📄 বনি সায়াদের কূপ
ওয়াকেদী বলেছেন, "আমাকে ইউনুস বিন মুহাম্মদ বিন ইয়াকুব বিন ওমর বিন কাতাদা মাহমুদ বিন রীবদের হাওয়ালা সহ এই রাওয়ায়েত শুনিয়েছেন যে, বনু সায়াদ বিন হাযিমের একটি প্রতিনিধিদল হুজুরে আকরাম (সাঃ)-এর খিদমতে তাবুকে উপস্থিত হলো। তারা বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার খিদমতে এসেছি এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে একটি কূপের পাশে রেখে এসেছি। এই কূপে পানি খুবই কম। আর এটা প্রচন্ড গরমের মওসুম। আমাদের ভয় হলো যে, আমরা যদি পানির সন্ধানে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ি তাহলে আমরা কোন বিপদে পড়তে পারি। কেননা আমাদের চারপাশে এখনো ইসলাম বেশী সম্প্রসারিত হয়নি। আপনি আমাদের জন্য দোয়া করুন যাতে আমাদের কূপগুলোতে পানির আধিক্য হয়। আমরা যদি পানি পাই তাহলে আশেপাশের কোন গোত্রই আমাদের সঙ্গে মোকাবেলার সাহস পাবে না। এমনিভাবে দীনের বিরোধীরা আমাদের মোকাবিলার শক্তিপাবেনা।”
তিনি ইরশাদ করলেন, "আমাকে কিছু পাথর এনে দাও।” তারা তাঁকে তিনটি পাথর এনে দিলো। তিনি পাথর তিনটি হাতে নিয়ে ডললেন এবং বললেন, এই পাথর নিয়ে যাও এবং বিসমিল্লাহ পড়ে প্রতিটি পাথর কূপে নিক্ষেপ করবে। পাথরগুলো নিয়ে তারা চলে গেল এবং রাসূলের (সাঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তা কূপে নিক্ষেপ করলো। কূপের পানি জোশ মেরে উঠলো। তারা চারপাশের মুশরিকদেরকে সেখান থেকে বের করে দিল।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যখন তাবুক থেকে মদিনা ফিরে এলেন তখন বনু সায়াদের মুসলমানদের চেষ্টায় সমগ্র এলাকা ইসলামের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠলো এবং বেশীরভাগ মানুষই মুসলমান হয়ে গেল।”
📄 যহরের আলো
ওয়াকেদী বর্ণনা করেছেন "আমার নিকট থেকে আব্দুল্লাহ বিন আবি উবায়দা এবং সায়াদ বিন রাশিদ সালেহ বিন ইয়াসান আবু মাররাহ মাওলা আলিকের উদ্ধৃতিসহ এই রাওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় এক পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় মুনাফিকরা তাঁকে একটি গিরিপথ থেকে নীচে ফেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন সেই গিরিপথ পৌঁছলেন তখন ষড়যন্ত্রকারীরাও তাঁর সঙ্গে যেতে চাইলো। কিন্তু আল্লাহ পাক নিজের নবীকে (সাঃ) তাদের অভিপ্রায় সম্পর্কে অবহিত করালেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) লোকদেরকে সেই গিরিপথ পার হওয়ার পরিবর্তে উপত্যকার পেছন দিয়ে অতিক্রম করার নির্দেশ দিলেন। কেননা তাই হলো সহজ এবং প্রশস্ত রাস্তা। লোকজন সেই রাস্তার দিকে মোড় নিলো এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নীজের উটনীতে সওয়ার হয়ে গিরিপথ অতিক্রম করার ইচ্ছায় রওয়ানা দিলেন। তিনি আম্মার বিন ইয়াসিরকে উটনীর নাকের রশি ধরে সামনে চলার নির্দেশ দিলেন এবং হোজায়ফা বিন ইয়ামানকে (রাঃ) উটনীর পিছু পিছু হেটে চলার কথা বললেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন গিরিপথের মধ্যে পৌঁছলেন তখন দেখলেন যে, তাঁর পেছনে পেছনে লোকজন চলে আসছে। এতে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন এবং হোজায়ফাকে (রাঃ) তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। মুনাফেকরাও হুজুরে পাকের (সাঃ) ক্রোধ সম্পর্কে অবগত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং হোজায়ফা (রাঃ) পিছে ফিরে দাঁড়ালেন এবং ঐসব লোকের সওয়ারীর মুখের ওপর লাঠির আঘাত হানলেন এবং তাদেরকে পিছু হটিয়ে দিলেন। তাদের ধারণা হলো যে, তাদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং তারা গিরিপথ দিয়ে খুব দ্রুতগতিতে নীচে নামলো যাতে তাড়াতাড়ি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে এবং কেউ তাদেরকে চিনতে না পারে। হযরত হোজায়ফা (রাঃ) ষড়যন্ত্রকারীদেরকে ভাগিয়ে দেওয়ার পর রাসূল (সাঃ) গিরিপথের বাইরে বেরুলেন। তিনি অবস্থান নিলেন এবং লোকজনও তাঁবু গাড়লেন। নবী (সাঃ) হযরত হোজায়ফাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, " হে হোজায়ফা (রাঃ) যাদেরকে তুমি গিরিপথ থেকে পিছনে ফিরিয়ে দিয়েছ তাদের কাউকে চিনো?” তিনি আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আমি অমুক অমুক ব্যক্তির সওয়ারী চিনেছিলাম। কিন্তু তারা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিল এবং রাতের অন্ধকারে আমি তাদেরকে ভালোভাবে দেখতে পারিনি।
এই সফরের সময় দ্রুতগতিতে চলার কারনে কতিপয় ব্যক্তির সওয়ারী থেকে কিছু সামান পড়ে গিয়েছিল। হামরা বিন আমর আসলামী (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, সে সময় (হুজুরের (সাঃ) দোয়ার বরকতে) আমার পাঁচটি আঙ্গুল আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। তার আলোয় আমরা আমাদের জিনিসপত্র একত্রিত করলাম। এমনকি লাঠি ও রশির মত জিনিসও আমাদের নজরে এলো এবং তা উঠিয়ে নিলাম। আমরা কোন জিনিসই সেখানে ফেলে আসিনি।
📄 খালিদ (রাঃ) এবং উকিদির
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) খালিদ বিন ওয়ালিদকে (রাঃ) ডাকলেন এবং বললেন, বনু কিন্দাহর বাদশাহ উকিদির বিন আব্দুল মালিকের নিকট গমন কর ও তাকে অনুগত বানাও। এ বাদশাহ ছিলো খৃষ্টান।
হযরত খালিদকে (রাঃ) রওয়ানা করার সময় তিনি বললেন, "তুমি তাকে বন গাই শিকার করা অবস্থায় পাবে।” হযরত খালিদ (রাঃ) মদীনা থেকে রওয়ানা হয়ে সঙ্গীদের সাথে বনু কিন্দাহ গিয়ে পৌঁছলেন। মানজারুল আইনে উকিদিরের দুর্গের নিকট চাঁদনী রাতের সময় তিনি দেখলেন যে, উকিদির দুর্গের ছাদে বসে আছে এবং তার স্ত্রীও তার পাশে বসে রয়েছে। সে সময় এক আশ্চর্য ধরনের দৃশ্য দেখা গেল। বাদশাহ'র মহলের সদর দরজার ওপর এক বন গাই এলো এবং দরজার সঙ্গে শিং মারতে লাগলো।
উকিদিরকে তার স্ত্রী বললো, "তুমি কি এ ধরনের দৃশ্য কখনো আগেও দেখেছ?” সে জবাব দিল, "খোদার কসম, না।” সে মহিলা বললো এই শিকার কে ছেড়ে দিতে পারে?” সে বললো, কেউ না। এ কথা বলেই সে ছাদ থেকে নীচে নেমে এলো এবং গোলামদেরকে তার ঘোড়ার ওপর জীন কষতে নির্দেশ দিল। অতপর সে নিজের শিশু সন্তান ও সঙ্গীদেরসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শিকারের জন্য রওয়ানা হল। তার সঙ্গে তার ভাই হাসসানও ছিল।
যেই তারা দুর্গ থেকে বের হয়ে খোলা স্থানে এলো। সেই হুজুরে আকরামের (সাঃ) সওয়ারীদের সামনা সামনি হয়ে গেল। উকিদিরের ভাই নিহত হলো এবং সে সাহাবীদের হাতে গ্রেফতার হলো। তার গায়ে একটি মূল্যবান কোবা ছিল। যাতে রেশম ও স্বর্ণের কারুকার্য করা ছিল। হযরত খালিদ (রাঃ) তার থেকে কোবাটা নিয়ে নিলেন এবং মদীনা পৌঁছার পূর্বে তা হুজুরে পাকের (সাঃ) খিদমতে প্রেরণ করলেন।
ইবনে ইসহাক আরো লিখেছেন যে, হযরত আনাসের (রাঃ) রাওয়ায়েতে আছেম বিন ওমর বিন কাতাদাহ (রাঃ) তার থেকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উকিদিরের কোবা যখন হুজুরে পাকের (সাঃ) নিকট পৌঁছলো তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। মুসলমানরা তার সৌন্দর্য এবং নরম দেখে হয়রান হয়ে গেল। তারা তা হাত দিয়ে ধরতো ও তার সুক্ষ্মদর্শিতায় বিস্ময় প্রকাশ করতো। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এ অবস্থা দেখে ইরশাদ করলেন, "তোমরা কি এতে বিস্ময় প্রকাশ করছো? সে সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার জীবন রয়েছে, জান্নাতে সায়াদ বিন মায়াজের (রাঃ) নিকট এ থেকেও অনেক সুন্দর ও উত্তম রুমাল রয়েছে।
অতপর খালিদ (রাঃ) উকিদিরকে নিয়ে নবীয়ে পাকের (সাঃ) নিকট হাজির হলেন। তিনি তাকে জীবনে বাঁচিয়ে দিলেন এবং জিযিয়া আদায়ের মাধ্যমে তার সঙ্গে সন্ধি করে নিলেন। তিনি উকিদিরকে মুক্ত করে দিলেন। ফলে সে নিজের কবিলায় ফিরে গেলো।
বনু তাই গোত্রের এক ব্যক্তি হযরত বুজায়ের বিন বাজরা হুজুরে পাকের (সাঃ) খিদমতে একটি কাসিদা পেশ করলেন। সে কাসিদায় তিনি বলেছিলেনঃ
تبارك سألق البقرات اني رأيت الله يهدى كل هاد فمن يك حائداً عن ذي تبوك فانا قد أمرنا بالجِهار
"সেই সত্ত্বা খুবই বরকতওয়ালা যিনি বনগাইকে হাঁকিয়ে নির্দিষ্টস্থানে নিয়ে এসেছিলেন। আমি দেখলাম যে, প্রত্যেক হেদায়াত দানকারীর পথ প্রদর্শন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই করেন। যদি কেউ তাবুক যুদ্ধের নির্দেশদানকারী থেকে (মুহাম্মদ আরাবী) পৃথক হতে চায় তাহলে সে যেন জেনে নেয় যে, আমরা পৃথক হবো না। আমাদেরকে জিহাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমাদের মাথা অবনতরয়েছে।"
রাসূলে পাক (সাঃ) তার এই কবিতা শুনে বললেন, "আল্লাহ যেন তোমার দাঁত কখনো ধ্বংস না করেন।" রাবী বলেন, বুজায়ের ৯০ বছর জীবিত ছিলেন। তার কোন দাঁত নষ্ট হয়নি।
📄 ইসলামের শহীদ উরওয়াহ্ বিন মাসউদ (রাঃ)
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রাসূলে পাক (সাঃ) রমযান মাসে তাবুক থেকে মদীনা পৌঁছেন। সেই মাসেই বনু ছাকিফের প্রতিনিধিদল তাঁর নিকট এলো। তারা তাবুকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করে চলে গেলো। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে এক সৌভাগ্যবান মানুষ উরওয়াহ বিন মাসউদ তাঁর মদীনা রওয়ানার পর তাঁর পদাংক অনুসরণ করে তাঁর সন্ধানে বের হলো। মদীনায় পৌঁছার পূর্বেই সে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করলো। হুজুরের (সাঃ) সাক্ষাতের পর এই ছাকাফী সরদার মুসলমান হয়ে গেলেন এবং বনু ছাকিফে ফিরে গিয়ে তাবলিগের কাজ শুরু করার জন্য রাসূলের (সাঃ) নিকট অনুমতি চাইলেন। রাসূলে পাক (সাঃ) বললেন; অভিপ্রায় তো ভালো কিন্তু তোমার গোত্রের মানুষ তোমাকে মেরে ফেলবে। হুজুর (সাঃ) বনু ছাকিফের কাঠিন্য ও জাহেলী গর্বের কথা অবগত ছিলেন। উরওয়াহ বিন মাসউদ (রাঃ) আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আমিতো নিজের কওমে খুবই জনপ্রিয়। তারা আমাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশীভালোবাসে।
ইবনে ইসহাক আরো বর্ণনা করেন, উরওয়াকে নিজের কওমে অত্যন্ত মান সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হতো। তার নির্দেশ শুনা এবং মানা হতো। তিনি নিজের কওমের নিকট এলেন। আশা ছিল যে, কওমের মধ্যে তাঁর যেমন সম্মান রয়েছে তেমনি ভীতিও আছে। এ জন্য কেউ তার নির্দেশের বিরোধিতা করবে না। সকলকেই তিনি ইসলামের সাধারণ দাওয়াত দিলেন।
তার কওম এই দাওয়াতের বিরোধিতা করে বসলো। তিনি অব্যাহতভাবে এই দাওয়াত দিতে থাকলেন। একটি উঁচু পাহাড়ে চড়ে তিনি নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করলেন এবং সাধারণ মানুষকে শিরক ও কুফর পরিত্যাগ করে ইসলামে প্রবেশ করার দাওয়াত দিলেন। বনু ছাকিফ চারদিক থেকে তার ওপর তীর বর্ষণ করতে লাগলো। তিনি আহত হলেন।
আহত হওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, "আপনি আপনার রক্তের ব্যাপারে কি বলেন?" তাঁর খান্দান হত্যাকারী ও তার গোত্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের ঘোষণা প্রদান করেছিল। তিনি বললেন, "আমার বদলায় কাউকে হত্যা করবে না। এতো একটা সম্মান। আল্লাহ পাক তা আমাকে প্রদান করেছেন এবং তিনি আমাকে শাহাদাতের মহান মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। আমার একমাত্র ইচ্ছা হলো যে, আমাকে সেই শহীদদের পাশে দাফন করতে হবে যারা হুজুরে আকরামের (সাঃ) সঙ্গে বনি ছাকিফের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেখানেই শহীদ হয়েছিলেন।” এক রাওয়ায়েতে এও আছে যে, শাহাদাতের পূর্বে তিনি বলেছিলেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর সত্য রাসূল। তিনি আমাকে এই শাহাদাতের খবর দিয়েছিলেন।"