📄 পৃথিবীতে তাওহীদের কলেবরমুখর গুঞ্জরণ ও অন্য ধর্মের উপর এর প্রতিক্রিয়া
এটা মহানবী মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবেরই ফল ছিল- যা বিশ্বমানবতাকে আকীদায়ে তাওহীদের মত এক দুর্লভ উপহার দান করল- যা ছিল শতাব্দীকাল পর্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ও বিস্মৃত এক বাস্তবতা, কিন্তু প্রিয় নবী (সা)-এর আবির্ভাবের পর সারা দুনিয়া জুড়ে গুঞ্জরিত হলো তাওহীদের আকীদা-বিশ্বাস। ফলে, পৃথিবীর প্রায় সকল পার্থিব ধর্ম-দর্শন ও ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনার উপর একত্ববাদের কম-বেশি প্রভাব পড়ল।
যেসব বড় বড় ধর্ম শিরক ও বহুত্ববাদের ওপর গড়ে উঠেছিল এবং যা তাদের শিরা-উপশিরায় মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত আকীদায়ে তাওহীদের প্রভাবে (অনুচ্চ কণ্ঠে ও ফিস ফিস করে হলেও) তাদেরকে এ কথা স্বীকার করতে হয়েছে যে, আল্লাহ্ এক এবং তাঁর কোন শরীক নেই। তারা নিজেদের শিরকি মতবাদের দার্শনিক ব্যাখ্যা করতে শুরু করল যাতে নিজেদেরকে শিরক ও বিদআতের অপবাদ থেকে বাঁচাতে পারে এবং আকীদায়ে তাওহীদের সাথে কিছুটা সামঞ্জস্য প্রমাণিত হয়। কাজেই এখন আর ধর্মগুরু ও তাদের অনুসারীরা পর্যন্ত শিরকের অপবাদ শুনতে প্রস্তুত নয়। ফলে, সারা শিরকী কর্মকান্ডে তারা এক ধরনের হীনম্মন্যতার শিকার হয়ে পড়ল। এ অবস্থায় তাওহীদের উপহার ছিল সবচেয়ে মূল্যবান উপহার- যা রাসূল (সা)-এর আবির্ভাবে বিশ্বমানবতা লাভ করে ধন্য হয়েছে। এ বাস্তবতার উপর আলোকপাত করতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হযরত মাওলানা সৈয়দ সুলায়মান নদভী (রহ) বলেন-
"ঐ জাতি-গোষ্ঠী, যারা আকীদায়ে তাওহীদ থেকে বেখবর ছিল, তারা মানুষের মর্যাদার ব্যাপারে ছিল পূর্ণ অজ্ঞ। তারা মানুষকে প্রাকৃতিক নিয়মেরই গোলাম মনে করত, কিন্তু মুহাম্মদ (সা)-এর আনীত তাওহীদী শিক্ষার প্রভাবে মানুষের দিল থেকে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সবকিছুর ভয়-ভীতি দূর হয়ে গেল। আকাশের সূর্য থেকে যমীনের নদী-নালা ও পুকুর পর্যন্ত প্রভু হবার পরিবর্তে মানুষের গোলাম হয়ে তাদের সামনে আবির্ভূত হলো। রাজা-মহারাজাদের শান- শওকতের জৌলুস ভেঙ্গে গেল এবং তারা বাবেল (ব্যাবিলন) শহর, মিসর, ভারত ও ইরানের আল্লাহ্ ও মহাপ্রভু )أَنَا رَبَّكُمْ الْأَعْلَى( হবার পরিবর্তে মানুষের খাদেম, সেবক ও পাহারাদার হিসেবে দৃষ্টিগোচর হলো।
"মানবীয় ভ্রাতৃত্ববোধ- যা দেবতাদের রাজত্ব উঁচু-নিচু, ক্ষমতাধর-দুর্বল ভদ্র ও ইতর প্রভৃতি শ্রেণীতে বিভক্ত করে রেখেছিল, তাদের বিশ্বাস ছিল যে, তাদের কোন জাতকে পরমেশ্বরের মুখ দ্বারা, আবার কোন জাতকে পরমেশ্বরের হাত দ্বারা এবং কোন জাতকে পা দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, আর এ আকীদা-বিশ্বাসের কারণে মানবতা এমন সব জাত-পাতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল যে, তাদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হওয়া কোনক্রমেই সম্ভব ছিল না, আর এভাবে সাম্য ও সম্প্রীতি দুনিয়া থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল, যমীন জাতিগত বা গোষ্ঠীগত জুলুম- নির্যাতন, অহংকার ও গৌরবের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। তাওহীদ এসে ঐ সকল মান-মর্যাদা, উঁচু-নিচু, ভদ্র-ইতর ও জাত-পাতের বিভেদকে একাকার করে দিল। সব মানুষ আল্লাহ্ বান্দা, তাঁর কাছে সব মানুষ সমান, সকলে পরস্পরে ভাই ভাই এবং সব ব্যপারে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। এ শিক্ষা দুনিয়াতে সামাজিকতা, রীতি-নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে সংস্কার সাধন করেছে, ইতিহাসের পাতা তার স্বাক্ষী।"
পরিশেষে তারাও এ মূলনীতির (তাওহীদের) অনুগ্রহ স্বীকার করেছে- যারা প্রকৃত অর্থে তাওহীদের সঠিক ধারণা হতে ছিল পূরোপুরি অজ্ঞ। আর এ কারণেই তারা আজও পর্যন্ত সাম্য ও সাম্য-প্রীতির মূল্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় নি। চূড়ান্ত অবস্থা এই যে, তারা আল্লাহ্র ঘরে যাবার পরেও তাদের দিল-দেমাগ হতে বৈষম্যের ধারণা দূর হয় না এবং আল্লাহ্র সামনে মাথানত করেও ঐশ্বর্য ও দারিদ্র্য, বর্ণ ও জাতিগত পার্থক্যের কথা ভুলতে পারে না। অন্যদিকে, মুসলিম জাতি তেরশত বছর যাবত তাওহীদের আকীদা-বিশ্বাসের কারণে সাম্য ও সম্প্রীতির অমূল্য নিয়ামত পেয়ে ধন্য হয়ে আছে। তারা সকল প্রকার কৃত্রিম ভেদাভেদ থেকে মুক্ত। ইসলামের দৃষ্টিতে সবাই এক আল্লাহ্র বান্দা, সকলেই সমান, তাঁর সামনে সকলেরই মস্তক অবনত। ধনী বা দরিদ্র, রং ও রূপ, বংশ ও গোত্র পরিচয় তাদের মাঝে কোন বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে না। যদি কোন বিশেষত্ব থাকে, তাহলে শুধু তাকওয়া ও আল্লাহ্র আনুগত্যের মাধ্যমে। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَكُمْ .
"তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মাঝে বেশি তাকওয়া অবলম্বনকারী।" [সূরা হুজুরাত : ১৩]
📄 ভারতের ওপর একত্ববাদের প্রভাব
ভারতীয় চিন্তা-চেতনা এবং দর্শনের ওপর ইসলামের এ একত্ববাদী আকীদা-বিশ্বাসের যে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে, এ সম্পর্কে ভারতের বিশিষ্ট গবেষক কে, এম, পানিক্কর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:
“এটা সর্বজনস্বীকৃত কথা যে, ইসলামি যুগে হিন্দু ধর্মের উপর ইসলামের গভীর প্রভাব পড়েছে। হিন্দুদের মধ্যে আল্লাহ্ ইবাদতের ধারণা ইসলামের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তৎকালীন সময়ে যদিও বা হিন্দু ধর্মের ধর্ম ও দর্শনের নেতৃস্থানীয়রা নিজেদের উপাস্যদের বিভিন্ন নামে নামকরণ করেছিল, তথাপি তারা আল্লাহ্ ইবাদতের দাওয়াত দিত এবং তারা আল্লাহ্ এক হবার কথা স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করত এবং আরো বলত, তিনিই একমাত্র ইবাদতের ও উপাস্য হবার যোগ্য এবং তাঁর কাছে মুক্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা উচিত। ইসলামের এ প্রভাব ইসলামি যুগে ভারতের ধর্ম ও সংস্কার আন্দোলনের মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ভগতি ও কবীর দাসের' সংস্কার আন্দোলন।”২
প্রসিদ্ধ গবেষক ডঃ তারাচাঁদ ভারতবর্ষে ইসলামের প্রভাব সম্পর্কে লিখেছেন- "ইসলামী খিলাফতের যুগ থেকে আরব মুসলমানেরা (দক্ষিণ ভারতের) উপকূলীয় অঞ্চলে পর্যটক হিসেবে আসত এবং নিজেদের স্বধর্মী আফগান, তুর্কী এবং মোঙ্গল বিজয়ীদের আগমনের অনেক আগেই তারা এখানে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয়দের সাথে সৌহার্দ্য গড়ে তুলেছিল। উপমহাদেশের এ অঞ্চলে নবম শতাব্দী হতে দ্বাদশ শতাব্দীকাল পর্যন্ত ব্যাপক ধর্মীয় আন্দোলন শুরু হয়, যে আন্দোলনের সম্পর্ক শংকর রামনুজ (Sankara Ramanu JA) আনন্দতীর্থ (Anandatirtha) এবং বসু (Basaua) এর সাথে ছিল। এদের মাধ্যমে ঐতিহাসিক মতবাদ সৃষ্টি হয়েছিল- যার নজীর পরবর্তী হিন্দু মতবাদের মধ্যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায় না।
এ আন্দোলন পুনর্জীবিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ, দক্ষিণ ভারতের এ ধর্ম ও দর্শনগুলো পৃথক পৃথকভাবে সনাতন চিন্তা-চেতনার উৎস হতে গৃহীত ছিল কিন্তু সমষ্টিগতভাবে এবং বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এতে ইসলাম ধর্মের প্রভাব প্রকাশ পায়। আর এ কারণে ইসলাম থেকে প্রভাবিত হবার ধারণা অধিক যুক্তিসঙ্গত বলে মন হয়।"৩
মান্যবর ডঃ তারাচাঁদ তাঁর অন্য এক বইয়ে ভগতী মতবাদের উপর ইসলামের প্রভাব আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:
"মিস্টিক্স (Mastics) নামে আরেকটি মতবাদ ছিল। এ মতবাদের প্রবর্তক সাধারণ ভাষা ব্যবহার করে তার বিপ্লবী চিন্তা-চেতনার প্রচার করে। এরা বেশির ভাগ নীচুজাতের মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখত। ফলে, তার আন্দোলন বঞ্চিত মানুষদেরকে উপরে উঠার ব্যাপারে আশাবাদী করে তুলেছিল। এদের অনেককে সরকারের রোষানলে পড়তে হয় এবং কেউ সামাজিক অসন্তুষ্টির মুখোমুখি হয়।
আর কিছু এমন ছিল যে, তাদের ব্যাপারে কোন মাথা ব্যথা ছিল না। কিন্তু বঞ্চিত গরীবেরা তাকে যথেষ্ট সমীহ করত এবং তার শিক্ষা-দীক্ষা অতি আগ্রহ সহকারে পালন করা হতো। এ সকল মনীষী মানবতার সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন। কারণ, তাদের শিক্ষার উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব কর্মদ্বারা মানবতার শিখরে উন্নীত হতে পারে। এ মতবাদগুলো পনের শতাব্দীর দিকে শুরু হয়ে সতের শতাব্দীর মধ্যকাল পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল। অতঃপর ধীরে ধীরে এগুলো বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। ঐ সকল মতবাদের অনুসারীরা হিন্দুস্থানের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। তথাপি তাদের শিক্ষা ও আকীদা- বিশ্বাসের উপর ইসলামের প্রভাব সুস্পষ্টভাবেই পরিলক্ষিত হয়।”১
শিখ ধর্মাবলম্বীদের অবস্থাও এটাই- যারা ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক ও সভ্যতা-সংস্কৃতির অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। (হিন্দুধর্মের) মাঝে এ ধর্মাবলম্বীদের জন্ম ও উত্থানের মূল কারণ ইতিহাসের আলোকে ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসের শুদ্ধিকরণরূপেই পরিদৃষ্ট হয়। এ ধর্মের প্রবর্তক বাবা গুরু নানক ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষাদ্বারা খুবই প্রভাবিত ছিলেন। তিনি ফারসি ভাষা ও ধর্মীয় জ্ঞান সাইয়েদ হাসানশাহ নামক একজন সূফী মুসলমানের কাছ থেকে অর্জন করেন। তিনি সূফী সাহেবকে খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। গুরু নানকের আরো অন্যান্য মুসলমান শিক্ষক ও গুরুরও উল্লেখ করা হয়েছে- যাদের সংখ্যা ছয়জন পর্যন্ত পাওয়া যায়। কথিত আছে, তিনি মক্কা-মদীনা শরীফ যিয়ারতও করেছিলেন এবং কিছুদিন বাগদাদে অবস্থান করেন। পাঞ্জাবের একজন বড় পীরে তরীকত জনাব শায়খ ফরীদের সাথেও তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল।
বাবা নানক তাঁর শিক্ষা ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাওহীদী বিশ্বাস, সাম্য ও সম্প্রীতি এবং মূর্তিপূজা ত্যাগের ব্যাপারে খুব তাকিদ করতেন।
টিকাঃ
১. কবীর দাস একজন সূফীবাদী কবি। তিনি ভারতীয় সমাজের উপর সমালোচনা করতেন এবং সংস্কারের দাবি জানাতেন। তার ধর্মমত সম্পর্কে মতভেদ আছে।
২. A Survey of Indian History. P. 132
৩. Influence of Islam on Indian Culture. P.107
১. Society And The State in the Muhgal Period by Dr Tarachand. (Delhi.1941) P.91
📄 খ্রিস্টান জগতের উপর তাওহীদের প্রভাব
প্রসিদ্ধ মিসরীয় গবেষক ডঃ আহমদ আমীন তাঁর 'দুহাল ইসলাম' গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:
"খ্রিস্টান জাতিতে এমন কিছু মতানৈক্য দেখা যায় যাতে সুস্পষ্টভাবে ইসলামের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং অষ্টম শতাব্দী অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরীতে সেপ্টমানিয়া (Septmania) নামক শহরে' এমন এক আন্দোলনের সূচনা হয় যারা পাদরীদের সামনে গুনাহের কথা স্বীকার করার পক্ষপাতী ছিল না। তাদের ধারণামতে, এ ব্যাপারে পাদরীদের এ ধরনের কোন ক্ষমতা দেয়া হয় নি; বরং মনুষের নিজের গুনাহের জন্য একমাত্র আল্লাহ্র সামনে মিনতি করা দরকার। আর যেহেতু ইসলাম ধর্মে পাদরী ও পুরোহিত নামের কোন দল বা ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই, এজন্য ইসলামে ঐ ধরনের কোন স্বীকারোক্তির ব্যবস্থাও নেই।
এ ধরনের আরো একটি আন্দোলন ধর্মীয় ছবি ও মূর্তির (Statues) বিরুদ্ধে ছিল- যাকে (Iconocla) বলা হয়। অষ্টম ও নবম শতাব্দী মুতাবিক হিজরী তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীর দিকে (Iconocla) নামক একটি খ্রিস্টান দলের আবির্ভাব ঘটে, যারা ছবি ও মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি করার পক্ষপাতী ছিল না। রোমান সম্রাট তৃতীয় লিউ ৭২৬ খ্রিস্টাব্দে ফরমান জারি করে শাহী ঘোষণার মাধ্যমে ছবি ও মূর্তির সম্মান প্রদর্শনকে নিষিদ্ধকাজ বলে ঘোষণা দেন। অতঃপর ৭৩০ খ্রিস্টাব্দে এটাকে মূর্তিপূজার শামিল বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এভাবে পোপ (সচারী ২য় ও ৩য়) এবং জার্মানিউস কম্পটাইনের অনুরূপ, দারনীর শাসক মূর্তিপূজার পৃষ্ঠপোষক, আর কন্সটাইন ৫ম ও লিউ চতুর্থ এর বিরোধী ছিলেন। ফলে, তাদের মাঝে ছিল চরম দ্বন্দ্ব- যার বিবরণ দেয়ার সুযোগ এখানে নেই। এখানে শুধু এতটুকু প্রমাণ করা উদ্দেশ্য যে, ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে ছবিবিরোধী আন্দোলন ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সুতরাং ইতিহাসবিদদের ভাষ্য হলো:
তাওরীনে ধর্মযাজক ক্লোডিউস (যিনি এ পদে ৮২৮ মুতাবিক ৩১৩ হিজরীর দিকে সমাসীন হয়েছিলেন) ছবি ও ক্রশচিহ্ন জ্বালিয়ে দিতেন এবং তার গির্জাগুলোতে এগুলোর উপাসনা করতে বারণ করতেন। এর কারণ হলো, তিনি স্পেনের ইসলামি পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানে বড় হন ও শিক্ষা- দীক্ষা লাভ করেন। ইসলামে ছবি ও মূর্তি একটি অপছন্দনীয় জিনিস, এটা প্রসিদ্ধ কথা। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহ) তাঁদের প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীস গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রা)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন:
قَدِمَ رَسُولُ اللهِ (ص) مِنْ سَفَرٍ وَقَدْ سَتَرْتُ سَهْوَةً لِي بِقَرَامٍ فِيهِ تَمَاثِيلَ - فَلَمَّا رَآهُ هَتَكَهُ وَتَلَوْنَ وَجْهَهُ وَقَالَ يَا عَائِشَةَ : أَشَدُ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِينَ يُضَاهُؤُنَ بِخَلْقِ اللهِ - قَالَتْ فَقَطَعْنَاهُ فَجَعَلْنَاهُ مِنْهُ وَسَادَةً أَوْ وَسَادَتَيْنِ .
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, “একবার রাসূলুল্লাহ (সা) কোন এক সফর থেকে ফিরে আসলেন। আমি জানালাতে ছবিযুক্ত কাপড়দ্বারা পর্দা দিয়ে রেখেছিলাম। প্রিয় নবী এটাকে দেখে ফেঁড়ে ফেললেন। তখন তাঁর চেহারা মুবারকের রং বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং আমাকে (ধমকের সুরে) বললেন : আয়েশা! কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তিকে বেশি শাস্তি দেয়া হবে যে ব্যক্তি আল্লাহ্ সৃষ্টির নকল করে।” তিনি বলেন, একথা শুনে আমরা সেটাকে কেটে একটি বা দু’টি বালিশ তৈরি করলাম।”
খ্রিস্টানদের একদল তো তাদের ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা তাওহীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে করে থাকে এবং “তারা হযরত ঈসা মসীহ (আ)-এর ইলাহ হওয়াকে অস্বীকৃতি জানায়।”১
ইউরোপের ইতিহাস ও খ্রিস্টধর্মের গির্জাঘরের ইতিহাস পর্যালোচনাকারী পাঠকগণ ইউরোপীয় সংস্কারপন্থীদের উপর ইসলামি চিন্তা-চেতনার প্রভাব লক্ষ্য করে থাকবেন। ষোড়শ শতাব্দীতে সৃষ্ট লুথারের সংস্কার আন্দোলনের মাঝেও ইসলামি শিক্ষার ছাপ পাওয়া যায়। যেমন কোন গল্পের উপর দূরের আলোকছটা দেখা যায়, ঠিক তেমনি মধ্যযুগের সনাতনপন্থী ও গির্জার নারাজীর মধ্যেও এ কিরণ হালকা-হালকাভাবে পরিলক্ষিত হয়। বিশিষ্ট খ্রিস্টান গবেষক J. Bass Mullinger এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।২
আরনেস্ট ডি বুনসেন (Ernest De Bunsen)-এর ধারণামতে, খ্রিস্টধর্মের ত্রিত্ববাদের এ অবস্থা এ ধর্মের উপর পল (Paul)-এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার কারণে এবং খ্রিস্টধর্ম তার চিন্তা-চেতনা ও মতাদর্শের অধীন হয়ে পড়ার কারণে হয়েছিল।
লুথার-এর নেতৃত্ব প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ দুনিয়াবী ও দ্বীনি বিষয়ে স্বাধীন চিন্তা-চেতনা, মানুষকে তার ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রদান এবং ধর্মীয় ব্যাপারে সহজীকরণ-এর উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এ মতবাদ তৎকালীন সময়ের অনুকরণপন্থী ও ধর্মীয় পুরোহিতদের বিরুদ্ধে চলে যায়। এ মতবাদের মূলমন্ত্র হলো "ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করবে, গির্জার সামনে নয়।"
টিকাঃ
১. Macauliffe, the Sikh Religion; শিবরাস সিং, Life of Gurunanak.
১. দুহাল ইসলাম ১খন্ড, পৃঃ ২৬৪-২৬৫।
২. MULLINGER-এর প্রবন্ধ, মার্টিন লুথার
৩. দেখুন- ISLAM OR TRUE CHRISTIANITY. ERNEST DE BUNSEN
📄 এ সকল চেষ্টা কেন নিষ্ফল হলো এবং কেন তা দ্বারা কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ হয়নি
একটি ঐতিহাসিক ও গবেষণালব্ধ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা প্রয়োজন, যা ধর্মীয় ইতিহাস এবং বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানসিক অবস্থা দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হলো সকল সংস্কার ও বৈপ্লবিক আন্দোলনগুলো বিকৃতি ও বিচ্যুতির শিকারে পরিণত হয়ে যায়। কারণ, এ সকল ধর্মের প্রবর্তকগণ বিরাট জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদেরকে পৃথক করতে সক্ষম হয়নি, যে ধর্মগুলোর মাঝে আন্দোলনগুলো আত্মপ্রকাশ করেছিল বরং ঐ ধর্মগুলো পূর্বের ধর্মীয় সমাজে মিলেমিশে বসবাস করত, যার মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসে তারা অস্বীকারকারী ছিল। ফলে, সকল সংস্কারবাদী আন্দোলন পূর্বের বিকৃত পুরাতন ধর্মে আত্মস্থ হয়ে গেল। যার শেষ পরিণাম হলো এই যে, সকল সংস্কার ও শুদ্ধি আন্দোলন এবং চেষ্টা-প্রচেষ্টা বিফল হয়ে গেল।
খ্রিস্টধর্মের সংস্কার ও শুদ্ধি আন্দোলনের পরিণতি এবং ভারতে আত্ম-প্রকাশকারী তাওহীদ ও সাম্য-সম্প্রীতির প্রতি আহবানকারী দলের পরিণতি আমাদের সামনে বিদ্যমান। অন্যদিকে, আম্বিয়া (আ) এবং ইসলাম ধর্মের অবস্থান এ ব্যাপারে অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। এ অবস্থার কথা হযরত ইব্রাহীম (আ) ও তাঁর ঈমানী চেতনার উত্তরসুরিদের কথার মাধ্যমে স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়, যে কথাগুলো তাঁরা তৎকালীন যুগের মুশরিকদেরকে বলেছিলেন এবং কুরআন আমাদেরকে তা অবহিত করেছে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِى إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَ بَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللهِ وَحْدَهُ إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ لَاسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ رَبَّnَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ آنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ .
"নিঃসন্দেহে (হযরত) ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। যখন তাঁরা তাদের স্বজাতি লোকদেরকে বলেছিল, তোমাদের থেকে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর তাদের থেকে আমরা মুক্ত, আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি এবং আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি হলো। যদি না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন কর। তবে হযরত ইবরাহীম (আ) তার পিতার জন্য যে কথা বলেছিল যে, আমি অবশ্যই আপনার জন্য দু'আ করব, আর আপনার ব্যাপারে আল্লাহ্র নিকট আমি কোন অধিকার রাখি না। হে আমাদের রব! আমরা আপনার উপরই ভরসা করেছি, আপনারই দিকে মুখ করেছি এবং প্রত্যাবর্তন তো আপনার কাছেই।" [সূরা মুমতাহিনা: ৪]
হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর দৃষ্টিভঙ্গি ও সুদৃঢ় অবস্থা কোন নির্দিষ্ট সময় ও সমাজের সাথে নির্ধারিত ছিল না, বরং তাঁর পরবর্তীদের জন্যও এ অসীয়ত করে গেছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيْهِ وَقَوْمِةٍ إِنَّنِي بَرَاءٌ مِّمَّا تَعْبُدُونَ إِلَّا الَّذِي فَطَرَنِي فَإِنَّهُ سَيَهْدِيْنِ وَجَعَلَهَا كَلِمَةٌ بَاقِيَةً فِي عَقِبِهِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ.
"(ঐ সময়ের কথা স্মরণ করুন) যখন (হযরত) ইবরাহীম (আ) তাঁর পিতা এবং স্বজাতিকে বলেছিলেন, তোমরা যাদের পূজা কর, তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, তবে তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে হিদায়াত করবেন। এ ঘোষণাকে তিনি স্থায়ী বাণীরূপে রেখে গেছেন তার পরবর্তীদের জন্য, যাতে ওরা ফিরে আসে।" [সূরা যুখরুফ: ২৬,২৭,২৮]
لِيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَنْ بَيِّنَةٍ وَيَحْيَى مَنْ حَيَّ عَنْ بَيِّنَةٍ
"যাতে যে ধ্বংস হতে চায় সে যেন সত্যাসত্য স্পষ্টরূপে প্রকাশের পর ধ্বংস হয় আর যে জীবিত থাকবে সে যেন সত্যাসত্য স্পষ্টরূপে প্রকাশের পর জীবিত থাকে।" [সূরা আনফাল: ৪২]