📄 নব জীবনের সূচনা এবং মহাবিপ্লব
পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং মুহাম্মদ (সা)-এর শিক্ষা ব্যবস্থার আলোকে নারীদের মর্যাদার এ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যেন মানব জগতে নারী জাতির নব জীবনের সূচনা করেছে। কারণ, আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, ইসলাম-পূর্ব বিশ্বে নারী এবং গৃহপালিত জন্তু বা জড় পদার্থের মাঝে কোন পার্থক্য ছিল না। তাদেরকে জীবন্ত কবর দেওয়া হত, বন্ধক রাখা হত অথবা গৃহের পুতুল মনে করা হত। এ পরিস্থিতিতে এ বিপ্লবী শিক্ষা ব্যবস্থা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, আখলাক- চরিত্র ও নীতি নৈতিকতা, পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে একটি বরকতময় ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়, যাকে সকল দেশ ও সমাজ স্বাগত জানায়। বিশেষ করে ঐ সকল দেশ, যেখানে ইসলাম বিজয়ী বেশে প্রবেশ করে অথবা যেখানে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা বা ইসলামি জীবন ব্যবস্থা প্রয়োগের সুযোগ এসেছিল। অথবা যেখানে ইসলাম একটি সংস্কারমূলক দাওয়াত ও বাস্তব নমুনা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। ইসলামের এ মানবীয় অবদানের মূল্য ও মূল্যায়ন ঐ সকল দেশে সুস্পষ্ট, যেখানে বিধবাদেরকে মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় জ্বলতে হত এবং সমাজ তাদেরকে স্বামীর মৃত্যুর পর বাঁচার অধিকার দিত না এবং সে নিজেও নিজকে বেঁচে থাকার যোগ্য মনে করত না।
মুসলমান শাসকগণ নিজেদের শাসনামলে কিছু ভারতীয় রীতি-নীতির, বিশেষত সতীদাহ প্রথার এভাবে সংস্কার করে যে, যাতে তাদ্বারা তাদের ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসের ও ভারতীয় রীতি-নীতিতে ক্ষতি এবং তাতে তাদের অমর্যাদা সাধন না হয়। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের বিশিষ্ট পর্যটক ও ডাক্তার বার্নিয়ার-এর উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে। (তিনি সম্রাট শাহজাহানের সময় ভারত ভ্রমণ করেছিলেন) তিনি উল্লেখ করেন:
"পূর্বের তুলনায় আজকাল সতীদাহ প্রথা কমে গেছে। কারণ, মুসলমান শাসকগণ এ হিংস্র রীতি-নীতির মূলোৎপাটন করার ক্ষেত্রে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেছেন যদিও তারা নিষেধাজ্ঞা জারি করার ক্ষেত্রে কোন আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। কারণ, তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতি-নীতিতে হস্তক্ষেপ করা সমীচীন মনে করতেন না বরং তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান করতেন। তারপরেও তারা সতীদাহ প্রথাকে বিভিন্ন কৌশলে বাধাদান করার চেষ্টা করতেন। এমনকি তারা এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যে, কোন নারী আঞ্চলিক শাসকের অনুমতি ছাড়া সতীদাহ বরণ করতে পারবে না। আর আঞ্চলিক শাসকের প্রতি নির্দেশ ছিল যে, তারা কেবল তখনই অনুমতি প্রদান করবেন যখন তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস হয় যে, এ মহিলা নিজের সিদ্ধান্ত হতে ফিরে আসবে না। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক শাসক তার সাথে আলোচনা করতেন, তাকে বুঝিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতেন, তাকে ভয় দেখাতেন এবং তার সাথে উত্তম আচরণের ওয়াদা করতেন। এরপরেও যদি তার বুঝ ও কৌশল কাজে না আসত, তখন তারা ঐ বিধবাকে অন্দর মহলে বেগমদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন যাতে বেগমগণ তাদেরকে বুঝিয়ে সতীদাহ হতে বিরত রাখতে পারে।
কিন্তু ঐ সকল চেষ্টা-কৌশলের পরেও এখনো সতীদাহ-এর সংখ্যা অনেক রয়ে গেছে; বিশেষ করে ঐ সকল অঞ্চলে যেখানে হিন্দু রাজাগণ শাসনকার্য পরিচালনা করছে এবং যেখানে কোন মুসলমান শাসক নির্ধারিত নেই।"১
টিকাঃ
১. সফরনামা: ডাক্তার বার্নিয়ার: দ্বিতীয় খণ্ড, পৃঃ ১৭২-১৭৪ (অমৃতসর ১৮৮৬)