📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে আরব-ইরান সম্পর্ক

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে আরব-ইরান সম্পর্ক


আরব উপদ্বীপের বেশির ভাগই মরু অঞ্চল। তাই সেখানকার অধিবাসীরা তাদের খাদ্যের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই অন্য দেশের মুখাপেক্ষী ছিল। তারা জীবিকার সন্ধানে ইরাক ও ইরানে যাতায়াত করত। সর্বপ্রথম 'ত্বাই' সম্প্রদায়ের লোক বসবাসের জন্য ইরানের দিকে যাত্রা করেছিল। ইরাক অঞ্চলে দেশত্যাগী আরবদের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে তারা সেখানে 'হীরা' নামক একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ইরানের বাদশারা বেদুঈন আরবদের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হীরাকে একটি নিরপেক্ষ বাফার স্টেট হিসাবে ব্যবহার করত।

ইরানের শাহানশাহরা হীরার শাসকদের প্রতি আস্থা রাখলেও কালক্রমে তাদের মধ্যে ঔদ্ধত্য দেখা দেয়। হীরাকে ইরানের একটি প্রদেশে পরিণত করতে গিয়ে তারা আরবদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এই তিক্ততা চরম আকার ধারণ করে 'যী-কার' যুদ্ধের সময় যেখানে আরবরা ইরানী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। রসূলুল্লাহ (সা) তখন মদীনায় তাঁর দাওয়াতের কাজ শুরু করেছিলেন। যখন পারস্যের নির্যাতিত আরব নেতা মাসান্না শায়বানী মুসলিম বাহিনীর সাহায্য চাইলেন তখন থেকেই মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে ইরানের সরাসরি সংঘাতের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

আরবের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ যেমন বাহরাইন, আম্মান এবং ইয়ামনও তখন ইরানী প্রভাবাধীন ছিল। আম্মানের আরব সরদার হাওযা বিন আলীকে ইরানের কিসরা একটি রাজমুকুট উপহার দিয়েছিলেন। তায়েফের দুর্গটিও কিসরার পাঠানো প্রকৌশলীর সাহায্যে নির্মিত হয়েছিল। রসূলুল্লাহ (সা) মক্কী জীবনেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে একদিন কিসরা ও কায়সারের সম্পদ মুসলমানদের অধিকারে আসবে।

৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া চুক্তির পর রসূলুল্লাহ (সা) প্রতিবেশী শাসকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে শুরু করেন। তিনি ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেজের কাছে আবদুল্লাহ বিন হুযাফার মাধ্যমে একটি পত্র পাঠান। পত্রে খসরুকে 'ইরানের নেতা' সম্বোধন করা হয়েছিল যা অহংকারী খসরুর পছন্দ হয়নি। সে পুরো পত্রটি না পড়েই ছিঁড়ে ফেলে। রসূলুল্লাহ (সা) এ খবর শুনে বদদোয়া করে বলেছিলেন— আল্লাহ তা'আলাও তার সাম্রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে দিন।

খসরু পারভেজ ইয়ামনের গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা)-কে গ্রেফতার করে মাদায়েনে পাঠাতে। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সা) বাযানের দূতদের বলেন যে আল্লাহর নির্দেশে খসরু পারভেজ স্বীয় পুত্রের হাতে নিহত হয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় খসরুর মৃত্যু তারিখ নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও কায়সার হিরাক্লিয়াসের সমসাময়িক পত্র থেকে জানা যায় যে ২৭ ফেব্রুয়ারি ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে (৬ষ্ঠ হিজরীর মধ্য রমযান) খসরু পারভেজ নিহত হন। রসূলুল্লাহর এই ভবিষ্যদ্বাণী ফলে বাযান এবং ইয়ামনের অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করে।

খসরুর মৃত্যুর পর পারস্য সাম্রাজ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। রসূলুল্লাহ (সা) এই সুযোগে পারস্যের অধীনস্থ আরব প্রদেশগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করেন। বাহরাইনের মুনযার বিন সাভা এবং আম্মানের জীফার ও আবদ রসূলুল্লাহর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা মাদায়েনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে মদীনার আনুগত্য স্বীকার করে। রসূলুল্লাহ (সা) অত্যন্ত সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পারস্যের হাত থেকে আরব উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রসূলুল্লাহর ওফাতের পর তাঁর সুযোগ্য খলীফা আবূ বকর সিদ্দীকের সময় পারস্য বিজয়ের চুড়ান্ত যাত্রা শুরু হয়।

টিকাঃ
১. তানবীহ, মাসউদী, পৃষ্ঠা ১৮৬।
২. কায়সার হিরাক্লিয়াসের যুদ্ধাভিযান সম্পর্কে জার্মান ভাষায় লিখিত গিরল্যাণ্ড-এর পুস্তক সবচাইতে নির্ভরযোগ্য।
৩. সীরাতে ইবনে হিশাম ও তারীখে তাবারীর বিভিন্ন বর্ণনা এবং 'আহদে নবভী কা নেযামে হুকমরানী' দ্রষ্টব্য।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগেই ইয়াহুদী

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগেই ইয়াহুদী


বর্তমান বিশ্বে রক্ত সম্পর্ক বা বংশের উপর ভিত্তি করে গঠিত জাতিসমূহের মধ্যে য়াহূদী একটি অতি প্রাচীন জাতি । এই জাতির একটি নিজস্ব সভ্যতা, নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে । যদি এদেরকে হযরত ইয়াকূব বিন ইসহাক বিন ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর বলে মেনে নেওয়া হয় তাহলে এরা নমরূদদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাবিল অর্থাৎ ইরাক থেকে কে'নান অর্থাৎ ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় এসেছিল । অতঃপর হযরত ইউসুফ (আ)-এর যুগে এরা মিসরে গমন করে ।

বলা হয়ে থাকে যে, ঐ যুগে সিরীয় বংশোদ্ভূত একটি গোত্র ফিরাউনের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল । এ কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে হযরত ইউসুফ (আ)-এর 'আযীয-ই-মিসর' অর্থাৎ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী মন্ত্রী হতে কোনরূপ বেগ পেতে হয় নি । এর কয়েক পুরুষ পরই মিসরীয় বংশোদ্ভূত একটি গোত্র ফিরাউনের আসনে অধিষ্ঠিত হয় । ফলে পূর্বেকার ফিরাউনদের অনুগ্রহপ্রাপ্তরা ধীরে ধীরে পরবর্তীদের রোষানলে পতিত হয় ।

ফিরাউন রা'মাসীস-এর যুগে য়াহূদীরা হযরত মূসা (আ)-এর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধভাবে মিসর ছেড়ে 'আরদে মুকাদ্দাসের' (ফিলিস্তিন)-এর দিকে যাত্রা করে । সুহুফে মূসা অর্থাৎ তাওরীতের বাকি অংশ অন্যান্য নবীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে বলে প্রকাশ । তাওরীত থেকেই জানা যায় যে, য়াহূদীরা 'আরদে মুকাদ্দাসের' প্রাচীন অধিবাসীদের (যারা আরবের আমালিকা বংশোদ্ভূত ছিল) উপর এরূপ অমানুষিক অত্যাচার করে যে, তাতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে । তারা স্তন্যপানকারী শিশুদেরকেও রেহাই দেয়নি । এই হিংস্র স্বভাবের কারণেই য়াহূদীরা বারবার গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং য়াহূদী বংশোদ্ভূত অসংখ্য নবী ও সংস্কারক তাদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন ।

বাদশাহ তালুতের পর হযরত দাউদ (আ) এবং হযরত সুলায়মান (আ) ফিলিস্তিনে 'ইলাহী রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন । অতঃপর গৃহযুদ্ধের কারণে য়াহূদী রাষ্ট্র দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং কখনো ইরাক পূর্ব থেকে এবং কখনো সিরিয়া উত্তর থেকে এই সমস্ত জনবসতির উপর আক্রমণ চালাতে থাকে । ফলে য়াহূদীরা ফিলিস্তিন পরিত্যাগ করে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে । অতঃপর ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তন এবং সেখানে বসবাস করার জন্য তাদের উপর্যুপরি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে ।

নবুওতের পূর্বে
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবকালে আরবের প্রতিটি অঞ্চলেই য়াহুদীরা বসবাস করত । কোথাও তাদের বসতি ছিল ঘন, আবার কোথাও ছিন্নভিন্ন । সংক্ষেপে বলতে গেলে তাদের বসতির একটি শিকল ইলা (আকাবা) মাক'না, খায়বর, ওয়াদিউল কু'রা, তীমার, ফিদক, মদীনা, ইয়াসরিব, তায়েফ এবং জারশ থেকে নিয়ে ইয়ামান, আম্মান এবং বাহরাইন পর্যন্ত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত ছিল ।

মক্কায় য়াহূদীদের কমই দেখা যেত । অবশ্য মক্কার আশেপাশে ঘন ঘন যে সমস্ত মেলা (যেমন-উকায, মিনা, মাজনা, যুলমাজায প্রভৃতি) বসত সেগুলোতে অর্থ উপার্জনের জন্য তারা বিভিন্ন প্রকারের অভিনব কৌশল অবলম্বন করত । ভবিষ্যত বক্তা, জ্যোতিষী ইত্যাদি থেকে আরম্ভ করে সাধারণ মানুষেররও মন জয়ের জন্য তারা রঙ-বেরঙের উপাদান সরবরাহ করত । শিক্ষিত (আহলে কিতাব) হওয়ার কারণে তারা ঐ এলাকার বেদুঈনদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানের পাত্র ছিল ।

প্রাচ্য প্রতীচ্যের সর্বত্রই এখন একথা স্বীকৃত যে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবের প্রারম্ভিক যুগে আহলে কিতাব (য়াহূদী খ্রীস্টান) একজন মহান ব্যক্তিত্ব তথা শেষ সান্ত্বনাদানকারীর অপেক্ষায় ছিল । কিন্তু রসূল-জীবন অধ্যয়নকারীদের সামনে এক্ষেত্রে এমন অদ্ভুত বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়, যার সমন্বয় সাধন মোটেই সহজ নয় । বৈপরিত্যটি হলো এই যে, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবকালে মদীনার য়াহূদীরা একদিকে তাদের প্রতিবেশী আরবদেরকে এই মর্মে হুমকি দিতে থাকে যে, এখনই প্রতিশ্রুত মসীহের আবির্ভাব হবে এবং তারা তাঁর সাহায্যে শত্রুদের মুণ্ডপাত করবে এবং অন্যদিকে এমন সব ঘটনা অহরহ ঘটতে থাকে যাতে য়াহূদীদেরকে ঐ প্রতিশ্রুত মসীহেরই হত্যার ষড়যন্ত্রে দিবারাত্রি লিপ্ত থাকতে দেখা যায় । যেমন, রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর দুধ-মা হালিমার কোলে চড়ে যখন একটি মেলায় যান তখন একজন য়াহূদী জ্যোতিষী তাঁকে দেখেই চীৎকার করে উঠে এবং উচ্চস্বরে বলতে থাকে, 'য়াহূদীরা, তোমরা এই শিশুকে অবিলম্বে হত্যা কর, কেননা সে তোমাদের সর্বনাশ করবে ।' রসূলুল্লাহ্ (সা) আপন কৈশোরে পিতৃব্য আবূ তালিবের সাথে একটি বণিকদলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যখন ফিলিস্তিন যান তখন সেখানকার একজন ঈসায়ী রাহিব (ধর্মগুরু) আবূ তালিবকে পরামর্শ দেন, 'এই ছেলেকে নিয়ে আর অগ্রসর হয়ো না । কেননা য়াহূদীরা এই ছেলের শত্রু । তারা কোনমতে জানতে পারলে একে তৎক্ষণাতই হত্যা করবে ।' ইতিহাসে এ ধরনের আরো অনেক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ।

ইসলাম প্রচারের সূচনায়
'সমগ্র বিশ্বের রহমত' হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে আল্লাহ্ তা'আলা সমগ্র মানব-জাতির জন্য কিয়ামত পর্যন্ত একজন 'উত্তম আদর্শ'রূপে প্রেরণ করেছিলেন । তাই তাঁকে অধীন রাখা হয়েছিল স্বাভাবিক কার্যকারণের । সমগ্র জ্বিন ও মানুষ তাঁর সম্বোধিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত দায়দায়িত্বের গণ্ডি ছিল তাঁর সীমাবদ্ধ । একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁকে তাঁর গোত্রের এবং তাঁর সাথে মেলামেশাকারীদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয় । অতঃপর নির্দেশ দেওয়া হয় গোপনীয়তা পরিত্যাগ করে সবাইকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার । মক্কী জীবনে মোটামুটিভাবে তাঁর ব্যক্তিগত যে দায়দায়িত্ব ছিল তা কুরআনের "لتنذر ام القرى ومن حولها" (যাতে তুমি ভয় দেখাও মক্কা এবং তার আশেপাশের লোকদেরকে) এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে । উল্লেখিত এলাকায় কি য়াহূদীরা বসবাস করত? আরব ঐতিহাসিকরা এর না-সূচক জওয়াব দিয়েছেন এবং কুরআন মজীদের আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যও তা-ই প্রমাণ করে ।

মদীনায় হিজরতের পূর্বে যে ৮৬টি সূরা নাযিল হয়েছে তার মধ্যে কোথাও য়াহূদীদেরকে সরাসরি সম্বোধন করে কিছু বলা হয়নি । 'ইয়া বানী ইসরাঈলা' (হে য়াহূদীগণ)-এই বাক্যটি অবতরণ অনুপাতে সর্বপ্রথম ৮৭নং সূরায় (সূরা বাকা'রা) পাওয়া যায়, যা হিজরতের পরে অবতীর্ণ সূরাগুলোর প্রাথমিক পর্যায়ভুক্ত । মক্কী যুগে 'ইয়া বানী আদম' (হে মানবজাতি) এবং 'ইয়া আইয়ুহান নাস' বাক্যই ব্যবহৃত হয়েছে ।

অবতরণের ধারাবাহিকতা স্মরণে রেখে যদি কিছুদিন কুরআন মজীদ অধ্যয়ন করা যায় তাহলে একথা প্রতিভাত হয়ে উঠে যে, সর্বপ্রথম আয়াত, যার মধ্যে য়াহূদীদের (পরোক্ষভাবে হলেও) উল্লেখ আছে তা হচ্ছে সূরা মুয্যাম্মিলের আয়াত :
انا ارسلنا اليكم رسولا شاهدا عليكم كما ارسلنا الى فرعون رسولا -
নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে তোমাদের সম্বন্ধে সাক্ষীস্বরূপ এক রসূল পাঠিয়েছি যেমন ফিরাউনের কাছে এক রসূল পাঠিয়েছিলাম । (৭৩:১৫)

এখানে য়াহূদী জাতির কোন উল্লেখ করা হয়নি, বরং তাদের শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মূসা (আ)-এর উল্লেখ করে তাঁর সাথে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর তুলনা করা হয়েছে । অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ফিরাউন রা'মাসীসকে পথ প্রদর্শনের জন্য একজন রসূল পাঠিয়েছিলেন এবং সে রসূলকে না মানার দরুন তাকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল । এভাবে তোমাদের (মক্কাবাসীদের) দিকেও আল্লাহ্ তা'আলা একজন রসূল পাঠিয়েছেন ।

অতঃপর সূরা আ'লা অবতীর্ণ হয় । তাতে বলা হয় :
والاخره خير وابقى - أن هذا لفي الصحف الأولى - صحফ ابرهيم وموسى -
অর্থাৎ পরকাল অতি উত্তম ও চিরস্থায়ী, নিশ্চয় একথা পূর্বের কিতাব সমূহেও অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম ও হযরত মূসা (আ)-এর কিতাব সমূহে আছে (৮৭:১৭-১৯) । অতঃপর য়াহুদীদের নয় বরং তাদের একটি নতুন শাখার অর্থাৎ খ্রীস্টানদের উল্লেখ (সূক্ষ্মভাবে) করা হয়েছে সূরা ইখলাসে । তাতে খ্রীস্টানদের মৌলিক বিশ্বাসসমূহকে রদ করা হয়েছে এই বলে যে, 'আল্লাহ্ তা'আলা কাউকেও জন্ম দেন না এবং তিনি নিজেও জন্ম নেন নি ।' কুরআন মজীদের সূরা বুরূজ, সূরা কা'ফ, সূরা ক'মর, সূরা সোয়াদ প্রভৃতিতে বারবার যে বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো, ফিরাউন এবং তার শোচনীয় পরিণামের কথা । সূরা ত্বীন-এর মধ্যে তুরে সিনীন (সিনাই পাহাড়)-এর শুধুমাত্র পরোক্ষ উল্লেখ রয়েছে ।

সূরা সোয়াদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নবীদের উল্লেখ রয়েছে । তাতে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আ), সুলায়মান (আ) এবং আইউব (আ) য়াহূদী বংশে প্রেরিত হয়েছেন এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে ও তেমনি একজন নবী ও রসূলরূপে প্রতিভাত হয়েছেন ।

মক্কী সূরাসমূহের মধ্যে বিস্তারিতভাবে এবং গুরুত্বের সাথে সর্বপ্রথম য়াহূদীদের উল্লেখ করা হয় সূরা আ'রাফে (এই সূরার ক্রমিক নম্বর গ্রন্থনার দিক দিয়ে ৭ এবং অবতীর্ণ হওয়ার দিক দিয়ে ৩৯) ।

এই সূরায় ফিরাউন থেকে মুক্তি এবং 'আরদে মুকাদ্দাসের' পথে হযরত মূসার তাওরীত লাভ প্রভৃতি বর্ণনা করার পর তাওরীত এবং ইঞ্জীলেও হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আগমন সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে । যেমন "মূসা তাঁর সম্প্রদায় হতে সত্তর জন লোককে আমার নির্ধারিত স্থানে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করলো । তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হলো তখন মূসা বললো, 'হে আমার প্রতিপালক, তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে । আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা যা করেছে সেজন্য কি তুমি আমাদের ধ্বংস করবে? এটা তো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দ্বারা তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর । তুমিই তো আমাদের অভিভাবক; সুতরাং আমাদের ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই তো শ্রেষ্ঠ ।

'আমাদের জন্য নির্ধারিত কর ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ, আমরা তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করেছি ।' আল্লাহ্ বললেন, আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতে ব্যাপ্ত; সুতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারিত করবো যারা সাবধান হয়, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে ।

যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক নিরক্ষর রসূলের-যার উল্লেখ তাওরীত ও ইঞ্জীলে-যা তাদের নিকট আছে-তাতে লিপিবদ্ধ পায়, যে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তু বৈধ করে ও অপবিত্র বস্তু অবৈধ করে এবং যে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের ভার হতে ও বন্ধন হতে যা তাদের উপর ছিল । সুতরাং যারা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাকে সম্মান করে এবং যে আলো তার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে তারাই সফলকাম ।

বল, 'হে মানুষ, আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসূল, যিনি আকাশ-মণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই; তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান; সুতরাং তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহর প্রতি ও তাঁর নিরক্ষর রসূলের প্রতি যে আল্লাহ্ ও তাঁর বাণীতে বিশ্বাস করে, এবং তোমরা তার অনুসরণ কর যাতে তোমরা পথ পাও ।

মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন দল রয়েছে যারা অন্যকে ন্যায়ভাবে পথ দেখায় ও ন্যায়বিচার করে (৭ : ১৫৫-৫৯) ।"

আমি এই আয়াতসমূহের 'শানে নুযুল' তাফসীর ও হাদীস গ্রন্থাদিতে পরিষ্কারভাবে পাই নি । তবে আমার মনে হয়, মক্কাবাসীরা যখন তায়েফ, ইয়ামন, মদীনা, খায়বর, ইরাক, সিরিয়া, মিসর প্রভৃতি দেশ সফর করত এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে মক্কার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি (নাবা-ই আযীম) শোনাত (অর্থাৎ বলত যে, তাদের শহরে এক ব্যক্তি আল্লাহর রসূল হওয়ার দাবি করছে) । তখন সেখানকার য়াহূদী এবং খ্রীস্টানরা এ ব্যাপারে তাদের বিভিন্নমুখী মতামত পেশ করত এবং মক্কাবাসীদেরকে বিভিন্ন নতুন প্রশ্ন শিখিয়ে দিত এবং কুরআনে যে সমস্ত প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে সেগুলোর জওয়াব বাৎলে দিত । সূরা আ'রাফে প্রথমে বিস্তারিতভাবে ধর্ম প্রচার এবং সৎপথ প্রদর্শনের মৌলিক দলীলাদি পেশ করা হয়েছে এই মর্মে যে, পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যেও নবী-রসূল এসেছেন । একদিকে নবীদের সমসাময়িক লোকেরা নাফরমানীর কারণে আল্লাহর শাস্তিতে পতিত হয়ে যেমন ধ্বংস হয়েছে অন্যদিকে তেমনি নবীদের অনুসারীদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যেও যখন নাফরমানী ফিরে এসেছে এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত শিক্ষার শেষ চিহ্নটুকু পর্যন্ত মুছে গেছে তখন তাদের মধ্যে আবার নতুনভাবে নবীর আবির্ভাব হয়েছে । অথবা ইতিপূর্বে যেখানে কোন নবী আসেননি তখন সেখানে নবী এসেছেন । এভাবে নূহ, হূদ, সালেহ, লুত এবং শূআ'ইব (আ)-এর বিবরণী দেওয়া হয়েছে । অতঃপর ফিরাউনের প্রতি হযরত মূসা (আ)-এর প্রেরিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে । অন্যান্য নবীর চাইতে মূসা (আ)-এর শিক্ষা সংরক্ষিত বলে মনে করা হত এবং তাঁর অনুসারী য়াহূদীরাও বর্তমান ছিল । এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠত যে, যদি তাওরীত মূসা (আ)-এর উপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাব হয়ে থাকে তাহলে কোন নতুন নবী এবং নতুন কিতাবের কি প্রয়োজন? যেসব লোক সৎপথ চায় তারা সবাই য়াহূদী হয়ে গেলেই তো পারে । অন্ততঃ মদীনার য়াহূদীরা তখন পর্যন্ত মোটামুটিভাবে ধর্ম প্রচার করত এবং তাদের ধর্মকে শুধুমাত্র বংশগত বেষ্টনী তথা বনী ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করত না । ঐ সময়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রত্যক্ষভাবে য়াহূদীদের সম্মুখীন হন নি । শুধু মক্কীবাসীদেরকে য়াহূদীদের শিখিয়ে দেওয়া প্রশ্নাদি তাঁর সামনে আসছিলো এবং তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও প্রয়োজন অনুযায়ী উত্থাপিত প্রশ্নাদির উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন । যেমন :
১. তিনি [মুহাম্মদ (সা)] বর্তমান নবী এবং ইঞ্জীলে তাঁর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে ।
২. মানুষের বুদ্ধিমত্তার ক্রমোন্নতির প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা'আলা তার সাবেক নির্দেশাবলী কিছুটা সংশোধন, কিছু কিছু বাধা-নিষেধ দূরীকরণ এবং শক্ত বোঝা অপসারণ করে নিজ কৃপায় মানুষের জীবন ধারণ পদ্ধতি অপেক্ষাকৃত সহজ ও সরল করতে চান ।
৩. পূর্ববর্তী নবীদের আগমন দেশভিত্তিক, জাতিভিত্তিক এবং কালভিত্তিক ছিল । এখন আল্লাহ্ তা'আলা এমন একজন নবী পাঠাতে চেয়েছেন যিনি হবেন সর্বদেশ, সর্বকাল এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য ।

এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের একটি অতি স্বল্প সংখ্যক লোকও যদি আজ পর্যন্ত সত্যিকার রাব্বানী শিক্ষার উপর কায়েম থাকে তাহলে তাদেরকেও কি নবাগত নবীর অনুসরণের জন্য অনুপ্রাণিত করা হবে? হ্যাঁ, করা হবে । কেননা পূর্ববর্তী সব ধর্মগ্রন্থেই একজন পরিষ্কার ভাষায় শেষ নবী, একজন শেষ সান্ত্বনাদাতার আগমনের কথা বলা হয়েছে । অতীতের সমস্ত ধর্মগ্রন্থেই হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর উল্লেখ আছে বলে কুরআনও দাবি করেছে - "إنه لفي زبر الأولين" সুদীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়া এবং নানা ঘটন-অঘটনে পতিত হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বেদসমূহের (চাই তা ইবরাহীম (আ) প্রাপ্ত সহীফা হোক কিংবা না হোক) মধ্যে একজন আবদুল্লাহ্ ও আমিনা-তনয়ের আগমনের সুসংবাদ আছে । গৌতম বুদ্ধও (চাই তিনি নবী হোন কিংবা না হোন) মরণকালে তাঁর অনুচরদেরকে একজন সম্মানিত নবীর আগমনের নির্দেশ দেন । তাওরীত এবং ইঞ্জীলে রসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমনের সুসংবাদ লিপিবদ্ধ ছিল বলে কুরআন দাবি করছে । গত চৌদ্দ শ' বছর ধরে মুসলিম জ্ঞানী ব্যক্তিরা এ বিষয়ের উপর অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা করে আসছেন । অতএব আমি এখানেই আলোচনার ইতি টানছি ।

তখন পর্যন্ত মক্কাবাসীরাই ছিল রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সম্বোধিত জন । অবশ্য হজ্ব উপলক্ষে আরব উপদ্বীপের অন্যান্য এলাকারও যে সমস্ত লোক বছরে একবার মক্কার অদূরে মিনা নামক স্থানে সমবেত হত এবং কয়েকদিন সেখানে অবস্থান করে ঈদ পালন করত, খুব সম্ভব তারাও শীঘ্রই সম্বোধিতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে । তবে তখন পর্যন্ত য়াহূদী এবং খ্রীস্টানরা সরাসরি রসূলুল্লাহর সামনে আসে নি বলা চলে । এ কারণে য়াহূদীদের উল্লেখ পরোক্ষভাবে এবং তৃতীয় পুরুষে করা হয়েছে । অবশ্য তাদের ধর্মের ভাল দিকটি অকপটে তুলে ধরা হয়েছে এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ যে আল্লাহ্ প্রদত্ত সে কথাও খোলাখুলিভাবে স্বীকার করা হয়েছে ।

২৭তম সূরায় (যা অবতীর্ণ হওয়ার দিক দিয়ে ৪৮তম) একটি নতুন ভঙ্গিতে বক্তব্য পেশ করা হয় । সূরার প্রথমে যেখানে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর অনুসারীদেরকে এই বলে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে যে, অবতীর্ণ কুরআন চরম বিজ্ঞ ও জ্ঞানী আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে আসছে, সেখানে সামান্য আগে বেড়ে বলা হচ্ছে যে, 'নিশ্চয়ই এই কুরআন বনী ইসরাইলের কাছে, তারা যে সকল বিষয়ে বিবাদ (মতানৈক্য) করে থাকে তার অধিকাংশই ঠিক ঠিক বলে দেয় (২৭ : ৭৬) ।' তাহলে কি কিছুসংখ্যক য়াহূদী প্রতিশ্রুত নবীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং বাকীরা তা অস্বীকার করেছিল? এক্ষেত্রে অনুমান করা ছাড়া গত্যন্তর নেই । তবে এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, অতঃপর কুরআন এবং রসূলুল্লাহ (সা)-এর দৃষ্টি য়াহূদীদের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল । কেননা এর পর যে দু'টি সূরা (সূরা কাসাস্ ও সূরা বনী ইসরাইল) অবতীর্ণ হয় তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হযরত মূসা (আ)-এর অবস্থা, তাঁর মাহাত্ম্য এবং উচ্চ মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে । বলা হয়েছে, 'আমি পূর্বতন যুগের লোকদের ধ্বংস করার পর অবশ্যই মূসা (আ)-কে কিতাব দিয়েছিলাম, যা মানুষের জন্য পরিষ্কার দলীল, সৎপথের জ্ঞান ও দয়াস্বরূপ, এই উদ্দেশ্যে যে, তারা এ থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে (২৮ : ৪৩) ।

বোঝা যাচ্ছে যে, এবার পরোক্ষভাবে হলেও য়াহূদীদের সাথে রসূলুল্লাহ (সা)-এর সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল এবং তারা (ইসলাম সম্পর্কে) মক্কার কুরায়শদের উত্থাপিত ওজর আপত্তি এবং তর্ক-বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে দিয়েছিল এবং তাওরীতের মধ্যে রসূলুল্লাহ্ (সা) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা অস্বীকার করছিল । কেননা এর পরই যে সূরা নাযিল হয় (১০ম সূরা) । তাতে মূসা এবং হারুন (আ)-এর বিস্তারিত বিবরণী (১০ : ৭৫) পেশ করার পর সমকালীন য়াহুদীদেরকে জেনে শুনে বিপরীত মত পোষণ এবং সত্যকে অস্বীকার করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে (১০ : ৯৩) । বলা হয়েছে, "আমি তোমার নিকট যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তোমার কোন সন্দেহ হয় তাহলে যারা তোমার আগে থেকে কিতাব পড়ে আসছে তাদের জিজ্ঞাসা কর (১০ : ৯৪) ।" এর দ্বারাও অনুমান করা হয় যে, এক অথবা একাধিক য়াহূদী ও খ্রীস্টান ইতিপূর্বে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল এবং তারা সমর্থন করে যাচ্ছিলো যে, তাওরীত ও ইঞ্জীলে যে প্রতিশ্রুত নবী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তিনি মুহাম্মদ (সা) ছাড়া আর কেউ নন । অতঃপর সূরা হুদ নাযিল হয় । তাতেও নবী (সা)-এর অভিযোগটির পুনরাবৃত্তি করা হয় (১১ : ১১০) ।

ইতিমধ্যে হযরত মূসা (আ)-র কিতাবকে 'আসমানী ওহী' বলে স্বীকার করার কারণে একটি নতুন প্রশ্ন দেখা দিচ্ছিল এবং কুরআন থেকে তার জওয়াব পাওয়া যাচ্ছিল । বিষয়টি হলো এই যে, য়াহূদীদের পবিত্র গ্রন্থে পূর্ববর্তী নবীদের অবস্থা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে । তবে এর মধ্যে কোন কোন নবীর কীর্তিকলাপ লজ্জাজনক এবং অপমানজনক বলেই প্রতীয়মান হয় । একদিকে কুরআন প্রায় প্রতিদিন এসব নবীর নাম ও অবস্থা বিশদভাবে বর্ণনা করে তাঁদেরকে আদর্শ স্থানীয় ব্যক্তিত্ব এবং আল্লাহর সম্মানিত বান্দারূপে সর্বসমক্ষে পেশ করছিলো, বরং মুসলমানদেরকে এখনো ঐসব নবীর শিক্ষা এবং আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ দিচ্ছিলো ("بهدا هم قنده" তুমিও তাদের পথ অনুসরণ কর - ৬ : ১১) এবং অন্যদিকে এই সমস্ত নবীর অবস্থা আহলে কিতাব অর্থাৎ য়াহূদীদের কাছে যেভাবে লিপিবদ্ধ পাওয়া যেত, তাতে ঘৃণারই উদ্রেক হত ।

য়াহূদী জাতির মত য়াহুদীদের পবিত্র গ্রন্থও বারবার অত্যন্ত সংকটজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় । কখনো কখনো বিদেশী আক্রমণকারীরা য়াহূদী ধর্মকে নির্মূল করার অভিপ্রায়ে য়াহূদীদের ধর্মগ্রন্থকে ধ্বংস করে দেয় এবং কয়েক শতাব্দী পর শুধু ব্যক্তি বিশেষের স্মরণশক্তির উপর নির্ভর করে পরিপূর্ণভাবে তো নয়ই বরং আংশিকভাবে তা আবার লিপিবদ্ধ করা হয় । কখনো কখনো ধর্মনেতারা বিশুদ্ধ মন নিয়ে স্থানে স্থানে তা সংশোধন করেন, কখনো কখনো অনুন্নত প্রাচীন লিখন পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন করতে গিয়ে তাতে কিছু নতুন জিনিস ঢুকে পড়ে, দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হওয়ার ফলে কখনো কখনো হাতে লেখা গ্রন্থগুলোর কালি মুছে গিয়ে মূল বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হয়ে যায়—এ সমস্ত কথা এখন খোদ য়াহুদীরাও স্বীকার করেন । আমরা এখানে আরো একটি অতিরিক্ত বিষয়ের উল্লেখ করবো । আর তা হচ্ছে এই যে, হযরত সুলায়মান (আ)-এর মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে য়াহুদীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং এতে প্রত্যেকটি দল এবং একে অন্যকে দোষী সাব্যস্ত করছিল । ইয়ারুবাম নামীয় একজন দলপতি হযরত সুলায়মান (আ) কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত এবং তাঁর কট্টর শত্রু ছিল । ঘটনাচক্রে সে-ই হযরত সুলায়মান (আ)-এর পর য়াহূদীদের বারোটি গোষ্ঠীর মধ্য থেকে দশটি গোষ্ঠীরই বাদশারূপে স্বীকৃতি লাভ করে । অতঃপর সে আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মকে পরিত্যাগ করে পৌত্তলিকতার প্রচলন করে । হযরত সুলায়মান (আ)-এর পুত্র এবং তাঁর মনোনীত ব্যক্তি শুধুমাত্র দু'টি গোষ্ঠীর বাদশাহরূপে সিংহাসনে আরোহণ করেন । বাদশাহ ইয়ারুবাম অধিকৃত অঞ্চলসমূহের ধর্মগ্রন্থে হযরত সুলায়মান (আ) এবং তাঁর পিতা প্রমুখের অবস্থাদি কিরূপ বিকৃত করে লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে এবার তা চিন্তা করে দেখুন ।

এবার কুরআন মজীদ য়াহুদীদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিরাট অবদান হিসাবে পরিলক্ষিত হলো । তারা এর আলোকে তাদের নবীদের চরিত্র এবং আচার-আচরণকে মানব সৃষ্ট কালিমা থেকে মুক্ত করে আদি ও আসলরূপে পুনরায় কিতাবে লিপিবদ্ধ করলো । গত কয়েক শতাব্দী ধরে প্রকৃতিও কুরআনকে বারবার সাহায্য করেছে । বিভিন্ন স্থান থেকে তাওরীতের বিভিন্ন লিপিবদ্ধ অংশ ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রাথমিক যুগের লিপিবদ্ধ গ্রন্থের সাথে পরবর্তী যুগের গ্রন্থের তুলনামূলক বিচারে তাতে সংযোজিত অনেক ভুলভ্রান্তি এবং পরিবর্তন ও পরিবর্ধন লোক চোখে ধরা পড়েছে ।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন সময়ে য়াহুদীরা কয়েকজন আরব বেদুঈনের সৌজন্যে একটি পুরাতন ধ্বংসাবশেষ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তাওরীত সমূহের সর্বাধিক প্রাচীন কপিটি সংরক্ষিত অবস্থায় উদ্ধার করে । এটা খ্রীস্টীয় সনের সূচনাকালে কিংবা তার নিকটবর্তী কোন এক সময়ে লেখা হয়েছিল । এই কপিটির প্রথম পাঠকালেই বর্তমানকালে প্রচলিত তাওরীতের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করতে হয় । বিশ্বস্ততার সাথে এটা সম্পাদনা করলে পূর্ববর্তী নবীদের উপর আরোপিত আরো অনেক কলংকই অনায়াসে বিদূরিত হয়ে যাবে । য়াহূদীদের আভ্যন্তরীণ কোন্দল, জেনে শুনে সত্যকে অস্বীকার প্রভৃতি কথা সূরা 'হুদ' এরপর সূরা হামীম সিজদায়ও (৪১ : ৪৫) উল্লেখ করা হয়েছে । আর সূরা শূরা (৪২ : ১৫) এবং সূরা জাসিয়াও য়াহূদী নবীদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং য়াহুদীদের উপর আল্লাহ্ প্রদত্ত পুরস্কার এবং অবদানের কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে । সূরা জাসিয়ায় তো বলা হয়েছে, 'আর নিশ্চয় আমি বনী ইসরাইলকে কিতাব, হিকমত (বিচারের জ্ঞান) ও নবুওত দিয়েছিলাম, তাদেরকে ভাল ভাল জিনিস খেতে দিয়েছিলাম, সমুদয় সৃষ্টির উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে এসব (সত্য ধর্মের) বিষয়ে স্পষ্ট দলীল দিয়েছিলাম, কিন্তু তাদের কাছে জ্ঞান ভাণ্ডার আসার পরে তারাই নিজেদের মধ্যে শুধু পরস্পর হিংসাবশতঃ মতভেদ করেছে (৪৫ : ১৬) ।'

অতঃপর সূরা আহকা'ফ নাযিল হয় । তাতে 'এবং এর পূর্বে, মূসার কিতাবই মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক ও করুণাস্বরূপ ছিল এবং এই কিতাব কুরআন সত্যতা ঘোষণাকারী'—বলে তাওরীতের প্রশংসা করা হয় এবং কুরআনকে তাওরীতের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং সাহায্যকারীরূপে সর্বসমক্ষে উপস্থাপন করা হয় । সূরা আম্বিয়া-যা এর কিছু পরে নাযিল হয়েছিল—তাতে তাওরীতকে 'আল-ফুরকান' এবং যিয়া (জ্যোতি) আখ্যা দেওয়া হয় ।

কুরআনের প্রচারমূলক প্রয়োজনেই উপরিউক্ত কাহিনীমূলক সূরাসমূহের পর বিশুদ্ধ আকায়িদমূলক সূরা 'গাশিয়া' নাযিল হয়, যাতে মানুষকে কিয়ামতের (শেষ বিচারের) ভয় দেখানো হয় । অতঃপর পুনরায় কাহিনীমূলক (সূরা কাহফ) নাযিল হয় ।

প্রবাদবাক্য, গল্প কাহিনী প্রভৃতির সাহায্যে উপস্থাপিত যুক্তির মধ্যে তীক্ষ্ণ ধার ও সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয় সত্য, তবে এক্ষেত্রে একটি কথা স্মরণ রাখা উচিত যে, ঐ সমস্ত কাহিনীর গোলকধাঁধায় পতিত হওয়া, যেমন-কাহিনীতে বর্ণিত আসহাবে কাহফ কোন্ যুগের, তাদের সংখ্যা কত ছিল, তাদের নাম কি ছিল, তাদের গুহা কোথায় ছিল ইত্যাদি কুরআনের মূল লক্ষ্য তথা মানব জাতির পথ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কোন গুরুত্বই রাখে না তবে এক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞান থেকে উপকৃত হওয়ার মধ্যে বাধার কিছু নেই ।

উপরোক্ত বর্ণনার প্রেক্ষিতে নিম্নে মূসা (আ) ও আবে হায়াত (যেখানে মাছ জীবিত হয়ে গিয়েছিল)-এর কাহিনীর উপর কিঞ্চিৎ আলোচনা করা হচ্ছে ।

একটি কথা জেনে রাখা উচিত যে, এ ধরনের কাহিনী বিভিন্ন সভ্যতার ঐতিহ্যগত বিবরণীর মধ্যে পাওয়া যায় । এটা মূসা (আ)-এর হাজার বছর পরের ঘটনা হলেও মহান আলেকজান্ডার এবং তার বাবুর্চিকেও এ ধরনের একটি কাহিনীর দিকে সম্পর্কিত করা হয়ে থাকে । তবে একটি কাহিনী যা ইরাকে কিছু সংখ্যক ইটের উপর লিখিত অবস্থায় একটি লাইব্রেরীতে পাওয়া গেছে এবং যা হযরত মূসা (আ)-এর চাইতেও প্রাচীন যুগের বলে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে-তাতে গাল্ গামীশ্ নামীয় এক ব্যক্তিকে অবিকল এই ঘটনারই নায়ক বলা হয়েছে । উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, কুরআন মজীদে দু'জন পৃথক ব্যক্তিত্বের জন্য 'ইমরান' নাম ব্যবহার করা হয়েছে । এভাবে 'মূসা' নামও যদি দু'জন ব্যক্তির জন্য ব্যবহার করা হয় তবে তাতে কোন বাধা নেই । সূরা কাহফের মধ্যে মূসা (আ) এবং তার শিক্ষা-সফরের যে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে বাহ্যত এটা বোঝা যায় না যে, তিনি অবশ্যই অবশ্যই মূসা বিন ইমরান (হযরত হারুনের ভাই) হবেন । যদি বলা হয় যে, এই মূসা দ্বারা গালগা মূসা ('মীশ' এর অপভ্রংশ)-কে বোঝানো হয়েছে, তাহলেও আপত্তির কিছুই থাকবে না । (গালগা মীশের আবে হায়াত এবং মাছের পুনরায় জীবিত হওয়ার বিস্তারিত কাহিনী জার্মান সাময়িকী তাসাইত শারীফত ফিউরা সেভরিয়া লোগী, ১৯১১-তে দেখুন) তাওরীতের মধ্যেও মাছ জীবিত হওয়ার কোন কাহিনী মূসার দিকে সম্পর্কিত করা হয়নি ।

মক্কী সূরাগুলো সম্পর্কে আর একটি জিনিসের উল্লেখ করে এখানেই আলোচনার ইতি টানছি । সূরা আন'আম (বর্তমান পাঠক্রম অনুযায়ী ৬ষ্ঠ এবং নুযূলক্রম অনুযায়ী ৫৫তম), অতঃপর সূরা নহল (পাঠক্রম অনুযায়ী ১৬শ এবং নুযূলক্রম অনুযায়ী ৭০তম)-এর মধ্যে য়াহূদীদের খাদ্য সম্পর্কিত বাধা-নিষেধের উল্লেখ আছে । প্রথমে উল্লেখিত সূরায় বলা হয়েছে, 'আর য়াহুদীদের জন্য আমি নিষিদ্ধ করেছিলাম সমুদয় নখযুক্ত জন্তু, আরো নিষিদ্ধ করেছিলাম গরু, ভেড়া ও ছাগলের চর্বি-যা তাদের পিঠে বা নাড়ীভুঁড়ির মধ্যে থাকে কিংবা যা হাড়ের সঙ্গে জড়িত আছে তৎসমুদয় ব্যতীত । আমি তাদেরকে এই শাস্তি দিয়েছিলাম তাদের বিদ্রোহের কারণে; আমি অবশ্যই সত্যবাদী (৬ : ১৪৭)' এবং পরে উল্লেখিত সূরায় বলা হয়েছে "এবং আমি য়াহুদীদের উপর সেই জিনিস নিষিদ্ধ করেছিলাম, যা এর পূর্বে তোমার কাছে বর্ণনা করেছি । বস্তুত আমি তাদের উপর কোন অত্যাচার করিনি, বরং তারাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে (১৬ : ১১৮) ।" এর দ্বারা অনুমিত হয় যে, যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ সমস্ত অনাবশ্যকীয় বাধা-নিষেধকে রহিত ঘোষণা করেন [সে মুহাম্মদ (সা) তাদেরকে ভাল কাজের হুকুম দেয় এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে এবং তাদের জন্য পবিত্র জিনিসসমূহ বৈধ (হালাল) এবং অপবিত্র জিনিসসমূহ অবৈধ করে দেয় এবং তাদের উপর যে বোঝা ও বেড়িসমূহ ছিল তা নামিয়ে দেয় (৭ : ১৫৭) । তখন য়াহূদীরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ধিক্কার দিতে থাকে এবং তাঁর বিরুদ্ধে মক্কাবাসীদেরকে উত্তেজিত করতে থাকে । এমতাবস্থায় য়াহূদীদেরকে ধমকিয়ে দেওয়া সমীচীন মনে করা হয় । আর তাদেরকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, যে জিনিস প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে তা খারাপ জিনিস ছিল না । অতএব এই প্রেক্ষিতে নির্দোষ আরববাসী এবং মুসলমানদের জন্য আল্লাহ্-সৃষ্ট এই সমস্ত অবদানকে নিষিদ্ধ করার কোন কারণই থাকতে পারে না ।

সারসংক্ষেপ
মোটকথা, মক্কী যুগে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং য়াহূদীদের সম্পর্কের উপর বাইরের কোন সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না । তবে কুরআনের বর্ণনার আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য দ্বারা উপরোক্ত সম্পর্কের যে বিবরণী উপরে পেশ করা হয়েছে তাতে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ইসলাম এবং য়াহূদীদের মধ্যে মোটামুটি একটি সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল এবং দিন দিন তা ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল । মাদানী সূরার একটি আয়াত (অবশ্য বাইরের সাক্ষ্য) দ্বারা এও স্বীকৃত হয়েছে যে, এই আয়াত (মক্কী) দ্বারা এবং মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের সময় নাজ্জাশীর নামে লিখিত এবং হযরত জাফর ত্বাইয়া (রা)-এর হস্তে প্রদত্ত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চিঠির একটি কথা দ্বারা :
يا اهل الكتاب تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم ..... الآية
অর্থাৎ তুমি বলো, 'হে কিতাবিগণ, আসো সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, আমরা আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদত করি না, কোন কিছুতেই তাঁর শরীক করি না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া কাউকেই প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করে না ।' (৩ : ৬৪)

পরিষ্কার বোঝা যায় যে, মক্কী যুগেই য়াহূদী, খ্রীস্টান এবং সাধারণ আরববাসীদেরকে মিল্লাতে ইবরাহীমের পতাকাতলে একত্রিত করার ব্যাপক প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং মদীনায় হিজরতের পর তা ব্যাপকতা লাভ করে । আগামীতে আমরা এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো ।

টিকাঃ
১. রামাসীস তার উপাধি ছিল । তবে সিসোতারস নামে তিনি বিখ্যাত ছিলেন । আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ১৩৩০ অব্দে তিনি তাঁর পিতা সীতী (প্রথম)-এর স্থলাভিষিক্ত হন এবং খ্রীস্টপূর্ব ১২৬০ অব্দের কোন এক সময়ে পানিতে ডুবে মারা যান । তাঁর মমিকৃত লাশ ১৮৮১ খ্রীস্টাব্দে পাওয়া যায় ।
২. মুহম্মদ ও বিশ্বের পরিসমাপ্তি (ফরাসী ভাষায় লিখিত) ৪ কাসনোভা, পৃষ্ঠা ২৮ ; ইঞ্জীল : ইউহ্না ।
৩. কুরআনে (২০ : ৮০) এই শব্দ (অর্থাৎ 'হে বনী ইসরাঈল') রসূলুল্লাহর সম্বোধন হিসাবে নয় বরং ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে এসেছে ।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 হিজরত-উত্তরকালে ইয়াহুদীদের সাথে সম্পর্ক

📄 হিজরত-উত্তরকালে ইয়াহুদীদের সাথে সম্পর্ক


মদীনার প্রাচীনতম নাম ছিল ত্বাবত । অতঃপর একে বলা হত তাইবা । খুব সম্ভব এই তাইবারই একটি পৃথক পল্লীর নাম ছিল ইয়াসরিব-যার অবস্থান উহুদ পাহাড়ের দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল বলে জানা যায় । ইয়াসরিবে প্রচুর পানি এবং খেজুর গাছ ছিল । মদীনাও মোটামুটি একটি প্রাচীন নাম । খুব সম্ভব এটা য়াহুদীদের একটি কেন্দ্র ছিল । অবশ্য ইসলামের যুগে এটা 'মদীনাতুন্ নবী' নামে সমগ্র আরবে খ্যাতি লাভ করে ।

মদীনায় য়াহূদীরা বেশ প্রাচীনকাল থেকেই বসবাস করে আসছিল । তারা আরবী ভাষা দ্বারা এতটা প্রভাবান্বিত হয়ে গিয়েছিল যে, তাদের নাম ধাম এবং গৃহস্থালী ভাষাও বিশুদ্ধ আরবীতে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল । তাদের গোত্রভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছিল । তবে তাতে নিয়ম শৃঙখলা বিদ্যমান ছিল । 'বায়তুল মাদরাস' নামে তাদের একটি কেন্দ্র ছিল-যা একাধারে বিচারালয় এবং দারুল উফতা (ধর্মীয় বিধি-নিষেধ বর্ণনা কেন্দ্র) হিসেবে কাজ করত । য়াহূদীদের গোত্রভিত্তিক ধন-ভাণ্ডার ছিল । গোত্রের আকস্মিক প্রয়োজন মেটাবার জন্য চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে ঐ ভাণ্ডারে ধন-সম্পদ সংগৃহীত হত । মদীনার য়াহূদীদের সামগ্রিক ইতিহাস এবং মদীনায় তাদের ক্ষমতাসীন থাকাকালে ইয়ামনের জনৈক 'তুব্বা' (শাসক) কর্তৃক মদীনা আক্রমণ সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনার স্থান এটা নয় (অবশ্য এ সম্পর্কিত উপাদান এবং তথ্যাদিও বড় একটা পাওয়া যায় না) ; তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, মদীনার দক্ষিণাঞ্চলের ওয়াদিউল আকীকে'র একটি পাহাড়ের উপর এখনো (১৩৬৬ হি : ) ইয়ামনী স্টাইলে লিখিত বেশ কিছু শিলালিপি পাওয়া যায়, যেগুলোতে শুধুমাত্র মানুষের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে । এই শিলালিপিগুলো কবেকার তা অবশ্য জানা যায় নি ।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মদীনা আগমনের পূর্বেই সেখানকার অধিবাসীরা দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল । একভাগ ছিল পৌত্তলিক আরব এবং অপর ভাগ ছিল য়াহূদী । ওদের মধ্যে আবার পারস্পরিক রেষারেষি ছিল । ফলে কিছুসংখ্যক আরব ও কিছু সংখ্যক য়াহূদী গোত্র একদিকে এবং অবশিষ্ট আরব ও অবশিষ্ট য়াহূদী গোত্রগুলো অন্যদিকে পরস্পর মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল । এদের মধ্যে মাঝে মাঝে রক্তাক্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয় । এ ধরনেরই শেষ যুদ্ধ 'ইয়াওমে বুআস' নামে খ্যাত । এই যুদ্ধ এত দীর্ঘায়িত ও ব্যাপকতর হয়ে পড়েছিল যে, তাতে মক্কাবাসীদেরকেও স্বপক্ষে টানার প্রচেষ্টা চলতে থাকে এবং এমনি প্রচেষ্টারত একদল প্রতিনিধি 'আকাবা নামক স্থানে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাতে বায়'আত গ্রহণ করে ।

মদীনার কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য সবকিছুর উপরই য়াহূদীদের প্রাধান্য ছিল । মদীনার আরবরা যে কারণেই ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ুক না কেন, তাতে বাহ্যত য়াহূদীদের কোন আকর্ষণই ছিল না । তারা দৃঢ়ভাবে একটি প্রাচীন ধর্মের অনুসারী ছিল এবং তাতে তাদের ধর্মীয় ও পার্থিব চাহিদা মোটামুটিভাবে পূরণ হয়ে যাচ্ছিল । তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও প্রতিবেশীদের চাইতে ভাল ছিল । তাদের মধ্যে লেখাপড়ার প্রচলন ছিল-সর্বোপরি তারা একটি ঐশী গ্রন্থের অধিকারী ছিল । ফলে মানসিক দিক দিয়ে নিজেদেরকে নিরক্ষর আরবদের চাইতে শ্রেষ্ঠতর মনে করত ।

য়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থে একজন শেষ নবীর আগমনের সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, তবে আরবদের মধ্য থেকে সে নবীর আগমনের ব্যাপারে তাদের ধারণা কি ছিল তা বলা মুশকিল । অবশ্য এটা জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবকালে তারা অবশ্যই এ ধরনের একজন নবীর আগমন প্রতীক্ষায় ছিল, যেমন ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা আজ তা স্বীকার করতে শুরু করেছেন । অবশ্য য়াহূদীরা চাচ্ছিল যে, তাদেরই বংশে সেই নবীর আবির্ভাব হবে । 'তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহভীরু'— কুরআনের এই সাধারণ নিয়মটি নিশ্চয়ই তাদের কাছে পছন্দনীয় ছিল না । কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মদীনায় আগমন এবং সেখানে মক্কার আশ্রয়প্রার্থী মুহাজিরদের পুনর্বাসনের কাজ সম্পন্ন করার পর য়াহূদীদের প্রতি মনোনিবেশ করা তাঁর জন্য ছিল অপরিহার্য । মক্কী জীবনের শেষ দিকেই তাওরীতের ভবিষ্যদ্বাণীর উপর কুরআন গুরুত্ব আরোপ করতে শুরু করেছিল । আর মাদানী জীবন শুরু হওয়ার পর তো য়াহূদীদের সাথে মদীনার অলিতে গলিতে রাতদিন মুসলামানদের দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছিলো । তা ছাড়া রাজনৈতিক ও আত্মরক্ষামূলক প্রয়োজনাদি পূরণ করা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব ছিল না, যতক্ষণ না মদীনার এই শতকরা ৫০ জন অধিবাসীর সাথে মুসলমানরা এক সন্তোষজনক সমঝোতায় পৌঁছে ।

সীরাতে ইবনে হিশামের ৫৪৫ পৃষ্ঠায় বনি কায়নুকার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ্ (সা) সেই প্রাচীনতম পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায় । তিনি তাদেরকে শপথ প্রদানের মাধ্যমে জিজ্ঞাসা করছিলেন, 'তাওরীতে কি আমার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী নেই? যদি তোমরা শপথ করে বল যে, 'নেই' তাহলে তোমাদেরকে এ ব্যাপারে দোষারোপ করা হবে না ।' রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এই মর্মের একটি পত্রও পাওয়া যায়, যা তিনি খায়বরের য়াহূদীদের নামে লিখেছিলেন । ঐ পত্রে তাদেরকে আল্লাহর দানসমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এই বলে তাদেরকে তাওরীতের ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছিল যে, যদি সত্যি সত্যি তাওরীতে আমার উল্লেখ না থাকে, তাহলে এ ব্যাপারে তোমাদের কাছে আমার বিশেষ কোন দাবি নেই । খুব সম্ভব এই পত্র সে যুগেরই এবং কোন বিশেষ বাহকের মাধ্যমে তা খায়বরে পাঠানো হয়েছিল । অবশ্য ঐ পত্রের কোন ফল পরিলক্ষিত হয়নি । বরং পর পর এমন সব ঘটনা ঘটতে থাকে যেগুলোর কারণে য়াহূদী-মুসলিম সম্পর্ক দিন দিন তিক্ততর হতে থাকে ।

মদীনার নগররাষ্ট্রের সাহীফা বা সংবিধান কখন রচনা এবং জারী করা হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি । তবে ঐতিহাসিকরা এ ব্যাপারে একমত যে, সর্বপ্রথম বনী কায়নুকা গোত্রই এই শাসনতন্ত্রের বরখেলাফ কাজ করেছিল । ঘটনার বিস্তারিত বিবরণী ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই, তবে এতটুকু জানা যায় যে, তৃতীয় হিজরীর মাঝামাঝি সময়ে জাহিলিয়া যুগের কিছু বদ-অভ্যাসের কারণে ঐ য়াহূদীরা একজন মুসলিম মহিলাকে অপমান করে, যার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ কিছু খুনাখুনি হয় । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাজনীতি এই ছিল যে, তিনি ইসলাম প্রচারকে সবকিছুর উপর অগ্রাধিকার দিতেন; তাই য়াহুদীরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও তিনি তাদের কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঐ আহ্বানের কি প্রত্যুত্তর তারা দিয়েছিল, তা জানা যায় নি । তবে ঘটনা শেষ পর্যন্ত এতদূর গিয়ে গড়ায় যে, মুসলমানরা তাদের মহল্লাকে ঘেরাও করে ফেলে এবং ১৫ দিন পর তারা শর্তহীনভাবে বশ্যতা স্বীকার করলে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে তিন দিনের মধ্যে নিরাপদে মদীনা ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেন, তবে তাদের অস্ত্রশস্ত্র আটক করে ফেলা হয় । য়াহূদীদের মদীনা ত্যাগের ব্যাপারে দেখাশোনা করার জন্য, তাবারীর বর্ণনানুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা) একজন বিশেষ সেনাপতি নিয়োগ করেন । য়াহূদীদের সংখ্যা সাত শ' ছিল বলে জানা যায় । কথিত আছে যে, ওরা শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনে গিয়ে বসতি স্থাপন করে ।

এখানে দু'একটি কথার উল্লেখ প্রয়োজন । প্রথম কথা এই যে, পরবর্তী বছরগুলোতে মদীনায় বরাবরই বনী কায়নুকা' সম্প্রদায়ের য়াহূদীদের সন্ধান পাওয়া যায় (যেমন আগামীতে উল্লেখ করা হবে) । তাদের পুরো সম্প্রদায়কে দেশান্তরিত করা হয়েছিল, না সম্প্রদায়ের কিছু লোককে, তা অবশ্য জানা যায় নি । যদি তাদের পুরো সম্প্রদায়কে দেশান্তরিত করা হয়ে থাকে, তাহলে কি তাদের কিছুসংখ্যক লোককে ক্ষমা করে মদীনায় পুনরায় বসবাসের অনুমতি দেয়া হয়েছিল, যাতে তারা তাদের পেশা (স্বর্ণকারের কাজ) চালিয়ে যেতে পারে? এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, যেসব ঐতিহাসিক পরবর্তী সময়ে মদীনায় য়াহুদীরা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন, তাঁদের মতে, বনী কায়নূকা সম্প্রদায়ের য়াহূদীরা উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করেছিল (ইবনে সাদ) । ৫ম হিজরীতে যখন বনী কুরায়যা সম্প্রদায়ের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়-তখনও তারা মুসলমানদের সাহায্য করেছিল (মাবসূত, সারাখসী) । ৭ম হিজরীতে খায়বর যুদ্ধেও তারা মুসলমানদের সাহায্য করেছিল এবং তার প্রতিদানে পুরস্কার লাভ করেছিল (সুনানে বায়হাকী) ।

অতএব ঐতিহাসিকরা বারবার ভুল করে উপরোক্ত তথ্য পরিবেশন করেছেন, তেমন কথা বলা যায় না । সারকথা এই যে, বনী কায়নুকা সম্প্রদায়ের য়াহূদীরা কৃষিজীবী নয় বরং কারিগর ছিল । মদীনায় যে জায়গায় তাদের বসতি ছিল সেটা আজ ধু-ধু প্রান্তর । ইতিহাসে 'সোকে বনী কায়নূকা'র (বনী কায়নুকা'র বাজার)-এর উল্লেখ পাওয়া যায় । খুব সম্ভব এরা কারিগরি কাজ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যও করত । আনসারের কোন কোন সম্প্রদায়ের সাথে 'বনী কায়নুকা' সম্প্রদায়ের মৈত্রীচুক্তি ছিল । পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করার পর আনসাররা ঐ মৈত্রীচুক্তি থেকে সরে আসে এবং পুরাপুরিভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিছনে সারিবদ্ধ হয় । অবশ্য পূর্ববর্তী ঐ চুক্তির কারণেই তারা বনী কায়নূকা'র সাথে সদয় ব্যবহারের জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে সুপারিশ করে । মুসলমান এবং বনী কায়নূকা'র মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে অন্যান্য য়াহূদী নিরপেক্ষ থাকে । এর দ্বারা বোঝা যায় যে, সামগ্রিকভাবে য়াহূদীদের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কোন চুক্তি ছিল না বরং তিনি প্রত্যেকটি গোত্রের সাথে পৃথক পৃথকভাবে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন । মদীনা রাষ্ট্রের সংবিধানের চুক্তির মধ্যেও সামগ্রিকভাবে বনী কায়নূকা'র নাম নয় বরং পৃথক পৃথকভাবে তার প্রত্যেকটি শাখার নাম রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত জানা যায়নি যে, ঐ চুক্তিতে উল্লেখিত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে কোন্‌ন্টি বনী কায়নুকা, কোন্টি বনী নযীর এবং কোন্টি বনী কুরায়যা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল ।

য়াহূদীদের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা যতই থাক না কেন, অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সংঘর্ষ দেখা দিলে তারা নিজেদের লোকদের পক্ষ অবলম্বন করত । অতএব বনী কায়নূকা গোত্রের মদীনা থেকে বিতাড়নের পর অবশিষ্ট য়াহূদীরা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যদি মনে মনে ক্ষেপে গিয়ে থাকে, তাহলে তাতে বিষয়ের কিছু নেই । কিন্তু দু'বছর পর্যন্ত তাদের সম্পর্কে কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায় না । ধারণা করা হয় যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের মধ্যে প্রচার কার্য চালিয়েছিলেন, সাধারণ মুসলমানদের সাথেও তাদের আলাপ আলোচনা ও তর্কবিতর্ক হয়েছিল এবং সামান্য কয়েকজন ছাড়া কোন য়াহূদীই শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেনি ।

হিজরতের পর অবতীর্ণ সূরাগুলোর মধ্যে সূরা বাকারাকেই সর্বপ্রথম সূরা মনে করা হয়, এর মধ্যে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বনী ইসরাইলের কাহিনী রয়েছে এবং ঐ সমস্ত তর্কবিতর্কের উল্লেখ রয়েছে যা মুসলমান ও য়াহুদীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল । য়াহুদীদের উপর একের পর এক আল্লাহর যে সমস্ত নিয়ামত এসেছিল, সূরা বাকারায় সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে । এই সূরার মধ্যে য়াহুদীদের মন জয়ের জন্য বিভিন্ন টেকনিক (কৌশল) অবলম্বন করা হয়েছে । একই সূরায় তাদের সম্পর্কে দু'দুবার পরিষ্কার ভাষায় স্বীকার করা হয়েছে, "আমি সমস্ত জগতের উপর তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন" (২ : ৪৭; ২ : ১২২) , তাদের ধর্মীয় গ্রন্থাদিতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আগমন সম্পর্কিত যে সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, তা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের সকল নবীকে মুসলমানদেরও নবী বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, এমন কি এও বলা চলে যে, তাদেরকে এমন একটি বুনিয়াদী ধর্মের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যার ভিত্তি সামান্য কয়েকটি বিশ্বাসের উপর স্থাপিত [যেমন বলা হয়েছে, "যারা ঈমান এনেছে, যারা য়াহূদী, নাসারা এবং সাবিয়ী-তাদের যে কেউ আল্লাহ্ ও আখিরাতে ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে তাদের জন্য তাদের প্রভুর নিকট পুরস্কার রয়েছে । তাদের ভয়ের বা শোকের কোন কারণ নেই (২ : ৬২) " এবং "ঈমানদারগণ য়াহূদী, সাবিয়ীন এবং খ্রীস্টান যে কেহ আল্লাহ্ ও আখিরাতে ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা কোন কষ্ট পাবে না (২ : ৬৯) ।" ] । কিন্তু য়াহূদীরা ইসলাম গ্রহণ করেনি । আর এত কিছু সত্ত্বেও দৃঢ়তার জীবন্ত মূর্তি রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সম্পর্কে মোটেই নিরাশ হন নি ।

ইতিমধ্যে বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে মুসলমানরা কা'বাকে তাদের কিবলা করে নিয়েছিল । এর ফলেও মুসলমানদের প্রতি য়াহুদীদের বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে থাকবে । বনী কায়নূকা'র ঘটনার কয়েক মাস পরই ওহ্রদ যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং তাতে মুসলমানরা কুরায়শদের হাতে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । আর ইসলামী রাষ্ট্র শেষ হয় হয় পর্যায়ে পৌঁছেও যেন কোন মতে টিকে যায় । এ ব্যাপারে য়াহূদীদের অবদান কি ছিল তা বলা মুশকিল ; তবে ইবনে কাসীর এবং অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থ থেকে এটা অবশ্য জানা যায় যে, কাব বিন আল আশরাফ নামীয় জনৈক য়াহূদী (বনী নযীর গোত্রের সাথে যার মায়ের রক্ত-সম্পর্ক ছিল) গোপনীয়ভাবে কুরায়শদেরকে মুসলমানদের উপর আক্রমণ পরিচালনার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলো এবং এ ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য প্রদানের নিশ্চিত আশ্বাস দিচ্ছিলো । বনী কায়নূকা'র ঘটনার পর সুসংঘটিত ইসলামী গোয়েন্দা সংস্থা এ ঘটনাটি জানতে পারে এবং উক্ত ষড়যন্ত্র সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অবহিত করে । মুসলিম ঐতিহাসিকরা নিঃসংকোচে স্বীকার করেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রেরিত কিছুসংখ্যক গেরিলা যোদ্ধা ঐ বিশ্বাসঘাতককে দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করে দেয় ।

কোটিপতি কা'ব বিন আল আশরাফ তার সীমাতিরিক্ত প্রেমাসক্তির জন্য সর্বত্র নিন্দিত ছিল । এই পথে সে তার ধন-সম্পদকে যেভাবে বিনা দ্বিধায় লুটিয়ে দিচ্ছিল, তাতে শুধু আরবরাই নয় বরং য়াহূদীরাও তার বিরুদ্ধে দারুণভাবে ক্ষেপে গিয়েছিল । ফলে দেখা যায়, তাকে হত্যার পর মদীনার য়াহূদী অধিবাসীদের মধ্যে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় নি । কা'ব অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ একটি প্রাসাদে বসবাস করত । মদীনার দক্ষিণে অবস্থিত ঐ প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এখনো পর্যটকদের প্রভাবিত করে । ঐ প্রাসাদটি ছিল একটি দুর্গবিশেষ । অবরোধ-পরিস্থিতি দেখা দিলে তাতে পানির সুবন্দোবস্ত থাকত । শুধু একটি কূপই নয় বরং একটি বিরাট জলাধার, পাইপের সাহায্যে প্রাসাদের বিভিন্ন অংশে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করত ।

মদীনা নগর-রাষ্ট্রের চুক্তির মধ্যে য়াহুদীদের সাথে প্রতিরক্ষা ছাড়াও সামাজিক বীমায় পরস্পর সহযোগিতার অঙ্গীকার ছিল । ওহুদ যুদ্ধের কয়েকমাস পর চতুর্থ হিজরীতে অনুরূপ একটি ঘটনা ঘটে । এদিকে যথারীতি য়াহূদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা) কয়েকজন প্রাচীন সাহাবীসহ সংশ্লিষ্ট গোত্র অর্থাৎ বনী নযীরের বসতিতে গমন করেন এবং তাদেরকে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে চুক্তি অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন । তারা ইতস্তত করতে থাকে এবং রসূলুল্লাহকে অপেক্ষারত রাখে । রোদের তেজ প্রখর হতে থাকে এবং ঐতিহাসিকদের বর্ণনানুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা) য়াহূদীদের একটি গাড়ীর ছায়ায় গিয়ে বসেন । তখন য়াহূদীরা কা'ব বিন আল আশরাফের হত্যা এবং অন্যান্য ব্যাপারে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য চাকা খুলে গাড়ীটি রসূলুল্লাহর উপর ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল বলে ঐতিহাসিকরা যে বর্ণনা দিয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় । কেননা মদীনা প্রভৃতি স্থানে য়াহূদীরা এ ধরনের আরো কিছু ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে । যাহোক রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের উপরিউক্ত দুরভিসন্ধি আঁচ করতে পেরে এমনভাবে সেখান থেকে চলে আসেন যে, তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন এমন সন্দেহও য়াহূদীদের হয়নি । প্রকৃতপক্ষে এটা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া কিছুই ছিল না ।

শীঘ্রই মুসলমানরা মদীনার দক্ষিণে অবস্থিত এবং ঘন খেজুর বাগান পরিবেষ্টিত বনী নযীরের বাসভূমি ঘেরাও করে ফেলেন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সামরিক প্রয়োজনে তাদের খেজুর বাগানের কিছু অংশ (কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী) কেটে পরিষ্কার করা হয়, শেষ পর্যন্ত য়াহূদীরা যখন বশ্যতা স্বীকার করে তখন তাদের সাথে যথেষ্ট সদ্ব্যবহার করা হয় । তাদের প্রত্যেক ব্যক্তিকে এক উট ভর্তি মাল সম্পদ সমেত মদীনা থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় অবশ্য কোন অস্ত্র সাথে নেওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি । ঐতিহাসিকদের বর্ণনানুযায়ী এই অবস্থায়ও তারা বাহাদুরী ফলাতে থাকে এবং বাজনা বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে এমনভাবে মদীনা ত্যাগ করে, যেন জয় তাদেরই হয়েছে । তারা বাসগৃহ ও বাগানসমূহ ছেড়ে যায় সত্যি, তবে ঘরের অস্থাবর জিনিসপত্রাদি, এমনকি দরজা ও চৌকাঠ পর্যন্ত সঙ্গে উঠিয়ে নিয়ে যেতে ভুলেনি । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত ঔদার্যের সাথে রক্ষা করেন এবং উপরিউক্ত যাবতীয় কার্যাদি-তাদের জন্য বৈধ রাখেন (তারীখে তাবারী, পৃষ্ঠা ১৪৫২) ।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, মদীনা ত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার পর বনী নযীরের লোকেরা রসূলুল্লাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে যে, তারা স্থানীয় অধিবাসীদেরকে যে ঋণ দিয়েছিল তা এখনো অনাদায়ী রয়ে গেছে । রসূলুল্লাহ্ (সা) তখন বলেন, 'পরিমাণ কিছুটা হ্রাস করে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই সমস্ত ঋণ আদায় করে নাও ।' (সারাসী, সিয়ারে কবীর : ২২) । শত্রু হওয়া সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের ঋণ ফেরত পাওয়ার অধিকারকে এভাবে সংরক্ষণ করেন । আপোস চুক্তির মাধ্যমে তাদের অস্থাবর যে সমস্ত সম্পদ রসূলুল্লাহর অধিকারে আসে তা 'রাষ্ট্রীয় সম্পদ' বলে ঘোষণা করা হয় । রসূলূল্লাহ্ (সা) তা থেকে কিছু সম্পদ নিজের জরুরী প্রয়োজন মেটাবার জন্য রাখেন এবং বাকিটা আনসারদের অনুমতি নিয়ে মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করে দেন । তবে দু'জন গরীব আনসারকেও কিছু সম্পদ দেন এবং বনু নযীর সম্প্রদায়ের দু'জন নওমুসলিমকেও তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেন (তাবারী, পৃষ্ঠা ১৪৫৩) ইমাম বুখারী (র) কিতাবুল বয়ু'তে এই মর্মে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, 'য়াহূদীরা দেশ ত্যাগ করার সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে তাদের ভূসম্পত্তি বিক্রি করে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন ।' কিন্তু এ ঘটনাটি ইমাম বুখারী বিস্তারিতভাবে লিখেন নি, তাই এটা কবেকার ঘটনা তা নিশ্চয় করে বলা মুশকিল ।

ইতিহাসের একটি বিবরণ অনুযায়ী বন্ নযীরকে ঘেরাও করার সময় ইসলামী বাহিনী এমন এক জায়গায় অবস্থান নেয়, যা বনু নযীর ও বনু কুরায়যা বসতির ঠিক মাঝখানে ছিল । বনু কুরায়যা গোত্রের গোপন সামরিক সাহায্য বন্ধ করার জন্যই যে অনুরূপ করা হয়েছিল, তা পরিষ্কার বোঝা যায় । ঘটনাটিকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে ইসলামী বাহিনীর অবস্থানস্থলের, যেখানে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর তাঁবু ছিল সেখানে 'মসজিদে ফযীহ' নামে একটি মসজিদ তৈরী করা হয়, যা এখনো বিদ্যমান আছে । তীরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য রসূলুল্লাহর ঐ তাঁবুটি কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়েছিল (সীরাতে শামিয়াহ) ।

এই ধারণা করা বিবেকসম্মত যে, ইসলাম ও য়াহূদীদের মধ্যকার সম্পর্ক তখন অনেক তিক্ত হয়ে উঠেছিল এবং ইসলাম বিস্তারের প্রচেষ্টাকে বানচাল করার জন্য য়াহূদীরা সভ্যতা ও সৌজন্য বিবর্জিত কার্যকলাপ শুরু করে দিয়েছিল । মসজিদে নবভীতে প্রদত্ত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ভাষণসমূহের প্রতি উষ্মা প্রকাশ, রসূলুল্লাহকে 'আস্সালামু আলাইকুম' (তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)-এর পরিবর্তে 'আসামু আলাইকুম' (তোমার মৃত্যু হোক) বলা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় কাজকে উপলক্ষ করে ঠাট্টা-তামাশা করা যেন য়াহূদীদের স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল । তাদের এসব আচার-আচরণের নিন্দা করে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে, (যেমন, "হে মুমিনগণ, তোমাদের পূর্ববর্তী কিতাবীদের মধ্যে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস করে ও তামাশা মনে করে, তোমরা তাদেরকে ও কাফিরদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না । বরং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও । যখন তোমরা নামাযের জন্য আহ্হ্বান কর তখনো তারা হাসি-ঠাট্টা করে, কেননা তাদের কোন বুদ্ধি নেই"—৫ : ৫৭-৫৯) । রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন য়াহূদী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধারে খাদ্য কিনতেন তখনো তাদের কিছুসংখ্যক দুরাচারী রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে খারাপ কথাবার্তা বলত । কিন্তু সর্বাবস্থায় রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আচরণ ছিল সুন্দরতম এবং আদর্শস্থানীয় । জনৈক সাহাবী 'আসামু আলাইকুম' (তোমার উপর মৃত্যু বর্ষিত হোক)-এর প্রতি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, আমি ওদেরকেও উত্তরে 'ওয়া আলাইকুম' (তোমাদের উপরও অর্থাৎ তোমরা আমার উপর যে জিনিসটি বর্ষিত হতে কামনা করলে, আমিও তোমাদের উপর সে জিনিসটি বর্ষিত হবার কামনা করছি) । য়াহূদী খাদ্য ব্যবসায়ীর অসাদারচণের ঘটনা সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা লিখেছেন যে, হযরত উমর (রা) তখন রাগে অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়েন । কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা) য়াহূদীকে তার প্রাপ্য ঋণের চাইতে কিছু বেশি অর্থ দিয়ে বিদায় করেন । যখন য়াহূদীরা ধর্মকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করত তখন তিনি নীরব থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করতেন ।

অবশ্য কুরআন মজীদের নতুন নতুন অবতীর্ণ ওহীর মধ্যে য়াহূদী সম্পর্কিত উক্তিসমূহ ক্রমশ কঠিনতর হতে থাকে । একটি ধর্মীয় কিতাবের মধ্যে রদবদল করা (য়াহুদীদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা কথা সমূহকে তাদের স্থান হতে বদল করে থাকে-৫ : ৪৬) , অর্থের জন্য অসত্য ও ধর্মবিরোধী ফতওয়া দিয়ে স্বধর্মীদের পথভ্রষ্ট করা ("অতএব সেই লোকদের জন্য কঠোর শাস্তি আছে যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে তার বদলে কিছু মূল্য পাবার জন্য বলে, 'এটা আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে, অতএব তাদের হাত যা লিখেছে, সেজন্য তারা কঠোর শাস্তি পাবে এবং তারা এর দ্বারা যা উপার্জন করে তার জন্যেও তারা দুঃখভোগ করবে ।"-২ : ৭৯) তাওরীতের নির্দেশাবলীকে পশ্চাতে ফেলে রাখা ("আর যখন আল্লাহর তরফ হতে তাদের মধ্যে এরূপ কোন রসূল এলো, যে তাদের সঙ্গে যা আছে তার সত্যতার সাক্ষ্য, তখনি কিতাবীদের একদল আল্লাহর কিতাবকে পিছন দিকে ফেলে দিল, যেন তারা কিছুই জানে না।"-২ : ১০১) , নিজেদের নবীদের পর্যন্ত হত্যা করা ("তারপর তারা অপমান ও দারিদ্র্যের দ্বারা জর্জরিত হলো এবং আল্লাহর গজবে পড়লো । এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহর হুকুম মানত না এবং অযথা নবীদের হত্যা করত । এটা এজন্য যে তারা অবাধ্য হয়েছিল এবং পুনঃ পুনঃ সীমা লঙ্ঘন করেছিল"-২ : ৬১) ইত্যাদি অভিযোগে তাদেরকে অভিযুক্ত করা হয় । হযরত দাউদ (আ) ও হযরত ঈসা (আ)-এর মুখে তাদের উপর অভিশাপ বর্ষণ এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়ের উল্লেখ করে যেন মুসলমানদেরকে এই মর্মে সান্ত্বনা দেওয়া হয় যে, এ জাতি (য়াহূদী) চিরদিনই এরূপ আচরণ করেছে, অতএব এদের ঈমান না আনার কারণে নিরাশ হওয়ার কোন হেতু নেই । কেননা এই পথভ্রষ্টতা ও আল্লাহদ্রোহিতার কারণেই যুগে যুগে এদের উপর অপমান এবং দারিদ্র্য নেমে এসেছে ।

কিন্তু ক্রমবর্ধমান এই রাজনৈতিক টানা-হেঁচড়া সত্ত্বেও য়াহূদীদের কোন ন্যায় এবং সত্যকে অস্বীকার করা হয়নি । বরং সর্বদা এবং শেষ পর্যন্ত এই বলা হতে থাকে যে, তাওরীত একটি পথ প্রদর্শক এবং আসমানী গ্রন্থ । এটাকে য়াহূদীদের পুরোপুরি অনুসরণ করা উচিত ("নিশ্চয় আমি নাযিল করেছি তাওরীত, যাতে রয়েছে হিদায়েত (পথ প্রদর্শন) ও নূর (আলো), যা দ্বারা বিচার করেছিল ঐ সকল নবী যারা আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করেছিল এবং আল্লাহওয়ালা ও বিদ্বান ব্যক্তিরা । কেননা তারা আল্লাহর কিতাবের সংরক্ষণকারী নিযুক্ত হয়েছিল এবং তারা এটাকে মেনেছিল । অতএব (হে য়াহূদীগণ) মানুষকে ভয় না করে আমাকেই ভয় করো, আর অল্পমূল্যে আমার বাণীসমূহ বিক্রি করো না এবং আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার না করে তারাই কাফির"-৫ : ৪৪) , "বলো হে কিতাবিগণ, তোমাদের কোন কাজ হবে না, যতক্ষণ না তোমরা তাওরীত ও ইঞ্জীলকে এবং তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে যা তোমাদের প্রতি নাযিল হয়েছে তা কায়েম (প্রতিষ্ঠা) না কর" (৫ : ৬৭) ] । য়াহূদী ও অন্যান্য কিতাবিদের যবেহ করা জন্তু, রান্না করা জিনিস এবং তাদের মেয়েদের বিবাহ করা মুসলমানদের জন্য বৈধ বলে ঘোষণা করা হয় [ "আজ তোমাদের জন্য বৈধ করা গেল সব পবিত্র জিনিস, আর কিতাবিদের খাদ্য তোমাদের জন্য এবং তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য বৈধ, আর বিশ্বাসী সতীসাধ্বী ও পূর্বের কিতাবিদের সতী নারীরাও (তোমাদের জন্য বৈধ) , যখন তোমরা তাদের মুহর আদায় কর পবিত্র জীবন যাপনের জন্য প্রকাশ্য কুকর্ম বা গোপন প্রেমের জন্য নয়, আর যে ঈমানকে অস্বীকার করে, তার সমস্ত কাজ বৃথা যায় এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়"-(৫ : ৫) ] । কিন্তু দেশ ত্যাগের কারণে বনী নযীরের লোকেরা অত্যন্ত ব্যথিত হয় । তারা খায়বরে গিয়ে বসতি স্থাপন করে এবং সেখানকার নেতৃত্ব লাভ করে । সেখানে তারা তাদের যাবতীয় শক্তি শুধু প্রতিশোধ গ্রহণের প্রস্তুতিতেই নিয়োজিত করে । তাদের দূত একদিকে মক্কায় গিয়ে কুরায়শদেরকে মদীনা আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করে এবং নিজেদের সাহায্যের আশ্বাস দেয় এবং অন্যদিকে গিতফান, ফাযারা প্রভৃতি লুটেরা গোত্রসমূহকে মদীনা আক্রমণ করে লুটপাট চালানোর জন্য প্রলোভিত করে । এতে কোন সন্দেহ নেই যে, খন্দক যুদ্ধে বিভিন্ন গোত্র কর্তৃক মদীনা ঘেরাও করার মূলে এই য়াহূদীদের প্রচেষ্টাই ছিল সর্ব প্রধান কারণ ।

মদীনার সাথে অর্থনৈতিক বয়কট এবং মদীনায় গমনকারী কাফেলাসমূহকে দুমাতুল জন্ন্দল প্রভৃতি স্থানে ভীতি প্রদর্শনেরও মূলে ছিল এই য়াহূদীদেরই কারসাজি । খন্দক যুদ্ধের ঘেরাওকালে মদীনায় অবস্থানকারী বনু কুরায়যার য়াহূদীরা হুয়াই বিন আখতব প্রমুখ নযীরী য়াহূদীদের প্ররোচনায় মুসলমানদের প্রবঞ্চিত করতে উদ্যত হয়েছিল এবং খন্দক যুদ্ধের পরও হতোদ্যম না হয়ে বরং আরো জোরেসোরে ষড়যন্ত্রের মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল ।

পঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাসে কুরায়শ এবং অন্যান্য গোত্র মদীনা ঘেরাও করে । রসূলুল্লাহ্ (সা) পূর্বেই এ সম্পর্কে অবগত হতে পেরে তাদের প্রতিরোধ করার জন্য শহরের উন্মুক্ত অংশে পরিখা খননের ব্যবস্থা করেন । ঐতিহাসিকদের বর্ণনানুযায়ী ঐ সময় বনু কুরায়যার য়াহূদীরা মুসলমানদেরকে শাবল, গাঁথুনি, কোদাল প্রভৃতি দিয়ে সাহায্য করে (ওয়াকিদী) । এছাড়া তারা সক্রিয়ভাবে মুসলমানদের কোনরূপ সাহায্য করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় নি । বরং জানা যায় যে, তারা শেষ মুহূর্তে মুসলমানদের প্রবঞ্চিত করার প্রস্তুতি নেয় এবং ইতিপূর্বে মুসলমানদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির অবসান হয়েছে বলে খোলাখুলিভাবে ঘোষণা করে । মুসলমান শিশু এবং মহিলারা যেসব সুরক্ষিত স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল তারা তার আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে থাকে এবং তাদের দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করার সুযোগ খুঁজতে থাকে ।

মোটকথা, মুসলমানদের সফল কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে য়াহূদীরা শত্রুদলের সাথে একাকার হয়ে যেতে পারেনি । তবে কুরায়শ ও অন্যান্য গোত্র যখন ঘেরাও উঠিয়ে মদীনা ত্যাগ করে, তখন আসে তাদের (য়াহূদীদের) বিশ্বাসভঙ্গের পরিণাম ভোগের পালা । মুসলমানরা তাদের বসতি ঘেরাও করে । এ ব্যাপারে শহরের অন্যান্য গোত্র-বিশেষ করে বনী কায়নূকা'র অবশিষ্ট য়াহূদীরা মুসলমানদের সাহায্য করে । অতএব বোঝা যায় যে, বনী কুরায়যার উপরিউক্ত অসদাচরণের ফলে শান্তিকামী য়াহূদীরাও তাদের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল । দীর্ঘদিন পর বনী কুরায়যার লোকেরা অস্ত্র সমর্পণ করে এবং তাদের জন্য এটা অনুমোদন করা হয় যে, তাদের সাবেক আনসারী বন্ধু গোত্র তাদের সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত দেবে তা-ই কার্যকরী করা হবে ।

বনী নযীরের বন্ধু গোত্র তাদের প্রাণ রক্ষা করেছিল, কিন্তু বনী কুরায়যার অতীত কার্যকলাপের দরুন তাদের প্রতি তাদের বন্ধু গোত্র অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে উঠে এবং পরিষ্কার সিদ্ধান্ত দেয় যে, বিজিত শত্রুর সাথে যেরূপ আচরণ করার কথা তাওরীতে আছে, এই বিজিত য়াহূদীদের সাথে সেরূপ আচরণই করা হবে । যুক্তিসংগত কারণেই হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষে এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না । অগত্যা তিনি আদেশ দিলেন, প্রাপ্তবয়স্ক সকল পুরুষকে হত্যা করা হবে, স্ত্রীলোক ও শিশুদেরকে ক্রীতদাস বানানো হবে এবং তাদের যাবতীয় বিষয়-সম্পদকে মালে গনীমতে পরিণত করা হবে । স্ত্রীলোকদের হত্যা করা যায় না এজন্য যে, তারা যুদ্ধ করে না । অন্যথায় এই সংঘর্ষকালে জনৈকা য়াহূদী স্ত্রীলোক একটি গাড়ী থেকে কিছু চাকার পাট নীচের দিকে ফেলে দিয়েছিল, যার ফলে একজন মুসলমান সিপাহী শাহাদত লাভ করেন । এই সামরিক অপরাধের শাস্তিস্বরূপ ঐ স্ত্রীলোককেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় (সীরাতে ইবনে হিশাম) । রাষ্ট্রের ভাগে মালে গনীমতের যে অংশ পড়ে তা থেকে ক্রীতদাসীদের নিলামে বিক্রি করে সে অর্থ দ্বারা সিরিয়া ও নজদের বাজারসমূহ থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়া কেনা হয় (সীরাতে শামী) এবং ভূসম্পত্তি, ঘরবাড়ী, বাগান প্রভৃতি স্থাবর সম্পত্তি সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয় (বালাযুরী) ।

এবার মদীনায় য়াহূদীর সংখ্যা অনেক কমে যায় । তাদের অসদাচরণের মাত্রাও হ্রাস পায় । ফলে ইসলামী রাষ্ট্রও তাদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করতে থাকে । তাদের দরিদ্র গোত্রগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ভাতা নির্ধারণ করে দেয়া হয় । (বনী উরায়েদ গোত্র ছিল তাদের অন্যতম । মদীনায়, উহুদ পাহাড়ের পূর্বপ্রান্তে এখনো 'মসজিদে উরায়েদ' নামে তাদের বসতির অস্তিত্ব দৃষ্টিগোচর হয় ।) শহরের মধ্যে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনার পুরাপুরি স্বাধীনতা ছিল, এমন কি, মসলা ধারে নেওয়ার কারণে এক য়াহূদীর কাছে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর বর্মটি বন্ধক রেখেছিলেন এবং সেই অবস্থায়ই তাঁর ওফাত হয় । রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর য়াহূদী প্রতিবেশীদেরকে সম্মানের চোখে দেখতেন, তারা অসুস্থ হলে দেখতে যেতেন, তাদের জানাযার মিছিল যখন গলি অতিক্রম করত তখন তিনি উপবিষ্ট থাকলে মৃত্যুজনিত এই খোদায়ী কাণ্ডের সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন ।

বনু কুরায়যার চরম পরিণামের কথা শুনে খায়বরের বনু নযীর প্রভৃতি গোত্র একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে । সারাসীর (শরহে সিয়ারে কবীর : ২০১) বর্ণনা অনুযায়ী তাদের এবং মক্কাবাসীদের মধ্যে এই মর্মে একটি চুক্তি হয় যে, মুসলমানরা প্রতিরোধমূলক অভিযানে মক্কার দিকে গেলে খায়বরবাসীরা এবং খায়বরের দিকে গেলে মক্কাবাসীরা সেনাবিহীন মদীনা আক্রমণ করে লুটপাট চালাবে । আর মুসলমানরা যদি কোন দিকে না গিয়ে মদীনায়ই অবস্থান করে, তাহলে ব্যাপক প্রস্তুতির মাধ্যমে আবার মদীনায় দ্বিতীয় খন্দকযুদ্ধের আয়োজন করা হবে ।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরম কূটনৈতিক সাফল্যের পরিণামস্বরূপ যখন হুদায়বিয়া চুক্তি সম্পাদিত হয়, তখন খায়বর এবং মক্কার উপরিউক্ত চুক্তি বন্ধন আপনা আপনি শিথিল হয়ে পড়ে । খায়বর অভিযান পরিচালনাকালে কুরায়শরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে—রসূলুল্লাহ্ (সা) সে সম্পর্কে আশ্বস্ত হওয়ার এক মাস পরই সপ্তম হিজরীর মুহাররমে খায়বর ঘেরাও করেন । ইবনে সা'দের বর্ণনানুযায়ী খায়বর অভিযানের প্রস্তুতি মদীনার য়াহূদীদের কাছে ছিল অসহ্যকর, কিন্তু মদীনায় বসবাস করে এ ব্যাপারে কিছু করার মত কোন ক্ষমতাই তাদের ছিল না । ইমাম আবু ইউসুফ (র) এর বর্ণনা অনুযায়ী বনু কায়নূকা' গোত্রের য়াহুদীরা খায়বর অভিযানে মুসলমানদের সাহায্য করেছিল এবং এর পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে মালে গনীমতের একটি অংশ দেওয়া হয়েছিল (তা'লীকে' সুনানে কুবরা : বায়হাকী : -এ বনু কায়নুকার এ সাহায্যকারীদের সংখ্যা দশ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে) । মোটকথা, পুরো সেনাবাহিনীকে মদীনায় রেখে তা থেকে মাত্র পনেরো শ' প্রাণ উৎসর্গকারীর একটি বাহিনী খায়বর অভিমুখে যাত্রা করে । খাযারা ও গিতফান ছিল খায়বরের বন্ধুগোত্র । পথিমধ্যে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে নিরপেক্ষ থাকার নির্দেশ দেন । তাদেরকে মদীনার খেজুর প্রদানের লোভও দেখানো হয় । কিন্তু কোন কাজ হয়নি । যখন তারা কিছুতেই সম্মত হলো না, তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) সেনাবাহিনী পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন একটি কৌশল অবলম্বন করেন যে, তাতে ঐ আরব গোত্রগুলো খায়বরবাসীদের সাহায্য করার পরিবর্তে নিজেদের বসতি এবং স্ত্রী-পুত্রদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে এবং খায়বরের পুরো অভিযানে কোন উৎপাতই করতে পারে নি । "খায়বর বিজয়ের পর ঐ নির্লজ্জ লোভীরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে খায়বরবাসীদের সাহায্য না করার পুরস্কার চাইতে এসেছিল, কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে ধমকিয়ে বিদায় করে দেন (শামী) ।"

খায়বর অভিযান ছিল অত্যন্ত ভয়ানক । খায়বর অঞ্চলের মাটি ছিল উর্বর । সেখানে পানিরও প্রাচুর্য ছিল । এখনো সেখানে বিরাট খেজুর বাগান এবং য়াহূদী যুগের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন জলাশয় রয়েছে । খায়বরের টিলাভূমিতে ছিল সাতটি দুর্গ এবং পুরো বসতির আয়তন পঁচিশ বর্গ মাইলের কম ছিল না । 'হিনু মুরাহহাব' ছিল ঐ সমস্ত দুর্গের অন্যতম-যা পুরান কীর্তিতে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও এখনো সউদী গভর্নরের বাসস্থান হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে । ঐ দুর্গের জলাশয়গুলো এখনো ভাল অবস্থায় রয়েছে । হিসনে মুরাহহাব থেকে সম্পূর্ণ খায়বর শহর দেখা যায় ।

খায়বর এত ঐশ্বর্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী শহর ছিল যে, জাহিলিয়া যুগে কুরায়শরা তাদের বিয়ে শাদীতে খায়বর থেকেই অলংকারাদি ভাড়া করে নিয়ে আসত । একবার এ ধরনের এক সেট অলংকার হারিয়ে গেলে তার ক্ষতিপূরণস্বরূপ কুরায়শকে দশ হাজার দীনার পরিশোধ করতে হয়েছিল (শরহে সিয়ারে কবীর) ।

যা হোক, ঐ দুর্গগুলো একটির পর একটি অধিকৃত হতে থাকে । কোন কোন দুর্গ অধিকারে স্থানীয় য়াহূদীরাও সাহায্য করেছিল । শামীর বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে 'হিনুয যুবায়ের' দুর্গের ভূগর্ভস্থ রাস্তার সন্ধান জনৈক য়াহূদীই দিয়েছিল, যার ফলে ঐ দুর্গটি সহজেই অধিকার করা সম্ভব হয় । ওয়াকিদীর বর্ণনা অনুযায়ী মুসলিম বাহিনী কর্তৃক পরিবেষ্টিত য়াহূদীরা দুর্গের উপর থেকে মুসলমানদের উপর 'মানজানিক' (পাথর নিক্ষেপণ যন্ত্র)-এর সাহায্যে পাথর নিক্ষেপ করছিল । মালে গনীমত হিসেবে প্রাপ্ত ঐ সমস্ত 'মানজানিক' মুসলমানরা পরবর্তী সময়ে তায়েফবাসী এবং অন্যান্য বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল ।

দুর্গ ঘেরাওকালে জনৈক য়াহূদীর এক ক্রীতদাস (যে রাখাল ছিল) ইসলাম গ্রহণ করে । ইসলামী আইন অনুযায়ী সে সঙ্গে সঙ্গে দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে । কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে নির্দেশ দেন, যেন সে তার প্রভুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করে । সে অনুযায়ী ক্রীতদাসটি পশুপালটিকে তার প্রভুর দুর্গের সন্নিকটে হাঁকিয়ে নিয়ে যায় এবং দুর্গের দিকে ভড়কিয়ে দেয় । পশুগুলো চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী আপনা আপনি দুর্গের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে এবং বিশ্বস্ত ক্রীতদাসটি সেখান থেকে ইসলামী ঘাঁটিতে ফিরে আসে ।

ভীষণ সংঘর্ষের পর শেষ পর্যন্ত সবগুলো দুর্গই আত্মসমর্পণ করে । তাদের সাথে এই চুক্তি হয় যে, তারা শুধু তাদের পরিধানের পোশাক এবং স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে খায়বর ছেড়ে যেখানে ইচ্ছা চলে যাবে । (বালাযুরী, পৃষ্ঠা ৩৩) ।

ঐ এলাকায় কোন মুসলমান বসতি ছিল না । তাই য়াহূদী বসতি তৎক্ষণাৎ উঠিয়ে দিলে সেখানকার বাগ-বাগিচা নষ্ট হয়ে যেত এবং ফসলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার দরুন দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অসুবিধা দেখা দিত । উপরিউক্ত কারণে এবং য়াহূদীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ (সা) অনুমতি দেন যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত য়াহূদীরা খায়বরে বসবাস করবে এবং নিজ নিজ জমি থেকে যথারীতি উপকৃত হবে । তবে উৎপাদন আধা-আধি হিসাবে বন্টিত হবে ।

পরবর্তী বছরগুলোতে ইসলামী তহশীলদারের কর্মপদ্ধতি এই বন্টনের ব্যাপারে এত ন্যায়ভিত্তিক থাকে যে, য়াহূদীরা তা প্রত্যক্ষ করে অলক্ষ্যে চীৎকার দিয়ে উঠে : এই ন্যায়বিচারের কারণেই জমির উপর আসমান দাঁড়িয়ে আছে, ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে না ।

বন্টনের পর সরকার যে অংশ পেত তা থেকে রসূলুল্লাহ্ (সা) যেসব ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন, তার দু'টি দলীল ইতিহাস সংরক্ষণ করেছে (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৭৭৫) । ঐ দলীলের মধ্যে রসূলুল্লাহ্র সহধর্মিণিগণ, হযরত ফাতিমা (রা), হযরত আবূ বকর (রা), রসূলুল্লাহর কিছু সংখ্যক আত্মীয়স্বজন এবং অন্যান্য বেশ কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষের নাম রয়েছে ।

আপসচুক্তির পর মুসলমান সৈন্যরা য়াহূদীদের বাগানসমূহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে । য়াহূদীদের অভিযোগ পেয়ে রসূলুল্লাহ (সা) মুসলমান সৈন্যদেরকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দেন এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ য়াহূদীদের সম্পদ তাদের সম্মতি কিংবা তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ ছাড়া (শরহে সিয়ারে কবীর) গ্রহণ করা অবৈধ বলে ঘোষণা করেন । হযরত আলী (রা)-এর বর্ণনা অনুযায়ী ঐ সময়েই রসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলমানদের জন্য মুতআ' (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিবাহ করা) এবং গাধার মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছিলেন । মাকরীযির বর্ণনানুযায়ী মালে গনীমতের মধ্য থেকে তাওরীতের কপিসমূহ য়াহূদীদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় । সন্ধির পর পর জনৈকা য়াহূদী মহিলা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিমন্ত্রণ করে তার খাবারের মধ্যে বিষ প্রয়োগের চেষ্টা করে । কিন্তু সে স্বীকারোক্তি করায় শেষ পর্যন্ত রসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে ক্ষমা করে দেন ।

চুক্তি অনুযায়ী অস্ত্রশস্ত্র এবং সোনারূপা বিজয়ীদের (মুসলমানদের) হাতে সোপর্দ করা অবশ্য কর্তব্য ছিল । কিন্তু বনূ নযীরের 'পৌর কোষাধ্যক্ষ'কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে উত্তরে বললো যে, কোষাগারের যাবতীয় মালসম্পদ যুদ্ধে খরচ হয়ে গেছে । তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) এই বলে বিষয়টি মিটমাট করে ফেলেন যে, যদি কোষাধ্যক্ষের কথা আগামীতে কখনো মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হবে । পরবর্তী সময়ে জনৈক স্থানীয় য়াহূদী, মুসলমানদের কাছে ফাঁস করে দেয় যে, একটি ধ্বংসস্তূপের কাছে কোন একটি লোক প্রায়ই সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করে । সঙ্গে সঙ্গে এ স্থানটি খনন করা হলে তা থেকে য়াহূদীর পৌর কোষাগারের মাল-সম্পদ বেরিয়ে আসে । এবার 'কানানা' নামীয় য়াহূদী কোষাধ্যক্ষকে তার মিথ্যাচারের জন্য প্রাণদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার নব পরিণীতা বিধবা পত্নী (যার মধুচন্দ্রিমাও উদযাপিত হয়নি। -শরহে সিয়ারে কবীর) সুফিয়া (রা) রসূলুল্লাহর সহধর্মিণীদের অন্তর্ভুক্ত হন । শেষ পর্যন্ত হযরত সুফিয়া (রা)-এর কারণেই খায়বর-বাসীদের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের আচরণ বেশ সৌহার্দমূলক হয়ে উঠে । হযরত সুফিয়া (রা) নিজে ও ছিলেন তাঁর অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অত্যন্ত করুণাময়ী । এমনকি মৃত্যুকালে তিনি তাঁর সম্পত্তি এক য়াহূদী ভাইপোর জন্য অসীয়ত করে যান (যারকানী, ব-হাওয়ালা সীয়ারুস সাহাবীয়াত) । ইসলাম এই ধরনের দান খয়রাত এবং সৌজন্যমূলক আচরণের প্রতি উৎসাহই প্রদান করে থাকে ।

খায়বরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে য়াহূদী বসতি ছিল প্রচুর । খায়বরের পরিণাম ঐ অঞ্চলবাসীদের মনেও দারুণ প্রভাব বিস্তার করে । ফলে 'বনূ আযরা'-র মত শক্তিশালী য়াহূদী সম্প্রদায়ও মুসলমানদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয় । (মাবসূত আস্ সারাসী, ২৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২) ।

বালাযুরীর বর্ণনানুযায়ী (পৃষ্ঠা ৩৩-৩৫) খায়বর থেকে প্রত্যাবর্তনকালে রসূলুল্লাহ্ (সা) ওয়ালিদউল কু'রাবাসীদেরও আনুগত্য দাবি করেন । ফলে তাদের সাথে কিছুটা সংঘর্ষ হয় এবং শেষ পর্যন্ত তারা খায়বরবাসীদের অনুরূপ শর্তাদির উপর মুসলমানদের বশ্যতা স্বীকার করে । সেখানকার কিছু জমি (যা খুব সম্ভব পতিত ছিল। বালাযুরীর বর্ণনানুযায়ী 'হামযাতুল আযরী'কে জায়গীরস্বরূপ দান করা হয় । রসূলুল্লাহ্ (সা) আমর বিন সায়ীদ বিন আ'সকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন । মদীনামুখী পথে ফিদকও পড়ে । বালাযুরীর বর্ণনানুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে একজন মুবাল্লিগ (ধর্ম প্রচারক) প্রেরণ করেন । কিন্তু সেখানকার লোক কোনরূপ যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে হাযির হয়ে খায়বরবাসীদের অনুরূপ শর্তাদির উপর মূলসমানদের বশ্যতা স্বীকার করে । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ফিদকের বাগানসমূহের আমদানীর ব্যয়খাত নির্দিষ্ট করে দেন । তা থেকে তিনি তাঁর এবং তাঁর পরিবার পরিজনের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনাদি মেটাতেন এবং যা অবশিষ্ট থাকত তা জনকল্যাণ-মূলক কাজে ব্যয়িত হত (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৭৬৪) । সাফদীর বর্ণনানুযায়ী আল-হিকম বিন সায়ীদ বিন আল-আসকে ফিদক অঞ্চলের গভর্নর নিয়োগ করা হয়েছিল ।

বাহ্যত খায়বরবাসীদের পুরোপুরি আভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা ছিল । তাই সেখানে কোন মুসলমান গভর্নর নিয়োগ করা হয় নি । এমন কি, একদা সেখানে জনৈক আনসার নিহত হলে রসূলুল্লাহ (সা) তার রক্তমূল্য পরিশোধ করার জন্য য়াহূদীদের কাছে পত্র লিখেন এবং তারা যখন শপথ করে বললো যে, এ কাজে য়াহূদীদের কোন হাত ছিল না তখন রসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে সে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে মদীনার সরকারী কোষাগার থেকেই ঐ আনসারীর রক্তমূল্য পরিশোধ করে দেন (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৭৭৮; মুয়াত্তা, ইমাম মালিক) ।

অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজিত হয় । সাথে সাথে তায়েফের পালা আসে । তায়েফে যথেষ্ট সংখ্যক য়াহূদী ছিল । কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সূদী কারবার ছাড়া সেখানকার রাজনীতিতে তাদের বিশেষ কোন প্রভাব ছিল না । বালাযুরীর গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৫৬) য়াহূদীদের কথা আছে, কিন্তু চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ কোন ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ নেই ।

নবম হিজরীতে তাবুকের বিরাট অভিযান পরিচালনা করা হয় । তাতে ৩০ হাজার মুসলমান অংশগ্রহণ করেছিলেন । রসূল জীবনের কোন অভিযানেই এত বড় জনসমাবেশ পরিলক্ষিত হয়নি । অতএব এটা পরিষ্কার যে, ঐ অভিযানকালে আশেপাশের ছোট ছোট বসতি সহজে এবং বিনা বাক্যব্যয়ে মুসলমানদের বশ্যতা স্বীকার করেছিল । জারবা, আযরাহ এবং মাক'নার বেশির ভাগই য়াহূদী বসতি ছিল বলে জানা যায় । জারবা এবং আযরাহের অধিবাসীরা মাথাপ্রতি বার্ষিক এক দীনার জিযিয়া প্রদানের ইচ্ছা ব্যক্ত করে এবং তাদেরকে সে শর্তেই ইসলামী রাষ্ট্রে আশ্রয় প্রদান করা হয় (ইবনে সা'দ) ।

তীমাবাসীরা কখন বশ্যতা স্বীকার করেছিল, তা সঠিক জানা যায়নি । বালাযুরী লিখেছেন, ওয়াদিউল কুরা'বাসীদের পরিণাম দেখে তীমাবাসীরা আপনা আপনি রসূলুল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে । তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিতে জিযিয়ার উল্লেখ আছে । এতে অনুমিত হয় যে, এটাও তাবুক অভিযানের পাশাপাশি একটি ঘটনা । কেননা ঐ সময়েই সম্পাদিত চুক্তিসমূহে প্রধানত জিযিয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় । সেখানকার গভর্নর ছিলেন ইয়াযিদ বিন সুফিয়ান-যিনি মক্কা বিজয়কালে (অষ্টম হিজরীতে) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । যা হোক, যুদ্ধাভিযান ছাড়াই বশ্যতা স্বীকার করায় তাদেরকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয় । তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বচন ইতিহাস সংরক্ষণ করেছে-যা আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও অর্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে অনন্য । চুক্তিটি ছিল নিম্নরূপ :
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد رسول الله لبنى عاديا أن لهم الذمة وعليهم الجزية ولا عداء ولا جلاء الليل مد والنهار شد وكتب خالد بن سعيد ( ابن سعد )
"করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে । আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষ থেকে বনূ আদিয়া সম্প্রদায়ের জন্য এই চুক্তি লেখা হচ্ছে । আশ্রয় তাদের প্রাপ্য এবং জিযিয়া প্রদান তাদের দায়িত্ব । তাদের উপর জুলুম করা হবে না এবং তাদেরকে দেশ ছাড়াও করা হবে না । (এই চুক্তিকে) রাত দীর্ঘায়িত করবে এবং দিন করবে সুদৃঢ় । (এটাকে) খালিদ বিন সায়ীদ লিখে দিয়েছেন" (ইবনে সা'দ) ।

বনু আদিয়া এবং তীমার উল্লেখ থাকায় অনুমিত হয় যে, এটা ছিল সর্বজন পরিচিত য়াহূদী সামওয়াল বিন আদিয়ার সম্প্রদায় । কেননা মাসউদীর মতে (আত্তানবীহ্ ওয়াল আশরাফ, পৃষ্ঠা ২৫৮) সামওয়াল তীমারই শাসক ছিলেন ।

মাক'নার ব্যাপারটি বেশ ঘোরালো । আকাবা উপসাগরের এই বন্দরটিও খুব সম্ভব য়াহূদী ঈসায়ী ঝগড়ার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল এবং ইলাবাসী ঈসায়ীরা সেখানকার য়াহূদীদেরকে পাকড়াও করে তাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল । ইলাবাসীদের সাথে যখন চুক্তি হলো তখন রসূলুল্লাহ (সা) নির্দেশ দেন, যেন মাক'নাবাসীদেরকে পাথেয় ও অন্যান্য আসবাব সামগ্রী দিয়ে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয় (ইবনে সা'দ) । ধারণা করা হয় যে, য়াহূদীরা তাবুকে এসে রসূলুল্লাহকে সাহায্য সহায়তা প্রদান করতে শুরু করেছিল । খোদ মাক'নাবাসীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অজ্ঞাতই রয়ে গেছে । তাদের সাথে কোন যুদ্ধ হয়েছিল বলে জানা যায়নি । এতদসত্ত্বেও ইবনে সা'দে যে চুক্তির উল্লেখ আছে সে অনুযায়ী তাদেরকে তাদের অস্ত্রশস্ত্র, ক্রীতদাস, গৃহপালিত পশু, বস্ত্র, খেজুর বাগানের শীতকালীন ফসল, ধৃত মৎস্যের এক-চতুর্থাংশ এবং মহিলাদের চরকা কাটা সূতার এক-চতুর্থাংশ ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রদান করতে হবে । অবশ্য তাদেরকে জিযিয়া কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে । রসূলুল্লাহ (সা) তাদের অতীত অপরাধসমূহও মাফ করে দেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরকে বেগারী এবং জবরদস্তিমূলক শ্রম থেকেও মুক্ত করে দেওয়া হয় । তাদের কাছ থেকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয় যে, তাদের শাসক হয় তাদের মধ্য থেকে হবে, নয়ত রসূলুল্লাহর আহল থেকে । অতঃপর বালাযুরী তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ 'ফুতুহুল বুলদান' রচনা করেন এবং ঐ চুক্তির মূল লিপিবদ্ধ বচনের, চোখে-দেখা যে বিবরণ দেন তাতে কিছুটা পরিবর্ধন ছিল । আর তা হচ্ছে, অতীতে সংঘটিত যাবতীয় হত্যাকাণ্ডের রক্তমূল্য থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং তাদের বসতির অধিকারী হবে একমাত্র তারাই অথবা রসূলুল্লাহ (সা) কিংবা তার প্রেরিত প্রতিনিধি । অস্ত্র, বস্ত্র, ক্রীতদাস প্রভৃতি সমর্পণের ব্যাপারে একটি পরিবর্ধন হলো, 'হ্যাঁ, রসূলুল্লাহ্ (সা) কিংবা তাঁর প্রেরিত প্রতিনিধিই যদি এর মধ্য থেকে কিছু বাদ দেন (তাহলে তা দিতে হবে না) ।' আর তাদের বসতির নেতা তাদেরই মধ্য থেকে হবেন কিংবা 'আহলে বায়তে রসূলুল্লাহ্' (সা)-এর মধ্য থেকে । অবশেষে ঐ চুক্তির লেখকের নামও রয়েছে । আর তিনি হলেন আলী বিন আবূ তালিব । চুক্তি সম্পাদনের তারিখও রয়েছে । আর তা হলো নবম হিজরী । তারিখের ব্যাপারে একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, সুবহুল আ'শা, কালকাশান্দী এবং আত্তারাতিবুল ইদারিয়াহ্, কাত্তানী-এর মধ্যে যদিও উল্লেখ করা হয়েছে যে, খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশেই হিজরী সনের প্রবর্তন করা হয়েছিল, কিন্তু তাবারী এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকের বর্ণনানুযায়ী এটা সর্বসম্মত যে, হযরত উমর (রা) ষোড়শ হিজরীতে হিজরী সনের প্রবর্তন করেছিলেন । অতএব উল্লেখিত চুক্তির মধ্যে হিজরীর উল্লেখ একটি খাপছাড়া কথারই নামান্তর । অনুমান করা যেতে পারে যে, উল্লেখিত চুক্তির এই বানোয়াট বচনই কালকাশান্দী প্রমুখকে প্রতারিত করেছিল, যার ফলে তারা হিজরী সন প্রবর্তনের ক্ষেত্রে একটি নতুন মতের জন্ম দেন ।

এই চুক্তির একটি তৃতীয় বর্ণনা মিসরীয় য়াহূদীদের একটি পাণ্ডুলিপিতে পাওয়া যায় । বর্ণনার ভাষা আরবী হলেও লিখন-রীতি ইবরানী । সে অনুযায়ী 'এই চুক্তি মাক'নার সাথে সাথে খায়বরবাসী এবং তাদের বংশধরদের ক্ষেত্রেও 'কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য' । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে হযরত সুফিয়া (রা)-এর বিবাহ-বন্ধনই এই বিশেষ সুবিধা প্রদানের কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে । কেননা হযরত সুফিয়া (রা) ছিলেন খায়বরেরই অধিবাসী এবং য়াহূদী বংশোদ্ভূত । এই চুক্তি অনুযায়ী অস্ত্র, ক্রীতদাস এবং মাল সম্পদ মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করা হবে না বরং তা য়াহূদীদেরই অধিকারে থাকবে । উপরন্তু তাদেরকে সরকারী কর থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হবে । তাছাড়া য়াহূদীদেরকে বিশেষ পোশাক পরিধান, বিশেষ রঙের কটিবেষ্টনী বাঁধা, সাথে অস্ত্র রাখা এবং অশ্বারোহনেরও অনুমতি দেওয়া হবে । তদুপরি তারা কোন মুসলমানকে হত্যা করলে তার ক্ষেত্রে সেই শাস্তিই প্রযোজ্য হবে, যা একজন মুসলমান হত্যাকারীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে । য়াহূদীদেরকে অন্যান্য সকল যিম্মীর উপর মর্যাদা প্রদান করা হবে । তারা মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে এবং তাদের জানাযা শহরের রাজপথগুলোর উপর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাবে । চুক্তির শেষে পঞ্চম হিজরী লেখা হয়েছে (অথচ নবম হিজরীতে মাক'না এবং সপ্তম হিজরীতে খায়বর বিজিত হয়েছিল) ।

নবম হিজরীতে সম্পাদিত মাক'না চুক্তি কম বেশি সেরকমই হওয়া উচিত, যেরকম জারবা ও আযরাহের ক্ষেত্রে হয়েছিল । কেননা মাকনার মত এসব স্থানের অধিবাসীরাও যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই স্ব-ইচ্ছায় মুসলমানদের আনুগত্য স্বীকার করেছিল । প্রকৃত ঘটনা এই হয়ে থাকবে যে, মুসলিম রাষ্ট্রনায়করা যখন স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেন এবং খলীফা মুতাওয়াক্কিল ও অন্যরা যখন অমুসলিম প্রজাদের উপর কিছু বাড়াবাড়ি করতে থাকেন তখন তাদের সে বাড়াবাড়ি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঐ সমস্ত বানোয়াট দলীলসমূহ রচিত হয়, যা ইবনে সা'দ ও বালাযুরীর যুগে পাওয়া যায় ।

এই চুক্তিতে বস্ত্র ও অস্ত্র সমর্পণের যে কথা আছে-পাঠকদের নিশ্চয়ই স্মরণ থাকবে যে, খায়বর চুক্তিতে তার উল্লেখ ছিল । অতএব এই বানোয়াট চুক্তি রচনার সময় খায়বর এবং মাকনা চুক্তির কিছু কথা এবং কিছু শব্দ গ্রহণ করা হয় এবং সেই সাথে কিছু বাড়তি সুবিধা নিজেদের জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়, যাতে খলীফা মুতাওয়াক্কিলকে এই বলে প্রভাবান্বিত করা যায় যে, খোদ রসূলুল্লাহ্র নির্দেশেই এই সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল । অতঃপর মিসরে যখন ফাতিমী খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলো (একদা মাক'না যাদের শাসনাধীন ছিল) এবং আল-হাকিম বিআমরিল্লাহ্ তাঁর এক ক্ষ্যাপামির যুগে যখন য়াহূদী ও অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের উপর সীমাহীন জুলুম অত্যাচার শুরু করেন তখন এই দ্বিতীয় চুক্তিটি তৈরী করে নেওয়া হয়, যা মিসরের য়াহূদী উপাসনালয় থেকে বেরিয়ে পড়ে । যাহোক এই বানোয়াট চুক্তির মাধ্যমে য়াহূদীরা এমন সব অধিকার আদায় করে নেয়, যা ফাতিমী যুগে না হলেও রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে যেকোন য়াহূদী ভোগ করত । হার্শফিন্ড, লেশেঙ্কীর্ণ প্রমুখ য়াহূদী শিক্ষাবিদ সাম্প্রতিককালে এই বিষয়ের উপর প্রবন্ধ লিখেছেন এবং উক্ত চুক্তিপত্রকে আদি ও আসল প্রমাণের জন্য তাদের যাবতীয় শক্তি নিয়োজিত করেছেন । কিন্তু উপরিউক্ত কারণসমূহের প্রেক্ষিতে আমরা এই চুক্তিপত্রের যাবতীয় বচনকে বানোয়াট আখ্যা না দিয়ে পারছি না ।

বিজিত আহলে কিতাবদের কাছ থেকে জিযিয়া গ্রহণের কুরআনী নির্দেশ খুব সম্ভব এই নবম হিজরীতেই অবতীর্ণ হয়েছিল । বাহরাইনের ইরানী গভর্নর মুনযার বিন সাভা খুব সম্ভব ষষ্ঠ হিজরীতে মুসলমান হয়েছিলেন এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে স্বপদেই বহাল রেখেছিলেন ।

মুনযারের নামে লিখিত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একটি পত্র ইবনে তোলোন প্রভৃতিতে পাওয়া যায় । তাতে আছে 'যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি ভালভাবে কাজ করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে পদ থেকে অপসারণ করা হবে না । যারা অগ্নি উপাসনা ও য়াহুদী ধর্ম ছাড়তে চায় না তাদের উপর জিযিয়া ধার্য করা হবে ।' সৌভাগ্যবশত বর্তমানে আসল পত্রটি পাওয়া গেছে । এই পত্র পেয়ে মুনযার রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন 'বাহরাইনের য়াহূদীদের সাথে কিরূপ আচরণ করা হবে (ইবনে সা'দ) ?' এই জিজ্ঞাসার উত্তরে রসূলুল্লাহ্ (সা) যা বলেছিলেন তা হলো, 'ইসলাম প্রচার সত্ত্বেও যারা মুসলমান হবে না তাদের কাছ থেকে জিযিয়া হিসাবে বার্ষিক এক দীনার আদায় কর ।' [ ইমাম আবূ ইউসুফ (র) প্রমুখ থেকে এ উক্তিটি বর্ণিত আছে । ]

খুব সম্ভব নবম হিজরীতে এবং তাবুক যুদ্ধের কিছু পূর্বে এই পত্র লেখালেখি হয়েছিল, কেননা কিছুদিন পরই আবু হুরায়রা প্রমুখকে বাহরাইন পাঠানো হয়েছিল এবং মুনযারের কাছে সংগৃহীত জিযিয়া সমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল । এই সাথে অন্য একজন মুসলমান শাসককেও লেখা হয়েছিল, যেন তিনি স্থানীয় মুসলমানদের কাছ থেকে আদায়কৃত কর (বিশেষ করে যাকাত) আবূ হুরায়রা প্রমুখের হাতে মদীনায় পাঠিয়ে দেন । এসব অর্থ তাবুক অভিযানের প্রস্তুতিতে খরচ করা হয়েছিল ।

এরই কাছাকাছি সময়ে ইয়ামনের গভর্নরদের নামে রসূলুল্লাহ্ (সা) যে সমস্ত পত্র পাঠিয়েছেন তাতেও স্থানীয় য়াহূদীদের উপর জিযিয়া কর ধার্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল । একটি পত্রের (যা ইবনে হিশাম প্রভৃতিতে আছে) বচন ছিল, 'যে সমস্ত য়াহূদী তাদের ধর্ম ছাড়তে চায় না তাদের উপর কোনরূপ জবরদস্তি করা হবে না, তবে তাদের উপর জিযিয়া ধার্য করা হবে ।'

পরিশিষ্ট
কুরআনী নির্দেশ অনুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে য়াহুদী প্রজারা আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের অধিকারী ছিল । তাদের দু'দলের মধ্যে কোন বিরোধ দেখা দিলে তাদের বিচারকরা তাদের আইন অনুযায়ী সে বিরোধের মীমাংসা করে দিতেন । অবশ্য এ অনুমতিও ছিল যে, তারা ইচ্ছা করলে তাদের মোকদ্দমা ইসলামী আদালতেও পেশ করতে পারবে । এ ধরনের কিছু মোকদ্দমা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে পেশ করা হয়েছিল এবং তিনি তাওরীত অনুযায়ী সে সমস্ত মোকদ্দমার রায় দিয়েছিলেন । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, "একবার তাঁর কাছে একটি ব্যভিচারের মোকদ্দমা পেশ করা হয় এবং তাতে চারজন য়াহূদী সাক্ষ্য প্রদান করে । তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) য়াহূদীদেরকেই জিজ্ঞাসা করেন, 'এ ব্যাপারে তোমাদের আইন কি?' তারা উত্তর দেয়, 'মুখে কালি মাখিয়ে ঘোরানো ।' রসূলুল্লাহ্ (সা) এতে আশ্বস্ত না হয়ে একখানি তাওরীত চেয়ে পাঠান এবং পড়িয়ে জানতে পারেন যে, অনুরূপ অপরাধের শাস্তি হচ্ছে প্রস্তর নিক্ষেপ । অতএব সে শাস্তিই কার্যকর করা হয় । (বুখারী, ইবনে হিশাম ইত্যাদি)

উল্লেখযোগ্য যে, আজকালও তাওরীত পাওয়া যায়, কিন্তু তাতে উপরিউক্ত শাস্তির উল্লেখ পাওয়া যায় না । কিন্তু ইনজীলের একটি কাহিনী এখানে পাওয়া যায় । আর তা হচ্ছে, "ব্যভিচারের অভিযোগে একটি স্ত্রীলোককে হযরত ঈসা (আ)-এর সামনে পেশ করা হয় এবং বলা হয় যে, তাওরীতের মধ্যে এর শাস্তি হচ্ছে প্রস্তর নিক্ষেপ । এখন আপনার রায় কি?..... ইত্যাদি ।" এর দ্বারা রসূল চরিত্র রচয়িতাদের বর্ণনার সত্যতা এবং তাওরীতের মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়েছে বলে কুরআন যে দাবি করেছে তার যথার্থতা প্রমাণিত হয় ।

মদীনার একজন য়াহূদী জনৈক স্ত্রীলোককে পাথর দ্বারা পর পর কয়েকটি আঘাতে হত্যা করলে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাওরীতের "কিসাস" আইন অনুযায়ী তাকে অনুরূপভাবে হত্যা করার নির্দেশ দেন (বুখারী, তাফসীরে তাবারী প্রভৃতি) ।

আরবী সাহিত্যে য়াহুদী জাতির অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত হয়ে আছে । প্রতিশ্রুতি পালনের ক্ষেত্রে তাদেরই সামওয়াল বিন আদিয়া যেমন অপরিসীম খ্যাতি অর্জন করেছেন, তেমনি মিথ্যাচার ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ক্ষেত্রে তাদেরই আরকোব যারপর নাই কুখ্যাত হয়ে আছে । কুরআনেও তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, 'তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যার কাছে বিপুল সম্পদ আমানত রাখলেও তা সে ফিরিয়ে দেবে, আবার এমন লোকও আছে যার কাছে একটি দীনারও আমানত রাখলে সে তা ফিরিয়ে দেবে না, যতক্ষণ না তুমি তার মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাক' (৩ : ৭৫) । এভাবে কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় য়াহূদীদের অবিশ্বস্ততা, নির্দয়তা, কাপুরুষতা প্রভৃতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ।

য়াহূদীদের history সম্পর্কে কুরআনের একটি বিবরণ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য (দ্বিতীয় পারায় শেষাংশে দ্রষ্টব্য) । বলা হয়ে থাকে যে হযরত মূসা (আ)-এর ইন্তিকালের পর য়াহুদীদের মধ্যে একজন নবীর আবির্ভাব হলো । তখন সামরিক এবং রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে য়াহূদীদের বিশেষ কোন যোগ্যতা ছিল না । যা হোক তারা নবীর কাছে ইচ্ছা ব্যক্ত করলো যেন তিনি তাদের জন্য একজন বাদশাহ ঠিক করে দেন, যার নেতৃত্বে তারা আল্লাহ্ পথে যুদ্ধ করবে । কিন্তু নবী তাদের বুঝালেন, তোমরা যুদ্ধের নাম নেবে না । কেননা আল্লাহর পক্ষ থেকে যদি একবার যুদ্ধ ফরয হয়ে যায়, আর তখন তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন কর তাহলে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত মারাত্মক । তারা বললো, 'আমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবো কেন? আমাদেরকে যে আমাদের ঘরবাড়ি ও সন্তান-সন্ততি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ।' অতঃপর শাওল নামক এক ব্যক্তিকে তাদের 'তালোত' বা বাদশাহ নিযুক্ত করা হলো এবং বলা হলো যে, সে আল্লাহর মনোনীত । য়াহূদীরা তখন আপত্তি করে উঠলো, 'এ যে গরীব ।' কিন্তু নবী বললেন, একে আল্লাহ্ প্রচুর জ্ঞান-বুদ্ধি ও দৈহিক শক্তি দিয়েছেন ইত্যাদি, ইত্যাদি ।

এই কাহিনীর মধ্যে ধর্মনীতি এবং রাজনীতিকে পৃথক করা হয়েছে এবং নবীর কাজ ও বাদশাহর কাজের মধ্যে মোটামুটি সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যদিও নবী এবং বাদশাহ উভয়ই আল্লাহর নির্দেশের অধীন । উপরন্তু ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই কারো চরিত্রকে কটাক্ষ করে কিছু বলতে বারণ করা হয়েছে । খুব সম্ভব এই জীবনদর্শন ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে । ফলে কোন রাজনীতিক আল্লাহর হুকুমের স্থলে নিজের হুকুম জারী করলেও তাকে কটাক্ষ করে কিছু বলা হয় না এবং মনে করা হয় যে, এক ব্যক্তির দ্বারা ধর্ম ও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব না হলে দু'ব্যক্তির মধ্যে তা ভাগ করে দেওয়া হবে (ফলে একজন শুধু ধর্ম নিয়ে অন্যজন শুধু দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকবে) ।

দু'হাজার বছর ধরে ঈসায়ীরা 'আল্লাহ্-দ্রোহিতার' অভিযোগে য়াহুদীদের উপর জুলুম নির্যাতন চালিয়ে আসছে এবং গত চৌদ্দশ' বছর ধরে যতবারই তারা য়াহূদী নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছে, ততবারই ইসলামী রাষ্ট্র য়াহূদীদেরকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে । কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এতদসত্ত্বেও য়াহূদীরা ইসলাম বিরোধিতার ক্ষেত্রে ঈসায়ীদের প্রাণের দোসর । তাদের এ আচরণ শুধু আজ নয়, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর ওহী নাযিলের সময়ও ছিল । তাই সূরা মায়িদায় (যা অবতীর্ণ হওয়ার দিক দিয়ে খুব সম্ভব শেষ সূরা) বলা হয়েছে :
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা য়াহুদী ও খ্রীস্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পরের বন্ধু, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে সে হয়ে যায় তাদেরই একজন । নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অত্যাচারীদের হিদায়েত করেন না ।" (৫ : ৫১)

এর কিছু দিন পর সূরা 'বারাআত' নাযিল হয়-যার মধ্যে অমুসলিম প্রজাদের সাথে আচরণের সাধারণ নিয়ম অর্থাৎ জিযিয়া ধার্য করার নির্দেশ দেওয়া হয় ।

মি. পিকথল তাঁর কুরআনের ইংরেজী অনুবাদের ভূমিকায় য়াহূদীদের মনোদর্শনের একটি সুন্দর নকশা এঁকেছেন, যেমন-
শেষ নবীর আগমন মুহূর্তে য়াহূদীদের এই ধারণা ছিল যে, তাঁর আগমনের মাধ্যমে তারা দুনিয়ার একটি শাসক সম্প্রদায়ে পরিণত হবে । কিন্তু যখন নবী এসে বংশ-গোত্রের সাম্য এবং "ইন্না আকরামাকুম 'ইনদাল্লাহি আতকাকুম" (নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি অভিজাত যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু ।) নীতি প্রতিষ্ঠা করলেন তখন তারা অসন্তুষ্ট ও নিরাশ হলো ।

টিকাঃ
১. মদীনায় সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী য়াহুদীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল যে, বহিরাক্রমণ প্রতিরোধে তারা মুসলমানদেরই সমপরিমাণ অংশ নেবে । কিন্তু ওহুদ যুদ্ধকালে য়াহুদীরা সাধারণভাবে কোন সাহায্য তো করেই নি বরং মুনাফিকদের তিন শ' সৈন্য। যারা পুরা ইসলামী সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ ছিল। সম্বলিত একটি বাহিনীকে ধোঁকা দিয়ে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ভীতি ও সন্ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল । ওদের মধ্যে কিছু য়াহূদীও থেকে থাকবে । সর্বোপরি ঐ বাহিনীর উপর য়াহূদীদের যে অসামান্য প্রভাব ছিল তা মোটেই অস্বীকার করা যায় না । খুব সম্ভব এই কারণে ইমাম যুহরীর মতে (ইবনে কাছীর দ্রষ্টব্য) : "ওহুদ যুদ্ধের সময় আনসাররা তাদের মিত্র সম্প্রদায় য়াহুদীদের সাহায্য গ্রহণের জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি বলেছিলেন, না তাদের সাহায্যের আমাদের দরকার নেই ।"
২. এক রাতে তো এমনও আশংকা হয়েছিল যে, ওরা সত্যি সত্যি মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে বসবে । রসূলুল্লাহ্ (সা) তখন পাঁচ শ' সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন-যারা সারা রাত য়াহুদীদের বসতির আশেপাশে 'আল্লাহু আকবর' ধ্বনি দিতে থাকে, যার ফলে ওরা ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে (শামী) ।
৩. ইয়াকৃত ইবনে কাইয়িমও, এর উল্লেখ করেছেন । অতএব এটা তাদের পূর্বেই তৈরী করা হয়েছিল । ইবনে কাছীরও এর উপর পুস্তিকা লিখেছেন ।
৪. হার্শফিল্ড, য়াহূদী আরবে (জার্মান ভাষায় লিখিত) , পৃষ্ঠা ১১০৭ ।
৫. জুইশ কোয়াটারলি (লেওন থেকে প্রকাশিত) , ১৯০৩ ইং, পৃষ্ঠা ১৭৩ ।
৬. এটা মাওলানা মানাযির আহসানের গবেষণালব্ধ তথ্য । অন্যথায় সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে, আরকোব ছিল আমালিকা বংশোদ্ভূত ।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 আরবের সাধারণ গোত্রসমূহের সাথে সম্পর্ক

📄 আরবের সাধারণ গোত্রসমূহের সাথে সম্পর্ক


হাদীসের মধ্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সমাজ-দর্শন বর্ণনা করা হয়েছে । যেমন “যখন আল্লাহ্ তা’আলা কোন জাতির মঙ্গল সাধনের ইচ্ছা করেন তখন সৎলোকদের মধ্য থেকে তাদের শাসক নিযুক্ত করেন । এবং যখন কোন জাতির অমঙ্গল ঘটাতে চান তখন তাদের শাসকের আসনে অসৎ লোককে সমাসীন করেন ।” কোন কোন সময়- জনসাধারণের তাদের শাসকেরই ধর্ম (চরিত্র) অনুসরণ করে প্রবাদ বাক্যটি এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় । الناس على دين ملوكهم

মোটকথা, বিভিন্ন কারণে এবং পূর্ববর্তী নবীদের সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা এবং প্রচার কার্যের ফলশ্রুতির আলোকে রসূলুল্লাহ্ (সা) দীন ও দুনিয়া, ইবাদত-বন্দেগী ও রাজনীতি এবং ইহজীবন ও পরজীবনের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক সৃষ্টির প্রয়াস পান । অন্য কথায় বলতে গেলে, তিনি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই মানসিক ও সামাজিক আন্দোলন পরিচালনার কর্মসূচী গ্রহণ করেন যাতে শীঘ্র শীঘ্র সে আন্দোলন ফলপ্রসূ হয় এবং রাষ্ট্রের আসল লক্ষ্যও অর্জিত হয় । তাই দেখা যায়, মদীনায় হিজরত করার পূর্বেও তিনি ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে প্রায়ই বলতেন, ‘আমার সাহায্য কর তাহলে আল্লাহর সাহায্যে কায়সার ও কিসরার রাজমুকুট তোমাদের পদতলে লুটিয়ে পড়বে ।’ মিনা, মাজনা, মূল মাজায এবং উকাযের মেলাসমূহেও তিনি এই কথা বলতেন । ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে যখন তায়েফ যান তখন সেখানকার সরদারদের কাছেও তিনি এই কথা বলেন ।

আউস এবং খাযরাজ সম্প্রদায়ের কিছু লোক সর্বপ্রথম যখন তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয় তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরী করে দেন । হিজরতের দু'বছর পূর্বে দ্বিতীয় বায়'আতে আকাবায় তিনি প্রত্যেকটি লোকের কাছ থেকে অন্যান্য স্বীকারোক্তির সাথে সাথে "শ্রবণ করা এবং মান্য করাই হবে আমাদের আচরণ চাই আপনার হুকুম আমাদের পছন্দ হোক অথবা না হোক । আমাদের যাকে যে পদেই আপনি নিয়োগ করুন না কেন, আমরা তাতে দ্বিমত পোষণ করবো না । আমরা যেখানেই থাকি না কেন, সত্য প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করবো, আল্লাহর হুকুমের সামনে আমরা কারো তিরস্কার বা ভীতি প্রদর্শনকে থোড়াই কেয়ার করবো এবং সব ব্যাপারে আপনার অনুগত থাকবো ।"-এই স্বীকারোক্তিও গ্রহণ করেন । এর এক বছর পর তৃতীয় বায়'আতে আকাবা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে তিনি পরিষ্কার ভাষায় স্বীকারোক্তি নেন, "যদি আপনি এবং আপনার মক্কাবাসী অনুসারীরা দেশ ত্যাগ করে মদীনায় চলে আসেন, তাহলে আমরা আপনাদের সবাইকে ঠিক সেরূপ সাহায্য-সহায়তা করবো যেরূপ আমাদের স্ত্রী, সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনের বেলায় করে থাকি—এতে যদি সারা বিশ্ববাসীর সাথে লড়তে হয়, তাতেও আমরা রাযী ।" এই সময় মদীনার যে বারোটি গোত্র তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাদের ইসলাম গ্রহণের খবর দিয়েছিল, তিনি তাদের মতানুযায়ী প্রত্যেক গোত্রের জন্য এক এক জন প্রতিনিধিত্বকারী [ যে খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতিনিধিত্ব করবে ] মনোনীত করেন । ইতিহাসে এরাই 'আনসার' নামে খ্যাত ।

উপরিউক্ত চুক্তিটি ছিল জীবন ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন একটি ঘটনা যা তে কিছু লোক সানন্দ চিত্তে এক ব্যক্তিকে তাদের নেতা ও শাসনকর্তা নিয়োগ করেছিল । যদিও আনসারদের ক্ষেত্রে এর পরেও এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যেগুলোর বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে (যেমন মদীনায় হিজরত করে আসার পর কয়েক ডজন মক্কী পরিবারকে তাদেরই সমপর্যায়ের মাদানী পরিবারের সাথে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধকরণ, মদীনাকে একটি নগর রাষ্ট্র ঘোষণা করে তার সীমানা চিহ্নিতকরণ, ঐ রাষ্ট্রের জন্য একটি সংবিধান রচনা ও তার বাস্তবায়ন, ঐ রাষ্ট্রের উদারনীতি ভিত্তিক আদর্শের ভিত্তিতে আশেপাশে য়াহূদী বসতিসমূহকেও তাতে অংশগ্রহণের সুযোগ দান প্রভৃতি) , কিন্তু সেগুলো মূলত রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না বরং ছিল আভ্যন্তরীণ প্রশাসন সম্পর্কিত ।

উপরিউক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি বাস্তবায়নে অবশ্যই কয়েক সপ্তাহ লেগে থাকবে । অতঃপর ছিল রাষ্ট্রীয় সীমানা রক্ষা সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের পালা । কুরায়শদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল । তারা তাদের পার্থিব প্রভাব খাটিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সঙ্গীদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য মদীনাবাসীদের অনবরত শাসিয়ে যাচ্ছিলো । এমতাবস্থায় মদীনার আমদানী-রফতানী ব্যবসার উপর কুরায়শী বাণিজ্য কাফেলার প্রভাব না পড়ে পারে কি?

জুহায়না এবং যুমরার গোত্রসমূহ
অনুমিত হয় যে, মদীনার আনসার গোত্রসমূহ তাদের পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের সাথে জাহিলিয়া যুগেও মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ ছিল—যেমন ছিল পার্শ্ববর্তী য়াহূদী গোত্রসমূহের সাথে । আর য়াহূদী গোত্রসমূহ মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ ছিল গাতফান প্রভৃতি উত্তর আরবীয় গোত্রসমূহের সাথে । সত্যি যদি তাই হয় তাহলে আনসারদের পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহ উত্তরাধিকারসূত্রেই ইসলামী রাষ্ট্রের মিত্রে পরিণত হয়েছিল । হিজরতের ছয় মাস পরই যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) কুরায়শদের সম্পর্কে এই মর্মে তাঁর নীতি নির্ধারণ করেন যে, তাদের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হবে (এবং মক্কায় মুহাজিরদের যে ধন-সম্পদ জবরদস্তিমূলকভাবে আটকিয়ে রাখা হয়েছে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে) এবং সে উদ্দেশ্যে তিনি যখন জুহায়না গোত্রের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ‘আয়েস’ নামক স্থানে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন তখন সেখানকার সরদার ছিলেন মুসলমানদেরই মিত্র । ঐ বাহিনীতে কোন আনসার ছিলেন না বরং সবাই ছিলেন মুহাজির । এমতাবস্থায় মনে করা হয় যে, মাজদী বিন আমর আল জুহনীর সাথে হিজরতের পর হয় খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা) কোন মৈত্রী চুক্তি করেছিলেন, না হয় আনসারদের পুরাতন মৈত্রীচুক্তিকে নবায়িত করে তা মদীনার সকল মুসলমানদের জন্য (ইতিমধ্যে যাদের নেতৃত্বের আসনে খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা) অধিষ্ঠিত হয়েছেন) একটি সাধারণ চুক্তিতে পরিণত করেছিলেন । ইবনে সা‘দ, ইবনে হিশাম প্রমুখ মৈত্রীর উল্লেখ করেছেন, কিন্তু মৈত্রীচুক্তি এবং এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়ের (যেমন তা কখন এবং কোথায় সম্পাদিত হয়েছিল) কোন উল্লেখ করেন নি । তবে তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশন করেছেন । আর তা হলো, মাজদী বিন আম‘র মুসলমান এবং কুরায়শ উভয়েরই মিত্র ছিলেন । এ কারণে তিনি কুরায়শের বাণিজ্য-কাফেলা (তিনশ’ উট সম্বলিত এই কাফেলা আবূ জেহেলের নেতৃত্বে ঐ এলাকা অতিক্রম করছিলো) এবং মুসলমান বাহিনীর (হযরত হামযার নেতৃত্বে যে বাহিনী প্রেরিত হয়েছিলো) মধ্যে সংঘর্ষ হতে দেননি, বরং কৌশলের সাথে কুরায়শী কাফেলাকে নিরাপদে মক্কার দিকে চলে যাবার সুযোগ করে দেন । ফলে ইসলামী বাহিনী মদীনায় ফিরে আসে । এর একমাস পর (শাওয়াল মাসে) আবূ সুফিয়ানের একটি কাফেলাকে বাধাদানের উদ্দেশ্যে 'রাবিগ'-এর দিকে একটি মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করা হয় এবং যীকা'দা মাসে ঐ একই উদ্দেশ্যে আর একটি বাহিনী প্রেরণ করা হয় ।

আয়েস, রাবিগ এবং খায়বর মদীনার পশ্চিম-দক্ষিণে সমুদ্র উপকূলের নিকটে পাশাপাশি অবস্থিত । সিরিয়া, মিসর, প্রভৃতি দেশে যাওয়ার সময় কুরায়শী বাণিজ্য-কাফেলাকে এই অঞ্চলটি অতিক্রম করতে হত । কুরায়শী কাফেলাকে বাধা দান করতে হলে এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সাথে মৈত্রী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা ছিল অত্যন্ত জরুরী । অন্যথায় কুরায়শী কাফেলার খবর যেমন সময়মত পাওয়া যাবে না, তেমনি এ আশংকাও থেকে যাবে যে, এই অঞ্চলের অধিবাসীরা ইসলামী বাহিনীকে সাহায্য দানের পরিবর্তে তাদের বিপক্ষে এবং কুরায়শী কাফেলার অনুকূলে অস্ত্রধারণ করবে ।

সম্ভবত উপরিউক্ত তিনটি অভিযান বিফল হওয়ার কারণে মিত্রদের সংখ্যাবৃদ্ধির ব্যাপারটি তলিয়ে দেখার প্রয়োজন অনুভূত হয় এবং চতুর্থ হিজরীর প্রারম্ভে সফর মাসে খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা) একটি বাহিনী সংগে নিয়ে মদীনার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত 'আবওয়া' বাণিজ্য কেন্দ্রে গমন করেন । মুসলমানদের পৌঁছতে একটু দেরি হওয়ায় এ যাত্রাও কুরায়শী কাফেলা সে স্থান অতিক্রম করে চলে যায় । এবার রসূলুল্লাহ্ (সা) শূনয় হাতে ফিরে আসার পরিবর্তে আশেপাশের অধিবাসীদের সাথে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা চালান এবং বনী যুমরা সম্প্রদায়ের জনৈক সরদার মুহসানা বিন আ'মরের সাথে একটি স্থায়ী মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হন । বাহ্যত এই সমস্ত লোক তখন পর্যন্ত মুসলমান হয়নি । কেননা পরিষ্কার ভাষায় ধর্মযুদ্ধ থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল । সম্ভবত সর্বপ্রথমে সম্পাদিত এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি ছিল নিম্নরূপ :

১. করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে ।
২. এটা আল্লাহর রসূল (মুহাম্মদ)-এর পক্ষ থেকে বনী যুমরার জন্য লিখিত ।
৩. (এই মর্মে যে) এদের মাল সম্পদ এবং প্রাণের নিরাপত্তা থাকবে ।
৪. যে কেউ অত্যাচারমূলকভাবে এদের উপর আকস্মিক হামলা চালাবে, অবশ্যই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে এদের সাহায্য করা হবে ।
৫. আর ততক্ষণ পর্যন্ত নবীকে সাহায্য করা এদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হবে যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্র ঝিনুকের খোসাকে সিক্ত রাখবে । হ্যাঁ, যদি মুসলমানরা আল্লাহর দীনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ করে তখন নবীকে সাহায্য করা এদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হবে না (বরং তখন তারা নিরপেক্ষ থাকবে) । অথবা এর অর্থ এই যে, এরা রসূলুল্লাহর সাহায্য পাবে । তবে যখন আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তখন কোন সাহায্য পাবে না, বরং (তখন) এই চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে ।
৬. এই চুক্তির ভিত্তিতে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল এদের দায়িত্ব নিলেন ।
৭. আর এদেরকে এই শর্তে সাহায্য দেওয়া হবে যে, তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলবে এবং অসৎ কাজ (প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ প্রভৃতি) থেকে নিজেদের দূরে রাখবে (ইবনে সা'দ ২৭২) ।

জুহায়না গোত্রের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক দিনের পর দিন উন্নত হতে থাকে । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর 'মূল মারওয়ার' অধিবাসী আ'ওসাজা বিন হারমালা আল-জুহনীকে একটি বিরাট জায়গীর দান করেন (ইবনে সা'দ, প্রভৃতি) । এই স্থানটি (মূল মারওয়া) সমুদ্র উপকূলের নিকটে অবস্থিত । কুরায়শী কাফেলা এই দিক দিয়েই যাতায়াত করত । সম্ভবত জায়গাটি ছিল পার্বত্য-বন্ধুর এবং একটি শ্রেষ্ঠ ঘাঁটি । হুদায়বিয়া চুক্তির শর্তানুযায়ী যখন মক্কার মুসলমানরা ধর্মীয় নির্যাতন সত্ত্বেও মদীনায় আশ্রয় নিতে পারত না তখন ওদেরই কিছুসংখ্যক ব্যক্তি আবু বসীরের নেতৃত্বে মূল মারওয়ায় একত্রিত হয় এবং কুরায়শী কাফেলাকে এদিক দিয়ে আসা যাওয়ার সময় হয়রানী করতে থাকে (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৭৫২) । নিশ্চয়ই আওসাজা বিন হারমালা (জায়গীরদার) ওদেরকে এই সুযোগ দিয়েছিলেন । অনুরূপভাবে বনী শামাখ (বা বনী শানাখ)-কে-যারা জুহায়নারই একটি শাখা-গোত্র ছিল বেশ বড় একটি অঞ্চলের জায়গীর প্রদান করা হয় (ইবনে সা'দ প্রভৃতি) । সম্ভবত এভাবেই কুরায়শের বাণিজ্য-পথ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল ।

এগুলো হলো প্রাথমিক যুগের ঘটনা । জুহায়নার শাখা গোত্র বনী জুরমযকেও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ (সা) একটি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে (ইবনে সা'দ) এই বলে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে, ইসলাম গ্রহণের সময় তাদের অধিকারে যে এলাকা ছিল তা তাদেরই থাকবে । খুব সম্ভব এটি ছিল একটি বিতর্কিত এলাকা এবং গৃহযুদ্ধের কারণে এই এলাকাটি তাদের দখল থেকে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল । উপরিউক্ত চুক্তিটি বনী জুরমুযের লোকদেরকে ইসলাম গ্রহণের প্রতি অনুপ্রাণিত করে থাকবে । সম্ভবত এই ঘটনা বদর-উত্তর কালে ঘটেছিল ।

রসূল যুগের শেষভাগে আমর বিন মুয়ীদ আল-জুহনী এবং বনী হারকা'হ ও বনী জুরমুযকে একটি বিশেষ চুক্তিপত্রের মাধ্যমে এই শর্তে নিরাপত্তা প্রদান করা হয় যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করবে, নামায পড়বে, যাকাত ও কর দেবে, যুদ্ধে প্রাপ্ত মালে গনীমতের খুমুস (১/৫ অংশ) কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেবে, তাদের অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবে এবং সুদ ছাড়া তাঁদের যাবতীয় ঋণের শুধুমাত্র মূলধন আদায় করবে । ঐ চুক্তিতে পরিষ্কার ভাষায় এও বলা হয়েছিল যে, কোন অপরিচিত ব্যক্তি ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এই গোত্রের সাথে মিশে গেলে সেও এই অধিকার (অর্থাৎ নিরাপত্তা) ভোগ করবে । (এই শেষ শর্তের মাধ্যমে সম্ভবত উপরিউক্ত গোত্রের অমুসলিম শাখা গোত্রসমূহের গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে নিরাপত্তা গ্রহণের একটি সুন্দর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ।)

রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওফাতের এক কিংবা দু'মাস পূর্বে উপরিউক্ত গোত্রের কাছে একটি নির্দেশনামা এই মর্মে পাঠানো হয়েছিল যে, স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণকারী কোন পশুর লাশ থেকে তারা যেন কোনভাবে উপকৃত না হয় । কেননা এগুলো মৃত এবং অপবিত্র (ইবনে তোলোন, তিরমিযী, তায়ালিসী প্রভৃতি) ।

বনূ যুমরার সাথে মিত্রতা বন্ধনের কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে । বনূ যুমরাও ছিল একটি বড় গোত্র । বনী আব্দ বিন আ'দী নামক এই গোত্রেরই একটি শাখা গোত্র মক্কার হরমেরই অধিবাসী হয়ে গিয়েছিল । অতএব কুরায়শের এত নিকট থেকে কুরায়শেরই বিরোধিতা করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল না । এতদসত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজনের ক্রমাগত চাপ সৃষ্টির ফলে তারা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে একটি প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই মনোভাব প্রকাশ করে যে, কুরায়শের সাথে সম্পর্ক রেখেও তারা মুসলমানদের সাথে মিত্রতা বন্ধনে আগ্রহী এবং কুরায়শের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারটি ছাড়া বাকি সব ব্যাপারেই তারা মুসলমানদের মিত্র হতে চায় (ইবনে সা'দ, ৪৮/১) । কুরায়শকে তার মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং মুসলমানদের মিত্র গোত্রসমূহের দ্বারা তাদেরকে ঘিরে ফেলার যে কৌশল রসূলুল্লাহ্ (সা) অবলম্বন করেছিলেন এটাও ছিল তার পক্ষে সহায়ক; তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) বনী আব্দ বিন আ'দী গোত্রকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেন । বনূ গিফার ছিল বনূ যুমরার আর একটি শাখাগোত্র । হযরত আবু যর গিফারী এই গোত্রেরই লোক ছিলেন । এই গোত্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বচন এবং শর্তাদির প্রতি লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, বদর যুদ্ধের সমসাময়িককালে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল । চুক্তিটি ছিল নিম্নরূপ :

১. এই চুক্তি বনূ গিফারের জন্য (সম্পাদিত) ।
২. এরা মুসলমানদেরই একটি দল । এরা সেই সমস্ত অধিকার ভোগ করবে যা মুসলমানরা ভোগ করে থাকে এবং সেই সমস্ত দায়িত্ব পালন করবে যা মুসলমানরা করে থাকে ।
৩. নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ্ (সা) এদের ধনসম্পদ এবং প্রাণের উপর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দায়িত্ব গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ।
৪. এদেরকে ঐ সমস্ত শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করা হবে, যারা তাদের উপর অত্যাচারমূলক আক্রমণ চালাবে ।
৫. আর নবী যখন এদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান জানাবেন তখন তারা সাড়া দেবে এবং নবীকে সাহায্য করা তাদের জন্য হবে ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য) যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্র ঝিনুকের খোসাকে সিক্ত রাখবে । হ্যাঁ, যদি কেউ দীনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ করে তাহলে অন্য কথা ।
৬. এই লেখা (চুক্তি) কোন অপরাধের (পাকড়াও-এর ক্ষেত্রে) প্রতিবন্ধক হবে না (ইবনে সা'দ) ।

বলা হয়ে থাকে যে, হযরত আবূ যর গিফারী প্রথমে খ্রীস্টান ছিলেন অথবা খ্রীস্টধর্ম দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত ছিলেন । তাহলে মুসলমানদের এই চুক্তি কি খ্রীস্টান যিম্মীদের সাথে (যেহেতু বন্ গিফার খ্রীস্টান ছিল) সম্পাদিত হয়েছিল? যদি এই চুক্তির দ্বিতীয় দফার সাথে মদীনার সংবিধানের ২৫তম দফার তুলনা করা হয় (যেখানে আবূ উবায়েদ থেকে বর্ণিত আছে যে, মদীনার য়াহূদীদেরকে 'উম্মাতুম্ মিনাল মুসলিমীন' অর্থাৎ মুসলমানদেরই একটি দল আখ্যা দেওয়া হয়েছিল । আর এই বর্ণনা যদি সঠিক হয়) তাহলে এখানে অসামঞ্জস্যের কিছু থাকে না । অবশ্য এই চুক্তির ৫ম দফা (যেখানে বলা হয়েছে যে, 'যদি কেউ দীনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ করে তাহলে অন্য কথা) বনূ গিফারকে মুসলমান কল্পনা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, তবে মদীনার সংবিধানের ৪৫তম দফার প্রতি লক্ষ্য করলে যেখানে দেখা যায় যে, রসূলুল্লাহ (সা) মদীনার য়াহূদীদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ কথা বলেছিলেন] এই প্রতিবন্ধকতাও আর থাকে না । খুব সম্ভব বনু গিফার গোত্রের কিছু লোক সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল । বাকীরা যদি খ্রীস্টান অথবা পৌত্তলিক অবস্থায় মুসলমানদের সাথে মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাহলে তো বাধার কিছু নেই । অবশ্য পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে এরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল ।

মুযীনা
এই গোত্র মদীনা থেকে বিশ মাইল দূরে বসবাস করত বলে ইবনে সা'দ (৩৮২) উল্লেখ করেছেন; কিন্তু কোন্ দিকে বসবাস করত তা উল্লেখ করেন নি । ধারণা করা হয় যে, এরাও মদীনার পশ্চিম দিকে ইয়ানবো প্রভৃতি উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহের ধারে কাছে বসবাস করত । কেননা এই গোত্রের একজন নেতাকে কাবার্লিয়ার খনিসমূহ জায়গীর স্বরূপ প্রদান করা হয়েছিল । সাম্প্রতিককালে একটি আমেরিকান কোম্পানী কাবীল নামক একটি পরিত্যক্ত প্রাচীন খনি নতুন করে খনন করে তা থেকে দু বছর পর্যন্ত সোনা উত্তোলন করতে থাকে (ঐ কোম্পানীর একজন কর্মকর্তা ১৩৬৫ হিজরীতে মদীনায় এই তথ্য প্রকাশ করেন) । সোনা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় খনিটি পুনরায় পরিত্যক্ত হয়েছে । ঐ খনির নিকটে একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র থেকে উপরিউক্ত কর্মকর্তা একটি লিপিও উদ্ধার করেন যার মধ্যে বিলাল বিন হারিস মুযনীকে খনির জায়গীর প্রদান সম্পর্কিত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রখানি ক্ষোদিত ছিল । কাবার্লিয়া মদীনার উত্তর-পশ্চিমে ফুরুর দিকে বলে আবূ ইউসুফ (র) বর্ণনা করেছেন । যদি বর্তমান কাবীলই প্রাচীন কাবার্লিয়া হয়ে থাকে এবং আবূ ইউসুফ (র)-এর বর্ণনাও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় তাহলে তো দিক এবং স্থান উভয়ই নির্ণীত হয়ে গেল । অতএব বলা যায় যে, কুরায়শের ঠিক বাণিজ্য পথেই ছিল মুযীনা গোত্রের বসতি । অতএব রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ অঞ্চলের একজন সরদারকে একটি মূল্যবান জায়গীর প্রদানের মাধ্যমে কুরায়শের বাণিজ্য কাফেলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে মুসলমানদের সাহায্য করার জন্য তাকে এবং তার গোত্রকে যেন বাধ্য করে নিয়েছিলেন । এই জায়গীরর উল্লেখ করার সাথে সাথে আমাদের গ্রন্থকার এও লিপিবদ্ধ করেছেন যে এই খনি থেকে আজও কোন যাকাত আদায় হয় না । সম্ভবত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যাবতীয় অধিকার সহ ঐ জায়গীরটি প্রদান করা হয়েছিল । বিলাল বিন হারিস নামক ঐ সরদারকে খনির জায়গীর প্রদান করতে গিয়ে পত্রে লেখা হয়েছিল যে, 'রসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে কোন মুসলমানের সম্পত্তি দেন নি ।' অতএব ধরে নেওয়া যায় যে, ঐ সম্পত্তি হয় পতিত এবং লাওয়ারিশ ছিল, নয়ত মুসলমানদের শত্রু মুযীনা গোত্রের অমুসলিম লোকেরা এর মালিক ছিল এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ সম্পত্তি বিলালকে দান করেছিলেন । ইবনে সা'দের মতে, এরা পঞ্চম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাদের কয়েকশ' লোক মদীনায় চলে আসে । কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন যাতে করে কোন অমুসলিম গোত্র ঐ এলাকাটি দখল করে না নেয় । রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ সরদারকে কিছু চাষোপযোগী জমিও জায়গীর স্বরূপ প্রদান করেছিলেন বলে ইবনে সা'দ প্রমুখ উল্লেখ করেছেন । আবূ ইউসুফ (র) প্রমুখের মতে ঐ জমি চাষাবাদ না করে পতিত দেওয়ার কারণে হযরত উমর (রা) এর কিছু অংশ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত করে নতুন বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে বন্টন করে দেন । ঐ পত্রে কাতিব (লেখক)-এর নাম মুআ'ভিয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে । সম্ভবত মক্কা বিজয়ের পর এই দ্বিতীয় দানপত্রটি প্রদান করা হয় ।

আশজা' ও আমীর বিন ইকরামা
আশজা বাহ্যত গিতফান গোত্রেরই একটি শাখা । এরা মদীনার উত্তরে কুরায়শের বাণিজ্যপথে বসবাস করত । দু'তিন বছর অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যখন মুসলমানেরা এই বাণিজ্যপথের উপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় তখন এই পুরা গোত্র-যারা বাণিজ্য কাফেলার জন্য সরাইখানা খুলে নিজেদের জীবিকার সংস্থান করত-সম্পূর্ণরূপে বেকার হয়ে যায় । ইবনে সা'দের বর্ণনানুযায়ী তারা তাদের এই বেকারত্বকে কাটিয়ে উঠার উদ্দেশ্যে মদীনায় একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে এবং রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয় । নায়ীম বিন মাসউদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনেকটা প্রাথমিক যুগের । ঐতিহাসিকদের মতে তারা খন্দক যুদ্ধের (৫ম হিজরী) পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল । সম্পাদিত চুক্তির বচন ছিল নিম্নরূপ :

১. করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে ।
২. নায়ীম বিন মাসউদ বিন রুখায়লা আশজায়ী এই কথার উপর অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন ।
৩. তিনি রসূলুল্লাহর সাথে পরস্পর সাহায্য ও মঙ্গল সাধনের উপর অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ওহুদ পাহাড় আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্র ঝিনুকের খোসাকে সিক্ত রাখবে ।
৪. আর (এই চুক্তি) আলী লিখেছেন (ইবনে সা'দ) ।

আ'মীর বিন ইকরামা গোত্রও আশজায়ীদের আত্মীয় ছিল । রসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে বাণিজ্য কাফেলার জন্য সরাইখানা খোলার অধিকার প্রদান করেন (ইবনে সা'দ ৩২১) এবং তাদের এক সরদারকে একটি জায়গীরও প্রদান করেন (ইবনে সা'দ ২৫) ।

এটা খন্দক যুদ্ধের পূর্বেকার রাজনৈতিক কর্মসূচী-যার মাধ্যমে কুরায়শদের বাণিজ্যপথ রুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল । খন্দক যুদ্ধের পর রসূলুল্লাহ্ (সা) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এখন থেকে কুরায়শদের অগ্রাভিযান বন্ধ থাকবে এবং মুসলমানরাই আগে বেড়ে তাদেরকে উচিত শিক্ষা দেবে । মূলত তখন থেকে ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকাণ্ডের পরিবর্তে গঠনমূলক কার্যকলাপ শুরু হয়ে গিয়েছিল । অতঃপর বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তিসমূহের মধ্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য ছিল যে, তখন থেকে ইসলামের মিত্র গোত্রসমূহের সাহায্যে মক্কার চতুর্দিক ঘিরে ফেলার উদ্যোগ চলছিলো । এক্ষেত্রে কুরায়শ-শত্রুদেরকে মুসলমানদের মিত্র করে নেওয়া খুবই সহজ ছিল । তবে চেষ্টা চলছিলো, যেন কুরায়শ-মিত্রদেরকেও মুসলমানদের মিত্র করে নেওয়া যায় অথবা কমপক্ষে তাদেরকে নিরপেক্ষ করে রাখা যায় ।

খাযাআ'
খাযাআ' মূলত ছিল একটি কাহতানী বা ইয়ামনী গোত্র । তবে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে তারা মক্কার আশেপাশে বসবাস করত । হজ্বের মওসুমে পুরা মীনায় যত লোক অবস্থান করে এই গোত্রের লোকসংখ্যা ছিল অনেকটা তাই । এই গোত্রের অনেকগুলো শাখা ছিল এবং পঞ্চম হিজরীতে বনী মাসতালাক ছাড়া বাকি সবার সাথেই মুসলমানদের সম্পর্ক সাধারণভাবে ভাল ছিল । অবশ্য এর কিছু ঐতিহাসিক কারণও ছিল । জাহিলিয়া যুগে আবদুল মুত্তালিব এই গোত্রের সাথে বংশ পরস্পরায় চিরস্থায়ী মিত্রতাবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খান্দান সে মিত্রতাকে অটুট রেখেছিল । ষষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া সন্ধিকালে যখন এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, এই চুক্তি দ্বারা শুধু মদীনার মুসলমান এবং মক্কার কুরায়শরাই নয় বরং যে সমস্ত গোত্র এদের যে কারো পক্ষে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করবে, তারাও উপকৃত হতে পারবে—তখন খাযাআ' গোত্র সাথে সাথেই ঘোষণা করে যে, তাদেরকে যেন রসূলুল্লাহর পক্ষে গণ্য করা হয় । এই সুযোগে রসূলুল্লাহ্ (সা) আবদুল মুত্তালিবের সেই পুরাতন মিত্রতা-বন্ধন নবায়ন করেন এবং বলেন, 'জাহিলিয়া যুগের প্রতিটি মিত্রতাবন্ধনকে ইসলাম আরো বেশি শক্তিশালী করে । পরবর্তী সময়ে যখন কুরায়শের মিত্র বনূ বকর কোন ব্যাপারে রাগান্বিত হয়ে খাযায়ীদের উপর নিশি আক্রমণ চালায় এবং কুরায়শও এ ব্যাপারে তাদেরকে সহায়তা করে তখন স্বাভাবিকভাবেই হুদায়বিয়া চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায় এবং মুসলমানরা কুরায়শদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে মক্কা নগরী দখল করে নেয় । এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না এবং এটাও সঠিকভাবে জানা যায় না যে, কি কারণে বনূ বকর খাযায়ীদের উপর আক্রমণ চালিয়েছিল । অবশ্য এটুকু জানা যায় যে, একজন খাযায়ী দূত ফরিয়াদ নিয়ে দ্রুতবেগে মদীনায় এসেছিল এবং একটি ছন্দবদ্ধ আবেদন পেশ করেছিল । তার গুরুত্বপূর্ণ বচনগুলো ছিল :
لا هم اني ناشد محمدا - حلف ابينا وابيه الا قلوا ان قريشا خلفوك الموعدا - ونقضوا ميثاقك المؤكدا هم ثبتونا بالوتير هجدا - فقتلونا ركعا وسجدا.
"হে আল্লাহ্, আমি মুহাম্মদকে সেই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, যে অঙ্গীকার আমাদের পিতা (পূর্বপুরুষ) এবং তার পিতার (পূর্বপুরুষ) মধ্যে হয়েছিল ।
(ফরিয়াদ এই যে,) কুরায়শ তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং তোমাদের পাকা অঙ্গীকারকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে ।
ওরা আমাদেরকে অতীতের শুভ্র ভূমিতে ঘুমন্ত অবস্থায় চেপে ধরেছে এবং রুকু' ও সিজদারত অবস্থায় আমাদেরকে হত্যা করেছে ।
তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) দূতকে এই বলে সান্ত্বনা দেন যে, 'তোমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে ।'

বুদায়েল প্রমুখ খাযায়ী' সরদারদের (যারা হুদায়বিয়া চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিল) নামে রসূলুল্লাহ (সা) একটি পত্র লিখেছিলেন বলে ইবনে সা'দ প্রমুখ উল্লেখ করেছেন । বাহ্যত এটা হুদায়বিয়া চুক্তির পরবর্তী এবং মক্কা বিজয়ের পূর্ববর্তী সময়কার ঘটনা । ঐ পত্রে রসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে আপন বন্ধুত্ব ও ঐকান্তিক ভালোবাসার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তারাও মক্কায় মদীনার মুসলমানদের ন্যায় সমপরিমাণ অধিকার ভোগ করবে । অর্থাৎ তারা হজ্ব ও উমরা পালনের জন্য সেখানে যেতে পারবে কিন্তু স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে না । পত্রে এটাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, হুদায়বিয়া চুক্তির পর খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে খাযায়ীদেরকে কোনরূপ হয়রানী করা হয় নি এবং ভবিষ্যতেও এর কোন আশংকা নেই । অতঃপর এই তথ্য পরিবেশন করা হয় যে, কিলাব এবং হাওয়াযিনের অমুক অমুক সরদার তাদের গোত্রের লোকদের নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তাদেরকে বারবার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যে, মুসলমান এবং খাযায়ীদের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠিত । ধারণা করা হয় যে, হুদায়বিয়া চুক্তির পর খাযায়ীরা মক্কায় কোন অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল এবং সম্ভবত এই অসুবিধা এ কারণে হয়েছিল যে, তারা হুদায়বিয়া চুক্তিতে নিম্নে বর্ণিত অধিকারসমূহের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে অত্যধিক উপযুক্ত মনে করত । সম্ভবত এ থেকেই রেষারেষির সূচনা হয়, যার পরিণাম ইতিপূর্বে বর্ণিত খুনাখুনিতে গিয়ে দাঁড়ায় ।

আসলাম গোত্র ছিল খাযাআ'রই একটি শাখা । ওদের নামে রসূলুল্লাহ্ (সা) একটি পত্র লিখেছিলেন বলে ইবনে সা'দ (২৪১) উল্লেখ করেছেন । পত্রের বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ :
১. খাযাআ'র শাখাগোত্র 'আসলাম'-এর ঐ সমস্ত লোকের জন্য যারা ঈমান আনে, নামায পড়ে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহর দীনের প্রতি সদয় ভাব দেখায় (নিম্নোক্ত সুযোগ দেওয়া হবে) ।
২. এদেরকে ঐ সমস্ত লোকের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রদান করা হবে যারা অত্যাচারমূলকভাবে তাদের উপর আকস্মিক হামলা চালায় ।
৩. নবী যখন এদেরকে সাহায্যের জন্য আহবান জানাবেন তখন তাঁকে সাহায্য করা তাদের জন্য হবে ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য) ।
৪. এদের যাযাবরদের ক্ষেত্রেও সেই অধিকার এবং দায়িত্ব প্রযোজ্য হবে যা এদের পল্লীবাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ।
৫. এরা যেখানেই থাকুক না কেন, মুহাজির হিসাবে গণ্য হবে ।
৬. এটা আল-আ'লা বিন আল-হাযরী লিপিবদ্ধ করেছেন এবং এর সাক্ষী হয়েছেন ।

এই দলীলের প্রথম লাইনেই 'আসলাম বিন খাযাআ'- এই শব্দগুলো রয়েছে । কিন্তু ইবনে সা'দের গুরু ওয়াকিদী তাঁর 'কিতাবুল মাগাযী'-এর মধ্যে এই দলীলটিকে কিছু পরিমাণ দীর্ঘ করে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং 'আসলাম-এর পরিবর্তে 'আসলুম' লিখেছেন । 'মিন খাযাআ' (খাযাআ হতে) শব্দ সেখানে নেই । তবে লেখা হয়েছে, 'রসূলুল্লাহ্ (সা) গাদীরুল আশতাত নামক একটি জলাশয়ের ধারে যখন তাঁবু ফেলেছিলেন, তখন এখানকার সরদার বুরায়দা বিন আল-খাসীব সেখানে উপস্থিত হন এবং ইসলাম গ্রহণের প্রতি তাঁর গোত্রের সম্মতির কথা জানিয়ে নিবেদন করেন, 'এই হচ্ছে আমাদের বসতি এবং গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ার । কিছু লোক হিজরত করে মদীনায় চলে গেছে এবং বাকিরা এখানে আছে । এখন আপনি যেই নির্দেশ দেন তাই আমাদের শিরোধার্য ।' রসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে সেখানেই বসবাসের নির্দেশ দেন । 'আসলুম' খাযাআ' গোত্রের নয় বরং কুযাআ' গোত্রের একটি শাখা ছিল । এরা মক্কার নিকটে নয় বরং মদীনা থেকেও উত্তরে কুযায়ীদের সাথে বসবাস করত । গাদীরুল আশতাতের কোন সন্ধান এখন পাওয়া যায় না । অতএব উপরে উল্লেখিত দুইটি বর্ণনার কোনটি সত্যি তা বলা মুশকিল । ইবনে সা'দের বর্ণনায় খাযাআ' শব্দটি পরিষ্কারভাবে লেখা হয়েছে এবং ওয়াকিদীর বর্ণনায় শুধু শাখা গোত্রের নাম 'আসলাম'-এর পরিবর্তে 'আসলুম' ('যবর'-এর পরিবর্তে পেশ) লেখা হয়েছে । অতএব লিপিবদ্ধকারীর ভুলেও এটা হতে পারে ।

এই দলীলের মধ্যে হিজরতের নির্দেশ থেকে গোত্রের বাকি লোকদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে । মদীনায় আগমনের পর রসূলুল্লাহ্ (সা) নওমুসলিম লোকদেরকে হিজরত করে ইসলামী রাষ্ট্রে চলে আসার নির্দেশ দিতেন । অবশ্য মক্কা বিজয়ের পর সে নির্দেশ রহিত করা হয় । তবে মক্কা বিজয়ের পূর্বেও কখনো কখনো এ নির্দেশ থেকে যেকোন গোত্রের লোককে অব্যাহতি দেওয়া হত, উপরোল্লেখিত ঘটনা তার প্রমাণ ।

ইবনে সা'দের বর্ণনায় যাকাতের উল্লেখ আছে । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে নবম হিজরীতে যথারীতি যাকাত বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয় । কিন্তু স্বেচ্ছাকৃতভাবে ও অনির্দিষ্ট হারে যাকাত প্রদানের উল্লেখ ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেও পাওয়া যায় । হযরত জাফর ত্বাইয়ার হিজরত করে হাবশায় গিয়েছিলেন । সেখানে নাজ্জাশীর এক জিজ্ঞাসার উত্তরে অন্যান্য বিষয়ের সাথে তিনি এটাও বলেছিলেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) মুসলমানদেরকে যাকাত প্রদানের জন্য তাকিদ দিয়ে থাকেন । কুরআন মজীদের মক্কী সূরাগুলোর মধ্যে বনী ইসরাইল সম্পর্কিত ঘটনায় কয়েকবার যাকাতের উল্লেখ করা হয়েছে । এ থেকে ধারণা করা যায় যে, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেও যাকাতদানের জন্য মুসলমানদের উৎসাহিত করা হত ।

অন্যান্য আরো কিছু সম্প্রদায়ের মত আসলাম সম্প্রদায়েরও অন্তত একজন সরদার হুসাইন বিন আউসকে জায়গীর প্রদান করা হয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) এ সম্পর্কিত একটি লিখিত নির্দেশও দিয়েছিলেন (ইবনে সা'দ) ।

ইবনুল আসীর প্রমুখের বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা) বেশ কয়েকজন আসলামী সরদারের নামে পত্র লিখেছিলেন । কিন্তু ঐ পত্রসমূহের বচন কি ছিল তা তাঁরা উল্লেখ করেন নি । ফলে ঐ সমস্ত পত্রের বিষয়বস্তু কি ছিল তা বলা মুশকিল ।

জাযাম, কুযাআ' ও আযরা
আরবের উত্তরে তাবুকের নিকটবর্তী অঞ্চলে এই সমস্ত গোত্রের লোক বসবাস করত । বাহ্যত সপ্তম হিজরীতে খায়বর বিজয়ের পর এই সমস্ত লোকের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক সৃষ্টি হয় ।

ঐ সময়ে বিভিন্ন রাজা-বাদশার কাছে ধর্মপ্রচারমূলক পত্র প্রেরিত হয়েছিল । ইবনে হিশাম প্রমুখ লিখেছেন, "রসূলুল্লাহর জনৈক দূতের আসবাব সামগ্রী 'জাযাম' গোত্রেরই এলাকায় কিছুসংখ্যক ডাকাত লুণ্ঠন করে । তখন আশেপাশের জাযামী গোত্রের কিছু নও-মুসলিম ঐ দূতের সাহায্যে এগিয়ে যায় এবং লুন্ঠিত আসবাব সামগ্রী ফিরিয়ে নিয়ে আসে । এই সংবাদ পেয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ এলাকার লোককে উচিত শিক্ষা দানের জন্য একটি বাহিনী প্রেরণ করেন; কিন্তু ভুলবশত কিছু নির্দোষ লোকও তাতে নিগৃহীত হয় । ঐ সমস্ত লোকেরা মদীনায় এসে রসূলুল্লাহর কাছে অভিযোগ করলে তিনি তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেন ।

রসূলুল্লাহ্ (সা) রেফাআ' বিন যায়িদ জাযামীর নামে একটি পত্র লিখেছিলেন বলে বেশির ভাগ ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন । তাতে বলা হয়েছিল, 'আমি একে ইসলাম প্রচারের জন্য তার সমগ্র সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠালাম । যে ইসলাম গ্রহণ করবে সে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের দলের অন্তর্ভুক্ত হবে । আর যে গ্রহণ করবে না তাকে দু'মাস পর্যন্ত আমান (নিরাপত্তা) দেওয়া গেল ।' এই ঘটনা কবেকার তা জানা যায় নি ।

ইবনুল আসীরের বর্ণনানুযায়ী তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তনের পর (ষষ্ঠ হিজরী) মালিক বিন আহমর জাযামী মদীনায় এসে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করেন । তাকে দেওয়া পত্রে রসূলুল্লাহ্ (সা) লিখেছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে এবং তার সঙ্গীরা নামায আদায় করে, যাকাত দেয়, মুসলমানদের অনুসরণ করে, অংশীবাদী (মুশরিক) থেকে দূরে থাকে, মালে গনীমত থেকে খুমুস (১/৫ অংশ) আদায় করে, গোত্রীয় বীমায় অংশ (সাহমুল গারিমীন) প্রদান করে, উপরন্তু অমুক অমুক জিনিস থেকে অমুক অমুক অংশ আদায় করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আল্লাহর এবং মুহাম্মদের আমানে (হিফাযতে) থাকবে ।'

এখানে উল্লিখিত সামুল গারিমীন (গোত্রীয় বীমার অংশ) একটি অভিনব বস্তু বটে । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে মদীনায় গোত্রগত একটি সমাজনীতির সন্ধান পাওয়া যায় । আর তা হলো, গোত্রের কোন ব্যক্তির উপর আর্থিক জরিমানা (যেমন রক্তমূল্য প্রভৃতি) প্রদান আবশ্যিক হয়ে পড়লে পুরা গোত্র সার্বজনীনভাবে তা পরিশোধ করত । কোন গোত্র সার্বজনীনভাবেও তা পরিশোধ করতে অক্ষম হলে অন্যান্য গোত্রও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসত । উপরে উল্লিখিত সাহমূল গারিমীন অনুরূপ ধরনেরই কোন জিনিস হয়ে থাকবে ।

দুমাতুল জন্দল
প্রাচীন যুগ হতে দুমাতুল জনদল উত্তর-দক্ষিণের (একদিকে আরাম ও বাবিল এবং অন্যদিকে হিন্দ ও মিসর) বাণিজ্য জারী রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসাবে পরিগণিত হয়ে আসছিল । (দাবলীকস, বাইবেল, হিষ্টি, চতুর্থ অধ্যায়, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ) । কা'লকাশান্দী লিখেছেন যে, এটা ছিল সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী অঞ্চল । ধারণা করা হয় যে, আরব থেকে উত্তর দিকে গমনকারী সব বাণিজ্য কাফেলাই এখানে এসে পৌঁছত । অতঃপর পৃথক পৃথক মোড় নিয়ে এখান থেকে সিরিয়া অথবা ইরাক যেখানে ইচ্ছা চলে যেত । এখানে জাহিলিয়া যুগে একটি বিরাট মেলা বসত । সে মেলার গুরুত্বের দিক বিবেচনা করে তার অধিকার লাভের জন্য প্রায়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ হত । (বিস্তারিত বিবরণের জন্য ইবনে হাবীব; আল মুতাহাব্বার, আল মারযুকী; আল আমিনা ওয়ায় আক্কিনা; বাবু আসওয়াকিল আরব ও আহদে নবভীকা নেযামে হরানী দ্রষ্টব্য) । যুদ্ধে ইবাদীরা জয়ী হলে উকীদর, এবং কালবীরা জয়ী হলে কেনাফা সেখানকার শাসক হতেন ।

বাহ্যত খায়বরের য়াহূদী এবং মক্কার কুরায়শীদের ষড়যন্ত্রের কারণে পঞ্চম হিজরীতে উকীদর মদীনায় খাদ্য আমদানীকারী বাণিজ্য কাফেলাগুলোতে হয়রানী করতে শুরু করে (মাসউদী, আত্তানবীহ্ ওয়াল আশরাফ, পৃষ্ঠা ২৪৮) । এটা ছিল মদীনার জন্য একটি ভয়ংকর ব্যাপার । তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) এর প্রতিবিধানের জন্য স্বয়ং একটি বাহিনী নিয়ে দুমাতুল জনদল অভিমুখে যাত্রা করেন (ইবনে সা'দ : ৪৪১) ।

ইতিমধ্যে আহযাব (আরবের বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ের সম্মিলিত বাহিনী) মদীনা আক্রমণের জন্য রওয়ানা হয় । তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) মধ্যপথ থেকে মদীনায় ফিরে আসেন (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৬৬৮) , রসূলুল্লাহর ব্যক্তিগত ভৃত্য হযরত আনাস থেকে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে উকীদরের কাছে একটি পত্র লিখেছিলেন (মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বল :) । রসূলুল্লাহ (সা)-এর ঐ পত্র বাহ্যত কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি । তাই তিনি উকীদরের বিরুদ্ধপক্ষের সাথে (যারা ঐ সময় পরাজিত অবস্থায় ছিল) বন্ধুত্ব স্থাপনে উদ্যোগী হন । কয়েক মাস পর ষষ্ঠ হিজরীতে হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করা হয় । ঐ বাহিনীর সামরিক গুরুত্বের চাইতে রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল বেশি । হযরত আবদুর রহমান (রা) কালব' গোত্রের মধ্যে ইসলাম প্রচার করেন এবং তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয় । অতঃপর তিনি কালব গোত্রের আল-আসবাগ্ নামীয় এক সরদারের মেয়েকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশ অনুসারে স্বয়ং বিবাহ করেন (ইবনে সা'দ : ৬৪১) এবং এভাবে দুমাতুল জন্দলকে দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে মুক্ত করার একটি বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী কৌশল অবলম্বন করা হয় । হুদায়বিয়া ও খায়বর অভিযানের পর বাণিজ্যপথ আপনা আপনি নিরাপদ হয়ে গিয়ে থাকবে । কিন্তু খ্রীস্টান উকীদর একজন ভয়ংকর প্রতিবেশী হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল । শেষ পর্যন্ত নবম হিজরীতে তাবুক অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সেনাবাহিনী উকীদরকে জীবন্ত অবস্থায় বন্দী করে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে হাযির করে ।

উকীদরের পরবর্তী অবস্থা অনেকটা বিতর্কিত । একদিকে ইবনে সা'দ প্রমুখ বলেছেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন নি বরং জিযিয়া প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং তাঁর দুর্গ, অস্ত্রশস্ত্র ও এলাকার যাবতীয় পতিত জমি মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করতে সম্মত হন । কিন্তু এরাই আবার ঐ চুক্তির যে প্রতিলিপি পেশ করেছেন তাতে জিযিয়ার কোন উল্লেখ নেই, বরং উকীদরের ইসলাম গ্রহণ, মিথ্যা খোদা ও মূর্তিসমূহ পরিত্যাগ, নামায আদায় এবং যাকাতদানের প্রতিশ্রুতির কথা আছে । এ ক্ষেত্রে সম্ভবত বালাযুরীর বর্ণনাই ঠিক (ফুতুহুল বুলদান, পৃষ্ঠা ৬২) । তাঁর মতে উকীদর তখন ইসলাম গ্রহণ করলেও শীঘ্রই মুরতাদ (ইসলাম বিমুখ) হয়ে যান এবং খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা)-এর হাতে নিহত হন । ইরতিদাদ (ইসলাম বিমুখতা) অবস্থায় জিযিয়ার শর্ত এবং আপস চুক্তি নিশ্চয়ই অবোধগম্য । তার একমাত্র ব্যাখ্যা এই হতে পারে যে, আপস চুক্তির যে প্রতিলিপি ঐতিহাসিকরা পেয়েছিলেন, তা আসল ও অকৃত্রিম ছিল না বরং পরবর্তী সময়ে ঐ এলাকার অধিবাসীরা যখন পুরাপুরিভাবে ইসলাম গ্রহণ করে তখন তারা নিজে থেকে একটি চুক্তিপত্র তৈরী করে নেয়, যাতে করে তাদের পিতামহ উকীদরকে একজন সাহাবী বানিয়ে নিজেদেরকে ঐ সাহাবীর বংশধর বলে পরিচয় দিতে পারে । এই পত্রের বিষয়বস্তু তৈরীতে প্রতিবেশী কালব গোত্রকে লিখিত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রটি তাদেরকে সাহায্য করে থাকবে । ঐ পত্র রসূলুল্লাহ্-(সা) হারিসা বিন কুতন কালবীকে লিখেছিলেন । তাতে পতিত জমি, নামায ও যাকাতের কথা মোটামুটি এরূপ শব্দেই লেখা রয়েছে যেরূপ উকীদরের দিকে সম্পর্কিত পত্রের মধ্যে দেখা যায় । অনুমান করা হয় যে, উকীদরকে বন্দী করে ছেড়ে দেওয়ার পর তা থেকে ছিনিয়ে নেওয়া দুর্গ এবং পতিত জমি একজন মুসলমান কালবী সরদারকে, যিনি ধারেকাছেই থাকতেন, দিয়ে দেওয়া হয় এবং যথারীতি এই পত্রও দেওয়া হয় (আসল ব্যাপার আল্লাহই ভাল জানেন) । কুতন বিন হারিসার নামেও রসূলুল্লাহর একটি পত্র পাওয়া যায় । তাতে ঐ গোত্রের লোকদেরকে নামায ও যাকাতের জন্য তাকিদ দেওয়া হয়েছে । এই কুতন উপরে উল্লেখিত হারিসার, না অন্য কারো পুত্র, তা জানা যায় নি ।

উকীদরের চুক্তি সম্পর্কিত একটি বিষয় খুবই চিত্তাকর্ষক । ইবনে সা'দ প্রমুখ লিখেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) ঐ চুক্তির উপর মোহরের পরিবর্তে তাঁর নখের ছাপ লাগিয়ে দিয়েছিলেন । উকীদর হীরার অধিবাসী ছিলেন । এখন ঐ জায়গায় কুফা শহর অবস্থিত । এটা বাবিলী অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং রসূল-যুগের পূর্বে সেখানে একটি অত্যন্ত পুরাতন রীতি এই ছিল যে, চুক্তি প্রদানকারী তার আংগুলের নখ দিয়ে অর্ধচন্দ্রের আকারে চুক্তিপত্রের নীচে একটি ছাপ দিত । প্রাচীন বাবিলী চুক্তিসমূহ, যা ইট ইত্যাদির উপর পাওয়া গেছে, তাতে এর অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় । এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুনঃ
1. Oulf Kruckman, Neue Babylonische Recht-Und Vewal- tungstaxte, Text 37, Tafel 28
2. B. Meissener, Babylonien Und Assyrien. 1, 179.
3. CH Edwards, The Hummurabi Code, P. 11

অনুমিত হয় যে, উকীদর চুক্তির উপর অনুরূপ ছাপ দেওয়ার জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বারবার অনুরোধ জানালে তিনি তাতে সম্মত হন ।

হুনায়ন, হাওয়াযিন, সাকীফ, তায়েফ
এক অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে মুসলমানরা যখন কোনরূপ সংঘর্ষ ছাড়াই মক্কা জয় করলো এবং রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অপরিসীম ক্ষমা ও অসাধারণ মহানুভবতায় যখন সেখানকার বেশির ভাগ লোকই ইসলাম গ্রহণ করলো তখন হাওয়াযিন এবং সাকীফ কেন বিচলিত হয়ে উঠেছিল তা বুঝে উঠা সত্যি মুশকিল । মুসলমানরা তো কখনো রাজ্য বিস্তারের জন্য অগ্রাভিযান চালায় নি । তাছাড়া রসূলুল্লাহ্ (সা) শিশুকালে হাওয়াযিনেই দুগ্ধ পান-করেছেন, প্রতিপালিত হয়েছেন এবং কয়েক বছর সেখানেই অতিবাহিত করেছেন । এতদসত্ত্বেও এর পিছনে যে সমস্ত কারণ ছিল তা সম্ভবত নিম্নরূপ :
১. তায়েফ এবং এর আশেপাশের উর্বর এলাকায় মক্কবাসীদের অনেক সম্পত্তি ছিল । বর্ণিত আছে যে, ঐ সমস্ত সম্পত্তিকে লাওয়ারিশ মনে করে তায়েফবাসীরা দখল করে নিয়েছিল এবং আশংকা করছিল যে, মক্কাবাসীরা এখন দাবি উত্থাপন করলে ঐ সমস্ত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ তাদেরকে দিতে হবে । অতএব এই ক্ষতিপূরণ যাতে না দিতে হয় সেজন্য তারা রণসজ্জা শুরু করে দিয়েছিল ।
২. তায়েফবাসীরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর যে অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল তা রসূলুল্লাহ (সা) ভুলে গেলেও কালিমালিপ্ত পাষাণহৃদয় তায়েফবাসীরা ভুলেনি । তারা আশংকা করছিলো যে, অন্যান্য দুনিয়াদারদের মত শক্তি অর্জন করার পর তিনি এই ব্যক্তিগত অসদাচরণের প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ছাড়বেন না । তাই তারা রসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিল ।
৩. মক্কা বিজয়ী মুহাম্মদ (সা) যাতে তায়েফে উর্বর এলাকার প্রতি হাত না বাড়ান সেজন্য তারা সতর্কতামূলক সামরিক প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিল ।
৪. মক্কাবাসীরা আকস্মিক হামলায় অস্ত্র সংবরণ করেছিল, যুদ্ধে পরাস্ত হয়নি । তায়েফে অবস্থানকারী মক্কাবাসী এবং তখন পর্যন্ত মক্কায় অবস্থানরত অমুসলিমদের উস্কানীতে তায়েফবাসীরা ধারণা করেছিল যে, তারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করলে অমুসলিম কিংবা আধা মুসলিম মক্কাবাসীরা নিজেদের রক্ষাকারী মনে করে তাদেরই সাহায্যে এগিয়ে আসবে । তাই স্বাভাবিকভাবে তারা রণসজ্জা শুরু করে দিয়েছিল ।

উপরিউক্ত কারণসমূহের সাথে সাথে অন্যান্য কারণ থাকতে পারে, যা এখন বিস্মৃতির অন্তরালে । যাহোক, হাওয়াযিন এবং সাকীফ একত্রিত হতে থাকে । অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) একজন গুপ্তচর প্রেরণ করেন । সে তথায় কিছুদিন অবস্থান করে তাদের রণশক্তি ও মতিগতির খবর নিয়ে আসে । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের প্রতিরোধ করাকেই শ্রেয় মনে করেন । ইসলামী বাহিনী মক্কার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করে সেখান থেকে প্রাপ্ত সাহায্য (সে সাহায্যের মধ্যে সৈন্য এবং হাতিয়ার উভয়ই ছিল) নিয়ে রওয়ানা হয় এবং হুনায়নে প্রথমবারের মত শত্রুর সম্মুখীন হয় । রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা থেকে চারদিনে সেখানে পৌঁছেছিলেন (আমতায়ে' মাক 'রিযী) ।

এটি সম্ভবত তখনো একটি অনাবাদী জায়গা ছিল এবং কল্পনাতীতভাবে শত্রুর সাথে সংঘর্ষ হওয়ার কারণে কিছুটা বিখ্যাত হয়ে পড়েছিল । কুরআনেও এর উল্লেখ আছে, কিন্তু আজো হুনায়ন কোথায় তা কেউ জানে না । গত হাজার বারো শ' বছর ধরে যে সমস্ত মুফাস্সির, ভূগোলবিদ ও গ্রন্থকার এর উল্লেখ করে আসছেন, তাঁদের মধ্যেও এর অবস্থান নিয়ে মতভেদ পরিলক্ষিত হয় । কেউ কেউ এটাকেও মক্কা থেকে এক দিনের এবং কেউ কেউ চার দিনের দূরত্বে বলে উল্লেখ করেছেন । তবে এটা অনুমান করতে বাধে যে, মক্কা থেকে শুধু একদিনের দূরত্বে শত্রুবাহিনী এসে পড়েছিল এবং রসূলুল্লাহ (সা) সে সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন । নিশ্চয় এটা মক্কা থেকে চল্লিশ পঞ্চাশ মাইল কিংবা তার চাইতেও বেশি দূরত্বে (চারদিনের দূরত্বে) ছিল ।

মুসলিম বাহিনী আঁকাবাকা বন্ধুর রাস্তা দিয়ে এগুচ্ছিলো এমন সময় হঠাৎ করে আরবের শ্রেষ্ঠ তীর নিক্ষেপকারীদের পাল্লায় পড়ে এবং ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় । শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ়তা শীঘ্রই মুসলিম বাহিনীকে সংগঠিত করে ফেলে এবং মুসলিম বাহিনীর সম্মিলিত আঘাত সহ্য করতে না পেরে শত্রুরা পলায়ন করতে বাধ্য হয় । শত্রুরা ঐ যুদ্ধে শুধু তাদের স্ত্রী পুত্রকন্যাদেরই নয় বরং পুরো সংসার অর্থাৎ উট-বকরীও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো । অতএব এসব জিনিস সহজেই মালে গনীমত হিসাবে মুসলমানদের হস্তগত হয় । রসূলুল্লাহ (সা) এগুলোকে সামলিয়ে নিয়ে শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করেন । তখন সুদৃঢ় প্রাচীরঘেরা তায়েফ শহর ছাড়া তাদের আশ্রয়ের আর কোন জায়গা ছিল না । ইরানী প্রকৌশলীরা ঐ প্রাচীর তৈরী করেছিল বলে জানা যায় (আগানী : ৪৯০২২) ।

মুসলমানরা শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করতে করতে তায়েফে গিয়ে পৌঁছে এবং কিছুদিন শহরটি ঘেরাও করে রাখে । শেষ পর্যন্ত রসূলুল্লাহ (সা) তায়েফ জয় না করেই প্রত্যাবর্তন করেন । মক্কা থেকে দশ বারো মাইল দূরে থাকতেই তিনি জাআ'ররানা নামক স্থানে হুনায়নের মালে গনীমত তলব করেন এবং যথারীতি তা বন্টন করে দেন । এবার হাওয়াযিন গোত্রের চৈতন্যোদয় হয় । তারা লজ্জাবনত অবস্থায় ক্রন্দন করতে করতে রসূলুল্লাহর কাছে আসে ও দুগ্ধ সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তারা করুণা ভিক্ষা করে । রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, 'তোমরা দেরি করে ফেলেছ । যুদ্ধজয়ের পর থেকে তোমাদের অপেক্ষা করছিলাম এই ভেবে যে, তোমরা মুসলমান হয়ে যাবে এবং তোমাদের ধন ও জন ফিরিয়ে দেওয়া হবে । এখন তোমরা তোমাদের ধন ও জনের (স্ত্রী পুত্রকন্যা) মধ্য থেকে যেকোন একটিকে বেছে নিতে পার ।' তারা নিশ্চয়ই তখন তাদের স্ত্রী পুত্র কন্যাদেরকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিল । তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, 'আমি আমার গোত্রের অংশ এখনই ফিরিয়ে দিচ্ছি । অবশিষ্টের জন্য নামাযের সময় জনসাধারণের সামনে তোমরা তোমাদের আবেদন পেশ করো ।' ঐ নও-মুসলিমরা তা-ই করে । রসূলুল্লাহ (সা) তখন তাঁর ও তাঁর গোত্রের পক্ষ থেকে হাওয়াযিনদের স্ত্রী-পুত্রকন্যা ফেরতদানের কথা পুনরায় ঘোষণা করেন । তখন সাহাবীরাও একের পর এক দাঁড়িয়ে নিজ নিজ গোত্রের পক্ষ থেকে অনুরূপ দাবি পরিত্যাগের কথা ঘোষণা করতে থাকেন । রসূলুল্লাহ (সা) তখন একজন হিসাবরক্ষক নিয়োগ করেন । তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক সাহাবীর সাথে সাক্ষাত করে কার কাছে কি আছে তার হিসাব লিখে নেন । বেশির ভাগ সাহাবীই হাওয়াযিনদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে বিনামূল্যে মুক্ত করে দেন । কিছু সংখ্যক সাহাবী তাতে সম্মত না হলে তাঁদেরকে বলা হয় যে, তাঁদের অংশের মূল্য বায়তুলমাল থেকে পরিশোধ করা হবে । তবে অবশ্যই নারী ও শিশুদেরকে মুক্ত করে দিতে হবে । সম্ভবত কিছুসংখ্যক অবিবাহিত যুবতী বিজয়ীদের সাথে থেকে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে করে এবং যার ভাগে পড়েছিল তার সাথেই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয় । বাকি সব স্ত্রীলোক এবং ছেলেমেয়ে হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদলের সাথে আনন্দচিত্তে নিজ নিজ বাসভূমিতে ফিরে যায় । অতঃপর রসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় ফিরে আসেন ।

সম্ভবত মক্কার মুসলমানরা তায়েফবাসীদের সাথে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বয়কট করেছিল । যখন তাদের চতুষ্পার্শ্বে ইসলাম দ্রুতবেগে প্রসার লাভ করছিলো তখন তায়েফবাসীদের পক্ষে দীর্ঘদিন উপরিউক্ত চাপ সহ্য করা মোটেই সম্ভব ছিল না । শেষ পর্যন্ত কয়েক মাস পর তারা রসূলুল্লাহর সাথে মিত্রতা স্থাপনের জন্য মদীনায় একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে । তারা মনে করেছিল যে, ইসলামের অর্থ শুধু নতি স্বীকার । তাই তাদের প্রতিনিধিদল একটি অবিজিত দেশের প্রতিনিধি হিসাবে রসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে এমন কিছু শর্ত পেশ করে, যা ছিল দর কষাকষির মাধ্যমে সুবিধা আদায়েরই নামান্তর । তারা বলে যে, তাফেবাসীরা মুসলমান হতে রাযী আছে, তবে এই শর্তে যে—
১. তাদেরকে নামায থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে ।
২. তায়েফকেও মক্কার মত হেরেম ঘোষণা করা হবে (খুব সম্ভব এর দ্বারা তারা হজ্জ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল) ।
৩. তাদেরকে যাকাত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে ।
৪. তাদেরকে জিহাদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে (অর্থাৎ তাদেরকে বাধ্যতামূলক সামরিক খিদমত এবং সামরিক স্বেচ্ছাসেবক সরবরাহ করা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে) ।
৫. তাদের শহরের প্রাচীন দেবালয়সমূহ ধ্বংস করা হবে না ।
৬. তাদের জন্য ব্যভিচার নিষিদ্ধ করা হবে না ।
৭. তাদের জন্য সূদী কারবার নিষিদ্ধ করা হবে না ।
৮. তাদের জন্য মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হবে না ।

কথিত আছে যে, তারা একটি চুক্তিপত্র লিখে নিয়ে এসেছিল এবং স্বাক্ষরের জায়গাটি শুধু খালি রেখেছিল, যাতে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাতে তাঁর মোহর লাগিয়ে দেন । চুক্তি অনুযায়ী তারা পুরো ইসলাম থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল । তবে রোযা থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি । যাহোক, এর দ্বারা পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, তারা রসূলুল্লাহ্র মিশনের আসল উদ্দেশ্যই হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনি । তারা ইসলামকে বিজিতদের উপর আরোপিত শর্তবিশেষ মনে করেছিল । রসূলুল্লাহ্ (সা) কিন্তু বেশ সহানুভূতির সাথেই তাদের ভ্রান্ত ধারণাকে সংশোধন করে দেন । তিনি তাদের প্রতি এমন হৃদ্যতা দেখান যে, তারা লজ্জিত হয়ে পড়ে এবং তাদের অমূলক দাবিগুলি প্রত্যাহার করে নেয় । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বলেন, নামায এবং ইবাদত ছাড়া মানুষ মানুষই থাকে না এবং পার্থিব স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া যে ধর্মের কোন লক্ষ্য নেই, সে ধর্ম কোন ধর্মই নয় । আর ব্যভিচার হচ্ছে একটি অশালীন ও অপবিত্র আচরণ । তোমরা যেমন তোমাদের স্ত্রী ও মেয়েদেরকে অন্যদের হাতে নষ্ট হতে দিতে রাযী নও, অন্যরাও তেমনি তাদের স্ত্রী ও মেয়েদেরকে তোমাদের হাতে নষ্ট হতে দিতে রাযী নয় ।" তাদের যাকাত ও যুদ্ধে সহায়তা দান তখনকার বিরাট ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য একটা ধর্তব্যের বিষয় ছিল না । তাই আবূ দাউদের বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে সেগুলো থেকে অব্যাহতিদানে সম্মত হন । তায়েফকে হেরেম ঘোষণার ব্যাপারেও তিনি একটি ঘোষণা জারী করেন এবং এর বিরুদ্ধাচারণের উপর শাস্তি নির্ধারণ করা হয় । যেহেতু জাতিকে শিক্ষাদানের ইখতিয়ার এখন রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাতে, তাই যারা কুরআন পড়বে এবং সেটাকে মানবে তাদেরকে ঐ সমস্ত শর্তাদি থেকে অব্যাহতি দান ছিল অপরহিার্য-যাতে করে মুসলমানরা ইসলামের আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয় । দেবালয় সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (সা) একটি সূক্ষ্ম রসিকতা করে বলেন, 'তোমাদের এটা ধ্বংস করতে হবে না । আমিই লোক পাঠিয়ে ধ্বংস করে দেব । আর তোমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এজন্য যদি সত্যি সত্যি কোন বিপদ নেমে আসে, তাহলে আমার লোকদের উপরই তা আসবে ।' সুদ সম্পর্কে যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায়—তাতে মূল সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কিছুটা অস্পষ্টতা থেকে যায় । তবে এটুকু জানা যায় যে, উকাযের পরবর্তী মেলা পর্যন্ত তাদের জন্য সুদ গ্রহণের অনুমতি দিয়ে পরবর্তী সময়ে তা রহিত করা হয় এবং বলা হয় যে, প্রদত্ত ঋণের শুধুমাত্র মূলধন ফেরত নেওয়া যাবে । তাদের চুক্তির যে বচন বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে যা পাওয়া যায় তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক বিধায় এখানেও উদ্ধৃত করা গেল ।

১. করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে ।
২. এটা একটা লিখিত চুক্তি যা আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সা :) সাকীফকে প্রদান করেছিলেন ।
৩. লেখা যাচ্ছে যে, তাদেরকে ঐ আল্লাহর যিম্মায় (হিফাযতে) দেওয়া গেল যিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই । আর ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে নবী বিন আবদুল্লাহর যিম্মা (হিফাযত) রইলো যে সমস্ত বিষয় এই চুক্তিতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ।
৪. নিশ্চয়ই তাদের উপত্যকা হারাম । আর আল্লাহর জন্য (ওয়াস্তে) সব কিছুই হারাম করা হলো । সেখানকার কাটাযুক্ত জংলী গাছ বৃক্ষ, সেখানকার শিকার, সেখানে অত্যাচার করা, কোনরূপ দুষ্কর্ম করা (সবই হারাম) ।
৫. সাকীফরাই ভুজ উপত্যকার সবচাইতে বেশি হকদার । তাদের তায়েফ (দুর্গ) লংঘন করা যাবে না এবং কোন মুসলমান তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দিতে পারবে না । তারা তাদের তায়েফে কিংবা নিজেদের উপত্যকার যেখানে ইচ্ছা দালান কোঠা নির্মাণ করতে পারবে ।
৬. তাদেরকে সামরিক খিদমতের জন্য একত্রিত করা যাবে না, তাদের কাছ থেকে 'উশর' আদায় করা হবে না এবং ধন ও প্রাণের ক্ষেত্রে তাদের উপর কোনরূপ জবরদস্তি করা যাবে না ।
৭. তারা মুসলমানেরই একটি দল । তারা যেখানে ইচ্ছা যাতায়াত করতে পারবে ।
৮. তাদের কাছে যে বন্দী হবে তার উপর তাদেরই সর্বাধিক অধিকার বর্তাবে, তার (বন্দীর) ব্যাপারে তারা যা ইচ্ছা করতে পারবে ।
৯. রেহেনের যামানতে তারা যে ঋণ দিয়েছে সে ঋণ আদায়ের সময়কাল যদি উকায মওসুমের পরে হয় তাহলে মূল পুঁজি উকাযের সময় পরিশোধ করা হবে (ইবনে আবদিল বার এবং 'লিসানুল আরব'-এর বর্ণনায় আছে, তাহলে এর মূল পুঁজি পরিশোধ করা হবে এবং উকাযে সুদ গ্রহণ করা যাবে-এর পরে নয়) ।
১০. সাকীফদের খাতায় তাদের ইসলাম গ্রহণের দিন লোকের কাছে যে সমস্ত ঋণ পাওনা আছে তা তারা পাবে ।
১১. সাকীফদের কাছে আমানতস্বরূপ অন্যের যে মাল বা মানুষ (দাসদাসী) আছে তা তারা অবশ্যই ফেরত দেবে ।
১২. সাকীফদের যে মানুষ বা সম্পদ এখন দেশের বাইরে রয়েছে সেগুলোর নিরাপত্তা থাকবে যেমন নিরাপত্তা রয়েছে দেশের অভ্যন্তরস্থ মানুষ ও সম্পদের ।
১৩. সাকীফদের যে সমস্ত মিত্র বা বাণিজ্য অংশীদার রয়েছে তারাও ঐ সমস্ত সুযোগ সুবিধার অধিকারী হবে, যা সাকীফদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ।
১৪. যদি কেউ সাকীফদেরকে অভিযুক্ত করে কিংবা তাদের উপর জুলুম করে তাহলে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর অনুসারীরা ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাকীফদেরকে সাহায্য করবেন ।
১৫. যদি সাকীফরা কোন ব্যক্তিকে তাদের এলাকায় আসতে অপছন্দ করে তাহলে সে ব্যক্তি সেখানে আসতে পারবে না ।
১৬. হাট-বাজার এবং ব্যবসা-বাণিজ্য গৃহাদির আঙ্গিনায় হবে ।
১৭. তাদের নেতা অন্য কেউ নয় বরং তাদের মধ্য থেকেই হবে ।
১৮. সাকীফরা কুরায়শদের যে সমস্ত শুল্কজনিত জমিতে পানি সরবরাহ করবে সে সমস্ত জমির অর্ধেক উৎপাদন তারাই পাবে ।
১৯. রেহেনের জামানতে তাদের যে ঋণ পাওনা আছে তাতে সুদ গ্রহণ করা যাবে না । রেহেনের মালিক যদি শীঘ্রই ঋণ পরিশোধে সক্ষম হয় তাহলে তা পরিশোধ করে দেবে । আর যদি শীঘ্রই পরিশোধে সক্ষম না হয় তাহলে আগামী বছর জমাদিলউলা পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারবে । ঋণ পরিশোধের সময় আসার পর যে তা পরিশোধ করবে না সে যেন সুদ গ্রহণ করলো ।
২০. তাদের কাছে যাদের ঋণ পাওনা আছে তা শুধু আসল পুঁজি ছাড়া আর কিছুই পাবে না ।
২১. তাদের কাছে যে বন্দী আছে—যাকে তার মালিক বিক্রি করে দিয়েছে তারা সে বন্দীকে বিক্রি করতে পারবে । আর যে বন্দীকে বিক্রি করা হয়নি তার 'ফিদিয়া' (মুক্তিমূল্য) হচ্ছে ৬টি উটনী । তার মধ্যে তিনটি হবে তিন বছর বয়স্কা ।
২২. যে বাণিজ্যভিত্তিক কিছু ক্রয় করেছে একমাত্র সে-ই তা বিক্রি করার অধিকারী হবে । (আবূ উবায়েদ, কিতাবুল আমওয়াল, পৃষ্ঠা ৫০৬)

ইমাম মালিক (মুয়াত্তা) জাহিলিয়া যুগের সুদ লেনদেনের যে রীতি বর্ণনা করেছেন তা প্রধানত সাকীফদের উপরই প্রযোজ্য । সে রীতি হলো, কিছু ঋণ দিয়ে তা পরিশোধের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া । সময়মত পরিশোধ করা হলে তো ভাল, অন্যথায় ঋণকে দ্বিগুণ করে পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেওয়া । এই সময়ও পরিশোধ করা না হলে ঋণের পরিমাণ পুনরায় দ্বিগুণ করে পরিশোধের সময় আবার বাড়িয়ে দেওয়া ।

ইবনে সা'দ (৩৩২) একটি অভিনব কথা লিখেছেন । আর তা হলো, সাকীফদের প্রতিনিধিদের ক্রমাগত চাপের ফলে চুক্তিপত্রের উপর রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর নাতিদের সাক্ষ্যও সংযোজিত করেছিলেন । (যেহেতু তাঁর কোন পুত্র সন্তান ছিল না ।) ইমাম হাসানের বয়স তখন চার বছর এবং ইমাম হুসায়নের বয়স আনুমানিক ৩ বছর ছিল । চুক্তিপত্রে কি তাঁদের আঙ্গুলের চিহ্ন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল? ইতিহাসে একথার কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে তা শুধুমাত্র অনুমানভিত্তিক ।

ইতিহাসে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আর একটি পত্রের সন্ধান পাওয়া যায় । তাতে তায়েফবাসীদের বলা হয়েছিল যে, ভুট্টার মদ তাদের জন্য নিষিদ্ধ ।

কয়েক মাস পর রসূলুল্লাহর ওফাত হয় । যখন ইরতিদাদের (ইসলাম বিমুখতার) গণ্ডগোল দেখা দেয় তখন খলীফা আবু বকর (রা) সাকীফের গভর্নর উসমান বিন আবিল আসকে নির্দেশ দেন, যেন তিনি তার এলাকার প্রত্যেকটি তালুক (মহল্লা) থেকে সামরিক স্বেচ্ছাসেবক প্রেরণ করেন । তাবারীর (পৃষ্ঠা ১৮৭১ ও ১৯৮৮) বর্ণনা অনুযায়ী গভর্নর উসমান প্রত্যেক মহল্লাবাসী উপর ২০ জন সৈন্য সরবরাহের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেন এবং তারা কোনরূপ আপত্তি ছাড়াই তা মেনে নেয় ।

এর পূর্বেই তায়েফের কিছু লোক মুসলমান হয়ে গিয়েছিল । যখন ঐ প্রতিনিধিদল আসে তখন মুগীরা বিন শু'বা আস সাকাফী মদীনায়ই ছিলেন । খায়বর যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যরা 'মান্‌জানিক' প্রভৃতি যুদ্ধাস্ত্রের সম্মুখীন হলে রসূলুল্লাহ্ কিছু লোককে ঐ সমস্ত অস্ত্র তৈরীর কৌশল শিক্ষা করার জন্য জুরাশে প্রেরণ করেন । তাদের মধ্যে উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফী এবং গায়লান বিন সালমা সাকাফীও ছিলেন । তারা ঐ শিক্ষা সফরে থাকার দরুন হুনায়ন এবং তায়েফ অভিযানে রসূলুল্লাহর সাহচর্যে থাকতে পারেন নি । (ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৮৬৯ ; ইবনে সা'দ ৫২২ এবং তাবারী) । এক বর্ণনা অনুযায়ী হযরত সালমান ফারসী (রা) নিজ হাতে একটি 'মানজানিক' তৈরী করে তায়েফে স্থাপন করেছিলেন ।

জুরাশ
তায়েফের দক্ষিণে তাবাদুলা ও জুরাশ বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান । মক্কা বিজয়ের পর, সম্ভবত তায়েফবাসীদের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সারো বিন আবদুল্লাহ্ আল-আযদী নামক একজন ইয়ামানী সরদার ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে তার আশেপাশের এলাকাসমূহে যথার্থ সামরিক আন্দোলন চালাবার অনুমতি দেন । ইবনে হিশামের বর্ণনা (পৃষ্ঠা ১৫৪) অনুযায়ী সারো বিন আবদুল্লাহ্ রসূলুল্লাহর নির্দেশে একটি বাহিনী নিয়ে জুরাশে অবতরণ করেন । তখন জুরাশ ছিল একটি প্রাচীরঘেরা নগরী । ঘেরাও সহ্য করেতে না পেরে জুরাশবাসীরা বাধ্য হয়ে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয় (এই চুক্তির মোটামুটি বর্ণনা বালাযুরীর ৫৯ পৃষ্ঠায় আছে) । সে চুক্তি অনুযায়ী জুরাশবাসীরা তাদের সম্পদের মালিক থাকবে, আগামীতে মুসলমান মুসাফিররা এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় তারা বিনা প্রতিদানে তাদের মেহমানদারী করবে, এখানকার আহলে কিতাবদের (য়োহূদী, ঈসায়ী) উপর জিযিয়া ধার্য করা হবে এবং হযরত আবু সুফিয়ান এখানকার গভর্নর হবেন ।

বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, ঐ সময়ও জুরাশ এত উন্নত ছিল যে, সেখানে মানজানিক, দাব্বাবা, দাবোর প্রভৃতি দুর্গ বিধ্বংসী ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রাদি নির্মিত হত । তখনকার দিনে ফিলিস্তিনের দক্ষিণে (বর্তমান জর্দানের পূর্বে) জারাশ নামক একটি শহর ছিল । গ্রীক যুগে এটা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান । এখনো এর ধ্বংসাবশেষ তার গৌরবোজ্জ্বল অতীতের সাক্ষ্য দিচ্ছে । ঐতিহাসিক এবং ভূগোলবিদরা (ইয়াকুত প্রমুখ) এখানকার প্রাচীর প্রভৃতির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন । অনুমিত হয় যে, মানজানিক এবং দাবাবা তৈরীর কৌশল আয়ত্ত করার জন্য কারিগরদেরকে এই উত্তরাঞ্চলীয় জারাশেই পাঠানো হয়েছিল । খুব সম্ভব বর্ণনাকারী এই জারাশের খবর রাখতেন না । তাই জারাশ বলতে তিনি জুরাশ বুঝেছেন ।

সত্যি সত্যি যদি সে স্থানটি তায়েফের দক্ষিণাঞ্চলের জুরাশ হয়ে থাকে তাহলে এই জুরাশবাসীদের ধন্যবাদ দিতে হয় এজন্য যে, সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তারা মক্কা, মদীনা এবং তায়েফকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল । অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে ছিল যে তখন কারিগরী শিক্ষার জন্য তায়েফের লোকদের সেখানেই পাঠানো হত ।

বিবিধ
নবম হিজরীতে 'আ'মূল ওফুদ' (প্রতিনিধি আগমনের) বছর বলা হয় । কেননা মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র আরবের ডজন ডজন ছোট ছোট গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে এবং রসূলুল্লাহ্র কাছে তাদের প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে নিজ নিজ এলাকার অধিকার ইত্যাদি সম্পর্কিত নির্দেশনামা লিখিয়ে নিয়ে যায় । এই বছরের শেষের দিকে সূরা বারাআত নাযিল হলে রসূলুল্লাহ্ (সা) হজ্বের মওসুমে তা প্রচার করিয়ে দেন এবং সমগ্র আরববাসীকে ৪ মাসের সময় দিয়ে বলেন, 'হয় তোমরা ইসলামের অনুগত হও, নয়ত আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল তোমাদের হিফাযতের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলেন ।" এই চরম সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেওয়ার এক বছর পর যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) দশম হিজরীতে নিজে হজ্ব পালন করতে যান, তখন দেড় লক্ষ মুসলমান আরাফার মাঠে সমবেত হয়েছিল বলে বর্ণিত আছে । রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে সম্বোধন করে অসিয়ত (শেষ উপদেশ প্রদান) করেন । তিনি জবলে রহমতে আরোহণ করে একটি বিখ্যাত বাণী প্রদান করেন । রসূলুল্লাহর বিদায় হজ্বের বাণী ছিল প্রকৃতপক্ষে মানবতার একটি রক্ষাকবচ । এর তিন মাস পর তিনি দুনিয়া ছেড়ে তাঁর পরম বন্ধু আল্লাহ্ তা'আলার সাথে মিলিত হন ।

যে সমস্ত গোত্র মুসলমান হত তাদের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্বিমুখী কর্মপন্থা গ্রহণ করা হত । তাদেরকে নামায পড়বার বা কেন্দ্রে যাকাত পাঠাবার নির্দেশই শুধু দেওয়া হত না বরং এই নির্দেশ যাতে যথাযথভাবে পালিত হয় সেজন্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে শাসনকর্তা নিয়োগ করা হত । তাদের দায়িত্ব ছিল বিভিন্নমুখী । যেমন স্থানীয় লোকদেরকে ইসলামিয়াত শিক্ষা দেওয়া, সদাচরণ শিক্ষা দেওয়া, তাদের মামলা মোকদ্দমার বিচার করা, তাদের কাছ থেকে যাকাত আদায় করে যথারীতি তা খরচ করা, তাদের কাছ থেকে আদায়কৃত করের বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তা প্রদান করা, তাদের এলাকায় সামাজিক বীমা চালু করা এবং যাকাতের অর্থ থেকে প্রত্যেকটি নিঃস্ব অভাবগ্রস্তের প্রয়োজনীয় খাদ্য পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা ।

উপরিউক্ত ব্যবস্থা অবলম্বনের দরুন যাদের কায়েমী স্বার্থে আঘাত লেগেছিল, যাদের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতা খতম হয়ে যাচ্ছিলো, তাদের হঠাৎ ক্ষেপে যাওয়ার কথা । বাস্তবে তারা ক্ষেপেও ছিল । রসূল-জীবনের একেবারে শেষভাগে এবং সিদ্দিকী খিলাফতের প্রারম্ভে তাদের ক্ষ্যাপামি ইরতিদাদ (ইসলাম-বিমুখতা) রূপে প্রকাশিত হয় । এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে হলে একটি পৃথক গ্রন্থই রচনা করতে হয় । এ বিষয়ের উপর বিশেষভাবে লিখিত ওয়াকিদীর 'কিতাবুর রাদ্দাহ' একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ । এই গ্রন্থটি পুনরায় প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে । প্রয়োজন রয়েছে এটার সাথে অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থ মিলিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করার ।

টিকাঃ
১. জাহিলিয়া যুগে আরবের লোকেরা গোত্র-সরদারকে মালে গনীমতের এক চতুর্থাংশ প্রদান করত । রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরিমাণ কিছুটা হ্রাস করে কেন্দ্রের জন্য এক-পঞ্চমাংশ এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের জন্য বাকি চার-পঞ্চমাংশ নির্ধারণ করেন । এ কারণে আরবের অনেক গোত্র কুরায়শ প্রভৃতির স্থলে মুসলমানদের পক্ষাবলম্বনে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবে ।
২. খন্দক অভিযানের জন্য কুরায়শরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলো, এরা মাত্র চার দিনের মধ্যে সে খবর রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে পৌঁছিয়ে দিয়েছিল (শামী) ।
৩. এটাই কি 'গাদীরে খাম' যা রাবিগের নিকটে অবস্থিত?

ফন্ট সাইজ
15px
17px