📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র (রোমের কায়সারের নামে)

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র (রোমের কায়সারের নামে)


ইসলামের সূচনাকালে সিরিয়ার উর্বর অঞ্চল বাইজেন্টাইনী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার দক্ষিণে আরব উপদ্বীপ-সীমান্তে অনেকগুলো বেদুঈন সম্প্রদায় বসবাস করত, যারা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন ছিল, কিন্তু বাইজেন্টাইনীদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কায়সার-ই-রোমের পক্ষ থেকে তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু ভাতা নির্ধারিত ছিল-যার বিনিময়ে তারা বাইজেন্টাইনীদের অনুকূলে ছিল এবং বেদুঈন আরবদেরকে বাইজেন্টাইনী এলাকায় লুটপাট করা থেকে বিরত রাখত।

অনেক প্রাচীনকাল থেকেই সিরিয়ার সাথে আরবের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল এবং প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে আরবদের বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়ায় যাতায়াত করত। ইরানী ও বাইজেন্টাইনী সাম্রাজ্যের মধ্যে বংশ পরম্পরায় সব সময়ই যুদ্ধ লেগে থাকত। রসূলুল্লাহর নুবুওত প্রাপ্তির সময় সে যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করে। রসূলুল্লাহর হিজরতের কিঞ্চিৎ পূর্বে ৭১৩ থেকে ৭১৭ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ইরানী সেনাবাহিনী দামিশক, বায়তুল মুকাদ্দাস এবং আলেকজান্দ্রিয়া দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু পঞ্চম হিজরী মুতাবিক ৭২৭ খ্রীস্টাব্দে নিল্ডার রণক্ষেত্রে ইরানীরা এমন শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে যে, এতদিনকার যুদ্ধের মোড় একেবারে ঘুরে যায়। তখন বাইজেন্টাইনীরা শুধু তাদের হারানো সব এলাকাই ফিরে পায়নি বরং প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নিজেদের পছন্দসই কিছু শর্তও আদায় করে নেয়।

মুসলিম ঐতিহাসিকদের মতে ষষ্ঠ হিজরীর শেষের দিকে রসূলুল্লাহ (সা) বাইজেন্টাইনীদের নেতা, রোম সম্রাটের নামে একটি পত্র প্রেরণ করেন এবং দূতকে নির্দেশ দেন, যেন ঐ পত্র বসরা শহরের (হাওরান অঞ্চল) শাসনকর্তার হাতে সোপর্দ করা হয়। বসরার গভর্নর নিজেই এই ব্যবস্থা নেন যে, পত্রটি এশিয়া কোচকে, কায়সার হিরাক্লিয়াসের কাছে পৌঁছিয়ে দেন। হিরাক্লিয়াস তখন এশিয়া কোচকেই অবস্থান করছিলেন। যদিও 'গোল্ট'-এর মত গ্রন্থকাররা এই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নিতে ইতস্তত করেন নি, তবু আমি এখানে ঐ সমস্ত অভিযোগ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা পর্যালোচনা করবো— যা ইউরোপের বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে।

সুইডেনের বিখ্যাত গ্রন্থকার 'বোল” রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে ঐ সমস্ত পত্রেরও উল্লেখ করেছেন যা রসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী শাসনকর্তাদের নামে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহর প্রেরিত দূতেরা অলৌকিকভাবে ঐ সমস্ত দেশের ভাষায় কথা বলতে লাগলো যেখানে যেখানে তাদেরকে পাঠানো হয়েছিল। এ ধরনের কেচ্ছা আসলে হযরত ঈসা (আ)-এর হাওয়ারীদের সম্পর্কেই প্রচলিত। প্রকৃতপক্ষে 'বোল' এ ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েছেন। ইবনে হিশামের সীরাতে রসূলুল্লাহ্ এবং তাবারীর ইতিহাসের মধ্যে ঘটনাটি অন্যভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে হুদায়বিয়া সন্ধির পর রসূলুল্লাহ (সা.) যখন দূত নির্বাচনের প্রস্তাব দেন তখন তিনি সাহাবীদের হাওয়ারীদের উদাহরণ দিয়ে ধৈর্য ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে বলেছিলেন যাতে তারা কোনরূপ ইতস্তত না করেন।

কায়তানী নামক এক ইতালীয় ঐতিহাসিক এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে কিছু অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁর অভিযোগগুলো ছিল— দূত হযরত দেহইয়া (রা) কায়সারের কাছ থেকে ফিরে আসার সময় নাকি ডাকাতির শিকার হয়েছিলেন ষষ্ঠ হিজরীর মধ্যভাগে, অথচ দূতদের রওয়ানা হওয়ার কথা ষষ্ঠ হিজরীর শেষে। এছাড়া দেহইয়া (রা)-এর খায়বর যুদ্ধে অংশগ্রহণের তথ্য নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তাবারীর বর্ণনায় দিন তারিখের হেরফের মূলত ওয়াকিদীর অসংলগ্ন বর্ণনার ফলশ্রুতি। প্রকৃত ঘটনা হলো হযরত দেহইয়া (রা) ষষ্ঠ হিজরীর শেষভাগে সিরিয়া রওয়ানা হয়েছিলেন এবং পথিমধ্যে জাযাম সম্প্রদায়ের ডাকাতরা তাকে আক্রমণ করেছিল। পরবর্তীতে খায়বর বিজয়ের পর তিনি পুনরায় কায়সারের কাছে পত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য সিরিয়া গমন করেন।

কায়তানীর আরেকটি অভিযোগ ছিল যে কায়সার হিরাক্লিয়াস ৬২৮ খ্রীস্টাব্দের পূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস আসেন নি। কিন্তু গ্রীক ঐতিহাসিক নিকেফোর এবং সেখানকার শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় যে ৬২৮ খ্রীস্টাব্দের ডিসেম্বরের দিকে হিরাক্লিয়াস বায়তুল মুকাদ্দাসে ক্রস প্রত্যাবর্তন উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। কাজেই মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনার সাথে এর পূর্ণ মিল পাওয়া যায়। এছাড়া ইমাম বুখারী, বালাযুরী এবং মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বলের বর্ণনায় কায়সারের কাছে দূত প্রেরণের ঘটনার বলিষ্ঠ সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

রসূলুল্লাহ্ (সা) হিরাক্লিয়াসের কাছে যে মূল পত্রটি পাঠিয়েছিলেন তা পরবর্তীকালে স্পেনের বাদশাহদের কাছে সংরক্ষিত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক সুহেলী বর্ণনা করেছেন যে ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীতে স্পেনের শাসনকর্তা আলফুনসো এই পবিত্র পত্রটি বংশপরম্পরায় সংরক্ষণ করতেন। আল্লামা আইনী এবং ইবনে ফযলুল্লাহ আল উমরীও তাঁদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে স্পেনের খ্রীস্টান বাদশাহদের কাছে হিরাক্লিয়াসকে লেখা রসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রটি সযত্নে রক্ষিত ছিল। মরক্কোর বিখ্যাত পন্ডিত শেখ আবদুল হাই কাত্তানী তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে গত কয়েক শতাব্দী ধরে এই পত্রটি স্পেনে সংরক্ষিত থাকলেও পরবর্তীতে এটি ফ্রান্সে ছিল বলে শোনা গিয়েছিল, যদিও বর্তমান সময়ে এর সুনির্দিষ্ট হদিস পাওয়া যায় নি।

পরিশেষে বলা যায় যে বাইজেন্টাইনী সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে রসূলুল্লাহর ধর্ম প্রচারমূলক পত্র প্রেরণ করাটা অসম্ভব কিছু নয়। কেননা যাবতীয় পরিস্থিতি এর অনুকূলে রয়েছে।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 জাহিলিয়া যুগ ও ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে বাইজেন্টাইনী রাষ্ট্রের সাথে আরবদের সম্পর্ক

📄 জাহিলিয়া যুগ ও ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে বাইজেন্টাইনী রাষ্ট্রের সাথে আরবদের সম্পর্ক


আরব উপদ্বীপ তিনটি মহাদেশের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এ কারণে প্রাচীন যুগ থেকেই এর একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের সাথে ইউরোপের সোজাসুজি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রাচ্যের পণ্যদ্রব্য প্রধানত আরবের রাস্তা দিয়েই পাশ্চাত্যে গিয়ে পৌঁছত এবং খোদ আরবরাও বাণিজ্য ব্যপদেশে দূর-দূরান্তে গমন করত। একদিকে এ ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন আরবদেরকে মিসর, সিরিয়া, চীন এবং ভারতে পৌঁছিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি মাতৃভূমির অনুর্বরতা অনেক প্রাচীনকাল থেকেই তাদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। যখন বাইজেন্টাইনী রোমকদের উন্নতির যুগ শুরু হয় তখন আরবদের বেশির ভাগ রাজ্যেরই বিলুপ্তি ঘটে অথবা বাইজেন্টাইনীদের অনুগত রাজ্যে পরিণত হয়।

বাইজেন্টাইনী ও ইরানীদের মধ্যে বংশ পরম্পরায় শত্রুতা চলে আসছিলো। এই শত্রুরা একে অপরকে প্রতিরোধ করার জন্য আরবদেরকেই কাজে লাগাত। এ উদ্দেশ্যে তারা আরব সীমান্তে আরবদের দ্বারাই কয়েকটি ক্ষুদ্র নিরপেক্ষ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। বাইজেন্টাইনীরা দামিশকে এই ধরনের একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে যেখানে গাস্সান সম্প্রদায় রাজত্ব করত। গাস্সানীরা বরাবরই রোমানদের অনুগত থাকে এবং তাদের প্রভাবে নিজেরাও খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। বাইজেন্টাইনী প্রভাব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তারা সিরিয়া ছাড়িয়ে ফিলিস্তিন, অতঃপর খোদ উত্তর আরব পর্যন্ত নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহের পিতামহ কুসাই বাইজেন্টাইনী প্রভাবাধীন কুযা'আ সম্প্রদায়ের সহায়তায় মক্কার ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কুসাই মক্কায় একটি নগররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। কুসাইর পর আব্দে মনাফের পুত্র হাশিম কায়সার-ই-রোমের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে সিরিয়া গমনাগমনের নিরাপত্তা লাভ করেন। কায়সার-ই-রোম হাশিমকে হাবশের নাজ্জাশীর নামে একটি সুপারিশপত্রও দিয়েছিলেন। মক্কাবাসীরা প্রতি বছর নিয়মিত শীতকালে ইয়ামন অঞ্চলে এবং গ্রীষ্মকালে সিরিয়া, মিসর প্রভৃতি অঞ্চলে বাণিজ্য যাত্রা করত। তবে বাইজেন্টাইনী সীমান্ত ফাঁড়িতে আরবদেরকে কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হতো এবং অস্ত্র রফতানীর ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।

ইয়ামনের নাজরানে খ্রীস্টানদের ওপর যূনাওয়াসের অত্যাচারের প্রতিবাদে কায়সারের প্ররোচনায় হাবশীরা ইয়ামন আক্রমণ করে এবং সেখানে খ্রীস্টান শাসন প্রতিষ্ঠা করে। রসূলুল্লাহ (সা) শিশু বয়সে এবং যৌবনে বাণিজ্য কাফেলার সাথে সিরিয়া গিয়েছিলেন। নবুওয়ত লাভের পর যখন আরবরা তাঁর ওপর নির্যাতন শুরু করে তখন তিনি অনুসারীদের হাবশায় হিজরত করতে বলেন এবং কায়সারের প্রভাবাধীন নাজ্জাশীর ন্যায়পরায়ণতার প্রশংসা করেন। রসূলুল্লাহ (সা) রোমানদেরকে ইরানীদের ওপর প্রাধান্য দিতেন।

হিজরতের পর মদীনার নগররাষ্ট্র যখন শক্তিশালী হয় তখন রসূলুল্লাহ (সা) উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ দুমাতুল জন্দলকে শত্রুমুক্ত করতে সচেষ্ট হন। ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া চুক্তির পর রসূলুল্লাহ (সা) কায়সার হিরাক্লিয়াসের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র পাঠান। বসরার শাসনকর্তার কাছে প্রেরিত রসূলুল্লাহর দূতকে গাস্সানী সর্দার মুতার নিকটে হত্যা করলে রসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিশোধ নিতে ৮ম হিজরীতে একটি সেনাবাহিনী পাঠান যা মুতার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এরপর ৯ম হিজরীতে রসূলুল্লাহ (সা) বিশাল বাহিনী নিয়ে তাবুক অভিযান পরিচালনা করেন। কায়সার তখন সরাসরি যুদ্ধে না আসলেও সীমান্তবর্তী অনেক ছোট রাজ্য যেমন আয়লা, মাক'না, জারজাহ্ ও আযরাহ্ মুসলমানদের বশ্যতা স্বীকার করে এবং জিযিয়া প্রদানে রাজি হয়।

আয়লার শাসক ইউহান্না রসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে একটি বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। মাক'নাবাসীরাও এই সময় মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। যদিও মাক'না ও খায়বর চুক্তির পরবর্তী কিছু নকল কপি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবে রসূলুল্লাহর সময় উত্তর আরবে ইসলামের রাজনৈতিক প্রভাব সুদৃঢ় হয়েছিল তা অনস্বীকার্য। রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওফাতের ঠিক পূর্বে তিনি মুতা পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে উসামা বিন যায়দের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন যা পরবর্তীতে খলীফা আবু বকর (রা) কার্যকর করেন।

খিলাফতে রাশেদার যুগে রোমানদের ওপর আরবদের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। রোমানদের ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে মুসলমানদের উদারতা ও সহনশীলতা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের স্থানীয় খ্রীস্টানদের আকৃষ্ট করেছিল। ফলে তারা বাইজেন্টাইনীদের চেয়ে মুসলমানদের অধীনে থাকাকেই অধিক শ্রেয় মনে করেছিল। রসূলুল্লাহ (সা) এবং খিলাফতে রাশেদার যুগে ইসলামের এই মানবিক ও রাজনৈতিক আদর্শই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল এলাকা জয় করতে সাহায্য করেছিল।

তথ্যপঞ্জীঃ
La Diplomatic Musulmane al E poque Du prophete etdes khalittas orthodoexs-এর সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো দ্রষ্টব্য।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে আরব-ইরান সম্পর্ক

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে আরব-ইরান সম্পর্ক


আরব উপদ্বীপের বেশির ভাগই মরু অঞ্চল। তাই সেখানকার অধিবাসীরা তাদের খাদ্যের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই অন্য দেশের মুখাপেক্ষী ছিল। তারা জীবিকার সন্ধানে ইরাক ও ইরানে যাতায়াত করত। সর্বপ্রথম 'ত্বাই' সম্প্রদায়ের লোক বসবাসের জন্য ইরানের দিকে যাত্রা করেছিল। ইরাক অঞ্চলে দেশত্যাগী আরবদের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে তারা সেখানে 'হীরা' নামক একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ইরানের বাদশারা বেদুঈন আরবদের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হীরাকে একটি নিরপেক্ষ বাফার স্টেট হিসাবে ব্যবহার করত।

ইরানের শাহানশাহরা হীরার শাসকদের প্রতি আস্থা রাখলেও কালক্রমে তাদের মধ্যে ঔদ্ধত্য দেখা দেয়। হীরাকে ইরানের একটি প্রদেশে পরিণত করতে গিয়ে তারা আরবদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এই তিক্ততা চরম আকার ধারণ করে 'যী-কার' যুদ্ধের সময় যেখানে আরবরা ইরানী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। রসূলুল্লাহ (সা) তখন মদীনায় তাঁর দাওয়াতের কাজ শুরু করেছিলেন। যখন পারস্যের নির্যাতিত আরব নেতা মাসান্না শায়বানী মুসলিম বাহিনীর সাহায্য চাইলেন তখন থেকেই মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে ইরানের সরাসরি সংঘাতের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

আরবের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ যেমন বাহরাইন, আম্মান এবং ইয়ামনও তখন ইরানী প্রভাবাধীন ছিল। আম্মানের আরব সরদার হাওযা বিন আলীকে ইরানের কিসরা একটি রাজমুকুট উপহার দিয়েছিলেন। তায়েফের দুর্গটিও কিসরার পাঠানো প্রকৌশলীর সাহায্যে নির্মিত হয়েছিল। রসূলুল্লাহ (সা) মক্কী জীবনেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে একদিন কিসরা ও কায়সারের সম্পদ মুসলমানদের অধিকারে আসবে।

৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া চুক্তির পর রসূলুল্লাহ (সা) প্রতিবেশী শাসকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে শুরু করেন। তিনি ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেজের কাছে আবদুল্লাহ বিন হুযাফার মাধ্যমে একটি পত্র পাঠান। পত্রে খসরুকে 'ইরানের নেতা' সম্বোধন করা হয়েছিল যা অহংকারী খসরুর পছন্দ হয়নি। সে পুরো পত্রটি না পড়েই ছিঁড়ে ফেলে। রসূলুল্লাহ (সা) এ খবর শুনে বদদোয়া করে বলেছিলেন— আল্লাহ তা'আলাও তার সাম্রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে দিন।

খসরু পারভেজ ইয়ামনের গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা)-কে গ্রেফতার করে মাদায়েনে পাঠাতে। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সা) বাযানের দূতদের বলেন যে আল্লাহর নির্দেশে খসরু পারভেজ স্বীয় পুত্রের হাতে নিহত হয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় খসরুর মৃত্যু তারিখ নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও কায়সার হিরাক্লিয়াসের সমসাময়িক পত্র থেকে জানা যায় যে ২৭ ফেব্রুয়ারি ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে (৬ষ্ঠ হিজরীর মধ্য রমযান) খসরু পারভেজ নিহত হন। রসূলুল্লাহর এই ভবিষ্যদ্বাণী ফলে বাযান এবং ইয়ামনের অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করে।

খসরুর মৃত্যুর পর পারস্য সাম্রাজ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। রসূলুল্লাহ (সা) এই সুযোগে পারস্যের অধীনস্থ আরব প্রদেশগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করেন। বাহরাইনের মুনযার বিন সাভা এবং আম্মানের জীফার ও আবদ রসূলুল্লাহর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা মাদায়েনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে মদীনার আনুগত্য স্বীকার করে। রসূলুল্লাহ (সা) অত্যন্ত সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পারস্যের হাত থেকে আরব উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রসূলুল্লাহর ওফাতের পর তাঁর সুযোগ্য খলীফা আবূ বকর সিদ্দীকের সময় পারস্য বিজয়ের চুড়ান্ত যাত্রা শুরু হয়।

টিকাঃ
১. তানবীহ, মাসউদী, পৃষ্ঠা ১৮৬।
২. কায়সার হিরাক্লিয়াসের যুদ্ধাভিযান সম্পর্কে জার্মান ভাষায় লিখিত গিরল্যাণ্ড-এর পুস্তক সবচাইতে নির্ভরযোগ্য।
৩. সীরাতে ইবনে হিশাম ও তারীখে তাবারীর বিভিন্ন বর্ণনা এবং 'আহদে নবভী কা নেযামে হুকমরানী' দ্রষ্টব্য।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগেই ইয়াহুদী

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগেই ইয়াহুদী


বর্তমান বিশ্বে রক্ত সম্পর্ক বা বংশের উপর ভিত্তি করে গঠিত জাতিসমূহের মধ্যে য়াহূদী একটি অতি প্রাচীন জাতি । এই জাতির একটি নিজস্ব সভ্যতা, নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে । যদি এদেরকে হযরত ইয়াকূব বিন ইসহাক বিন ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর বলে মেনে নেওয়া হয় তাহলে এরা নমরূদদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাবিল অর্থাৎ ইরাক থেকে কে'নান অর্থাৎ ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় এসেছিল । অতঃপর হযরত ইউসুফ (আ)-এর যুগে এরা মিসরে গমন করে ।

বলা হয়ে থাকে যে, ঐ যুগে সিরীয় বংশোদ্ভূত একটি গোত্র ফিরাউনের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল । এ কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে হযরত ইউসুফ (আ)-এর 'আযীয-ই-মিসর' অর্থাৎ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী মন্ত্রী হতে কোনরূপ বেগ পেতে হয় নি । এর কয়েক পুরুষ পরই মিসরীয় বংশোদ্ভূত একটি গোত্র ফিরাউনের আসনে অধিষ্ঠিত হয় । ফলে পূর্বেকার ফিরাউনদের অনুগ্রহপ্রাপ্তরা ধীরে ধীরে পরবর্তীদের রোষানলে পতিত হয় ।

ফিরাউন রা'মাসীস-এর যুগে য়াহূদীরা হযরত মূসা (আ)-এর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধভাবে মিসর ছেড়ে 'আরদে মুকাদ্দাসের' (ফিলিস্তিন)-এর দিকে যাত্রা করে । সুহুফে মূসা অর্থাৎ তাওরীতের বাকি অংশ অন্যান্য নবীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে বলে প্রকাশ । তাওরীত থেকেই জানা যায় যে, য়াহূদীরা 'আরদে মুকাদ্দাসের' প্রাচীন অধিবাসীদের (যারা আরবের আমালিকা বংশোদ্ভূত ছিল) উপর এরূপ অমানুষিক অত্যাচার করে যে, তাতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে । তারা স্তন্যপানকারী শিশুদেরকেও রেহাই দেয়নি । এই হিংস্র স্বভাবের কারণেই য়াহূদীরা বারবার গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং য়াহূদী বংশোদ্ভূত অসংখ্য নবী ও সংস্কারক তাদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন ।

বাদশাহ তালুতের পর হযরত দাউদ (আ) এবং হযরত সুলায়মান (আ) ফিলিস্তিনে 'ইলাহী রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন । অতঃপর গৃহযুদ্ধের কারণে য়াহূদী রাষ্ট্র দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং কখনো ইরাক পূর্ব থেকে এবং কখনো সিরিয়া উত্তর থেকে এই সমস্ত জনবসতির উপর আক্রমণ চালাতে থাকে । ফলে য়াহূদীরা ফিলিস্তিন পরিত্যাগ করে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে । অতঃপর ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তন এবং সেখানে বসবাস করার জন্য তাদের উপর্যুপরি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে ।

নবুওতের পূর্বে
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবকালে আরবের প্রতিটি অঞ্চলেই য়াহুদীরা বসবাস করত । কোথাও তাদের বসতি ছিল ঘন, আবার কোথাও ছিন্নভিন্ন । সংক্ষেপে বলতে গেলে তাদের বসতির একটি শিকল ইলা (আকাবা) মাক'না, খায়বর, ওয়াদিউল কু'রা, তীমার, ফিদক, মদীনা, ইয়াসরিব, তায়েফ এবং জারশ থেকে নিয়ে ইয়ামান, আম্মান এবং বাহরাইন পর্যন্ত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত ছিল ।

মক্কায় য়াহূদীদের কমই দেখা যেত । অবশ্য মক্কার আশেপাশে ঘন ঘন যে সমস্ত মেলা (যেমন-উকায, মিনা, মাজনা, যুলমাজায প্রভৃতি) বসত সেগুলোতে অর্থ উপার্জনের জন্য তারা বিভিন্ন প্রকারের অভিনব কৌশল অবলম্বন করত । ভবিষ্যত বক্তা, জ্যোতিষী ইত্যাদি থেকে আরম্ভ করে সাধারণ মানুষেররও মন জয়ের জন্য তারা রঙ-বেরঙের উপাদান সরবরাহ করত । শিক্ষিত (আহলে কিতাব) হওয়ার কারণে তারা ঐ এলাকার বেদুঈনদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানের পাত্র ছিল ।

প্রাচ্য প্রতীচ্যের সর্বত্রই এখন একথা স্বীকৃত যে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবের প্রারম্ভিক যুগে আহলে কিতাব (য়াহূদী খ্রীস্টান) একজন মহান ব্যক্তিত্ব তথা শেষ সান্ত্বনাদানকারীর অপেক্ষায় ছিল । কিন্তু রসূল-জীবন অধ্যয়নকারীদের সামনে এক্ষেত্রে এমন অদ্ভুত বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়, যার সমন্বয় সাধন মোটেই সহজ নয় । বৈপরিত্যটি হলো এই যে, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবকালে মদীনার য়াহূদীরা একদিকে তাদের প্রতিবেশী আরবদেরকে এই মর্মে হুমকি দিতে থাকে যে, এখনই প্রতিশ্রুত মসীহের আবির্ভাব হবে এবং তারা তাঁর সাহায্যে শত্রুদের মুণ্ডপাত করবে এবং অন্যদিকে এমন সব ঘটনা অহরহ ঘটতে থাকে যাতে য়াহূদীদেরকে ঐ প্রতিশ্রুত মসীহেরই হত্যার ষড়যন্ত্রে দিবারাত্রি লিপ্ত থাকতে দেখা যায় । যেমন, রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর দুধ-মা হালিমার কোলে চড়ে যখন একটি মেলায় যান তখন একজন য়াহূদী জ্যোতিষী তাঁকে দেখেই চীৎকার করে উঠে এবং উচ্চস্বরে বলতে থাকে, 'য়াহূদীরা, তোমরা এই শিশুকে অবিলম্বে হত্যা কর, কেননা সে তোমাদের সর্বনাশ করবে ।' রসূলুল্লাহ্ (সা) আপন কৈশোরে পিতৃব্য আবূ তালিবের সাথে একটি বণিকদলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যখন ফিলিস্তিন যান তখন সেখানকার একজন ঈসায়ী রাহিব (ধর্মগুরু) আবূ তালিবকে পরামর্শ দেন, 'এই ছেলেকে নিয়ে আর অগ্রসর হয়ো না । কেননা য়াহূদীরা এই ছেলের শত্রু । তারা কোনমতে জানতে পারলে একে তৎক্ষণাতই হত্যা করবে ।' ইতিহাসে এ ধরনের আরো অনেক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ।

ইসলাম প্রচারের সূচনায়
'সমগ্র বিশ্বের রহমত' হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে আল্লাহ্ তা'আলা সমগ্র মানব-জাতির জন্য কিয়ামত পর্যন্ত একজন 'উত্তম আদর্শ'রূপে প্রেরণ করেছিলেন । তাই তাঁকে অধীন রাখা হয়েছিল স্বাভাবিক কার্যকারণের । সমগ্র জ্বিন ও মানুষ তাঁর সম্বোধিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত দায়দায়িত্বের গণ্ডি ছিল তাঁর সীমাবদ্ধ । একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁকে তাঁর গোত্রের এবং তাঁর সাথে মেলামেশাকারীদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয় । অতঃপর নির্দেশ দেওয়া হয় গোপনীয়তা পরিত্যাগ করে সবাইকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার । মক্কী জীবনে মোটামুটিভাবে তাঁর ব্যক্তিগত যে দায়দায়িত্ব ছিল তা কুরআনের "لتنذر ام القرى ومن حولها" (যাতে তুমি ভয় দেখাও মক্কা এবং তার আশেপাশের লোকদেরকে) এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে । উল্লেখিত এলাকায় কি য়াহূদীরা বসবাস করত? আরব ঐতিহাসিকরা এর না-সূচক জওয়াব দিয়েছেন এবং কুরআন মজীদের আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যও তা-ই প্রমাণ করে ।

মদীনায় হিজরতের পূর্বে যে ৮৬টি সূরা নাযিল হয়েছে তার মধ্যে কোথাও য়াহূদীদেরকে সরাসরি সম্বোধন করে কিছু বলা হয়নি । 'ইয়া বানী ইসরাঈলা' (হে য়াহূদীগণ)-এই বাক্যটি অবতরণ অনুপাতে সর্বপ্রথম ৮৭নং সূরায় (সূরা বাকা'রা) পাওয়া যায়, যা হিজরতের পরে অবতীর্ণ সূরাগুলোর প্রাথমিক পর্যায়ভুক্ত । মক্কী যুগে 'ইয়া বানী আদম' (হে মানবজাতি) এবং 'ইয়া আইয়ুহান নাস' বাক্যই ব্যবহৃত হয়েছে ।

অবতরণের ধারাবাহিকতা স্মরণে রেখে যদি কিছুদিন কুরআন মজীদ অধ্যয়ন করা যায় তাহলে একথা প্রতিভাত হয়ে উঠে যে, সর্বপ্রথম আয়াত, যার মধ্যে য়াহূদীদের (পরোক্ষভাবে হলেও) উল্লেখ আছে তা হচ্ছে সূরা মুয্যাম্মিলের আয়াত :
انا ارسلنا اليكم رسولا شاهدا عليكم كما ارسلنا الى فرعون رسولا -
নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে তোমাদের সম্বন্ধে সাক্ষীস্বরূপ এক রসূল পাঠিয়েছি যেমন ফিরাউনের কাছে এক রসূল পাঠিয়েছিলাম । (৭৩:১৫)

এখানে য়াহূদী জাতির কোন উল্লেখ করা হয়নি, বরং তাদের শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মূসা (আ)-এর উল্লেখ করে তাঁর সাথে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর তুলনা করা হয়েছে । অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ফিরাউন রা'মাসীসকে পথ প্রদর্শনের জন্য একজন রসূল পাঠিয়েছিলেন এবং সে রসূলকে না মানার দরুন তাকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল । এভাবে তোমাদের (মক্কাবাসীদের) দিকেও আল্লাহ্ তা'আলা একজন রসূল পাঠিয়েছেন ।

অতঃপর সূরা আ'লা অবতীর্ণ হয় । তাতে বলা হয় :
والاخره خير وابقى - أن هذا لفي الصحف الأولى - صحফ ابرهيم وموسى -
অর্থাৎ পরকাল অতি উত্তম ও চিরস্থায়ী, নিশ্চয় একথা পূর্বের কিতাব সমূহেও অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম ও হযরত মূসা (আ)-এর কিতাব সমূহে আছে (৮৭:১৭-১৯) । অতঃপর য়াহুদীদের নয় বরং তাদের একটি নতুন শাখার অর্থাৎ খ্রীস্টানদের উল্লেখ (সূক্ষ্মভাবে) করা হয়েছে সূরা ইখলাসে । তাতে খ্রীস্টানদের মৌলিক বিশ্বাসসমূহকে রদ করা হয়েছে এই বলে যে, 'আল্লাহ্ তা'আলা কাউকেও জন্ম দেন না এবং তিনি নিজেও জন্ম নেন নি ।' কুরআন মজীদের সূরা বুরূজ, সূরা কা'ফ, সূরা ক'মর, সূরা সোয়াদ প্রভৃতিতে বারবার যে বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো, ফিরাউন এবং তার শোচনীয় পরিণামের কথা । সূরা ত্বীন-এর মধ্যে তুরে সিনীন (সিনাই পাহাড়)-এর শুধুমাত্র পরোক্ষ উল্লেখ রয়েছে ।

সূরা সোয়াদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নবীদের উল্লেখ রয়েছে । তাতে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আ), সুলায়মান (আ) এবং আইউব (আ) য়াহূদী বংশে প্রেরিত হয়েছেন এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে ও তেমনি একজন নবী ও রসূলরূপে প্রতিভাত হয়েছেন ।

মক্কী সূরাসমূহের মধ্যে বিস্তারিতভাবে এবং গুরুত্বের সাথে সর্বপ্রথম য়াহূদীদের উল্লেখ করা হয় সূরা আ'রাফে (এই সূরার ক্রমিক নম্বর গ্রন্থনার দিক দিয়ে ৭ এবং অবতীর্ণ হওয়ার দিক দিয়ে ৩৯) ।

এই সূরায় ফিরাউন থেকে মুক্তি এবং 'আরদে মুকাদ্দাসের' পথে হযরত মূসার তাওরীত লাভ প্রভৃতি বর্ণনা করার পর তাওরীত এবং ইঞ্জীলেও হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আগমন সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে । যেমন "মূসা তাঁর সম্প্রদায় হতে সত্তর জন লোককে আমার নির্ধারিত স্থানে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করলো । তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হলো তখন মূসা বললো, 'হে আমার প্রতিপালক, তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে । আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা যা করেছে সেজন্য কি তুমি আমাদের ধ্বংস করবে? এটা তো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দ্বারা তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর । তুমিই তো আমাদের অভিভাবক; সুতরাং আমাদের ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই তো শ্রেষ্ঠ ।

'আমাদের জন্য নির্ধারিত কর ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ, আমরা তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করেছি ।' আল্লাহ্ বললেন, আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতে ব্যাপ্ত; সুতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারিত করবো যারা সাবধান হয়, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে ।

যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক নিরক্ষর রসূলের-যার উল্লেখ তাওরীত ও ইঞ্জীলে-যা তাদের নিকট আছে-তাতে লিপিবদ্ধ পায়, যে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তু বৈধ করে ও অপবিত্র বস্তু অবৈধ করে এবং যে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের ভার হতে ও বন্ধন হতে যা তাদের উপর ছিল । সুতরাং যারা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাকে সম্মান করে এবং যে আলো তার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে তারাই সফলকাম ।

বল, 'হে মানুষ, আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসূল, যিনি আকাশ-মণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই; তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান; সুতরাং তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহর প্রতি ও তাঁর নিরক্ষর রসূলের প্রতি যে আল্লাহ্ ও তাঁর বাণীতে বিশ্বাস করে, এবং তোমরা তার অনুসরণ কর যাতে তোমরা পথ পাও ।

মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন দল রয়েছে যারা অন্যকে ন্যায়ভাবে পথ দেখায় ও ন্যায়বিচার করে (৭ : ১৫৫-৫৯) ।"

আমি এই আয়াতসমূহের 'শানে নুযুল' তাফসীর ও হাদীস গ্রন্থাদিতে পরিষ্কারভাবে পাই নি । তবে আমার মনে হয়, মক্কাবাসীরা যখন তায়েফ, ইয়ামন, মদীনা, খায়বর, ইরাক, সিরিয়া, মিসর প্রভৃতি দেশ সফর করত এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে মক্কার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি (নাবা-ই আযীম) শোনাত (অর্থাৎ বলত যে, তাদের শহরে এক ব্যক্তি আল্লাহর রসূল হওয়ার দাবি করছে) । তখন সেখানকার য়াহূদী এবং খ্রীস্টানরা এ ব্যাপারে তাদের বিভিন্নমুখী মতামত পেশ করত এবং মক্কাবাসীদেরকে বিভিন্ন নতুন প্রশ্ন শিখিয়ে দিত এবং কুরআনে যে সমস্ত প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে সেগুলোর জওয়াব বাৎলে দিত । সূরা আ'রাফে প্রথমে বিস্তারিতভাবে ধর্ম প্রচার এবং সৎপথ প্রদর্শনের মৌলিক দলীলাদি পেশ করা হয়েছে এই মর্মে যে, পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যেও নবী-রসূল এসেছেন । একদিকে নবীদের সমসাময়িক লোকেরা নাফরমানীর কারণে আল্লাহর শাস্তিতে পতিত হয়ে যেমন ধ্বংস হয়েছে অন্যদিকে তেমনি নবীদের অনুসারীদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যেও যখন নাফরমানী ফিরে এসেছে এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত শিক্ষার শেষ চিহ্নটুকু পর্যন্ত মুছে গেছে তখন তাদের মধ্যে আবার নতুনভাবে নবীর আবির্ভাব হয়েছে । অথবা ইতিপূর্বে যেখানে কোন নবী আসেননি তখন সেখানে নবী এসেছেন । এভাবে নূহ, হূদ, সালেহ, লুত এবং শূআ'ইব (আ)-এর বিবরণী দেওয়া হয়েছে । অতঃপর ফিরাউনের প্রতি হযরত মূসা (আ)-এর প্রেরিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে । অন্যান্য নবীর চাইতে মূসা (আ)-এর শিক্ষা সংরক্ষিত বলে মনে করা হত এবং তাঁর অনুসারী য়াহূদীরাও বর্তমান ছিল । এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠত যে, যদি তাওরীত মূসা (আ)-এর উপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাব হয়ে থাকে তাহলে কোন নতুন নবী এবং নতুন কিতাবের কি প্রয়োজন? যেসব লোক সৎপথ চায় তারা সবাই য়াহূদী হয়ে গেলেই তো পারে । অন্ততঃ মদীনার য়াহূদীরা তখন পর্যন্ত মোটামুটিভাবে ধর্ম প্রচার করত এবং তাদের ধর্মকে শুধুমাত্র বংশগত বেষ্টনী তথা বনী ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করত না । ঐ সময়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রত্যক্ষভাবে য়াহূদীদের সম্মুখীন হন নি । শুধু মক্কীবাসীদেরকে য়াহূদীদের শিখিয়ে দেওয়া প্রশ্নাদি তাঁর সামনে আসছিলো এবং তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও প্রয়োজন অনুযায়ী উত্থাপিত প্রশ্নাদির উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন । যেমন :
১. তিনি [মুহাম্মদ (সা)] বর্তমান নবী এবং ইঞ্জীলে তাঁর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে ।
২. মানুষের বুদ্ধিমত্তার ক্রমোন্নতির প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা'আলা তার সাবেক নির্দেশাবলী কিছুটা সংশোধন, কিছু কিছু বাধা-নিষেধ দূরীকরণ এবং শক্ত বোঝা অপসারণ করে নিজ কৃপায় মানুষের জীবন ধারণ পদ্ধতি অপেক্ষাকৃত সহজ ও সরল করতে চান ।
৩. পূর্ববর্তী নবীদের আগমন দেশভিত্তিক, জাতিভিত্তিক এবং কালভিত্তিক ছিল । এখন আল্লাহ্ তা'আলা এমন একজন নবী পাঠাতে চেয়েছেন যিনি হবেন সর্বদেশ, সর্বকাল এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য ।

এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের একটি অতি স্বল্প সংখ্যক লোকও যদি আজ পর্যন্ত সত্যিকার রাব্বানী শিক্ষার উপর কায়েম থাকে তাহলে তাদেরকেও কি নবাগত নবীর অনুসরণের জন্য অনুপ্রাণিত করা হবে? হ্যাঁ, করা হবে । কেননা পূর্ববর্তী সব ধর্মগ্রন্থেই একজন পরিষ্কার ভাষায় শেষ নবী, একজন শেষ সান্ত্বনাদাতার আগমনের কথা বলা হয়েছে । অতীতের সমস্ত ধর্মগ্রন্থেই হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর উল্লেখ আছে বলে কুরআনও দাবি করেছে - "إنه لفي زبر الأولين" সুদীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়া এবং নানা ঘটন-অঘটনে পতিত হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বেদসমূহের (চাই তা ইবরাহীম (আ) প্রাপ্ত সহীফা হোক কিংবা না হোক) মধ্যে একজন আবদুল্লাহ্ ও আমিনা-তনয়ের আগমনের সুসংবাদ আছে । গৌতম বুদ্ধও (চাই তিনি নবী হোন কিংবা না হোন) মরণকালে তাঁর অনুচরদেরকে একজন সম্মানিত নবীর আগমনের নির্দেশ দেন । তাওরীত এবং ইঞ্জীলে রসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমনের সুসংবাদ লিপিবদ্ধ ছিল বলে কুরআন দাবি করছে । গত চৌদ্দ শ' বছর ধরে মুসলিম জ্ঞানী ব্যক্তিরা এ বিষয়ের উপর অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা করে আসছেন । অতএব আমি এখানেই আলোচনার ইতি টানছি ।

তখন পর্যন্ত মক্কাবাসীরাই ছিল রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সম্বোধিত জন । অবশ্য হজ্ব উপলক্ষে আরব উপদ্বীপের অন্যান্য এলাকারও যে সমস্ত লোক বছরে একবার মক্কার অদূরে মিনা নামক স্থানে সমবেত হত এবং কয়েকদিন সেখানে অবস্থান করে ঈদ পালন করত, খুব সম্ভব তারাও শীঘ্রই সম্বোধিতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে । তবে তখন পর্যন্ত য়াহূদী এবং খ্রীস্টানরা সরাসরি রসূলুল্লাহর সামনে আসে নি বলা চলে । এ কারণে য়াহূদীদের উল্লেখ পরোক্ষভাবে এবং তৃতীয় পুরুষে করা হয়েছে । অবশ্য তাদের ধর্মের ভাল দিকটি অকপটে তুলে ধরা হয়েছে এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ যে আল্লাহ্ প্রদত্ত সে কথাও খোলাখুলিভাবে স্বীকার করা হয়েছে ।

২৭তম সূরায় (যা অবতীর্ণ হওয়ার দিক দিয়ে ৪৮তম) একটি নতুন ভঙ্গিতে বক্তব্য পেশ করা হয় । সূরার প্রথমে যেখানে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর অনুসারীদেরকে এই বলে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে যে, অবতীর্ণ কুরআন চরম বিজ্ঞ ও জ্ঞানী আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে আসছে, সেখানে সামান্য আগে বেড়ে বলা হচ্ছে যে, 'নিশ্চয়ই এই কুরআন বনী ইসরাইলের কাছে, তারা যে সকল বিষয়ে বিবাদ (মতানৈক্য) করে থাকে তার অধিকাংশই ঠিক ঠিক বলে দেয় (২৭ : ৭৬) ।' তাহলে কি কিছুসংখ্যক য়াহূদী প্রতিশ্রুত নবীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং বাকীরা তা অস্বীকার করেছিল? এক্ষেত্রে অনুমান করা ছাড়া গত্যন্তর নেই । তবে এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, অতঃপর কুরআন এবং রসূলুল্লাহ (সা)-এর দৃষ্টি য়াহূদীদের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল । কেননা এর পর যে দু'টি সূরা (সূরা কাসাস্ ও সূরা বনী ইসরাইল) অবতীর্ণ হয় তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হযরত মূসা (আ)-এর অবস্থা, তাঁর মাহাত্ম্য এবং উচ্চ মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে । বলা হয়েছে, 'আমি পূর্বতন যুগের লোকদের ধ্বংস করার পর অবশ্যই মূসা (আ)-কে কিতাব দিয়েছিলাম, যা মানুষের জন্য পরিষ্কার দলীল, সৎপথের জ্ঞান ও দয়াস্বরূপ, এই উদ্দেশ্যে যে, তারা এ থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে (২৮ : ৪৩) ।

বোঝা যাচ্ছে যে, এবার পরোক্ষভাবে হলেও য়াহূদীদের সাথে রসূলুল্লাহ (সা)-এর সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল এবং তারা (ইসলাম সম্পর্কে) মক্কার কুরায়শদের উত্থাপিত ওজর আপত্তি এবং তর্ক-বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে দিয়েছিল এবং তাওরীতের মধ্যে রসূলুল্লাহ্ (সা) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা অস্বীকার করছিল । কেননা এর পরই যে সূরা নাযিল হয় (১০ম সূরা) । তাতে মূসা এবং হারুন (আ)-এর বিস্তারিত বিবরণী (১০ : ৭৫) পেশ করার পর সমকালীন য়াহুদীদেরকে জেনে শুনে বিপরীত মত পোষণ এবং সত্যকে অস্বীকার করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে (১০ : ৯৩) । বলা হয়েছে, "আমি তোমার নিকট যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তোমার কোন সন্দেহ হয় তাহলে যারা তোমার আগে থেকে কিতাব পড়ে আসছে তাদের জিজ্ঞাসা কর (১০ : ৯৪) ।" এর দ্বারাও অনুমান করা হয় যে, এক অথবা একাধিক য়াহূদী ও খ্রীস্টান ইতিপূর্বে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল এবং তারা সমর্থন করে যাচ্ছিলো যে, তাওরীত ও ইঞ্জীলে যে প্রতিশ্রুত নবী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তিনি মুহাম্মদ (সা) ছাড়া আর কেউ নন । অতঃপর সূরা হুদ নাযিল হয় । তাতেও নবী (সা)-এর অভিযোগটির পুনরাবৃত্তি করা হয় (১১ : ১১০) ।

ইতিমধ্যে হযরত মূসা (আ)-র কিতাবকে 'আসমানী ওহী' বলে স্বীকার করার কারণে একটি নতুন প্রশ্ন দেখা দিচ্ছিল এবং কুরআন থেকে তার জওয়াব পাওয়া যাচ্ছিল । বিষয়টি হলো এই যে, য়াহূদীদের পবিত্র গ্রন্থে পূর্ববর্তী নবীদের অবস্থা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে । তবে এর মধ্যে কোন কোন নবীর কীর্তিকলাপ লজ্জাজনক এবং অপমানজনক বলেই প্রতীয়মান হয় । একদিকে কুরআন প্রায় প্রতিদিন এসব নবীর নাম ও অবস্থা বিশদভাবে বর্ণনা করে তাঁদেরকে আদর্শ স্থানীয় ব্যক্তিত্ব এবং আল্লাহর সম্মানিত বান্দারূপে সর্বসমক্ষে পেশ করছিলো, বরং মুসলমানদেরকে এখনো ঐসব নবীর শিক্ষা এবং আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ দিচ্ছিলো ("بهدا هم قنده" তুমিও তাদের পথ অনুসরণ কর - ৬ : ১১) এবং অন্যদিকে এই সমস্ত নবীর অবস্থা আহলে কিতাব অর্থাৎ য়াহূদীদের কাছে যেভাবে লিপিবদ্ধ পাওয়া যেত, তাতে ঘৃণারই উদ্রেক হত ।

য়াহূদী জাতির মত য়াহুদীদের পবিত্র গ্রন্থও বারবার অত্যন্ত সংকটজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় । কখনো কখনো বিদেশী আক্রমণকারীরা য়াহূদী ধর্মকে নির্মূল করার অভিপ্রায়ে য়াহূদীদের ধর্মগ্রন্থকে ধ্বংস করে দেয় এবং কয়েক শতাব্দী পর শুধু ব্যক্তি বিশেষের স্মরণশক্তির উপর নির্ভর করে পরিপূর্ণভাবে তো নয়ই বরং আংশিকভাবে তা আবার লিপিবদ্ধ করা হয় । কখনো কখনো ধর্মনেতারা বিশুদ্ধ মন নিয়ে স্থানে স্থানে তা সংশোধন করেন, কখনো কখনো অনুন্নত প্রাচীন লিখন পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন করতে গিয়ে তাতে কিছু নতুন জিনিস ঢুকে পড়ে, দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হওয়ার ফলে কখনো কখনো হাতে লেখা গ্রন্থগুলোর কালি মুছে গিয়ে মূল বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হয়ে যায়—এ সমস্ত কথা এখন খোদ য়াহুদীরাও স্বীকার করেন । আমরা এখানে আরো একটি অতিরিক্ত বিষয়ের উল্লেখ করবো । আর তা হচ্ছে এই যে, হযরত সুলায়মান (আ)-এর মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে য়াহুদীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং এতে প্রত্যেকটি দল এবং একে অন্যকে দোষী সাব্যস্ত করছিল । ইয়ারুবাম নামীয় একজন দলপতি হযরত সুলায়মান (আ) কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত এবং তাঁর কট্টর শত্রু ছিল । ঘটনাচক্রে সে-ই হযরত সুলায়মান (আ)-এর পর য়াহূদীদের বারোটি গোষ্ঠীর মধ্য থেকে দশটি গোষ্ঠীরই বাদশারূপে স্বীকৃতি লাভ করে । অতঃপর সে আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মকে পরিত্যাগ করে পৌত্তলিকতার প্রচলন করে । হযরত সুলায়মান (আ)-এর পুত্র এবং তাঁর মনোনীত ব্যক্তি শুধুমাত্র দু'টি গোষ্ঠীর বাদশাহরূপে সিংহাসনে আরোহণ করেন । বাদশাহ ইয়ারুবাম অধিকৃত অঞ্চলসমূহের ধর্মগ্রন্থে হযরত সুলায়মান (আ) এবং তাঁর পিতা প্রমুখের অবস্থাদি কিরূপ বিকৃত করে লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে এবার তা চিন্তা করে দেখুন ।

এবার কুরআন মজীদ য়াহুদীদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিরাট অবদান হিসাবে পরিলক্ষিত হলো । তারা এর আলোকে তাদের নবীদের চরিত্র এবং আচার-আচরণকে মানব সৃষ্ট কালিমা থেকে মুক্ত করে আদি ও আসলরূপে পুনরায় কিতাবে লিপিবদ্ধ করলো । গত কয়েক শতাব্দী ধরে প্রকৃতিও কুরআনকে বারবার সাহায্য করেছে । বিভিন্ন স্থান থেকে তাওরীতের বিভিন্ন লিপিবদ্ধ অংশ ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রাথমিক যুগের লিপিবদ্ধ গ্রন্থের সাথে পরবর্তী যুগের গ্রন্থের তুলনামূলক বিচারে তাতে সংযোজিত অনেক ভুলভ্রান্তি এবং পরিবর্তন ও পরিবর্ধন লোক চোখে ধরা পড়েছে ।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন সময়ে য়াহুদীরা কয়েকজন আরব বেদুঈনের সৌজন্যে একটি পুরাতন ধ্বংসাবশেষ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তাওরীত সমূহের সর্বাধিক প্রাচীন কপিটি সংরক্ষিত অবস্থায় উদ্ধার করে । এটা খ্রীস্টীয় সনের সূচনাকালে কিংবা তার নিকটবর্তী কোন এক সময়ে লেখা হয়েছিল । এই কপিটির প্রথম পাঠকালেই বর্তমানকালে প্রচলিত তাওরীতের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করতে হয় । বিশ্বস্ততার সাথে এটা সম্পাদনা করলে পূর্ববর্তী নবীদের উপর আরোপিত আরো অনেক কলংকই অনায়াসে বিদূরিত হয়ে যাবে । য়াহূদীদের আভ্যন্তরীণ কোন্দল, জেনে শুনে সত্যকে অস্বীকার প্রভৃতি কথা সূরা 'হুদ' এরপর সূরা হামীম সিজদায়ও (৪১ : ৪৫) উল্লেখ করা হয়েছে । আর সূরা শূরা (৪২ : ১৫) এবং সূরা জাসিয়াও য়াহূদী নবীদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং য়াহুদীদের উপর আল্লাহ্ প্রদত্ত পুরস্কার এবং অবদানের কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে । সূরা জাসিয়ায় তো বলা হয়েছে, 'আর নিশ্চয় আমি বনী ইসরাইলকে কিতাব, হিকমত (বিচারের জ্ঞান) ও নবুওত দিয়েছিলাম, তাদেরকে ভাল ভাল জিনিস খেতে দিয়েছিলাম, সমুদয় সৃষ্টির উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে এসব (সত্য ধর্মের) বিষয়ে স্পষ্ট দলীল দিয়েছিলাম, কিন্তু তাদের কাছে জ্ঞান ভাণ্ডার আসার পরে তারাই নিজেদের মধ্যে শুধু পরস্পর হিংসাবশতঃ মতভেদ করেছে (৪৫ : ১৬) ।'

অতঃপর সূরা আহকা'ফ নাযিল হয় । তাতে 'এবং এর পূর্বে, মূসার কিতাবই মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক ও করুণাস্বরূপ ছিল এবং এই কিতাব কুরআন সত্যতা ঘোষণাকারী'—বলে তাওরীতের প্রশংসা করা হয় এবং কুরআনকে তাওরীতের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং সাহায্যকারীরূপে সর্বসমক্ষে উপস্থাপন করা হয় । সূরা আম্বিয়া-যা এর কিছু পরে নাযিল হয়েছিল—তাতে তাওরীতকে 'আল-ফুরকান' এবং যিয়া (জ্যোতি) আখ্যা দেওয়া হয় ।

কুরআনের প্রচারমূলক প্রয়োজনেই উপরিউক্ত কাহিনীমূলক সূরাসমূহের পর বিশুদ্ধ আকায়িদমূলক সূরা 'গাশিয়া' নাযিল হয়, যাতে মানুষকে কিয়ামতের (শেষ বিচারের) ভয় দেখানো হয় । অতঃপর পুনরায় কাহিনীমূলক (সূরা কাহফ) নাযিল হয় ।

প্রবাদবাক্য, গল্প কাহিনী প্রভৃতির সাহায্যে উপস্থাপিত যুক্তির মধ্যে তীক্ষ্ণ ধার ও সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয় সত্য, তবে এক্ষেত্রে একটি কথা স্মরণ রাখা উচিত যে, ঐ সমস্ত কাহিনীর গোলকধাঁধায় পতিত হওয়া, যেমন-কাহিনীতে বর্ণিত আসহাবে কাহফ কোন্ যুগের, তাদের সংখ্যা কত ছিল, তাদের নাম কি ছিল, তাদের গুহা কোথায় ছিল ইত্যাদি কুরআনের মূল লক্ষ্য তথা মানব জাতির পথ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কোন গুরুত্বই রাখে না তবে এক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞান থেকে উপকৃত হওয়ার মধ্যে বাধার কিছু নেই ।

উপরোক্ত বর্ণনার প্রেক্ষিতে নিম্নে মূসা (আ) ও আবে হায়াত (যেখানে মাছ জীবিত হয়ে গিয়েছিল)-এর কাহিনীর উপর কিঞ্চিৎ আলোচনা করা হচ্ছে ।

একটি কথা জেনে রাখা উচিত যে, এ ধরনের কাহিনী বিভিন্ন সভ্যতার ঐতিহ্যগত বিবরণীর মধ্যে পাওয়া যায় । এটা মূসা (আ)-এর হাজার বছর পরের ঘটনা হলেও মহান আলেকজান্ডার এবং তার বাবুর্চিকেও এ ধরনের একটি কাহিনীর দিকে সম্পর্কিত করা হয়ে থাকে । তবে একটি কাহিনী যা ইরাকে কিছু সংখ্যক ইটের উপর লিখিত অবস্থায় একটি লাইব্রেরীতে পাওয়া গেছে এবং যা হযরত মূসা (আ)-এর চাইতেও প্রাচীন যুগের বলে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে-তাতে গাল্ গামীশ্ নামীয় এক ব্যক্তিকে অবিকল এই ঘটনারই নায়ক বলা হয়েছে । উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, কুরআন মজীদে দু'জন পৃথক ব্যক্তিত্বের জন্য 'ইমরান' নাম ব্যবহার করা হয়েছে । এভাবে 'মূসা' নামও যদি দু'জন ব্যক্তির জন্য ব্যবহার করা হয় তবে তাতে কোন বাধা নেই । সূরা কাহফের মধ্যে মূসা (আ) এবং তার শিক্ষা-সফরের যে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে বাহ্যত এটা বোঝা যায় না যে, তিনি অবশ্যই অবশ্যই মূসা বিন ইমরান (হযরত হারুনের ভাই) হবেন । যদি বলা হয় যে, এই মূসা দ্বারা গালগা মূসা ('মীশ' এর অপভ্রংশ)-কে বোঝানো হয়েছে, তাহলেও আপত্তির কিছুই থাকবে না । (গালগা মীশের আবে হায়াত এবং মাছের পুনরায় জীবিত হওয়ার বিস্তারিত কাহিনী জার্মান সাময়িকী তাসাইত শারীফত ফিউরা সেভরিয়া লোগী, ১৯১১-তে দেখুন) তাওরীতের মধ্যেও মাছ জীবিত হওয়ার কোন কাহিনী মূসার দিকে সম্পর্কিত করা হয়নি ।

মক্কী সূরাগুলো সম্পর্কে আর একটি জিনিসের উল্লেখ করে এখানেই আলোচনার ইতি টানছি । সূরা আন'আম (বর্তমান পাঠক্রম অনুযায়ী ৬ষ্ঠ এবং নুযূলক্রম অনুযায়ী ৫৫তম), অতঃপর সূরা নহল (পাঠক্রম অনুযায়ী ১৬শ এবং নুযূলক্রম অনুযায়ী ৭০তম)-এর মধ্যে য়াহূদীদের খাদ্য সম্পর্কিত বাধা-নিষেধের উল্লেখ আছে । প্রথমে উল্লেখিত সূরায় বলা হয়েছে, 'আর য়াহুদীদের জন্য আমি নিষিদ্ধ করেছিলাম সমুদয় নখযুক্ত জন্তু, আরো নিষিদ্ধ করেছিলাম গরু, ভেড়া ও ছাগলের চর্বি-যা তাদের পিঠে বা নাড়ীভুঁড়ির মধ্যে থাকে কিংবা যা হাড়ের সঙ্গে জড়িত আছে তৎসমুদয় ব্যতীত । আমি তাদেরকে এই শাস্তি দিয়েছিলাম তাদের বিদ্রোহের কারণে; আমি অবশ্যই সত্যবাদী (৬ : ১৪৭)' এবং পরে উল্লেখিত সূরায় বলা হয়েছে "এবং আমি য়াহুদীদের উপর সেই জিনিস নিষিদ্ধ করেছিলাম, যা এর পূর্বে তোমার কাছে বর্ণনা করেছি । বস্তুত আমি তাদের উপর কোন অত্যাচার করিনি, বরং তারাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে (১৬ : ১১৮) ।" এর দ্বারা অনুমিত হয় যে, যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ সমস্ত অনাবশ্যকীয় বাধা-নিষেধকে রহিত ঘোষণা করেন [সে মুহাম্মদ (সা) তাদেরকে ভাল কাজের হুকুম দেয় এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে এবং তাদের জন্য পবিত্র জিনিসসমূহ বৈধ (হালাল) এবং অপবিত্র জিনিসসমূহ অবৈধ করে দেয় এবং তাদের উপর যে বোঝা ও বেড়িসমূহ ছিল তা নামিয়ে দেয় (৭ : ১৫৭) । তখন য়াহূদীরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ধিক্কার দিতে থাকে এবং তাঁর বিরুদ্ধে মক্কাবাসীদেরকে উত্তেজিত করতে থাকে । এমতাবস্থায় য়াহূদীদেরকে ধমকিয়ে দেওয়া সমীচীন মনে করা হয় । আর তাদেরকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, যে জিনিস প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে তা খারাপ জিনিস ছিল না । অতএব এই প্রেক্ষিতে নির্দোষ আরববাসী এবং মুসলমানদের জন্য আল্লাহ্-সৃষ্ট এই সমস্ত অবদানকে নিষিদ্ধ করার কোন কারণই থাকতে পারে না ।

সারসংক্ষেপ
মোটকথা, মক্কী যুগে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং য়াহূদীদের সম্পর্কের উপর বাইরের কোন সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না । তবে কুরআনের বর্ণনার আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য দ্বারা উপরোক্ত সম্পর্কের যে বিবরণী উপরে পেশ করা হয়েছে তাতে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ইসলাম এবং য়াহূদীদের মধ্যে মোটামুটি একটি সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল এবং দিন দিন তা ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল । মাদানী সূরার একটি আয়াত (অবশ্য বাইরের সাক্ষ্য) দ্বারা এও স্বীকৃত হয়েছে যে, এই আয়াত (মক্কী) দ্বারা এবং মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের সময় নাজ্জাশীর নামে লিখিত এবং হযরত জাফর ত্বাইয়া (রা)-এর হস্তে প্রদত্ত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চিঠির একটি কথা দ্বারা :
يا اهل الكتاب تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم ..... الآية
অর্থাৎ তুমি বলো, 'হে কিতাবিগণ, আসো সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, আমরা আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদত করি না, কোন কিছুতেই তাঁর শরীক করি না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া কাউকেই প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করে না ।' (৩ : ৬৪)

পরিষ্কার বোঝা যায় যে, মক্কী যুগেই য়াহূদী, খ্রীস্টান এবং সাধারণ আরববাসীদেরকে মিল্লাতে ইবরাহীমের পতাকাতলে একত্রিত করার ব্যাপক প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং মদীনায় হিজরতের পর তা ব্যাপকতা লাভ করে । আগামীতে আমরা এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো ।

টিকাঃ
১. রামাসীস তার উপাধি ছিল । তবে সিসোতারস নামে তিনি বিখ্যাত ছিলেন । আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ১৩৩০ অব্দে তিনি তাঁর পিতা সীতী (প্রথম)-এর স্থলাভিষিক্ত হন এবং খ্রীস্টপূর্ব ১২৬০ অব্দের কোন এক সময়ে পানিতে ডুবে মারা যান । তাঁর মমিকৃত লাশ ১৮৮১ খ্রীস্টাব্দে পাওয়া যায় ।
২. মুহম্মদ ও বিশ্বের পরিসমাপ্তি (ফরাসী ভাষায় লিখিত) ৪ কাসনোভা, পৃষ্ঠা ২৮ ; ইঞ্জীল : ইউহ্না ।
৩. কুরআনে (২০ : ৮০) এই শব্দ (অর্থাৎ 'হে বনী ইসরাঈল') রসূলুল্লাহর সম্বোধন হিসাবে নয় বরং ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে এসেছে ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px