📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 আল-আমরা এবং মিরাজ

📄 আল-আমরা এবং মিরাজ


মুহাম্মদ বিন ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রাসূলের (সাঃ) মি'রাজ সফর সম্পর্কে তাঁর নিকট উম্মে হানি বিনতে আবি তালিবের (রাঃ) এই রাওয়ায়েত পৌঁছেছে। উম্মে হানির নাম ছিল হিন্দ। তিনি বললেন, সে রাতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমার ঘরে শুয়েছিলেন। তিনি এশার নামায আদায় করে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আমরাও শুয়ে পড়লাম। ফজরের নামাযের আগে তিনি আমাদেরকে জাগালেন এবং আমরা তাঁর সঙ্গে সুবহের নামায আদায় করলাম। নামাযের পর তিনি বললেন, "হে উম্মে হানি! আমি তোমাদের সঙ্গে এশার নামায পড়েছিলাম। অতপর রাতে আমি বাইতুল মুকাদ্দাস গিয়েছিলাম এবং সেখানে নামায পড়েছি। এখন আমি পুনরায় সকালের নামায তোমাদের সঙ্গে এখানে আদায় করছি। যেমন তোমরা দেখছো।"
এ কথা বলেই তিনি বাইরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাঁর চাদরের কোণা ধরলাম। ফলে তাঁর পেটের ওপর থেকে কাপড় সরে গেল। তাঁর পেট দেখতে তুলার মত সাদা ছিল। আমি আরজ করলাম, "হে আল্লাহর নবী। লোকদেরকে এ কথা বলবেন না। তারা সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করবে।” তিনি বললেন, "খোদার কসম। এই ঘটনার কথা আমি লোকদেরকে অবশ্যই বলবো।"
তিনি যখন চলে গেলেন তখন আমি নিজের একজন হাবশী বাঁদীকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কি বলেন এবং জবাবে লোকজন কি বলে তা দেখা ও শোনার জন্য নির্দেশ দিলাম। হুজুরে আকরাম (সাঃ) লোকদের নিকট গিয়ে ঘটনা বর্ণনা করলেন। লোকজন তা শুনে ভয়ানক বিস্ময় প্রকাশ করলো এবং বললো, "হে মুহাম্মদ, এই ঘটনার দলিল প্রমাণ কি তা বলো। আমরা কখনো এ ধরনের কথা কারোর মুখ থেকেশুনিনি।
তিনি বললেন, প্রমাণ হলো যে, আমি অমুক কবিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করি। তারা অমুক উপত্যকাতে ছিল। বুরাক দেখে তাদের উট বিশৃংখল হয়ে পড়ে। একটি উট দল ছেড়ে চলে যেতে লাগলো। আমি তাদেরকে ডেকে বললাম যে, উট কোথায়? আমি সিরিয়ার দিকে যাচ্ছিলাম। যেতে যেতে আমি যখন সানজিনান পাহাড়ের ওপর পৌঁছলাম তখন অমুক কবিলার নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম যে, লোকজন ঘুমিয়ে রয়েছে। পানির পাত্র পড়ে ছিল। তার মুখ তারা বেঁধে রেখেছিল। আমি তার মুখ খুললাম এবং পানি পান করলাম। অতপর তার মুখ আবার আগের মতই বেঁধে রাখলাম। তার প্রমাণ যদি তোমরা চাও তাহলে দেখবে যে, তাদের কাফেলা এখন তানয়িমের গিরিপথ বাইজা থেকে নীচে নামছে। কাফেলার আগে আগে মেটে রংয়ের উট আছে। এই উটের ওপর দুটো খলে রয়েছে। থলে দুটির একটির রং কালো এবং অপরটির রং সাদা।" উম্মেহানি আরো বর্ণনা করেন, "লোকজন খুব দ্রুত তার সঙ্গে সেই গিরিপথের দিকে গেল এবং প্রথম উট সেইভাবে পেল না যেমন হুজুর (সাঃ) বর্ণনা করেছিলেন। সেই উট কাফেলায় ছিল। (কিন্তু কিছু দূর অতিক্রম করার পর সম্ভবত অবস্থান পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। আর এটা তেমন কোন আচমকা ব্যাপার ছিল না। এ জন্য কোরেশরা তা রাসুলকে (সঃ) মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে ব্যবহার করেনি) কোরেশরা পানির পাত্রের ব্যাপারে কাফেলাকে জিজ্ঞেস করলে তারা বললো, "খোদার কসম! সে সত্য বলেছে। আমরা পানির পাত্র পূর্ণ করে রেখেছিলাম। অতপর তার মুখ ও বেঁধে দিয়েছিলাম। সকালে উঠে পাত্রের মুখতো তেমন বাঁধাই পেলাম। কিন্তু তাতে পানি ছিল না।”
দ্বিতীয় কাফেলা যখন মক্কা পৌঁছল তখন লোকজন তাদের নিকট তাদের অবস্থা জিজ্ঞেস করলো। তারা বললো, "খোদার কসম। তিনি সত্য কথা বলেছেন। সেই উপত্যকায় আমাদের উট বিশৃংখল হয়ে গিয়েছিল এবং একটি উট দল ছেড়ে চলে গিয়েছিল। অতপর আমরা এক ব্যক্তির আওয়াজ শুনলাম। সে আমাদেরকে ডাকলো এবং বললো যে, উট এদিকে রয়েছে। যেদিক থেকে আওয়াজ এসেছিল আমরা সেদিকে গিয়ে উটটি পেয়ে গেলাম।” ইবনে ইসহাক হাসান বাসরীর উদ্ধৃতি দিয়েও এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, "যখন সকাল হলো এবং হুজুর (সাঃ) কোরেশদেরকে সমগ্র ঘটনা শুনালেন তখন তারা তাঁকে অসম্ভব বলে আখ্যায়িত করে অস্বীকার করলো। তাদের বক্তব্য ছিল যে, একটি কাফেলার মক্কা থেকে সিরিয়া পৌঁছতে এক মাস এবং সেখান থেকে ফেরার জন্য একমাস প্রয়োজন। মুহাম্মদ (সঃ) এক রাতে কেমন করে এখান থেকে সেখানে গেলেন এবং তারপর ফিরেও এলেন?"
এই ঘটনার পর অনেক দুর্বল ঈমানের মানুষ ফিতনার শিকার হয়ে মুরতাদ হয়ে যায়। কয়েক ব্যক্তি আবু বকরের (রাঃ) নিকট গিয়ে বললো, "হে আবু বকর! তোমার দোস্ত কি বলে তা কি শুনেছো?" সে দাবী করেছে যে, গত রাতে সে মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর করে এবং সেখানে নামায পড়ে এবং ফিরেও এসেছে।” আবু বকর (রাঃ) বললেন, "তোমরা অকারণে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ।” তারা বললো, "তুমি নিজেই গিয়ে শুনো তোমার দোস্ত মসজিদে বসে স্বয়ং এই কাহিনী শুনাচ্ছে।"
আবু বকর বললেন, "মুহাম্মদ (সঃ) যদি এই কথা বলে থাকেন তাহলে খোদার কসম। এটা ঠিক। তোমরা তাতে বিস্মিত কেন হচ্ছ? খোদার কসম! আমি তো তার চেয়েও বড় কথা স্বীকার করি। তিনি বলেন, রাত অথবা দিনের কোন মুহুর্তে আসমান থেকে তাঁর নিকট ওহি আসে এবং আমি তা সত্য মনে করি। যে ব্যাপারে তোমরা আশ্চর্য হচ্ছো তা থেকেও তো ওহির ব্যাপারটি আরো বেশী আশ্চর্যের। কিন্তু আমি তা মানি।
এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) হুজুরের (সাঃ) খিদমতে হাঁজির হয়ে আরজ করলেন, "লোকদেরকে কি এ কথা বলেছেন যে রাতে আপনি বাইতুল মুকাদ্দস তাশরীফ নিয়েছিলেন এবং ফিরেও এসেছেন?" তিনি জবার দিলেন, "হ্যাঁ, আমি এ কথা বলেছি।" হযরত আবু বকর (রাঃ) আরজ করলেন, " হে আল্লাহর রাসুল। আমি বাইতুল মুকাদ্দস দেখেছি। আপনি তার সিফত বর্ণনা করুন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের নকশা বর্ণনা করলেন। হাসান বাসরী বলেন, এ সময় আল্লাহ তায়ালা হুজুরে আকরামের (সাঃ) সামনে বাইতুল মুকাদ্দাস পেশ করে দিয়েছিলেন। তিনি তার নকশা দেখে বর্ণনা করেছিলেন। হুজুরে আকরাম (সাঃ) যখন এক এক বস্তুর দৃশ্য বর্ণনা করছিলেন তখন আবু বকর (রাঃ) বলছিলেন, "আপনি সম্পূর্ণ ঠিক বলেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল।" তিনি যখন সম্পূর্ণ নকশা বর্ণনা করলেন এবং প্রত্যেক বস্তুই হযরত আবু বকর (রাঃ) সত্য বলে স্বীকার করে নিলেন তখন প্রিয় নবী (সাঃ) তাকে "সিদ্দিক” উপাধিতে ভূষিত করলেন।
ইবনে ইসহাক অন্যভাবে হযরত আবু সাঈদ খুদরীর (রাঃ) যবানীতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, "আমি হুজুর (সাঃ) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলতেন, "আমি যখন বাইতুল মুকাদ্দসে নামাজ শেষ করলাম তখন একটি সিঁড়ি (মি'রাজ) আমার সামনে পেশ করা হলো। এমন সুন্দর বস্তু আমি কখনো দেখিনি। সেই সিঁড়ি তোমরা দেখতে পাও না। কিন্তু যখন কারোর মৃত্যুর সময় আসে তখন সে তা দেখতে পায়। আমার দোস্ত জিবরাইল (আঃ) আমাকে সেই সিড়ির উপর চড়িয়ে দিল। আমি এই সিঁড়িতে চড়েই আসমানের দরজাতে গিয়ে পৌঁছলাম। এ দরজাকে বাবুল হাফজা বলে। এই দরজায় একজন ফেরেস্তা পাহারাদার রয়েছেন। তার নাম হলো ইসমাইল। তার অধীন ১২ হাজার ফেরেশতা রয়েছে এবং ১২ হাজারের প্রত্যেকের অধীন আবার ১২ হাজার ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছে। এ সময় তিনি কুরআন মজিদের এই আয়াত পাঠ করলেন,
অর্থাৎ তোমার রবের অসংখ্য সৈন্য রয়েছে। সে সম্পর্কে তিনি স্বয়ংই জানেন। অন্য কেউ জানতে পারে না।
অতপর বলেন, "আমরা যখন দরজায় পৌঁছলাম তখন ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করলো, "জিবরাইল (আঃ) তোমার সঙ্গে এ কে?” সে বললো, "তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।" সে জিজ্ঞাসা করলো, "তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে?"
জিবরাইল (আঃ) জবাব দিলেন, "হ্যাঁ" "সেই ফেরেশতা আমাকে দোয়া খায়ের করলেন এবং দরজা খুলে দিলেন।"
ইবনে ইসহাক আহলে ইলমের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, হুজুর (সাঃ) বলেছেন, আমি যখন আসমানসমূহের উপর গিয়েছিলাম তখন যে সব ফেরেশতার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল তাদের সকলেই হেসে ও মুচকি হাসি দিয়ে আমাকে সম্বর্ধনা জানিয়েছিলেন এবং প্রত্যেকেই আমার জন্য দোয়া খায়ের করেছিলেন। একজন ফেরেশতা আমি এমন পেয়েছিলাম যে, যিনি আমার জন্য অন্যান্য ফেরেশতার মত দোয়া খায়ের করছিলেন। কিন্তু তাঁর চেহারায় প্রফুল্লতার নাম-নিশানাও ছিল না। আমি জিবরাইলকে (আঃ) জিজ্ঞাসা করলাম, "এ কোন ফেরেশতা?” জিবরাইল (আঃ) বলেন, "হে আল্লাহর রাসূল। সে আগেও কোন দিন হাসে নি এবং পরেও কোন দিন হাসবে না। সে যদি হাসতো তাহলে আজ আপনার আগমনেই হাসতো। কিন্তু তার জন্য নির্দেশই হলো সে যেন কখনো না হাসে। সে হলো জাহান্নামের দারোগা। তার নাম "মালিক।"
আমি জিবরাইলকে (আঃ) বললাম, 'তুমি আল্লাহর নিকট مُطَاعَ ثُمَّ آمين অর্থাৎ যার নির্দেশ মানা যায় এবং যার আমানত স্বীকৃত হওয়ার মর্যাদা রাখে। তুমি কি ঐ ফেরেস্তাকে নির্দেশ দিয়ে আমাকে দোজখের, ঝলক দেখাতে পারো?” জিবরাইল (আঃ) বলেন, "হাঁ, কেন নয়।" অতপর তিনি মালিককে নির্দেশ দিলেন, "মালিক মুহাম্মদকে (সাঃ) দোজখ দেখিয়ে দাও।" এই নির্দেশের পর তিনি দোজখের ওপর থেকে পরদা সরিয়ে দিলেন। দোজখ ফুটন্ত হওয়া শুরু হলো এবং তার স্ফুলিঙ্গ বড় থেকে বড় হতে লাগলো। এমন অনুভব হতে লাগলো যে প্রত্যেক বস্তু ভষ্ম করে ফেলবে। আমি জিবরাইলকে (আঃ) বললাম, দোজখকে তার সীমানায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মালিককে নির্দেশ দিন। জিবরাইল (আঃ) মালিককে বললেন এবং সে আগুনকে তার সীমানায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ছায়া যেভাবে মিলিয়ে যায় তেমনি আগুন ফিরে গেল। তারপর মালিক তাকে পরদা দিয়ে ঢেকে দিল।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) মি'রাজের ঘটনার আরো বর্ণনা দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আমি যখন আসমানের ওপর গেলাম তখন সেখানে আমি একজন বুজর্গ ব্যক্তিকে বসা দেখলাম। মানুষের রুহ তাঁর সামনে পেশ করা হচ্ছিল, কিছু রুহ দেখে তিনি আনন্দ প্রকাশ করছিলেন এবং বলছিলেন, "পবিত্র রুহ পবিত্র শরীর থেকে বের হয়েছে। তার জন্য কল্যাণ রয়েছে।" আবার কিছু রুহ দেখে তিনি দুঃখ প্রকাশ করতেন এবং চেহারায় অশ্বস্তির ভাব ফুটে উঠতো। অতপর বলতেন, 'অপবিত্র শরীর থেকে বের হয়েছে।"
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "জিবরাইল (আঃ) এই বুজর্গ ব্যক্তি কে?” তিনি বললেন, " তিনি হলেন হযরত আদম (আঃ)। তাঁর সকল সন্তানের রুহ তাঁর খিদমতে পেশ করা হয়। কাফের এবং নাফরমানদের দেখে বিরক্তি ও আফসোস প্রকাশ করেন। ঈমানদার ও নেককারদের রুহ দেখে আনন্দিত হন।"
অতপর আমি কিছু লোক দেখলাম। যাদের ঠোঁট উটের মত ঝুলন্ত ছিল। তাদের হাতে ছিল আগুনের পাথর। তা মুখে নিক্ষেপ করলে পিঠ দিয়ে বাহিরে বেরিয়ে আসতো। আমি জিবরাইলকে (আঃ) তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, "তারা হলোজুলুম করে ইয়াতিমের সম্পদ ভক্ষণকারী মানুষ।"
অতপর আমি অনেক বড় বড় পেটওয়ালা মানুষকে দেখলাম। এতবড় পেট যা ধারনাও করা যায় না। ফিরাউন ও তার কওমকে আগুনে নিয়ে যাওয়ার রাস্তায় তারা পড়েছিল। ফিরাউন ও তার কওম পিপাসার্ত উটের মত চলতো এবং সেই সব বড় পেটওয়ালাদেরকে দলিত মথিত করে চলে যেত। কিন্তু তারা নিজের স্থান থেকে নড়তে পারতো না। আমি জিবরাইলকে (আঃ) জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা?' তিনি জবাব দিলেন, "তারা হলো সূদ খোর।"
এরপর আমি আরো কিছু লোককে দেখলাম তাদের সামনে তাজা তুনা খোশবুদার গোশত পড়ে ছিল এবং তার সাথেই দুর্গন্ধযুক্ত গোশতও ছিল। তারা পবিত্র গোশত না খেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত গোশত খাচ্ছে। আমি তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। জানা গেল যে তারা বৈধ স্ত্রী ছেড়ে অবৈধ পথ অবলম্বনকারী মানুষ।
তারপর আমি কিছু মহিলাকে দেখলাম। তারা নিজের বুকের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় খুব কষ্টে ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলে জিবরাইল (আঃ) বললেন, "তারা সেই মহিলা যারা পুরুষদের ঘাড়ে সেই সব সন্তান চাপিয়ে দিয়েছিল যারা প্রকৃতপক্ষে সেই পুরুষদেরছিলনা।"
ইবনে ইসহাক বলেন, কাসিম ইবনে মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে এই রাওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে তিনি (সাঃ) বলেছেন, "সেই মহিলার ওপর আল্লাহর সীমাহীন গজব আপতিত হয় যে পুরুষের বংশে সেই সন্তান ঢুকিয়ে দেয় অথচ সেই সন্তান তার নয়। অতপর সে তার সম্পদও ভক্ষণ করে (অর্থাৎ উত্তরাধিকার ও নাফকা বা খরচ-খরচার আকারে) এবং তার গোপন কথাও জেনে যায়।"
ইবনে ইসহাক মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করে হযরত আবু সাঈদ খুদরীর (রাঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বিশদ বর্ণনা দেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "অতপর জিবরাইল (আঃ) আমাকে দ্বিতীয় আসমানের ওপর নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি দুই নওজোয়ান ইসা (আঃ) ইবনে মরিয়ম এবং ইয়াহিয়া (আঃ) বিন জাকারিয়াকে দেখলাম। তারা পরস্পর খালাতো ভাই ছিলেন।
অতপর আমি তৃতীয় আসমানে গেলাম। সেখানে আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তিনি দেখতে পূর্ণিমার চাদের মত ছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলে জিবরাইল (আঃ) বললেন, "তিনি আপনার ভাই ইউসুফ (আঃ) বিন ইয়াকুব (আঃ)।” অতপর আমি চতুর্থ আসমানের ওপর চড়লাম। সেখানেও এক ব্যক্তিকে দেখলাম। জিবরাইল (আঃ) বললেন, তিনি হলেন ইদরিস (আঃ) যার ব্যাপারে আল্লাহর ইরশাদ হলোঃ
وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا
জিবরাইল (আঃ) আমাকে পঞ্চম আকাশের ওপর নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি একজন বয়স্ক বুজর্গ ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম। তার থেকে সুদর্শন বৃদ্ধ আমি কখনো দেখিনি। তিনি ছিলেন হারুন (আঃ) বিন ইমরান। ৬ষ্ঠ আসমানে আমি এক দীর্ঘ-দেহী উঁচু নাকওয়ালা ব্যক্তি দেখলাম। তাঁর ব্যাপারে জিবরাইলকে (আঃ) জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তিনি হলেন তোমার ভাই মুসা (আঃ) ইবনে ইমরান।"
সর্বশেষে আমি যখন সপ্তম আসমানে চড়লাম। সেখানে একজন বুজর্গ ব্যক্তি চেয়ারের ওপর বসেছিলেন। তার চেয়ার ছিল বাইতুল মামুরের দরজার ওপর। বাইতুল মামুরে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে এবং বের হয়। এবং একবার প্রবেশকারী ফেরেশতা পুনরায় দ্বিতীয়বার কিয়ামত পর্যন্ত প্রবেশ করবে না। বরং প্রতিদিন নতুণ ফেরেশতার আগমন ঘটে।"
বাইতুল মা'মুরের দরজার ওপর বসা বুজর্গ ব্যক্তির সঙ্গে তোমাদের নবীর (স্বয়ং রাসূলুল্লাহ) এমন সাদৃশ্য রয়েছে যে অন্য কেউ তার উদাহরণ হতে পারে না। সেই বুজর্গের ব্যাপারে আমি জিজ্ঞাসা করলে জিবরাইল (আঃ) বললেন, "তিনি আপনার পিতা ইবরাহিম (আঃ)।"
অতপর জিবরাইল (আঃ) আমাকে জান্নাতে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি এক অনিন্দ সুন্দরী দাসী দেখলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, "সে কে?" তিনি জবাব দিলেন যে, সে যায়েদ বিন হারেছার হুর।"
হজুরে আকরাম (সাঃ) যয়েদ (রাঃ) বিন হারেছাকে সেই দাসীর এবং জান্নাতের ওসুসংবাদদিয়েছেন।

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 নবীর (সাঃ) হিজরত

📄 নবীর (সাঃ) হিজরত


ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন "আ'মার থেকে ইয়াযিদ বিন যিয়াদ মুহাম্মদ বিন কা'ব আল-কারাজির উদ্ধৃতিসহ এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, যখন কেরেশদের নির্বাচিত ব্যক্তিরা নবীয়ে আকরামের (সাঃ) গৃহ অবরোধ করলো, তখন তাদের মধ্যে আবু জেহেল বিন হিশামও শামিল ছিল। সে সাথীদেরকে বললো, "মুহম্মদের (সাঃ) ধারণা যে, তোমরা যদি তাকে অনুসরণ কর তাহলে আরব এবং আজমের মালিক হয়ে যাবে এবং অতপর এটাও যে তার ওপর ঈমান আনলে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে তোমরা জর্দানের সর্বোত্তম বাগানের মত বাগান পাবে। আর যদি তা না কর তাহলে তার হাতে যবেহ হয়ে যাবে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনে তোমাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। তাতে জ্বলতে থাকবে।”
এই আলোচনা হুজুরের (সঃ) ঘরের দরজাতেই হচ্ছিল। প্রিয় নবী (সঃ) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক নিজের ঘর থেকে বের হলেন। হাতে এক মুঠো মাটি নিলেন এবং কাফিরদের প্রতি তা নিক্ষেপ করে বললেন, "হ্যাঁ। আমি এ সব কিছুই বলে থাকি এবং এ কথাও বলি যে, তোমরা সেই সব লোকের অন্তর্ভুক্ত যাদের তকদিরে রয়েছে আগুন।” আল্লাহ পাক দুশমনদের চোখের ওপর পর্দা ফেলে দিলেন। তারা তাঁকে দেখতেই পেল না। তিনি তাদের মাথার ওপর মাটি নিক্ষেপ করলেন। সে সময় তিনি সূরায়ে ইয়াসিনের আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন।
তিনি সেই আয়াতসমূহ তিলাওয়াত 'শেষ করলে সব কাফিরের মাথা ও মুখমন্ডল মাটিতে ভরে গিয়েছিল। তারপর তিনি নিজের পথে রওয়ানা হলেন। রাতের কোন এক অংশে কাফেরদের নিকট তাদের জনৈক সঙ্গী এলো। অবরোধের সময় সে তাদের সঙ্গে ছিল না। সে জিজ্ঞেস করলো "তোমরা এখানে কার জন্য অপেক্ষা করছ?” তারা বললো, "মুহাম্মদের জন্য।” বললো, "খোদা তোমাদেরকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ (সঃ) তো তোমাদের মধ্য থেকে সুস্থভাবেই বের হয়ে চলে গেছে এবং যাবার সময় তোমাদের সবার মাথার ওপর মাটিও নিক্ষেপ করে গেছে। যার অপেক্ষায় তোমরা দাঁড়িয়ে আছ-সে তো চলে গেছে। এখন এখানে কিকরছো।"
বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মাথায় হাত রাখলো এবং তা মাটি মিশ্রিত পেলো। তারপর দেওয়ালের ওপর দিয়ে উকি মারতে লাগলো। প্রিয় নবীর (সঃ) বিছানায় আলী (রাঃ) হুজুরের (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন। তা দেখে তারা বলতে লাগলো, "খোদার কসম। মুহাম্মদ (সঃ) তো স্বগৃহে শুয়ে আছে এবং তার ওপর চাদর রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) ঘুমে নিমগ্ন রয়েছেন সকাল পর্যন্ত তারা এইটাই মনে করলো। সকালে যখন হযরত আলী (রাঃ) ঘুম থেকে জাগলেন এবং চাদর ফেলে দিলেন তখন কাফেরদের চোখ বিস্ফারিত হওয়ার মত। তারা তখন বলাবলি শুরু করলো যে, খবর দানকারীর খবর সঠিক ছিল এবং সে সত্য বলেছিল।"

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 উম্মে মা'বাদের তাঁবু

📄 উম্মে মা'বাদের তাঁবু


উম্মে মা'বাদ একটি প্রসিদ্ধ নাম। ইতিহাসে তার অনেক উল্লেখ রয়েছে। এই মহিলার আসল নাম ছিল আতিকা বিনতে খালেদ। কথিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং তাঁর গোলাম আমের বিন ফুহাইরা সমভিব্যাহারে হিজরতের সফরের সময় উম্মে মা'বাদের তাঁবুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি তার কাছ থেকে গোশত এবং খেজুর ক্রয় করতে চাইলেন। কিন্তু তার নিকট এসব পণ্য ছিল না। কবিলা দুর্ভিক্ষ কবলিত এবং ক্ষুধার্থ। হুজুরে করিম (সঃ) তাঁবুর খুঁটির সঙ্গে একটি বকরী বাঁধা দেখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, "হে উম্মে মা'বাদ! এই বকরী এখানে কেন বেঁধে রেখেছ?”
সে বললো, "বকরীটি দুর্বল এবং অসুস্থ। পালের সঙ্গে যেতে পারে না। এজন্য এখানে রয়েছে।” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "দুধ দেয় কি?” সে জবাব দিল, "বেচারী কি দুধ দেবে। তার জীবন নিয়েই টানাটানি।” তিনি বললেন, "তার দুধ দোহনের অনুমতি কি আমি পাবো?” আমার মাতা-পিতা আপনার ওপর কোরবান হোক। আপনি যদি দুধ দেখেন তাহলে দুয়ে নিন" সে বলল।
তিনি সেই দুর্বল বকরীর ওলানের ওপর হাত ঘোরালেন এবং বিসমিল্লাহ পড়লেন এবং বকরীকে আদর করলেন। খোদার কুদরতে তার শুকনো ওলানে দুধ এলো এবং দুধে তা ফুলে গেল। তিনি একটি বড় পাত্র চাইলেন। এই পাত্র যদি ভরে যেত তাহলে উপস্থিত সবার জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি সেই পাত্রে দুধ দোহন শুরু করলেন এবং পাত্র সম্পূর্ণরূপে ভরে গেল। তার ওপর সাদা ফেনা উঠতে লাগলো। তিনি সর্বপ্রথম উম্মে মা'বাদকে পান করালেন। তিনি আসুদা হয়ে পান করলেন। অতপর তিনি সাহাবীদের (রাঃ) পান করালেন। তাঁরাও পেট পুরে পান করলেন। সবশেষে তিনি নিজে পান করলেন।
পাত্র খালি করার পর তিনি দ্বিতীয়বার বকরী দোহন করলেন এবং পুনরায় তা পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি সেই পূর্ণ পাত্র উম্মে মা'বাদকে দিলেন। তার নিকট থেকে ইসলামের বাইয়াত নিলেন। অতপর সেখান থেকে সামনের মঞ্জিলের দিকে রওয়ানা দিলেন। উম্মে মা'বাদ এতক্ষণে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর আবু মা'বাদ জঙ্গল থেকে বকরী তাড়িয়ে নিয়ে বাড়ী ফিরলো। দুর্ভিক্ষের কারণে বকরীগুলোর পেট ছিল খালি এবং দুর্বল। আবু মা'বাদ দুধ দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "উম্মে মা'বাদ! এই দুধ কোথা থেকে এসেছে? বাড়ীতে তো দুর্বল ও অসুস্থ বকরী ছিল এবং দুধ দানকারী কোন পশু ছিল না।"
উম্মে মা'বাদ বললেন, "খোদার কসম! ব্যাপারটি অত্যন্ত আশ্চর্য ধরনের। একজন বরকতওয়ালা মানুষ এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর অবয়ব ও গুণাবলী এমন ধরনের ছিল।” (উম্মে মা'বাদ হুজুরের (সঃ) ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা করেন) আবু মা'বাদ বললো, "সেই পবিত্র ব্যক্তিত্বের আরো গুণাবলী বর্ণনা কর।" উম্মে মা'বাদ বিস্তারিতভাবে আরো গুণাবলী বর্ণনা করলেন। আবু মা'বাদ তা শুনে বললোঃ
"খোদার কসম! এতো সেই কোরেশ। যার ব্যাপারে আমরা শুনেছি যে তিনি মক্কায় আবির্ভূত হয়েছেন। আমি তাঁর সান্নিধ্য লাভের দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করছি। সুযোগ পেলে আমি অবশ্যই তাঁর খিদমতে উপস্থিত হবো।"

📘 বিশ্বনবীর সাঃ মুজিযা > 📄 সুরাকার ঘোড়া

📄 সুরাকার ঘোড়া


ইবনে ইসহাক যাহরীর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, আবদুর রহমান বিন মালিক বিন জা'শম সুরাকা বিন মালিক বিন জা'শম থেকে শুনেছেন যে, তিনি বলতেন, "রাসুলুল্লাহ (সঃ) যখন হিজরত করে মক্কা থেকে মদীনা রওয়ানা হলেন, তখন কোরেশরা ঘোষণা করে ছিল যে, যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (সঃ) বিন আবদুল্লাহকে ধরে তাদের নিকট নিয়ে আসবে তাকে একশ' উট পুরস্কার দেওয়া হবে। আমি আমার কওমের বৈঠক স্থলে বসেছিলাম এবং এ ব্যাপারেই আলোচনা চলছিল। ঠিক সেই সময় কবিলার জনৈক ব্যক্তি দরজায় এসে দাঁড়ালো এবং বললো, "খোদার কসম। আমি তিন ব্যক্তির একটি কাফেলা দেখেছি। এই কাফেলা কেবলমাত্র আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে গেল। আমার বদ্ধমূল ধারণা যে, তারা মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরাই হবেন।"
আমি সেই ব্যক্তিকে চুপ করার জন্য চোখ দিয়ে ইশারা করলাম। অতপর আমি লোকদেরকে বললাম যে, সে অমুক কবিলার মানুষ এবং হারিয়ে যাওয়া উট তালাশ করছিল। সংবাদদানকারী লোকটি বললো, সম্ভবতঃ তাই হবে। এরপর সে চুপ মেরে গেল। আমি কিছুক্ষণ মজলিশে বসে রলাম এবং বিভিন্ন ধরনের কথা হতে লাগলো। আমি উঠে বাড়ী চলে গেলাম। আমি নির্দেশ দিলাম যে, আমার ঘোড়া প্রস্তুত করা হোক এবং আমার অস্ত্র বের করা হোক। ঘোড়া তৈরী করে উপত্যকার মাঝে পৌঁছে দেওয়া হলো এবং আমি বাড়ীর পেছন দরজা দিয়ে অস্ত্র সমেত বের হয়ে ঘোড়ার নিকট গিয়ে পৌঁছলাম।
তারপর তীরের মাধ্যমে শুভ-অশুভ নির্বাচন করলাম। এই পরীক্ষা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেল। যে তীর বের হলো তার ওপর লিখা ছিল, তাকে ক্ষতি করো না। কিন্তু আমিতো শত উটের লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি শুভ-অশুভ নির্ধারণকে উপেক্ষা করে রওয়ানা হলাম। কাফেলার সন্ধান পেয়ে গেলাম এবং তার পদচিহ্ন ধরে এগুতে লাগল্পম। হঠাৎ করে ঘোড়ার পা ফসকে গেল। আমি তার পিঠ থেকে নীচে পড়ে গেলাম। এ ধরনের কোন সময় হয়নি। আমি ধারণা করলাম এটা. আবার কি হলো। আমি তীর বের করলাম এবং পুনরায় শুভ-অশুভ জানতে চাইলাম। এবারও সেই কথাই বের হলো যা পূর্বে দেখেছিলাম।
আমি এবারও এই পরীক্ষায় কান না দিয়ে পশ্চাদ্ভাবন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি তাদের পেছনে যাচ্ছিলাম। অতপর আমার ঘোড়ার একই অবস্থা হলো এবং আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। খুব তাজ্জব হলাম এবং বললাম, এটা কি হচ্ছে? তারপর তৃতীয়বার আমি শুভ-অশুভ নির্ধারণ করলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার সেই একই ধরনের জবাব পেলাম, তাকে ক্ষতি করো না। আমি তখনো আমার ইচ্ছা পরিবর্তন করলাম না এবং কাফেলার পেছনে চলতে লাগলাম। এমনকি তারা আমার নজরে এসে গেল। এখন আমার ঘোড়া পিছলে যাওয়ার পরিবর্তে অন্য আরেক মুসিবতে আটকে গেল। তার সামনের দু'পা মাটিতে গেড়ে গেল আমি মাটিতে এসে পড়লাম। অত্যন্ত কষ্টে ঘোড়া মাটি থেকে পা বের করলো এবং তা করতেই মাটি থেকে ধোঁয়ার মত কি যেন বের হলো। এতক্ষণে আমি বুঝলাম যে, মুহাম্মদের (সাঃ) হিফাজত (খোদার পক্ষ থেকে) করা হয়েছে এবং তিনি বিজয়ী। বিজিত হতে পারেন না।
তারপর আমি তাদেরকে ডেকে বললাম, আমি সুরাকা বিন জা'শম। একটু দাঁড়াও। আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। খোদার কসম। আমি তোমাদেরকে ধোকা দিব না এবং আমার তরফ থেকে তোমাদের কোন ক্ষতিও হবে না।
প্রিয় নবী (সাঃ) আবু বকরকে (রাঃ) বললেন, "তাকে জিজ্ঞেস কর, কি চায়।” আবু বকর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলে আমি বললাম, "আমাকে লিখিত কিছু দিন যা আমার ও আপনার মধ্যে দলিল ও চিহ্ন হিসেবে থাকবে। তিনি বললেন, "আবু বকর! তাকে লিখে দাও।” আবু বকর (রাঃ) একটি হাড়ের ওপর লিখে আমার দিকে নিক্ষেপ করলেন। আমি তা উঠিয়ে তুলে রেখে দিলাম। আমি ফিরে এলাম। কিন্তু এই ঘটনার কথা কারোর নিকটই উল্লেখ করলাম না। এ অবস্থাতেই মক্কা বিজয় হলো।
হুজুর (সাঃ) মক্কা বিজয় শেষে হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধও সমাপ্তি করেছিলেন এবং আমি লিখা নিয়ে তাঁর খিদমতে হাজির হওয়ার জন্য চললাম। মক্কা ও তায়েফের মধ্যেকার জি'রানা'র ঝর্ণার নিকট আমি তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলাম। আনসারদের একটি ঘোড় সওয়ার দল আমাকে দেখে বর্শা উচিয়ে চীৎকার করে জিজ্ঞাসা করলো, "তুমি কে? কি চাও?”
আমি আল্লাহ আল্লাহ করে রাসূলের (সাঃ) নিকট পৌঁছলাম। তিনি উটনীর ওপর সওয়ার ছিলেন। আমি তাঁর পায়ের গোছা দেখলাম। খোদার কসম। তা এতো লাল ও সাদা ছিল যেন আগুনের অঙ্গার। আমি লিখা হাতে নিয়ে হাত ওপরে তুলে বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল! এটা আপনার লিখা এবং আমি হলাম সুরাকা বিন জা'শম।" তিনি ইরশাদ করলেন "আজ নেকী ও হৃদ্যতার দিন। তাকে নিকটে আসতে দাও।" অতপর আমি তাঁর নিকট কতিপয় প্রশ্ন করলাম। এইসব প্রশ্নের মধ্যে আমার স্মরণে আছে এই প্রশ্নটিঃ "হে আল্লাহর রাসূল। আমি যদি নিজের হাওজকে উট ও চতুষ্পদ জন্তুর জন্য পানিতে পূর্ণ করে দিই। অতপর কোন অপরিচিত উট এসে যদি সেখান থেকে পানি পান করে নেয় তাহলে কি আমি কোন সওয়াব পাবো?” তিনি বললেনঃ
"হাঁ, প্রত্যেক পশুর খাওয়ানো ও পানি পান করানোতে সওয়াব রয়েছে।"
তারপর আমি আমার কওমের নিকট ফিরে এলাম এবং হুজুরের (সাঃ) খিদমতে সাদকা প্রেরণ অব্যাহত রাখলাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00