📄 এক রাষ্ট্রে দুই রাষ্ট্রনায়ক
ভূমিকা
প্রথম খলীফা নির্বাচনের সময় মুসলমানরা সর্বসম্মতিক্রমে একই সময়ে 'একই রাষ্ট্রে দুই রাষ্ট্রনায়ক' নির্বাচনের নীতি অনুসরণ করেছিল বলে বর্ণিত আছে। কিন্তু ইসলামী ইতিহাসে এই বর্ণনার বিরুদ্ধে বেশ কিছু চিত্তাকর্ষক উপাদান সংগৃহীত হয়েছে।
হযরত আবূ বকর (রা)-কে একক খলীফা নির্বাচনে ঐকমত্য
যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন তখন একতা ও ঐক্যের ইসলামী শিক্ষা মুসলমানদের বাধ্য করলো, নবীকে কাফন-দাফনের পূর্বেই তাঁর উম্মতের জন্য একজন নেতা নির্বাচন করতে। যখন আনসার ও মুহাজিরদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সাকীফা-ই-বনী সায়েদায় সমবেত হন তখন মুহাজিরদের পক্ষ থেকে হযরত আবু বকর (রা) দাঁড়িয়ে বলেন— "তোমরা তোমাদের যে সমস্ত কৃতিত্বপূর্ণ কাজের উল্লেখ করেছ, নিঃসন্দেহে তোমরা সেগুলোর অধিকারী, কিন্তু আরবের লোক কুরায়শ ছাড়া অন্য কাউকেই নেতা মানবে না।" অতঃপর এক আনসারী দাঁড়িয়ে বললেন, "এক নেতা আমাদের মধ্য থেকে হবেন এবং এক নেতা তোমাদের মধ্য থেকে।" একথার উপর খুব হট্টগোল শুরু হলো। হযরত উমর (রা) তখন হযরত আবু বকর (রা)-এর হাত বাড়িয়ে দিতে বললেন এবং তাঁর হাতে বায়'আত করলেন। অতঃপর মুহাজির ও আনসাররা সবাই তাঁর হাতে বায়'আত করলো।
সহীহ মুসলিমে একটি বর্ণনা আছে, 'যখন দুই খলীফার হাতে বায়'আত করা হয় তখন শেষোক্তজনকে হত্যা করো।'
📄 যৌথ প্রশাসনের অনুমতি
কুরআনের দৃষ্টিতে
হযরত মূসা (আ)-কে যখন নবুয়তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তখন তিনি আরজ করেছিলেন: "আমার স্ব-বংশের মধ্য হতে আমার জন্য করে দাও একজন সাহায্যকারী; আমার ভ্রাতা হারুনকে, তার দ্বারা আমার শক্তি বৃদ্ধি কর এবং তাকে আমার কর্মে শরীক কর।" যৌথ প্রশাসন সম্পর্কিত এই দৃষ্টান্ত আল্লাহ অনুমোদন করেন এবং প্রশাসনের ক্ষেত্রে হারুনকে মূসা (আ)-এর অংশীদার করলেন। কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, "এদেরই পথ তুমি অনুসরণ করো।"
হাদীসের দৃষ্টিতে
রসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি বিরাট দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় যে তিনি আম্মানের দক্ষিণ-পূর্ব আরবে দু'জন যৌথ প্রশাসককে লিখেছিলেন। পত্রটি ছিল নিম্নরূপ: "মুহাম্মদ রসূলুল্লাহর পক্ষ হতে আল-জালান্দীর পুত্রদ্বয় জীফার ও আবদ্কে লিখিত। শান্তি বর্ষিত হোক তাদের উপর যারা হেদায়েতের পথ অনুসরণ করে। আমি তোমাদের দু'জনকে ইসলামের দিকে আহবান জানাচ্ছি। যদি তোমরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ কর তাহলে তোমাদের উভয়কেই আমি শাসক হিসাবে বহাল রাখবো।"
সীরাত লেখকরা উল্লেখ করেছেন যে, উপরে উল্লেখিত উভয় শাসকই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদেরই শাসন বহাল রাখা হয়েছিল।
পরিশিষ্ট
দক্ষিণের সবচাইতে প্রাচীন পার্শী ঐতিহাসিক এ'সামী তাঁর গ্রন্থ 'ফুতুহুস্ সালাতীনে' লিখেছেন যে, আলী ও মুহাম্মদ যৌথভাবে সিংহাসনে বসেছিলেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীরও একটি অভিমত এই যে, যদি কোন সময় প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা একই ব্যক্তির মধ্যে না পাওয়া যায় তাহলে প্রশাসনিক দায়িত্ব একাধিক ব্যক্তির মধ্যে ব শয়তান ও ফেরেশতা থেকে পৃথক বরং এ উভয় থেকে শ্রেষ্ঠ আল্লাহর সৃষ্টির একটি পরিপূর্ণ নমুনা হওয়ার পথ বাতলে দিয়েছে। এই মহান পথ প্রদর্শকের শিক্ষা আজো হিংসা-বিদ্বেষ ও রেষারেষিতে পরিপূর্ণ বিশ্বের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠার সবচাইতে মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
টিকাঃ
১. হযরত সাওদা (রা) এবং হযরত উম্মে হাবীবা (রা)-এর স্বামীদ্বয় হাবশে হিজরত করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে উভয়েই মুরতাদ (ইসলামবিমুখ) হয়ে যান। কিন্তু হযরত সাওদা (রা) ও হযরত উম্মে হাবীবা (রা) ইসলামের উপর সুদৃঢ় থাকেন। ইসলামের প্রতি ঐ দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার কারণেই সম্ভবত তাঁরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সহধর্মিণী তথা 'মুসলমানদের মা' হতে পেরেছিলেন।
২. তাঁর এক বোনের নাম সীরীন অথবা শীরীন ছিল বলে জানা যায়। যদি সত্যি সত্যি তাঁরা সহোদরা হয়ে থাকেন তাহলে তাঁরা মূলত ইরানী তথা পার্শী ছিলেন। ইরান কর্তৃক মিসর আক্রমণের সময় তাঁরা সেখানে আসেন এবং ইরানের পরাজয়ের পরও সেখানে থেকে যান এবং পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।