📄 নবুওতের প্রচার কার্য
মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা যদি সচ্ছল না হয় এবং পেটের তাড়নায় যদি তাকে দিগ্বিদিক ছুটতে হয় তাহলে অন্য কাজ—বিশেষ করে ‘চিন্তার জগতে’ প্রবেশ করার মত কোন সুযোগ বা অবকাশ তার থাকে না। কেননা অন্যান্য চিন্তার চাইতে রুজী-রোজগারের চিন্তাই তার কাছে তখন বড় হয়ে দেখা দেয়। নবুওত যুগের কয়েক বছর পূর্ব থেকেই মক্কাবাসীরা আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে দিয়েছিল এবং এক্ষেত্রে বিরাট সাফল্যও অর্জন করেছিল। প্রথম নবভী সালে এ ধরনের যথেষ্ট লোক ছিল, যারা মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিয়েছিল। এই পরিবেশই নবুওতে মুহাম্মদীর অভ্যুদয় হয় এবং সে অনুযায়ী তা যথাযথ ভূমিকাও পালন করে।
ঐতিহাসিকরা একদিকে বলেছেন প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর তিন বছর পর্যন্ত আর ওহী নাযিল হয়নি, অপরদিকে বলেছেন, প্রথম তিন বছর পর্যন্ত গোপনে গোপনে প্রচার কার্য চলেছিল। তাদের এই দুই বর্ণনার মধ্যে অবশ্যই একটা সামঞ্জস্য থাকা চাই। ওহী নাযিল হওয়ার পর রসূলুল্লাহ্ (সা) নিশ্চয়ই তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করেছিলেন। তাঁর মত নিষ্কলুষ ও পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘ঈমান আনলাম’ বলাটা তাদের পক্ষেও অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এরই ঘরে লালিত পালিত অপ্রাপ্ত বয়স্ক তাঁর পিতৃব্যপুত্র আলী (রা), তাঁর স্নেহভাজন ক্রীতদাস যায়েদ বিন হারিসা (রা) ও তাঁর পিয়তমা পত্নী বিবি খাদীজা (রা) প্রমুখ তো তাঁর আহ্বানের সাথে সাথেই ঈমান এনেছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হযরত আবূ বকর (রা)-এর সাথেও নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে আলাপ করেছিলেন এবং তিনিও খুব সম্ভব তাঁর কথায় আস্থাশীল হয়ে সঙ্গেই সঙ্গেই ঈমান এনেছিলেন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাথমিক যুগের এসব নও-মুসলিম সম্মিলিতভাবে আল্লাহর দীনের প্রচারাভিযান এত জোরেসোরে চালিয়েছিলেন, যার তুলনা অন্যান্য ধর্মে বিরল। মহিলাদের কর্ম প্রচেষ্টা সম্পর্কে আমরা অন্যত্র আলোচনা করবো। পুরুষদের মধ্যে এক্ষেত্রে হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রচেষ্টা বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হয়েছিল। তাঁরই অনবরত প্রচার ও অনুপ্রেরণা দানের ফলে তাঁর বন্ধুদের মধ্যে যুবাইর বিন আল-আওয়াম, আবদুর রহমান বিন আউফ, সা'দ বিন আবি ওক্কাস, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ এবং এক বর্ণনামতে 'উসমান বিন আফফান যেমন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন, অন্যদিকে তেমনি বিলাল, আমির বিন ফাহিরা, উম্মে আবীস, যানীরা ও লাবীনা সহ কয়েকজন পুরুষ ও মহিলাকে তিনি ক্রয় করে আযাদ করে দিয়েছিলেন। কেননা ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এঁদের মনিবরা তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছিল। এসব ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীদের মধ্যে কিভাবে ও কার প্রচেষ্টায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। যাহোক হযরত আবূ বকরের জান মাল ছিল ইসলামের জন্য উৎসর্গীকৃত। তিনি মুসলমান ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীদেরকে কাফিরদের নির্যাতন থেকে মুক্তি দিতে বিশেষভাবে আনন্দ পেতেন।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রচার কার্যের বিষয়বস্তু কি ছিল। তখনকার সময়ে নাযিলকৃত আয়াত ও সূরাসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় যে, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস স্থাপন, শিরক থেকে দূরে থাকা, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, শেষ বিচার এবং সে অনুযায়ী পুরস্কার বা শাস্তি হিসাবে যথাক্রমে বেহেস্ত বা দোযখ লাভ ইত্যাদি ছিল প্রচার কার্যের বিষয়বস্তু। প্রতিমা পূজার অপকারিতা, ফেরেস্তাদের অস্তিত্ব, ফেরেস্তাদের মাধ্যমে নবীদের কাছে আল্লাহর ওহী প্রেরণ, মানুষের হিদায়েতের কাজে ফেরেশতাদের নিয়োগ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কেও তখন আলোচনা করা হতো। উত্তম চরিত্র গঠন এবং দান-দক্ষিণার জন্যতেও তখন উৎসাহ প্রদান করা হত।
প্রচার কার্যের ধারা এই ছিল যে, যখনই রসূলুল্লাহ্ (সা) কোন বন্ধু-বান্ধব কিংবা সত্যানুসন্ধানী লোকের সাক্ষাত পেতেন তখনই মধুর সুরে কুরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে তাঁকে শোনাতেন এবং শ্রোতার যোগ্যতা অনুসারে এসব আয়াতের ব্যাখ্যা করে তার কাছে ইসলামী মূলনীতির বিবরণ পেশ করতেন। তিনি একদিকে মহান স্রষ্টার অপরিসীম করুণা এবং অন্যদিকে তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার বর্ণনা দিয়ে মানুষকে পরকালের হিসাব-নিকাশের ভয় দেখাতেন। তিনি দেশে প্রচলিত মনগড়া ধর্মীয় বিধি বিধানের সমালোচনা করে বলতেন,—মানুষের হাতে গড়া প্রতিমা যারা কথা বলতে জানে না, কোন কিছু শুনতে পায় না, নড়চড়া করতে পারে না, এমন কি নিজেদেরও নিরাপত্তা বিধান করতে পারে না, তারা কিভাবে মহান আল্লাহর সমীপে অপরের মুক্তির জন্যে সুপারিশ করতে পারে? এককথায় বলতে গেলে, তখন সংক্ষিপ্তভাবে আল্লাহ্ ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, পরকাল, আল্লাহই ভাগ্যের ভাল-মন্দ নির্ধারণ করেন, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান—এই বিষয়গুলির উপর বিশ্বাস স্থাপনের শিক্ষা দেওয়া হত।
কুরআনের ভাব ও ভাষার মধ্যে এমনি একটি আকর্ষণ ছিল যে, তা শুনে ভাষার জাদুকর আরবদের মাথা হেঁট হয়ে যেত। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইসলামের চরম শত্রুরাও রজনীর অন্ধকারে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাসগৃহের পাশে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে কুরআন তিলাওয়াত শুনত এবং তা শুনে মোহিত হত। এ সময় অন্য কেউ যাতে তাদের দেখতে না পায় সেজন্য তারা সতর্ক থাকত এবং বারবার রাস্তার দিকে চোখ তুলে তাকাত। কখন কিভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা) জনসমাবেশে নবুওতের প্রচার কার্য চালাতেন তার বিস্তারিত বর্ণনা তাবারীর ইতিহাসে আছে।
তখনো পাঞ্জেগানা (দৈনিক পাঁচবার) নামায ফরয হয় নি, কিন্তু প্রথম থেকেই দিনে দু'বার, খুব সম্ভব চাশ্ত (দিনের প্রথম প্রহর) ও ইশার (রাতের প্রথম ভাগ) সময় অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করা হত। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, সকাল বেলা চাশতের সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) কা'বাগৃহের সামনে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করতেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন পৌত্তলিকতার কঠোর সমালোচনা করতে লাগলেন, তখন কুরায়শরা তাঁকে বাধা দিল এবং তাঁর উপর নির্যাতন শুরু করল। ঐতিহাসিকদের মতে ঐ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) নগরের বাইরে চলে যেতেন এবং সেখানেই নামায আদায় করে আসতেন।
আল-আরকম নামীয় সাহাবীর বাড়ীতে রসূলুল্লাহ্ (সা) কখন এবং কিভাবে গিয়ে হাযির হতেন, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। রসূলুল্লাহর বাড়ি সম্ভবত কেন্দ্রস্থল থেকে কিছু দূরে ছিল। পক্ষান্তরে আল আরকমের বাড়ি ছিল কা'বার একেবারে সন্নিকটে—সাফা পাহাড়ের উপরে, আর বাড়িটাও ছিল বেশ প্রশস্ত (এই বাড়িটি এখনও বিদ্যমান আছে)। তুর্কী শাসনামলে এর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সউদী শাসনামলেও যথারীতি সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং পার্শ্ববর্তী কয়েকটি বাড়ি উচ্ছেদ করে এ বস্তি পর্যন্ত পৌঁছার রাস্তাটি বেশ চওড়া করা হয়েছে।) এই পবিত্র বাড়িতেই প্রচার বৈঠক বসত এবং সম্ভবত এখানেই জামা'আতের সাথে নামায আদায় করা হত। এখান থেকে কা'বা গৃহও পরিষ্কার নযরে পড়ে।
হযরত আবূ বকর (রা)-এর ঘরের আঙ্গিনায় একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল এবং সেখানে কুরআন পাঠের মাহফিল বসত বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। এই কুরআন পাঠ শোনার জন্য সেখানে সব শ্রেণীর লোক এমনকি দাস-দাসীরাও এসে জড়ো হত এবং অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে কুরআনের অমিয় বাণী শ্রবণ করত।
তিন বছর পর্যন্ত অতি সংগোপনে কাজ করার পর প্রকাশ্য প্রচারাভিযানের সূচনা করা হয়। 'ইসাবায়ে ইবনে হজর' ইত্যাদি গ্রন্থে উল্লেখ আছে, খানায়ে কা'বায় প্রথমবারের মত যখন প্রকাশ্যে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করা হয় তখনও কুরায়শরা তাদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের উপাসনা শুরু করে দেয়। ফলে এক বিরাট সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং কুরায়শদের বাড়াবাড়িতে হারিস বিন আবূ হালা নামীয় জনৈক মুসলমান (তিনি সম্ভবত বিবি খাদীজা (রা)-এর প্রথম স্বামীর অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান ছিলেন) শাহাদত লাভ করেন। এ ঘটনার পর থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত খানায়ে কা'বায় মুসলমানদের সালাত আদায় বন্ধ থাকে।
ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, হযরত উসমান, হযরত যুবায়র, হযরত সাঈদ বিন যায়িদ ও হযরত আবুযর (রা) প্রমুখ যুবক ইসলাম গ্রহণ করলে পর তাঁদের অভিভাবকরা তাদের উপর নানা ধরনের জুলুম অত্যাচার চালায়। খুব সম্ভব ঐ সময়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে তাঁর গোত্রনেতা ও পিতৃব্য আবু তালিবের কাছে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। একবার একদল লোক এসে আবু তালিবকে শেষ কথা শুনিয়ে দিয়ে গেল, "আপনি হয় আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের দেবতাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে বারণ করুন নয়তো তার পৃষ্ঠপোষকতা পরিত্যাগ করুন।” তখন আবু তালিব রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ভালভাবে বুঝান কিন্তু তিনি উত্তরে বলেন, "এরা যদি আমার এক হাতে চাঁদ এবং অন্য হাতে সূর্য এনে দেয় তবু আমি আমার এই কর্তব্য কাজ থেকে বিরত থাকব না। যদি আপনিও আমার পৃষ্ঠপোষকতা ছেড়ে দেন তবু আমি পরোয়া করব না। যে মহান আল্লাহর নির্দেশে আমি এ কাজ করছি, তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট।” একদা কুরায়শ বংশের উতবা নামীয় ধীর গম্ভীর মেজাজের জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে নির্জনে অনেক কথাবার্তা বলেন। তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করেন, "আপনার এই প্রচারের উদ্দেশ্য কি?' ধন-সম্পদ চান? সুন্দরী রমণী চান? সমগ্র নগরের নেতৃত্ব চান?-আমরা আপনাকে সবকিছু দিতে রাযী আছি। তবে আপনি আমাদের দেবদেবীর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকুন এবং যারা এদের উপাসনা করে (আমাদের পূর্বপুরুষগণও এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত) তাদের জাহান্নামী হওয়ার ঘোষণা বন্ধ করুন।" উত্তরে রসূলুল্লাহ (সা) কুরআনের ঐ আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করতে লাগলেন, যাতে আল্লাহর আযাবকে ভয় করতে বলা হয়েছে। তিলাওয়াত শুনে উতবা এত প্রভাবান্বিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল যে, তার মনে হতে লাগল, এখনই বুঝি আল্লাহর আযাব নাযিল হবে। অবিলম্বে কুরআন তিলাওয়াত বন্ধ করার জন্য সে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কসম দিতে লাগল এবং অন্য কোন কথা না বলে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়ল।
নবুওতের ছয় বছর কেটে গেল। ইসলাম ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করল। যারা একবার ইসলাম গ্রহণ করল, শত প্রলোভন, প্ররোচনা, এমন কি অমানুষিক নির্যাতন তাদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে পারল না। এতে কুরায়শের মুশরিক নেতাদের ক্রোধ ক্রমশ বাড়তে লাগল। এই কঠিন মুহূর্তেও রসূলুল্লাহ্ (সা) ধৈর্যচ্যুত হলেন না বরং তিনি যথারীতি তাঁর পরম শত্রুদের সেবাযত্ন করে গেলেন। তাঁর এই উদার ব্যবহারের অপ্রত্যাশিত ফলও পাওয়া গেল। একদা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিতৃব্য হামযা শিকার থেকে প্রত্যাবর্তন কালে সংবাদ পেলেন, আবু জেহেল রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছে, এমন কি তাঁকে দৈহিক নির্যাতনও করেছে। হামযা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নি, কিন্তু এই ঘটনার খবর পাওয়া মাত্র তিনি সোজাসুজি হরমে চলে যান এবং সেখানে গিয়ে আবূ জেহেলকে দেখামাত্র হাতের ধনুক তার দিকে তাক করে বলেন, "এখনই আমি ইসলাম গ্রহণ করছি। যদি কারো সাহস থাকে তো আমার মুকাবিলা কর।”
রুকানা নামক পাহলোয়ানের ইসলাম গ্রহণের সঠিক সময় জানা যায় নি। তবে এটুকু জানা গেছে যে, সে নবুওতের সত্যতা প্রমাণের জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাঁর সাথে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল, "যদি আমি হেরে যাই তাহলে বিরাট মেষপালের এক-তৃতীয়াংশ আপনাকে দিয়ে দেব।” রসূলুল্লাহ্ মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং রুকানাকে একবার নয় বরং তিন তিনবার হারিয়ে দিয়ে তার সমস্ত মেষপালের অধিকারী হন। এতে রুকানা কান্নাকাটি শুরু করে দিলে রসূলুল্লাহ্ (সা) তার মেষপালটি ফেরত দিয়ে দেন। রসূলুল্লাহর এই ব্যবহারে সে যারপর নাই মুগ্ধ হয় এবং একাগ্রচিত্তে ইসলাম গ্রহণ করে (শরহে সীয়ার কবীর)। রুকানা এমন জবরদস্ত পাহলোয়ান ছিল যে, মাটিতে বিছানো একটি চামড়ার উপর সে যখন সোজা হয়ে দাঁড়াত তখন লোকেরা টেনে বের করার চেষ্টা করলে বাইরের অংশটি ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যেত কিন্তু তার পায়ের নীচের অংশটি যেমনটি ছিল তেমনটিই থাকত।
হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার জন্য কুরায়শ গোত্রের কেউ এগিয়ে না আসায় উমরের আত্মমর্যাদা ও বীরত্বে আঘাত লাগে। এ কাজটি করতে হলে পুরস্কার লাভেরও আশা আছে। যাহোক উমর রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। পথিমধ্যে এক আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়। আত্মীয় উমরকে সম্বোর্ডন করে বলেন, "রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার পূর্বে তোমার নিজের ঘরের খবর নাও। তোমার সহোদরা ভগ্নি এবং ভগ্নিপতিও তো ইসলাম গ্রহণ করেছে।” একথা শুনে উমর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সোজাসুজি বোনের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেন এবং ভগ্নি ও ভগ্নিপতিকে প্রহার করতে থাকেন। তখন প্রহৃত বোন বলে উঠেন, 'হাঁ, আমরা মুসলমান হয়েছি, তোমার যা খুশি, তা করতে পার।' ঐ আওয়াজের কী জাদুকরী প্রভাব ছিল জানি না, তবে উমর তাতে শিউরে উঠেন এবং তাঁর হৃদয়ানুভূতি যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তিনি ভাবতে থাকেন, কী অহেতুক কাজেই না তিনি এবং তাঁর সম্প্রদায় লিপ্ত রয়েছেন! আল্লাহ্ নিঃসন্দেহে এক ও অদ্বিতীয়, আর এসব মূর্তি বেকার ও নিষ্কর্মা। এসব নিষ্কর্মাদের আরাধনা অসার ও ভিত্তিহীন। উমর ক্রমশ নরম হয়ে যান এবং বোনকে কুরআনের ঐ আয়াতটি দেখাতে বলেন, যা তিনি কিছুক্ষণ আগে পড়ছিলেন। বোন বললেন, 'তুমি অপবিত্র এবং অপবিত্র অবস্থায় কুরআন স্পর্শ করতে নেই। তুমি আগে গোসল করে এস, তারপর তিলাওয়াতের অনুমতি পাবে।' পাষাণ উমর তখন যেন গলিত মোমে পরিণত হন। তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে দেখা করার জন্যও ব্যাকুল হয়ে উঠেন। মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে উমর ইসলামের প্রসারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি আল-আরকমের বাড়িতে অবস্থানরত সকল মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) সবাইকে নিয়ে সেখানে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করেন। কোন কুরায়শই তাতে বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি। তবে এ ঘটনা তাদের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কুরায়শরা এবার মুসলমানদের সাথে সামাজিক বয়কটে নামে। এ বয়কটের দরুন রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরিবারকে দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত ভীষণ বিপদের মধ্যে কাটাতে হয়।
নবুওতের দশম বছর। তখন বয়কটের অবসান হয়েছে সত্যি, কিন্তু মুসলমানদের দুঃখের অবসান হয় নি। আর ঐ দুঃখজনক পরিস্থিতিতেই রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে শোক সাগরে ভাসিয়ে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন তাঁর সহধর্মিণী খাদীজা (রা) ও পিতৃব্য আবূ তালিব। আবূ তালিবের পর গোত্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন আবু লাহাব; কিন্তু নবুওত প্রাপ্তির সেই সূচনা থেকেই আবু লাহাবের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কোন বনিবনা ছিল না। এমনকি তিনি (আবূ লাহাব) রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোত্রচ্যুতির কথাও ঘোষণা করেছিলেন। সুতরাং বাধ্য হয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য পা বাড়াতে হল তায়েফের দিকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইসলাম প্রচারের সামান্য প্রচেষ্টা চালাতেই তিনি ভীষণভাবে প্রহৃত হয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হন। নিজ গোত্রের সাথে সুসম্পর্ক না থাকায় কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় তিনি মক্কায় প্রবেশাধিকার লাভ করেন। তবে বাহ্যত এই শর্ত ছিল যে, তিনি মক্কায় কোন প্রকার প্রচারধর্মী বক্তব্য রাখতে পারবেন না।
আরবের লোকেরা প্রতি বছরই মক্কায় হজ্জ করতে আসত এবং সে উপলক্ষে সেখানে বিরাট মেলা বসত। ঐ সব মেলায় যোগদানের ব্যাপারে কোনরূপ বাধানিষেধ ছিল না। তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) উকায, যুল মাজায, মুজনাহ্ প্রভৃতি মেলায় নিয়মিত যোগদান করতেন। তিনি সর্বপ্রথম নগরীর বাইরে মিনা প্রান্তরে কতিপয় গোত্রের লোকদের সাথে তাদের তাঁবুতেই সাক্ষাত করেন। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি ঐভাবে পনরটি গোত্রের সাথে পর্যায়ক্রমে সাক্ষাত করেন। তিনি তাদের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানান, "আপনারা আমায় সহযোগিতা করুন, আমাকে আপনাদের দেশে নিয়ে যান এবং আমায় প্রচারকার্যে সাহায্য করুন, এতে শুধু আপনাদের পরকালেরই নয় বরং ইহকালেরও প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে এবং আপনারা অতিসত্বর রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের অধিকারী হতে পারবেন। সাফল্য আপনাদের অনিবার্য। আবু লাহাব কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাঁর প্রায় প্রত্যেকটি সমাবেশে ও বক্তৃতায় ছায়ার মত অনুসরণ করে তাঁর শ্রোতাদের উদ্দেশ্য করে বলতে থাকলো, "সাবধান! আপনারা এ পাগলের কথায় কান দেবেন না, অন্যথায় আপনারা সমগ্র কুরায়শদের কোপানলে পড়বেন।” একদা রসূলুল্লাহ্ (সা) মিনা থেকে মক্কার দিকে ফিরে আসছেন। এমন সময় আকাবা উপত্যকায় মদীনার কয়েকজন হাজীকে দেখতে পেলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মনস্থ করলেন, ওদের কাছেও নবুওতের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাতুলালয় ছিল মদীনায়। মদীনাবাসীদের সাথে তাঁর ছিল মামা-ভাগ্নে সম্পর্ক; আর য়াহূদীদের সাথে সহ-অবস্থানের ফলে নবী, পরকাল, পুনরুত্থান ইত্যাদি সম্পর্কে মদীনাবাসীরা ছিল স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী।
তখনকার আহলে কিতাবীরা বিশ্বাস করত যে, সমগ্র বিশ্বের শান্তিদাতা রূপে অচিরেই একজন নবীর আবির্ভাব হবে, আর সেই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে য়াহূদীরা মদীনাবাসীদের বলত, "যখন ঐ প্রতিশ্রুত নবী আবির্ভূত হবেন তখন আমরা তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয়ে আমাদের শত্রুদের শায়েস্তা করবো।" যাহোক উপরোক্ত কারণে মদীনাবাসীরা শেষ নবী সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী ছিল এবং উক্ত নবী ইতিমধ্যে আবির্ভূত হয়েছেন বলেও তারা সংবাদ পেয়েছিল। আর এটা তাদের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, নিজেরা উক্ত নবীর খিদমতে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি নিজেই এসে তাদের কাছে উপস্থিত হয়েছেন। অতএব কোনরূপ ইতস্তত না করে আকাবায় অবস্থানকারী মদীনার হাজীরা তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করল এবং নিজেদের মাতৃভূমি মদীনায় ফিরে গিয়ে এর প্রচারে মনোনিবেশ করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিল।
এদেরই প্রচেষ্টায় এক বছরে মদীনায় যে দশ বারজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল, পরবর্তী হজ্জ মওসুমে তারা আকাবায় উপস্থিত হয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করে এবং নিজেদের ও নিজেদের গোত্রসমূহের পক্ষ থেকে এই বলে আনুগত্য প্রকাশ করে যে, তারা এক আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না; ব্যভিচার, চুরি ও কন্যা সন্তানদের হত্যা থেকে বিরত থাকবে, জেনে শুনে কারো বিরুদ্ধে অপবাদ রটাবে না এবং কখনো রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করবে না। এই প্রতিনিধিদল তাদের সাথে একজন শিক্ষক পাঠাবার জন্যও রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অনুরোধ জানায় এবং সে অনুযায়ী হযরত উমাইরকে মদীনায় পাঠনো হয়। হযরত উমাইর (রা) মদীনায় গিয়ে ইসলামের পক্ষে জোর প্রচার কার্য চালান এবং মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেন। এই পুণ্যবান ব্যক্তি সেখানে কিভাবে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদন করেছিলেন এবং সেখানকার বিরুদ্ধ মতাবলম্বী নেতাদেরকে কিভাবে নিজের বশে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন তারীখে তাবারীতে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মদীনার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত উমর (রা)-এর মতই একজন তেজস্বী ও সাহসী নেতা ছিলেন। কুরআনের কয়েকটি আয়াত শোনামাত্র তিনিও ইসলামের প্রতি এতই অভিভূত হয়ে পড়েন যে, মহল্লায় গিয়ে আপন অনুসারীদের প্রতি প্রকাশ্য ঘোষণা দেন, "তোমরা যদি আমার কাছ থেকে সদ্ব্যবহার পেতে চাও, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নাও, অন্যথায় আমিও হব তোমাদের সবচাইতে ঘোর শত্রু।” তাঁর ঐ ঘোষণার ফলে সেদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই গোত্রের সব লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়।
আর একটি বছর অতিবাহিত হল। ইতিমধ্যে হযরত উমাইরের হাতে যাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন তাঁদের একটি বিরাট দল হজ্জ উপলক্ষে মিনায় আসেন এবং আকাবা উপত্যকায় তাঁদের প্রিয় নেতা রসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করেন। তারা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে মদীনা গমনের অনুরোধ জানান এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাঁরা সেখানে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর মক্কার সাথীদের যথাযোগ্য মেহমানদারী করবেন এবং এমনভাবে তাঁদের নিরাপত্তা বিধান করবেন, যেমন তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা বিধান করে থাকেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) তখন বললেন, "তোমাদের যুদ্ধ আমাদেরই যুদ্ধ এবং তোমাদের সন্ধি আমাদেরই সন্ধি। আমি এখন তোমাদেরই হয়ে গেলাম।"
এটা ছিল বিশ্বের স্মরণকালের ইতিহাসে এমন একটি বাস্তব সামাজিক চুক্তি, যার মাধ্যমে কিছু লোক এক ব্যক্তিকে তাদের নেতা মনোনীত করে এবং চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অধিকার এবং দায়িত্বও নির্ধারণ করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনার পর থেকেই হিজরতের কার্যকরী পদক্ষেপ শুরু হয়।
হিজরতের পর, ক্ষমতার প্রসার ও সরকার গঠনকালীন যুগেও ইসলাম প্রচারের কাজ ছিল মুখ্য। এজন্য দিকে দিকে শিক্ষক ও মুবাল্লিগ পাঠানো হত। আর সরকারী সংস্থাগুলো এদের পৃষ্ঠপোষকতা ও নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করত। তবে অমুসলিম নাগরিকদের সাথেও সম্পূর্ণ ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক ব্যবহার করা হত। অবশ্য তারা অনুভব করত যে, তারা একটি জাতীয় ও ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্রে নয় বরং এমন একটি রাষ্ট্রে বাস করছে, যার রয়েছে একটি বিশেষ জীবন-দর্শন। মুসলমান কৃষকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ভূমি রাজস্ব আদায় করা হত, তাদের কাছ থেকে আদায় করা হত তার চাইতে অনেক কম। মুসলমান বণিকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ আয়কর আদায় করা হত তাদের কাছ থেকে আদায় করা হত তার অর্ধাংশ মাত্র। জিহাদ ছিল মুসলমানদের জন্য ফরয বা অবশ্য কর্তব্য; পক্ষান্তরে অমুসলিমদের উপর এ ব্যাপারে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। তারা কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার এবং রাষ্ট্রীয় তহবিলে জিযিয়া কর জমা দিয়ে স্ব স্ব গৃহে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারত। একজন অমুসলিম সহজেই ইসলামী প্রধান বা শাসক হতে পারত না, ততক্ষণ না সে রাষ্ট্রের 'জীবনদর্শন'কে নিজের জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করত এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি ক্ষেত্রে এই জীবনদর্শনের জন্যই নিজের জান, মাল ও সর্বশক্তি নিয়োগ করত।
ইসলামের জীবন-দর্শন সহজ বিষয় নয়। অন্যকে সৎ কাজের আদেশ দেবে অথচ নিজে তা করবে না-সে সুযোগ ইসলামে নেই। স্বয়ং রসূলুল্লাহ্ (সা) অন্যকে যে কাজের আদেশ দিতেন, নিজে তার চেয়ে অধিক পরিমাণে সে কাজ করতেন।
📄 ইসলাম প্রচারে মহিলাদের অবদান
হযরত মুহাম্মদ (সা) যৌবনে অন্যের ব্যবসা পরিচালনা করে কিংবা ব্যবসা- প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে নিজের বৈধ ও হালাল জীবিকা অর্জন করতেন। অসহায় ও অক্ষমদের সাহায্যার্থেও তিনি সদা-সচেষ্ট থাকতেন। হিজরী-পূর্ব ১৩ সালে চল্লিশ বছর বয়সে নবুওয়ত প্রচারের জন্য যখন আদিষ্ট হন, তখন থেকে পূর্ণ সময়টাই তিনি প্রচার ও সংস্কারমূলক কাজে ব্যয় করেন। এ দায়িত্ব পালনে তিনি রাত দিন নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। এ জগতটাই আসলে কাজের জগত। এখানে নবী-রসূলদের পবিত্র কাজেও 'কুন্ ফা-ইয়াকুন' অর্থাৎ বললাম, 'হও এবং হয়ে গেল' ভিত্তিতে সম্পন্ন হয় না। কাজে কাজেই পৃথিবীর প্রত্যেকটি নতুন সংস্কার আন্দোলনের ন্যায় ইসলাম প্রচার আন্দোলনের জন্যেও প্রয়োজন ছিল অগণিত মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা তথা ত্যাগ-তিতিক্ষার। এ ব্যাপারে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিম মহিলারাও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। আমাদের ঐতিহাসিকরা এ ব্যাপারে যেসব তথ্য রেখে গেছেন, তা নিতান্তই অপ্রতুল। তবু বিষয়টি যেহেতু শিক্ষণীয়, তাই আমরা প্রাপ্ত তথ্যাদির উপরই এ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করছি।
খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ
এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম মুসলিম জননী খাদীজাতুল কুবরা (রা) সম্পর্কে আলোচনা করতে হয়। কেননা তিনি শুধুমাত্র বিশ্বনবীর সম্মানিতা জীবন সঙ্গিনীই ছিলেন না, নবুওতের প্রাথমিক যুগে অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রেও রেখেছিলেন এক বিরাট অবদান। আমীর-উমারা ও বন্ধু-বান্ধবদের ভূরিভোজের মাধ্যমে নয়, বরং দরিদ্রের সাহায্য ও অক্ষমদের সেবার মাধ্যমেই প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা লাভ করা যায়। প্রাক-নবুওয়ত যুগে বিবি খাদীজা (রা) তাঁর সমস্ত সম্পত্তি য়াতিম, বিধবা ও অনাথদের সেবায় আপন স্বামীর জন্য ওয়াকফ্ করে দিয়েছিলেন। কাজে কাজেই তা ব্যয়িত হয়েছিল ইয়াতিম, বিধবা ও অনাথদের সেবায়। এভাবে বিবি খাদীজা (রা) আমীর-ফকীর- সবার কাছেই আপন স্বামীকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর এ মর্যাদা দীনের প্রচার কার্যে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিভিন্নমুখী সমস্যার কারণে যখন রসূলে করীম (সা) পরিশ্রান্ত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন তখন তাঁর খাদীজা (রা)-এর মত একজন সান্ত্বনাদানকারিণী রমণীর সাহচর্যের খুবই প্রয়োজন ছিল। মানবসুলভ দুর্বলতার কারণে রসূলুল্লাহ্ (সা) ঘাবড়ে গেলে বিবি খাদীজা (রা) তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন এবং ইসলামের মহান আন্দোলন পরিচালনার উপর তাঁকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতেন। ইতিহাসে এ জাতীয় বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইসলামের আবির্ভাবের সংবাদ বিবি খাদীজা (রা) কর্তৃক তাঁর পিতৃব্যপুত্র ওরাকা বিন নওফেলের কাছে পৌঁছানো ও আপন স্বামীকে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা তো সর্বজনবিদিত। কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায়, বিবি খাদীজা মক্কার জনৈক খ্রীস্টানের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়েছিলেন (সীরাতে কেরামত আলী)। নিজে ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে পরিবারের সকল দাসদাসীকে ইসলামে বায়আত করানো বিবি খাদীজার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁর ইসলাম গ্রহণ তাঁর গোত্রের উপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছিল। কুরায়শদের অমানবিক সামাজিক বয়কটের সময় বিবি খাদীজাও মুসলমানদের সাথে 'আবু তালিব উপত্যকায়' বন্দী ছিলেন। তাই সেই সংকটময় অবস্থায়ও কুরায়শদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে তাঁকে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হাকীম বিন হাজাম মাঝে মাঝে কিছু না কিছু খাদ্যদ্রব্য পাঠাত। এতে প্রমাণিত হয় যে, তাঁর গোত্রের লোকেরা পুরোপুরি ইসলাম গ্রহণ না করলেও হযরত খাদীজা (রা)-এর কারণে মুসলমানদের বিরোধিতা না করে বরং সময় ও সুযোগমত কিছুটা সহযোগিতাই করেছে।
বিবি গুযাইয়াহ্ (রা)
মুহাম্মদ বিন হাবীব আল-বাগদাদী (মৃত্যু ২৪৫ হি.) স্বীয় গ্রন্থ "আল-মুহাব্বর'- এ উল্লেখ করেছেন, বিবি গুযাইয়াহ্ (রা) মুসলমান হওয়ার পর প্রচারকার্য চালিয়ে মক্কার অনেক মহিলাকে ইসলামে বায়আত করেন। এতে কুরায়শরা দারুণভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। যেহেতু গুযাইয়াহ (রা) কুরায়শী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন মরুচারিণী বেদুঈন; তাই কুরায়শরা তাঁকে শহর থেকে বের করে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করে। তারা তাঁকে একটি কাফেলার হাতে সোপর্দ করে যাতে ঐ কাফেলা হাত পা বাঁধা অবস্থায়ই তাঁকে তাঁর গোত্রের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। বিবি গুযাইয়াহ্ বর্ণনা করেছেন, 'এই লোকেরা একবারও আমাকে পানাহারের সুযোগ দেয় নি, বরং যখনই তারা কোন মনযিলে অবতরণ করত, তখন আমাকে হাত পা বাঁধা অবস্থায়ই রোদের মধ্যে ফেলে রাখত। এভাবে তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠে এবং আমি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি। এক রাতে আমি ঐ অবস্থায়ই আছি-এমন একটি অদৃশ্য বস্তু এসে আমার মুখে লাগে; আমি তা থেকে কিছু পানি চুষে খেয়ে চেতনা লাভ করি। তারপর পেট পুরেই পানি পান করি। সকালে উঠে লোকেরা আমার এই পরিবর্তিত উন্নত অবস্থা দেখে সন্দেহ করলো, নিশ্চয়ই আমি বাঁধনমুক্ত হয়ে চুরি করে কাফেলার পানি পান করেছি। কিন্তু যখন লক্ষ্য করলো যে, আমার দড়ি যেমনটি ছিল ঠিক তেমনটিই রয়েছে এবং তাদের মশকসমূহের মুখও যেভাবে বাঁধা ছিল অবিকল সেভাবেই বাঁধা রয়েছে তখন তারা বুঝতে পারলো যে, এটা আমার প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার অসীম করুণা ও অদৃশ্য সাহায্য ছাড়া কিছু নয়। এই ঘটনা দ্বারা কাফেলার লোকেরা যারপর নাই প্রভাবান্বিত হল এবং সকলে একসাথে তওবা করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিল। আল্লাহর রসূলের প্রতি বিবি গুযাইয়াহর বিশ্বাস এতই প্রগাঢ় ছিল যে, "এবং কোন বিশ্বাসী নারী নবীর নিকট নিজেকে নিবেদন করলে"-এই আয়াতটি তাঁরই সম্পর্কে নাযিল হয়।
উম্মে শরীফ দাওসিয়াহ (রা)
উস্ দুল গাবা-এর বরাত দিয়ে 'সিয়ারুস্ সাহাবীয়াত' (দারুন মুসান্নিফীন)-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, উম্মে শরীফ দাওসিয়াহ (রা) গোপনীয়তা রক্ষা করে অত্যন্ত কৌশলের সাথে মহিলাদের মধ্যে ইসলামের প্রচারকার্য চালান, ফলে কুরায়শী মহিলাদের মধ্যে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে।
ফাতিমা বিনতে আল-খাত্তাব (রা)
ফাতিমা বিনতে আল-খাত্তাব (রা) ছিলেন উমর (রা)-এর বোন। তিনি কিভাবে হযরত উমর (রা)-কে প্রভাবান্বিত করেছিলেন, আর কিভাবে হযরত উমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তা তো ইসলামী ইতিহাসের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। জাহিলিয়া যুগে কুরায়শদের মধ্যে যে কয়জন মহিলা পড়াশোনা জানতেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম।
সা'দা বিনতে কুরায়য (রা)
ইবনে হজর তাঁর 'ইসাবা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, সা'দা বিনতে কুরায়য (রা)-এর অনুপ্রেরণায় হযরত উসমান (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। খুব সম্ভব তিনি ছিলেন হযরত উসমানের খালা। তাঁর সম্পর্কে এর অধিক কিছু জানা যায়নি। 'তৃতীয় আকাবা' (যাকে হিজরতের ভূমিকা বলা হয়)-এর সম্মিলিত শপথে দু'জন মহিলাও অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। এ তো গেল হিজরত-পূর্ব যুগের ঘটনা। হিজরত-উত্তর যুগেও কয়েকজন মহিলা দীনের প্রচার কার্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। বলা হয়ে থকে, মক্কার মহিলাদের চেয়ে মদীনার মহিলারা ছিলেন এক্ষেত্রে অধিক অগ্রণী। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তারা যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তার কিছু বিবরণী নিম্নে দেওয়া গেল।
উম্মে সালীম বিনতে মালহান (রা)
উম্মে সালীম বিনতে মালহান (রা) একজন সিংহ-হৃদয়া মহিলা ছিলেন। তিনি এবং তাঁর বোন যুদ্ধের ময়দানে খঞ্জর হাতে অংশগ্রহণ করতেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। হুনাইনের যুদ্ধে ইসলামী সেনাবাহিনীর পলায়নকারী মক্কী স্বেচ্ছাসেবকদেরকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের জন্যে যুদ্ধে বিজয় লাভের পর তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে পরামর্শ দিয়েছিলেন। (সহীহ মুসলিম, সিয়ারুস সাহাবীয়াত)
উম্মে সালীম (রা)-এর স্বামী পৌত্তলিক ছিলেন। তিনি একটি বৃক্ষের পূজা করতেন। উম্মে সালীম মুসলমান হওয়ার পর বৃক্ষপূজার কারণে স্বামীকে ধিক্কার দিতেন এবং রহস্য করে বলতেন, 'যে উদ্ভিদ মাটির ভেতর থেকে বের হয় সে আবার প্রভু হয় কিভাবে? স্বামী ধীরে ধীরে তাঁর কথা দ্বারা প্রভাবান্বিত হন এবং শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেন। (ইসাবা, ইবনে সা'দ)
বিবিধ বিষয়
রসূলুল্লাহ (সা) সদুপদেশ দানের জন্য মসজিদে নববীতে একটি পৃথক মাহফিলের ব্যবস্থা করতেন এবং সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে তা বসত। চাঁদার জন্য যখন বিশেষ আহ্বান জানানো হত তখন এ জাতীয় মাহফিল থেকে উৎসাহজনক সাড়া পাওয়া যেত। সহীহ বুখারীতে একদিনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে : হযরত বিলাল সফ্ (নামাযের সারি)-সমূহ ঘুরে ঘুরে চাঁদা সংগ্রহ করছিলেন, আর মহিলারা রসূলুল্লাহ্ (সা)-র আহ্বানে নিজেদের কাঁকন, বালি (অলংকার) ইত্যাদি খুলে খুলে আল্লাহ্র রাস্তায় দান করছিলেন।
বাবুর্চি ও সেবিকা হয়ে মুসলিম মহিলারা যে স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশ নিতেন তার উল্লেখ এখানে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও বিদেশ থেকে আগত অমুসলিম রাষ্ট্রের দূতরা মদীনায় এলে আনসার মহিলারা যে তাদের মেহমানদারীর দায়িত্ব বহন করতেন তাঁর কথা তো এখানে অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে না! ইবনে সা'দ ইত্যাদি গ্রন্থে প্রায়ই এমন একজন মহিলা আনসারীর বাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বিদেশী রাষ্ট্রদূতরা অবস্থান করতেন এবং তাঁদের পানাহারের ব্যবস্থাও সেখানেই করা হত।
মোটকথা, মহিলারাও রসূলে আকরাম (সা)-এর দীনের প্রচার কার্যে যথেষ্ট অবদান রাখেন। তাঁরা তাঁদের স্বামী, ভৃত্য, দাসদাসী, আত্মীয়-স্বজন ও সখী-বান্ধবীদেরকেও ইসলাম গ্রহণে অনুপ্রাণিত করেন। ইসলামের জন্যে তাঁরা অকাতরে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন সহ্য করেন। কিছুসংখ্যক মহিলা পুরুষদের সাথে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তাদের ঈমান যে অত্যন্ত মজুত ছিল তা আবিসিনিয়ার একটি ঘটনা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়। সেখানকার ঈসায়ী পরিবেশে অবস্থানকালে উম্মে হাবীবা (রা)-এর স্বামী উবায়দুল্লাহ বিন জুহশ এবং সওদা (রা)-এর স্বামী সুকরান ইসলাম ছেড়ে খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন, কিন্তু ঐ মহিলাদ্বয় ইসলামেই অবিচল থাকেন। আর তারই পুরস্কারস্বরূপ পরবর্তী সময়ে তাঁরা 'উম্মুল মুমিনীন' [রসূলুল্লাহ্ (সা)-র পত্নী] হওয়ায় সৌভাগ্য অর্জন করেন।
হযরত উমর (রা)-এর পরিবারের দু'জন দাসী-যুনীরা (রা) ও লবিনা (রা) মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত 'উমর (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) তাঁদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাতেন। জানা যায়, তিনি তাঁদেরকে প্রহার করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে থেমে যেতেন। অতঃপর তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন, "তোমরা মনে করো না যে, আমি তোমাদের উপর সদয় হয়ে গেছি বরং পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ার কারণেই একটু জিরিয়ে নিচ্ছি। তৈরী হয়ে যাও। শীঘ্রই তোমাদের উপর প্রহার শুরু করবো।” মহিলা দুজন হাসিমুখে ঐ নির্যাতন সহ্য করে নেন, কিন্তু ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি।
সওবিয়া (রা)-ও (যিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে কয়েকদিন নিজের স্তনের দুধ খাইয়েছিলেন) জুলুম নির্যাতনের কোন পরোয়া না করেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি ইতিপূর্বে আযাদ (মুক্ত) হয়েছিলেন তাই আবু লাহাব খুব সম্ভব তাকে শাস্তিদানের কোন সুযোগ পায়নি।
সাফা বিনতে আবদুল্লাহ আলআদভিয়াহ্ (রা) কখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তিনি হযরত উমর (রা)-এর আত্মীয়া ছিলেন এবং ভাল লেখাপড়া জানতেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে মুসলিম-জননী বিবি হাফসা (রা)-কে শিক্ষাদানের কাজে নিয়োগ করেছিলেন। ঐ মহিলা নানা দিক দিয়ে মুসলমানদের উন্নতির জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পলন করেন।
📄 কুরায়শের সাথে সংঘাত
সত্যিকথা বলতে গেলে, নবুয়ত প্রাপ্তির সাথে সাথে কুরায়শদের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যে সংঘাত শুরু হয়, তা মক্কা বিজয় পর্যন্ত স্থায়ী থাকে এবং বিদায় হজ্জে গিয়ে সমাপ্ত হয়। এই সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে বিভিন্ন অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক সংঘাতের সূচনা হয় তৃতীয় আকাবার শপথের সাথে সাথে। শেষ পর্যন্ত কুরায়শরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। মক্কা থেকে হিজরত, মদীনায় বণিকদল অবরোধ, বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ—এসব ছিল ঐ সংঘর্ষেরই বিভিন্ন অংশ। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য আমার লেখা ‘আহদে নববী মে ময়দানে জঙ্গ’ পুস্তকটি পাঠ করার জন্যে আমি পাঠকদের আহ্বান জানাচ্ছি। কেননা উক্ত পুস্তকে এসব সংঘর্ষের পটভূমি ও ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ পুস্তকে শুধু হুদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের উপর দুটি অধ্যায় সংযোজিত হয়েছে এবং তাতে কুরায়শদের সাথে রাজনৈতিক সংঘাতের যথেষ্ট তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। এর অধিক আলোচনার অবকাশ বা প্রয়োজন এখানে আছে বলে মনে হয় না।
📄 হুদায়বিয়া সন্ধির বিজয় বা রসুলুল্লাহ্ (সা)-এর পররাষ্ট্র নীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল দিক
বিশ্ব ইতিহাসে রসূলুল্লাহ (সা)-এর শাসনকাল একটি যুগান্তকারী বৈপ্লবিক অধ্যায়। ঐ সময়ে সারা বিশ্বে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য পারস্য ও রোম ছিল মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতবর্ষ ও চীনে সভ্য জাতিসমূহের শাসন পদ্ধতি প্রচলিত থাকলেও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় অব্যাহত ছিল বৃহৎ শক্তিসমূহের ক্ষমতা দখলের সংঘাত। ভূমধ্যসাগর ঐ সময় কেবল ভৌগোলিক দিক থেকে নয় বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও ছিল পৃথিবীর মধ্যবর্তী এলাকা। ভূমধ্যসাগরের তীরেই গ্রীসের অবস্থান। রোম, মিসর এবং সিরিয়ার অবস্থানও ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেষে। এই সাগরেরই উপকূলে শেষ হয়েছে আরবের উত্তরসীমা। আর এই সাগর পর্যন্ত নিজ সাম্রাজ্যসীমা বিস্তারে পারস্য ছিল সদা তৎপর, অল্পকালের জন্য হলেও তারা এক্ষেত্রে বেশ কয়েকবার সাফল্যও অর্জন করেছিল। প্রকৃতি আরবদেশকে স্থাপন করেছে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এ তিনটি মহাদেশের কেন্দ্রস্থলে। আরবেরই বাসোপ-যোগী' উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যস্থলে অবস্থিত মহানগরী মক্কা। কবির কল্পনায় নয় বরং বাস্তবতার নিরিখেই বলা চলে যে, মহানগরী মক্কা ভূমণ্ডলের মধ্যস্থলেই অবস্থিত।
অতএব ঐ প্রাচীন যুগে বিশ্বব্যাপী কোন আন্দোলন পরিচালনার পক্ষে মক্কাই ছিল সর্বাধিক উপযুক্ত স্থান। 'হিজায' ভূমিতে ইউরোপের শীতল, আফ্রিকার উষ্ণ ও এশিয়ার শস্য-শ্যামল পরিবেশের একটি মিশ্রিত রূপ ছিল বিদ্যমান। কাজে কাজেই সেখানকার অধিবাসীরাও ছিল তিনটি মহাদেশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সর্বপরি সামরিক দিক থেকে মক্কা ছিল অতি সুরক্ষিত অঞ্চল।
হিজরীপূর্ব ১৩ সালে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর জন্মভূমি মক্কায় ইসলামের প্রচার কাজ শুরু করেন। কিন্তু কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করতে না করতেই সমগ্র দেশবাসী তাঁর কট্টর শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে তাদের প্রবল শত্রুতা ও বিরোধিতার দুর্যোগপূর্ণ তেরটি বছর অতিক্রম করার পর প্রথম হিজরী সালে তিনি জন্মভূমি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। শীঘ্রই সেখানে তিনি একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং একটি নগর-রাষ্ট্রেরও গোড়াপত্তন করেন। এই নগর-রাষ্ট্রের জন্য তিনি যে লিখিত সংবিধানটি রচনা করেছিলেন, ইতিহাস আজ পর্যন্ত সেটাকে বিভিন্ন দফা সম্বলিত একটি দলীল হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছে। মদীনা গমনের কয়েক মাসের মধ্যেই রসূলুল্লাহ্ (সা) পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের এলাকাগুলি সফর করে সকলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন। ফলে মদীনা থেকে ইয়ামবো' পর্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী গোত্রসমূহ (বনী যুমরা, মদলজ প্রভৃতি) ইসলাম গ্রহণ না করলেও রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, কেউ মদীনা আক্রমণ করলে তারা মুসলমানদেরই সাহায্য করবে যদি তাদের এলাকা শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে মুসলমানরা তাদেরকে সাহায্য করবে। তবে দুই পক্ষের কেউ চুক্তি অনুযায়ী না চললে কেউ কাউকে সাহায্য করবে না। মূলত এটা ছিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যার উপর দিয়ে বাণিজ্যিক কাফেলাসমূহ যাতায়াত করত। মক্কাবাসীরা এই পথেই সিরিয়া, মিসর, ইরাক প্রভৃতি অঞ্চলে যাতায়াত করত। এই রাস্তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা কুরায়শদের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং তারা বদর যুদ্ধের পরাজয়ের চাইতেও অধিক মাত্রায় বিচলিত হয়ে উঠে।
তৃতীয় হিজরী সালে উহুদের যুদ্ধে মুসলমানরা বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হয়, কিন্তু অচিরেই তারা সে অসুবিধা কাটিয়ে উঠে। তারা মদীনার পূর্বদিকে অবস্থিত নজদ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে মক্কাবাসীদের ইরাক যাওয়ার কষ্টদায়ক বিকল্প রাস্তাটিও বন্ধ করে দেয়। এ সময় বনি কায়নুকা ও বনি নযীরের য়াহুদী সম্প্রদায় দেশত্যাগে বাধ্য হয় এবং মদীনার উত্তরে খায়বর অঞ্চলের য়াহূদীদের সাথে বসবাস করতে শুরু করে। তারা তখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং কুরায়শকেও গিতফান প্রভৃতি গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে ক্ষেপিয়ে তুলতে থাকে। দুমাতুল জন্দল ছিল উত্তর আরবের একটি বাণিজ্য কেন্দ্র। মদীনায় আগমনকারী বাণিজ্যিক কাফেলাসমূহকে সেখানে লুটতরাজ করা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। য়াহূদী পুঁজিপতিদের প্ররোচনায়ই অনুরূপ ঘটনা ঘটত। এই য়াহুদীদেরই প্ররোচনায় গিতফান ও ফাযারাহ্ গোত্রদ্বয় একদিকে এবং কুরায়শ ও তার মিত্র গোত্রগুলি অন্যদিকে খন্দকের সংঘর্ষের সময় মদীনা অবরোধ করেছিল। ঐ দুর্বল মুহূর্তে মদীনার অবশিষ্ট য়াহূদীরাও (বনি কুরায়যা) যাতে মুসলমানদের সাথে বিশ্বাঘাতকতা করে সে ব্যবস্থাও তারা পূর্বাহ্নে করে রেখেছিল। মুসলমানরা এই সাংঘাতিক ধরনের বিপদটি কাটিয়ে উঠলে পর বনি কুরায়যাকে তাদের কৃতকর্মের জন্যে দেশান্তরিত করা হয়। অতঃপর খায়বর, তীমা, ওয়াদিউল কু'রা, মাকনা প্রভৃতি স্থানের য়াহুদীরাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
এটা ছিল মুসলমানদের জন্য একটি দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্ত। উত্তর আরবের খায়বর প্রভৃতি স্থান ছিল য়াহুদী শক্তির কেন্দ্রস্থল। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফাযারা, গিতফান ইত্যাদি গোত্র খায়বরবাসীদের 'সাথে মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ছিল না। তারা যখনই সুযোগ পেত তখনই মুসলমানদের ক্ষতিসাধন করত। দক্ষিণে ছিল মক্কা। অর্থনৈতিক দিক থেকে মক্কা চাপের সম্মুখীন হলেও সামরিক দিক দিয়ে ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। মক্কাবাসীরা ক্রোধ ও হিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিল এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছিল। খায়বরে অবস্থানরত বনী নযীরের লোকদের প্রচেষ্টা পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তুলেছিল। য়াহূদী, গিতফান, কুরায়শ-এ ত্রিশক্তির আক্রমণ থেকে মদীনাকে রক্ষা করা তখন সহজ কাজ ছিল না। খন্দকের যুদ্ধে য়াহুদী ছাড়াই দশ হাজার সৈন্য মদীনা আক্রমণ করেছিল এবং প্রয়োজনবোধে যেকোন সময় ন্যূনপক্ষে আরো তিন হাজার সৈন্য এসে যোগদান করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পক্ষান্তরে আবালবৃদ্ধবনিতা মিলে মুসলমানরা ছিল মাত্র তিন হাজার। সে মুহূর্তে কোন দিক থেকেই তাদের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধির কোন সম্ভাবনা ছিল না।
খায়বর ও মক্কা-এ উভয় শক্তিকেই তখন দমন করার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু একই সাথে দু'টি কেন্দ্রে হামলা করার মত শক্তি মুসলমানদের ছিল না। এমন কি মদীনার প্রতিরক্ষার জন্যে একটি উপযুক্ত বাহিনী মোতায়েন রেখে অন্য একটি পৃথক বাহিনী দ্বারা উক্ত দু'টি কেন্দ্রের যেকোন একটির উপর হামলা পরিচালনার শক্তিও মুসলমানদের ছিল না। সেই সাথে এ আশঙ্কাও ছিল যে, (শামসুল আয়িম্মা সারাসী স্বীয় গ্রন্থ 'আল মাবসূত-এ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে এ আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন) যদি মুসলমানরা মক্কার দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে খায়বর ও গিতফানের লোকেরা মদীনা আক্রমণ করে বসবে। আর যদি মুসলমানরা খায়বর আক্রমণ করে তাহলে মক্কাবাসীরা তাদের আশেপাশের গোত্র ও অধীনস্থদের নিয়ে মদীনায় এসে লুটতরাজ শুরু করে দেবে। কেননা, মদীনা একটি মধ্যবর্তী স্থান। এর উত্তরদিকে খায়বর মাত্র পাঁচ মনযিল এবং মক্কা মাত্র বার মনযিল দূরে।
এমতাবস্থায় একজন রাজনীতিক বা কূটনীতিকের কর্তব্য হবে, যেকোন একটি শত্রুর সাথে সন্ধি করে তাকে অপরটির শত্রু করে তোলা অথবা নিদেনপক্ষে নিরপেক্ষ করে রাখা। একটা থেকে রেহাই পেলে অপরটি আপনা আপনি দমে যাবে এবং মাথাচাড়া দিয়ে উঠার সাহস পাবে না। তবে প্রশ্ন ছিল সন্ধিটা মক্কাবাসীদের সাথে হবে না খায়বরবাসীদের সাথে? খায়বরবাসীদের মিত্র এবং সাহায্যকারী অর্থাৎ ফাযারাহ্ ও গিতফানের লোকেরা ছিল নৈতিকতাবিবর্জিত লুটতরাজ-প্রিয় যাফারর আরব সম্প্রদায়। আর খায়বরস্থ য়াহূদীরা ছিল সাংস্কৃতিক ও বংশগত দৃষ্টিকোণ থেকে আরবদের চাইতে স্বতন্ত্র ধাতের। তাছাড়া দেশান্তরিত হওয়ার কারণে ও সম্পদ লুণ্ঠিত হওয়ার ফলে তাদের মন-মানসিকতাও তখন উগ্র রূপ ধারণ করেছিল। এমতাবস্থায় তাদের সাথে আপোস মীমাংসায় আসা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া অতিলিপু মনোবৃত্তি ও শোষণকারী পুঁজিবাদী হওয়ার কারণে লেনদেনকারী কোন লোকই তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারত না। ঐ একই কারণে তাদের কথার উপরও নির্ভর করা যেত না। তবে একথা বলা যায় যে, খায়বরের প্রাচুর্যময় কেন্দ্রটি একটি অসামরিক জাতির অধীনে থাকায় উহাকে গনীমতের মাল হিসেবে লাভ করা ছিল খুবই সহজসাধ্য।
পক্ষান্তরে মক্কার প্রতি মুসলমানদের আগ্রহ ছিল বিভিন্ন কারণে। মুসলমান মুহাজির সবাই ছিল মক্কাবাসী এবং তাদের আত্মীয়তাও ছিল মক্কাবাসীদের সাথে। কা'বা ছিল মুসলমানদের নামাযের কিবলা ও হজ্জের কেন্দ্রস্থল। মক্কাবাসীরা পরাস্ত হলে তা ইসলামের জন্যে অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। কেননা কুরায়শদের অর্থনৈতিক ও তামদ্দুনিক সম্পর্ক ছিল সারা আরব জুড়ে। যোগ্যতার দিক দিয়েও ছিল তারা সর্বাগ্রে। তাদের কথার মূল্য ছিল এবং তারা উন্নত চিন্তাধারারও অধিকারী ছিল। জাতীয় স্বার্থে জানমাল সহ সর্বশক্তি নিয়োগ করতে তারা দ্বিধাবোধ করত না। তারা কঠোর পরিশ্রমী ছিল এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিও ছিল অনুরাগী। তাছাড়া শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার ব্যাপারেও তারা বেদুঈনদের চেয়ে অধিক যোগ্যতার অধিকারী ছিল। উপরন্তু মুসলমান কর্তৃক অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে তারা সন্ধির জন্যে প্রায় প্রস্তুত হয়েই ছিল এবং মুখ রক্ষার জন্য এর একটা সম্মানজনক সুযোগও খুঁজছিল। ঘটনাক্রমে হিজাযে এ সময় ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মক্কাবাসীদের রসদের কেন্দ্র ইয়ামামার উপর মুসলমানদের (ইয়ামামা বিন উসালের ইসলাম গ্রহণের কারণে) অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেখান থেকে রসদ আমদানী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা) এই অবরোধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করানোর পর স্বেচ্ছায় তা উঠিয়ে নেন।
অধিকন্তু তিনি মক্কার জনসাধারণের মন জয়ের জন্য সেখানকার দীন-দুঃখীদের সাহায্যার্থে ঐ দুর্ভিক্ষের সময় পাঁচশত আশরাফী সেখানে পাঠিয়ে দেন। মক্কার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী নেতা আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবীবা যিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, ঐ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) 'গায়েবানা আকদ'-এর মাধ্যমে তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এছাড়া পশুর চামড়ার বিনিময়ে তিনি জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্রী (খেজুর ইত্যাদি) আবু সুফিয়ানের কাছে হাদিয়াস্বরূপ পাঠিয়ে দেন। মোটকথা, যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করা সত্ত্বেও নীরবে অগোচরে মন জয়ের কাজও চলছিলো। কুরায়শদের হজ্জের সময়ও ছিল সমাগত। এ সময় তারা একাধারে তিনমাস যুদ্ধ বিগ্রহ করাকে নিষিদ্ধ মনে করত এবং কিসাসের উপযোগী পরম শত্রুকেও তখন নগরীতে পাওয়া গেলেও তাকে হত্যা করা হত না। মুসলমানেরা কুরায়শদের কা'বাকেই নিজেদের কিবলা হিসেবে মনে করত এবং সেখানে হজ্জ করাকে নিজেদের 'ধর্মের অঙ্গ' হিসেবে বিশ্বাস করত। সুতরাং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও কুরায়শদের উপর না পড়ে পারে না। উপরোক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ্ (সা) চিন্তা করলেন, যদি হজ্জের মাসগুলোতে তওয়াফে কা'বা, কুরবানী ও উমরা সমাপনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করা যায় এবং কুরায়শদের সামনে তাঁদের মুখরক্ষাকারী কিছু শর্ত উত্থাপন করা যায় তাহলে তারা হয়ত মুসলমানদের সাথে একটি সন্ধির জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে। ঘটনাচক্রে, এ সময় 'নীনভা' নামক স্থানে পারস্য ও রোমের মধ্যকার শত শত বছরের যুদ্ধ পারস্যের চরম পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আর কিছু না হোক, অন্তত আরবে উত্তরাধিকারবিহীনভাবে পরিত্যক্ত ইরানী প্রদেশসমূহ যথা ইয়ামন, বাহরাইন ও ওমানে ইচ্ছামত ঘোরাফেরা করার একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। ইয়ামামায় অধিকার প্রতিষ্ঠার কারণে মুসলমানরা প্রথম থেকেই বাহরাইন ও ওমানের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। এদিকে কুরায়শদের ইয়ামন যাওয়ার রাস্তাও খুলে গিয়েছিল এবং নীনভা'য় রোমীয়দের বিজয় উত্তরাঞ্চলে বড় রকমের যেকোন কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল।
এ সময় মদীনায় কর্মোপযোগী মুসলমান পুরুষের সংখ্যা ছিল আনুমানিক তিন হাজার। যিলকদ মাসে চৌদ্দ শত মুসলমানসহ হজ্জের ইহ্রাম বেঁধে এবং কুরবানীর জন্তু সঙ্গে নিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা হতে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। যেহেতু শান্তিপূর্ণভাবে শুধু হজ্জ সমাপনই মুসলমানদের উদ্দেশ্য ছিল, তাই সঙ্গে কোন যুদ্ধাস্ত্র নেওয়া হয় নি। তবে কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর হযরত উমর (রা)-এর পরামর্শে আত্মরক্ষার জন্য কিছু অস্ত্র মদীনা হতে আনানো হয় এবং তা কোষবদ্ধ অবস্থায়ই সঙ্গে রাখা হয়। যথেষ্ট পরিমাণ সৈন্য মদীনায় রেখেই মুসলমানরা নীরবে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়। অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য যাত্রার প্রাক্কালে যে গোয়েন্দাকে পাঠান হয়েছিল, পথিমধ্যে সে এসে খবর দেয় যে, কুরায়শরা ব্যাপারটা জেনে নিয়েছে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা আহবাশ্ প্রভৃতি মিত্র গোত্রসমূহকেও যুদ্ধের জন্য একত্রিত করছে। রসূলুল্লাহ্ (সা) তৎক্ষণাৎ পরামর্শ সভা আহ্বান করে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, পূর্বপরিকল্পনা মতে হজ্জের জন্য অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা হবে, না কুরায়শ-মিত্রদের ঘরবাড়ীর উপর আক্রমণ পরিচালনা করা হবে? যেহেতু তখন ঐ সমস্ত ঘরবাড়ীতে শুধুমাত্র শিশু ও মহিলারা ছিল, তাই সেখান থেকে গৃহপালিত জন্তু, দাসদাসী ইত্যাদি গনীমতের মাল সামগ্রী সহজেই লাভ করা যাবে এবং এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষ একটা সমুচিত শিক্ষাও পাবে। অবশেষে হযরত আবু বকর (রা)-এর পরামর্শক্রমে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে উমরা আদায়েরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা) সামনে এগিয়ে চলেন এবং হুদায়বিয়া নামক স্থানে উপনীত হন। হুদায়বিয়া হতেই হরমের সীমা শুরু হয়েছে এবং সেখানেই উপকূলীয় অঞ্চল শেষ হয়ে দুর্গম মরু প্রান্তর ও পাহাড়ী এলাকার সূত্রপাত হয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হুদায়বিয়ায় উপনীত হওয়ার সংবাদ কুরায়শদের কাছে পৌঁছে যায়। সামরিক দষ্টিকোণ থেকে প্রতিপক্ষকে বাধাদানের জন্যে হুদায়বিয়া উপত্যকার চাইতে উত্তম স্থান কুরায়শদের কাছে আর কিছুই ছিল না। হুদায়বিয়ার দূরত্ব মক্কা হতে মাত্র দশ বারো মাইল। দূর-দূরান্ত হতে আগত এবং রসদ ও সাহায্য হতে সম্পর্কচ্যুত ইসলামী 'যাত্রীদের সাথে বাড়িতে বসেই কুরায়শরা যুদ্ধ করতে পারত।
হুদায়বিয়ায় উপনীত হওয়ার সাথে সাথে দূত বিনিময়ের কাজ শুরু হয়। কুরায়শ প্রতিনিধিরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চায়। রসূলুল্লাহ (সা) স্বীয় জামাতা হযরত উসমান (রা)-কে আলাপ- আলোচনার সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে মক্কায় প্রেরণ করেন। মক্কায় তখন বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল। কোন কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সেখানে ছিল না। তাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা আবু সুফিয়ান ঐ সময়ে কোন এক অজ্ঞাত পথ ধরে চুপে চুপে সিরিয়া গিয়েছিলেন এবং সেখানেই অবস্থান করছিলেন। সুতরাং মক্কাবাসীরা হযরত উসমান (রা)-কে নষরবন্দী করে ফেলে। এদিকে হযরত উসমান (রা)-এর প্রত্যাবর্তনে বিলম্ব ঘটছে দেখে মুসলমানরা আশংকিত হয়ে উঠে যে, হয়ত তিনি মক্কাবাসীদের হাতে শাহাদত বরণ করেছেন। তখন মুসলমানদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তারা মরণপণ যুদ্ধের জন্যে শপথ গ্রহণ করে। কুরআনুল করীমে 'বিশ্বাসীরা যখন বৃক্ষতলে তোমার নিকট তোমার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করল'-এই আয়াতের মাধ্যমে ঐ ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কুরায়শদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তারা ভীতিগ্রস্ত হয়ে উঠে এবং পরস্পর পরামর্শ করে সুহাইল বিন আমরকে আলাপ-আলোচনার সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে বিশেষ দূত হিসাবে হুদায়বিয়ায় প্রেরণ করে। কিছুক্ষণ তর্ক-বিতর্ক চলার পর একটি সন্ধিপত্র সম্পাদন করা হয়। তাতে স্থিরীকৃত হয় যে-
১. মুসলমানরা এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই ফিরে যাবে এবং আগামী বছর উমরা করতে আসবে।
২. কোন মুসলমান পালিয়ে মক্কায় এসে আশ্রয় নিলে তাকে মুসলমানদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না, কিন্তু কোন মক্কাবাসী পালিয়ে মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে চলে গেলে চাওয়া মাত্র তাকে কুরায়শের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
৩. এ সন্ধি দশ বছর পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে বলবৎ থাকবে। একপক্ষ অপর পক্ষের যুদ্ধ বিগ্রহে নিরপেক্ষ থাকবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ কাজে একে অন্যের এলাকা দিয়ে গমনাগমন করতে পারবে।
যখন মুসলমানরা উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে নিল এবং চুক্তিপত্রে ইসলামী নিয়মানুযায়ী 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম'-এর স্থলে কুরায়শী কায়দায় 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লেখা হল এবং 'মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ'-এর স্থলে 'মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ' লিখারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তখন মনে করা হলো যে, বিজয়টা কুরায়শদের হয়েছে। বাহ্যত তা ঠিকও ছিল। কাজে কাজেই সন্ধির পর মুসলমান সৈন্যদের মধ্যে দারুণ অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়। এমন কি হযরত উমর (রা)-এর মত দূরদর্শী ব্যক্তিও নিজের অস্থিরতা গোপন রাখতে পারেন নি। তবে মুসলমানরা তখন এতটুকু নিয়ম- শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের অধিকারী হয়ে গিয়েছিল যে, যখন রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, বিষয়টি ঐভাবেই স্থির করা হয়েছে এবং তিনি তা পছন্দ করেছেন তখন নীরবে ও নির্দ্বিধায় তা মেনে নেওয়া ছাড়া কারোরই গত্যন্তর ছিল না।
হুদায়বিয়ার এ সন্ধি (কুরায়শদের ভাষায় মুসলমানদের পরাজয়)-কে কুরআনুল করীম মুসলমানদের জন্য 'ফতহে মুবীন' (এক মহাবিজয়) ও 'নাসরে আজীজ' (এক বিরাট সাহায্য) আখ্যা দিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে যে, বাহ্যত একটা পরিষ্কার পরাজয়কে কিভাবে মহাবিজয় আখ্যা দেওয়া হলো? তবে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে যে, ইসলামী সরকার তো পূর্ব থেকেই কুরায়শদের মুখরক্ষাকারী শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল। খায়বর যুদ্ধে কুরায়শরা যাতে হস্তক্ষেপ না করে-এটাই ছিল মুসলমানদের মূল লক্ষ্য। তাদের সে লক্ষ্য পূর্ণ হলো। কুরায়শরা হুদায়বিয়া সন্ধির মাধ্যমে তা মেনে নিল, বরং বলা যায়, একটু অধিক পরিমাণেই মেনে নিল। আর 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লেখার মধ্যে পৌত্তলিকতা বা শিরকের কিছু ছিল না। 'মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ' লেখার মধ্যেও মুসলমানদের ক্ষতির কোন কারণ ছিল না। এভাবে 'উমরা' থেকে বাধাদানও ছিল একটি মামুলি ব্যাপার। কেননা 'যাদের সক্ষমতা আছে' এর কারণে ঐ সময় মুসলমানদের উপর হজ্জ ফরয ছিল না। কোন মক্কাবাসী মুসলমান হয়ে মদীনায় গেলে তাকে মক্কায় ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে খোদ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ভাষ্য হলো, "আমাদের কাছ থেকে যে ব্যক্তি পলায়ন করবে, সে তো কাফির। তাকে ফেরত নিয়ে আসার আমাদের কোনই প্রয়োজন নেই। আর কুরায়শদের কাছ থেকে পলায়ন করে যারা আমাদের কাছে আসবে, সে তো সত্যিকার মুসলমান। অতএব সে যদি তার দেশবাসীর অত্যাচারে ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে উত্তম পুরস্কার দেবেন।” দেখা গেল, কিছুদিন যেতে না যেতেই ঐসব নও-মুসলিম ইসলামী রাষ্ট্রের আওতা বহির্ভূত একস্থানে জড়ো হয়ে কুরায়শদের বাণিজ্য কাফেলার উপর আক্রমণ চালাতে শুরু করেছে। কুরায়শরা এতে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে এসে চুক্তির ঐ শর্তটি বাতিল করে ওদেরকে মদীনায় নিয়ে আসার অনুরোধ জানায়। তৃতীয় শর্ত তো মুসলমানরা নিজেরাই কামনা করেছিল, মুসলমানরা চেয়েছিল কুরায়শরা যাতে তাদের সাথে একটি সন্ধিশর্তে আবদ্ধ হয় এবং তাদের যুদ্ধসমূহে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ না করে। মুসলমানদের এই নাজুক পরিস্থিতিতে হুদায়বিদায় কুরায়শদের পক্ষ হতে সন্ধির জন্যে এগিয়ে আসাটা ইসলামী পররাষ্ট্র নীতির একটি 'মহান বিজয়' ফতহে মুবীন ও বিরাট সাহায্য নাসরে আজীজ ছাড়া কিছু ছিল না।
এই সন্ধির কারণেই মুসলমানদের ভাগ্য প্রশস্ত হয়। তারা আকস্মিক বিপদের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং মুক্ত পরিবেশে তিন বছরের মধ্যে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে নিজেদের রাষ্ট্রের বিস্তৃতি প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি করে পূর্ণ আরব উপদ্বীপকে নিজেদের অনুগত করে নেয়। ঐ এলাকা থেকে রোমীয় ও ইরানী প্রভাবকে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করে তারা এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে, যা পনর বছরের মধ্যেই তিনটি মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ সময়ে যে শক্তিই তাদের মুকাবিলা করেছে সে-ই ধ্বংস হয়েছে, আর যারা আনুগত্য স্বীকার করেছে তারা বর্ণ ও ভাষার উর্ধ্বে উঠে ইসলামী মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে সমমর্যাদার অধিকারী হয়েছে।
হুদায়বিয়ার সন্ধি হচ্ছে এমন একটি ঘটনা যাকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান কীর্তি আখ্যা দেওয়া চলে। এর মূল ভাষা আরবী গ্রন্থসমূহে কখনো পুরোপুরিভাবে, আবার কখনো আংশিকভাবে দৃষ্টিগোচর হয়।
হুদায়বিয়ার চুক্তি
১. তোমার নামে হে আল্লাহ্!
২. এটা সেই চুক্তি যা মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ ও সুহাইল বিন আমরের মধ্যে সম্পাদিত হলো।
৩. তাঁরা দুজন একথার উপর চুক্তিবদ্ধ হলেন যে, দশ বছরের মধ্যে কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ হবে না। ঐ সময়ে উভয় পক্ষের লোকেরা নিরাপদে বসবাস করবে এবং একে অন্যের উপর আক্রমণ পরিচালনা থেকে বিরত থাকবে।
৪. মুহাম্মদ (সা)-এর সাথীদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জ, উমরা অথবা ব্যবসা-সংক্রান্ত ব্যাপারে মক্কায় আসবে, তার জানমালের নিরাপত্তা থাকবে। অনুরূপভাবে কুরায়শদের যে ব্যক্তি ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদীনা হয়ে মিসর অথবা সিরিয়া (আবু উবাইদ-এর বর্ণনা মতে ইরাক অথবা সিরিয়া) গমন করবে, তারও জানমালের নিরাপত্তা থাকবে।
৫. কুরায়শের যে ব্যক্তি তার অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিরেকে মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে চলে যাবে তাকে কুরায়শের হাতে সমর্পণ করা হবে। আর মুহাম্মদের সঙ্গীদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরায়শের কাছে চলে আসবে, তাকে মুহাম্মদের হাতে সমর্পণ করা হবে না।
৬. আমাদের সকল প্রকারের শত্রুতা বন্ধ থাকবে। (এতে বাইরের কোন বিশ্বাসঘাতকতা প্রবেশ করতে পারবে না।) প্রকাশ্যে অথবা গোপনে কেউ কারো বিরুদ্ধে সাহায্য করবে না এবং চুক্তির বরখেলাফ কোন প্রকার ধোঁকাবাজিকেও প্রশ্রয় দেবে না।
৭. যে কেউ মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে মৈত্রচুক্তিতে আবদ্ধ হতে চায় সে তা করতে পারবে, আর যে কেউ কুরায়শের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে চায়, সে তা করতে পারবে।
(একথা শুনে খুযআ' গোত্রের লোকেরা দাঁড়িয়ে বলল, আমরা মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে চাই এবং বনু বকর গোত্রের লোকেরা বলল, আমরা কুরায়শের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে চাই)।
৮. এ বছর আপনি মক্কায় প্রবেশ না করেই এখান থেকে ফেরত চলে যাবেন। অবশ্য আগামী বছর আমরা মক্কা ছেড়ে বাইরে চলে যাবো এবং আপনি আপনার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মক্কায় তিনরাত অবস্থান করতে পারবেন। আপনার সাথে একজন আরোহীর অস্ত্র অর্থাৎ কোষবদ্ধ তরবারি থাকবে। এছাড়া অন্য কোন অস্ত্র আপনি নিয়ে আসতে পারবেন না।
৯. কুরবানীর পশু আমরা যেখানে আছি (হুদায়বিয়ায়) সেখানেই থাকবে এবং সেখানেই হালাল করা হবে। এগুলোকে আমাদের কাছে (মক্কায়) কুরবানীর জন্য নিয়ে যাওয়া চলবে না। প্রকাশ থাকে যে, আমাদের এবং আপনাদের অধিকার এবং দায়িত্ব সমতার ভিত্তিতে নির্ণীত হবে।
ইসলামী পক্ষের সাক্ষীগণঃ আবূ বকর, উমর, আবদুর রহমান বিন আউফ, আবদুল্লাহ বিন সুহাইল বিন আমর, সা'দ বিন আবূ ওক্কাস, মুহাম্মদ বিন মুসলিমা, আবু উবায়দা বিন আল-জাররাহ প্রমুখ।
কুরায়শ পক্ষের সাক্ষীগণঃ মাকরায বিন হাফয প্রমুখ।
লেখকঃ আলী বিন আবূ তালিব।
চুক্তির মূল ভাষা যে সকল পুস্তক হতে সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো হলোঃ তফসীরে তাবারী, খণ্ড ২৬, পৃষ্ঠা ৬১; সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৭৪৭- ৭৪৮, ফারসী অনুবাদঃ সীরাতে ইবনে ইসহাক, পৃষ্ঠা ১৮০ (প্যারিস); ওয়াকিদীর "মাগাযী” (বৃটিশ মিউজিয়াম); তাবাকাতে ইবনে সা'দ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৭; তারীখে তাবারী, সীরাতে তাবারী, তারীখে ইবনে কাসীর, তারীখে আল-খমাস, তারীখে ইবনে আসীর, সীরাতে হালবী, কিতাবুল আমওয়াল, সহীহ বুখারী, ফুতুহে বালাযুরী, তারীখ আল ইয়াকুবী; সহীহ মুসলিম, আবূ ইউসুফের 'খারাজ' ও ইবনে আবি শায়বার কানযুল উম্মাল ইত্যাদি।
টিকাঃ
১. এ ব্যাপারে আমার দুনিয়ার সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান শীর্ষক প্রবন্ধ مجلة طيلسانين হায়দরাবাদ ১৯৩৯ খ্রী. দ্রষ্টব্য।
২. এর জন্য আমার আরবী পুস্তক الوسائق السياسية (কায়রো, হিজরী ১৩৬) দ্রষ্টব্য।
৩. মাসঊদীর التنبيه ও الاشراف : পৃষ্ঠা ২৪৮।
৪. সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ১৯৭-১৯৮; ইসতিআবে ইবনে আবদুল বর, জীবনী, নম্বর ২৭৮।
৫. সারাসী, মাবসূত, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৯১-৯২; সারাখসীর শরহুস সিয়ারুল কবীর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৯।
৬. সারাসী, মাবসূত, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১২।
৭. গারল্যাণ্ড (Gerland)-এর জার্মানী ভাষার লিখিত পুস্তক 'Persische Feldzuge Des Kaisers Heraklaius' দ্রষ্টব্য।
৮. তারিখে তাবারী, পৃষ্ঠা ১৫৩১।
৯. বিদায়া, ইবনে কাসীর।
১০. ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামে এই দফাটির উল্লেখ নেই। তারীখে তাবারীতে এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে তফসীরে তাবারী, আবু উবায়দের কিতাবুল আমওয়াল, ফুতুহে বালাযুরী প্রভৃতি গ্রন্থে এ দিকটির উল্লেখ পাওয়া যায়।