📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 আবু মাহযুয়ার মুয়াজ্জিন

📄 আবু মাহযুয়ার মুয়াজ্জিন


ইমাম আহমদ (রাঃ) বিন হাম্বল বলেছেন যে, তার থেকে রূহ বিন উবাদাহ তার থাকে ইবনে জুরাইজ তার থেকে আব্দুল আজীজ বিন আব্দুল মালিক ইবনে আবি মাহজুরাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাকে আব্দুল্লাহ বিন মুহাইয়িরিজ বলেছেন। আর এই আব্দুল্লাহ ইয়াতিম ছিলেন এবং আবু মাহজুরার (রাঃ) অভিভাবকত্বে লালিত পালিত হয়েছিলেন। আব্দুল্লাহ বলেন যে, তিনি একবার সিরিয়া সফরে রওয়ানা হলেন। রওয়ানার পূর্বে তিনি হযরত আবু মাহজুরাহ (রাঃ) কে বললেন, "সিরিয়ার মানুষ আমাকে আপনার আযানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে আমি তাদেরকে কি বলবো?"
আবু মাহজুরাহ (রাঃ) নিজের ঘটনাকে এমনিভাবে বর্ণনা করেন "আমি সাথীদের সহ হুনাইনের দিকে অগ্রসর হলাম। আমরা পথে ছিলাম। এমন সময় হুজুরে আকরামের কাফেলা হুনাইন থেকে ফিরে আসছিলো। হুজুরে আকরামের (সাঃ) মুয়াজ্জিন আযান দিলেন। আমরা কিছু দূর থেকে আযানের আওয়াজ শুনলাম। আমরা রাস্তা থেকে পৃথক হয়ে বসে গিয়েছিলাম। আমরা আযান শুনে তার শব্দাবলী ঠাট্টা-বিদ্রূপচ্ছলে দোহরাতে শুরু করলাম।
মহানবী (সাঃ) আমাদের আওয়াজ শুনলেন। তিনি আমাদেরকে তার সামনে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। যখন আমাদেরকে তার সামনে আনা হলো তখন তিনি বললেন, "তোমাদের মধ্য থেকে কার আওয়াজ বুনন্দ ছিল?” একথা শুনে সকলেই আমার দিকে ইঙ্গিত করলেন।
আর তারা এ ব্যাপারে সত্যি কথাই বলেছিল। তিনি অবশিষ্ট সকলকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। আমাকে যেতে দিলেন না। তিনি নির্দেশ দিলেন, "দাঁড়াও এবং আযানবলো।"
নির্দেশ শুনে আমি উঠে দাঁড়ালাম। সে সময় আমার সবচেয়ে ঘৃণার বস্তু ছিল রাসূলের (সঃ) ব্যক্তিত্ব। যে বস্তুর তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন তাও আমার নিকট চরম অপসন্দনীয় ছিল। যাহোক, আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি আমাকে আযানের বাক্যাবলী শিখালেন এবং বললেন, "এখন উচ্চৈস্বরে বলা শুরুকরো।"
الله اكبر. الله اكبر. اشهد ان لا اله الا الله. اشهد ان محمداً رسول الله . حيى على الصلوة . حيى على الفلاح . الله اكبر الله اكبر . لا اله الا الله -
আমি যখন আযান পূর্ণ করলাম তখন তিনি আমাকে ডাকলেন এবং একটি থলে দান করলেন। তাতে কিছু রুপা ছিল। তারপর তিনি আমার কপালের ওপর হাত রাখলেন। অতপর তিনি হাত আমার চেহারার ওপর ঘুরিয়ে আমার বুকের ওপর আনলেন এবং আমার কলিজা ও পেটের ওপর ঘুরালেন। অতপর আমার নাভি পর্যন্ত তার হাত ঘুরালেন। তারপর তিনি দোয়া করলেন, "আল্লাহ তায়ালা তোমাকে বরকত দিন এবং তোমার ওপর দয়া প্রদর্শন করুন।"
এতক্ষণে আমার অন্তরের অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছিল। আমি আরয করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল। আমাকে মক্কার মুয়াজ্জিন নিয়োগ করুন।” তিনি বললেন, "যাও, আমি তোমাকে মক্কার হেরেম শরীফে মুয়াজ্জিন নিয়োগ করলাম।”
তারপর আমার অন্তর হুজুরে আকরামের (সাঃ) মুহাব্বতে এমনভাবে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল যে, সৃষ্টি জগতের কোন বস্তু আমার নিকট তার থেকে প্রিয় ছিল না। আমি হুজুরে আকরামের (সাঃ) নিয়োগকৃত আমেল আত্তাব বিন উসাইদের নিকট এলাম এবং তাকে সমগ্র কাহিনী শুনালাম। বস্তুত সে সময় থেকেই আমি আযানের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছিলাম। সুনানিল বাইহাকীতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আবু মাহজুরাহ (রাঃ) 'র পুত্ররা তার পুতা এবং পরপুতা সকলেই মসজিদে হারামে আযানদিতেন।

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 ইয়ামাতের হুনাইন

📄 ইয়ামাতের হুনাইন


ওয়ালিদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেছেন, "আমার থেকে আব্দুল্লাহ বিন মুবারক, তাঁর থেকে আবু বকর আল হাজলী, তাঁর থেকে ইবনে আব্বাসের গোলাম আকরামা এবং তাঁর থেকে শাইবা বিন ওসমান রাওয়ায়েত করেছেন। শাইবা বলতেন, আমি হুনাইনের যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহকে (সাঃ) একাকী দেখতে পেলাম। আমার পিতা ও চাচার কথা মনে পড়ে গেল। আলী (রাঃ) ও হামযা (রাঃ) তাদেরকে হত্যা করেছিল। আমি মনে মনে ভাবলাম যে, আজ প্রতিশোধের সুযোগ এসেছে।
আমি দক্ষিণ দিক থেকে তাঁর দিকে অগ্রসর হলাম। যেই আমি নিকটে পৌঁছলাম সেই তার ডাইনে আবাসকে দেখলাম। আমি বললাম, সেতো তাঁর চাচা। তিনি অবশ্যই তাঁকে ছেড়ে যাবেন না। সে সময় আবাস যিরাহ পরিধান করেছিল। এই যিরাহ রূপার মত সাদা ছিল এবং তার ওপর ধূলোবালি পড়েছিল। অতপর আমি বাম দিক থেকে হামলা করার ইচ্ছা করলাম। নিকটে পৌঁছতেই তাঁর সঙ্গে আবু সুফিয়ান বিন হারিছ বিন আব্দুল মুত্তালিবকে দেখতে পেলাম। আমি চিন্তা করলাম যে, সে তো তাঁর চাচাতো ভাই। সে তাকে অমিত বিক্রমে রক্ষা করবে। আমি পিছনে হটে এলাম এবং চিন্তা করলাম যে, পিছন দিক থেকে হামলা করবো। পেছন দিক থেকে এলাম। শুধুমাত্র তরবারীর কোপ মারা বাকী ছিল। আমি তরবারী উঠাতে যাচ্ছিলাম তখন হঠাৎ করে আমার ও তাঁর মধ্যে আগুনের একটি স্ফুলিঙ্গ বাধা হয়ে দাঁড়ালো। এই স্ফুলিঙ্গ এত কঠিন ও তীব্র গতিসম্পন্ন ছিল যে বিদ্যুতের মত আমার চোখকে ঝলসে দিল। আমি ভীত হয়ে পড়লাম যে, এই তীব্র গতিসম্পন্ন আলো আমাকে চোখের জ্যোতি থেকে বঞ্চিতই করে না দেয়। আমি আমার চোখের ওপর হাত রাখলাম এবং উল্টা পেছন দিকে ভেগে গেলাম।
এই সময় হুজুরে আকরাম (সাঃ) আমার দিকে মনোযোগ দিলেন এবং বললেন, "হে শাইবা, হে শাইবা, আমার নিকট এসো।" অতপর দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ শাইবার নিকট থেকে শয়তানকে দূর করে দাও।"
আমি তাঁর দিকে চোখ উঠালাম। সে সময় তিনি আমার নিজের চোখ, কান এবং জীবন থেকে বেশী প্রিয় হয়ে গেছেন। তিনি বললেন, "ইয়া শাইবা কাতিলুল কুফফার"। অর্থাৎ হে শাইবা। কাফিরদের সঙ্গে লড়াই কর।"
অতপর আমি দেখলাম যে, হুজুরে আকরাম (সাঃ) মুঠ ভরতি মাটি নিলেন এবং দুশমনের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। সেই মাটি সকল দুশমনের চোখে পড়লো।”

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 কত যাথা

📄 কত যাথা


ইবনে ইসহাক বলেন, ইয়াসির বিন রাযام খাইবারে রাসূলের (সাঃ) ওপর হামলার জন্য বন গাতফানকে একত্রিত করেছিলো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে (রাঃ) সাহাবীদের একটি দলসহ তাদের মুকাবিলা করার জন্য প্রেরণ করলেন। এই দলে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন আনিসও ছিলেন। তিনি বনু সালমার মৈত্রীওছিলেন।
তাঁরা ইয়াসির বিন রাযামের নিকট গেলেন এবং তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলেন। আলোচনার মাধ্যমে তার নৈকট্যও লাভ করলেন। অতপর তাকে বললেন, "তুমি যদি রাসূলের (সাঃ) নিকট গমন কর তাহলে তিনি তোমাকে প্রভুত পুরস্কার দিবেন এবং পদ দান করবেন। তাঁরা তাকে বার বার একথা বুঝালেন। ফলে সে যাওয়ার জন্য আগ্রহী হলো। সে ইহুদীদের একটি দলের সঙ্গে সেই সাহাবী দলের সাথে মদীনা রওয়ানা হলো। হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন আনিস তাকে নিজের উটের ওপর বসালেন। খাইবার থেকে ৬ মাইল এদিকে কারকারা নামক স্থানে পৌঁছে ইয়াসির নিজের সিদ্ধান্তে লজ্জিত হলো এবং তার ভয় অনুভূত হতে লাগলো।
আব্দুলাহ (রাঃ) বিন আনিস বুঝে ফেললেন যে, তার মনোভাবের পরিবর্তন হচ্ছে। তিনি দেখলেন যে, সে তরবারী বের করতে চায়। এ সময় তিনি তাকে সুযোগ না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তরবারীর কোপ দিয়ে তার পা কেটে দিলেন। সে এক লম্বা লাঠি দিয়ে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আনিসের মাথার ওপর আঘাত হানলো এবং তাকে আহত করলো এই অবস্থা দেখে সাহাবীরা স্ব স্ব কাছের ইহুদীকে হত্যা করে ফেললো। তারা সকলেই ধরাশায়ী হয়ে পড়লো। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি পালিয়ে গেল এবং জীবন বাঁচিয়ে ফিরে গেল।
আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন আনিস মদীনা ফিরে এলেন। হুজুরে আকরাম (সাঃ) তাঁকে আহত অবস্থায় দেখতে পেলেন। এ সময় তিনি তার ক্ষত স্থানে মুখের পবিত্র লালা লাগিয়ে দিলেন। তাঁর ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে গেল। তাতে কোন ব্যথা এবং ঘা রইলো না।

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 মক্কা যুদ্ধের শহীদবৃন্দ

📄 মক্কা যুদ্ধের শহীদবৃন্দ


ইবনে ইসহাক বলেছেন, "মুহাম্মদ বিন জাফর বিন যোবায়ের ইরওয়াহ (রাঃ) বিন যোবায়েরের উদ্ধৃতিসহ আমার নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হুজুরে আকরাম (সাঃ) মওতার দিকে একটি সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। আর যায়েদ (রাঃ) বিন হারেছাকে এই বাহিনীর আমীর নিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, "যদি যায়েদের (রাঃ) কিছু হয় তাহলে জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) কমান্ড হাতে নেবেন। তাঁরও যদি কিছু ঘটে তাহলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) আমীর হবেন (অন্য) এক রাওয়াতে আছে যে, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহারও যদি কিছু হয় তাহলে মুসলমান বাহিনী যাকে ইচ্ছা তাকে নিজেদের আমীর বানিয়ে নেবেন।"
মহানবী (সাঃ) সেই বাহিনীকে বিদায় করলেন। বিদায় জানানোর জন্য তিনি মদীনার বাইরে পর্যন্ত তাদের সঙ্গে গেলেন। এই বাহিনী সিরিয়ার এক স্থানে তাঁবু ফেললেন। সেখানে খবর পৌঁছলো যে, কায়সারে রোম হিরাক্লিয়াস স্ব বাহিনীসহ বালকা এলাকায় মাআব নামক স্থানে তাঁবু ফেলেছে। তার এক লাখ সৈন্য ছিল। তার সঙ্গে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং তাদের গোত্র বনু লাখাম, বনু জাযাম, বনু কিন ও বনু বাহরাও নিজেদের বাহিনী নিয়ে হিরাক্লিয়াসের খিদমতে হাজির হলো। তাদের সংখ্যাও হিরাক্লিয়াসের সৈন্য সংখ্যার সমান ছিল। مسلمانوں সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। মুসলমানরা দুইরাত সেখানে অবস্থান করলেন এবং কি করা যায় সে ব্যাপারে পারস্পরিক পরামর্শ করতে লাগলেন। লোকজন রাসূলের (সাঃ) নিকট চিঠি লিখে শত্রু পক্ষের সংখ্যাধিক্যের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণের আবেদন জানানোর পক্ষে মত প্রকাশ করলেন। তিনি যদি অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণ করেন তাহলে উত্তম। অর যদি তিনি এই সৈন্য নিয়েই মুকাবিলার নির্দেশ দেন তাহলে সামনে এগুনোয়াবে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) লোকদেরকে খুব করে সাহস দিলেন এবং বললেন, "হে আমার কওমের লোকেরা। খোদার কসম, যে বস্তুর কামনায় তোমরা বাড়ী থেকে বের হয়েছিলে অর্থাৎ 'শাহাদাত ফি সাবিলিল্লাহ' তা তোমাদের সামনে রয়েছে, আর তোমরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ। আমরা কখনো দুশমনের সঙ্গে নিজেদের সংখ্যা ও সাজ সরঞ্জামের ভিত্তিতে যুদ্ধ করিনি। আমরা দুশমনের মুকাবিলা সব সময়ই সেই দীন ও ঈমানী শক্তির ভিত্তিতে করেছি যার বরকত আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দান করেছেন। চলো, সামনে অগ্রসর হও। আমাদের জন্য দুই ভালোর এক ভালো নির্ধারিত রয়েছে। হয় 'বিজয়ী' হবো না হয় 'শাহাদাত' লাভকরবো।"
ইবনে রাওয়াহার উত্তেজনাকর বক্তৃতায় লোকদের সাহস বাড়লো এবং তারা বলে উঠলেন, 'আল্লাহর কসম, ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) সত্য বলেছেন।”
ইবনে ইসহাক আরো লিখেছেন যে, মুসলমান বাহিনী রওয়ানা করলো। বালকাতে শত্রুপক্ষ। বালকার অন্যতম বস্তি মাশারিদের নিকটে ছিল শত্রুপক্ষ। আর মওতার বস্তির নিকট ছিল মুসলমানরা। মওতা নামক স্থানে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
যায়েদ (রাঃ) বিন হারিছা দুশমনের মোকাবিলা অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে, লড়লেন। তাঁর হাতে ছিল রাসূল (সাঃ) প্রদত্ত ঝান্ডা। তিনি তা সমুন্নত রাখলেন। বাহাদুরীর সঙ্গে লড়াই করলেন এবং আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় শহীদ হয়ে গেলেন। তারপর জাফর (রাঃ) বিন আবিতালিব ঝান্ডা তুলে নিলেন। তিনি ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। শত্রুর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু জাফর বাহাদুরীর সঙ্গে মুকাবিলা এবং স্ব বাহিনীর সাহস বৃদ্ধি করছিলেন। যুদ্ধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল এবং উভয়পক্ষের লোকজন গাজরকাটা হয়ে ভূতলে নিপতিত হচ্ছিল। জাফর (রাঃ) নিজের শাকরা নামক ঘোড়া থেকে নেমে এলেন এবং তার কুচ কেটে দিলেন। যাতে শত্রুরা তা ব্যবহার করতে না পারে। অতপর দুশমনের মুকাবিলায় বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন। দু'টি হাত কেটে গেল। অতপর নিজে শহীদ হয়ে গেলেন।
হযরত জাফরের (রাঃ) শাহাদাতের পর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা ঝান্ডা হাতে নিলেন এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বও কাঁধে তুলে নিলেন। তিনি ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। শত্রুর চাপ সে সময় সীমাতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছিল। আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার অন্তরে অল্প সময়ের জন্য দুর্বলতা ও সংশয়ের সৃষ্টি হলো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে সামলে নিলেন এবং মুখ দিয়ে এই কবিতা উচ্চারিত হলোঃ
"হে অন্তর! আমি কসম খেয়েছি যে, তোমাকে এই ময়দানে নামতেই হবে। খুশীর সঙ্গে সামনে অগ্রসর হলে কতই না সুন্দর। নচেৎ বাধ্য হয়েই তোমাকে একাজ করতে হবে।" "মানুষেরা সোৎসাহে সামনে অগ্রসর হচ্ছে ও চেচামেচী ও চীৎকারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এটা কেমন কথা যে আমি তোমাকে জান্নাতের দিকে পাগলের মত অগ্রসর না হয়ে ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় দেখছি।”
"দীর্ঘদিন যাবৎ তুমি আরাম-আয়েশে অতিবাহিত করেছ। একটি থলিতে (মায়ের পেটে) অপবিত্র পানির কাতরা ছাড়া আর তোমার তাৎপর্য কি হতে পারে।"
অধিকন্তু তিনি বললেন, " হে নফস (মৃত্যুতে ভয় পাও কেন) এখানে যদি গলা না কাটাও তাহলে এমনি এমনিই মৃত্যু এসে যাবে। মৃত্যুর হাম্মামখানা গরম হয়েছে।"
"যেবন্ধু তোমার কামনায় ছিল তাতো অনুপস্থিত (শাহাদাত)। যায়েদ (রাঃ) এবং জাফর (রাঃ) যে কাজ করেছে তা যদি তুমি কর তাহলে তুমি হেদায়াত ও সাফল্যের পথ পাবে।
এই কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে এলেন এবং দুশমনের সঙ্গে, হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। এই মুহূর্তে তাঁর চাচাতো ভাই এক টুকরো গোশতের হাড় নিয়ে তাঁর নিকট হাজির হলেন এবং বললেন, "এই গোশত খেয়ে শরীরে কিছুটা শক্তি বাড়িয়ে নিন। আপনি কয়েকদিন যাবৎ খুব কঠিন অবস্থায় কাটাচ্ছেন। তাঁর হাত থেকে তিনি সেই দস্তি নিলেন এবং কেবলমাত্র এক লোকমাই মুখে দিয়েছিলেন। এমন সময় ভয়ংকর আওয়াজ শুনলেন। তরবারী তরবারীতে ঝনঝনানি চলছিল এবং চেচামেচি উচ্চগ্রামে পৌঁছেছিল। তৎক্ষণাৎ তিনি নিজেকে বললেন, "পরিস্থিতি এত নাজুক, আর তুই এখনো দুনিয়ার আরাম-আয়েশেই মজে আছিস? গোশত ফেলে দিলেন এবং তরবারী নিয়ে দুশমনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শত্রুব্যূহ অতিক্রম করে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে আহত হয়ে শহীদ হয়ে গেলেন।
আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার (রাঃ) শাহাদাতের পর ছাবিত বিন আকরাম পতাকা তুলে ধরলেন এবং উচ্চস্বরে বললেন, "হে মুসলমানেরা। নিজেদের মধ্য থেকে উত্তম ব্যক্তিকে এই ঝান্ডা অর্পন করো।" লোকেরা বললো, "তুমিই তা তুলে ধরো।" তিনি বললেন, "আমি তার যোগ্য নই। লোকজন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদকে ঝান্ডা তুলে নেয়ার আবেদন জানালো। তিনি ঝান্ডা ধরলেন। দুশমনদেরকে পিছে হটিয়ে দিলেন। দুই বাহিনীর মধ্যে বেশ দুরত্ব সৃষ্টি হলো। কেননা অগ্রসরমান রোমক বাহিনীকে থামিয়ে দিয়ে হযরত খালিদ (রাঃ) বেশ পেছনে ঠেলে দিয়েছিলেন। অতপর হযরত খালিদ (রাঃ) সন্ধ্যার সময় নিজের বাহিনীসহ পেছনে চলে এলেন।
ইবনে ইসহাক বলেন, "আমি আহলে ইলম থেকে এই খবর পেয়েছি যে, যুদ্ধের আগুন জ্বলার সময় হুজুরে আকরাম (রাঃ) মদীনাতে খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, "যায়েদ (রাঃ) ঝান্ডা ধরলেন এবং বাহাদুরীর সঙ্গে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। অতপর জাফর (রাঃ) কমান্ড হাতে নিলেন এবং যায়েদের (রাঃ) পদাংক অনুসরণ করে তিনিও শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করলেন। তার পর হুজুর (সাঃ) কিছুক্ষণের জন্য চুপ মেরে রইলেন। সে সময় আনসারদের চেহারা লাল হয়ে গেল। তারা চিন্তা করলো যে, আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন রাওয়াহা হয়তো কোন দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলেছে।
হুজুরে আকরাম (সাঃ) কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার বললেন, "অতপর ঝান্ডা আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার হাতে এলো। তিনিও লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। আমাকে দেখানো হলো যে তাঁকে জান্নাতে পৌঁছানো হয়েছে। ফেরেশতারা তাঁকে সোনালী পালং-এ উঠিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছে। আমি দেখলাম যে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার পালং সম্পূর্ণ ঠিক-ঠাক ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম যে, এই পালং ঢিলা কেন? তখন আমাকে বলা হলো যে পূর্বেকার দুই জেনারেল নির্দ্বিধায় যুদ্ধে লাফিয়ে পড়েন, কিন্তু আবদুল্লাহ (রাঃ) কিছুটা সংশয় ও ইতস্ততঃ ভাব প্রকাশ করেছিলেন। তবে তিনিও আগে অগ্রসর হলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন।
হুজুরে আকরাম (সাঃ) যুদ্ধের ময়দান থেকে খবর আসার পূর্বেই এই শহীদদের শাহাদতের খবর শুনিয়ে দিয়েছিলেন।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00