📄 নবীর (সাঃ) ধনু
ওয়াকেদী ইবনে কাতাদার উদ্ধৃতিসহ ওহোদ যুদ্ধের অবস্থা লিখতে গিয়ে বর্ণনা করেছেন, "হজুরে আকরাম (সাঃ) যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন এবং বর্শা দিয়ে দুশমনের মুকাবিলা করতে থাকেন। এমনকি বর্শা ভেঙ্গে যায়। এছাড়া তাঁর ধনুর কাঠ ভেঙ্গে যায় এবং দড়ি ছিঁড়ে যায়।
ধনুর রশি বা দড়ি এক বিঘত পরিমাণ ছিল। তা এবং ধনুর কাঠ উকাশাহ (রাঃ) বিন মিহসান ধরলেন। তিনি কাঠের ধনু বানিয়ে তাতে দড়ি বাঁধতে লাগলেন। কিন্তু তা ছিল খুবই ছোট। অপর প্রান্ত পর্যন্ত পৌছছিল না। তিনি হজুরে পাকের (সাঃ) নিকট একথা বললেন। হুজুর (সাঃ) বললেন, "তা টানো। অপর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।"
উকাশাহ (রাঃ) বলেন, "সেই সত্তার কসম যিনি মুহাম্মদকে (সাঃ) হক দিয়ে প্রেরণ করেছেন। আমি রশি টানলাম। তা বড় হতে লাগলো এবং কাঠের অপর দিকে লাগালাম। অতপর তা নরম হয়ে গেল। হুজুর (সাঃ) নিজের ধনু নিয়ে নিলেন এবং তা দিয়ে তীর নিক্ষেপ করতে লাগলেন। তীর নিক্ষেপে সে দিন আবু তালহা (রাঃ) খুবই পারদর্শিতা দেখালেন। তিনি হুজুরে আকরামের (সাঃ) সামনে নিজেকে ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তীরও চালাচ্ছিলেন। অবশেষে তার ধনুও ভেঙ্গে গিয়েছিল এবং তা কাতাদাহ (রাঃ) বিন নুমান উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
আবু তালহা (রাঃ) ওহোদের যুদ্ধে নিজের তৃণির হুজুরের (সাঃ) সামনে রেখে দিয়ে উচ্চৈস্বরে বলেছিলেন, আল্লাহর রাসুল। আপনার হিফাজতের জন্য আমার জীবন হাজির। "হজুর (সাঃ) আবু তালহাকে (রাঃ) তীর ধরিয়ে দিচ্ছিলেন এবং বলছিলেন, "আবু তালহা" তীর চালাও।” তিনি খুব ভালভাবে তীর চালালেন এবং নিপুণতার সঙ্গে সঠিক নিশানায় মারলেন। হুজুর (সাঃ) কখনো কখনো আবু তালহাকে (রাঃ) পেছন থেকে দাঁড়িয়ে দেখতেন এবং প্রত্যেক তীর নিশানায় লাগতে দেখে আনন্দ প্রকাশ করতেন। আবু তালহা (রাঃ) অব্যাহতভাবে বলে চলছিলেন, "আমার গলা আপনার গলার জন্য ঢাল স্বরূপ এবং আমার জীবন আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত। আল্লাহ আমাকে আপনার উপর ফিদা হয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য দিন।”
আবু তালহার (রাঃ) ছিল উচ্চ ও ভীতিপূর্ণ কণ্ঠ। হজুর (সাঃ) বললেন “আবু তালহার উচ্চস্বর এবং জিহাদের না'রা ৪০ ব্যক্তি থেকেও কার্যকর।” আবু তালহার (রাঃ) তৃণিরে ৫০টি তীর ছিল। তার সবই নিক্ষেপ করলেন। হুজুর (সাঃ) সাধারণ কাঠ তার হাতে তুলে দিলেন।
তিনি তাও শত্রুর প্রতি নিক্ষেপ করলেন এবং তা তীর হয়ে দুশমনের উপর গিয়ে আঘাত করলো।
📄 প্রস্তরময় ভূমি
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, খন্দকের যুদ্ধের সময় পরিখা খনন করতে গিয়ে এমন কয়েকটি ঘটনা সংঘটিত হয়, যা সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ ও রাসুলের (সাঃ) নবুয়তের সত্যতা প্রমাণ করে। মুসলমানরা সেই সব ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছিলেন।
জাবের (রাঃ) ইবনে আব্দুল্লাহ বলতেন, খন্দক বা পরিখা খননের সময় এক জায়গায় মরুভূমির কঠিন পাথর দেখা দিল। পাথরও এমন যে কোন ক্রমেই তা ভাংছিল না। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) হজুরে আকরামের নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন, কোন পাত্রে পানি নিয়ে এসো। তিনি সেই পানিতে ফুঁ দিলেন। অতপর তিনি দীর্ঘক্ষণ আল্লাহর নিকট দোয়া করতে থাকলেন। দোয়া শেষে তিনি সেই পানি পাথরের উপর ঢেলে দিলেন। উপস্থিত সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে একজন বলেন "সেই সত্তার শপথ। যিনি মুহাম্মদকে (সাঃ) সত্য নবী (সাঃ) বানিয়ে প্রেরণ করেছেন। সেই পাথর দেখতে দেখতে বালির মত নরম হয়ে গেল। কোদাল অথবা অন্য অস্ত্র দিয়ে তা না ভেঙ্গে উঠিয়ে ফেলা যেত, না খন্ড বিখন্ড করা যেত।
📄 বশির কন্যার খেজুর
সাঈদ বিন মিনার উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, খন্দকের যুদ্ধের সময় নু'মান বিন বশিরের বোন এবং হযরত বশির বিন সায়াদের কন্যার সঙ্গে এই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি বলেন যে, আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা আমাকে ডাকলেন এবং বললেন "মা আমার, এই খেজুর নিয়ে গিয়ে তোমার পিতা ও মামা আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে দিয়ে এসো।” একটি কাপড়ে করে এক মুঠের মত খেজুর নিয়ে আমি খন্দকের দিকে গেলাম। এই আমার আব্বা এবং মামার দ্বিপ্রহরের খাবারছিল।
আমি আমার পিতা ও মামাকে খোঁজ করছিলাম। এমন সময় হুজুর (সাঃ) এক স্থানে আমাকে দেখে ফেললেন। তিনি বললেন, "বেটি এসো। তোমার কাছে একি? "আমি আরজ করলাম" হে আল্লাহার রাসূল। এ হলো খেজুর। আমার মা আমার পিতা ও মামুর পেটের আগুন নেভানোর জন্য আমার নিকট দিয়ে পাঠিয়েছেন।”
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "এগুলো আমাকে দাও।” আমি খেজুরগুলো হজুরে আকরামের (সাঃ) হাতে দিয়ে দিলাম। তার হাত সেই খেজুরে পূর্ণ হলো না। যাহোক, তিনি দস্তরখান বিছানোর নির্দেশ দিলেন এবং বিছানোর পর খেজুরগুলো তার ওপর ছড়িয়ে দিলেন। অতপর তিনি সকলকে খাওয়ার জন্য ডেকে আনতে কাউকে নির্দেশ দিলেন। বশির কন্যা বলেন, "খন্দকবাসী দস্তরখানে একত্রিত হলেন এবং খাওয়া শুরু করলেন। একদল খেয়ে উঠে যেতেন এবং দ্বিতীয় দল এসে খাওয়া শুরু করতেন। এভাবে সকল খন্দকবাসীই পেট পুরে খেলেন। কিন্তু খেজুর শেষ হলো না। খোদার কসম। দস্তরখানের ওপর তখনো খেজুর মওজুদ ছিল এবং তা কিনার দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিলো।"
📄 জাবেরের (রাঃ) খাবার
ইবনে ইসহাক সাঈদ বিন মিনার এবং জাবের (রাঃ) বিন আব্দুল্লাহার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ননা করেছেন যে, হযরত জাবের (রাঃ) বিন আবদুল্লাহ হুজুরে আকরামের (সাঃ) সঙ্গে পরিখা খননে ব্যাপৃত ছিলেন। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন, তার নিকট একটা ছোট ধরনের দুর্বল বকরী ছিল। তিনি ধারণা করলেন যে, প্রিয় নবী (সাঃ) বেশ কিছুদিন যাবৎ অভুক্ত রয়েছেন। এই বকরী জবেহ করে হুজুরের (সাঃ) মেহমানদারীর ব্যবস্থা করলে কেমন হয়।
তিনি আরো বলেন, "আমি স্ত্রীকে আটা বানাতে বললাম। সুতরাং সে আটা বানিয়ে রুটি তৈরী করলো। আমি বকরী জবেহ করলাম এবং রাসূলের (সাঃ) জন্য গোশত ভুনলাম। যখন সন্ধ্যা হলো এবং হুজুর (সাঃ) খন্দক থেকে বাড়ীর দিকে যেতে লাগলেন তখন আমি অরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমার নিকট একটি বকরী ছিল। আজ আমি তা জবেহ করেছি এবং রুটি তৈরী করেছি। অপনি আমাদের বাড়ি তাশরীফ নিয়ে আমাদেরকে মেযবানীর সুযোগ দানে বাধিত করুন। আমিতো শুধু হুজুরকেই (সাঃ) দাওয়াত দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি দাওয়াত দিতেই তিনি তা কবুল করেন এবং কোন আহবানকারীকে সকলকে ডেকে জাবের বিন আবদুল্লাহর বাড়ী পৌঁছে যাওয়ার কথা বলতে বললেন।"
আমি মনে মনে ইন্নালিল্লাহ পড়লাম। কেননা খাবারতো খুবই কম ছিল। যাহোক হজুরে আকরাম (সাঃ) সাহাবার (রাঃ) দল নিয়ে আমার বাড়ী প্রবেশ করলেন এবং বসে গেলেন। আমি তাঁর সামনে খানা এনে রাখলাম। তিনি আল্লাহর নাম নিলেন। বরকতের দোয়া করলেন এবং খানা খেলেন। লোকজন পালাক্রমে খাবার খাওয়ার জন্য আসতে লাগলেন এবং পেট পুরে খেতে লাগলেন। কয়েক পালায় তাঁরা খাবার খেলেন। এমনকি সকল খন্দকবাসীরই পেট ভরে গেল।