📄 খন্দকের পাথর
ইবনে ইসহাক হযরত সালমান (রাঃ) ফারসীর জবানীতে এই ঘটনা বর্ণনা করছেন। হযরত সালমান বলেন, "খন্দক খোঁড়ার সময় একটি কঠিন পাথর দেখা গেল। আমি তা ভাঙ্গার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সফল হলাম না। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমার নিকটেই খোঁড়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি যখন এই পরিস্থিতি দেখলেন তখন আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন এবং কোদাল ধরলেন। তিনি পাথরের ওপর কোদাল মারলেন। কোদালের নীচে দিয়ে বিদ্যুতের শিখা বের হলো অতপর দ্বিতীয় বারেও একই ধরনের শিখা দেখা গেল। তৃতীয় বারেও বিদ্যুতের চমক সৃষ্টি হলো এবং পাথর ভেঙ্গে গেল।
আমি আরজ করলামঃ "আমার মাতা পিতা আপনার ওপর কুরবান হোক। হে আল্লাহর রাসূল। আপনি যখন কোদাল মারছিলেন তখন কোদালের নীচে আমি আগুনের শিখা উঠতে দেখেছি। এই শিখা কিসের ছিল?
তিনি বললেন, "সালমান সত্যিই কি তুমি এই শিখা দেখেছ?
আমি ইতিবাচক জবাব দিলাম। তাতে হুজুর (সাঃ) বললেন, "প্রথম কোদালে যে শিক্ষা বের হয়েছিল তাতে আল্লাহ পাক আমাকে ইয়েমেনের ওপর বিজয় দান করেন। দ্বিতীয় বারের শিখায় আল্লাহ পাক আমার জন্য সিরিয়া বিজয়ের পথ সুগম করেন এবং তৃতীয় বারের শিখায় আল্লাহ তায়ালা পূর্বের দেশসমূহের বিজয় আমার জন্য নির্ধারিত করে দেন। ইবনে ইসহাক আরো বর্ণনা করেন যে, তিনি বিশ্বস্ত রাবীদের মুখে হযরত আবু হুরায়রার (রাঃ) এই রাওয়ায়েত শুনেছেন। হযরত ওমর (রাঃ) এবং হযরত ওসমানের (রাঃ) খিলাফতকালের বিজয়সমূহে তিনি বলতেন, "যত এলাকা চাও জয় করতে থাকো। খোদা এই সব বিজয় মুবারক করুন। মদীনা থেকে বিশ্বের দূর দূরান্ত পর্যন্ত এবং আজ থেকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত নত এলাকার ওপর আমরা বিজয় পতাকা উড্ডীন করবো তার অবস্থা আল্লাহ তায়ালা নিজের মাহবুব পয়গাম্বরকে (রাঃ) বলে দিয়ে ছিলেন। আসমান জমিনের মালিক সেইসব এলাকার চাবি নিজের নবীকে প্রদান করেছিলেন।"
📄 আমের বিন আকওয়ার শাহাদাত
ইবনে ইসহাক মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম ইবনুল হারিছুত তাইমী থেকে এবং তিনি আবুল হাইছাম নাসার বিন দাহার আসলামী থেকে এবং তিনি নিজের পিতা থেকে শুনেছেন যে, এক সফরকালে হুজুরে আকরাম (সাঃ) সালমাহ বিন আমর বিন আকওয়ার চাচা আমের বিন আকওয়াকে বললেন, "ইবনে আকওয়া কিছু হুদ্দিখানি কর। যাতে উট দ্রুত চলতে পারে।"
ইবনে আকওয়া উট থেকে নেমে পায়ে হেটে চলতে লাগলেন এবং হদ্দির জন্য যুদ্ধগাথার কবিতা পড়তে লাগলেন। এই কবিতায় রাসূলকে (সাঃ) নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল যে যুদ্ধের সময় সাহাবি বৃন্দ (রাঃ) অটলতা প্রদর্শন করবেন। সেই কবিতা হলোঃ
والله لولا الله ما اهتدينا ولا تصدقنا ولا صلينا ! انا اذا قوم بغوا علينا وان ارادوا فتنة ابينا ! فانزلنا سكينة علينا وثبت الاقدام ان لا قينا !
"খোদার কসম। খোদা যদি আমাদেরকে তাওফিক না দিতেন তাহলে আমরা হেদায়াত প্রাপ্ত হতাম না। না আমরা সাদকা দিতাম, না আমরা নামায পড়তাম। অর্থাৎ তিনি আমাদেরকে বিশেষ রহমতে ইসলামের হেদায়াত দিয়েছেন এবং আমরা এই পবিত্র জীবন গ্রহণ করেছি।"
সেই রাস্তায় চলতে গিয়ে যখন কোন শত্রু আমাদের বিরুদ্ধে চড়াও হয় তখন আমরা বযদিলী প্রদর্শন করি না। যারা আমাদের জন্য ফিতনা সৃষ্টি করতে চায় আমরা তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা মিশ্রিত ক্রোধ প্রকারতাম।
হে মাওলায়ে করিম। আমাদের অন্তরে প্রশান্তি দাও এবং দুশমনের সঙ্গে যদি মুকাবিলা হয়ে যায় তাহলে অটলতা দান কর।"
প্রিয় নবী (সাঃ) এই কবিতা শুনে খুশী হলেন এবং ইবনে আকওয়াকে يرحمك الله "আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন" এই দোয়া করলেন। তিনি যদি কোন সাহাবীকে কখনো এই দোয়া করতেন তখন সে শাহাদাতের মর্যাদায় আসীন হয়ে যেতেন।
হযরত ওমর (রাঃ) সেই সময়ই বলে ফেললেন, "হে আল্লাহর রাসূল। খোদার কসম, ইবনে আকওয়ার শাহাদাত তো আবশ্যিক হয়ে গেল। সে যদি আরো কিছু দিন আমাদের সঙ্গে থাকতো তাহলে কতই না ভালো হতো।"
আমের বিন আকওয়া (রাঃ) খায়বারের যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেলেন। তাঁর শাহাদাতের ঘটনা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে তাঁর নিজের তরবারীই উল্টে তাকে আঘাত করে বসে। যখম খুব মারাত্মক ছিল। তাতেই তার ওফাত হয়।
তাঁর শাহাদাতের ব্যাপারে লোকদের সন্দেহ হলো এবং বললো, "সেতো নিজের তরবারীর আঘাতেই আহত হয়ে নিহত হয়েছেন।" আমের বিন আকওয়ার ভাতুষ্পুত্র সালমাহ বিন আমর এইসব কথা শুনে হুজুরে আকরামের (রাঃ) খিদমতে হাজির হলেন এবং লোকজনের মন্তব্যের কথা উল্লেখ করলেন। হুজুরে আকরাম (সাঃ) একথা শুনে বললেন, انه الشهيد অবশ্যই সে হক পথে শাহাদাত পেয়েছে। অতপর তিনি তাঁর নামাযে জানাযা পড়ালেন এবং সকল মুসলমান তাঁর জানাযার নামায পড়লেন।
📄 আবুল ইয়াসারের জন্য রাসূলের (সাঃ) দোয়া
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, বুরাইদাহ বিন সুফিয়ান আসলামী তাঁকে এই ঘটনা কয়েকজন বর্ণনাকারীর মুখ দিয়ে শুনিয়েছেন। আবুল ইয়াসার কা'ব বিন ওমর বলেন, "আমরা হুজুরে আকরামের (সাঃ) সঙ্গে খায়বারের যুদ্ধে ছিলাম। রাত হয়ে যাচ্ছিল। আমরা ইহুদীদের দূর্গ অবরোধ করেছিলাম। হঠাৎ করে ভেড়া-ছাগলের একটি দল সেখান দিয়ে অতিক্রম করলো। তার মালিক ছিল একজন ইহুদী এবং দুর্গে ফিরে যাচ্ছিল।
হুজুরে আকরাম (সাঃ) ইরশাদ করলেনঃ "এইসব বকরীর মধ্য থেকে দুচারটা আমাদের খাওয়ার জন্য কে নিয়ে আসতে পারে?” আবুল ইয়াসার বলেন, "আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি এই কাজ করতে পারি।” তিনি বললেন, "ঠিকআছে।”
আমি উট পাখীর মত গিয়ে বকরীর পালে ঢুকে পড়লাম। পালের প্রথম অংশ দুর্গে ঢুকে পড়েছিল। আমি শেষ অংশ থেকে দু'টো ধরলাম এবং তা বগলদাবা করে নিজের সৈন্যবাহনীর দিকে রওয়ানা করলাম। আমি এমনভাবে আসছিলাস যে আমার নিকট যেন কোন বোঝাই নেই।
আমি যখন বকরী নিয়ে হুজুরে আকরামের (সাঃ) খিদমতে পেশ করলাম তখন তিনি তা জবেহ করার নির্দেশ দিলেন এবং সকলেই তার গোশত খেলেন।"
রাসুলের (সাঃ) সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে হযরত আবুল ইয়াসারই (রাঃ) সর্বশেষে ওফাত পান। হজুরে আকরাম (সাঃ) তাঁর কল্যাণের জন্য দোয়া করেছিলেন। তিনি দীর্ঘজীবন পেয়েছিলেন। শেষ জীবনে তিনি কখনো এই ঘটনা বর্ণনা করলে অশ্রু ঝরে পড়তো এবং বলতেন, "আমার থেকে উপকৃত হও। আমার বয়সের কসম। সাহাবীদের (রাঃ) দলের আমিই রয়ে গেছি। বাকী সবাই বিদায় নিয়ে গেছেন।”
📄 বিষমিশ্রিত বকরী
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, হুজুরে আকরাম (সাঃ) খায়বারের দুর্গ জয় করে যখন সেখানে ইতমিনানের সঙ্গে অবস্থান করলেন তখন সাল্লাম বিন মাশকাম ইহুদীর স্ত্রী যয়নব বিনতিল হারিছ প্রিয় নবীকে (সাঃ) একটি হাদিয়া পাঠালো। হাদিয়াটি ছিল মুসাল্লাম গোশতের আকারে একটি বকরী। মহিলাটি হাদিয়া প্রেরণের পূর্বে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, হুজুর (সাঃ) বকরীর কোন অংশের গোশত বেশী পছন্দ করেন। তাকে বলা হয়েছিল দস্তির গোশত তিনি বেশী পছন্দ করেন।
মহিলাটি বকরীর গোশতে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল এবং বিশেষভাবে দস্তিকে বেশী করে ভুনেছিল। অতপর এই তুনা বকরী নিয়ে সে হুজুরের (সাঃ) সামনে রেখে দিলো। হুজুর (সা:) দস্তির গোশত নিলেন। কিন্তু তিনি তা তখনো খাননি। তার পাশে সাহাবী হযরত বাশার (রাঃ) বিন বারা' বিন মরুরও বসেছিলেন। তিনি গোশতের একটি টুকরো নিলেন এবং খেয়ে ফেললেন। প্রিয় নবী (সাঃ) মুখে লোকমা তো নিলেন কিন্তু না গিলে উগড়ে দিলেন। অতপর বললেন, বকরীর হাড় আমাকে খবর দিচ্ছে যে এটা বিষাক্ত।
সেই মহিলাতো বকরী রেখে চলে গিয়েছিল। তিনি তাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠালেন। সে আসার পর তিনি তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। সে অপরাধ স্বীকার করলো। তিনি তাকে এই অপরাধমূলক কাজ কেন করেছে তা জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে সে বললো "আপনি আমার কওমের সঙ্গে যে আচরণ করেছেন তা আপনার নিকট গোপনীয় ব্যাপার নয়। আমি ধারনা করেছিলাম যে, আপনি যদি দুনিয়ার বাদশাহদের মত বাদশাহ হন তাহলে বিষ মিশ্রিত গোশত খেয়ে মারা যাবেন এবং আমি শাস্তি পাবো এবং প্রতিশোধের আগুন ঠান্ডা হবে। আর আপনি যদি নবী (সাঃ) হন তাহলে আল্লাহ আপনাকে খবরদার করবেন।"
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন যে, এই স্বীকৃতির পর হুজুর (সাঃ) তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু দ্বিতীয় রাওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, সে সময় তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। তবে পরে সেই বিষের ক্রিয়ায় হযরত বশিরের (রাঃ) ওফাত হলে তিনি ইসলামী আইন অনুযায়ী সেই মহিলার ওপর কিসাসের হদ জারি করেন এবং তাকে কতল করা হয়।