📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 রাসূলের (সাঃ) উটনী ও মুনাফিক

📄 রাসূলের (সাঃ) উটনী ও মুনাফিক


ইবনে ইসহাক হুজুরে আকরামের (সাঃ) তাবুক সফরের ঘটনাবলী লিখতে গিয়ে বর্ণনা করেছেন, রাস্তায় কোন একস্থানে তাঁর উটনী নিখোঁজ হয়ে গেলে তাঁর সাহাবী বৃন্দ (রাঃ) উটনীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। হুজুরে আকরামের (সাঃ) একজন মুখলিস সাহাবী ছিলেন আম্মারাহ বিন হাযম (রাঃ)। তিনি বাইয়াতে উকবা এবং বদরে অংশগ্রহনের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তাঁর গ্রুপে যায়েদ বিন লাসাইত কাইনুকায়ীও ছিল। সে ছিল মুনাফিক। আম্মারাহ (রাঃ) রাসূলে পাকের (সাঃ) নিকট ছিলেন। আর যায়েদ ছিল তার আবাসস্থলে। আবাসস্থলে সে লোকদেরকে বলেছিল, "মুহাম্মদ কি এই দাবি করে না যে সে আল্লাহর নবী এবং তোমাদেরকে আসমানের খবর শুনিয়ে থাকে না? আর তার এই খবর নেই যে তার উট কোথায়?
আম্মারাহ (রাঃ) সে সময় আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) নিকট ছিলেন। তিনি (সাঃ) তাঁকে বললেন, 'জনৈক ব্যক্তি এই কথা বলেছে। আমি বলি, খোদার কসম। আমি' তাই জানতে পারি যা আল্লাহ আমাকে জানান। এখনই আল্লাহ পাক আমাকে আমার উটের খবর দিয়েছেন। উটনীটি ঐ উপত্যকায় অমুক গিরিপথে রয়েছে। একটি গাছের সঙ্গে তার নাকিল বা নাকে বাঁধা রশি আটকে গেছে এবং উটনীটি সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। যাও, সেখান থেকে তাকে ধরে নিয়ে এসো।”
সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) সেখানে গেলেন এবং সেখানেই উটনীকে পেলেন। তারা তাকে নিয়ে এলেন। আম্মারাহ (রাঃ) বিন হাযম নিজের আবাসস্থলে গিয়ে লোকদেরকে বললেন, "খোদার কসম! ঠিক এক্ষুণি হুজুরে আকরাম (সাঃ) আমাদেরকে বললেন যে, জনৈক ব্যক্তি এই কথা বলেছে। সেখানে উপস্থিত লোকরা জানালো যে, কিছুক্ষণ পূর্বে এ কথাতো যায়েদবিন লুছাইত বলেছে।
এ কথা শুনে আম্মারাহ (রাঃ) খুব রাগান্বিত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ যায়েদের ঘাড় ধরলেন এবং লোকদেরকে ডেকে 'বললেন, "আল্লাহর বান্দারা। আমার তাঁবুতে একজন হুশিয়ার, চালাক (ভয়ংকর) মানুষ ছিল এবং আমি তার খবরই রাখতাম না।" অতপর তাকে সম্বোধন করে বললেন, "হে খোদার শত্রু। আমার তাঁবু থেকে বেরিয়ে যা এবং কখনো আমার সঙ্গে চলাফেরা করবি না। এমন কি আমার কাছেও ঘেঁষবিনা।”

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 আবু যরের (রাঃ) পাণ

📄 আবু যরের (রাঃ) পাণ


ইবনে ইসহাক (রাঃ) হুজুরে আকরামের (সাঃ) তাবুক যাত্রার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, মহানবী (সাঃ) রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং অনেক মানুষ পেছনে রয়ে গেল। সাহাবীবৃন্দ (রাঃ) হুজুরের নিকট আরজ করতে লাগলেন, হে আল্লার রাসূল! অমুক অমুক পেছনে রয়ে গেল।” একথা শুনে তিনি বললেন, "ছেড়ে দাও, তাদের মধ্যে যদি কল্যাণ থাকে তাহলে শীঘ্রই আল্লাহ পাক তাদেরকে এনে তোমাদের সঙ্গে মিলিত করবেন। আর যদি ব্যাপার উল্টো হয় তাহলে তোমাদের চিন্তা কিসের? আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় কর। তিনি তাদের (অমঙ্গল) থেকে তোমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন।"
এই সময় একজন বললো "হে আল্লাহর রাসুল। আবু যরও (রাঃ) পেছনে রয়ে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে তার উট বসে পড়েছিল এবং চেষ্টা সত্ত্বেও আর ওঠার নাম করছিল না। নবী (সাঃ) বললেন, "আবু যরের (রাঃ) মধ্যে যদি কল্যাণ থাকে তাহলে সে শীঘ্রই তোমাদের নিকট এসে পৌঁছাবে। নচেৎ তার চিন্তা কর না।”
এদিকে অবু যরের (রাঃ) অবস্থা এমন ছিল যে, উট যখন উঠলো না তখন তিনি সেখানে তাকে ছেড়ে দিলেন। নিজের হাল্কা-পাতলা সামান নিলেন এবং পদব্রজেই রওয়ানা হলেন। রাসূলের (সাঃ) কাফেলার পদাংক অনুসরণ করে তিনি হুজুরের (সাঃ) সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য অস্থির ছিলেন। নবী পাক (সাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা এক স্থানে যাত্রা বিরতি করলেন। مسلمانوں মধ্যে জনৈক ব্যক্তি মরুভূমি দিয়ে এক ব্যক্তিকে আসতে দেখলেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল। কেউ একাকী এবং পদব্রজেআসছে।”
তিনি একথা শুনে বললেন, "কুন আবা জাররিন" অর্থাৎ "সে আবু যার হবে।” লোকজন দেখলো। দূর থেকেই আগত ব্যক্তিকে চেনা গেল। তারা আরজ করলো, "আল্লাহর কসম! সেতো আবু যারই।” রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "আল্লাহ তায়ালা আবু যারের ওপর রহম করুন। সে একাকীই আসে, একাকীই শেষ হয়ে যাবে এবং একাকীই কিয়ামতের দিন উঠানো হবে।"
ইবনে ইসহাক আরো বর্ণনা করেছেন যে, "বুরাইদা বিন সুফিয়ান আসলামী আমার থেকে মুহাম্মদ বিন কায়াব আল ফারাজী আল আবদিল্লাহ বিন মাসাদের উদ্ধৃতিসহ বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ) নিজের খেলাফতকালে যখন হযরত আবু যারকে মদীনা থেকে রাবযা চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি তা পালন করলেন এবং সেই গ্রামেই বসবাস শুরু করলেন। সেখানেই তাঁর শেষ সময় ঘনিয়ে এলো। গ্রামের সকল মানুষই হজ্বে গিয়েছিলেন।
আবু যার গিফারীর (রাঃ) স্ত্রী এবং গোলাম ছাড়া আর সেখানে কেউ ছিল না। তিনি মৃত্যুর পূর্বে তাদেরকে ওসিয়ত করেছিলেন যে, মৃত্যুর পর তাঁকে গোসল দিয়ে এবং কাফন পরিয়ে রাস্তায় রেখে দিতে হবে। একটি কাফেলা আসবে। সেই কাফেলাকে বলতে হবে যে, এটা রাসুলের (সাঃ) সাহাবী আবু যারের (রাঃ) নামাজে জানাযা। তোমরা নামাজে জানাযা এবং দাফনে আমাদেরক সাহায্য করো।”
আবু যারের (রাঃ) যখন ওফাত হলো তখন তাঁর স্ত্রী ও গোলাম তাঁর ওসিয়ত অনুযায়ী কাজ করলেন। সে সময় একটি কাফেলা দৃষ্টি গোচর হলো। সেই কাফেলার সালার ছিলেন রাসুলের (সাঃ) সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন মাসউদ। তিনি ইরাক থেকে উমরা করার জন্য মক্কা মুয়াজ্জামা যাচ্ছিলেন।
যখন জানাযার নিকটবর্তী হলেন তখন গোলামটি দাঁড়িয়ে বললেন, 'এটা রাসুলের (সাঃ) সাহাবী আবু যারের (রাঃ) জানাযা। আপনারা নামাজে জানাযা পড়িয়ে আমাদেরকে সাহায্য এবং মাইয়্যেতকে দাফন করুন।” একথা শুনতেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) কাঁদতে লাগলেন। তিনি নিজের উট থেকে নেমে ধরা গলায় বললেন, "রাসুলে পাক (সাঃ) ঠিকই বলেছিলেন। হে, আবু যার। আপনি একাকীই রওয়ানা দিতেন। একাকীই দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেলেন এবং একাকীই আপনাকে কিয়ামতের দিন উঠানো হবে।"
হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন মাসউদ এবং তাঁর সঙ্গীরা হযরত আবু যার গিফারীর (রাঃ) জানাযা পড়লেন। হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন মাসউদ ইমামতি করলেন। তারপর তাঁকে দাফন করলেন। দাফনের পর আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন মাসউদ তাবুক সফরের ঘটনা এবং হুজুরের (সাঃ) ইরশাদের কথা লোকদেরকে শুনালেন। প্রত্যেকের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 মুনাফেক্ক উপত্যাকার পানি

📄 মুনাফেক্ক উপত্যাকার পানি


ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, তাবুক সফরকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুশাককাক উপত্যকা অতিক্রম করেন। উপত্যকার এক স্থানে পাহাড় থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়তো। এই পানি পরিমানে এত কম ছিল যে একবারে দুই অথবা তিন ব্যক্তি পিপাসা নিবারণ করতে পারতো। রাসুলে আকরাম (সাঃ) বললেন, " যেই এই উপত্যাকায় প্রথম পৌঁছবে সে যেন আমাদের পৌঁছা পর্যন্ত পানি পান না করে।
কতিপয় মুনাফিক সেই পানির নিকট গিয়ে পৌঁছলো এবং তারা পানি পান করলো। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যখন সেখানে পৌঁছলেন তখন দেখলেন যে এক ফোঁটা পানিও নেই। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "আমাদের আগে কে এখানে পৌঁছেছিল? তাঁকে বলা হলো অমুক এবং অমুক আগে এসেছিল। তিনি তাদেরক অভিশাপ দিলেন এবং বললেন, "আমাদের আগমন পর্যন্ত সকলকেই পানি পান করতে কি আমি নিষেধ করিনি?"
তিনি সওয়ারী থেকে নামলেন এবং পানির কাতরার নীচে হাত রাখলেন। কয়েক ফোঁটা তাঁর হাতের ওপর পড়লো। তিনি তা হাতে নিয়ে পানির উৎসস্থলে ছিটিয়ে দিলেন এবং তারপর পবিত্র হাত দিয়ে তা স্পর্শ করলেন এবং কিছুক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট দোয়া করতে লাগলেন। যে উৎসস্থল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছিল সেখানে বজ্রপাতের মত একটি আওয়াজ হলো এবং প্রস্রবনের মত পানি প্রবাহিত হলো। লোকজন খুব আসুদাহ হয়ে পানি পান করলো এবং নিজেদের প্রয়োজনের জন্য পাত্রে ভরে নিলেন।
হুজুরে পাক (সাঃ) ইরশাদ করলেন, "তোমরা যদি জীবিত থাকো অথবা তোমাদের মধ্যে যেই কিছুদিন দুনিয়ায় থাকবে সে/অবশ্যই এই উপত্যকাকে শস্য শ্যামল দেখতে পাবে এবং চারপাশের সকল উপত্যকা থেকে বেশী সম্পদও আবাদ হবে।"
বস্তুতঃ এই উপত্যকা হুজুরে আকরামের (সাঃ (ইরশাদ অনুযায়ী শস্য শ্যামলিমাপূর্ণহয়েছিল।

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 বিলালের (রাঃ) খাবার

📄 বিলালের (রাঃ) খাবার


ওয়াকেদী বর্ণনা করেছেন, "আমার নিকট থেকে ইউনুস বিন মুহাম্মাদ ইয়াকুব বিন আমর বিন কাতাদার উদ্ধৃতিসহ বর্ণনা করেছেন যে, বনি সায়াদ বিন হাযিমের এক ব্যক্তি বলেছেন, "আমি রাসুলের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলাম। সে সময় হুজুর (সাঃ) তাবুকের এক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ৬ জন সঙ্গী। আমি সেখানে পৌঁছলাম এবং তাকে সালাম করলাম। তিনি আমাকে বসার নির্দেশ দিলেন। আমি বসলাম এবং আরজ করলাম, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল।”
নবীরে পাক (সাঃ) বললেন, "তুমি মুক্তি পেয়ে গেছ।” অতপর হযরত বিলালকে (রাঃ) আওয়াজ দিলেন এবং বললেন, "বিলাল আমাদেরকে খাবার খাওয়াও।” হযরত বিলাল (রাঃ) মাটির ওপর চামড়ার একটি দস্তরখান বিছালেন এবং একটি থলি থেকে খেজুর, ঘি এবং পনিরের তৈরী পাঞ্জেরী বের করলেন।
নবী পাক (সাঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, "বিসমিল্লাহ বলুন এবং খান।" আমরা সকলেই খাবার খেলাম এবং আসুদাহ হয়ে গেলাম। আমি আরজ করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল। এত কম খাবার ছিল যে, প্রথমে আমি মনে করেছিলাম একাই খেয়ে নিই। কিন্তু তা আমাদের সকলেরই পেট ভরিয়েছে।” তিনি বললেন, "মুমিন এক অস্ত্রে ভক্ষণ করে। আর কাফের ৭ অস্ত্রে ভক্ষণ করে থাকে।” আমি পরের দিন পুনরায় হুজুরে আকরামের খিদমতে হাজির হলাম। আমি মধ্যাহ্ন ভোজেও অংশ নিতে চাচ্ছিলাম। তাতে আমার দু'টি লক্ষ্য ছিল। একেতো এই খাবার খাওয়া। দ্বিতীয়ত অন্তরের আরো বেশী প্রশান্তি লাভ করা যে, আল্লাহ তায়ালা নিজের নবীকে বিশেষ বরকত দান করেছেন। খাওয়ার সময় হলে দেখলাম যে, নবীর (সাঃ) নিকট ১০ জন মানুষ উপস্থিত। তিনি হযরত বিলালকে (রাঃ) বললেন, "বিলাল খাবার আনো।” সুতরাং বিলাল (রাঃ) দস্তরখান বিছিয়ে দিলেন এবং একটি থলি থেকে খেজুর বের করতে লাগলেন। তিনি মুঠি ভরে ভরে খেজুর দস্তর খানের ওপর রাখছিলেন। হুজুর (সাঃ) বললেন, "বিলাল, উদার মনে খেজুর এখানে রাখো। আরশওয়ালার ওপর ভরসা রাখো এবং এই ভীতি অন্তরে স্থান দিওনা যে সেখানে বখিলী করা হবে।"
বিলাল (রাঃ) সকল খেজুর থলে থেকে বের করে দিলেন। আমি আন্দাজ করলাম যে সেই খেজুর দুইমুদ (প্রায় দেড়সের) হবে। হুজুরে আকরাম (সাঃ) নিজের পবিত্র হাত সেই খেজুরের ওপর রাখলেন এবং তারপর বললেন, “বিসমিল্লাহ বলে খাও।” সকলেই খুব খেলেন এবং আমিও পেট ভরে খেলাম। আমি নিজে খেজুর উৎপাদন করতাম এবং খেতামও বেশী। কিন্ত আর খাওয়ার মত অবস্থা ছিল না। সকলেই খাওয়া শেষ করলে আমি দেখলাম যে, দস্তরখানে কম-বেশি তত খেজুরই পড়ে রয়েছে যত বিলাল (রাঃ) রেখেছিলেন।। আমরা যেন কিছুই খাইনি।
তারপরের দিনও আমি একই ব্যাপার দেখলাম। নবী (সাঃ) বিলালকে (রাঃ) বললেন, "খাবার আনো" বিলাল (রাঃ) আগের দিনের থলি থেকে খেজুর দস্তরখানে রেখে দিলেন। দশ অথবা তার থেকে বেশী ব্যক্তি তা পেটপুরে খেলেন। পর পর তিন দিনই এ রকম হলো।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00