📄 কত যাথা
ইবনে ইসহাক বলেন, ইয়াসির বিন রাযام খাইবারে রাসূলের (সাঃ) ওপর হামলার জন্য বন গাতফানকে একত্রিত করেছিলো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে (রাঃ) সাহাবীদের একটি দলসহ তাদের মুকাবিলা করার জন্য প্রেরণ করলেন। এই দলে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন আনিসও ছিলেন। তিনি বনু সালমার মৈত্রীওছিলেন।
তাঁরা ইয়াসির বিন রাযামের নিকট গেলেন এবং তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলেন। আলোচনার মাধ্যমে তার নৈকট্যও লাভ করলেন। অতপর তাকে বললেন, "তুমি যদি রাসূলের (সাঃ) নিকট গমন কর তাহলে তিনি তোমাকে প্রভুত পুরস্কার দিবেন এবং পদ দান করবেন। তাঁরা তাকে বার বার একথা বুঝালেন। ফলে সে যাওয়ার জন্য আগ্রহী হলো। সে ইহুদীদের একটি দলের সঙ্গে সেই সাহাবী দলের সাথে মদীনা রওয়ানা হলো। হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন আনিস তাকে নিজের উটের ওপর বসালেন। খাইবার থেকে ৬ মাইল এদিকে কারকারা নামক স্থানে পৌঁছে ইয়াসির নিজের সিদ্ধান্তে লজ্জিত হলো এবং তার ভয় অনুভূত হতে লাগলো।
আব্দুলাহ (রাঃ) বিন আনিস বুঝে ফেললেন যে, তার মনোভাবের পরিবর্তন হচ্ছে। তিনি দেখলেন যে, সে তরবারী বের করতে চায়। এ সময় তিনি তাকে সুযোগ না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তরবারীর কোপ দিয়ে তার পা কেটে দিলেন। সে এক লম্বা লাঠি দিয়ে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আনিসের মাথার ওপর আঘাত হানলো এবং তাকে আহত করলো এই অবস্থা দেখে সাহাবীরা স্ব স্ব কাছের ইহুদীকে হত্যা করে ফেললো। তারা সকলেই ধরাশায়ী হয়ে পড়লো। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি পালিয়ে গেল এবং জীবন বাঁচিয়ে ফিরে গেল।
আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন আনিস মদীনা ফিরে এলেন। হুজুরে আকরাম (সাঃ) তাঁকে আহত অবস্থায় দেখতে পেলেন। এ সময় তিনি তার ক্ষত স্থানে মুখের পবিত্র লালা লাগিয়ে দিলেন। তাঁর ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে গেল। তাতে কোন ব্যথা এবং ঘা রইলো না।
📄 মক্কা যুদ্ধের শহীদবৃন্দ
ইবনে ইসহাক বলেছেন, "মুহাম্মদ বিন জাফর বিন যোবায়ের ইরওয়াহ (রাঃ) বিন যোবায়েরের উদ্ধৃতিসহ আমার নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হুজুরে আকরাম (সাঃ) মওতার দিকে একটি সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। আর যায়েদ (রাঃ) বিন হারেছাকে এই বাহিনীর আমীর নিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, "যদি যায়েদের (রাঃ) কিছু হয় তাহলে জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) কমান্ড হাতে নেবেন। তাঁরও যদি কিছু ঘটে তাহলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) আমীর হবেন (অন্য) এক রাওয়াতে আছে যে, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহারও যদি কিছু হয় তাহলে মুসলমান বাহিনী যাকে ইচ্ছা তাকে নিজেদের আমীর বানিয়ে নেবেন।"
মহানবী (সাঃ) সেই বাহিনীকে বিদায় করলেন। বিদায় জানানোর জন্য তিনি মদীনার বাইরে পর্যন্ত তাদের সঙ্গে গেলেন। এই বাহিনী সিরিয়ার এক স্থানে তাঁবু ফেললেন। সেখানে খবর পৌঁছলো যে, কায়সারে রোম হিরাক্লিয়াস স্ব বাহিনীসহ বালকা এলাকায় মাআব নামক স্থানে তাঁবু ফেলেছে। তার এক লাখ সৈন্য ছিল। তার সঙ্গে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং তাদের গোত্র বনু লাখাম, বনু জাযাম, বনু কিন ও বনু বাহরাও নিজেদের বাহিনী নিয়ে হিরাক্লিয়াসের খিদমতে হাজির হলো। তাদের সংখ্যাও হিরাক্লিয়াসের সৈন্য সংখ্যার সমান ছিল। مسلمانوں সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। মুসলমানরা দুইরাত সেখানে অবস্থান করলেন এবং কি করা যায় সে ব্যাপারে পারস্পরিক পরামর্শ করতে লাগলেন। লোকজন রাসূলের (সাঃ) নিকট চিঠি লিখে শত্রু পক্ষের সংখ্যাধিক্যের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণের আবেদন জানানোর পক্ষে মত প্রকাশ করলেন। তিনি যদি অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণ করেন তাহলে উত্তম। অর যদি তিনি এই সৈন্য নিয়েই মুকাবিলার নির্দেশ দেন তাহলে সামনে এগুনোয়াবে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) লোকদেরকে খুব করে সাহস দিলেন এবং বললেন, "হে আমার কওমের লোকেরা। খোদার কসম, যে বস্তুর কামনায় তোমরা বাড়ী থেকে বের হয়েছিলে অর্থাৎ 'শাহাদাত ফি সাবিলিল্লাহ' তা তোমাদের সামনে রয়েছে, আর তোমরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ। আমরা কখনো দুশমনের সঙ্গে নিজেদের সংখ্যা ও সাজ সরঞ্জামের ভিত্তিতে যুদ্ধ করিনি। আমরা দুশমনের মুকাবিলা সব সময়ই সেই দীন ও ঈমানী শক্তির ভিত্তিতে করেছি যার বরকত আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দান করেছেন। চলো, সামনে অগ্রসর হও। আমাদের জন্য দুই ভালোর এক ভালো নির্ধারিত রয়েছে। হয় 'বিজয়ী' হবো না হয় 'শাহাদাত' লাভকরবো।"
ইবনে রাওয়াহার উত্তেজনাকর বক্তৃতায় লোকদের সাহস বাড়লো এবং তারা বলে উঠলেন, 'আল্লাহর কসম, ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) সত্য বলেছেন।”
ইবনে ইসহাক আরো লিখেছেন যে, মুসলমান বাহিনী রওয়ানা করলো। বালকাতে শত্রুপক্ষ। বালকার অন্যতম বস্তি মাশারিদের নিকটে ছিল শত্রুপক্ষ। আর মওতার বস্তির নিকট ছিল মুসলমানরা। মওতা নামক স্থানে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
যায়েদ (রাঃ) বিন হারিছা দুশমনের মোকাবিলা অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে, লড়লেন। তাঁর হাতে ছিল রাসূল (সাঃ) প্রদত্ত ঝান্ডা। তিনি তা সমুন্নত রাখলেন। বাহাদুরীর সঙ্গে লড়াই করলেন এবং আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় শহীদ হয়ে গেলেন। তারপর জাফর (রাঃ) বিন আবিতালিব ঝান্ডা তুলে নিলেন। তিনি ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। শত্রুর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু জাফর বাহাদুরীর সঙ্গে মুকাবিলা এবং স্ব বাহিনীর সাহস বৃদ্ধি করছিলেন। যুদ্ধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল এবং উভয়পক্ষের লোকজন গাজরকাটা হয়ে ভূতলে নিপতিত হচ্ছিল। জাফর (রাঃ) নিজের শাকরা নামক ঘোড়া থেকে নেমে এলেন এবং তার কুচ কেটে দিলেন। যাতে শত্রুরা তা ব্যবহার করতে না পারে। অতপর দুশমনের মুকাবিলায় বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন। দু'টি হাত কেটে গেল। অতপর নিজে শহীদ হয়ে গেলেন।
হযরত জাফরের (রাঃ) শাহাদাতের পর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা ঝান্ডা হাতে নিলেন এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বও কাঁধে তুলে নিলেন। তিনি ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। শত্রুর চাপ সে সময় সীমাতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছিল। আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার অন্তরে অল্প সময়ের জন্য দুর্বলতা ও সংশয়ের সৃষ্টি হলো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে সামলে নিলেন এবং মুখ দিয়ে এই কবিতা উচ্চারিত হলোঃ
"হে অন্তর! আমি কসম খেয়েছি যে, তোমাকে এই ময়দানে নামতেই হবে। খুশীর সঙ্গে সামনে অগ্রসর হলে কতই না সুন্দর। নচেৎ বাধ্য হয়েই তোমাকে একাজ করতে হবে।" "মানুষেরা সোৎসাহে সামনে অগ্রসর হচ্ছে ও চেচামেচী ও চীৎকারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এটা কেমন কথা যে আমি তোমাকে জান্নাতের দিকে পাগলের মত অগ্রসর না হয়ে ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় দেখছি।”
"দীর্ঘদিন যাবৎ তুমি আরাম-আয়েশে অতিবাহিত করেছ। একটি থলিতে (মায়ের পেটে) অপবিত্র পানির কাতরা ছাড়া আর তোমার তাৎপর্য কি হতে পারে।"
অধিকন্তু তিনি বললেন, " হে নফস (মৃত্যুতে ভয় পাও কেন) এখানে যদি গলা না কাটাও তাহলে এমনি এমনিই মৃত্যু এসে যাবে। মৃত্যুর হাম্মামখানা গরম হয়েছে।"
"যেবন্ধু তোমার কামনায় ছিল তাতো অনুপস্থিত (শাহাদাত)। যায়েদ (রাঃ) এবং জাফর (রাঃ) যে কাজ করেছে তা যদি তুমি কর তাহলে তুমি হেদায়াত ও সাফল্যের পথ পাবে।
এই কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে এলেন এবং দুশমনের সঙ্গে, হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। এই মুহূর্তে তাঁর চাচাতো ভাই এক টুকরো গোশতের হাড় নিয়ে তাঁর নিকট হাজির হলেন এবং বললেন, "এই গোশত খেয়ে শরীরে কিছুটা শক্তি বাড়িয়ে নিন। আপনি কয়েকদিন যাবৎ খুব কঠিন অবস্থায় কাটাচ্ছেন। তাঁর হাত থেকে তিনি সেই দস্তি নিলেন এবং কেবলমাত্র এক লোকমাই মুখে দিয়েছিলেন। এমন সময় ভয়ংকর আওয়াজ শুনলেন। তরবারী তরবারীতে ঝনঝনানি চলছিল এবং চেচামেচি উচ্চগ্রামে পৌঁছেছিল। তৎক্ষণাৎ তিনি নিজেকে বললেন, "পরিস্থিতি এত নাজুক, আর তুই এখনো দুনিয়ার আরাম-আয়েশেই মজে আছিস? গোশত ফেলে দিলেন এবং তরবারী নিয়ে দুশমনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শত্রুব্যূহ অতিক্রম করে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে আহত হয়ে শহীদ হয়ে গেলেন।
আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার (রাঃ) শাহাদাতের পর ছাবিত বিন আকরাম পতাকা তুলে ধরলেন এবং উচ্চস্বরে বললেন, "হে মুসলমানেরা। নিজেদের মধ্য থেকে উত্তম ব্যক্তিকে এই ঝান্ডা অর্পন করো।" লোকেরা বললো, "তুমিই তা তুলে ধরো।" তিনি বললেন, "আমি তার যোগ্য নই। লোকজন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদকে ঝান্ডা তুলে নেয়ার আবেদন জানালো। তিনি ঝান্ডা ধরলেন। দুশমনদেরকে পিছে হটিয়ে দিলেন। দুই বাহিনীর মধ্যে বেশ দুরত্ব সৃষ্টি হলো। কেননা অগ্রসরমান রোমক বাহিনীকে থামিয়ে দিয়ে হযরত খালিদ (রাঃ) বেশ পেছনে ঠেলে দিয়েছিলেন। অতপর হযরত খালিদ (রাঃ) সন্ধ্যার সময় নিজের বাহিনীসহ পেছনে চলে এলেন।
ইবনে ইসহাক বলেন, "আমি আহলে ইলম থেকে এই খবর পেয়েছি যে, যুদ্ধের আগুন জ্বলার সময় হুজুরে আকরাম (রাঃ) মদীনাতে খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, "যায়েদ (রাঃ) ঝান্ডা ধরলেন এবং বাহাদুরীর সঙ্গে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। অতপর জাফর (রাঃ) কমান্ড হাতে নিলেন এবং যায়েদের (রাঃ) পদাংক অনুসরণ করে তিনিও শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করলেন। তার পর হুজুর (সাঃ) কিছুক্ষণের জন্য চুপ মেরে রইলেন। সে সময় আনসারদের চেহারা লাল হয়ে গেল। তারা চিন্তা করলো যে, আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন রাওয়াহা হয়তো কোন দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলেছে।
হুজুরে আকরাম (সাঃ) কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার বললেন, "অতপর ঝান্ডা আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার হাতে এলো। তিনিও লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। আমাকে দেখানো হলো যে তাঁকে জান্নাতে পৌঁছানো হয়েছে। ফেরেশতারা তাঁকে সোনালী পালং-এ উঠিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছে। আমি দেখলাম যে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার পালং সম্পূর্ণ ঠিক-ঠাক ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম যে, এই পালং ঢিলা কেন? তখন আমাকে বলা হলো যে পূর্বেকার দুই জেনারেল নির্দ্বিধায় যুদ্ধে লাফিয়ে পড়েন, কিন্তু আবদুল্লাহ (রাঃ) কিছুটা সংশয় ও ইতস্ততঃ ভাব প্রকাশ করেছিলেন। তবে তিনিও আগে অগ্রসর হলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন।
হুজুরে আকরাম (সাঃ) যুদ্ধের ময়দান থেকে খবর আসার পূর্বেই এই শহীদদের শাহাদতের খবর শুনিয়ে দিয়েছিলেন।"
📄 কুন আধা খায়ছানা (রাঃ)
ইবনে ইসহাক মহানবীর (সাঃ) তাবুক সফরের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, "রাসূলে পাক (সাঃ) সফরে রওয়ানা হয়ে গেলেন। আবু খায়ছামা (রাঃ) নিজের বাগান থেকে বাড়ী ফিরে এলেন। সময়টি ছিল দ্বিপ্রহর। তখন প্রচণ্ড লু হাওয়া বইছিলো। আবু খায়ছামার (রাঃ) দু'জন স্ত্রী ছিলেন। তাঁরা সুস্বাদু খাবার তৈরী করে রেখেছিলেন এবং ঘড়া ভরা ছিল ঠান্ডা পানি। আবু খায়ছামা জানতে পেলেন যে, হুজুরে আকরাম (সাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা সকালেই তাবুকের দিকে চলে গেছেন।
নিজের কক্ষের দরজায় পৌঁছে আবু খায়ছামা দেখলেন যে, তার স্ত্রীরা তার জন্য অপেক্ষা করছেন। কক্ষের শীতলতা এবং বাইরের প্রচন্ড লু হাওয়ার দৃশ্যে আবু খায়ছামা নিজেকেই বললেন, "রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রখর রোদে উত্তপ্ত প্রস্তরময় ভূমিতে লু হাওয়ার মোকাবিলা করছেন আর আবু খায়ছামা শীতল ছায়ায় সুস্বাদু খাবারের মজা লুটা এবং সুন্দরী মহিলার সান্নিধ্য উপভোগ করার জন্য এই দ্বিপ্রহরে এখানে অতিবাহিত করবে? এটা ইসলাম বিরোধী এবং ঈমানের দাবীর পরিপন্থী” অতপর বললেন, "খোদার কসম! আমি তোমাদের কারোর কামরায় অবশ্যই প্রবেশ করবো না। আমি রাসূলের (সাঃ) নিকট যাবো। অবিলম্বে রাস্তার সামান তৈরী করে দাও” তারা সফরের সামান তৈরী করে দিলেন। এ সময় তিনি বাগানে গেলেন। উটনীর উপর হাওদা বাঁধলেন এবং ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় বেরিয়ে পড়লেন। এ দিকে হুজুরে আকরাম (সাঃ) যে দিন তাবুকে উপস্থিত হলেন সেই দিন আবু খায়ছামাও সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন। রাস্তায় আবু খায়ছামার (রাঃ) সঙ্গে উমায়ের বিন ওয়াহাব আল-জামহার (রাঃ) সাক্ষাৎ হলো। তিনিও হুজুরের (সাঃ) সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য বের হয়েছিলেন। তারা উভয়েই এক সঙ্গে চলতে লাগলেন। তাবুকের নিকট পৌঁছলে হযরত আবু খায়ছামা (রাঃ) বললেন, "উমায়ের! আমি তো গুণাহগার। ওজর ছাড়া পিছনে রয়ে গিয়েছিলাম। তোমার তো কোন অপরাধ নেই। তুমি একটু থামো। আমাকে একাকি হুজুরে পাকের (সাঃ) নিকট যাওয়ার সুযোগ দাও।” সুতরাং হযরত উমায়ের (রাঃ) একটু পেছনে রয়ে গেলেন।
আবু খায়ছামার (রাঃ) তাবুক পৌঁছার আগেই হুজুর (সাঃ) এবং অন্যান্য সাহাবী (রাঃ) সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। আবু খায়ছামা (রাঃ) যখন নিকটে পৌঁছলেন তখন লোকজন বললেন, " কোন সওয়ার এদিকে একাকী আসছে।" হুজুর (সাঃ) বললেন, "আবু খায়ছামা হবে।” (কুন আবা খায়ছামা)।
সে যখন এসে পৌঁছালো তখন সাহাবীরা (রাঃ) আরজ করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! বাস্তবিকই সে আবু খায়ছামা।”
আবু খায়ছামা (রাঃ) নিজের উটনী বসালেন এবং হুজুরের (সাঃ) খেদমতে হাজির হলেন। হুজুরকে (সাঃ) সালাম করলেন। হুজুরে আকরাম (সাঃ) সালামের জবাব দানের পর বললেন, "হে আবু খায়ছামা। তুমি ধ্বংসের কিনারে পৌঁছে গিয়েছিলে।” আবু খায়ছামা (রাঃ) নিজের কাহিনী শুনালেন। নবী পাক (সাঃ) তার বরকত ও কল্যাণের জন্য দোয়া করলেন। আবু খায়ছামা (রাঃ) হুজুরের (সাঃ) দোয়া শুনে খুশী হয়ে একটি কবিতা আবৃত্তি করলেনঃ
ولما رأيت الناس في الدين نافقوا اتيت الذي كان اعف واكرما وبايعت باليمني يدى المحمد فلم اكتسب إثما ولم اغش محرما تركت خضيباً في العريش وصرمة صفايا كراماً بسرها قد تحمما وكنت اذا شك المنافق اسمحت الى الدين نفسي شطره حيث يمما
"আমি যখন দেখলাম যে, লোকজন দীনে মুনাফেকী অবলম্বন করছে তখন আমি সেই ধরনের কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করলাম যা খুলুস বা পবিত্রতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং আমি সেই ব্যক্তিত্বের নিকট এসেছি যিনি খুব ক্ষমাশীল এবং চরমউদার।
আমি আমার দক্ষিণ হস্ত দিয়ে মুহাম্মদের (সাঃ) হাতে বাইয়াত করেছি এবং সেই বাইয়াতের পর কখনো কোন গুনাহ করিনি ও লুকিয়ে-ছুপিয়ে কখনো হারাম পথে চলিনি।
আমি আমার গৃহে সুন্দরী মহিলাদেরকে রেখে এসেছি এবং দুধ দানকারী অনেক উটনী ছেড়ে এসেছি। আঙ্গুরের ছড়া থেকে হাত সরিয়ে এনেছি। এই আঙ্গুরের গোছা পেকে লাল রং ধারণ করছিল ও খেজুরের পাকা বাগানকে বিদায় জানিয়ে এসেছি।
মুনাফিকরা যখন হক দীনের ব্যাপারে সংশয়, সন্দেহের শিকার হতো তখন আমি দীনকে মজবুতভাবে আকড়ে ধরেছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিল দীন। যেখানেই আমি তা পেয়েছি তা বুকের সঙ্গে লাগিয়ে নিয়েছি।”
📄 রূদ ও মেঘ
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাবুক যাওয়ার প্রাক্কালে যখন হাজার এলাকা অতিক্রম করছিলেন তখন সেখানে অবস্থান করেন এবং লোকজন একটি কূপ থেকে পানি পান করেন। যাত্রা বিরতির পর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, "এই কূপের পানি পান করে পিপাসা নিবারণ করবে না এবং ওজু করবেনা। তোমরা যদি এই পানি দিয়ে আটা গুলিয়ে থাকো তাহলে সেই রুটি খাবে না। বরং এই আটা উটদেরকে খাইয়ে দাও এবং রাতে তোমাদের মধ্যে কেউ যেন একাকী তাঁবু থেকে বের না হয়।"
রাসুলের (সাঃ) নির্দেশ অনুযায়ী লোকজন কাজ করলো। কিন্তু বনু সায়েদার দুই ব্যক্তি নির্দেশ আমান্য করলো। তারা একাকী তাঁবু থেকে বের হলো। একজন গিয়েছিল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। অন্যজন নিজের নিখোঁজ উটের সন্ধানে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দানের জন্য যে গিয়েছিল রাস্তায় তাকে কে যেন গলা টিপে ধরেছিল এবং যে উটের সন্ধানে গিয়েছিল তাকে ঝাপটা বাতাসে উঠিয়ে তাই গোত্রের দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করেছিল।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই খবর পেলেন এবং বললেন, "আমি কি তোমাদেরকে একাকী বাইরে বেরুতে নিষেধ করেছিলাম না?” তারপর তিনি যে ব্যক্তিকে গলা টিপে ধরা হয়েছিল তার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে সুস্থতা দান করলেন। অন্যজনের আর কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। তবে, নবী করিম (সাঃ) যখন মদীনা পৌঁছলেন তখন তাই গোত্রের লোকনজ তাকে এনে তাঁর খিদমতে পেশ করলেন।
ইবনে ইসহাক আরো উল্লেখ করেছেন যে, "হাজার এলাকায় যখন ভোর হলো তখন লোকদের নিকট পানি ছিল না। তারা নিজেদের সমস্যার কথা রাসূলের খিদমতে পেশ করলেন।"
আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) আরজ করলেন, "হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ তায়ালা আপনার নিকট ওয়াদা করেছেন যে তিনি আপনার দোয়া কবুল করবেন। অতএব, আপনি আমাদের জন্য দোয়া করুন।"
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আবু বকর। তুমি কি চাও যে আমি দোয়াকরি।"
হযরত আবু বকর (রাঃ) আরজ করলেন, "জ্বী, হ্যাঁ। হে আল্লাহর রাসূল।” রাসুলুল্লাহ (সা) সেই সময়ই দোয়া করলেন। আকাশ সম্পূর্ণ পরিস্কার ছিল। আল্লাহ তায়ালা তৎক্ষণাৎ এক খন্ড মেঘ প্রেরণ করলেন। আর এই মেঘ লোকদের ওপর ছেয়ে গেল। তারপর বৃষ্টি বর্ষণ হতে লাগলো। লোকজন সেই বৃষ্টির পানি দিয়ে নিজেদের পিপাসা নিবারণ করলো এবং প্রয়োজনমত পানি জমাও করলো।"
ইবনে ইসহাক আছিম বিন ওমর বিন কাতাদা থেকে এবং তিনি বনু আবদিল আশহালের কিছু লোকের নিকট থেকে রাওয়ায়েত বর্ণনা করতেন যে, কতিপয় ব্যক্তি নিকটাত্মীয়ের মধ্য থেকে তাদেরকে চিনতেন যাদের অন্তরে মুনাফিকী ছিল। মাহমুদ বলেন যে আমাকে আমার বুজর্গরা বলেছেন যে, একজন মুনাফিক নিজের কপটতায় খুব পোক্ত ছিল। কিন্তু সে প্রত্যেক সফরেই রাসূলের (সা) সঙ্গে শরীক হওয়ার জন্য চেষ্টা করতো। হাজারে যখন বৃষ্টির এই ঘটনা সংঘটিত হলো তখন লোকজন তার নিকট গেল এবং বললো, "তোমার জন্য আফসোস! এই মুজিজা দেখার পরও কি তোমার সন্দেহ রয়েছে?” সে বললো, "এটাতো সাধারণভাবে অতিক্রমকারী মেঘ খন্ড ছিল। আর এ ধরনের সব সময়ই হয়ে থাকে।”