📄 জাবির ওয়ালী
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, হযরত আওফ বিন মালিক আশজায়ী বলেছেন, হুজুর (সঃ) এক বাহিনী রওয়ানা করলেন। এই বাহিনীর আমীর ছিলেন আমর (রাঃ) বিন আস। এটা ছিল জাতুস সালাসিলের যুদ্ধ এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) আমাদের সঙ্গে শামিল ছিলেন। সফরকালে আমি কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। তারা একটি উট জবেহ করে রেখেছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে কারোরই তার গোশত ছাড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল না। আমি এই কাজে খুব পটু ছিলাম। আমি তাদেরকে বললাম, "আমি এই কাজ করতে পারি। শর্ত হলো গোশতের একটি অংশ আমাকেও দিতে হবে।" তারা এই শর্ত মেনে নিল।
আমি গোশত বানিয়ে দিলাম এবং নিজের অংশ নিয়ে সঙ্গীদের নিকট এলাম। আমরা গোশত রান্না করলাম এবং খেলাম। আবুবকর (রাঃ) এবং ওমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আওফ! তুমি এই গোশ্ত কোথা থেকে এনেছিলে? আমি তা তাদেরকে বললাম। তাঁরা আমার কাজকে ভালো মনে করলেন না এবং উভয়ে নিজেদের গলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বমি করে ফেললো।
সৈন্য বাহিনী মদীনা ফিরে এলে আমি সর্বপ্রথম মদীনা পৌঁছে গেলাম। অন্যরা তখনো অনেক পেছনে ছিল। হুজুরের (সঃ) খিদমতে হাজির হলাম। তিনি তখন নামায পড়ছিলেন। নামায থেকে ফারেগ হলে আমি অগ্রসর হয়ে সালাম করলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি আওফ বিন মালিক (রাঃ)?” আমি আরজ কললাম, "জ্বী হ্যাঁ।” তিনি বললেন, "জবিহা ওয়ালা আওফ।” এ ছাড়া আর রাসূলে করীম (সঃ) কিছু বললেন না।
📄 চিঠি দেওয়াকারী
কায়েস বিন আবি হাযেম ইয়াযিদ (রাঃ) বিন আবি শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি (ইয়াযিদ) বলতেন, "আমি মদীনার এক অপ্রশস্ত গলি দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। আমার পাশ দিয়ে একজন মহিলা অতিক্রম করছিল। আমি তার আচল ধরে নিজের দিকে টানলাম এবং তার রানে চিমটি দিলাম। পরের দিন হুজুরে আকরাম (সাঃ) লোকদের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করতে লাগলেন। আমিও বাইয়াতের জন্য হাজির হলাম।
আমি যখন হাত বাড়ালাম হুজুর (সাঃ) তখন নিজের হাত পিছনে নিলেন এবং বললেন, "তুমি কি সেই ব্যক্তি নও গতকাল যে চিমটি দিয়েছিলে?” আমি আরজ করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল। আমার বাইয়াত কবুল করুন। খোদার কসম। ভবিষ্যতে আমি আর এমন করবো না।” একথা শুনে হুজুর (সাঃ) আমার বাইয়াত গ্রহণকরলেন।"
📄 মারয়াদার হত্যাকারী
ওয়াকেদী (রাঃ) ইয়াহিয়া বিন আবদুল্লাহ বিন আবি কাতাদা থেকে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি (আবু কাতাদা (রাঃ) হারিছ বিন রাবয়ীল আনসারী) (সঃ) নির্দেশে জিকারদ ঝরনার নিকট আইনিয়া বিন হাসন এবং তার লুটপাটকারী সাথীদের বিরুদ্ধে মুকাবিলার জন্য গেলেন। সফল হয়ে মদীনা ফিরলে রাসূলের (সঃ) সঙ্গে রাস্তায় সাক্ষাত হলো। তিনি আমাকে দেখে বললেন, "হে আল্লাহ! তার দৈহিক শক্তি এবং চেহারার সৌন্দর্যে বরকত দাও।” তারপর আরো দোয়া করলেন এবং বললেন, " তোমার চেহারা আলোকিত হোক অর্থাৎ তুমি বিখ্যাত মানুষ হয়ে যাও।” জবাবে আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল। আপনিও খ্যাতিমান হোন।”
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি মাসয়াদা কাফেরকে হত্যা করেছো?" আমি আরজ করলাম, "জী হ্যাঁ। হে আল্লাহর রাসূল।”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার চেহারার ওপর এটা কি?” আমি আরজ করলাম, "শত্রুরা তীর মেরেছে। আর তা আমার চেহারাকে আহত করেছে।"
তিনি বললেন, "এদিকে আমার নিকট এসো” আমি তাঁর নিকটে গেলাম। তিনি আমার ক্ষতের ওপর তাঁর পবিত্র মুখের লালা লাগিয়ে দিলেন। আমার সেই ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে গেল এবং তারপর আমি আর কোনদিন আহত হইনি।"
📄 চক্ষুষ্মান মুজাহিদ
ওয়াকেদী এই ঘটনা বর্ননা করেছেন। বনু উমাইয়া বিন যায়েদের খান্দানের একজন মহিলা ছিল আসমা বিনতে মারওয়ান। সে ছিল ইয়াযিদ বিন যায়েদ ইবনুল খাতমীর স্ত্রী। এই মহিলা ইসলামের কট্টর দুশমন ছিল এবং হুজুরের (সঃ) প্রতি ছিল তার প্রচন্ড শত্রুতা। রাসূলে করীমের (সঃ) বিরুদ্ধে বিষাক্ত কবিতা রচনা করতো এবং অন্যদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতো। সে তার কতিপয় কবিতাতে বলেছিলোঃ "বনি মালেক এবং বনিয়ত দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছ। আওফ এবং বনি খাজরাজেরও ধ্বংস প্রাপ্তি ঘটেছে।”
"তোমরা এত বেশরম ও নীচু হয়ে গেছ যে, কোথাও থেকে আগমনকারী মর্যাদাহীন অপরিচিতের আনুগত্য কর। সে তো তোমাদের মধ্যকার নয়। মুরাদ ও মুজহাজ সকল গোত্রই নাকারাহ এবং কাপুরুষ হয়ে গেছে।”
"সরদারদের হত্যার পর তোমরা এমন বুজদিল হয়ে গেছ যে, ভয়ের কারণে তোমাদের নিঃশ্বাস টগবগ করা হাঁড়ির মত আওয়াজ বের করে।"
এই কবিতাবলী সেই মহিলার ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতার পূর্ণ ভাষ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। উমায়ের বিন আদি বিন খারশা বিন উমাইয়াতুল খাতমী একজন অন্ধ সাহাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং জাননিছার। তিনি সেই মহিলার কবিতার ব্যাপারে খুব ক্রদ্ধ ছিলেন। অবশেষে তিনি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন যে ইসলামের শত্রু সেই মহিলাকে তিনি শেষ করে দেবেন। তিনি বললেন, "হে আল্লাহ! আমি মানত করছি যে, রাসুলুল্লাহ যদি যুদ্ধের ময়দান থেকে সহিহ সালামতে মদীনা ফিরে আসেন তাহলে আমি সেই হতভাগা মহিলাকে হত্যা করবো।” সে সময় হুজুর (সাঃ) বদরে ছিলেন।
তাঁর (সঃ) বদর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর উমায়ের বিন আদি অর্ধ-রাতের সময় সেই মহিলার বাড়ী গেলেন। সে গভীর নিন্দ্রায় মগ্ন ছিল এবং তার চার পাশে ছোট বড় কয়েকজন সন্তান শুয়েছিল। উমায়ের (রাঃ) বিন আদি তার ছোট সন্তানদেরকে পৃথক করলেন এবং সেই মহিলার বুকের ওপর তরবারী রেখে তাকে হত্যা করলেন। তারপর সেখান থেকে চলে এলেন এবং ফজরের নামায মদীনায় হুজুরের (সঃ) ইমামতে আদায় করলেন।
সালাম ফিরানোর পর হুজুর (সঃ) উমায়েরের (রাঃ) দিকে দেখলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, উমায়ের (রাঃ) তুমি বিনতে মারওয়ানকে হত্যা করেছ?"
তিনি জবাব দিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল। আমার মাতা-পিতা আপনার ওপর কুরবান হোক। আমি এই কাজ করেছি। উমায়ের (রাঃ) ভয় পেয়ে গেলেন যে, এই হত্যার কারণে তাকে জবাবদিহী করতে হবে। সুতরাং তিনি আরজ করলেন "হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে কি কোন জরিমানা দিতে হবে। যদি তা দিতে হয় তাহলে তা নির্দেশ করুন।"
তিনি বললেন, "এ ব্যাপারে কেউই দ্বিমত পোষণ করতে পারে না। অর্থাৎ সেই মহিলার ইসলাম দুশমনি এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, সে এই পরিণতিরই যোগ্য ছিল। তিনি সমবেত সকলকে সম্বোধন করে বললেন, "তোমরা যদি এমন মানুষ দেখতে চাও যিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) ব্যাপারে কারোর কোন ঔদ্ধত্য বরদাশত করতে পারে না এবং না দেখে আল্লাহ ও তার রাসূলের (সঃ) সাহায্যের জন্য উঠে দাঁড়ায় তাহলে উমায়ের (রাঃ) বিন আদিকে দেখে নাও।”
হযরত ওমর (রাঃ) বিন খাত্তাব বলেন, "একটু এই অন্ধকে দেখ যে আল্লাহর আনুগত্যে এত কঠোর।” হুজুর (সাঃ) বললেন, অন্ধ বলো না। সে তো চক্ষুষ্মান।”
উমায়ের (রাঃ) যখন গ্রামে ফিরলেন তখন নিহত মহিলার দাফন হচ্ছিল। তাঁকে দেখে লোকজন তাঁর দিকে এগিয়ে এলো এবং বললো, "হে, উমায়ের। একি তোমার কাজ?” তিনি জবাব দিলেন, "হ্যায়, তোমরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে চাইলে কর এবং অবশ্যই আমাকে কোন সুযোগ দেবে না। খোদার কসম। সে যেসব কথা বলতো তোমরাও যদি সেই সব কথা বলো তাহলে এই তরবারি দিয়ে তোমাদের সকলকে আমি হত্যা করে ফেলবো অথবা নিজের জীবন কুরবান করে দেব।
বনু কাতমার অনেক মানুষ ইসলামে প্রভাবিত হয়েছিল। কিন্তু ভয়ে তা প্রকাশ করতো না। সেদিন তারাও প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করলো।"