📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 মানবীয় ভ্রাতৃত্বের শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক ঘোষণা

📄 মানবীয় ভ্রাতৃত্বের শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক ঘোষণা


মানবতার নবী (সা)-এর দ্বিতীয় মহৎ অনুগ্রহ এবং দুনিয়ার বুকে চিরন্তন অবদান হলো মানবীয় ঐক্যের ধারণা। এর পূর্বে মানুষ বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী উঁচু-নীচু শ্রেণী এবং সংকীর্ণ বংশগত শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত ছিল। আর ঐ সকল শ্রেণীবিভাগের মাঝে পারস্পরিক বিভেদ এত বেশি ও এরূপ ছিল যে, যেমন মানুষ ও পশুর মাঝে বা স্বাধীন ও গোলামের মাঝে, অথবা যেমন বান্দা ও প্রভুর মাঝে ফারাক হয়ে থাকে। প্রিয় নবী (সা)-এর পূর্বে মানবীয় ঐক্য ও সাম্যের ধারণা মানুষের অলীক কল্পনা ও সুখস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। প্রিয় নবী (সা) শত শতাব্দীর সুদীর্ঘ নীরবতা ও চাদরে ঢাকা অন্ধকার ভেদ করে এ বিপ্লবী ঘোষণা দিলেন, যা মানুষের চিন্তা-চেতনায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী। তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণা ছিল:
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ - وَإِنَّ آبَاءُ كُمْ وَاحِدُ كُلُّكُمْ لآدم وآدم مِنْ تُرَابِ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ إِتَقَاكُمْ - وَلَيْسَ لِعَرَبِي عَلَى عَجَبِي فَضْلُ إِلَّا بِالتَّقْوَى.
“হে মানুষ! তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। তোমরা সকলে আদম থেকে, আর আদম মাটি থেকে। তাই তোমাদের মধ্যে সে-ই আল্লাহ্র নিকট সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী যে অধিক তাকওয়ার অধিকারী। কোন অনারবের উপর কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তাকওয়ার কারণ ছাড়া।”১
এর মাঝে একই সাথে দু'টি ঘোষণা ছিল, যা নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুটি স্তম্ভের ভূমিকা পালন করে। যাকে আরবী পরিভাষায় وحدة الرب ووحدة الاب )এক প্রভু ও এক পিতা)-এর উপর ভিত্তি করেই সবসময় ও সর্বত্রই শান্তি ও নিরাপত্তার প্রাসাদ নির্মিত হয়। যথা- প্রথমত, রবুবিয়তের একত্ব, দ্বিতীয়ত, মনুষ্যত্বের একত্ব। এদিক থেকে এক মানুষ অপর মানুষের সাথে দু'দিক থেকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়; প্রথমত হল রবের দিক থেকে এবং দ্বিতীয়ত হলো তাদের পূর্বপুরুষ ও আদিপিতা একজনই।
এ মর্মে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে: يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّنْ نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالاً كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا.
"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ হতে। অতঃপর তা থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাদের উভয় হতে অসংখ্য পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং ঐ আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা পরস্পরকে চাও এবং আত্মীয়তা সম্পর্কে সতর্ক থাক, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক।" [সূরা নিসা: ১] يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْتُكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقُكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيدٌ.
"হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে একটি পুরুষ ও একটি নারী হতে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচয় লাভ করতে পার। আর অবশ্যই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদার অধিকারী ঐ ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়ার অধিকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন।" [সূরা হুজরাত: ১৩]
এক হাদীসে প্রিয় নবী (সা) ইরশাদ করেন: إِنَّ اللَّهِ قَدَ اَذْهَبَ عَنْكُمْ عَصَبِيَّةِ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ - إِنَّمَا هُوَ مُؤْمِنٌ تَقِيَ أَوَ فَاجِرٍ شَقِى - النَّاسُ بَنَوَ آدم - وَآدم خَلَقَ مِنْ تُرَابِ لَا فَضْلَ لِعَرَبِي عَلَى عَجَبِي إِلَّا بِالْتَّقْوَى.
"আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের থেকে জাহিলী অহমিকা ও পূর্বপুরুষদের নিয়ে অহংকার করার প্রথা শেষ করে দিয়েছেন। এখন হয়তো সে মুমিন মুত্তাকি হবে অথবা হতভাগ্য ফাজের হবে। সকল মানুষই আদম সন্তান। আর আদম হলেন মাটির তৈরি। সুতরাং, কোন অনারবের উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, যদি সে তাকওয়া অর্জন না করে।"
এ কারনেই ইসলাম ধর্ম সকল জাতি-গোষ্ঠী, বংশ-খান্দান, সকল দেশ ও মহাদেশের এজমালী সম্পদ ও সামগ্রিক অধিকারসম্পন্ন। এতে ইয়াহুদীদের লাবী বংশ অথবা হিন্দুদের ব্রাহ্মণদের মত কারো কোন বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠিত নেই অথবা এখানে এক বংশ অন্য বংশের উপর অথবা এক সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায়ের উপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার নয় অথবা শ্রেষ্ঠত্বের ও বিশেষত্বের মানদণ্ড হিসেবে বংশ ও রক্ত বিবেচিত হয় না; শ্রেষ্ঠত্বের মৌলিক মানদণ্ড হলো মানুষের নিজস্ব আগ্রহ, পিপাসা ও সাধনা, যোগ্যতা, সংগ্রাম ও কঠিন অধ্যবসায়। হযরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ) নিজস্ব সনদে প্রিয় নবী (সা) হতে বর্ণনা করেন:
لَوْ كَانَ العِلْمَ بِالقُرَيَّا لَتَنَاوَلَهُ أَنَاسٌ مِنْ أَبْنَاءِ فَارِسٍ "জ্ঞান যদি ধ্রুবতারার কাছেও থাকে, তাহলে অবশ্যই তা ইরানের কিছু সন্তান অর্জন করতে সক্ষম হবে।"
ফলে আরবগণ সবসময় ধর্মীয় জ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী ও বিশেষত্বের অধিকারী অনারব আলিম-উলামাকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেছেন এবং তাদের ইলম ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন; তাদের আমানতদারী ও ইলমী নেতৃত্বকে মেনে নিয়েছেন এবং তাদেরকে এমন সব খেতাবে ভূষিত করেছেন- যা সাধারণত আরব আলিমদেরকে প্রদান করা হয়নি। তারা বুখারী শরীফের লেখক ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল (ইবন ইবরাহীম ইবন মুগীরা ইবন বারদিসবা) আল-জু'ফী আল-বুখারী (রহ)-কে 'আমীরুল মুমিনীনা ফিল হাদীস' খেতাবে ভূষিত করেছেন এবং তার গ্রন্থকে পবিত্র কুরআনের পরে 'অধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। এমনিভাবে আরবগণ ইমাম আবুল মা'আলী আব্দুল মালিক আল-জুয়াইনী নিশাপুরীকে (মৃঃ ৪৬৮ হিঃ)-কে 'ইমামুল হারামাইন' খেতাব প্রদান করেছেন এবং ইমাম আবূ হামেদ মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ আল-গাযযালী তুসীকে 'হুজ্জাতুল ইসলাম' বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
এ ছাড়া হিজরী প্রথম শতাব্দীর শেষদিকে মাওয়ালী ও অনারব অধিবাসীগণ সকল ইসলামি রাজধানীতে مسلمانوں নেতা ও আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। তাদের উপরই নির্ভর করত শিক্ষা, ফতোয়া, ফিকহ ও হাদীসসহ সকল বিষয়। এটি একটি সর্বজনবিদিত বাস্তবতা। তাবাকাত ও তারাজিম, (বিষয়ভিত্তিক জীবনী গ্রন্থ) ও ইসলামের সভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাস গ্রন্থসমূহে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এটা ঐ সময় হয়েছিল যখন ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ এবং আরবদের হাতেই ছিল নেতৃত্ব ও ক্ষমতা।
একজন ক্ষণজন্মা আরব মনীষী আল্লামা আব্দুর রহমান ইবন খালদূন আল-মাগরিবী (মৃঃ ৮০৮ হিঃ) এ সম্পর্কে লিখেছেন:
"এটি একটি বিস্ময়কর ঐতিহাসিক বাস্তবতা যে, মুসলিম উম্মাহর মাঝে শরী'আত বিষয়ক জ্ঞান ও দর্শন বিষয়ক জ্ঞানের অধিকাংশের ধারক বাহক হলেন অনারব অধিবাসীগণ। আরবগণ এ সকল বিষয়ে খুবই কম নযর দিয়েছিল। অথচ এ জাতি ছিল আরবী ভাষা এবং শরী'আতের কর্ণধার হলেন আরব। অথচ নাহুশাস্ত্রের ইমাম হলেন সিবাওয়ায়হ ও তাঁর পরে আবু আলী ফারিসী, তারপরে আল-যুজ্জাজ। আর তাঁরা সবাই অনারব বংশোদ্ভূত। এভাবে হাদীস, উসূলে ফিকহ ও ইলমে কালাম বিষয়ে বিজ্ঞ পণ্ডিত ও অধিকাংশ তাফসীরবিশারদ ছিলেন অনারব।'
প্রিয় নবী (সা)-এর উল্লিখিত হাদীসটি (যা উপরে অতিক্রান্ত হয়েছে) অত্যন্ত চিরন্তন সত্য ভাষণ ছিল যা তিনি বিদায় হজ্জের সময় পবিত্র যবানে প্রদান করেন। প্রিয় নবী (সা) যে সময় এ ঐতিহাসিক ঘোষণাটি প্রদান করেন, দুনিয়া তখন এ বজ্রসম ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘোষণাকে মেনে নেওয়ার মত সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না।
আমাদের স্বভাবই হলো যে, কোনকিছুকে ধীরে ধীরে এবং কোন মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকি। যেমন বিদ্যুৎকে আমরা বিদ্যুৎ নিরোধক অবস্থায় বা তারের মধ্যে লুকায়িত অবস্থায় ধরতে পারি কিন্তু যদি তা সরাসরি ধরতে যাই, তাহলে কঠিন কম্পনের (Shock) মুখোমুখি হই আর তা আমাদের জন্য মৃত্যুর যমদূত হয়ে উপস্থিত হয়।
জ্ঞান-বিজ্ঞান, কোন বিষয় অনুধাবন ও উপলব্ধি, চিন্তা-দর্শন যে সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে, তা বিশ্বমানবতা ইসলামি-দাওয়াত, ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা এবং ধর্ম প্রচারক সংস্কারকগণের সাধনার ফলে সম্ভব হয়েছে। ঐ মহান বিপ্লবী ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী সত্য ঘোষণা আজ বর্তমান বিশ্বের নিত্যদিনের চিরন্তন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আজ দুনিয়ার সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন তাকে সানন্দে গ্রহণ করেছে। বর্তমানে তার স্বাভাবিক পরিণতি হলো, 'মানবাধিকারের ঘোষণা' বর্তমানে জাতিসংঘ যার পতাকাবাহী। এমনিভাবে ঐ সকল ঘোষণা তারই ফসল- যা সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং ও মানবাধিকার ও সাম্যের পতাকাবাহী সংগঠনসমূহ বারবার ব্যক্ত করছে আর এতে কেউ আশ্চর্যবোধ করছে না।

টিকাঃ
১. কানযুল উম্মাল
১. মুকাদ্দমা ইবনে খালদুন (মিসরে মুদ্রিত), পৃঃ ৪০১

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 ইসলাম-পূর্ব মানব সমাজ এবং এতে ব্যক্তি ও গোত্রের মাহাত্ম্য

📄 ইসলাম-পূর্ব মানব সমাজ এবং এতে ব্যক্তি ও গোত্রের মাহাত্ম্য


মানব ইতিহাসে এমন একযুগও অতিবাহিত হয়েছে, যখন তাদের দিল ও দেমাগ কিছু কিছু জাতি-গোষ্ঠীর ব্যাপারে মহৎ ও অতিমানব হওয়ার ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন ও প্রভাবিত ছিল। ফলে, কিছু কিছু জাতি-গোষ্ঠী তাদের বংশ-লতিকা চন্দ্র, সূর্য ও স্রষ্টার সাথে মিলিয়ে ফেলেছিল। পবিত্র কুরআনে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে:
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصْرِى نَحْنُ أَبْنَوُا اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ.
"ইয়াহুদী-খ্রিস্টানেরা বলে, আমরা আল্লাহ্র পুত্র এবং তাঁর প্রিয়পাত্র।” [সূরা মায়িদা: ১৮]
মিসরের ফিরাউনদের ধারণা ছিল, তারা সূর্যদেবতা 'রে' (RE)-এর বহিঃপ্রকাশ ও তার মূর্ত প্রতীক। ভারতবর্ষে দু'টি বংশকে সূর্যবংশ ও চন্দ্রবংশ বলা হত। ইরানের বাদশাহ কিসরাগণের ধারণা ছিল, তাদের ধমণীতে ঈশ্বরের রক্ত প্রবহমান, এ কারণে তার প্রজারা তাকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখত। পারস্য সম্রাট পারভেজ (৫৯০-৬২৮ খ্রিঃ)-এর প্রশংসায় বলা হত যে, তিনি প্রভুদের মাঝে অবিনশ্বর মানব এবং মানুষের মাঝে অদ্বিতীয় প্রভু। তার বাণী সমুন্নত, সম্মান সর্বোচ্চ, তিনি সূর্যের সাথে উদিত হন এবং স্বীয় দ্যূতিদ্বারা অন্ধকার রাতকে আলোকিত করেন।'
রোম সম্রাট কায়সারকেও ঈশ্বর মনে করা হত। তার উপাধি ছিল (August) মহান ও মহাত্মন।২ চীনারা তাদের সম্রাটকে আকাশপুত্র মনে করত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, আকাশ হলো নর আর যমীন হলো নারী। এদের উভয়ের মিলনের মাধ্যমে এ বিশ্বজগৎ সৃষ্টি হয়েছে। সম্রাট প্রথম খত্তা সেই যুগলের প্রথম সন্তান।৩
আরবের অধিবাসীরা নিজেদের ছাড়া অন্যদেরকে আজমী (বাকহীন) মনে করত। কুরায়শ গোত্র সকল আরব গোত্রের মাঝে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করত। ফলে, তারা হজ্জের মৌসুমেও নিজেদের এ স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখত। অন্য লোকদের সাথে মেলামেশা করত না, আরাফাতের দিন অন্য হাজীদের সাথে আরাফার মাঠে সমবেত হওয়ার পরিবর্তে তারা কাবা শরীফেই অবস্থান করত। অতঃপর তারা মুযদালিফাতে যেত। আর বলত, "আমরা আল্লাহ্ তা'আলার শহরের বাসিন্দা, তাঁর ঘরের প্রতিবেশী।" আর কখনো বলতো, "আমরা বিশেষ লোক।”১
ভারতবর্ষ সমসাময়িক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শ্রেণী-বৈষম্য ও মানুষে-মানুষে ভেদাভেদের ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিল। তাদের সমাজব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর, তাতে কোন নমনীয়তা ও সহনশীলতা ছিল না, এ ব্যবস্থার পক্ষে ধর্মের সমর্থন ও সহযোগিতাও ছিল। এ ব্যবস্থা বহিরাগত জাতি, ধর্ম ও পবিত্রতার ইজারাদার ব্রাহ্মণদের স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। তাতে উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে পেশা, বংশ ও খান্দান নির্ধারণ করা হত। আর তা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিধানের মর্যাদা রাখত। যেভাবে এটাকে ভারতের ধর্মীয় নেতারা প্রণয়ন করেছিল, তাতে তা সমাজের সাধারণ নিয়ম ও জীবনপদ্ধতিতে পরিণত হয়েছিল। তাদের ঐ বিধান ভারতের অধিবাসীদেরকে চার শ্রেণীতে বিভক্ত করে রেখেছিল-
১. ব্রাহ্মণ ও ধর্মীয় শ্রেণী;
২. সামরিক ও সৈন্য অর্থাৎ ক্ষত্রিয়;
৩. ব্যবসায়ী ও কৃষক অর্থাৎ বৈশ্য; এবং
৪. সেবক অর্থাৎ শূদ্র।
এরাই হলো সর্বনিম্ন শ্রেণী। স্রষ্টা এদেরকে নিজের পা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের উপর উল্লিখিত তিন শ্রেণীর সেবা করা অপরিহার্য করে দিয়েছেন।
এ বিধান ব্রাহ্মণদেরকে এমন প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে যাতে অন্য কোন শ্রেণী শরীক নেই। ব্রাহ্মণকে সর্বাবস্থায় মুক্তিপ্রাপ্ত স্বর্গীয় মনে করা হত যদিও তারা তাদের অপরাধ ও কুকর্মের দ্বারা ত্রিভুবনকে ধ্বংস করে ফেলে। তাদের উপর কোন কর আরোপ করা হত না, তাদেরকে কোন অবস্থাতেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হত না। অন্যদিকে, শূদ্রদের মাল জমা করার, ব্রাহ্মণদের সাথে উঠাবসা করার, তাদেরকে স্পর্শ করার এবং পবিত্র গ্রন্থসমূহের শিক্ষা অর্জন করার অধিকার ছিল না।২
পেশাজীবী তাঁতী, জেলে, কসাই, ধোপা, মেথর ইত্যাদি শ্রেণীর লোকদের মনুশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী শহরের ভিতরে বসবাস করার অধিকার ছিল না। তাই তারা শহরের বাইরে বসবাস করত। তারা তাদের কাজকর্ম করার জন্য সূর্য- উদয়ের পর শহরে আসত এবং সূর্যাস্তের পূর্বেই শহরের বাইরে চলে যেতো। এ নিয়মের কারণে তাদের শহরের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও আমোদ-প্রমোদ উপভোগ করার কোন সুযোগ ছিল না। ফলে, তারা জরাজীর্ণ গ্রাম্য জীবন যাপন করতে বাধ্য ছিল।'

টিকাঃ
১. সাসানী যুগে ইরান, আর্থার ক্রিস্টেনশন প্রণীত পৃঃ ৬৪
২. The Roman World By Victor Chopart. P. 418.
৩. চীনের ইতিহাস, জেমস কারকর্ণ প্রণীত
১. বুখারী শরীফ, হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত
২. ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবস্থা জানার জন্য মনুশাস্ত্রের ১, ২, ৮, ৯, ১০, ১১ তম অধ্যায় দেখুন।
১. মনুস্মৃতি এবং Manu And Yajnvalky A. By Jayaswal. P.

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 ইসলামের সাম্যের ধারণা ও বিশ্বব্যাপি এর প্রভাব

📄 ইসলামের সাম্যের ধারণা ও বিশ্বব্যাপি এর প্রভাব


মুসলমানগণ ভারতবর্ষে আসার সময় সাথে করে যে বিস্ময়কর বস্তু নিয়ে এসেছিলেন, তা ছিল মানবসাম্যের ধারণা। এ বিষয়ে ভারতীয়দের কোন জ্ঞান- বা ধারণা ছিল না। মুসলিম সমাজে না ছিল শ্রেণীবৈষম্য, আর না ছিল শূদ্র সমাজ ব্যবস্থা। এখানে কেউ জন্মগত অদ্যুৎ অথবা কারো জন্য লেখাপড়া নিষিদ্ধ ছিল না। আবার বংশগত পেশার স্বাতন্ত্র্য ও স্থায়ী প্রথা ছিল না; বরং তারা মিলেমিশে বসবাস করতেন এবং একই সাথে এক দস্তরখানে খাবার গ্রহণ করতেন। সকলেই একত্রে লেখাপড়া শিখতেন, ইচ্ছামত পেশা গ্রহণ করতেন। এটি ভারতীয় চিন্তা-চেতনা ও সমাজ ব্যবস্থার জন্য ছিল এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও তা ভারতকে বড়ই উপকার করেছে এবং শ্রেণীবৈষম্যের অভিশাপকে কিছুটা হলেও লাঘব করেছে। আর তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বড় শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। যা সমাজ সংস্কারের পতাকাবাহীদেরকে তৎপর করেছে এবং ছ্যুত-অচ্ছ্যুতের দ্বন্দ্ব নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এ ঐতিহাসিক বাস্তবতার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন এভাবে:
"ভারতের ইতিহাসে উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিজয়ীগণ ও ইসলামের আগমনের বড় গুরুত্ব রয়েছে। তারা ভারতীয় সমাজের ফ্যাসাদকে প্রকাশ করেছে এবং তাদের শ্রেণী বৈষম্য ও ছুত-অদ্ভুত এবং ভারতের বিশ্ব হতে বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে, ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও সাম্য-সৌহার্দ্য এবং যার উপর مسلمانوں ঈমান ও আমল ছিল, হিন্দুদের মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তা- চেতনাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে। যা ভারতীয় সমাজব্যবস্থা তাদের জন্য সাম্য-সৌহার্দ্য এবং মানবাধিকার থেকে উপকৃত হবার দরজা বন্ধ করে রেখেছিল।"২
হিন্দুধর্মের উপর ইসলামের প্রভাবের কারণে দক্ষিণ ভারতে 'ভগতি' আন্দোলনের জন্ম হয় এবং তা অতি দ্রুত সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলন সম্পর্কে ড. তারা চাঁদ লেখেন:
"তাদের সাথে অনেক আল্লাহওয়ালা লোক ছিলেন- যারা জনসাধারণকে সম্বোধন করে তাদেরকে মৌখিক উপদেশ প্রদান করতেন এবং জনগণের সাধারণ ভাষা ব্যবহার করতেন। তাদের অনেকের কবিসুলভ যোগ্যতাও ছিল। তাদের কবিতা সাধারণ মানুষের দিলে গেঁথে যেত। তারা পন্ডিতসুলভ পরিভাষা বর্জন করেন। তারা আল্লাহ্ তায়ালা ও মানুষের ভালবাসার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতেন, মূর্তিপূজা, শ্রেণী বৈষম্য, লৌকিকতা, বিভেদ ও জৌলুসপূজার নিন্দা করতেন। তাদের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, সাধুতা ও নির্মোহ জীবন সাধারণ মানুষের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।"
"তারাই বর্তমান ভারতীয় ভাষার ভিত্তি স্থাপন করে। তাদের উদ্যম মানব জীবনে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং জনসাধারণকে উচ্চ ও নিঃস্বার্থ খিদমতের জন্য প্রস্তুত করে। পনের, ষোল ও সতের শতাব্দীতে তারা দেশের সর্বত্রই এক বিস্ময়কর আশা-আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল- যা তাদের আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের উচ্ছ্বাসিত অবস্থা ছাড়া উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ঐ শতাব্দীগুলো তাদের হৃদয়গ্রাহী বাণীতে মুখরিত ছিল। তাতে একই সাথে সতর্কীকরণ ও উৎসাহদান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সকল লোক সত্যিকার অর্থে উদার ও প্রশস্ত দিলের অধিকারী ছিলেন। তাদের সংখ্যাও ছিল প্রচুর। তাদের অনেকেই নীচু শ্রেণীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তারা জন্মের ভিত্তিতে সম্ভ্রান্ত হওয়ার ভ্রান্ত ধারণাকে নির্মূল করেন।”১
বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ প্রফেসর গিব (Gibb) বিশ্ব সভ্যতায় ইসলামের প্রয়োজনের উপর গুরুত্ব আরোপ-করতে গিয়ে লিখেছেন:
"ইসলামকে মানবতার জন্য আরো একটি খিদমত আঞ্জাম দিতে হবে। মানুষের স্তর, অবস্থান ও পেশার ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাম্য-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে অন্য কোন সমাজব্যবস্থা তার মত সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। আফ্রিকা, ভারত এবং ইন্দোনেশিয়ার বিশাল ও জাপানের সীমাবদ্ধ মুসলিম সমাজের দ্বারা এ বিষয় স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম কিভাবে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও রীতি-নীতি এবং অমীমাংসিত বিরোধসমূহকে সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং যদি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে বিরোধের পরিবর্তে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা সৃষ্টি করতে হয়, তাহলে তার জন্য ইসলামের খিদমত গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।"?
প্রখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক ঐতিহাসিক টয়েনবী (A. J. Toynbee) ইসলামি সাম্যের স্বীকৃতি প্রদান করে লিখেছেন:
"মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে বংশগত ভেদাভেদের মূলোৎপাটন ইসলামের মহৎ অবদানসমূহের একটি অন্যতম অবদান। আর বর্তমান যুগে ইসলামের এ মহানুভবতা সময়ের সর্ববৃহৎ প্রয়োজন। ..... যদিও অন্য কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে ইংরেজী ভাষাভাষীদের সফলতাসমূহ মানবতার জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এটা অনস্বীকারযোগ্য বাস্তবতা যে, জাতিগত আবেগসমূহের বিপদের ক্ষেত্রে তারা দুর্ভাগাই রয়ে গেছে।”২
ভারতের প্রসিদ্ধ ও বিশিষ্ট নারী সরোজনী নাইডু ইসলাম প্রদত্ত ভ্রাতৃত্ব ও সাম্য-সম্প্রীতির বিষয়টি উদার মনে এভাবে স্বীকার করেছেন:
"এটি সর্বপ্রথম ধর্ম যা গণতন্ত্রের প্রচার-প্রসার করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করেছে। মসজিদগুলোতে আযানের সাথে সাথে ইবাদতকারীগণ একত্রিত হয় এবং দিনে পাঁচবার তারা আল্লাহু আকবার ঘোষণায় একসাথে মাথা অবনত করে এবং ইসলামি গণতন্ত্রের বাস্তবায়ন করে। আমি বার বার অনুভব করেছি যে, ইসলাম সমষ্টিগত কর্মের দ্বারা এক মানুষকে অপর মানুষের সাথে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়। যদি আপনি লন্ডনে কোন মিসরী, আলজিরিয়ান, ভারতীয় এবং তুর্কি মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেখেন, তাহলে এতে কোন গুরুত্ব থাকে না যে, একজনের দেশ মিসর আর অপরজনের জন্মভূমি ভারত।"°
প্রসিদ্ধ আফ্রিকান নেতা মালকম এক্স (Malclm-x) তাঁর আত্মজীবনীতে মুসলিম সমাজের এবং ইসলামি সভ্যতা কর্তৃক প্রদত্ত ঐক্য ও সাম্যের বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেন:
"আমি ঐ সকল ইসলামি দেশে বিগত এগার দিন যাবত একই প্লেটে খাবার খেয়েছি, একই গ্লাসে পানি পান করেছি এবং তাদের সাথে একই গালিচায় ঘুমিয়েছি। ..... আমি তাদের মাঝে ঐ রকম আন্তরিকতা পেয়েছি- যার অনুভূতি আমার হয়েছিল নাইজিরিয়া, সুদান ও ঘানার কালো আফ্রিকান মুসলমানদের মাঝে।
"আমরা সকলে ভাই ভাই ছিলাম, কেননা আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস আমাদের দিল-দেমাগ, চিন্তা-চেতনা ও আচার-আচরণ থেকে গৌরবর্ণের বিশেষত্বকে মিটিয়ে দিয়েছে। আমার বুঝে এসে গেছে যে, যদি আমেরিকার লোকজন তাওহীদ ও একত্ববাদে বিশ্বাসী হত, তাহলে হয়ত তারাও মানব ঐক্যের বিষয়টি গ্রহণ করত; রঙ বা বর্ণের ভিত্তিতে অন্য লোকদের তুলনা, বিরোধিতা বা শত্রুতা করা ত্যাগ করত। আমি এ বিষয়টি হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছি যে, আমি আমেরিকার জনগণকে বলব, এখানে সকল বর্ণের মানুষের মাঝে সত্যিকার অর্থে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রয়েছে, কোন মানুষই নিজেকে ভিন্ন ও পৃথক মনে করে না- সেখানে কারো মাঝে শ্রেষ্ঠত্ববোধ বা হীনম্মন্যতা বোধ নেই।"১

টিকাঃ
২. Discovery of India, Calcautta. 1946. P. 223
১. Tara Chand. Socitety and Statein the Mughal Period. Publication Division, Ministry of Information and Broadcusting 1961.p. P. 88.89
১. H. A. R. Gibb Whtther Islam.
২. A. J. Toynbee; Civilization on Trial Newyork-1848. P. 205.
৩. Sarojini Naidu: Speeches And Writings of Sarojini Naidu ,madras. 1918. P. 167.
১. The Autobiography of Malcolm x (essx) 1965 p. 419-420.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00