📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 বিলালের (রাঃ) খাবার

📄 বিলালের (রাঃ) খাবার


ওয়াকেদী বর্ণনা করেছেন, "আমার নিকট থেকে ইউনুস বিন মুহাম্মাদ ইয়াকুব বিন আমর বিন কাতাদার উদ্ধৃতিসহ বর্ণনা করেছেন যে, বনি সায়াদ বিন হাযিমের এক ব্যক্তি বলেছেন, "আমি রাসুলের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলাম। সে সময় হুজুর (সাঃ) তাবুকের এক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ৬ জন সঙ্গী। আমি সেখানে পৌঁছলাম এবং তাকে সালাম করলাম। তিনি আমাকে বসার নির্দেশ দিলেন। আমি বসলাম এবং আরজ করলাম, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল।”
নবীরে পাক (সাঃ) বললেন, "তুমি মুক্তি পেয়ে গেছ।” অতপর হযরত বিলালকে (রাঃ) আওয়াজ দিলেন এবং বললেন, "বিলাল আমাদেরকে খাবার খাওয়াও।” হযরত বিলাল (রাঃ) মাটির ওপর চামড়ার একটি দস্তরখান বিছালেন এবং একটি থলি থেকে খেজুর, ঘি এবং পনিরের তৈরী পাঞ্জেরী বের করলেন।
নবী পাক (সাঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, "বিসমিল্লাহ বলুন এবং খান।" আমরা সকলেই খাবার খেলাম এবং আসুদাহ হয়ে গেলাম। আমি আরজ করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল। এত কম খাবার ছিল যে, প্রথমে আমি মনে করেছিলাম একাই খেয়ে নিই। কিন্তু তা আমাদের সকলেরই পেট ভরিয়েছে।” তিনি বললেন, "মুমিন এক অস্ত্রে ভক্ষণ করে। আর কাফের ৭ অস্ত্রে ভক্ষণ করে থাকে।” আমি পরের দিন পুনরায় হুজুরে আকরামের খিদমতে হাজির হলাম। আমি মধ্যাহ্ন ভোজেও অংশ নিতে চাচ্ছিলাম। তাতে আমার দু'টি লক্ষ্য ছিল। একেতো এই খাবার খাওয়া। দ্বিতীয়ত অন্তরের আরো বেশী প্রশান্তি লাভ করা যে, আল্লাহ তায়ালা নিজের নবীকে বিশেষ বরকত দান করেছেন। খাওয়ার সময় হলে দেখলাম যে, নবীর (সাঃ) নিকট ১০ জন মানুষ উপস্থিত। তিনি হযরত বিলালকে (রাঃ) বললেন, "বিলাল খাবার আনো।” সুতরাং বিলাল (রাঃ) দস্তরখান বিছিয়ে দিলেন এবং একটি থলি থেকে খেজুর বের করতে লাগলেন। তিনি মুঠি ভরে ভরে খেজুর দস্তর খানের ওপর রাখছিলেন। হুজুর (সাঃ) বললেন, "বিলাল, উদার মনে খেজুর এখানে রাখো। আরশওয়ালার ওপর ভরসা রাখো এবং এই ভীতি অন্তরে স্থান দিওনা যে সেখানে বখিলী করা হবে।"
বিলাল (রাঃ) সকল খেজুর থলে থেকে বের করে দিলেন। আমি আন্দাজ করলাম যে সেই খেজুর দুইমুদ (প্রায় দেড়সের) হবে। হুজুরে আকরাম (সাঃ) নিজের পবিত্র হাত সেই খেজুরের ওপর রাখলেন এবং তারপর বললেন, “বিসমিল্লাহ বলে খাও।” সকলেই খুব খেলেন এবং আমিও পেট ভরে খেলাম। আমি নিজে খেজুর উৎপাদন করতাম এবং খেতামও বেশী। কিন্ত আর খাওয়ার মত অবস্থা ছিল না। সকলেই খাওয়া শেষ করলে আমি দেখলাম যে, দস্তরখানে কম-বেশি তত খেজুরই পড়ে রয়েছে যত বিলাল (রাঃ) রেখেছিলেন।। আমরা যেন কিছুই খাইনি।
তারপরের দিনও আমি একই ব্যাপার দেখলাম। নবী (সাঃ) বিলালকে (রাঃ) বললেন, "খাবার আনো" বিলাল (রাঃ) আগের দিনের থলি থেকে খেজুর দস্তরখানে রেখে দিলেন। দশ অথবা তার থেকে বেশী ব্যক্তি তা পেটপুরে খেলেন। পর পর তিন দিনই এ রকম হলো।”

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 বনি সায়াদের কূপ

📄 বনি সায়াদের কূপ


ওয়াকেদী বলেছেন, "আমাকে ইউনুস বিন মুহাম্মদ বিন ইয়াকুব বিন ওমর বিন কাতাদা মাহমুদ বিন রীবদের হাওয়ালা সহ এই রাওয়ায়েত শুনিয়েছেন যে, বনু সায়াদ বিন হাযিমের একটি প্রতিনিধিদল হুজুরে আকরাম (সাঃ)-এর খিদমতে তাবুকে উপস্থিত হলো। তারা বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার খিদমতে এসেছি এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে একটি কূপের পাশে রেখে এসেছি। এই কূপে পানি খুবই কম। আর এটা প্রচন্ড গরমের মওসুম। আমাদের ভয় হলো যে, আমরা যদি পানির সন্ধানে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ি তাহলে আমরা কোন বিপদে পড়তে পারি। কেননা আমাদের চারপাশে এখনো ইসলাম বেশী সম্প্রসারিত হয়নি। আপনি আমাদের জন্য দোয়া করুন যাতে আমাদের কূপগুলোতে পানির আধিক্য হয়। আমরা যদি পানি পাই তাহলে আশেপাশের কোন গোত্রই আমাদের সঙ্গে মোকাবেলার সাহস পাবে না। এমনিভাবে দীনের বিরোধীরা আমাদের মোকাবিলার শক্তিপাবেনা।”
তিনি ইরশাদ করলেন, "আমাকে কিছু পাথর এনে দাও।” তারা তাঁকে তিনটি পাথর এনে দিলো। তিনি পাথর তিনটি হাতে নিয়ে ডললেন এবং বললেন, এই পাথর নিয়ে যাও এবং বিসমিল্লাহ পড়ে প্রতিটি পাথর কূপে নিক্ষেপ করবে। পাথরগুলো নিয়ে তারা চলে গেল এবং রাসূলের (সাঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তা কূপে নিক্ষেপ করলো। কূপের পানি জোশ মেরে উঠলো। তারা চারপাশের মুশরিকদেরকে সেখান থেকে বের করে দিল।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যখন তাবুক থেকে মদিনা ফিরে এলেন তখন বনু সায়াদের মুসলমানদের চেষ্টায় সমগ্র এলাকা ইসলামের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠলো এবং বেশীরভাগ মানুষই মুসলমান হয়ে গেল।”

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 যহরের আলো

📄 যহরের আলো


ওয়াকেদী বর্ণনা করেছেন "আমার নিকট থেকে আব্দুল্লাহ বিন আবি উবায়দা এবং সায়াদ বিন রাশিদ সালেহ বিন ইয়াসান আবু মাররাহ মাওলা আলিকের উদ্ধৃতিসহ এই রাওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় এক পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় মুনাফিকরা তাঁকে একটি গিরিপথ থেকে নীচে ফেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন সেই গিরিপথ পৌঁছলেন তখন ষড়যন্ত্রকারীরাও তাঁর সঙ্গে যেতে চাইলো। কিন্তু আল্লাহ পাক নিজের নবীকে (সাঃ) তাদের অভিপ্রায় সম্পর্কে অবহিত করালেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) লোকদেরকে সেই গিরিপথ পার হওয়ার পরিবর্তে উপত্যকার পেছন দিয়ে অতিক্রম করার নির্দেশ দিলেন। কেননা তাই হলো সহজ এবং প্রশস্ত রাস্তা। লোকজন সেই রাস্তার দিকে মোড় নিলো এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নীজের উটনীতে সওয়ার হয়ে গিরিপথ অতিক্রম করার ইচ্ছায় রওয়ানা দিলেন। তিনি আম্মার বিন ইয়াসিরকে উটনীর নাকের রশি ধরে সামনে চলার নির্দেশ দিলেন এবং হোজায়ফা বিন ইয়ামানকে (রাঃ) উটনীর পিছু পিছু হেটে চলার কথা বললেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন গিরিপথের মধ্যে পৌঁছলেন তখন দেখলেন যে, তাঁর পেছনে পেছনে লোকজন চলে আসছে। এতে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন এবং হোজায়ফাকে (রাঃ) তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। মুনাফেকরাও হুজুরে পাকের (সাঃ) ক্রোধ সম্পর্কে অবগত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং হোজায়ফা (রাঃ) পিছে ফিরে দাঁড়ালেন এবং ঐসব লোকের সওয়ারীর মুখের ওপর লাঠির আঘাত হানলেন এবং তাদেরকে পিছু হটিয়ে দিলেন। তাদের ধারণা হলো যে, তাদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং তারা গিরিপথ দিয়ে খুব দ্রুতগতিতে নীচে নামলো যাতে তাড়াতাড়ি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে এবং কেউ তাদেরকে চিনতে না পারে। হযরত হোজায়ফা (রাঃ) ষড়যন্ত্রকারীদেরকে ভাগিয়ে দেওয়ার পর রাসূল (সাঃ) গিরিপথের বাইরে বেরুলেন। তিনি অবস্থান নিলেন এবং লোকজনও তাঁবু গাড়লেন। নবী (সাঃ) হযরত হোজায়ফাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, " হে হোজায়ফা (রাঃ) যাদেরকে তুমি গিরিপথ থেকে পিছনে ফিরিয়ে দিয়েছ তাদের কাউকে চিনো?” তিনি আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আমি অমুক অমুক ব্যক্তির সওয়ারী চিনেছিলাম। কিন্তু তারা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিল এবং রাতের অন্ধকারে আমি তাদেরকে ভালোভাবে দেখতে পারিনি।
এই সফরের সময় দ্রুতগতিতে চলার কারনে কতিপয় ব্যক্তির সওয়ারী থেকে কিছু সামান পড়ে গিয়েছিল। হামরা বিন আমর আসলামী (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, সে সময় (হুজুরের (সাঃ) দোয়ার বরকতে) আমার পাঁচটি আঙ্গুল আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। তার আলোয় আমরা আমাদের জিনিসপত্র একত্রিত করলাম। এমনকি লাঠি ও রশির মত জিনিসও আমাদের নজরে এলো এবং তা উঠিয়ে নিলাম। আমরা কোন জিনিসই সেখানে ফেলে আসিনি।

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 খালিদ (রাঃ) এবং উকিদির

📄 খালিদ (রাঃ) এবং উকিদির


ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) খালিদ বিন ওয়ালিদকে (রাঃ) ডাকলেন এবং বললেন, বনু কিন্দাহর বাদশাহ উকিদির বিন আব্দুল মালিকের নিকট গমন কর ও তাকে অনুগত বানাও। এ বাদশাহ ছিলো খৃষ্টান।
হযরত খালিদকে (রাঃ) রওয়ানা করার সময় তিনি বললেন, "তুমি তাকে বন গাই শিকার করা অবস্থায় পাবে।” হযরত খালিদ (রাঃ) মদীনা থেকে রওয়ানা হয়ে সঙ্গীদের সাথে বনু কিন্দাহ গিয়ে পৌঁছলেন। মানজারুল আইনে উকিদিরের দুর্গের নিকট চাঁদনী রাতের সময় তিনি দেখলেন যে, উকিদির দুর্গের ছাদে বসে আছে এবং তার স্ত্রীও তার পাশে বসে রয়েছে। সে সময় এক আশ্চর্য ধরনের দৃশ্য দেখা গেল। বাদশাহ'র মহলের সদর দরজার ওপর এক বন গাই এলো এবং দরজার সঙ্গে শিং মারতে লাগলো।
উকিদিরকে তার স্ত্রী বললো, "তুমি কি এ ধরনের দৃশ্য কখনো আগেও দেখেছ?” সে জবাব দিল, "খোদার কসম, না।” সে মহিলা বললো এই শিকার কে ছেড়ে দিতে পারে?” সে বললো, কেউ না। এ কথা বলেই সে ছাদ থেকে নীচে নেমে এলো এবং গোলামদেরকে তার ঘোড়ার ওপর জীন কষতে নির্দেশ দিল। অতপর সে নিজের শিশু সন্তান ও সঙ্গীদেরসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শিকারের জন্য রওয়ানা হল। তার সঙ্গে তার ভাই হাসসানও ছিল।
যেই তারা দুর্গ থেকে বের হয়ে খোলা স্থানে এলো। সেই হুজুরে আকরামের (সাঃ) সওয়ারীদের সামনা সামনি হয়ে গেল। উকিদিরের ভাই নিহত হলো এবং সে সাহাবীদের হাতে গ্রেফতার হলো। তার গায়ে একটি মূল্যবান কোবা ছিল। যাতে রেশম ও স্বর্ণের কারুকার্য করা ছিল। হযরত খালিদ (রাঃ) তার থেকে কোবাটা নিয়ে নিলেন এবং মদীনা পৌঁছার পূর্বে তা হুজুরে পাকের (সাঃ) খিদমতে প্রেরণ করলেন।
ইবনে ইসহাক আরো লিখেছেন যে, হযরত আনাসের (রাঃ) রাওয়ায়েতে আছেম বিন ওমর বিন কাতাদাহ (রাঃ) তার থেকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উকিদিরের কোবা যখন হুজুরে পাকের (সাঃ) নিকট পৌঁছলো তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। মুসলমানরা তার সৌন্দর্য এবং নরম দেখে হয়রান হয়ে গেল। তারা তা হাত দিয়ে ধরতো ও তার সুক্ষ্মদর্শিতায় বিস্ময় প্রকাশ করতো। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এ অবস্থা দেখে ইরশাদ করলেন, "তোমরা কি এতে বিস্ময় প্রকাশ করছো? সে সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার জীবন রয়েছে, জান্নাতে সায়াদ বিন মায়াজের (রাঃ) নিকট এ থেকেও অনেক সুন্দর ও উত্তম রুমাল রয়েছে।
অতপর খালিদ (রাঃ) উকিদিরকে নিয়ে নবীয়ে পাকের (সাঃ) নিকট হাজির হলেন। তিনি তাকে জীবনে বাঁচিয়ে দিলেন এবং জিযিয়া আদায়ের মাধ্যমে তার সঙ্গে সন্ধি করে নিলেন। তিনি উকিদিরকে মুক্ত করে দিলেন। ফলে সে নিজের কবিলায় ফিরে গেলো।
বনু তাই গোত্রের এক ব্যক্তি হযরত বুজায়ের বিন বাজরা হুজুরে পাকের (সাঃ) খিদমতে একটি কাসিদা পেশ করলেন। সে কাসিদায় তিনি বলেছিলেনঃ
تبارك سألق البقرات اني رأيت الله يهدى كل هاد فمن يك حائداً عن ذي تبوك فانا قد أمرنا بالجِهار
"সেই সত্ত্বা খুবই বরকতওয়ালা যিনি বনগাইকে হাঁকিয়ে নির্দিষ্টস্থানে নিয়ে এসেছিলেন। আমি দেখলাম যে, প্রত্যেক হেদায়াত দানকারীর পথ প্রদর্শন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই করেন। যদি কেউ তাবুক যুদ্ধের নির্দেশদানকারী থেকে (মুহাম্মদ আরাবী) পৃথক হতে চায় তাহলে সে যেন জেনে নেয় যে, আমরা পৃথক হবো না। আমাদেরকে জিহাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমাদের মাথা অবনতরয়েছে।"
রাসূলে পাক (সাঃ) তার এই কবিতা শুনে বললেন, "আল্লাহ যেন তোমার দাঁত কখনো ধ্বংস না করেন।" রাবী বলেন, বুজায়ের ৯০ বছর জীবিত ছিলেন। তার কোন দাঁত নষ্ট হয়নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00