📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের রাজনৈতিক দলীলসমূহ

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের রাজনৈতিক দলীলসমূহ


রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রাদি সংগ্রহ করার আগ্রহ সাহাবীদের যুগেই পরিলক্ষিত হয় । কোন যুগের রাজনীতিকে বুঝতে হলে তখনকার সরকারী দলীল-পত্রাদির উপর নির্ভর করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত । যদিও কালের ঘাত-প্রতিঘাতে রসূল-যুগের অনেক দলীল-পত্র হারিয়ে গেছে তবুও একথা ঠিক যে, রসূল সম্পর্কিত যে সমস্ত দলীল-পত্র পাওয়া যায়, অতীত যুগের কোন নবী কিংবা রাজা-বাদশাহ সম্পর্কিত দলীল পত্রাদির সংখ্যাল্পতার দিকে তাকালে এখনো সেগুলোকে নজীর-বিহীন বলা চলে ।

১৩৬০ হিজরীতে "মাজমু'আতুল ওসায়েকিস সিয়াসিয়াহ্ ফিল 'আহ্দেন নবভী ওয়াল খিলাফতির রাশিদাহ” শীর্ষক যে গ্রন্থটি মিসর থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাতে রসূল-যুগের প্রায় পৌনে তিন শ' চিঠি সংকলিত হয়েছে । অতঃপর তাতে খিলাফতে রাশিদা সম্পর্কিত কিছু উপাদানও সংগৃহীত হয়েছে । এই গ্রন্থ প্রকাশের পর রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আরো প্রায় দেড় দু'ডজন পত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে । নতুনভাবে মুদ্রণের ব্যবস্থা করা হলে এই অতিরিক্ত পত্রগুলো থেকেও সাধারণ পাঠকবৃন্দ সরাসরি উপকৃত হতে পারবেন ।

এই গ্রন্থের আগে-পরের পাতাগুলোতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যে সমস্ত পত্রের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর জন্যও মাজমু'আতুল ওসায়েকিস সিয়াসিয়াহ'কে সাহায্য পুস্তক হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে । কেননা তাতে এই চিঠিগুলোর উল্লেখই শুধু নয়, কোন্ পত্র কোন্ গ্রন্থে পাওয়া যায়, কোন্ পত্রের বচনের মধ্যে মতবিরোধ আছে, কে কি রকম বচন বর্ণনা করেছেন, এমনকি বচনের শব্দার্থ এবং টীকা-টিপ্পনীও বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে । আর সেইসাথে এই চিঠিপত্রাদি উদ্ধার ও সংরক্ষণে পূর্ববর্তীদের কার কি পরিমাণ অবদান রয়েছে তাও অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়েছে ।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 আন্তর্জাতিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বৈবাহিক সম্পর্ক ও অন্যান্য ব্যবস্থা

📄 আন্তর্জাতিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বৈবাহিক সম্পর্ক ও অন্যান্য ব্যবস্থা


পটভূমি
এখন থেকে হাজার-দেড় হাজার বছর পূর্বে যখন শিক্ষার এত চর্চা ছিল না, এক দেশের সাথে অন্য দেশের লোকদের মেলামেশার এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না, এক দেশ অন্য দেশের এত মুখাপেক্ষী ছিল না, তখন ধর্মের বিভিন্নতা, দেশ, জাতি, বংশ গোত্র, সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগত বিভিন্নতা, মানুষের মধ্যে মারামারি, রেষারেষি এমন কি খুনাখুনিয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াত। সকল ধর্ম এবং বর্তমান বিজ্ঞানও একথার উপর একমত যে, ভূ-গোলকের সমগ্র মানুষ একই পিতার বংশধর। আদম সন্তানরা আত্মরক্ষার জন্য গোষ্ঠীবদ্ধ হয়েছে, জীবন যাপনের প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় কেন্দ্রেীভূত হয়েছে এবং এই গোষ্ঠী ও কেন্দ্রকে উপলক্ষ করে ভাইয়ের রক্তে ভাইয়ের হাত রঞ্জিত ও কলুষিত হয়েছে। গ্রীক এবং ল্যাটিনের মত প্রাচীন সভ্য জাতির ভাষায় (সম্ভবত সংস্কৃত ভাষায়ও) শত্রুকে বুঝাতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয় তার প্রকৃত অর্থ হলো 'অপরিচিত'। এ দ্বারা মানুষ সম্পর্কিত ঐ সমস্ত জাতির চিন্তাধারার একটি মোটামুটি পরিচয় পাওয়া যায়। অতএব যে সমস্ত জাতি সংস্কৃতি সভ্যতায় পশ্চাদপদ, যে সমস্ত জাতি অসভ্য বর্বর তাদের চিন্তাধারা কি হবে তা তো জানা কথা।

অনুরূপ পরিস্থিতি এবং সত্য কথা বলতে গেলে, এর চাইতেও মারাত্মক পরিস্থিতি আরব উপদ্বীপে বিদ্যমান ছিল। আরব-অনারবের মৌলিক বৈষম্যের কথা ছেড়ে দিলেও আদনানী এবং কাহতানীদের পরস্পর ভেদাভেদ এত মারাত্মক রূপ ধারণ করেছিল যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগগুলোতেও এর প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল। অতঃপর আদনানীদের মধ্যেও মাযর-রাবী'আর বৈষম্য কিছু কম মারাত্মক ছিল না। এক্ষেত্রে কুরায়শদের ব্যাপারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা যেমন আরবের অন্য লোকদের চাইতে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করত তেমনি তাদের মধ্যে বনী হাশিম ও বনী উমাইয়ার পরস্পর রেষারেষি ও শত্রুতার কথাও ছিল সর্বজনবিদিত। এছাড়াও আরবদের মধ্যে হাযরী (শহরের অধিবাসী) বাদভী (বেদুঈন) ভেদ-বৈষম্যের লড়াইও ছিল তুঙ্গে। তারা একে অপরকে নীচ এবং হেয় জ্ঞান করত। আমার হিজায সফরকালে এক প্রশ্নের উত্তরে, এই সেদিনও জনৈক বাদভী অনেকটা নাক সিঁটকিয়ে আমাকে বলেছিলেন, 'বাদভী কি কখনো মুরগী পালে? এগুলো তো হাযরীদের কাজ।'

আজকালও জার্মান-ফরাসী, রুশ-পর্তুগীজ প্রভৃতি জাতি-বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। তবে শোচনীয়তা ও ধ্বংসকারিতার দিক বিবেচনা করলে ইসলাম-পূর্ব যুগে আরব গোত্রসমূহের মধ্যে যে ভেদ-বৈষম্য ও রেষারেষি বিদ্যমান ছিল তার অনুপাতে বর্তমান এই বৈষম্য কিছুই নয়। নিজেদেরকে সবচাইতে উৎকৃষ্ট মনে করার হীন মনোবৃত্তি আরবদেরকে পরস্পর থেকে এতই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল যে তাদের বিয়ে-শাদী প্রধানত নিজেদের গোত্রের মধ্যেই হত। গোত্রগত শত্রুতার কারণে এক গোত্র অন্য গোত্রকে নিজেদের সমকক্ষ মনে করত না। তাছাড়া কথায় কথায় রাত দিন সংঘর্ষ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ তাদের মধ্যে লেগেই ছিল। সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবিকা-উপাদান হ্রাস এই রেষারেষি ও হানাহানিকে এক চরম বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

ইসলামের আবির্ভাব
অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম উপরিউক্ত হীনমন্যতা ও গোত্রগত রেষারেষির বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করে। ইসলামের মতে, আরব অনারবের আল্লাহ্ একই। যিনি আদনানীদের আল্লাহ, তিনি কাহতানীদেরও আল্লাহ্। মানুষ মাত্রই একই পিতা আদমের সন্তান। তাদের মধ্যে বর্ণ, ভাষা এবং দেশের বিভিন্নতা থাকলেও সৃষ্টিগতভাবে তারা সকলেই সমান। তাদের মধ্যে কে উৎকৃষ্ট আর কে নিকৃষ্ট তা তাদের কার্যকলাপ এবং আচার-আচরণ দ্বারাই বিচার্য।

আল্লাহর একত্বের বিষয়টি বাহ্যত ধর্মের সাথে সম্পর্কিত হলেও ইসলামী সমাজে এর সামাজিক গুরুত্ব মোটেই কম নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির আল্লাহ 'এক' না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত না মানব জাতির সাম্যের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপিত হবে, আর না মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকার এবং ন্যায় ও পুণ্যের কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবে।

ইসলামী শিক্ষা আরবদের সাধারণ আচার-আচরণ ও চিন্তা-ভাবনার বিপরীত ছিল। যেভাবে অত্যন্ত ন্যায় বিচারভিত্তিক একটি সিদ্ধান্তের ততক্ষণ পর্যন্ত কোন মূল্য নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তা কার্যকরী হয় না—ঠিক সেভাবে সুন্দরতম শিক্ষা এবং আকায়িদ-বিশ্বাসেরও কোন মূল্য নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তা কাজে পরিণত করা না হয়। রসূল-জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তখন শিক্ষা ও শিক্ষার বাস্তবায়ন চলত একই সাথে। তখন দর্শন ও বাস্তবায়নের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না, স্বভাব ধর্ম ও সুস্থ বিবেক বুদ্ধি অনুযায়ী মানুষের মধ্যে সখ্যতা ও বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করা হত।

রসূলুল্লাহর কর্মপন্থা
ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্য হাসিলের সর্বপ্রথম উপাদান ছিল তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব প্রতিষ্ঠা। যদি সকলের আল্লাহ্ এক হন, তিনি যদি ন্যায়বান ও সকলের উপর সমভাবে করুণাশীল হন, তাহলে তো মানুষের মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে কোন ভেদ-বৈষম্য থাকে না। সমগ্র মানব জাতির মধ্যে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী ও প্রকৃত আনুগত্য সৃষ্টির জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) যে বিখ্যাত বাণীটি প্রদান করেছিলেন তা হলো, "মানুষ মাত্রই আদম থেকে সৃষ্ট আর খোদ আদম মাটি থেকে সৃষ্ট।" কুরআনেও এই নীতি ঘোষণা করা হয়েছে যে, পরস্পর পরিচিতির জন্যই মানুষের মধ্যে জাতি ও গোত্রের সৃষ্টি। আর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় শুধু 'তাকওয়া' (আল্লাহভীরুতা ও পুণ্যকর্ম) দ্বারা। অন্য আর এক জায়গায় বলা হয়েছে, মানুষের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা তাদের সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমার নিদর্শন ছাড়া কিছু নয়।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে যেহেতু দর্শন ও বাস্তবতার মধ্যে কোন প্রভেদ ছিল না, তাই আমরা দেখতে পাই, তখন দাস-প্রভু, কুরায়শী-অকুরায়শী, আরব-অনারব, হাবশী-রোমী-ইরানী সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই সারিতে দণ্ডায়মান এবং তাদের মধ্যে প্রাচীন মূর্খতাভিত্তিক ভেদ-বৈষম্যের লেশ মাত্র নেই। রসূলুল্লাহর এই রাজনীতিকে, তাঁর খলীফারাও পরিপূর্ণভাবে ও বিশ্বস্ততার সাথে বহাল রাখেন। ফলে মুসলমানদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে এই বিশ্বাস গড়ে উঠে যে, ইসলাম এবং সাম্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত; এর একটি ছাড়া অন্যটির কথা ভাবাও যায় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভারত হচ্ছে সবচাইতে পশ্চাদপদ দেশ। আর বর্ণ-বৈষম্যের ক্ষেত্রে সম্ভবত মালাবার হচ্ছে এর মধ্যে সবচাইতে পশ্চাদপদ এলাকা। এখানে প্রচুর সংখ্যক অদ্ভুত (অস্পৃশ্য জাতির লোক) অমানুষিক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে বসবাস করছে। এই এলাকায় মুসলমানদের সাথে অপেক্ষাকৃত ভাল ব্যবহার করা হয়। যেকোন অপরিচিত পর্যটক আজো এই অবস্থা দেখে বিস্মিত হবে যে, সকাল বেলা যে অদ্ভুত শুধু আপন (নিম্নবংশে) জন্মের কারণে লাঞ্ছনা ও অপমানের কারণে পরিণত হয়, বিকাল বেলা ইসলাম গ্রহণের কারণে, সেই অদ্ভুতের সাথেই হিন্দুরা সেই ধরনেরই (ভাল) ব্যবহার করে, যে ধরনের ব্যবহার তারা শুধুমাত্র একজন মুসলমানের সাথে করে থাকে। কাশ্মীরে এখন কোন অদ্ভুতের অস্তিত্ব নেই। কারণ-স্বরূপ বলা হয়ে থাকে যে, এখানকার উচ্চ জাতের দাবিদার হিন্দুরাই নাক সিঁটকিয়ে ওখানকার অদ্ভুতদেরকে মুসলমানদের ভাগে ঠেলে দিয়েছে।

রসূলুল্লাহ্ (সা) সকল মুসলমানের জন্য একই 'কিবলা' নির্ধারণ করেন, সবার উপর একই আইন চালু করেন এবং একই নেতৃত্বের অধীনে জড়ো করেন সবাইকে। তিনি এরূপ করেন নি যে, উচ্চ জাতের উপাসনালয় পৃথক হবে, অন্তত উপাসনালয়ে তাদের বসার জায়গাটা পৃথক হবে, তাদের পুণ্যের ভাগটাও বড় হবে, নীচ জাতের লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করলে কোন শাস্তিই তাদের হবে না, আর হলেও হবে শুধু 'নামকেওয়াস্তে' ।

এক কিবলা হওয়ার কারণে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমান এটা হৃদয়ঙ্গম করতে বাধ্য যে, তারা সকলেই একই কেন্দ্রের অধীন এবং তাদের নিজেদের তৈরী মসজিদ মোটেই কোন পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়। ইসলাম প্রবর্তিত আইনের সাম্যের কারণে সেই বিস্ময়কর পরিস্থিতির উদ্ভব মোটেই হয় নি যে, কাশ্মীরের ব্রাহ্মণ মাদ্রাজ কিংবা বাংলাদেশের ব্রাহ্মণের সাথে আত্মীয়তা করতে পারবে, কিন্তু একসাথে বসে পানাহার করতে পারবে না। সমগ্র মানবজাতিকে আদি ও অকৃত্রিম একত্বের দিকে টেনে আনার ক্ষেত্রে 'আইনে সমতা'র চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। এসবও কিন্তু বৃথা যেত যদি না একই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হত এবং দীন ও দুনিয়াকে একই কেন্দ্রে একত্রিত করা হত। যদি কথাকে (শিক্ষাকে) কাজে রূপায়িত করার ব্যবস্থা গৃহীত না হত এবং আধ্যাত্মিক ও পার্থিব বিষয়সমূহকে একত্রে সুবিন্যস্ত করা না হত তাহলে ইসলাম আরো দু'দশটি দার্শনিক চিন্তাধারার মত শুধু কল্পনা জগতেই রয়ে যেত। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর শিক্ষাকে কার্যকরী করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ধনীদের পাকড়াও করেন এবং তাদেরকে তাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অবশ্যদেয় কর হিসাবে কেন্দ্রে পাঠাতে বাধ্য করেন। এ থেকে উট বাঁধার একটি রশি পরিমাণ দ্রব্যও কেউ দিতে অস্বীকার করলে সেটাকে 'প্রকাশ্য বিদ্রোহ' মনে করা হত। রসূলের সুযোগ্য খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) তাঁর খিলাফতকালে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা বিদ্রোহীদেরকে সহজে সে কথাটি বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়, যা অনেক প্রেরণা দান সত্ত্বেও তারা বুঝে উঠতে পারে নি।

যাকাত অমান্যকারী বিত্তশালীদের বিরুদ্ধে ঘোষিত এই যুদ্ধের গুরুত্ব ঐতিহাসিকরা এখনো যথাযথভাবে বুঝে উঠতে পারেন নি। প্রকৃতপক্ষে এটা মানব জাতির অর্থনৈতিক জগতে একটা বিপ্লব ছাড়া কিছু নয়। এই বিপ্লব একদিকে সম্পদ বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে নাগরিকত্বের দায়-দায়িত্ব যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছে।

আরবদের সাথে সম্পর্ক
আরবে সাধারণত গোত্রীয় শাসন প্রচলিত ছিল। তাই সেখানে বন্ধুত্ব ও মিত্রতা স্থাপনের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার প্রভাবই ছিল সবচাইতে বেশি। প্রকৃতপক্ষে এই সম্পর্ক যতই দুর্বল হোক না কেন, অন্য যেকোন সম্পর্কের চাইতে অন্তত তখনকার মত তা ছিল অপেক্ষাকৃত সুদৃঢ় ও শক্তিশালী। মদীনায় হিজরতের পর একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো। একটি নগররাষ্ট্র হিসাবে এর সূচনা হলেও মাত্র দশ বছরের মধ্যে তা সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপ, দক্ষিণ ইরাক এবং ফিলিস্তিন পর্যন্ত দশ বারো লক্ষ বর্গমাইল ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ঐ যুগে রসূলুল্লাহ্ (সা) যে সমস্ত বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। স্ত্রীদের সংখ্যাধিক্য সর্বাবস্থায় নিন্দনীয় নয়। আর সেই অবস্থায় তো নয়ই, যখন এর একমাত্র উদ্দেশ্য রমণাভিলাষ না হয়। রসূলসহধর্মিণীরা এক জায়গার বা এক অঞ্চলের ছিলেন না। মোটামুটিভাবে তাঁরা যেন আরবের প্রত্যেকটি বড় গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। যেহেতু তাঁরা সাধারণভাবে অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারের ছিলেন, তাই ঐ সমস্ত বিবাহের প্রভাবও ছিল সুদূরপ্রসারী।

হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা এবং হযরত মায়মুনা বিনতে হারিস ছিলেন ইয়ামনের প্রভাবশালী গোত্র আমির বিন সা'সা'র মেয়ে। বিশেষ করে হযরত মায়মুনার ছিল আট নয়টি বোন এবং তাদের প্রত্যেকেরই বিবাহ হয়েছিল অত্যন্ত বড় বড় পরিবারে। বিখ্যাত গ্রন্থকার মুহাম্মদ বিন হাবিব (মৃত্যু ২৪৫ হি)-এর মতে অভিজাত জামাতার সংখ্যাধিক্যের ক্ষেত্রে হিন্দা বিনতে আ'ওফ ছিলেন আরবের মধ্যে অতুলনীয়া। তিনি ছিলেন হযরত মায়মুনা এবং তাঁর বোনদের মা।

হযরত জুভায়রিয়া ছিলেন বনী মুসতালাক গোত্রের সরদারের মেয়ে। এটি ছিল একটি শক্তিশালী এবং বিরাট গোত্র। মক্কা এবং মদীনার মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছিল এদের বাস। এই বৈবাহিক সম্বন্ধের কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমা মক্কার দিকে প্রায় এক শ' মাইল বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। 'কান্দাহ' ছিল দক্ষিণ আরবের একটি রাজকীয় পরিবার। ইসলাম-পূর্ব যুগে এই পরিবারের রাজ্যসীমা দক্ষিণ ইরাক পর্যন্ত আরবের পূর্বাংশে বিস্তার লাভ করেছিল। ইসলাম-উত্তর যুগেও এদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা) এই গোত্রের সাথেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিলাব, কালব, বনী সালীম প্রভৃতি গোত্রের সাথেও তিনি অনুরূপ সম্বন্ধ স্থাপন করেছিলেন। এ ব্যাপারে কিতাবুল মুহাব্বার এবং তাবাকাতে ইবনে সা'দে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। হযরত খাদীজা (রা) ছিলেন বনী আসাদ বিন আবদুল উয্যা গোত্রের মেয়ে। আর হযরত সাওদা (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত হাফসা (রা), হযরত উম্মে সালমা (রা), হযরত উম্মে হাবীবা (রা), হযরত যায়নাব বিনতে জুহশ (রা) ছিলেন যথাক্রমে বনী আমির বিন লুই, বনী তামীম, বনী আ'দী, বনী মাখযুম, বনী উমাইয়া ও বনী আসাদ বিন খুযায়মা গোত্রের মেয়ে। মক্কায় এই সমস্ত পরিবারের চাইতে সম্ভ্রান্ত পরিবার আর ছিল না। হযরত মারিয়া কিবতিয়া (রা) ছিলেন মিসরের মেয়ে। তিনি প্রথমে খ্রীস্টান ছিলেন। হযরত সুফিয়া (রা) ছিলেন খায়বরের য়াহুদী পরিবারের মেয়ে। রসূলুল্লাহ্ (সা) উপরিউক্ত বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ থেকে প্রাচীন যুগের গোত্রগত রেষারেষি দূর করার সামগ্রিক চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং তা বাস্তবে ফলপ্রসূও হয়েছিল।

অনারবদের সাথে সম্পর্ক
রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর কর্মপদ্ধতিতে যে মানসিক দিকটির প্রতি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন তা হলো, কাউকে খারাপ বললে সে ভাল না হয়ে বরং আরো জেদী হয়ে উঠে। অতএব তাকে সংশোধন করার জন্য প্রথমে তার প্রশংসা করে অতঃপর তার ভ্রান্তিগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। য়াহূদী, খ্রীস্টান এবং আরবের মুশরিকদের সম্পর্কেও রসূলুল্লাহ্র শিক্ষার সারকথা এই ছিল যে, হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ), হযরত ইবরাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন আল্লাহর নবী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী বংশধররা মনগড়া পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে এঁদের মূল শিক্ষা বিগড়ে দিয়েছে। কুরআন আহলে কিতাবদের সম্বোধন করে বলছেঃ "হে কিতাবিগণ, আসো তোমরা সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কারো ইবাদত করি না, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক করি না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করে না।"

কুরআন আরো বলছে, "ওয়ালি কুল্লি কাউমিল হাদ।" অর্থাৎ প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যই আছে পথ-প্রদর্শক। শেষ পর্যন্ত বলছেঃ "যারা বিশ্বাস করে, যারা য়াহূদী হয়েছে এবং খ্রীস্টান ও সাবেইন (তারকার পূজারী)-যারাই আল্লাহ্ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।" রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাবি ছিল যে, ইসলাম একটি মৌলিক ধর্ম। হযরত আদম থেকে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত সকল নবীই ইসলাম প্রচারের জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। ইসলাম চিরাচরিত মৌল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সমস্ত সত্যকে একজন বিবেক সম্পন্ন মানুষ না মেনে পারে না। আর মৌলিক ওয়াজিবাত (অবশ্য কর্তব্য) কার্যাদি ছাড়া অন্যান্য কার্য মুবাহ অর্থাৎ একজন মানুষ সেগুলো ইচ্ছা হলে করতে পারে, ইচ্ছা না হলে নাও করতে পারে। ধর্মের মৌলিক ভিত্তিসমূহ এবং এ সমস্ত কার্য, যা মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেগুলো বর্ণনা করার পর ইসলাম ধর্ম তথা জীবন ব্যবস্থাকে সর্বসাধারণের জন্য অতি সহজ এবং বোধগম্য করে পেশ করেছে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যে এক মধুর সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছে।

অন্য কথায় বলতে গেলে, সকল ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পরস্পর সম্মান ও ভক্তি শ্রদ্ধার ভাব গড়ে তোলা এবং শাখা-প্রশাখা ছেড়ে যুক্তিসম্মত মৌল ভিত্তির উপর সকলকে সমবেত হওয়ার দিকেই ইসলাম দাওয়াত দিয়েছে। একমাত্র এই মৌলিক ধর্মের মাধ্যমেই দ্বীন ও দুনিয়ার প্রকৃত মঙ্গল ও শান্তি লাভ সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম মানুষকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের এবংুঈন) ভেদ-বৈষম্যের লড়াইও ছিল তুঙ্গে। তারা একে অপরকে নীচ এবং হেয় জ্ঞান করত। আমার হিজায সফরকালে এক প্রশ্নের উত্তরে, এই সেদিনও জনৈক বাদভী অনেকটা নাক সিঁটকিয়ে আমাকে বলেছিলেন, 'বাদভী কি কখনো মুরগী পালে? এগুলো তো হাযরীদের কাজ।'

আজকালও জার্মান-ফরাসী, রুশ-পর্তুগীজ প্রভৃতি জাতি-বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। তবে শোচনীয়তা ও ধ্বংসকারিতার দিক বিবেচনা করলে ইসলাম-পূর্ব যুগে আরব গোত্রসমূহের মধ্যে যে ভেদ-বৈষম্য ও রেষারেষি বিদ্যমান ছিল তার অনুপাতে বর্তমান এই বৈষম্য কিছুই নয়। নিজেদেরকে সবচাইতে উৎকৃষ্ট মনে করার হীন মনোবৃত্তি আরবদেরকে পরস্পর থেকে এতই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল যে তাদের বিয়ে-শাদী প্রধানত নিজেদের গোত্রের মধ্যেই হত। গোত্রগত শত্রুতার কারণে এক গোত্র অন্য গোত্রকে নিজেদের সমকক্ষ মনে করত না। তাছাড়া কথায় কথায় রাত দিন সংঘর্ষ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ তাদের মধ্যে লেগেই ছিল। সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবিকা-উপাদান হ্রাস এই রেষারেষি ও হানাহানিকে এক চরম বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

ইসলামের আবির্ভাব
অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম উপরিউক্ত হীনমন্যতা ও গোত্রগত রেষারেষির বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করে। ইসলামের মতে, আরব অনারবের আল্লাহ্ একই। যিনি আদনানীদের আল্লাহ, তিনি কাহতানীদেরও আল্লাহ্। মানুষ মাত্রই একই পিতা আদমের সন্তান। তাদের মধ্যে বর্ণ, ভাষা এবং দেশের বিভিন্নতা থাকলেও সৃষ্টিগতভাবে তারা সকলেই সমান। তাদের মধ্যে কে উৎকৃষ্ট আর কে নিকৃষ্ট তা তাদের কার্যকলাপ এবং আচার-আচরণ দ্বারাই বিচার্য।

আল্লাহর একত্বের বিষয়টি বাহ্যত ধর্মের সাথে সম্পর্কিত হলেও ইসলামী সমাজে এর সামাজিক গুরুত্ব মোটেই কম নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির আল্লাহ 'এক' না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত না মানব জাতির সাম্যের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপিত হবে, আর না মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকার এবং ন্যায় ও পুণ্যের কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবে।

ইসলামী শিক্ষা আরবদের সাধারণ আচার-আচরণ ও চিন্তা-ভাবনার বিপরীত ছিল। যেভাবে অত্যন্ত ন্যায় বিচারভিত্তিক একটি সিদ্ধান্তের ততক্ষণ পর্যন্ত কোন মূল্য নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তা কার্যকরী হয় না— ঠিক সেভাবে সুন্দরতম শিক্ষা এবং আকায়িদ-বিশ্বাসেরও কোন মূল্য নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তা কাজে পরিণত করা না হয়। রসূল-জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তখন শিক্ষা ও শিক্ষার বাস্তবায়ন চলত একই সাথে। তখন দর্শন ও বাস্তবায়নের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না, স্বভাব ধর্ম ও সুস্থ বিবেক বুদ্ধি অনুযায়ী মানুষের মধ্যে সখ্যতা ও বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করা হত।

রসূলুল্লাহর কর্মপন্থা
ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্য হাসিলের সর্বপ্রথম উপাদান ছিল তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব প্রতিষ্ঠা। যদি সকলের আল্লাহ্ এক হন, তিনি যদি ন্যায়বান ও সকলের উপর সমভাবে করুণাশীল হন, তাহলে তো মানুষের মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে কোন ভেদ-বৈষম্য থাকে না। সমগ্র মানব জাতির মধ্যে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী ও প্রকৃত আনুগত্য সষ্টির জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) যে বিখ্যাত বাণীটি প্রদান করেছিলেন তা হলো, "মানুষ মাত্রই আদম থেকে সৃষ্ট আর খোদ আদম মাটি থেকে সৃষ্ট।" কুরআনেও এই নীতি ঘোষণা করা হয়েছে যে, পরস্পর পরিচিতির জন্যই মানুষের মধ্যে জাতি ও গোত্রের সৃষ্টি। আর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় শুধু 'তাকওয়া' (আল্লাহভীরুতা ও পুণ্যকর্ম) দ্বারা। অন্য আর এক জায়গায় বলা হয়েছে, মানুষের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা তাদের সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমার নিদর্শন ছাড়া কিছু নয়।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে যেহেতু দর্শন ও বাস্তবতার মধ্যে কোন প্রভেদ ছিল না, তাই আমরা দেখতে পাই, তখন দাস-প্রভু, কুরায়শী-অকুরায়শী, আরব-অনারব, হাবশী-রোমী-ইরানী সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই সারিতে দণ্ডায়মান এবং তাদের মধ্যে প্রাচীন মূর্খতাভিত্তিক ভেদ-বৈষম্যের লেশ মাত্র নেই। রসূলুল্লাহর এই রাজনীতিকে, তাঁর খলীফারাও পরিপূর্ণভাবে ও বিশ্বস্ততার সাথে বহাল রাখেন। ফলে মুসলমানদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে এই বিশ্বাস গড়ে উঠে যে, ইসলাম এবং সাম্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত; এর একটি ছাড়া অন্যটির কথা ভাবাও যায় না।

রসূলুল্লাহ্ (সা) সকল মুসলমানের জন্য একই 'কিবলা' নির্ধারণ করেন, সবার উপর একই আইন চালু করেন এবং একই নেতৃত্বের অধীনে জড়ো করেন সবাইকে। তিনি এরূপ করেন নি যে, উচ্চ জাতের উপাসনালয় পৃথক হবে, অন্তত উপাসনালয়ে তাদের বসার জায়গাটা পৃথক হবে, তাদের পুণ্যের ভাগটাও বড় হবে, নীচ জাতের লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করলে কোন শাস্তিই তাদের হবে না, আর হলেও হবে শুধু 'নামকেওয়াস্তে'। এক কিবলা হওয়ার কারণে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমান এটা হৃদয়ঙ্গম করতে বাধ্য যে, তারা সকলেই একই কেন্দ্রের অধীন এবং তাদের নিজেদের তৈরী মসজিদ মোটেই কোন পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়। ইসলাম প্রবর্তিত আইনের সাম্যের কারণে সেই বিস্ময়কর পরিস্থিতির উদ্ভব মোটেই হয় নি যে, উচ্চবংশীয় ব্যক্তি নিম্নবংশীয় ব্যক্তির সাথে আত্মীয়তা করতে পারবে, কিন্তু একসাথে বসে পানাহার করতে পারবে না। সমগ্র মানবজাতিকে আদি ও অকৃত্রিম একত্বের দিকে টেনে আনার ক্ষেত্রে 'আইনে সমতা'র চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।

রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর শিক্ষাকে কার্যকরী করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ধনীদের পাকড়াও করেন এবং তাদেরকে তাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অবশ্যদেয় কর হিসাবে কেন্দ্রে পাঠাতে বাধ্য করেন। এ থেকে উট বাঁধার একটি রশি পরিমাণ দ্রব্যও কেউ দিতে অস্বীকার করলে সেটাকে 'প্রকাশ্য বিদ্রোহ' মনে করা হত। রসূলের সুযোগ্য খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) তাঁর খিলাফতকালে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা বিদ্রোহীদেরকে সহজে সে কথাটি বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়, যা অনেক প্রেরণা দান সত্ত্বেও তারা বুঝে উঠতে পারে নি। প্রকৃতপক্ষে এটা মানব জাতির অর্থনৈতিক জগতে একটা বিপ্লব ছাড়া কিছু নয়। এই বিপ্লব একদিকে সম্পদ বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে নাগরিকত্বের দায়-দায়িত্ব যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছে।

আরবদের সাথে সম্পর্ক
আরবে সাধারণত গোত্রীয় শাসন প্রচলিত ছিল। তাই সেখানে বন্ধুত্ব ও মিত্রতা স্থাপনের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার প্রভাবই ছিল সবচাইতে বেশি। মদীনায় হিজরতের পর একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো। ঐ যুগে রসূলুল্লাহ্ (সা) যে সমস্ত বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। রসূল-সহধর্মিণীরা এক জায়গার বা এক অঞ্চলের ছিলেন না। মোটামুটিভাবে তাঁরা যেন আরবের প্রত্যেকটি বড় গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।

হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা এবং হযরত মায়মুনা বিনতে হারিস ছিলেন ইয়ামনের প্রভাবশালী গোত্র আমির বিন সা'সা'র মেয়ে। বিশেষ করে হযরত মায়মুনার ছিল আট নয়টি বোন এবং তাদের প্রত্যেকেরই বিবাহ হয়েছিল অত্যন্ত বড় বড় পরিবারে। হযরত জুভায়রিয়া ছিলেন বনী মুসতালাক গোত্রের সরদারের মেয়ে। এই বৈবাহিক সম্বন্ধের কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমা মক্কার দিকে প্রায় এক শ' মাইল বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। 'কান্দাহ' ছিল দক্ষিণ আরবের একটি রাজকীয় পরিবার। রসূলুল্লাহ্ (সা) এই গোত্রের সাথেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিলাব, কালব, বনী সালীম প্রভৃতি গোত্রের সাথেও তিনি অনুরূপ সম্বন্ধ স্থাপন করেছিলেন।

হযরত খাদীজা (রা) ছিলেন বনী আসাদ বিন আবদুল উয্যা গোত্রের মেয়ে। আর হযরত সাওদা (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত হাফসা (রা), হযরত উম্মে সালমা (রা), হযরত উম্মে হাবীবা (রা), হযরত যায়নাব বিনতে জুহশ (রা) ছিলেন যথাক্রমে বনী আমির বিন লুই, বনী তামীম, বনী 'আ'দী, বনী মাখযুম, বনী উমাইয়া ও বনী আসাদ বিন খুযায়মা গোত্রের মেয়ে। মক্কায় এই সমস্ত পরিবারের চাইতে সম্ভ্রান্ত পরিবার আর ছিল না। হযরত মারিয়া কিবতিয়া (রা) ছিলেন মিসরের মেয়ে। তিনি প্রথমে খ্রীস্টান ছিলেন। হযরত সুফিয়া (রা) ছিলেন খায়বরের য়াহূদী পরিবারের মেয়ে। রসূলুল্লাহ্ (সা) উপরিউক্ত বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ থেকে প্রাচীন যুগের গোত্রগত রেষারেষি দূর করার সামগ্রিক চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং তা বাস্তবে ফলপ্রসূও হয়েছিল।

অনারবদের সাথে সম্পর্ক
রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর কর্মপদ্ধতিতে যে মানসিক দিকটির প্রতি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন তা হলো, কাউকে খারাপ বললে সে ভাল না হয়ে বরং আরো জেদী হয়ে উঠে। অতএব তাকে সংশোধন করার জন্য প্রথমে তার প্রশংসা করে অতঃপর তার ভ্রান্তিগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। য়াহূদী, খ্রীস্টান এবং আরবের মুশরিকদের সম্পর্কেও রসূলুল্লাহ্র শিক্ষার সারকথা এই ছিল যে, হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ), হযরত ইবরাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন আল্লাহর নবী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী বংশধররা মনগড়া পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে এঁদের মূল শিক্ষা বিগড়ে দিয়েছে। কুরআন আহলে কিতাবদের সম্বোধন করে বলছেঃ হে কিতাবিগণ, আসো তোমরা সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কারো ইবাদত করি না, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক করি না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করে না। কুরআন আরো বলছে, "ওয়ালি কুল্লি কাউমিল হাদ।” অর্থাৎ প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যই আছে পথ-প্রদর্শক।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাবি ছিল যে, ইসলাম একটি মৌলিক ধর্ম। হযরত আদম থেকে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত সকল নবীই ইসলাম প্রচারের জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। ইসলাম চিরাচরিত মৌল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। ধর্মের মৌলিক ভিত্তিসমূহ এবং এ সমস্ত কার্য, যা মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেগুলো বর্ণনা করার পর ইসলাম ধর্ম তথা জীবন ব্যবস্থাকে সর্বসাধারণের জন্য অতি সহজ এবং বোধগম্য করে পেশ করেছে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দাদের এক মধুর সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছে।

পরিশিষ্ট
রসূলুল্লাহ্ (সা) হুনায়ন এবং তায়েফ অভিযান শেষে যখন জাআ'ররানা নামক স্থানে গনীমতের মাল বন্টন করছিলেন, তখন হাওয়াযিন গোত্র এসে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাদের নারী ও শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন জানায়। রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর নিজের ও বনী হাশিম গোত্রের ভাগ বিনা প্রতিদানে ফিরিয়ে দেন। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সকল সাহাবীই স্বেচ্ছায় তাদের নিজ নিজ যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেন। সম্ভবত কিছুসংখ্যক অবিবাহিত যুবতী বিজয়ীদের সাথে থেকে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে করে এবং যার ভাগে পড়েছিল তার সাথেই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়। বাকি সব স্ত্রীলোক এবং ছেলেমেয়ে হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদলের সাথে আনন্দচিত্তে নিজ নিজ বাসভূমিতে ফিরে যায়।

টিকাঃ
১. হযরত সাওদা (রা) এবং হযরত উম্মে হাবীবা (রা)-এর স্বামীদ্বয় হাবশে হিজরত করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে উভয়েই মুরতাদ (ইসলামবিমুখ) হয়ে যান। কিন্তু হযরত সাওদা (রা) ও হযরত উম্মে হাবীবা (রা) ইসলামের উপর সুদৃঢ় থাকেন। ইসলামের প্রতি ঐ দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার কারণেই সম্ভবত তাঁরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সহধর্মিণী তথা 'মুসলমানদের মা' হতে পেরেছিলেন।
২. তাঁর এক বোনের নাম সীরীন অথবা শীরীন ছিল বলে জানা যায়। যদি সত্যি সত্যি তাঁরা সহোদরা হয়ে থাকেন তাহলে তাঁরা মূলত ইরানী তথা পার্শী ছিলেন। ইরান কর্তৃক মিসর আক্রমণের সময় তাঁরা সেখানে আসেন এবং ইরানের পরাজয়ের পরও সেখানে থেকে যান এবং পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূল-যুগের কিছু আন্তর্জাতিক সমস্যা ও তার ইসলামী সমাধান

📄 রসূল-যুগের কিছু আন্তর্জাতিক সমস্যা ও তার ইসলামী সমাধান


ভূমিকা
উদ্ভিদ জগৎ এবং প্রাণী জগতের মধ্যে মানুষ যতই উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন কিংবা উন্নত হোন না কেন, তাদেরও সূচনা আছে, পরিপূর্ণতা আছে এবং পরিসমাপ্তিও আছে। এই বিশ্বে তাদের আগমন-নির্গমন অনন্তকাল ধরে জারি আছে। তারা শিশু হয়ে জন্মগ্রহণ করে, বড় হয়, বৃদ্ধ হয়, অতঃপর মারা যায়। কিন্তু তাতে দুনিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটে না। বরং এর মধ্যেই বড়দের ঘরে কিছু নতুন শিশুর জন্ম হয় এবং শেষ হওয়ার পূর্বে তাদেরও কেউ কেউ বড় হয় এবং বংশ রক্ষা করার মত কিছু সন্তান-সন্ততি রেখে যায়। সম্ভবত প্রকৃতির এই লীলাখেলারই ফলশ্রুতি এই যে, মানুষের মধ্যে বারবার একই জিনিসের অভ্যুদয় হয় এবং সেটা পৃথিবীতে আপন প্রভাবও রেখে যায়। সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্যে একমাত্র মানুষই তাদের অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবার যোগ্যতা রাখে। এ কারণে তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার গণ্ডী দিন দিন উন্নতর হচ্ছে।

রসূল-যুগের প্রারম্ভে বিশ্বের অবস্থা
এখন (সন ১৩৭৮ হি) থেকে ১৩৭৮ বছর পূর্বে, রসূল যুগের প্রারম্ভে বিশ্বের অবস্থা কিরূপ ছিল তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়। রসূল-যুগের প্রারম্ভে বিশ্বে বিরাট বিরাট সভ্যতার অধিকারী দেশসমূহ ছিল। তখন মানুষের বুদ্ধিবলে মিসরের পিরামিড তৈরী হয়ে গেছে, অজন্তার গুহাচিত্রও আঁকা হয়ে গেছে, দুনিয়ায় তাওরীতের কঠোরতা, ইনজীলের নম্রতা এবং বেদের (জাত-বর্ণের) ভেদ-বৈষম্যও এসে গেছে। কিন্তু তত্ত্বগত ও বৈষয়িক উন্নতি সত্ত্বেও তখনকার মানুষের আধ্যাত্মিক ও মানসিক অধঃপতন ছিল মারাত্মক।

জাতীয়তাবাদ
ইরানীরা তাদের সাদা বর্ণের উপর এত গর্বিত ছিল যে, তারা হাবশী এবং হিন্দুদেরকে 'কাক' বলে সম্বোধন করত। আরবরা তাদের ভাষার গঠন-প্রকৃতি এবং ভাব প্রকাশের যোগ্যতার উপর এত গর্বিত ছিল যে, তারা নিজেদের ছাড়া বাকি বিশ্ববাসীকে 'বোবা' জ্ঞান করত। কুরআন ঘোষণা করলো, "এবং তাঁর (আল্লাহর) নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।” ফলে ইসলামী রাষ্ট্রে বিলাল (রা) হাবশী ও সুহায়েব রোমীর মধ্যে কোন পার্থক্য রইল না।

জাতিভেদ
মানুষ একই মাতাপিতা অর্থাৎ আদম হাওয়ার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও জাতিগত ভেদ-বৈষম্যের কারণে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, এক ভাই অন্য ভাইকে স্পর্শ করা তো দূরের কথা, একের ছায়া অন্যের ছায়ার উপর পড়ুক, এটাও তারা সহ্য করতে পারত না। কুরআন ঘোষণা করলো, "হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যদাসম্পন্ন, যে আল্লাহ সম্পর্কে অধিক সাবধানী।”

retaliation বা পাল্টা প্রতিশোধ গ্রহণ
রসূল-যুগের প্রারম্ভে আরব গোত্রসমূহের মধ্যেও প্রতিশোধ ও পাল্টা প্রতিশোধ গ্রহণের ধারা চলে আসছিলো। একুশ বছরের ক্রমাগত সংঘর্ষের পর মুসলমানরা যখন মক্কার উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) শহরবাসীদের একত্রিত করে বলেছিলেন, "আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও, তোমাদের সবাইকে মুক্ত করে দেওয়া হলো।" একথা ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে মক্কার কায়া এমনভাবে পাল্টে যায় যে, সেখানকার অধিবাসীরা পুনরায় প্রতিশোধ গ্রহণের কথা চিরদিনের জন্যে ভুলে যায় এবং পরিণত হয় তাদের পূর্বতন শত্রুর সবচাইতে বড় অনুসারীতে।

জীবন দর্শন
রসূল-যুগের প্রারম্ভে দু'টি দর্শন ছিল। একটি হলো, 'দুনিয়া থেকে পৃথক হয়ে যাও, তবেই তোমরা প্রকৃত মানুষ হতে পারবে।' আর অন্যটি ছিল, 'খাও দাও, স্ফূর্তি কর, এটাই জীবনের চরম লক্ষ্য।' ইসলামী জীবন দর্শন হলো, ইহলোকেও মঙ্গলে থাকবো, আবার পরলোকেও মঙ্গলে থাকবো। কুরআন বলছে: "হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ইহকালে কল্যাণ দাও এবং পরকালেও কল্যাণ দাও এবং আমাদেরকে অগ্নি-যন্ত্রণা হতে রক্ষা কর।"

অন্য ধর্মের সত্যতার সাক্ষ্য
রসূলুল্লাহ্ (সা) কখনো বলেন নি যে, দুনিয়ার অন্যান্য সব ধর্ম মিথ্যা বরং তিনি বলেছেন, দুনিয়ায় এমন কোন দেশ বা জাতি নেই যেখানে আল্লাহর রসূল আসেন নি। কুরআন বলছে: "এমন কোন জাতি নেই যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ভয় প্রদর্শনকারী আসে নি।" ইসলাম বিশ্বের সমস্ত ধর্মাবলম্বীকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে মূল ও আসল ধর্মের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে এবং আল্লাহর একত্ব, শেষ বিচারের দিন ও সৎকাজ এই তিনটি বিষয়ের উপর একমত হতে।

প্রাচুর্য ও নিঃস্বতা
ইসলাম সম্পদ একীভূতকরণের শিকড়টি কেটে দিয়েছে। সর্বপ্রকার সুদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অসিয়ত (উইল) করার উপরও প্রয়োজনীয় বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। উত্তরাধিকারীত্বের মধ্যে পুরুষ স্ত্রীলোক-উভয়কেই অংশীদার করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সম্পদের উপর যাকাত নামে একটি বাধ্যতামূলক মাশুল ধার্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে, প্রতিটি নাগরিকের খাওয়া-পরার সংস্থান করা।

বিবিধ
ইসলাম ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য মেনে নিয়েই সামাজিক সাম্যের পথে পা বাড়িয়েছে। ইসলাম মানুষের স্বভাব পরিবর্তনের চাইতে স্বভাবকে সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালনার উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। এক বিবাহ আদর্শগতভাবে একটি ভাল ব্যাপার। কিন্তু পরিস্থিতি অনুযায়ী বহু বিবাহের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। ইসলাম মনোজগতের দাসত্বের কড়া সমালোচনা করেছে এবং সৃষ্টির উপর চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-গবেষণার উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। 'রাব্বি যিনী ইলমা'-হে প্রতিপালক, আমার জ্ঞান-বুদ্ধিকে আরো বাড়িয়ে দাও।

ভূমিকা
উদ্ভিদ জগৎ এবং প্রাণী জগতের মধ্যে মানুষ যতই উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন কিংবা উন্নত হোন না কেন, তাদেরও সূচনা আছে, পরিপূর্ণতা আছে এবং পরিসমাপ্তিও আছে। এই বিশ্বে তাদের আগমন-নির্গমন অনন্তকাল ধরে জারি আছে। তারা শিশু হয়ে জন্মগ্রহণ করে, বড় হয়, বৃদ্ধ হয়, অতঃপর মারা যায়। কিন্তু তাতে দুনিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটে না। বরং এর মধ্যেই বড়দের ঘরে কিছু নতুন শিশুর জন্ম হয় এবং শেষ হওয়ার পূর্বে তাদেরও কেউ কেউ বড় হয় এবং বংশ রক্ষা করার মত কিছু সন্তান-সন্ততি রেখে যায়।

সম্ভবত প্রকৃতির এই লীলাখেলারই ফলশ্রুতি এই যে, মানুষের মধ্যে বারবার একই জিনিসের অভ্যুদয় হয় এবং সেটা পৃথিবীতে আপন প্রভাবও রেখে যায়। সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্যে একমাত্র মানুষই তাদের অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবার যোগ্যতা রাখে। এ কারণে তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার গণ্ডী দিন দিন উন্নতর হচ্ছে। আমার এতগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, অতীত যুগের যাবতীয় অভিজ্ঞতা, যাবতীয় সমস্যা ও তার সমাধান একেবারে বাসি হয়ে যায় নি বরং আজও সেগুলোর অস্তিত্ব আছে, প্রভাব আছে। অতীতে বিভিন্ন সমস্যার যে সমস্ত সমাধান বের করা হয়েছে সেগুলোর প্রভাব ততক্ষণ পর্যন্ত বাকি ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত সে অনুযায়ী কাজ করা হয়েছে। নতুন বংশধরেরা যখন ঐ পাঠ ভুলে গেছে তখন আবার নতুন করে এ পুরাতন সমস্যাগুলোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

রসূল-যুগের প্রারম্ভে বিশ্বের অবস্থা
এখন (সন ১৩৭৮ হি) থেকে ১৩৭৮ বছর পূর্বে, রসূল যুগের প্রারম্ভে বিশ্বের অবস্থা কিরূপ ছিল তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়। মানব জগৎ কখনো শুধুমাত্র খারাপ লোকে ভরপুর থাকে না। তাতে কিছু ভাল লোকও থাকে। বরং নিকৃষ্টতম মানুষের জীবনেও কিছু মুহূর্ত এমন আসে, যখন সে কিছু না কিছু ভাল কাজ করে। কিন্তু এখানে আমরা ঐ সমস্ত ধ্যান-ধারণা, ঐ সমস্ত অভ্যাস ও আচার-আচরণ সম্পর্কে আলোচনা করবো, যা ঐ যুগে প্রচলিত ছিল। এর মধ্য থেকে আমরা একটিকে নেব এবং দেখবো ফারান পাহাড়ের শীর্ষ থেকে তার সংস্কারের কি আহ্বান এসেছিলো। আমরা দেখবো, ঐ আহ্বান সমাজে প্রচলিত আচার-আচরণ সম্পর্কে কি অভিমত দিয়েছিলো এবং শক্ত হাতে ঐ সমস্ত আচার-আচরণকে কোন্ কোন্ ছাঁচে ঢেলে কোন্ কোন্ রূপে রূপায়িত করেছিলো। মানুষের স্বভাব পরিবর্তনের প্রশ্ন এখানে নয়; প্রশ্ন শুধু স্বভাবের বহিঃপ্রকাশের পথ নির্ধারণের।

এটা তো সহজ কথা যে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কমবেশি দয়া মায়া থাকে। তার মধ্যে সহনশীলতা থাকে, আরামপ্রিয়তাও থাকে। যদি মানুষের রাগ এবং আরামপ্রিয়তাকে নিঃশেষ করে দেওয়া যায় তাহলে সে মানুষই থাকে না বরং ফেরেশতা অথবা প্রস্তরে পরিণত হয়। এখন প্রশ্ন হলো, মানুষ কখন দয়া করবে, কখন রাগ করবে, আবার কখন ধৈর্য ধারণ করবে? মানুষ তার কোন্ অভ্যাস এবং কোন্ শক্তিকে কোন্ কাজে কি পরিমাণে নিয়োজিত করবে—সংস্কারক প্রকৃতপক্ষে তাকে সে পথেরই নির্দেশই দিয়ে থাকেন।

রসূল-যুগের প্রারম্ভে বিশ্বে বিরাট বিরাট সভ্যতার অধিকারী দেশসমূহ ছিল। তন্মধ্যে মাদায়েনের ইরানীরা, কন্সটান্টিনোপলের বাইজেন্টাইনীরা এবং খানবানিয়ের চীনারা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন মানুষের বুদ্ধিবলে মিসরের পিরামিড তৈরী হয়ে গেছে, অজন্তার গুহাচিত্রও আঁকা হয়ে গেছে, দুনিয়ায় তাওরীতের কঠোরতা, ইনজীলের নম্রতা এবং বেদের (জাত-বর্ণের) ভেদ-বৈষম্যও এসে গেছে এবং অভিজ্ঞতার দ্বারা মানুষ সেগুলোর পরিণামও দেখে নিয়েছে। তখন কনফুসিয়াসের শিক্ষা অনুযায়ী মানুষ তার পূর্ব-পুরুষের এক শ' এক স্তর পর্যন্ত মুখস্থ করার চেষ্টা করে নিয়েছে, (এরিস্টটলের) 'পলিটিক্স', মহাভারত এবং ইলিয়াড ওডিসিও লেখা হয়ে গেছে। মোটকথা ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, কারিগরি তথা প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে মানুষ সেই স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, যেখানে বসে এই আধুনিক সভ্যতার যুগেও তারা নিঃসন্দেহে গর্ববোধ করতে পারে। কিন্তু তত্ত্বগত ও বৈষয়িক উন্নতি সত্ত্বেও তখনকার মানুষের আধ্যাত্মিক ও মানসিক অধঃপতন ছিল মারাত্মক।

জাতীয়তাবাদ
ইরানীরা তাদের সাদা বর্ণের উপর এত গর্বিত ছিল যে, তারা হাবশী এবং হিন্দুদেরকে 'কাক' বলে সম্বোধন করত। আরবরা তাদের ভাষার গঠন-প্রকৃতি এবং ভাব প্রকাশের যোগ্যতার উপর এত গর্বিত ছিল যে, তারা নিজেদের ছাড়া বাকি বিশ্ববাসীকে 'বোবা' জ্ঞান করত। ইরানীদের বর্ণ এবং আরবদের ভাষা নিঃসন্দেহে অপরূপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। কিন্তু তাই বলে কি গায়ের বর্ণ এবং মুখের ভাষার ভিত্তিতে অন্যকে হেয় জ্ঞান করা সঙ্গত? অতএব কুরআন ঘোষণা করলো, "এবং তাঁর (আল্লাহর) নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।" ফলে ইসলামী রাষ্ট্রে বিলাল (রা) হাবশী ও সুহায়েব রোমীর মধ্যে কোন পার্থক্য রইল না। তুর্কীরা আর কখনো হাবশীদের দেখে নাক সিটকালো না এবং আরবরা চীনাদের সাথে শান্তিতে জীবন যাপন করার মধ্যেও অসুবিধার কিছু দেখলো না।

জাতিভেদ
মানুষ একই মাতাপিতা অর্থাৎ আদম হাওয়ার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও জাতিগত ভেদ-বৈষম্যের কারণে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, এক ভাই অন্য ভাইকে স্পর্শ করা তো দূরের কথা, একের ছায়া অন্যের ছায়ার উপর পড়ুক, এটাও তারা সহ্য করতে পারত না। জ্ঞানের প্রসার ও প্রচারের ব্যাপারে তারা এতই কৃপণ ও স্বার্থপর হয়ে উঠেছিল যে, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের মাধ্যম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ যে কেউ স্পর্শ করা বা পাঠ করা তো দূরের কথা, যদি কোনভাবে নীচ জাতের কেউ তা শুনে ফেলত তাহলেও গলিত সীসা কানের মধ্যে ঢেলে দিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হত। কোন কোন সম্প্রদায়ের লোক নিজেদেরকে জ্ঞানে-গুণে এত উৎকৃষ্ট মনে করত যে, দুনিয়ায় অন্য কোন সম্প্রদায় বা মানুষের মধ্যে জ্ঞান বা বিজ্ঞতা থাকতে পারে তা তারা বিশ্বাসই করতে চাইত না। এমতাবস্থায় কুরআন ঘোষণা করলো, "হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যদাসম্পন্ন, যে আল্লাহ সম্পর্কে অধিক সাবধানী।" অতঃপর অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, একই সারিতে (বাদশাহ) মাহমুদ ও (দাস) আয়াজ দাঁড়িয়ে গেল। তাদের মধ্যে কেউ দাস রইলো না এবং কেউ প্রভুও রইলো না। পরবর্তীকালে দাস বংশের শাসনকেও কেউ হেয় নজরে দেখলেন না। কেননা ইতিপূর্বে আবু বকর সিদ্দীক (রা), উমর ফারুক (রা) এবং খালিদ সাইফুল্লাহ (রা)-কে ক্রীতদাস যায়দ (রা) এবং ক্রীতদাস পুত্র উসামা (রা)-এর অধীনে যুদ্ধ করতে তারা দেখেছে। মানুষের মধ্যে জন্মগত সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং শুধু গুণাবলী দ্বারা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের যে আদর্শ ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিল তা দ্বারা মানব সমাজকে ঐ সমস্ত ভেদ-বৈষম্য থেকে পাক-পবিত্র করে তোলা হয়, যা অমুসলিম সমাজে এখনো পরস্পর রেষারেষি ও হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে।

রিভার্স বা পাল্টা প্রতিশোধ গ্রহণ
সাধারণ মানুষের স্বভাবই এই যে, তারা অন্যের উপকারের কথা মনে রাখে না, কিন্তু অন্যের দ্বারা যে কষ্ট বা আঘাত পায়, তা চিরদিন মনে রাখে। এক্ষেত্রে জাতি বা ব্যক্তির শুধু নাম আওড়ালে আমাদের নবীনদের পক্ষে আসল ব্যাপারটি বুঝে উঠা মুশকিল হবে। তাই ভূমিকাস্বরূপ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছি। আজ জাপানে আমেরিকানদের বাড়াবাড়ি দেখে জাপানীদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি জাগে। কিন্তু যুদ্ধকালীন সময়ে জাপানীরা আমেরিকানদের প্রতি যে অমানবিক আচরণ করেছে, তা স্মরণ করলে আমেরিকানদের প্রতিই সহানুভূতি জাগে। যুদ্ধের পূর্বে আমেরিকায় জাপানীদের যেরূপ হেয় জ্ঞান করা হত সেদিকে লক্ষ্য করলে জাপানীরা যুদ্ধকালীন সময়ে যা করেছে তাতে তাদের প্রতি সহানুভূতি জাগে, আর আমেরিকা উন্নত হওয়ার পূর্বে জাপানীরা আমেরিকানদেরকে যেরূপ ঘৃণা করত তাতে আমেরিকানদের প্রতি সহানুভূতি জাগে।

মোটকথা, পাল্টা প্রতিশোধ গ্রহণের এই ধারা কখনো শেষ হবে না যদি না মানুষের মধ্যে 'গতস্য শোচনা নাস্তি'- এবং 'যা হবার হয়ে গেছে মাফ করে দাও'-এই মনোবৃত্তি জাগ্রত হয়। রসূল-যুগের প্রারম্ভে আরব গোত্রসমূহের মধ্যেও প্রতিশোধ ও পাল্টা প্রতিশোধ গ্রহণের অনুরূপ ধারা চলে আসছিলো। ইরানী ও গ্রীকদের (রোমানদের) হাজার বছরের সংঘর্ষ, ভারতে ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধদের সংঘর্ষ ঐ একই সাক্ষ্য দিচ্ছিল। সমাজসংস্কারমূলক দাওয়াতের জন্য খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপরও আরবরা দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়েছিল। এমন কি তারা তাকে হত্যা করারও সংকল্প নিয়েছিল। দেশ ত্যাগ করার পর তারা তাঁর এবং তাঁর অনুসারীদের যাবতীয় সহায়-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিল। দেশত্যাগ করা সত্ত্বেও তারা তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয় নি। বদর, ওহুদ, খন্দক তথা একটির পর একটি মারাত্মক অভিযান চালিয়ে তারা মুসলমানদেরকে সমূলে উৎখাত করতে চেয়েছিল। একুশ বছরের ক্রমাগত সংঘর্ষের পর মুসলমানরা হঠাৎ মক্কার উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এত জুলুম, এত নির্যাতন সহ্য করার পর এভাবে জয়লাভ করে মুসলমানরা যদি মক্কায় পাইকারী হারে হত্যাকাণ্ড চালাত তাহলে কি সেটা খুব অন্যায় হত? মক্কাবাসীদের যাবতীয় সম্পত্তি আটক করে নেওয়া কি তখন অবৈধ হত? মক্কাবাসীদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত ক্রীতদাস এবং অচ্ছুৎ বানিয়ে রাখলে সেটাকে কি মুসলমানদের বাড়াবাড়ি আখ্যা দেওয়া যেত? মক্কা বিজয়ের সাথে সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা) শহরবাসীদের একত্রিত করে কি বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, "আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও, তোমাদের সবাইকে মুক্ত করে দেওয়া হলো।"—তখন তিনি যদি প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন তাহলে তাঁর রিপুর তাড়না নিঃসন্দেহে অবদমিত হত। কিন্তু কষ্ট যা হবার, তা তো হয়ে গেছে, যে মরার সে তো মরে গেছে, যে ঘটনা ঘটে গেছে তাকে তো আর অঘটনের খাতায় তোলা যাবে না। এভাবে মাল লুন্ঠন করলে কিছু গনীমত নিশ্চয়ই হস্তগত হত, কিন্তু মাল তো আসলে হাতের ময়লা—আসে, আবার চলে যায়। চিরদিনের জন্য মক্কাবাসীদেরকে দাস বানাবার নির্দেশ দেওয়া যেত, কিন্তু তারা কি চিরদিন নীরব নিশ্চুপ বসে থাকবে? আর যদি পুনরায় জয়লাভ করে তাহলে কি এর চাইতেও মারাত্মক অঘটন ঘটাবে না? 'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই'— একথা ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে মক্কাবাসীদের অন্তর মোমের মত গলে যায়, এক নিদারুণ লজ্জা ও অনুশোচনায় তারা ঘর্মাক্ত হয়ে উঠে এবং মক্কার কায়া এমনভাবে পাল্টে যায় যে, সেখানকার অধিবাসীরা পুনরায় প্রতিশোধ গ্রহণের কথা চিরদিনের জন্যে ভুলে যায় এবং পরিণত হয় তাদের পূর্বতন শত্রুর সবচাইতে বড় অনুসারীতে। আজ যদি কোন আইজেন হাওয়ার কিংবা কোন স্ট্যালিন পুনরায় রসূলুল্লাহর এই সুন্নাত (কর্মধারা) অনুসরণ করতেন এবং পুনরায় বিশ্বকে প্রতিশোধ ও পাল্টা প্রতিশোধের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতেন তাহলে কত ভালই না হত।

জীবন দর্শন
রসূল-যুগের প্রারম্ভে বিশ্বে যেসব বড় বড় ধর্ম ও সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল সেগুলো মানব জীবনের লক্ষ্য ও জীবনদর্শন সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করত। বৌদ্ধমত আত্মা এবং রিপুর পবিত্রতার উপর মানুষের দৃষ্টিকে এমনভাবে কেন্দ্রীভূত করেছিল যে, তাদের জীবন দর্শনের মধ্যে আল্লাহর কোন স্থান ছিল না এবং তার কোন প্রয়োজনও ছিল না। বাহ্যত কোন চূড়ান্ত লক্ষ্য ছাড়াই বৌদ্ধমত মানুষের প্রকৃতিগত শক্তির ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছিল। আর খ্রীস্টমতের অবস্থা এই ছিল যে, তাতে একদিকে আল্লাহর সাথে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপনের উপদেশ দেওয়া হচ্ছিল এবং অন্যদিকে ধর্ম প্রতিষ্ঠাতাকে পরামর্শ (বরং নির্দেশ) দেওয়া হচ্ছিলো যে, কায়সারের (রাষ্ট্রনায়কের) জিনিস কায়সারকে এবং খোদার জিনিস খোদাকে দান কর। এই ব্যবস্থায় পুরাপুরি 'শিরক' (অংশীদারিত্ব) প্রতিষ্ঠিত না হলেও তা দ্বারা ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে এমন একটি স্থায়ী বিভেদের সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, রাজনীতিকের জন্য চরিত্রের যেন আর কোন প্রয়োজন ছিল না। এই দর্শনের ভিত্তিতে যেমন একজন রাষ্ট্রনায়ক স্বেচ্ছাচারী ও পাষাণ হয়ে উঠতে পারে তেমনি শুধুমাত্র উপাসনা ছাড়া জীবনের আর কোন ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের কোন অধিকার থাকে না।

মোটকথা, রসূল-যুগের প্রারম্ভে দু'টি দর্শন ছিল। একটি হলো, 'দুনিয়া থেকে পৃথক হয়ে যাও, তবেই তোমরা প্রকৃত মানুষ হতে পারবে।' আর অন্যটি ছিল, 'খাও দাও, স্ফূর্তি কর, এটাই জীবনের চরম লক্ষ্য।' এটা জানা কথা যে, অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই হাতে গোনা যায় এমন কিছুসংখ্যক ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউই বৈরাগ্যের পক্ষপাতী নয়। আর জড়বাদী ধারণার বশবর্তী হয়ে নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দেওয়ার অর্থই তো হচ্ছে মানুষ ও পশুর মধ্যকার পার্থক্যকে মুছে ফেলা। অতএব এমন একটি জীবন দর্শনের প্রয়োজন ছিল, যা মানুষের স্বভাবের অনুকূল এবং তাদের বংশরক্ষার জন্যও উপযোগী। এই সম্পর্কে কুরআন যে বিপ্লবী নির্দেশ দিয়েছে তা হলো, "মানুষের মধ্যে অনেকে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ইহকালেই দাও।' বস্তুত পরকালে তাদের জন্য কোন অংশ নেই। এবং তাদের মধ্যে অনেকে বলে, "হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ইহকালে কল্যাণ দাও এবং পরকালেও কল্যাণ দাও এবং আমাদেরকে অগ্নি-যন্ত্রণা হতে রক্ষা কর।' তারা যা অর্জন করেছে তার প্রাপ্য অংশ তাদেরই। বস্তুত আল্লাহ্ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।"

ইসলামী এবং খাঁটি ইসলামী জীবন দর্শন হলো, ইহলোকেও মঙ্গলে থাকবো, আবার পরলোকেও মঙ্গলে থাকবো। আমরা আসমান ও যমীনের প্রতিটি সৃষ্টি থেকে উপকৃত হবো, কিন্তু আমরা থাকবো শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। উদাম স্বাদ গ্রহণ করা (মজা করা) আমাদের জীবনের লক্ষ্য হবে না বরং জীবনের লক্ষ্যকে পূর্ণ করার জন্য আমরা অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করে, অন্যের উপর কোনরূপ অত্যাচার না করে যতটুকু স্বাদ গ্রহণ করার প্রয়োজন তা অবশ্যই করবো।

বিশ্বাস ও কাজ
ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ধর্মীয় বিদ্বেষ এতদূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল যে, প্রতিটি লোক নিজের ধর্ম ছাড়া অন্যান্য সব ধর্মকে ভিত্তিহীন এবং মুক্তিপ্রাপ্তির সম্পূর্ণ প্রতিকূল মনে করত। আর সবচেয়ে সাংঘাতিক কথা হলো, তারা নিজেদের ধর্মে বাইরের কোন লোককে অনুপ্রবেশের অনুমতিই দিত না। ধর্মকে শুধুমাত্র নিজেদের বংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার স্বার্থপর মনোবৃত্তি ছিল য়াহূদীদের। হিন্দুদের অবস্থাও ছিল তাই। বরং মতির ইঞ্জীলের বর্ণনার উপর যদি ভরসা করা যায় তাহলে বলতে হয় যে খোদ ঈসাও (আ) বলেছিলেন, "আমি শুধুমাত্র ইসরাঈল বংশের হারানো মেষের জন্য আবির্ভূত হয়েছি। বাকি বিশ্বের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই এবং আমি আমার দূত এবং প্রচারকদেরকেও নির্দেশ দিয়েছিলাম, যেন তারা শুধুমাত্র ইসরাঈল বংশের হারানো মেষের মধ্যে খ্রীস্টবাদ প্রচার করে।"

এছাড়াও তখন মানুষের আর একটি বিশ্বাস ছিল যে, কাজের (আমলের) কোন গুরুত্ব নেই। বরং নিজেদের ধর্মে থাকাটাই এমন একটি বড় কাজ যা স্থায়ী মুক্তির জন্য যথেষ্ট। কুরআন কাজের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছে। কুরআনে 'আ-মানু' (যারা ঈমান এনেছে)-এর সাথে 'ও আমিলুস সোয়ালিহাত' (এবং যারা আমল করেছে)-এর যেরূপ পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে সেরূপ পুনরাবৃত্তি অন্য কিছুরই বেলায় করা হয়নি। আর বংশগত ও জন্মগত ধর্ম সম্পর্কে অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে বলা হয়েছে যে, যখন মানুষ আল্লাহর কাছে হাযির হবে তখন 'তাদের পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তা বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরের খোঁজ-খবর নেবে না।' বরং প্রতিটি লোকই নিজ নিজ কাজের জন্য দায়ী হবে। এমন হবে না যে, অন্য কেউ ফাঁসিমঞ্চে ঝুলে—চাই সে 'খোদার পুত্র'ই হোক—আমাদের পাপের যাবতীয় দায়দায়িত্ব নিজ ঘাড়ে তুলে নেবে এবং আমরা সারা জীবন হেলায় খেলায় কাটিয়ে এমনি এমনি পরিত্রাণ পেয়ে যাব।

অন্য ধর্মের সত্যতার সাক্ষ্য
রসূলুল্লাহ (সা) কখনো বলেন নি যে, দুনিয়ার অন্যান্য সব ধর্ম মিথ্যা এবং সেগুলোর অনুসারীরা জাহান্নামী বরং তিনি বলেছেন, দুনিয়ার প্রতিটি ধর্মই সত্য, তবে এই শর্তে যে, সে ধর্মের মৌল শিক্ষায় পরিবর্তন পরিবর্ধনের মাধ্যমে কোন অনাচার যেন ঢুকে না পড়ে। তিনি আরো বলেছেন, দুনিয়ায় এমন কোন দেশ বা জাতি নেই যেখানে আল্লাহর রসূল আসেন নি এবং সত্য ধর্ম প্রচার করেন নি। কুরআনে বলা হয়েছে, "আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রসূল প্রেরণ করেছিলাম। তাদের কারো কারো কথা তোমার কাছে বিবৃত করেছি এবং কারো কারো কথা তোমার কাছে বিবৃত করি নাই।" আরো বলা হয়েছে, "এমন কোন জাতি নেই যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ভয় প্রদর্শনকারী আসে নি।"

সপ্তম হিজরীতে অর্থাৎ তাঁর ওফাতের মাত্র তিন বছর পূর্বে রসূলুল্লাহ (সা) কন্সটান্টিনোপল, মিসর এবং হাবশের খ্রীস্টান শাসকদের নামে যে সমস্ত প্রচারমূলক পত্র লিখেছিলেন, তাতে বিশেষভাবে নিম্নের আয়াতটি অন্তর্ভুক্ত ছিল: তুমি বলো, 'হে কিতাবিগণ, আসো সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কারো ইবাদত করি না, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক করি না এবং আমরা আল্লাহ্ ছাড়া কাউকেই প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করি না।' যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে বলো, 'আমরা আত্মসমর্পণকারী, তোমরা সাক্ষী থাক'। তাছাড়া কুরআনে অন্যত্র ঘোষণা করা হয়েছেঃ "যারা বিশ্বাস করে (মুমিন), যারা য়াহূদী হয়েছে এবং খ্রীস্টান ও সাবেয়ীন, যারাই আল্লাহ্ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।" রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাবি ছিল যে, ইসলাম একটি মৌলিক ধর্ম। হযরত আদম থেকে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত সকল নবীই ইসলাম প্রচারের জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। ইসলাম চিরাচরিত মৌল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সমস্ত সত্যকে একজন বিবেক সম্পন্ন মানুষ না মেনে পারে না। আর মৌলিক ওয়াজিবাত (অবশ্য কর্তব্য) কার্যাদি ছাড়া অন্যান্য কার্য মুবাহ অর্থাৎ একজন মানুষ সেগুলো ইচ্ছা হলে করতে পারে, ইচ্ছা না হলে নাও করতে পারে। ধর্মের মৌলিক ভিত্তিসমূহ এবং এ সমস্ত কার্য, যা মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেগুলো বর্ণনা করার পর ইসলাম ধর্ম তথা জীবন ব্যবস্থাকে সর্বসাধারণের জন্য অতি সহজ এবং বোধগম্য করে পেশ করেছে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যে এক মধুর সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছে।

অন্য কথায় বলতে গেলে, সকল ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পরস্পর সম্মান ও ভক্তি শ্রদ্ধার ভাব গড়ে তোলা এবং শাখা-প্রশাখা ছেড়ে যুক্তিসম্মত মৌল ভিত্তির উপর সকলকে সমবেত হওয়ার দিকেই ইসলাম দাওয়াত দিয়েছে। একমাত্র এই মৌলিক ধর্মের মাধ্যমেই দ্বীন ও দুনিয়ার প্রকৃত মঙ্গল ও শান্তি লাভ সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম মানুষকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের এবং শয়তান ও ফেরেশতা থেকে পৃথক বরং এ উভয় থেকে শ্রেষ্ঠ আল্লাহর সৃষ্টির একটি পরিপূর্ণ নমুনা হওয়ার পথ বাতিলে দিয়েছে। উপরিউক্ত বিধান মেনে চললে ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে মুক্তিলাভ করা যেতে পারে। সর্বোপরি কুরআনের 'লা ইকরাহা ফিদ্দীন' (ধর্মে কোন জোর জবরদস্তি নেই) এমন একটি অমূল্য বাণী, যা এর পূর্বে কখনো শোনা যায় নি।

প্রাচুর্য ও নিঃস্বতা
ইসলাম-পূর্ববর্তী ধর্মসমূহ দান-দক্ষিণার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে সত্যি, তবে এর উপর কোন বাধ্যবাকতা আরোপ করে নি। ফলে ধনীদের মধ্যে সাধারণভাবে যে কৃপণতা ও নির্দয়তা থাকে, তা দূর করার কোন উপায়ই বাকি থাকে নি। ব্যক্তিস্বাধীনতার কারণে সাধারণত সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকে না। তাই সম্পদশালী আরো সম্পদশালী হতে থাকে এবং নিঃস্ব আরো নিঃস্ব। ইসলাম-পূর্ব যুগে সম্ভবত একবারই 'মাযদাক' এই পদ্ধতির বিরোধিতা করেন এবং মানুষকে সমাজতন্ত্রের শিক্ষা দেন। কিন্তু তার ঐ শিক্ষা বাস্তবভিত্তিক ছিল না, বরং ছিল ঘৃণা ও হিংসা-বিদ্বেষ পূর্ণ। তাছাড়া ঐ পদ্ধতিতে মানুষের চরিত্র কাঠামোকে ভেংগে খান খান করে দেওয়া হয়। কেননা তার মতে স্ত্রীলোকেরাও সম্পত্তি বিশেষ। অতএব বিবাহ শাদীর মাধ্যমে তাদেরকেও ব্যক্তি বিশেষের ভোগ-সামগ্রীতে পরিণত না করে ইজমালী সম্পত্তি হিসাবেই রাখা উচিত। বাহ্যতই বোঝা যাচ্ছে যে, এ ধরনের মতাদর্শ বেশি দিন চলতে পারে না। বাস্তবেও হয়েছিল তাই। যদি সমাজতন্ত্রের অর্থ এই হয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা কম বেশি যা কিছু আমাদের দিয়েছেন তার মধ্যে আমরা আমাদের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ভাইদেরকেও শরীক রাখবো— তাহলে প্রত্যেকটি মুসলমান যে এক নম্বরের সমাজতন্ত্রী তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আর যদি সমাজতন্ত্রের অর্থ এই হয় যে, আমরা আমাদের চাইতে অপেক্ষাকৃত সম্পদশালী লোকদের সম্পত্তির দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকাব এবং নিজে অলস, নিষ্কর্মা ও দায়িত্বহীন হওয়া সত্ত্বেও অন্যের 'মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জন করা' অর্থ ছিনিয়ে আনব তাহলে এটা একটা জঘন্যতম হীনতা ছাড়া কিছু নয়। আর একজন মুসলমান কিয়ামত পর্যন্ত এ ধরনের হীনতার শিকারে পরিণত হতে পারে না। দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং সাথে সাথে ভিক্ষাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ করার আইন যতক্ষণ পর্যন্ত চালু না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সম্পদের ক্ষেত্রে বিবর্তন ও বন্টনের কোন্ নীতি গ্রহণ করলে জনসাধারণ সামগ্রিকভাবে সুখে শান্তিতে বাস করতে পারে ইসলাম তা ভালভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল। আর পেরেছিল বলেই সে সম্পদ একীভূতকরণের শিকড়টি কেটে দিয়েছে। সর্বপ্রকার সুদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অসিয়ত (উইল) করার উপরও প্রয়োজনীয় বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কোন ব্যক্তি তার সমুদয় সম্পত্তি এক ব্যক্তিকে দান করে যেতে পারে না, বরং বেশি থেকে বেশি এক-তৃতীয়াংশ মাত্র দান করতে পারে। অতঃপর উত্তরাধিকারীত্বের মধ্যে পুরুষ স্ত্রীলোক-উভয়কেই অংশীদার করা হয়েছে, যাতে একাধিক পরিবারের মধ্যে সম্পদ বন্টিত হয়। এমন দশ বারো জন নিকটাত্মীয়ের উল্লেখ করা হয়েছে যারা অবশ্য অবশ্যই মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিছু না কিছু অংশ পায়। সুদ নিষিদ্ধ করার সাথে সাথে গরীব নিঃস্বদের ঋণ প্রাপ্তির পথটি যাতে বন্ধ হয়ে না যায় সে জন্য সুদবিহীন কর্জদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর অর্পণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সম্পদের উপর যাকাত নামে একটি বাধ্যতামূলক মাশুল ধার্য করা হয়েছে, যার হার শতকরা বার্ষিক আড়াই টাকা। কিন্তু আমাদের ফকীহ্রা মন্তব্য করেছেন যে, এটা হচ্ছে সর্বনিম্ন হার। অন্যথায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব হলে রাষ্ট্র সম্পদশালী ব্যক্তিকে তার জীবিকা নির্বাহের পরিমাণ সম্পদ দিয়ে বাকী সবটুকু সম্পদই দেশের নিরাপত্তা রক্ষা এবং জনসাধারণের কল্যাণার্থে বাজেয়াপ্ত করে নিতে পারে। মোটকথা, রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে, প্রতিটি নাগরিকের খাওয়া-পরার সংস্থান করা। স্বাভাবিক হারে কর আদায় করে যদি তা সম্ভব হয় তো ভাল কথা, অন্যথায় প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্র সে হার বাড়িয়ে দিতে পারে। যাকাত আদায় এবং তা যথাযথভাবে খরচ করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

সুদের নিষিদ্ধতা এবং প্রতিটি নাগরিকের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ এমন একটি আদর্শ যা সমাজতন্ত্রীরা ইসলাম থেকেই ধার করেছে। কিন্তু সুদের নিষিদ্ধতাকে তারা সামাল দিতে পারেনি। ফলে তা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে 'সম্পদের সাম্য' কোন জরুরী বিষয় নয়। তবে সম্পদশালীদের উপর অবশ্য অবশ্যই সম্পত্তির মাশুল ধার্য করা হবে। সমাজতন্ত্রীরা প্রথম প্রথম 'সম্পদের সাম্য'-এর উপর খুব জোর দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর করতে না পেরে তারা পিছনের দরজা দিয়ে সটকে পড়েছে। আজ রাশিয়ার বিভিন্ন স্তরের বেতন ভাণ্ডারের মধ্যে সেই পরিমাণ বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়, যে পরিমাণ বৈষম্য অসমাজতন্ত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রী ও চাপরাশির বেতন হারের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয় না। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন এমনি যথাযথ ও সর্বাঙ্গ সুন্দর যে মিসর ও সিরিয়ার খ্রীস্টানরা মুসলমানদের সাথে সাংঘাতিক ধর্মীয় বিদ্বেষ পোষণ করা সত্ত্বেও ইসলামী উত্তরাধিকার আইনকে পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করে চলেছে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে সমবায়ভিত্তিক বীমা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তখন সম্পদশালীদের মুনাফাভিত্তিক বীমা ব্যবস্থা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। চৌদ্দ শ' বছর অতিবাহিত হওয়ার পর অধুনাকালে বৃটেন যেন চৈতন্য ফিরে পেয়েছে। কেননা শ্রমিকদলের ১৯৫০ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দেখা যায় যে, তারা ব্যবসাভিত্তিক বীমা ব্যবস্থাকে সমবায়ভিত্তিক (Mutualize) বীমা ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মুসলমানরা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ততদিন চালু রেখেছিল ততদিন না তারা নিঃস্বতায় ভুগেছে আর না তাদের মধ্যে সুদখোরীর অশুভ প্রতিক্রিয়া তথা ধনী-দরিদ্রের সংঘর্ষ দেখা দিয়েছে।

বিবিধ
ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ইসলাম ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য মেনে নিয়েই সামাজিক সাম্যের পথে পা বাড়িয়েছে। সর্বোচ্চ ব্যক্তি-দায়িত্ব অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার ইবাদতের জন্য ইসলামের নির্দেশ হলো- প্রতিদিন পাঁচবার সালাত আদায় কর, প্রতি সপ্তাহে শহর ও তার আশেপাশের লোক এবং প্রতি বছর দু'বার দূর-দূরান্তের লোক একত্রিত হও। আর সারা জীবনে অন্ততঃ একবার হজ্বের বাৎসরিক জমায়েতে অংশগ্রহণ কর। দৈহিক ইবাদতের মত আর্থিক ইবাদত তথা সাদকা ও যাকাতের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি অতীব জরুরী ঘোষণা করা হয়েছে। আর এই সমস্ত আইনের চোখে সকলেই সমান। এতে বর্ণ, ভাষা, বংশ দেশভিত্তিক কোন ভেদাভেদ নাই। সমগ্র আদমসন্তানকে একীভূত করার ব্যাপারে ইসলামের উপরিউক্ত নীতির একটি সুফল এই দেখা যাচ্ছে যে, অসংখ্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সমস্যা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে আজও যে পরস্পর সহৃদয়তা ও ভ্রাতৃত্ব পরিলক্ষিত হয় তার একটি সামান্য পরিমাণ অন্য কোন জাতি বা ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না।

ইসলাম মানুষের স্বভাব পরিবর্তনের চাইতে স্বভাবকে সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালনার উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। এক বিবাহ আদর্শগতভাবে একটি ভাল ব্যাপার। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যান্য কারণে স্ত্রীন্টন করে নেওয়া যেতে পারে।

শেষ কথা এই যে, একই রাষ্ট্রের জন্য দু'জন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের ব্যাপারটি ইসলামের দৃষ্টিতে জরুরীও নয় এবং সাধারণভাবে এর প্রচলন ছিল না। তবে ইসলাম যে এর অনুমতি দিয়েছে তা কুরআন, হাদীস ও রসূল-জীবনের ঘটনাবলী থেকে প্রমাণিত হয়। আখিরাতের ব্যাপার হলোঃ "আজ কর্তৃত্ব কার? এক পরাক্রমশালী আল্লাহরই।" আল্লাহ্ হিসাব গ্রহণে তৎপর।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 মানবতার মুক্তিসনদ বিদায় হজ্জের ভাষণ

📄 মানবতার মুক্তিসনদ বিদায় হজ্জের ভাষণ


দশম হিজরীর ৯ই যিল হাজ্জাহ জুম'আর দিন আরাফা প্রান্তরের জাবালুর রাহমাত থেকে প্রায় দেড় লক্ষ লোককে সম্বোধন করে রসূলুল্লাহ (সা) বিদায় হজ্বের যে ভাষণ দিয়েছিলেন সৌভাগ্যক্রমে ইতিহাস তা সংরক্ষণ করেছে। ভাষণটি হচ্ছে:

১. সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই সাহায্য চাই, তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁরই কাছে তওবা করি। আল্লাহ যাকে পথ দেখান তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রসূল।

২. হে লোক সকল, আল্লাহকে ভয় করার জন্য আমি তোমাদিগকে তাকিদ দিচ্ছি এবং তাঁর অনুগত হওয়ার জন্য অত্যন্ত জোরের সাথে তোমাদেরকে বলছি।

৩. হে লোক সকল, আমার কথা শোন। আমি জানি না, হয়ত এ বছরের পর এই জায়গায় আমি আর তোমাদের সাথে মিলিত হতে পারব কি না।

৪. হে লোক সকল, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত হারাম, যেমন হারাম এবং সম্মানিত তোমাদের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর। হে আল্লাহ্ তুমি এর সাক্ষী থাক।

৫. যার কাছে কোন আমানত আছে, সে যেন তা ঐ ব্যক্তির কাছে পৌছিয়ে দেয়, যে তা গচ্ছিত রেখেছে।

৬. সাবধান! জাহিলিয়া যুগের সুদ বাতিল করে দেওয়া গেল। অবশ্য মূল পুঁজির উপর তোমাদের অধিকার থাকবে। না তোমরা কারো উপর অত্যাচার করবে, আর না কেউ তোমাদের উপর অত্যাচার করবে।

৭. সাবধান! জাহিলিয়া যুগের খুনের প্রতিশোধ গ্রহণ বাতিল করা গেল।

৮. সাবধান! জাহিলিয়া যুগের নিদর্শনাদি এবং পদাধিকারসমূহ বাতিল করা গেল - শুধুমাত্র কা'বা শরীফের রক্ষণাবেক্ষণ এবং হাজীদের পানি পান করানো ছাড়া।

৯. ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি কিসাস। এ ধরনের হত্যার রক্তমূল্য হচ্ছে একশ' উট। যে এর মধ্যে বাড়াবাড়ি করতে চায় সে জাহিলিয়ার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। হে আল্লাহ্, তুমি সাক্ষী থাক।

১০. পর সমাচার এই যে, হে লোক সকল, শয়তান এ ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে যে, এখন এই ভূমিতে তার আর উপাসনা হবে না। কিন্তু সে চায় যে, ঐ সমস্ত কথার আনুগত্য করা হোক, যাকে তোমরা খুব সামান্য ব্যাপার বলে মনে কর।

১১. হে লোকসকল, বছরের মধ্যে কাবীসাগিরি করা কুফরীকে বাড়িয়ে তোলারই নামান্তর। কালচক্র আবর্তিত হয়ে পুনরায় সেই অবস্থায় ফিরে এসেছে, যেরূপ তা আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন ছিল। আল্লাহর গণনায় মাস বারোটি। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।

১২. হে লোক সকল! তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের একটি অধিকার আছে এবং তাদেরও তোমাদের উপর অধিকার আছে। স্ত্রীদের সাথে ভাল ব্যবহার করার জন্য তোমাদেরকে তাকিদ দিচ্ছি। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছ। অতএব স্ত্রীদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর।

১৩. তোমাদের দাসদাসীদের প্রতি খেয়াল রেখো। তোমরা যা খাও তাদেরও তা খাওয়াও, তোমরা যা পর তাদেরও তা পরাও। তাদের কোন অপরাধ ক্ষমা করতে না পারলে তাদের বিক্রি করে দাও, কিন্তু আল্লাহর বান্দাদের উপর তোমরা অত্যাচার করো না।

১৪. অতএব আমার পরে তোমরা কাফির হয়ে যেয়ো না এমতাবস্থায় যে, তোমরা একে অন্যকে হত্যা করতে থাক। আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব ও রসূলুল্লাহর সুন্নাত রেখে গেলাম; এ দু'টি আঁকড়ে ধরলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। হে আল্লাহ্ তুমি সাক্ষী থাক।

১৫. লোকসকল, তোমাদের প্রভু এক, তোমাদের পিতাও এক। তোমরা সবাই আদম থেকে সৃষ্ট এবং আদম মাটি থেকে সৃষ্ট। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। আরবের কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই অনারবের উপর (তাকওয়া ছাড়া)। হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থাক।

টিকাঃ
১. এই ভাষণের বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন আল-বয়ানী ওয়াত্তাবয়ীন, জাহিম, ২য় খণ্ড; ইবনে হিশাম; তারীখে তাবারী।
২. সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৯৬৮; তারিখে তাবারী, পৃষ্ঠা ১৭৫৪; সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. ইমাম তাবারীর বর্ণনানুযায়ী এর অনুলিপি খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশে লিপিবদ্ধ করে হযরত আবূ শাহকে দেওয়া হয়েছিল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px