📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 আরবের সাধারণ গোত্রসমূহের সাথে সম্পর্ক

📄 আরবের সাধারণ গোত্রসমূহের সাথে সম্পর্ক


হাদীসের মধ্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সমাজ-দর্শন বর্ণনা করা হয়েছে । যেমন “যখন আল্লাহ্ তা’আলা কোন জাতির মঙ্গল সাধনের ইচ্ছা করেন তখন সৎলোকদের মধ্য থেকে তাদের শাসক নিযুক্ত করেন । এবং যখন কোন জাতির অমঙ্গল ঘটাতে চান তখন তাদের শাসকের আসনে অসৎ লোককে সমাসীন করেন ।” কোন কোন সময়- জনসাধারণের তাদের শাসকেরই ধর্ম (চরিত্র) অনুসরণ করে প্রবাদ বাক্যটি এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় । الناس على دين ملوكهم

মোটকথা, বিভিন্ন কারণে এবং পূর্ববর্তী নবীদের সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা এবং প্রচার কার্যের ফলশ্রুতির আলোকে রসূলুল্লাহ্ (সা) দীন ও দুনিয়া, ইবাদত-বন্দেগী ও রাজনীতি এবং ইহজীবন ও পরজীবনের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক সৃষ্টির প্রয়াস পান । অন্য কথায় বলতে গেলে, তিনি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই মানসিক ও সামাজিক আন্দোলন পরিচালনার কর্মসূচী গ্রহণ করেন যাতে শীঘ্র শীঘ্র সে আন্দোলন ফলপ্রসূ হয় এবং রাষ্ট্রের আসল লক্ষ্যও অর্জিত হয় । তাই দেখা যায়, মদীনায় হিজরত করার পূর্বেও তিনি ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে প্রায়ই বলতেন, ‘আমার সাহায্য কর তাহলে আল্লাহর সাহায্যে কায়সার ও কিসরার রাজমুকুট তোমাদের পদতলে লুটিয়ে পড়বে ।’ মিনা, মাজনা, মূল মাজায এবং উকাযের মেলাসমূহেও তিনি এই কথা বলতেন । ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে যখন তায়েফ যান তখন সেখানকার সরদারদের কাছেও তিনি এই কথা বলেন ।

আউস এবং খাযরাজ সম্প্রদায়ের কিছু লোক সর্বপ্রথম যখন তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয় তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরী করে দেন । হিজরতের দু'বছর পূর্বে দ্বিতীয় বায়'আতে আকাবায় তিনি প্রত্যেকটি লোকের কাছ থেকে অন্যান্য স্বীকারোক্তির সাথে সাথে "শ্রবণ করা এবং মান্য করাই হবে আমাদের আচরণ চাই আপনার হুকুম আমাদের পছন্দ হোক অথবা না হোক । আমাদের যাকে যে পদেই আপনি নিয়োগ করুন না কেন, আমরা তাতে দ্বিমত পোষণ করবো না । আমরা যেখানেই থাকি না কেন, সত্য প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করবো, আল্লাহর হুকুমের সামনে আমরা কারো তিরস্কার বা ভীতি প্রদর্শনকে থোড়াই কেয়ার করবো এবং সব ব্যাপারে আপনার অনুগত থাকবো ।"-এই স্বীকারোক্তিও গ্রহণ করেন । এর এক বছর পর তৃতীয় বায়'আতে আকাবা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে তিনি পরিষ্কার ভাষায় স্বীকারোক্তি নেন, "যদি আপনি এবং আপনার মক্কাবাসী অনুসারীরা দেশ ত্যাগ করে মদীনায় চলে আসেন, তাহলে আমরা আপনাদের সবাইকে ঠিক সেরূপ সাহায্য-সহায়তা করবো যেরূপ আমাদের স্ত্রী, সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনের বেলায় করে থাকি—এতে যদি সারা বিশ্ববাসীর সাথে লড়তে হয়, তাতেও আমরা রাযী ।" এই সময় মদীনার যে বারোটি গোত্র তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাদের ইসলাম গ্রহণের খবর দিয়েছিল, তিনি তাদের মতানুযায়ী প্রত্যেক গোত্রের জন্য এক এক জন প্রতিনিধিত্বকারী [ যে খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতিনিধিত্ব করবে ] মনোনীত করেন । ইতিহাসে এরাই 'আনসার' নামে খ্যাত ।

উপরিউক্ত চুক্তিটি ছিল জীবন ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন একটি ঘটনা যা তে কিছু লোক সানন্দ চিত্তে এক ব্যক্তিকে তাদের নেতা ও শাসনকর্তা নিয়োগ করেছিল । যদিও আনসারদের ক্ষেত্রে এর পরেও এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যেগুলোর বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে (যেমন মদীনায় হিজরত করে আসার পর কয়েক ডজন মক্কী পরিবারকে তাদেরই সমপর্যায়ের মাদানী পরিবারের সাথে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধকরণ, মদীনাকে একটি নগর রাষ্ট্র ঘোষণা করে তার সীমানা চিহ্নিতকরণ, ঐ রাষ্ট্রের জন্য একটি সংবিধান রচনা ও তার বাস্তবায়ন, ঐ রাষ্ট্রের উদারনীতি ভিত্তিক আদর্শের ভিত্তিতে আশেপাশে য়াহূদী বসতিসমূহকেও তাতে অংশগ্রহণের সুযোগ দান প্রভৃতি) , কিন্তু সেগুলো মূলত রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না বরং ছিল আভ্যন্তরীণ প্রশাসন সম্পর্কিত ।

উপরিউক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি বাস্তবায়নে অবশ্যই কয়েক সপ্তাহ লেগে থাকবে । অতঃপর ছিল রাষ্ট্রীয় সীমানা রক্ষা সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের পালা । কুরায়শদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল । তারা তাদের পার্থিব প্রভাব খাটিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সঙ্গীদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য মদীনাবাসীদের অনবরত শাসিয়ে যাচ্ছিলো । এমতাবস্থায় মদীনার আমদানী-রফতানী ব্যবসার উপর কুরায়শী বাণিজ্য কাফেলার প্রভাব না পড়ে পারে কি?

জুহায়না এবং যুমরার গোত্রসমূহ
অনুমিত হয় যে, মদীনার আনসার গোত্রসমূহ তাদের পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের সাথে জাহিলিয়া যুগেও মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ ছিল—যেমন ছিল পার্শ্ববর্তী য়াহূদী গোত্রসমূহের সাথে । আর য়াহূদী গোত্রসমূহ মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ ছিল গাতফান প্রভৃতি উত্তর আরবীয় গোত্রসমূহের সাথে । সত্যি যদি তাই হয় তাহলে আনসারদের পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহ উত্তরাধিকারসূত্রেই ইসলামী রাষ্ট্রের মিত্রে পরিণত হয়েছিল । হিজরতের ছয় মাস পরই যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) কুরায়শদের সম্পর্কে এই মর্মে তাঁর নীতি নির্ধারণ করেন যে, তাদের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হবে (এবং মক্কায় মুহাজিরদের যে ধন-সম্পদ জবরদস্তিমূলকভাবে আটকিয়ে রাখা হয়েছে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে) এবং সে উদ্দেশ্যে তিনি যখন জুহায়না গোত্রের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ‘আয়েস’ নামক স্থানে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন তখন সেখানকার সরদার ছিলেন মুসলমানদেরই মিত্র । ঐ বাহিনীতে কোন আনসার ছিলেন না বরং সবাই ছিলেন মুহাজির । এমতাবস্থায় মনে করা হয় যে, মাজদী বিন আমর আল জুহনীর সাথে হিজরতের পর হয় খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা) কোন মৈত্রী চুক্তি করেছিলেন, না হয় আনসারদের পুরাতন মৈত্রীচুক্তিকে নবায়িত করে তা মদীনার সকল মুসলমানদের জন্য (ইতিমধ্যে যাদের নেতৃত্বের আসনে খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা) অধিষ্ঠিত হয়েছেন) একটি সাধারণ চুক্তিতে পরিণত করেছিলেন । ইবনে সা‘দ, ইবনে হিশাম প্রমুখ মৈত্রীর উল্লেখ করেছেন, কিন্তু মৈত্রীচুক্তি এবং এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়ের (যেমন তা কখন এবং কোথায় সম্পাদিত হয়েছিল) কোন উল্লেখ করেন নি । তবে তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশন করেছেন । আর তা হলো, মাজদী বিন আম‘র মুসলমান এবং কুরায়শ উভয়েরই মিত্র ছিলেন । এ কারণে তিনি কুরায়শের বাণিজ্য-কাফেলা (তিনশ’ উট সম্বলিত এই কাফেলা আবূ জেহেলের নেতৃত্বে ঐ এলাকা অতিক্রম করছিলো) এবং মুসলমান বাহিনীর (হযরত হামযার নেতৃত্বে যে বাহিনী প্রেরিত হয়েছিলো) মধ্যে সংঘর্ষ হতে দেননি, বরং কৌশলের সাথে কুরায়শী কাফেলাকে নিরাপদে মক্কার দিকে চলে যাবার সুযোগ করে দেন । ফলে ইসলামী বাহিনী মদীনায় ফিরে আসে । এর একমাস পর (শাওয়াল মাসে) আবূ সুফিয়ানের একটি কাফেলাকে বাধাদানের উদ্দেশ্যে 'রাবিগ'-এর দিকে একটি মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করা হয় এবং যীকা'দা মাসে ঐ একই উদ্দেশ্যে আর একটি বাহিনী প্রেরণ করা হয় ।

আয়েস, রাবিগ এবং খায়বর মদীনার পশ্চিম-দক্ষিণে সমুদ্র উপকূলের নিকটে পাশাপাশি অবস্থিত । সিরিয়া, মিসর, প্রভৃতি দেশে যাওয়ার সময় কুরায়শী বাণিজ্য-কাফেলাকে এই অঞ্চলটি অতিক্রম করতে হত । কুরায়শী কাফেলাকে বাধা দান করতে হলে এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সাথে মৈত্রী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা ছিল অত্যন্ত জরুরী । অন্যথায় কুরায়শী কাফেলার খবর যেমন সময়মত পাওয়া যাবে না, তেমনি এ আশংকাও থেকে যাবে যে, এই অঞ্চলের অধিবাসীরা ইসলামী বাহিনীকে সাহায্য দানের পরিবর্তে তাদের বিপক্ষে এবং কুরায়শী কাফেলার অনুকূলে অস্ত্রধারণ করবে ।

সম্ভবত উপরিউক্ত তিনটি অভিযান বিফল হওয়ার কারণে মিত্রদের সংখ্যাবৃদ্ধির ব্যাপারটি তলিয়ে দেখার প্রয়োজন অনুভূত হয় এবং চতুর্থ হিজরীর প্রারম্ভে সফর মাসে খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা) একটি বাহিনী সংগে নিয়ে মদীনার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত 'আবওয়া' বাণিজ্য কেন্দ্রে গমন করেন । মুসলমানদের পৌঁছতে একটু দেরি হওয়ায় এ যাত্রাও কুরায়শী কাফেলা সে স্থান অতিক্রম করে চলে যায় । এবার রসূলুল্লাহ্ (সা) শূনয় হাতে ফিরে আসার পরিবর্তে আশেপাশের অধিবাসীদের সাথে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা চালান এবং বনী যুমরা সম্প্রদায়ের জনৈক সরদার মুহসানা বিন আ'মরের সাথে একটি স্থায়ী মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হন । বাহ্যত এই সমস্ত লোক তখন পর্যন্ত মুসলমান হয়নি । কেননা পরিষ্কার ভাষায় ধর্মযুদ্ধ থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল । সম্ভবত সর্বপ্রথমে সম্পাদিত এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি ছিল নিম্নরূপ :

১. করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে ।
২. এটা আল্লাহর রসূল (মুহাম্মদ)-এর পক্ষ থেকে বনী যুমরার জন্য লিখিত ।
৩. (এই মর্মে যে) এদের মাল সম্পদ এবং প্রাণের নিরাপত্তা থাকবে ।
৪. যে কেউ অত্যাচারমূলকভাবে এদের উপর আকস্মিক হামলা চালাবে, অবশ্যই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে এদের সাহায্য করা হবে ।
৫. আর ততক্ষণ পর্যন্ত নবীকে সাহায্য করা এদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হবে যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্র ঝিনুকের খোসাকে সিক্ত রাখবে । হ্যাঁ, যদি মুসলমানরা আল্লাহর দীনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ করে তখন নবীকে সাহায্য করা এদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হবে না (বরং তখন তারা নিরপেক্ষ থাকবে) । অথবা এর অর্থ এই যে, এরা রসূলুল্লাহর সাহায্য পাবে । তবে যখন আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তখন কোন সাহায্য পাবে না, বরং (তখন) এই চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে ।
৬. এই চুক্তির ভিত্তিতে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল এদের দায়িত্ব নিলেন ।
৭. আর এদেরকে এই শর্তে সাহায্য দেওয়া হবে যে, তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলবে এবং অসৎ কাজ (প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ প্রভৃতি) থেকে নিজেদের দূরে রাখবে (ইবনে সা'দ ২৭২) ।

জুহায়না গোত্রের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক দিনের পর দিন উন্নত হতে থাকে । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর 'মূল মারওয়ার' অধিবাসী আ'ওসাজা বিন হারমালা আল-জুহনীকে একটি বিরাট জায়গীর দান করেন (ইবনে সা'দ, প্রভৃতি) । এই স্থানটি (মূল মারওয়া) সমুদ্র উপকূলের নিকটে অবস্থিত । কুরায়শী কাফেলা এই দিক দিয়েই যাতায়াত করত । সম্ভবত জায়গাটি ছিল পার্বত্য-বন্ধুর এবং একটি শ্রেষ্ঠ ঘাঁটি । হুদায়বিয়া চুক্তির শর্তানুযায়ী যখন মক্কার মুসলমানরা ধর্মীয় নির্যাতন সত্ত্বেও মদীনায় আশ্রয় নিতে পারত না তখন ওদেরই কিছুসংখ্যক ব্যক্তি আবু বসীরের নেতৃত্বে মূল মারওয়ায় একত্রিত হয় এবং কুরায়শী কাফেলাকে এদিক দিয়ে আসা যাওয়ার সময় হয়রানী করতে থাকে (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৭৫২) । নিশ্চয়ই আওসাজা বিন হারমালা (জায়গীরদার) ওদেরকে এই সুযোগ দিয়েছিলেন । অনুরূপভাবে বনী শামাখ (বা বনী শানাখ)-কে-যারা জুহায়নারই একটি শাখা-গোত্র ছিল বেশ বড় একটি অঞ্চলের জায়গীর প্রদান করা হয় (ইবনে সা'দ প্রভৃতি) । সম্ভবত এভাবেই কুরায়শের বাণিজ্য-পথ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল ।

এগুলো হলো প্রাথমিক যুগের ঘটনা । জুহায়নার শাখা গোত্র বনী জুরমযকেও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ (সা) একটি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে (ইবনে সা'দ) এই বলে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে, ইসলাম গ্রহণের সময় তাদের অধিকারে যে এলাকা ছিল তা তাদেরই থাকবে । খুব সম্ভব এটি ছিল একটি বিতর্কিত এলাকা এবং গৃহযুদ্ধের কারণে এই এলাকাটি তাদের দখল থেকে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল । উপরিউক্ত চুক্তিটি বনী জুরমুযের লোকদেরকে ইসলাম গ্রহণের প্রতি অনুপ্রাণিত করে থাকবে । সম্ভবত এই ঘটনা বদর-উত্তর কালে ঘটেছিল ।

রসূল যুগের শেষভাগে আমর বিন মুয়ীদ আল-জুহনী এবং বনী হারকা'হ ও বনী জুরমুযকে একটি বিশেষ চুক্তিপত্রের মাধ্যমে এই শর্তে নিরাপত্তা প্রদান করা হয় যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করবে, নামায পড়বে, যাকাত ও কর দেবে, যুদ্ধে প্রাপ্ত মালে গনীমতের খুমুস (১/৫ অংশ) কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেবে, তাদের অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবে এবং সুদ ছাড়া তাঁদের যাবতীয় ঋণের শুধুমাত্র মূলধন আদায় করবে । ঐ চুক্তিতে পরিষ্কার ভাষায় এও বলা হয়েছিল যে, কোন অপরিচিত ব্যক্তি ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এই গোত্রের সাথে মিশে গেলে সেও এই অধিকার (অর্থাৎ নিরাপত্তা) ভোগ করবে । (এই শেষ শর্তের মাধ্যমে সম্ভবত উপরিউক্ত গোত্রের অমুসলিম শাখা গোত্রসমূহের গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে নিরাপত্তা গ্রহণের একটি সুন্দর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ।)

রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওফাতের এক কিংবা দু'মাস পূর্বে উপরিউক্ত গোত্রের কাছে একটি নির্দেশনামা এই মর্মে পাঠানো হয়েছিল যে, স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণকারী কোন পশুর লাশ থেকে তারা যেন কোনভাবে উপকৃত না হয় । কেননা এগুলো মৃত এবং অপবিত্র (ইবনে তোলোন, তিরমিযী, তায়ালিসী প্রভৃতি) ।

বনূ যুমরার সাথে মিত্রতা বন্ধনের কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে । বনূ যুমরাও ছিল একটি বড় গোত্র । বনী আব্দ বিন আ'দী নামক এই গোত্রেরই একটি শাখা গোত্র মক্কার হরমেরই অধিবাসী হয়ে গিয়েছিল । অতএব কুরায়শের এত নিকট থেকে কুরায়শেরই বিরোধিতা করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল না । এতদসত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজনের ক্রমাগত চাপ সৃষ্টির ফলে তারা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে একটি প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই মনোভাব প্রকাশ করে যে, কুরায়শের সাথে সম্পর্ক রেখেও তারা মুসলমানদের সাথে মিত্রতা বন্ধনে আগ্রহী এবং কুরায়শের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারটি ছাড়া বাকি সব ব্যাপারেই তারা মুসলমানদের মিত্র হতে চায় (ইবনে সা'দ, ৪৮/১) । কুরায়শকে তার মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং মুসলমানদের মিত্র গোত্রসমূহের দ্বারা তাদেরকে ঘিরে ফেলার যে কৌশল রসূলুল্লাহ্ (সা) অবলম্বন করেছিলেন এটাও ছিল তার পক্ষে সহায়ক; তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) বনী আব্দ বিন আ'দী গোত্রকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেন । বনূ গিফার ছিল বনূ যুমরার আর একটি শাখাগোত্র । হযরত আবু যর গিফারী এই গোত্রেরই লোক ছিলেন । এই গোত্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বচন এবং শর্তাদির প্রতি লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, বদর যুদ্ধের সমসাময়িককালে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল । চুক্তিটি ছিল নিম্নরূপ :

১. এই চুক্তি বনূ গিফারের জন্য (সম্পাদিত) ।
২. এরা মুসলমানদেরই একটি দল । এরা সেই সমস্ত অধিকার ভোগ করবে যা মুসলমানরা ভোগ করে থাকে এবং সেই সমস্ত দায়িত্ব পালন করবে যা মুসলমানরা করে থাকে ।
৩. নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ্ (সা) এদের ধনসম্পদ এবং প্রাণের উপর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দায়িত্ব গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ।
৪. এদেরকে ঐ সমস্ত শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করা হবে, যারা তাদের উপর অত্যাচারমূলক আক্রমণ চালাবে ।
৫. আর নবী যখন এদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান জানাবেন তখন তারা সাড়া দেবে এবং নবীকে সাহায্য করা তাদের জন্য হবে ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য) যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্র ঝিনুকের খোসাকে সিক্ত রাখবে । হ্যাঁ, যদি কেউ দীনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ করে তাহলে অন্য কথা ।
৬. এই লেখা (চুক্তি) কোন অপরাধের (পাকড়াও-এর ক্ষেত্রে) প্রতিবন্ধক হবে না (ইবনে সা'দ) ।

বলা হয়ে থাকে যে, হযরত আবূ যর গিফারী প্রথমে খ্রীস্টান ছিলেন অথবা খ্রীস্টধর্ম দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত ছিলেন । তাহলে মুসলমানদের এই চুক্তি কি খ্রীস্টান যিম্মীদের সাথে (যেহেতু বন্ গিফার খ্রীস্টান ছিল) সম্পাদিত হয়েছিল? যদি এই চুক্তির দ্বিতীয় দফার সাথে মদীনার সংবিধানের ২৫তম দফার তুলনা করা হয় (যেখানে আবূ উবায়েদ থেকে বর্ণিত আছে যে, মদীনার য়াহূদীদেরকে 'উম্মাতুম্ মিনাল মুসলিমীন' অর্থাৎ মুসলমানদেরই একটি দল আখ্যা দেওয়া হয়েছিল । আর এই বর্ণনা যদি সঠিক হয়) তাহলে এখানে অসামঞ্জস্যের কিছু থাকে না । অবশ্য এই চুক্তির ৫ম দফা (যেখানে বলা হয়েছে যে, 'যদি কেউ দীনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ করে তাহলে অন্য কথা) বনূ গিফারকে মুসলমান কল্পনা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, তবে মদীনার সংবিধানের ৪৫তম দফার প্রতি লক্ষ্য করলে যেখানে দেখা যায় যে, রসূলুল্লাহ (সা) মদীনার য়াহূদীদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ কথা বলেছিলেন] এই প্রতিবন্ধকতাও আর থাকে না । খুব সম্ভব বনু গিফার গোত্রের কিছু লোক সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল । বাকীরা যদি খ্রীস্টান অথবা পৌত্তলিক অবস্থায় মুসলমানদের সাথে মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাহলে তো বাধার কিছু নেই । অবশ্য পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে এরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল ।

মুযীনা
এই গোত্র মদীনা থেকে বিশ মাইল দূরে বসবাস করত বলে ইবনে সা'দ (৩৮২) উল্লেখ করেছেন; কিন্তু কোন্ দিকে বসবাস করত তা উল্লেখ করেন নি । ধারণা করা হয় যে, এরাও মদীনার পশ্চিম দিকে ইয়ানবো প্রভৃতি উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহের ধারে কাছে বসবাস করত । কেননা এই গোত্রের একজন নেতাকে কাবার্লিয়ার খনিসমূহ জায়গীর স্বরূপ প্রদান করা হয়েছিল । সাম্প্রতিককালে একটি আমেরিকান কোম্পানী কাবীল নামক একটি পরিত্যক্ত প্রাচীন খনি নতুন করে খনন করে তা থেকে দু বছর পর্যন্ত সোনা উত্তোলন করতে থাকে (ঐ কোম্পানীর একজন কর্মকর্তা ১৩৬৫ হিজরীতে মদীনায় এই তথ্য প্রকাশ করেন) । সোনা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় খনিটি পুনরায় পরিত্যক্ত হয়েছে । ঐ খনির নিকটে একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র থেকে উপরিউক্ত কর্মকর্তা একটি লিপিও উদ্ধার করেন যার মধ্যে বিলাল বিন হারিস মুযনীকে খনির জায়গীর প্রদান সম্পর্কিত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রখানি ক্ষোদিত ছিল । কাবার্লিয়া মদীনার উত্তর-পশ্চিমে ফুরুর দিকে বলে আবূ ইউসুফ (র) বর্ণনা করেছেন । যদি বর্তমান কাবীলই প্রাচীন কাবার্লিয়া হয়ে থাকে এবং আবূ ইউসুফ (র)-এর বর্ণনাও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় তাহলে তো দিক এবং স্থান উভয়ই নির্ণীত হয়ে গেল । অতএব বলা যায় যে, কুরায়শের ঠিক বাণিজ্য পথেই ছিল মুযীনা গোত্রের বসতি । অতএব রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ অঞ্চলের একজন সরদারকে একটি মূল্যবান জায়গীর প্রদানের মাধ্যমে কুরায়শের বাণিজ্য কাফেলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে মুসলমানদের সাহায্য করার জন্য তাকে এবং তার গোত্রকে যেন বাধ্য করে নিয়েছিলেন । এই জায়গীরর উল্লেখ করার সাথে সাথে আমাদের গ্রন্থকার এও লিপিবদ্ধ করেছেন যে এই খনি থেকে আজও কোন যাকাত আদায় হয় না । সম্ভবত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যাবতীয় অধিকার সহ ঐ জায়গীরটি প্রদান করা হয়েছিল । বিলাল বিন হারিস নামক ঐ সরদারকে খনির জায়গীর প্রদান করতে গিয়ে পত্রে লেখা হয়েছিল যে, 'রসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে কোন মুসলমানের সম্পত্তি দেন নি ।' অতএব ধরে নেওয়া যায় যে, ঐ সম্পত্তি হয় পতিত এবং লাওয়ারিশ ছিল, নয়ত মুসলমানদের শত্রু মুযীনা গোত্রের অমুসলিম লোকেরা এর মালিক ছিল এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ সম্পত্তি বিলালকে দান করেছিলেন । ইবনে সা'দের মতে, এরা পঞ্চম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাদের কয়েকশ' লোক মদীনায় চলে আসে । কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন যাতে করে কোন অমুসলিম গোত্র ঐ এলাকাটি দখল করে না নেয় । রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ সরদারকে কিছু চাষোপযোগী জমিও জায়গীর স্বরূপ প্রদান করেছিলেন বলে ইবনে সা'দ প্রমুখ উল্লেখ করেছেন । আবূ ইউসুফ (র) প্রমুখের মতে ঐ জমি চাষাবাদ না করে পতিত দেওয়ার কারণে হযরত উমর (রা) এর কিছু অংশ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত করে নতুন বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে বন্টন করে দেন । ঐ পত্রে কাতিব (লেখক)-এর নাম মুআ'ভিয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে । সম্ভবত মক্কা বিজয়ের পর এই দ্বিতীয় দানপত্রটি প্রদান করা হয় ।

আশজা' ও আমীর বিন ইকরামা
আশজা বাহ্যত গিতফান গোত্রেরই একটি শাখা । এরা মদীনার উত্তরে কুরায়শের বাণিজ্যপথে বসবাস করত । দু'তিন বছর অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যখন মুসলমানেরা এই বাণিজ্যপথের উপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় তখন এই পুরা গোত্র-যারা বাণিজ্য কাফেলার জন্য সরাইখানা খুলে নিজেদের জীবিকার সংস্থান করত-সম্পূর্ণরূপে বেকার হয়ে যায় । ইবনে সা'দের বর্ণনানুযায়ী তারা তাদের এই বেকারত্বকে কাটিয়ে উঠার উদ্দেশ্যে মদীনায় একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে এবং রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয় । নায়ীম বিন মাসউদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনেকটা প্রাথমিক যুগের । ঐতিহাসিকদের মতে তারা খন্দক যুদ্ধের (৫ম হিজরী) পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল । সম্পাদিত চুক্তির বচন ছিল নিম্নরূপ :

১. করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে ।
২. নায়ীম বিন মাসউদ বিন রুখায়লা আশজায়ী এই কথার উপর অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন ।
৩. তিনি রসূলুল্লাহর সাথে পরস্পর সাহায্য ও মঙ্গল সাধনের উপর অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ওহুদ পাহাড় আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্র ঝিনুকের খোসাকে সিক্ত রাখবে ।
৪. আর (এই চুক্তি) আলী লিখেছেন (ইবনে সা'দ) ।

আ'মীর বিন ইকরামা গোত্রও আশজায়ীদের আত্মীয় ছিল । রসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে বাণিজ্য কাফেলার জন্য সরাইখানা খোলার অধিকার প্রদান করেন (ইবনে সা'দ ৩২১) এবং তাদের এক সরদারকে একটি জায়গীরও প্রদান করেন (ইবনে সা'দ ২৫) ।

এটা খন্দক যুদ্ধের পূর্বেকার রাজনৈতিক কর্মসূচী-যার মাধ্যমে কুরায়শদের বাণিজ্যপথ রুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল । খন্দক যুদ্ধের পর রসূলুল্লাহ্ (সা) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এখন থেকে কুরায়শদের অগ্রাভিযান বন্ধ থাকবে এবং মুসলমানরাই আগে বেড়ে তাদেরকে উচিত শিক্ষা দেবে । মূলত তখন থেকে ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকাণ্ডের পরিবর্তে গঠনমূলক কার্যকলাপ শুরু হয়ে গিয়েছিল । অতঃপর বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তিসমূহের মধ্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য ছিল যে, তখন থেকে ইসলামের মিত্র গোত্রসমূহের সাহায্যে মক্কার চতুর্দিক ঘিরে ফেলার উদ্যোগ চলছিলো । এক্ষেত্রে কুরায়শ-শত্রুদেরকে মুসলমানদের মিত্র করে নেওয়া খুবই সহজ ছিল । তবে চেষ্টা চলছিলো, যেন কুরায়শ-মিত্রদেরকেও মুসলমানদের মিত্র করে নেওয়া যায় অথবা কমপক্ষে তাদেরকে নিরপেক্ষ করে রাখা যায় ।

খাযাআ'
খাযাআ' মূলত ছিল একটি কাহতানী বা ইয়ামনী গোত্র । তবে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে তারা মক্কার আশেপাশে বসবাস করত । হজ্বের মওসুমে পুরা মীনায় যত লোক অবস্থান করে এই গোত্রের লোকসংখ্যা ছিল অনেকটা তাই । এই গোত্রের অনেকগুলো শাখা ছিল এবং পঞ্চম হিজরীতে বনী মাসতালাক ছাড়া বাকি সবার সাথেই মুসলমানদের সম্পর্ক সাধারণভাবে ভাল ছিল । অবশ্য এর কিছু ঐতিহাসিক কারণও ছিল । জাহিলিয়া যুগে আবদুল মুত্তালিব এই গোত্রের সাথে বংশ পরস্পরায় চিরস্থায়ী মিত্রতাবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খান্দান সে মিত্রতাকে অটুট রেখেছিল । ষষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া সন্ধিকালে যখন এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, এই চুক্তি দ্বারা শুধু মদীনার মুসলমান এবং মক্কার কুরায়শরাই নয় বরং যে সমস্ত গোত্র এদের যে কারো পক্ষে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করবে, তারাও উপকৃত হতে পারবে—তখন খাযাআ' গোত্র সাথে সাথেই ঘোষণা করে যে, তাদেরকে যেন রসূলুল্লাহর পক্ষে গণ্য করা হয় । এই সুযোগে রসূলুল্লাহ্ (সা) আবদুল মুত্তালিবের সেই পুরাতন মিত্রতা-বন্ধন নবায়ন করেন এবং বলেন, 'জাহিলিয়া যুগের প্রতিটি মিত্রতাবন্ধনকে ইসলাম আরো বেশি শক্তিশালী করে । পরবর্তী সময়ে যখন কুরায়শের মিত্র বনূ বকর কোন ব্যাপারে রাগান্বিত হয়ে খাযায়ীদের উপর নিশি আক্রমণ চালায় এবং কুরায়শও এ ব্যাপারে তাদেরকে সহায়তা করে তখন স্বাভাবিকভাবেই হুদায়বিয়া চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায় এবং মুসলমানরা কুরায়শদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে মক্কা নগরী দখল করে নেয় । এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না এবং এটাও সঠিকভাবে জানা যায় না যে, কি কারণে বনূ বকর খাযায়ীদের উপর আক্রমণ চালিয়েছিল । অবশ্য এটুকু জানা যায় যে, একজন খাযায়ী দূত ফরিয়াদ নিয়ে দ্রুতবেগে মদীনায় এসেছিল এবং একটি ছন্দবদ্ধ আবেদন পেশ করেছিল । তার গুরুত্বপূর্ণ বচনগুলো ছিল :
لا هم اني ناشد محمدا - حلف ابينا وابيه الا قلوا ان قريشا خلفوك الموعدا - ونقضوا ميثاقك المؤكدا هم ثبتونا بالوتير هجدا - فقتلونا ركعا وسجدا.
"হে আল্লাহ্, আমি মুহাম্মদকে সেই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, যে অঙ্গীকার আমাদের পিতা (পূর্বপুরুষ) এবং তার পিতার (পূর্বপুরুষ) মধ্যে হয়েছিল ।
(ফরিয়াদ এই যে,) কুরায়শ তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং তোমাদের পাকা অঙ্গীকারকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে ।
ওরা আমাদেরকে অতীতের শুভ্র ভূমিতে ঘুমন্ত অবস্থায় চেপে ধরেছে এবং রুকু' ও সিজদারত অবস্থায় আমাদেরকে হত্যা করেছে ।
তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) দূতকে এই বলে সান্ত্বনা দেন যে, 'তোমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে ।'

বুদায়েল প্রমুখ খাযায়ী' সরদারদের (যারা হুদায়বিয়া চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিল) নামে রসূলুল্লাহ (সা) একটি পত্র লিখেছিলেন বলে ইবনে সা'দ প্রমুখ উল্লেখ করেছেন । বাহ্যত এটা হুদায়বিয়া চুক্তির পরবর্তী এবং মক্কা বিজয়ের পূর্ববর্তী সময়কার ঘটনা । ঐ পত্রে রসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে আপন বন্ধুত্ব ও ঐকান্তিক ভালোবাসার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তারাও মক্কায় মদীনার মুসলমানদের ন্যায় সমপরিমাণ অধিকার ভোগ করবে । অর্থাৎ তারা হজ্ব ও উমরা পালনের জন্য সেখানে যেতে পারবে কিন্তু স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে না । পত্রে এটাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, হুদায়বিয়া চুক্তির পর খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে খাযায়ীদেরকে কোনরূপ হয়রানী করা হয় নি এবং ভবিষ্যতেও এর কোন আশংকা নেই । অতঃপর এই তথ্য পরিবেশন করা হয় যে, কিলাব এবং হাওয়াযিনের অমুক অমুক সরদার তাদের গোত্রের লোকদের নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তাদেরকে বারবার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যে, মুসলমান এবং খাযায়ীদের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠিত । ধারণা করা হয় যে, হুদায়বিয়া চুক্তির পর খাযায়ীরা মক্কায় কোন অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল এবং সম্ভবত এই অসুবিধা এ কারণে হয়েছিল যে, তারা হুদায়বিয়া চুক্তিতে নিম্নে বর্ণিত অধিকারসমূহের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে অত্যধিক উপযুক্ত মনে করত । সম্ভবত এ থেকেই রেষারেষির সূচনা হয়, যার পরিণাম ইতিপূর্বে বর্ণিত খুনাখুনিতে গিয়ে দাঁড়ায় ।

আসলাম গোত্র ছিল খাযাআ'রই একটি শাখা । ওদের নামে রসূলুল্লাহ্ (সা) একটি পত্র লিখেছিলেন বলে ইবনে সা'দ (২৪১) উল্লেখ করেছেন । পত্রের বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ :
১. খাযাআ'র শাখাগোত্র 'আসলাম'-এর ঐ সমস্ত লোকের জন্য যারা ঈমান আনে, নামায পড়ে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহর দীনের প্রতি সদয় ভাব দেখায় (নিম্নোক্ত সুযোগ দেওয়া হবে) ।
২. এদেরকে ঐ সমস্ত লোকের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রদান করা হবে যারা অত্যাচারমূলকভাবে তাদের উপর আকস্মিক হামলা চালায় ।
৩. নবী যখন এদেরকে সাহায্যের জন্য আহবান জানাবেন তখন তাঁকে সাহায্য করা তাদের জন্য হবে ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য) ।
৪. এদের যাযাবরদের ক্ষেত্রেও সেই অধিকার এবং দায়িত্ব প্রযোজ্য হবে যা এদের পল্লীবাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ।
৫. এরা যেখানেই থাকুক না কেন, মুহাজির হিসাবে গণ্য হবে ।
৬. এটা আল-আ'লা বিন আল-হাযরী লিপিবদ্ধ করেছেন এবং এর সাক্ষী হয়েছেন ।

এই দলীলের প্রথম লাইনেই 'আসলাম বিন খাযাআ'- এই শব্দগুলো রয়েছে । কিন্তু ইবনে সা'দের গুরু ওয়াকিদী তাঁর 'কিতাবুল মাগাযী'-এর মধ্যে এই দলীলটিকে কিছু পরিমাণ দীর্ঘ করে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং 'আসলাম-এর পরিবর্তে 'আসলুম' লিখেছেন । 'মিন খাযাআ' (খাযাআ হতে) শব্দ সেখানে নেই । তবে লেখা হয়েছে, 'রসূলুল্লাহ্ (সা) গাদীরুল আশতাত নামক একটি জলাশয়ের ধারে যখন তাঁবু ফেলেছিলেন, তখন এখানকার সরদার বুরায়দা বিন আল-খাসীব সেখানে উপস্থিত হন এবং ইসলাম গ্রহণের প্রতি তাঁর গোত্রের সম্মতির কথা জানিয়ে নিবেদন করেন, 'এই হচ্ছে আমাদের বসতি এবং গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ার । কিছু লোক হিজরত করে মদীনায় চলে গেছে এবং বাকিরা এখানে আছে । এখন আপনি যেই নির্দেশ দেন তাই আমাদের শিরোধার্য ।' রসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে সেখানেই বসবাসের নির্দেশ দেন । 'আসলুম' খাযাআ' গোত্রের নয় বরং কুযাআ' গোত্রের একটি শাখা ছিল । এরা মক্কার নিকটে নয় বরং মদীনা থেকেও উত্তরে কুযায়ীদের সাথে বসবাস করত । গাদীরুল আশতাতের কোন সন্ধান এখন পাওয়া যায় না । অতএব উপরে উল্লেখিত দুইটি বর্ণনার কোনটি সত্যি তা বলা মুশকিল । ইবনে সা'দের বর্ণনায় খাযাআ' শব্দটি পরিষ্কারভাবে লেখা হয়েছে এবং ওয়াকিদীর বর্ণনায় শুধু শাখা গোত্রের নাম 'আসলাম'-এর পরিবর্তে 'আসলুম' ('যবর'-এর পরিবর্তে পেশ) লেখা হয়েছে । অতএব লিপিবদ্ধকারীর ভুলেও এটা হতে পারে ।

এই দলীলের মধ্যে হিজরতের নির্দেশ থেকে গোত্রের বাকি লোকদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে । মদীনায় আগমনের পর রসূলুল্লাহ্ (সা) নওমুসলিম লোকদেরকে হিজরত করে ইসলামী রাষ্ট্রে চলে আসার নির্দেশ দিতেন । অবশ্য মক্কা বিজয়ের পর সে নির্দেশ রহিত করা হয় । তবে মক্কা বিজয়ের পূর্বেও কখনো কখনো এ নির্দেশ থেকে যেকোন গোত্রের লোককে অব্যাহতি দেওয়া হত, উপরোল্লেখিত ঘটনা তার প্রমাণ ।

ইবনে সা'দের বর্ণনায় যাকাতের উল্লেখ আছে । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে নবম হিজরীতে যথারীতি যাকাত বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয় । কিন্তু স্বেচ্ছাকৃতভাবে ও অনির্দিষ্ট হারে যাকাত প্রদানের উল্লেখ ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেও পাওয়া যায় । হযরত জাফর ত্বাইয়ার হিজরত করে হাবশায় গিয়েছিলেন । সেখানে নাজ্জাশীর এক জিজ্ঞাসার উত্তরে অন্যান্য বিষয়ের সাথে তিনি এটাও বলেছিলেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) মুসলমানদেরকে যাকাত প্রদানের জন্য তাকিদ দিয়ে থাকেন । কুরআন মজীদের মক্কী সূরাগুলোর মধ্যে বনী ইসরাইল সম্পর্কিত ঘটনায় কয়েকবার যাকাতের উল্লেখ করা হয়েছে । এ থেকে ধারণা করা যায় যে, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেও যাকাতদানের জন্য মুসলমানদের উৎসাহিত করা হত ।

অন্যান্য আরো কিছু সম্প্রদায়ের মত আসলাম সম্প্রদায়েরও অন্তত একজন সরদার হুসাইন বিন আউসকে জায়গীর প্রদান করা হয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) এ সম্পর্কিত একটি লিখিত নির্দেশও দিয়েছিলেন (ইবনে সা'দ) ।

ইবনুল আসীর প্রমুখের বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা) বেশ কয়েকজন আসলামী সরদারের নামে পত্র লিখেছিলেন । কিন্তু ঐ পত্রসমূহের বচন কি ছিল তা তাঁরা উল্লেখ করেন নি । ফলে ঐ সমস্ত পত্রের বিষয়বস্তু কি ছিল তা বলা মুশকিল ।

জাযাম, কুযাআ' ও আযরা
আরবের উত্তরে তাবুকের নিকটবর্তী অঞ্চলে এই সমস্ত গোত্রের লোক বসবাস করত । বাহ্যত সপ্তম হিজরীতে খায়বর বিজয়ের পর এই সমস্ত লোকের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক সৃষ্টি হয় ।

ঐ সময়ে বিভিন্ন রাজা-বাদশার কাছে ধর্মপ্রচারমূলক পত্র প্রেরিত হয়েছিল । ইবনে হিশাম প্রমুখ লিখেছেন, "রসূলুল্লাহর জনৈক দূতের আসবাব সামগ্রী 'জাযাম' গোত্রেরই এলাকায় কিছুসংখ্যক ডাকাত লুণ্ঠন করে । তখন আশেপাশের জাযামী গোত্রের কিছু নও-মুসলিম ঐ দূতের সাহায্যে এগিয়ে যায় এবং লুন্ঠিত আসবাব সামগ্রী ফিরিয়ে নিয়ে আসে । এই সংবাদ পেয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ এলাকার লোককে উচিত শিক্ষা দানের জন্য একটি বাহিনী প্রেরণ করেন; কিন্তু ভুলবশত কিছু নির্দোষ লোকও তাতে নিগৃহীত হয় । ঐ সমস্ত লোকেরা মদীনায় এসে রসূলুল্লাহর কাছে অভিযোগ করলে তিনি তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেন ।

রসূলুল্লাহ্ (সা) রেফাআ' বিন যায়িদ জাযামীর নামে একটি পত্র লিখেছিলেন বলে বেশির ভাগ ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন । তাতে বলা হয়েছিল, 'আমি একে ইসলাম প্রচারের জন্য তার সমগ্র সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠালাম । যে ইসলাম গ্রহণ করবে সে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের দলের অন্তর্ভুক্ত হবে । আর যে গ্রহণ করবে না তাকে দু'মাস পর্যন্ত আমান (নিরাপত্তা) দেওয়া গেল ।' এই ঘটনা কবেকার তা জানা যায় নি ।

ইবনুল আসীরের বর্ণনানুযায়ী তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তনের পর (ষষ্ঠ হিজরী) মালিক বিন আহমর জাযামী মদীনায় এসে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করেন । তাকে দেওয়া পত্রে রসূলুল্লাহ্ (সা) লিখেছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে এবং তার সঙ্গীরা নামায আদায় করে, যাকাত দেয়, মুসলমানদের অনুসরণ করে, অংশীবাদী (মুশরিক) থেকে দূরে থাকে, মালে গনীমত থেকে খুমুস (১/৫ অংশ) আদায় করে, গোত্রীয় বীমায় অংশ (সাহমুল গারিমীন) প্রদান করে, উপরন্তু অমুক অমুক জিনিস থেকে অমুক অমুক অংশ আদায় করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আল্লাহর এবং মুহাম্মদের আমানে (হিফাযতে) থাকবে ।'

এখানে উল্লিখিত সামুল গারিমীন (গোত্রীয় বীমার অংশ) একটি অভিনব বস্তু বটে । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে মদীনায় গোত্রগত একটি সমাজনীতির সন্ধান পাওয়া যায় । আর তা হলো, গোত্রের কোন ব্যক্তির উপর আর্থিক জরিমানা (যেমন রক্তমূল্য প্রভৃতি) প্রদান আবশ্যিক হয়ে পড়লে পুরা গোত্র সার্বজনীনভাবে তা পরিশোধ করত । কোন গোত্র সার্বজনীনভাবেও তা পরিশোধ করতে অক্ষম হলে অন্যান্য গোত্রও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসত । উপরে উল্লিখিত সাহমূল গারিমীন অনুরূপ ধরনেরই কোন জিনিস হয়ে থাকবে ।

দুমাতুল জন্দল
প্রাচীন যুগ হতে দুমাতুল জনদল উত্তর-দক্ষিণের (একদিকে আরাম ও বাবিল এবং অন্যদিকে হিন্দ ও মিসর) বাণিজ্য জারী রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসাবে পরিগণিত হয়ে আসছিল । (দাবলীকস, বাইবেল, হিষ্টি, চতুর্থ অধ্যায়, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ) । কা'লকাশান্দী লিখেছেন যে, এটা ছিল সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী অঞ্চল । ধারণা করা হয় যে, আরব থেকে উত্তর দিকে গমনকারী সব বাণিজ্য কাফেলাই এখানে এসে পৌঁছত । অতঃপর পৃথক পৃথক মোড় নিয়ে এখান থেকে সিরিয়া অথবা ইরাক যেখানে ইচ্ছা চলে যেত । এখানে জাহিলিয়া যুগে একটি বিরাট মেলা বসত । সে মেলার গুরুত্বের দিক বিবেচনা করে তার অধিকার লাভের জন্য প্রায়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ হত । (বিস্তারিত বিবরণের জন্য ইবনে হাবীব; আল মুতাহাব্বার, আল মারযুকী; আল আমিনা ওয়ায় আক্কিনা; বাবু আসওয়াকিল আরব ও আহদে নবভীকা নেযামে হরানী দ্রষ্টব্য) । যুদ্ধে ইবাদীরা জয়ী হলে উকীদর, এবং কালবীরা জয়ী হলে কেনাফা সেখানকার শাসক হতেন ।

বাহ্যত খায়বরের য়াহূদী এবং মক্কার কুরায়শীদের ষড়যন্ত্রের কারণে পঞ্চম হিজরীতে উকীদর মদীনায় খাদ্য আমদানীকারী বাণিজ্য কাফেলাগুলোতে হয়রানী করতে শুরু করে (মাসউদী, আত্তানবীহ্ ওয়াল আশরাফ, পৃষ্ঠা ২৪৮) । এটা ছিল মদীনার জন্য একটি ভয়ংকর ব্যাপার । তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) এর প্রতিবিধানের জন্য স্বয়ং একটি বাহিনী নিয়ে দুমাতুল জনদল অভিমুখে যাত্রা করেন (ইবনে সা'দ : ৪৪১) ।

ইতিমধ্যে আহযাব (আরবের বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ের সম্মিলিত বাহিনী) মদীনা আক্রমণের জন্য রওয়ানা হয় । তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) মধ্যপথ থেকে মদীনায় ফিরে আসেন (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৬৬৮) , রসূলুল্লাহর ব্যক্তিগত ভৃত্য হযরত আনাস থেকে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে উকীদরের কাছে একটি পত্র লিখেছিলেন (মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বল :) । রসূলুল্লাহ (সা)-এর ঐ পত্র বাহ্যত কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি । তাই তিনি উকীদরের বিরুদ্ধপক্ষের সাথে (যারা ঐ সময় পরাজিত অবস্থায় ছিল) বন্ধুত্ব স্থাপনে উদ্যোগী হন । কয়েক মাস পর ষষ্ঠ হিজরীতে হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করা হয় । ঐ বাহিনীর সামরিক গুরুত্বের চাইতে রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল বেশি । হযরত আবদুর রহমান (রা) কালব' গোত্রের মধ্যে ইসলাম প্রচার করেন এবং তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয় । অতঃপর তিনি কালব গোত্রের আল-আসবাগ্ নামীয় এক সরদারের মেয়েকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশ অনুসারে স্বয়ং বিবাহ করেন (ইবনে সা'দ : ৬৪১) এবং এভাবে দুমাতুল জন্দলকে দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে মুক্ত করার একটি বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী কৌশল অবলম্বন করা হয় । হুদায়বিয়া ও খায়বর অভিযানের পর বাণিজ্যপথ আপনা আপনি নিরাপদ হয়ে গিয়ে থাকবে । কিন্তু খ্রীস্টান উকীদর একজন ভয়ংকর প্রতিবেশী হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল । শেষ পর্যন্ত নবম হিজরীতে তাবুক অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সেনাবাহিনী উকীদরকে জীবন্ত অবস্থায় বন্দী করে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে হাযির করে ।

উকীদরের পরবর্তী অবস্থা অনেকটা বিতর্কিত । একদিকে ইবনে সা'দ প্রমুখ বলেছেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন নি বরং জিযিয়া প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং তাঁর দুর্গ, অস্ত্রশস্ত্র ও এলাকার যাবতীয় পতিত জমি মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করতে সম্মত হন । কিন্তু এরাই আবার ঐ চুক্তির যে প্রতিলিপি পেশ করেছেন তাতে জিযিয়ার কোন উল্লেখ নেই, বরং উকীদরের ইসলাম গ্রহণ, মিথ্যা খোদা ও মূর্তিসমূহ পরিত্যাগ, নামায আদায় এবং যাকাতদানের প্রতিশ্রুতির কথা আছে । এ ক্ষেত্রে সম্ভবত বালাযুরীর বর্ণনাই ঠিক (ফুতুহুল বুলদান, পৃষ্ঠা ৬২) । তাঁর মতে উকীদর তখন ইসলাম গ্রহণ করলেও শীঘ্রই মুরতাদ (ইসলাম বিমুখ) হয়ে যান এবং খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা)-এর হাতে নিহত হন । ইরতিদাদ (ইসলাম বিমুখতা) অবস্থায় জিযিয়ার শর্ত এবং আপস চুক্তি নিশ্চয়ই অবোধগম্য । তার একমাত্র ব্যাখ্যা এই হতে পারে যে, আপস চুক্তির যে প্রতিলিপি ঐতিহাসিকরা পেয়েছিলেন, তা আসল ও অকৃত্রিম ছিল না বরং পরবর্তী সময়ে ঐ এলাকার অধিবাসীরা যখন পুরাপুরিভাবে ইসলাম গ্রহণ করে তখন তারা নিজে থেকে একটি চুক্তিপত্র তৈরী করে নেয়, যাতে করে তাদের পিতামহ উকীদরকে একজন সাহাবী বানিয়ে নিজেদেরকে ঐ সাহাবীর বংশধর বলে পরিচয় দিতে পারে । এই পত্রের বিষয়বস্তু তৈরীতে প্রতিবেশী কালব গোত্রকে লিখিত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রটি তাদেরকে সাহায্য করে থাকবে । ঐ পত্র রসূলুল্লাহ্-(সা) হারিসা বিন কুতন কালবীকে লিখেছিলেন । তাতে পতিত জমি, নামায ও যাকাতের কথা মোটামুটি এরূপ শব্দেই লেখা রয়েছে যেরূপ উকীদরের দিকে সম্পর্কিত পত্রের মধ্যে দেখা যায় । অনুমান করা হয় যে, উকীদরকে বন্দী করে ছেড়ে দেওয়ার পর তা থেকে ছিনিয়ে নেওয়া দুর্গ এবং পতিত জমি একজন মুসলমান কালবী সরদারকে, যিনি ধারেকাছেই থাকতেন, দিয়ে দেওয়া হয় এবং যথারীতি এই পত্রও দেওয়া হয় (আসল ব্যাপার আল্লাহই ভাল জানেন) । কুতন বিন হারিসার নামেও রসূলুল্লাহর একটি পত্র পাওয়া যায় । তাতে ঐ গোত্রের লোকদেরকে নামায ও যাকাতের জন্য তাকিদ দেওয়া হয়েছে । এই কুতন উপরে উল্লেখিত হারিসার, না অন্য কারো পুত্র, তা জানা যায় নি ।

উকীদরের চুক্তি সম্পর্কিত একটি বিষয় খুবই চিত্তাকর্ষক । ইবনে সা'দ প্রমুখ লিখেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) ঐ চুক্তির উপর মোহরের পরিবর্তে তাঁর নখের ছাপ লাগিয়ে দিয়েছিলেন । উকীদর হীরার অধিবাসী ছিলেন । এখন ঐ জায়গায় কুফা শহর অবস্থিত । এটা বাবিলী অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং রসূল-যুগের পূর্বে সেখানে একটি অত্যন্ত পুরাতন রীতি এই ছিল যে, চুক্তি প্রদানকারী তার আংগুলের নখ দিয়ে অর্ধচন্দ্রের আকারে চুক্তিপত্রের নীচে একটি ছাপ দিত । প্রাচীন বাবিলী চুক্তিসমূহ, যা ইট ইত্যাদির উপর পাওয়া গেছে, তাতে এর অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় । এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুনঃ
1. Oulf Kruckman, Neue Babylonische Recht-Und Vewal- tungstaxte, Text 37, Tafel 28
2. B. Meissener, Babylonien Und Assyrien. 1, 179.
3. CH Edwards, The Hummurabi Code, P. 11

অনুমিত হয় যে, উকীদর চুক্তির উপর অনুরূপ ছাপ দেওয়ার জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বারবার অনুরোধ জানালে তিনি তাতে সম্মত হন ।

হুনায়ন, হাওয়াযিন, সাকীফ, তায়েফ
এক অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে মুসলমানরা যখন কোনরূপ সংঘর্ষ ছাড়াই মক্কা জয় করলো এবং রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অপরিসীম ক্ষমা ও অসাধারণ মহানুভবতায় যখন সেখানকার বেশির ভাগ লোকই ইসলাম গ্রহণ করলো তখন হাওয়াযিন এবং সাকীফ কেন বিচলিত হয়ে উঠেছিল তা বুঝে উঠা সত্যি মুশকিল । মুসলমানরা তো কখনো রাজ্য বিস্তারের জন্য অগ্রাভিযান চালায় নি । তাছাড়া রসূলুল্লাহ্ (সা) শিশুকালে হাওয়াযিনেই দুগ্ধ পান-করেছেন, প্রতিপালিত হয়েছেন এবং কয়েক বছর সেখানেই অতিবাহিত করেছেন । এতদসত্ত্বেও এর পিছনে যে সমস্ত কারণ ছিল তা সম্ভবত নিম্নরূপ :
১. তায়েফ এবং এর আশেপাশের উর্বর এলাকায় মক্কবাসীদের অনেক সম্পত্তি ছিল । বর্ণিত আছে যে, ঐ সমস্ত সম্পত্তিকে লাওয়ারিশ মনে করে তায়েফবাসীরা দখল করে নিয়েছিল এবং আশংকা করছিল যে, মক্কাবাসীরা এখন দাবি উত্থাপন করলে ঐ সমস্ত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ তাদেরকে দিতে হবে । অতএব এই ক্ষতিপূরণ যাতে না দিতে হয় সেজন্য তারা রণসজ্জা শুরু করে দিয়েছিল ।
২. তায়েফবাসীরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর যে অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল তা রসূলুল্লাহ (সা) ভুলে গেলেও কালিমালিপ্ত পাষাণহৃদয় তায়েফবাসীরা ভুলেনি । তারা আশংকা করছিলো যে, অন্যান্য দুনিয়াদারদের মত শক্তি অর্জন করার পর তিনি এই ব্যক্তিগত অসদাচরণের প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ছাড়বেন না । তাই তারা রসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিল ।
৩. মক্কা বিজয়ী মুহাম্মদ (সা) যাতে তায়েফে উর্বর এলাকার প্রতি হাত না বাড়ান সেজন্য তারা সতর্কতামূলক সামরিক প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিল ।
৪. মক্কাবাসীরা আকস্মিক হামলায় অস্ত্র সংবরণ করেছিল, যুদ্ধে পরাস্ত হয়নি । তায়েফে অবস্থানকারী মক্কাবাসী এবং তখন পর্যন্ত মক্কায় অবস্থানরত অমুসলিমদের উস্কানীতে তায়েফবাসীরা ধারণা করেছিল যে, তারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করলে অমুসলিম কিংবা আধা মুসলিম মক্কাবাসীরা নিজেদের রক্ষাকারী মনে করে তাদেরই সাহায্যে এগিয়ে আসবে । তাই স্বাভাবিকভাবে তারা রণসজ্জা শুরু করে দিয়েছিল ।

উপরিউক্ত কারণসমূহের সাথে সাথে অন্যান্য কারণ থাকতে পারে, যা এখন বিস্মৃতির অন্তরালে । যাহোক, হাওয়াযিন এবং সাকীফ একত্রিত হতে থাকে । অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) একজন গুপ্তচর প্রেরণ করেন । সে তথায় কিছুদিন অবস্থান করে তাদের রণশক্তি ও মতিগতির খবর নিয়ে আসে । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের প্রতিরোধ করাকেই শ্রেয় মনে করেন । ইসলামী বাহিনী মক্কার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করে সেখান থেকে প্রাপ্ত সাহায্য (সে সাহায্যের মধ্যে সৈন্য এবং হাতিয়ার উভয়ই ছিল) নিয়ে রওয়ানা হয় এবং হুনায়নে প্রথমবারের মত শত্রুর সম্মুখীন হয় । রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা থেকে চারদিনে সেখানে পৌঁছেছিলেন (আমতায়ে' মাক 'রিযী) ।

এটি সম্ভবত তখনো একটি অনাবাদী জায়গা ছিল এবং কল্পনাতীতভাবে শত্রুর সাথে সংঘর্ষ হওয়ার কারণে কিছুটা বিখ্যাত হয়ে পড়েছিল । কুরআনেও এর উল্লেখ আছে, কিন্তু আজো হুনায়ন কোথায় তা কেউ জানে না । গত হাজার বারো শ' বছর ধরে যে সমস্ত মুফাস্সির, ভূগোলবিদ ও গ্রন্থকার এর উল্লেখ করে আসছেন, তাঁদের মধ্যেও এর অবস্থান নিয়ে মতভেদ পরিলক্ষিত হয় । কেউ কেউ এটাকেও মক্কা থেকে এক দিনের এবং কেউ কেউ চার দিনের দূরত্বে বলে উল্লেখ করেছেন । তবে এটা অনুমান করতে বাধে যে, মক্কা থেকে শুধু একদিনের দূরত্বে শত্রুবাহিনী এসে পড়েছিল এবং রসূলুল্লাহ (সা) সে সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন । নিশ্চয় এটা মক্কা থেকে চল্লিশ পঞ্চাশ মাইল কিংবা তার চাইতেও বেশি দূরত্বে (চারদিনের দূরত্বে) ছিল ।

মুসলিম বাহিনী আঁকাবাকা বন্ধুর রাস্তা দিয়ে এগুচ্ছিলো এমন সময় হঠাৎ করে আরবের শ্রেষ্ঠ তীর নিক্ষেপকারীদের পাল্লায় পড়ে এবং ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় । শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ়তা শীঘ্রই মুসলিম বাহিনীকে সংগঠিত করে ফেলে এবং মুসলিম বাহিনীর সম্মিলিত আঘাত সহ্য করতে না পেরে শত্রুরা পলায়ন করতে বাধ্য হয় । শত্রুরা ঐ যুদ্ধে শুধু তাদের স্ত্রী পুত্রকন্যাদেরই নয় বরং পুরো সংসার অর্থাৎ উট-বকরীও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো । অতএব এসব জিনিস সহজেই মালে গনীমত হিসাবে মুসলমানদের হস্তগত হয় । রসূলুল্লাহ (সা) এগুলোকে সামলিয়ে নিয়ে শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করেন । তখন সুদৃঢ় প্রাচীরঘেরা তায়েফ শহর ছাড়া তাদের আশ্রয়ের আর কোন জায়গা ছিল না । ইরানী প্রকৌশলীরা ঐ প্রাচীর তৈরী করেছিল বলে জানা যায় (আগানী : ৪৯০২২) ।

মুসলমানরা শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করতে করতে তায়েফে গিয়ে পৌঁছে এবং কিছুদিন শহরটি ঘেরাও করে রাখে । শেষ পর্যন্ত রসূলুল্লাহ (সা) তায়েফ জয় না করেই প্রত্যাবর্তন করেন । মক্কা থেকে দশ বারো মাইল দূরে থাকতেই তিনি জাআ'ররানা নামক স্থানে হুনায়নের মালে গনীমত তলব করেন এবং যথারীতি তা বন্টন করে দেন । এবার হাওয়াযিন গোত্রের চৈতন্যোদয় হয় । তারা লজ্জাবনত অবস্থায় ক্রন্দন করতে করতে রসূলুল্লাহর কাছে আসে ও দুগ্ধ সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তারা করুণা ভিক্ষা করে । রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, 'তোমরা দেরি করে ফেলেছ । যুদ্ধজয়ের পর থেকে তোমাদের অপেক্ষা করছিলাম এই ভেবে যে, তোমরা মুসলমান হয়ে যাবে এবং তোমাদের ধন ও জন ফিরিয়ে দেওয়া হবে । এখন তোমরা তোমাদের ধন ও জনের (স্ত্রী পুত্রকন্যা) মধ্য থেকে যেকোন একটিকে বেছে নিতে পার ।' তারা নিশ্চয়ই তখন তাদের স্ত্রী পুত্র কন্যাদেরকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিল । তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, 'আমি আমার গোত্রের অংশ এখনই ফিরিয়ে দিচ্ছি । অবশিষ্টের জন্য নামাযের সময় জনসাধারণের সামনে তোমরা তোমাদের আবেদন পেশ করো ।' ঐ নও-মুসলিমরা তা-ই করে । রসূলুল্লাহ (সা) তখন তাঁর ও তাঁর গোত্রের পক্ষ থেকে হাওয়াযিনদের স্ত্রী-পুত্রকন্যা ফেরতদানের কথা পুনরায় ঘোষণা করেন । তখন সাহাবীরাও একের পর এক দাঁড়িয়ে নিজ নিজ গোত্রের পক্ষ থেকে অনুরূপ দাবি পরিত্যাগের কথা ঘোষণা করতে থাকেন । রসূলুল্লাহ (সা) তখন একজন হিসাবরক্ষক নিয়োগ করেন । তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক সাহাবীর সাথে সাক্ষাত করে কার কাছে কি আছে তার হিসাব লিখে নেন । বেশির ভাগ সাহাবীই হাওয়াযিনদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে বিনামূল্যে মুক্ত করে দেন । কিছু সংখ্যক সাহাবী তাতে সম্মত না হলে তাঁদেরকে বলা হয় যে, তাঁদের অংশের মূল্য বায়তুলমাল থেকে পরিশোধ করা হবে । তবে অবশ্যই নারী ও শিশুদেরকে মুক্ত করে দিতে হবে । সম্ভবত কিছুসংখ্যক অবিবাহিত যুবতী বিজয়ীদের সাথে থেকে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে করে এবং যার ভাগে পড়েছিল তার সাথেই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয় । বাকি সব স্ত্রীলোক এবং ছেলেমেয়ে হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদলের সাথে আনন্দচিত্তে নিজ নিজ বাসভূমিতে ফিরে যায় । অতঃপর রসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় ফিরে আসেন ।

সম্ভবত মক্কার মুসলমানরা তায়েফবাসীদের সাথে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বয়কট করেছিল । যখন তাদের চতুষ্পার্শ্বে ইসলাম দ্রুতবেগে প্রসার লাভ করছিলো তখন তায়েফবাসীদের পক্ষে দীর্ঘদিন উপরিউক্ত চাপ সহ্য করা মোটেই সম্ভব ছিল না । শেষ পর্যন্ত কয়েক মাস পর তারা রসূলুল্লাহর সাথে মিত্রতা স্থাপনের জন্য মদীনায় একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে । তারা মনে করেছিল যে, ইসলামের অর্থ শুধু নতি স্বীকার । তাই তাদের প্রতিনিধিদল একটি অবিজিত দেশের প্রতিনিধি হিসাবে রসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে এমন কিছু শর্ত পেশ করে, যা ছিল দর কষাকষির মাধ্যমে সুবিধা আদায়েরই নামান্তর । তারা বলে যে, তাফেবাসীরা মুসলমান হতে রাযী আছে, তবে এই শর্তে যে—
১. তাদেরকে নামায থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে ।
২. তায়েফকেও মক্কার মত হেরেম ঘোষণা করা হবে (খুব সম্ভব এর দ্বারা তারা হজ্জ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল) ।
৩. তাদেরকে যাকাত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে ।
৪. তাদেরকে জিহাদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে (অর্থাৎ তাদেরকে বাধ্যতামূলক সামরিক খিদমত এবং সামরিক স্বেচ্ছাসেবক সরবরাহ করা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে) ।
৫. তাদের শহরের প্রাচীন দেবালয়সমূহ ধ্বংস করা হবে না ।
৬. তাদের জন্য ব্যভিচার নিষিদ্ধ করা হবে না ।
৭. তাদের জন্য সূদী কারবার নিষিদ্ধ করা হবে না ।
৮. তাদের জন্য মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হবে না ।

কথিত আছে যে, তারা একটি চুক্তিপত্র লিখে নিয়ে এসেছিল এবং স্বাক্ষরের জায়গাটি শুধু খালি রেখেছিল, যাতে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাতে তাঁর মোহর লাগিয়ে দেন । চুক্তি অনুযায়ী তারা পুরো ইসলাম থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল । তবে রোযা থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি । যাহোক, এর দ্বারা পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, তারা রসূলুল্লাহ্র মিশনের আসল উদ্দেশ্যই হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনি । তারা ইসলামকে বিজিতদের উপর আরোপিত শর্তবিশেষ মনে করেছিল । রসূলুল্লাহ্ (সা) কিন্তু বেশ সহানুভূতির সাথেই তাদের ভ্রান্ত ধারণাকে সংশোধন করে দেন । তিনি তাদের প্রতি এমন হৃদ্যতা দেখান যে, তারা লজ্জিত হয়ে পড়ে এবং তাদের অমূলক দাবিগুলি প্রত্যাহার করে নেয় । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বলেন, নামায এবং ইবাদত ছাড়া মানুষ মানুষই থাকে না এবং পার্থিব স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া যে ধর্মের কোন লক্ষ্য নেই, সে ধর্ম কোন ধর্মই নয় । আর ব্যভিচার হচ্ছে একটি অশালীন ও অপবিত্র আচরণ । তোমরা যেমন তোমাদের স্ত্রী ও মেয়েদেরকে অন্যদের হাতে নষ্ট হতে দিতে রাযী নও, অন্যরাও তেমনি তাদের স্ত্রী ও মেয়েদেরকে তোমাদের হাতে নষ্ট হতে দিতে রাযী নয় ।" তাদের যাকাত ও যুদ্ধে সহায়তা দান তখনকার বিরাট ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য একটা ধর্তব্যের বিষয় ছিল না । তাই আবূ দাউদের বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে সেগুলো থেকে অব্যাহতিদানে সম্মত হন । তায়েফকে হেরেম ঘোষণার ব্যাপারেও তিনি একটি ঘোষণা জারী করেন এবং এর বিরুদ্ধাচারণের উপর শাস্তি নির্ধারণ করা হয় । যেহেতু জাতিকে শিক্ষাদানের ইখতিয়ার এখন রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাতে, তাই যারা কুরআন পড়বে এবং সেটাকে মানবে তাদেরকে ঐ সমস্ত শর্তাদি থেকে অব্যাহতি দান ছিল অপরহিার্য-যাতে করে মুসলমানরা ইসলামের আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয় । দেবালয় সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (সা) একটি সূক্ষ্ম রসিকতা করে বলেন, 'তোমাদের এটা ধ্বংস করতে হবে না । আমিই লোক পাঠিয়ে ধ্বংস করে দেব । আর তোমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এজন্য যদি সত্যি সত্যি কোন বিপদ নেমে আসে, তাহলে আমার লোকদের উপরই তা আসবে ।' সুদ সম্পর্কে যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায়—তাতে মূল সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কিছুটা অস্পষ্টতা থেকে যায় । তবে এটুকু জানা যায় যে, উকাযের পরবর্তী মেলা পর্যন্ত তাদের জন্য সুদ গ্রহণের অনুমতি দিয়ে পরবর্তী সময়ে তা রহিত করা হয় এবং বলা হয় যে, প্রদত্ত ঋণের শুধুমাত্র মূলধন ফেরত নেওয়া যাবে । তাদের চুক্তির যে বচন বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে যা পাওয়া যায় তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক বিধায় এখানেও উদ্ধৃত করা গেল ।

১. করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে ।
২. এটা একটা লিখিত চুক্তি যা আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সা :) সাকীফকে প্রদান করেছিলেন ।
৩. লেখা যাচ্ছে যে, তাদেরকে ঐ আল্লাহর যিম্মায় (হিফাযতে) দেওয়া গেল যিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই । আর ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে নবী বিন আবদুল্লাহর যিম্মা (হিফাযত) রইলো যে সমস্ত বিষয় এই চুক্তিতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ।
৪. নিশ্চয়ই তাদের উপত্যকা হারাম । আর আল্লাহর জন্য (ওয়াস্তে) সব কিছুই হারাম করা হলো । সেখানকার কাটাযুক্ত জংলী গাছ বৃক্ষ, সেখানকার শিকার, সেখানে অত্যাচার করা, কোনরূপ দুষ্কর্ম করা (সবই হারাম) ।
৫. সাকীফরাই ভুজ উপত্যকার সবচাইতে বেশি হকদার । তাদের তায়েফ (দুর্গ) লংঘন করা যাবে না এবং কোন মুসলমান তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দিতে পারবে না । তারা তাদের তায়েফে কিংবা নিজেদের উপত্যকার যেখানে ইচ্ছা দালান কোঠা নির্মাণ করতে পারবে ।
৬. তাদেরকে সামরিক খিদমতের জন্য একত্রিত করা যাবে না, তাদের কাছ থেকে 'উশর' আদায় করা হবে না এবং ধন ও প্রাণের ক্ষেত্রে তাদের উপর কোনরূপ জবরদস্তি করা যাবে না ।
৭. তারা মুসলমানেরই একটি দল । তারা যেখানে ইচ্ছা যাতায়াত করতে পারবে ।
৮. তাদের কাছে যে বন্দী হবে তার উপর তাদেরই সর্বাধিক অধিকার বর্তাবে, তার (বন্দীর) ব্যাপারে তারা যা ইচ্ছা করতে পারবে ।
৯. রেহেনের যামানতে তারা যে ঋণ দিয়েছে সে ঋণ আদায়ের সময়কাল যদি উকায মওসুমের পরে হয় তাহলে মূল পুঁজি উকাযের সময় পরিশোধ করা হবে (ইবনে আবদিল বার এবং 'লিসানুল আরব'-এর বর্ণনায় আছে, তাহলে এর মূল পুঁজি পরিশোধ করা হবে এবং উকাযে সুদ গ্রহণ করা যাবে-এর পরে নয়) ।
১০. সাকীফদের খাতায় তাদের ইসলাম গ্রহণের দিন লোকের কাছে যে সমস্ত ঋণ পাওনা আছে তা তারা পাবে ।
১১. সাকীফদের কাছে আমানতস্বরূপ অন্যের যে মাল বা মানুষ (দাসদাসী) আছে তা তারা অবশ্যই ফেরত দেবে ।
১২. সাকীফদের যে মানুষ বা সম্পদ এখন দেশের বাইরে রয়েছে সেগুলোর নিরাপত্তা থাকবে যেমন নিরাপত্তা রয়েছে দেশের অভ্যন্তরস্থ মানুষ ও সম্পদের ।
১৩. সাকীফদের যে সমস্ত মিত্র বা বাণিজ্য অংশীদার রয়েছে তারাও ঐ সমস্ত সুযোগ সুবিধার অধিকারী হবে, যা সাকীফদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ।
১৪. যদি কেউ সাকীফদেরকে অভিযুক্ত করে কিংবা তাদের উপর জুলুম করে তাহলে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর অনুসারীরা ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাকীফদেরকে সাহায্য করবেন ।
১৫. যদি সাকীফরা কোন ব্যক্তিকে তাদের এলাকায় আসতে অপছন্দ করে তাহলে সে ব্যক্তি সেখানে আসতে পারবে না ।
১৬. হাট-বাজার এবং ব্যবসা-বাণিজ্য গৃহাদির আঙ্গিনায় হবে ।
১৭. তাদের নেতা অন্য কেউ নয় বরং তাদের মধ্য থেকেই হবে ।
১৮. সাকীফরা কুরায়শদের যে সমস্ত শুল্কজনিত জমিতে পানি সরবরাহ করবে সে সমস্ত জমির অর্ধেক উৎপাদন তারাই পাবে ।
১৯. রেহেনের জামানতে তাদের যে ঋণ পাওনা আছে তাতে সুদ গ্রহণ করা যাবে না । রেহেনের মালিক যদি শীঘ্রই ঋণ পরিশোধে সক্ষম হয় তাহলে তা পরিশোধ করে দেবে । আর যদি শীঘ্রই পরিশোধে সক্ষম না হয় তাহলে আগামী বছর জমাদিলউলা পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারবে । ঋণ পরিশোধের সময় আসার পর যে তা পরিশোধ করবে না সে যেন সুদ গ্রহণ করলো ।
২০. তাদের কাছে যাদের ঋণ পাওনা আছে তা শুধু আসল পুঁজি ছাড়া আর কিছুই পাবে না ।
২১. তাদের কাছে যে বন্দী আছে—যাকে তার মালিক বিক্রি করে দিয়েছে তারা সে বন্দীকে বিক্রি করতে পারবে । আর যে বন্দীকে বিক্রি করা হয়নি তার 'ফিদিয়া' (মুক্তিমূল্য) হচ্ছে ৬টি উটনী । তার মধ্যে তিনটি হবে তিন বছর বয়স্কা ।
২২. যে বাণিজ্যভিত্তিক কিছু ক্রয় করেছে একমাত্র সে-ই তা বিক্রি করার অধিকারী হবে । (আবূ উবায়েদ, কিতাবুল আমওয়াল, পৃষ্ঠা ৫০৬)

ইমাম মালিক (মুয়াত্তা) জাহিলিয়া যুগের সুদ লেনদেনের যে রীতি বর্ণনা করেছেন তা প্রধানত সাকীফদের উপরই প্রযোজ্য । সে রীতি হলো, কিছু ঋণ দিয়ে তা পরিশোধের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া । সময়মত পরিশোধ করা হলে তো ভাল, অন্যথায় ঋণকে দ্বিগুণ করে পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেওয়া । এই সময়ও পরিশোধ করা না হলে ঋণের পরিমাণ পুনরায় দ্বিগুণ করে পরিশোধের সময় আবার বাড়িয়ে দেওয়া ।

ইবনে সা'দ (৩৩২) একটি অভিনব কথা লিখেছেন । আর তা হলো, সাকীফদের প্রতিনিধিদের ক্রমাগত চাপের ফলে চুক্তিপত্রের উপর রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর নাতিদের সাক্ষ্যও সংযোজিত করেছিলেন । (যেহেতু তাঁর কোন পুত্র সন্তান ছিল না ।) ইমাম হাসানের বয়স তখন চার বছর এবং ইমাম হুসায়নের বয়স আনুমানিক ৩ বছর ছিল । চুক্তিপত্রে কি তাঁদের আঙ্গুলের চিহ্ন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল? ইতিহাসে একথার কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে তা শুধুমাত্র অনুমানভিত্তিক ।

ইতিহাসে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আর একটি পত্রের সন্ধান পাওয়া যায় । তাতে তায়েফবাসীদের বলা হয়েছিল যে, ভুট্টার মদ তাদের জন্য নিষিদ্ধ ।

কয়েক মাস পর রসূলুল্লাহর ওফাত হয় । যখন ইরতিদাদের (ইসলাম বিমুখতার) গণ্ডগোল দেখা দেয় তখন খলীফা আবু বকর (রা) সাকীফের গভর্নর উসমান বিন আবিল আসকে নির্দেশ দেন, যেন তিনি তার এলাকার প্রত্যেকটি তালুক (মহল্লা) থেকে সামরিক স্বেচ্ছাসেবক প্রেরণ করেন । তাবারীর (পৃষ্ঠা ১৮৭১ ও ১৯৮৮) বর্ণনা অনুযায়ী গভর্নর উসমান প্রত্যেক মহল্লাবাসী উপর ২০ জন সৈন্য সরবরাহের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেন এবং তারা কোনরূপ আপত্তি ছাড়াই তা মেনে নেয় ।

এর পূর্বেই তায়েফের কিছু লোক মুসলমান হয়ে গিয়েছিল । যখন ঐ প্রতিনিধিদল আসে তখন মুগীরা বিন শু'বা আস সাকাফী মদীনায়ই ছিলেন । খায়বর যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যরা 'মান্‌জানিক' প্রভৃতি যুদ্ধাস্ত্রের সম্মুখীন হলে রসূলুল্লাহ্ কিছু লোককে ঐ সমস্ত অস্ত্র তৈরীর কৌশল শিক্ষা করার জন্য জুরাশে প্রেরণ করেন । তাদের মধ্যে উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফী এবং গায়লান বিন সালমা সাকাফীও ছিলেন । তারা ঐ শিক্ষা সফরে থাকার দরুন হুনায়ন এবং তায়েফ অভিযানে রসূলুল্লাহর সাহচর্যে থাকতে পারেন নি । (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৮৬৯ ; ইবনে সা'দ ৫২২ এবং তাবারী) । এক বর্ণনা অনুযায়ী হযরত সালমান ফারসী (রা) নিজ হাতে একটি 'মানজানিক' তৈরী করে তায়েফে স্থাপন করেছিলেন ।

জুরাশ
তায়েফের দক্ষিণে তাবাদুলা ও জুরাশ বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান । মক্কা বিজয়ের পর, সম্ভবত তায়েফবাসীদের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সারো বিন আবদুল্লাহ্ আল-আযদী নামক একজন ইয়ামানী সরদার ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে তার আশেপাশের এলাকাসমূহে যথার্থ সামরিক আন্দোলন চালাবার অনুমতি দেন । ইবনে হিশামের বর্ণনা (পৃষ্ঠা ১৫৪) অনুযায়ী সারো বিন আবদুল্লাহ্ রসূলুল্লাহর নির্দেশে একটি বাহিনী নিয়ে জুরাশে অবতরণ করেন । তখন জুরাশ ছিল একটি প্রাচীরঘেরা নগরী । ঘেরাও সহ্য করেতে না পেরে জুরাশবাসীরা বাধ্য হয়ে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয় (এই চুক্তির মোটামুটি বর্ণনা বালাযুরীর ৫৯ পৃষ্ঠায় আছে) । সে চুক্তি অনুযায়ী জুরাশবাসীরা তাদের সম্পদের মালিক থাকবে, আগামীতে মুসলমান মুসাফিররা এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় তারা বিনা প্রতিদানে তাদের মেহমানদারী করবে, এখানকার আহলে কিতাবদের (য়োহূদী, ঈসায়ী) উপর জিযিয়া ধার্য করা হবে এবং হযরত আবু সুফিয়ান এখানকার গভর্নর হবেন ।

বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, ঐ সময়ও জুরাশ এত উন্নত ছিল যে, সেখানে মানজানিক, দাব্বাবা, দাবোর প্রভৃতি দুর্গ বিধ্বংসী ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রাদি নির্মিত হত । তখনকার দিনে ফিলিস্তিনের দক্ষিণে (বর্তমান জর্দানের পূর্বে) জারাশ নামক একটি শহর ছিল । গ্রীক যুগে এটা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান । এখনো এর ধ্বংসাবশেষ তার গৌরবোজ্জ্বল অতীতের সাক্ষ্য দিচ্ছে । ঐতিহাসিক এবং ভূগোলবিদরা (ইয়াকুত প্রমুখ) এখানকার প্রাচীর প্রভৃতির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন । অনুমিত হয় যে, মানজানিক এবং দাবাবা তৈরীর কৌশল আয়ত্ত করার জন্য কারিগরদেরকে এই উত্তরাঞ্চলীয় জারাশেই পাঠানো হয়েছিল । খুব সম্ভব বর্ণনাকারী এই জারাশের খবর রাখতেন না । তাই জারাশ বলতে তিনি জুরাশ বুঝেছেন ।

সত্যি সত্যি যদি সে স্থানটি তায়েফের দক্ষিণাঞ্চলের জুরাশ হয়ে থাকে তাহলে এই জুরাশবাসীদের ধন্যবাদ দিতে হয় এজন্য যে, সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তারা মক্কা, মদীনা এবং তায়েফকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল । অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে ছিল যে তখন কারিগরী শিক্ষার জন্য তায়েফের লোকদের সেখানেই পাঠানো হত ।

বিবিধ
নবম হিজরীতে 'আ'মূল ওফুদ' (প্রতিনিধি আগমনের) বছর বলা হয় । কেননা মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র আরবের ডজন ডজন ছোট ছোট গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে এবং রসূলুল্লাহ্র কাছে তাদের প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে নিজ নিজ এলাকার অধিকার ইত্যাদি সম্পর্কিত নির্দেশনামা লিখিয়ে নিয়ে যায় । এই বছরের শেষের দিকে সূরা বারাআত নাযিল হলে রসূলুল্লাহ্ (সা) হজ্বের মওসুমে তা প্রচার করিয়ে দেন এবং সমগ্র আরববাসীকে ৪ মাসের সময় দিয়ে বলেন, 'হয় তোমরা ইসলামের অনুগত হও, নয়ত আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল তোমাদের হিফাযতের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলেন ।" এই চরম সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেওয়ার এক বছর পর যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) দশম হিজরীতে নিজে হজ্ব পালন করতে যান, তখন দেড় লক্ষ মুসলমান আরাফার মাঠে সমবেত হয়েছিল বলে বর্ণিত আছে । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে সম্বোধন করে অসিয়ত (শেষ উপদেশ প্রদান) করেন । তিনি জবলে রহমতে আরোহণ করে একটি বিখ্যাত বাণী প্রদান করেন । রসূলুল্লাহর বিদায় হজ্বের বাণী ছিল প্রকৃতপক্ষে মানবতার একটি রক্ষাকবচ । এর তিন মাস পর তিনি দুনিয়া ছেড়ে তাঁর পরম বন্ধু আল্লাহ্ তা'আলার সাথে মিলিত হন ।

যে সমস্ত গোত্র মুসলমান হত তাদের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্বিমুখী কর্মপন্থা গ্রহণ করা হত । তাদেরকে নামায পড়বার বা কেন্দ্রে যাকাত পাঠাবার নির্দেশই শুধু দেওয়া হত না বরং এই নির্দেশ যাতে যথাযথভাবে পালিত হয় সেজন্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে শাসনকর্তা নিয়োগ করা হত । তাদের দায়িত্ব ছিল বিভিন্নমুখী । যেমন স্থানীয় লোকদেরকে ইসলামিয়াত শিক্ষা দেওয়া, সদাচরণ শিক্ষা দেওয়া, তাদের মামলা মোকদ্দমার বিচার করা, তাদের কাছ থেকে যাকাত আদায় করে যথারীতি তা খরচ করা, তাদের কাছ থেকে আদায়কৃত করের বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তা প্রদান করা, তাদের এলাকায় সামাজিক বীমা চালু করা এবং যাকাতের অর্থ থেকে প্রত্যেকটি নিঃস্ব অভাবগ্রস্তের প্রয়োজনীয় খাদ্য পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা ।

উপরিউক্ত ব্যবস্থা অবলম্বনের দরুন যাদের কায়েমী স্বার্থে আঘাত লেগেছিল, যাদের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতা খতম হয়ে যাচ্ছিলো, তাদের হঠাৎ ক্ষেপে যাওয়ার কথা । বাস্তবে তারা ক্ষেপেও ছিল । রসূল-জীবনের একেবারে শেষভাগে এবং সিদ্দিকী খিলাফতের প্রারম্ভে তাদের ক্ষ্যাপামি ইরতিদাদ (ইসলাম-বিমুখতা) রূপে প্রকাশিত হয় । এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে হলে একটি পৃথক গ্রন্থই রচনা করতে হয় । এ বিষয়ের উপর বিশেষভাবে লিখিত ওয়াকিদীর 'কিতাবুর রাদ্দাহ' একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ । এই গ্রন্থটি পুনরায় প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে । প্রয়োজন রয়েছে এটার সাথে অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থ মিলিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করার ।

টিকাঃ
১. জাহিলিয়া যুগে আরবের লোকেরা গোত্র-সরদারকে মালে গনীমতের এক চতুর্থাংশ প্রদান করত । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরিমাণ কিছুটা হ্রাস করে কেন্দ্রের জন্য এক-পঞ্চমাংশ এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের জন্য বাকি চার-পঞ্চমাংশ নির্ধারণ করেন । এ কারণে আরবের অনেক গোত্র কুরায়শ প্রভৃতির স্থলে মুসলমানদের পক্ষাবলম্বনে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবে ।
২. খন্দক অভিযানের জন্য কুরায়শরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলো, এরা মাত্র চার দিনের মধ্যে সে খবর রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে পৌঁছিয়ে দিয়েছিল (শামী) ।
৩. এটাই কি 'গাদীরে খাম' যা রাবিগের নিকটে অবস্থিত?

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ইসলামবিমুখতা (ইরতিদাদ) ও বিদ্রোহ

📄 ইসলামবিমুখতা (ইরতিদাদ) ও বিদ্রোহ


অন্যের উন্নতিতে হিংসুটে হওয়া মানুষের অনেকটা স্বভাবজাত । অন্য কিছু না হলেও সমগ্র আরব থেকে যাকাত আদায় করে মদীনায় প্রেরণ এবং অর্থ বিত্তের সাথে সাথে মুসলমানদের কর্তৃত্বেরও দ্রুত প্রসার শত্রুদের অন্তরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিল । নিম্নের ঘটনাগুলো হচ্ছে তারই বহিঃপ্রকাশ ।

ইয়ামামা ও নজদ
বনু হানীফার একজন সরদারের নাম ছিল সামামা বিন আসাল । ইবনে হজরের বর্ণনা অনুযায়ী (ইসাবা, পৃষ্ঠা ৯৬১) রসূলুল্লাহ (সা) হিজরতের পূর্বে ঐ সরদারের কাছে ইসলাম প্রচার করলে তিনি ধমকের সুরে বলেছিলেন, "পুনরায় যদি এরূপ (প্রচার) কর তাহলে তোমাকে হত্যা করবো ।" চতুর্থ হিজরীতে বনূ হানীফা গোত্রের আ'মির বিন তুফায়েল প্রমুখ মুসলমান অতিথি এবং প্রচারকদের ধোঁকা দিয়ে পাইকারীভাবে হত্যা করে । যষ্ঠ হিজরীর প্রথম দিকে সামামাকে বন্দী করে মদীনায় নিয়ে আসা হয় । রসূলুল্লাহ (সা) তাকে ক্ষমা করে দেন । তাতে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন । অতঃপর তিনি ইয়ামামা থেকে মক্কায় খাদ্য রফতানী বন্ধ করে দেন । মক্কাবাসীরা তখন পর্যন্ত মুসলমানদের সাথে লড়ে যাচ্ছিলো । সামামার ইসলাম ছিল খাঁটি এবং সুদৃঢ় । রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওফাতের পর যখন ইরতিদাদের (ইসলাম বিমুখতা) গণ্ডগোল হয় তখনো সামামা ইসলামের বিরাট খিদমত আনজাম দেন (তাবারী, পৃষ্ঠা ১৯৬৩) ।

পারস্য উপসাগর সংলগ্ন ইয়ামামা ও নজদের উচ্চভূমি ছিল সাধারণভাবে ইরানী সাম্রাজ্য দ্বারা প্রভাবান্বিত । বনূ হানীফা গোত্রের অন্যতম শাখা গোত্রের সরদার ছিলেন হাওযাহ বিন আলী । কিসরা-ই-ইরান তাকে মুক্তাখচিত একটি মুকুট উপহার দিয়েছিলেন, যা তিনি পরিধান করতেন । এ জন্য তাকে যুত্তাজ (মুকুটের অধিকারী) বলা হত (ইশতিকাকে ইবনে দারীদ, পৃষ্ঠা ২০৯ ও আক'দুল ফরীদ : ২৭) । তিনি ইয়ামামার বাণিজ্য কাফেলাসমূহের যিম্মাদার এবং শাহ-ই-ইরানের মিত্র ছিলেন । বাইজেন্টাইনী কায়সার-ই-রোমের হাতে ইরান পরাজিত হলে পর ইয়ামামার মত দূর-দূরান্তের এলাকাসমূহের উপর কেন্দ্রীয় প্রভাব লোপ পায় । সপ্তম হিজরীতে রসূলুল্লাহ্ (সা) হাওযাহকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি উত্তরে বলেন, "আমাকে ক্ষমতার সম-অংশীদার করে নিলে আমি ইসলাম গ্রহণে রাযি আছি ।" কিন্তু ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব লাভ হাওযাহের ভাগ্যে জুটেনি । এর পূর্বেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং ইসলামের ক্রমবর্ধমান সাফল্য প্রত্যক্ষ করে বনূ হানীফার কয়েকটি শাখাগোত্র ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয় (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৯৪৫) ।

ঐ সময়ে আর একটি গোত্রের প্রতিনিধিদল মদীনায় আসে । মুসায়লামা বিন হাবীবও ঐ দলে ছিল । ইতিহাসে সে মুসায়লামা কায্যাব নামে কুখ্যাত । মদীনায় ইসলাম গ্রহণ করা সত্ত্বেও সে দেশে ফিরেই রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে অশিষ্টের মত একটি পত্র লেখে এবং হাওযাহ বিন আলীর মতই ক্ষমতায় অংশদারিত্ব দাবি করে । রসূলুল্লাহ্ (সা) তার দূতদের কাছ থেকে জানতে পারেন যে, তারা সকলেই মুরতাদ (ইসলামবিমুখ) হয়ে গেছে । তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মুসায়লামার পত্রের উত্তর দেন । এবার মুসায়লামা খোলাখুলি নবৃওয়াতের দাবি করে বসে । এই ফিত্না (গণ্ডগোল) বন্ধ করতে বেশ কয়েক বছর লেগেছিল । শেষ পর্যন্ত আবু বকর সিদ্দীকের খিলাফতকালে খালিদ বিন ওয়ালীদের নেতৃত্বে প্রেরিত মুসলিম বাহিনীর হাতে মুসায়লামা এবং তার বহু সংখ্যক অনুসারী মারা যায় এবং এখানেই এই ফিতনার পরিসমাপ্তি ঘটে । মুসায়লামা ছিল একজন ভাল সাহিত্যিক । কুরআনের অনুকরণ করে সে অনেকগুলো আয়াত এবং ছোট ছোট সূরা তৈরী করেছিল, যা বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে সংরক্ষিত আছে । কিন্তু ঐ বানোয়াট কুরআনের মধ্যে শুধু সুর এবং ছন্দ ছিল । তাতে নৈতিকতা বা আধ্যাত্মিকতার কোন পরশ ছিল না । রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও মুসায়লামার বেশ যোগ্যতা ছিল । তার প্রতিবেশী সাজ্জাহ তামীমিয়াও নবুওয়াত দাবি করে বসলে মুসায়লামা তাকে সহজেই বশীভূত করে ফেলে এবং সে নবৃওয়াতের দাবি পরিত্যাগ করে মুসায়লামার বান্ধবীতে পরিণত হয় । মুসায়লামা নিহত হওয়ার পর সাজ্জাহ ইসলাম গ্রহণ করে । কথিত আছে যে, একজন পাকাপোক্ত মুসলামান হিসাবেই সে দীর্ঘদিন পর্যন্ত জীবিত ছিল ।

বিদায় হজ্বের পর ইয়ামনে আসওয়াদ উনসীও নবুওতের দাবি করে । ঐ সরদারের নাম ছিল যুলখেমার আ'হবালাহ বিন কা'ব । মাজাহ্ গোত্র তার সাহায্যে এগিয়ে আসে এবং সাথে সাথে নাজরানের মধ্যেও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় । সে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বেশ কয়েকজন প্রচারককে তার এলাকা থেকে বের করে দেয় । কোন কোন প্রচারককে হত্যাও করে । রসূলুল্লাহ (সা) ঐ এলাকার সরদারদেরকে তাদের সম্মিলিত শক্তি দিয়ে ঐ বিদ্রোহ দমনের প্রচেষ্টা চালাতে নির্দেশ দেন ।

জাদুমন্ত্র ও টোটকা চিকিৎসার মাধ্যমে আসওয়াদ তার এলাকার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে জানা যায় । সে ইরানী বংশোদ্ভূত একটি নারীর প্রেমে পড়ে তার স্বামীকে হত্যা করে । রমণীটি ছিল খুবই দৃঢ়চেতা । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ওফাতের দু-একদিন পূর্বে তারই সহায়তায় আসওয়াদকে হত্যা করা হয় । অতঃপর আসওয়াদের সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে খুব একটা সময় লাগে নি । হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে এই গণ্ডগোলেরও পরিসমাপ্তি ঘটে । আসওয়াদ হাদ্রামাউত থেকে তায়েফ পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল ।

মুসায়লামা, সাজ্জাহ ও আসওয়াদ উনসীর দেখাদেখি তুলায়হা বিন খুভায়লা আসদীও নবুওতের দাবি করে বসে । সেও রসূলুল্লাহর কাছে পত্র লিখে ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব কামনা করে । সে মদীনার উত্তরাঞ্চলের গাতফান গোত্রের সরদার ছিল । আবূ বকর সিদ্দীকের খিলাফতকালে খালিদ বিন ওয়ালীদ এই ফিতনা দমনের জন্য আদিষ্ট হন এবং সহজেই তা দমন করেন । হাওযাই বিন আলীর পর সম্ভবত আম্মানের লাকীত বিন মালিক আযদী যুত্তাজ উপাধির অধিকারী হয় । তার অন্তরেও নবী হওয়ার বাসনা জাগে ।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবনকালে ইসলামবিমুখতা ও বিদ্রোহ দমনের জন্য তাঁর প্রচারক ও ইসলামে দৃঢ় বিশ্বাসী গোত্রীয় সরদারদের কাছে ১৯টি পত্র লিখেছিলেন । এর মধ্যে তাঁর ওফাত হয় এবং বিদ্রোহের মধ্যে আরো তীব্রতা দেখা দেয় । হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) উসামা বিন যায়দ (রা)-এর নেতৃত্বে একটি বিরাট বাহিনী ফিলিস্তিনে প্রেরণ করেন । এটাও বলা হয়ে থাকে যে, প্রথম প্রথম কিছুসংখ্যক লুটেরা নিজ নিজ শক্তি প্রদর্শনে উৎসাহিত হয়ে উঠে এবং ধারণা হতে থাকে যে, ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় রাজধানী মদীনা যেন তারা ঘেরাও করে ফেলেছে ।

বিদ্রোহের বেশ কয়েকটি কারণ ছিল । কিছু লোক ইসলামবিমুখ হয়ে পড়েছিল । কোন কোন জায়গায় নবুওতের দাবি উঠেছিল । কোন কোন জায়গায় মদীনাকে কেন্দ্র হিসাবে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি উঠেছিল এবং সেখানে যাকাত প্রেরণ করতে অস্বীকার করা হয়েছিল । নবম হিজরীর শেষভাগে আরবের সর্বত্র যাকাত আদায়কারী কর্মচারী নিয়োগ করা হয় এবং একাদশ হিজরীর প্রারম্ভে রসূলুল্লাহ (সা) পরলোকগমন করেন । আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকালে যে রকম দৃঢ়তা ও দ্রুততার সাথে এই ফিতনা প্রতিরোধ করা হয়েছিল তা বিশ্ব ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে ।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের রাজনৈতিক দলীলসমূহ

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের রাজনৈতিক দলীলসমূহ


রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রাদি সংগ্রহ করার আগ্রহ সাহাবীদের যুগেই পরিলক্ষিত হয় । কোন যুগের রাজনীতিকে বুঝতে হলে তখনকার সরকারী দলীল-পত্রাদির উপর নির্ভর করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত । যদিও কালের ঘাত-প্রতিঘাতে রসূল-যুগের অনেক দলীল-পত্র হারিয়ে গেছে তবুও একথা ঠিক যে, রসূল সম্পর্কিত যে সমস্ত দলীল-পত্র পাওয়া যায়, অতীত যুগের কোন নবী কিংবা রাজা-বাদশাহ সম্পর্কিত দলীল পত্রাদির সংখ্যাল্পতার দিকে তাকালে এখনো সেগুলোকে নজীর-বিহীন বলা চলে ।

১৩৬০ হিজরীতে "মাজমু'আতুল ওসায়েকিস সিয়াসিয়াহ্ ফিল 'আহ্দেন নবভী ওয়াল খিলাফতির রাশিদাহ” শীর্ষক যে গ্রন্থটি মিসর থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাতে রসূল-যুগের প্রায় পৌনে তিন শ' চিঠি সংকলিত হয়েছে । অতঃপর তাতে খিলাফতে রাশিদা সম্পর্কিত কিছু উপাদানও সংগৃহীত হয়েছে । এই গ্রন্থ প্রকাশের পর রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আরো প্রায় দেড় দু'ডজন পত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে । নতুনভাবে মুদ্রণের ব্যবস্থা করা হলে এই অতিরিক্ত পত্রগুলো থেকেও সাধারণ পাঠকবৃন্দ সরাসরি উপকৃত হতে পারবেন ।

এই গ্রন্থের আগে-পরের পাতাগুলোতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যে সমস্ত পত্রের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর জন্যও মাজমু'আতুল ওসায়েকিস সিয়াসিয়াহ'কে সাহায্য পুস্তক হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে । কেননা তাতে এই চিঠিগুলোর উল্লেখই শুধু নয়, কোন্ পত্র কোন্ গ্রন্থে পাওয়া যায়, কোন্ পত্রের বচনের মধ্যে মতবিরোধ আছে, কে কি রকম বচন বর্ণনা করেছেন, এমনকি বচনের শব্দার্থ এবং টীকা-টিপ্পনীও বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে । আর সেইসাথে এই চিঠিপত্রাদি উদ্ধার ও সংরক্ষণে পূর্ববর্তীদের কার কি পরিমাণ অবদান রয়েছে তাও অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়েছে ।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 আন্তর্জাতিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বৈবাহিক সম্পর্ক ও অন্যান্য ব্যবস্থা

📄 আন্তর্জাতিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বৈবাহিক সম্পর্ক ও অন্যান্য ব্যবস্থা


পটভূমি
এখন থেকে হাজার-দেড় হাজার বছর পূর্বে যখন শিক্ষার এত চর্চা ছিল না, এক দেশের সাথে অন্য দেশের লোকদের মেলামেশার এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না, এক দেশ অন্য দেশের এত মুখাপেক্ষী ছিল না, তখন ধর্মের বিভিন্নতা, দেশ, জাতি, বংশ গোত্র, সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগত বিভিন্নতা, মানুষের মধ্যে মারামারি, রেষারেষি এমন কি খুনাখুনিয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াত। সকল ধর্ম এবং বর্তমান বিজ্ঞানও একথার উপর একমত যে, ভূ-গোলকের সমগ্র মানুষ একই পিতার বংশধর। আদম সন্তানরা আত্মরক্ষার জন্য গোষ্ঠীবদ্ধ হয়েছে, জীবন যাপনের প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় কেন্দ্রেীভূত হয়েছে এবং এই গোষ্ঠী ও কেন্দ্রকে উপলক্ষ করে ভাইয়ের রক্তে ভাইয়ের হাত রঞ্জিত ও কলুষিত হয়েছে। গ্রীক এবং ল্যাটিনের মত প্রাচীন সভ্য জাতির ভাষায় (সম্ভবত সংস্কৃত ভাষায়ও) শত্রুকে বুঝাতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয় তার প্রকৃত অর্থ হলো 'অপরিচিত'। এ দ্বারা মানুষ সম্পর্কিত ঐ সমস্ত জাতির চিন্তাধারার একটি মোটামুটি পরিচয় পাওয়া যায়। অতএব যে সমস্ত জাতি সংস্কৃতি সভ্যতায় পশ্চাদপদ, যে সমস্ত জাতি অসভ্য বর্বর তাদের চিন্তাধারা কি হবে তা তো জানা কথা।

অনুরূপ পরিস্থিতি এবং সত্য কথা বলতে গেলে, এর চাইতেও মারাত্মক পরিস্থিতি আরব উপদ্বীপে বিদ্যমান ছিল। আরব-অনারবের মৌলিক বৈষম্যের কথা ছেড়ে দিলেও আদনানী এবং কাহতানীদের পরস্পর ভেদাভেদ এত মারাত্মক রূপ ধারণ করেছিল যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগগুলোতেও এর প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল। অতঃপর আদনানীদের মধ্যেও মাযর-রাবী'আর বৈষম্য কিছু কম মারাত্মক ছিল না। এক্ষেত্রে কুরায়শদের ব্যাপারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা যেমন আরবের অন্য লোকদের চাইতে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করত তেমনি তাদের মধ্যে বনী হাশিম ও বনী উমাইয়ার পরস্পর রেষারেষি ও শত্রুতার কথাও ছিল সর্বজনবিদিত। এছাড়াও আরবদের মধ্যে হাযরী (শহরের অধিবাসী) বাদভী (বেদুঈন) ভেদ-বৈষম্যের লড়াইও ছিল তুঙ্গে। তারা একে অপরকে নীচ এবং হেয় জ্ঞান করত। আমার হিজায সফরকালে এক প্রশ্নের উত্তরে, এই সেদিনও জনৈক বাদভী অনেকটা নাক সিঁটকিয়ে আমাকে বলেছিলেন, 'বাদভী কি কখনো মুরগী পালে? এগুলো তো হাযরীদের কাজ।'

আজকালও জার্মান-ফরাসী, রুশ-পর্তুগীজ প্রভৃতি জাতি-বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। তবে শোচনীয়তা ও ধ্বংসকারিতার দিক বিবেচনা করলে ইসলাম-পূর্ব যুগে আরব গোত্রসমূহের মধ্যে যে ভেদ-বৈষম্য ও রেষারেষি বিদ্যমান ছিল তার অনুপাতে বর্তমান এই বৈষম্য কিছুই নয়। নিজেদেরকে সবচাইতে উৎকৃষ্ট মনে করার হীন মনোবৃত্তি আরবদেরকে পরস্পর থেকে এতই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল যে তাদের বিয়ে-শাদী প্রধানত নিজেদের গোত্রের মধ্যেই হত। গোত্রগত শত্রুতার কারণে এক গোত্র অন্য গোত্রকে নিজেদের সমকক্ষ মনে করত না। তাছাড়া কথায় কথায় রাত দিন সংঘর্ষ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ তাদের মধ্যে লেগেই ছিল। সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবিকা-উপাদান হ্রাস এই রেষারেষি ও হানাহানিকে এক চরম বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

ইসলামের আবির্ভাব
অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম উপরিউক্ত হীনমন্যতা ও গোত্রগত রেষারেষির বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করে। ইসলামের মতে, আরব অনারবের আল্লাহ্ একই। যিনি আদনানীদের আল্লাহ, তিনি কাহতানীদেরও আল্লাহ্। মানুষ মাত্রই একই পিতা আদমের সন্তান। তাদের মধ্যে বর্ণ, ভাষা এবং দেশের বিভিন্নতা থাকলেও সৃষ্টিগতভাবে তারা সকলেই সমান। তাদের মধ্যে কে উৎকৃষ্ট আর কে নিকৃষ্ট তা তাদের কার্যকলাপ এবং আচার-আচরণ দ্বারাই বিচার্য।

আল্লাহর একত্বের বিষয়টি বাহ্যত ধর্মের সাথে সম্পর্কিত হলেও ইসলামী সমাজে এর সামাজিক গুরুত্ব মোটেই কম নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির আল্লাহ 'এক' না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত না মানব জাতির সাম্যের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপিত হবে, আর না মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকার এবং ন্যায় ও পুণ্যের কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবে।

ইসলামী শিক্ষা আরবদের সাধারণ আচার-আচরণ ও চিন্তা-ভাবনার বিপরীত ছিল। যেভাবে অত্যন্ত ন্যায় বিচারভিত্তিক একটি সিদ্ধান্তের ততক্ষণ পর্যন্ত কোন মূল্য নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তা কার্যকরী হয় না—ঠিক সেভাবে সুন্দরতম শিক্ষা এবং আকায়িদ-বিশ্বাসেরও কোন মূল্য নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তা কাজে পরিণত করা না হয়। রসূল-জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তখন শিক্ষা ও শিক্ষার বাস্তবায়ন চলত একই সাথে। তখন দর্শন ও বাস্তবায়নের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না, স্বভাব ধর্ম ও সুস্থ বিবেক বুদ্ধি অনুযায়ী মানুষের মধ্যে সখ্যতা ও বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করা হত।

রসূলুল্লাহর কর্মপন্থা
ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্য হাসিলের সর্বপ্রথম উপাদান ছিল তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব প্রতিষ্ঠা। যদি সকলের আল্লাহ্ এক হন, তিনি যদি ন্যায়বান ও সকলের উপর সমভাবে করুণাশীল হন, তাহলে তো মানুষের মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে কোন ভেদ-বৈষম্য থাকে না। সমগ্র মানব জাতির মধ্যে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী ও প্রকৃত আনুগত্য সৃষ্টির জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) যে বিখ্যাত বাণীটি প্রদান করেছিলেন তা হলো, "মানুষ মাত্রই আদম থেকে সৃষ্ট আর খোদ আদম মাটি থেকে সৃষ্ট।" কুরআনেও এই নীতি ঘোষণা করা হয়েছে যে, পরস্পর পরিচিতির জন্যই মানুষের মধ্যে জাতি ও গোত্রের সৃষ্টি। আর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় শুধু 'তাকওয়া' (আল্লাহভীরুতা ও পুণ্যকর্ম) দ্বারা। অন্য আর এক জায়গায় বলা হয়েছে, মানুষের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা তাদের সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমার নিদর্শন ছাড়া কিছু নয়।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে যেহেতু দর্শন ও বাস্তবতার মধ্যে কোন প্রভেদ ছিল না, তাই আমরা দেখতে পাই, তখন দাস-প্রভু, কুরায়শী-অকুরায়শী, আরব-অনারব, হাবশী-রোমী-ইরানী সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই সারিতে দণ্ডায়মান এবং তাদের মধ্যে প্রাচীন মূর্খতাভিত্তিক ভেদ-বৈষম্যের লেশ মাত্র নেই। রসূলুল্লাহর এই রাজনীতিকে, তাঁর খলীফারাও পরিপূর্ণভাবে ও বিশ্বস্ততার সাথে বহাল রাখেন। ফলে মুসলমানদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে এই বিশ্বাস গড়ে উঠে যে, ইসলাম এবং সাম্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত; এর একটি ছাড়া অন্যটির কথা ভাবাও যায় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভারত হচ্ছে সবচাইতে পশ্চাদপদ দেশ। আর বর্ণ-বৈষম্যের ক্ষেত্রে সম্ভবত মালাবার হচ্ছে এর মধ্যে সবচাইতে পশ্চাদপদ এলাকা। এখানে প্রচুর সংখ্যক অদ্ভুত (অস্পৃশ্য জাতির লোক) অমানুষিক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে বসবাস করছে। এই এলাকায় মুসলমানদের সাথে অপেক্ষাকৃত ভাল ব্যবহার করা হয়। যেকোন অপরিচিত পর্যটক আজো এই অবস্থা দেখে বিস্মিত হবে যে, সকাল বেলা যে অদ্ভুত শুধু আপন (নিম্নবংশে) জন্মের কারণে লাঞ্ছনা ও অপমানের কারণে পরিণত হয়, বিকাল বেলা ইসলাম গ্রহণের কারণে, সেই অদ্ভুতের সাথেই হিন্দুরা সেই ধরনেরই (ভাল) ব্যবহার করে, যে ধরনের ব্যবহার তারা শুধুমাত্র একজন মুসলমানের সাথে করে থাকে। কাশ্মীরে এখন কোন অদ্ভুতের অস্তিত্ব নেই। কারণ-স্বরূপ বলা হয়ে থাকে যে, এখানকার উচ্চ জাতের দাবিদার হিন্দুরাই নাক সিঁটকিয়ে ওখানকার অদ্ভুতদেরকে মুসলমানদের ভাগে ঠেলে দিয়েছে।

রসূলুল্লাহ্ (সা) সকল মুসলমানের জন্য একই 'কিবলা' নির্ধারণ করেন, সবার উপর একই আইন চালু করেন এবং একই নেতৃত্বের অধীনে জড়ো করেন সবাইকে। তিনি এরূপ করেন নি যে, উচ্চ জাতের উপাসনালয় পৃথক হবে, অন্তত উপাসনালয়ে তাদের বসার জায়গাটা পৃথক হবে, তাদের পুণ্যের ভাগটাও বড় হবে, নীচ জাতের লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করলে কোন শাস্তিই তাদের হবে না, আর হলেও হবে শুধু 'নামকেওয়াস্তে' ।

এক কিবলা হওয়ার কারণে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমান এটা হৃদয়ঙ্গম করতে বাধ্য যে, তারা সকলেই একই কেন্দ্রের অধীন এবং তাদের নিজেদের তৈরী মসজিদ মোটেই কোন পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়। ইসলাম প্রবর্তিত আইনের সাম্যের কারণে সেই বিস্ময়কর পরিস্থিতির উদ্ভব মোটেই হয় নি যে, কাশ্মীরের ব্রাহ্মণ মাদ্রাজ কিংবা বাংলাদেশের ব্রাহ্মণের সাথে আত্মীয়তা করতে পারবে, কিন্তু একসাথে বসে পানাহার করতে পারবে না। সমগ্র মানবজাতিকে আদি ও অকৃত্রিম একত্বের দিকে টেনে আনার ক্ষেত্রে 'আইনে সমতা'র চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। এসবও কিন্তু বৃথা যেত যদি না একই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হত এবং দীন ও দুনিয়াকে একই কেন্দ্রে একত্রিত করা হত। যদি কথাকে (শিক্ষাকে) কাজে রূপায়িত করার ব্যবস্থা গৃহীত না হত এবং আধ্যাত্মিক ও পার্থিব বিষয়সমূহকে একত্রে সুবিন্যস্ত করা না হত তাহলে ইসলাম আরো দু'দশটি দার্শনিক চিন্তাধারার মত শুধু কল্পনা জগতেই রয়ে যেত। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর শিক্ষাকে কার্যকরী করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ধনীদের পাকড়াও করেন এবং তাদেরকে তাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অবশ্যদেয় কর হিসাবে কেন্দ্রে পাঠাতে বাধ্য করেন। এ থেকে উট বাঁধার একটি রশি পরিমাণ দ্রব্যও কেউ দিতে অস্বীকার করলে সেটাকে 'প্রকাশ্য বিদ্রোহ' মনে করা হত। রসূলের সুযোগ্য খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) তাঁর খিলাফতকালে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা বিদ্রোহীদেরকে সহজে সে কথাটি বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়, যা অনেক প্রেরণা দান সত্ত্বেও তারা বুঝে উঠতে পারে নি।

যাকাত অমান্যকারী বিত্তশালীদের বিরুদ্ধে ঘোষিত এই যুদ্ধের গুরুত্ব ঐতিহাসিকরা এখনো যথাযথভাবে বুঝে উঠতে পারেন নি। প্রকৃতপক্ষে এটা মানব জাতির অর্থনৈতিক জগতে একটা বিপ্লব ছাড়া কিছু নয়। এই বিপ্লব একদিকে সম্পদ বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে নাগরিকত্বের দায়-দায়িত্ব যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছে।

আরবদের সাথে সম্পর্ক
আরবে সাধারণত গোত্রীয় শাসন প্রচলিত ছিল। তাই সেখানে বন্ধুত্ব ও মিত্রতা স্থাপনের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার প্রভাবই ছিল সবচাইতে বেশি। প্রকৃতপক্ষে এই সম্পর্ক যতই দুর্বল হোক না কেন, অন্য যেকোন সম্পর্কের চাইতে অন্তত তখনকার মত তা ছিল অপেক্ষাকৃত সুদৃঢ় ও শক্তিশালী। মদীনায় হিজরতের পর একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো। একটি নগররাষ্ট্র হিসাবে এর সূচনা হলেও মাত্র দশ বছরের মধ্যে তা সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপ, দক্ষিণ ইরাক এবং ফিলিস্তিন পর্যন্ত দশ বারো লক্ষ বর্গমাইল ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ঐ যুগে রসূলুল্লাহ্ (সা) যে সমস্ত বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। স্ত্রীদের সংখ্যাধিক্য সর্বাবস্থায় নিন্দনীয় নয়। আর সেই অবস্থায় তো নয়ই, যখন এর একমাত্র উদ্দেশ্য রমণাভিলাষ না হয়। রসূলসহধর্মিণীরা এক জায়গার বা এক অঞ্চলের ছিলেন না। মোটামুটিভাবে তাঁরা যেন আরবের প্রত্যেকটি বড় গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। যেহেতু তাঁরা সাধারণভাবে অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারের ছিলেন, তাই ঐ সমস্ত বিবাহের প্রভাবও ছিল সুদূরপ্রসারী।

হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা এবং হযরত মায়মুনা বিনতে হারিস ছিলেন ইয়ামনের প্রভাবশালী গোত্র আমির বিন সা'সা'র মেয়ে। বিশেষ করে হযরত মায়মুনার ছিল আট নয়টি বোন এবং তাদের প্রত্যেকেরই বিবাহ হয়েছিল অত্যন্ত বড় বড় পরিবারে। বিখ্যাত গ্রন্থকার মুহাম্মদ বিন হাবিব (মৃত্যু ২৪৫ হি)-এর মতে অভিজাত জামাতার সংখ্যাধিক্যের ক্ষেত্রে হিন্দা বিনতে আ'ওফ ছিলেন আরবের মধ্যে অতুলনীয়া। তিনি ছিলেন হযরত মায়মুনা এবং তাঁর বোনদের মা।

হযরত জুভায়রিয়া ছিলেন বনী মুসতালাক গোত্রের সরদারের মেয়ে। এটি ছিল একটি শক্তিশালী এবং বিরাট গোত্র। মক্কা এবং মদীনার মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছিল এদের বাস। এই বৈবাহিক সম্বন্ধের কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমা মক্কার দিকে প্রায় এক শ' মাইল বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। 'কান্দাহ' ছিল দক্ষিণ আরবের একটি রাজকীয় পরিবার। ইসলাম-পূর্ব যুগে এই পরিবারের রাজ্যসীমা দক্ষিণ ইরাক পর্যন্ত আরবের পূর্বাংশে বিস্তার লাভ করেছিল। ইসলাম-উত্তর যুগেও এদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা) এই গোত্রের সাথেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিলাব, কালব, বনী সালীম প্রভৃতি গোত্রের সাথেও তিনি অনুরূপ সম্বন্ধ স্থাপন করেছিলেন। এ ব্যাপারে কিতাবুল মুহাব্বার এবং তাবাকাতে ইবনে সা'দে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। হযরত খাদীজা (রা) ছিলেন বনী আসাদ বিন আবদুল উয্যা গোত্রের মেয়ে। আর হযরত সাওদা (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত হাফসা (রা), হযরত উম্মে সালমা (রা), হযরত উম্মে হাবীবা (রা), হযরত যায়নাব বিনতে জুহশ (রা) ছিলেন যথাক্রমে বনী আমির বিন লুই, বনী তামীম, বনী আ'দী, বনী মাখযুম, বনী উমাইয়া ও বনী আসাদ বিন খুযায়মা গোত্রের মেয়ে। মক্কায় এই সমস্ত পরিবারের চাইতে সম্ভ্রান্ত পরিবার আর ছিল না। হযরত মারিয়া কিবতিয়া (রা) ছিলেন মিসরের মেয়ে। তিনি প্রথমে খ্রীস্টান ছিলেন। হযরত সুফিয়া (রা) ছিলেন খায়বরের য়াহুদী পরিবারের মেয়ে। রসূলুল্লাহ্ (সা) উপরিউক্ত বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ থেকে প্রাচীন যুগের গোত্রগত রেষারেষি দূর করার সামগ্রিক চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং তা বাস্তবে ফলপ্রসূও হয়েছিল।

অনারবদের সাথে সম্পর্ক
রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর কর্মপদ্ধতিতে যে মানসিক দিকটির প্রতি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন তা হলো, কাউকে খারাপ বললে সে ভাল না হয়ে বরং আরো জেদী হয়ে উঠে। অতএব তাকে সংশোধন করার জন্য প্রথমে তার প্রশংসা করে অতঃপর তার ভ্রান্তিগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। য়াহূদী, খ্রীস্টান এবং আরবের মুশরিকদের সম্পর্কেও রসূলুল্লাহ্র শিক্ষার সারকথা এই ছিল যে, হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ), হযরত ইবরাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন আল্লাহর নবী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী বংশধররা মনগড়া পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে এঁদের মূল শিক্ষা বিগড়ে দিয়েছে। কুরআন আহলে কিতাবদের সম্বোধন করে বলছেঃ "হে কিতাবিগণ, আসো তোমরা সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কারো ইবাদত করি না, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক করি না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করে না।"

কুরআন আরো বলছে, "ওয়ালি কুল্লি কাউমিল হাদ।" অর্থাৎ প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যই আছে পথ-প্রদর্শক। শেষ পর্যন্ত বলছেঃ "যারা বিশ্বাস করে, যারা য়াহূদী হয়েছে এবং খ্রীস্টান ও সাবেইন (তারকার পূজারী)-যারাই আল্লাহ্ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।" রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাবি ছিল যে, ইসলাম একটি মৌলিক ধর্ম। হযরত আদম থেকে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত সকল নবীই ইসলাম প্রচারের জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। ইসলাম চিরাচরিত মৌল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সমস্ত সত্যকে একজন বিবেক সম্পন্ন মানুষ না মেনে পারে না। আর মৌলিক ওয়াজিবাত (অবশ্য কর্তব্য) কার্যাদি ছাড়া অন্যান্য কার্য মুবাহ অর্থাৎ একজন মানুষ সেগুলো ইচ্ছা হলে করতে পারে, ইচ্ছা না হলে নাও করতে পারে। ধর্মের মৌলিক ভিত্তিসমূহ এবং এ সমস্ত কার্য, যা মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেগুলো বর্ণনা করার পর ইসলাম ধর্ম তথা জীবন ব্যবস্থাকে সর্বসাধারণের জন্য অতি সহজ এবং বোধগম্য করে পেশ করেছে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যে এক মধুর সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছে।

অন্য কথায় বলতে গেলে, সকল ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পরস্পর সম্মান ও ভক্তি শ্রদ্ধার ভাব গড়ে তোলা এবং শাখা-প্রশাখা ছেড়ে যুক্তিসম্মত মৌল ভিত্তির উপর সকলকে সমবেত হওয়ার দিকেই ইসলাম দাওয়াত দিয়েছে। একমাত্র এই মৌলিক ধর্মের মাধ্যমেই দ্বীন ও দুনিয়ার প্রকৃত মঙ্গল ও শান্তি লাভ সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম মানুষকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের এবংুঈন) ভেদ-বৈষম্যের লড়াইও ছিল তুঙ্গে। তারা একে অপরকে নীচ এবং হেয় জ্ঞান করত। আমার হিজায সফরকালে এক প্রশ্নের উত্তরে, এই সেদিনও জনৈক বাদভী অনেকটা নাক সিঁটকিয়ে আমাকে বলেছিলেন, 'বাদভী কি কখনো মুরগী পালে? এগুলো তো হাযরীদের কাজ।'

আজকালও জার্মান-ফরাসী, রুশ-পর্তুগীজ প্রভৃতি জাতি-বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। তবে শোচনীয়তা ও ধ্বংসকারিতার দিক বিবেচনা করলে ইসলাম-পূর্ব যুগে আরব গোত্রসমূহের মধ্যে যে ভেদ-বৈষম্য ও রেষারেষি বিদ্যমান ছিল তার অনুপাতে বর্তমান এই বৈষম্য কিছুই নয়। নিজেদেরকে সবচাইতে উৎকৃষ্ট মনে করার হীন মনোবৃত্তি আরবদেরকে পরস্পর থেকে এতই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল যে তাদের বিয়ে-শাদী প্রধানত নিজেদের গোত্রের মধ্যেই হত। গোত্রগত শত্রুতার কারণে এক গোত্র অন্য গোত্রকে নিজেদের সমকক্ষ মনে করত না। তাছাড়া কথায় কথায় রাত দিন সংঘর্ষ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ তাদের মধ্যে লেগেই ছিল। সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবিকা-উপাদান হ্রাস এই রেষারেষি ও হানাহানিকে এক চরম বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

ইসলামের আবির্ভাব
অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম উপরিউক্ত হীনমন্যতা ও গোত্রগত রেষারেষির বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করে। ইসলামের মতে, আরব অনারবের আল্লাহ্ একই। যিনি আদনানীদের আল্লাহ, তিনি কাহতানীদেরও আল্লাহ্। মানুষ মাত্রই একই পিতা আদমের সন্তান। তাদের মধ্যে বর্ণ, ভাষা এবং দেশের বিভিন্নতা থাকলেও সৃষ্টিগতভাবে তারা সকলেই সমান। তাদের মধ্যে কে উৎকৃষ্ট আর কে নিকৃষ্ট তা তাদের কার্যকলাপ এবং আচার-আচরণ দ্বারাই বিচার্য।

আল্লাহর একত্বের বিষয়টি বাহ্যত ধর্মের সাথে সম্পর্কিত হলেও ইসলামী সমাজে এর সামাজিক গুরুত্ব মোটেই কম নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির আল্লাহ 'এক' না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত না মানব জাতির সাম্যের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপিত হবে, আর না মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকার এবং ন্যায় ও পুণ্যের কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবে।

ইসলামী শিক্ষা আরবদের সাধারণ আচার-আচরণ ও চিন্তা-ভাবনার বিপরীত ছিল। যেভাবে অত্যন্ত ন্যায় বিচারভিত্তিক একটি সিদ্ধান্তের ততক্ষণ পর্যন্ত কোন মূল্য নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তা কার্যকরী হয় না— ঠিক সেভাবে সুন্দরতম শিক্ষা এবং আকায়িদ-বিশ্বাসেরও কোন মূল্য নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তা কাজে পরিণত করা না হয়। রসূল-জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তখন শিক্ষা ও শিক্ষার বাস্তবায়ন চলত একই সাথে। তখন দর্শন ও বাস্তবায়নের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না, স্বভাব ধর্ম ও সুস্থ বিবেক বুদ্ধি অনুযায়ী মানুষের মধ্যে সখ্যতা ও বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করা হত।

রসূলুল্লাহর কর্মপন্থা
ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্য হাসিলের সর্বপ্রথম উপাদান ছিল তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব প্রতিষ্ঠা। যদি সকলের আল্লাহ্ এক হন, তিনি যদি ন্যায়বান ও সকলের উপর সমভাবে করুণাশীল হন, তাহলে তো মানুষের মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে কোন ভেদ-বৈষম্য থাকে না। সমগ্র মানব জাতির মধ্যে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী ও প্রকৃত আনুগত্য সষ্টির জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) যে বিখ্যাত বাণীটি প্রদান করেছিলেন তা হলো, "মানুষ মাত্রই আদম থেকে সৃষ্ট আর খোদ আদম মাটি থেকে সৃষ্ট।" কুরআনেও এই নীতি ঘোষণা করা হয়েছে যে, পরস্পর পরিচিতির জন্যই মানুষের মধ্যে জাতি ও গোত্রের সৃষ্টি। আর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় শুধু 'তাকওয়া' (আল্লাহভীরুতা ও পুণ্যকর্ম) দ্বারা। অন্য আর এক জায়গায় বলা হয়েছে, মানুষের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা তাদের সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমার নিদর্শন ছাড়া কিছু নয়।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে যেহেতু দর্শন ও বাস্তবতার মধ্যে কোন প্রভেদ ছিল না, তাই আমরা দেখতে পাই, তখন দাস-প্রভু, কুরায়শী-অকুরায়শী, আরব-অনারব, হাবশী-রোমী-ইরানী সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই সারিতে দণ্ডায়মান এবং তাদের মধ্যে প্রাচীন মূর্খতাভিত্তিক ভেদ-বৈষম্যের লেশ মাত্র নেই। রসূলুল্লাহর এই রাজনীতিকে, তাঁর খলীফারাও পরিপূর্ণভাবে ও বিশ্বস্ততার সাথে বহাল রাখেন। ফলে মুসলমানদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে এই বিশ্বাস গড়ে উঠে যে, ইসলাম এবং সাম্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত; এর একটি ছাড়া অন্যটির কথা ভাবাও যায় না।

রসূলুল্লাহ্ (সা) সকল মুসলমানের জন্য একই 'কিবলা' নির্ধারণ করেন, সবার উপর একই আইন চালু করেন এবং একই নেতৃত্বের অধীনে জড়ো করেন সবাইকে। তিনি এরূপ করেন নি যে, উচ্চ জাতের উপাসনালয় পৃথক হবে, অন্তত উপাসনালয়ে তাদের বসার জায়গাটা পৃথক হবে, তাদের পুণ্যের ভাগটাও বড় হবে, নীচ জাতের লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করলে কোন শাস্তিই তাদের হবে না, আর হলেও হবে শুধু 'নামকেওয়াস্তে'। এক কিবলা হওয়ার কারণে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমান এটা হৃদয়ঙ্গম করতে বাধ্য যে, তারা সকলেই একই কেন্দ্রের অধীন এবং তাদের নিজেদের তৈরী মসজিদ মোটেই কোন পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়। ইসলাম প্রবর্তিত আইনের সাম্যের কারণে সেই বিস্ময়কর পরিস্থিতির উদ্ভব মোটেই হয় নি যে, উচ্চবংশীয় ব্যক্তি নিম্নবংশীয় ব্যক্তির সাথে আত্মীয়তা করতে পারবে, কিন্তু একসাথে বসে পানাহার করতে পারবে না। সমগ্র মানবজাতিকে আদি ও অকৃত্রিম একত্বের দিকে টেনে আনার ক্ষেত্রে 'আইনে সমতা'র চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।

রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর শিক্ষাকে কার্যকরী করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ধনীদের পাকড়াও করেন এবং তাদেরকে তাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অবশ্যদেয় কর হিসাবে কেন্দ্রে পাঠাতে বাধ্য করেন। এ থেকে উট বাঁধার একটি রশি পরিমাণ দ্রব্যও কেউ দিতে অস্বীকার করলে সেটাকে 'প্রকাশ্য বিদ্রোহ' মনে করা হত। রসূলের সুযোগ্য খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) তাঁর খিলাফতকালে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা বিদ্রোহীদেরকে সহজে সে কথাটি বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়, যা অনেক প্রেরণা দান সত্ত্বেও তারা বুঝে উঠতে পারে নি। প্রকৃতপক্ষে এটা মানব জাতির অর্থনৈতিক জগতে একটা বিপ্লব ছাড়া কিছু নয়। এই বিপ্লব একদিকে সম্পদ বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে নাগরিকত্বের দায়-দায়িত্ব যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছে।

আরবদের সাথে সম্পর্ক
আরবে সাধারণত গোত্রীয় শাসন প্রচলিত ছিল। তাই সেখানে বন্ধুত্ব ও মিত্রতা স্থাপনের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার প্রভাবই ছিল সবচাইতে বেশি। মদীনায় হিজরতের পর একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো। ঐ যুগে রসূলুল্লাহ্ (সা) যে সমস্ত বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। রসূল-সহধর্মিণীরা এক জায়গার বা এক অঞ্চলের ছিলেন না। মোটামুটিভাবে তাঁরা যেন আরবের প্রত্যেকটি বড় গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।

হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা এবং হযরত মায়মুনা বিনতে হারিস ছিলেন ইয়ামনের প্রভাবশালী গোত্র আমির বিন সা'সা'র মেয়ে। বিশেষ করে হযরত মায়মুনার ছিল আট নয়টি বোন এবং তাদের প্রত্যেকেরই বিবাহ হয়েছিল অত্যন্ত বড় বড় পরিবারে। হযরত জুভায়রিয়া ছিলেন বনী মুসতালাক গোত্রের সরদারের মেয়ে। এই বৈবাহিক সম্বন্ধের কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমা মক্কার দিকে প্রায় এক শ' মাইল বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। 'কান্দাহ' ছিল দক্ষিণ আরবের একটি রাজকীয় পরিবার। রসূলুল্লাহ্ (সা) এই গোত্রের সাথেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিলাব, কালব, বনী সালীম প্রভৃতি গোত্রের সাথেও তিনি অনুরূপ সম্বন্ধ স্থাপন করেছিলেন।

হযরত খাদীজা (রা) ছিলেন বনী আসাদ বিন আবদুল উয্যা গোত্রের মেয়ে। আর হযরত সাওদা (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত হাফসা (রা), হযরত উম্মে সালমা (রা), হযরত উম্মে হাবীবা (রা), হযরত যায়নাব বিনতে জুহশ (রা) ছিলেন যথাক্রমে বনী আমির বিন লুই, বনী তামীম, বনী 'আ'দী, বনী মাখযুম, বনী উমাইয়া ও বনী আসাদ বিন খুযায়মা গোত্রের মেয়ে। মক্কায় এই সমস্ত পরিবারের চাইতে সম্ভ্রান্ত পরিবার আর ছিল না। হযরত মারিয়া কিবতিয়া (রা) ছিলেন মিসরের মেয়ে। তিনি প্রথমে খ্রীস্টান ছিলেন। হযরত সুফিয়া (রা) ছিলেন খায়বরের য়াহূদী পরিবারের মেয়ে। রসূলুল্লাহ্ (সা) উপরিউক্ত বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ থেকে প্রাচীন যুগের গোত্রগত রেষারেষি দূর করার সামগ্রিক চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং তা বাস্তবে ফলপ্রসূও হয়েছিল।

অনারবদের সাথে সম্পর্ক
রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর কর্মপদ্ধতিতে যে মানসিক দিকটির প্রতি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন তা হলো, কাউকে খারাপ বললে সে ভাল না হয়ে বরং আরো জেদী হয়ে উঠে। অতএব তাকে সংশোধন করার জন্য প্রথমে তার প্রশংসা করে অতঃপর তার ভ্রান্তিগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। য়াহূদী, খ্রীস্টান এবং আরবের মুশরিকদের সম্পর্কেও রসূলুল্লাহ্র শিক্ষার সারকথা এই ছিল যে, হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ), হযরত ইবরাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন আল্লাহর নবী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী বংশধররা মনগড়া পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে এঁদের মূল শিক্ষা বিগড়ে দিয়েছে। কুরআন আহলে কিতাবদের সম্বোধন করে বলছেঃ হে কিতাবিগণ, আসো তোমরা সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কারো ইবাদত করি না, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক করি না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করে না। কুরআন আরো বলছে, "ওয়ালি কুল্লি কাউমিল হাদ।” অর্থাৎ প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যই আছে পথ-প্রদর্শক।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাবি ছিল যে, ইসলাম একটি মৌলিক ধর্ম। হযরত আদম থেকে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত সকল নবীই ইসলাম প্রচারের জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। ইসলাম চিরাচরিত মৌল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। ধর্মের মৌলিক ভিত্তিসমূহ এবং এ সমস্ত কার্য, যা মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেগুলো বর্ণনা করার পর ইসলাম ধর্ম তথা জীবন ব্যবস্থাকে সর্বসাধারণের জন্য অতি সহজ এবং বোধগম্য করে পেশ করেছে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দাদের এক মধুর সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছে।

পরিশিষ্ট
রসূলুল্লাহ্ (সা) হুনায়ন এবং তায়েফ অভিযান শেষে যখন জাআ'ররানা নামক স্থানে গনীমতের মাল বন্টন করছিলেন, তখন হাওয়াযিন গোত্র এসে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাদের নারী ও শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন জানায়। রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর নিজের ও বনী হাশিম গোত্রের ভাগ বিনা প্রতিদানে ফিরিয়ে দেন। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সকল সাহাবীই স্বেচ্ছায় তাদের নিজ নিজ যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেন। সম্ভবত কিছুসংখ্যক অবিবাহিত যুবতী বিজয়ীদের সাথে থেকে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে করে এবং যার ভাগে পড়েছিল তার সাথেই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়। বাকি সব স্ত্রীলোক এবং ছেলেমেয়ে হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদলের সাথে আনন্দচিত্তে নিজ নিজ বাসভূমিতে ফিরে যায়।

টিকাঃ
১. হযরত সাওদা (রা) এবং হযরত উম্মে হাবীবা (রা)-এর স্বামীদ্বয় হাবশে হিজরত করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে উভয়েই মুরতাদ (ইসলামবিমুখ) হয়ে যান। কিন্তু হযরত সাওদা (রা) ও হযরত উম্মে হাবীবা (রা) ইসলামের উপর সুদৃঢ় থাকেন। ইসলামের প্রতি ঐ দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার কারণেই সম্ভবত তাঁরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সহধর্মিণী তথা 'মুসলমানদের মা' হতে পেরেছিলেন।
২. তাঁর এক বোনের নাম সীরীন অথবা শীরীন ছিল বলে জানা যায়। যদি সত্যি সত্যি তাঁরা সহোদরা হয়ে থাকেন তাহলে তাঁরা মূলত ইরানী তথা পার্শী ছিলেন। ইরান কর্তৃক মিসর আক্রমণের সময় তাঁরা সেখানে আসেন এবং ইরানের পরাজয়ের পরও সেখানে থেকে যান এবং পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px