📄 ছুয়াদ বিন আব্দুল্লাহ আল ইয়াফির মদীনা আগমন
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, "ছুরাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-ইযদি এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে হুজুরে পাকের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলেন এবং ইসলাম কবুল করলেন। নবী পাক (সাঃ) হযরত ছুরাদকে তার কওমের مسلمانوں আমীর নিয়োগ করলেন এবং বললেন যে ইয়েমেনের গোত্রসমূহের চারপাশের ও পার্শ্ববর্তী মুশরিক গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে নিজের কবিলা এবং অন্যান্য আশপাশের মুসলমানের সঙ্গে মিলে জিহাদ করো।
ছুরাদ বিন আব্দুল্লাহ রাসূলে পাকের (সাঃ) নির্দেশ অনুযায়ী বের হলেন এবং ইয়েমেনের জারাশ এলাকায় গিয়ে পৌঁছলেন। সে যুগে জারাশ একটি বদ্ধ শহর ছিল। শহরটির চারপাশে প্রাচীর দেওয়া ছিল। তাতে ইয়েমেনের কতিপয় গোত্র বাস করতো এবং বনু খাছায়াম গোত্রের কিছু মানুষও তাদের নিকট আশ্রয় নিয়েছিল। তারা মুসলমানদের আগমনের খবর পেয়ে ইয়েমেনীদের সঙ্গে দূর্গে আবদ্ধ হয়ে গেল।
হযরত ছুরাদ এবং তার সঙ্গীরা তাদেরকে এক মাস অবরোধ করে রাখলো কিন্তু দুর্গ কবজা করা গেল না। হযরত ছুরাদ অবশেষে অবরোধ উঠিয়ে নিলেন এবং স্থান ত্যাগ করে চলে গেলেন। অবরুদ্ধরা ধারনা করলো যে হামলাকারীরা পরাজিত হয়ে চলে গেছে। সুতরাং তারা দুর্গ থেকে বের হয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করতে চাইলো। হযরত ছুরাদ যখন শাকার নামক পাহাড়ের নিকট পৌঁছলেন তখন জারাশ বাসীরা তার ওপর হামলা করে বসলো। হযরত ছুরাদ পিছু ফিরে এমনভাবে সেই হামলার জবাব দিলেন যে দুশমনরা গাজর কাটা হয়ে গেল। ব্যাপক সংখ্যায় তরা নিহত হলো।
তার পূর্বে জারাশবাসী পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য মদীনায় দুজন প্রতিনিধি প্রেরণ করেছিল। প্রতিনিধিদ্বয়কে তারা এই বলে পাঠিয়েছিল যে তারা মদীনার শাসককে কেমন পেয়েছিল তা ফিরে এসে তাদেরকে জানাবে। এই দুই ব্যক্তি নবী পাকের (সাঃ) নিকট বসেছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, "শাকার কোন দেশে এবং এলাকায় অবস্থিত?" 'তারা জবাব দিল, "হে আল্লাহর রাসূল। আমাদের এলাকায় একটি পাহাড় আছে। তাকে কাশার বলে।” (জারাশবাসী শাকারকে কাশারই বলে থাকতো) তিনি বললেন, "এটা কাশার নয় শাকার।” তারা জিজ্ঞেস করলো, কেন? কোন বিশেষ কথা আছে কি?" তিনি বললেন, "এ মুহূর্তে সেই পাহাড়ের উপর কুরবানীর পশু জবেহ হচ্ছে।”
আসরের নামাযের পর এই আলোচনা হলো। এ কথা শুনে তারা দু'জন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) অথবা হযরত ওসমান গণির (রাঃ) নিকট গেল। এ সময় তারা (আবু বকর (রাঃ) অথবা ওসমান (রাঃ)) তাদেরকে বললেন, "তোমাদের ধ্বংস হোক। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমাদেরকে তোমাদের কওমের কতলে আমের খবর দিয়েছেন। তোমরা উঠে দাঁড়াও এবং হুজুরের (সাঃ) খিদমতে গিয়ে আরজ করো যে, তিনি যেন তোমাদের কওমের পক্ষে দোয়া করেন। যাতে তাদের ওপর থেকে এই আজাব বা শাস্তি দূর হয়। এ কথা শুনে তারা কাল বিলম্ব না করে রাসূলে পাকের (সাঃ) নিকট উপস্থিত হল এবং দোয়ার আবেদন জানাল। রাসূলে পাক (সাঃ) দোয়া করলেনঃ "হে আল্লাহ! তাদের কওমের ওপর থেকে মুসিবত দূর করো।"
সে সময়ই তারা রাসুলে পাকের (সাঃ) নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে স্বগৃহে রওয়ানা হল। সেখানে পৌঁছে তারা খবর পেল যে, সেই দিন এবং সেই সময় তাদেরকে ছুরাদ বিন আব্দুল্লাহ যুদ্ধে ধরাশায়ী করে ফেলেন এবং যারা জীবিত ছিল তারা পালিয়ে জীবন রক্ষা করে।
📄 ইবনে নাযিহ আল-হাজবীকে হত্যা
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ বিন জাফর বিন যোবায়ের আমার নিকট থেকে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আনিসের হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বলেন, "নবীয়ে আকরাম (সাঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, সুফিয়ান বিন নাবিহ আল-হাজলী আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সৈন্য একত্রিত করে রেখেছে বলে খবর পেয়েছি। সে বর্তমানে নাখলা অথবা আরনায় অবস্থান করছে। তুমি যাও এবং তাকে হত্যা কর।"
আমি আরজ করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল। তার কিছু আলামত এবং হুলিয়া সম্পর্ক আমাকে বলে দিন। যাতে আমি তাকে চিনতে পারি।"
তিনি বললেন, "তুমি যখন তাকে দেখবে তখন তোমার শয়তানের চেহারা স্মরণ হবে এবং তোমার ও তার মধ্যে মজবুত নিদর্শন এই হবে যে তাকে দেখে একবার তোমার শরীরে কাঁপন অনুভূত হবে।”
আমি নিজের তরবারীসহ বের হয়ে পড়লাম এবং তার নিকট গিয়ে পৌঁছলাম। আমি দেখলাম যে সে হাওদায় সওয়ার নিজের স্ত্রীদেরকে নীচে নামাচ্ছে এবং তাঁবুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সময়টি ছিল আসরের সময়। আমি যেই তাকে দেখলাম সেই আমার মনে সেই অনুভূতি জাগ্রত হলো যা হুজুর (সাঃ) ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আমি কাঁপনও অনুভব করলাম। যাহোক আমি তার দিকে অগ্রসর হলাম। হঠাৎ করে আমার ধারণা হলো যে আমার এবং তার মধ্যেকার ব্যাপারটি সাঙ্গ হতে যেন বেশী সময় না নেয় ও আসরের নামাজ যেন কাজা হয়ে না যায়। আমি পৃথক হয়ে নামাজ আদায় করলাম। অতপর সোজা তার দিকে অগ্রসর হলাম। আমি যখন তার নিকট পৌছলাম তখন সে জিজ্ঞাসা করলো, "তুমি কে?”
জবাবে বললাম, "আমি একজন আরব। আমি তোমার ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছি। তুমি "সেই ব্যক্তির মুকাবিলা করার জন্য যে সার্থক বিরাট সেনা বাহিনী প্রস্তুত করেছ তার খ্যাতি আমাকে তোমার প্রতি আগ্রহান্বিত করেছে এবং আমি তোমার নিকট হাজির হয়ে গেছি।”
সে অমার কথা শুনে গর্বের সঙ্গে বলতে লাগলো, "তুমি যা কিছু শুনেছ তা সঠিক। আমি তার বিরুদ্ধে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।” আমি তার সাথে সাথে কিছু দূরে গেলাম। আমি যখন অনুভব করলাম যে সে আমার তরবারীর আওতায় রয়েছে তখন আমি তার ওপর তরবারী চালালাম এবং তাকে হত্যা করে ফেললাম। তাকে হত্যা করে আমি আমার পথ নিলাম এবং তার স্ত্রীদের শোকে মাথা কূটতে দেখে তাদের সামনে থেকে গায়েব হয়ে গেলাম।
আমি যখন মদীনা মুনাওয়ারাতে হুজুরে আকরামের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলাম তখন তিনি আমাকে দেখেই বললেন, "চেহারাতো সফল হিসেবেই মনে হচ্ছে।” আমি আরজ করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল। আমি তাকে কতল করে এসেছি।” তিনি বললেন, "তুমি ঠিকই বলেছ।”
তারপর রাসূলে মকবুল (সাঃ) আমাকে সঙ্গে করে নিজের বাড়ি নিয়ে গেলেন এবং একটি লাঠি দিয়ে বললেন, "হে আব্দুল্লাহ বিন আনিস। এই লাঠি নাও এবং তা নিজের কাছে রেখো।"
আমি নবীর (সাঃ) গৃহ থেকে সেই লাঠি নিয়ে বাইরে এলাম। এ সময় লোকজন আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো, "এই লাঠি কি জন্য?"
আমি বললাম, "রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে এটা দিয়ে দিয়েছেন এবং তা আমার নিকট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।" তারা বললো, "তুমি কি হুজুরের (সাঃ) নিকট ফিরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করবে না যে তিনি এই লাঠি কেন দিয়েছেন?” আমি তার নিকট ফিরে গেলাম এবং জিজ্ঞাসা করলাম, "ইয়া রাসূলুল্লাহ। আপনি আমাকে এই পবিত্র লাঠি কেন প্রদান করেছেন? তিনি ইরশাদ করলেন, "এটা আমার ও তোমার মধ্যে কিয়ামতের দিন নিদর্শন হবে। সেদিন খুব কম মানুষই ঠেস দেওয়ার জন্য কোন কিছুর সাহায্য পাবে। তুমি এই লাঠির ওপর ঠেস দিয়ে চলো এবং কিয়ামতের দিনও এই লাঠিসহ আমার সঙ্গে মিলিত হবে।"
ইবনে ইসহাক আরো বলেছেন, "আব্দুল্লাহ বিন আনিস নিজের তরবারী ও সেই লাঠি সব সময় নিজের নিকট রাখতেন। মৃত্যুর সময়ও এই লাঠি তাঁর নিকট ছিল। তিনি ওসিয়ত করেছিলেন যে, লাঠিটি তার কাফনের সঙ্গে লেপ্টে দিতে হবে এবং তা সমেতই দাফন করতে হবে। বস্তুত তার ওসিয়ত অনুযায়ী এমনি করা হয়েছিল।
📄 হামাযা নামক করেয়ী
ওয়াকেদী বর্ননা করেছেন যে, আবু বকর বিন সোলায়মান বিন আবি হাছমা রাওয়ায়েত করেছেন, হুজুরে পাক (সাঃ) নবম হিজরীর রজব মাসে হযরত আলা বিন হাজরামীকে মানযার বিন সাবীর নামে একটি পত্র দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। মানযার ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আলা ফিরে আসেন। ফেরার পথে ইয়ামামা অতিক্রম করছিলেন। এ সময় ইয়ামামার সরদার ছামামা বিন আছাল তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি মুহাম্মদের (সাঃ) দূত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ছামামা ক্রোধান্বিত হয়ে বললো, এখন তুমি তার নিকট জীবিত ফিরে যেতে পারবে না। সে তাকে হত্যার হুমকি দিতে লাগলো। তার চাচা আমের তাকে বললো, ছামামা বুদ্ধির পরিচয় দাও। সেই ব্যক্তির (মুহাম্মাদ) সঙ্গে তোমার কি বিবাদ রয়েছে?
আমেরের হস্তক্ষেপে ছামামা হযরত আলা'কে ছেড়ে দিলো এবং তিনি মদীনা পৌঁছে হুজুরে পাকের (সাঃ) খিদমতে সকল ঘটনা বর্ননা করলেন। তিনি দোয়া করলেন, হে খোদা! আমেরকে হেদায়াত দান করো এবং ছামামার ওপর আমাকে বিজয় দান কর।
ইমাম বুখারী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে হযরত আবু হুরায়রার (রাঃ) হাদিস আব্দুল্লাহ বিন ইউসুফ সাঈদ বিন আবি সাঈদের রাওয়ায়েত থেকে শুনিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলতেন, নবী পাক (সাঃ) নাজদের দিকে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তারা বনু হানিফার এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলো এবং তাকে এনে মসজিদে নববীর একটি খুঁটিরসঙ্গে বেঁধে রাখলো। তার নাম ছিল ছামামা বিন আছাল।
রাসূলে পাক (সাঃ) ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে এলেন। এ সময় তিনি কয়েদীকে তার নাম ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, ছামামা কেমন আছো"?
সে জবাব দিল, হে মুহাম্মদ। আমি ভালো আছি। অপনি যদি আমাকে হত্যা করেন তাহলে এমন এক ব্যক্তি নিহত হবে যার রক্তের মূল্য রয়েছে। যদি আমার ওপর ইহসান করেন তাহলে এমন ব্যক্তির ওপর ইহসান হবে যে, ইহসানে প্রতিদান দিতে জানে। আর যদি আপনার ধন সম্পদের প্রয়োজন হয় তাহলে যত ইচ্ছা চেয়ে নিতেপারেন।
হুজুরে আকরাম (সাঃ) পরের দিন তার নিকট এলেন এবং পূর্বের প্রশ্নের পুনরুক্তি করলেন। সেও তার একই জবাব পেশ করলো। তৃতীয় দিনও এই সওয়াল জবাব হলো। ছামামার জবাব শুনে হুজুরে আকরাম (সাঃ) সাহাবাদেরকে (রাঃ) ছামামাকে মুক্তির জন্য নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে মুক্ত করে দেওয়া হলো। মুক্তির পর সে মসজিদ সন্নিকটে একটি খেজুরের বাগানে গেল। সেখানে গোসল করলো এবং পুনরায় মসজিদে এসে কালেমায়ে শাহাদাত পড়ল।
মুসলমান হওয়ার পর ছামামা হুজুরের (সাঃ) নিকট আরজ করলেন, খোদার কসম, হে মুহাম্মদ! এই ধরাধামে আপনার চেহারা থেকে বেশী অন্য কারো চেহারার প্রতি আমার ঘৃণা ছিল না। আর এখন দুনিয়ার সকলের চেহারা থেকে আপনার চেহারা আমার নিকট বেশী প্রিয়। আপনার দীন থেকে বেশী দুনিয়ার অন্য দীনের প্রতি আমার শত্রুতা ছিলনা। আজ দুনিয়ার সকল দীনের চেয়ে আপনার দীন সবচেয়ে বেশী ভালো লাগছে। অন্য শহরের চেয়ে আপনার শহরের প্রতিই আমার ঘৃণা বেশী ছিল। কিন্তু আজ আপনার শহরই সমগ্র দুনিয়া থেকে বেশী প্রিয় হয়ে গেছে।
আপনার ঘোড় সওয়াররা আমাকে যখন গ্রেফতার করে তখন আমি ওমরার জন্য মক্কা যাচ্ছিলাম। এখন আপনার নির্দেশ কি?
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছামামাকে সুসংবাদ এবং ওমরাহ করার জন্য মক্কা মুকাররামা গমনের নির্দেশ দিলেন। তিনি যখন মক্কা পৌঁছলেন তখন কোরেশরা তার চারপাশে একত্রিত হয়ে বললো তুমি কি ধর্মান্তর হয়ে গেছো? তিনি জবাব দিলেন, না। আমি বরং মুহাম্মাদের (সাঃ) সঙ্গে দীনে ইসলামে দাখিল হয়েছি। তোমরা শূনে নাও, খোদার কসম। ইয়ামামা থেকে তোমরা এখন একটি কণা পরিমাণ শস্যও পাবে না। হ্যাঁ, আল্লাহর নবী (সাঃ) যদি অনুমতি দান করেন তাহলে খাদ্য শস্য পাবে।
ইয়ামামা ফিরে গিয়ে তিনি মক্কাবাসীদের খাদ্য বন্ধ করে দিলেন। তারা হুজুরের (সাঃ) সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। কিন্তু বাধ্য হয়ে রাসুলের (সাঃ) খিদমতে হাজির হয়ে ইয়ামামা থেকে তাদের খাদ্য সরবরাহ বহাল করার ব্যাপারে আবেদন জানালো। বস্তুত হুজুরের (সাঃ) নির্দেশে খাদ্য সরবরাহ বহাল হলো।
📄 রাসূলুল্লাহর (সাঃ) তরবারী
ওয়াকেদী আব্দুল্লাহ বিন আবু বকরের একটি রাওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর (রাঃ) বলেছেন, রাসূলে আকরাম (সাঃ) খবর পেলেন যে, বনু ছালাবা এবং বনু মাহারিব গোত্রের লোকজন তাঁর ওপর হামলা করার জন্য এক বিরাট বাহিনী একত্রিত করেছে। এই বাহিনী মদীনার চারদিক থেকে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। আছুর বিন হারিছ বিন মাহারিব নামক একজন সরদার এই বাহিনী মোতায়েন করেছিল। এই বেদুঈন সরদারের লকব গওরছ ছিল বলেও কথিত আছে।
এই পরিকল্পনার খবর পেয়ে রাসূলে আকরাম (সাঃ) মুসলমানদেরকে জিহাদের প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন এবং সাড়ে চারশ সাহাবীর একটি দলসহ মদীনা থেকে বের হলেন। এই যুদ্ধে তার সঙ্গে ঘোড় সওয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যোদ্ধাও ছিলেন। প্রথমত তিনি সাধারণ রাস্তা দিয়েই চলতে লাগলেন। অতপর তিনি পরিচিত রাস্তা ছেড়ে একটি অপ্রশস্ত পার্বত্য পথ ধরলেন। সেই পথ দিয়ে তিনি জিল কাসসাহ নামক স্থানে পৌঁছলেন। এখানে সাহাবীরা এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করলেন'। লোকটি বনু ছালাবার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল এবং তার নাম ছিল জাব্বার। সে কোথায় যাচ্ছে তা তারা তাকে জিজ্ঞেস করলো। জবাবে সে বললো, আমি ইয়াসরাবযাচ্ছি।
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, ইয়াসরাবে তার কি কাজ আছে সে বললো, আমি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে চাই।
তারা জিজ্ঞেস করলে- তুমি কি সৈন্য বাহিনী দেখেছ অথবা তোমার কওমের নতুন কোন খবর তোমার নিকট আছে কি?
সে বললো, আমার নিকট বিশেষ কোন তথ্য নেই। তবে, এতটুকু জানি যে দা'ছুর বিন হারিছ কিছু লোককে তৈরী করেছে।
সাহাবীবৃন্দ (রাঃ) সেইব্যক্তিকে হুজুরের (সাঃ) খিদমতে পেশ করলেন। তখন তিনি তার নিকট ইসলামের দাওয়াত দিলেন।। এই দাওয়াত পেয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতপর তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ। তারা আপনার মুকাবিলায় আসার সাহস করবে না। তারা তো আপনার নাম শুনেই ভেগে যাবে। তারা পাহাড়ে গিয়ে লুকাবে। আমি আপনার সঙ্গে যাবো এবং আপনাকে তাদের গুঢ় রহস্য বলবো।
রাসূলে পাক (সাঃ) সেই নওমুসলিম সাহাবীকে হযরত বেলালের হাওয়ালা করে দিলেন এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সাহাবীদেরকে অগ্রযাত্রার নির্দেশ দিলেন। সে সাহাবী এমন এক রাস্তা ধরলেন যে, তা পাহাড় থেকে বের হয়ে এক টিলার পাদদেশে গিয়ে দা'ছুরের সঙ্গীদের ওপর গিয়ে পৌঁছলো। বেদুঈনরা হুজুরের (সাঃ) আগমনের খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ আশেপাশের পাহাড়ে গিয়ে পালালো। হুজুর (সাঃ) তাদের কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলেন না। অথচ তারা উঁচু পাহাড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে মুসলমানদেরকে দেখছিলো।
রাসূলে আকরাম (সাঃ) জি আমর নামক স্থানে তাঁবু ফেললেন। সেখানে মুষলধারায় বৃষ্টিপাত ঘটলো। বৃষ্টির সময় নবী পাক (সাঃ) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দানের জন্য তাঁবু তেকে দূরে গিয়েছিলেন। বৃষ্টিতে তার শরীরের কাপড় ভিজে গিয়েছিল।
তিনি জি আমর উপত্যাকায় পর্দা দেখতে পেয়ে একস্থানে কাপড় খুললেন এবং তা শুকানোর জন্য একটি বৃক্ষের ওপর ছড়িয়ে দিলেন। তখন রোদ বের হয়েছিল। তিনি শুধুমাত্র লুঙ্গি পরেছিলেন এবং অবশিষ্ট কাপড় খুলে ফেলেছিলেন। কাপড় শুকানোর অপেক্ষায় তিনি বৃক্ষের নীচে বসেছিলেন। অতপর তিনি শুয়ে পড়লেন এবং চোখ বুজে এলো। এ সময় তিনি সম্পূর্ণ একাকী ছিলেন এবং বেদুঈন সৈন্য পাহাড়ের উঁচু থেকে তাঁকে দেখছিলো।
দা'ছুর বেদুঈনদের সরদার ছিল। তাকে তারা বাহাদুরও মনে করতো। এ সময় তারা তাকে বললো, "এখন সুবর্ণ সুযোগ। মুহাম্মদ সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সে এখন শুয়েও রয়েছে। এখান থেকে যদি সে নিজের সঙ্গীদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকও দেয় তাহলে কেউ তার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি যাও এবং তাকে খতম কর।"
দা'ছুর নিজের অনেকগুলো তরবারী থেকে সবচেয়ে ধারালো এবং চমকদার তরবারীটি বের করলো এবং পা টিপে টিকে পাহাড় থেকে অবতরণ করলো। সে হজুরের (সাঃ) মাথার উপর গিয়ে দাঁড়ালো এবং তরবারী হেলাতে হেলাতে বললো, "হে মুহাম্মদ! বলো আমার তরবারী থেকে তোমাকে আজ কে বাঁচাতে পারে?" রাসূলে পাক (সাঃ) চোখ খুললেন এবং অত্যন্ত ইতমিনানের সঙ্গে জবাব দিলেন, "আল্লাহ"।
রাবী বর্ণনা করেছেন যে, ঠিক সেই মুহূর্তে জিবরাইল (আ) দা'ছুরের বুকের ওপর দুটি ঘা মারলেন এবং তরবারী হাত থেকে পড়ে গেল। তারপর সেও মাটির ওপর পতিত হলো। হুজুর (সাঃ) তার তরবারী উঠালেন এবং তার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এখন তুমি বলো যে আজ তোমাকে কে বাঁচাতে পারে?”
সে জবাব দিল, "কেউ নয়।” অতপর তৎক্ষণাৎ কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন এবং বললেন, খোদার শপথ আমি আর কখনো আপনার বিরোধিতা করবো না ও সামরিক অভিযানের চেষ্টাও করবো না।"
রাসূলে করিম (সাঃ) তার তরবারী তাকে দিয়ে দিলেন। এ সময় তিনি ফিরে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলেন। কিন্তু আবার রাসূলের (সাঃ) দিকে মুখ ফিরে তাকালেন এবং বললেন, "খোদার কসম! আপনি আমার থেকে অনেক উত্তম এবং অনেক ভালো। আপনার আচরণ কত ভালো।” তিনি বললেন, 'আমার এই ধরনেরই হওয়া উচিত। এটাই আমার শান।" তার কওমের লোকজন সকল দৃশ্য অবলোকন করছিল। তিনি যখন ফিরলেন তখন তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কি হয়েছিল?” তিনি বললেন, খোদার শপথ। আশ্চর্য ধরনের ব্যাপার ঘটে গেল। আমি তরবারী উত্তোলন করতে চাচ্ছিলাম। ঠিক এমনি সময় আমার এবং তার মধ্যে এক লম্বা ও গৌর বর্ণের মানুষ হঠাৎ করে আড়াল হয়ে দাঁড়ালো। সে আমার বুকের ওপর দুটি ঘা মারলো এবং আমি চিৎ হয়ে পড়ে গেলাম। এ সময় আমার হাত থেকে তরবারী ছুটে গেল। আমি বুঝতে পেলাম যে সে ছিল একজন ফেরেশতা। সেই আমাকে মেরে ফেলে দিয়েছিল। সুতরাং আমি আর কালবিলম্ব না করে সাক্ষ্য দিলাম যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ একক ও শরীকহীন। আল্লাহর শপথ, এখন আর আমি তার বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চালাবো না। এরপর সে নিজের কওমের লোকদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতেন।
ওয়াকেদী আব্দুল্লাহ বিন আবু বকরের একটি রাওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর (রাঃ) বলেছেন, রাসূলে আকরাম (সাঃ) খবর পেলেন যে, বনু ছালাবা এবং বনু মাহারিব গোত্রের লোকজন তাঁর ওপর হামলা করার জন্য এক বিরাট বাহিনী একত্রিত করেছে। এই বাহিনী মদীনার চারদিক থেকে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। আছুর বিন হারিছ বিন মাহারিব নামক একজন সরদার এই বাহিনী মোতায়েন করেছিল। এই বেদুঈন সরদারের লকব গওরছ ছিল বলেও কথিত আছে।
এই পরিকল্পনার খবর পেয়ে রাসূলে আকরাম (সাঃ) মুসলমানদেরকে জিহাদের প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন এবং সাড়ে চারশ সাহাবীর একটি দলসহ মদীনা থেকে বের হলেন। এই যুদ্ধে তার সঙ্গে ঘোড় সওয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যোদ্ধাও ছিলেন। প্রথমত তিনি সাধারণ রাস্তা দিয়েই চলতে লাগলেন। অতপর তিনি পরিচিত রাস্তা ছেড়ে একটি অপ্রশস্ত পার্বত্য পথ ধরলেন। সেই পথ দিয়ে তিনি জিল কাসসাহ নামক স্থানে পৌঁছলেন। এখানে সাহাবীরা এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করলেন'। লোকটি বনু ছালাবার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল এবং তার নাম ছিল জাব্বার। সে কোথায় যাচ্ছে তা তারা তাকে জিজ্ঞেস করলো। জবাবে সে বললো, আমি ইয়াসরাবযাচ্ছি।
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, ইয়াসরাবে তার কি কাজ আছে সে বললো, আমি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে চাই।
তারা জিজ্ঞেস করলে- তুমি কি সৈন্য বাহিনী দেখেছ অথবা তোমার কওমের নতুন কোন খবর তোমার নিকট আছে কি?
সে বললো, আমার নিকট বিশেষ কোন তথ্য নেই। তবে, এতটুকু জানি যে দা'ছুর বিন হারিছ কিছু লোককে তৈরী করেছে।
সাহাবীবৃন্দ (রাঃ) সেইব্যক্তিকে হুজুরের (সাঃ) খিদমতে পেশ করলেন। তখন তিনি তার নিকট ইসলামের দাওয়াত দিলেন।। এই দাওয়াত পেয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতপর তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ। তারা আপনার মুকাবিলায় আসার সাহস করবে না। তারা তো আপনার নাম শুনেই ভেগে যাবে। তারা পাহাড়ে গিয়ে লুকাবে। আমি আপনার সঙ্গে যাবো এবং আপনাকে তাদের গুঢ় রহস্য বলবো।
রাসূলে পাক (সাঃ) সেই নওমুসলিম সাহাবীকে হযরত বেলালের হাওয়ালা করে দিলেন এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সাহাবীদেরকে অগ্রযাত্রার নির্দেশ দিলেন। সে সাহাবী এমন এক রাস্তা ধরলেন যে, তা পাহাড় থেকে বের হয়ে এক টিলার পাদদেশে গিয়ে দা'ছুরের সঙ্গীদের ওপর গিয়ে পৌঁছলো। বেদুঈনরা হুজুরের (সাঃ) আগমনের খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ আশেপাশের পাহাড়ে গিয়ে পালালো। হুজুর (সাঃ) তাদের কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলেন না। অথচ তারা উঁচু পাহাড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে মুসলমানদেরকে দেখছিলো।
রাসূলে আকরাম (সাঃ) জি আমর নামক স্থানে তাঁবু ফেললেন। সেখানে মুষলধারায় বৃষ্টিপাত ঘটলো। বৃষ্টির সময় নবী পাক (সাঃ) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দানের জন্য তাঁবু তেকে দূরে গিয়েছিলেন। বৃষ্টিতে তার শরীরের কাপড় ভিজে গিয়েছিল।
তিনি জি আমর উপত্যাকায় পর্দা দেখতে পেয়ে একস্থানে কাপড় খুললেন এবং তা শুকানোর জন্য একটি বৃক্ষের ওপর ছড়িয়ে দিলেন। তখন রোদ বের হয়েছিল। তিনি শুধুমাত্র লুঙ্গি পরেছিলেন এবং অবশিষ্ট কাপড় খুলে ফেলেছিলেন। কাপড় শুকানোর অপেক্ষায় তিনি বৃক্ষের নীচে বসেছিলেন। অতপর তিনি শুয়ে পড়লেন এবং চোখ বুজে এলো। এ সময় তিনি সম্পূর্ণ একাকী ছিলেন এবং বেদুঈন সৈন্য পাহাড়ের উঁচু থেকে তাঁকে দেখছিলো।
দা'ছুর বেদুঈনদের সরদার ছিল। তাকে তারা বাহাদুরও মনে করতো। এ সময় তারা তাকে বললো, "এখন সুবর্ণ সুযোগ। মুহাম্মদ সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সে এখন শুয়েও রয়েছে। এখান থেকে যদি সে নিজের সঙ্গীদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকও দেয় তাহলে কেউ তার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি যাও এবং তাকে খতম কর।"
দা'ছুর নিজের অনেকগুলো তরবারী থেকে সবচেয়ে ধারালো এবং চমকদার তরবারীটি বের করলো এবং পা টিপে টিকে পাহাড় থেকে অবতরণ করলো। সে হজুরের (সাঃ) মাথার উপর গিয়ে দাঁড়ালো এবং তরবারী হেলাতে হেলাতে বললো, "হে মুহাম্মদ! বলো আমার তরবারী থেকে তোমাকে আজ কে বাঁচাতে পারে?" রাসূলে পাক (সাঃ) চোখ খুললেন এবং অত্যন্ত ইতমিনানের সঙ্গে জবাব দিলেন, "আল্লাহ"।
রাবী বর্ণনা করেছেন যে, ঠিক সেই মুহূর্তে জিবরাইল (আ) দা'ছুরের বুকের ওপর দুটি ঘা মারলেন এবং তরবারী হাত থেকে পড়ে গেল। তারপর সেও মাটির ওপর পতিত হলো। হুজুর (সাঃ) তার তরবারী উঠালেন এবং তার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এখন তুমি বলো যে আজ তোমাকে কে বাঁচাতে পারে?”
সে জবাব দিল, "কেউ নয়।” অতপর তৎক্ষণাৎ কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন এবং বললেন, খোদার শপথ আমি আর কখনো আপনার বিরোধিতা করবো না ও সামরিক অভিযানের চেষ্টাও করবো না।"
রাসূলে করিম (সাঃ) তার তরবারী তাকে দিয়ে দিলেন। এ সময় তিনি ফিরে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলেন। কিন্তু আবার রাসূলের (সাঃ) দিকে মুখ ফিরে তাকালেন এবং বললেন, "খোদার কসম! আপনি আমার থেকে অনেক উত্তম এবং অনেক ভালো। আপনার আচরণ কত ভালো।” তিনি বললেন, 'আমার এই ধরনেরই হওয়া উচিত। এটাই আমার শান।" তার কওমের লোকজন সকল দৃশ্য অবলোকন করছিল। তিনি যখন ফিরলেন তখন তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কি হয়েছিল?” তিনি বললেন, খোদার শপথ। আশ্চর্য ধরনের ব্যাপার ঘটে গেল। আমি তরবারী উত্তোলন করতে চাচ্ছিলাম। ঠিক এমনি সময় আমার এবং তার মধ্যে এক লম্বা ও গৌর বর্ণের মানুষ হঠাৎ করে আড়াল হয়ে দাঁড়ালো। সে আমার বুকের ওপর দুটি ঘা মারলো এবং আমি চিৎ হয়ে পড়ে গেলাম। এ সময় আমার হাত থেকে তরবারী ছুটে গেল। আমি বুঝতে পেলাম যে সে ছিল একজন ফেরেশতা। সেই আমাকে মেরে ফেলে দিয়েছিল। সুতরাং আমি আর কালবিলম্ব না করে সাক্ষ্য দিলাম যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ একক ও শরীকহীন। আল্লাহর শপথ, এখন আর আমি তার বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চালাবো না। এরপর সে নিজের কওমের লোকদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতেন।
ওয়াকেদী আব্দুল্লাহ বিন আবু বকরের একটি রাওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর (রাঃ) বলেছেন, রাসূলে আকরাম (সাঃ) খবর পেলেন যে, বনু ছালাবা এবং বনু মাহারিব গোত্রের লোকজন তাঁর ওপর হামলা করার জন্য এক বিরাট বাহিনী একত্রিত করেছে। এই বাহিনী মদীনার চারদিক থেকে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। আছুর বিন হারিছ বিন মাহারিব নামক একজন সরদার এই বাহিনী মোতায়েন করেছিল। এই বেদুঈন সরদারের লকব গওরছ ছিল বলেও কথিত আছে।
এই পরিকল্পনার খবর পেয়ে রাসূলে আকরাম (সাঃ) মুসলমানদেরকে জিহাদের প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন এবং সাড়ে চারশ সাহাবীর একটি দলসহ মদীনা থেকে বের হলেন। এই যুদ্ধে তার সঙ্গে ঘোড় সওয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যোদ্ধাও ছিলেন। প্রথমত তিনি সাধারণ রাস্তা দিয়েই চলতে লাগলেন। অতপর তিনি পরিচিত রাস্তা ছেড়ে একটি অপ্রশস্ত পার্বত্য পথ ধরলেন। সেই পথ দিয়ে তিনি জিল কাসসাহ নামক স্থানে পৌঁছলেন। এখানে সাহাবীরা এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করলেন'। লোকটি বনু ছালাবার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল এবং তার নাম ছিল জাব্বার। সে কোথায় যাচ্ছে তা তারা তাকে জিজ্ঞেস করলো। জবাবে সে বললো, আমি ইয়াসরাবযাচ্ছি।
তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, ইয়াসরাবে তার কি কাজ আছে সে বললো, আমি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে চাই।
তারা জিজ্ঞেস করলে- তুমি কি সৈন্য বাহিনী দেখেছ অথবা তোমার কওমের নতুন কোন খবর তোমার নিকট আছে কি?
সে বললো, আমার নিকট বিশেষ কোন তথ্য নেই। তবে, এতটুকু জানি যে দা'ছুর বিন হারিছ কিছু লোককে তৈরী করেছে।
সাহাবীবৃন্দ (রাঃ) সেইব্যক্তিকে হুজুরের (সাঃ) খিদমতে পেশ করলেন। তখন তিনি তার নিকট ইসলামের দাওয়াত দিলেন।। এই দাওয়াত পেয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতপর তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ। তারা আপনার মুকাবিলায় আসার সাহস করবে না। তারা তো আপনার নাম শুনেই ভেগে যাবে। তারা পাহাড়ে গিয়ে লুকাবে। আমি আপনার সঙ্গে যাবো এবং আপনাকে তাদের গুঢ় রহস্য বলবো।
রাসূলে পাক (সাঃ) সেই নওমুসলিম সাহাবীকে হযরত বেলালের হাওয়ালা করে দিলেন এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সাহাবীদেরকে অগ্রযাত্রার নির্দেশ দিলেন। সে সাহাবী এমন এক রাস্তা ধরলেন যে, তা পাহাড় থেকে বের হয়ে এক টিলার পাদদেশে গিয়ে দা'ছুরের সঙ্গীদের ওপর গিয়ে পৌঁছলো। বেদুঈনরা হুজুরের (সাঃ) আগমনের খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ আশেপাশের পাহাড়ে গিয়ে পালালো। হুজুর (সাঃ) তাদের কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলেন না। অথচ তারা উঁচু পাহাড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে মুসলমানদেরকে দেখছিলো।
রাসূলে আকরাম (সাঃ) জি আমর নামক স্থানে তাঁবু ফেললেন। সেখানে মুষলধারায় বৃষ্টিপাত ঘটলো। বৃষ্টির সময় নবী পাক (সাঃ) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দানের জন্য তাঁবু তেকে দূরে গিয়েছিলেন। বৃষ্টিতে তার শরীরের কাপড় ভিজে গিয়েছিল।
তিনি জি আমর উপত্যাকায় পর্দা দেখতে পেয়ে একস্থানে কাপড় খুললেন এবং তা শুকানোর জন্য একটি বৃক্ষের ওপর ছড়িয়ে দিলেন। তখন রোদ বের হয়েছিল। তিনি শুধুমাত্র লুঙ্গি পরেছিলেন এবং অবশিষ্ট কাপড় খুলে ফেলেছিলেন। কাপড় শুকানোর অপেক্ষায় তিনি বৃক্ষের নীচে বসেছিলেন। অতপর তিনি শুয়ে পড়লেন এবং চোখ বুজে এলো। এ সময় তিনি সম্পূর্ণ একাকী ছিলেন এবং বেদুঈন সৈন্য পাহাড়ের উঁচু থেকে তাঁকে দেখছিলো।
দা'ছুর বেদুঈনদের সরদার ছিল। তাকে তারা বাহাদুরও মনে করতো। এ সময় তারা তাকে বললো, "এখন সুবর্ণ সুযোগ। মুহাম্মদ সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সে এখন শুয়েও রয়েছে। এখান থেকে যদি সে নিজের সঙ্গীদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকও দেয় তাহলে কেউ তার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি যাও এবং তাকে খতম কর।"
দা'ছুর নিজের অনেকগুলো তরবারী থেকে সবচেয়ে ধারালো এবং চমকদার তরবারীটি বের করলো এবং পা টিপে টিকে পাহাড় থেকে অবতরণ করলো। সে হজুরের (সাঃ) মাথার উপর গিয়ে দাঁড়ালো এবং তরবারী হেলাতে হেলাতে বললো, "হে মুহাম্মদ! বলো আমার তরবারী থেকে তোমাকে আজ কে বাঁচাতে পারে?" রাসূলে পাক (সাঃ) চোখ খুললেন এবং অত্যন্ত ইতমিনানের সঙ্গে জবাব দিলেন, "আল্লাহ"।
রাবী বর্ণনা করেছেন যে, ঠিক সেই মুহূর্তে জিবরাইল (আ) দা'ছুরের বুকের ওপর দুটি ঘা মারলেন এবং তরবারী হাত থেকে পড়ে গেল। তারপর সেও মাটির ওপর পতিত হলো। হুজুর (সাঃ) তার তরবারী উঠালেন এবং তার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এখন তুমি বলো যে আজ তোমাকে কে বাঁচাতে পারে?”
সে জবাব দিল, "কেউ নয়।” অতপর তৎক্ষণাৎ কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন এবং বললেন, খোদার শপথ আমি আর কখনো আপনার বিরোধিতা করবো না ও সামরিক অভিযানের চেষ্টাও করবো না।"
রাসূলে করিম (সাঃ) তার তরবারী তাকে দিয়ে দিলেন। এ সময় তিনি ফিরে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলেন। কিন্তু আবার রাসূলের (সাঃ) দিকে মুখ ফিরে তাকালেন এবং বললেন, "খোদার কসম! আপনি আমার থেকে অনেক উত্তম এবং অনেক ভালো। আপনার আচরণ কত ভালো।” তিনি বললেন, 'আমার এই ধরনেরই হওয়া উচিত। এটাই আমার শান।" তার কওমের লোকজন সকল দৃশ্য অবলোকন করছিল। তিনি যখন ফিরলেন তখন তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কি হয়েছিল?” তিনি বললেন, খোদার শপথ। আশ্চর্য ধরনের ব্যাপার ঘটে গেল। আমি তরবারী উত্তোলন করতে চাচ্ছিলাম। ঠিক এমনি সময় আমার এবং তার মধ্যে এক লম্বা ও গৌর বর্ণের মানুষ হঠাৎ করে আড়াল হয়ে দাঁড়ালো। সে আমার বুকের ওপর দুটি ঘা মারলো এবং আমি চিৎ হয়ে পড়ে গেলাম। এ সময় আমার হাত থেকে তরবারী ছুটে গেল। আমি বুঝতে পেলাম যে সে ছিল একজন ফেরেশতা। সেই আমাকে মেরে ফেলে দিয়েছিল। সুতরাং আমি আর কালবিলম্ব না করে সাক্ষ্য দিলাম যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ একক ও শরীকহীন। আল্লাহর শপথ, এখন আর আমি তার বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চালাবো না। এরপর সে নিজের কওমের লোকদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতেন।