📄 কায়মানের আত্মহত্যা
ইবনে ইসহাক আছেম বিন ওমর কাতাদার (রাঃ) উদ্ধৃতিসহ বর্ণনা করেছেন যে, আমাদের মধ্যে একজন অপরিচিত মানুষ ছিল। তাকে আমরা চিনতাম না। তার নাম বলা হতো কাযমান। হুজুরের (সাঃ) সামনে তার কথা উল্লেখ হলে তিনি বলতেন, "সে দোযখবাসী।"
ওহোদের যুদ্ধের দিন যখন প্রচন্ড লড়াই চলছিলো তখন কাযমান মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে ভয়ানকভাবে যুদ্ধ করলো। সে একাই সাত অথবা আট জন কাফের খতম করে ফেললো। সে ছিল যুদ্ধবাজ। যুদ্ধে সেও মারাত্মক আঘাত পেয়েছিল। বনি জাফরের একটি গৃহে তাকে রাখা হয়।
হুজুরের (সাঃ) মজলিসে তার উল্লেখ হলে সাহাবার (রাঃ) একটি দল তাকে খুব প্রশংসা করলো। হুজুর (সাঃ) পুনরায় তার জাহান্নামী হওয়ার কথা উল্লেখ করলেন। সাহাবারা (রাঃ) খুব আশ্চর্যান্বিত হলেন যে, ব্যাপার কি। তাকে দেখতে তো সম্পূর্ণ রূপে জান্নাতী মনে হয়। আর হুজুর (সাঃ) তাকে জাহান্নামী আখ্যায়িত করছেন। লোকদের মনে এক আশ্চর্য ধরনের দ্বন্দ্ব চলছিলো।
কিছু মানুষ সেবা শুশ্রুষার জন্য কাযমানের নিকট গেলো এবং বললো, "হে কাযমান। আল্লাহর কসম, তুমি আজ কামাল করে দেখিয়েছ এবং বিরাট পরীক্ষাও সহ্য করেছ। তুমি সুসংবাদ ও মুবারকবাদের যোগ্য।”
সে বললো, "কিসের সুসংবাদ? খোদার কসম, আমি তো স্ব কওমের ইজ্জত এবং নিজের গোত্রের গৌরবের জন্য লড়াই করে থাকি এই আবেগই যদি না থাকতো তাহলে আমি যুদ্ধের ময়দানে কেন কুদে বেড়াবো?”
ইবনে ইসহাক আরো বলেন, তার ক্ষতের ব্যথা যখন প্রচন্ড রূপ নিলো এবং তা সহ্য করতে পারলো না তখন সে তুনির থেকে তীর বের করে আত্মহত্যা করলো। সাহাবীরা (রাঃ) এই ঘটনা দেখে হুজুরের (সাঃ) নিকট ফিরে গেলেন। তাঁরা একবাক্যে বলতে লাগলেন, "আমরা আমাদের সাক্ষ্যের পুনরুক্তি করছি যে, আপনি -আল্লাহর সত্য রাসূল' এরপর তারা কাযমানের ঘটনা বর্ণনা করলেন।
তিনি ইরশাদ করলেন, "আল্লাহ পাক অনেক সময় এই দীনের সাহায্য কোন কাফেরের মাধ্যমেও করে থাকেন।"
📄 আব্দুল্লাহর (রাঃ) তরবারী
যুহায়ের বর্ণনা করেছেন, যুদ্ধের ময়দানে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিন জাহাশের তরবারী ভেঙ্গে গেল। হুজুরে আকরাম (সাঃ) তাঁকে খেজুরের এক লাঠি দান করলেন। এই লাঠি তাঁর হাতে তরবারী হয়ে গেল। তার হাতলও খেজুরেরই ছিল। এই তরবারী উরজুল নামে খ্যাত ছিল।
📄 কুলসুমের মাজযুব
ইবনে আব্দুল বার বর্ণনা করেছেন যে, আবু রাহাম কুলসুম বিন হাছিন বিন গালফ বিন উবাইদুল গিফারী যিনি বেশীর ভাগ নিজের আবু রাহাম কুনিয়তে মশহুর ছিলেন। রাসূলের (সাঃ) মদীনা আগমনের পর তিনি মুসলমান হন। তিনি বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু ওহোদ ও তার পরের যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ করেন। বাইয়াতে রিদওয়ানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। হজুরে আকরাম (সাঃ) মদীনায় তাঁকে দুবার নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন।
ওহোদের যুদ্ধে শত্রুর একটি তীর তার গলায় বিদ্ধ হয়। তিনি সেই অবস্থাতেই হুজুরের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলেন। হুজুর (সাঃ) তীর খুলে দিলেন এবং ক্ষতের ওপর মুখের পবিত্র লালা লাগিয়ে দিলেন। ক্ষত শুকিয়ে গেল। কিন্তু তারপর থেকে হযরত আবু রাহামের নামই "আল মানহর" অর্থাৎ গলাকাটা বলে খ্যাত হয়ে গেল।
📄 নবীর (সাঃ) ধনু
ওয়াকেদী ইবনে কাতাদার উদ্ধৃতিসহ ওহোদ যুদ্ধের অবস্থা লিখতে গিয়ে বর্ণনা করেছেন, "হজুরে আকরাম (সাঃ) যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন এবং বর্শা দিয়ে দুশমনের মুকাবিলা করতে থাকেন। এমনকি বর্শা ভেঙ্গে যায়। এছাড়া তাঁর ধনুর কাঠ ভেঙ্গে যায় এবং দড়ি ছিঁড়ে যায়।
ধনুর রশি বা দড়ি এক বিঘত পরিমাণ ছিল। তা এবং ধনুর কাঠ উকাশাহ (রাঃ) বিন মিহসান ধরলেন। তিনি কাঠের ধনু বানিয়ে তাতে দড়ি বাঁধতে লাগলেন। কিন্তু তা ছিল খুবই ছোট। অপর প্রান্ত পর্যন্ত পৌছছিল না। তিনি হজুরে পাকের (সাঃ) নিকট একথা বললেন। হুজুর (সাঃ) বললেন, "তা টানো। অপর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।"
উকাশাহ (রাঃ) বলেন, "সেই সত্তার কসম যিনি মুহাম্মদকে (সাঃ) হক দিয়ে প্রেরণ করেছেন। আমি রশি টানলাম। তা বড় হতে লাগলো এবং কাঠের অপর দিকে লাগালাম। অতপর তা নরম হয়ে গেল। হুজুর (সাঃ) নিজের ধনু নিয়ে নিলেন এবং তা দিয়ে তীর নিক্ষেপ করতে লাগলেন। তীর নিক্ষেপে সে দিন আবু তালহা (রাঃ) খুবই পারদর্শিতা দেখালেন। তিনি হুজুরে আকরামের (সাঃ) সামনে নিজেকে ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তীরও চালাচ্ছিলেন। অবশেষে তার ধনুও ভেঙ্গে গিয়েছিল এবং তা কাতাদাহ (রাঃ) বিন নুমান উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
আবু তালহা (রাঃ) ওহোদের যুদ্ধে নিজের তৃণির হুজুরের (সাঃ) সামনে রেখে দিয়ে উচ্চৈস্বরে বলেছিলেন, আল্লাহর রাসুল। আপনার হিফাজতের জন্য আমার জীবন হাজির। "হজুর (সাঃ) আবু তালহাকে (রাঃ) তীর ধরিয়ে দিচ্ছিলেন এবং বলছিলেন, "আবু তালহা" তীর চালাও।” তিনি খুব ভালভাবে তীর চালালেন এবং নিপুণতার সঙ্গে সঠিক নিশানায় মারলেন। হুজুর (সাঃ) কখনো কখনো আবু তালহাকে (রাঃ) পেছন থেকে দাঁড়িয়ে দেখতেন এবং প্রত্যেক তীর নিশানায় লাগতে দেখে আনন্দ প্রকাশ করতেন। আবু তালহা (রাঃ) অব্যাহতভাবে বলে চলছিলেন, "আমার গলা আপনার গলার জন্য ঢাল স্বরূপ এবং আমার জীবন আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত। আল্লাহ আমাকে আপনার উপর ফিদা হয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য দিন।”
আবু তালহার (রাঃ) ছিল উচ্চ ও ভীতিপূর্ণ কণ্ঠ। হজুর (সাঃ) বললেন “আবু তালহার উচ্চস্বর এবং জিহাদের না'রা ৪০ ব্যক্তি থেকেও কার্যকর।” আবু তালহার (রাঃ) তৃণিরে ৫০টি তীর ছিল। তার সবই নিক্ষেপ করলেন। হুজুর (সাঃ) সাধারণ কাঠ তার হাতে তুলে দিলেন।
তিনি তাও শত্রুর প্রতি নিক্ষেপ করলেন এবং তা তীর হয়ে দুশমনের উপর গিয়ে আঘাত করলো।