📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রাবলীর দু'টি ভিত্তি

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রাবলীর দু'টি ভিত্তি


রসূলূল্লাহ (সা) বিভিন্ন সম্রাট ও গোত্র প্রধানের নামে যেসব পত্র পাঠিয়েছিলেন (এ যাবত হিসাব করে দেখা গেছে।), সেগুলোর সংখ্যা বর্তমান সোয়া দুই শ'তে পৌঁছেছে। সর্বপ্রথম বিশটি পত্র সম্বলিত এর একটি সংকলন প্রকাশ করেন ইয়ামনের গভর্নর আমর ইবনে হাযম। কয়েক মাস পূর্বে এ বিষয়ের উপর একটি মূল্যবান প্রবন্ধ প্রকাশ করার সৌভাগ্য আমারও হয়েছিল। তবে, মূল পত্রগুলো ছিল বহুদিন থেকেই লুপ্তপ্রায়। সরকারী রেকর্ড অফিসে যেসব পত্র সংরক্ষিত ছিল হাজ্জাজ বিন ইউসুফের শাসনামলে করোটিকার দিনে জনসাধারণের হাতে সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এছাড়া প্রাপকদের অসতর্কতার দরুনও কিছু পত্র বিলুপ্ত হয়। এতদসত্ত্বেও বেশ কিছু পত্রের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে আজও ইতিহাসের পাতায় পাতায়। স্পেনের ঈসায়ী সম্রাটদের কাছে সংরক্ষিত পত্রটির অবস্থার চাক্ষুষ বিবরণী পরিলক্ষিত হয় ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত লেখকদের পুস্তকগুলোতে। জায়গীর দান সংক্রান্ত ব্যাপারে তামীম দারী (রা) যে একটি পত্র পেয়েছিলেন সেকথা ইমাম আবূ ইউসুফ (র)-এর মত প্রবীণ লেখকও বর্ণনা করেছেন।

আমরা এখন আলোকপাত করবো ঐ দুটি পত্রের উপর, যা সম্প্রতি পাওয়া গেছে এবং যার ফটো ও নিগেটিভও সংগ্রহ করার সুবর্ণ সুযোগ হয়েছে। পত্রদ্বয়ের একটি হলো, মিসরের প্রধান পাদ্রী মকোকিসের নামে। এ পত্রটির ফটো ভারতবর্ষে বহুদিন থেকেই সুপরিচিত ছিল। অপর পত্রটি হলো, বাহরাইনের মুসলিম শাসনকর্তা মুনযর বিন সাভার নামে। এর ফটোও ১৮৬৩ খ্রীস্টাব্দে Zdmg নামক জার্মান পুস্তিকায় ছাপা হয়েছে। এ দুটি মূল্যবান পত্রের উপর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ইউরোপে খুব কমই হয়েছে। উর্দু ভাষায় তো মোটেই হয়নি। সুতরাং আমরা এখন এ দুটি পত্রের উপর পৃথক পৃথক আলোচনা করবো।

প্রথম পত্র
প্রথম পত্রটি হলো মিসরের প্রধান পাদ্রী মকোকিসের নামে। রসূলুল্লাহ্ (সা) এ সময় প্রতিবেশী সাম্রাজ্যদ্বয়ের সম্রাটদের কাছে ইসলামের তাবলিগী দাওয়াত পৌঁছাতে মনস্থ করেন। মকোকিসের কাছে প্রেরিত পত্র সম্পর্কে ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ মোদিও রেয়না প্যারিসের ত্রৈমাসিক পত্রিকা 'আইয়াতিক বাবতা'এর ১৮৫৪ (ইং) সংখ্যায় (৪র্থ খণ্ড) একটি চিঠি প্রকাশ করেন। পত্রটি সনাক্ত করেন মৌসিও বার্তেলমী। তিনি আখেমীমের নিকটবর্তী একটি খ্রীস্টান দরবেশের আস্তানায় আরবী ভাষায় লিখিত একটি পুস্তকের মলাট থেকে পাতলা চামড়ায় লেখা এই পবিত্র পত্রটি উদ্ধার করেন।

রসূলুল্লাহ্ (সা) মকোকিসের নামে যে পত্রটি পাঠিয়েছিলেন, তার প্রাপ্ত পত্রের ফটো দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, এটা মূল পত্র। কেননা এতে মোহর রয়েছে। সুতরাং এটাকে কৃত্রিম মনে করার কোন সম্ভাবনা নেই। সুলতান আবদুল হামীদ খান (প্রথম) এটি একশ' স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে সংগ্রহ করেন এবং এটি ইস্তাম্বুলের রাজপ্রাসাদের ভাণ্ডারে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পবিত্র স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষিত হয়। ১৯০৪ খ্রীস্টাব্দে জুরযী যায়দান তাঁর আরবী মাসিক 'আল-হেলাল' (কায়রো) পত্রিকায় এর একটি নকলের ফটো প্রকাশ করেন।

জার্মানীর প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ড. বেকার এবং ইতালীয় ঐতিহাসিক কায়নাতী এই পত্রটিকে জাল বা ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করার চেষ্টা করেছেন। কায়নাতীর অভিযোগ ছিল— মকোকিস খ্রীস্টান পাদ্রী হয়ে অখ্রীস্টান নবীকে কেন দাসী উপহার দেবেন? এর উত্তরে বলা যায়, তৎকালীন ধর্মীয় দলাদলিতে মকোকিস আরবী নবীকে হয়তো খ্রীস্টানদের একটি নতুন সম্প্রদায়ের প্রবর্তক মনে করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে উপহার প্রদান বা বিয়ের সম্বন্ধ গড়ার রীতি প্রাচীনকালেই বিদ্যমান ছিল। মিসরের আরবী জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক মৌসিও ভাইট দাবি করেছেন যে পত্রটির ভাষা নাজ্জাশী ও রোম সম্রাটের পত্রের মতই। কিন্তু যেহেতু তিনটি পত্রই একই দিনে একই লক্ষ্য নিয়ে লেখা হয়েছিল এবং লেখকও সম্ভবত একই ব্যক্তি ছিলেন, তাই ভাষা এক হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মকোকিসের পত্রে মোহর সম্পর্কে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তার সাথে এ পত্রের পূর্ণ মিল রয়েছে (তিন লাইনে মুহাম্মদ, রসূল, আল্লাহ)। নলডেক নামক জনৈক গবেষকের ধারণা ছিল যে তৎকালীন সময়ে মাটির মোহর ব্যবহৃত হতো। তবে 'মাটির মোহর' সম্ভবত লেফাফার মুখে লাগানো হতো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কিন্তু মূল দলিলে কালির মোহরই বাঞ্ছনীয় ছিল যাতে তা স্থায়িত্ব পায়।

দ্বিতীয় পত্র
বাহরাইনের মুসলিম শাসনকর্তা মুনযর বিন সাভার নামে প্রেরিত পত্রটি হলো দ্বিতীয় পত্র। রসূলুল্লাহ্ (সা) ষষ্ঠ হিজরীতে মুনযরের নামে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র পাঠিয়েছিলেন। পত্র পেয়ে মুনযর ইসলাম গ্রহণ করলে রসূলুল্লাহ (সা) তাকে বাহরাইনের শাসনকর্তা পদে বহাল রেখে একটি ফিরতি নির্দেশনামা পাঠান। সম্প্রতি প্রাপ্ত এই পত্রটিই সেই নির্দেশনামা। ১৮৬৩ সালে Zdmg পত্রিকার সম্পাদক ফ্রেইসার এই পত্রটিকে জাল বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল— এই পত্রের বচন বা বিষয়বস্তু ইতিহাসে পাওয়া যায় না এবং লিপিরীতিতে অনেক ভুল রয়েছে। কিন্তু ইবনে তোলোন, আল কলশান্দী এবং ইবনুল কাইয়িমের মত প্রাচীন লেখকদের গ্রন্থে এই পত্রের বচন হুবহু সংরক্ষিত আছে। ফ্রেইসার যে লিপিগত অসামঞ্জস্যের কথা বলেছিলেন, তা প্রকৃতপক্ষে সেকালের লিখন পদ্ধতির অজ্ঞতাপ্রসূত। যেমন, 'আশহাদু'র 'শীন' এবং 'হে' লেখার বিশেষ প্রাচীন রীতি ফ্লেইসার বুঝতে পারেননি।

মুনযরের পত্র এবং মকোকিসের পত্রের মোহরের মধ্যে পূর্ণ সাদৃশ্য বিদ্যমান ছিল, যা উভয় পত্রের অকৃত্রিমতারই সাক্ষ্য বহন করে। ১৯১৭ সালে দামেশকে খাজা কামালুদ্দিন এটি স্বচক্ষে দেখেছিলেন।

তথ্যপঞ্জী
১. 'কিতাবুল খারাজ' (আবু ইউসুফ)। পৃষ্ঠা, ৩২। এছাড়া বালাযুরী ইয়াহইয়া বিন আদম ও মাওয়ারদী।
২. আল ওসায়িকুস্ সিয়াসিয়াহ ফিল আহাদিন নবভী ওয়াল খিলাফতের রাশিদাহ, ছাপা মিসর।
৩. এই ফটো এবং আয়ইয়াতিক পত্রিকায় প্রকাশিত পত্র-যা মকোসিসের নামে লেখা হয়েছিল তারও ফটো জার্মানীর বন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যবিষয়ক বিভাগের প্রধান ড. পাওয়াল কালে মেহেরবানীপূর্বক আমাকে দিয়েছিলেন।
৪. 'ইলামুস সাইলীন আন কুতুবে সাইয়ীদিল মুরসালিন', প্রণেতা ইবনে তোলোন; 'যাদুল মা'আদ', প্রণেতা ইবনে কাইয়িম; 'সুবহুল আ'শা', প্রণেতা আল কলশান্দী।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র (রোমের কায়সারের নামে)

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র (রোমের কায়সারের নামে)


ইসলামের সূচনাকালে সিরিয়ার উর্বর অঞ্চল বাইজেন্টাইনী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার দক্ষিণে আরব উপদ্বীপ-সীমান্তে অনেকগুলো বেদুঈন সম্প্রদায় বসবাস করত, যারা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন ছিল, কিন্তু বাইজেন্টাইনীদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কায়সার-ই-রোমের পক্ষ থেকে তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু ভাতা নির্ধারিত ছিল-যার বিনিময়ে তারা বাইজেন্টাইনীদের অনুকূলে ছিল এবং বেদুঈন আরবদেরকে বাইজেন্টাইনী এলাকায় লুটপাট করা থেকে বিরত রাখত।

অনেক প্রাচীনকাল থেকেই সিরিয়ার সাথে আরবের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল এবং প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে আরবদের বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়ায় যাতায়াত করত। ইরানী ও বাইজেন্টাইনী সাম্রাজ্যের মধ্যে বংশ পরম্পরায় সব সময়ই যুদ্ধ লেগে থাকত। রসূলুল্লাহর নুবুওত প্রাপ্তির সময় সে যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করে। রসূলুল্লাহর হিজরতের কিঞ্চিৎ পূর্বে ৭১৩ থেকে ৭১৭ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ইরানী সেনাবাহিনী দামিশক, বায়তুল মুকাদ্দাস এবং আলেকজান্দ্রিয়া দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু পঞ্চম হিজরী মুতাবিক ৭২৭ খ্রীস্টাব্দে নিল্ডার রণক্ষেত্রে ইরানীরা এমন শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে যে, এতদিনকার যুদ্ধের মোড় একেবারে ঘুরে যায়। তখন বাইজেন্টাইনীরা শুধু তাদের হারানো সব এলাকাই ফিরে পায়নি বরং প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নিজেদের পছন্দসই কিছু শর্তও আদায় করে নেয়।

মুসলিম ঐতিহাসিকদের মতে ষষ্ঠ হিজরীর শেষের দিকে রসূলুল্লাহ (সা) বাইজেন্টাইনীদের নেতা, রোম সম্রাটের নামে একটি পত্র প্রেরণ করেন এবং দূতকে নির্দেশ দেন, যেন ঐ পত্র বসরা শহরের (হাওরান অঞ্চল) শাসনকর্তার হাতে সোপর্দ করা হয়। বসরার গভর্নর নিজেই এই ব্যবস্থা নেন যে, পত্রটি এশিয়া কোচকে, কায়সার হিরাক্লিয়াসের কাছে পৌঁছিয়ে দেন। হিরাক্লিয়াস তখন এশিয়া কোচকেই অবস্থান করছিলেন। যদিও 'গোল্ট'-এর মত গ্রন্থকাররা এই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নিতে ইতস্তত করেন নি, তবু আমি এখানে ঐ সমস্ত অভিযোগ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা পর্যালোচনা করবো— যা ইউরোপের বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে।

সুইডেনের বিখ্যাত গ্রন্থকার 'বোল” রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে ঐ সমস্ত পত্রেরও উল্লেখ করেছেন যা রসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী শাসনকর্তাদের নামে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহর প্রেরিত দূতেরা অলৌকিকভাবে ঐ সমস্ত দেশের ভাষায় কথা বলতে লাগলো যেখানে যেখানে তাদেরকে পাঠানো হয়েছিল। এ ধরনের কেচ্ছা আসলে হযরত ঈসা (আ)-এর হাওয়ারীদের সম্পর্কেই প্রচলিত। প্রকৃতপক্ষে 'বোল' এ ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েছেন। ইবনে হিশামের সীরাতে রসূলুল্লাহ্ এবং তাবারীর ইতিহাসের মধ্যে ঘটনাটি অন্যভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে হুদায়বিয়া সন্ধির পর রসূলুল্লাহ (সা.) যখন দূত নির্বাচনের প্রস্তাব দেন তখন তিনি সাহাবীদের হাওয়ারীদের উদাহরণ দিয়ে ধৈর্য ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে বলেছিলেন যাতে তারা কোনরূপ ইতস্তত না করেন।

কায়তানী নামক এক ইতালীয় ঐতিহাসিক এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে কিছু অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁর অভিযোগগুলো ছিল— দূত হযরত দেহইয়া (রা) কায়সারের কাছ থেকে ফিরে আসার সময় নাকি ডাকাতির শিকার হয়েছিলেন ষষ্ঠ হিজরীর মধ্যভাগে, অথচ দূতদের রওয়ানা হওয়ার কথা ষষ্ঠ হিজরীর শেষে। এছাড়া দেহইয়া (রা)-এর খায়বর যুদ্ধে অংশগ্রহণের তথ্য নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তাবারীর বর্ণনায় দিন তারিখের হেরফের মূলত ওয়াকিদীর অসংলগ্ন বর্ণনার ফলশ্রুতি। প্রকৃত ঘটনা হলো হযরত দেহইয়া (রা) ষষ্ঠ হিজরীর শেষভাগে সিরিয়া রওয়ানা হয়েছিলেন এবং পথিমধ্যে জাযাম সম্প্রদায়ের ডাকাতরা তাকে আক্রমণ করেছিল। পরবর্তীতে খায়বর বিজয়ের পর তিনি পুনরায় কায়সারের কাছে পত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য সিরিয়া গমন করেন।

কায়তানীর আরেকটি অভিযোগ ছিল যে কায়সার হিরাক্লিয়াস ৬২৮ খ্রীস্টাব্দের পূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস আসেন নি। কিন্তু গ্রীক ঐতিহাসিক নিকেফোর এবং সেখানকার শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় যে ৬২৮ খ্রীস্টাব্দের ডিসেম্বরের দিকে হিরাক্লিয়াস বায়তুল মুকাদ্দাসে ক্রস প্রত্যাবর্তন উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। কাজেই মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনার সাথে এর পূর্ণ মিল পাওয়া যায়। এছাড়া ইমাম বুখারী, বালাযুরী এবং মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বলের বর্ণনায় কায়সারের কাছে দূত প্রেরণের ঘটনার বলিষ্ঠ সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

রসূলুল্লাহ্ (সা) হিরাক্লিয়াসের কাছে যে মূল পত্রটি পাঠিয়েছিলেন তা পরবর্তীকালে স্পেনের বাদশাহদের কাছে সংরক্ষিত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক সুহেলী বর্ণনা করেছেন যে ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীতে স্পেনের শাসনকর্তা আলফুনসো এই পবিত্র পত্রটি বংশপরম্পরায় সংরক্ষণ করতেন। আল্লামা আইনী এবং ইবনে ফযলুল্লাহ আল উমরীও তাঁদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে স্পেনের খ্রীস্টান বাদশাহদের কাছে হিরাক্লিয়াসকে লেখা রসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রটি সযত্নে রক্ষিত ছিল। মরক্কোর বিখ্যাত পন্ডিত শেখ আবদুল হাই কাত্তানী তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে গত কয়েক শতাব্দী ধরে এই পত্রটি স্পেনে সংরক্ষিত থাকলেও পরবর্তীতে এটি ফ্রান্সে ছিল বলে শোনা গিয়েছিল, যদিও বর্তমান সময়ে এর সুনির্দিষ্ট হদিস পাওয়া যায় নি।

পরিশেষে বলা যায় যে বাইজেন্টাইনী সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে রসূলুল্লাহর ধর্ম প্রচারমূলক পত্র প্রেরণ করাটা অসম্ভব কিছু নয়। কেননা যাবতীয় পরিস্থিতি এর অনুকূলে রয়েছে।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 জাহিলিয়া যুগ ও ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে বাইজেন্টাইনী রাষ্ট্রের সাথে আরবদের সম্পর্ক

📄 জাহিলিয়া যুগ ও ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে বাইজেন্টাইনী রাষ্ট্রের সাথে আরবদের সম্পর্ক


আরব উপদ্বীপ তিনটি মহাদেশের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এ কারণে প্রাচীন যুগ থেকেই এর একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের সাথে ইউরোপের সোজাসুজি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রাচ্যের পণ্যদ্রব্য প্রধানত আরবের রাস্তা দিয়েই পাশ্চাত্যে গিয়ে পৌঁছত এবং খোদ আরবরাও বাণিজ্য ব্যপদেশে দূর-দূরান্তে গমন করত। একদিকে এ ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন আরবদেরকে মিসর, সিরিয়া, চীন এবং ভারতে পৌঁছিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি মাতৃভূমির অনুর্বরতা অনেক প্রাচীনকাল থেকেই তাদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। যখন বাইজেন্টাইনী রোমকদের উন্নতির যুগ শুরু হয় তখন আরবদের বেশির ভাগ রাজ্যেরই বিলুপ্তি ঘটে অথবা বাইজেন্টাইনীদের অনুগত রাজ্যে পরিণত হয়।

বাইজেন্টাইনী ও ইরানীদের মধ্যে বংশ পরম্পরায় শত্রুতা চলে আসছিলো। এই শত্রুরা একে অপরকে প্রতিরোধ করার জন্য আরবদেরকেই কাজে লাগাত। এ উদ্দেশ্যে তারা আরব সীমান্তে আরবদের দ্বারাই কয়েকটি ক্ষুদ্র নিরপেক্ষ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। বাইজেন্টাইনীরা দামিশকে এই ধরনের একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে যেখানে গাস্সান সম্প্রদায় রাজত্ব করত। গাস্সানীরা বরাবরই রোমানদের অনুগত থাকে এবং তাদের প্রভাবে নিজেরাও খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। বাইজেন্টাইনী প্রভাব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তারা সিরিয়া ছাড়িয়ে ফিলিস্তিন, অতঃপর খোদ উত্তর আরব পর্যন্ত নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহের পিতামহ কুসাই বাইজেন্টাইনী প্রভাবাধীন কুযা'আ সম্প্রদায়ের সহায়তায় মক্কার ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কুসাই মক্কায় একটি নগররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। কুসাইর পর আব্দে মনাফের পুত্র হাশিম কায়সার-ই-রোমের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে সিরিয়া গমনাগমনের নিরাপত্তা লাভ করেন। কায়সার-ই-রোম হাশিমকে হাবশের নাজ্জাশীর নামে একটি সুপারিশপত্রও দিয়েছিলেন। মক্কাবাসীরা প্রতি বছর নিয়মিত শীতকালে ইয়ামন অঞ্চলে এবং গ্রীষ্মকালে সিরিয়া, মিসর প্রভৃতি অঞ্চলে বাণিজ্য যাত্রা করত। তবে বাইজেন্টাইনী সীমান্ত ফাঁড়িতে আরবদেরকে কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হতো এবং অস্ত্র রফতানীর ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।

ইয়ামনের নাজরানে খ্রীস্টানদের ওপর যূনাওয়াসের অত্যাচারের প্রতিবাদে কায়সারের প্ররোচনায় হাবশীরা ইয়ামন আক্রমণ করে এবং সেখানে খ্রীস্টান শাসন প্রতিষ্ঠা করে। রসূলুল্লাহ (সা) শিশু বয়সে এবং যৌবনে বাণিজ্য কাফেলার সাথে সিরিয়া গিয়েছিলেন। নবুওয়ত লাভের পর যখন আরবরা তাঁর ওপর নির্যাতন শুরু করে তখন তিনি অনুসারীদের হাবশায় হিজরত করতে বলেন এবং কায়সারের প্রভাবাধীন নাজ্জাশীর ন্যায়পরায়ণতার প্রশংসা করেন। রসূলুল্লাহ (সা) রোমানদেরকে ইরানীদের ওপর প্রাধান্য দিতেন।

হিজরতের পর মদীনার নগররাষ্ট্র যখন শক্তিশালী হয় তখন রসূলুল্লাহ (সা) উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ দুমাতুল জন্দলকে শত্রুমুক্ত করতে সচেষ্ট হন। ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া চুক্তির পর রসূলুল্লাহ (সা) কায়সার হিরাক্লিয়াসের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র পাঠান। বসরার শাসনকর্তার কাছে প্রেরিত রসূলুল্লাহর দূতকে গাস্সানী সর্দার মুতার নিকটে হত্যা করলে রসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিশোধ নিতে ৮ম হিজরীতে একটি সেনাবাহিনী পাঠান যা মুতার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এরপর ৯ম হিজরীতে রসূলুল্লাহ (সা) বিশাল বাহিনী নিয়ে তাবুক অভিযান পরিচালনা করেন। কায়সার তখন সরাসরি যুদ্ধে না আসলেও সীমান্তবর্তী অনেক ছোট রাজ্য যেমন আয়লা, মাক'না, জারজাহ্ ও আযরাহ্ মুসলমানদের বশ্যতা স্বীকার করে এবং জিযিয়া প্রদানে রাজি হয়।

আয়লার শাসক ইউহান্না রসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে একটি বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। মাক'নাবাসীরাও এই সময় মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। যদিও মাক'না ও খায়বর চুক্তির পরবর্তী কিছু নকল কপি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবে রসূলুল্লাহর সময় উত্তর আরবে ইসলামের রাজনৈতিক প্রভাব সুদৃঢ় হয়েছিল তা অনস্বীকার্য। রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওফাতের ঠিক পূর্বে তিনি মুতা পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে উসামা বিন যায়দের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন যা পরবর্তীতে খলীফা আবু বকর (রা) কার্যকর করেন।

খিলাফতে রাশেদার যুগে রোমানদের ওপর আরবদের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। রোমানদের ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে মুসলমানদের উদারতা ও সহনশীলতা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের স্থানীয় খ্রীস্টানদের আকৃষ্ট করেছিল। ফলে তারা বাইজেন্টাইনীদের চেয়ে মুসলমানদের অধীনে থাকাকেই অধিক শ্রেয় মনে করেছিল। রসূলুল্লাহ (সা) এবং খিলাফতে রাশেদার যুগে ইসলামের এই মানবিক ও রাজনৈতিক আদর্শই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল এলাকা জয় করতে সাহায্য করেছিল।

তথ্যপঞ্জীঃ
La Diplomatic Musulmane al E poque Du prophete etdes khalittas orthodoexs-এর সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো দ্রষ্টব্য।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে আরব-ইরান সম্পর্ক

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগে আরব-ইরান সম্পর্ক


আরব উপদ্বীপের বেশির ভাগই মরু অঞ্চল। তাই সেখানকার অধিবাসীরা তাদের খাদ্যের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই অন্য দেশের মুখাপেক্ষী ছিল। তারা জীবিকার সন্ধানে ইরাক ও ইরানে যাতায়াত করত। সর্বপ্রথম 'ত্বাই' সম্প্রদায়ের লোক বসবাসের জন্য ইরানের দিকে যাত্রা করেছিল। ইরাক অঞ্চলে দেশত্যাগী আরবদের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে তারা সেখানে 'হীরা' নামক একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ইরানের বাদশারা বেদুঈন আরবদের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হীরাকে একটি নিরপেক্ষ বাফার স্টেট হিসাবে ব্যবহার করত।

ইরানের শাহানশাহরা হীরার শাসকদের প্রতি আস্থা রাখলেও কালক্রমে তাদের মধ্যে ঔদ্ধত্য দেখা দেয়। হীরাকে ইরানের একটি প্রদেশে পরিণত করতে গিয়ে তারা আরবদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এই তিক্ততা চরম আকার ধারণ করে 'যী-কার' যুদ্ধের সময় যেখানে আরবরা ইরানী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। রসূলুল্লাহ (সা) তখন মদীনায় তাঁর দাওয়াতের কাজ শুরু করেছিলেন। যখন পারস্যের নির্যাতিত আরব নেতা মাসান্না শায়বানী মুসলিম বাহিনীর সাহায্য চাইলেন তখন থেকেই মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে ইরানের সরাসরি সংঘাতের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

আরবের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ যেমন বাহরাইন, আম্মান এবং ইয়ামনও তখন ইরানী প্রভাবাধীন ছিল। আম্মানের আরব সরদার হাওযা বিন আলীকে ইরানের কিসরা একটি রাজমুকুট উপহার দিয়েছিলেন। তায়েফের দুর্গটিও কিসরার পাঠানো প্রকৌশলীর সাহায্যে নির্মিত হয়েছিল। রসূলুল্লাহ (সা) মক্কী জীবনেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে একদিন কিসরা ও কায়সারের সম্পদ মুসলমানদের অধিকারে আসবে।

৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়া চুক্তির পর রসূলুল্লাহ (সা) প্রতিবেশী শাসকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে শুরু করেন। তিনি ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেজের কাছে আবদুল্লাহ বিন হুযাফার মাধ্যমে একটি পত্র পাঠান। পত্রে খসরুকে 'ইরানের নেতা' সম্বোধন করা হয়েছিল যা অহংকারী খসরুর পছন্দ হয়নি। সে পুরো পত্রটি না পড়েই ছিঁড়ে ফেলে। রসূলুল্লাহ (সা) এ খবর শুনে বদদোয়া করে বলেছিলেন— আল্লাহ তা'আলাও তার সাম্রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে দিন।

খসরু পারভেজ ইয়ামনের গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা)-কে গ্রেফতার করে মাদায়েনে পাঠাতে। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সা) বাযানের দূতদের বলেন যে আল্লাহর নির্দেশে খসরু পারভেজ স্বীয় পুত্রের হাতে নিহত হয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় খসরুর মৃত্যু তারিখ নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও কায়সার হিরাক্লিয়াসের সমসাময়িক পত্র থেকে জানা যায় যে ২৭ ফেব্রুয়ারি ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে (৬ষ্ঠ হিজরীর মধ্য রমযান) খসরু পারভেজ নিহত হন। রসূলুল্লাহর এই ভবিষ্যদ্বাণী ফলে বাযান এবং ইয়ামনের অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করে।

খসরুর মৃত্যুর পর পারস্য সাম্রাজ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। রসূলুল্লাহ (সা) এই সুযোগে পারস্যের অধীনস্থ আরব প্রদেশগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করেন। বাহরাইনের মুনযার বিন সাভা এবং আম্মানের জীফার ও আবদ রসূলুল্লাহর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা মাদায়েনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে মদীনার আনুগত্য স্বীকার করে। রসূলুল্লাহ (সা) অত্যন্ত সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পারস্যের হাত থেকে আরব উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রসূলুল্লাহর ওফাতের পর তাঁর সুযোগ্য খলীফা আবূ বকর সিদ্দীকের সময় পারস্য বিজয়ের চুড়ান্ত যাত্রা শুরু হয়।

টিকাঃ
১. তানবীহ, মাসউদী, পৃষ্ঠা ১৮৬।
২. কায়সার হিরাক্লিয়াসের যুদ্ধাভিযান সম্পর্কে জার্মান ভাষায় লিখিত গিরল্যাণ্ড-এর পুস্তক সবচাইতে নির্ভরযোগ্য।
৩. সীরাতে ইবনে হিশাম ও তারীখে তাবারীর বিভিন্ন বর্ণনা এবং 'আহদে নবভী কা নেযামে হুকমরানী' দ্রষ্টব্য।

ফন্ট সাইজ
15px
17px