📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 হুদায়বিয়া সন্ধির বিজয় বা রসুলুল্লাহ্ (সা)-এর পররাষ্ট্র নীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল দিক

📄 হুদায়বিয়া সন্ধির বিজয় বা রসুলুল্লাহ্ (সা)-এর পররাষ্ট্র নীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল দিক


বিশ্ব ইতিহাসে রসূলুল্লাহ (সা)-এর শাসনকাল একটি যুগান্তকারী বৈপ্লবিক অধ্যায়। ঐ সময়ে সারা বিশ্বে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য পারস্য ও রোম ছিল মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতবর্ষ ও চীনে সভ্য জাতিসমূহের শাসন পদ্ধতি প্রচলিত থাকলেও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় অব্যাহত ছিল বৃহৎ শক্তিসমূহের ক্ষমতা দখলের সংঘাত। ভূমধ্যসাগর ঐ সময় কেবল ভৌগোলিক দিক থেকে নয় বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও ছিল পৃথিবীর মধ্যবর্তী এলাকা। ভূমধ্যসাগরের তীরেই গ্রীসের অবস্থান। রোম, মিসর এবং সিরিয়ার অবস্থানও ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেষে। এই সাগরেরই উপকূলে শেষ হয়েছে আরবের উত্তরসীমা। আর এই সাগর পর্যন্ত নিজ সাম্রাজ্যসীমা বিস্তারে পারস্য ছিল সদা তৎপর, অল্পকালের জন্য হলেও তারা এক্ষেত্রে বেশ কয়েকবার সাফল্যও অর্জন করেছিল। প্রকৃতি আরবদেশকে স্থাপন করেছে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এ তিনটি মহাদেশের কেন্দ্রস্থলে। আরবেরই বাসোপ-যোগী' উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যস্থলে অবস্থিত মহানগরী মক্কা। কবির কল্পনায় নয় বরং বাস্তবতার নিরিখেই বলা চলে যে, মহানগরী মক্কা ভূমণ্ডলের মধ্যস্থলেই অবস্থিত।

অতএব ঐ প্রাচীন যুগে বিশ্বব্যাপী কোন আন্দোলন পরিচালনার পক্ষে মক্কাই ছিল সর্বাধিক উপযুক্ত স্থান। 'হিজায' ভূমিতে ইউরোপের শীতল, আফ্রিকার উষ্ণ ও এশিয়ার শস্য-শ্যামল পরিবেশের একটি মিশ্রিত রূপ ছিল বিদ্যমান। কাজে কাজেই সেখানকার অধিবাসীরাও ছিল তিনটি মহাদেশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সর্বপরি সামরিক দিক থেকে মক্কা ছিল অতি সুরক্ষিত অঞ্চল।

হিজরীপূর্ব ১৩ সালে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর জন্মভূমি মক্কায় ইসলামের প্রচার কাজ শুরু করেন। কিন্তু কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করতে না করতেই সমগ্র দেশবাসী তাঁর কট্টর শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে তাদের প্রবল শত্রুতা ও বিরোধিতার দুর্যোগপূর্ণ তেরটি বছর অতিক্রম করার পর প্রথম হিজরী সালে তিনি জন্মভূমি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। শীঘ্রই সেখানে তিনি একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং একটি নগর-রাষ্ট্রেরও গোড়াপত্তন করেন। এই নগর-রাষ্ট্রের জন্য তিনি যে লিখিত সংবিধানটি রচনা করেছিলেন, ইতিহাস আজ পর্যন্ত সেটাকে বিভিন্ন দফা সম্বলিত একটি দলীল হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছে। মদীনা গমনের কয়েক মাসের মধ্যেই রসূলুল্লাহ্ (সা) পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের এলাকাগুলি সফর করে সকলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন। ফলে মদীনা থেকে ইয়ামবো' পর্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী গোত্রসমূহ (বনী যুমরা, মদলজ প্রভৃতি) ইসলাম গ্রহণ না করলেও রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, কেউ মদীনা আক্রমণ করলে তারা মুসলমানদেরই সাহায্য করবে যদি তাদের এলাকা শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে মুসলমানরা তাদেরকে সাহায্য করবে। তবে দুই পক্ষের কেউ চুক্তি অনুযায়ী না চললে কেউ কাউকে সাহায্য করবে না। মূলত এটা ছিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যার উপর দিয়ে বাণিজ্যিক কাফেলাসমূহ যাতায়াত করত। মক্কাবাসীরা এই পথেই সিরিয়া, মিসর, ইরাক প্রভৃতি অঞ্চলে যাতায়াত করত। এই রাস্তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা কুরায়শদের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং তারা বদর যুদ্ধের পরাজয়ের চাইতেও অধিক মাত্রায় বিচলিত হয়ে উঠে।

তৃতীয় হিজরী সালে উহুদের যুদ্ধে মুসলমানরা বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হয়, কিন্তু অচিরেই তারা সে অসুবিধা কাটিয়ে উঠে। তারা মদীনার পূর্বদিকে অবস্থিত নজদ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে মক্কাবাসীদের ইরাক যাওয়ার কষ্টদায়ক বিকল্প রাস্তাটিও বন্ধ করে দেয়। এ সময় বনি কায়নুকা ও বনি নযীরের য়াহুদী সম্প্রদায় দেশত্যাগে বাধ্য হয় এবং মদীনার উত্তরে খায়বর অঞ্চলের য়াহূদীদের সাথে বসবাস করতে শুরু করে। তারা তখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং কুরায়শকেও গিতফান প্রভৃতি গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে ক্ষেপিয়ে তুলতে থাকে। দুমাতুল জন্দল ছিল উত্তর আরবের একটি বাণিজ্য কেন্দ্র। মদীনায় আগমনকারী বাণিজ্যিক কাফেলাসমূহকে সেখানে লুটতরাজ করা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। য়াহূদী পুঁজিপতিদের প্ররোচনায়ই অনুরূপ ঘটনা ঘটত। এই য়াহুদীদেরই প্ররোচনায় গিতফান ও ফাযারাহ্ গোত্রদ্বয় একদিকে এবং কুরায়শ ও তার মিত্র গোত্রগুলি অন্যদিকে খন্দকের সংঘর্ষের সময় মদীনা অবরোধ করেছিল। ঐ দুর্বল মুহূর্তে মদীনার অবশিষ্ট য়াহূদীরাও (বনি কুরায়যা) যাতে মুসলমানদের সাথে বিশ্বাঘাতকতা করে সে ব্যবস্থাও তারা পূর্বাহ্নে করে রেখেছিল। মুসলমানরা এই সাংঘাতিক ধরনের বিপদটি কাটিয়ে উঠলে পর বনি কুরায়যাকে তাদের কৃতকর্মের জন্যে দেশান্তরিত করা হয়। অতঃপর খায়বর, তীমা, ওয়াদিউল কু'রা, মাকনা প্রভৃতি স্থানের য়াহুদীরাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

এটা ছিল মুসলমানদের জন্য একটি দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্ত। উত্তর আরবের খায়বর প্রভৃতি স্থান ছিল য়াহুদী শক্তির কেন্দ্রস্থল। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফাযারা, গিতফান ইত্যাদি গোত্র খায়বরবাসীদের 'সাথে মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ছিল না। তারা যখনই সুযোগ পেত তখনই মুসলমানদের ক্ষতিসাধন করত। দক্ষিণে ছিল মক্কা। অর্থনৈতিক দিক থেকে মক্কা চাপের সম্মুখীন হলেও সামরিক দিক দিয়ে ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। মক্কাবাসীরা ক্রোধ ও হিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিল এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছিল। খায়বরে অবস্থানরত বনী নযীরের লোকদের প্রচেষ্টা পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তুলেছিল। য়াহূদী, গিতফান, কুরায়শ-এ ত্রিশক্তির আক্রমণ থেকে মদীনাকে রক্ষা করা তখন সহজ কাজ ছিল না। খন্দকের যুদ্ধে য়াহুদী ছাড়াই দশ হাজার সৈন্য মদীনা আক্রমণ করেছিল এবং প্রয়োজনবোধে যেকোন সময় ন্যূনপক্ষে আরো তিন হাজার সৈন্য এসে যোগদান করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পক্ষান্তরে আবালবৃদ্ধবনিতা মিলে মুসলমানরা ছিল মাত্র তিন হাজার। সে মুহূর্তে কোন দিক থেকেই তাদের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধির কোন সম্ভাবনা ছিল না।

খায়বর ও মক্কা-এ উভয় শক্তিকেই তখন দমন করার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু একই সাথে দু'টি কেন্দ্রে হামলা করার মত শক্তি মুসলমানদের ছিল না। এমন কি মদীনার প্রতিরক্ষার জন্যে একটি উপযুক্ত বাহিনী মোতায়েন রেখে অন্য একটি পৃথক বাহিনী দ্বারা উক্ত দু'টি কেন্দ্রের যেকোন একটির উপর হামলা পরিচালনার শক্তিও মুসলমানদের ছিল না। সেই সাথে এ আশঙ্কাও ছিল যে, (শামসুল আয়িম্মা সারাসী স্বীয় গ্রন্থ 'আল মাবসূত-এ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে এ আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন) যদি মুসলমানরা মক্কার দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে খায়বর ও গিতফানের লোকেরা মদীনা আক্রমণ করে বসবে। আর যদি মুসলমানরা খায়বর আক্রমণ করে তাহলে মক্কাবাসীরা তাদের আশেপাশের গোত্র ও অধীনস্থদের নিয়ে মদীনায় এসে লুটতরাজ শুরু করে দেবে। কেননা, মদীনা একটি মধ্যবর্তী স্থান। এর উত্তরদিকে খায়বর মাত্র পাঁচ মনযিল এবং মক্কা মাত্র বার মনযিল দূরে।

এমতাবস্থায় একজন রাজনীতিক বা কূটনীতিকের কর্তব্য হবে, যেকোন একটি শত্রুর সাথে সন্ধি করে তাকে অপরটির শত্রু করে তোলা অথবা নিদেনপক্ষে নিরপেক্ষ করে রাখা। একটা থেকে রেহাই পেলে অপরটি আপনা আপনি দমে যাবে এবং মাথাচাড়া দিয়ে উঠার সাহস পাবে না। তবে প্রশ্ন ছিল সন্ধিটা মক্কাবাসীদের সাথে হবে না খায়বরবাসীদের সাথে? খায়বরবাসীদের মিত্র এবং সাহায্যকারী অর্থাৎ ফাযারাহ্ ও গিতফানের লোকেরা ছিল নৈতিকতাবিবর্জিত লুটতরাজ-প্রিয় যাফারর আরব সম্প্রদায়। আর খায়বরস্থ য়াহূদীরা ছিল সাংস্কৃতিক ও বংশগত দৃষ্টিকোণ থেকে আরবদের চাইতে স্বতন্ত্র ধাতের। তাছাড়া দেশান্তরিত হওয়ার কারণে ও সম্পদ লুণ্ঠিত হওয়ার ফলে তাদের মন-মানসিকতাও তখন উগ্র রূপ ধারণ করেছিল। এমতাবস্থায় তাদের সাথে আপোস মীমাংসায় আসা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া অতিলিপু মনোবৃত্তি ও শোষণকারী পুঁজিবাদী হওয়ার কারণে লেনদেনকারী কোন লোকই তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারত না। ঐ একই কারণে তাদের কথার উপরও নির্ভর করা যেত না। তবে একথা বলা যায় যে, খায়বরের প্রাচুর্যময় কেন্দ্রটি একটি অসামরিক জাতির অধীনে থাকায় উহাকে গনীমতের মাল হিসেবে লাভ করা ছিল খুবই সহজসাধ্য।

পক্ষান্তরে মক্কার প্রতি মুসলমানদের আগ্রহ ছিল বিভিন্ন কারণে। মুসলমান মুহাজির সবাই ছিল মক্কাবাসী এবং তাদের আত্মীয়তাও ছিল মক্কাবাসীদের সাথে। কা'বা ছিল মুসলমানদের নামাযের কিবলা ও হজ্জের কেন্দ্রস্থল। মক্কাবাসীরা পরাস্ত হলে তা ইসলামের জন্যে অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। কেননা কুরায়শদের অর্থনৈতিক ও তামদ্দুনিক সম্পর্ক ছিল সারা আরব জুড়ে। যোগ্যতার দিক দিয়েও ছিল তারা সর্বাগ্রে। তাদের কথার মূল্য ছিল এবং তারা উন্নত চিন্তাধারারও অধিকারী ছিল। জাতীয় স্বার্থে জানমাল সহ সর্বশক্তি নিয়োগ করতে তারা দ্বিধাবোধ করত না। তারা কঠোর পরিশ্রমী ছিল এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিও ছিল অনুরাগী। তাছাড়া শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার ব্যাপারেও তারা বেদুঈনদের চেয়ে অধিক যোগ্যতার অধিকারী ছিল। উপরন্তু মুসলমান কর্তৃক অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে তারা সন্ধির জন্যে প্রায় প্রস্তুত হয়েই ছিল এবং মুখ রক্ষার জন্য এর একটা সম্মানজনক সুযোগও খুঁজছিল। ঘটনাক্রমে হিজাযে এ সময় ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মক্কাবাসীদের রসদের কেন্দ্র ইয়ামামার উপর মুসলমানদের (ইয়ামামা বিন উসালের ইসলাম গ্রহণের কারণে) অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেখান থেকে রসদ আমদানী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা) এই অবরোধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করানোর পর স্বেচ্ছায় তা উঠিয়ে নেন।

অধিকন্তু তিনি মক্কার জনসাধারণের মন জয়ের জন্য সেখানকার দীন-দুঃখীদের সাহায্যার্থে ঐ দুর্ভিক্ষের সময় পাঁচশত আশরাফী সেখানে পাঠিয়ে দেন। মক্কার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী নেতা আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবীবা যিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, ঐ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) 'গায়েবানা আকদ'-এর মাধ্যমে তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এছাড়া পশুর চামড়ার বিনিময়ে তিনি জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্রী (খেজুর ইত্যাদি) আবু সুফিয়ানের কাছে হাদিয়াস্বরূপ পাঠিয়ে দেন। মোটকথা, যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করা সত্ত্বেও নীরবে অগোচরে মন জয়ের কাজও চলছিলো। কুরায়শদের হজ্জের সময়ও ছিল সমাগত। এ সময় তারা একাধারে তিনমাস যুদ্ধ বিগ্রহ করাকে নিষিদ্ধ মনে করত এবং কিসাসের উপযোগী পরম শত্রুকেও তখন নগরীতে পাওয়া গেলেও তাকে হত্যা করা হত না। মুসলমানেরা কুরায়শদের কা'বাকেই নিজেদের কিবলা হিসেবে মনে করত এবং সেখানে হজ্জ করাকে নিজেদের 'ধর্মের অঙ্গ' হিসেবে বিশ্বাস করত। সুতরাং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও কুরায়শদের উপর না পড়ে পারে না। উপরোক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ্ (সা) চিন্তা করলেন, যদি হজ্জের মাসগুলোতে তওয়াফে কা'বা, কুরবানী ও উমরা সমাপনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করা যায় এবং কুরায়শদের সামনে তাঁদের মুখরক্ষাকারী কিছু শর্ত উত্থাপন করা যায় তাহলে তারা হয়ত মুসলমানদের সাথে একটি সন্ধির জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে। ঘটনাচক্রে, এ সময় 'নীনভা' নামক স্থানে পারস্য ও রোমের মধ্যকার শত শত বছরের যুদ্ধ পারস্যের চরম পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আর কিছু না হোক, অন্তত আরবে উত্তরাধিকারবিহীনভাবে পরিত্যক্ত ইরানী প্রদেশসমূহ যথা ইয়ামন, বাহরাইন ও ওমানে ইচ্ছামত ঘোরাফেরা করার একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। ইয়ামামায় অধিকার প্রতিষ্ঠার কারণে মুসলমানরা প্রথম থেকেই বাহরাইন ও ওমানের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। এদিকে কুরায়শদের ইয়ামন যাওয়ার রাস্তাও খুলে গিয়েছিল এবং নীনভা'য় রোমীয়দের বিজয় উত্তরাঞ্চলে বড় রকমের যেকোন কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল।

এ সময় মদীনায় কর্মোপযোগী মুসলমান পুরুষের সংখ্যা ছিল আনুমানিক তিন হাজার। যিলকদ মাসে চৌদ্দ শত মুসলমানসহ হজ্জের ইহ্রাম বেঁধে এবং কুরবানীর জন্তু সঙ্গে নিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা হতে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। যেহেতু শান্তিপূর্ণভাবে শুধু হজ্জ সমাপনই মুসলমানদের উদ্দেশ্য ছিল, তাই সঙ্গে কোন যুদ্ধাস্ত্র নেওয়া হয় নি। তবে কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর হযরত উমর (রা)-এর পরামর্শে আত্মরক্ষার জন্য কিছু অস্ত্র মদীনা হতে আনানো হয় এবং তা কোষবদ্ধ অবস্থায়ই সঙ্গে রাখা হয়। যথেষ্ট পরিমাণ সৈন্য মদীনায় রেখেই মুসলমানরা নীরবে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়। অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য যাত্রার প্রাক্কালে যে গোয়েন্দাকে পাঠান হয়েছিল, পথিমধ্যে সে এসে খবর দেয় যে, কুরায়শরা ব্যাপারটা জেনে নিয়েছে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা আহবাশ্ প্রভৃতি মিত্র গোত্রসমূহকেও যুদ্ধের জন্য একত্রিত করছে। রসূলুল্লাহ্ (সা) তৎক্ষণাৎ পরামর্শ সভা আহ্বান করে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, পূর্বপরিকল্পনা মতে হজ্জের জন্য অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা হবে, না কুরায়শ-মিত্রদের ঘরবাড়ীর উপর আক্রমণ পরিচালনা করা হবে? যেহেতু তখন ঐ সমস্ত ঘরবাড়ীতে শুধুমাত্র শিশু ও মহিলারা ছিল, তাই সেখান থেকে গৃহপালিত জন্তু, দাসদাসী ইত্যাদি গনীমতের মাল সামগ্রী সহজেই লাভ করা যাবে এবং এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষ একটা সমুচিত শিক্ষাও পাবে। অবশেষে হযরত আবু বকর (রা)-এর পরামর্শক্রমে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে উমরা আদায়েরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা) সামনে এগিয়ে চলেন এবং হুদায়বিয়া নামক স্থানে উপনীত হন। হুদায়বিয়া হতেই হরমের সীমা শুরু হয়েছে এবং সেখানেই উপকূলীয় অঞ্চল শেষ হয়ে দুর্গম মরু প্রান্তর ও পাহাড়ী এলাকার সূত্রপাত হয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হুদায়বিয়ায় উপনীত হওয়ার সংবাদ কুরায়শদের কাছে পৌঁছে যায়। সামরিক দষ্টিকোণ থেকে প্রতিপক্ষকে বাধাদানের জন্যে হুদায়বিয়া উপত্যকার চাইতে উত্তম স্থান কুরায়শদের কাছে আর কিছুই ছিল না। হুদায়বিয়ার দূরত্ব মক্কা হতে মাত্র দশ বারো মাইল। দূর-দূরান্ত হতে আগত এবং রসদ ও সাহায্য হতে সম্পর্কচ্যুত ইসলামী 'যাত্রীদের সাথে বাড়িতে বসেই কুরায়শরা যুদ্ধ করতে পারত।

হুদায়বিয়ায় উপনীত হওয়ার সাথে সাথে দূত বিনিময়ের কাজ শুরু হয়। কুরায়শ প্রতিনিধিরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চায়। রসূলুল্লাহ (সা) স্বীয় জামাতা হযরত উসমান (রা)-কে আলাপ- আলোচনার সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে মক্কায় প্রেরণ করেন। মক্কায় তখন বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল। কোন কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সেখানে ছিল না। তাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা আবু সুফিয়ান ঐ সময়ে কোন এক অজ্ঞাত পথ ধরে চুপে চুপে সিরিয়া গিয়েছিলেন এবং সেখানেই অবস্থান করছিলেন। সুতরাং মক্কাবাসীরা হযরত উসমান (রা)-কে নষরবন্দী করে ফেলে। এদিকে হযরত উসমান (রা)-এর প্রত্যাবর্তনে বিলম্ব ঘটছে দেখে মুসলমানরা আশংকিত হয়ে উঠে যে, হয়ত তিনি মক্কাবাসীদের হাতে শাহাদত বরণ করেছেন। তখন মুসলমানদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তারা মরণপণ যুদ্ধের জন্যে শপথ গ্রহণ করে। কুরআনুল করীমে 'বিশ্বাসীরা যখন বৃক্ষতলে তোমার নিকট তোমার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করল'-এই আয়াতের মাধ্যমে ঐ ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কুরায়শদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তারা ভীতিগ্রস্ত হয়ে উঠে এবং পরস্পর পরামর্শ করে সুহাইল বিন আমরকে আলাপ-আলোচনার সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে বিশেষ দূত হিসাবে হুদায়বিয়ায় প্রেরণ করে। কিছুক্ষণ তর্ক-বিতর্ক চলার পর একটি সন্ধিপত্র সম্পাদন করা হয়। তাতে স্থিরীকৃত হয় যে-
১. মুসলমানরা এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই ফিরে যাবে এবং আগামী বছর উমরা করতে আসবে।
২. কোন মুসলমান পালিয়ে মক্কায় এসে আশ্রয় নিলে তাকে মুসলমানদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না, কিন্তু কোন মক্কাবাসী পালিয়ে মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে চলে গেলে চাওয়া মাত্র তাকে কুরায়শের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
৩. এ সন্ধি দশ বছর পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে বলবৎ থাকবে। একপক্ষ অপর পক্ষের যুদ্ধ বিগ্রহে নিরপেক্ষ থাকবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ কাজে একে অন্যের এলাকা দিয়ে গমনাগমন করতে পারবে।

যখন মুসলমানরা উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে নিল এবং চুক্তিপত্রে ইসলামী নিয়মানুযায়ী 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম'-এর স্থলে কুরায়শী কায়দায় 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লেখা হল এবং 'মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ'-এর স্থলে 'মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ' লিখারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তখন মনে করা হলো যে, বিজয়টা কুরায়শদের হয়েছে। বাহ্যত তা ঠিকও ছিল। কাজে কাজেই সন্ধির পর মুসলমান সৈন্যদের মধ্যে দারুণ অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়। এমন কি হযরত উমর (রা)-এর মত দূরদর্শী ব্যক্তিও নিজের অস্থিরতা গোপন রাখতে পারেন নি। তবে মুসলমানরা তখন এতটুকু নিয়ম- শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের অধিকারী হয়ে গিয়েছিল যে, যখন রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, বিষয়টি ঐভাবেই স্থির করা হয়েছে এবং তিনি তা পছন্দ করেছেন তখন নীরবে ও নির্দ্বিধায় তা মেনে নেওয়া ছাড়া কারোরই গত্যন্তর ছিল না।

হুদায়বিয়ার এ সন্ধি (কুরায়শদের ভাষায় মুসলমানদের পরাজয়)-কে কুরআনুল করীম মুসলমানদের জন্য 'ফতহে মুবীন' (এক মহাবিজয়) ও 'নাসরে আজীজ' (এক বিরাট সাহায্য) আখ্যা দিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে যে, বাহ্যত একটা পরিষ্কার পরাজয়কে কিভাবে মহাবিজয় আখ্যা দেওয়া হলো? তবে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে যে, ইসলামী সরকার তো পূর্ব থেকেই কুরায়শদের মুখরক্ষাকারী শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল। খায়বর যুদ্ধে কুরায়শরা যাতে হস্তক্ষেপ না করে-এটাই ছিল মুসলমানদের মূল লক্ষ্য। তাদের সে লক্ষ্য পূর্ণ হলো। কুরায়শরা হুদায়বিয়া সন্ধির মাধ্যমে তা মেনে নিল, বরং বলা যায়, একটু অধিক পরিমাণেই মেনে নিল। আর 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লেখার মধ্যে পৌত্তলিকতা বা শিরকের কিছু ছিল না। 'মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ' লেখার মধ্যেও মুসলমানদের ক্ষতির কোন কারণ ছিল না। এভাবে 'উমরা' থেকে বাধাদানও ছিল একটি মামুলি ব্যাপার। কেননা 'যাদের সক্ষমতা আছে' এর কারণে ঐ সময় মুসলমানদের উপর হজ্জ ফরয ছিল না। কোন মক্কাবাসী মুসলমান হয়ে মদীনায় গেলে তাকে মক্কায় ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ভাষ্য হলো, "আমাদের কাছ থেকে যে ব্যক্তি পলায়ন করবে, সে তো কাফির। তাকে ফেরত নিয়ে আসার আমাদের কোনই প্রয়োজন নেই। আর কুরায়শদের কাছ থেকে পলায়ন করে যারা আমাদের কাছে আসবে, সে তো সত্যিকার মুসলমান। অতএব সে যদি তার দেশবাসীর অত্যাচারে ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে উত্তম পুরস্কার দেবেন।” দেখা গেল, কিছুদিন যেতে না যেতেই ঐসব নও-মুসলিম ইসলামী রাষ্ট্রের আওতা বহির্ভূত একস্থানে জড়ো হয়ে কুরায়শদের বাণিজ্য কাফেলার উপর আক্রমণ চালাতে শুরু করেছে। কুরায়শরা এতে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে এসে চুক্তির ঐ শর্তটি বাতিল করে ওদেরকে মদীনায় নিয়ে আসার অনুরোধ জানায়। তৃতীয় শর্ত তো মুসলমানরা নিজেরাই কামনা করেছিল, মুসলমানরা চেয়েছিল কুরায়শরা যাতে তাদের সাথে একটি সন্ধিশর্তে আবদ্ধ হয় এবং তাদের যুদ্ধসমূহে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ না করে। মুসলমানদের এই নাজুক পরিস্থিতিতে হুদায়বিদায় কুরায়শদের পক্ষ হতে সন্ধির জন্যে এগিয়ে আসাটা ইসলামী পররাষ্ট্র নীতির একটি 'মহান বিজয়' ফতহে মুবীন ও বিরাট সাহায্য নাসরে আজীজ ছাড়া কিছু ছিল না।

এই সন্ধির কারণেই মুসলমানদের ভাগ্য প্রশস্ত হয়। তারা আকস্মিক বিপদের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং মুক্ত পরিবেশে তিন বছরের মধ্যে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে নিজেদের রাষ্ট্রের বিস্তৃতি প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি করে পূর্ণ আরব উপদ্বীপকে নিজেদের অনুগত করে নেয়। ঐ এলাকা থেকে রোমীয় ও ইরানী প্রভাবকে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করে তারা এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে, যা পনর বছরের মধ্যেই তিনটি মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ সময়ে যে শক্তিই তাদের মুকাবিলা করেছে সে-ই ধ্বংস হয়েছে, আর যারা আনুগত্য স্বীকার করেছে তারা বর্ণ ও ভাষার উর্ধ্বে উঠে ইসলামী মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে সমমর্যাদার অধিকারী হয়েছে।

হুদায়বিয়ার সন্ধি হচ্ছে এমন একটি ঘটনা যাকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান কীর্তি আখ্যা দেওয়া চলে। এর মূল ভাষা আরবী গ্রন্থসমূহে কখনো পুরোপুরিভাবে, আবার কখনো আংশিকভাবে দৃষ্টিগোচর হয়।

হুদায়বিয়ার চুক্তি
১. তোমার নামে হে আল্লাহ্!
২. এটা সেই চুক্তি যা মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ ও সুহাইল বিন আমরের মধ্যে সম্পাদিত হলো।
৩. তাঁরা দুজন একথার উপর চুক্তিবদ্ধ হলেন যে, দশ বছরের মধ্যে কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ হবে না। ঐ সময়ে উভয় পক্ষের লোকেরা নিরাপদে বসবাস করবে এবং একে অন্যের উপর আক্রমণ পরিচালনা থেকে বিরত থাকবে।
৪. মুহাম্মদ (সা)-এর সাথীদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জ, উমরা অথবা ব্যবসা-সংক্রান্ত ব্যাপারে মক্কায় আসবে, তার জানমালের নিরাপত্তা থাকবে। অনুরূপভাবে কুরায়শদের যে ব্যক্তি ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা হয়ে মিসর অথবা সিরিয়া (আবু উবাইদ-এর বর্ণনা মতে ইরাক অথবা সিরিয়া) গমন করবে, তারও জানমালের নিরাপত্তা থাকবে।
৫. কুরায়শের যে ব্যক্তি তার অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিরেকে মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে চলে যাবে তাকে কুরায়শের হাতে সমর্পণ করা হবে। আর মুহাম্মদের সঙ্গীদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরায়শের কাছে চলে আসবে, তাকে মুহাম্মদের হাতে সমর্পণ করা হবে না।
৬. আমাদের সকল প্রকারের শত্রুতা বন্ধ থাকবে। (এতে বাইরের কোন বিশ্বাসঘাতকতা প্রবেশ করতে পারবে না।) প্রকাশ্যে অথবা গোপনে কেউ কারো বিরুদ্ধে সাহায্য করবে না এবং চুক্তির বরখেলাফ কোন প্রকার ধোঁকাবাজিকেও প্রশ্রয় দেবে না।
৭. যে কেউ মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে মৈত্রচুক্তিতে আবদ্ধ হতে চায় সে তা করতে পারবে, আর যে কেউ কুরায়শের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে চায়, সে তা করতে পারবে।
(একথা শুনে খুযআ' গোত্রের লোকেরা দাঁড়িয়ে বলল, আমরা মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে চাই এবং বনু বকর গোত্রের লোকেরা বলল, আমরা কুরায়শের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে চাই)।
৮. এ বছর আপনি মক্কায় প্রবেশ না করেই এখান থেকে ফেরত চলে যাবেন। অবশ্য আগামী বছর আমরা মক্কা ছেড়ে বাইরে চলে যাবো এবং আপনি আপনার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মক্কায় তিনরাত অবস্থান করতে পারবেন। আপনার সাথে একজন আরোহীর অস্ত্র অর্থাৎ কোষবদ্ধ তরবারি থাকবে। এছাড়া অন্য কোন অস্ত্র আপনি নিয়ে আসতে পারবেন না।
৯. কুরবানীর পশু আমরা যেখানে আছি (হুদায়বিয়ায়) সেখানেই থাকবে এবং সেখানেই হালাল করা হবে। এগুলোকে আমাদের কাছে (মক্কায়) কুরবানীর জন্য নিয়ে যাওয়া চলবে না। প্রকাশ থাকে যে, আমাদের এবং আপনাদের অধিকার এবং দায়িত্ব সমতার ভিত্তিতে নির্ণীত হবে।

ইসলামী পক্ষের সাক্ষীগণঃ আবূ বকর, উমর, আবদুর রহমান বিন আউফ, আবদুল্লাহ বিন সুহাইল বিন আমর, সা'দ বিন আবূ ওক্কাস, মুহাম্মদ বিন মুসলিমা, আবু উবায়দা বিন আল-জাররাহ প্রমুখ।
কুরায়শ পক্ষের সাক্ষীগণঃ মাকরায বিন হাফয প্রমুখ।
লেখকঃ আলী বিন আবূ তালিব।

চুক্তির মূল ভাষা যে সকল পুস্তক হতে সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো হলোঃ তফসীরে তাবারী, খণ্ড ২৬, পৃষ্ঠা ৬১; সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৭৪৭- ৭৪৮, ফারসী অনুবাদঃ সীরাতে ইবনে ইসহাক, পৃষ্ঠা ১৮০ (প্যারিস); ওয়াকিদীর "মাগাযী” (বৃটিশ মিউজিয়াম); তাবাকাতে ইবনে সা'দ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৭; তারীখে তাবারী, সীরাতে তাবারী, তারীখে ইবনে কাসীর, তারীখে আল-খমাস, তারীখে ইবনে আসীর, সীরাতে হালবী, কিতাবুল আমওয়াল, সহীহ বুখারী, ফুতুহে বালাযুরী, তারীখ আল ইয়াকুবী; সহীহ মুসলিম, আবূ ইউসুফের 'খারাজ' ও ইবনে আবি শায়বার কানযুল উম্মাল ইত্যাদি।

টিকাঃ
১. এ ব্যাপারে আমার দুনিয়ার সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান শীর্ষক প্রবন্ধ مجلة طيلسانين হায়দরাবাদ ১৯৩৯ খ্রী. দ্রষ্টব্য।
২. এর জন্য আমার আরবী পুস্তক الوسائق السياسية (কায়রো, হিজরী ১৩৬) দ্রষ্টব্য।
৩. মাসঊদীর التنبيه ও الاشراف : পৃষ্ঠা ২৪৮।
৪. সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ১৯৭-১৯৮; ইসতিআবে ইবনে আবদুল বর, জীবনী, নম্বর ২৭৮।
৫. সারাসী, মাবসূত, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৯১-৯২; সারাখসীর শরহুস সিয়ারুল কবীর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৯।
৬. সারাসী, মাবসূত, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১২।
৭. গারল্যাণ্ড (Gerland)-এর জার্মানী ভাষার লিখিত পুস্তক 'Persische Feldzuge Des Kaisers Heraklaius' দ্রষ্টব্য।
৮. তারিখে তাবারী, পৃষ্ঠা ১৫৩১।
৯. বিদায়া, ইবনে কাসীর।
১০. ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামে এই দফাটির উল্লেখ নেই। তারীখে তাবারীতে এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে তফসীরে তাবারী, আবু উবায়দের কিতাবুল আমওয়াল, ফুতুহে বালাযুরী প্রভৃতি গ্রন্থে এ দিকটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে পশুত্বের উপর মানবতার বিজয়

📄 মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে পশুত্বের উপর মানবতার বিজয়


হিজরীপূর্ব ১৩ সালের ২৭শে রমযান মক্কার অদূরে 'জবলে নূরের' 'হেরা' গুহা থেকে যে আলো বিচ্ছুরিত হলো, হাজার হাজার বছর ধরে সত্যের সন্ধানে ব্যাপৃত মানবতা সে আলোর মাধ্যমে মুক্তির দিশা পেল। নিজের ও স্রষ্টার মধ্যকার সঠিক সম্পর্ক নির্ণয়ের এবং নিজের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের ব্যাপারে নসের দাসত্ব ও মনগড়া চিন্তাধারা মানবতাকে যুগ যুগ ধরে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল, বিভিন্ন যুগে সত্যের মশালবাহীদের কাছ থেকে মানবতার ক্ষীণ আলো সাময়িকভাবে বিচ্ছুরিত হলেও তা আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যেত। হেরার আলোর মাধ্যমে ঐ মোহাচ্ছন্ন ও আঁধারে ঢাকা মানবতা আবার প্রতিভাত হওয়ার সুযোগ পেল। হেরার গুহা থেকে ঐ অভিনব বস্তুটি তওহীদের আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে আবার বেরিয়ে এল। সর্বপ্রথম মাত্র একটি ব্যক্তি ঐ রাস্তা দেখতে পেলেন এবং তিনি তাঁর সাথীদের বললেন, "গুছিয়ে দাঁড়াও এবং সামনে অগ্রসর হও” (About turn, Forward March)। কিছু লোক তো সাথে সাথেই তাঁর কথা মেনে নিল, আর অবশিষ্টরা বিরুদ্ধাচরণ শুরু করল। যারা অগ্রসর হলো, তারা শীঘ্রই সত্যের আলো প্রত্যক্ষ করল। সুতরাং বাতিল তাদেরকে বিপথগামী করতে পারল না, বরং বাতিলের বিরুদ্ধে শুরু হলো তাদের সংগ্রাম।

সত্যের মহান পথপ্রদর্শক সত্যের পতাকাবাহীদের নিয়ে এগিয়ে চললেন এবং অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বাতিলের অনুসারীদের আলোর দিকে নিয়ে আসতে সচেষ্ট হলেন। এ পথে তাঁকে অনেক দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতে হলো, কিন্তু তিনি তা হাসিমুখে বরণ করে নিলেন। সীমাহীন অত্যাচারের মুহূর্তেও তাঁর কন্ঠ থেকে "প্রভু হে! আমার জাতিকে পথ দেখাও, কেননা তারা একেবারে মূর্খ"- একথা ছাড়া আর কিছুই উচ্চারিত হয় নি। মোটকথা, কাউকে আহ্বান জানিয়ে, কাউকে সতর্ক করে দিয়ে, আবার কাউকে জোরে টেনে তিনি বাতিল ও অসত্যের গুহা থেকে বের করতে লাগলেন। ফলে কিছুদিনের ভিতরেই ঐ গুহা (আরব) একেবারে খালি হয়ে গেল এবং ঐ মহান নেতারও জীবনাবসান ঘটলো। তাঁর তিরোভাবের পর তাঁর অনুসারীরা পৃথিবীর কেন্দ্রভূমির উন্মুক্ত ময়দানে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল, আরবের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ থেকে বাতিল এখনও বিদূরিত হয় নি। তাই তাঁরা তাদের মহান পথপ্রদর্শকের 'উত্তম আদর্শ'কে সামনে রেখে বাতিলের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বিশ্ব মানবতাকে উদ্ধার করার কাজে মনোনিবেশ করল। তাদের সে অভিযান এখনো সাফল্যজনকভাবে চলছে।

এসব কোন কল্পিত কাহিনী নয়, বরং বাস্তব ঘটনা। ঐ মহান পথপ্রদর্শকের কঠোর সংগ্রামের শেষ ধাপই হচ্ছে মক্কা বিজয়ের ঘটনা। তাই এ সম্পর্কে কিছু বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন।

রসূলুল্লাহ (সা) হেরা গুহায় ন্যায় ও সত্যের যে পথ শবেকদরে প্রত্যক্ষ করলেন, ঘরে ফিরে এসে আপন পরিবার-পরিজন, গোত্র ও নগরবাসীর দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করলেন। একত্ববাদ, আল্লাহর আনুগত্য ও প্রকৃত মানবতার এই শিক্ষা প্রচারে তাঁকে কি পরিমাণ কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কিভাবে দশটি বছর জান-মাল দিয়ে দিবারাত্রি পরিশ্রম করা সত্ত্বেও তিনি পঁচিশ-পঞ্চাশ জনের অধিক লোককে সৎপথে আনতে সক্ষম হননি, দীনের প্রচারে তাঁকে কি পরিমাণ কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল, কিভাবে তাঁকে তায়েফে দেশান্তরিত হতে হয়েছিল, কিভাবে মদীনার কয়েকজন লোক কোন এক সুযোগে হঠাৎ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করল, কিভাবে তাদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি লাভ করে মুসলমানরা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করল এবং মক্কাবাসীরা তাদের ধনসম্পদকে বলপূর্বক কিভাবে আত্মসাৎ করে নিল সে সম্পর্কে সকলেই অবগত আছেন।

মদীনায় উপনীত হয়েই রসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম তাঁর নিরাশ্রয় সঙ্গী-সাথীদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করলেন। অতঃপর তিনি মুহাজির, আনসার ও অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষীকে সংগঠিত করে একটি নগর-রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করলেন। মক্কার মুহাজির, মদীনার আনসার ও তাদের অমুসলিম আরব আত্মীয়-স্বজন ও য়াহূদীরা ছিল তখন মদীনার অধিবাসী। রসূলুল্লাহ (সা) তাদের সবাইকে আপন নেতৃত্বাধীনে একত্রিত করে একটি চুক্তিবদ্ধ নগর-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ চুক্তির একান্ন দফা সম্বলিত সংবিধানটি, যা প্রথম হিজরী সালে রচিত হয়েছিল, সৌভাগ্যবশত ইতিহাস তা আজো সংরক্ষণ করে রেখেছে।

ঐ সংবিধানের মাধ্যমেই নগরীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা এবং কুরায়শদের মুকাবিলা করার ব্যবস্থা করা হয়। হিজরতের পর দু'চার মাসের মধ্যেই রসূলুল্লাহ্ (সা) আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিধানের কাজ সমাপ্ত করে, পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের প্রতি নযর দেন। মদীনা থেকে ইয়াম্বুর উপকূলীয় এলাকার দূরত্ব ছিল পঁচাত্তর থেকে আশি মাইল। এটা ছিল বনু যুমরা, বনু মাদলজ প্রভৃতি গোত্রের বাসস্থান। রসূলুল্লাহ (সা) তাদের সাথে এই শর্তে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হন যে, তাদের উপর কেউ আক্রমণ করলে মুসলমানরা তাদের সাহায্য করবে এবং মুসলমানদের উপর কেউ আক্রমণ করলে তারা মুসলমানদের সাহায্য করবে। এই চুক্তিটিও ইতিহাস সংরক্ষিত করে রেখেছে।

মানচিত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায়, মক্কাবাসীরা প্রতি বছর স্থলপথে যেসব বাণিজ্যিক কাফেলা মিসর ও সিরিয়ায় পাঠাত, সেসব কাফেলাকে বনু যুমরা প্রভৃতি গোত্রের এলাকা দিয়েই যাতায়াত করতে হত। রসূলুল্লাহ্ (সা) মিত্রপক্ষসমূহের সাহায্যে কুরায়শদের ঐ পথ বন্ধ করে দিয়ে তাদের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিশোধ গ্রহণ এবং তাদের পরাস্ত করার প্রয়াস পান। এতে কুরায়শরা উত্তেজিত হয়ে দ্বিতীয় হিজরী সালের রমযান মাসে বদর প্রান্তরে রসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর সাথীদের ঘেরাও করার চেষ্টা চালায়, কিন্তু একটি উন্নত সামরিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তিন'শ জন মুসলমান এক হাজার কুরায়শ সৈন্যকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

কুরায়শরা এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য পুরো একটি বছর প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং ৩রা হিজরী সনের শাওয়াল মাসে মদীনার উপর হামলা চালায়। নগরীর বাইরে উহুদের প্রান্তরে মুসলিম সৈন্যরা কুরায়শদের মুকাবিলা করে। কুরায়শরা মুসলিম বাহিনীকে হঠাৎ পিছু হটিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ মুলতবী রেখে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করে। মুসলমানরা অতিসত্বর তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় এবং মদীনার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নজদ এলাকায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। তারা কুরায়শদের উপকূলীয় পথের ন্যায় ইরাক প্রভৃতি স্থানে গমনাগমনের মরু পথগুলিও বন্ধ করে দেয়। অতঃপর রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কার পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের সাথে মৈত্রী স্থাপন করে তাদেরকে যাবতীয় সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দেন এবং কুরায়শদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে অনুপ্রাণিত করেন। অতঃপর তিনি মদীনার উত্তরাঞ্চলের দুমাতুল জন্দল পর্যন্ত (যা সিরিয়া ও ইরাকগামী বাণিজ্যিক কাফেলার সঙ্গমস্থল ছিল) প্রভাব বিস্তার করে কুরায়শদের উত্তরাঞ্চলের বণিজ্যিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেন।

ইত্যবসরে মদীনার য়াহূদীরা মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং নিজেদের কৃতকর্মের পরিণামস্বরূপ মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে খায়বর প্রভৃতি স্থানে গিয়ে পুনরায় বসতি স্থাপন করে। এই য়াহুদীদের প্ররোচনা ও সাহায্য দানের আশ্বাস পেয়ে কুরায়শরা শেষবারের মত আর একটি প্রচেষ্টা চালায়। তারা তাদের মিত্র গোত্রসমূহকে একত্রিত করে এবং সাধারণভাবে সকল য়াহুদী, বিশেষভাবে খায়বরের য়াহুদীদের মিত্র গোত্রসমূহ গিতফান প্রভৃতিকে লুটতরাজের লোভ দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে টানে। এভাবে তারা দশ হাজার সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমণ করে। ঐ সময় মদীনার অবশিষ্ট য়াহূদীরাও মুসলমানদের কোণঠাসা করার হুমকি দিতে থাকে। এটা ছিল ৫মি হিজরী সালের শাওয়াল মাসের ঘটনা। রসূলুল্লাহ্ (সা) তিন হাজার সৈন্যের সাহায্যে পনর দিনের মধ্যে নগরীর অরক্ষিত পরিখা খনন করেন। পরিখা খননের কাজ শেষ হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই শত্রুরা এসে উপস্থিত হয়। সংযুক্ত অবরোধকারীদের কয়েকটি গোত্র যাতে শত্রুবাহিনী থেকে ছিটকে পড়ে, সে জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রথম থেকেই প্রচেষ্টা চালান। মদীনার বাগানসমূহের এক-তৃতীয়াংশ খেজুরের বিনিময়ে কয়েকটি গোত্র ফিরে যেতে উদ্যত হয়, কিন্তু মদিনাবাসীরা এত বড় বিনিময় প্রদানে রাযী ছিল না। ইতিমধ্যে য়াহুদী ও মক্কাবাসীদের মধ্যে পরস্পর ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। অপরদিকে রসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক প্রেরিত গোয়েন্দারা কৌশলগত ব্যবস্থায় এত সফলতা অর্জন করে যে, কুরায়শরা নিরুৎসাহী হয়ে শেষ পর্যন্ত অবরোধ উঠিয়ে নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করে। তখন গিতফান প্রভৃতি গোত্র একাকী আর কি করবে? তারাও অবশেষে মদীনা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

এখন পূর্ব প্রান্তের ইয়ামামা পর্যন্ত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তম হিজরী সালের প্রারম্ভে সেখানকার কোন কোন নেতার (সামামা বিন আসাল) ইসলাম গ্রহণের ফলে সেখান থেকে মক্কায় খাদ্যদ্রব্যের রফতানী বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাক্রমে সে বছর আরবে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা, খাদ্যদ্রব্য আমদানীর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা, বারবার পরাজয় বরণ ইত্যাদি কারণে কুরায়শরা বিচলিত হয়ে পড়ে, যদিও তাদের সামরিক শক্তি তখনও অটুট ছিল। ঐ সময় মদীনার মুসলমানদের অবস্থা এই ছিল যে, উত্তর দিকে গিতফান ও খায়বরের য়াহূদীরা তাদের বিরুদ্ধে ওত পেতে বসেছিল এবং দক্ষিণ দিকে মক্কাবাসীরা ছিল তাদের সর্বপ্রকার বিরোধিতার জন্য সদা প্রস্তুত। আর একই সাথে উভয় শক্তির মুকাবিলা করার মত সামরিক শক্তি মুসলমানদের ছিল না। তবে যেকোন একটির উপর আক্রমণ করার মত শক্তি তাদের ছিল। পঞ্চম হিজরী শতাব্দীর বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ফকীহ্ শামসুল আয়িম্মা সারাখসীর মতে, তখন মুসলমানরা যদি খায়বর আক্রমণ করত তা'হলে সৈন্যবিহীন মদীনার উপর মক্কাবাসীদের আক্রমণ ও লুটতরাজের পূর্ণ আশংকা ছিল। আর যদি তারা দক্ষিণে মক্কার উপর আক্রমণ চালাত তাহলে উত্তর দিক অর্থাৎ খায়বর থেকে মদীনা আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশংকা ছিল। কেননা মদীনা ছিল মক্কা ও খায়বরের মধ্যবর্তী স্থানে। এই পরিস্থিতিতে ৬ষ্ঠ হিজরী সালের যিলকদ মাসে রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা অথবা খায়বর-এ দু'শক্তির মধ্যে যেকোন একটির সাথে সন্ধি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন এবং এ উদ্দেশ্যে তিনি মক্কাকেই বেছে নেন। মক্কাবাসীরা তখন ছিল দারুণভাবে দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ-কবলিত। এমতাবস্থায় তারা সন্ধির প্রস্তাব যে সহজেই মেনে নেবে, সম্ভবত রসূলুল্লাহ্ (সা) সে চিন্তাও করেছিলেন।

ইতিপূর্বে রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কার দুর্ভিক্ষ কবলিত অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য পাঁচ শ' স্বর্ণ মুদ্রা মক্কার নেতা আবূ সুফিয়ানের নিকট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ঐ সংবাদ মক্কায় প্রচারিত হলে মক্কাবাসীরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে একজন 'ভদ্র দুশমন' বলে আখ্যায়িত করতে লাগল-যদিও নেতৃস্থানীয় লোকেরা এতে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। তারা একে রসূলুল্লাহ্র একটি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছিল।

অতঃপর হজ্জের মওসুমে, যখন কুরায়শরা যুদ্ধ-বিগ্রহকে হারাম বলে মনে করে, রসূলুল্লাহ্ (সা) স্বীয় বাহিনীর অর্ধেক লোককে মদীনায় রেখে এবং মাত্র পনর শ' লোক সঙ্গে নিয়ে হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। কুরায়শরা যাতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে না পড়ে সেজন্য তিনি যুদ্ধাস্ত্র ছাড়াই রওয়ানা হন। হুদায়বিয়ায় (মক্কা থেকে দশ মাইল দূরে অবস্থিত) উপস্থিত হয়েই তিনি কুরায়শদের সাথে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন এবং কুরায়শদের মুখ রক্ষাকারী শর্তসমূহ মেনে নেবেন বলেও আগ্রহ প্রকাশ করেন। কুরায়শরা যখন দেখলো, একজন শক্তিশালী শত্রু, বারবার যুদ্ধ করেও যাঁকে পরাস্ত করা যাচ্ছে না-তিনি যখন আপনা থেকেই মুখরক্ষাকারী শর্তে সন্ধি করতে প্রস্তুত হয়ে গেছেন, তখন তারাও কোনরূপ দ্বিরুক্তি না করে সন্ধির জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে কুরায়শ ও তাদের মিত্রপক্ষ এবং হযরত মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর মিত্রপক্ষের মধ্যে কোনরূপ যুদ্ধবিগ্রহ হবে না এবং এক পক্ষ অপর পক্ষের যুদ্ধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। উপরন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা) কুরায়শদের বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করে দেবেন। আর কোন মুসলমান মক্কায় ফিরে গেলে তাকে প্রত্যর্পণ করা হবে না, পক্ষান্তরে কোন মক্কাবাসী মদীনায় গেলে তাকে কুরায়শদের দাবি অনুযায়ী প্রত্যর্পণ করতে হবে।

শেষোক্ত শর্তটি কুরায়শরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার জন্যই মনজুর করিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু এতে তাদের কোন উপকার হয় নি। অপরদিকে মুসলমানদের যুদ্ধে কুরায়শরা হস্তক্ষেপ করবে না-এ শর্তটি মেনে নিয়ে তারা প্রকারান্তরে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে খায়বরের য়াহূদীদের শক্তি খর্ব করার একটি সুযোগ করে দিয়েছিল। তারা আর একটি বিরাট ভুল করেছিল এই যে, তারা য়াহূদীদের সাথে সম্পর্ক না রেখে ভবিষ্যতের জন্যে একটি শক্তিশালী মিত্রপক্ষের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের একক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

হুদায়বিয়ার সন্ধিতে কুরায়শদেরকে য়াহূদীদের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকার শর্তে রাযী করানোটা ছিল মুসলমানদের জন্যে একটি বিরাট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিজয়। সুতরাং কুরআন কর্তৃক এটাকে মহবিজয় (ফতহে মুবীন) আখ্যা দেওয়াটা কোন অত্যুক্তি নয়। হুদায়বিয়া থেকে মদীনায় ফিরে আসার দু'সপ্তাহ পরই রসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বর অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন এবং এমন কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেন যে, খায়বরবাসীদের সাহায্যার্থে কেউই এগিয়ে আসে নি, এমন কি গিতফান গোত্রের মিত্ররাও তখন ঘরে বসে তামাশা দেখতে থাকে। এভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা) অতি সহজে চিরদিনের জন্যে ঐ বিপদটি দূরে করতে সক্ষম হন।

ঐ বিজয় মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন গোত্রের সাথে আরো বেশি করে মিত্রতা স্থাপনের পথ প্রশস্ত করে দেয়। সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে বাহরাইন ও ওমানে নতুন বসতি স্থাপনকারী ইরানীরা তাদের কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত হয়ে মদীনার সাথে জোটবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে কুরায়শদের অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, তাদের নিজস্ব কয়েক হাজার লোক ছাড়া আর কোন সাহায্যকারী রইল না। যখনই তারা মুসলমানদের একটি মিত্র গোত্রের বিরুদ্ধে গোপনে সাহায্য প্রদান করে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সম্পাদিত সন্ধির কিছুটা বিরুদ্ধাচরণ করল এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে শাস্তি প্রদানে উদ্যত হলেন, তখন তাঁকে রুখে দাঁড়াবার মত শক্তি তাদের ছিল না। ফলে রসূলুল্লাহ্ (সা) কোনরূপ রক্তপাত ছাড়াই মক্কা বিজয়ে সক্ষম হন।

রসূলুল্লাহর নিজস্ব পত্রালাপকারী (Correspondent) দীর্ঘদিন থেকে মক্কায় অবস্থান করছিল এবং শত্রুর প্রতিটি গতিবিধি সম্পর্কে যথাসময়ে তাঁকে অবহিত রাখছিল। এই পূর্ব অবহিতির কারণেই উহুদ-বিশেষ করে খন্দকের যুদ্ধে রসূলুল্লাহ্ (সা) অত্যন্ত উপকৃত হয়েছিলেন। কেননা ঐ সময় তিনি আরবের উত্তর দিকের শেষ প্রান্তের দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন এবং যথাসময়ে সংবাদ পাওয়ার কারণে অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে এসে পুরো দু'সপ্তাহ ধরে নিজেকে পরিখা খনন ও অন্যান্য নিরাপত্তামূলক কাজে নিয়োজিত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া নিজের লোকদের খবরাখবরও ছিল রসূলুল্লাহর নখদর্পণে। তিনি অতি সন্তর্পণে দশ হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হন এবং ইবনে হিশামের ভাষায়, "মক্কার পাহাড়সমূহের ঠিক পাদদেশে তাঁবু না খাটানো পর্যন্ত ঐ বিরাট বাহিনী সম্পর্কে কুরায়শরা ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারে নি। তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কাবাসীদের এই মর্মে অবহিত করেন যে, যে ব্যক্তি নিজের ঘরে বসে থাকবে কিংবা কা'বা মসজিদে চলে যাবে কিংবা অস্ত্র সমর্পণ করবে, ইসলামী ফৌজ কোনক্রমেই তাদের উপর আক্রমণ চালাবে না। অতঃপর রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর বাহিনীকে তিনভাগে বিভক্ত করেন এবং নগরে প্রবেশের তিনটি রাস্তা দিয়ে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর বাহিনীকে সতর্ক করে দেন, যেন কিছুতেই রক্তপাত না ঘটে। সম্পূর্ণ নগর দখল করার পর তিনি কা'বার ভিতরের ও আঙ্গিনার সব মূর্তি ভেঙ্গে চুরমার করে যথাস্থানে ফেলে দেওয়ার পর নগরবাসীকে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাদের নির্যাতনমূলক কার্যাবলীর উল্লেখ করে তিনি জিজ্ঞেস করেন, "বল, তোমরা আজ আমার কাছে কি প্রত্যাশা কর?" তারা জওয়াব দেয়, 'একজন ভদ্রলোক ও ভদ্রলোকের সন্তানের কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করা যায়।” একথা শুনে 'রাহমাতুল্লিল 'আলামীন' বলে উঠেন, "আজ তোমাদের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও, তোমাদের সকলেই মুক্ত।” এ ঘোষণা শোনামাত্রই পুরো মক্কা উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলো "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুলাহ্- "আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) তাঁর রসূল।" তারা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাদের শর্তহীন আনুগত্যেরও আশ্বাস দিল।

টিকাঃ
১. আহদে নবভী কা নেযামে হুকমরানী গ্রন্থের "দুনিয়ার সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল" অধ্যায় দ্রষ্টব্য।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ইসলাম-পূর্ব ও ইসলামোত্তর যুগে হাবশা (আবিসিনিয়া) ও আরব

📄 ইসলাম-পূর্ব ও ইসলামোত্তর যুগে হাবশা (আবিসিনিয়া) ও আরব


প্রাচীনকালে ইয়ামনে হাবশা নামক একটি গোত্র বসবাস করত বলে জানা যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একথা ক্রমশ স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে হাবশীরা ইয়ামন থেকেই আগত একটি ঔপনিবেশিক জাতি। 'আমহারা' হাবশা বা আবিসিনিয়ার একটি প্রদেশের নাম। এই নামের সাথে দক্ষিণ আরবের হাদ্রামাউতের পূর্বদিকে অবস্থিত 'মাহরা'-এর নিকট সম্পর্ক রয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তিতে মাহরা ও আমহারার উচ্চারণের মধ্যে বিরাট সামঞ্জস্য বিদ্যমান। ১৯৩৩ খ্রীস্টাব্দে আমি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষা অনুষদে দেখে এসেছি যে, এ ব্যাপারে ব্যাপক চিন্তাগবেষণা চলছে।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্মের প্রায় এক'শ বছর পূর্বে ইয়ামনে যূ-নওয়াস নামক একজন য়াহূদী বাদশাহ রাজত্ব করতেন। তাঁর শাসনামলে নাজরানে খ্রীস্ট ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। যূ-নওয়াস নাজরানবাসীকে খৃষ্টধর্ম পরিত্যাগ এবং য়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। বাদশাহ নিজে য়াহূদী ছিলেন বলে অথবা নাজরানে নিহত দুটি য়াহূদী সন্তানের পিতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নাজরানবাসীকে য়াহূদী ধর্ম গ্রহণ করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেন। তখন নাজরানবাসীরা খ্রীস্টধর্ম ত্যাগ করতে অস্বীকার করলে এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে বাদশাহ নাজরানে উপস্থিত হন এবং অতি নির্মমভাবে সেখানে হত্যাকাণ্ড চালান। বাদশাহর নির্দেশে বিরাট বিরাট গর্ত খনন করে তাতে আগুন জ্বালানো হয় এবং খ্রীস্টধর্ম ত্যাগে অস্বীকারকারীদের সেসব অগ্নিকুণ্ডে জীবন্ত নিক্ষেপ করা হয়। মুফাস্স্সিরদের ধারণা এই যে, কুরআনের "অভিশপ্ত হয়েছিল ইন্ধন দ্বারা গর্তে অগ্নিসংযোগকারীরা (৮৫ঃ ৪- ৭")-এই আয়াতে উপরোক্ত ঘটনার প্রতিই ইংগিত করা হয়েছে।

এই সাধারণ হত্যাকাণ্ড থেকে রক্ষাপ্রাপ্ত জনৈক ব্যক্তি কোন-না-কোন উপায়ে হাবশা পৌঁছতে সক্ষম হয় এবং যূ-নওয়াস কর্তৃক অগ্নিদগ্ধ একখণ্ড ইঞ্জিল নাজ্জাশীকেও দেখিয়ে এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে তাঁর কাছে ফরিয়াদ জানায়। নাজ্জাশী অগ্নিদগ্ধ ঐ ইঞ্জিলখানা বাইজেনটাইন সম্রাটের নিকট কন্সটান্টিনোপলে পাঠিয়ে দেন এবং যুদ্ধের জন্যে নৌবহর তৈরী করার দাবি জানান।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা থেকে জানা যায়, নাজরানের ঐ ফরিয়াদী ব্যক্তি সরাসরি রোম সম্রাটের নিকট পৌঁছেছিল। রোম সম্রাট তাকে বলেছিলেন, "আমার দেশ অনেক দূরে, আমি তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারব না। তবে আমি নিজে নাজ্জাশীর কাছে চিঠি লিখছি। তিনি নিজেও একজন খ্রীস্টান। আর তাঁর দেশও তোমাদের সন্নিকটে। সুতরাং তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং ঐ অমানুষিক ঘটনার প্রতিশোধ নেবেন।" অতঃপর রোম সম্রাটের একটি বিরাট নৌবহর হাবশী বন্দরে এসে পৌঁছে। নাজ্জাশী নিজেও সাত শ' নৌযান তৈরী করান এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হাবশা বন্দরে আগত ইরানী ও অন্যান্য বণিকদের নৌযানসমূহ সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য আটক করেন। আরবের স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী সত্তর হাজার এবং গ্রীক ঐতিহাসিকদের মতে, এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য ঐসব নৌযানে ইয়ামন অভিমুখে যাত্রা করে। 'বাব আল্ মানদাব' উপকূল অতিক্রম করার সময় ঝড়ের কবলে পড়ে বহু নৌযান ডুবে গেলেও শেষ পর্যন্ত নৌবহরটি ইয়ামন উপকূলে উপনীত হয়।

ঐতিহাসিক ইবনে কালবীর মতে, প্রথমে একটি সেনাবাহিনী যু-নওয়াসের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়। যূ-নওয়াস ঐ বাহিনীর সংখ্যাধিক্য দেখে ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং মোটা অংকের অর্থদানের প্রতিশ্রুতিতে নিজের নিরাপত্তা কামনা করেন। কিন্তু হাবশী সেনাপতি যখন উক্ত অর্থ গ্রহণ করতে আসেন, তখন যূ-নওয়াস বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে হত্যা করেন। অতঃপর সেনাপতিহীন সেনাবহিনীকে পরাজিত করা তার জন্য কোন কঠিন কাজ ছিল না। এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নাজ্জাশী সত্তর হাজার হাবশী সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। ল্যাটিন ঐতিহাসিকদের মতে, এই বাহিনীর পনর হাজারের একটি অগ্রগামী দল ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অবশেষে যূ-নওয়াসের পরাজয়ের মাধ্যমেই এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। যূ-নওয়াস আত্মহত্যা করেন। ইয়ামনে হাবশীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইয়ামন নাজ্জাশীর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

আবরাহা কর্তৃক ইয়ামনের শাসনভার গ্রহণ
কিছুদিন পর আরইয়াত ও আবরাহা নামক দুজন হাবশী কর্মকর্তার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আবরাহা আরইয়াতকে হত্যা করে ইয়ামনের শাসনভার গ্রহণ করেন। পরিস্থিতি আয়ত্তে আনয়ন ও অধিক রক্তপাত বন্ধ করার উদ্দেশ্যে নাজ্জাশী আবরাহাকে ইয়ামনের শাসনকর্তা হিসেবে অনুমোদন করেন।
আবরাহা ছিলেন একজন ধর্মপরায়ণ খ্রীস্টান। খ্রীস্টধর্ম প্রচারের জন্য সারা দেশে তিনি জোরদার প্রচারাভিযান চালান। তিনি ইয়ামনের রাজধানী 'সানআ'য় কালীস নামে একটি গীর্জা নির্মাণ করেন। এই গীর্জার নির্মাণ কাজে সাহায্যের উদ্দেশ্যে বাইজেন্টাইন-সম্রাট বহুসংখ্যক কারিগর, মূল্যবান পাথর ও চীনদেশে তৈরী নকশা করা ইট প্রেরণ করেন। নির্মাণ কাজ শেষ হলে আলেকজান্দ্রিয়ার শাসক গ্রেজেনতিউস (Gregentius) নামক জনৈক ইতালীয় পাদ্রীকে সেখানে পাঠিয়ে দেন। আবরাহা নাজরানেও একটি গীর্জা এবং শহীদদের জন্য একটি সমাধিস্থল নির্মাণ করেন।

মা'রিবের শিলালিপি
আবরাহা একজন জনহিতৈষী শাসনকর্তা ছিলেন বলে অনুমান করা যায়। জনসাধারণের সুবিধার্থে তিনি দেশের স্থানীয় জলাশয়সমূহ সংস্কারের প্রতি মনো-নিবেশ করেন। আজও ইয়ামনের বিভিন্ন স্থানে তাঁর সময়ের তৈরী অনেক শিলালিপির সন্ধান পাওয়া যায়। এসব শিলালিপি হতে ইতিহাসের অনেক তথ্য জানা যায়।

আসহাবে ফীল বা হস্তী সম্বলিত বাহিনী
৫৭০ খ্রীস্টাব্দে আবরাহা মক্কা আক্রমণ করেন। আরব ঐতিহাসিকরা এ ঘটনাকে 'আসহাবে ফীল'-এর ঘটনা আখ্যা দিয়েছেন। আধুনিক ইউরোপীয় লেখকদের ধারণা, আবরাহা প্রকৃতপক্ষে ইরানীদের বিরুদ্ধে বাইজেন্টাইন-সম্রাটকে সাহায্যের উদ্দেশ্যেই স্থলপথে এ অভিযান চালিয়েছিলেন। কিন্তু আরব ঐতিহাসিকরা এ ঘটনার কারণ হিসেবে মক্কার কিছু লোকের অপকর্মের কথাই উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, সান'আ'র কলীস গীর্জা নির্মাণ করার কারণে পৌত্তলিক আরবরা আক্রোশে ফেটে পড়ে এবং কিছুসংখ্যক লোক কোন-না-কোন বাহানায় সেখানে উপনীত হয়ে রাতের অন্ধকারে গোপনে গীর্জায় প্রস্রাব-পায়খানা করে চলে আসে। গভীর অনুসন্ধানের পর অনুমান করা হয় যে, এ দুষ্কর্মটি কিছুসংখ্যক মক্কাবাসী কর্তৃকই সংঘটিত হয়েছে এবং কা'বার মর্যাদা রক্ষার্থেই তারা এ কাজটি করেছে। আবরাহা একটি হাতী সহ বিরাট এক সেনাবাহিনী নিয়ে কা'বা অভিমুখে যাত্রা করেন। যখন তিনি মক্কার নিকটে উপনীত হন তখন কুরআন মজীদের বর্ণনানুসারে পাখীর ঝাক আবাবীল (طير ابابيل) এসে তার সৈন্যদের উপর কংকর নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এই কংকরগুলো এত বিষাক্ত ছিল যে, সৈন্যদের মধ্যে মহামারী দেখা দেয়। বহুলোক এতে প্রাণ হারায় এবং কিছু লোক আবরাহার সাথে ইয়ামন ফিরে যায়। অসুস্থ হয়ে কিছু লোক মক্কাতেই থেকে যায়। অনুমান করা হচ্ছে এসব লোক যেহেতু সৈনিক ছিল সেহেতু সুস্থ হয়ে তারা মক্কার ঐ সব রক্ষীবাহিনীতে যোগদান করে যা বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে প্রতিরক্ষার জন্য বিভিন্ন স্থানে গমনা-গমন করত। এই হাতীর ঘটনার বছরই রসূলুল্লাহ্ (স)-এর জন্ম হয়।

ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন যে, হাবশা বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের শাসনাধীন না থাকলেও নিঃসন্দেহে তার প্রভাবাধীন ছিল। ইয়ামনে হাবশার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে বাইজেন্টাইনরা অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে—এ আশা পোষণ করত। ইয়ামনের মাধ্যমে ভারতবর্ষ হতে রেশম আমদানী করা সহজ হবে বলে তারা মনে করত এবং ঐ উদ্দেশ্যে কয়েকটি বাইজেনটাইনী প্রতিনিধিদল ইয়ামন সফরেও এসেছিল। কিন্তু ইরানী বণিকদের ব্যবসা ছিল সর্বত্র সম্প্রসারিত। তারা প্রায় সকল নগরে বন্দরেই ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি এডেন ও অন্যান্য ইয়ামনী বন্দরগুলোও ছিল তদের প্রভাবাধীন। মারযুকী বর্ণনা করেছেন, এডেনে যে আতর তৈরী করা হত, নজীরবিহীন গুণাবলীর কারণে তার সুনাম ভারত, ফ্রান্স ও রোম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

আবরাহার মৃত্যুর পর কিছুদিন যেতে না যেতেই ইরানীরা ইয়ামন আক্রমণ করে এবং হাবশীদেরকে পরাজিত করে ইয়ামনে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।

হিজাযের সাথে হাবশার সম্পর্ক
হিজাযের সাথে হাবশার সম্পর্ক অতি প্রাচীন কাল থেকেই ছিল বলে জানা যায়। যে কয়টি হাবশী শব্দের উল্লেখ কুরআন করীমে পাওয়া যায় তা থেকেও এ সম্পর্কের সত্যতা প্রমাণিত হয়। প্রাচীনকালে চীন এবং ভারতবর্ষের পণ্যদ্রব্য ইয়ামনে আমদানী করা হত এবং স্থলপথে তা হিজায ও সিরিয়া হয়ে ইউরোপে গিয়ে পৌঁছত। রোমীয় ও বাইজেন্টাইন্না যখন লোহিত সাগরে তাদের প্রভাব বিস্তারের সূচনা করে তখন হিজাযের ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেয়। সম্ভবত এ কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহ হাশিম কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ থেকে বাণিজ্যিক কাফেলার গমনাগমনের অনুমতি লাভ করেন। ইবনে সাদ ও ইমাম ইবনে হাম্বল প্রমুখের বর্ণনা মতে, রোম সম্রাট হাশিমকে সিরিয়া গমনাগমনের অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রভাবাধীন হাবশার নাজ্জাশীর নিকটও এ ব্যাপারে একটি অনুরোধপত্র পাঠিয়েছিলেন। হাশিম স্বীয় ভ্রাতাকে হাবশায় পাঠান। রোম সম্রাটের অনুরোধে হাবশার নাজ্জাশী হাশিমের ভ্রাতাকে বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে হাবশা গমনাগমনের অনুমতি দেন। চামড়া, লোবান, পশমী কাপড় প্রভৃতি ছিল সাধারণত উষর মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের রফতানী দ্রব্য। এছাড়া নিকটতম মেলাগুলোতে ঘিও বিক্রয় করা হত। উপরোক্ত দ্রব্যসমূহের বিনিময়ে মক্কাবাসীরা বিপুল পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য আমদানী করত। সিরীয় সরকার অস্ত্র রফতানীর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিল, কিন্তু এসব ব্যবসায়ী সুযোগ পেলেই বিদেশে তা পাচার করত।

হাবশা গমনের পথ ছিল দুটি। হিজায থেকে ফিলিস্তিন ও মিসর হয়ে স্থলপথে হাবশায় উপনীত হওয়া অথবা জিদ্দা থেকে বাবুল মনদব হয়ে নৌপথে হাবশা বন্দরে অবতরণ করা। কুরআন করীমে সমুদ্র সম্পর্কে সূক্ষ্ম আলোচনা, জাহাজসমূহের চলাচল, ঝড় ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার দরুন সেগুলোর বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া, যাত্রীদের দুঃখকষ্টজনিত দৃশ্যের অবতারণা এবং সর্বোপরি সামুদ্রিক পরিভাষা হিসেবে কোন কোন হাবশী শব্দের ব্যবহার- একথাই প্রমাণ করে যে, রসূলুল্লাহ (সা) প্রথমদিগের মক্কী ও হিজাযী শ্রোতারা সমুদ্রাভিযান ও হাবশার সমুদ্র সম্পর্কে কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। যদি আরবী ঐতিহাসিকদের উপর নির্ভর করা যায়, তাহলে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, নাজ্জাশীর সাথে আরবী বণিকদের ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল এবং তারা তাঁর দরবারে বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত হত। নবুওয়ত লাভের প্রাক্কালে রসূলুল্লাহরও সম্ভবত এ সুযোগ হয়েছিল-যদিও জীবনী রচয়িতারা এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। বাণিজ্যিক লেনদেনে সততার কারণে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে 'আল-আমীন' খেতাব পেলেন, যিনি কেবল ইয়ামন ও সিরিয়াই নয় বরং ইমাম ইবনে হাম্বলের বর্ণনানুসারে ওমান ও বাহরাইনের মত দূর-দূরান্তের দেশসমূহও সফর করেছিলেন তিনি হাবশা সফর করেন নাই-এমন কথা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় না। তিনি তাঁর পিতৃব্যপুত্রের হাতে তাঁর হাবশায় হিজরত করার সময় একান্ত পরিচিত ব্যক্তির মত নাজ্জাশীর কাছে যে পরিচয়পত্র দিয়েছিলেন তাতে লেখা ছিল, "এ নবাগতদের প্রতি যথাযোগ্য আতিথ্য প্রদর্শন করবেন।” এই বাক্যটি নিঃসন্দেহে এ ধারণাকে জোরদার করে যে, তিনি হাবশাও সফর করেছিলেন।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুওত লাভ
৬১০ খ্রীস্টাব্দে হযরত মুহাম্মদ (সা) মক্কায় ঘোষণা করেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে সৎপথ দেখানোর জন্য তাঁকে নবী করে পাঠিয়েছেন। পৌত্তলিক ও ধর্মহীন নগরবাসীকে যখন এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য তিনি আহ্বান জানান এবং পৌত্তলিকতার অসারতা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে প্রচারকার্য শুরু করেন তখন মক্কাবাসীরা তাঁকে কঠোর হস্তে বাধাদানের চেষ্টা করে। যে কয়জন লোক তাঁর এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল তাঁদেরকেও অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। চার পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রম করে যে প্রচারাভিযান চালানো হয়, তাতে মাত্র কয়েক ডজন লোক ইসলাম গ্রহণ করে। মুসলমানদের প্রতি মক্কাবাসীদের নির্যাতন যখন চরমে গিয়ে পৌঁছে তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে মাতৃভূমি ত্যাগ করে হাবশায় হিজরত করার পরামর্শ দেন। তিনি তাদেরকে বলেন, হাবশায় এমন এক ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ আছেন, যাঁর রাজ্যে কারো উপর অত্যাচার করা হয় না। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিতৃব্যপুত্র জা'ফর ত্বাইয়ারও ঐ মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রাবলী
রসূলুল্লাহ্ (সা) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোত্র প্রধান, প্রাদেশিক শাসনকর্তা প্রতিবেশী রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে যেসব পত্র পাঠিয়েছিলেন, ইতিহাস এ জাতীয় প্রায় দু'আড়াই 'শ, পত্র সংরক্ষণ করেছে। সমগ্র আরব উপদ্বীপে যাঁর শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল তাঁর পক্ষে এই পরিমাণ পত্র লিখা উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। এসব পত্রের মধ্যে তাবারী, ইবনে কাইয়িম, কাসতুল্লানী প্রমুখ যে পত্রটি তাঁদের পুস্তকে উল্লেখ করেছেন সেটি হলো:
করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষ থেকে হাবশার নাজ্জাশী (বাদশাহ) আল-আসহামের প্রতি— আমি মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, তিনি ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই এবং যিনি সারা বিশ্বের বাদশাহ, মহান, শান্তিময়, নিরাপত্তাদাতা ও শান্তিদাতা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, ঈসা ইবনে মারইয়াম আল্লাহর রূহ এবং বাণী যা আল্লাহ্ মহিমান্বিত ও পবিত্র নারী মারইয়ামের গর্ভে নিক্ষেপ করেন। আল্লাহর রূহ ও ফুঁকের কারণে ঐ নারী গর্ভবতী হন, যেমন- আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মহিমময় হাতে আদম (আ)-কেও সৃষ্টি করেছিলেন। আমি আপনাকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আপনি আমার অনুসরণ করুন এবং আমি যে নবুওত নিয়ে এসেছি তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন। আমি আল্লাহর রসূল হিসেবে আপনাকে ও আপনার সেনাবাহিনীকে মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমি আল্লাহর পয়গাম পৌঁছিয়ে দিলাম এবং মঙ্গলের দিকে আহ্বান করলাম। আপনি আমার আহ্বানে সাড়া দিন। আমি আমার পিতৃব্যপুত্র জাফর এবং তাঁর সঙ্গে একদল মুসলমানকে আপনার নিকট পাঠালাম। তাঁরা আপনার নিকট উপস্থিত হলে আপনি তাঁদের অতিথি সেবা করবেন এবং কোনরূপ অহমিকা দেখাবেন না। সালাম তাদের প্রতি যারা হিদায়েতের অনুসারী।

এ পত্রটি ষষ্ঠ হিজরী সনের শেষের দিকে লেখা হয়েছিল বলে প্রায় সকল মুসলিম ঐতিহাসিকই অভিমত প্রকাশ করেছেন। কেননা ঐ সময়েই রসূলে করীম (সা) কয়েকজন প্রতিবেশী শাসনকর্তার নিকট ইসলামের দাওয়াতী পত্র পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এই পত্রের শেষাংশটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তাতে লেখা ছিল, "আমি আমার পিতৃব্যপুত্র জাফর এবং তার সঙ্গে একদল মুসলমানকে আপনার কাছে পাঠালাম, তারা আপনার নিকট উপস্থিত হলে আপনি তাঁদের প্রতি আতিথ্য প্রদর্শন করবেন এবং কোনরূপ অহমিকা দেখাবেন না।” এ বাক্যটি ষষ্ঠ হিজরী সালে কিভাবে লেখা যেতে পারে? ঐ সময় তো মুসলমানদের হাবশায় হিজরতের প্রায় পনর বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। পত্রের বিষয়বস্তু দেখে তো অনুমিত হয় জা'ফর ত্বাইয়ারের পরিচিতির উদ্দেশ্যেই ঐ পত্রটি দেওয়া হয়েছিল। জীবনী রচয়িতাদের নীরবতার প্রতি যদি লক্ষ্য করা না হয় তাহলে পত্রের বিষয়বস্তু দেখে ধারণা করা যায় যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) নবুওত লাভের প্রাক্কালে হাবশা সফর করেছিলেন এবং দেশের অন্যান্য বণিকের মত নাজ্জাশীর সাথে তাঁরও ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। মুহাজিরদের বিদায়ের সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছিলেন, হাবশায় এমন এক সম্রাট আছেন যার রাজ্যে কারো উপর অত্যাচার করা হয় না। একথা কয়টি উক্ত ধারণাকে আরো জোরদার করে তুলে। রসূলুল্লাহ্ (সা) মাঝে মাঝে কিছুকিছু হাবশী শব্দও যে উচ্চারণ করতেন বিভিন্ন হাদীসে তার উল্লেখ আছে।

ঘটনাক্রমে ১৯৩৯ খ্রীস্টাব্দে 'মদীনার পত্রাবলী' শীর্ষক বক্তৃতা দানের উদ্দেশ্যে আমি যখন অক্সফোর্ড গিয়েছিলাম, তখন সেখানে অধ্যাপক মারগুলিউস স্কটল্যান্ডের জনৈক প্রাচ্যবিদের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যিনি সম্প্রতি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উক্ত পত্রটি পেয়েছিলেন। আমি উক্ত প্রাচ্যবিদের কাছে চিঠি লিখলে অধ্যাপক মারগুলিউস তা তার নিকট পাঠিয়ে দেন। প্রাচ্যবিদ (ডি. এম. ডনলাপ বাসস্থান— ব্রাইডকর্ক, স্কটল্যান্ড) আমার চিঠির জবাবে ১৯৩৯ খ্রীস্টাব্দের ২রা জুন সিরিয়া থেকে যে চিঠি লিখেন, তা হায়দারাবাদে আমার হস্তগত হয়। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, "ব্যতিক্রমধর্মী এক পরিস্থিতিতে নাজ্জাশীর প্রতি লিখিত এ পত্রটি সম্প্রতি ফিলিস্তিনের জনৈক পাদ্রীর কাছ থেকে ক্রয় করা হয়েছে এবং অচিরেই লণ্ডনের জি.আর.এ. এস পত্রিকায় প্রবন্ধাকারে তা প্রকাশিত হবে।” এছাড়া তিনি অনুগ্রহ করে উপরোক্ত পত্রের হাতের লিখা একটি নকলও আমার কাছে পাঠিয়ে দেন এবং দেশে ফিরে একটি ফটোকপি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

হাবশায় মক্কার কাফিরদের প্রতিনিধি দল
যা হোক, মুহাজিরদের কয়েকটি দল যখন হাবশায় গিয়ে পৌঁছে তখন মক্কাবাসীরা তাদেরকে হয়রানি করার জন্য বিভিন্ন পথ খুঁজতে থাকে। অবশেষে তারা হাবশায় একটি প্রতিনিধি দল পাঠায় এবং এ সমস্ত মুহাজিরকে ফেরত পাঠানোর জন্য নাজ্জাশীর নিকট দাবি জানায়। নাজ্জাশী এ ব্যাপারে মুসলমানদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেন।

মুসলমানরা বলল, আমরা মক্কায় কোন অন্যায় কিংবা গর্হিত কাজ করে আসি নি। আমরা পথভ্রষ্ট ছিলাম, আল্লাহ্ তা'আলা একজন নবী পাঠিয়ে আমাদের হিদায়েতের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আমরা আমাদের দেশবাসীর অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে এদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছি। কুরায়শ প্রতিনিধিদলের নেতা আ'মর ইবনে আ'স অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন কূটনীতিবিদ ছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ আলোচনার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে নাজ্জাশীর নাজুক ও অনুভূতিপূর্ণ আবেগে আঘাত হেনে প্রশ্ন করেন, "তাহলে মুসলমানরা বলুক হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে তারা কি বিশ্বাস পোষণ করে?”

মুসলমান প্রতিনিধি দলের নেতা হযরত জাফর ত্বাইয়ার কুরআনের ঐ জাতীয় কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন যেখানে হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র রূহ (রুহুল্লাহ), আল্লাহর বাণী (কালিমাতুল্লাহ), মারইয়ামের পুত্র ও বিনা পিতায় জন্মগ্রহণকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আল্লাহর পুত্র হওয়ার ব্যাপারটি অস্বীকার করা হয়েছে। নাজ্জাশী ব্যক্তিগতভাবে একক সত্তায় বিশ্বাসী খ্রীস্টান ছিলেন। এ সময় ঐ সম্প্রদায় এবং গ্রীসের খ্রীস্টানদের মধ্যে বিরাট মতবিরোধ ছিল। গ্রীকরা হযরত ঈসা (আ)-এর মানবিক ও খোদায়ী-উভয় সত্তায় বিশ্বাসী ছিল। হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে (হাবশার) সকল খ্রীস্টানের বিশ্বাস ছিল যে, তিনি আল্লাহর রূহ (রুহুল্লাহ), আল্লাহর বাণী (কালিমাতুল্লাহ) ও মারইয়ামের পুত্র এবং তিনি বিনাপিতায় জন্মলাভ করেছেন। বলা হয়ে থাকে, সম্ভবত এ কারণে নাজ্জাশী ও তাঁর দরবারের পাদ্রীরা মুসলমানদেরকে খ্রীস্টান মনে করেছিল এবং এ ধারণার ভিত্তিতেই তারা মুসলমানদেরকে মক্কাবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছিল। হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর পুত্র একথা মুসলমানরা স্বীকার করত না। সম্ভবত "একক সত্তায় বিশ্বাসী” নাজ্জাশী মুসলমানদের এ ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। নাজ্জাশী সম্ভবত এটাও ধারণা করেছিলেন যে, মুসলমানরা প্রকৃতপক্ষে খ্রীস্টানদেরই একটি নতুন সম্প্রদায়। সুতরাং হাবশী পরিবেশে থাকলে ক্রমশ তারা একক সত্তায় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (নাজ্জাশীর এ ধারণা আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল)। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমানদের মধ্যে যারা ইসলামী কেন্দ্র ও পথপ্রদর্শক (রসূলুল্লাহ) হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তাদের নূন্যপক্ষে দু'ব্যক্তি খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিল।

নাজ্জাশীর ইসলাম গ্রহণ
মুসলমান লেখকদের মতে নাজ্জাশী মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর গায়েবানা নামাযে জানাযাও আদায় করেছিলেন, কিন্তু এটা ছিল হিজরতের পরের ঘটনা। মক্কায় কিছুদিনের জন্য এক অভিনব গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে কুরায়শদের যাবতীয় বিরোধিতার অবসান ঘটেছে। তার ফলে তৎক্ষণাৎ হাবশা থেকে অনেক মুহাজির স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর প্রকৃত অবস্থা যখন প্রকাশ পেল, তখন তারা মক্কার আর কিছু মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় হাবশায় চলে যান।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর মদীনায় হিজরত
বিশেষ কোন ঘটনা ছাড়াই কয়েক বছর অতিবাহিত হল। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সা) মক্কাবাসীদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে মদীনায় হিজরত করেন এবং আশেপাশের গোত্রসমূহের সাথে সমঝোতা করে সেখানে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা মুসলমানদের প্রভাবান্বিত এলাকা দিয়ে সিরিয়ায় গমনাগমন করত। মুসলমানরা তাদের সে পথ বন্ধ করে দেন এবং কুরায়শদের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। পরিণামে বদর প্রভৃতি যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং তাতে সাধারণত কুরায়শদের চরমভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়। ইত্যবসরে কুরায়শদের একটি প্রতিনিধি দল হাবশা গমন করে এবং সেখানে অবস্থানকারী মুসলমানদের উপর তাদের পরাজয়ের আক্রোশ মেটাতে সচেষ্ট হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি আমর বিন উমাইয়া নামক জনৈক অমুসলিমকে দূত হিসেবে হাবশায় প্রেরণ করেন। নাজ্জাশী বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের সংবাদ শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হন। হাবশায় কুরায়শদের দুরভিসন্ধি এবারও ব্যর্থ হয়। যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র ক্রমোন্নতির পথে ছিল, তাই বিদেশে মুসলমানদের আশ্রয় গ্রহণের আর প্রয়োজন ছিল না। সুতরাং কিছুদিন পর অর্থাৎ ৬ষ্ঠ হিজরী সালে রসূলুল্লাহ্ (সা) হাবশা থেকে মুহাজিরদেরকে মদীনায় নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন। নাজ্জাশী রসূলুল্লাহ (সা)-এর ইচ্ছানুযায়ী মুহাজিরদের জনৈক যুবতী বিধবাকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে গায়েবানা আকদ করিয়ে দেন এবং তাঁকে মুহাজিরদের সাথে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। অত্যন্ত জাঁক-জমকের সাথে তিনি বিভিন্ন ধরনের উপহার-উপঢৌকন দিয়ে নিজের জাহাজে করে মুসলমানদের মদীনায় পাঠিয়ে দেন। ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন যে, নাজ্জাশী ঐ মুসলমানদের সাথে আরো কয়েকটি জাহাজে করে তাঁর পুত্র ও বহু সংখ্যক হাবশীকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে পাঠিয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ সালাম প্রেরণের উদ্দেশ্যেই তিনি উপরোক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নাজ্জাশীর পত্র
তাবারী ও ইবনে ইসহাক নাজ্জাশীর পত্রটিকেও সংরক্ষণ করেছেন। পত্রে নাজ্জাশী নিজে গোপনে মুসলমান হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন এবং আপন পুত্রকে (রসূলের খিদমতে) পাঠানোর কথাও উল্লেখ করেছেন। পত্রটি নিম্নরূপ: করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে আল্লাহর রসূল মুহাম্মদের প্রতি হাবশার সম্রাট আসহাম বিন আবজরের পক্ষ হতে। আপনার প্রতি সালাম হে আল্লাহর নবী। আর করুণা ও বরকত সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং যিনি আমাকে ইসলামের পথ দেখিয়েছেন। (অতঃপর) হে আল্লাহর রসূল, আপনার পত্র আমার হস্তগত হয়েছে। এতে ঈসা (আ)-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যমীন ও আসমানের মালিক আল্লাহর শপথ, ঈসা (আ) সম্পর্কে আপনি যা বর্ণনা করেছেন তিনি তা থেকে ঊর্ধ্বে ছিলেন না, আপনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন তিনি ঠিক তাই ছিলেন। আমরা আপনার প্রেরিত পত্রের মর্ম উপলব্ধি করেছি এবং আপনার পিতৃব্যপুত্র ও তাঁর সাথীদের অতিথি সেবা করেছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহ্র সত্য ও সত্যায়িত নবী। আমি আপনার পিতৃব্যপুত্র ও তাঁর সহচরদের হাত ধরে সেই আল্লাহ্ তা'আলার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি, যিনি জগতসমূহের পরিচালক। আমি আমার পুত্র আরহা বিন আসহাম বিন আবজরকে পাঠালাম। আমি আমার নিজের সত্তা ছাড়া অন্য কিছুর মালিক নই। আপনি যদি আমাকে আপনার খিদমতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন তাহলে আমি তাই করবো। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি যা কিছু বলেন সবই সত্য। সালাম আপনার প্রতি, হে আল্লাহর রসূল।

এই প্রতিনিধি দলটি হাবশা থেকে রওয়ানা হয়, কিন্তু কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, যেসব জাহাজে এ হাবশীরা আরোহণ করেছিল, সেগুলি পথিমধ্যে ডুবে যায়। তবে কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, কয়েকটি জাহাজ নিরাপদেই যথাস্থানে পৌঁছেছিল। এই প্রতিনিধি দলটি মদীনায় উপস্থিত হলে রসূলে করীম (সা) অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তাঁদের সেবাযত্ন করেন। হাবশায় ঐ সিপাহীরা মুসলমানদের সাথে কোন কোন যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। সমহূদী 'মদীনার ইতিহাস' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, নাজ্জাশীর পুত্র হযরত আলীর সাথে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং হাবশায় প্রত্যাবর্তন করে রাজ-সিংহাসনে আরোহণ করতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন।

নাজ্জাশীর প্রতি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র
প্রতিনিধি দলের মদীনা পৌঁছার সংবাদ জানিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) নাজ্জাশীর নিকট একটি পত্র ও কিছু উপহার সামগ্রী পাঠান। কিন্তু তখন নাজ্জাশী ইহলোক ত্যাগ করেছেন। ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন, উক্ত নাজ্জাশীর উত্তরাধিকারীর কাছেও রসূলুল্লাহ্ (সা) একটি দাওয়াতী পত্র পাঠান, কিন্তু তার ফলাফল কি হয়েছিল তা জানা যায় নি। ইমাম বায়হাকী এ পত্রটিকে ইবনে ইসহাকের পুস্তক থেকে উদ্ধৃত করেছেন। পত্রটি নিম্নরূপ:
এ পত্রটি নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষ হতে হাবশার সম্রাট আসহামের প্রতি সালাম, তাঁর প্রতি যিনি সত্য পথ অনুসরণ করেন এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর না আছে কোন স্ত্রী, না কোন পুত্র। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রসূল। ইসলাম গ্রহণ করুন, আপনার মঙ্গল হবে। "হে আহলে কিতাব, তোমরা সেই বাণীর দিকে আস যাতে তোমাদের ও আমাদের মধ্যে ঐক্য রয়েছে। আর তা হলো, আমরা আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো বন্দেগী করব না এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীকও করব না। আমরা আল্লাহকে ছেড়ে একে অপরকে যেন প্রভু বলে স্বীকার না করি। যদি তারা (আহলে কিতাব) মত পরিবর্তন করে তাহলে বলে দাও তোমরা সাক্ষী থেকো, আমরা মুসলমান। অতঃপর আপনি যদি আমার দাওয়াত অস্বীকার করেন তাহলে আপনাকে আপনার খ্রীস্টান জাতির পাপও বহন করতে হবে।

সম্প্রতি হাবশী ইটালীয় যুদ্ধের প্রথমাবস্থায় (হামদম পত্রিকা, মিসরীয় পত্রিকা 'আল বালাগ' হতে এবং আল-বালাগ, 'আদ্দিস আবাবার 'বুরহানে ইসলাম' হতে এ সংবাদ পরিবেশন করেছ।) কয়েকটি পত্রিকা এ সংবাদ পরিবেশন করে যে, নাজ্জাশী তার রক্ষণাগার থেকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি পত্র যা এখনো সংরক্ষিত আছে— বের করে মুসলমানদের একটি প্রতিনিধিদলকে দেখিয়েছেন। পত্রটির যে বচন (এবারত) নকল করা হয়েছে উপরোক্ত বচনের সাথে তার হবহু মিল রয়েছে। তবে এ বর্ণনাটি কতটুকু সত্য তা বলা মুশকিল, কেননা ইতিপূর্বে হাবশার এই রক্ষণাগার সম্পর্কে কোন কিছুই জানা যায় নি। রসূলুল্লাহ (সা)-এর আরো দুটি মূল পত্র গত শতাব্দীর তৃতীয়ার্ধে পাওয়া গেছে এবং সেগুলোর ফটো প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক-পুস্তিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পুরাতন আরবী ইতিহাসসমূহে সংরক্ষিত পত্রসমূহের সাথে উক্ত পত্রদ্বয়ের বচনের (মতন) পূর্ণ সামঞ্জস্য রয়েছে। নাজ্জাশীর প্রদর্শিত পত্রটির ফটোও যদি পাওয়া যায় তাহলে আমরা বিশেষভাবে উপকৃত হব। নাজ্জাশীর মূল্যবান রক্ষণাগারের তত্ত্বাবধায়ক দেশান্তরিত হওয়ার সময় মি. ডনলাপের মত বাধ্য হয়ে যদি এ ঐতিহাসিক পত্রটি ফিলিস্তিনে বিক্রি করে থাকেন এবং সেখানে তা পাওয়া যায়, তবে এর সত্যতা প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য হবে। আল্লাহ্ জানেন, গত মহাযুদ্ধের পর এ ঐতিহাসিক পত্রটি কোথায় আছে এবং কি অবস্থায় আছে।

হাবশার সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক
রসূলে করীম (সা)-এর শাসনামলে হাবশার সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। হাবশীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করার জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) যে জোর তাকিদ করেছেন, সে ধরনের অনেক হাদীসের সন্ধান পাওয়া যায়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাবশী সন্তানরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার সাথে রসূলুল্লাহর সাথে যে সহযোগিতা করেছে, মুসলমানরা আজো তা অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। ইসলামের প্রথম মুয়াযযিন হযরত বিলাল (রা) হাবশীর নামের মধ্যে এমন আকর্ষণ রয়েছে যে, প্রচলিত ভাষায় বিলালের অর্থ মুয়াযযিনই মনে করা হয়। লণ্ডনের পটনী মহল্লায় অবস্থিত মসজিদের প্রথম ইংরেজ মুয়াযযিনের নামও বিলাল রাখা হয়েছিল। ঐ বিলালের প্রকৃত নাম কি ছিল আজ তা অতি অল্প লোকই জানে বা জানার চেষ্টা করে। কৃষ্ণাঙ্গ বিলালের নামের সাথে নিজের নামের মিল থাকায় শ্বেতাঙ্গ বিলাল তা নিজের জন্য গৌরবের বিষয় বলে মনে করতেন।

ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, আবরাহার আক্রমণের সময় কিছুসংখ্যক হাবশী মক্কায় থেকে গিয়েছিল। বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ পাদ্রী লা-মিন্স ১৯১৬ খ্রীস্টাব্দে 'জার্নাল আযইয়াতিক' এ একটি অভিনব ও বিশেষভাবে লক্ষণীয় প্রবন্ধ লিখেছেন, যার শিরোনাম হলো-"Lammens, Les ahabis et l'organisation Militaire de la Mecque Au Siecle de l'hegite' অর্থাৎ 'মক্কায় হাবশী ও হিজরত যুগের সামরিক আইন', তাতে তিনি বহু সংখ্যক আরবী রেফারেন্সের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, কুরায়শরা নিয়মিত ও সদাপ্রস্তুত (Standing Army) একটি সামরিক বাহিনী গঠন করেছিল এবং তাতে হাবশী ক্রীতদাস ও হাবশী বেতনভুক্ত সৈন্য কর্মরত ছিল। কুরায়শরা শুধু নিজেদের বাণিজ্যিক কাফেলার গমনাগমনের সময়ই নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে রক্ষীবাহিনী হিসেবে এদেরকে সঙ্গে নিয়ে যেত না বরং নিজেদের যুদ্ধ-বিগ্রহেও এদের সাহায্য নিত।

মিসরের দক্ষিণাঞ্চলে ইসলামের প্রসার
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ওফাতের পর মুসলমানরা দ্রুত চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে মিসরের দক্ষিণাঞ্চলও ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। কখন ও কিভাবে সেখানে ইসলাম প্রচারের সূচনা হয়েছিল তা জানা যায় নি। যেহেতু প্রাচীনকাল থেকেই মিসরের সাথে এই অঞ্চলের ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল সেহেতু মিসর বিজয়ের পরই কোন মুসলিম বণিক সম্ভবত সেখানে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। নোবিয়া অঞ্চলে হযরত উসমান (রা)-এর শাসনামলে তৈরী মসজিদের সন্ধান পাওয়া যায়।

'খুতুতে মিসর' গ্রন্থে মাকরীযী লিখেছেন, হযরত উমর (রা)-এর শাসনামলে আমের বিন আ'স (রা) যখন মিসর জয় করেন, তখন তিনি আবদুল্লাহ্ বিন সা'দ বিন আবি সুরাহকে ২০ অথবা ২১ হিজরীতে বিশ হাজার সৈন্যসহ মিসরের দক্ষিণাঞ্চল নোবিয়ায় পাঠান। সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থানের পর আমর বিন আ'স তাদেরকে মিসরে ফিরে আসার নির্দেশ দেন।

নোবিয়ায় মুসলমানদের আক্রমণ ও সন্ধি
নোবিয়াবাসী ও আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবি সুরাহের মধ্যে যে সন্ধি হয়েছিল, আমর বিন আ'সের ইনতেকালের পর তারা তা ভঙ্গ করে এবং দক্ষিণ মিসরে লুটতরাজ শুরু করে। এদেরকে দমন করার জন্য আবদুল্লাহ বিন সা'দ পুনরায় নোবিয়া আক্রমণ করেন। আবদুল্লাহ বিন সা'দ মিসরের শাসনভার গ্রহণ করার পর ৩১ হিজরীতে অর্থাৎ হযরত উসমান (রা)-এর শাসনামলে নোবিয়ার রাজধানী 'দানকলা' অবরোধ করেন এবং কামানের সাহায্যে শত্রুবাহিনীর উপর পাথর নিক্ষেপ করেন। তাতে তাদের গীর্জা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ভীত-সন্ত্রস্ত বাদশাহ উপায়ান্তর না দেখে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সন্ধির আবেদন জানান। অতএব পুনরায় সন্ধি স্থাপিত হয় এবং নোবিয়রা বার্ষিক তিনশ' ষাটটি ক্রীতদাস প্রদানে সম্মত হয়। অপরদিকে মুসলমানরা তাদেরকে খাদ্য সরবরাহ করতে রাযী হয়। উভয়পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়, যাকে ‘বকত’ (Pact) বলা হত। ঐ চুক্তিতে রাজধানী দানকলা জামে মসজিদের উল্লেখ আছে। চুক্তিপত্রটি ছিল নিম্নরূপঃ

করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহ্র নামে।
১. শাসনকর্তা (আমীর) আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবি সুরাহর চুক্তি নোবার বাদশাহ ও তার জনগণের জন্য।
২. আসওয়ান হতে উলওয়াহ পর্যন্ত নোবার আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের জন্য এ চুক্তিটি সম্পাদিত হলো।
৩. আবদুল্লাহ বিন সা'দ তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছেন এবং তাদের সাথে একটি চুক্তি করেছেন যা তাদের এবং পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ মিসর প্রভৃতি অঞ্চলের মুসলমান ও যিম্মীদের মধ্যে প্রযোজ্য হবে।
৪. হে নোবাবাসী! তোমাদেরকে আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূল মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষ হতে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। যতক্ষণ তোমরা পারস্পরিক শর্তসমূহ মেনে চলবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমাদের উপর আক্রমণ করব না এবং তোমাদের সাথে যুদ্ধও করব না।
৫. তোমরা আমাদের দেশে এসে ভ্রমণ করতে পারবে কিন্তু স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে না, আর আমরাও তোমাদের দেশে গমনাগমন করতে পারব কিন্তু স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে না।
৬. কোন মুসলমান অথবা যিম্মী যদি তোমাদের দেশে আসে অথবা গমনাগমন করে তাহলে যতক্ষণ না সে তোমাদের দেশ থেকে প্রত্যাবর্তন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব তোমাদের উপর বর্তাবে।
৭. যদি মুসলমানদের ক্রীতদাস পালিয়ে তোমাদের কাছে যায় তাহলে তোমরা তাকে মুসলমানদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেবে। তার উপর কোন অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে না। কোন মুসলমান তার সাথে দেখা করতে চাইলে অথবা আলাপ করতে চাইলে তোমরা তাতে বাধা দেবে না।
৮. তোমাদের শহরে মুসলমানরা যে মসজিদ নির্মাণ করেছে তা সংরক্ষণের দায়িত্ব তোমাদের উপর বর্তাবে। কোন মুসল্লীকে মসজিদে যেতে বাধা না দেওয়া, মসজিদকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং তাতে আলোর ব্যবস্থা করাও তোমাদের কর্তব্য বলে পরিগণিত হবে।
৯. তোমরা মুসলিম শাসককে কর হিসেবে বার্ষিক ৩৬০টি ক্রীতদাস দেবে। দাসরা তোমাদের দেশের মধ্যম আকৃতির লোক হবে এবং যাবতীয় দোষত্রুটি থেকে মুক্ত হবে। তারা নারী পুরুষ উভয় সম্প্রদায়ের হবে কিন্তু অত্যধিক বয়স্ক হবে না কিংবা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হবে না। এদেরকে আসওয়ানের শাসনকর্তার হাতে সোপর্দ করা হবে।
১০. উলওয়াহ ও আসওয়ানের মধ্যবর্তী এলাকায় তোমাদের উপর কেউ আক্রমণ করলে আক্রমণকারীকে বাধা দেওয়া মুসলমানদের জন্য অবশ্যকর্তব্য বলে বিবেচিত হবে না।
১১. যদি তোমরা মুসলমানদের কাছ থেকে পলাতক দাসকে আশ্রয় দাও অথবা কোন মুসলমান অথবা যিম্মীকে হত্যা কর অথবা মুসলমান নির্মিত মসজিদসমূহকে নষ্ট কর অথবা ৩৬০টি দাস দান করতে কার্পণ্য কর, তাহলে এ নিরাপত্তা দান ও সন্ধি আপনা আপনি ভঙ্গ হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় তোমরা ও আমরা সেই পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবো যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ হতে কোন ফয়সালা আসে। আর আল্লাহ্ তা'আলা হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।
১২. এ ব্যাপারে আমাদের উপর আল্লাহ্ এবং তার রসূল (সা)-এর প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্ব আছে এবং তোমাদের উপরও তোমাদের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসের পাত্র হযরত ঈসা (আ), হাওয়ারানি ও তোমাদের ধর্মের অন্যান্য সম্মানিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব আছে। এ বিষয়ে আল্লাহ্ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী রইলেন।
১৩. হিজরী ৩১ সালের রমযান মাসে আমর বিন শরজিল এই চুক্তিপত্রটি লিখেছেন।

চুক্তি মাফিক প্রতি বছর দাসদের সোপর্দ করার নীতির ভিত্তিতে মিসরের গভর্নর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অধিকার নির্ধারণ করা হত। কিভাবে এবং কি পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য তাদেরকে দান করা হত এবং খাদ্যদ্রব্য ছাড়া কাপড়-চোপড় প্রভৃতি কিভাবে সরবরাহ করা হত, ঐতিহাসিক মাকরীযী তা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। যেহেতু নোবীয়রা খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ছিল, তাই বার্ষিক লেনদেনকালে কোন এক সময় তারা মদের মটকাও মুসলমানদেরকে উপহার দিতে শুরু করলে উলামারা তাতে হস্তক্ষেপ করেন।

হাবশার কয়েকটি উপকূলীয় অঞ্চল ও সেখানকার অধিবাসীদের জীবনব্যবস্থা
হাবশা ও নোবা সংলগ্ন বাজাহ্ অঞ্চলটি লোহিত সাগর ও নীলনদের মধ্যবর্তী ই’যাব বন্দর (বর্তমান পোর্ট সুদান) হতে দক্ষিণে সাকীন পর্যন্ত বিস্তৃত। মাকরীযী ('যিকরুল বাজাহ অধ্যায়ে) লিখেছেন, দক্ষিণ ভারতের কোন কোন উপকূলীয় অঞ্চলের মত সেখানেও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ পুত্রের স্থলে ভাগ্নে অথবা দৌহিত্রকে উত্তরাধিকারী করা হত। সেখানে কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা ধর্ম ছিল না। আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবি সুরাহ যখন নোবা আক্রমণ করেন তখন তিনি এ অঞ্চলের প্রতিও মনোনিবেশ করেন। কিন্তু পরে যখন তিনি জানতে পারেন যে, সেখানে মুকাবিলা করার মত কোন প্রতিষ্ঠিত সরকারই নেই তখন তিনি আর সেদিকে অগ্রসর হননি। এমনকি, তাদের সাথে কোন চুক্তিও করেন নি। তাদের সাথে সর্বপ্রথম চুক্তি করেন শাসনকর্তা আবদুল্লাহ বিন আল-হিজাব আল সালুলী (শাসনকাল হিজরী ১০২-১১৬)। ঐ চুক্তির শর্ত ছিল, তারা ৩০০টি উট বার্ষিক কর হিসাবে পরিশোধ করবে এবং বাণিজ্যিক কারণে ইসলামী রাষ্ট্রে গমনাগমন করতে পারবে, তবে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে না। আর তারা তাদের অঞ্চলে বসবাসরত মুসলমান ও যিম্মীদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করবে, অন্যথায় তাদের সাথে যে চুক্তি আছে তা আপনা আপনি ভঙ্গ হয়ে যাবে। যদি মুসলমানদের কোন ক্রীতদাস পলায়ন করে তাদের এলাকায় চলে যায় তবে তারা তাকে ফেরতদানে বাধ্য থাকবে। চুক্তির শর্তাবলী কার্যকর করার উদ্দেশ্যে মিসরে তাদের একজন প্রতিনিধি জামিনস্বরূপ অবস্থান করত। শর্তভঙ্গের শাস্তিও নির্ধারিত ছিল। একটি ছাগল লুট করলে চার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) এবং একটি গরু লুট করলে দশ দীনার জরিমানা করা হত। পলায়নকারী ক্রীতদাসকে ফেরত না পাঠালে তাদেরকে সেজন্যও দায়ী করা হত। ধীরে ধীরে মুসলমানরা সেখানে গিয়ে বসবাস করায়, সেখানকার শাহী পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করায় এবং সেখানকার খনিগুলো খনন করে উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করায় ঐ এলাকার অধিবাসীদের বন্য স্বভাবের পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু খলীফা মামুনের শাসনামলে তারা পুনরায় লুটতরাজ শুরু করে। মামুন তাদের দমন করার জন্য সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন জাহানকে সেখানে প্রেরণ করেন। কয়েকটি সংঘর্ষের পর বাজার শাসনকর্তা কিনওয়ান বিন আবদুল আযীয সন্ধির প্রস্তাব পেশ করে। ঐতিহাসিক মাকরীযী ঐ সন্ধির দীর্ঘ বচনসমূহ সংরক্ষণ করেছেন। নিম্নে তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দেওয়া গেল।

"তুমি ও তোমার প্রজারা সকলেই খলীফা মামুনের দাস হিসেবে বিবেচিত হবে, তবে তুমি তোমার নিজ অঞ্চলে পূর্বের ন্যায় বাদশাহই থাকবে এবং যথারীতি একশ' উট অথবা তিনশ' দীনার বার্ষিক কর দান করবে।.....ইসলাম, কুরআন ও রসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে খারাপ উক্তি করলে এ চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যাবে। ....ইসলামের শত্রুদের কোন প্রকার সাহায্য করা চলবে না। ....কোন স্বাধীন অথবা যিম্মী মুসলমানকে হত্যা করলে দশটি প্রাণের রক্তমূল্য এবং কোন মুসলমান ক্রীতদাসকে হত্যা করলে তার মূল্যের দশগুণ মুদ্রা আদায় করা হবে। এভাবে মুসলমান জনসাধারণের মাল লুন্ঠন করলে দশগুণ জরিমানা আদায় করা হবে।......তোমাদের অঞ্চল দিয়ে মুসলমান জনসাধারণের গমনাগমনে বাধা দিতে পারবে না এবং রাহাজানিও করা চলবে না।.... মুসলমানদের নির্মিত মসজিদসমূহ ধ্বংস করা যাবে না।..... চুক্তি কার্যকরীকরণের নিশ্চয়তা দানের উদ্দেশ্যে কিনওয়ান বিন আবদুল আযীয জামিন হিসেবে মিসরে অবস্থান করবে।..... মুসলমান কর্মকর্তারা মুসলমানদের যাকাত আদায় করার জন্য বাজাহয় প্রবেশ করতে পারবে.....। এই চুক্তির যথাযথ অনুবাদ করা হয় এবং এর উপর সাক্ষীদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়।"

খলীফা মুতাওয়াক্কিলের শাসনামল পর্যন্ত এ চুক্তি কার্যকর ছিল। অতঃপর ঐ অঞ্চলের অধিবাসীরা লুটতরাজ করতে শুরু করলে তাদের দমনের জন্য একটি ক্ষুদ্র বাহিনী পাঠানো হয়। সমর বিভাগের দক্ষতার কারণে স্বল্প সংখ্যক সৈন্য সম্বলিত ঐ বাহিনী শত্রুদের চরমভাবে পরাজিত করে এবং বাজার বাদশাহকে বাগদাদে খলীফার দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য করে। এটা হচ্ছে ২৪১ হিজরী সালের ঘটনা। ঐ সময় পুনরায় চুক্তিটি নবায়ন করা হয় এবং এতে মুসলমানদের অতিরিক্ত আরো কয়েকটি অধিকার সংযোজিত হয়। ঐতিহাসিক মাকরীযী 'আল-আত্মাম' নামক একটি স্বতন্ত্র পুস্তকে বাজাহ্ অঞ্চলের বিভিন্ন অবস্থার উপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় প্রাক-ইসলামী যুগ ও ইসলামের প্রাথমিক যুগের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় এখানে তা উল্লেখ করা হলো না।

উপসংহার
উপরিউল্লিখিত পত্রাদির উপর আলোচনা করার পরও নতুন কিছু তথ্য সংগৃহীত হওয়ায় উপসংহারের আকারে এখানে তা সংযোজন করা হলো। সম্প্রতি গ্লাসগো থেকে মি. ডনলাপের একটি চিঠি এসেছে। তাঁর বর্তমান প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে এবং প্রবন্ধের সাথে রসূলে করীম (সা)-এর পত্রের ফটোও সন্নিবেশিত হয়েছে। এ ব্যাপারে জি.আর. এ. এস. লণ্ডন পুস্তিকার ১৯৪০ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারী সংখ্যা (পৃষ্ঠা ৫৪-৬০) বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য।

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আসল পত্রটি একটি পাতলা চামড়ার উপর লেখা ছিল যার দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১৩ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৯ ইঞ্চি। পত্রে মোহর ছাড়া ১৭টি লাইন ছিল যা পরিস্কারভাবে পড়া যায়। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মকোকিস ও মুনযরের কাছে পাঠানো পত্রের অক্ষরের সাথে এ পত্রের অক্ষরের সামঞ্জস্য নেই। এতে অনুমান করা যায়, এ পত্রের লেখক অন্য কোন ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু অক্ষর ও অক্ষররীতির প্রতি লক্ষ্য করলে এ পত্রটিও প্রাচীন বলেই প্রতীয়মান হয়। পত্রসমূহের সমাপ্তিতে যেসব মোহর রয়েছে, আকার ও অক্ষরের দিক দিয়ে সবটাই এক ও অভিন্ন বলে মি. ডনলাপের বিশেষজ্ঞ বন্ধুরা স্বীকার করেছেন। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পবিত্র পত্রটির কালি ছিল খেজুর রঙের মত লাল। ১৯৩৮ খ্রীস্টাব্দে দামেশকের জনৈক ব্যক্তি হাবশার একজন পাদ্রীর কাছ থেকে এটা ক্রয় করেন এবং বৃটিশ মিউজিয়াম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা এর সত্যতা যাচাই করার জন্য বৃটেনে তা পাঠিয়ে দেন। মি. ডনলাপ বলেন, "আমি নিজে এ পত্রটি দামেশকে গিয়ে মালিকের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি। প্রবন্ধকার এও লিখেছেন যে, যেসব বিশেষজ্ঞ পত্রটি দেখেছেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন যে, পত্রের চামড়াটি নতুন হওয়ার চাইতে পুরাতন হওয়াটাই অধিক বাঞ্ছনীয়। অবশ্য বৃটিশ মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞরা চামড়াটিকে তত পুরাতন মনে করেন না যে, সেটাকে একেবারে নিঃসংকোচে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের বলে স্বীকার করা হবে। তবে প্রকৃত কথা হলো, যতক্ষণ না রসূলুল্লাহ (সা)-এর সময়ের অন্য কোন আসল ও সর্বসমর্থিত পাতলা চামড়া না পাওয়া যাবে ততক্ষণ 'এটা এত পুরাতন বলে মনে হয় না' বলাটা যুক্তি-সঙ্গত হবে না।

নাজ্জাশীর প্রতি প্রেরিত রসূলুল্লাহ (সা)-এর মূল পত্র প্রাপ্তি সম্পর্কে কিছু আলোচনা
১৯৩৯ খ্রীস্টাব্দের ১১ই মে, আমি যখন অক্সফোর্ডে 'হিজরী সালের প্রাথমিক পর্যায়ের মদীনার কয়েকটি আরবী পত্রাবলী'র উপর একটি বক্তৃতা দেই এবং এসব পত্রের অক্ষরের সাথে কিছু দিন পূর্বে প্রাপ্ত মকোকিস্ ও মুনযরের প্রতি প্রেরিত পত্রের অক্ষরের তুলনা করি, তখন অধ্যাপক মারগুলিউস বলে উঠলেন, নাজ্জাশীর প্রতি প্রেরিত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একটি পত্র সম্প্রতি পাওয়া গেছে এবং তা স্কটল্যান্ডের একজন লোকের কাছে রক্ষিত আছে। সভা শেষে আমি অধ্যাপক মারগুলিউসের মাধ্যমে স্কটল্যান্ডবাসী ঐ লোকটির কাছে চিঠি পাঠাই এবং হায়দারাবাদ ফিরে আসার কয়েকমাস পর ঐ চিঠির জবাব পাই। চিঠি লেখক মি. ডনলাপ এ সময় সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। জবাবী চিঠির সাথে তিনি আমার কাছে নাজ্জাশীর প্রতি প্রেরিত পত্রের একটি হাতের লেখা নকলও পাঠিয়েছিলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, স্কটল্যান্ডে ফিরে গিয়ে তিনি এর একটি আলোকচিত্রও পাঠাবেন। লণ্ডনের জি. আর. এ. এস. পত্রিকায় এ সম্পর্কে অবিলম্বে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করবেন বলেও তিনি এ চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু ঐ সময় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। (ফলে তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে পড়ে)। কিন্তু ইত্যবসরে ইসলামী কালচার হায়দারাবাদ-এ (অক্টোবর ১৯৩৯-এর ৪২৯ পৃষ্ঠার টীকায়) এবং মিসর হতে প্রকাশিত পুস্তক 'আল ওসায়িকুস্ সিয়াসিয়ায়' (২৪-২৫ পৃষ্ঠার টীকায়) আমি এটা প্রকাশ করে ফেলি। বর্তমান প্রবন্ধটি জি.আর.এ.এস. পত্রিকার ১৯৪০ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারী সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল, কিন্তু এ সংখ্যাটি ভারতে পৌঁছেছিল অনেক পরে। পত্রিকার ৫৪-৬০ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল প্রবন্ধটি। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রের আলোকচিত্রের ব্লকও সেখানে ছাপা হয়েছিল।

এ মূল্যবান দলীলটি পাওয়া গিয়েছিল দামেশকে ১৯৩৮ খ্রীস্টাব্দে। আমিই এটা বৃটেনে নিয়ে যাই। মি. বল ও মি. ফেলটন বৃটিশ মিউজিয়ামে তা দেখেন।.... অধ্যাপক মারগুলিউস ও গ্লাসগোর মি. রবসন প্রমুখ আরবী ভাষা বিশেষজ্ঞরা দেখার পর আমি তা দামেশকে তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফেরত দিয়ে আসি। পত্রের মালিক দামেশকেরই অধিবাসী একজন গৃহস্থ ব্যক্তি। বন বিশ্ববিদ্যালয়ের (জার্মানী) অধ্যাপক ‘কালে’ ও অধ্যাপক ‘হিফনিং’ মূল পত্রটি দেখতে পাননি, তবে তাঁর আলোকচিত্রটি কয়েকবারই দেখেছেন। কিছুদিন পূর্বে প্রাপ্ত মকোকিসের প্রতি প্রেরিত পত্রের সাথে এ পত্রের যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে-বিশেষ করে উভয় পত্রের মোহরের মধ্যে পূর্ণ সামঞ্জস্য বিদ্যমান। তবে উভয় পত্রের অক্ষরের মধ্যে বৈসাদৃশ্য থাকায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, পত্রদ্বয়ের লেখক ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন। আরবী ইতিহাসসমূহে এ পত্রের যে বচন পাওয়া যায় তার সাথে এ বচনের বেশ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞরা পুরাতন অক্ষর জ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মত প্রকাশ করেছিলেন যে, এটা ততটা পুরাতন নয় যতটা বলা হয়ে থাকে। যাঁরা মূল চামড়া দেখেছেন তাঁদের অনেকেরই ধারণা, এই চামড়াটি নতুন না হয়ে পুরাতন হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। ফরাসী ভাষায় লিখিত 'রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শাসনামলে ইসলামের পররাষ্ট্রনীতি' পুস্তকের প্রণেতা মি. হামীদুল্লাহর মতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মূল পত্রটি বর্তমান নাজ্জাশীর গ্রন্থাগারে ছিল। বর্তমান মালিকের বর্ণনা থেকে জানা যায়, কয়েক বছর আগে তিনি এ মূল্যবান দলীলটি হাবশার জনৈক পাদ্রীর কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন। অতএব এটা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত যে, পত্রটি ইতিপূর্বে হাবশার নাজ্জাশীর গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ছিল। হাবশী-ইটালী যুদ্ধের সময় এ পত্রটি কোন না কোনভাবে জনৈক পাদ্রীর অধিকারে চলে যায়, যিনি পরে সিরিয়া সফর করেন...।

এখন কথা হলো, এত কিছু জানার পরও মি. ডনলাপ এ পত্রটিকে জাল বলে মত প্রকাশ করেছেন। তিনি যেসব দলীল-প্রমাণের উপর ভিত্তি করে এ মত প্রকাশ করেছেন তার সংক্ষিপ্তসার হলো:
১. রসূলুল্লাহ (সা) নাজ্জাশীর কাছে কোন পত্র পাঠান নি। কেননা তিনি নিজেকে বিশ্বনবী বলে মনে করতেন না, তিনি শুধু আরবেরই সংস্কার সাধন করতে চেয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে খৃষ্টানরা যখন পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করে এ তথ্য প্রকাশ করলে যে, ঈসা (আ) সারা বিশ্বে ধর্ম প্রচারের জন্য তাঁর হাওয়ারীন পাঠিয়ে-ছিলেন, তখন মুসলমানরা তাদের নবীর সম্মান যাতে ক্ষণ্ণ না হয় সেজন্য এ কাহিনী গড়ে নিয়েছিল।
২. ইতিপূর্বে মকোকিস ও মুনযর বিন সাবার প্রতি প্রেরিত রসূলুল্লাহ (সা)-এর মূল পত্র যখন পাওয়া যায় তখন নভেন্ড কে. উ. শাওয়ালী এবং শালাইশার সেগুলোকে জাল বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন।
৩. ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞরা চামড়ায় লিখিত পত্রকে জাল বলে মনে করেন।
৪. সীরাতে ইবনে হিশামের যেখানে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে প্রথমে ইবনে ইসহাকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। (সম্ভবত এ বর্ণনা ইবনে হিশামের নিজের অথবা তাঁর সময়ে রচিত হয়েছে)।
৫. কুরআন মজীদের যে সময় পুরাতন সংখ্যা পাওয়া যায়, সেগুলোর অক্ষরের সাথে এ পত্রের অক্ষরের যথেষ্ট অসমঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়।
৬. আজকাল অনেক জাল জিনিসকেও পুরাতন বলে বিক্রি করা হয়। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তাই করা হয়েছে।
৭. এ পত্রের বচন বা মতন, যা আরবী ইতিহাসসমূহে পাওয়া যায়, তার সাথে চামড়ায় লিখিত এ পত্রের বচনের যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

এ সাতটি যুক্তির মধ্যে কেবলমাত্র পুরাকালের পাদ্রীসুলভ কথাবার্তার ভাবভঙ্গিই ফুটে উঠেছে, যা সূক্ষ্মদৃষ্টিসম্পন্ন কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। তরুণ পাঠকদের অবগতির জন্যে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে প্রমাণ ভিত্তিক কিছুটা আলোচনা করছি।
প্রথম প্রমাণঃ এটি একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ। কেননা কুরআন করীমের বিভিন্ন স্থানে পরিস্কার ভাষায় বলে দেওয়া হয়েছে যে, আরবের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) বিশ্বনবী ছিলেন। তবে তিনি যেহেতু একজন মানুষ তাই এ বস্তুজগতে মানুষ হিসেবে তাঁর কর্মতৎপরতাও ছিল সীমিত। আর ঐ একই কারণে তাঁর তাবলিগী জীবনটা কেটেছিল কেবলমাত্র হিজাযেই। পক্ষান্তরে হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে ইঞ্জিলেরই কয়েক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি কেবলমাত্র বনী ইসরাইলেরই নবী ছিলেন। যা হোক, এ অভিযোগ এবং এর প্রত্যুত্তর আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়।
দ্বিতীয় প্রমাণঃ এর বিস্তারিত জবাব আমার পূর্বের প্রবন্ধগুলোতে দেওয়া হয়েছে। এই পত্রের ব্যাপারে কেউ যদি জাল বলে অভিমত প্রকাশ করে তাহলে বর্তমান পত্রটিও যে জাল হবে এটা বলা যায় কোন যুক্তির ভিত্তিতে?
তৃতীয় প্রমাণঃ বৃটিশ মিউজিয়ামের দু'জন বিশেষজ্ঞ কেবলমাত্র এতটুকু বলেছিলেন যে, এ চামড়াকে তো এত পুরাতন বলে মনে হয় না যে, তা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের হবে। এটা হলো তাদের অনুমানমূলক বক্তব্য।
চতুর্থ প্রমাণঃ সংক্ষেপে এখানে এতটুকু বলা যায় যে, সীরাতে ইবনে হিশামের বচনের প্রারম্ভে, 'ইবনে ইসহাক বলেছেন' একথা না বলার কারণে এটা জাল প্রমাণিত হয় না। কেননা, ধারাবাহিক বচনের বিভিন্ন স্থানে ইবনে ইসহাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পঞ্চম প্রমাণঃ এর দ্বারাও কোন কিছু (জাল) প্রমাণিত হয় না। প্রথমত এ কারণে যে, কুরআনে করীমের অক্ষরগুলো লেখা হত বিশেষ অক্ষরে, পক্ষান্তরে সাধারণ সরকারী চিঠি-পত্রগুলো লেখা হত অফিশিয়েল অক্ষরে।
ষষ্ঠ প্রমাণঃ এ ক্ষেত্রে বেচারা বিক্রেতার ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রশ্ন তোলা অবান্তর।
সপ্তম প্রমাণঃ এ অভিযোগটিতে কিছুটা চিন্তার খোরাক আছে। সমস্ত ঐতিহাসিক একমত যে, এ পত্রটি ষষ্ঠ হিজরী সালে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু এর কোন কোন বাক্য যেমন, "আমি আপনার কাছে আমার পিতৃব্যপুত্র জা'ফরকে পাঠালাম..." ইত্যাদি, এই ধারণাকে জোরদার করে যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) স্বীয় পিতৃব্য পুত্র জা'ফরকে হাবশায় হিজরত করার সময় পরিচিতি পত্র হিসেবে (সম্ভবত হিজরতের ৮ বছর পূর্বে ৫ নবভী সালে) সেটা পাঠিয়েছিলেন। এর ভিত্তিতে বলা যায়, আমাদের সামনে যে বচন রয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে দু'টি পৃথক পৃথক পত্রেরই সংযুক্ত বচন। দ্বিতীয় পত্র নিঃসন্দেহে ৬ষ্ঠ হিজরী সালে পাঠানো হয়েছিল, যাতে নাজ্জাশীকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্যে আহ্বান করা হয়েছিল।

এবার ইতিহাসসমূহে লিখিত বচনের মধ্যে যে বিভিন্নতা রয়েছে তার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, শাব্দিক বর্ণনার মত অর্থগত বর্ণনার প্রচলনও আরবদের মধ্যে রয়েছে। ইতিহাসসমূহের বর্ণনা ও চামড়ার বর্ণনার মধ্যে যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, তা একটি অর্থকে বিভিন্ন প্রতিশব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করার নামান্তর। এতে মূল অর্থের মধ্যে কোন পরিবর্তন হয়নি।

মি. ডনলাপ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে গেছেন। যেমন:
১. বর্তমান পত্রের মোহরের সাথে পূর্বে প্রাপ্ত পত্রসমূহের পূর্ণ মিল রয়েছে।
২. চামড়ার এবারতের অক্ষর বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। ফাকবিলু এর স্থলে ফাকবালু (আলিফ ছাড়া) এবং ইত্তাবাআ (দুটি 'তা' দিয়ে) লেখা হয়েছে। এ ধরনের প্রাচীন লিপিরীতি রসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগেরই ইঙ্গিত বহন করে।
৩. পত্রের অক্ষরের মধ্যে নুকতা (বিন্দু) ও এ'রাব একেবারেই ছিল না। নূকতা ইত্যাদির প্রচলন শুরু হয় প্রথম হিজরী শতাব্দীতে।
৪. শব্দকে বিভক্ত করে অর্ধাংশে এক লাইনে এবং অবশিষ্টাংশ অন্য লাইনে লেখার পদ্ধতি (যেমন- রসুল...লি...) মদীনার প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতেও দেখা যায়।
৫. "ম" এবং "হ " লেখার পদ্ধতিও বেশ পুরাতন।
৬. যে স্থান হতে এবং যে অবস্থায় এ পত্রটি পাওয়া গেছে তাতেও বোঝা যায় যে এটা যাবতীয় সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে। হাবশী-ইতালী যুদ্ধে কোন পলায়নপর দরিদ্রের পক্ষে এটাকে কোন লোকের কাছে বিক্রি করা যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে হয়।

টিকাঃ
১. আরবী ভাষায় নাজ্জাশীর উচ্চারণ ৫ অক্ষরের তাশদীদ ছাড়া অর্থাৎ নাজাশী করা হয়। এই অনারব শব্দটি হাবশী ভাষার 'নগোস' (Nagos) শব্দ হতে উদ্ভূত। এর অর্থ শাসনকর্তা নয় বরং সম্রাট।
২. ২৩ দফা সম্বলিত একটি গঠনতন্ত্র তিনি সেখানে কার্যকর করেন। গ্রীক ভাষায় লিখিত উক্ত গঠনতন্ত্রটি আজও ভিয়েনার গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে।
৩. অধিকাংশ ঐতিহাসিক সেনাবাহিনীতে একটি মাত্র হাতীর কথা উল্লেখ করেছেন। কুরআন করীমে শব্দ দ্বারা একটি হাতীর কথাই বোঝানো হয়েছে।
৪. আরব ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, এ ঘটনার পরই আরবে সর্বপ্রথম বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এর আগে আরববাসীদের কাছে এ রোগটি অবিদিত ছিল। (তাবারী, পৃষ্ঠা ১৪৫)।
৫. ১৯৩৬ সালে লেখক এ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, যখন হাবশায় নাজ্জাশীর শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। - অনুবাদক

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রাবলীর দু'টি ভিত্তি

📄 রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্রাবলীর দু'টি ভিত্তি


রসূলূল্লাহ (সা) বিভিন্ন সম্রাট ও গোত্র প্রধানের নামে যেসব পত্র পাঠিয়েছিলেন (এ যাবত হিসাব করে দেখা গেছে।), সেগুলোর সংখ্যা বর্তমান সোয়া দুই শ'তে পৌঁছেছে। সর্বপ্রথম বিশটি পত্র সম্বলিত এর একটি সংকলন প্রকাশ করেন ইয়ামনের গভর্নর আমর ইবনে হাযম। কয়েক মাস পূর্বে এ বিষয়ের উপর একটি মূল্যবান প্রবন্ধ প্রকাশ করার সৌভাগ্য আমারও হয়েছিল। তবে, মূল পত্রগুলো ছিল বহুদিন থেকেই লুপ্তপ্রায়। সরকারী রেকর্ড অফিসে যেসব পত্র সংরক্ষিত ছিল হাজ্জাজ বিন ইউসুফের শাসনামলে করোটিকার দিনে জনসাধারণের হাতে সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এছাড়া প্রাপকদের অসতর্কতার দরুনও কিছু পত্র বিলুপ্ত হয়। এতদসত্ত্বেও বেশ কিছু পত্রের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে আজও ইতিহাসের পাতায় পাতায়। স্পেনের ঈসায়ী সম্রাটদের কাছে সংরক্ষিত পত্রটির অবস্থার চাক্ষুষ বিবরণী পরিলক্ষিত হয় ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত লেখকদের পুস্তকগুলোতে। জায়গীর দান সংক্রান্ত ব্যাপারে তামীম দারী (রা) যে একটি পত্র পেয়েছিলেন সেকথা ইমাম আবূ ইউসুফ (র)-এর মত প্রবীণ লেখকও বর্ণনা করেছেন।

আমরা এখন আলোকপাত করবো ঐ দুটি পত্রের উপর, যা সম্প্রতি পাওয়া গেছে এবং যার ফটো ও নিগেটিভও সংগ্রহ করার সুবর্ণ সুযোগ হয়েছে। পত্রদ্বয়ের একটি হলো, মিসরের প্রধান পাদ্রী মকোকিসের নামে। এ পত্রটির ফটো ভারতবর্ষে বহুদিন থেকেই সুপরিচিত ছিল। অপর পত্রটি হলো, বাহরাইনের মুসলিম শাসনকর্তা মুনযর বিন সাভার নামে। এর ফটোও ১৮৬৩ খ্রীস্টাব্দে Zdmg নামক জার্মান পুস্তিকায় ছাপা হয়েছে। এ দুটি মূল্যবান পত্রের উপর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ইউরোপে খুব কমই হয়েছে। উর্দু ভাষায় তো মোটেই হয়নি। সুতরাং আমরা এখন এ দুটি পত্রের উপর পৃথক পৃথক আলোচনা করবো।

প্রথম পত্র
প্রথম পত্রটি হলো মিসরের প্রধান পাদ্রী মকোকিসের নামে। রসূলুল্লাহ্ (সা) এ সময় প্রতিবেশী সাম্রাজ্যদ্বয়ের সম্রাটদের কাছে ইসলামের তাবলিগী দাওয়াত পৌঁছাতে মনস্থ করেন। মকোকিসের কাছে প্রেরিত পত্র সম্পর্কে ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ মোদিও রেয়না প্যারিসের ত্রৈমাসিক পত্রিকা 'আইয়াতিক বাবতা'এর ১৮৫৪ (ইং) সংখ্যায় (৪র্থ খণ্ড) একটি চিঠি প্রকাশ করেন। পত্রটি সনাক্ত করেন মৌসিও বার্তেলমী। তিনি আখেমীমের নিকটবর্তী একটি খ্রীস্টান দরবেশের আস্তানায় আরবী ভাষায় লিখিত একটি পুস্তকের মলাট থেকে পাতলা চামড়ায় লেখা এই পবিত্র পত্রটি উদ্ধার করেন।

রসূলুল্লাহ্ (সা) মকোকিসের নামে যে পত্রটি পাঠিয়েছিলেন, তার প্রাপ্ত পত্রের ফটো দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, এটা মূল পত্র। কেননা এতে মোহর রয়েছে। সুতরাং এটাকে কৃত্রিম মনে করার কোন সম্ভাবনা নেই। সুলতান আবদুল হামীদ খান (প্রথম) এটি একশ' স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে সংগ্রহ করেন এবং এটি ইস্তাম্বুলের রাজপ্রাসাদের ভাণ্ডারে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পবিত্র স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষিত হয়। ১৯০৪ খ্রীস্টাব্দে জুরযী যায়দান তাঁর আরবী মাসিক 'আল-হেলাল' (কায়রো) পত্রিকায় এর একটি নকলের ফটো প্রকাশ করেন।

জার্মানীর প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ড. বেকার এবং ইতালীয় ঐতিহাসিক কায়নাতী এই পত্রটিকে জাল বা ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করার চেষ্টা করেছেন। কায়নাতীর অভিযোগ ছিল— মকোকিস খ্রীস্টান পাদ্রী হয়ে অখ্রীস্টান নবীকে কেন দাসী উপহার দেবেন? এর উত্তরে বলা যায়, তৎকালীন ধর্মীয় দলাদলিতে মকোকিস আরবী নবীকে হয়তো খ্রীস্টানদের একটি নতুন সম্প্রদায়ের প্রবর্তক মনে করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে উপহার প্রদান বা বিয়ের সম্বন্ধ গড়ার রীতি প্রাচীনকালেই বিদ্যমান ছিল। মিসরের আরবী জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক মৌসিও ভাইট দাবি করেছেন যে পত্রটির ভাষা নাজ্জাশী ও রোম সম্রাটের পত্রের মতই। কিন্তু যেহেতু তিনটি পত্রই একই দিনে একই লক্ষ্য নিয়ে লেখা হয়েছিল এবং লেখকও সম্ভবত একই ব্যক্তি ছিলেন, তাই ভাষা এক হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মকোকিসের পত্রে মোহর সম্পর্কে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তার সাথে এ পত্রের পূর্ণ মিল রয়েছে (তিন লাইনে মুহাম্মদ, রসূল, আল্লাহ)। নলডেক নামক জনৈক গবেষকের ধারণা ছিল যে তৎকালীন সময়ে মাটির মোহর ব্যবহৃত হতো। তবে 'মাটির মোহর' সম্ভবত লেফাফার মুখে লাগানো হতো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কিন্তু মূল দলিলে কালির মোহরই বাঞ্ছনীয় ছিল যাতে তা স্থায়িত্ব পায়।

দ্বিতীয় পত্র
বাহরাইনের মুসলিম শাসনকর্তা মুনযর বিন সাভার নামে প্রেরিত পত্রটি হলো দ্বিতীয় পত্র। রসূলুল্লাহ্ (সা) ষষ্ঠ হিজরীতে মুনযরের নামে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র পাঠিয়েছিলেন। পত্র পেয়ে মুনযর ইসলাম গ্রহণ করলে রসূলুল্লাহ (সা) তাকে বাহরাইনের শাসনকর্তা পদে বহাল রেখে একটি ফিরতি নির্দেশনামা পাঠান। সম্প্রতি প্রাপ্ত এই পত্রটিই সেই নির্দেশনামা। ১৮৬৩ সালে Zdmg পত্রিকার সম্পাদক ফ্রেইসার এই পত্রটিকে জাল বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল— এই পত্রের বচন বা বিষয়বস্তু ইতিহাসে পাওয়া যায় না এবং লিপিরীতিতে অনেক ভুল রয়েছে। কিন্তু ইবনে তোলোন, আল কলশান্দী এবং ইবনুল কাইয়িমের মত প্রাচীন লেখকদের গ্রন্থে এই পত্রের বচন হুবহু সংরক্ষিত আছে। ফ্রেইসার যে লিপিগত অসামঞ্জস্যের কথা বলেছিলেন, তা প্রকৃতপক্ষে সেকালের লিখন পদ্ধতির অজ্ঞতাপ্রসূত। যেমন, 'আশহাদু'র 'শীন' এবং 'হে' লেখার বিশেষ প্রাচীন রীতি ফ্লেইসার বুঝতে পারেননি।

মুনযরের পত্র এবং মকোকিসের পত্রের মোহরের মধ্যে পূর্ণ সাদৃশ্য বিদ্যমান ছিল, যা উভয় পত্রের অকৃত্রিমতারই সাক্ষ্য বহন করে। ১৯১৭ সালে দামেশকে খাজা কামালুদ্দিন এটি স্বচক্ষে দেখেছিলেন।

তথ্যপঞ্জী
১. 'কিতাবুল খারাজ' (আবু ইউসুফ)। পৃষ্ঠা, ৩২। এছাড়া বালাযুরী ইয়াহইয়া বিন আদম ও মাওয়ারদী।
২. আল ওসায়িকুস্ সিয়াসিয়াহ ফিল আহাদিন নবভী ওয়াল খিলাফতের রাশিদাহ, ছাপা মিসর।
৩. এই ফটো এবং আয়ইয়াতিক পত্রিকায় প্রকাশিত পত্র-যা মকোসিসের নামে লেখা হয়েছিল তারও ফটো জার্মানীর বন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যবিষয়ক বিভাগের প্রধান ড. পাওয়াল কালে মেহেরবানীপূর্বক আমাকে দিয়েছিলেন।
৪. 'ইলামুস সাইলীন আন কুতুবে সাইয়ীদিল মুরসালিন', প্রণেতা ইবনে তোলোন; 'যাদুল মা'আদ', প্রণেতা ইবনে কাইয়িম; 'সুবহুল আ'শা', প্রণেতা আল কলশান্দী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px