📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 নবুওতের মক্কী যুগ

📄 নবুওতের মক্কী যুগ


ওহীর মাধ্যমেই নবুওতের সূচনা হয়। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর আদেশ নির্দেশ নবীর কাছে প্রেরণ করেন, যাতে তিনি মানবজাতির কাছে তা পৌঁছিয়ে দেন। নবুওত এমন কোন মৌরসী পেশা নয় যে, কেউ তা আপন পিতামাতা বা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে আয়ত্ত করে নেবে, বরং তা হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সৎ ও সত্যবাদী ব্যক্তিত্বকে পরিষ্কার ভাষায় বলে দেওয়া যে, "তুমি আল্লাহর রসূল, তোমার কর্তব্য হচ্ছে তুমি তোমার জাতিকে ন্যায় ও সত্যের প্রতি আহ্বান জানাবে।”

অতঃপর নবুওতপ্রাপ্ত ব্যক্তির দেহে ও মন-মানসিকতায় এক বিরাট প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের বর্ণনা থেকে এ ব্যাপারে মোটামুটি একটি ধারণা করা যায়। তিনি বলেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বিবি খাদীজাকে বলতেন, "যখন আমি একাকী বসে থাকি, তখনি শুনতে পাই, কে যেন আমাকে 'হে মুহাম্মদ' বলে সম্বোধন করছে। নিদ্রিত অবস্থায় নয় বরং জাগ্রত অবস্থায়ই আমি আলোর (নূরের) মত কি যেন অনুভব করি। আল্লাহর শপথ, প্রতিমা-পূজারী ও জ্যোতিষীদের অদৃশ্য বাণীসমূহের চাইতে ঘৃণ্য বস্তু আমার কাছে আর কিছুই ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমিও কি একজন জ্যোতিষী হয়ে গেলাম? আমাকে যে সম্বোধন করছে সে কোন জ্বীন বা শয়তান নয় তো?"

তাঁর ঐ আশংকা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কেননা এসব বিষয় প্রকাশিত হয়ে পড়লে জনসাধারণ তাঁকে মিথ্যুক, পাগল, ভূতে-ধরা, জ্যোতিষী ইত্যাদি যে আখ্যা দিত তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তাছাড়া ঐ দেশে নবুওত ও রিসালত সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোন লোক ছিল না। এমতাবস্থায় শয়তানের ইঙ্গিত ও ফেরেশতার ইলহামের মধ্যে মূলত যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, তা অনুভব করা ওদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

বিবি খাদীজা (রা) রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে তাঁকে বলেন, 'আপনার মত মহৎ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা'আলা কখনো অপদস্থ করবেন না।' অতঃপর তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর পিতৃব্যপুত্র খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ওরাকা বিন নওফলের কাছে নিয়ে যান। ওরাকা ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'এসব কথাবার্তা মোটেই শয়তানী নয় বরং এগুলোর সাথে হযরত মূসা (আ)-এর 'নামোস' অর্থাৎ তওরাতের পরিষ্কার সামঞ্জস্য রয়েছে।” তিনি আরো বলেন, "আপনার উপর যে দায়িত্ব বর্তাবে তা সম্পাদনে যদি বাধা প্রদান করা হয়, এজন্যে আপনি যদি অত্যাচারিত হন, আর আমি তখন জীবিত থাকি, তাহলে আপনাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবো।"

ইবনে হিশামের বর্ণনানুযায়ী, রসূলুল্লাহকে অধিক সান্ত্বনা দানের জন্যে বিবি খাদীজা (রা) আর একটি অদ্ভুত উপায় অবলম্বন করেছিলেন। তিনি রসূলুল্লাহকে বললেন, আপনি যখনই জিবরাঈল ফেরেশতাকে দেখবেন তখনি আমাকে বলবেন। কিছুদিন পর রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, 'আমি এখন তাঁকে দেখতে পাচ্ছি।' তখন বিবি খাদীজা বললেন, 'আসুন আমার ডান দিকে বসুন।' অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি আপনি তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ্ (সা) উত্তরে বললেন, 'হ্যাঁ।' বিবি খাদীজা বললেন, 'আসুন, এবার আমার বাম দিকে বসুন।' অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ্ (সা) জওয়াব দিলেন, 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি তাঁকে নিজের সামনে বসিয়ে ঐ একই প্রশ্ন করলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) উত্তর দিলেন 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি তাঁকে আপন জামার ভিতরে টেনে নিয়ে সেই বেসামাল অবস্থায় জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ (সা) উত্তরে বললেন, 'না এখন দেখতে পাচ্ছি না।' একথা শুনে বিবি খাদীজা বললেন, 'শয়তান হলে সে আমাদের ঐ লজ্জাজনক অবস্থায় কখনো চলে যেত না। অতএব তিনি শুধুমাত্র ফেরেশতাই হতে পারেন।'

প্রাথমিকভাবে অবতরণের পর কিছুদিন ওহী আসা বন্ধ থাকে (ওহী বন্ধের ঐ সময়টাকে 'ফতরতে ওহী' বলা হয়)। ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে, ঐ অবস্থা তিন বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। প্রথম পর্যায়ে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কারণে রসূলুল্লাহ (সা)-এর মনের মধ্যে ছিল ভয়-ভীতি। দ্বিতীয় পর্যায়ে শান্তি লাভ ও ওহীর প্রতি আকর্ষণ এবং শেষ পর্যায়ে ওহীর জন্য প্রতীক্ষা ও ব্যাকুলতা। ঐতিহাসিকরা শেষোক্ত পর্যায়ের যে বিবরণ দিয়েছেন তা হলো, ওহীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে তাঁর মনে দারুণ অস্বস্তির সৃষ্টি হত। অবশ্য অনুরূপ সংকটজনক মুহূর্তে তিনি জাগতিক বিষয়বস্তুর কথা একদম ভুলে যেতেন চলে যেতেন আধ্যাত্মিক জগতে এবং তথায় জিবরাঈল (আ)-কে দেখতে পেতেন। জিবরাঈল (আ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, 'আপনি তো আল্লাহর রসূল। (অতএব আপনার এত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোন কারণ নেই)। রসূলুল্লাহ (সা) জিবরাঈল (আ)-এর কথায় সান্ত্বনা লাভ করতেন এবং আত্মশুদ্ধির জন্য আরো কঠোর ইবাদতে নিমগ্ন হতেন।

জানা যায়, এ সময় পরিবার-পরিজনের সাথে তাঁর নামমাত্র সম্পর্ক ছিল। তিনি রাতের বেলা দীর্ঘ সময় ইবাদত করে কা'বার অঙ্গনেই শুয়ে পড়তেন এবং দিনের বেলায়ও ইবাদত করতেন, নামাযে মশগুল থাকতেন। ঐ সময় আত্মশুদ্ধি ও সৃষ্টির সেবা ছাড়া কোন কিছুর সাথেই তাঁর সম্পর্ক ছিল না।

এই সাধনা তাঁর হৃদয় সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। পার্থিব যাবতীয় কামনা-বাসনা চিরতরে মুছে গেল তাঁর মন থেকে। তিনি রূপান্তরিত হলেন পরিপূর্ণ মানুষে। নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেন আল্লাহর মধ্যে। তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি ইচ্ছা ও বাসনা আল্লাহতে মিশে গেল (ফানাফিল্লাহ)। এতদসত্ত্বেও কেবলমাত্র তাঁর নিজের মনেই নয়, তাঁর স্ত্রীর মনেও এ আশংকা দেখা দিল যে, তাহলে সত্যই কি আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে ত্যাগ করলেন? সত্যই কি আল্লাহ্ তা'আলা অসন্তুষ্ট হয়ে পড়লেন তাঁর উপর?

বস্তুত এ সময়টা ছিল তাঁর প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। শেষ পর্যন্ত এর পরিসমাপ্তি ঘটল এবং মুহাম্মদ (সা)-কে সম্বোধন করে পাক রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ঘোষণা করা হলো:
উজ্জ্বল দিনের শপথ এবং অন্ধকার রাতের শপথ। তোমার প্রভু তোমাকে পরিত্যাগ করেন নি কিংবা তোমার উপর অসন্তুষ্ট হননি। নিশ্চয়ই তোমার ভবিষ্যৎ তোমার অতীত অপেক্ষা উজ্জ্বল এবং শীঘ্রই তোমার প্রভু তোমাকে এমন কিছু দান করবেন যাতে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে। তিনি কি তোমাকে য়াতিম বালকরূপে পান নি এবং আশ্রয়দান করেন নি? এবং তিনি কি তোমাকে পথ-অনভিজ্ঞ পান নি এবং সুপথ দেখান নি? তিনি কি তোমাকে অভাবগ্রস্ত দেখেন নি এবং অভাবমুক্ত করেন নি? অতএব যে অনাথ, তাকে তুমি উৎপীড়ন করবে না, যে ভিক্ষুক, তাকে তুমি তিরস্কার করবে না। আর তোমার প্রভুর অনুগ্রহের কথা প্রচার কর।

"এবং তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের কথা প্রচার কর"-এ আয়াতের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাবলীগে রিসালত-এর নির্দেশ লাভ করেছিলেন। এই প্রাথমিক অবস্থায় যেসব আয়াত ও সূরা অবতীর্ণ হয়েছিল, তন্মধ্যে সূরা 'ইকরা' এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সৃষ্টি ক্ষমতার অপূর্ব বর্ণনা এবং যাবতীয় জড়বাদ ও নাস্তিক্যবাদের অসারতা প্রমাণ করেছে। সূরা 'মুদ্দাস্সিরে" মানবজাতিকে যাবতীয় অসৎ কর্মের অশুভ পরিণতি থেকে দূরে থাকা, একমাত্র মহান আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করা, নামাযের পূর্বে দেহ ও পোশাক পবিত্র করা, আল্লাহ্ যেসব কাজে অসন্তুষ্ট সেগুলি থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের সেবা ও উপকার করার পর সেজন্য খোঁটা না দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করা হয়েছে। সূরা 'হজরে' রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, ' তোমাকে যে নির্দেশই দেওয়া হোক না কেন, তুমি তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করো। এজন্য মুশরিকদের ভয় করবে না। সূরা 'শু'আরা'য় একদিকে রসূলুল্লাহ-কে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে তাঁর নিকটাত্মীয়দেরকে আল্লাহর ভয় দেখাতে এবং অন্যদিকে অভিযোগকারীদের জওয়াব দিতে গিয়ে পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ওহী দেবতাদের কন্ঠ নিঃসৃত বাণী বা মনগড়া কবিতা কিংবা শয়তানী কথাবার্তা নয়। 'আমপারার' বিভিন্ন সূরায় আল্লাহ্ তা'আলার একত্ব স্বীকার করে নেওয়া এবং সৎকর্মশীল হওয়ার জন্যে মানব জাতিকে বারবার তাকিদ দেওয়া হয়েছে এবং নানাবিধ দলীল এবং উপমা দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে যে, মানুষের ক্ষমতার বাইরে এই যে আসমান-যমীন, চাঁদ, সূর্য, বাতাস, সমুদ্র, মেঘবৃষ্টি, ঋতু, এমন কি মানব জাতি-এ সবকিছুরই স্রষ্টা হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা। তিনি অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ব দান করেন, তিনি জীবিতকে মৃত্যুর মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেন। এমন ক্ষমতাবান যে সত্তা, তিনি কি মৃত্যুর পর মানুষকে জীবন দান করে তার ইহলোকের যাবতীয় কাজের পুরস্কার অথবা শাস্তি প্রদান করতে পারবেন না? অতঃপর সৎকাজ ও অসৎকাজের পরিণামস্বরূপ যথাক্রমে বেহেশত ও দোযখ প্রদানের কথা উল্লেখ করে কিয়ামত ও শেষ বিচার দিনের বিস্তারিত অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে।

ইসলাম ও জাহিলিয়াতের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, জাহিল লোকেরা পার্থিব আরাম-আয়েশকেই ভালমন্দের মাপকাঠি বলে মনে করে এবং পার্থিব কামনা-বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য মন্দ কাজকেই ভাল কাজের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে এটা শয়তানী আচরণ ছাড়া কিছু নয়। আমরা এখন ঐ যুগ সম্পর্কে আলোচনা করবো।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 নবুওতের প্রচার কার্য

📄 নবুওতের প্রচার কার্য


মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা যদি সচ্ছল না হয় এবং পেটের তাড়নায় যদি তাকে দিগ্বিদিক ছুটতে হয় তাহলে অন্য কাজ—বিশেষ করে ‘চিন্তার জগতে’ প্রবেশ করার মত কোন সুযোগ বা অবকাশ তার থাকে না। কেননা অন্যান্য চিন্তার চাইতে রুজী-রোজগারের চিন্তাই তার কাছে তখন বড় হয়ে দেখা দেয়। নবুওত যুগের কয়েক বছর পূর্ব থেকেই মক্কাবাসীরা আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে দিয়েছিল এবং এক্ষেত্রে বিরাট সাফল্যও অর্জন করেছিল। প্রথম নবভী সালে এ ধরনের যথেষ্ট লোক ছিল, যারা মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিয়েছিল। এই পরিবেশই নবুওতে মুহাম্মদীর অভ্যুদয় হয় এবং সে অনুযায়ী তা যথাযথ ভূমিকাও পালন করে।

ঐতিহাসিকরা একদিকে বলেছেন প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর তিন বছর পর্যন্ত আর ওহী নাযিল হয়নি, অপরদিকে বলেছেন, প্রথম তিন বছর পর্যন্ত গোপনে গোপনে প্রচার কার্য চলেছিল। তাদের এই দুই বর্ণনার মধ্যে অবশ্যই একটা সামঞ্জস্য থাকা চাই। ওহী নাযিল হওয়ার পর রসূলুল্লাহ্ (সা) নিশ্চয়ই তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করেছিলেন। তাঁর মত নিষ্কলুষ ও পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘ঈমান আনলাম’ বলাটা তাদের পক্ষেও অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এরই ঘরে লালিত পালিত অপ্রাপ্ত বয়স্ক তাঁর পিতৃব্যপুত্র আলী (রা), তাঁর স্নেহভাজন ক্রীতদাস যায়েদ বিন হারিসা (রা) ও তাঁর পিয়তমা পত্নী বিবি খাদীজা (রা) প্রমুখ তো তাঁর আহ্বানের সাথে সাথেই ঈমান এনেছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হযরত আবূ বকর (রা)-এর সাথেও নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে আলাপ করেছিলেন এবং তিনিও খুব সম্ভব তাঁর কথায় আস্থাশীল হয়ে সঙ্গেই সঙ্গেই ঈমান এনেছিলেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাথমিক যুগের এসব নও-মুসলিম সম্মিলিতভাবে আল্লাহর দীনের প্রচারাভিযান এত জোরেসোরে চালিয়েছিলেন, যার তুলনা অন্যান্য ধর্মে বিরল। মহিলাদের কর্ম প্রচেষ্টা সম্পর্কে আমরা অন্যত্র আলোচনা করবো। পুরুষদের মধ্যে এক্ষেত্রে হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রচেষ্টা বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হয়েছিল। তাঁরই অনবরত প্রচার ও অনুপ্রেরণা দানের ফলে তাঁর বন্ধুদের মধ্যে যুবাইর বিন আল-আওয়াম, আবদুর রহমান বিন আউফ, সা'দ বিন আবি ওক্কাস, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ এবং এক বর্ণনামতে 'উসমান বিন আফফান যেমন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন, অন্যদিকে তেমনি বিলাল, আমির বিন ফাহিরা, উম্মে আবীস, যানীরা ও লাবীনা সহ কয়েকজন পুরুষ ও মহিলাকে তিনি ক্রয় করে আযাদ করে দিয়েছিলেন। কেননা ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এঁদের মনিবরা তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছিল। এসব ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীদের মধ্যে কিভাবে ও কার প্রচেষ্টায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। যাহোক হযরত আবূ বকরের জান মাল ছিল ইসলামের জন্য উৎসর্গীকৃত। তিনি মুসলমান ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীদেরকে কাফিরদের নির্যাতন থেকে মুক্তি দিতে বিশেষভাবে আনন্দ পেতেন।

এখন প্রশ্ন হলো, প্রচার কার্যের বিষয়বস্তু কি ছিল। তখনকার সময়ে নাযিলকৃত আয়াত ও সূরাসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় যে, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস স্থাপন, শিরক থেকে দূরে থাকা, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, শেষ বিচার এবং সে অনুযায়ী পুরস্কার বা শাস্তি হিসাবে যথাক্রমে বেহেস্ত বা দোযখ লাভ ইত্যাদি ছিল প্রচার কার্যের বিষয়বস্তু। প্রতিমা পূজার অপকারিতা, ফেরেস্তাদের অস্তিত্ব, ফেরেস্তাদের মাধ্যমে নবীদের কাছে আল্লাহর ওহী প্রেরণ, মানুষের হিদায়েতের কাজে ফেরেশতাদের নিয়োগ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কেও তখন আলোচনা করা হতো। উত্তম চরিত্র গঠন এবং দান-দক্ষিণার জন্যতেও তখন উৎসাহ প্রদান করা হত।

প্রচার কার্যের ধারা এই ছিল যে, যখনই রসূলুল্লাহ্ (সা) কোন বন্ধু-বান্ধব কিংবা সত্যানুসন্ধানী লোকের সাক্ষাত পেতেন তখনই মধুর সুরে কুরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে তাঁকে শোনাতেন এবং শ্রোতার যোগ্যতা অনুসারে এসব আয়াতের ব্যাখ্যা করে তার কাছে ইসলামী মূলনীতির বিবরণ পেশ করতেন। তিনি একদিকে মহান স্রষ্টার অপরিসীম করুণা এবং অন্যদিকে তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার বর্ণনা দিয়ে মানুষকে পরকালের হিসাব-নিকাশের ভয় দেখাতেন। তিনি দেশে প্রচলিত মনগড়া ধর্মীয় বিধি বিধানের সমালোচনা করে বলতেন,—মানুষের হাতে গড়া প্রতিমা যারা কথা বলতে জানে না, কোন কিছু শুনতে পায় না, নড়চড়া করতে পারে না, এমন কি নিজেদেরও নিরাপত্তা বিধান করতে পারে না, তারা কিভাবে মহান আল্লাহর সমীপে অপরের মুক্তির জন্যে সুপারিশ করতে পারে? এককথায় বলতে গেলে, তখন সংক্ষিপ্তভাবে আল্লাহ্ ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, পরকাল, আল্লাহই ভাগ্যের ভাল-মন্দ নির্ধারণ করেন, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান—এই বিষয়গুলির উপর বিশ্বাস স্থাপনের শিক্ষা দেওয়া হত।

কুরআনের ভাব ও ভাষার মধ্যে এমনি একটি আকর্ষণ ছিল যে, তা শুনে ভাষার জাদুকর আরবদের মাথা হেঁট হয়ে যেত। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইসলামের চরম শত্রুরাও রজনীর অন্ধকারে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাসগৃহের পাশে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে কুরআন তিলাওয়াত শুনত এবং তা শুনে মোহিত হত। এ সময় অন্য কেউ যাতে তাদের দেখতে না পায় সেজন্য তারা সতর্ক থাকত এবং বারবার রাস্তার দিকে চোখ তুলে তাকাত। কখন কিভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা) জনসমাবেশে নবুওতের প্রচার কার্য চালাতেন তার বিস্তারিত বর্ণনা তাবারীর ইতিহাসে আছে।

তখনো পাঞ্জেগানা (দৈনিক পাঁচবার) নামায ফরয হয় নি, কিন্তু প্রথম থেকেই দিনে দু'বার, খুব সম্ভব চাশ্ত (দিনের প্রথম প্রহর) ও ইশার (রাতের প্রথম ভাগ) সময় অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করা হত। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, সকাল বেলা চাশতের সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) কা'বাগৃহের সামনে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করতেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন পৌত্তলিকতার কঠোর সমালোচনা করতে লাগলেন, তখন কুরায়শরা তাঁকে বাধা দিল এবং তাঁর উপর নির্যাতন শুরু করল। ঐতিহাসিকদের মতে ঐ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) নগরের বাইরে চলে যেতেন এবং সেখানেই নামায আদায় করে আসতেন।

আল-আরকম নামীয় সাহাবীর বাড়ীতে রসূলুল্লাহ্ (সা) কখন এবং কিভাবে গিয়ে হাযির হতেন, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। রসূলুল্লাহর বাড়ি সম্ভবত কেন্দ্রস্থল থেকে কিছু দূরে ছিল। পক্ষান্তরে আল আরকমের বাড়ি ছিল কা'বার একেবারে সন্নিকটে—সাফা পাহাড়ের উপরে, আর বাড়িটাও ছিল বেশ প্রশস্ত (এই বাড়িটি এখনও বিদ্যমান আছে)। তুর্কী শাসনামলে এর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সউদী শাসনামলেও যথারীতি সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং পার্শ্ববর্তী কয়েকটি বাড়ি উচ্ছেদ করে এ বস্তি পর্যন্ত পৌঁছার রাস্তাটি বেশ চওড়া করা হয়েছে।) এই পবিত্র বাড়িতেই প্রচার বৈঠক বসত এবং সম্ভবত এখানেই জামা'আতের সাথে নামায আদায় করা হত। এখান থেকে কা'বা গৃহও পরিষ্কার নযরে পড়ে।

হযরত আবূ বকর (রা)-এর ঘরের আঙ্গিনায় একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল এবং সেখানে কুরআন পাঠের মাহফিল বসত বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। এই কুরআন পাঠ শোনার জন্য সেখানে সব শ্রেণীর লোক এমনকি দাস-দাসীরাও এসে জড়ো হত এবং অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে কুরআনের অমিয় বাণী শ্রবণ করত।

তিন বছর পর্যন্ত অতি সংগোপনে কাজ করার পর প্রকাশ্য প্রচারাভিযানের সূচনা করা হয়। 'ইসাবায়ে ইবনে হজর' ইত্যাদি গ্রন্থে উল্লেখ আছে, খানায়ে কা'বায় প্রথমবারের মত যখন প্রকাশ্যে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করা হয় তখনও কুরায়শরা তাদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের উপাসনা শুরু করে দেয়। ফলে এক বিরাট সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং কুরায়শদের বাড়াবাড়িতে হারিস বিন আবূ হালা নামীয় জনৈক মুসলমান (তিনি সম্ভবত বিবি খাদীজা (রা)-এর প্রথম স্বামীর অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান ছিলেন) শাহাদত লাভ করেন। এ ঘটনার পর থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত খানায়ে কা'বায় মুসলমানদের সালাত আদায় বন্ধ থাকে।

ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, হযরত উসমান, হযরত যুবায়র, হযরত সাঈদ বিন যায়িদ ও হযরত আবুযর (রা) প্রমুখ যুবক ইসলাম গ্রহণ করলে পর তাঁদের অভিভাবকরা তাদের উপর নানা ধরনের জুলুম অত্যাচার চালায়। খুব সম্ভব ঐ সময়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে তাঁর গোত্রনেতা ও পিতৃব্য আবু তালিবের কাছে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। একবার একদল লোক এসে আবু তালিবকে শেষ কথা শুনিয়ে দিয়ে গেল, "আপনি হয় আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের দেবতাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে বারণ করুন নয়তো তার পৃষ্ঠপোষকতা পরিত্যাগ করুন।” তখন আবু তালিব রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ভালভাবে বুঝান কিন্তু তিনি উত্তরে বলেন, "এরা যদি আমার এক হাতে চাঁদ এবং অন্য হাতে সূর্য এনে দেয় তবু আমি আমার এই কর্তব্য কাজ থেকে বিরত থাকব না। যদি আপনিও আমার পৃষ্ঠপোষকতা ছেড়ে দেন তবু আমি পরোয়া করব না। যে মহান আল্লাহর নির্দেশে আমি এ কাজ করছি, তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট।” একদা কুরায়শ বংশের উতবা নামীয় ধীর গম্ভীর মেজাজের জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে নির্জনে অনেক কথাবার্তা বলেন। তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করেন, "আপনার এই প্রচারের উদ্দেশ্য কি?' ধন-সম্পদ চান? সুন্দরী রমণী চান? সমগ্র নগরের নেতৃত্ব চান?-আমরা আপনাকে সবকিছু দিতে রাযী আছি। তবে আপনি আমাদের দেবদেবীর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকুন এবং যারা এদের উপাসনা করে (আমাদের পূর্বপুরুষগণও এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত) তাদের জাহান্নামী হওয়ার ঘোষণা বন্ধ করুন।" উত্তরে রসূলুল্লাহ (সা) কুরআনের ঐ আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করতে লাগলেন, যাতে আল্লাহর আযাবকে ভয় করতে বলা হয়েছে। তিলাওয়াত শুনে উতবা এত প্রভাবান্বিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল যে, তার মনে হতে লাগল, এখনই বুঝি আল্লাহর আযাব নাযিল হবে। অবিলম্বে কুরআন তিলাওয়াত বন্ধ করার জন্য সে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কসম দিতে লাগল এবং অন্য কোন কথা না বলে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়ল।

নবুওতের ছয় বছর কেটে গেল। ইসলাম ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করল। যারা একবার ইসলাম গ্রহণ করল, শত প্রলোভন, প্ররোচনা, এমন কি অমানুষিক নির্যাতন তাদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে পারল না। এতে কুরায়শের মুশরিক নেতাদের ক্রোধ ক্রমশ বাড়তে লাগল। এই কঠিন মুহূর্তেও রসূলুল্লাহ্ (সা) ধৈর্যচ্যুত হলেন না বরং তিনি যথারীতি তাঁর পরম শত্রুদের সেবাযত্ন করে গেলেন। তাঁর এই উদার ব্যবহারের অপ্রত্যাশিত ফলও পাওয়া গেল। একদা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিতৃব্য হামযা শিকার থেকে প্রত্যাবর্তন কালে সংবাদ পেলেন, আবু জেহেল রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছে, এমন কি তাঁকে দৈহিক নির্যাতনও করেছে। হামযা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নি, কিন্তু এই ঘটনার খবর পাওয়া মাত্র তিনি সোজাসুজি হরমে চলে যান এবং সেখানে গিয়ে আবূ জেহেলকে দেখামাত্র হাতের ধনুক তার দিকে তাক করে বলেন, "এখনই আমি ইসলাম গ্রহণ করছি। যদি কারো সাহস থাকে তো আমার মুকাবিলা কর।”

রুকানা নামক পাহলোয়ানের ইসলাম গ্রহণের সঠিক সময় জানা যায় নি। তবে এটুকু জানা গেছে যে, সে নবুওতের সত্যতা প্রমাণের জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাঁর সাথে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল, "যদি আমি হেরে যাই তাহলে বিরাট মেষপালের এক-তৃতীয়াংশ আপনাকে দিয়ে দেব।” রসূলুল্লাহ্ মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং রুকানাকে একবার নয় বরং তিন তিনবার হারিয়ে দিয়ে তার সমস্ত মেষপালের অধিকারী হন। এতে রুকানা কান্নাকাটি শুরু করে দিলে রসূলুল্লাহ্ (সা) তার মেষপালটি ফেরত দিয়ে দেন। রসূলুল্লাহর এই ব্যবহারে সে যারপর নাই মুগ্ধ হয় এবং একাগ্রচিত্তে ইসলাম গ্রহণ করে (শরহে সীয়ার কবীর)। রুকানা এমন জবরদস্ত পাহলোয়ান ছিল যে, মাটিতে বিছানো একটি চামড়ার উপর সে যখন সোজা হয়ে দাঁড়াত তখন লোকেরা টেনে বের করার চেষ্টা করলে বাইরের অংশটি ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যেত কিন্তু তার পায়ের নীচের অংশটি যেমনটি ছিল তেমনটিই থাকত।

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার জন্য কুরায়শ গোত্রের কেউ এগিয়ে না আসায় উমরের আত্মমর্যাদা ও বীরত্বে আঘাত লাগে। এ কাজটি করতে হলে পুরস্কার লাভেরও আশা আছে। যাহোক উমর রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। পথিমধ্যে এক আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়। আত্মীয় উমরকে সম্বোর্ডন করে বলেন, "রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার পূর্বে তোমার নিজের ঘরের খবর নাও। তোমার সহোদরা ভগ্নি এবং ভগ্নিপতিও তো ইসলাম গ্রহণ করেছে।” একথা শুনে উমর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সোজাসুজি বোনের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেন এবং ভগ্নি ও ভগ্নিপতিকে প্রহার করতে থাকেন। তখন প্রহৃত বোন বলে উঠেন, 'হাঁ, আমরা মুসলমান হয়েছি, তোমার যা খুশি, তা করতে পার।' ঐ আওয়াজের কী জাদুকরী প্রভাব ছিল জানি না, তবে উমর তাতে শিউরে উঠেন এবং তাঁর হৃদয়ানুভূতি যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তিনি ভাবতে থাকেন, কী অহেতুক কাজেই না তিনি এবং তাঁর সম্প্রদায় লিপ্ত রয়েছেন! আল্লাহ্ নিঃসন্দেহে এক ও অদ্বিতীয়, আর এসব মূর্তি বেকার ও নিষ্কর্মা। এসব নিষ্কর্মাদের আরাধনা অসার ও ভিত্তিহীন। উমর ক্রমশ নরম হয়ে যান এবং বোনকে কুরআনের ঐ আয়াতটি দেখাতে বলেন, যা তিনি কিছুক্ষণ আগে পড়ছিলেন। বোন বললেন, 'তুমি অপবিত্র এবং অপবিত্র অবস্থায় কুরআন স্পর্শ করতে নেই। তুমি আগে গোসল করে এস, তারপর তিলাওয়াতের অনুমতি পাবে।' পাষাণ উমর তখন যেন গলিত মোমে পরিণত হন। তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে দেখা করার জন্যও ব্যাকুল হয়ে উঠেন। মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে উমর ইসলামের প্রসারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি আল-আরকমের বাড়িতে অবস্থানরত সকল মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) সবাইকে নিয়ে সেখানে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করেন। কোন কুরায়শই তাতে বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি। তবে এ ঘটনা তাদের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কুরায়শরা এবার মুসলমানদের সাথে সামাজিক বয়কটে নামে। এ বয়কটের দরুন রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরিবারকে দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত ভীষণ বিপদের মধ্যে কাটাতে হয়।

নবুওতের দশম বছর। তখন বয়কটের অবসান হয়েছে সত্যি, কিন্তু মুসলমানদের দুঃখের অবসান হয় নি। আর ঐ দুঃখজনক পরিস্থিতিতেই রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে শোক সাগরে ভাসিয়ে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন তাঁর সহধর্মিণী খাদীজা (রা) ও পিতৃব্য আবূ তালিব। আবূ তালিবের পর গোত্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন আবু লাহাব; কিন্তু নবুওত প্রাপ্তির সেই সূচনা থেকেই আবু লাহাবের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কোন বনিবনা ছিল না। এমনকি তিনি (আবূ লাহাব) রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোত্রচ্যুতির কথাও ঘোষণা করেছিলেন। সুতরাং বাধ্য হয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য পা বাড়াতে হল তায়েফের দিকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইসলাম প্রচারের সামান্য প্রচেষ্টা চালাতেই তিনি ভীষণভাবে প্রহৃত হয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হন। নিজ গোত্রের সাথে সুসম্পর্ক না থাকায় কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় তিনি মক্কায় প্রবেশাধিকার লাভ করেন। তবে বাহ্যত এই শর্ত ছিল যে, তিনি মক্কায় কোন প্রকার প্রচারধর্মী বক্তব্য রাখতে পারবেন না।

আরবের লোকেরা প্রতি বছরই মক্কায় হজ্জ করতে আসত এবং সে উপলক্ষে সেখানে বিরাট মেলা বসত। ঐ সব মেলায় যোগদানের ব্যাপারে কোনরূপ বাধানিষেধ ছিল না। তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) উকায, যুল মাজায, মুজনাহ্ প্রভৃতি মেলায় নিয়মিত যোগদান করতেন। তিনি সর্বপ্রথম নগরীর বাইরে মিনা প্রান্তরে কতিপয় গোত্রের লোকদের সাথে তাদের তাঁবুতেই সাক্ষাত করেন। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি ঐভাবে পনরটি গোত্রের সাথে পর্যায়ক্রমে সাক্ষাত করেন। তিনি তাদের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানান, "আপনারা আমায় সহযোগিতা করুন, আমাকে আপনাদের দেশে নিয়ে যান এবং আমায় প্রচারকার্যে সাহায্য করুন, এতে শুধু আপনাদের পরকালেরই নয় বরং ইহকালেরও প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে এবং আপনারা অতিসত্বর রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের অধিকারী হতে পারবেন। সাফল্য আপনাদের অনিবার্য। আবু লাহাব কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাঁর প্রায় প্রত্যেকটি সমাবেশে ও বক্তৃতায় ছায়ার মত অনুসরণ করে তাঁর শ্রোতাদের উদ্দেশ্য করে বলতে থাকলো, "সাবধান! আপনারা এ পাগলের কথায় কান দেবেন না, অন্যথায় আপনারা সমগ্র কুরায়শদের কোপানলে পড়বেন।” একদা রসূলুল্লাহ্ (সা) মিনা থেকে মক্কার দিকে ফিরে আসছেন। এমন সময় আকাবা উপত্যকায় মদীনার কয়েকজন হাজীকে দেখতে পেলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মনস্থ করলেন, ওদের কাছেও নবুওতের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাতুলালয় ছিল মদীনায়। মদীনাবাসীদের সাথে তাঁর ছিল মামা-ভাগ্নে সম্পর্ক; আর য়াহূদীদের সাথে সহ-অবস্থানের ফলে নবী, পরকাল, পুনরুত্থান ইত্যাদি সম্পর্কে মদীনাবাসীরা ছিল স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী।

তখনকার আহলে কিতাবীরা বিশ্বাস করত যে, সমগ্র বিশ্বের শান্তিদাতা রূপে অচিরেই একজন নবীর আবির্ভাব হবে, আর সেই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে য়াহূদীরা মদীনাবাসীদের বলত, "যখন ঐ প্রতিশ্রুত নবী আবির্ভূত হবেন তখন আমরা তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয়ে আমাদের শত্রুদের শায়েস্তা করবো।" যাহোক উপরোক্ত কারণে মদীনাবাসীরা শেষ নবী সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী ছিল এবং উক্ত নবী ইতিমধ্যে আবির্ভূত হয়েছেন বলেও তারা সংবাদ পেয়েছিল। আর এটা তাদের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, নিজেরা উক্ত নবীর খিদমতে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি নিজেই এসে তাদের কাছে উপস্থিত হয়েছেন। অতএব কোনরূপ ইতস্তত না করে আকাবায় অবস্থানকারী মদীনার হাজীরা তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করল এবং নিজেদের মাতৃভূমি মদীনায় ফিরে গিয়ে এর প্রচারে মনোনিবেশ করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিল।

এদেরই প্রচেষ্টায় এক বছরে মদীনায় যে দশ বারজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল, পরবর্তী হজ্জ মওসুমে তারা আকাবায় উপস্থিত হয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করে এবং নিজেদের ও নিজেদের গোত্রসমূহের পক্ষ থেকে এই বলে আনুগত্য প্রকাশ করে যে, তারা এক আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না; ব্যভিচার, চুরি ও কন্যা সন্তানদের হত্যা থেকে বিরত থাকবে, জেনে শুনে কারো বিরুদ্ধে অপবাদ রটাবে না এবং কখনো রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করবে না। এই প্রতিনিধিদল তাদের সাথে একজন শিক্ষক পাঠাবার জন্যও রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অনুরোধ জানায় এবং সে অনুযায়ী হযরত উমাইরকে মদীনায় পাঠনো হয়। হযরত উমাইর (রা) মদীনায় গিয়ে ইসলামের পক্ষে জোর প্রচার কার্য চালান এবং মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেন। এই পুণ্যবান ব্যক্তি সেখানে কিভাবে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদন করেছিলেন এবং সেখানকার বিরুদ্ধ মতাবলম্বী নেতাদেরকে কিভাবে নিজের বশে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন তারীখে তাবারীতে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মদীনার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত উমর (রা)-এর মতই একজন তেজস্বী ও সাহসী নেতা ছিলেন। কুরআনের কয়েকটি আয়াত শোনামাত্র তিনিও ইসলামের প্রতি এতই অভিভূত হয়ে পড়েন যে, মহল্লায় গিয়ে আপন অনুসারীদের প্রতি প্রকাশ্য ঘোষণা দেন, "তোমরা যদি আমার কাছ থেকে সদ্ব্যবহার পেতে চাও, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নাও, অন্যথায় আমিও হব তোমাদের সবচাইতে ঘোর শত্রু।” তাঁর ঐ ঘোষণার ফলে সেদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই গোত্রের সব লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়।

আর একটি বছর অতিবাহিত হল। ইতিমধ্যে হযরত উমাইরের হাতে যাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন তাঁদের একটি বিরাট দল হজ্জ উপলক্ষে মিনায় আসেন এবং আকাবা উপত্যকায় তাঁদের প্রিয় নেতা রসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করেন। তারা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে মদীনা গমনের অনুরোধ জানান এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাঁরা সেখানে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর মক্কার সাথীদের যথাযোগ্য মেহমানদারী করবেন এবং এমনভাবে তাঁদের নিরাপত্তা বিধান করবেন, যেমন তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা বিধান করে থাকেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) তখন বললেন, "তোমাদের যুদ্ধ আমাদেরই যুদ্ধ এবং তোমাদের সন্ধি আমাদেরই সন্ধি। আমি এখন তোমাদেরই হয়ে গেলাম।"

এটা ছিল বিশ্বের স্মরণকালের ইতিহাসে এমন একটি বাস্তব সামাজিক চুক্তি, যার মাধ্যমে কিছু লোক এক ব্যক্তিকে তাদের নেতা মনোনীত করে এবং চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অধিকার এবং দায়িত্বও নির্ধারণ করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনার পর থেকেই হিজরতের কার্যকরী পদক্ষেপ শুরু হয়।

হিজরতের পর, ক্ষমতার প্রসার ও সরকার গঠনকালীন যুগেও ইসলাম প্রচারের কাজ ছিল মুখ্য। এজন্য দিকে দিকে শিক্ষক ও মুবাল্লিগ পাঠানো হত। আর সরকারী সংস্থাগুলো এদের পৃষ্ঠপোষকতা ও নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করত। তবে অমুসলিম নাগরিকদের সাথেও সম্পূর্ণ ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক ব্যবহার করা হত। অবশ্য তারা অনুভব করত যে, তারা একটি জাতীয় ও ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্রে নয় বরং এমন একটি রাষ্ট্রে বাস করছে, যার রয়েছে একটি বিশেষ জীবন-দর্শন। মুসলমান কৃষকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ভূমি রাজস্ব আদায় করা হত, তাদের কাছ থেকে আদায় করা হত তার চাইতে অনেক কম। মুসলমান বণিকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ আয়কর আদায় করা হত তাদের কাছ থেকে আদায় করা হত তার অর্ধাংশ মাত্র। জিহাদ ছিল মুসলমানদের জন্য ফরয বা অবশ্য কর্তব্য; পক্ষান্তরে অমুসলিমদের উপর এ ব্যাপারে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। তারা কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার এবং রাষ্ট্রীয় তহবিলে জিযিয়া কর জমা দিয়ে স্ব স্ব গৃহে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারত। একজন অমুসলিম সহজেই ইসলামী প্রধান বা শাসক হতে পারত না, ততক্ষণ না সে রাষ্ট্রের 'জীবনদর্শন'কে নিজের জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করত এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি ক্ষেত্রে এই জীবনদর্শনের জন্যই নিজের জান, মাল ও সর্বশক্তি নিয়োগ করত।

ইসলামের জীবন-দর্শন সহজ বিষয় নয়। অন্যকে সৎ কাজের আদেশ দেবে অথচ নিজে তা করবে না-সে সুযোগ ইসলামে নেই। স্বয়ং রসূলুল্লাহ্ (সা) অন্যকে যে কাজের আদেশ দিতেন, নিজে তার চেয়ে অধিক পরিমাণে সে কাজ করতেন।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ইসলাম প্রচারে মহিলাদের অবদান

📄 ইসলাম প্রচারে মহিলাদের অবদান


হযরত মুহাম্মদ (সা) যৌবনে অন্যের ব্যবসা পরিচালনা করে কিংবা ব্যবসা- প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে নিজের বৈধ ও হালাল জীবিকা অর্জন করতেন। অসহায় ও অক্ষমদের সাহায্যার্থেও তিনি সদা-সচেষ্ট থাকতেন। হিজরী-পূর্ব ১৩ সালে চল্লিশ বছর বয়সে নবুওয়ত প্রচারের জন্য যখন আদিষ্ট হন, তখন থেকে পূর্ণ সময়টাই তিনি প্রচার ও সংস্কারমূলক কাজে ব্যয় করেন। এ দায়িত্ব পালনে তিনি রাত দিন নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। এ জগতটাই আসলে কাজের জগত। এখানে নবী-রসূলদের পবিত্র কাজেও 'কুন্ ফা-ইয়াকুন' অর্থাৎ বললাম, 'হও এবং হয়ে গেল' ভিত্তিতে সম্পন্ন হয় না। কাজে কাজেই পৃথিবীর প্রত্যেকটি নতুন সংস্কার আন্দোলনের ন্যায় ইসলাম প্রচার আন্দোলনের জন্যেও প্রয়োজন ছিল অগণিত মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা তথা ত্যাগ-তিতিক্ষার। এ ব্যাপারে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিম মহিলারাও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। আমাদের ঐতিহাসিকরা এ ব্যাপারে যেসব তথ্য রেখে গেছেন, তা নিতান্তই অপ্রতুল। তবু বিষয়টি যেহেতু শিক্ষণীয়, তাই আমরা প্রাপ্ত তথ্যাদির উপরই এ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করছি।

খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ
এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম মুসলিম জননী খাদীজাতুল কুবরা (রা) সম্পর্কে আলোচনা করতে হয়। কেননা তিনি শুধুমাত্র বিশ্বনবীর সম্মানিতা জীবন সঙ্গিনীই ছিলেন না, নবুওতের প্রাথমিক যুগে অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রেও রেখেছিলেন এক বিরাট অবদান। আমীর-উমারা ও বন্ধু-বান্ধবদের ভূরিভোজের মাধ্যমে নয়, বরং দরিদ্রের সাহায্য ও অক্ষমদের সেবার মাধ্যমেই প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা লাভ করা যায়। প্রাক-নবুওয়ত যুগে বিবি খাদীজা (রা) তাঁর সমস্ত সম্পত্তি য়াতিম, বিধবা ও অনাথদের সেবায় আপন স্বামীর জন্য ওয়াকফ্ করে দিয়েছিলেন। কাজে কাজেই তা ব্যয়িত হয়েছিল ইয়াতিম, বিধবা ও অনাথদের সেবায়। এভাবে বিবি খাদীজা (রা) আমীর-ফকীর- সবার কাছেই আপন স্বামীকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর এ মর্যাদা দীনের প্রচার কার্যে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিভিন্নমুখী সমস্যার কারণে যখন রসূলে করীম (সা) পরিশ্রান্ত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন তখন তাঁর খাদীজা (রা)-এর মত একজন সান্ত্বনাদানকারিণী রমণীর সাহচর্যের খুবই প্রয়োজন ছিল। মানবসুলভ দুর্বলতার কারণে রসূলুল্লাহ্ (সা) ঘাবড়ে গেলে বিবি খাদীজা (রা) তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন এবং ইসলামের মহান আন্দোলন পরিচালনার উপর তাঁকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতেন। ইতিহাসে এ জাতীয় বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইসলামের আবির্ভাবের সংবাদ বিবি খাদীজা (রা) কর্তৃক তাঁর পিতৃব্যপুত্র ওরাকা বিন নওফেলের কাছে পৌঁছানো ও আপন স্বামীকে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা তো সর্বজনবিদিত। কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায়, বিবি খাদীজা মক্কার জনৈক খ্রীস্টানের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়েছিলেন (সীরাতে কেরামত আলী)। নিজে ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে পরিবারের সকল দাসদাসীকে ইসলামে বায়আত করানো বিবি খাদীজার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁর ইসলাম গ্রহণ তাঁর গোত্রের উপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছিল। কুরায়শদের অমানবিক সামাজিক বয়কটের সময় বিবি খাদীজাও মুসলমানদের সাথে 'আবু তালিব উপত্যকায়' বন্দী ছিলেন। তাই সেই সংকটময় অবস্থায়ও কুরায়শদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে তাঁকে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হাকীম বিন হাজাম মাঝে মাঝে কিছু না কিছু খাদ্যদ্রব্য পাঠাত। এতে প্রমাণিত হয় যে, তাঁর গোত্রের লোকেরা পুরোপুরি ইসলাম গ্রহণ না করলেও হযরত খাদীজা (রা)-এর কারণে মুসলমানদের বিরোধিতা না করে বরং সময় ও সুযোগমত কিছুটা সহযোগিতাই করেছে।

বিবি গুযাইয়াহ্ (রা)
মুহাম্মদ বিন হাবীব আল-বাগদাদী (মৃত্যু ২৪৫ হি.) স্বীয় গ্রন্থ "আল-মুহাব্বর'- এ উল্লেখ করেছেন, বিবি গুযাইয়াহ্ (রা) মুসলমান হওয়ার পর প্রচারকার্য চালিয়ে মক্কার অনেক মহিলাকে ইসলামে বায়আত করেন। এতে কুরায়শরা দারুণভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। যেহেতু গুযাইয়াহ (রা) কুরায়শী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন মরুচারিণী বেদুঈন; তাই কুরায়শরা তাঁকে শহর থেকে বের করে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করে। তারা তাঁকে একটি কাফেলার হাতে সোপর্দ করে যাতে ঐ কাফেলা হাত পা বাঁধা অবস্থায়ই তাঁকে তাঁর গোত্রের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। বিবি গুযাইয়াহ্ বর্ণনা করেছেন, 'এই লোকেরা একবারও আমাকে পানাহারের সুযোগ দেয় নি, বরং যখনই তারা কোন মনযিলে অবতরণ করত, তখন আমাকে হাত পা বাঁধা অবস্থায়ই রোদের মধ্যে ফেলে রাখত। এভাবে তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠে এবং আমি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি। এক রাতে আমি ঐ অবস্থায়ই আছি-এমন একটি অদৃশ্য বস্তু এসে আমার মুখে লাগে; আমি তা থেকে কিছু পানি চুষে খেয়ে চেতনা লাভ করি। তারপর পেট পুরেই পানি পান করি। সকালে উঠে লোকেরা আমার এই পরিবর্তিত উন্নত অবস্থা দেখে সন্দেহ করলো, নিশ্চয়ই আমি বাঁধনমুক্ত হয়ে চুরি করে কাফেলার পানি পান করেছি। কিন্তু যখন লক্ষ্য করলো যে, আমার দড়ি যেমনটি ছিল ঠিক তেমনটিই রয়েছে এবং তাদের মশকসমূহের মুখও যেভাবে বাঁধা ছিল অবিকল সেভাবেই বাঁধা রয়েছে তখন তারা বুঝতে পারলো যে, এটা আমার প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার অসীম করুণা ও অদৃশ্য সাহায্য ছাড়া কিছু নয়। এই ঘটনা দ্বারা কাফেলার লোকেরা যারপর নাই প্রভাবান্বিত হল এবং সকলে একসাথে তওবা করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিল। আল্লাহর রসূলের প্রতি বিবি গুযাইয়াহর বিশ্বাস এতই প্রগাঢ় ছিল যে, "এবং কোন বিশ্বাসী নারী নবীর নিকট নিজেকে নিবেদন করলে"-এই আয়াতটি তাঁরই সম্পর্কে নাযিল হয়।

উম্মে শরীফ দাওসিয়াহ (রা)
উস্ দুল গাবা-এর বরাত দিয়ে 'সিয়ারুস্ সাহাবীয়াত' (দারুন মুসান্নিফীন)-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, উম্মে শরীফ দাওসিয়াহ (রা) গোপনীয়তা রক্ষা করে অত্যন্ত কৌশলের সাথে মহিলাদের মধ্যে ইসলামের প্রচারকার্য চালান, ফলে কুরায়শী মহিলাদের মধ্যে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে।

ফাতিমা বিনতে আল-খাত্তাব (রা)
ফাতিমা বিনতে আল-খাত্তাব (রা) ছিলেন উমর (রা)-এর বোন। তিনি কিভাবে হযরত উমর (রা)-কে প্রভাবান্বিত করেছিলেন, আর কিভাবে হযরত উমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তা তো ইসলামী ইতিহাসের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। জাহিলিয়া যুগে কুরায়শদের মধ্যে যে কয়জন মহিলা পড়াশোনা জানতেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম।

সা'দা বিনতে কুরায়য (রা)
ইবনে হজর তাঁর 'ইসাবা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, সা'দা বিনতে কুরায়য (রা)-এর অনুপ্রেরণায় হযরত উসমান (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। খুব সম্ভব তিনি ছিলেন হযরত উসমানের খালা। তাঁর সম্পর্কে এর অধিক কিছু জানা যায়নি। 'তৃতীয় আকাবা' (যাকে হিজরতের ভূমিকা বলা হয়)-এর সম্মিলিত শপথে দু'জন মহিলাও অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। এ তো গেল হিজরত-পূর্ব যুগের ঘটনা। হিজরত-উত্তর যুগেও কয়েকজন মহিলা দীনের প্রচার কার্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। বলা হয়ে থকে, মক্কার মহিলাদের চেয়ে মদীনার মহিলারা ছিলেন এক্ষেত্রে অধিক অগ্রণী। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তারা যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তার কিছু বিবরণী নিম্নে দেওয়া গেল।

উম্মে সালীম বিনতে মালহান (রা)
উম্মে সালীম বিনতে মালহান (রা) একজন সিংহ-হৃদয়া মহিলা ছিলেন। তিনি এবং তাঁর বোন যুদ্ধের ময়দানে খঞ্জর হাতে অংশগ্রহণ করতেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। হুনাইনের যুদ্ধে ইসলামী সেনাবাহিনীর পলায়নকারী মক্কী স্বেচ্ছাসেবকদেরকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের জন্যে যুদ্ধে বিজয় লাভের পর তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে পরামর্শ দিয়েছিলেন। (সহীহ মুসলিম, সিয়ারুস সাহাবীয়াত)
উম্মে সালীম (রা)-এর স্বামী পৌত্তলিক ছিলেন। তিনি একটি বৃক্ষের পূজা করতেন। উম্মে সালীম মুসলমান হওয়ার পর বৃক্ষপূজার কারণে স্বামীকে ধিক্কার দিতেন এবং রহস্য করে বলতেন, 'যে উদ্ভিদ মাটির ভেতর থেকে বের হয় সে আবার প্রভু হয় কিভাবে? স্বামী ধীরে ধীরে তাঁর কথা দ্বারা প্রভাবান্বিত হন এবং শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেন। (ইসাবা, ইবনে সা'দ)

বিবিধ বিষয়
রসূলুল্লাহ (সা) সদুপদেশ দানের জন্য মসজিদে নববীতে একটি পৃথক মাহফিলের ব্যবস্থা করতেন এবং সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে তা বসত। চাঁদার জন্য যখন বিশেষ আহ্বান জানানো হত তখন এ জাতীয় মাহফিল থেকে উৎসাহজনক সাড়া পাওয়া যেত। সহীহ বুখারীতে একদিনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে : হযরত বিলাল সফ্ (নামাযের সারি)-সমূহ ঘুরে ঘুরে চাঁদা সংগ্রহ করছিলেন, আর মহিলারা রসূলুল্লাহ্ (সা)-র আহ্বানে নিজেদের কাঁকন, বালি (অলংকার) ইত্যাদি খুলে খুলে আল্লাহ্র রাস্তায় দান করছিলেন।

বাবুর্চি ও সেবিকা হয়ে মুসলিম মহিলারা যে স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশ নিতেন তার উল্লেখ এখানে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও বিদেশ থেকে আগত অমুসলিম রাষ্ট্রের দূতরা মদীনায় এলে আনসার মহিলারা যে তাদের মেহমানদারীর দায়িত্ব বহন করতেন তাঁর কথা তো এখানে অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে না! ইবনে সা'দ ইত্যাদি গ্রন্থে প্রায়ই এমন একজন মহিলা আনসারীর বাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বিদেশী রাষ্ট্রদূতরা অবস্থান করতেন এবং তাঁদের পানাহারের ব্যবস্থাও সেখানেই করা হত।

মোটকথা, মহিলারাও রসূলে আকরাম (সা)-এর দীনের প্রচার কার্যে যথেষ্ট অবদান রাখেন। তাঁরা তাঁদের স্বামী, ভৃত্য, দাসদাসী, আত্মীয়-স্বজন ও সখী-বান্ধবীদেরকেও ইসলাম গ্রহণে অনুপ্রাণিত করেন। ইসলামের জন্যে তাঁরা অকাতরে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন সহ্য করেন। কিছুসংখ্যক মহিলা পুরুষদের সাথে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তাদের ঈমান যে অত্যন্ত মজুত ছিল তা আবিসিনিয়ার একটি ঘটনা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়। সেখানকার ঈসায়ী পরিবেশে অবস্থানকালে উম্মে হাবীবা (রা)-এর স্বামী উবায়দুল্লাহ বিন জুহশ এবং সওদা (রা)-এর স্বামী সুকরান ইসলাম ছেড়ে খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন, কিন্তু ঐ মহিলাদ্বয় ইসলামেই অবিচল থাকেন। আর তারই পুরস্কারস্বরূপ পরবর্তী সময়ে তাঁরা 'উম্মুল মুমিনীন' [রসূলুল্লাহ্ (সা)-র পত্নী] হওয়ায় সৌভাগ্য অর্জন করেন।

হযরত উমর (রা)-এর পরিবারের দু'জন দাসী-যুনীরা (রা) ও লবিনা (রা) মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত 'উমর (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) তাঁদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাতেন। জানা যায়, তিনি তাঁদেরকে প্রহার করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে থেমে যেতেন। অতঃপর তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন, "তোমরা মনে করো না যে, আমি তোমাদের উপর সদয় হয়ে গেছি বরং পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ার কারণেই একটু জিরিয়ে নিচ্ছি। তৈরী হয়ে যাও। শীঘ্রই তোমাদের উপর প্রহার শুরু করবো।” মহিলা দুজন হাসিমুখে ঐ নির্যাতন সহ্য করে নেন, কিন্তু ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি।

সওবিয়া (রা)-ও (যিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে কয়েকদিন নিজের স্তনের দুধ খাইয়েছিলেন) জুলুম নির্যাতনের কোন পরোয়া না করেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি ইতিপূর্বে আযাদ (মুক্ত) হয়েছিলেন তাই আবু লাহাব খুব সম্ভব তাকে শাস্তিদানের কোন সুযোগ পায়নি।

সাফা বিনতে আবদুল্লাহ আলআদভিয়াহ্ (রা) কখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তিনি হযরত উমর (রা)-এর আত্মীয়া ছিলেন এবং ভাল লেখাপড়া জানতেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে মুসলিম-জননী বিবি হাফসা (রা)-কে শিক্ষাদানের কাজে নিয়োগ করেছিলেন। ঐ মহিলা নানা দিক দিয়ে মুসলমানদের উন্নতির জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পলন করেন।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 কুরায়শের সাথে সংঘাত

📄 কুরায়শের সাথে সংঘাত


সত্যিকথা বলতে গেলে, নবুয়ত প্রাপ্তির সাথে সাথে কুরায়শদের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যে সংঘাত শুরু হয়, তা মক্কা বিজয় পর্যন্ত স্থায়ী থাকে এবং বিদায় হজ্জে গিয়ে সমাপ্ত হয়। এই সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে বিভিন্ন অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক সংঘাতের সূচনা হয় তৃতীয় আকাবার শপথের সাথে সাথে। শেষ পর্যন্ত কুরায়শরা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। মক্কা থেকে হিজরত, মদীনায় বণিকদল অবরোধ, বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ—এসব ছিল ঐ সংঘর্ষেরই বিভিন্ন অংশ। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য আমার লেখা ‘আহদে নববী মে ময়দানে জঙ্গ’ পুস্তকটি পাঠ করার জন্যে আমি পাঠকদের আহ্বান জানাচ্ছি। কেননা উক্ত পুস্তকে এসব সংঘর্ষের পটভূমি ও ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ পুস্তকে শুধু হুদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের উপর দুটি অধ্যায় সংযোজিত হয়েছে এবং তাতে কুরায়শদের সাথে রাজনৈতিক সংঘাতের যথেষ্ট তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। এর অধিক আলোচনার অবকাশ বা প্রয়োজন এখানে আছে বলে মনে হয় না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px