📄 বারিদের মক্কা
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, "আদি বিন হাতেম তাই সম্পর্কে আমি যেসব বর্ণনা পেয়েছি তা থেকে জানা যায় যে, সে রসুলকে (সাঃ) চরমভাবে ঘৃণা করতো। তার বর্ণনা হলো, "আমি খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলাম এবং আমি নিজেই কবিলার সরদার ছিলাম। আমার মর্যাদা ছিল বাদশাহ এবং শাসকদের মত। বনু তাই থেকে এক চতুর্থাংশ গনিমতের মাল পেতাম। তা দিয়েই জীবিকা চলতো। আমি আমার ধর্মকে সত্য ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করতাম এবং নিজের শাসনের ওপর খুব গর্ব ছিল। আমার আর কোন ধরনের চিন্তা-ভাবনা ছিল না।
সময় অতিবাহিত হতে লাগলো। এ অবস্থায় কেউ আমাকে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ সম্পর্কে বললো, তার কথা শুনতেই তাঁর সম্পর্কে আমার চরম ঘৃণা অনুভব হলো। মদীনা থেকে যখন তার সেনা বাহিনী আশে পাশে যেতে লাগলো তখন আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আমি আমার এক আরবী গোলামকে বললাম, "তোমার কল্যাণ হোক। আমার জন্য মোটা তাজা দ্রুতগামী একদল উট তৈরী রেখো। যখন মুহাম্মদের (সাঃ) বাহিনীর খবর পাবে তখনই অবিলম্বে আমাকে খবর দেবে।” আমার এই গোলাম আমার উটের রাখাল ছিল।
আমার নির্দেশ অনুযায়ী সে উট প্রস্তুত করেছিল। একদিন খুব প্রত্যুষে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে দৌড়াতে সে আমার কাছে এলো এবং বললো, "মুহাম্মদের (সাঃ) বাহিনীর আগমনে তুমি কিছু করতে চেয়েছিলে। যাহোক, সেই বাহিনীতো এসে গেছে। আমি দূর থেকে কিছু ঝান্ডা দেখলাম। আমি সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে জনৈক ব্যক্তি বললো এরা হলো মুহাম্মদের (সাঃ) বাহিনী। এখন যা করার তা কর।”
আদি আরো উল্লেখ করেন, "আমি গোলামকে খুব তাড়াতাড়ি আমার উট হাজির করার কথা বললাম। উট এলে আমি অত্যাবশ্যকীয় সামান নিলাম এবং পরিবার- পরিজনকে উটের ওপর বসালাম এবং সিরিয়ার দিকে রওয়ানা দিলাম। আমি ধারণা করেছিলাম যে, সিরিয়ায় আমার স্বধর্মীদের শাসন রয়েছে। তাদের সঙ্গে মিলিত হবো। এ ব্যস্ততায় আমার বোন সাফানাহ বিনতে হাতেমকে ফেলে রেখে এসেছিলাম। রওয়ানার সময় সে কোথাও কোন জরুরী কাজে গিয়েছিল। আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবস্থায় বোনকে রেখে সিরিয়ায় চলে যাই।
রাসূলের (সাঃ) বাহিনী বনু তাইকে পরাজিত করে এবং তাদের সম্পদ ও গবাদি পশু হস্তগত করে। অনেক মহিলা ও শিশুকে কয়েদী বানিয়ে নেয়। অধিকাংশ পুরুষই যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যায়। কয়েদীদেরকে মদীনা নেয়া হলো। হজুরে আকরাম (সাঃ) আমার সিরিয়ার দিকে পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছিলেন। বন্ তাইয়ের কয়েদীদেরকে মসজিদের নিকট একটি কম্পাউণ্ডে রাখা হলো। আমার বোনও তাদের সঙ্গে কয়েদ ছিল। একদিন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সেখান দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। সে সময় আমার বোন দাঁড়িয়ে গেল। সে বললো, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা মারা গেছেন। আমার ওপর ইহসান করুন এবং আল্লাহও আপনার ওপর ইহসান করবেন।" তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার অভিভাবক কে?” সে জবাব দিল, "আদি বিন হাতেম।" রাসুলে পাক (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, "সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তার রাসুল (সাঃ) থেকে দূরে পালিয়ে যায়?” এ কথা বলে তিনি চলে গেলেন। দ্বিতীয় দিন পুনরায় নবী পাক (সাঃ) কয়েদীদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। সেদিনও বিনতে হাতেম তাঁর নিকট একই আবেদন জানালো। তিনিও পূর্বেকার জবাবেরই পুনরুল্লেখ করলেন। বিনতে হাতেম বলেন, "তৃতীয় দিনে যখন তিনি কয়েদীদের নিকট এলেন তখন আমি নিরাশ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু হুজুরের (সাঃ) পেছনে পেছনে এক ব্যক্তি আসছিল। সে ইঙ্গিতে আমার ব্যাপার পেশ করার কথা জানালো। বস্তুতঃ আমি সাহস পেয়ে উঠে দাঁড়ালাম এবং আমার নিবেদনের কথা পুনরুল্লেখ করলাম। আমার নিবেদন শুনে তিনি বললেন, "আমি তোমার ওপর ইহসান করেছি এবং তোমাকে আযাদি দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তাড়াহুড়ো করো না। এখানে অপেক্ষা করো। তোমার কওমের কোন বিশ্বস্ত ব্যক্তি অথবা কাফেলা এদিক দিয়ে গেলে তাদের সঙ্গে চলে যাবে। যাওয়ার পূর্বে আমাকে খবর দেবে।” যে ব্যক্তি আমাকে নেক পরামর্শ দিয়েছিলেন তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে লোকেরা আমাকে বললো যে, তিনি হলেন আলী ইবনে তালিব। রাসুলুল্লাহর (সাঃ) চাচাতোভাই। আমি যাতায়াতকারী একটি কাফেলার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম। অবশেষে বিলি অথবা কাজায়াহ কবিলার কাফেলা এলো। তারা সিরিয়া যাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল। আমি আমার ভাইয়ের নিকট সিরিয়া গমন করতে চাইছিলাম। আমি রাসুলকে (সাঃ) খবর দিলাম। তিনি আমাকে কাপড় দিলেন। সওয়ারী দিলেন এবং রাহাখরচ দিয়ে খুব মান ইজ্জতের সঙ্গে বিদায় করলেন। আমি সেই কাফেলার সঙ্গে চলে গেলাম। আদী বলেন, "খোদার কসম! আমি আমার পরিবার পরিজনসহ সিরিয়া অবস্থান করছিলাম। কিন্তু খুব পেরেশান ছিলাম। বোনের জন্য শুধু চিন্তা করতাম। তার যে কি হচ্ছে এ চিন্তাই আমাকে পেয়ে বসেছিল। একদিন আমি বাড়ীর সকলের সঙ্গে বসেছিলাম। এমন সময় সামনে একটি কাফেলা পরিদৃষ্ট হলো। একটি উটের ওপর কোন পর্দানশীন মহিলা সওয়ার ছিলেন। সে কাফেলা আমাদের দিকেই আসছিল। আমি মনে মনে বললাম হাতেমের কন্যা আসছে। পৌঁছলে দেখা গেল সেই।”
পৌঁছেই সে আমাকে গালাগাল শুরু করে দিল। "আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্নকারী জালেম। তুমি নিজের বালবাচ্চাদেরকে নিজের সঙ্গে সওয়ার করিয়ে পালিয়ে এসেছ এবং নিজের পিতার কন্যা এবং তার ইজ্জতকে ফেলে রেখে এসেছ।”
আমি স্বয়ং লজ্জিত ছিলাম। আমি বললাম, "আমার প্রিয় বোন, তুমি ঠিকই বলেছ। আমি কোন ওজর পেশ করছি না। আমাকে মাফ করে দাও এবং কোন বদ দোয়াকরোনা।"
অতপর সে সওয়ারী থেকে নামলো এবং আমার নিকটই থাকা শুরু করলো। সে খুব বুদ্ধিমতি মহিলা ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, "তুমি সেই ব্যক্তিকে (মোহাম্মদ সাঃ) কেমন পেয়েছ? এবং তাঁর সম্পর্কে তোমার মত কি?
জবাবে সে বললো, "আমার মত হলো তুমি অবিলম্বে তার খিদমতে হাজির হও। যদি সে আল্লাহর নবী (সাঃ) হয়ে থাকে তাহলে তার নিকট দ্রুত গমন করা ফজিলতের ব্যাপার। আর যদি সে বাদশাহ হয়ে থাকে তাহলে সে লোকদেরকে সম্মান করতে জানে। সেখানে মর্যাদাবানদেরকে বেইজ্জত করা হয় না এবং তোমার মান মর্যাদা তো স্পষ্ট ব্যাপার।”
আমি তার মতকে সঠিক মনে করলাম এবং স্বেচ্ছায় মদীনার দিকে রওয়ানা দিলাম। মদীনায় পৌঁছে দেখলাম যে হুজুরে পাক (সাঃ) নিজের মসজিদে তাশরীফ নিয়েছেন। আমি সালাম করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? আমি আরজ করলাম, "আদি বিন হাতেম তাই।" তিনি আমাকে উষ্ণভাবে অভ্যর্থনা জানালেন এবং আমাকে স্বগৃহে নিয়ে গেলেন। গৃহে যাওয়ার সময় এক দুর্বল বৃদ্ধা তাঁর পথ রোধ করে দাঁড়ালো। তিনি দীর্ধক্ষণ তাঁর কথা শুনলেন এবং সে নিজের সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা বলতে লাগলো।
আমি মনে মনে বললাম, "খোদার কসম, এই ব্যক্তি বাদশাহ হতে পারেন না।' বৃদ্ধার সঙ্গে কথা শেষ করে তিনি আমাকে বাড়ী নিয়ে গেলেন। ছোট একটি ঘরে তিনি আমার দিকে একটি বসার গদি এগিয়ে দিলেন। গদিটি ছিল খেজুর পাতায় ভর্তি একটি চামড়ার গদি। আমাকে বললেন, "এর ওপর বসো।" আমি আরজ করলাম, "না, আপনি তার ওপর তাশরীফ রাখুন।” কিন্তু তিনি হুকুম দিলেন, "না, তুমি এর ওপর বসো।” আমি গদির ওপর বসলাম। অথচ রাসূলে মকবুল (সাঃ) মাটির ওপর তাশরীফ রাখলেন। এ সময় আমি অন্তরে অন্তরে বললাম, "খোদার কসম! এ ধরনের ব্যবহার তো কোন বাদশাহ করতে পারে না।।"
তারপর তিনি আমাকে বললেন, "হে আদি বিন হাতেম। তুমি কি রাকুসী গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নও?” (রাক্সী একটি ধর্মীয় দল। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রসম ইহুদী ও খৃস্টানদের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল) আমি আরজ করলাম, "জ্বী হা, আমি রাকুসী।” তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, "তুমি কি নিজের কওমের নিকট থেকে গনিমতের মালের চতুর্থাংশ আদায় করতে না?" আমি জবাব দিলাম, "জ্বী হাঁ।” তিনি বললেন, "এই আদায় তোমাদের দীন অনুযায়ী হালালও ছিল না।” আমি স্বীকার করলাম যে, হুজুরের (সাঃ) ফরমান সঠিক।
এতক্ষণে আমি ভালোভাবেই জেনে ফেললাম যে তিনি আল্লাহর বরহক রাসুল (সাঃ)। যেসকল কথা আরবরা অবশ্যই জানতো না তা তিনি খুব ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। অতপর তিনি আমাকে একটি প্রশ্ন করলেন। বললেন, হে আদি। সম্ভবতঃ তুমি একটি কারণে দীন ইসলাম গ্রহন করছো না। কারণটি হলো مسلمانوں অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই দুর্বল। খোদার কসম। ধন সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে সকলে হবেন দাতা। কোন গ্রহীতা পাওয়া যাবে না। সম্ভবতঃ তুমি এ ব্যাপারেও পেরেশান রয়েছো যে, এরা তো সংখ্যায় খুবই কম এবং সমগ্র দুনিয়া তাদের দুশমন। খোদার কসম। এই দীনের বিজয় এমন হবে যা তুমি শুনবে এবং দেখবে যে একজন মহিলা অলংকার সজ্জিত অবস্থায় একাকী নিজের উটের ওপর কাদেসিয়া থেকে সওয়ার হবেন এবং বাইতুল্লাহর হজ্বের জন্য মক্কা সফর করবেন। তিনি কোন ধরনের ভয়ে ভীত হবেন না। হে আদি। সম্ভবতঃ তুমি ভেবে থাকবে যে দুনিয়ায় অনেক বাদশাহ এবং সুলতান রয়েছেন। অথচ মুসলমানদের মধ্যে কোন তাজদার বা রাজা বাদশাহ নেই। খোদার কসম। তুমি শুনবে যে বাবিলের সাদা মহল সমূহ তাদের হাতে বিজয় লাভ করবে।”
আদি বলেন, "একথা শুনে আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।”
তিনি বলতেন, "আমি দুটি জিনিসতো স্বচক্ষে দেখেছি। বাবিলের মহলসমূহও বিজিত হয়েছে এবং কাদেসিয়া থেকে একাকী সফরকারী মহিলাকেও আমি দেখেছি। আমি খোদার কসম খেয়ে বলছি যে, তৃতীয় ব্যাপারটিও অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং দান সাদকা গ্রহণের মত কেউ থাকবেনা।"
📄 নাযেলার দাঁত
আবু ওমর বর্ণনা করেছেন "নাবেগা জা'দী হুজুরে আকরামের (সাঃ) খিদমতে হাজির হয়ে একটি কাসিদাহ পড়লেন। নবী করীম (সাঃ) এজন্য তাকে দোয়া করলেন। সে কাসিদাহর প্রথার চরণ হলোঃ
اتيت رسول الله اذ جاء بالهدى ويتلوا كتاباً كالمجرة نيرا
"আল্লাহর রাসূল (সাঃ) হেদায়াতসহ যখন দুনিয়ায় তাশরীফ আনলেন তখন আমি তাঁর খিদমতে হাজির হলাম। তিনি মানবতার হেদায়াত বা পথ প্রদর্শনের কাজ করতেন এবং কিতাব তিলাওয়াত করতেন। যার আয়াত ছায়াপথের নক্ষত্রপুঞ্জের মত চমকদার এবং আলকোজ্জল।"
হাসান বিন আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি কোন ব্যক্তির নিকট থেকে শুনেছেন যে নাবেগার রাসূলেরর (সাঃ) দরবারে হাজির হওয়ার ঘটনা নাবেগা স্বয়ং বর্ণনা করতেন। নাবেগা বলেছেন, "আমি হুজুরে পাকের (সাঃ) যিয়ারত লাভ করলাম। এ সময় আমি এই কবিতা পাঠ করলাম :
"আমরা সেই কওমের সুপুত্র যারা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। আমাদের অশ্বারোহী সেই সময় পর্যন্ত যুদ্ধ থেকে ফিরে আসে না যতক্ষণ যুদ্ধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না হয়। তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শণ কাকে বলে তা জানেই না।"
"হতবুদ্ধি হওয়ার সময় (প্রচন্ড যুদ্ধের সময়) আমরা শত্রুকে ব্যাপক আকারে নিধন করি এবং রক্তের নদী বইয়ে দিয়ে থাকি। এই সময় আমাদের ঘোড়ার রং চেনা খুব মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। কালো বর্ণের ঘোড়া লাল হয়ে যায়।”
"যুদ্ধের ময়দান থেকে সাফ-সুতরা এবং সহিহ সালামত অবস্থায় আমাদের ঘোড়া ফিরে আসার কোন রীতিই নাই। বরং প্রয়োজনের সময় আমরা তাদের কুঁচও কেটে ফেলে থাকি এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে অটল থেকে দুশমনদেরকে সাফ করে ফেলি।"
"আমরা নিজদের সুস্পষ্ট কার্যাবলীর কারণে আসমান সদৃশ খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছি এবং আমাদের নসব এত উঁচু এবং কলংকহীন যে অত্যন্ত সম্মান ও ইজ্জতের সঙ্গে আমাদের দাদাদেরকে স্মরণ করা হয়। এসব কিছু সত্ত্বেও আমরা তার থেকেও বুলন্দ মর্যাদার আকাঙ্খা করি।"
একথা শুনে নবী করীম (সাঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আবু লায়লা। তা থেকে উঁচু কি মর্যাদার আকাংখা করে থাকো?” আমি আরজ করলাম, "জান্নাত।” তিনি বললেন, "অবশ্যই, ইনশাল্লাহ।”
নাবেগা বললেন, অতপর আমি হজুরকে (সাঃ) এই কবিতা শুনালামঃ "যে ভদ্রতা বা নম্রতার সঙ্গে বীরত্বের সংশ্লিষ্টতা নেই, তা আবার কোন কাজের। তাকে তো ভীরু বলাই যথার্থ। ভদ্রতা ও নম্রতার সঙ্গে বাহাদুরী থাকতে হবে। যাতে হাওজের পরিস্কার পানি ঘোলাকারীদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া যায়।”
"আবার এমন বাহাদুরী বা বীরত্ব যার সঙ্গে ভদ্রতা ও নম্রতার সংমিশ্রণ থাকে না তাতো জাহেলী বা অজ্ঞতার নামান্তর। বীরত্বের সীলমোহর অংকিত করার পর ক্ষমা ও নম্রতা দিয়ে অন্তরকে জয় করতে হবে।”
হুজুরে পাক (সাঃ) এই কবিতা শুনে বললেন, "আল্লাহ তোমার দাঁতকে সব সময়ের জন্য মাহফুজ ও মজবুত রাখুন।"
হাসান বলেন, নাবেগা জা'দীর দাঁত সকলের চেয়ে বেশী খুবসুরত ছিল। তিনি মুখ খুললেই বিদ্যুতের মত চমকে সাদা দাঁত দৃষ্টি গোচর হতো। তাঁর কোন দাঁত পড়েনি এবং দুর্বলও হয়নি। এটা ছিল রাসুলে করিমের (সাঃ) দোয়ার তাছির। নাবেগা একশ বারো বছর জীবিত ছিলেন এবং তার দাঁত আমৃত্যু সম্পূর্ণ ঠিক ছিল।
📄 ছা’লাবার জন্য আফসোস
ইবনে আবি হাতিম হাদীস বর্ননা করেছেন। হাদিসটির রাবি হলেন মায়ান বিন রিফায়াহ। তিনি আলী বিন ইয়াযিদ থেকে তিনি আবু আব্দুর রহমান কাসিম বিন আব্দুর রহমান থেকে তিনি আব্দুর রহমান বিন ইয়াদিন বিন মাবিয়া থেকে এবং তিনি আবু উমামাল বাহেলী থেকে বর্ননা করেছেন। ছা'লাবা বিন হাতিব আনসারী রাসূলের (সাঃ) নিকট আরজ করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! দোয়া করুন যাতে আল্লাহ তায়ালা আমাকে ধন-সম্পদে পূর্ণ করে দেন"।
রাসূলে পাক (সাঃ) ইরশাদ করলেন "ছা'লাবা তোমার জন্য আফসোস! (তুমি আল্লাহর নবীর নিকট এমন দাবী পেশ করেছ যা খুবই নগন্য ব্যাপার) যে অল্প সম্পদের তুমি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পারো তা সেই বেশী সম্পদ থেকে উত্তম যার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের শক্তি তুমি রাখো না।”
সে সময় ছা'লাবা চলে গেল। কিন্তু কিছু দিন পর পুনরায় আরজ করলো, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য ধন সম্পদের দোয়া করুন।” তিনি তাকে বুঝালেন এবং বললেন, "আল্লাহর নবী যেভাবে জীবন অতিবাহিত করেন সে ব্যাপারে কি তুমি সন্তুষ্ট নও। সেই সত্তার শপথ যার কবজাতে আমার জীবন রয়েছে। আমি চাইলে এই সব পাহাড় সোনা ও রূপার হয়ে যেত এবং আমার সঙ্গে সঙ্গে চলতো।
হা'লাবা বললো, " সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে হক রাসূল বানিয়ে প্রেরণ করেছন। আমার যদি প্রচুর ধন সম্পদ হয় তাহলে আমি হকদারের হক ভালোভাবে আদায়করবো।”
তার বার বার পীড়াপীড়ির কারণে হুজুরে আকরাম (সাঃ) দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ।" ছা'লাবাকে ধনসম্পদ দান কর। ছা'লাবার কিছু বকরী ছিল। বর্ষা মওসুমে কীট পতঙ্গের যেমন বৃদ্ধি ঘটে তেমনি তা বাড়তে লাগলো। মদীনা তারজন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল। সে মদীনার বাইরে এক উপত্যকায় চলে গেল। এ সময় সে জোহর ও আসরের নামাজ মসজিদে নববীতে এসে আদায় করতো। কিন্তু অন্য নামাজ জামায়াত ছাড়া বকরীদের পাশে একাকী আদায় করতে লাগলো।
অব্যাহতভাবে বকরীর সংখ্যা বেড়ে চললো। তখন সেই উপত্যাকাণ্ড সংকীর্ণ হয়ে পড়লো। ছা'লাবা তার আগে অন্য এক ময়দানে চলে গেল। অতপর সকল নামাজ জামায়াত ছাড়াই পড়তে লাগলো। শুধুমাত্র জুময়ার দিন জুময়ার নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে অসতো। বকরীর সংখ্যা আরো বেড়ে গেল। এ সময় সেই ময়দানেরও আগে খোলা এলাকাতে চলে গেল।
তারপর জুময়ার নামাজ পড়াও শেষ হলো। কাফেলার নিকট মদীনার হালহকিকত জিজ্ঞাসা করেই শেষ করতো। এই সব কাফেলা জুময়ার নামাজ আদায় করে স্ব স্ব গ্রামে ফিরে যেতো।
এক দিন রাসূলে পাক (সাঃ) লোকদের নিকট ছা'লাবার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তাঁকে বলা হলো যে তার বকরীর সংখ্যা খুবই বেড়ে গেছে এবং সে মদীনা থেকে দূরে চলে গেছে। তিনি বললেন," হে ছা'লাবা তোমার জন্য আফসোস, "হে ছা'লাবা তোমার জন্য আফসোস, হে ছা'লাবা তোমার জন্য আফসোস।"
যখন যাকাত ফরজ হওয়া সম্পর্কিত ........ خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً
সূরায়ে তওবায় ১০ নম্বর আয়াত নাযিল হলো তখন হুজুরে পাক (সাঃ) যাকাত আদায়কারীদেরকে বিভিন্ন এলাকার প্রেরণ করলেন এবং যাকাত আদায় সম্পর্কিত যাবতীয় নির্দেশাবলী লিখিয়ে তাদেরকে দিয়ে দিলেন। সেই এলাকায় তিনি দু'জন সাহাবীকে (রাঃ) প্রেরণ করলেন। সাহাবীদ্বয় বনু জাহিনা এবং বনু সলিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি বললেন, "ছাঁলাবা এবং বনু সলিমের অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে যাকাত আদায় করে নিয়ে এসো।"
এই সাহাবীদ্বয় মদীনা থেকে বের হলেন এবং ছালাবার নিকট পৌঁছলেন। তাকে হুজুরের (সাঃ) নির্দেশ শুনালেন এবং চিঠি দেখালেন। নির্দেশ শুনে সে বললো, "এতো জিযিয়া। এতো জিযিয়ার মত ট্যাক্স। খোদার কসম। ব্যাপারটি কি তা আমার বুঝে আসছেনা। আপনারা এখন যান এবং অন্যান্যের নিকট থেকে আদায় করে আমার নিকট আবার আসবেন।”
সাহাবীদ্বয় যখন বনু সালিমের مسلمانوں নিকট পৌঁছলেন তখন তারা তাদেরকে উক্ত সম্বর্ধনা আনালো এবং চিঠি প্রাপ্তিতে আনন্দ প্রকাশ করলো। অতপর নিজেদের উটের মধ্য থেকে উত্তম উট বেছে বেছে তাদের সামনে পেশ করলো। সাহাবীদ্বয় (রাঃ) তা দেখলেন এবং বললেন, "আমরা বেছে বেছে উত্তম-সম্পদ- নেবো। এটা ঠিক নয়। মধ্যম ধরনের মাল নেওয়ার জন্য আমাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে। তারা বললো, "খোদার কসম। আপনারা এসব গ্রহণ করুন। কেননা আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে তা দিচ্ছি এবং আমাদের আকাংখা হলো যে অল্লাহর পথে উত্তম সম্পদ পেশ করবো।” তাদের নিকট থেকে যাকাতের মাল নিয়ে সাহাবীদ্বয় অন্যান্য জমিদারের নিকটও গেলেন এবং তাদের নিকট থেকেও যাকাত আদায় করলেন।
অতপর ফেরার পথে তাঁরা পুনরায় ছা'লাবার নিকট এলেন। সে বললো, 'চিঠিটা আমাকে দেখাওতো।' চিঠি নিয়ে পড়লো এবং পুনরায় সেই কথাই বললো যে, এটা জিযিয়া। তারপর বলতে লাগলো, "তোমরা যাও। আমি এ ব্যাপারে চিন্তা করবো।”
এই দুই সাহাবী [রাঃ] মদীনা পৌঁছলেন। তাদের নিকট থেকে কাহিনী শোনার পূর্বেই হুজুরে আকরাম (মাঃ) বনি সলিমের সাহাবীর [রাঃ] পক্ষে কল্যাণের দোয়া করলেন এবং বললেন, "হে ছা'লাবা তোমার জন্য আফসোস। অতপর সাহাবীদ্বয় রাসূলে পাক (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদেরকে সমগ্র কাহিনী শুনালেন। এ সময় সূরায়ে তওবার এই আয়াত কয়টি নাযিল হয়ঃ "তাদের মধ্যে কিছু লোক এমনও রয়েছে, যারা খোদার নিকট ওয়াদা করেছিল যে, তিনি যদি তাঁর অনুগ্রহদানে আমাদেরকে ধন্য করেন তবে আমরা দান-খয়রাত করবো ও নেক লোক হয়ে থাকবো।” কিন্তু আল্লাহ যখন নিজের অনুগ্রহে তাদেরকে ধনশালী বানিয়ে দিলেন, তখন তারা কাপণ্য কতে শুরু করলো এবং নিজেদের ওয়াদা পালন হতে এমনভাবে বিমুখ হলো যে তাদের এজন্য একটু ভয়ও হলো না। ফল এই হলো যে তাদের এই ওয়াদা ভংগের কারণে যা তারা আল্লাহর সঙ্গে করেছিল-এবং এই মিথ্যার কারণে, যা তারা বলতে অভ্যস্ত ছিল আল্লাহ তাদের অন্তরে মুনাফিকী বদ্ধমূল করে দিলেন। এ তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত কখনো তাদের ছেড়ে যাবে না।” (আত তওবা (৭৫-৭৭)
ছা'লাবার আত্মীয়রা এই আয়াতসমূহ শুনে তার নিকট গেল এবং তাকে গালাগালিও করল এবং তাকে এও বললো যে তার ব্যাপারে কঠিন ভীতিপূর্ণ আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছে। তারপর ছা'লাবা বকরী নিয়ে মদীনা এলো এবং হুজুরকে (সাঃ) সাদকা ও যাকাত গ্রহণের কথা বললো। কিন্তু তিনি বললেন, "আল্লাহ আমাকে তোমার সাদকা গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।” তখন ছা'লাবা মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলো এবং কান্নাকাটি করতে লাগলো। তিনি বললেন, "আমি তোমাকে বার বার বুঝিয়ে ছিলাম। কিন্তু তুমি বোঝোনি। এটা তোমার নিজের আমল। যা তোমার সামনে সমুপস্থিত।
ছা'লাবা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেল। হুজুরের (সাঃ) ওফাতের পর সে খলিফাতুর রাসূল (সাঃ) আবু বকরের (রাঃ) নিকট মালসহ এলো এবং তার সাদকা গ্রহণের জন্য দরখাস্ত করলো। কিন্তু হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন, "রাসুলে পাক (সাঃ) তোমার মাল গ্রহন করেননি। তাহলে আমি কি তোমার মাল ওসুল করবো?” তিনিও তা প্রত্যাখ্যান করলেন।
হযরত ওমরের (রাঃ) খিলাফত কালেও ছা'লাবা মাল নিয়ে এলো। কিন্তু হযরত ওমরও (রাঃ) তাই বললেন, "রাসূলে পাক (সাঃ) এবং সিদ্দিকে আকবার (রাঃ) তোমার মাল কবুল করেননি। আমি কি তোমার মাল উসুল করতে পারি?” তিনিও তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন।
হযরত ওসমান (রাঃ) খলিফা হলেন। ছাঁলাবা পুনরায় তার নিকট উপস্থিত হল এবং তার মাল গ্রহণের জন্য নিবেদন জানালো। কিন্তু হযরত ওসমান গণি (রাঃ) বললেন, "রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং শায়খাইন তোমার মাল প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই অবস্থায় ওসমান তোমার মাল কি করে গ্রহণ করতে পারে?"
হযরত ওসমান গনির (রাঃ) খিলাফত কালে সে জিল্লতীর সঙ্গে মারা যায়।
📄 আল-হানিউল যাহনী
ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, "আমার থেকে ইয়াহিয়া, তাঁর থেকে ইসমাঈল এবং তাঁর থেকে কায়েস বর্ণনা করেছেন। কায়েস হযরত জারির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে শুনেছেন। তিনি বলতেন যে তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "হে জারির! তুমি কি জিল খালহা মূর্তিকে ধ্বংস করে আমাকে আরাম প্রদান করবে না?" বন্ধু খাছয়াম এবং বনু বাজিলা একটি গৃহ বানিয়েছিল। এই গৃহে অন্য মূর্তির সঙ্গে এই মূর্তিও রাখা হয়েছিল। তার নাম ছিল কা'বাতুল ইয়ামানিয়া।"
জারির বর্ণনা করেন, "আমি দেড়শ' সওয়ার সহ এই অভিযানে রওয়ানা হলাম। আমার সাথীরা বনু আহমাসের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। তারা সকলেই দক্ষ ঘোড়সওয়ার ছিলো। আমি ঘোড়ার পিঠে খুব শক্তভাবে বসতে পারছিলাম না। একথা আমি হুজুরকে (সাঃ) বললাম। তিনি তাঁর হাত সজোরে আমার বুকের ওপর মারলেন। ফলে আমার বুকের ওপর তার আঙ্গুলের ছাপ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। অতপর তিনি দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ। তাকে ঘোড়ার পিঠে মজবুতভাবে বসার যোগ্য এবং হাদি ও মাহদি বানিয়ে দাও।"
হযরত জারির (রাঃ) বৃত খানা বা মূর্তি গৃহ জ্বালিয়ে ছারখার করে দিলেন এবং মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে খান খান করে ফেললেন। অতপর একজন দূতকে হুজুরে আকরামের (সাঃ) খিদমতে সুসংবাদ শোনানোর জন্য রওয়ানা করলেন। দূতটি হুজুরের (সাঃ) দরবারে এসে আরজ করলো," হে আল্লাহর রাসূল। সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে হকসহ প্রেরণ করেছেন। আমি সেখান থেকে সেই সময় পর্যন্ত রওয়ানা দিইনি যতক্ষণ মূর্তি জ্বলে খালসাকে জ্বালিয়ে ছারখার করা হয়নি। এখন তার অবস্থা খোস পাঁচরা ওয়ালা উটের মত।
এসময় হজুরে আকরাম (সাঃ) খুব খুশী হলেন এবং সমগ্র আহমাস কবিলা এবং তাদের ঘোড়সওয়ারদের পক্ষে পাঁচবার বরকতের দোয়া করলেন।