📄 দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির দাওয়াত
পবিত্র কুরআন বাহ্যিক ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা (যার মধ্যে চোখের বড় গুরুত্ব রয়েছে) কাজ নিতে এবং সঠিকভাবে দেখার জন্য অত্যন্ত উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে- যাতে মানুষ সাধারণ দৃষ্টি হতে অন্তর্দৃষ্টি পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়। এর প্রথম স্তর সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে: أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَسُوقُ الْمَاءَ إِلَى الْأَرْضِ الْجُرْزِ فَنُخْرِجُ بِهِ زَرْعًا تَأْكُلُ مِنْهُ أَنْعَامُهُمْ وَأَنفُسُهُمْ ۖ أَفَلَا يُبْصِرُونَ. "তারা কি লক্ষ্য করে না যে, অবশ্যই আমি ঊষ্ণ ভূমির উপর পানি বর্ষণ করি। অতঃপর তার মাধ্যমে শস্য উদ্গত করি- যা থেকে আহার করে তাদের জীবজন্তু ও তারা নিজেরা। তবুও কি তারা লক্ষ্য করবে না।" [সূরা সাজদা: ২৭]
অধিকন্তু তিনি এ বিরাট শক্তি ও নিয়ামত (দৃষ্টিশক্তি) কাজে না লাগানোর কারণে তিরস্কার ও নিন্দা করেছেন। কারণ, তা হিদায়াত ও সুপথ লাভের মাধ্যম।
فَعَمُوا وَصَمُّوا ثُمَّ تَابَ اللهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ عَمُوا وَصَمُّوا كَثِيرٌ مِنْهُمْ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ.
“ফলে তারা অন্ধ ও বধির হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ্ তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হলেন। অতঃপর পুনরায় তাদের অনেকে অন্ধ ও বধির হয়ে গেল। তারা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহ্ পূর্ণ দ্রষ্টা।” [সূরা মায়িদা: ৭১]
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ .
"বলুন, অন্ধ আর চক্ষুষ্মান কি সমান? তোমরা কি অনুধাবন কর না।" [সূরা আন'আম: ৫০]
مَثَلُ الْفَرِيقَيْنِ كَالْأَعْمَى وَالْأَصَمِّ وَالْبَصِيرِ وَالسَّمِيعِ هَلْ يَسْتَوِيَانِ مَثَلاً أَفَلَا تَذَكَّرُونَ.
"দু'দলের উপমা অন্ধ ও বধিরের এবং চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তিসম্পন্নের ন্যায়। অবস্থায় দু'দল কি সমান? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?" [সূরা হূদ: ২৪]
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِي الظُّلُمَاتُ وَالنُّورُ.
"বলুন, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? অথবা অন্ধকার ও আলো কি এক?" [সূরা রা'দ: ১৬]
وَمَا يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ - وَلَا الظُّلُمَاتُ وَلَا النُّورُ .
"সমান নয় অন্ধ ও চক্ষুষ্মান। আর না অন্ধকার ও আলো।" [সূরা ফাতির: ১৯-২০]
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নিদর্শনাবলীকে উপেক্ষা করা ও তা এড়িয়ে যাওয়ার উপর শক্ত ভাবে সতর্ক করে ইরশাদ করেন:
وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ.
"আকাশমণ্ডলী ও যমীনের মাঝে অনেক নিদর্শন রয়েছে। তারা প্রত্যক্ষ করে। তা সত্ত্বেও তারা তা হতে বিমুখ।" [সূরা ইউসুফ: ১০৫]
অন্যত্র চোখওয়ালাদেরকে লজ্জা দেবার জন্য ইরশাদ করেন: فَاعْتَبِرُوا يَأَوْلِي الْأَبْصَارِ "হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।" [সূরা হাশর: ৩]
আকল-বুদ্ধি দ্বারা উপকৃত হওয়া এবং জ্ঞানীদেরকে লজ্জা দেবার জন্য تَعْقِلُونَ শব্দটি পবিত্র কুরআনে বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি এ ধরনের আয়াতের সংখ্যা তেইশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ঐ সকল আয়াতে: لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ - أَفَلَا تَعْقِلُونَ - إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ. এ ধরনের বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এখানে আমরা কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছি-
كَذلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ "এভাবে আল্লাহ্ তাঁর বিধানসমূহ তোমাদের জন্য খুলে খুলে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা বুঝতে পার।" [সূরা বাকারা: ২৪২]
قَدْ بَيَّنَا لَكُمُ الْآيَاتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ. "অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেছি। যদি তোমরা অনুধাবন কর।" [সূরা আলে ইমরান: ১১৮]
وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ - أَفَلَا تَعْقِلُونَ. "যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আখিরাতের আবাসই শ্রেয়। তোমরা কি এটা অনুধাবন কর না?" [সূরা আ'রাফ: ১৬৯]
لَقَدْ اَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ كِتَابًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ. "আমি তো তোমাদের কাছে অবতীর্ণ করেছি কিতাব, যাতে আছে তোমাদের জন্য উপদেশ। তবু কি তোমরা বুঝবে না?" [সূরা আম্বিয়া: ১০]
وَإِنَّكُمْ لَتَمُرُّونَ عَلَيْهِمْ مُصْبِحِينَ وَبِالَّيْلِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ. "তোমরা তো তাদের ধ্বংসাবশেষগুলো অতিক্রম করে থাক সকাল-সন্ধ্যায়। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না?" [সূরা সাফফাত: ১৩৭-১৩৮]
জাহান্নামবাসী এ পবিত্র ইন্দ্রিয় কাজে না লাগাবার কথা আলোচনা করে বলবে:
وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ. "তারা আরো বলবে, যদি আমরা শুনতাম অথবা বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগাতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামবাসী হতাম না।" [সূরা মুলক : ১০]
এভাবে يَعْقِلُونَ শব্দটি প্রশংসা ও ইতিবাচক প্রসঙ্গে বিশ বারের অধিক ব্যবহৃত হয়েছে।
চিন্তার আহ্বান জানানো, চিন্তাবিদদের প্রশংসার ক্ষেত্রে এবং চিন্তাশক্তিকে কাজে না লাগানো ব্যক্তিদের নিন্দায় পবিত্র কুরআনের আচরণ এটাই। কাজেই এ পবিত্র কুরআনে تَفَكُّر (চিন্তা) শব্দটি এগার বার এসেছে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً. "যারা দাঁড়ানো, বসা ও শোয়া অবস্থায় আল্লাহ্ যিকির করে এবং আকাশমণ্ডলী ও যমীনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং বলে, হে আমাদের রব! আপনি এটা অহেতুক সৃষ্টি করেন নি।" [সূরা আলে ইমরান : ১৯১]
فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ. "আপনি ঘটনা বর্ণনা করুন, যাতে তারা চিন্তা করে।" [সূরা আ'রাফ : ১৭৬]
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ. "এতে অবশ্যই চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" [সূরা রা'দ : ৩]
এই চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে মুমিন ও আল্লাহ্র পরিচয় লাভকারী বান্দা ঐ মহাসত্য পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়- যে ব্যাপারে পবিত্র কুরআন তাদের ভাষায় ব্যক্ত করেছে:
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً. "হে আমাদের প্রভু! আপনি এসব কিছু অহেতুক সৃষ্টি করেননি।" [সূরা আলে ইমরান : ১৯১]
📄 চিন্তার আহ্বানের প্রভাব ও সুফল
এর ফলে ঐ চিন্তাগত তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়- যা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প ও কারিগরী এবং মানব সভ্যতা-সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করলো। আর তার প্রভাব বিশ্বজগতের ওপর পড়ল, যেন তার কারণে একটি প্রশস্ত বাতায়ন ও জানালা খুলে গেল- যা থেকে আলো ও মুক্ত বাতাস প্রবাহিত হতে লাগল। ইসলাম যেন সেই তালা ভেঙ্গে বা খুলে দিল- যা স্বাধীনতা ও সুস্থ চিন্তার শত্রুরা এবং সনাতন ধর্মের ভ্রান্ত প্রতিনিধিগণ মানুষের বিবেক-বুদ্ধির উপর চাপিয়ে রেখেছিল। বিশ্ববাসী হাজার বছরের গভীর নিদ্রা থেকে জাগ্রত হলো। মানবতা ঐ নিদ্রা থেকে জেগে চোখ কচলিয়ে নিল। অতঃপর হাজার বছরের হারিয়ে যাওয়া উন্নতি পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে এবং পথের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে তীব্র গতিতে অগ্রসর হতে লাগল। এ বিশ্বজনীন প্রভাব ও তার বিভিন্নমুখী বিপ্লবের ব্যাপারে একজন ফরাসী পণ্ডিত (Jolivet Castelot) তার মূল্যবান গ্রন্থ ইতিহাসের আইন (La loi de Histoire)-এ উল্লেখ করেছেন:
"মুহাম্মদ (সা)-এর ইনতিকালের পর আরবরা অতি দ্রুত উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করে। সে সময় ইসলাম প্রচারের জন্য সময়ও বড়ই উপযোগী ছিল। সেই সাথে ইসলামি সভ্যতাও বিস্ময়কর উন্নতি লাভ করে এবং বিজয়ের সূত্রে তা সর্বত্র প্রসার লাভ করতে থাকে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কাব্য-সাহিত্যে তাদের প্রভাব বিকশিত হতে থাকে। এভাবে আরবরা কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত নিজেদের হাতে জ্ঞানের মশাল বহন করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐ সকল শাখায় তারা প্রতিনিধিত্ব করে- যার সম্পর্ক ছিল দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাথে। তারা যে শুধু প্রচলিত অর্থেই চিন্তানায়ক, আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক ছিল তাই নয়, বরং তারা নিজেদের শিক্ষা-সেবাকে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে, তারা প্রকৃত অর্থে চিন্তানায়ক ও জ্ঞানের উদ্ভাবক হবার সত্যই যোগ্য ছিল। আরবীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির বয়স কম ছিল কিন্তু তার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ছিল। এখন আমরা তার পতনে আক্ষেপই করতে পারি।"
অগ্রসর হয়ে তিনি আরো উল্লেখ করেন:
"শাসকগণ যদিও জমিদারী মেজায রাখত। তাদের দ্বারা যে কাজ হয়েছে তা তাদের ব্যক্তিত্বের অনেক ঊর্ধ্বে ছিল। এরই ফলে একটি বিস্ময়কর সভ্যতা অস্তিত্ব লাভ করল। ইউরোপ আরব সভ্যতার অনুগ্রহপ্রাপ্ত। বিশেষত, যখন তারা দশম শতাব্দী হতে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বিজয়ী ও শাসক ছিল ইউরোপ তখন তাদের দার্শনিকসুলভ ও জ্ঞান-চিন্তাদ্বারা উপকৃত হয়েছে- যা মধ্যযুগে নীরব প্রভাব ফেলেছে। আরব সভ্যতা-সংস্কৃতি, আরব জ্ঞান-বিজ্ঞান, আরব সাহিত্য, শিল্পকলার সামনে আমাদেরকে অজ্ঞ ও গোঁয়ার মনে হয়। তারা ঐ স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দ্বারা উপকৃত হয়েছে- যা সে যুগে আরব চিন্তাধারার কারণে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
"এ চারশতকে আরব সভ্যতা ছাড়া অন্য কোন সভ্যতা ছিল না। তখন আরব মনীষীগণই এ পতাকা উত্তোলন করে রেখেছিল।"'
গুস্তাভ লি বন (Gustave le Bon) লিখেছেন: "যা আধুনিক বিজ্ঞানের উৎসের মর্যাদা রাখে, তাকে লোকেরা বেকনের (Francis Bacon) উদ্ভাবন বলে মনে করে। কিন্তু এখন স্বীকার করা জরুরী যে, এ পদ্ধতি পুরোটাই আরবদের আবিষ্কৃত।"
ব্রিফাল্ট (Robert Briefault) তার The Making of Humanity গ্রন্থে উল্লেখ করেন: "ইউরোপের উন্নতির এমন কোন দিক নেই যার উপর ইসলামি সভ্যতার অনুগ্রহ ও উল্লেখযোগ্য প্রভাবের গভীর ছাপ নেই।"
তিনি অগ্রসর হয়ে লিখেছেন: "শুধু রসায়ণ চর্চাই যাতে আরবদের অনুগ্রহ স্বীকৃত, ইউরোপের নবজাগরণ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে এমন নয়, বরং ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি ইউরোপের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী প্রভাব ফেলেছে। আর তার সূচনা ঐ সময় হয়েছিল যখন ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রথম কিরণ ইউরোপের উপর পড়তে শুরু করেছিল।”২
টিকাঃ
১. الاستاذ محمد کرد علی، الاسلام والحضارة العربية. পৃঃ 480/488
২. The Making of Humanity. p. 202