📄 খ্রিস্টান জগতের উপর তাওহীদের প্রভাব
প্রসিদ্ধ মিসরীয় গবেষক ডঃ আহমদ আমীন তাঁর 'দুহাল ইসলাম' গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:
"খ্রিস্টান জাতিতে এমন কিছু মতানৈক্য দেখা যায় যাতে সুস্পষ্টভাবে ইসলামের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং অষ্টম শতাব্দী অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরীতে সেপ্টমানিয়া (Septmania) নামক শহরে' এমন এক আন্দোলনের সূচনা হয় যারা পাদরীদের সামনে গুনাহের কথা স্বীকার করার পক্ষপাতী ছিল না। তাদের ধারণামতে, এ ব্যাপারে পাদরীদের এ ধরনের কোন ক্ষমতা দেয়া হয় নি; বরং মনুষের নিজের গুনাহের জন্য একমাত্র আল্লাহ্র সামনে মিনতি করা দরকার। আর যেহেতু ইসলাম ধর্মে পাদরী ও পুরোহিত নামের কোন দল বা ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই, এজন্য ইসলামে ঐ ধরনের কোন স্বীকারোক্তির ব্যবস্থাও নেই।
এ ধরনের আরো একটি আন্দোলন ধর্মীয় ছবি ও মূর্তির (Statues) বিরুদ্ধে ছিল- যাকে (Iconocla) বলা হয়। অষ্টম ও নবম শতাব্দী মুতাবিক হিজরী তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীর দিকে (Iconocla) নামক একটি খ্রিস্টান দলের আবির্ভাব ঘটে, যারা ছবি ও মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি করার পক্ষপাতী ছিল না। রোমান সম্রাট তৃতীয় লিউ ৭২৬ খ্রিস্টাব্দে ফরমান জারি করে শাহী ঘোষণার মাধ্যমে ছবি ও মূর্তির সম্মান প্রদর্শনকে নিষিদ্ধকাজ বলে ঘোষণা দেন। অতঃপর ৭৩০ খ্রিস্টাব্দে এটাকে মূর্তিপূজার শামিল বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এভাবে পোপ (সচারী ২য় ও ৩য়) এবং জার্মানিউস কম্পটাইনের অনুরূপ, দারনীর শাসক মূর্তিপূজার পৃষ্ঠপোষক, আর কন্সটাইন ৫ম ও লিউ চতুর্থ এর বিরোধী ছিলেন। ফলে, তাদের মাঝে ছিল চরম দ্বন্দ্ব- যার বিবরণ দেয়ার সুযোগ এখানে নেই। এখানে শুধু এতটুকু প্রমাণ করা উদ্দেশ্য যে, ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে ছবিবিরোধী আন্দোলন ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সুতরাং ইতিহাসবিদদের ভাষ্য হলো:
তাওরীনে ধর্মযাজক ক্লোডিউস (যিনি এ পদে ৮২৮ মুতাবিক ৩১৩ হিজরীর দিকে সমাসীন হয়েছিলেন) ছবি ও ক্রশচিহ্ন জ্বালিয়ে দিতেন এবং তার গির্জাগুলোতে এগুলোর উপাসনা করতে বারণ করতেন। এর কারণ হলো, তিনি স্পেনের ইসলামি পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানে বড় হন ও শিক্ষা- দীক্ষা লাভ করেন। ইসলামে ছবি ও মূর্তি একটি অপছন্দনীয় জিনিস, এটা প্রসিদ্ধ কথা। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহ) তাঁদের প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীস গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রা)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন:
قَدِمَ رَسُولُ اللهِ (ص) مِنْ سَفَرٍ وَقَدْ سَتَرْتُ سَهْوَةً لِي بِقَرَامٍ فِيهِ تَمَاثِيلَ - فَلَمَّا رَآهُ هَتَكَهُ وَتَلَوْنَ وَجْهَهُ وَقَالَ يَا عَائِشَةَ : أَشَدُ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِينَ يُضَاهُؤُنَ بِخَلْقِ اللهِ - قَالَتْ فَقَطَعْنَاهُ فَجَعَلْنَاهُ مِنْهُ وَسَادَةً أَوْ وَسَادَتَيْنِ .
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, “একবার রাসূলুল্লাহ (সা) কোন এক সফর থেকে ফিরে আসলেন। আমি জানালাতে ছবিযুক্ত কাপড়দ্বারা পর্দা দিয়ে রেখেছিলাম। প্রিয় নবী এটাকে দেখে ফেঁড়ে ফেললেন। তখন তাঁর চেহারা মুবারকের রং বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং আমাকে (ধমকের সুরে) বললেন : আয়েশা! কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তিকে বেশি শাস্তি দেয়া হবে যে ব্যক্তি আল্লাহ্ সৃষ্টির নকল করে।” তিনি বলেন, একথা শুনে আমরা সেটাকে কেটে একটি বা দু’টি বালিশ তৈরি করলাম।”
খ্রিস্টানদের একদল তো তাদের ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা তাওহীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে করে থাকে এবং “তারা হযরত ঈসা মসীহ (আ)-এর ইলাহ হওয়াকে অস্বীকৃতি জানায়।”১
ইউরোপের ইতিহাস ও খ্রিস্টধর্মের গির্জাঘরের ইতিহাস পর্যালোচনাকারী পাঠকগণ ইউরোপীয় সংস্কারপন্থীদের উপর ইসলামি চিন্তা-চেতনার প্রভাব লক্ষ্য করে থাকবেন। ষোড়শ শতাব্দীতে সৃষ্ট লুথারের সংস্কার আন্দোলনের মাঝেও ইসলামি শিক্ষার ছাপ পাওয়া যায়। যেমন কোন গল্পের উপর দূরের আলোকছটা দেখা যায়, ঠিক তেমনি মধ্যযুগের সনাতনপন্থী ও গির্জার নারাজীর মধ্যেও এ কিরণ হালকা-হালকাভাবে পরিলক্ষিত হয়। বিশিষ্ট খ্রিস্টান গবেষক J. Bass Mullinger এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।২
আরনেস্ট ডি বুনসেন (Ernest De Bunsen)-এর ধারণামতে, খ্রিস্টধর্মের ত্রিত্ববাদের এ অবস্থা এ ধর্মের উপর পল (Paul)-এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার কারণে এবং খ্রিস্টধর্ম তার চিন্তা-চেতনা ও মতাদর্শের অধীন হয়ে পড়ার কারণে হয়েছিল।
লুথার-এর নেতৃত্ব প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ দুনিয়াবী ও দ্বীনি বিষয়ে স্বাধীন চিন্তা-চেতনা, মানুষকে তার ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রদান এবং ধর্মীয় ব্যাপারে সহজীকরণ-এর উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এ মতবাদ তৎকালীন সময়ের অনুকরণপন্থী ও ধর্মীয় পুরোহিতদের বিরুদ্ধে চলে যায়। এ মতবাদের মূলমন্ত্র হলো "ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করবে, গির্জার সামনে নয়।"
টিকাঃ
১. Macauliffe, the Sikh Religion; শিবরাস সিং, Life of Gurunanak.
১. দুহাল ইসলাম ১খন্ড, পৃঃ ২৬৪-২৬৫।
২. MULLINGER-এর প্রবন্ধ, মার্টিন লুথার
৩. দেখুন- ISLAM OR TRUE CHRISTIANITY. ERNEST DE BUNSEN
📄 এ সকল চেষ্টা কেন নিষ্ফল হলো এবং কেন তা দ্বারা কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ হয়নি
একটি ঐতিহাসিক ও গবেষণালব্ধ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা প্রয়োজন, যা ধর্মীয় ইতিহাস এবং বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানসিক অবস্থা দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হলো সকল সংস্কার ও বৈপ্লবিক আন্দোলনগুলো বিকৃতি ও বিচ্যুতির শিকারে পরিণত হয়ে যায়। কারণ, এ সকল ধর্মের প্রবর্তকগণ বিরাট জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদেরকে পৃথক করতে সক্ষম হয়নি, যে ধর্মগুলোর মাঝে আন্দোলনগুলো আত্মপ্রকাশ করেছিল বরং ঐ ধর্মগুলো পূর্বের ধর্মীয় সমাজে মিলেমিশে বসবাস করত, যার মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসে তারা অস্বীকারকারী ছিল। ফলে, সকল সংস্কারবাদী আন্দোলন পূর্বের বিকৃত পুরাতন ধর্মে আত্মস্থ হয়ে গেল। যার শেষ পরিণাম হলো এই যে, সকল সংস্কার ও শুদ্ধি আন্দোলন এবং চেষ্টা-প্রচেষ্টা বিফল হয়ে গেল।
খ্রিস্টধর্মের সংস্কার ও শুদ্ধি আন্দোলনের পরিণতি এবং ভারতে আত্ম-প্রকাশকারী তাওহীদ ও সাম্য-সম্প্রীতির প্রতি আহবানকারী দলের পরিণতি আমাদের সামনে বিদ্যমান। অন্যদিকে, আম্বিয়া (আ) এবং ইসলাম ধর্মের অবস্থান এ ব্যাপারে অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। এ অবস্থার কথা হযরত ইব্রাহীম (আ) ও তাঁর ঈমানী চেতনার উত্তরসুরিদের কথার মাধ্যমে স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়, যে কথাগুলো তাঁরা তৎকালীন যুগের মুশরিকদেরকে বলেছিলেন এবং কুরআন আমাদেরকে তা অবহিত করেছে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِى إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَ بَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللهِ وَحْدَهُ إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ لَاسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ رَبَّnَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ آنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ .
"নিঃসন্দেহে (হযরত) ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। যখন তাঁরা তাদের স্বজাতি লোকদেরকে বলেছিল, তোমাদের থেকে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর তাদের থেকে আমরা মুক্ত, আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি এবং আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি হলো। যদি না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন কর। তবে হযরত ইবরাহীম (আ) তার পিতার জন্য যে কথা বলেছিল যে, আমি অবশ্যই আপনার জন্য দু'আ করব, আর আপনার ব্যাপারে আল্লাহ্র নিকট আমি কোন অধিকার রাখি না। হে আমাদের রব! আমরা আপনার উপরই ভরসা করেছি, আপনারই দিকে মুখ করেছি এবং প্রত্যাবর্তন তো আপনার কাছেই।" [সূরা মুমতাহিনা: ৪]
হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর দৃষ্টিভঙ্গি ও সুদৃঢ় অবস্থা কোন নির্দিষ্ট সময় ও সমাজের সাথে নির্ধারিত ছিল না, বরং তাঁর পরবর্তীদের জন্যও এ অসীয়ত করে গেছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيْهِ وَقَوْمِةٍ إِنَّنِي بَرَاءٌ مِّمَّا تَعْبُدُونَ إِلَّا الَّذِي فَطَرَنِي فَإِنَّهُ سَيَهْدِيْنِ وَجَعَلَهَا كَلِمَةٌ بَاقِيَةً فِي عَقِبِهِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ.
"(ঐ সময়ের কথা স্মরণ করুন) যখন (হযরত) ইবরাহীম (আ) তাঁর পিতা এবং স্বজাতিকে বলেছিলেন, তোমরা যাদের পূজা কর, তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, তবে তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে হিদায়াত করবেন। এ ঘোষণাকে তিনি স্থায়ী বাণীরূপে রেখে গেছেন তার পরবর্তীদের জন্য, যাতে ওরা ফিরে আসে।" [সূরা যুখরুফ: ২৬,২৭,২৮]
لِيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَنْ بَيِّنَةٍ وَيَحْيَى مَنْ حَيَّ عَنْ بَيِّنَةٍ
"যাতে যে ধ্বংস হতে চায় সে যেন সত্যাসত্য স্পষ্টরূপে প্রকাশের পর ধ্বংস হয় আর যে জীবিত থাকবে সে যেন সত্যাসত্য স্পষ্টরূপে প্রকাশের পর জীবিত থাকে।" [সূরা আনফাল: ৪২]