📄 ক্ষকদের পানি
ইমাম বুখারী (রাঃ) মুসাদ্দাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াহিয়া বিন সাঈদ আওফ থেকে এবং তিনি আবু রিজা থেকে এবং তিনি ইমরান থেকে শুনেছেন। তিনি বলতেন, "আমরা রাসূলের (সঃ) সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। আমরা সারা রাত হাঁটলাম। এমনকি রাত শেষ হয়ে এলো। আমাদের প্রচণ্ড ঘুম পেল। এমন অবস্থায় মুসাফিরের জন্য ঘুমের চেয়ে বেশী মিষ্টি বস্তু আর হয় না। অতএব আমরা ঘুমিয়ে গেলাম। সূর্যের তাপ আমাদের না জাগানো পর্যন্ত আমরা ঘুমিয়ে রইলাম।
সর্ব প্রথম অমুক অমুক এবং অমুক উঠলো। চতুর্থ নবরে ওমর (রাঃ) বিন খাত্তাবের চোখ খুললো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ঘুমাতেন তখন আমাদের মধ্য থেকে কেউ তাকে জাগাতে সাহস পেতো না। কেননা স্বপ্নে আল্লাহ পাক হুজুরকে (সঃ) কি দেখাতেন তা আমরা জানতাম না। হযরত ওমর (রাঃ) যখন জাগলেন তখন দেখলেন যে ঘুমের কারণে নামাযের সময় চলে গেছে। এই অবস্থায় তিনি উচ্চৈস্বরে আল্লাহু আকবার তাকবির বলা শুরু করলেন এবং অব্যাহতভাবে তাকবির দোহরাতে লাগলেন। এমনকি তাঁর আওয়াজ শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ঘুম থেকে জাগলেন তখন লোকজন তাঁর সামনে এই অবস্থায় পেরেশানী প্রকাশ করলো। তিনি বললেন, "কোন চিন্তা নেই, সফরের জন্য তৈরী হও। অতপর লোকজন সফরে রওনা হলো। কিছুদূর যাওয়ার পরই হুজুর (সঃ) নিজের সওয়ারী থেকে নামলেন এবং ওজুর জন্য পানি চাইলেন। ওজুর পর আযান দেওয়া হলো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়ালেন। তিনি যখন নামায থেকে ফারেগ হলেন তখন দেখলেন যে এক ব্যক্তি পৃথক বসে আছে। নামাযে শামিল হয়নি। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে অমুক ব্যক্তি! তোমাকে কিসে নামায থেকে বিরত রেখেছে? সে জবাব দিল, জনাব। আমার শুক্রক্ষরণ হয়েছে। গোসলের জন্য পানি নেই। তিনি (সঃ) বললেন, "মাটি দিয়ে তাইয়াম্মুম কর। তোমার পবিত্রতার জন্য এটাই যথেষ্ট।"
তারপর লোকজন আবার চলা শুরু কললো এবং কিছু দূর গেয়ে পিপাসার কথা জানালো। হুজুর (সঃ) সওয়ারী থেকে নামলেন এবং হযরত আলী (রাঃ) ও অন্য একজন সাহাবীকে ডাকলেন এবং বললেন, "যাও এবং পানি তালাশ করো।” সুতরাং তাঁরা উভয়ে গেলেন এবং কিছু দূরে 'তারা একজন মহিলাকে দেখতে পেলেন। মহিলাটি উটের ওপর সওয়ার ছিল। সে উটের ওপর বড় বড় দুটি মশকে পানি ভরে রেখেছিল। তাঁরা সেই মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন যে পানি কোথায়? সে জবাব দিল, "কাল এই সময় আমি পানি নিয়ে পুকুর থেকে রওনা দিয়েছিলাম। তাঁরা বললেন, অমাদের সঙ্গে এসো। সে বললো কোথায়? সাহাবীরা বললেন, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট। সে বলতে লাগলো, " সে ব্যক্তি যাকে ছারি বা ধর্মদ্রোহী বলা হয়ে থাকে। তাঁরা জবাব দিলেন, "হাঁ, তুমি ঠিকই বুঝেছ। অতএব আমাদের সঙ্গে চল।” তারপর তাঁঁরা তাকে নিয়ে রসূলের (সঃ) সামনে সেই মহিলার সঙ্গে অনুষ্ঠিত কথার্বাতার কথা বর্ণনা করলেন। তিনি (সঃ) বললেন ঐ মহিলাকে উট থেকে নামাও। অতপর হুজুর (সঃ) একটি পাত্র আনালেন এবং মশক দুটির মুখ খুলে তা থেকে সামান্য পানি পাত্রটিতে ঢাললেন এবং মশকদুটির মুখ বন্ধ করে দিলেন এবং লোকদেরকে ডেকে বললেন, যার পানি পান করার প্রয়োজন সে এসে পানি পান করে নিক এবং যার পাত্রে নেওয়া দরকার সে পাত্রে ভরে নিক। এরপর যার ইচ্ছা সে পান করে নিল এবং যার ইচ্ছা পাত্রে ভরে নিল। শেষে আমি একটি পাত্র ভরে সেই ব্যক্তিকে দিলাম যে শুক্রক্ষরণের কথা বলেছিল এবং তাকে বললাম, " যাও এবং এই পানি দিয়ে গোসল কর।"
ইমরান আরো বলেন, সেই মহিলা দাঁড়িয়ে আশ্চর্য হয়ে সবকিছু দেখছিলো। খোদার কসম। সে এমন হতভম্ব হলো যে বর্ননা করা যায় না। রাসুলে (সঃ) খোদা বললেন, তাঁর জন্য কিছু খেজুর, আটা এবং ছাতু যা তোমাদের নিকট আছে জমা কর।" সাহাবীরা (রাঃ) খানাপিনার সামান্য জমা করলেন এবং তা একটি কাপড়ে বেঁধে মহিলাকে উটের ওপর সওয়ার করালেন ও পুটলী তার সামনে রেখে দিলেন। হুজুর (সঃ) বললেন, "তুমি জানো যে আমি তোমার পানি কমাইনি। বরং আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পানি পান করিয়েছেন।"
মহিলাটি যখন নিজের পরিবার পরিজনের নিকট পৌঁছালো তখন তারা তাকে কোথায় এত দেরী করেছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো। সে বললো, "আমি এক আশ্চর্য ও অভূতপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। রাস্তায় আমার সঙ্গে দু'ব্যক্তির দেখা হয়েছিল। তারা আমাকে কথিত সেই ছাবির নিকট নিয়ে গিয়েছিল।” অতপর সে সমগ্র ঘটনা বর্ণনা করলো এবং বললো, "খোদার কসম, আসমান ও যমিনের মধ্যে হয় তার চেয়ে বড় কোন জাদুকর নেই অথবা সে আল্লাহর সত্যিকার রাসূল।"
মুসলমানরা যখন সেই এলাকায় মুশরিকদের ওপর হামলা করতেন তখন সেই মহিলা যে বস্তিতে থাকতো তার ওপর হামলা করতো না। একদিন সে নিজের কবিরার লোকদেরকে বললো যে, "তারা তোমাদের চার পাশে হামলা করেছে। কিন্তু তোমাদেরকে জেনে শুনে ছেড়ে দিচ্ছে। তার চেয়ে বরং তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম।” তারা তার কথা মেনে নিল এবং ইসলাম গ্রহণ করলো।
📄 চামড়ার পাত্রের পানি
ইমাম বুখারী (রা) মুসা বিন ইসমাইল, আবদুল আজীজ বিন মুসলিম হিছিন ও সালিম বিন আবিল জায়াদ-এর উদ্ধৃতিসহ হযরত জাবের (রাঃ) বিন আবদুল্লাহ এই হাদিস নকল করেছেন। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার দিন লোকজন পিপাসায় বড় কাতর। কারোর নিকট পানি নেই। রাসুলের (সঃ) নিকট একটি চামড়ার পাত্র ছিল। লোকজন তাঁর (সঃ) চার পাশে জমা হলো। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন ব্যাপারকি? তারা বললেন, আমাদের নিকট না ওজুর পানি আছে, না খাবার পানি। পানি বলতে আপনার কাছে যা আছে তাই।
জাবের (রাঃ) বলেন, এ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাত চামড়ার পাত্রে রাখলেন। তখন আঙ্গুল দিয়ে পানির ঝরনা ধারা প্রবাহিত হলো। অমরা আসুদাহ হয়ে পানি পান করলাম এবং ওজুও করলাম। সালেম বলেন, আমি হযরত জাবেরকে (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলাম, তোমরা সংখ্যায় কত ছিলে?" তিনি বললেন, আমরা যদি এক লাখও হতাম তা হলেও সেই পানি আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। যা হোক আমরা সে সময় প্রায় ১৫'শ মানুষ ছিলাম।”
📄 পরাজিত কুবাজ
ওয়াকেদী বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর থেকে মুহাম্মদ বিন আবি হামিদ এবং তাঁর থেকে আবদুল্লাহ বিন আমর বিন উমাইয়া বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা আমর বিন উমাইয়াকে বদরের যুদ্ধে পরাজিত মুশরেকদের একজন বললো যে, এই পরাজয়ে তারা খুব বিস্মিত হয়েছিল। পরাজিত হয়ে তারা মক্কার দিকে পালাচ্ছিল এবং মনে মনে বলছিল যে, এ ধরণের পরাজয়তো মহিলারাই স্বীকার করতে পারে।
কুবাছ ইবনে আশিমুল নিকনানী বলতেন যে, সে বদরের যুদ্ধে মুশরেকদের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল। তার বর্ণনা হলো, "আমি দেখলাম যে মুহাম্মদের (সঃ) সাথীদের সংখ্যা খুবই কম এবং আমাদের পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যের সংখ্যা অনেক বেশী। অতপর আমি পরাজয়ের দৃশ্য দেখলাম এবং আমিও পলায়নকারীদের সঙ্গে পালালাম। আমি মুশরিকদের প্রত্যেকের চেহারার দিকে তাকালাম এবং মনে মনে বললাম, "এ ধরনের পরাজয় তো আমি কখনো দেখিনি। মহিলারাইতো এভাবে পালিয়ে থাকে।”
আমি পালাচ্ছিলাম এবং ভয়ও পাচ্ছিলাম যে, কোথাও ধরা না পড়ে যাই। সাধারন রাস্তা ছাড়া আমি অপরিচিত রাস্তা ধরলাম। গাইকা নামক স্থানে আমার কওমের এক ব্যক্তির সাথে আমার দেখা হলো এবং সে আমার অবস্থার কথা জিজ্ঞাস করলো। আমি বললাম, "কি জিজ্ঞাসা করো?" আমাদের লোকজন ধরাশায়ী হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আমরা শোচনীয় ভাবে পরাজয় বরণ করেছি। তুমি কি আমাকে তোমার সওয়ারীর ওপর নেবে?”
সে আমাকে তার সওয়ারীর ওপর তুলে নিল এবং পথ চলার পাথেয় দিল। আমরা জুহফা পৌঁছলাম। অতপর আমি মক্কা প্রবেশ করলাম। মক্কা প্রবেশের পূর্বে আমি গামিম নামক স্থানে হাইসুমান ইবনে হাবিসুল খাজায়ী কে দেখলাম। আমার জানা ছিল যে, সে তাড়াতাড়ী মক্কা পৌঁছে কতলে আমের বা ব্যাপক হত্যাকান্ডের খবর দেবে। আমি ভাবলাম যে, এই দুঃসংবাদ আমার পূর্বেই তার মুখে শুনুক। আমি থেমে গেলাম এবং সে আমার পূর্বেই মক্কায় প্রবেশ করলো। সে মক্কা বাসীকে তাদের নিহতদের খবর শুনালো। তারা কান্নাকাটি ও বুক চাপড়াতে লাগলো এবং সঙ্গে সঙ্গে খাজায়ীকে গালি দিতে লাগলো। সে তাদেরকে ভালো কোন খবর শুনানোর পরিবর্তে কোমর ভেঙ্গে দেয়ার খবর শুনালো।
কুবাছ বলেন, খন্দকের যুদ্ধের পর আমার অন্তরে কিছুটা পরিবর্তন সূচিত হলো। অমি চিন্তা করলাম যে মদীনা যাবো এবং দেখবো যে মুহাম্মদ (সঃ) কি বলেন। আমার অন্তরে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে হুজুরের (সঃ) ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। লোকজন আমাকে বললো যে, তিনি মসজিদের দেয়ালের ছায়ায় বসে আছেন। তাঁর সঙ্গে সাহাবার (রাঃ) একটি দলও ছিল। আমি সেখানে পৌঁছলাম। সাহাবীদের মধ্যে আমি তাঁকে চিনতে পারলাম না। সালাম করলাম। হুজুর (সঃ) বললেন, "হে আশিমের পুত্র কুবাছ। তুমি বদরের দিন বলে ছিলে যে, " এমন পরাজয় তো আমি কখনো দেখিনি। মহিলারাইতো এভাবে ভেগেথাকে।”
আমি তাঁর মুখে এ কথা শুনতেই কালেমায়ে শাহাদাত পড়লাম এবং বললাম, "আমিতো এই কথা মনে মনেই বলেছিলাম এবং কারোর সামনেই তা প্রকাশ করিনি। আপনি যদি আল্লাহর নবী না হতেন তাহলে এই ঘটনার খবর আপানি কখনই পেতেন না। আল্লাহ আপনাকে এ কথা বলেছেন। আপনি আপনার হাত বাড়িয়ে দিন যাতে আমি বাইয়াত করতে পারি। তিনি আমার সামনে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা এবং শিক্ষা পেশ করলেন এবং আমি ইসলামে প্রবেশ করলাম।"
📄 নাজ্জাশীর মৃত্যু
ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন, তিনি যুহায়ের বিন হারব থেকে, তিনি ইয়াকুব বিন ইবরাহীম থেকে, তিনি সালেহ থেকে এবং তিনি ইবনে শিহাব থেকে শুনেছেন।
ইবনে শিহাব এই রাওয়ায়েতে আবু সালমা বিন আবদূর রহমান এবং ইবনুল মুসাইয়িবের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের উভয়কেই হযরত আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যেদিন হাবশার বাদশা নাজ্জাশীর মৃত্যু হলো সেদিন হুজুর (সঃ) সাহাবীদেরকে (রাঃ) এই ঘটনার খবর দিলেন এবং বললেন, "নিজের ভাইয়ের জন্য মাগফিরাত কামনা কর।"
মুসা বিন উকবা নিজের মাতা থেকে এবং তিনি উম্মে কুলছুম বিনতে আবি সালমা থেকে বর্ণনা করেন যে, হুজুরে পাক (সঃ) যখন হযরত উম্মে সালমাকে (রাঃ) বিয়ে করেন তখন তাঁকে বলেছিলেন যে, "আমি একটি রেশমী হুল্লাহ বা চাদর এবং কয়েক আওকিয়া মিশক উপঢৌকন স্বরূপ নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করছি। কিন্তু আমার যেন মনে হয় যে, নাজ্জাশী বাদশাহর মৃত্যু ঘটেছে এবং আমার উপঢৌকন ফিরে আসবে। এই উপঢৌকন ফিরে আসলে হুল্লাহটি তুমি নেবে।
যেভাবে হুজুর (সঃ) ইরশাদ করলেন সেই অনুযায়ী নাজ্জাশী মারা গিয়েছিলেন এবং হুজুরের (সঃ) উপঢৌকন ফিরে এসেছিল। হুজুর (সঃ) নিজের প্রত্যেক স্ত্রীকে এক এক আন্তকিয়া মিশক দিলেন এবং অবশিষ্ট সকল মিশক ও হুল্লাহ উন্মে সালমাকে দিলেন।