📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 দ্বীনের মেজায নির্ধারণ

📄 দ্বীনের মেজায নির্ধারণ


এটি ছিল প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ প্রথম অহী এবং অহীর ধারাবাহিকতার সূচনাবিন্দু- যা পরবর্তী সকল স্তরে এবং দ্বীনের মেজায, স্বভাব ও প্রকৃতি নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এবং তা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-কলা, দাওয়াত ও আন্দোলন বা চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। আর এ কারণে ইসলাম ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাঝে স্থায়ী সুসম্পর্ক ও সহযাত্রা রয়েছে। ফলে, ইসলাম সব সময় জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে মানবীয় স্পৃহা ও নতুন নতুন সংকট সমাধান করার যোগ্যতা ও সমর্থনের সঙ্গ দিয়েছে, সাধারণত কোন প্রজন্ম, মানবীয় জ্ঞানবুদ্ধি ও সুস্থ সমাজ এর মুখোমুখি হয়ে থাকে। ইসলাম কখনোই জ্ঞানের প্রতি বিরাগ বা বুদ্ধিবৃত্তির প্রবাহ-প্রতিপত্তির কারণে ভীত হয়নি।

টিকাঃ
১. কুরায়শদের মাঝে মাত্র সতেরজন লেখাপড়া জানত। এটাই প্রসিদ্ধ আরব লেখক ইবন আবদ রাব্বিহী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল ইকদুল ফারীদ'-এ উল্লেখ করেছেন। (দেখুন- ৪/২৪২ পৃঃ) অধিকন্তু, আল্লামা বালাযুরী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফুতুহুল বুলদান'-এ এ মতই প্রকাশ করেছেন। (দেখুন ৪৫৭ পৃঃ অবশ্য কেউ কেউ এ সংখ্যা কিছু অধিক বলেছেন; তবে তাও খুব বেশি নয়

এটি ছিল প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ প্রথম অহী এবং অহীর ধারাবাহিকতার সূচনাবিন্দু- যা পরবর্তী সকল স্তরে এবং দ্বীনের মেজায, স্বভাব ও প্রকৃতি নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এবং তা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-কলা, দাওয়াত ও আন্দোলন বা চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। আর এ কারণে ইসলাম ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাঝে স্থায়ী সুসম্পর্ক ও সহযাত্রা রয়েছে। ফলে, ইসলাম সব সময় জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে মানবীয় স্পৃহা ও নতুন নতুন সংকট সমাধান করার যোগ্যতা ও সমর্থনের সঙ্গ দিয়েছে, সাধারণত কোন প্রজন্ম, মানবীয় জ্ঞানবুদ্ধি ও সুস্থ সমাজ এর মুখোমুখি হয়ে থাকে। ইসলাম কখনোই জ্ঞানের প্রতি বিরাগ বা বুদ্ধিবৃত্তির প্রবাহ-প্রতিপত্তির কারণে ভীত হয়নি।

টিকাঃ
১. কুরায়শদের মাঝে মাত্র সতেরজন লেখাপড়া জানত। এটাই প্রসিদ্ধ আরব লেখক ইবন আবদ রাব্বিহী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল ইকদুল ফারীদ'-এ উল্লেখ করেছেন। (দেখুন- ৪/২৪২ পৃঃ) অধিকন্তু, আল্লামা বালাযুরী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফুতুহুল বুলদান'-এ এ মতই প্রকাশ করেছেন। (দেখুন ৪৫৭ পৃঃ অবশ্য কেউ কেউ এ সংখ্যা কিছু অধিক বলেছেন; তবে তাও খুব বেশি নয়

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপারে কিছু ধর্ম ভীত

📄 জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপারে কিছু ধর্ম ভীত


কিছু ধর্ম এমনো রয়েছে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৃত্যুর মাঝে নিজেদের জীবন এবং তার পরাজয়ের মাঝে নিজেদের বিজয় অনুভব করে। এর দৃষ্টান্ত একটি গল্পের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।
কথিত আছে যে, একবার মাছিদের একটি দল হযরত সুলায়মান (আ)-এর কাছে জড়ো হয়ে বাতাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে, বাতাস আমাদের উপর নির্দয়ভাবে জুলুম করে। কারণ, আমরা তার উপস্থিতিতে টিকতে পারি না। দমকা বাতাস প্রবাহিত হবার সাথে সাথে আমাদের পলায়ন করতে হয়। তাদের অভিযোগ শ্রবণ করে হযরত সুলায়মান (আ.) বললেন, বিবাদীর উপস্থিতি প্রয়োজন। সুতরাং বাতাসকে তলব করা হলো। কিন্তু বাতাস উপস্থিত হবার সাথে সাথে মাছির দল উধাও হয়ে গেল। এতে হযরত সুলায়মান (আ.) বললেন- বাদীর অনুপস্থিতিতে আমরা কিভাবে সিদ্ধান্ত নিব? এ অবস্থাই অনেক ধর্মের। ভারতের সনাতন ধর্ম এবং তার অসংখ্য নেতার কর্মপদ্ধতিও এ মর্মে একাধিক সাক্ষ্য সরবরাহ করে।
ইউরোপে গির্জা ও বিজ্ঞানের লড়াই ও বিবাদের কাহিনী তো অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে মার্কিন লেখক ড্রেপারের গ্রন্থটি Conflict between Religon and Science ঐতিহাসিক দলিলপত্র সমৃদ্ধ অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ।' মধ্যযুগে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত তদন্ত আদালত Courts of Inquistion ও গির্জার মাঝে বিবাদের সংখ্যা হাজারের বেশি হবে। সে সময় ঐসব আদালতের দেয়া লোমহর্ষক রায়ের কারণে আজো শরীর ভয়ে প্রকম্পিত হয়।
খ্রিস্টীয় বিশ্বাসসমূহ পরীক্ষার এ ধর্মীয় আদালতসমূহ (Courts of nquisition) রোমান ক্যাথলিক গির্জার পক্ষ হতে মধ্যযুগে ইতালী, ফ্রান্স, জার্মান ও স্পেনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ সব আদালত ধর্মত্যাগের কারণে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের নির্মম শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ছিল। ১৪৯০ সালে স্পেনে আরবদের পতনের পর ঐসব আদালতের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সরকার নিজের দখলে নিয়ে নেয়। ফলে, সতের শতাব্দীর দিকে তাদের পতন শুরু হয়। ১৮০৮ সালের দিকে নেপোলিয়ন এগুলো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৮২০ সালে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত তা কোনো না কোনো আকারে চলতে থাকে। তবে এটা বলা মুশকিল যে, মোট কত লোক ঐ সকল আদালতের রায়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছে। তবে এমন লোকের সংখ্যা লাখের মত হবে এটা নিশ্চিত।
পবিত্র কুরআন নাযিল হয়ে শিক্ষার এমন মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছে এবং জ্ঞানীদের এত অধিক মর্যাদা ও মূল্যায়ন করেছে- যার তুলনা পূর্ববর্তী কোন গ্রন্থে এবং প্রাচীন কোন ধর্মে পাওয়া মুশকিল। পবিত্র কুরআন জ্ঞান ও জ্ঞানীদের এমন ভূয়সী প্রশংসা করেছে যাদ্বারা তাদের মর্যাদা নবীদের নীচের স্তরে এবং সকল মানব সম্প্রদায়ের উপরের স্তরে পৌঁছে গেছে। এ মর্মে আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন:
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"আল্লাহ্ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং ফেরেশতা ও জ্ঞানীগণও আর তিনি ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।" [সূরা আলে ইমরান: ১৮]
তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন:
وَقُلْ رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا. "বলুন! হে আমার রব, আমার জ্ঞানকে বাড়িয়ে দিন।” [সূরা তাহা : ১১৪]
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ . "আপনি বলুন, যারা জ্ঞান রাখে আর যারা জ্ঞান রাখে না, তারা কি সমান হতে পারে?" [সূরা যুমার: ৯]
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ. "আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের মধ্য হতে যারা ঈমানদার ও জ্ঞানী, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।" [সূরা মুজাদালাহ: ১১]
إِنَّمَا يَخْشَيْ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الْعَلَمُوا . "আল্লাহকে তো শুধুমাত্র জ্ঞানী লোকেরাই ভয় করে।" [সূরা ফাতির: ২৮]
এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী (সা)-এর হাদীস ভাণ্ডার হতে এখানে কয়েকটি বর্ণনা করা যথেষ্ট হবে।
فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ . "একজন আলিমের মর্যাদা একজন আবেদের উপর এমন, যেমন তোমাদের সাধারণ মানুষের উপর আমার মর্যাদা।" [তিরমিযী]
إِنَّ الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَبًا وَإِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ - فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظّ وَافِرٍ . "আলিমগণ নবীদের ওয়ারিস, আর নবীগণ কাউকে দীনার বা দিরহামের ওয়ারিস বানান না। তাঁরা শুধুমাত্র এক্ষেত্রে ইলমের ওয়ারিস বানান। সুতরাং যে ইলমকে গ্রহণ করলো, সে বড় মূল্যবান সম্পদ গ্রহণ করলো।" [আবু দাউদ ও তিরমিযী]
জ্ঞানের এ পরিমাণ মর্যাদা ও উৎসাহ প্রদানের কারণে ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানের প্রতি এমন উদ্যম, এমন স্পৃহা ও অধ্যবসায় সৃষ্টি হয়েছিল এবং জ্ঞানের জন্য আত্মোৎসর্গ-আত্মবিসর্জনের এমন অপরিসীম আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল- যার ফলে বিশ্বব্যাপী চিরন্তন শিক্ষা বিপ্লব সাধিত হয়েছিল এবং তা সর্বাধিক সময়ের ও স্থানের দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। আর এর তাৎপর্যগত দূরত্ব তো পূর্বের দুটো হতে অধিক।'
প্রখ্যাত ফরাসী লেখক ড. ল্যাবান তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আরব সংস্কৃতি'তে (তামাদ্দুনে আরব) উল্লেখ করেন:
"আরবগণ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে যে সাধনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তা বাস্তবেই বিস্ময়কর ব্যাপার। এ বিশেষ ব্যাপারে অনেক জাতি-গোষ্ঠী তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করেছে কিন্তু খুব কমই তাদের উপর বিজয়ী হতে পেরেছে। যখনই তারা কোনো শহর গড়ে তুলেছে, তখনই তারা সর্বপ্রথম সেখানে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে। বড় বড় শহরে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) অধিক পরিমাণে হতো।
বেনজামিন দিলি তওয়িল (মৃঃ ১১৭৩ খ্রিঃ) বর্ণনা করেন, তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় বিশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখেছেন।
সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাগদাদ, কায়রো, টলেডো, কর্ডোভা ও অন্যান্য বড় বড় শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এগুলোতে গবেষণাগার, তথ্যভাণ্ডার, বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। মোটকথা, সেখানে গবেষণার সব ধরনের উপকরণ বিদ্যমান ছিল। শুধু স্পেনেই ছিল সত্তরটির মত সাধারণ গ্রন্থাগার।
আরব ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে কর্ডোভার দ্বিতীয় বাদশাহর কর্ডোভাস্থ গ্রন্থাগারে ছয় লাখ গ্রন্থ ছিল। এর মধ্যে শুধু পুস্তক তালিকা ছিল চল্লিশ খন্ড। এ ব্যাপারে কেউ অত্যন্ত সুন্দর বলেছেন: চারশ বছর পর যখন চার্লস আকেল ফ্রান্সের রাজকীয় গ্রন্থাগার নির্মাণ করেন, তখন তিনি ৯০০-এর বেশি গ্রন্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হননি। আর সেখানে পুরো এক আলমারী ধর্মগ্রন্থও ছিল না।'

টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য, ড্রেপার রচিত 'ধর্ম-ও বিজ্ঞানের যুদ্ধ'। অনুবাদ (উর্দু) লাহোরস্থ 'যমীনদার' পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা জাফর আলী খান বি, এ, (আলীগড়)
১. এর বিস্তৃতি ও তার শাখাসমূহ জানার জন্য ঐ সকল গ্রন্থের সাহায্য নেয়া যেতে পারে- যা বিভিন্ন ভাষায় ইসলামি পণ্ডিতগণ রচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, এখানে কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো: ক. আল ফিহরিস্ত, লেখক ইবনু নাদীম, খ. কাশফুযযুনুন, লেখক হাজী খলীফাহ গ. মু'জামুল মুসান্নিফীন, লেখক আল্লামা মাহমূদ হাসান টুংকী (এটি ৬০ খণ্ডে সমাপ্ত এবং ২০,০০০ পৃষ্ঠায় ৪০,০০০ লেখকের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে); ঘ. আছ-ছাকাফাতুল হিন্দিয়া, লেখক মাওঃ সৈয়দ আব্দুল হাই হাসানী (র.) (দামেশক হতে প্রকাশিত); আরবী সাহিত্যের ইতিহাস লেখক ব্রোকালমান ও 'তারিখুত তুরাছিল আরবী', লেখক ফুয়াদ সাযগীন ইত্যাদি বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ
১. আরব সভ্যতা, উর্দু তরজমা সৈয়দ আলী বিলগিরামী, পৃঃ ৩৯৮-৯৯

কিছু ধর্ম এমনো রয়েছে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৃত্যুর মাঝে নিজেদের জীবন এবং তার পরাজয়ের মাঝে নিজেদের বিজয় অনুভব করে। এর দৃষ্টান্ত একটি গল্পের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।
কথিত আছে যে, একবার মাছিদের একটি দল হযরত সুলায়মান (আ)-এর কাছে জড়ো হয়ে বাতাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে, বাতাস আমাদের উপর নির্দয়ভাবে জুলুম করে। কারণ, আমরা তার উপস্থিতিতে টিকতে পারি না। দমকা বাতাস প্রবাহিত হবার সাথে সাথে আমাদের পলায়ন করতে হয়। তাদের অভিযোগ শ্রবণ করে হযরত সুলায়মান (আ.) বললেন, বিবাদীর উপস্থিতি প্রয়োজন। সুতরাং বাতাসকে তলব করা হলো। কিন্তু বাতাস উপস্থিত হবার সাথে সাথে মাছির দল উধাও হয়ে গেল। এতে হযরত সুলায়মান (আ.) বললেন- বাদীর অনুপস্থিতিতে আমরা কিভাবে সিদ্ধান্ত নিব? এ অবস্থাই অনেক ধর্মের। ভারতের সনাতন ধর্ম এবং তার অসংখ্য নেতার কর্মপদ্ধতিও এ মর্মে একাধিক সাক্ষ্য সরবরাহ করে।
ইউরোপে গির্জা ও বিজ্ঞানের লড়াই ও বিবাদের কাহিনী তো অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে মার্কিন লেখক ড্রেপারের গ্রন্থটি Conflict between Religon and Science ঐতিহাসিক দলিলপত্র সমৃদ্ধ অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ।' মধ্যযুগে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত তদন্ত আদালত Courts of Inquistion ও গির্জার মাঝে বিবাদের সংখ্যা হাজারের বেশি হবে। সে সময় ঐসব আদালতের দেয়া লোমহর্ষক রায়ের কারণে আজো শরীর ভয়ে প্রকম্পিত হয়।
খ্রিস্টীয় বিশ্বাসসমূহ পরীক্ষার এ ধর্মীয় আদালতসমূহ (Courts of nquisition) রোমান ক্যাথলিক গির্জার পক্ষ হতে মধ্যযুগে ইতালী, ফ্রান্স, জার্মান ও স্পেনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ সব আদালত ধর্মত্যাগের কারণে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের নির্মম শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ছিল। ১৪৯০ সালে স্পেনে আরবদের পতনের পর ঐসব আদালতের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সরকার নিজের দখলে নিয়ে নেয়। ফলে, সতের শতাব্দীর দিকে তাদের পতন শুরু হয়। ১৮০৮ সালের দিকে নেপোলিয়ন এগুলো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৮২০ সালে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত তা কোনো না কোনো আকারে চলতে থাকে। তবে এটা বলা মুশকিল যে, মোট কত লোক ঐ সকল আদালতের রায়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছে। তবে এমন লোকের সংখ্যা লাখের মত হবে এটা নিশ্চিত।
পবিত্র কুরআন নাযিল হয়ে শিক্ষার এমন মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছে এবং জ্ঞানীদের এত অধিক মর্যাদা ও মূল্যায়ন করেছে- যার তুলনা পূর্ববর্তী কোন গ্রন্থে এবং প্রাচীন কোন ধর্মে পাওয়া মুশকিল। পবিত্র কুরআন জ্ঞান ও জ্ঞানীদের এমন ভূয়সী প্রশংসা করেছে যাদ্বারা তাদের মর্যাদা নবীদের নীচের স্তরে এবং সকল মানব সম্প্রদায়ের উপরের স্তরে পৌঁছে গেছে। এ মর্মে আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন:
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"আল্লাহ্ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং ফেরেশতা ও জ্ঞানীগণও আর তিনি ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।" [সূরা আলে ইমরান: ১৮]
তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন:
وَقُلْ رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا. "বলুন! হে আমার রব, আমার জ্ঞানকে বাড়িয়ে দিন।” [সূরা তাহা : ১১৪]
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ . "আপনি বলুন, যারা জ্ঞান রাখে আর যারা জ্ঞান রাখে না, তারা কি সমান হতে পারে?" [সূরা যুমার: ৯]
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ. "আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের মধ্য হতে যারা ঈমানদার ও জ্ঞানী, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।" [সূরা মুজাদালাহ: ১১]
إِنَّمَا يَخْشَيْ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الْعَلَمُوا . "আল্লাহকে তো শুধুমাত্র জ্ঞানী লোকেরাই ভয় করে।" [সূরা ফাতির: ২৮]
এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী (সা)-এর হাদীস ভাণ্ডার হতে এখানে কয়েকটি বর্ণনা করা যথেষ্ট হবে।
فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ . "একজন আলিমের মর্যাদা একজন আবেদের উপর এমন, যেমন তোমাদের সাধারণ মানুষের উপর আমার মর্যাদা।" [তিরমিযী]
إِنَّ الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَبًا وَإِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ - فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظّ وَافِرٍ . "আলিমগণ নবীদের ওয়ারিস, আর নবীগণ কাউকে দীনার বা দিরহামের ওয়ারিস বানান না। তাঁরা শুধুমাত্র এক্ষেত্রে ইলমের ওয়ারিস বানান। সুতরাং যে ইলমকে গ্রহণ করলো, সে বড় মূল্যবান সম্পদ গ্রহণ করলো।" [আবু দাউদ ও তিরমিযী]
জ্ঞানের এ পরিমাণ মর্যাদা ও উৎসাহ প্রদানের কারণে ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানের প্রতি এমন উদ্যম, এমন স্পৃহা ও অধ্যবসায় সৃষ্টি হয়েছিল এবং জ্ঞানের জন্য আত্মোৎসর্গ-আত্মবিসর্জনের এমন অপরিসীম আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল- যার ফলে বিশ্বব্যাপী চিরন্তন শিক্ষা বিপ্লব সাধিত হয়েছিল এবং তা সর্বাধিক সময়ের ও স্থানের দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। আর এর তাৎপর্যগত দূরত্ব তো পূর্বের দুটো হতে অধিক।'
প্রখ্যাত ফরাসী লেখক ড. ল্যাবান তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আরব সংস্কৃতি'তে (তামাদ্দুনে আরব) উল্লেখ করেন:
"আরবগণ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে যে সাধনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তা বাস্তবেই বিস্ময়কর ব্যাপার। এ বিশেষ ব্যাপারে অনেক জাতি-গোষ্ঠী তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করেছে কিন্তু খুব কমই তাদের উপর বিজয়ী হতে পেরেছে। যখনই তারা কোনো শহর গড়ে তুলেছে, তখনই তারা সর্বপ্রথম সেখানে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে। বড় বড় শহরে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) অধিক পরিমাণে হতো।
বেনজামিন দিলি তওয়িল (মৃঃ ১১৭৩ খ্রিঃ) বর্ণনা করেন, তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় বিশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখেছেন।
সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাগদাদ, কায়রো, টলেডো, কর্ডোভা ও অন্যান্য বড় বড় শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এগুলোতে গবেষণাগার, তথ্যভাণ্ডার, বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। মোটকথা, সেখানে গবেষণার সব ধরনের উপকরণ বিদ্যমান ছিল। শুধু স্পেনেই ছিল সত্তরটির মত সাধারণ গ্রন্থাগার।
আরব ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে কর্ডোভার দ্বিতীয় বাদশাহর কর্ডোভাস্থ গ্রন্থাগারে ছয় লাখ গ্রন্থ ছিল। এর মধ্যে শুধু পুস্তক তালিকা ছিল চল্লিশ খন্ড। এ ব্যাপারে কেউ অত্যন্ত সুন্দর বলেছেন: চারশ বছর পর যখন চার্লস আকেল ফ্রান্সের রাজকীয় গ্রন্থাগার নির্মাণ করেন, তখন তিনি ৯০০-এর বেশি গ্রন্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হননি। আর সেখানে পুরো এক আলমারী ধর্মগ্রন্থও ছিল না।'

টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য, ড্রেপার রচিত 'ধর্ম-ও বিজ্ঞানের যুদ্ধ'। অনুবাদ (উর্দু) লাহোরস্থ 'যমীনদার' পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা জাফর আলী খান বি, এ, (আলীগড়)
১. এর বিস্তৃতি ও তার শাখাসমূহ জানার জন্য ঐ সকল গ্রন্থের সাহায্য নেয়া যেতে পারে- যা বিভিন্ন ভাষায় ইসলামি পণ্ডিতগণ রচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, এখানে কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো: ক. আল ফিহরিস্ত, লেখক ইবনু নাদীম, খ. কাশফুযযুনুন, লেখক হাজী খলীফাহ গ. মু'জামুল মুসান্নিফীন, লেখক আল্লামা মাহমূদ হাসান টুংকী (এটি ৬০ খণ্ডে সমাপ্ত এবং ২০,০০০ পৃষ্ঠায় ৪০,০০০ লেখকের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে); ঘ. আছ-ছাকাফাতুল হিন্দিয়া, লেখক মাওঃ সৈয়দ আব্দুল হাই হাসানী (র.) (দামেশক হতে প্রকাশিত); আরবী সাহিত্যের ইতিহাস লেখক ব্রোকালমান ও 'তারিখুত তুরাছিল আরবী', লেখক ফুয়াদ সাযগীন ইত্যাদি বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ
১. আরব সভ্যতা, উর্দু তরজমা সৈয়দ আলী বিলগিরামী, পৃঃ ৩৯৮-৯৯

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 জ্ঞানের বিভিন্ন পুঁথিগুলোকে এক সুতোয় বাঁধা

📄 জ্ঞানের বিভিন্ন পুঁথিগুলোকে এক সুতোয় বাঁধা


জ্ঞানের সঠিক উদ্দেশ্যের দিকে পথ প্রদর্শন করা এবং তাকে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও কল্যাণকর, আরো বিশ্বাসের মাধ্যম বানাবার ক্ষেত্রে প্রিয়নবী (সা)-এর নবুয়ত ও ইসলামি দাওয়াতের ভূমিকা মূল্য ও মূল্যায়নে তা থেকে অনেক বেশি- যা পালন করেছে শিক্ষা আন্দোলনকে কার্যকর করতে ও বিস্তারের ক্ষেত্রে।
জ্ঞানের পুথিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল; এবং অনেক সময় পরস্পর সাংঘর্ষিক ছিল। রসায়ণশাস্ত্র ও বিজ্ঞানশাস্ত্র রীতিমত ধর্মের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। এমনকি গণিতশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো নির্দোষ জ্ঞানের পণ্ডিতগণও কখনো কখনো নেতিবাচক ও ধর্মহীন নাস্তিক্যবাদী ফলাফল উদ্ভাবন করত। সুতরাং গ্রীক দার্শনিকগণ (যারা কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত দর্শন ও গণিতশাস্ত্রে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল) হয়তো তারা মুশরিক ছিল নতুবা তারা ধর্মহীন নাস্তিক ছিল। আর গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্বীনি চেতনার জন্য বিপদের কারণ এবং নাস্তিকদের জন্য সনদ ও দলিল-প্রমাণ এবং আদর্শ হয়ে বিদ্যমান ছিল। এ অবস্থায় ইসলামের বড় অবদান ছিল এই যে, তা এমন ঐক্য সৃষ্টি করেছে- যা জ্ঞানের সকল পথিককে এক সুঁতোয় গেঁথেছে। আর এটা তার জন্য করা এজন্য সহজ হয়েছিল যে, তার শিক্ষা সফর সঠিক সূচনাবিন্দু (Staring point) হতে সূত্রপাত হয়েছিল।
ইসলাম শিক্ষাকে আল্লাহর প্রতি ঈমান, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা ও আল্লাহর উপর ভরসা করার মাধ্যমে এবং اقرأ باسم ربك এ নির্দেশের উপর আমল করার মাধ্যমে শুরু করে। আর এটা বাস্তব সত্য কথা যে, অনেক সময় সঠিক সূচনা নির্ভুল পরিণাম ও শুভ ফলের নিশ্চয়তা প্রদান করে। ইসলাম কুরআন ও ঈমানের দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে এমন ঐক্য আবিষ্কার করেছে, যা সকল ঐক্যকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। আর এ ঐক্য হলো আল্লাহ্ তা'আলার মা'রিফাত ও পরিচয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রশংসা করেছেন:
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقٍ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحْنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"তারা আকাশমণ্ডলী ও যমীনের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। অতঃপর বলে- হে আমাদের রব! আপনি এটি অহেতুক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।" [আলে ইমরান: ১৯১]
অতীতকালে মানুষের কাছে জাগতিক ঐক্যসমূহের মাঝে বাহ্যত পরস্পর বিরোধী মনে হত। অর্থাৎ জগতের বাহ্যিক কাঠামো, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাঝে সংঘাতময় দৃষ্টিগোচর হত। ফলে, তাকে বিস্ময় ও অস্থিরতার মাঝে ফেলে দিত এবং এক পর্যায়ে তাকে কুফরী ও ধর্মহীনতার পথে নিয়ে যেত। আবার কখনো তা বিশ্বস্রষ্টা ও বিশ্বনিয়ন্ত্রকের প্রতি সমালোচনা ও আপত্তির পর্যায়ে পৌঁছে দিত। এসব লক্ষ্য করে কুরআন ও ঈমানভিত্তিক ইসলামি শিক্ষা পৃথিবীকে এমন ঐক্য প্রদান করল- যা জাগতিক ঐক্যসমূহকে একত্রিত করে দিল। আর এটি ছিল আল্লাহ্র প্রবল ইচ্ছা ও তাঁর পূর্ণ হিকমতের বহিঃপ্রকাশ।
একজন জার্মান মনীষী হেরাল্ড হফডিং (Harald Hoffding) এ ঐক্যের আবিষ্কার এবং মানব জীবন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নীতি-নৈতিকতার ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় তার প্রভাব ও কার্যকর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন:
"প্রত্যেক ধর্মের বিশ্বাস একত্ববাদের উপর- যার দৃষ্টিভঙ্গি হলো- বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিলাভের কারণ একই (এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনিবার্য কারণবশত এ ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যাবলীর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে) এ দৃষ্টিভঙ্গি ঈমান, আকীদা-বিশ্বাস ও মানব স্বভাবের উপর অত্যন্ত অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে এবং তাকে মান্যকারীদের জন্য এ আকীদা-বিশ্বাস রাখা অত্যন্ত সহজ (কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে মতবিরোধ ও কিছু বিষয়কে এড়িয়ে গেলে) হয় যে, বিশ্বের সবকিছুই একটি বিধিগত নিয়মের আওতায় ঐক্যবদ্ধ। কেননা, কারণের ঐক্য বিধিগত ঐক্যেরও দাবি রাখে।
মধ্যযুগের ধর্মদর্শন আধিক্যের মাঝে ঐক্যের ধারণার বিষয়টি মানুষের মস্তিষ্কে বসিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল, যে কারণে বর্বর লোকেরা প্রকৃতির দৃশ্যমান আধিক্যের কারণে তা থেকে গাফিল ও উদাসীন হয়ে পড়েছিল। আর এ সকল আধিক্য প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে এজন্য ভুলত্রুটি হত যে, তার হাতে সেগুলোর মাঝে সত্তাগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মত কোন সূত্র ছিল না।"১
এভাবে জ্ঞান উদ্দেশ্যপূর্ণ, কল্যাণকর, আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। আর তা নিজস্ব প্রচেষ্টায় মানবতার সেবায়, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করে। ফলে, এ চিন্তাধারা মানুষের চিন্তা- চেতনা ও কর্মপন্থার জগতে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ বলে বিবেচিত হয়েছিল- যা মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সাধন করে এবং মানুষের চিন্তার গতি ঘুরিয়ে দেয়। পশ্চিমা মনীষীগণও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানবীয় চিন্তার উপর পবিত্র কুরআনের এ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা তন্মধ্য থেকে এখানে দু'টিমাত্র সাক্ষ্য উল্লেখ করাকে যথেষ্ট মনে করব।
বিখ্যাত ইসলাম বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদ মার্গোলিয়াথ (G. Margolioth), রাডওয়েল (J.M. Rodweil) রচিত কুরআনুল কারীমের অনুবাদ গ্রন্থের ভূমিকাতে উল্লেখ করেন:
"দুনিয়াতে ধর্মগ্রন্থসমূহের মধ্যে কুরআন একটি বিশেষ মর্যাদা রাখে, অথচ এ ধরনের ইতিহাস নির্ভর রচনার মধ্যে তার বয়স সবচেয়ে কম। কিন্তু মানুষের উপর বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষেত্রে তা অন্য কারো থেকে পেছনে নয়। এ কুরআন একটি নতুন মানবীয় চিন্তাধারা সৃষ্টি করতে এবং একটি নতুন নীতি- নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপনে সক্ষম হয়েছে।"২
অন্য আরেকজন বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ হার্টউইগ হার্শফেন্ড (Hartwig Hirschfeld লিখেছেন:
"আমাদের এতে আশ্চর্য লাগে যে, কুরআন সকল জ্ঞানের উৎস। আসমান- যমীন, মানবজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারিগরী, যে সকল বিষয় তাতে আলোচনা হয়েছে, তা সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে এবং তাফসীর গ্রন্থসমূহে তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এর উপর ব্যাপক আলোচনা- পর্যালোচনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ফলে, مسلمانوں মাঝে পরোক্ষভাবে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির পথ সুগম হয়েছে। সে কেবল যে আরবদেরকেই প্রভাবিত করেছে এমন নয়, বরং তা ইয়াহুদী দার্শনিকগণকে ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক বিষয়ে আরবদের অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। পরিশেষে, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব আরব ধর্মতত্ত্বদ্বারা যে পরিমাণ উপকৃত হয়েছে, তার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।
"আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে ইসলামের প্রচেষ্টা শুধু ধর্মীয় বিষয়াদির মাঝে সীমাবদ্ধ। গ্রীক সৌরবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক রচনাবলি অধ্যয়ন করার কারণে তাদের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রতি মনোযোগী করে তোলে। মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে দুনিয়া যে অহী লাভ করেছে, তাতে সৌরজগতের ঘূর্ণিপাকের আলোচনা করা হয়েছে এবং তা তার পূজা দেবার জন্য নয়, বরং তা আল্লাহ্ পাকের নিদর্শন ও মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে করা হয়েছে। সমস্ত মুসলিম জাতি-গোষ্ঠী সৌরজগত সম্পর্কে সাফল্যের সাথে পর্যালোচনা করেছে শত শত বছর পর্যন্ত; তারাই এ বিদ্যার ধারকবাহক ছিল এবং এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ নক্ষত্র ও গ্রহসমূহের নাম ও তাদের গতিবিধি বিষয়ক শব্দগুলো আরবদের ব্যবহৃত। মধ্যযুগে ইউরোপের সৌরবিদ্যার পণ্ডিতগণ আরবদের ছাত্র ছিলেন।
এভাবে কুরআন চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যায়নের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে এবং সাধারণভাবে প্রকৃতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করতে এবং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।”১

টিকাঃ
১. History of Modern Philosophy, p. 5
২. Rev. G. Margolioths In Introduction to the Koran by J. M. Rodweel. London- (1918)
১. Hartwitg Hirschfeld New Reseharches into Composition and Exegesis of the Quran, London. (1908) p. 9

জ্ঞানের সঠিক উদ্দেশ্যের দিকে পথ প্রদর্শন করা এবং তাকে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও কল্যাণকর, আরো বিশ্বাসের মাধ্যম বানাবার ক্ষেত্রে প্রিয়নবী (সা)-এর নবুয়ত ও ইসলামি দাওয়াতের ভূমিকা মূল্য ও মূল্যায়নে তা থেকে অনেক বেশি- যা পালন করেছে শিক্ষা আন্দোলনকে কার্যকর করতে ও বিস্তারের ক্ষেত্রে।
জ্ঞানের পুথিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল; এবং অনেক সময় পরস্পর সাংঘর্ষিক ছিল। রসায়ণশাস্ত্র ও বিজ্ঞানশাস্ত্র রীতিমত ধর্মের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। এমনকি গণিতশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো নির্দোষ জ্ঞানের পণ্ডিতগণও কখনো কখনো নেতিবাচক ও ধর্মহীন নাস্তিক্যবাদী ফলাফল উদ্ভাবন করত। সুতরাং গ্রীক দার্শনিকগণ (যারা কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত দর্শন ও গণিতশাস্ত্রে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল) হয়তো তারা মুশরিক ছিল নতুবা তারা ধর্মহীন নাস্তিক ছিল। আর গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্বীনি চেতনার জন্য বিপদের কারণ এবং নাস্তিকদের জন্য সনদ ও দলিল-প্রমাণ এবং আদর্শ হয়ে বিদ্যমান ছিল। এ অবস্থায় ইসলামের বড় অবদান ছিল এই যে, তা এমন ঐক্য সৃষ্টি করেছে- যা জ্ঞানের সকল পথিককে এক সুঁতোয় গেঁথেছে। আর এটা তার জন্য করা এজন্য সহজ হয়েছিল যে, তার শিক্ষা সফর সঠিক সূচনাবিন্দু (Staring point) হতে সূত্রপাত হয়েছিল।
ইসলাম শিক্ষাকে আল্লাহর প্রতি ঈমান, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা ও আল্লাহর উপর ভরসা করার মাধ্যমে এবং اقرأ باسم ربك এ নির্দেশের উপর আমল করার মাধ্যমে শুরু করে। আর এটা বাস্তব সত্য কথা যে, অনেক সময় সঠিক সূচনা নির্ভুল পরিণাম ও শুভ ফলের নিশ্চয়তা প্রদান করে। ইসলাম কুরআন ও ঈমানের দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে এমন ঐক্য আবিষ্কার করেছে, যা সকল ঐক্যকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। আর এ ঐক্য হলো আল্লাহ্ তা'আলার মা'রিফাত ও পরিচয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রশংসা করেছেন:
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقٍ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحْنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"তারা আকাশমণ্ডলী ও যমীনের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। অতঃপর বলে- হে আমাদের রব! আপনি এটি অহেতুক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।" [আলে ইমরান: ১৯১]
অতীতকালে মানুষের কাছে জাগতিক ঐক্যসমূহের মাঝে বাহ্যত পরস্পর বিরোধী মনে হত। অর্থাৎ জগতের বাহ্যিক কাঠামো, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাঝে সংঘাতময় দৃষ্টিগোচর হত। ফলে, তাকে বিস্ময় ও অস্থিরতার মাঝে ফেলে দিত এবং এক পর্যায়ে তাকে কুফরী ও ধর্মহীনতার পথে নিয়ে যেত। আবার কখনো তা বিশ্বস্রষ্টা ও বিশ্বনিয়ন্ত্রকের প্রতি সমালোচনা ও আপত্তির পর্যায়ে পৌঁছে দিত। এসব লক্ষ্য করে কুরআন ও ঈমানভিত্তিক ইসলামি শিক্ষা পৃথিবীকে এমন ঐক্য প্রদান করল- যা জাগতিক ঐক্যসমূহকে একত্রিত করে দিল। আর এটি ছিল আল্লাহ্র প্রবল ইচ্ছা ও তাঁর পূর্ণ হিকমতের বহিঃপ্রকাশ।
একজন জার্মান মনীষী হেরাল্ড হফডিং (Harald Hoffding) এ ঐক্যের আবিষ্কার এবং মানব জীবন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নীতি-নৈতিকতার ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় তার প্রভাব ও কার্যকর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন:
"প্রত্যেক ধর্মের বিশ্বাস একত্ববাদের উপর- যার দৃষ্টিভঙ্গি হলো- বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিলাভের কারণ একই (এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনিবার্য কারণবশত এ ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যাবলীর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে) এ দৃষ্টিভঙ্গি ঈমান, আকীদা-বিশ্বাস ও মানব স্বভাবের উপর অত্যন্ত অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে এবং তাকে মান্যকারীদের জন্য এ আকীদা-বিশ্বাস রাখা অত্যন্ত সহজ (কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে মতবিরোধ ও কিছু বিষয়কে এড়িয়ে গেলে) হয় যে, বিশ্বের সবকিছুই একটি বিধিগত নিয়মের আওতায় ঐক্যবদ্ধ। কেননা, কারণের ঐক্য বিধিগত ঐক্যেরও দাবি রাখে।
মধ্যযুগের ধর্মদর্শন আধিক্যের মাঝে ঐক্যের ধারণার বিষয়টি মানুষের মস্তিষ্কে বসিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল, যে কারণে বর্বর লোকেরা প্রকৃতির দৃশ্যমান আধিক্যের কারণে তা থেকে গাফিল ও উদাসীন হয়ে পড়েছিল। আর এ সকল আধিক্য প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে এজন্য ভুলত্রুটি হত যে, তার হাতে সেগুলোর মাঝে সত্তাগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মত কোন সূত্র ছিল না।"১
এভাবে জ্ঞান উদ্দেশ্যপূর্ণ, কল্যাণকর, আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। আর তা নিজস্ব প্রচেষ্টায় মানবতার সেবায়, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করে। ফলে, এ চিন্তাধারা মানুষের চিন্তা- চেতনা ও কর্মপন্থার জগতে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ বলে বিবেচিত হয়েছিল- যা মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সাধন করে এবং মানুষের চিন্তার গতি ঘুরিয়ে দেয়। পশ্চিমা মনীষীগণও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানবীয় চিন্তার উপর পবিত্র কুরআনের এ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা তন্মধ্য থেকে এখানে দু'টিমাত্র সাক্ষ্য উল্লেখ করাকে যথেষ্ট মনে করব।
বিখ্যাত ইসলাম বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদ মার্গোলিয়াথ (G. Margolioth), রাডওয়েল (J.M. Rodweil) রচিত কুরআনুল কারীমের অনুবাদ গ্রন্থের ভূমিকাতে উল্লেখ করেন:
"দুনিয়াতে ধর্মগ্রন্থসমূহের মধ্যে কুরআন একটি বিশেষ মর্যাদা রাখে, অথচ এ ধরনের ইতিহাস নির্ভর রচনার মধ্যে তার বয়স সবচেয়ে কম। কিন্তু মানুষের উপর বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষেত্রে তা অন্য কারো থেকে পেছনে নয়। এ কুরআন একটি নতুন মানবীয় চিন্তাধারা সৃষ্টি করতে এবং একটি নতুন নীতি- নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপনে সক্ষম হয়েছে।"২
অন্য আরেকজন বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ হার্টউইগ হার্শফেন্ড (Hartwig Hirschfeld লিখেছেন:
"আমাদের এতে আশ্চর্য লাগে যে, কুরআন সকল জ্ঞানের উৎস। আসমান- যমীন, মানবজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারিগরী, যে সকল বিষয় তাতে আলোচনা হয়েছে, তা সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে এবং তাফসীর গ্রন্থসমূহে তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এর উপর ব্যাপক আলোচনা- পর্যালোচনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ফলে, مسلمانوں মাঝে পরোক্ষভাবে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির পথ সুগম হয়েছে। সে কেবল যে আরবদেরকেই প্রভাবিত করেছে এমন নয়, বরং তা ইয়াহুদী দার্শনিকগণকে ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক বিষয়ে আরবদের অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। পরিশেষে, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব আরব ধর্মতত্ত্বদ্বারা যে পরিমাণ উপকৃত হয়েছে, তার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।
"আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে ইসলামের প্রচেষ্টা শুধু ধর্মীয় বিষয়াদির মাঝে সীমাবদ্ধ। গ্রীক সৌরবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক রচনাবলি অধ্যয়ন করার কারণে তাদের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রতি মনোযোগী করে তোলে। মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে দুনিয়া যে অহী লাভ করেছে, তাতে সৌরজগতের ঘূর্ণিপাকের আলোচনা করা হয়েছে এবং তা তার পূজা দেবার জন্য নয়, বরং তা আল্লাহ্ পাকের নিদর্শন ও মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে করা হয়েছে। সমস্ত মুসলিম জাতি-গোষ্ঠী সৌরজগত সম্পর্কে সাফল্যের সাথে পর্যালোচনা করেছে শত শত বছর পর্যন্ত; তারাই এ বিদ্যার ধারকবাহক ছিল এবং এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ নক্ষত্র ও গ্রহসমূহের নাম ও তাদের গতিবিধি বিষয়ক শব্দগুলো আরবদের ব্যবহৃত। মধ্যযুগে ইউরোপের সৌরবিদ্যার পণ্ডিতগণ আরবদের ছাত্র ছিলেন।
এভাবে কুরআন চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যায়নের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে এবং সাধারণভাবে প্রকৃতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করতে এবং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।”১

টিকাঃ
১. History of Modern Philosophy, p. 5
২. Rev. G. Margolioths In Introduction to the Koran by J. M. Rodweel. London- (1918)
১. Hartwitg Hirschfeld New Reseharches into Composition and Exegesis of the Quran, London. (1908) p. 9

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00