📄 প্রস্তরময় ভূমি
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, খন্দকের যুদ্ধের সময় পরিখা খনন করতে গিয়ে এমন কয়েকটি ঘটনা সংঘটিত হয়, যা সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ ও রাসুলের (সাঃ) নবুয়তের সত্যতা প্রমাণ করে। মুসলমানরা সেই সব ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছিলেন।
জাবের (রাঃ) ইবনে আব্দুল্লাহ বলতেন, খন্দক বা পরিখা খননের সময় এক জায়গায় মরুভূমির কঠিন পাথর দেখা দিল। পাথরও এমন যে কোন ক্রমেই তা ভাংছিল না। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) হজুরে আকরামের নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন, কোন পাত্রে পানি নিয়ে এসো। তিনি সেই পানিতে ফুঁ দিলেন। অতপর তিনি দীর্ঘক্ষণ আল্লাহর নিকট দোয়া করতে থাকলেন। দোয়া শেষে তিনি সেই পানি পাথরের উপর ঢেলে দিলেন। উপস্থিত সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে একজন বলেন "সেই সত্তার শপথ। যিনি মুহাম্মদকে (সাঃ) সত্য নবী (সাঃ) বানিয়ে প্রেরণ করেছেন। সেই পাথর দেখতে দেখতে বালির মত নরম হয়ে গেল। কোদাল অথবা অন্য অস্ত্র দিয়ে তা না ভেঙ্গে উঠিয়ে ফেলা যেত, না খন্ড বিখন্ড করা যেত।
📄 বশির কন্যার খেজুর
সাঈদ বিন মিনার উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, খন্দকের যুদ্ধের সময় নু'মান বিন বশিরের বোন এবং হযরত বশির বিন সায়াদের কন্যার সঙ্গে এই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি বলেন যে, আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা আমাকে ডাকলেন এবং বললেন "মা আমার, এই খেজুর নিয়ে গিয়ে তোমার পিতা ও মামা আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে দিয়ে এসো।” একটি কাপড়ে করে এক মুঠের মত খেজুর নিয়ে আমি খন্দকের দিকে গেলাম। এই আমার আব্বা এবং মামার দ্বিপ্রহরের খাবারছিল।
আমি আমার পিতা ও মামাকে খোঁজ করছিলাম। এমন সময় হুজুর (সাঃ) এক স্থানে আমাকে দেখে ফেললেন। তিনি বললেন, "বেটি এসো। তোমার কাছে একি? "আমি আরজ করলাম" হে আল্লাহার রাসূল। এ হলো খেজুর। আমার মা আমার পিতা ও মামুর পেটের আগুন নেভানোর জন্য আমার নিকট দিয়ে পাঠিয়েছেন।”
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "এগুলো আমাকে দাও।” আমি খেজুরগুলো হজুরে আকরামের (সাঃ) হাতে দিয়ে দিলাম। তার হাত সেই খেজুরে পূর্ণ হলো না। যাহোক, তিনি দস্তরখান বিছানোর নির্দেশ দিলেন এবং বিছানোর পর খেজুরগুলো তার ওপর ছড়িয়ে দিলেন। অতপর তিনি সকলকে খাওয়ার জন্য ডেকে আনতে কাউকে নির্দেশ দিলেন। বশির কন্যা বলেন, "খন্দকবাসী দস্তরখানে একত্রিত হলেন এবং খাওয়া শুরু করলেন। একদল খেয়ে উঠে যেতেন এবং দ্বিতীয় দল এসে খাওয়া শুরু করতেন। এভাবে সকল খন্দকবাসীই পেট পুরে খেলেন। কিন্তু খেজুর শেষ হলো না। খোদার কসম। দস্তরখানের ওপর তখনো খেজুর মওজুদ ছিল এবং তা কিনার দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিলো।"
📄 জাবেরের (রাঃ) খাবার
ইবনে ইসহাক সাঈদ বিন মিনার এবং জাবের (রাঃ) বিন আব্দুল্লাহার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ননা করেছেন যে, হযরত জাবের (রাঃ) বিন আবদুল্লাহ হুজুরে আকরামের (সাঃ) সঙ্গে পরিখা খননে ব্যাপৃত ছিলেন। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন, তার নিকট একটা ছোট ধরনের দুর্বল বকরী ছিল। তিনি ধারণা করলেন যে, প্রিয় নবী (সাঃ) বেশ কিছুদিন যাবৎ অভুক্ত রয়েছেন। এই বকরী জবেহ করে হুজুরের (সাঃ) মেহমানদারীর ব্যবস্থা করলে কেমন হয়।
তিনি আরো বলেন, "আমি স্ত্রীকে আটা বানাতে বললাম। সুতরাং সে আটা বানিয়ে রুটি তৈরী করলো। আমি বকরী জবেহ করলাম এবং রাসূলের (সাঃ) জন্য গোশত ভুনলাম। যখন সন্ধ্যা হলো এবং হুজুর (সাঃ) খন্দক থেকে বাড়ীর দিকে যেতে লাগলেন তখন আমি অরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমার নিকট একটি বকরী ছিল। আজ আমি তা জবেহ করেছি এবং রুটি তৈরী করেছি। অপনি আমাদের বাড়ি তাশরীফ নিয়ে আমাদেরকে মেযবানীর সুযোগ দানে বাধিত করুন। আমিতো শুধু হুজুরকেই (সাঃ) দাওয়াত দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি দাওয়াত দিতেই তিনি তা কবুল করেন এবং কোন আহবানকারীকে সকলকে ডেকে জাবের বিন আবদুল্লাহর বাড়ী পৌঁছে যাওয়ার কথা বলতে বললেন।"
আমি মনে মনে ইন্নালিল্লাহ পড়লাম। কেননা খাবারতো খুবই কম ছিল। যাহোক হজুরে আকরাম (সাঃ) সাহাবার (রাঃ) দল নিয়ে আমার বাড়ী প্রবেশ করলেন এবং বসে গেলেন। আমি তাঁর সামনে খানা এনে রাখলাম। তিনি আল্লাহর নাম নিলেন। বরকতের দোয়া করলেন এবং খানা খেলেন। লোকজন পালাক্রমে খাবার খাওয়ার জন্য আসতে লাগলেন এবং পেট পুরে খেতে লাগলেন। কয়েক পালায় তাঁরা খাবার খেলেন। এমনকি সকল খন্দকবাসীরই পেট ভরে গেল।
📄 খন্দকের পাথর
ইবনে ইসহাক হযরত সালমান (রাঃ) ফারসীর জবানীতে এই ঘটনা বর্ণনা করছেন। হযরত সালমান বলেন, "খন্দক খোঁড়ার সময় একটি কঠিন পাথর দেখা গেল। আমি তা ভাঙ্গার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সফল হলাম না। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমার নিকটেই খোঁড়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি যখন এই পরিস্থিতি দেখলেন তখন আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন এবং কোদাল ধরলেন। তিনি পাথরের ওপর কোদাল মারলেন। কোদালের নীচে দিয়ে বিদ্যুতের শিখা বের হলো অতপর দ্বিতীয় বারেও একই ধরনের শিখা দেখা গেল। তৃতীয় বারেও বিদ্যুতের চমক সৃষ্টি হলো এবং পাথর ভেঙ্গে গেল।
আমি আরজ করলামঃ "আমার মাতা পিতা আপনার ওপর কুরবান হোক। হে আল্লাহর রাসূল। আপনি যখন কোদাল মারছিলেন তখন কোদালের নীচে আমি আগুনের শিখা উঠতে দেখেছি। এই শিখা কিসের ছিল?
তিনি বললেন, "সালমান সত্যিই কি তুমি এই শিখা দেখেছ?
আমি ইতিবাচক জবাব দিলাম। তাতে হুজুর (সাঃ) বললেন, "প্রথম কোদালে যে শিক্ষা বের হয়েছিল তাতে আল্লাহ পাক আমাকে ইয়েমেনের ওপর বিজয় দান করেন। দ্বিতীয় বারের শিখায় আল্লাহ পাক আমার জন্য সিরিয়া বিজয়ের পথ সুগম করেন এবং তৃতীয় বারের শিখায় আল্লাহ তায়ালা পূর্বের দেশসমূহের বিজয় আমার জন্য নির্ধারিত করে দেন। ইবনে ইসহাক আরো বর্ণনা করেন যে, তিনি বিশ্বস্ত রাবীদের মুখে হযরত আবু হুরায়রার (রাঃ) এই রাওয়ায়েত শুনেছেন। হযরত ওমর (রাঃ) এবং হযরত ওসমানের (রাঃ) খিলাফতকালের বিজয়সমূহে তিনি বলতেন, "যত এলাকা চাও জয় করতে থাকো। খোদা এই সব বিজয় মুবারক করুন। মদীনা থেকে বিশ্বের দূর দূরান্ত পর্যন্ত এবং আজ থেকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত নত এলাকার ওপর আমরা বিজয় পতাকা উড্ডীন করবো তার অবস্থা আল্লাহ তায়ালা নিজের মাহবুব পয়গাম্বরকে (রাঃ) বলে দিয়ে ছিলেন। আসমান জমিনের মালিক সেইসব এলাকার চাবি নিজের নবীকে প্রদান করেছিলেন।"