📄 চিন্তার আহ্বানের প্রভাব ও সুফল
এর ফলে ঐ চিন্তাগত তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়- যা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প ও কারিগরী এবং মানব সভ্যতা-সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করলো। আর তার প্রভাব বিশ্বজগতের ওপর পড়ল, যেন তার কারণে একটি প্রশস্ত বাতায়ন ও জানালা খুলে গেল- যা থেকে আলো ও মুক্ত বাতাস প্রবাহিত হতে লাগল। ইসলাম যেন সেই তালা ভেঙ্গে বা খুলে দিল- যা স্বাধীনতা ও সুস্থ চিন্তার শত্রুরা এবং সনাতন ধর্মের ভ্রান্ত প্রতিনিধিগণ মানুষের বিবেক-বুদ্ধির উপর চাপিয়ে রেখেছিল। বিশ্ববাসী হাজার বছরের গভীর নিদ্রা থেকে জাগ্রত হলো। মানবতা ঐ নিদ্রা থেকে জেগে চোখ কচলিয়ে নিল। অতঃপর হাজার বছরের হারিয়ে যাওয়া উন্নতি পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে এবং পথের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে তীব্র গতিতে অগ্রসর হতে লাগল। এ বিশ্বজনীন প্রভাব ও তার বিভিন্নমুখী বিপ্লবের ব্যাপারে একজন ফরাসী পণ্ডিত (Jolivet Castelot) তার মূল্যবান গ্রন্থ ইতিহাসের আইন (La loi de Histoire)-এ উল্লেখ করেছেন:
"মুহাম্মদ (সা)-এর ইনতিকালের পর আরবরা অতি দ্রুত উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করে। সে সময় ইসলাম প্রচারের জন্য সময়ও বড়ই উপযোগী ছিল। সেই সাথে ইসলামি সভ্যতাও বিস্ময়কর উন্নতি লাভ করে এবং বিজয়ের সূত্রে তা সর্বত্র প্রসার লাভ করতে থাকে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কাব্য-সাহিত্যে তাদের প্রভাব বিকশিত হতে থাকে। এভাবে আরবরা কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত নিজেদের হাতে জ্ঞানের মশাল বহন করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐ সকল শাখায় তারা প্রতিনিধিত্ব করে- যার সম্পর্ক ছিল দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাথে। তারা যে শুধু প্রচলিত অর্থেই চিন্তানায়ক, আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক ছিল তাই নয়, বরং তারা নিজেদের শিক্ষা-সেবাকে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে, তারা প্রকৃত অর্থে চিন্তানায়ক ও জ্ঞানের উদ্ভাবক হবার সত্যই যোগ্য ছিল। আরবীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির বয়স কম ছিল কিন্তু তার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ছিল। এখন আমরা তার পতনে আক্ষেপই করতে পারি।"
অগ্রসর হয়ে তিনি আরো উল্লেখ করেন:
"শাসকগণ যদিও জমিদারী মেজায রাখত। তাদের দ্বারা যে কাজ হয়েছে তা তাদের ব্যক্তিত্বের অনেক ঊর্ধ্বে ছিল। এরই ফলে একটি বিস্ময়কর সভ্যতা অস্তিত্ব লাভ করল। ইউরোপ আরব সভ্যতার অনুগ্রহপ্রাপ্ত। বিশেষত, যখন তারা দশম শতাব্দী হতে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বিজয়ী ও শাসক ছিল ইউরোপ তখন তাদের দার্শনিকসুলভ ও জ্ঞান-চিন্তাদ্বারা উপকৃত হয়েছে- যা মধ্যযুগে নীরব প্রভাব ফেলেছে। আরব সভ্যতা-সংস্কৃতি, আরব জ্ঞান-বিজ্ঞান, আরব সাহিত্য, শিল্পকলার সামনে আমাদেরকে অজ্ঞ ও গোঁয়ার মনে হয়। তারা ঐ স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দ্বারা উপকৃত হয়েছে- যা সে যুগে আরব চিন্তাধারার কারণে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
"এ চারশতকে আরব সভ্যতা ছাড়া অন্য কোন সভ্যতা ছিল না। তখন আরব মনীষীগণই এ পতাকা উত্তোলন করে রেখেছিল।"'
গুস্তাভ লি বন (Gustave le Bon) লিখেছেন: "যা আধুনিক বিজ্ঞানের উৎসের মর্যাদা রাখে, তাকে লোকেরা বেকনের (Francis Bacon) উদ্ভাবন বলে মনে করে। কিন্তু এখন স্বীকার করা জরুরী যে, এ পদ্ধতি পুরোটাই আরবদের আবিষ্কৃত।"
ব্রিফাল্ট (Robert Briefault) তার The Making of Humanity গ্রন্থে উল্লেখ করেন: "ইউরোপের উন্নতির এমন কোন দিক নেই যার উপর ইসলামি সভ্যতার অনুগ্রহ ও উল্লেখযোগ্য প্রভাবের গভীর ছাপ নেই।"
তিনি অগ্রসর হয়ে লিখেছেন: "শুধু রসায়ণ চর্চাই যাতে আরবদের অনুগ্রহ স্বীকৃত, ইউরোপের নবজাগরণ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে এমন নয়, বরং ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি ইউরোপের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী প্রভাব ফেলেছে। আর তার সূচনা ঐ সময় হয়েছিল যখন ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রথম কিরণ ইউরোপের উপর পড়তে শুরু করেছিল।”২
টিকাঃ
১. الاستاذ محمد کرد علی، الاسلام والحضارة العربية. পৃঃ 480/488
২. The Making of Humanity. p. 202