📄 উম্মে ফুহাইরের বিয়ের গল্প
হাফেজ আবু ইয়ালা রাওয়ায়েত করেছেন, "আমার থেকে শায়বান, তাঁর থেকে মুহাম্মদ বিন যিয়াদুল বারজামি, তাঁর থেকে আবু তালাল এবং তাঁর থেকে হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। আনাস (রাঃ) বলতেন, "আমার মা আমাকে বলেছিলেন যে তাঁর একটি দুধের বকরী ছিল। তার দুধের ছানা উঠিয়ে তিনি ঘি বানিয়ে একটি পাত্রে রাখতেন। এক সময় সেই পাত্র ঘিতে পূর্ণ হয়ে গেল। তাঁর একজন কাজের মেয়ে ছিল। তিনি তাঁকে সেই ঘিয়ের পাত্র হুজুরে আকরামকে (সাঃ) দিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। যাতে তিনি তা দিয়ে রুটি খেতে পারেন।
মেয়েটি ঘিয়ের পাত্র নিয়ে নবী করিমের (সাঃ) নিকট হাজির হয়ে আরজ করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল। উম্মে সুলাইম এই ঘি প্রেরণ করেছেন।” সুতরাং নবী পাক (সাঃ) বাড়ীর লোকদেরকে ঘিয়ের পাত্র খালি করে তা মেয়েটিকে দিয়ে দিতে বললেন।"
তাঁরা পাত্র খালি করে দিয়ে দিলেন। মেয়েটি পাত্র নিয়ে এসে খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখলো। উম্মে সুলাইম কোন কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলেন "আমি কি তোমাকে ঘিয়ের পাত্র রাসূলকে (সাঃ) দিয়ে আসার নির্দেশ দিইনি?” জবাবে সে বললো, "হাঁ আমি ঘি দিয়ে এসেছি।” উম্মে সুলাইম বললেন, পাত্র থেকে তো ঘি ফোটায় ফোটায় পড়ছে।” মেয়েটি আরজ করলো, "আপনি রাসূলের (সাঃ) নিকট গিয়ে সত্যতা যাচাই করুন।"
উম্মে সুলাইম মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে নবীর (সাঃ) নিকট গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাস করলেন। তিনি বললেন, মেয়েটি ঘি দিয়ে গেছে। একথা শুনে উম্মে সুলাইম আরজ করলেন, "সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য ও হক দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন। পাত্রটি তো পূর্ণ রয়েছে এবং তা থেকে ফোটায় ফোটায় ঘি পড়ে যাচ্ছে।”
রাসূলে পাক (সাঃ) ইরশাদ করলেন, "উম্মে সুলাইম! আল্লাহ তায়ালা নিজের নবীকে (সাঃ) যেমন রিযক দিয়েছেন তেমনি তোমাকেও নিজের রহমতের মাধ্যমে রিযক প্রদান করেছেন। তাতে কি তুমি বিস্মিত হয়েছো? খাও, পান কর এবং শুকর আদায়কর।"
• উম্মে সুলাইম বলতেন, "আমরা সেই পাত্র থেকে অমুকের অমুকের বাড়ীতে পেয়ালা ভরে ঘি প্রেরণ করলাম এবং আমরা নিজেরা অবশিষ্ট ঘি দিয়ে দুই মাস রুটি খেলাম।"
📄 ওয়াফসাহ (রাঃ) আসাদীর ঘটনা
ইমাম আহমদ (রঃ) বিন হাম্বল বর্ণনা করেছেন, "আমার থেকে আফফান, তাঁর থেকে হাম্মাদ বিন সালমা তাঁর থেকে যোবায়ের বিন আব্দুস সালাম এবং তাঁর থেকে আইয়ুব বিন আব্দুল্লাহ বিন মাকরায বর্ননা করেছেন। আইয়ুব বলতেন যে ওয়াবিসাহ আসদীর সঙ্গী এই ঘটনা ওয়াবিসার (রাঃ) মুখে শুনাতেন। ওয়াবিসা (রাঃ) বলতেন, "আমি রাসূলের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলাম। আসার পূর্বেই আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম যে, নবীর (সাঃ) নিকট নেকী ও বদি সম্পর্কে সকল প্রশ্ন করবো। যাতে কোন নেক কাজ আমার নিকট গোপন না থাকে এবং কোন খারাব কাজ সম্পর্কে আমি অনবহিত না থাকি। আমি যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন রাসূলের (সাঃ) চারপাশে মুসলমানদের একটি দল বসেছিলেন। তারা রাসূলের (সাঃ) নিকট প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছিলেন। আমি লোকদের মাথার ওপর দিয়ে আগে যেতে চাচ্ছিলাম। লোকেরা আমাকে বললো যে, এভাবে মাথার ওপর দিয়ে লাফ দিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। আমি বললাম, "আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে রাস্তা দাও। আমি রাসূলে করিমের (সাঃ) নিকট যেতে চাই। তিনি আমার নিকট দুনিয়ার সকল মানুষের চেয়ে বেশী প্রিয়।"
নবী পাক (সাঃ) অত্যন্ত স্নেহ ও ভালোবাসার সঙ্গে বললেন, "ওয়াবিসাকে ছেড়ে দাও, ওয়াবিসা আমার নিকট এসো।” তিনি একথা দুই তিনবার বললেন। লোকজন আমার রাস্তা ছেড়ে দিলো এবং আমি নবীর (সাঃ) সম্পূর্ণ সামনে গিয়ে বসলাম। তিনি বললেন, "তুমি কি নিজে জিজ্ঞেস করবে অথবা আমি বলবো যে তুমি কোন উদ্দেশ্যেএসেছ?"
আমি আরজ করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনিই বলে দিন।”
তিনি বললেন, "তুমি নেকী ও বদী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছ?”
আমি আরজ করলাম, 'জ্বী, হ্যাঁ।”
তারপর নবী করিম (সাঃ) নিজের আঙ্গুলগুলো একত্রিত করে আমার বুকের ওপর চেপে ধরলেনএবং তিনবার এরশাদ করলেন, "হে ওয়াবিসা। নিজের দিল ও নফসের নিকট জিজ্ঞাসা করো। নেকী তাকে বলে যাতে তোমার অন্তর মুতমায়েন হয়। আর বদী হলো তা যা তোমার দিলে খটকা ও সন্দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করে। এই মৌলনীতি সব সময় সামনে রাখবে। যদিও মানুষ এ ব্যাপারে ফতওয়া দিতে থাকবে।"
📄 তায়ামূল আযাযাব
আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে তাঁর থেকে মুহাম্মদ বিন আলা, তাঁর থেকে ইবনে ইদরিস তাঁর থেকে আছেম বিন কুলাইব, তাঁর থেকে তাঁর পিতা এবং তাঁর থেকে একজন আনসারী সাহাবী বর্ণনা করেছেন, "আমরা রাসূলের (সাঃ) সঙ্গে এক জানাযার নামাজের জন্য বের হলাম। আমি রাসূলকে (সাঃ) দেখলাম যে তিনি কবরের কিনারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এবং কবর খোদাইকারীদেরকে বলছিলেন, "পায়ের দিকে আরো খোঁড়ো এবং মাথার দিকেও আরো একটু প্রশস্ত কর।"
জানাযাহ এবং দাফনের পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনা ফিরে এলেন। এ সময় একজন মহিলার দূত তাঁর পক্ষ থেকে হুজুরকে (সাঃ) খাওয়ার দাওয়াত দিলো। তিনি তার সঙ্গে তাশরীফ নিলেন। তাঁর সামনে খাবার পেশ করা হলো। তিনি খাবারের মধ্যে হাত রাখলেন এবং উপস্থিত অন্যান্য সকলেও হাত বাড়ালেন। লোকজন খেতে লাগলেন। এ সময় আমাদের বুজুর্গরা দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এক লোকমা মুখে দিয়ে তা মুখের মধ্যে ঘোরাচ্ছেন ফিরাচ্ছেন। তারপর বললেন, "আমি অনুভব করছি যে মালিকের অনুমতি ছাড়াই এই বকরীর গোশত রান্না করা হয়েছে।"
সেই মহিলা একথা শুনে বলে পাঠালেন, "হে আল্লাহর রাসূল। আমি জনৈক প্রতিবেশীকে একটি বকরী ক্রয়ের জন্য বাকীতে প্রেরণ করেছিলাম। কিন্তু সে বকরী পায়নি। অতঃপর আমি প্রতিবেশীটির নিকট আমার প্রদত্ত অর্থ ফেরত চেয়ে পাঠালাম। কিন্তু সেসময় সে বাড়ী ছিল না। আমি তার স্ত্রীর নিকট অর্থ দাবী করলাম। তখন সে এই বকরী পাঠিয়ে দিয়েছিল। প্রতিবেশী বকরীটি নিজের জন্য ক্রয় করেছিল।" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "এই গোশত কয়েদীদের খাইয়ে দাও।"
📄 ছুয়াদ বিন আব্দুল্লাহ আল ইয়াফির মদীনা আগমন
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, "ছুরাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-ইযদি এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে হুজুরে পাকের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলেন এবং ইসলাম কবুল করলেন। নবী পাক (সাঃ) হযরত ছুরাদকে তার কওমের مسلمانوں আমীর নিয়োগ করলেন এবং বললেন যে ইয়েমেনের গোত্রসমূহের চারপাশের ও পার্শ্ববর্তী মুশরিক গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে নিজের কবিলা এবং অন্যান্য আশপাশের মুসলমানের সঙ্গে মিলে জিহাদ করো।
ছুরাদ বিন আব্দুল্লাহ রাসূলে পাকের (সাঃ) নির্দেশ অনুযায়ী বের হলেন এবং ইয়েমেনের জারাশ এলাকায় গিয়ে পৌঁছলেন। সে যুগে জারাশ একটি বদ্ধ শহর ছিল। শহরটির চারপাশে প্রাচীর দেওয়া ছিল। তাতে ইয়েমেনের কতিপয় গোত্র বাস করতো এবং বনু খাছায়াম গোত্রের কিছু মানুষও তাদের নিকট আশ্রয় নিয়েছিল। তারা মুসলমানদের আগমনের খবর পেয়ে ইয়েমেনীদের সঙ্গে দূর্গে আবদ্ধ হয়ে গেল।
হযরত ছুরাদ এবং তার সঙ্গীরা তাদেরকে এক মাস অবরোধ করে রাখলো কিন্তু দুর্গ কবজা করা গেল না। হযরত ছুরাদ অবশেষে অবরোধ উঠিয়ে নিলেন এবং স্থান ত্যাগ করে চলে গেলেন। অবরুদ্ধরা ধারনা করলো যে হামলাকারীরা পরাজিত হয়ে চলে গেছে। সুতরাং তারা দুর্গ থেকে বের হয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করতে চাইলো। হযরত ছুরাদ যখন শাকার নামক পাহাড়ের নিকট পৌঁছলেন তখন জারাশ বাসীরা তার ওপর হামলা করে বসলো। হযরত ছুরাদ পিছু ফিরে এমনভাবে সেই হামলার জবাব দিলেন যে দুশমনরা গাজর কাটা হয়ে গেল। ব্যাপক সংখ্যায় তরা নিহত হলো।
তার পূর্বে জারাশবাসী পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য মদীনায় দুজন প্রতিনিধি প্রেরণ করেছিল। প্রতিনিধিদ্বয়কে তারা এই বলে পাঠিয়েছিল যে তারা মদীনার শাসককে কেমন পেয়েছিল তা ফিরে এসে তাদেরকে জানাবে। এই দুই ব্যক্তি নবী পাকের (সাঃ) নিকট বসেছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, "শাকার কোন দেশে এবং এলাকায় অবস্থিত?" 'তারা জবাব দিল, "হে আল্লাহর রাসূল। আমাদের এলাকায় একটি পাহাড় আছে। তাকে কাশার বলে।” (জারাশবাসী শাকারকে কাশারই বলে থাকতো) তিনি বললেন, "এটা কাশার নয় শাকার।” তারা জিজ্ঞেস করলো, কেন? কোন বিশেষ কথা আছে কি?" তিনি বললেন, "এ মুহূর্তে সেই পাহাড়ের উপর কুরবানীর পশু জবেহ হচ্ছে।”
আসরের নামাযের পর এই আলোচনা হলো। এ কথা শুনে তারা দু'জন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) অথবা হযরত ওসমান গণির (রাঃ) নিকট গেল। এ সময় তারা (আবু বকর (রাঃ) অথবা ওসমান (রাঃ)) তাদেরকে বললেন, "তোমাদের ধ্বংস হোক। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমাদেরকে তোমাদের কওমের কতলে আমের খবর দিয়েছেন। তোমরা উঠে দাঁড়াও এবং হুজুরের (সাঃ) খিদমতে গিয়ে আরজ করো যে, তিনি যেন তোমাদের কওমের পক্ষে দোয়া করেন। যাতে তাদের ওপর থেকে এই আজাব বা শাস্তি দূর হয়। এ কথা শুনে তারা কাল বিলম্ব না করে রাসূলে পাকের (সাঃ) নিকট উপস্থিত হল এবং দোয়ার আবেদন জানাল। রাসূলে পাক (সাঃ) দোয়া করলেনঃ "হে আল্লাহ! তাদের কওমের ওপর থেকে মুসিবত দূর করো।"
সে সময়ই তারা রাসুলে পাকের (সাঃ) নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে স্বগৃহে রওয়ানা হল। সেখানে পৌঁছে তারা খবর পেল যে, সেই দিন এবং সেই সময় তাদেরকে ছুরাদ বিন আব্দুল্লাহ যুদ্ধে ধরাশায়ী করে ফেলেন এবং যারা জীবিত ছিল তারা পালিয়ে জীবন রক্ষা করে।