📄 পশ্চিমা পন্ডিত ও ইনসাফপ্রিয় মণীষীদের সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তি
অসংখ্য ইনসাফপ্রিয় পণ্ডিত এবং সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাসের বিজ্ঞ ব্যক্তি কুরআন ও ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। কারণ, তা নারীর মর্যাদা ও তার অধিকার সংবলিত।
এখানে আমরা দু'-তিনটি সাক্ষ্য উল্লেখ করা যথেষ্ট মনে করব। এর মধ্যে একজন পশ্চিমা পণ্ডিত মহিলার স্বীকৃতি রয়েছে। তিনি ভারতে একটি শিক্ষা ও সংস্কার আন্দোলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং দক্ষিণ ভারতের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (থিয়োসুফিক্যাল সোসাইটি) প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন। একজন মহিলার সাক্ষী এজন্যও গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান যে, তারা মহিলাদের বিষয়ে অত্যন্ত অনুভূতিশীল হয়ে থাকে এবং তারা মহিলাদের পক্ষ গ্রহণ করে তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিক হয়। তিনি হলেন মিসেস এ্যানি বেসান্ত (Mrs. Annie Besant).
তিনি স্বরচিত গ্রন্থে লিখেছেন :
"আপনি এমন কিছু লোক দেখতে পাবেন যারা ইসলাম ধর্মের এজন্য সমালোচনা করে যে, ইসলাম সীমিত পরিসরে হলেও বহুবিবাহের অনুমতি প্রদান করেছে। কিন্তু তারা আমার ঐ সমালোচনা আপনাকে বলবে না- যা আমি লন্ডনের একটি হলরুমে এক সেমিনারে আলোচনা করেছিলাম। আমি সেখানে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলাম যে, একজন স্ত্রী থাকার পরে অসংখ্য মহিলার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া মুনাফিকী (Hypocrisy) এবং সীমিত পরিসরের বহু বিবাহ হতে অধিক অপমানকর। স্বাভাবিকভাবে মানুষ এ ধরনের আলোচনাকে দূষণীয় মনে করে। তারপরেও তাদের বলা উচিত। কারণ, আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, নারী সংক্রান্ত ইসলামি আইন এখনো পর্যন্ত ইংল্যান্ডে পালন করা হচ্ছে। কারণ, তা সর্বাধিক ন্যায়সংগত আইন- যা দুনিয়াতে বিদ্যমান। মীরাসের অধিকার ও তালাকের বিষয়েও তা পশ্চিমাদের থেকে অনেক অগ্রসর এবং নারীর অধিকার সংরক্ষণকারী। অথচ একবিবাহ ও বহুবিবাহ সম্পর্কিত শব্দসমূহ মানুষকে যাদুগ্রস্ত করে রেখেছে। ফলে, তারা পশ্চিমা নারীদের ঐ অপমানকর জীবনের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করতে চায় না যাকে তার প্রথম সংরক্ষকগণ শুধু এজন্য রাস্তায় নিক্ষেপ করত যে, তার দ্বারা তাদের মন ভরে গেছে। অতঃপর তারা তাদের কোনো সহযোগিতা করত না।"১
মিঃ এন, এল, কোলসেন (MR. N. L. Coulsen) লিখেছেন: "নিঃসন্দেহে নারী বিষয়ে, বিশেষ করে বিবাহিত নারীর ব্যাপারে কুরআনী আইন শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। বিবাহ এবং তালাক সম্পর্কিত অসংখ্য বিধান রয়েছে- যার সাধারণ উদ্দেশ্য হলো, নারীর মর্যাদা সমুন্নত করা। আর তা আরবদের আইন-কানুনে বিপ্লবী পরিবর্তনের প্রমাণ... তাকে পার্সোনাল ল'-এর মর্যাদা দান করেছে, যা ইতিপূর্বে ছিল না। তালাকের বিধানে কুরআন সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন সাধন করেছে, তা হলো ইদ্দতকে তালাকের অন্তর্ভুক্ত করা।”২
ধর্ম ও সভ্যতা বিষয়ক বিশ্বকোষের প্রবন্ধকার লিখেছেন: "ইসলামের নবী নিঃসন্দেহে নারীর মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছেন, যা সেই প্রাচীন আরব সমাজে পেত। বিশেষ করে স্বামীর মৃত্যুর পর নারী স্বামীর রেখে যাওয়া প্রাণীই থেকে যায়নি, বরং সে নিজে তার মীরাসের হকদার হয়ে যায় এবং অন্য স্বাধীন মহিলাদের মত তাকে দ্বিতীয় বিবাহের ব্যাপারে বাধ্য করা যেত না। সে বিবাহের সময় যে সকল বস্তু পেয়েছিল, তালাকের সময় তা প্রদান করতে তার স্বামী বাধ্য থাকে।
এছাড়াও সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কাব্যচর্চার প্রতি আগ্রহী হতে থাকে। কেউ কেউ শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। সাধারণ পরিবারে নারীরা নিজ গৃহে রাণীর মর্যাদায় এবং তার পরিবারের আনন্দ-বেদনায় শরীক হত। সর্বোপরি তাদেরকে মায়ের মর্যাদা দেয়া হত।""
টিকাঃ
১. The Life is Teaching of Muhammad (SM) by Annie Besant (Modras 1932) p. 3.
2. A History of Islamic Law. (Edinburg 1971) p. 14.
৩. এনসাইক্লোপিডিয়া অব রিলিজিয়ন এণ্ড ইথিক্স (নিউইয়র্ক ১৯১২) পৃঃ ২৭১
📄 নব জীবনের সূচনা এবং মহাবিপ্লব
পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং মুহাম্মদ (সা)-এর শিক্ষা ব্যবস্থার আলোকে নারীদের মর্যাদার এ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যেন মানব জগতে নারী জাতির নব জীবনের সূচনা করেছে। কারণ, আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, ইসলাম-পূর্ব বিশ্বে নারী এবং গৃহপালিত জন্তু বা জড় পদার্থের মাঝে কোন পার্থক্য ছিল না। তাদেরকে জীবন্ত কবর দেওয়া হত, বন্ধক রাখা হত অথবা গৃহের পুতুল মনে করা হত। এ পরিস্থিতিতে এ বিপ্লবী শিক্ষা ব্যবস্থা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, আখলাক- চরিত্র ও নীতি নৈতিকতা, পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে একটি বরকতময় ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়, যাকে সকল দেশ ও সমাজ স্বাগত জানায়। বিশেষ করে ঐ সকল দেশ, যেখানে ইসলাম বিজয়ী বেশে প্রবেশ করে অথবা যেখানে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা বা ইসলামি জীবন ব্যবস্থা প্রয়োগের সুযোগ এসেছিল। অথবা যেখানে ইসলাম একটি সংস্কারমূলক দাওয়াত ও বাস্তব নমুনা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। ইসলামের এ মানবীয় অবদানের মূল্য ও মূল্যায়ন ঐ সকল দেশে সুস্পষ্ট, যেখানে বিধবাদেরকে মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় জ্বলতে হত এবং সমাজ তাদেরকে স্বামীর মৃত্যুর পর বাঁচার অধিকার দিত না এবং সে নিজেও নিজকে বেঁচে থাকার যোগ্য মনে করত না।
মুসলমান শাসকগণ নিজেদের শাসনামলে কিছু ভারতীয় রীতি-নীতির, বিশেষত সতীদাহ প্রথার এভাবে সংস্কার করে যে, যাতে তাদ্বারা তাদের ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসের ও ভারতীয় রীতি-নীতিতে ক্ষতি এবং তাতে তাদের অমর্যাদা সাধন না হয়। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের বিশিষ্ট পর্যটক ও ডাক্তার বার্নিয়ার-এর উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে। (তিনি সম্রাট শাহজাহানের সময় ভারত ভ্রমণ করেছিলেন) তিনি উল্লেখ করেন:
"পূর্বের তুলনায় আজকাল সতীদাহ প্রথা কমে গেছে। কারণ, মুসলমান শাসকগণ এ হিংস্র রীতি-নীতির মূলোৎপাটন করার ক্ষেত্রে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেছেন যদিও তারা নিষেধাজ্ঞা জারি করার ক্ষেত্রে কোন আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। কারণ, তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতি-নীতিতে হস্তক্ষেপ করা সমীচীন মনে করতেন না বরং তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান করতেন। তারপরেও তারা সতীদাহ প্রথাকে বিভিন্ন কৌশলে বাধাদান করার চেষ্টা করতেন। এমনকি তারা এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যে, কোন নারী আঞ্চলিক শাসকের অনুমতি ছাড়া সতীদাহ বরণ করতে পারবে না। আর আঞ্চলিক শাসকের প্রতি নির্দেশ ছিল যে, তারা কেবল তখনই অনুমতি প্রদান করবেন যখন তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস হয় যে, এ মহিলা নিজের সিদ্ধান্ত হতে ফিরে আসবে না। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক শাসক তার সাথে আলোচনা করতেন, তাকে বুঝিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতেন, তাকে ভয় দেখাতেন এবং তার সাথে উত্তম আচরণের ওয়াদা করতেন। এরপরেও যদি তার বুঝ ও কৌশল কাজে না আসত, তখন তারা ঐ বিধবাকে অন্দর মহলে বেগমদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন যাতে বেগমগণ তাদেরকে বুঝিয়ে সতীদাহ হতে বিরত রাখতে পারে।
কিন্তু ঐ সকল চেষ্টা-কৌশলের পরেও এখনো সতীদাহ-এর সংখ্যা অনেক রয়ে গেছে; বিশেষ করে ঐ সকল অঞ্চলে যেখানে হিন্দু রাজাগণ শাসনকার্য পরিচালনা করছে এবং যেখানে কোন মুসলমান শাসক নির্ধারিত নেই।"১
টিকাঃ
১. সফরনামা: ডাক্তার বার্নিয়ার: দ্বিতীয় খণ্ড, পৃঃ ১৭২-১৭৪ (অমৃতসর ১৮৮৬)