📄 জ্ঞানের বিভিন্ন পুঁথিগুলোকে এক সুতোয় বাঁধা
জ্ঞানের সঠিক উদ্দেশ্যের দিকে পথ প্রদর্শন করা এবং তাকে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও কল্যাণকর, আরো বিশ্বাসের মাধ্যম বানাবার ক্ষেত্রে প্রিয়নবী (সা)-এর নবুয়ত ও ইসলামি দাওয়াতের ভূমিকা মূল্য ও মূল্যায়নে তা থেকে অনেক বেশি- যা পালন করেছে শিক্ষা আন্দোলনকে কার্যকর করতে ও বিস্তারের ক্ষেত্রে।
জ্ঞানের পুথিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল; এবং অনেক সময় পরস্পর সাংঘর্ষিক ছিল। রসায়ণশাস্ত্র ও বিজ্ঞানশাস্ত্র রীতিমত ধর্মের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। এমনকি গণিতশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো নির্দোষ জ্ঞানের পণ্ডিতগণও কখনো কখনো নেতিবাচক ও ধর্মহীন নাস্তিক্যবাদী ফলাফল উদ্ভাবন করত। সুতরাং গ্রীক দার্শনিকগণ (যারা কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত দর্শন ও গণিতশাস্ত্রে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল) হয়তো তারা মুশরিক ছিল নতুবা তারা ধর্মহীন নাস্তিক ছিল। আর গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্বীনি চেতনার জন্য বিপদের কারণ এবং নাস্তিকদের জন্য সনদ ও দলিল-প্রমাণ এবং আদর্শ হয়ে বিদ্যমান ছিল। এ অবস্থায় ইসলামের বড় অবদান ছিল এই যে, তা এমন ঐক্য সৃষ্টি করেছে- যা জ্ঞানের সকল পথিককে এক সুঁতোয় গেঁথেছে। আর এটা তার জন্য করা এজন্য সহজ হয়েছিল যে, তার শিক্ষা সফর সঠিক সূচনাবিন্দু (Staring point) হতে সূত্রপাত হয়েছিল।
ইসলাম শিক্ষাকে আল্লাহর প্রতি ঈমান, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা ও আল্লাহর উপর ভরসা করার মাধ্যমে এবং اقرأ باسم ربك এ নির্দেশের উপর আমল করার মাধ্যমে শুরু করে। আর এটা বাস্তব সত্য কথা যে, অনেক সময় সঠিক সূচনা নির্ভুল পরিণাম ও শুভ ফলের নিশ্চয়তা প্রদান করে। ইসলাম কুরআন ও ঈমানের দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে এমন ঐক্য আবিষ্কার করেছে, যা সকল ঐক্যকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। আর এ ঐক্য হলো আল্লাহ্ তা'আলার মা'রিফাত ও পরিচয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রশংসা করেছেন:
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقٍ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحْنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"তারা আকাশমণ্ডলী ও যমীনের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। অতঃপর বলে- হে আমাদের রব! আপনি এটি অহেতুক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।" [আলে ইমরান: ১৯১]
অতীতকালে মানুষের কাছে জাগতিক ঐক্যসমূহের মাঝে বাহ্যত পরস্পর বিরোধী মনে হত। অর্থাৎ জগতের বাহ্যিক কাঠামো, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাঝে সংঘাতময় দৃষ্টিগোচর হত। ফলে, তাকে বিস্ময় ও অস্থিরতার মাঝে ফেলে দিত এবং এক পর্যায়ে তাকে কুফরী ও ধর্মহীনতার পথে নিয়ে যেত। আবার কখনো তা বিশ্বস্রষ্টা ও বিশ্বনিয়ন্ত্রকের প্রতি সমালোচনা ও আপত্তির পর্যায়ে পৌঁছে দিত। এসব লক্ষ্য করে কুরআন ও ঈমানভিত্তিক ইসলামি শিক্ষা পৃথিবীকে এমন ঐক্য প্রদান করল- যা জাগতিক ঐক্যসমূহকে একত্রিত করে দিল। আর এটি ছিল আল্লাহ্র প্রবল ইচ্ছা ও তাঁর পূর্ণ হিকমতের বহিঃপ্রকাশ।
একজন জার্মান মনীষী হেরাল্ড হফডিং (Harald Hoffding) এ ঐক্যের আবিষ্কার এবং মানব জীবন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নীতি-নৈতিকতার ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় তার প্রভাব ও কার্যকর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন:
"প্রত্যেক ধর্মের বিশ্বাস একত্ববাদের উপর- যার দৃষ্টিভঙ্গি হলো- বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিলাভের কারণ একই (এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনিবার্য কারণবশত এ ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যাবলীর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে) এ দৃষ্টিভঙ্গি ঈমান, আকীদা-বিশ্বাস ও মানব স্বভাবের উপর অত্যন্ত অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে এবং তাকে মান্যকারীদের জন্য এ আকীদা-বিশ্বাস রাখা অত্যন্ত সহজ (কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে মতবিরোধ ও কিছু বিষয়কে এড়িয়ে গেলে) হয় যে, বিশ্বের সবকিছুই একটি বিধিগত নিয়মের আওতায় ঐক্যবদ্ধ। কেননা, কারণের ঐক্য বিধিগত ঐক্যেরও দাবি রাখে।
মধ্যযুগের ধর্মদর্শন আধিক্যের মাঝে ঐক্যের ধারণার বিষয়টি মানুষের মস্তিষ্কে বসিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল, যে কারণে বর্বর লোকেরা প্রকৃতির দৃশ্যমান আধিক্যের কারণে তা থেকে গাফিল ও উদাসীন হয়ে পড়েছিল। আর এ সকল আধিক্য প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে এজন্য ভুলত্রুটি হত যে, তার হাতে সেগুলোর মাঝে সত্তাগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মত কোন সূত্র ছিল না।"১
এভাবে জ্ঞান উদ্দেশ্যপূর্ণ, কল্যাণকর, আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। আর তা নিজস্ব প্রচেষ্টায় মানবতার সেবায়, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করে। ফলে, এ চিন্তাধারা মানুষের চিন্তা- চেতনা ও কর্মপন্থার জগতে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ বলে বিবেচিত হয়েছিল- যা মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সাধন করে এবং মানুষের চিন্তার গতি ঘুরিয়ে দেয়। পশ্চিমা মনীষীগণও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানবীয় চিন্তার উপর পবিত্র কুরআনের এ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা তন্মধ্য থেকে এখানে দু'টিমাত্র সাক্ষ্য উল্লেখ করাকে যথেষ্ট মনে করব।
বিখ্যাত ইসলাম বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদ মার্গোলিয়াথ (G. Margolioth), রাডওয়েল (J.M. Rodweil) রচিত কুরআনুল কারীমের অনুবাদ গ্রন্থের ভূমিকাতে উল্লেখ করেন:
"দুনিয়াতে ধর্মগ্রন্থসমূহের মধ্যে কুরআন একটি বিশেষ মর্যাদা রাখে, অথচ এ ধরনের ইতিহাস নির্ভর রচনার মধ্যে তার বয়স সবচেয়ে কম। কিন্তু মানুষের উপর বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষেত্রে তা অন্য কারো থেকে পেছনে নয়। এ কুরআন একটি নতুন মানবীয় চিন্তাধারা সৃষ্টি করতে এবং একটি নতুন নীতি- নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপনে সক্ষম হয়েছে।"২
অন্য আরেকজন বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ হার্টউইগ হার্শফেন্ড (Hartwig Hirschfeld লিখেছেন:
"আমাদের এতে আশ্চর্য লাগে যে, কুরআন সকল জ্ঞানের উৎস। আসমান- যমীন, মানবজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারিগরী, যে সকল বিষয় তাতে আলোচনা হয়েছে, তা সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে এবং তাফসীর গ্রন্থসমূহে তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এর উপর ব্যাপক আলোচনা- পর্যালোচনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ফলে, مسلمانوں মাঝে পরোক্ষভাবে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির পথ সুগম হয়েছে। সে কেবল যে আরবদেরকেই প্রভাবিত করেছে এমন নয়, বরং তা ইয়াহুদী দার্শনিকগণকে ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক বিষয়ে আরবদের অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। পরিশেষে, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব আরব ধর্মতত্ত্বদ্বারা যে পরিমাণ উপকৃত হয়েছে, তার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।
"আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে ইসলামের প্রচেষ্টা শুধু ধর্মীয় বিষয়াদির মাঝে সীমাবদ্ধ। গ্রীক সৌরবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক রচনাবলি অধ্যয়ন করার কারণে তাদের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রতি মনোযোগী করে তোলে। মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে দুনিয়া যে অহী লাভ করেছে, তাতে সৌরজগতের ঘূর্ণিপাকের আলোচনা করা হয়েছে এবং তা তার পূজা দেবার জন্য নয়, বরং তা আল্লাহ্ পাকের নিদর্শন ও মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে করা হয়েছে। সমস্ত মুসলিম জাতি-গোষ্ঠী সৌরজগত সম্পর্কে সাফল্যের সাথে পর্যালোচনা করেছে শত শত বছর পর্যন্ত; তারাই এ বিদ্যার ধারকবাহক ছিল এবং এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ নক্ষত্র ও গ্রহসমূহের নাম ও তাদের গতিবিধি বিষয়ক শব্দগুলো আরবদের ব্যবহৃত। মধ্যযুগে ইউরোপের সৌরবিদ্যার পণ্ডিতগণ আরবদের ছাত্র ছিলেন।
এভাবে কুরআন চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যায়নের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে এবং সাধারণভাবে প্রকৃতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করতে এবং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।”১
টিকাঃ
১. History of Modern Philosophy, p. 5
২. Rev. G. Margolioths In Introduction to the Koran by J. M. Rodweel. London- (1918)
১. Hartwitg Hirschfeld New Reseharches into Composition and Exegesis of the Quran, London. (1908) p. 9
জ্ঞানের সঠিক উদ্দেশ্যের দিকে পথ প্রদর্শন করা এবং তাকে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও কল্যাণকর, আরো বিশ্বাসের মাধ্যম বানাবার ক্ষেত্রে প্রিয়নবী (সা)-এর নবুয়ত ও ইসলামি দাওয়াতের ভূমিকা মূল্য ও মূল্যায়নে তা থেকে অনেক বেশি- যা পালন করেছে শিক্ষা আন্দোলনকে কার্যকর করতে ও বিস্তারের ক্ষেত্রে।
জ্ঞানের পুথিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল; এবং অনেক সময় পরস্পর সাংঘর্ষিক ছিল। রসায়ণশাস্ত্র ও বিজ্ঞানশাস্ত্র রীতিমত ধর্মের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। এমনকি গণিতশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো নির্দোষ জ্ঞানের পণ্ডিতগণও কখনো কখনো নেতিবাচক ও ধর্মহীন নাস্তিক্যবাদী ফলাফল উদ্ভাবন করত। সুতরাং গ্রীক দার্শনিকগণ (যারা কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত দর্শন ও গণিতশাস্ত্রে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল) হয়তো তারা মুশরিক ছিল নতুবা তারা ধর্মহীন নাস্তিক ছিল। আর গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্বীনি চেতনার জন্য বিপদের কারণ এবং নাস্তিকদের জন্য সনদ ও দলিল-প্রমাণ এবং আদর্শ হয়ে বিদ্যমান ছিল। এ অবস্থায় ইসলামের বড় অবদান ছিল এই যে, তা এমন ঐক্য সৃষ্টি করেছে- যা জ্ঞানের সকল পথিককে এক সুঁতোয় গেঁথেছে। আর এটা তার জন্য করা এজন্য সহজ হয়েছিল যে, তার শিক্ষা সফর সঠিক সূচনাবিন্দু (Staring point) হতে সূত্রপাত হয়েছিল।
ইসলাম শিক্ষাকে আল্লাহর প্রতি ঈমান, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা ও আল্লাহর উপর ভরসা করার মাধ্যমে এবং اقرأ باسم ربك এ নির্দেশের উপর আমল করার মাধ্যমে শুরু করে। আর এটা বাস্তব সত্য কথা যে, অনেক সময় সঠিক সূচনা নির্ভুল পরিণাম ও শুভ ফলের নিশ্চয়তা প্রদান করে। ইসলাম কুরআন ও ঈমানের দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে এমন ঐক্য আবিষ্কার করেছে, যা সকল ঐক্যকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। আর এ ঐক্য হলো আল্লাহ্ তা'আলার মা'রিফাত ও পরিচয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রশংসা করেছেন:
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقٍ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحْنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"তারা আকাশমণ্ডলী ও যমীনের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। অতঃপর বলে- হে আমাদের রব! আপনি এটি অহেতুক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।" [আলে ইমরান: ১৯১]
অতীতকালে মানুষের কাছে জাগতিক ঐক্যসমূহের মাঝে বাহ্যত পরস্পর বিরোধী মনে হত। অর্থাৎ জগতের বাহ্যিক কাঠামো, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাঝে সংঘাতময় দৃষ্টিগোচর হত। ফলে, তাকে বিস্ময় ও অস্থিরতার মাঝে ফেলে দিত এবং এক পর্যায়ে তাকে কুফরী ও ধর্মহীনতার পথে নিয়ে যেত। আবার কখনো তা বিশ্বস্রষ্টা ও বিশ্বনিয়ন্ত্রকের প্রতি সমালোচনা ও আপত্তির পর্যায়ে পৌঁছে দিত। এসব লক্ষ্য করে কুরআন ও ঈমানভিত্তিক ইসলামি শিক্ষা পৃথিবীকে এমন ঐক্য প্রদান করল- যা জাগতিক ঐক্যসমূহকে একত্রিত করে দিল। আর এটি ছিল আল্লাহ্র প্রবল ইচ্ছা ও তাঁর পূর্ণ হিকমতের বহিঃপ্রকাশ।
একজন জার্মান মনীষী হেরাল্ড হফডিং (Harald Hoffding) এ ঐক্যের আবিষ্কার এবং মানব জীবন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নীতি-নৈতিকতার ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় তার প্রভাব ও কার্যকর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন:
"প্রত্যেক ধর্মের বিশ্বাস একত্ববাদের উপর- যার দৃষ্টিভঙ্গি হলো- বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিলাভের কারণ একই (এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনিবার্য কারণবশত এ ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যাবলীর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে) এ দৃষ্টিভঙ্গি ঈমান, আকীদা-বিশ্বাস ও মানব স্বভাবের উপর অত্যন্ত অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে এবং তাকে মান্যকারীদের জন্য এ আকীদা-বিশ্বাস রাখা অত্যন্ত সহজ (কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে মতবিরোধ ও কিছু বিষয়কে এড়িয়ে গেলে) হয় যে, বিশ্বের সবকিছুই একটি বিধিগত নিয়মের আওতায় ঐক্যবদ্ধ। কেননা, কারণের ঐক্য বিধিগত ঐক্যেরও দাবি রাখে।
মধ্যযুগের ধর্মদর্শন আধিক্যের মাঝে ঐক্যের ধারণার বিষয়টি মানুষের মস্তিষ্কে বসিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল, যে কারণে বর্বর লোকেরা প্রকৃতির দৃশ্যমান আধিক্যের কারণে তা থেকে গাফিল ও উদাসীন হয়ে পড়েছিল। আর এ সকল আধিক্য প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে এজন্য ভুলত্রুটি হত যে, তার হাতে সেগুলোর মাঝে সত্তাগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মত কোন সূত্র ছিল না।"১
এভাবে জ্ঞান উদ্দেশ্যপূর্ণ, কল্যাণকর, আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। আর তা নিজস্ব প্রচেষ্টায় মানবতার সেবায়, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করে। ফলে, এ চিন্তাধারা মানুষের চিন্তা- চেতনা ও কর্মপন্থার জগতে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ বলে বিবেচিত হয়েছিল- যা মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সাধন করে এবং মানুষের চিন্তার গতি ঘুরিয়ে দেয়। পশ্চিমা মনীষীগণও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানবীয় চিন্তার উপর পবিত্র কুরআনের এ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা তন্মধ্য থেকে এখানে দু'টিমাত্র সাক্ষ্য উল্লেখ করাকে যথেষ্ট মনে করব।
বিখ্যাত ইসলাম বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদ মার্গোলিয়াথ (G. Margolioth), রাডওয়েল (J.M. Rodweil) রচিত কুরআনুল কারীমের অনুবাদ গ্রন্থের ভূমিকাতে উল্লেখ করেন:
"দুনিয়াতে ধর্মগ্রন্থসমূহের মধ্যে কুরআন একটি বিশেষ মর্যাদা রাখে, অথচ এ ধরনের ইতিহাস নির্ভর রচনার মধ্যে তার বয়স সবচেয়ে কম। কিন্তু মানুষের উপর বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষেত্রে তা অন্য কারো থেকে পেছনে নয়। এ কুরআন একটি নতুন মানবীয় চিন্তাধারা সৃষ্টি করতে এবং একটি নতুন নীতি- নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপনে সক্ষম হয়েছে।"২
অন্য আরেকজন বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ হার্টউইগ হার্শফেন্ড (Hartwig Hirschfeld লিখেছেন:
"আমাদের এতে আশ্চর্য লাগে যে, কুরআন সকল জ্ঞানের উৎস। আসমান- যমীন, মানবজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারিগরী, যে সকল বিষয় তাতে আলোচনা হয়েছে, তা সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে এবং তাফসীর গ্রন্থসমূহে তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এর উপর ব্যাপক আলোচনা- পর্যালোচনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ফলে, مسلمانوں মাঝে পরোক্ষভাবে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির পথ সুগম হয়েছে। সে কেবল যে আরবদেরকেই প্রভাবিত করেছে এমন নয়, বরং তা ইয়াহুদী দার্শনিকগণকে ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক বিষয়ে আরবদের অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। পরিশেষে, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব আরব ধর্মতত্ত্বদ্বারা যে পরিমাণ উপকৃত হয়েছে, তার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।
"আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে ইসলামের প্রচেষ্টা শুধু ধর্মীয় বিষয়াদির মাঝে সীমাবদ্ধ। গ্রীক সৌরবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক রচনাবলি অধ্যয়ন করার কারণে তাদের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রতি মনোযোগী করে তোলে। মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে দুনিয়া যে অহী লাভ করেছে, তাতে সৌরজগতের ঘূর্ণিপাকের আলোচনা করা হয়েছে এবং তা তার পূজা দেবার জন্য নয়, বরং তা আল্লাহ্ পাকের নিদর্শন ও মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে করা হয়েছে। সমস্ত মুসলিম জাতি-গোষ্ঠী সৌরজগত সম্পর্কে সাফল্যের সাথে পর্যালোচনা করেছে শত শত বছর পর্যন্ত; তারাই এ বিদ্যার ধারকবাহক ছিল এবং এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ নক্ষত্র ও গ্রহসমূহের নাম ও তাদের গতিবিধি বিষয়ক শব্দগুলো আরবদের ব্যবহৃত। মধ্যযুগে ইউরোপের সৌরবিদ্যার পণ্ডিতগণ আরবদের ছাত্র ছিলেন।
এভাবে কুরআন চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যায়নের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে এবং সাধারণভাবে প্রকৃতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করতে এবং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।”১
টিকাঃ
১. History of Modern Philosophy, p. 5
২. Rev. G. Margolioths In Introduction to the Koran by J. M. Rodweel. London- (1918)
১. Hartwitg Hirschfeld New Reseharches into Composition and Exegesis of the Quran, London. (1908) p. 9