📄 পবিত্র স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন
প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর চিরন্তন অনুগ্রহরাজী ও তাঁর নবুয়ত ও দাওয়াতের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝে একটি পবিত্র ও চিরন্তন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। একটির ভবিষ্যত ও পরিণতি অন্যটির ভবিষ্যত ও পরিণতির সাথে জুড়ে দিয়েছেন এবং জ্ঞান- বিজ্ঞানের উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং তা অর্জনের জন্য অত্যন্ত উৎসাহ প্রদান করেছেন- যার দরুন এ ব্যাপারে নতুন কিছু সংযোজন করা সম্ভব নয়। আর এ কারণে তার স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটেছে এভাবে যে, ইসলামের ইতিহাসে এমন সব গবেষণা ও গ্রন্থ রচনা হয়েছে- যা সাধারণত ধর্ম ও আসমানী গ্রন্থের দাবিদার সভ্যতা-সংস্কৃতি ও অপরাপর সময়কালেও তা বিরল।
এর একটি বড় প্রমান এই যে, প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উপর নাযিলকৃত প্রথম অহীতে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা বিশ্বমানবতাকে জ্ঞান দান করে যে দয়া করেছেন, তার আলোচনা রয়েছে। তিনি এ ক্ষেত্রে কলমের বড় অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করেন। কারণ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক সফরের সূত্রপাত এর সাথে সম্পৃক্ত। এ কলমের মাধ্যমে চালু হয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা ও গবেষণার বিশ্বব্যাপী আন্দোলন, যার মাধ্যমে আজ পর্যন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান একজন থেকে অপরজনের কাছে, এক জাতি থেকে অপর জাতির কাছে, এক যুগ থেকে অন্য যুগে, এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মে পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান- বিজ্ঞানের প্রচার-প্রসার ঘটার ক্ষেত্রে এবং তা মানবীয় প্রয়োজনে ব্যবহৃত হওয়ার ক্ষেত্রে এরই ব্যাপক ও গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে; আজকের স্কুল-কলেজ- মাদরাসা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রসমূহ কলমকে কেন্দ্র করেই কর্মমুখর হয়ে রয়েছে।
প্রথম অহীতে কলমের আলোচনা করার মত কোন মানবীয় শর্ত ও যৌক্তিক বিচার-বিবেচনা ছিল না। আবার প্রথম ওহীতে কলমের আলোচনা আনার মত এমন কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তৈরি হয়নি। কারণ অহী তো নাযিল হয়েছিল একজন উম্মী নবীর প্রতি এবং এক মূর্খ জাতির মাঝে, একটি অনুন্নত এলাকাতে। এ অঞ্চলে কলম নামের বস্তুটি ছিল সর্বাপেক্ষা দুর্লভ বস্তু। আর এ কারণে আরবজাতিকে উম্মী জাতি বলা হত। পবিত্র কুরআনে তাদের এ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ আছে। ইরশাদ হয়েছে:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ.
"তিনিই ঐ মহান সত্তা যিনি উম্মী লোকদের মাঝে তাদের মধ্য হতে একজনকে রাসূল করে প্রেরণ করেছেন। (এজন্য যে,) তিনি তাদেরকে আল্লাহ্র আয়াত পড়ে শোনাবেন, তাদের আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটাবেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন। বস্তুত তারা ছিল সুস্পষ্ট গোমরাহীতে।" [সূরা জুমু'আ: ২]
আরবদের উম্মী হবার ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ইয়াহূদীদের কথাকে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছে। কারণ, তারা মদীনাতে আরবদের প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করত। ফলে, তারা আরবদের সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞাত ছিল। ইরশাদ হচ্ছে:
لَيْسَ عَلَيْنَا فِي الْأُمِّيِّينَ سَبِيلٌ.
"আমাদের উপর উম্মীদের (মূর্খদের) ব্যাপারে কোন দায়-দায়িত্ব নেই।" [আলে ইমরান: ৭৫]
এ উম্মতের মাঝে যে রাসুল (যাঁর কাছে অহী নাযিল হচ্ছিল) তিনিও পূর্ণ উম্মী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَبُ وَلَا الْإِيْمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْتُهُ نُورًا نَهْدِى بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِى إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
"এভাবেই আমরা আপনার কাছে অহী অর্থাৎ আমার নির্দেশসমূহ প্রেরণ করেছি। আপনার তো খবরই ছিল না কিতাব কি জিনিস আর না আপনি ঈমান সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তবে আমি এ কুরআনকে নূর হিসেবে প্রেরণ করেছি যাতে এর মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করি। আর নিঃসন্দেহে আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।" [সূরা শূরা: ৫২]
অন্যত্র ইরশাদ করেন: وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخْتُهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَّا رْتَابَ الْمُبْطِلُونَ.
"আর আপনি এ কুরআনের পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করেন নি। আর আপনার হাত তা (অর্থাৎ কোন কিতাব) লেখেনি। অন্যথায় তো বাতিলপন্থীরা সন্দেহ পোষণ করত।" [সূরা আনকাবূত: ৪৮]
প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর চিরন্তন অনুগ্রহরাজী ও তাঁর নবুয়ত ও দাওয়াতের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝে একটি পবিত্র ও চিরন্তন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। একটির ভবিষ্যত ও পরিণতি অন্যটির ভবিষ্যত ও পরিণতির সাথে জুড়ে দিয়েছেন এবং জ্ঞান- বিজ্ঞানের উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং তা অর্জনের জন্য অত্যন্ত উৎসাহ প্রদান করেছেন- যার দরুন এ ব্যাপারে নতুন কিছু সংযোজন করা সম্ভব নয়। আর এ কারণে তার স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটেছে এভাবে যে, ইসলামের ইতিহাসে এমন সব গবেষণা ও গ্রন্থ রচনা হয়েছে- যা সাধারণত ধর্ম ও আসমানী গ্রন্থের দাবিদার সভ্যতা-সংস্কৃতি ও অপরাপর সময়কালেও তা বিরল।
এর একটি বড় প্রমান এই যে, প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উপর নাযিলকৃত প্রথম অহীতে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা বিশ্বমানবতাকে জ্ঞান দান করে যে দয়া করেছেন, তার আলোচনা রয়েছে। তিনি এ ক্ষেত্রে কলমের বড় অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করেন। কারণ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক সফরের সূত্রপাত এর সাথে সম্পৃক্ত। এ কলমের মাধ্যমে চালু হয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা ও গবেষণার বিশ্বব্যাপী আন্দোলন, যার মাধ্যমে আজ পর্যন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান একজন থেকে অপরজনের কাছে, এক জাতি থেকে অপর জাতির কাছে, এক যুগ থেকে অন্য যুগে, এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মে পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান- বিজ্ঞানের প্রচার-প্রসার ঘটার ক্ষেত্রে এবং তা মানবীয় প্রয়োজনে ব্যবহৃত হওয়ার ক্ষেত্রে এরই ব্যাপক ও গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে; আজকের স্কুল-কলেজ- মাদরাসা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রসমূহ কলমকে কেন্দ্র করেই কর্মমুখর হয়ে রয়েছে।
প্রথম অহীতে কলমের আলোচনা করার মত কোন মানবীয় শর্ত ও যৌক্তিক বিচার-বিবেচনা ছিল না। আবার প্রথম ওহীতে কলমের আলোচনা আনার মত এমন কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তৈরি হয়নি। কারণ অহী তো নাযিল হয়েছিল একজন উম্মী নবীর প্রতি এবং এক মূর্খ জাতির মাঝে, একটি অনুন্নত এলাকাতে। এ অঞ্চলে কলম নামের বস্তুটি ছিল সর্বাপেক্ষা দুর্লভ বস্তু। আর এ কারণে আরবজাতিকে উম্মী জাতি বলা হত। পবিত্র কুরআনে তাদের এ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ আছে। ইরশাদ হয়েছে:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ.
"তিনিই ঐ মহান সত্তা যিনি উম্মী লোকদের মাঝে তাদের মধ্য হতে একজনকে রাসূল করে প্রেরণ করেছেন। (এজন্য যে,) তিনি তাদেরকে আল্লাহ্র আয়াত পড়ে শোনাবেন, তাদের আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটাবেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন। বস্তুত তারা ছিল সুস্পষ্ট গোমরাহীতে।" [সূরা জুমু'আ: ২]
আরবদের উম্মী হবার ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ইয়াহূদীদের কথাকে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছে। কারণ, তারা মদীনাতে আরবদের প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করত। ফলে, তারা আরবদের সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞাত ছিল। ইরশাদ হচ্ছে:
لَيْسَ عَلَيْنَا فِي الْأُمِّيِّينَ سَبِيلٌ.
"আমাদের উপর উম্মীদের (মূর্খদের) ব্যাপারে কোন দায়-দায়িত্ব নেই।" [আলে ইমরান: ৭৫]
এ উম্মতের মাঝে যে রাসুল (যাঁর কাছে অহী নাযিল হচ্ছিল) তিনিও পূর্ণ উম্মী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَبُ وَلَا الْإِيْمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْتُهُ نُورًا نَهْدِى بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِى إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
"এভাবেই আমরা আপনার কাছে অহী অর্থাৎ আমার নির্দেশসমূহ প্রেরণ করেছি। আপনার তো খবরই ছিল না কিতাব কি জিনিস আর না আপনি ঈমান সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তবে আমি এ কুরআনকে নূর হিসেবে প্রেরণ করেছি যাতে এর মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করি। আর নিঃসন্দেহে আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।" [সূরা শূরা: ৫২]
অন্যত্র ইরশাদ করেন: وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخْتُهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَّا رْتَابَ الْمُبْطِلُونَ.
"আর আপনি এ কুরআনের পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করেন নি। আর আপনার হাত তা (অর্থাৎ কোন কিতাব) লেখেনি। অন্যথায় তো বাতিলপন্থীরা সন্দেহ পোষণ করত।" [সূরা আনকাবূত: ৪৮]
📄 এক অনাকাঙ্ক্ষিত সূচনা
হেরা গুহায় সর্বপ্রথম উম্মী নবী (সা)-এর প্রতি এ অহীটিই নাযিল হয়। (অথচ এটি ছিল ছয়শত বছরের' এ দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর পৃথিবীর সাথে আসমানের এবং আসমানের সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক অহীর মাধ্যমে গড়ে ওঠা অথচ তাতে আল্লাহ্ ইবাদত-বন্দেগীর হুকুম, আল্লাহ্র পরিচয় ও আনুগত্য সংক্রান্ত আদেশ কিংবা তাতে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ, জাহিলিয়্যত ও তার রীতি-নীতি পরিত্যাগ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি। যদি এমন আদেশ-নিষেধ থাকত, তাহলে তা যথার্থই হত। কারণ, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এবং যথাস্থানে তার সুস্পষ্ট তাবলীগ করা হত। কিন্তু তা না হয়ে অহীর সূত্রপাত হয়েছে اقرأ শব্দদ্বারা। ইরশাদ হচ্ছে:
اقْرَأُ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ - خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ - اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ .
"পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন (সকলকে)। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাঁধা রক্ত হতে। আপনি পড়ুন, আর আপনার রব বড়ই দয়ালু- যিনি শিক্ষা দেন কলমের মাধ্যমে। তিনি মানুষকে শিক্ষাদান করেছেন যা সে জানত না।" [সূরা 'আলাক: ১-৫]
এভাবেই এ ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রপাত হয়। এ ঘটনা ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদগণের সামনে চিন্তা-ভাবনার এক নতুন ও প্রশস্ত জগৎ উন্মোচন করে দেয়। আর এটা ছিল এ বাস্তবতার প্রতি সূক্ষ্ম ও স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, একজন উম্মী নবী (সা)-এর মাধ্যমে মানব সভ্যতা ও ধর্মীয় ইতিহাসের একটি নতুন যুগের সূত্রপাত হতে যাচ্ছে, তা ব্যাপক ও গভীর অর্থে লেখাপড়ার বিস্তৃতি ও উন্নত যুগ হবে এবং সে যুগে লেখাপড়ার রাজত্ব চলবে। তারা তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দ্বীন-ধর্মের সম্মিলিতভাবে একটি নতুন মানব সমাজ ও একটি নতুন বিশ্ব গঠন করবে এবং তার উৎকর্ষ সাধন করবে।
আর এটা তখনই সম্ভব হবে যদি লেখাপড়ার সূচনা হয় নবুয়তের ছত্র-ছায়ায় এবং ঐ মালিকের নামে (যিনি এ বিশ্বজগৎ ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন) যাতে এ জ্ঞান-বিজ্ঞান আল্লাহ্র প্রতি ইয়াকীন ও তাঁর সঠিক মা'রেফাতের রঙে রঙিন হয় এবং তার আলোকরশ্মি ও দিকনির্দেশনায় আপন সফর চালু রাখতে পারে। আর এজন্য ইরশাদ করেন: اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ. "পড়ুন! আপনার রবের নামে যিনি (বিশ্বজগৎ) সৃজন করেছেন।"
সেই সাথে মানুষ যেন নিজের স্বরূপ ও সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে অবহিত থাকে যাতে সে কখনো নিজের সত্তাকে ভুলে না যায় এবং সীমা অতিক্রম না করে ও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-কারিগরি ও সৃষ্টিজগৎকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের সফলতায় যেন ধোঁকা না খায়। এজন্য ইরশাদ করেন: خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ "যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাঁধা রক্ত হতে।”
এপর তিনি কলমের মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন এবং তার সম্মান ও মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান, লেখাপড়া, শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে তার অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন- যা মক্কা তথা আরব উপদ্বীপে জানা সম্ভব ছিল না। কারণ, সেখানে তা অল্প কিছু মানুষের কাছেই ছিল মাত্র। আর এ কারণে আরব উপদ্বীপে লেখাপড়া জানা লোককে কাতেব বা লেখক বলা হতো। তাই এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ. "যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দান করেছেন।"
অতঃপর মানুষের ঐ যোগ্যতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মানুষ দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-গবেষণা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নিত্য নতুন জ্ঞান অর্জন করতে এবং তারা তাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে সক্ষম। কিন্ত এ সব কিছুর উৎস ও কেন্দ্রই হলো আল্লাহ্ প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থা। আর মানুষকে বৈশিষ্ট্যসহ সৃষ্টি করা হয়েছে এজন্যে যে, সে অজানাকে জানতে এবং অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ব প্রদান করতে সক্ষম। আর এজন্যই ইরশাদ হয়েছে: عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ . "যিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন এমন সব বিষয়, যা সে জানতো না।"
টিকাঃ
১. এ দীর্ঘ সময় ঈসা (আ) ও আমাদের নবী (সা)-এর মধ্যবর্তীকালে অতিক্রান্ত হয়েছিল
হেরা গুহায় সর্বপ্রথম উম্মী নবী (সা)-এর প্রতি এ অহীটিই নাযিল হয়। (অথচ এটি ছিল ছয়শত বছরের' এ দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর পৃথিবীর সাথে আসমানের এবং আসমানের সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক অহীর মাধ্যমে গড়ে ওঠা অথচ তাতে আল্লাহ্ ইবাদত-বন্দেগীর হুকুম, আল্লাহ্র পরিচয় ও আনুগত্য সংক্রান্ত আদেশ কিংবা তাতে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ, জাহিলিয়্যত ও তার রীতি-নীতি পরিত্যাগ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি। যদি এমন আদেশ-নিষেধ থাকত, তাহলে তা যথার্থই হত। কারণ, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এবং যথাস্থানে তার সুস্পষ্ট তাবলীগ করা হত। কিন্তু তা না হয়ে অহীর সূত্রপাত হয়েছে اقرأ শব্দদ্বারা। ইরশাদ হচ্ছে:
اقْرَأُ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ - خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ - اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ .
"পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন (সকলকে)। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাঁধা রক্ত হতে। আপনি পড়ুন, আর আপনার রব বড়ই দয়ালু- যিনি শিক্ষা দেন কলমের মাধ্যমে। তিনি মানুষকে শিক্ষাদান করেছেন যা সে জানত না।" [সূরা 'আলাক: ১-৫]
এভাবেই এ ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রপাত হয়। এ ঘটনা ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদগণের সামনে চিন্তা-ভাবনার এক নতুন ও প্রশস্ত জগৎ উন্মোচন করে দেয়। আর এটা ছিল এ বাস্তবতার প্রতি সূক্ষ্ম ও স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, একজন উম্মী নবী (সা)-এর মাধ্যমে মানব সভ্যতা ও ধর্মীয় ইতিহাসের একটি নতুন যুগের সূত্রপাত হতে যাচ্ছে, তা ব্যাপক ও গভীর অর্থে লেখাপড়ার বিস্তৃতি ও উন্নত যুগ হবে এবং সে যুগে লেখাপড়ার রাজত্ব চলবে। তারা তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দ্বীন-ধর্মের সম্মিলিতভাবে একটি নতুন মানব সমাজ ও একটি নতুন বিশ্ব গঠন করবে এবং তার উৎকর্ষ সাধন করবে।
আর এটা তখনই সম্ভব হবে যদি লেখাপড়ার সূচনা হয় নবুয়তের ছত্র-ছায়ায় এবং ঐ মালিকের নামে (যিনি এ বিশ্বজগৎ ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন) যাতে এ জ্ঞান-বিজ্ঞান আল্লাহ্র প্রতি ইয়াকীন ও তাঁর সঠিক মা'রেফাতের রঙে রঙিন হয় এবং তার আলোকরশ্মি ও দিকনির্দেশনায় আপন সফর চালু রাখতে পারে। আর এজন্য ইরশাদ করেন: اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ. "পড়ুন! আপনার রবের নামে যিনি (বিশ্বজগৎ) সৃজন করেছেন।"
সেই সাথে মানুষ যেন নিজের স্বরূপ ও সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে অবহিত থাকে যাতে সে কখনো নিজের সত্তাকে ভুলে না যায় এবং সীমা অতিক্রম না করে ও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-কারিগরি ও সৃষ্টিজগৎকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের সফলতায় যেন ধোঁকা না খায়। এজন্য ইরশাদ করেন: خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ "যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাঁধা রক্ত হতে।”
এপর তিনি কলমের মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন এবং তার সম্মান ও মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান, লেখাপড়া, শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে তার অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন- যা মক্কা তথা আরব উপদ্বীপে জানা সম্ভব ছিল না। কারণ, সেখানে তা অল্প কিছু মানুষের কাছেই ছিল মাত্র। আর এ কারণে আরব উপদ্বীপে লেখাপড়া জানা লোককে কাতেব বা লেখক বলা হতো। তাই এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ. "যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দান করেছেন।"
অতঃপর মানুষের ঐ যোগ্যতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মানুষ দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-গবেষণা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নিত্য নতুন জ্ঞান অর্জন করতে এবং তারা তাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে সক্ষম। কিন্ত এ সব কিছুর উৎস ও কেন্দ্রই হলো আল্লাহ্ প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থা। আর মানুষকে বৈশিষ্ট্যসহ সৃষ্টি করা হয়েছে এজন্যে যে, সে অজানাকে জানতে এবং অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ব প্রদান করতে সক্ষম। আর এজন্যই ইরশাদ হয়েছে: عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ . "যিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন এমন সব বিষয়, যা সে জানতো না।"
টিকাঃ
১. এ দীর্ঘ সময় ঈসা (আ) ও আমাদের নবী (সা)-এর মধ্যবর্তীকালে অতিক্রান্ত হয়েছিল
📄 দ্বীনের মেজায নির্ধারণ
এটি ছিল প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ প্রথম অহী এবং অহীর ধারাবাহিকতার সূচনাবিন্দু- যা পরবর্তী সকল স্তরে এবং দ্বীনের মেজায, স্বভাব ও প্রকৃতি নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এবং তা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-কলা, দাওয়াত ও আন্দোলন বা চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। আর এ কারণে ইসলাম ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাঝে স্থায়ী সুসম্পর্ক ও সহযাত্রা রয়েছে। ফলে, ইসলাম সব সময় জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে মানবীয় স্পৃহা ও নতুন নতুন সংকট সমাধান করার যোগ্যতা ও সমর্থনের সঙ্গ দিয়েছে, সাধারণত কোন প্রজন্ম, মানবীয় জ্ঞানবুদ্ধি ও সুস্থ সমাজ এর মুখোমুখি হয়ে থাকে। ইসলাম কখনোই জ্ঞানের প্রতি বিরাগ বা বুদ্ধিবৃত্তির প্রবাহ-প্রতিপত্তির কারণে ভীত হয়নি।
টিকাঃ
১. কুরায়শদের মাঝে মাত্র সতেরজন লেখাপড়া জানত। এটাই প্রসিদ্ধ আরব লেখক ইবন আবদ রাব্বিহী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল ইকদুল ফারীদ'-এ উল্লেখ করেছেন। (দেখুন- ৪/২৪২ পৃঃ) অধিকন্তু, আল্লামা বালাযুরী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফুতুহুল বুলদান'-এ এ মতই প্রকাশ করেছেন। (দেখুন ৪৫৭ পৃঃ অবশ্য কেউ কেউ এ সংখ্যা কিছু অধিক বলেছেন; তবে তাও খুব বেশি নয়
এটি ছিল প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ প্রথম অহী এবং অহীর ধারাবাহিকতার সূচনাবিন্দু- যা পরবর্তী সকল স্তরে এবং দ্বীনের মেজায, স্বভাব ও প্রকৃতি নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এবং তা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-কলা, দাওয়াত ও আন্দোলন বা চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। আর এ কারণে ইসলাম ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাঝে স্থায়ী সুসম্পর্ক ও সহযাত্রা রয়েছে। ফলে, ইসলাম সব সময় জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে মানবীয় স্পৃহা ও নতুন নতুন সংকট সমাধান করার যোগ্যতা ও সমর্থনের সঙ্গ দিয়েছে, সাধারণত কোন প্রজন্ম, মানবীয় জ্ঞানবুদ্ধি ও সুস্থ সমাজ এর মুখোমুখি হয়ে থাকে। ইসলাম কখনোই জ্ঞানের প্রতি বিরাগ বা বুদ্ধিবৃত্তির প্রবাহ-প্রতিপত্তির কারণে ভীত হয়নি।
টিকাঃ
১. কুরায়শদের মাঝে মাত্র সতেরজন লেখাপড়া জানত। এটাই প্রসিদ্ধ আরব লেখক ইবন আবদ রাব্বিহী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল ইকদুল ফারীদ'-এ উল্লেখ করেছেন। (দেখুন- ৪/২৪২ পৃঃ) অধিকন্তু, আল্লামা বালাযুরী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফুতুহুল বুলদান'-এ এ মতই প্রকাশ করেছেন। (দেখুন ৪৫৭ পৃঃ অবশ্য কেউ কেউ এ সংখ্যা কিছু অধিক বলেছেন; তবে তাও খুব বেশি নয়
📄 জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপারে কিছু ধর্ম ভীত
কিছু ধর্ম এমনো রয়েছে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৃত্যুর মাঝে নিজেদের জীবন এবং তার পরাজয়ের মাঝে নিজেদের বিজয় অনুভব করে। এর দৃষ্টান্ত একটি গল্পের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।
কথিত আছে যে, একবার মাছিদের একটি দল হযরত সুলায়মান (আ)-এর কাছে জড়ো হয়ে বাতাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে, বাতাস আমাদের উপর নির্দয়ভাবে জুলুম করে। কারণ, আমরা তার উপস্থিতিতে টিকতে পারি না। দমকা বাতাস প্রবাহিত হবার সাথে সাথে আমাদের পলায়ন করতে হয়। তাদের অভিযোগ শ্রবণ করে হযরত সুলায়মান (আ.) বললেন, বিবাদীর উপস্থিতি প্রয়োজন। সুতরাং বাতাসকে তলব করা হলো। কিন্তু বাতাস উপস্থিত হবার সাথে সাথে মাছির দল উধাও হয়ে গেল। এতে হযরত সুলায়মান (আ.) বললেন- বাদীর অনুপস্থিতিতে আমরা কিভাবে সিদ্ধান্ত নিব? এ অবস্থাই অনেক ধর্মের। ভারতের সনাতন ধর্ম এবং তার অসংখ্য নেতার কর্মপদ্ধতিও এ মর্মে একাধিক সাক্ষ্য সরবরাহ করে।
ইউরোপে গির্জা ও বিজ্ঞানের লড়াই ও বিবাদের কাহিনী তো অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে মার্কিন লেখক ড্রেপারের গ্রন্থটি Conflict between Religon and Science ঐতিহাসিক দলিলপত্র সমৃদ্ধ অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ।' মধ্যযুগে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত তদন্ত আদালত Courts of Inquistion ও গির্জার মাঝে বিবাদের সংখ্যা হাজারের বেশি হবে। সে সময় ঐসব আদালতের দেয়া লোমহর্ষক রায়ের কারণে আজো শরীর ভয়ে প্রকম্পিত হয়।
খ্রিস্টীয় বিশ্বাসসমূহ পরীক্ষার এ ধর্মীয় আদালতসমূহ (Courts of nquisition) রোমান ক্যাথলিক গির্জার পক্ষ হতে মধ্যযুগে ইতালী, ফ্রান্স, জার্মান ও স্পেনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ সব আদালত ধর্মত্যাগের কারণে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের নির্মম শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ছিল। ১৪৯০ সালে স্পেনে আরবদের পতনের পর ঐসব আদালতের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সরকার নিজের দখলে নিয়ে নেয়। ফলে, সতের শতাব্দীর দিকে তাদের পতন শুরু হয়। ১৮০৮ সালের দিকে নেপোলিয়ন এগুলো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৮২০ সালে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত তা কোনো না কোনো আকারে চলতে থাকে। তবে এটা বলা মুশকিল যে, মোট কত লোক ঐ সকল আদালতের রায়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছে। তবে এমন লোকের সংখ্যা লাখের মত হবে এটা নিশ্চিত।
পবিত্র কুরআন নাযিল হয়ে শিক্ষার এমন মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছে এবং জ্ঞানীদের এত অধিক মর্যাদা ও মূল্যায়ন করেছে- যার তুলনা পূর্ববর্তী কোন গ্রন্থে এবং প্রাচীন কোন ধর্মে পাওয়া মুশকিল। পবিত্র কুরআন জ্ঞান ও জ্ঞানীদের এমন ভূয়সী প্রশংসা করেছে যাদ্বারা তাদের মর্যাদা নবীদের নীচের স্তরে এবং সকল মানব সম্প্রদায়ের উপরের স্তরে পৌঁছে গেছে। এ মর্মে আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন:
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"আল্লাহ্ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং ফেরেশতা ও জ্ঞানীগণও আর তিনি ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।" [সূরা আলে ইমরান: ১৮]
তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন:
وَقُلْ رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا. "বলুন! হে আমার রব, আমার জ্ঞানকে বাড়িয়ে দিন।” [সূরা তাহা : ১১৪]
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ . "আপনি বলুন, যারা জ্ঞান রাখে আর যারা জ্ঞান রাখে না, তারা কি সমান হতে পারে?" [সূরা যুমার: ৯]
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ. "আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের মধ্য হতে যারা ঈমানদার ও জ্ঞানী, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।" [সূরা মুজাদালাহ: ১১]
إِنَّمَا يَخْشَيْ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الْعَلَمُوا . "আল্লাহকে তো শুধুমাত্র জ্ঞানী লোকেরাই ভয় করে।" [সূরা ফাতির: ২৮]
এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী (সা)-এর হাদীস ভাণ্ডার হতে এখানে কয়েকটি বর্ণনা করা যথেষ্ট হবে।
فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ . "একজন আলিমের মর্যাদা একজন আবেদের উপর এমন, যেমন তোমাদের সাধারণ মানুষের উপর আমার মর্যাদা।" [তিরমিযী]
إِنَّ الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَبًا وَإِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ - فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظّ وَافِرٍ . "আলিমগণ নবীদের ওয়ারিস, আর নবীগণ কাউকে দীনার বা দিরহামের ওয়ারিস বানান না। তাঁরা শুধুমাত্র এক্ষেত্রে ইলমের ওয়ারিস বানান। সুতরাং যে ইলমকে গ্রহণ করলো, সে বড় মূল্যবান সম্পদ গ্রহণ করলো।" [আবু দাউদ ও তিরমিযী]
জ্ঞানের এ পরিমাণ মর্যাদা ও উৎসাহ প্রদানের কারণে ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানের প্রতি এমন উদ্যম, এমন স্পৃহা ও অধ্যবসায় সৃষ্টি হয়েছিল এবং জ্ঞানের জন্য আত্মোৎসর্গ-আত্মবিসর্জনের এমন অপরিসীম আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল- যার ফলে বিশ্বব্যাপী চিরন্তন শিক্ষা বিপ্লব সাধিত হয়েছিল এবং তা সর্বাধিক সময়ের ও স্থানের দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। আর এর তাৎপর্যগত দূরত্ব তো পূর্বের দুটো হতে অধিক।'
প্রখ্যাত ফরাসী লেখক ড. ল্যাবান তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আরব সংস্কৃতি'তে (তামাদ্দুনে আরব) উল্লেখ করেন:
"আরবগণ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে যে সাধনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তা বাস্তবেই বিস্ময়কর ব্যাপার। এ বিশেষ ব্যাপারে অনেক জাতি-গোষ্ঠী তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করেছে কিন্তু খুব কমই তাদের উপর বিজয়ী হতে পেরেছে। যখনই তারা কোনো শহর গড়ে তুলেছে, তখনই তারা সর্বপ্রথম সেখানে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে। বড় বড় শহরে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) অধিক পরিমাণে হতো।
বেনজামিন দিলি তওয়িল (মৃঃ ১১৭৩ খ্রিঃ) বর্ণনা করেন, তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় বিশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখেছেন।
সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাগদাদ, কায়রো, টলেডো, কর্ডোভা ও অন্যান্য বড় বড় শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এগুলোতে গবেষণাগার, তথ্যভাণ্ডার, বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। মোটকথা, সেখানে গবেষণার সব ধরনের উপকরণ বিদ্যমান ছিল। শুধু স্পেনেই ছিল সত্তরটির মত সাধারণ গ্রন্থাগার।
আরব ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে কর্ডোভার দ্বিতীয় বাদশাহর কর্ডোভাস্থ গ্রন্থাগারে ছয় লাখ গ্রন্থ ছিল। এর মধ্যে শুধু পুস্তক তালিকা ছিল চল্লিশ খন্ড। এ ব্যাপারে কেউ অত্যন্ত সুন্দর বলেছেন: চারশ বছর পর যখন চার্লস আকেল ফ্রান্সের রাজকীয় গ্রন্থাগার নির্মাণ করেন, তখন তিনি ৯০০-এর বেশি গ্রন্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হননি। আর সেখানে পুরো এক আলমারী ধর্মগ্রন্থও ছিল না।'
টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য, ড্রেপার রচিত 'ধর্ম-ও বিজ্ঞানের যুদ্ধ'। অনুবাদ (উর্দু) লাহোরস্থ 'যমীনদার' পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা জাফর আলী খান বি, এ, (আলীগড়)
১. এর বিস্তৃতি ও তার শাখাসমূহ জানার জন্য ঐ সকল গ্রন্থের সাহায্য নেয়া যেতে পারে- যা বিভিন্ন ভাষায় ইসলামি পণ্ডিতগণ রচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, এখানে কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো: ক. আল ফিহরিস্ত, লেখক ইবনু নাদীম, খ. কাশফুযযুনুন, লেখক হাজী খলীফাহ গ. মু'জামুল মুসান্নিফীন, লেখক আল্লামা মাহমূদ হাসান টুংকী (এটি ৬০ খণ্ডে সমাপ্ত এবং ২০,০০০ পৃষ্ঠায় ৪০,০০০ লেখকের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে); ঘ. আছ-ছাকাফাতুল হিন্দিয়া, লেখক মাওঃ সৈয়দ আব্দুল হাই হাসানী (র.) (দামেশক হতে প্রকাশিত); আরবী সাহিত্যের ইতিহাস লেখক ব্রোকালমান ও 'তারিখুত তুরাছিল আরবী', লেখক ফুয়াদ সাযগীন ইত্যাদি বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ
১. আরব সভ্যতা, উর্দু তরজমা সৈয়দ আলী বিলগিরামী, পৃঃ ৩৯৮-৯৯
কিছু ধর্ম এমনো রয়েছে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৃত্যুর মাঝে নিজেদের জীবন এবং তার পরাজয়ের মাঝে নিজেদের বিজয় অনুভব করে। এর দৃষ্টান্ত একটি গল্পের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।
কথিত আছে যে, একবার মাছিদের একটি দল হযরত সুলায়মান (আ)-এর কাছে জড়ো হয়ে বাতাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে, বাতাস আমাদের উপর নির্দয়ভাবে জুলুম করে। কারণ, আমরা তার উপস্থিতিতে টিকতে পারি না। দমকা বাতাস প্রবাহিত হবার সাথে সাথে আমাদের পলায়ন করতে হয়। তাদের অভিযোগ শ্রবণ করে হযরত সুলায়মান (আ.) বললেন, বিবাদীর উপস্থিতি প্রয়োজন। সুতরাং বাতাসকে তলব করা হলো। কিন্তু বাতাস উপস্থিত হবার সাথে সাথে মাছির দল উধাও হয়ে গেল। এতে হযরত সুলায়মান (আ.) বললেন- বাদীর অনুপস্থিতিতে আমরা কিভাবে সিদ্ধান্ত নিব? এ অবস্থাই অনেক ধর্মের। ভারতের সনাতন ধর্ম এবং তার অসংখ্য নেতার কর্মপদ্ধতিও এ মর্মে একাধিক সাক্ষ্য সরবরাহ করে।
ইউরোপে গির্জা ও বিজ্ঞানের লড়াই ও বিবাদের কাহিনী তো অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে মার্কিন লেখক ড্রেপারের গ্রন্থটি Conflict between Religon and Science ঐতিহাসিক দলিলপত্র সমৃদ্ধ অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ।' মধ্যযুগে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত তদন্ত আদালত Courts of Inquistion ও গির্জার মাঝে বিবাদের সংখ্যা হাজারের বেশি হবে। সে সময় ঐসব আদালতের দেয়া লোমহর্ষক রায়ের কারণে আজো শরীর ভয়ে প্রকম্পিত হয়।
খ্রিস্টীয় বিশ্বাসসমূহ পরীক্ষার এ ধর্মীয় আদালতসমূহ (Courts of nquisition) রোমান ক্যাথলিক গির্জার পক্ষ হতে মধ্যযুগে ইতালী, ফ্রান্স, জার্মান ও স্পেনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ সব আদালত ধর্মত্যাগের কারণে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের নির্মম শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ছিল। ১৪৯০ সালে স্পেনে আরবদের পতনের পর ঐসব আদালতের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সরকার নিজের দখলে নিয়ে নেয়। ফলে, সতের শতাব্দীর দিকে তাদের পতন শুরু হয়। ১৮০৮ সালের দিকে নেপোলিয়ন এগুলো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৮২০ সালে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত তা কোনো না কোনো আকারে চলতে থাকে। তবে এটা বলা মুশকিল যে, মোট কত লোক ঐ সকল আদালতের রায়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছে। তবে এমন লোকের সংখ্যা লাখের মত হবে এটা নিশ্চিত।
পবিত্র কুরআন নাযিল হয়ে শিক্ষার এমন মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছে এবং জ্ঞানীদের এত অধিক মর্যাদা ও মূল্যায়ন করেছে- যার তুলনা পূর্ববর্তী কোন গ্রন্থে এবং প্রাচীন কোন ধর্মে পাওয়া মুশকিল। পবিত্র কুরআন জ্ঞান ও জ্ঞানীদের এমন ভূয়সী প্রশংসা করেছে যাদ্বারা তাদের মর্যাদা নবীদের নীচের স্তরে এবং সকল মানব সম্প্রদায়ের উপরের স্তরে পৌঁছে গেছে। এ মর্মে আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন:
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"আল্লাহ্ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং ফেরেশতা ও জ্ঞানীগণও আর তিনি ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।" [সূরা আলে ইমরান: ১৮]
তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন:
وَقُلْ رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا. "বলুন! হে আমার রব, আমার জ্ঞানকে বাড়িয়ে দিন।” [সূরা তাহা : ১১৪]
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ . "আপনি বলুন, যারা জ্ঞান রাখে আর যারা জ্ঞান রাখে না, তারা কি সমান হতে পারে?" [সূরা যুমার: ৯]
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ. "আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের মধ্য হতে যারা ঈমানদার ও জ্ঞানী, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।" [সূরা মুজাদালাহ: ১১]
إِنَّمَا يَخْشَيْ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الْعَلَمُوا . "আল্লাহকে তো শুধুমাত্র জ্ঞানী লোকেরাই ভয় করে।" [সূরা ফাতির: ২৮]
এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী (সা)-এর হাদীস ভাণ্ডার হতে এখানে কয়েকটি বর্ণনা করা যথেষ্ট হবে।
فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ . "একজন আলিমের মর্যাদা একজন আবেদের উপর এমন, যেমন তোমাদের সাধারণ মানুষের উপর আমার মর্যাদা।" [তিরমিযী]
إِنَّ الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَبًا وَإِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ - فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظّ وَافِرٍ . "আলিমগণ নবীদের ওয়ারিস, আর নবীগণ কাউকে দীনার বা দিরহামের ওয়ারিস বানান না। তাঁরা শুধুমাত্র এক্ষেত্রে ইলমের ওয়ারিস বানান। সুতরাং যে ইলমকে গ্রহণ করলো, সে বড় মূল্যবান সম্পদ গ্রহণ করলো।" [আবু দাউদ ও তিরমিযী]
জ্ঞানের এ পরিমাণ মর্যাদা ও উৎসাহ প্রদানের কারণে ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানের প্রতি এমন উদ্যম, এমন স্পৃহা ও অধ্যবসায় সৃষ্টি হয়েছিল এবং জ্ঞানের জন্য আত্মোৎসর্গ-আত্মবিসর্জনের এমন অপরিসীম আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল- যার ফলে বিশ্বব্যাপী চিরন্তন শিক্ষা বিপ্লব সাধিত হয়েছিল এবং তা সর্বাধিক সময়ের ও স্থানের দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। আর এর তাৎপর্যগত দূরত্ব তো পূর্বের দুটো হতে অধিক।'
প্রখ্যাত ফরাসী লেখক ড. ল্যাবান তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আরব সংস্কৃতি'তে (তামাদ্দুনে আরব) উল্লেখ করেন:
"আরবগণ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে যে সাধনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তা বাস্তবেই বিস্ময়কর ব্যাপার। এ বিশেষ ব্যাপারে অনেক জাতি-গোষ্ঠী তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করেছে কিন্তু খুব কমই তাদের উপর বিজয়ী হতে পেরেছে। যখনই তারা কোনো শহর গড়ে তুলেছে, তখনই তারা সর্বপ্রথম সেখানে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে। বড় বড় শহরে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) অধিক পরিমাণে হতো।
বেনজামিন দিলি তওয়িল (মৃঃ ১১৭৩ খ্রিঃ) বর্ণনা করেন, তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় বিশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখেছেন।
সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাগদাদ, কায়রো, টলেডো, কর্ডোভা ও অন্যান্য বড় বড় শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এগুলোতে গবেষণাগার, তথ্যভাণ্ডার, বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। মোটকথা, সেখানে গবেষণার সব ধরনের উপকরণ বিদ্যমান ছিল। শুধু স্পেনেই ছিল সত্তরটির মত সাধারণ গ্রন্থাগার।
আরব ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে কর্ডোভার দ্বিতীয় বাদশাহর কর্ডোভাস্থ গ্রন্থাগারে ছয় লাখ গ্রন্থ ছিল। এর মধ্যে শুধু পুস্তক তালিকা ছিল চল্লিশ খন্ড। এ ব্যাপারে কেউ অত্যন্ত সুন্দর বলেছেন: চারশ বছর পর যখন চার্লস আকেল ফ্রান্সের রাজকীয় গ্রন্থাগার নির্মাণ করেন, তখন তিনি ৯০০-এর বেশি গ্রন্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হননি। আর সেখানে পুরো এক আলমারী ধর্মগ্রন্থও ছিল না।'
টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য, ড্রেপার রচিত 'ধর্ম-ও বিজ্ঞানের যুদ্ধ'। অনুবাদ (উর্দু) লাহোরস্থ 'যমীনদার' পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা জাফর আলী খান বি, এ, (আলীগড়)
১. এর বিস্তৃতি ও তার শাখাসমূহ জানার জন্য ঐ সকল গ্রন্থের সাহায্য নেয়া যেতে পারে- যা বিভিন্ন ভাষায় ইসলামি পণ্ডিতগণ রচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, এখানে কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো: ক. আল ফিহরিস্ত, লেখক ইবনু নাদীম, খ. কাশফুযযুনুন, লেখক হাজী খলীফাহ গ. মু'জামুল মুসান্নিফীন, লেখক আল্লামা মাহমূদ হাসান টুংকী (এটি ৬০ খণ্ডে সমাপ্ত এবং ২০,০০০ পৃষ্ঠায় ৪০,০০০ লেখকের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে); ঘ. আছ-ছাকাফাতুল হিন্দিয়া, লেখক মাওঃ সৈয়দ আব্দুল হাই হাসানী (র.) (দামেশক হতে প্রকাশিত); আরবী সাহিত্যের ইতিহাস লেখক ব্রোকালমান ও 'তারিখুত তুরাছিল আরবী', লেখক ফুয়াদ সাযগীন ইত্যাদি বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ
১. আরব সভ্যতা, উর্দু তরজমা সৈয়দ আলী বিলগিরামী, পৃঃ ৩৯৮-৯৯