📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 সামাজিক ও নাগরিক জীবন

📄 সামাজিক ও নাগরিক জীবন


বিবাহ-উত্তর জীবন
বিবি খাদীজার মৃত স্বামীদ্বয়ের সন্তানরা আরবের প্রচলিত প্রথানুযায়ী সম্ভবত তাঁর শ্বশুরালয়েই রয়ে গিয়েছিল। কেননা, তাঁর এ বিয়ের সময় তাঁর সন্তানরা বেশ বড়সড় হয়ে গিয়েছিল। যা হোক, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পারিবারিক জীবনে কিন্তু এসব সন্তানের বিশেষ কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে অনুমান করা হয় যে, এদের সাথে তাঁর ব্যবহার নিশ্চয়ই সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল।

দুধমায়ের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সম্পর্ক ছিল সবসময়ই মধুর। সুহাইলী তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, "রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিবাহের পর বৃদ্ধা হালিমা তাঁকে দেখতে এলে নববধূ বিবি খাদীজা তাঁর সাথে অত্যন্ত শিষ্টাচারপূর্ণ ব্যবহার করেন এবং তাঁকে উপঢৌকনস্বরূপ কয়েকটি উট প্রদান করেন। বিবি হালিমা অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করেন এবং নবদম্পতির মঙ্গল কামনা করে তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নেন।” ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বিবি হালিমা তাঁর দুর্ভিক্ষজনিত অভাবের কথা ব্যক্ত করলে বিবি খাদীজা তাঁকে চল্লিশটি ছাগল এবং একটি উট দান করেন।

বিবি খাদীজার সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বৈবাহিক জীবন যে কত মধুর ও সুখময় ছিল তা দশ বছরের মধ্যে ছয়-সাতটি সন্তান লাভের মাধ্যমেই নয় বরং বিবি খাদীজার ইন্তেকালের পর রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে যেরূপ আবেগ-উচ্ছ্বাসের সাথে স্মরণ করতেন, তা থেকেও অতি সহজে অনুমান করা যায়। রসূলুল্লাহ্ (সা) বিবি খাদীজাকে এত বেশি স্মরণ করতেন-যা তাঁর সবচেয়ে প্রিয়তমা পত্নী হযরত আয়েশার কাছেও ছিল দস্তুরমত ঈর্যার ব্যাপার। রসূলুল্লাহ্ (সা) যতক্ষণ ঘরে থাকতেন, ততক্ষণ স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির সাথে কিরূপ মধুর ব্যবহার করতেন, তাদেরকে কত বেশি আদর করতেন এবং তাদের মন রক্ষা করার প্রতি কিরূপ যত্নবান থাকতেন, হাদীস গ্রন্থাদিতে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি তাঁদেরকে সব সময়ই ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বদান্যতার প্রশিক্ষণ দিতেন ও তাঁদের বোধগম্য হয় এমন কথাবার্তা বলতেন। সত্যিকথা বলতে গেলে, সকলের সাথে সবসময় সদ্ভাব বজায় রেখে চলাই ছিল তাঁর আচরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বিবাহ-উত্তর ও নবুওতপূর্ব পনর বছরের জীবন তিনি কিভাবে কাটিয়েছিলেন তার সত্যিকার রূপরেখা একমাত্র কোন অভিজ্ঞ প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে। নবুওতের প্রাথমিক যুগে আল্লাহ্ কর্তৃক তাঁকে প্রদত্ত 'উম্মী' (নিরক্ষর) উপাধির কারণে তিনি বিচলিত হয়ে পড়লে বিবি খাদীজা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, "আপনি নিঃসন্দেহ থাকুন, আল্লাহ্ আপনাকে বিপর্যস্ত করবেন না এবং আপনার জন্য কল্যাণকর নয় এমন কিছুও করবেন না। কেননা, আপনি নিকটাত্মীয়দের হক আদায় করেন, অতিথিদের সেবাযত্ব করেন, পরিবারের ভরণ-পোষণ করেন, পরিশ্রম করে রোজগার করেন, ন্যায় ও সত্যের কাজে সকলকে সাহায্য করেন, অনাথদের আশ্রয় দেন, সবসময় সত্য কথা বলেন, কখনো বিশ্বাসঘাত করেন না, অক্ষমদের সাহায্য করেন, গরীব নিঃস্বদের সাথে সদ্ব্যবহার করেন এবং সকলের সাথেই সদ্ভাব রাখেন।"

রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আর যেসব গুণের সন্ধান পাওয়া যায়, তা হলো, তিনি নিজে শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন, বসে বসে ধনবতী স্ত্রীর সম্পত্তি ভোগ করাকে তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি খাদ্যশস্যের ব্যবসা করতেন। খুব সম্ভব তিনি ব্যবসায়ে অন্য কোন লোকের সাথে অংশীদার ছিলেন।

তাবারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, ঐ সময়ে মক্কায় একবার ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন আবু তালিবের বিরাট পরিবারটি অত্যন্ত দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়। একদিন রসূলুল্লাহ্ (সা) পিতৃব্য আব্বাসের কাছে গিয়ে আবূ তালিবকে এই দুঃসময়ে সাহায্য করার আবেদন জানান। শেষ পর্যন্ত তিনি এবং আব্বাস আবু তালিবের পুত্র যথাক্রমে আলী এবং জাফরকে ভরণ-পোষণের জন্য নিজ নিজ পরিবারে নিয়ে আসেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রতিটি সৎকর্মেই ছিলেন অগ্রণী এবং এক্ষেত্রে অন্যান্যকেও তিনি অনুপ্রেরণা দান করতেন।

উল্লেখিত আচার-আচরণের কারণেই সমগ্র মক্কা নগরীতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। আযরাকী প্রমুখ ইতিহাসবিদের মতে, যদিও চল্লিশের কম বয়স্ক লোকের পক্ষে মক্কা নগরীর (ব্যবস্থাপনার) সদস্যপদ লাভ করার সুযোগ ছিল না, কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দূরদর্শিতা, ন্যায়বিচারসুলভ ও পক্ষপাতহীন আচরণের কারণে যেকোন সমস্যা সমাধানে তার বয়োজ্যেষ্ঠরাও যে তাঁর উপর নির্ভরশীল ছিলেন তার বাস্তব দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করা যায় নগরের একাধিক সমস্যা সমাধানে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স যখন আনুমানিক পঁয়ত্রিশ বছর তখন একটি অগ্নিকাণ্ডের কারণে এবং পরবর্তী সময়ে ধ্বংসাত্মক বন্যার ফলে পবিত্র কা'বাগৃহের প্রাচীর ধ্বসে পড়ে। মক্কা ছিল চতুর্দিক দিয়ে পর্বতশ্রেণী পরিবেষ্টিত এবং এর সবচেয়ে নীচু জায়গায় ছিল পবিত্র কা'বাগৃহের অবস্থান। ফলে, নগরে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই সমস্ত পানি এখানে এসে জমা হতো। পূর্ব অভিজ্ঞতা সামনে রেখে 'আ'মির আল জাদির' নামক মক্কার জনৈক দলপতি কা'বার মূল প্রাচীরকে বন্যার স্রোত থেকে রক্ষা করার জন্যে এর চতুর্দিকে পৃথক আর একটি প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু উল্লেখিত বছরে এত অধিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়েছিল যে, বাইরের প্রাচীর মূল প্রাচীরকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ফলে বাধ্য হয়েই এটা পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন পর্যন্ত কা'বাগৃহের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয়ই ছিল ন'হাত করে এবং উচ্চতা ছিল মানুষের দেহের উচ্চতার চাইতে সামান্য কিছু বেশি। এছাড়া এর উপরিভাগে ছাদের কোন ব্যবস্থা ছিল না। সে বছর মক্কা নগরীর উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী সাগরের উপর দিয়েও ঝড় বয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। বাস্তবে হয়েও ছিল তা-ই এবং ঐ সর্বনাশা ঝড়ের কবলে পড়ে জিদ্দার অদূরে একটি রোমীয় জাহাজ ডাঙ্গায় আটকা পড়ে এবং তা লুণ্ঠিত হয়। আযরাকীর মতানুসারে, ঐ সংবাদ যখন মক্কাবাসীদের কাছে পৌঁছে তখন তারা সম্পদের লোভ-লালসা পরিহার করে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসে। ঐ জাহাজের আরোহীদের মধ্যে যারা প্রাণে বেঁচেছিল তারা তাদের সেবাযত্ব করে এবং যে সমস্ত পণ্যদ্রব্য রক্ষা পেয়েছিল, সেগুলো তারা শুধু উচিত মূল্যে কিনেই নেয়নি বরং সেগুলোর শুল্কও রহিত করে দেয়। তারা জাহাজের তক্তাগুলোও কিনে নেয়। মক্কায় বাকুম নাম্নী জনৈকা মিসরী মহিলার সন্ধান পাওয়া যায়। এক বর্ণনানুসারে ঐ বৃদ্ধাটিও ঝড়ে আক্রান্ত হয়েছিল এবং মক্কাবাসীদের উদার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে চিরদিনের জন্য সেখানেই রয়ে গিয়েছিল। কোন কোন বর্ণনা মতে, মর্মর পাথর, লোহা, কাঠ ইত্যাদি গৃহনির্মাণ সামগ্রীই ছিল ঐ জাহাজের পণ্যদ্রব্য। একটি গীর্জা নির্মাণের জন্য ঐসব সামগ্রী মিসর হতে আবিসিনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। অতএব কা'বাগৃহ নির্মাণে ব্যবহারযোগ্য ঐসব প্রয়োজনীয় অথচ অত্যুৎকৃষ্ট সামগ্রী কোনরূপ চেষ্টা-চরিত্র ছাড়াই মক্কাবাসীরা পেয়ে যায়। তখন মক্কাবাসীদের চোখের সামনে আর একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে; আর তা হচ্ছে এই যে, ভালভাবে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পূজার নযর-নিয়াজ তথা নৈবেদ্যাদি কা'বার দরজার নিকটস্থ যে অন্ধকূপে নিক্ষেপ করা হতো, সেখানে কোথা থেকে একটি বিরাট সর্প এসে বাসা বাঁধে। ফলে জনমনে দারুণ ত্রাসের সৃষ্টি হয়। যখন কা'বাগৃহ পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছিল তখন হঠাৎ একদিন সাপটি অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে এসে প্রাচীরের উপর ঘোরাফেরা করতে থাকে এবং ঠিক তখনি একটি বাজপাখী কোথা থেকে বিদ্যুৎ বেগে উড়ে এসে সাপটি ছোঁ মেরে ধরে নিয়ে যায়। এ বিস্ময়কর অথচ অলৌকিক ঘটনা থেকে মক্কাবাসীরা এই অনুপ্রেরণা লাভ করে যে, তারা তাদের এই প্রাচীন ও পবিত্র উপাসনালয় নির্মাণে অবৈধ উপায়ে অর্জিত কোন টাকা-পয়সা খরচ করবে না। জুলুম অথবা বল প্রয়োগের মাধ্যমে কিংবা সুদী ব্যবসা করে যেসব অর্থ উপার্জিত হয়েছে সেগুলোও এই পুণ্য কাজে ব্যয় করা হবে না। কা'বাগৃহ ছিল চার প্রাচীর বিশিষ্ট এবং এর নির্মাণ কাজ মক্কাবাসীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল।

দরজা সংলগ্ন প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব আব্দে মনাফ এবং বনী যুহরার উপর পড়েছিল। হজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী প্রাচীরের নির্মাণ কাজ বনী মখযুম, তায়ীম ইত্যাদি গোত্র গ্রহণ করেছিল। পেছনের প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব ছিল বনী সাহাম ও বনী জামাহ-এর উপর। হজর বা হাতীম সংলগ্ন প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব ছিল বনী আবদেদার, বনী আসাদ ও বনী আদীর উপর। পুরাতন প্রাচীরটিকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে অপসারণ করা হয়। গৃহের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আগের চাইতে দ্বিগুণ করা হয়। একটি সিঁড়িও নির্মাণ করা হয় এবং উপরিভাগে ছাদ দেয়া হয়। কা'বার 'হাতীম' নামক অংশটি ছাদবিহীন অবস্থায় অর্ধেক প্রাচীর দ্বারা বৃত্তাকারে নির্মাণ করা হয়। কিছু ফাঁক রেখে এর দু'দিকের প্রাচীরকে কা'বাপ্রাচীর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, যাতে যেকোন লোক যেকোন সময় এতে প্রবেশ করতে পারে। এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ছিল কা'বাগৃহে প্রবেশ করারই শামিল। সাধারণ চুক্তি সম্পাদন, শপথ গ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে জনসাধারণ হাতীমকেই ব্যবহার করত। তারা মূলগৃহে সপ্তাহে শুধু সোমবার ও বৃহস্পতিবার-এ দুদিন প্রবেশ করত। অবশ্য বিশেষ বিশেষ উৎসব উপলক্ষে অন্য যেকোন দিনও প্রবেশ করা চলত। প্রাচীরের নির্মাণ কাজ শুরু হলে নগরের সকলেই পাথর বহন এবং তা স্থাপনের কাজে অংশ নিতে থাকে। প্রাচীর নির্মাণের কাজ উচ্চতায় দেড় গজ পর্যন্ত পৌঁছলে 'হজরে আসওয়াদ'কে এমন একটি জায়গায় স্থাপনের প্রয়োজন অনুমিত হয় যেখান থেকে তা তওয়াফকারীদের নজরে পড়ে এবং তারা সেটাকে সহজে চুম্বনও করতে পারে। হজরে আসওয়াদ ছিল একটি পবিত্র পাথর; একে যথাস্থানে স্থাপন করা ছিল একটি অতি সম্মানের কাজ। সুতরাং প্রত্যেক গোত্রের লোকই সে কাজটি সমাধা করতে চায়। শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্বকলহের সৃষ্টি হয় এবং তা যুদ্ধের আকার ধারণ করে। হাতীম অংশের নির্মাণকারীরা 'রক্তপূর্ণ পাত্রে হাত ডুবিয়ে' শপথ নিল যে, তারা কিছুতেই এ সম্মানজনক কাজ সমাধা না করে ছাড়বে না। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে পাঁচদিন পর্যন্ত কা'বার নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকে। অবশেষে এ সংকট নিরসনের জন্যে কা'বা প্রাঙ্গণেই পরস্পর সলা-পরামর্শ চলতে থাকে! বৃদ্ধ উমাইয়া বিন আল-মুগীরা সকলকে সম্বোধন করে বললেন, "তোমরা এই ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। আগামী দিন যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম এ পথে কা'বাগৃহে আসবে সে এ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত দেবে তাই তোমরা মেনে নেবে।” (অতি প্রত্যূষে) হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে সর্বাগ্রে সেখানে আসতে দেখে দূর হতে সকলেই সমস্বরে বলে উঠল, "এই তো আমাদের আল- আমীন আসছে, এই তো আমাদের মুহাম্মদ (সা) আসছে, আমরা সকলে তাঁর উপরই মীমাংসার ভার অর্পণ করলাম।” রসূলুল্লাহ (সা) যখন কাছে এলেন তখন আসল ঘটনার কথা তাঁকে বলা হলো। তখন তিনি ইচ্ছা করলে এ সম্মানজনক কাজটি নিজের জন্য অথবা নিজের গোত্রের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে তৎক্ষণাৎ একখানি চাদর চেয়ে নিয়ে তাতে হজরে আসওয়াদ রাখেন এবং প্রত্যেক গোত্রের মনোনীত ব্যক্তিদেরকে সেই চাদরের এক এক কোণা ধরে পাথরটিকে সম্মিলিতভাবে উঠানোর আহবান জানান। এভাবে সকলে নির্দিষ্ট স্থানের নিকটবর্তী হলে তিনি হজরে আসওয়াদকে নিজ হাতে চাদর থেকে উঠিয়ে নিয়ে প্রাচীরগাত্রে স্থাপন করেন। এভাবে রসূলুল্লাহ (সা) সেদিন একটি অবশ্যম্ভাবী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধকে অতি সহজে প্রতিরোধ করেছিলেন। যারা ঐ ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি করেছিল আজ বিশ্বে তাদের নামগন্ধও নেই, যারা চাদর উঠিয়েছিল তাদের নামও আর কেউ জানতে চায় না, কিন্তু কিভাবে ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করতে হয়, একজন শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী হিসাবে সেদিন মুহাম্মদ আল-আমীন তাঁর যে 'উত্তম আদর্শ' স্থাপন করলেন তাতে তিনি বিশ্বে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ঐ সময়কার (কা'বা পুননির্মাণ চলাকালীন) শেষ ঘটনাটির কথাও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। মক্কাবাসীদের তখনকার পোশাক ছিল সাধারণত একটি লুঙ্গি ও একটি চাদর। বিত্তহীনদের আবার চাদর গায়ে দেওয়ার সঙ্গতি ছিল না। কা'বা নির্মাণের সময় ভারী ভারী পাথর কাঁধে করে বয়ে আনতে হত। সুতরাং কাঁধের চামড়া যাতে কেটে না যায় সে জন্যে বিত্তহীন লোকেরা নিজেদের লুঙ্গিকেই কাঁধের উপর ভাঁজ করে গদির মত বানিয়ে নিত। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর কাঁধের চামড়া কেটে যাচ্ছে দেখে পিতৃব্য আব্বাস উপরিউক্তভাবে গদি বানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন কিন্তু যখনই তিনি তা করতে যান, তখনই মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। অতএব ঐ লজ্জাজনক কাজটি করা তাঁর পক্ষে সেদিন সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতেও তিনি কোনদিন এ কাজ করার ইচ্ছা করেন নি।

যখন কা'বার নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলো এবং তা আল্লাহর ঘর হিসেবে স্বীকৃতিও পেল তখন পৌত্তলিক মক্কাবাসীরা অনতিবিলম্বে তাতে কারুকার্য শুরু করে দিল। তারা কা'বাপ্রাচীরের ভিতরের দিকে নানা ধরনের ছবি আঁকলো। তন্মধ্যে ফেরেশতার ছবিসহ কয়েকজন নবী-রসূলেরও ছবি ছিল। তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা (লটারী) করছেন, হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর সেরূপ ছবিও তাতে অংকিত হলো। বিবি মরিয়ম ও হযরত ঈসা (আ)-এর ছবিও তাতে স্থান পেল। কা'বার অঙ্গনে-প্রাঙ্গণে প্রত্যেক গোত্রের মোট ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হলো। এভাবে সুচতুর কুরায়শরা কা'বাকে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীর জন্যে "সার্বজনীন দেবালয়ে” পরিণত করল। ফলে আরবের প্রত্যেক ধর্মের ও প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা অত্যন্ত খুশীমনে কা'বা দর্শন ও তা প্রদক্ষিণ করতে শুরু করল। বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে কুরায়শদের জন্য এটা অত্যন্ত কল্যাণকর প্রমাণিত হলো।

এক ও অদ্বিতীয় (লা-শরীক) আল্লাহর ঘরটি এভাবে 'দেবালয়ে' পরিণত হচ্ছে দেখে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মন-মানসিকতা তথা চিন্তারাজ্যে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। তিনি তখন থেকে শুধু এ ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাই করেন নি বরং অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে প্রতীক্ষাও করতে থাকেন- 'কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়' তা দেখার জন্য।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 নবুওতের সূর্যোদয়

📄 নবুওতের সূর্যোদয়


যে বিশ্বাস ও মর্যাদার সাথে বায়তুল্লাহর (কা'বাগৃহের) নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, যেভাবে অবৈধ অর্থের চাঁদা পরিহার করে কেবলমাত্র হালাল ও বৈধ মাল দিয়ে তা নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবে নগরের চিন্তাশীল লোক ও যুবক সমাজের মনে এক অভাবনীয় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। কা'বার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অবস্থা এরূপ দাঁড়িয়েছিল যে, এখানে এসে মিথ্যা শপথ নিতে যেকোন লোক বিব্রত বোধ করত এবং কোন ব্যাপারে অত্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহমুক্ত হলে পর 'হাতীমে কা'বায়' এসে সে ব্যাপারে শপথ নিত। ক্রমে ক্রমে জনমনে এরূপ ধারণারও সৃষ্টি হয়েছিল যে, এখানে কোন ব্যক্তি মিথ্যা শপথ নিলে বিশ্বে তার নাম-নিশানা থাকবে না এবং সবংশে সে নিপাত যাবে।

কিছুদিন যেতে না যেতেই যখন লা-শরীক (অদ্বিতীয়) আল্লাহর ঘর দেবালয়ে পরিণত হলো এবং এর অভ্যন্তরে ও বহিরাঙ্গনে তিন শ' ষাটটি প্রতিমা স্থাপন করা হলো, তখন স্বাধীন চিন্তাশীলদের মনে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। যেসব প্রতিমা মানুষেরই তৈরী, এমন কি নির্মাণগত অক্ষমতার কারণে যেগুলোর আকার-আকৃতিও বেমানান ও অশোভন, যারা কথা বলতে পারে না, নড়াচড়া করতে পারে না, কেউ ক্ষতি সাধন করলে যারা তাকে বাধাদানের সামান্যতম ক্ষমতাও রাখে না, তারা অন্যের কী উপকার বা অপকার করতে পারে এবং ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে এদের স্থানই বা কি হতে পারে? তা ছাড়া একটি কাহিনী তো সবারই জানা ছিল যে, খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী কোন এক অঞ্চলের লোকেরা মাটি ও পাথরের পরিবর্তে আটা দিয়ে একটি বৃহদাকার মূর্তি তৈরি করে তাকেই তাদের উপাস্য দেবতা হিসেবে মানতে থাকে। কিন্তু পরবর্তী কোন এক বছর যখন তথায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখন তারা তাদের ঐ উপাস্য দেবতাকে কেটে টুকরা টুকরা করে নিজেদের মধ্যে বন্টন করে খেয়ে ফেলে। উপরন্তু এও শোনা যেত, যেসব প্রতিমা কাঠ দিয়ে তৈরী করা হত, শীতের মওসুমে রাতের অন্ধকারে পথিকেরা সেসব প্রতিমা থেকে তাদের চলার ইন্ধন সংগ্রহ করে নিত। এ জাতীয় উপাস্য কি কোনরূপ গুরুত্বের অধিকারী হতে পারে? প্রতিমা সম্পর্কিত এর চাইতেও ঘৃণ্য একটি ঘটনার কথা জানা যায়। আর তা হলো, আসাফ নামক জনৈক ব্যক্তি নায়েলা নাম্নী জনৈকা মহিলার সাথে ব্যভিচার করার কারণে একবার খানায়ে কা'বার অভ্যন্তরে এসে আশ্রয় নেয়। জনসাধারণ তাদের ঐ ঘৃণ্য অনাচারের কথা প্রচারের উদ্দেশ্য তাদের দু'টি মূর্তি মক্কার বিশেষ বিশেষ স্থানে স্থাপন করে। কয়েক বছর পর কিছু অজ্ঞ লোক অভিশপ্ত এ দুটি মূর্তিরই পূজা শুরু করে দেয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সংখ্যক উন্নত মন্যেবৃত্তির অধিকারী লোকের পক্ষে কা'বাগৃহকে দেবালয়ে পরিণত করার ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়ার মধ্যে অস্বাভাবিকতার কিছু ছিল না।

মক্কার অধিবাসীরা ছিল সাধারণত পৌত্তলিক। তবে কিছু লোক বিদেশীদের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পৌত্তলিকতাকে ঘৃণা করত। মক্কা নগরেই কিছু লোক খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ছিল। আর কিছু লোক ছিল নাস্তিক। 'খাও দাও স্ফূর্তি কর'- এই ছিল শেষোক্তদের জীবনাদর্শ। পক্ষান্তরে কিছু লোক একত্ববাদেও বিশ্বাসী ছিল। তারা মাবুদ ও ইবাদতকারীদের মধ্যে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা যায় সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করত, তবে এর সঠিক দিকদর্শন তাদের জানা ছিল না। তারা তাদের হৃদয়ের আবেগ কবিতার ছন্দে এবং অন্যান্যভাবে প্রকাশ করত। যেমন একজন বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছেন "হে আল্লাহ! কিভাবে আমি তোমার ইবাদত করবো? দাঁড়িয়ে মাথা নত করে, সিজদা করে, পা উপরের দিকে উঠিয়ে, না উর্ধ্ববাহ হয়ে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমিই বলে দাও। তুমি যেভাবে বলবে আমি সেভাবেই করব।"

মোটকথা, ধার্মিক মাত্রেই নিজ নিজ সাধ্যমত ইবাদতের একটা সঠিক পন্থা উদ্ভাবনের চিন্তায় ছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোত্রের লোকেরাও প্রতিমাপূজা করত; তবে বিবি খাদীজার জনৈক নিকটাত্মীয় ওরাকাহ বিন নওফেল খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন। নগরবাসীদের মধ্যে বিরাজিত অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণাও রসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ও সৃষ্টিকর্তার রহস্য সম্পর্কে চিন্তিত করে তুলত। সম্ভবত এভাবে অনেকদিন পর্যন্ত তিনি চিন্তা করতে থাকেন। তিনি এসব বিষয় নিয়ে কখনো স্ত্রীর সাথে, আবার কখনো বন্ধু-বান্ধব, গোত্র-প্রধান ও নগরের সম্মানিত ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। কারো কাছ থেকে সদুত্তর না পেয়ে নিরাশ চিত্তে কখনো কোন বৃক্ষতলে, কখনো প্রকাণ্ড পাথরের ছায়ায় বসে তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা চিন্তার মধ্যে কাটিয়ে দিতেন। তাবারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, পরিবার-পরিজন ছেড়ে কিছুদিনের জন্যে কোন পর্বত গুহায় একাকী বসে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে উপকারিতা রয়েছে তা মক্কাবাসীদের অজ্ঞাত ছিল না। তারা এ জিনিসটির সন্ধান কোথা থেকে পেয়েছিল তা অবশ্য জানা যায়নি। সম্ভবত তারা তা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কাছ থেকেই শিখেছিল।

ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) সারা রমযান মাস মক্কার বাইরে, তাঁর বাসস্থান থেকে প্রায় আড়াই/তিন ফার্লং দূরে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। তখন তিনি খাদ্যদ্রব্য সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। যখন তা ফুরিয়ে যেত তখন কিছুক্ষণের জন্য বাড়ীতে ফিরে এসে আবার তা নিয়ে যেতেন অথবা বিবি খাদীজা ভৃত্যের মাধ্যমে তা তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। গুহায় বসে তিনি কি করতেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না; সম্ভবত তিনি তখন রোযা রাখতেন এবং অন্য কোন কঠোর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। ঘটনাক্রমে কোন মুসাফির বা ভিখারী সেখানে উপস্থিত হলে নিজের সামান্য আহার্য থেকেই তিনি তাকে কিছু খেতে দিতেন। মাস শেষে তিনি সেখান থেকে গৃহাভিমুখে রওয়ানা হতেন এবং কা'বাগৃহ প্রদক্ষিণ করে তবে নিজের পরিবার-পরিজনের সাথে মিলিত হতেন।

হেরা পর্বত। বর্তমান এটাকে জবলুনুর বলা হয় এবং বাইবেলে এটা 'ফারান' নামে পরিচিত। মক্কার উত্তর-পূর্ব দিকে, মীনা ও আরাফাগামী রাস্তার বামদিকে কয়েক ফার্লং দূরে অবস্থিত। বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট বন্যায় তখন শহরের বিরাট ক্ষতি হত। তুর্কী শাসনামলে মক্কা শহর রক্ষার উদ্দেশ্যে একটি দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করে বন্যার গতি পরিবর্তন করে দেয়া হয়। এই বাঁধের কিছুটা সম্মুখভাগে অগ্রসর হলেই শুভ্রসাদা একটি নূরানী পাহাড় নযরে পড়ে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে উপরে উঠলেই তুর্কী সুলতানদের জন্যে অন্তর থেকে আপনা আপনি দুআ বেরিয়ে আসে। তারা সেখানে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরী করেছিলেন। বৃষ্টির পানি ঐ হ্রদে জমা হত এবং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত তা জনসাধারণের তৃষ্ণা নিবারণের কাজ দিত। আরো কিছু উপরে উঠলে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়ার কাছে কয়েকটি বড় বড় পাথর উপরে, নীচে ও আশেপাশে এমনভাবে স্থাপিত হয়েছে যে, এতে একটি গুহার সৃষ্টি হয়েছে। তাতে উঠানামার জন্যে সিঁড়ির মত পথও তৈরী হয়ে গেছে। গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেই আল্লাহর অসীম মহিমা প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রায় চার গজ লম্বা, পৌনে দুই গজ প্রশস্ত ও একজন পূর্ণদৈর্ঘ্য মানুষ দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারে এরূপ উচ্চতাসম্পন্ন এই গুহাটিতে পা লম্বা করে অনায়াসেই শোয়া যেত। এছাড়া রৌদ্র-বৃষ্টি থেকেও তা ছিল সুরক্ষিত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, লম্বাকৃতির এই গুহাটি ছিল সম্পূর্ণরূপে কা'বামুখী। এভাবে হেরা গুহায় ধ্যান-মগ্ন অবস্থায় রসূলুল্লাহ্ (সা) কত বছর কাটিয়েছিলেন, অনেক অনুসন্ধানের পরও তা জানা যায়নি। তবে সে মেয়াদ পাঁচ বছরের কম ছিল বলে অনুমিত হয়।

পার্থিব সাধনা ও তার ফলাফল সম্পর্কে মানুষ আলাপ-আলোচনা করে এবং ভাষাশৈলীর মাধ্যমে তা বিভিন্নভাবে প্রকাশও করতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনার ফলাফল তো বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করা সম্ভব নয়। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ঐ ধ্যানমগ্ন হওয়াটা কেমন লাগত তা পুরোপুরিভাবে ব্যক্ত করা সহজ নয়; তবে প্রামাণ্য বর্ণনাসমূহ ও জীবন-চরিত লেখকরা এ সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন তার সারকথা হলো, যেহেতু রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রতি বছর ঐ একই কাজ করতেন, তাই নিশ্চিত করে বলা যায়, তাতে তিনি তাঁর বিদগ্ধ হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ করতেন এবং ঐ কাজ তাঁর খুবই মনঃপূত ছিল। আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রাথমিক সোপানে তিনি সত্য স্বপ্ন দেখতেন এবং সেগুলোর ফলাফল দিবালোকের ন্যায় সত্যে পরিণত হত। ক্রমে ক্রমে তিনি অনুভব করতে থাকেন, কোন পাথর অথবা বৃক্ষ যেন তাঁকেই লক্ষ্য করে আওয়াজ দিচ্ছে এবং ক্রমশ সে আওয়াজ যেন তাঁর কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রথম প্রথম এসব ব্যাপার লক্ষ্য করে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন। কোন মানুষ আওয়াজ দিচ্ছে মনে করে তিনি গুহা থেকে বেরিয়ে আসতেন, কিন্তু আশেপাশে কোথাও কাউকে খুঁজে পেতেন না। এভাবে ক্রমাগত ঐ আওয়াজ শুনতে শুনতে অদৃশ্য আওয়াজদাতার প্রতি তাঁর অনুরাগ বেড়ে যেতে থাকে। এমন কি, একবার আওয়াজ শোনার পর পুনরায় তা শোনার জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন।

এভাবে দিন যতই অতিক্রান্ত হতে থাকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মন পার্থিব বিষয়বস্তুর প্রতি ততই অনীহ হয়ে উঠতে থাকে এবং তিনি এক অদৃশ্য শক্তির সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে উঠেন। মাবুদ ও আবিদ, সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যে এবং একজন মানুষকে পূর্ণ মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য যে স্তরের পূত-পবিত্র হৃদয়ের প্রয়োজন, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পূর্ব থেকেই তিনি তা লাভ করেছিলেন। তার ফলে তাঁর পবিত্র সত্তা সর্বদা সবাইকে যাবতীয় অন্যায় অসত্য প্রতিরোধে এবং ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করত। আর এ ধরনের পূত-পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই একজন সত্যিকার পথপ্রদর্শক ও সংস্কারক না হয়ে পারেন না।

এভাবে তাঁর আত্মশুদ্ধি ও আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জনের কাজ কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে থাকে এবং তখন তিনি পরিবার-পরিজন থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কা'বাগৃহ নির্মাণের পূর্বে তাঁর যে সন্তান জন্ম নিয়েছিল সেই ছিল শেষ সন্তান। অতঃপর খাদীজা (রা)-এর কোলে আর কোন সন্তান আসেনি।

রসূলুল্লাহ (সা) বয়সে পরিপক্বতা লাভ করছেন, তাঁর চল্লিশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে, সুতরাং অদৃশ্য শক্তির পক্ষ থেকে তাঁকে 'ওহী' ও 'ইলহাম' বহনের উপযোগী করে তৈরী করা হচ্ছে। 'রসূলে উম্মী' (নিরক্ষর নবী) (সা)-কে মহান স্রষ্টা "রাহমাতুল্লিল আলামীনে" (জগৎসমূহের করুণায়) রূপান্তরিত করছেন।

পুনরায় রমযান মাস এল। পূর্বের মত ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তাঁর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। এমতাবস্থায় একদিন জিবরাইল (আ) 'ওহী' তথা আল্লাহর বাণী নিয়ে তাঁর সমক্ষে হাযির হলেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবীর মর্যাদা দান করলেন। আল্লাহুম্মা সাল্লি'আলা মুহাম্মদ (হে আল্লাহ্! মুহাম্মদের উপর করুণা বর্ষণ কর)।

যখন সর্বপ্রথম 'ওহী' অবতীর্ণ হলো, তখন কেউই তাঁর সামনে ছিল না। অতঃপর তেইশ বছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে এবং অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। প্রত্যক্ষদর্শীরা এ সম্পর্কে যেসব বর্ণনা দিয়েছেন, সেগুলোর আলোকে, আমাদের বর্তমান পারিপার্শ্বিকতায় আমরা সে সম্পর্কে যে ধারণা করতে পারি, তা হলো, অবতরণের পদ্ধতিটা ছিল ঠিক যেন টেলিফোন যন্ত্রের মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণের মত। ওহীকে একটি টেলিফোন-বার্তা মনে করা যেতে পারে, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীর কাছে পাঠাতেন। মুহাদ্দিস এবং ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে ওহী আসার সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) ঘন্টার মত আওয়াজ শুনতে পেতেন। তাঁর অন্তরঙ্গ ব্যক্তিদের। যেমন আবূ বকর ও উমর (রা)। কানে ঐ সময় মাছির ভন ভন শব্দের মত আওয়াজ আসত, যদিও তাঁরা কোন কিছুই দেখতে পেতেন না। ওহী অবতরণের ঐ পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও গুরুগম্ভীর। প্রত্যক্ষদর্শী কোন কোন সাহাবীর বর্ণনা অনুযায়ী ভীষণ শীতের সময়ও ওহী অবতীর্ণ হলে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে উঠত। উষ্টারোহী অবস্থায় ওহী অবতীর্ণ হলে তাঁকে বহনকারী উট অনেক সময় ভারাক্রান্ত হয়ে বসে পড়ত। কোন কোন সময় উট না বসলেও মনে হত, যেন তার হাড্ডি ভেঙ্গে যাচ্ছে। একদা জনৈক সাহাবীর উরুর সাথে হাঁটু লাগিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) বসে আছেন, এমন সময় ওহী অবতীর্ণ হয়, তখন ঐ সাহাবী মূর্ছিত হয়ে পড়েন এবং অনুভব করেন, যেন তাঁর উরুদেশের হাড্ডি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

ফেরেশতা বা 'মালাক' শব্দের অর্থ 'প্রেরিত' বা 'সংবাদবাহক'। প্রকৃতপক্ষে মালাক হচ্ছে এমন এক সৃষ্টি, যা মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের কাজ করে এবং সংবাদ বহন করে। রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, সংবাদ বাহক ফেরেশতা (জিবরাঈল) কখনো মানুষের মত, কখনো ডানাবিশিষ্ট উড্ডয়নশীল এক অভিনব প্রাণীর মত, কখনো বা অন্য কোন আকৃতিতে আমার সামনে হাযির হতেন।

যেহেতু নবুওতের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, তাই এ সম্পর্কিত বিষয়াদিও সবার কাছে সহজবোধ্য হবার কথা নয়। তাছাড়া ওহী অনুসরণকারীদের কাছে এসব বিষয় খুব একটা গুরুত্বপূর্ণও নয়। ওহী কিভাবে অবতীর্ণ হলো, তার চাইতে ওহীর মাধ্যমে কি নির্দেশ এলো এবং কিভাবে তা সংরক্ষিত হলো, তা-ই হচ্ছে আমাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মোটকথা, ওহীর আগমন ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল রসূল-জীবনের পরবর্তী যুগ।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 নবুওতের মক্কী যুগ

📄 নবুওতের মক্কী যুগ


ওহীর মাধ্যমেই নবুওতের সূচনা হয়। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর আদেশ নির্দেশ নবীর কাছে প্রেরণ করেন, যাতে তিনি মানবজাতির কাছে তা পৌঁছিয়ে দেন। নবুওত এমন কোন মৌরসী পেশা নয় যে, কেউ তা আপন পিতামাতা বা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে আয়ত্ত করে নেবে, বরং তা হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সৎ ও সত্যবাদী ব্যক্তিত্বকে পরিষ্কার ভাষায় বলে দেওয়া যে, "তুমি আল্লাহর রসূল, তোমার কর্তব্য হচ্ছে তুমি তোমার জাতিকে ন্যায় ও সত্যের প্রতি আহ্বান জানাবে।”

অতঃপর নবুওতপ্রাপ্ত ব্যক্তির দেহে ও মন-মানসিকতায় এক বিরাট প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের বর্ণনা থেকে এ ব্যাপারে মোটামুটি একটি ধারণা করা যায়। তিনি বলেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বিবি খাদীজাকে বলতেন, "যখন আমি একাকী বসে থাকি, তখনি শুনতে পাই, কে যেন আমাকে 'হে মুহাম্মদ' বলে সম্বোধন করছে। নিদ্রিত অবস্থায় নয় বরং জাগ্রত অবস্থায়ই আমি আলোর (নূরের) মত কি যেন অনুভব করি। আল্লাহর শপথ, প্রতিমা-পূজারী ও জ্যোতিষীদের অদৃশ্য বাণীসমূহের চাইতে ঘৃণ্য বস্তু আমার কাছে আর কিছুই ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমিও কি একজন জ্যোতিষী হয়ে গেলাম? আমাকে যে সম্বোধন করছে সে কোন জ্বীন বা শয়তান নয় তো?"

তাঁর ঐ আশংকা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কেননা এসব বিষয় প্রকাশিত হয়ে পড়লে জনসাধারণ তাঁকে মিথ্যুক, পাগল, ভূতে-ধরা, জ্যোতিষী ইত্যাদি যে আখ্যা দিত তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তাছাড়া ঐ দেশে নবুওত ও রিসালত সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোন লোক ছিল না। এমতাবস্থায় শয়তানের ইঙ্গিত ও ফেরেশতার ইলহামের মধ্যে মূলত যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, তা অনুভব করা ওদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

বিবি খাদীজা (রা) রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে তাঁকে বলেন, 'আপনার মত মহৎ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা'আলা কখনো অপদস্থ করবেন না।' অতঃপর তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর পিতৃব্যপুত্র খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ওরাকা বিন নওফলের কাছে নিয়ে যান। ওরাকা ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'এসব কথাবার্তা মোটেই শয়তানী নয় বরং এগুলোর সাথে হযরত মূসা (আ)-এর 'নামোস' অর্থাৎ তওরাতের পরিষ্কার সামঞ্জস্য রয়েছে।” তিনি আরো বলেন, "আপনার উপর যে দায়িত্ব বর্তাবে তা সম্পাদনে যদি বাধা প্রদান করা হয়, এজন্যে আপনি যদি অত্যাচারিত হন, আর আমি তখন জীবিত থাকি, তাহলে আপনাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবো।"

ইবনে হিশামের বর্ণনানুযায়ী, রসূলুল্লাহকে অধিক সান্ত্বনা দানের জন্যে বিবি খাদীজা (রা) আর একটি অদ্ভুত উপায় অবলম্বন করেছিলেন। তিনি রসূলুল্লাহকে বললেন, আপনি যখনই জিবরাঈল ফেরেশতাকে দেখবেন তখনি আমাকে বলবেন। কিছুদিন পর রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, 'আমি এখন তাঁকে দেখতে পাচ্ছি।' তখন বিবি খাদীজা বললেন, 'আসুন আমার ডান দিকে বসুন।' অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি আপনি তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ্ (সা) উত্তরে বললেন, 'হ্যাঁ।' বিবি খাদীজা বললেন, 'আসুন, এবার আমার বাম দিকে বসুন।' অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ্ (সা) জওয়াব দিলেন, 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি তাঁকে নিজের সামনে বসিয়ে ঐ একই প্রশ্ন করলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) উত্তর দিলেন 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি তাঁকে আপন জামার ভিতরে টেনে নিয়ে সেই বেসামাল অবস্থায় জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ (সা) উত্তরে বললেন, 'না এখন দেখতে পাচ্ছি না।' একথা শুনে বিবি খাদীজা বললেন, 'শয়তান হলে সে আমাদের ঐ লজ্জাজনক অবস্থায় কখনো চলে যেত না। অতএব তিনি শুধুমাত্র ফেরেশতাই হতে পারেন।'

প্রাথমিকভাবে অবতরণের পর কিছুদিন ওহী আসা বন্ধ থাকে (ওহী বন্ধের ঐ সময়টাকে 'ফতরতে ওহী' বলা হয়)। ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে, ঐ অবস্থা তিন বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। প্রথম পর্যায়ে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কারণে রসূলুল্লাহ (সা)-এর মনের মধ্যে ছিল ভয়-ভীতি। দ্বিতীয় পর্যায়ে শান্তি লাভ ও ওহীর প্রতি আকর্ষণ এবং শেষ পর্যায়ে ওহীর জন্য প্রতীক্ষা ও ব্যাকুলতা। ঐতিহাসিকরা শেষোক্ত পর্যায়ের যে বিবরণ দিয়েছেন তা হলো, ওহীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে তাঁর মনে দারুণ অস্বস্তির সৃষ্টি হত। অবশ্য অনুরূপ সংকটজনক মুহূর্তে তিনি জাগতিক বিষয়বস্তুর কথা একদম ভুলে যেতেন চলে যেতেন আধ্যাত্মিক জগতে এবং তথায় জিবরাঈল (আ)-কে দেখতে পেতেন। জিবরাঈল (আ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, 'আপনি তো আল্লাহর রসূল। (অতএব আপনার এত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোন কারণ নেই)। রসূলুল্লাহ (সা) জিবরাঈল (আ)-এর কথায় সান্ত্বনা লাভ করতেন এবং আত্মশুদ্ধির জন্য আরো কঠোর ইবাদতে নিমগ্ন হতেন।

জানা যায়, এ সময় পরিবার-পরিজনের সাথে তাঁর নামমাত্র সম্পর্ক ছিল। তিনি রাতের বেলা দীর্ঘ সময় ইবাদত করে কা'বার অঙ্গনেই শুয়ে পড়তেন এবং দিনের বেলায়ও ইবাদত করতেন, নামাযে মশগুল থাকতেন। ঐ সময় আত্মশুদ্ধি ও সৃষ্টির সেবা ছাড়া কোন কিছুর সাথেই তাঁর সম্পর্ক ছিল না।

এই সাধনা তাঁর হৃদয় সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। পার্থিব যাবতীয় কামনা-বাসনা চিরতরে মুছে গেল তাঁর মন থেকে। তিনি রূপান্তরিত হলেন পরিপূর্ণ মানুষে। নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেন আল্লাহর মধ্যে। তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি ইচ্ছা ও বাসনা আল্লাহতে মিশে গেল (ফানাফিল্লাহ)। এতদসত্ত্বেও কেবলমাত্র তাঁর নিজের মনেই নয়, তাঁর স্ত্রীর মনেও এ আশংকা দেখা দিল যে, তাহলে সত্যই কি আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে ত্যাগ করলেন? সত্যই কি আল্লাহ্ তা'আলা অসন্তুষ্ট হয়ে পড়লেন তাঁর উপর?

বস্তুত এ সময়টা ছিল তাঁর প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। শেষ পর্যন্ত এর পরিসমাপ্তি ঘটল এবং মুহাম্মদ (সা)-কে সম্বোধন করে পাক রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ঘোষণা করা হলো:
উজ্জ্বল দিনের শপথ এবং অন্ধকার রাতের শপথ। তোমার প্রভু তোমাকে পরিত্যাগ করেন নি কিংবা তোমার উপর অসন্তুষ্ট হননি। নিশ্চয়ই তোমার ভবিষ্যৎ তোমার অতীত অপেক্ষা উজ্জ্বল এবং শীঘ্রই তোমার প্রভু তোমাকে এমন কিছু দান করবেন যাতে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে। তিনি কি তোমাকে য়াতিম বালকরূপে পান নি এবং আশ্রয়দান করেন নি? এবং তিনি কি তোমাকে পথ-অনভিজ্ঞ পান নি এবং সুপথ দেখান নি? তিনি কি তোমাকে অভাবগ্রস্ত দেখেন নি এবং অভাবমুক্ত করেন নি? অতএব যে অনাথ, তাকে তুমি উৎপীড়ন করবে না, যে ভিক্ষুক, তাকে তুমি তিরস্কার করবে না। আর তোমার প্রভুর অনুগ্রহের কথা প্রচার কর।

"এবং তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের কথা প্রচার কর"-এ আয়াতের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাবলীগে রিসালত-এর নির্দেশ লাভ করেছিলেন। এই প্রাথমিক অবস্থায় যেসব আয়াত ও সূরা অবতীর্ণ হয়েছিল, তন্মধ্যে সূরা 'ইকরা' এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সৃষ্টি ক্ষমতার অপূর্ব বর্ণনা এবং যাবতীয় জড়বাদ ও নাস্তিক্যবাদের অসারতা প্রমাণ করেছে। সূরা 'মুদ্দাস্সিরে" মানবজাতিকে যাবতীয় অসৎ কর্মের অশুভ পরিণতি থেকে দূরে থাকা, একমাত্র মহান আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করা, নামাযের পূর্বে দেহ ও পোশাক পবিত্র করা, আল্লাহ্ যেসব কাজে অসন্তুষ্ট সেগুলি থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের সেবা ও উপকার করার পর সেজন্য খোঁটা না দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করা হয়েছে। সূরা 'হজরে' রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, ' তোমাকে যে নির্দেশই দেওয়া হোক না কেন, তুমি তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করো। এজন্য মুশরিকদের ভয় করবে না। সূরা 'শু'আরা'য় একদিকে রসূলুল্লাহ-কে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে তাঁর নিকটাত্মীয়দেরকে আল্লাহর ভয় দেখাতে এবং অন্যদিকে অভিযোগকারীদের জওয়াব দিতে গিয়ে পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ওহী দেবতাদের কন্ঠ নিঃসৃত বাণী বা মনগড়া কবিতা কিংবা শয়তানী কথাবার্তা নয়। 'আমপারার' বিভিন্ন সূরায় আল্লাহ্ তা'আলার একত্ব স্বীকার করে নেওয়া এবং সৎকর্মশীল হওয়ার জন্যে মানব জাতিকে বারবার তাকিদ দেওয়া হয়েছে এবং নানাবিধ দলীল এবং উপমা দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে যে, মানুষের ক্ষমতার বাইরে এই যে আসমান-যমীন, চাঁদ, সূর্য, বাতাস, সমুদ্র, মেঘবৃষ্টি, ঋতু, এমন কি মানব জাতি-এ সবকিছুরই স্রষ্টা হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা। তিনি অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ব দান করেন, তিনি জীবিতকে মৃত্যুর মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেন। এমন ক্ষমতাবান যে সত্তা, তিনি কি মৃত্যুর পর মানুষকে জীবন দান করে তার ইহলোকের যাবতীয় কাজের পুরস্কার অথবা শাস্তি প্রদান করতে পারবেন না? অতঃপর সৎকাজ ও অসৎকাজের পরিণামস্বরূপ যথাক্রমে বেহেশত ও দোযখ প্রদানের কথা উল্লেখ করে কিয়ামত ও শেষ বিচার দিনের বিস্তারিত অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে।

ইসলাম ও জাহিলিয়াতের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, জাহিল লোকেরা পার্থিব আরাম-আয়েশকেই ভালমন্দের মাপকাঠি বলে মনে করে এবং পার্থিব কামনা-বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য মন্দ কাজকেই ভাল কাজের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে এটা শয়তানী আচরণ ছাড়া কিছু নয়। আমরা এখন ঐ যুগ সম্পর্কে আলোচনা করবো।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 নবুওতের প্রচার কার্য

📄 নবুওতের প্রচার কার্য


মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা যদি সচ্ছল না হয় এবং পেটের তাড়নায় যদি তাকে দিগ্বিদিক ছুটতে হয় তাহলে অন্য কাজ—বিশেষ করে ‘চিন্তার জগতে’ প্রবেশ করার মত কোন সুযোগ বা অবকাশ তার থাকে না। কেননা অন্যান্য চিন্তার চাইতে রুজী-রোজগারের চিন্তাই তার কাছে তখন বড় হয়ে দেখা দেয়। নবুওত যুগের কয়েক বছর পূর্ব থেকেই মক্কাবাসীরা আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে দিয়েছিল এবং এক্ষেত্রে বিরাট সাফল্যও অর্জন করেছিল। প্রথম নবভী সালে এ ধরনের যথেষ্ট লোক ছিল, যারা মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিয়েছিল। এই পরিবেশই নবুওতে মুহাম্মদীর অভ্যুদয় হয় এবং সে অনুযায়ী তা যথাযথ ভূমিকাও পালন করে।

ঐতিহাসিকরা একদিকে বলেছেন প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর তিন বছর পর্যন্ত আর ওহী নাযিল হয়নি, অপরদিকে বলেছেন, প্রথম তিন বছর পর্যন্ত গোপনে গোপনে প্রচার কার্য চলেছিল। তাদের এই দুই বর্ণনার মধ্যে অবশ্যই একটা সামঞ্জস্য থাকা চাই। ওহী নাযিল হওয়ার পর রসূলুল্লাহ্ (সা) নিশ্চয়ই তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করেছিলেন। তাঁর মত নিষ্কলুষ ও পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘ঈমান আনলাম’ বলাটা তাদের পক্ষেও অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এরই ঘরে লালিত পালিত অপ্রাপ্ত বয়স্ক তাঁর পিতৃব্যপুত্র আলী (রা), তাঁর স্নেহভাজন ক্রীতদাস যায়েদ বিন হারিসা (রা) ও তাঁর পিয়তমা পত্নী বিবি খাদীজা (রা) প্রমুখ তো তাঁর আহ্বানের সাথে সাথেই ঈমান এনেছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হযরত আবূ বকর (রা)-এর সাথেও নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে আলাপ করেছিলেন এবং তিনিও খুব সম্ভব তাঁর কথায় আস্থাশীল হয়ে সঙ্গেই সঙ্গেই ঈমান এনেছিলেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাথমিক যুগের এসব নও-মুসলিম সম্মিলিতভাবে আল্লাহর দীনের প্রচারাভিযান এত জোরেসোরে চালিয়েছিলেন, যার তুলনা অন্যান্য ধর্মে বিরল। মহিলাদের কর্ম প্রচেষ্টা সম্পর্কে আমরা অন্যত্র আলোচনা করবো। পুরুষদের মধ্যে এক্ষেত্রে হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রচেষ্টা বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হয়েছিল। তাঁরই অনবরত প্রচার ও অনুপ্রেরণা দানের ফলে তাঁর বন্ধুদের মধ্যে যুবাইর বিন আল-আওয়াম, আবদুর রহমান বিন আউফ, সা'দ বিন আবি ওক্কাস, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ এবং এক বর্ণনামতে 'উসমান বিন আফফান যেমন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন, অন্যদিকে তেমনি বিলাল, আমির বিন ফাহিরা, উম্মে আবীস, যানীরা ও লাবীনা সহ কয়েকজন পুরুষ ও মহিলাকে তিনি ক্রয় করে আযাদ করে দিয়েছিলেন। কেননা ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এঁদের মনিবরা তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছিল। এসব ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীদের মধ্যে কিভাবে ও কার প্রচেষ্টায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। যাহোক হযরত আবূ বকরের জান মাল ছিল ইসলামের জন্য উৎসর্গীকৃত। তিনি মুসলমান ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীদেরকে কাফিরদের নির্যাতন থেকে মুক্তি দিতে বিশেষভাবে আনন্দ পেতেন।

এখন প্রশ্ন হলো, প্রচার কার্যের বিষয়বস্তু কি ছিল। তখনকার সময়ে নাযিলকৃত আয়াত ও সূরাসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় যে, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস স্থাপন, শিরক থেকে দূরে থাকা, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, শেষ বিচার এবং সে অনুযায়ী পুরস্কার বা শাস্তি হিসাবে যথাক্রমে বেহেস্ত বা দোযখ লাভ ইত্যাদি ছিল প্রচার কার্যের বিষয়বস্তু। প্রতিমা পূজার অপকারিতা, ফেরেস্তাদের অস্তিত্ব, ফেরেস্তাদের মাধ্যমে নবীদের কাছে আল্লাহর ওহী প্রেরণ, মানুষের হিদায়েতের কাজে ফেরেশতাদের নিয়োগ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কেও তখন আলোচনা করা হতো। উত্তম চরিত্র গঠন এবং দান-দক্ষিণার জন্যতেও তখন উৎসাহ প্রদান করা হত।

প্রচার কার্যের ধারা এই ছিল যে, যখনই রসূলুল্লাহ্ (সা) কোন বন্ধু-বান্ধব কিংবা সত্যানুসন্ধানী লোকের সাক্ষাত পেতেন তখনই মধুর সুরে কুরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে তাঁকে শোনাতেন এবং শ্রোতার যোগ্যতা অনুসারে এসব আয়াতের ব্যাখ্যা করে তার কাছে ইসলামী মূলনীতির বিবরণ পেশ করতেন। তিনি একদিকে মহান স্রষ্টার অপরিসীম করুণা এবং অন্যদিকে তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার বর্ণনা দিয়ে মানুষকে পরকালের হিসাব-নিকাশের ভয় দেখাতেন। তিনি দেশে প্রচলিত মনগড়া ধর্মীয় বিধি বিধানের সমালোচনা করে বলতেন,—মানুষের হাতে গড়া প্রতিমা যারা কথা বলতে জানে না, কোন কিছু শুনতে পায় না, নড়চড়া করতে পারে না, এমন কি নিজেদেরও নিরাপত্তা বিধান করতে পারে না, তারা কিভাবে মহান আল্লাহর সমীপে অপরের মুক্তির জন্যে সুপারিশ করতে পারে? এককথায় বলতে গেলে, তখন সংক্ষিপ্তভাবে আল্লাহ্ ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, পরকাল, আল্লাহই ভাগ্যের ভাল-মন্দ নির্ধারণ করেন, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান—এই বিষয়গুলির উপর বিশ্বাস স্থাপনের শিক্ষা দেওয়া হত।

কুরআনের ভাব ও ভাষার মধ্যে এমনি একটি আকর্ষণ ছিল যে, তা শুনে ভাষার জাদুকর আরবদের মাথা হেঁট হয়ে যেত। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইসলামের চরম শত্রুরাও রজনীর অন্ধকারে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাসগৃহের পাশে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে কুরআন তিলাওয়াত শুনত এবং তা শুনে মোহিত হত। এ সময় অন্য কেউ যাতে তাদের দেখতে না পায় সেজন্য তারা সতর্ক থাকত এবং বারবার রাস্তার দিকে চোখ তুলে তাকাত। কখন কিভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা) জনসমাবেশে নবুওতের প্রচার কার্য চালাতেন তার বিস্তারিত বর্ণনা তাবারীর ইতিহাসে আছে।

তখনো পাঞ্জেগানা (দৈনিক পাঁচবার) নামায ফরয হয় নি, কিন্তু প্রথম থেকেই দিনে দু'বার, খুব সম্ভব চাশ্ত (দিনের প্রথম প্রহর) ও ইশার (রাতের প্রথম ভাগ) সময় অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করা হত। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, সকাল বেলা চাশতের সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) কা'বাগৃহের সামনে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করতেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন পৌত্তলিকতার কঠোর সমালোচনা করতে লাগলেন, তখন কুরায়শরা তাঁকে বাধা দিল এবং তাঁর উপর নির্যাতন শুরু করল। ঐতিহাসিকদের মতে ঐ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) নগরের বাইরে চলে যেতেন এবং সেখানেই নামায আদায় করে আসতেন।

আল-আরকম নামীয় সাহাবীর বাড়ীতে রসূলুল্লাহ্ (সা) কখন এবং কিভাবে গিয়ে হাযির হতেন, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। রসূলুল্লাহর বাড়ি সম্ভবত কেন্দ্রস্থল থেকে কিছু দূরে ছিল। পক্ষান্তরে আল আরকমের বাড়ি ছিল কা'বার একেবারে সন্নিকটে—সাফা পাহাড়ের উপরে, আর বাড়িটাও ছিল বেশ প্রশস্ত (এই বাড়িটি এখনও বিদ্যমান আছে)। তুর্কী শাসনামলে এর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সউদী শাসনামলেও যথারীতি সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং পার্শ্ববর্তী কয়েকটি বাড়ি উচ্ছেদ করে এ বস্তি পর্যন্ত পৌঁছার রাস্তাটি বেশ চওড়া করা হয়েছে।) এই পবিত্র বাড়িতেই প্রচার বৈঠক বসত এবং সম্ভবত এখানেই জামা'আতের সাথে নামায আদায় করা হত। এখান থেকে কা'বা গৃহও পরিষ্কার নযরে পড়ে।

হযরত আবূ বকর (রা)-এর ঘরের আঙ্গিনায় একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল এবং সেখানে কুরআন পাঠের মাহফিল বসত বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। এই কুরআন পাঠ শোনার জন্য সেখানে সব শ্রেণীর লোক এমনকি দাস-দাসীরাও এসে জড়ো হত এবং অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে কুরআনের অমিয় বাণী শ্রবণ করত।

তিন বছর পর্যন্ত অতি সংগোপনে কাজ করার পর প্রকাশ্য প্রচারাভিযানের সূচনা করা হয়। 'ইসাবায়ে ইবনে হজর' ইত্যাদি গ্রন্থে উল্লেখ আছে, খানায়ে কা'বায় প্রথমবারের মত যখন প্রকাশ্যে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করা হয় তখনও কুরায়শরা তাদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের উপাসনা শুরু করে দেয়। ফলে এক বিরাট সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং কুরায়শদের বাড়াবাড়িতে হারিস বিন আবূ হালা নামীয় জনৈক মুসলমান (তিনি সম্ভবত বিবি খাদীজা (রা)-এর প্রথম স্বামীর অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান ছিলেন) শাহাদত লাভ করেন। এ ঘটনার পর থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত খানায়ে কা'বায় মুসলমানদের সালাত আদায় বন্ধ থাকে।

ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, হযরত উসমান, হযরত যুবায়র, হযরত সাঈদ বিন যায়িদ ও হযরত আবুযর (রা) প্রমুখ যুবক ইসলাম গ্রহণ করলে পর তাঁদের অভিভাবকরা তাদের উপর নানা ধরনের জুলুম অত্যাচার চালায়। খুব সম্ভব ঐ সময়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে তাঁর গোত্রনেতা ও পিতৃব্য আবু তালিবের কাছে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। একবার একদল লোক এসে আবু তালিবকে শেষ কথা শুনিয়ে দিয়ে গেল, "আপনি হয় আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের দেবতাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে বারণ করুন নয়তো তার পৃষ্ঠপোষকতা পরিত্যাগ করুন।” তখন আবু তালিব রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ভালভাবে বুঝান কিন্তু তিনি উত্তরে বলেন, "এরা যদি আমার এক হাতে চাঁদ এবং অন্য হাতে সূর্য এনে দেয় তবু আমি আমার এই কর্তব্য কাজ থেকে বিরত থাকব না। যদি আপনিও আমার পৃষ্ঠপোষকতা ছেড়ে দেন তবু আমি পরোয়া করব না। যে মহান আল্লাহর নির্দেশে আমি এ কাজ করছি, তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট।” একদা কুরায়শ বংশের উতবা নামীয় ধীর গম্ভীর মেজাজের জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে নির্জনে অনেক কথাবার্তা বলেন। তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করেন, "আপনার এই প্রচারের উদ্দেশ্য কি?' ধন-সম্পদ চান? সুন্দরী রমণী চান? সমগ্র নগরের নেতৃত্ব চান?-আমরা আপনাকে সবকিছু দিতে রাযী আছি। তবে আপনি আমাদের দেবদেবীর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকুন এবং যারা এদের উপাসনা করে (আমাদের পূর্বপুরুষগণও এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত) তাদের জাহান্নামী হওয়ার ঘোষণা বন্ধ করুন।" উত্তরে রসূলুল্লাহ (সা) কুরআনের ঐ আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করতে লাগলেন, যাতে আল্লাহর আযাবকে ভয় করতে বলা হয়েছে। তিলাওয়াত শুনে উতবা এত প্রভাবান্বিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল যে, তার মনে হতে লাগল, এখনই বুঝি আল্লাহর আযাব নাযিল হবে। অবিলম্বে কুরআন তিলাওয়াত বন্ধ করার জন্য সে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কসম দিতে লাগল এবং অন্য কোন কথা না বলে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়ল।

নবুওতের ছয় বছর কেটে গেল। ইসলাম ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করল। যারা একবার ইসলাম গ্রহণ করল, শত প্রলোভন, প্ররোচনা, এমন কি অমানুষিক নির্যাতন তাদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে পারল না। এতে কুরায়শের মুশরিক নেতাদের ক্রোধ ক্রমশ বাড়তে লাগল। এই কঠিন মুহূর্তেও রসূলুল্লাহ্ (সা) ধৈর্যচ্যুত হলেন না বরং তিনি যথারীতি তাঁর পরম শত্রুদের সেবাযত্ন করে গেলেন। তাঁর এই উদার ব্যবহারের অপ্রত্যাশিত ফলও পাওয়া গেল। একদা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিতৃব্য হামযা শিকার থেকে প্রত্যাবর্তন কালে সংবাদ পেলেন, আবু জেহেল রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছে, এমন কি তাঁকে দৈহিক নির্যাতনও করেছে। হামযা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নি, কিন্তু এই ঘটনার খবর পাওয়া মাত্র তিনি সোজাসুজি হরমে চলে যান এবং সেখানে গিয়ে আবূ জেহেলকে দেখামাত্র হাতের ধনুক তার দিকে তাক করে বলেন, "এখনই আমি ইসলাম গ্রহণ করছি। যদি কারো সাহস থাকে তো আমার মুকাবিলা কর।”

রুকানা নামক পাহলোয়ানের ইসলাম গ্রহণের সঠিক সময় জানা যায় নি। তবে এটুকু জানা গেছে যে, সে নবুওতের সত্যতা প্রমাণের জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাঁর সাথে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল, "যদি আমি হেরে যাই তাহলে বিরাট মেষপালের এক-তৃতীয়াংশ আপনাকে দিয়ে দেব।” রসূলুল্লাহ্ মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং রুকানাকে একবার নয় বরং তিন তিনবার হারিয়ে দিয়ে তার সমস্ত মেষপালের অধিকারী হন। এতে রুকানা কান্নাকাটি শুরু করে দিলে রসূলুল্লাহ্ (সা) তার মেষপালটি ফেরত দিয়ে দেন। রসূলুল্লাহর এই ব্যবহারে সে যারপর নাই মুগ্ধ হয় এবং একাগ্রচিত্তে ইসলাম গ্রহণ করে (শরহে সীয়ার কবীর)। রুকানা এমন জবরদস্ত পাহলোয়ান ছিল যে, মাটিতে বিছানো একটি চামড়ার উপর সে যখন সোজা হয়ে দাঁড়াত তখন লোকেরা টেনে বের করার চেষ্টা করলে বাইরের অংশটি ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যেত কিন্তু তার পায়ের নীচের অংশটি যেমনটি ছিল তেমনটিই থাকত।

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার জন্য কুরায়শ গোত্রের কেউ এগিয়ে না আসায় উমরের আত্মমর্যাদা ও বীরত্বে আঘাত লাগে। এ কাজটি করতে হলে পুরস্কার লাভেরও আশা আছে। যাহোক উমর রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। পথিমধ্যে এক আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়। আত্মীয় উমরকে সম্বোর্ডন করে বলেন, "রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করার পূর্বে তোমার নিজের ঘরের খবর নাও। তোমার সহোদরা ভগ্নি এবং ভগ্নিপতিও তো ইসলাম গ্রহণ করেছে।” একথা শুনে উমর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সোজাসুজি বোনের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেন এবং ভগ্নি ও ভগ্নিপতিকে প্রহার করতে থাকেন। তখন প্রহৃত বোন বলে উঠেন, 'হাঁ, আমরা মুসলমান হয়েছি, তোমার যা খুশি, তা করতে পার।' ঐ আওয়াজের কী জাদুকরী প্রভাব ছিল জানি না, তবে উমর তাতে শিউরে উঠেন এবং তাঁর হৃদয়ানুভূতি যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তিনি ভাবতে থাকেন, কী অহেতুক কাজেই না তিনি এবং তাঁর সম্প্রদায় লিপ্ত রয়েছেন! আল্লাহ্ নিঃসন্দেহে এক ও অদ্বিতীয়, আর এসব মূর্তি বেকার ও নিষ্কর্মা। এসব নিষ্কর্মাদের আরাধনা অসার ও ভিত্তিহীন। উমর ক্রমশ নরম হয়ে যান এবং বোনকে কুরআনের ঐ আয়াতটি দেখাতে বলেন, যা তিনি কিছুক্ষণ আগে পড়ছিলেন। বোন বললেন, 'তুমি অপবিত্র এবং অপবিত্র অবস্থায় কুরআন স্পর্শ করতে নেই। তুমি আগে গোসল করে এস, তারপর তিলাওয়াতের অনুমতি পাবে।' পাষাণ উমর তখন যেন গলিত মোমে পরিণত হন। তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে দেখা করার জন্যও ব্যাকুল হয়ে উঠেন। মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে উমর ইসলামের প্রসারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি আল-আরকমের বাড়িতে অবস্থানরত সকল মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) সবাইকে নিয়ে সেখানে জামা'আতের সাথে নামায আদায় করেন। কোন কুরায়শই তাতে বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি। তবে এ ঘটনা তাদের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কুরায়শরা এবার মুসলমানদের সাথে সামাজিক বয়কটে নামে। এ বয়কটের দরুন রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরিবারকে দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত ভীষণ বিপদের মধ্যে কাটাতে হয়।

নবুওতের দশম বছর। তখন বয়কটের অবসান হয়েছে সত্যি, কিন্তু মুসলমানদের দুঃখের অবসান হয় নি। আর ঐ দুঃখজনক পরিস্থিতিতেই রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে শোক সাগরে ভাসিয়ে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন তাঁর সহধর্মিণী খাদীজা (রা) ও পিতৃব্য আবূ তালিব। আবূ তালিবের পর গোত্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন আবু লাহাব; কিন্তু নবুওত প্রাপ্তির সেই সূচনা থেকেই আবু লাহাবের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কোন বনিবনা ছিল না। এমনকি তিনি (আবূ লাহাব) রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোত্রচ্যুতির কথাও ঘোষণা করেছিলেন। সুতরাং বাধ্য হয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য পা বাড়াতে হল তায়েফের দিকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইসলাম প্রচারের সামান্য প্রচেষ্টা চালাতেই তিনি ভীষণভাবে প্রহৃত হয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হন। নিজ গোত্রের সাথে সুসম্পর্ক না থাকায় কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় তিনি মক্কায় প্রবেশাধিকার লাভ করেন। তবে বাহ্যত এই শর্ত ছিল যে, তিনি মক্কায় কোন প্রকার প্রচারধর্মী বক্তব্য রাখতে পারবেন না।

আরবের লোকেরা প্রতি বছরই মক্কায় হজ্জ করতে আসত এবং সে উপলক্ষে সেখানে বিরাট মেলা বসত। ঐ সব মেলায় যোগদানের ব্যাপারে কোনরূপ বাধানিষেধ ছিল না। তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) উকায, যুল মাজায, মুজনাহ্ প্রভৃতি মেলায় নিয়মিত যোগদান করতেন। তিনি সর্বপ্রথম নগরীর বাইরে মিনা প্রান্তরে কতিপয় গোত্রের লোকদের সাথে তাদের তাঁবুতেই সাক্ষাত করেন। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি ঐভাবে পনরটি গোত্রের সাথে পর্যায়ক্রমে সাক্ষাত করেন। তিনি তাদের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানান, "আপনারা আমায় সহযোগিতা করুন, আমাকে আপনাদের দেশে নিয়ে যান এবং আমায় প্রচারকার্যে সাহায্য করুন, এতে শুধু আপনাদের পরকালেরই নয় বরং ইহকালেরও প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে এবং আপনারা অতিসত্বর রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের অধিকারী হতে পারবেন। সাফল্য আপনাদের অনিবার্য। আবু লাহাব কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাঁর প্রায় প্রত্যেকটি সমাবেশে ও বক্তৃতায় ছায়ার মত অনুসরণ করে তাঁর শ্রোতাদের উদ্দেশ্য করে বলতে থাকলো, "সাবধান! আপনারা এ পাগলের কথায় কান দেবেন না, অন্যথায় আপনারা সমগ্র কুরায়শদের কোপানলে পড়বেন।” একদা রসূলুল্লাহ্ (সা) মিনা থেকে মক্কার দিকে ফিরে আসছেন। এমন সময় আকাবা উপত্যকায় মদীনার কয়েকজন হাজীকে দেখতে পেলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মনস্থ করলেন, ওদের কাছেও নবুওতের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাতুলালয় ছিল মদীনায়। মদীনাবাসীদের সাথে তাঁর ছিল মামা-ভাগ্নে সম্পর্ক; আর য়াহূদীদের সাথে সহ-অবস্থানের ফলে নবী, পরকাল, পুনরুত্থান ইত্যাদি সম্পর্কে মদীনাবাসীরা ছিল স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী।

তখনকার আহলে কিতাবীরা বিশ্বাস করত যে, সমগ্র বিশ্বের শান্তিদাতা রূপে অচিরেই একজন নবীর আবির্ভাব হবে, আর সেই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে য়াহূদীরা মদীনাবাসীদের বলত, "যখন ঐ প্রতিশ্রুত নবী আবির্ভূত হবেন তখন আমরা তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয়ে আমাদের শত্রুদের শায়েস্তা করবো।" যাহোক উপরোক্ত কারণে মদীনাবাসীরা শেষ নবী সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী ছিল এবং উক্ত নবী ইতিমধ্যে আবির্ভূত হয়েছেন বলেও তারা সংবাদ পেয়েছিল। আর এটা তাদের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, নিজেরা উক্ত নবীর খিদমতে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি নিজেই এসে তাদের কাছে উপস্থিত হয়েছেন। অতএব কোনরূপ ইতস্তত না করে আকাবায় অবস্থানকারী মদীনার হাজীরা তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করল এবং নিজেদের মাতৃভূমি মদীনায় ফিরে গিয়ে এর প্রচারে মনোনিবেশ করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিল।

এদেরই প্রচেষ্টায় এক বছরে মদীনায় যে দশ বারজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল, পরবর্তী হজ্জ মওসুমে তারা আকাবায় উপস্থিত হয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করে এবং নিজেদের ও নিজেদের গোত্রসমূহের পক্ষ থেকে এই বলে আনুগত্য প্রকাশ করে যে, তারা এক আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না; ব্যভিচার, চুরি ও কন্যা সন্তানদের হত্যা থেকে বিরত থাকবে, জেনে শুনে কারো বিরুদ্ধে অপবাদ রটাবে না এবং কখনো রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করবে না। এই প্রতিনিধিদল তাদের সাথে একজন শিক্ষক পাঠাবার জন্যও রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অনুরোধ জানায় এবং সে অনুযায়ী হযরত উমাইরকে মদীনায় পাঠনো হয়। হযরত উমাইর (রা) মদীনায় গিয়ে ইসলামের পক্ষে জোর প্রচার কার্য চালান এবং মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেন। এই পুণ্যবান ব্যক্তি সেখানে কিভাবে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদন করেছিলেন এবং সেখানকার বিরুদ্ধ মতাবলম্বী নেতাদেরকে কিভাবে নিজের বশে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন তারীখে তাবারীতে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মদীনার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত উমর (রা)-এর মতই একজন তেজস্বী ও সাহসী নেতা ছিলেন। কুরআনের কয়েকটি আয়াত শোনামাত্র তিনিও ইসলামের প্রতি এতই অভিভূত হয়ে পড়েন যে, মহল্লায় গিয়ে আপন অনুসারীদের প্রতি প্রকাশ্য ঘোষণা দেন, "তোমরা যদি আমার কাছ থেকে সদ্ব্যবহার পেতে চাও, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নাও, অন্যথায় আমিও হব তোমাদের সবচাইতে ঘোর শত্রু।” তাঁর ঐ ঘোষণার ফলে সেদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই গোত্রের সব লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়।

আর একটি বছর অতিবাহিত হল। ইতিমধ্যে হযরত উমাইরের হাতে যাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন তাঁদের একটি বিরাট দল হজ্জ উপলক্ষে মিনায় আসেন এবং আকাবা উপত্যকায় তাঁদের প্রিয় নেতা রসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করেন। তারা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে মদীনা গমনের অনুরোধ জানান এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাঁরা সেখানে রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর মক্কার সাথীদের যথাযোগ্য মেহমানদারী করবেন এবং এমনভাবে তাঁদের নিরাপত্তা বিধান করবেন, যেমন তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা বিধান করে থাকেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) তখন বললেন, "তোমাদের যুদ্ধ আমাদেরই যুদ্ধ এবং তোমাদের সন্ধি আমাদেরই সন্ধি। আমি এখন তোমাদেরই হয়ে গেলাম।"

এটা ছিল বিশ্বের স্মরণকালের ইতিহাসে এমন একটি বাস্তব সামাজিক চুক্তি, যার মাধ্যমে কিছু লোক এক ব্যক্তিকে তাদের নেতা মনোনীত করে এবং চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অধিকার এবং দায়িত্বও নির্ধারণ করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনার পর থেকেই হিজরতের কার্যকরী পদক্ষেপ শুরু হয়।

হিজরতের পর, ক্ষমতার প্রসার ও সরকার গঠনকালীন যুগেও ইসলাম প্রচারের কাজ ছিল মুখ্য। এজন্য দিকে দিকে শিক্ষক ও মুবাল্লিগ পাঠানো হত। আর সরকারী সংস্থাগুলো এদের পৃষ্ঠপোষকতা ও নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করত। তবে অমুসলিম নাগরিকদের সাথেও সম্পূর্ণ ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক ব্যবহার করা হত। অবশ্য তারা অনুভব করত যে, তারা একটি জাতীয় ও ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্রে নয় বরং এমন একটি রাষ্ট্রে বাস করছে, যার রয়েছে একটি বিশেষ জীবন-দর্শন। মুসলমান কৃষকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ভূমি রাজস্ব আদায় করা হত, তাদের কাছ থেকে আদায় করা হত তার চাইতে অনেক কম। মুসলমান বণিকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ আয়কর আদায় করা হত তাদের কাছ থেকে আদায় করা হত তার অর্ধাংশ মাত্র। জিহাদ ছিল মুসলমানদের জন্য ফরয বা অবশ্য কর্তব্য; পক্ষান্তরে অমুসলিমদের উপর এ ব্যাপারে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। তারা কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার এবং রাষ্ট্রীয় তহবিলে জিযিয়া কর জমা দিয়ে স্ব স্ব গৃহে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারত। একজন অমুসলিম সহজেই ইসলামী প্রধান বা শাসক হতে পারত না, ততক্ষণ না সে রাষ্ট্রের 'জীবনদর্শন'কে নিজের জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করত এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি ক্ষেত্রে এই জীবনদর্শনের জন্যই নিজের জান, মাল ও সর্বশক্তি নিয়োগ করত।

ইসলামের জীবন-দর্শন সহজ বিষয় নয়। অন্যকে সৎ কাজের আদেশ দেবে অথচ নিজে তা করবে না-সে সুযোগ ইসলামে নেই। স্বয়ং রসূলুল্লাহ্ (সা) অন্যকে যে কাজের আদেশ দিতেন, নিজে তার চেয়ে অধিক পরিমাণে সে কাজ করতেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px