📄 বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স যখন পঁচিশ বছর দু'মাস দশ দিন, তখন তিনি খাদীজা বিনতে খুডায়ল্দ বিন আবদুল উযা বিন কুসাই-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবি খাদীজা শুধু সুন্দরীই ছিলেন না, প্রচুর ধন-রত্নেরও অধিকারী ছিলেন। কুরায়শের অনেক নেতৃস্থানীয় লোকই তাঁর পাণি-প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু তিনি কাউকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে সম্মত হননি। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা ও অন্যান্য সদ্গুণের খ্যাতি ছিল সমগ্র মক্কা নগরীতে। তাঁর পবিত্রতার কথাও সর্বত্র আলোচিত হত। বিবি খাদীজাও এসব বিষয় সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ফুফু হযরত সুফিয়া বিবি খাদীজার ভাই আওয়াম বিন খুভায়লদ-এর স্ত্রী ছিলেন। বিবি খাদীজা আলাপ প্রসঙ্গে হযরত সুফিয়ার কাছ থেকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যক্তিগত জীবনেরও খুঁটিনাটি জানার সুযোগ পান। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সতী-সাধ্বী রমণী হিসাবে স্বাভাবিকভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি তাঁর অনুরাগের সৃষ্টি হয়। তাছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার উদ্দেশ্যেই প্রধানত তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিজের পণ্য-সামগ্রী দিয়ে সিরিয়া পাঠান এবং স্বীয় দাস মায়সারাকেও তাঁর সঙ্গী করে দেন। ঐ অভিযানে বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সততা ও উন্নত গুণাবলীর অনেক প্রত্যক্ষ প্রমাণ পান। ফলে তিনি স্বয়ং নাফিসা বিনতে উমাইয়া অর্থাৎ ইউলা বিন উমাইয়ার ভগ্নির মাধ্যমে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তাঁর বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। ইবনে ইসহাকের মতে তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে ডেকে এনে সাক্ষাতেই সব কথা পাকাপাকি করেছিলেন। বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কেন ভালবেসেছিলেন তা তাঁর তখনকার একটি বক্তব্য থেকেই পরিস্ফুট হয়ে উঠে। তিনি বলেছিলেন, "আপনার সচ্চরিত্র ও সত্যবাদিতার কারণেই আমি আপনার অনুরাগী হয়ে উঠেছি।”
রসূলুল্লাহ (সা)-এর ঐ সংবাদটি পিতৃব্য আবূ তালিবের কাছে পৌঁছালে তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাতে সায় দেন। অতঃপর তিনি বনী হাশিম ও 'মুদা'র গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকদের নিয়ে বিবি খাদীজার বাড়িতে যান এবং সেখানেই বিবাহের যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। আব্দ অনুষ্ঠানে আবূ তালিব যে সারগর্ত ভাষণ দেন, তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অভিভাবকরা ঐ সময়ে তাঁর সম্পর্কে কি উন্নত ধারণা পোষণ করতেন এবং তাঁর স্বভাব-চরিত্র তাঁদের উপর কী অসাধারণ প্রভাবই না বিস্তার করেছিল! আবূ তালিবের ভাষণ ছিল নিম্নরূপঃ
সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর-যিনি আমাদের ইবরাহীমের বংশে ও ইসমাঈলের গোত্রে সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের মা'দ ও মুদারে'র পবিত্র উৎস থেকে উৎসারিত করেছেন, যিনি আমাদের তাঁর গৃহের রক্ষক ও হরমের ইমাম মনোনীত করেছেন, যিনি আমাদের এমন গৃহ দান করেছেন যার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে অসংখ্য লোকের আগমন ঘটে এবং এমন 'হরম' দান করেছেন যেখানে কেউ উপস্থিত হলে পুরোপুরি নিরাপত্তা লাভ করে, যিনি আমাদের জনগণের নেতা মনোনীত করেছেন। অতঃপর বলছি, আমার ভ্রাতুপুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সম্পর্কে, জ্ঞানগরিমা ও মহত্ত্বে যার সাথে অন্য কারো তুলনাই হয় না- যদিও তাঁর ধন-সম্পদ অতি অল্প। তবে জেনে রাখবেন ধনসম্পদ নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। মুহাম্মদের (সা) সাথে আমার কি সম্পর্ক রয়েছে আপনারা সকলেই তা জানেন। তিনি বিবি খাদীজা বিনতে খুভায়লকে বিবাহ করার জন্যে প্রস্তাব দিয়েছেন, অতএব, আমি আমার সম্পদ হ'তে বিশটি উট এ বিবাহের মুহর হিসেবে দান করলাম। তাঁর ভবিষ্যত, আল্লাহর শপথ, অত্যন্ত উজ্জ্বল ও গৌরবময়।
যখন আবূ তালিবের ভাষণ শেষ হলো তখন বিবি খাদীজার পিতৃব্য পুত্র ওরাকাহ বিন নওফেল ভাষণ দিতে উঠেন। তাঁর ভাষণের বিষয়বস্তু ছিল:
সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের সেসব গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যার কথা আবূ তালিব উল্লেখ করেছেন। আমরা সারা আরবের নেতা ও ইমাম, আর আপনারা সর্ব প্রকার সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। কোন দল বা গোষ্ঠীই আপনাদের মর্যাদা অস্বীকার করতে পারবে না এবং আপনাদের আভিজাত্য ও মর্যাদাকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আমরা অত্যন্ত আনন্দ উদ্দীপনা নিয়ে আপনাদের সাথে আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হতে যাচ্ছি। অতএব, হে কুরায়শের লোকেরা! আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমি চার শ' মিসকালের বিনিময়ে খাদীজা বিনতে খুভায়দকে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লার হাতে তাঁর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে তুলে দিচ্ছি।
ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আবু তালিব বললেন, "হে ওরাকাহ, উমর বিন আসাদ যখন এই মাহফিলে উপস্থিত আছেন, তখন তিনিও এ ব্যাপারে আপনার সাথে অংশ নিন—এটা আমি কামনা করি।” তখন আমর বিন আসাদ দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি খাদীজা বিনতে খুয়ায়লদকে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর স্ত্রীত্বে সমর্পণ করলাম।” এভাবে উভয় পক্ষের ইজাব (প্রস্তাব দান) ও কবুল (প্রস্তাব গ্রহণ)-এর মধ্য দিয়ে বিবাহকাজ সম্পন্ন হয়।
বিবাহের সময় বিবি খাদীজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তিনি বিধবা ছিলেন এবং ইতিপূর্বে তাঁর আরো দু'টি বিয়ে হয়েছিল। প্রথম বিয়ে হয়েছিল আবিহালা বিন যারারাহ তামীমীর সাথে। ঐ ঘরে তাঁর গর্ভে হিন্দ বিন আবিহালা ও যয়নব বিনতে আবিহালা নামক দুটি সন্তান জন্ম নেয়। দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল আতীক বিন আয়িয মাখযুমীর সাথে। ঐ ঘরেও তাঁর গর্ভে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। পুত্র সন্তানের নাম আবদুল্লাহ বিন আতীক ছিল বলে জানা যায়।
📄 সামাজিক ও নাগরিক জীবন
বিবাহ-উত্তর জীবন
বিবি খাদীজার মৃত স্বামীদ্বয়ের সন্তানরা আরবের প্রচলিত প্রথানুযায়ী সম্ভবত তাঁর শ্বশুরালয়েই রয়ে গিয়েছিল। কেননা, তাঁর এ বিয়ের সময় তাঁর সন্তানরা বেশ বড়সড় হয়ে গিয়েছিল। যা হোক, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পারিবারিক জীবনে কিন্তু এসব সন্তানের বিশেষ কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে অনুমান করা হয় যে, এদের সাথে তাঁর ব্যবহার নিশ্চয়ই সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল।
দুধমায়ের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সম্পর্ক ছিল সবসময়ই মধুর। সুহাইলী তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, "রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিবাহের পর বৃদ্ধা হালিমা তাঁকে দেখতে এলে নববধূ বিবি খাদীজা তাঁর সাথে অত্যন্ত শিষ্টাচারপূর্ণ ব্যবহার করেন এবং তাঁকে উপঢৌকনস্বরূপ কয়েকটি উট প্রদান করেন। বিবি হালিমা অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করেন এবং নবদম্পতির মঙ্গল কামনা করে তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নেন।” ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বিবি হালিমা তাঁর দুর্ভিক্ষজনিত অভাবের কথা ব্যক্ত করলে বিবি খাদীজা তাঁকে চল্লিশটি ছাগল এবং একটি উট দান করেন।
বিবি খাদীজার সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বৈবাহিক জীবন যে কত মধুর ও সুখময় ছিল তা দশ বছরের মধ্যে ছয়-সাতটি সন্তান লাভের মাধ্যমেই নয় বরং বিবি খাদীজার ইন্তেকালের পর রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে যেরূপ আবেগ-উচ্ছ্বাসের সাথে স্মরণ করতেন, তা থেকেও অতি সহজে অনুমান করা যায়। রসূলুল্লাহ্ (সা) বিবি খাদীজাকে এত বেশি স্মরণ করতেন-যা তাঁর সবচেয়ে প্রিয়তমা পত্নী হযরত আয়েশার কাছেও ছিল দস্তুরমত ঈর্যার ব্যাপার। রসূলুল্লাহ্ (সা) যতক্ষণ ঘরে থাকতেন, ততক্ষণ স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির সাথে কিরূপ মধুর ব্যবহার করতেন, তাদেরকে কত বেশি আদর করতেন এবং তাদের মন রক্ষা করার প্রতি কিরূপ যত্নবান থাকতেন, হাদীস গ্রন্থাদিতে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি তাঁদেরকে সব সময়ই ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বদান্যতার প্রশিক্ষণ দিতেন ও তাঁদের বোধগম্য হয় এমন কথাবার্তা বলতেন। সত্যিকথা বলতে গেলে, সকলের সাথে সবসময় সদ্ভাব বজায় রেখে চলাই ছিল তাঁর আচরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
বিবাহ-উত্তর ও নবুওতপূর্ব পনর বছরের জীবন তিনি কিভাবে কাটিয়েছিলেন তার সত্যিকার রূপরেখা একমাত্র কোন অভিজ্ঞ প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে। নবুওতের প্রাথমিক যুগে আল্লাহ্ কর্তৃক তাঁকে প্রদত্ত 'উম্মী' (নিরক্ষর) উপাধির কারণে তিনি বিচলিত হয়ে পড়লে বিবি খাদীজা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, "আপনি নিঃসন্দেহ থাকুন, আল্লাহ্ আপনাকে বিপর্যস্ত করবেন না এবং আপনার জন্য কল্যাণকর নয় এমন কিছুও করবেন না। কেননা, আপনি নিকটাত্মীয়দের হক আদায় করেন, অতিথিদের সেবাযত্ব করেন, পরিবারের ভরণ-পোষণ করেন, পরিশ্রম করে রোজগার করেন, ন্যায় ও সত্যের কাজে সকলকে সাহায্য করেন, অনাথদের আশ্রয় দেন, সবসময় সত্য কথা বলেন, কখনো বিশ্বাসঘাত করেন না, অক্ষমদের সাহায্য করেন, গরীব নিঃস্বদের সাথে সদ্ব্যবহার করেন এবং সকলের সাথেই সদ্ভাব রাখেন।"
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আর যেসব গুণের সন্ধান পাওয়া যায়, তা হলো, তিনি নিজে শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন, বসে বসে ধনবতী স্ত্রীর সম্পত্তি ভোগ করাকে তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি খাদ্যশস্যের ব্যবসা করতেন। খুব সম্ভব তিনি ব্যবসায়ে অন্য কোন লোকের সাথে অংশীদার ছিলেন।
তাবারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, ঐ সময়ে মক্কায় একবার ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন আবু তালিবের বিরাট পরিবারটি অত্যন্ত দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়। একদিন রসূলুল্লাহ্ (সা) পিতৃব্য আব্বাসের কাছে গিয়ে আবূ তালিবকে এই দুঃসময়ে সাহায্য করার আবেদন জানান। শেষ পর্যন্ত তিনি এবং আব্বাস আবু তালিবের পুত্র যথাক্রমে আলী এবং জাফরকে ভরণ-পোষণের জন্য নিজ নিজ পরিবারে নিয়ে আসেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রতিটি সৎকর্মেই ছিলেন অগ্রণী এবং এক্ষেত্রে অন্যান্যকেও তিনি অনুপ্রেরণা দান করতেন।
উল্লেখিত আচার-আচরণের কারণেই সমগ্র মক্কা নগরীতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। আযরাকী প্রমুখ ইতিহাসবিদের মতে, যদিও চল্লিশের কম বয়স্ক লোকের পক্ষে মক্কা নগরীর (ব্যবস্থাপনার) সদস্যপদ লাভ করার সুযোগ ছিল না, কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দূরদর্শিতা, ন্যায়বিচারসুলভ ও পক্ষপাতহীন আচরণের কারণে যেকোন সমস্যা সমাধানে তার বয়োজ্যেষ্ঠরাও যে তাঁর উপর নির্ভরশীল ছিলেন তার বাস্তব দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করা যায় নগরের একাধিক সমস্যা সমাধানে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স যখন আনুমানিক পঁয়ত্রিশ বছর তখন একটি অগ্নিকাণ্ডের কারণে এবং পরবর্তী সময়ে ধ্বংসাত্মক বন্যার ফলে পবিত্র কা'বাগৃহের প্রাচীর ধ্বসে পড়ে। মক্কা ছিল চতুর্দিক দিয়ে পর্বতশ্রেণী পরিবেষ্টিত এবং এর সবচেয়ে নীচু জায়গায় ছিল পবিত্র কা'বাগৃহের অবস্থান। ফলে, নগরে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই সমস্ত পানি এখানে এসে জমা হতো। পূর্ব অভিজ্ঞতা সামনে রেখে 'আ'মির আল জাদির' নামক মক্কার জনৈক দলপতি কা'বার মূল প্রাচীরকে বন্যার স্রোত থেকে রক্ষা করার জন্যে এর চতুর্দিকে পৃথক আর একটি প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু উল্লেখিত বছরে এত অধিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়েছিল যে, বাইরের প্রাচীর মূল প্রাচীরকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ফলে বাধ্য হয়েই এটা পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন পর্যন্ত কা'বাগৃহের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয়ই ছিল ন'হাত করে এবং উচ্চতা ছিল মানুষের দেহের উচ্চতার চাইতে সামান্য কিছু বেশি। এছাড়া এর উপরিভাগে ছাদের কোন ব্যবস্থা ছিল না। সে বছর মক্কা নগরীর উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী সাগরের উপর দিয়েও ঝড় বয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। বাস্তবে হয়েও ছিল তা-ই এবং ঐ সর্বনাশা ঝড়ের কবলে পড়ে জিদ্দার অদূরে একটি রোমীয় জাহাজ ডাঙ্গায় আটকা পড়ে এবং তা লুণ্ঠিত হয়। আযরাকীর মতানুসারে, ঐ সংবাদ যখন মক্কাবাসীদের কাছে পৌঁছে তখন তারা সম্পদের লোভ-লালসা পরিহার করে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসে। ঐ জাহাজের আরোহীদের মধ্যে যারা প্রাণে বেঁচেছিল তারা তাদের সেবাযত্ব করে এবং যে সমস্ত পণ্যদ্রব্য রক্ষা পেয়েছিল, সেগুলো তারা শুধু উচিত মূল্যে কিনেই নেয়নি বরং সেগুলোর শুল্কও রহিত করে দেয়। তারা জাহাজের তক্তাগুলোও কিনে নেয়। মক্কায় বাকুম নাম্নী জনৈকা মিসরী মহিলার সন্ধান পাওয়া যায়। এক বর্ণনানুসারে ঐ বৃদ্ধাটিও ঝড়ে আক্রান্ত হয়েছিল এবং মক্কাবাসীদের উদার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে চিরদিনের জন্য সেখানেই রয়ে গিয়েছিল। কোন কোন বর্ণনা মতে, মর্মর পাথর, লোহা, কাঠ ইত্যাদি গৃহনির্মাণ সামগ্রীই ছিল ঐ জাহাজের পণ্যদ্রব্য। একটি গীর্জা নির্মাণের জন্য ঐসব সামগ্রী মিসর হতে আবিসিনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। অতএব কা'বাগৃহ নির্মাণে ব্যবহারযোগ্য ঐসব প্রয়োজনীয় অথচ অত্যুৎকৃষ্ট সামগ্রী কোনরূপ চেষ্টা-চরিত্র ছাড়াই মক্কাবাসীরা পেয়ে যায়। তখন মক্কাবাসীদের চোখের সামনে আর একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে; আর তা হচ্ছে এই যে, ভালভাবে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পূজার নযর-নিয়াজ তথা নৈবেদ্যাদি কা'বার দরজার নিকটস্থ যে অন্ধকূপে নিক্ষেপ করা হতো, সেখানে কোথা থেকে একটি বিরাট সর্প এসে বাসা বাঁধে। ফলে জনমনে দারুণ ত্রাসের সৃষ্টি হয়। যখন কা'বাগৃহ পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছিল তখন হঠাৎ একদিন সাপটি অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে এসে প্রাচীরের উপর ঘোরাফেরা করতে থাকে এবং ঠিক তখনি একটি বাজপাখী কোথা থেকে বিদ্যুৎ বেগে উড়ে এসে সাপটি ছোঁ মেরে ধরে নিয়ে যায়। এ বিস্ময়কর অথচ অলৌকিক ঘটনা থেকে মক্কাবাসীরা এই অনুপ্রেরণা লাভ করে যে, তারা তাদের এই প্রাচীন ও পবিত্র উপাসনালয় নির্মাণে অবৈধ উপায়ে অর্জিত কোন টাকা-পয়সা খরচ করবে না। জুলুম অথবা বল প্রয়োগের মাধ্যমে কিংবা সুদী ব্যবসা করে যেসব অর্থ উপার্জিত হয়েছে সেগুলোও এই পুণ্য কাজে ব্যয় করা হবে না। কা'বাগৃহ ছিল চার প্রাচীর বিশিষ্ট এবং এর নির্মাণ কাজ মক্কাবাসীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল।
দরজা সংলগ্ন প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব আব্দে মনাফ এবং বনী যুহরার উপর পড়েছিল। হজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী প্রাচীরের নির্মাণ কাজ বনী মখযুম, তায়ীম ইত্যাদি গোত্র গ্রহণ করেছিল। পেছনের প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব ছিল বনী সাহাম ও বনী জামাহ-এর উপর। হজর বা হাতীম সংলগ্ন প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব ছিল বনী আবদেদার, বনী আসাদ ও বনী আদীর উপর। পুরাতন প্রাচীরটিকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে অপসারণ করা হয়। গৃহের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আগের চাইতে দ্বিগুণ করা হয়। একটি সিঁড়িও নির্মাণ করা হয় এবং উপরিভাগে ছাদ দেয়া হয়। কা'বার 'হাতীম' নামক অংশটি ছাদবিহীন অবস্থায় অর্ধেক প্রাচীর দ্বারা বৃত্তাকারে নির্মাণ করা হয়। কিছু ফাঁক রেখে এর দু'দিকের প্রাচীরকে কা'বাপ্রাচীর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, যাতে যেকোন লোক যেকোন সময় এতে প্রবেশ করতে পারে। এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ছিল কা'বাগৃহে প্রবেশ করারই শামিল। সাধারণ চুক্তি সম্পাদন, শপথ গ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে জনসাধারণ হাতীমকেই ব্যবহার করত। তারা মূলগৃহে সপ্তাহে শুধু সোমবার ও বৃহস্পতিবার-এ দুদিন প্রবেশ করত। অবশ্য বিশেষ বিশেষ উৎসব উপলক্ষে অন্য যেকোন দিনও প্রবেশ করা চলত। প্রাচীরের নির্মাণ কাজ শুরু হলে নগরের সকলেই পাথর বহন এবং তা স্থাপনের কাজে অংশ নিতে থাকে। প্রাচীর নির্মাণের কাজ উচ্চতায় দেড় গজ পর্যন্ত পৌঁছলে 'হজরে আসওয়াদ'কে এমন একটি জায়গায় স্থাপনের প্রয়োজন অনুমিত হয় যেখান থেকে তা তওয়াফকারীদের নজরে পড়ে এবং তারা সেটাকে সহজে চুম্বনও করতে পারে। হজরে আসওয়াদ ছিল একটি পবিত্র পাথর; একে যথাস্থানে স্থাপন করা ছিল একটি অতি সম্মানের কাজ। সুতরাং প্রত্যেক গোত্রের লোকই সে কাজটি সমাধা করতে চায়। শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্বকলহের সৃষ্টি হয় এবং তা যুদ্ধের আকার ধারণ করে। হাতীম অংশের নির্মাণকারীরা 'রক্তপূর্ণ পাত্রে হাত ডুবিয়ে' শপথ নিল যে, তারা কিছুতেই এ সম্মানজনক কাজ সমাধা না করে ছাড়বে না। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে পাঁচদিন পর্যন্ত কা'বার নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকে। অবশেষে এ সংকট নিরসনের জন্যে কা'বা প্রাঙ্গণেই পরস্পর সলা-পরামর্শ চলতে থাকে! বৃদ্ধ উমাইয়া বিন আল-মুগীরা সকলকে সম্বোধন করে বললেন, "তোমরা এই ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। আগামী দিন যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম এ পথে কা'বাগৃহে আসবে সে এ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত দেবে তাই তোমরা মেনে নেবে।” (অতি প্রত্যূষে) হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে সর্বাগ্রে সেখানে আসতে দেখে দূর হতে সকলেই সমস্বরে বলে উঠল, "এই তো আমাদের আল- আমীন আসছে, এই তো আমাদের মুহাম্মদ (সা) আসছে, আমরা সকলে তাঁর উপরই মীমাংসার ভার অর্পণ করলাম।” রসূলুল্লাহ (সা) যখন কাছে এলেন তখন আসল ঘটনার কথা তাঁকে বলা হলো। তখন তিনি ইচ্ছা করলে এ সম্মানজনক কাজটি নিজের জন্য অথবা নিজের গোত্রের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে তৎক্ষণাৎ একখানি চাদর চেয়ে নিয়ে তাতে হজরে আসওয়াদ রাখেন এবং প্রত্যেক গোত্রের মনোনীত ব্যক্তিদেরকে সেই চাদরের এক এক কোণা ধরে পাথরটিকে সম্মিলিতভাবে উঠানোর আহবান জানান। এভাবে সকলে নির্দিষ্ট স্থানের নিকটবর্তী হলে তিনি হজরে আসওয়াদকে নিজ হাতে চাদর থেকে উঠিয়ে নিয়ে প্রাচীরগাত্রে স্থাপন করেন। এভাবে রসূলুল্লাহ (সা) সেদিন একটি অবশ্যম্ভাবী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধকে অতি সহজে প্রতিরোধ করেছিলেন। যারা ঐ ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি করেছিল আজ বিশ্বে তাদের নামগন্ধও নেই, যারা চাদর উঠিয়েছিল তাদের নামও আর কেউ জানতে চায় না, কিন্তু কিভাবে ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করতে হয়, একজন শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী হিসাবে সেদিন মুহাম্মদ আল-আমীন তাঁর যে 'উত্তম আদর্শ' স্থাপন করলেন তাতে তিনি বিশ্বে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ঐ সময়কার (কা'বা পুননির্মাণ চলাকালীন) শেষ ঘটনাটির কথাও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। মক্কাবাসীদের তখনকার পোশাক ছিল সাধারণত একটি লুঙ্গি ও একটি চাদর। বিত্তহীনদের আবার চাদর গায়ে দেওয়ার সঙ্গতি ছিল না। কা'বা নির্মাণের সময় ভারী ভারী পাথর কাঁধে করে বয়ে আনতে হত। সুতরাং কাঁধের চামড়া যাতে কেটে না যায় সে জন্যে বিত্তহীন লোকেরা নিজেদের লুঙ্গিকেই কাঁধের উপর ভাঁজ করে গদির মত বানিয়ে নিত। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর কাঁধের চামড়া কেটে যাচ্ছে দেখে পিতৃব্য আব্বাস উপরিউক্তভাবে গদি বানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন কিন্তু যখনই তিনি তা করতে যান, তখনই মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। অতএব ঐ লজ্জাজনক কাজটি করা তাঁর পক্ষে সেদিন সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতেও তিনি কোনদিন এ কাজ করার ইচ্ছা করেন নি।
যখন কা'বার নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলো এবং তা আল্লাহর ঘর হিসেবে স্বীকৃতিও পেল তখন পৌত্তলিক মক্কাবাসীরা অনতিবিলম্বে তাতে কারুকার্য শুরু করে দিল। তারা কা'বাপ্রাচীরের ভিতরের দিকে নানা ধরনের ছবি আঁকলো। তন্মধ্যে ফেরেশতার ছবিসহ কয়েকজন নবী-রসূলেরও ছবি ছিল। তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা (লটারী) করছেন, হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর সেরূপ ছবিও তাতে অংকিত হলো। বিবি মরিয়ম ও হযরত ঈসা (আ)-এর ছবিও তাতে স্থান পেল। কা'বার অঙ্গনে-প্রাঙ্গণে প্রত্যেক গোত্রের মোট ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হলো। এভাবে সুচতুর কুরায়শরা কা'বাকে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীর জন্যে "সার্বজনীন দেবালয়ে” পরিণত করল। ফলে আরবের প্রত্যেক ধর্মের ও প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা অত্যন্ত খুশীমনে কা'বা দর্শন ও তা প্রদক্ষিণ করতে শুরু করল। বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে কুরায়শদের জন্য এটা অত্যন্ত কল্যাণকর প্রমাণিত হলো।
এক ও অদ্বিতীয় (লা-শরীক) আল্লাহর ঘরটি এভাবে 'দেবালয়ে' পরিণত হচ্ছে দেখে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মন-মানসিকতা তথা চিন্তারাজ্যে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। তিনি তখন থেকে শুধু এ ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাই করেন নি বরং অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে প্রতীক্ষাও করতে থাকেন- 'কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়' তা দেখার জন্য।
📄 নবুওতের সূর্যোদয়
যে বিশ্বাস ও মর্যাদার সাথে বায়তুল্লাহর (কা'বাগৃহের) নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, যেভাবে অবৈধ অর্থের চাঁদা পরিহার করে কেবলমাত্র হালাল ও বৈধ মাল দিয়ে তা নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবে নগরের চিন্তাশীল লোক ও যুবক সমাজের মনে এক অভাবনীয় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। কা'বার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অবস্থা এরূপ দাঁড়িয়েছিল যে, এখানে এসে মিথ্যা শপথ নিতে যেকোন লোক বিব্রত বোধ করত এবং কোন ব্যাপারে অত্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহমুক্ত হলে পর 'হাতীমে কা'বায়' এসে সে ব্যাপারে শপথ নিত। ক্রমে ক্রমে জনমনে এরূপ ধারণারও সৃষ্টি হয়েছিল যে, এখানে কোন ব্যক্তি মিথ্যা শপথ নিলে বিশ্বে তার নাম-নিশানা থাকবে না এবং সবংশে সে নিপাত যাবে।
কিছুদিন যেতে না যেতেই যখন লা-শরীক (অদ্বিতীয়) আল্লাহর ঘর দেবালয়ে পরিণত হলো এবং এর অভ্যন্তরে ও বহিরাঙ্গনে তিন শ' ষাটটি প্রতিমা স্থাপন করা হলো, তখন স্বাধীন চিন্তাশীলদের মনে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। যেসব প্রতিমা মানুষেরই তৈরী, এমন কি নির্মাণগত অক্ষমতার কারণে যেগুলোর আকার-আকৃতিও বেমানান ও অশোভন, যারা কথা বলতে পারে না, নড়াচড়া করতে পারে না, কেউ ক্ষতি সাধন করলে যারা তাকে বাধাদানের সামান্যতম ক্ষমতাও রাখে না, তারা অন্যের কী উপকার বা অপকার করতে পারে এবং ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে এদের স্থানই বা কি হতে পারে? তা ছাড়া একটি কাহিনী তো সবারই জানা ছিল যে, খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী কোন এক অঞ্চলের লোকেরা মাটি ও পাথরের পরিবর্তে আটা দিয়ে একটি বৃহদাকার মূর্তি তৈরি করে তাকেই তাদের উপাস্য দেবতা হিসেবে মানতে থাকে। কিন্তু পরবর্তী কোন এক বছর যখন তথায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখন তারা তাদের ঐ উপাস্য দেবতাকে কেটে টুকরা টুকরা করে নিজেদের মধ্যে বন্টন করে খেয়ে ফেলে। উপরন্তু এও শোনা যেত, যেসব প্রতিমা কাঠ দিয়ে তৈরী করা হত, শীতের মওসুমে রাতের অন্ধকারে পথিকেরা সেসব প্রতিমা থেকে তাদের চলার ইন্ধন সংগ্রহ করে নিত। এ জাতীয় উপাস্য কি কোনরূপ গুরুত্বের অধিকারী হতে পারে? প্রতিমা সম্পর্কিত এর চাইতেও ঘৃণ্য একটি ঘটনার কথা জানা যায়। আর তা হলো, আসাফ নামক জনৈক ব্যক্তি নায়েলা নাম্নী জনৈকা মহিলার সাথে ব্যভিচার করার কারণে একবার খানায়ে কা'বার অভ্যন্তরে এসে আশ্রয় নেয়। জনসাধারণ তাদের ঐ ঘৃণ্য অনাচারের কথা প্রচারের উদ্দেশ্য তাদের দু'টি মূর্তি মক্কার বিশেষ বিশেষ স্থানে স্থাপন করে। কয়েক বছর পর কিছু অজ্ঞ লোক অভিশপ্ত এ দুটি মূর্তিরই পূজা শুরু করে দেয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সংখ্যক উন্নত মন্যেবৃত্তির অধিকারী লোকের পক্ষে কা'বাগৃহকে দেবালয়ে পরিণত করার ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়ার মধ্যে অস্বাভাবিকতার কিছু ছিল না।
মক্কার অধিবাসীরা ছিল সাধারণত পৌত্তলিক। তবে কিছু লোক বিদেশীদের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পৌত্তলিকতাকে ঘৃণা করত। মক্কা নগরেই কিছু লোক খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ছিল। আর কিছু লোক ছিল নাস্তিক। 'খাও দাও স্ফূর্তি কর'- এই ছিল শেষোক্তদের জীবনাদর্শ। পক্ষান্তরে কিছু লোক একত্ববাদেও বিশ্বাসী ছিল। তারা মাবুদ ও ইবাদতকারীদের মধ্যে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা যায় সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করত, তবে এর সঠিক দিকদর্শন তাদের জানা ছিল না। তারা তাদের হৃদয়ের আবেগ কবিতার ছন্দে এবং অন্যান্যভাবে প্রকাশ করত। যেমন একজন বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছেন "হে আল্লাহ! কিভাবে আমি তোমার ইবাদত করবো? দাঁড়িয়ে মাথা নত করে, সিজদা করে, পা উপরের দিকে উঠিয়ে, না উর্ধ্ববাহ হয়ে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমিই বলে দাও। তুমি যেভাবে বলবে আমি সেভাবেই করব।"
মোটকথা, ধার্মিক মাত্রেই নিজ নিজ সাধ্যমত ইবাদতের একটা সঠিক পন্থা উদ্ভাবনের চিন্তায় ছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোত্রের লোকেরাও প্রতিমাপূজা করত; তবে বিবি খাদীজার জনৈক নিকটাত্মীয় ওরাকাহ বিন নওফেল খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন। নগরবাসীদের মধ্যে বিরাজিত অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণাও রসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ও সৃষ্টিকর্তার রহস্য সম্পর্কে চিন্তিত করে তুলত। সম্ভবত এভাবে অনেকদিন পর্যন্ত তিনি চিন্তা করতে থাকেন। তিনি এসব বিষয় নিয়ে কখনো স্ত্রীর সাথে, আবার কখনো বন্ধু-বান্ধব, গোত্র-প্রধান ও নগরের সম্মানিত ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। কারো কাছ থেকে সদুত্তর না পেয়ে নিরাশ চিত্তে কখনো কোন বৃক্ষতলে, কখনো প্রকাণ্ড পাথরের ছায়ায় বসে তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা চিন্তার মধ্যে কাটিয়ে দিতেন। তাবারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, পরিবার-পরিজন ছেড়ে কিছুদিনের জন্যে কোন পর্বত গুহায় একাকী বসে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে উপকারিতা রয়েছে তা মক্কাবাসীদের অজ্ঞাত ছিল না। তারা এ জিনিসটির সন্ধান কোথা থেকে পেয়েছিল তা অবশ্য জানা যায়নি। সম্ভবত তারা তা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কাছ থেকেই শিখেছিল।
ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) সারা রমযান মাস মক্কার বাইরে, তাঁর বাসস্থান থেকে প্রায় আড়াই/তিন ফার্লং দূরে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। তখন তিনি খাদ্যদ্রব্য সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। যখন তা ফুরিয়ে যেত তখন কিছুক্ষণের জন্য বাড়ীতে ফিরে এসে আবার তা নিয়ে যেতেন অথবা বিবি খাদীজা ভৃত্যের মাধ্যমে তা তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। গুহায় বসে তিনি কি করতেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না; সম্ভবত তিনি তখন রোযা রাখতেন এবং অন্য কোন কঠোর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। ঘটনাক্রমে কোন মুসাফির বা ভিখারী সেখানে উপস্থিত হলে নিজের সামান্য আহার্য থেকেই তিনি তাকে কিছু খেতে দিতেন। মাস শেষে তিনি সেখান থেকে গৃহাভিমুখে রওয়ানা হতেন এবং কা'বাগৃহ প্রদক্ষিণ করে তবে নিজের পরিবার-পরিজনের সাথে মিলিত হতেন।
হেরা পর্বত। বর্তমান এটাকে জবলুনুর বলা হয় এবং বাইবেলে এটা 'ফারান' নামে পরিচিত। মক্কার উত্তর-পূর্ব দিকে, মীনা ও আরাফাগামী রাস্তার বামদিকে কয়েক ফার্লং দূরে অবস্থিত। বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট বন্যায় তখন শহরের বিরাট ক্ষতি হত। তুর্কী শাসনামলে মক্কা শহর রক্ষার উদ্দেশ্যে একটি দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করে বন্যার গতি পরিবর্তন করে দেয়া হয়। এই বাঁধের কিছুটা সম্মুখভাগে অগ্রসর হলেই শুভ্রসাদা একটি নূরানী পাহাড় নযরে পড়ে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে উপরে উঠলেই তুর্কী সুলতানদের জন্যে অন্তর থেকে আপনা আপনি দুআ বেরিয়ে আসে। তারা সেখানে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরী করেছিলেন। বৃষ্টির পানি ঐ হ্রদে জমা হত এবং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত তা জনসাধারণের তৃষ্ণা নিবারণের কাজ দিত। আরো কিছু উপরে উঠলে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়ার কাছে কয়েকটি বড় বড় পাথর উপরে, নীচে ও আশেপাশে এমনভাবে স্থাপিত হয়েছে যে, এতে একটি গুহার সৃষ্টি হয়েছে। তাতে উঠানামার জন্যে সিঁড়ির মত পথও তৈরী হয়ে গেছে। গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেই আল্লাহর অসীম মহিমা প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রায় চার গজ লম্বা, পৌনে দুই গজ প্রশস্ত ও একজন পূর্ণদৈর্ঘ্য মানুষ দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারে এরূপ উচ্চতাসম্পন্ন এই গুহাটিতে পা লম্বা করে অনায়াসেই শোয়া যেত। এছাড়া রৌদ্র-বৃষ্টি থেকেও তা ছিল সুরক্ষিত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, লম্বাকৃতির এই গুহাটি ছিল সম্পূর্ণরূপে কা'বামুখী। এভাবে হেরা গুহায় ধ্যান-মগ্ন অবস্থায় রসূলুল্লাহ্ (সা) কত বছর কাটিয়েছিলেন, অনেক অনুসন্ধানের পরও তা জানা যায়নি। তবে সে মেয়াদ পাঁচ বছরের কম ছিল বলে অনুমিত হয়।
পার্থিব সাধনা ও তার ফলাফল সম্পর্কে মানুষ আলাপ-আলোচনা করে এবং ভাষাশৈলীর মাধ্যমে তা বিভিন্নভাবে প্রকাশও করতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনার ফলাফল তো বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করা সম্ভব নয়। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ঐ ধ্যানমগ্ন হওয়াটা কেমন লাগত তা পুরোপুরিভাবে ব্যক্ত করা সহজ নয়; তবে প্রামাণ্য বর্ণনাসমূহ ও জীবন-চরিত লেখকরা এ সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন তার সারকথা হলো, যেহেতু রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রতি বছর ঐ একই কাজ করতেন, তাই নিশ্চিত করে বলা যায়, তাতে তিনি তাঁর বিদগ্ধ হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ করতেন এবং ঐ কাজ তাঁর খুবই মনঃপূত ছিল। আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রাথমিক সোপানে তিনি সত্য স্বপ্ন দেখতেন এবং সেগুলোর ফলাফল দিবালোকের ন্যায় সত্যে পরিণত হত। ক্রমে ক্রমে তিনি অনুভব করতে থাকেন, কোন পাথর অথবা বৃক্ষ যেন তাঁকেই লক্ষ্য করে আওয়াজ দিচ্ছে এবং ক্রমশ সে আওয়াজ যেন তাঁর কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রথম প্রথম এসব ব্যাপার লক্ষ্য করে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন। কোন মানুষ আওয়াজ দিচ্ছে মনে করে তিনি গুহা থেকে বেরিয়ে আসতেন, কিন্তু আশেপাশে কোথাও কাউকে খুঁজে পেতেন না। এভাবে ক্রমাগত ঐ আওয়াজ শুনতে শুনতে অদৃশ্য আওয়াজদাতার প্রতি তাঁর অনুরাগ বেড়ে যেতে থাকে। এমন কি, একবার আওয়াজ শোনার পর পুনরায় তা শোনার জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন।
এভাবে দিন যতই অতিক্রান্ত হতে থাকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মন পার্থিব বিষয়বস্তুর প্রতি ততই অনীহ হয়ে উঠতে থাকে এবং তিনি এক অদৃশ্য শক্তির সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে উঠেন। মাবুদ ও আবিদ, সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যে এবং একজন মানুষকে পূর্ণ মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য যে স্তরের পূত-পবিত্র হৃদয়ের প্রয়োজন, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পূর্ব থেকেই তিনি তা লাভ করেছিলেন। তার ফলে তাঁর পবিত্র সত্তা সর্বদা সবাইকে যাবতীয় অন্যায় অসত্য প্রতিরোধে এবং ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করত। আর এ ধরনের পূত-পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই একজন সত্যিকার পথপ্রদর্শক ও সংস্কারক না হয়ে পারেন না।
এভাবে তাঁর আত্মশুদ্ধি ও আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জনের কাজ কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে থাকে এবং তখন তিনি পরিবার-পরিজন থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কা'বাগৃহ নির্মাণের পূর্বে তাঁর যে সন্তান জন্ম নিয়েছিল সেই ছিল শেষ সন্তান। অতঃপর খাদীজা (রা)-এর কোলে আর কোন সন্তান আসেনি।
রসূলুল্লাহ (সা) বয়সে পরিপক্বতা লাভ করছেন, তাঁর চল্লিশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে, সুতরাং অদৃশ্য শক্তির পক্ষ থেকে তাঁকে 'ওহী' ও 'ইলহাম' বহনের উপযোগী করে তৈরী করা হচ্ছে। 'রসূলে উম্মী' (নিরক্ষর নবী) (সা)-কে মহান স্রষ্টা "রাহমাতুল্লিল আলামীনে" (জগৎসমূহের করুণায়) রূপান্তরিত করছেন।
পুনরায় রমযান মাস এল। পূর্বের মত ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তাঁর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। এমতাবস্থায় একদিন জিবরাইল (আ) 'ওহী' তথা আল্লাহর বাণী নিয়ে তাঁর সমক্ষে হাযির হলেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবীর মর্যাদা দান করলেন। আল্লাহুম্মা সাল্লি'আলা মুহাম্মদ (হে আল্লাহ্! মুহাম্মদের উপর করুণা বর্ষণ কর)।
যখন সর্বপ্রথম 'ওহী' অবতীর্ণ হলো, তখন কেউই তাঁর সামনে ছিল না। অতঃপর তেইশ বছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে এবং অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। প্রত্যক্ষদর্শীরা এ সম্পর্কে যেসব বর্ণনা দিয়েছেন, সেগুলোর আলোকে, আমাদের বর্তমান পারিপার্শ্বিকতায় আমরা সে সম্পর্কে যে ধারণা করতে পারি, তা হলো, অবতরণের পদ্ধতিটা ছিল ঠিক যেন টেলিফোন যন্ত্রের মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণের মত। ওহীকে একটি টেলিফোন-বার্তা মনে করা যেতে পারে, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীর কাছে পাঠাতেন। মুহাদ্দিস এবং ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে ওহী আসার সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) ঘন্টার মত আওয়াজ শুনতে পেতেন। তাঁর অন্তরঙ্গ ব্যক্তিদের। যেমন আবূ বকর ও উমর (রা)। কানে ঐ সময় মাছির ভন ভন শব্দের মত আওয়াজ আসত, যদিও তাঁরা কোন কিছুই দেখতে পেতেন না। ওহী অবতরণের ঐ পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও গুরুগম্ভীর। প্রত্যক্ষদর্শী কোন কোন সাহাবীর বর্ণনা অনুযায়ী ভীষণ শীতের সময়ও ওহী অবতীর্ণ হলে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে উঠত। উষ্টারোহী অবস্থায় ওহী অবতীর্ণ হলে তাঁকে বহনকারী উট অনেক সময় ভারাক্রান্ত হয়ে বসে পড়ত। কোন কোন সময় উট না বসলেও মনে হত, যেন তার হাড্ডি ভেঙ্গে যাচ্ছে। একদা জনৈক সাহাবীর উরুর সাথে হাঁটু লাগিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) বসে আছেন, এমন সময় ওহী অবতীর্ণ হয়, তখন ঐ সাহাবী মূর্ছিত হয়ে পড়েন এবং অনুভব করেন, যেন তাঁর উরুদেশের হাড্ডি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
ফেরেশতা বা 'মালাক' শব্দের অর্থ 'প্রেরিত' বা 'সংবাদবাহক'। প্রকৃতপক্ষে মালাক হচ্ছে এমন এক সৃষ্টি, যা মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের কাজ করে এবং সংবাদ বহন করে। রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, সংবাদ বাহক ফেরেশতা (জিবরাঈল) কখনো মানুষের মত, কখনো ডানাবিশিষ্ট উড্ডয়নশীল এক অভিনব প্রাণীর মত, কখনো বা অন্য কোন আকৃতিতে আমার সামনে হাযির হতেন।
যেহেতু নবুওতের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, তাই এ সম্পর্কিত বিষয়াদিও সবার কাছে সহজবোধ্য হবার কথা নয়। তাছাড়া ওহী অনুসরণকারীদের কাছে এসব বিষয় খুব একটা গুরুত্বপূর্ণও নয়। ওহী কিভাবে অবতীর্ণ হলো, তার চাইতে ওহীর মাধ্যমে কি নির্দেশ এলো এবং কিভাবে তা সংরক্ষিত হলো, তা-ই হচ্ছে আমাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মোটকথা, ওহীর আগমন ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল রসূল-জীবনের পরবর্তী যুগ।
📄 নবুওতের মক্কী যুগ
ওহীর মাধ্যমেই নবুওতের সূচনা হয়। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর আদেশ নির্দেশ নবীর কাছে প্রেরণ করেন, যাতে তিনি মানবজাতির কাছে তা পৌঁছিয়ে দেন। নবুওত এমন কোন মৌরসী পেশা নয় যে, কেউ তা আপন পিতামাতা বা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে আয়ত্ত করে নেবে, বরং তা হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সৎ ও সত্যবাদী ব্যক্তিত্বকে পরিষ্কার ভাষায় বলে দেওয়া যে, "তুমি আল্লাহর রসূল, তোমার কর্তব্য হচ্ছে তুমি তোমার জাতিকে ন্যায় ও সত্যের প্রতি আহ্বান জানাবে।”
অতঃপর নবুওতপ্রাপ্ত ব্যক্তির দেহে ও মন-মানসিকতায় এক বিরাট প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের বর্ণনা থেকে এ ব্যাপারে মোটামুটি একটি ধারণা করা যায়। তিনি বলেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বিবি খাদীজাকে বলতেন, "যখন আমি একাকী বসে থাকি, তখনি শুনতে পাই, কে যেন আমাকে 'হে মুহাম্মদ' বলে সম্বোধন করছে। নিদ্রিত অবস্থায় নয় বরং জাগ্রত অবস্থায়ই আমি আলোর (নূরের) মত কি যেন অনুভব করি। আল্লাহর শপথ, প্রতিমা-পূজারী ও জ্যোতিষীদের অদৃশ্য বাণীসমূহের চাইতে ঘৃণ্য বস্তু আমার কাছে আর কিছুই ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমিও কি একজন জ্যোতিষী হয়ে গেলাম? আমাকে যে সম্বোধন করছে সে কোন জ্বীন বা শয়তান নয় তো?"
তাঁর ঐ আশংকা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কেননা এসব বিষয় প্রকাশিত হয়ে পড়লে জনসাধারণ তাঁকে মিথ্যুক, পাগল, ভূতে-ধরা, জ্যোতিষী ইত্যাদি যে আখ্যা দিত তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তাছাড়া ঐ দেশে নবুওত ও রিসালত সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোন লোক ছিল না। এমতাবস্থায় শয়তানের ইঙ্গিত ও ফেরেশতার ইলহামের মধ্যে মূলত যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, তা অনুভব করা ওদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
বিবি খাদীজা (রা) রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে তাঁকে বলেন, 'আপনার মত মহৎ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা'আলা কখনো অপদস্থ করবেন না।' অতঃপর তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর পিতৃব্যপুত্র খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ওরাকা বিন নওফলের কাছে নিয়ে যান। ওরাকা ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'এসব কথাবার্তা মোটেই শয়তানী নয় বরং এগুলোর সাথে হযরত মূসা (আ)-এর 'নামোস' অর্থাৎ তওরাতের পরিষ্কার সামঞ্জস্য রয়েছে।” তিনি আরো বলেন, "আপনার উপর যে দায়িত্ব বর্তাবে তা সম্পাদনে যদি বাধা প্রদান করা হয়, এজন্যে আপনি যদি অত্যাচারিত হন, আর আমি তখন জীবিত থাকি, তাহলে আপনাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবো।"
ইবনে হিশামের বর্ণনানুযায়ী, রসূলুল্লাহকে অধিক সান্ত্বনা দানের জন্যে বিবি খাদীজা (রা) আর একটি অদ্ভুত উপায় অবলম্বন করেছিলেন। তিনি রসূলুল্লাহকে বললেন, আপনি যখনই জিবরাঈল ফেরেশতাকে দেখবেন তখনি আমাকে বলবেন। কিছুদিন পর রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, 'আমি এখন তাঁকে দেখতে পাচ্ছি।' তখন বিবি খাদীজা বললেন, 'আসুন আমার ডান দিকে বসুন।' অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি আপনি তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ্ (সা) উত্তরে বললেন, 'হ্যাঁ।' বিবি খাদীজা বললেন, 'আসুন, এবার আমার বাম দিকে বসুন।' অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ্ (সা) জওয়াব দিলেন, 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি তাঁকে নিজের সামনে বসিয়ে ঐ একই প্রশ্ন করলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) উত্তর দিলেন 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি তাঁকে আপন জামার ভিতরে টেনে নিয়ে সেই বেসামাল অবস্থায় জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখনো কি দেখতে পাচ্ছেন?' রসূলুল্লাহ (সা) উত্তরে বললেন, 'না এখন দেখতে পাচ্ছি না।' একথা শুনে বিবি খাদীজা বললেন, 'শয়তান হলে সে আমাদের ঐ লজ্জাজনক অবস্থায় কখনো চলে যেত না। অতএব তিনি শুধুমাত্র ফেরেশতাই হতে পারেন।'
প্রাথমিকভাবে অবতরণের পর কিছুদিন ওহী আসা বন্ধ থাকে (ওহী বন্ধের ঐ সময়টাকে 'ফতরতে ওহী' বলা হয়)। ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে, ঐ অবস্থা তিন বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। প্রথম পর্যায়ে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কারণে রসূলুল্লাহ (সা)-এর মনের মধ্যে ছিল ভয়-ভীতি। দ্বিতীয় পর্যায়ে শান্তি লাভ ও ওহীর প্রতি আকর্ষণ এবং শেষ পর্যায়ে ওহীর জন্য প্রতীক্ষা ও ব্যাকুলতা। ঐতিহাসিকরা শেষোক্ত পর্যায়ের যে বিবরণ দিয়েছেন তা হলো, ওহীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে তাঁর মনে দারুণ অস্বস্তির সৃষ্টি হত। অবশ্য অনুরূপ সংকটজনক মুহূর্তে তিনি জাগতিক বিষয়বস্তুর কথা একদম ভুলে যেতেন চলে যেতেন আধ্যাত্মিক জগতে এবং তথায় জিবরাঈল (আ)-কে দেখতে পেতেন। জিবরাঈল (আ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, 'আপনি তো আল্লাহর রসূল। (অতএব আপনার এত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোন কারণ নেই)। রসূলুল্লাহ (সা) জিবরাঈল (আ)-এর কথায় সান্ত্বনা লাভ করতেন এবং আত্মশুদ্ধির জন্য আরো কঠোর ইবাদতে নিমগ্ন হতেন।
জানা যায়, এ সময় পরিবার-পরিজনের সাথে তাঁর নামমাত্র সম্পর্ক ছিল। তিনি রাতের বেলা দীর্ঘ সময় ইবাদত করে কা'বার অঙ্গনেই শুয়ে পড়তেন এবং দিনের বেলায়ও ইবাদত করতেন, নামাযে মশগুল থাকতেন। ঐ সময় আত্মশুদ্ধি ও সৃষ্টির সেবা ছাড়া কোন কিছুর সাথেই তাঁর সম্পর্ক ছিল না।
এই সাধনা তাঁর হৃদয় সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। পার্থিব যাবতীয় কামনা-বাসনা চিরতরে মুছে গেল তাঁর মন থেকে। তিনি রূপান্তরিত হলেন পরিপূর্ণ মানুষে। নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেন আল্লাহর মধ্যে। তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি ইচ্ছা ও বাসনা আল্লাহতে মিশে গেল (ফানাফিল্লাহ)। এতদসত্ত্বেও কেবলমাত্র তাঁর নিজের মনেই নয়, তাঁর স্ত্রীর মনেও এ আশংকা দেখা দিল যে, তাহলে সত্যই কি আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে ত্যাগ করলেন? সত্যই কি আল্লাহ্ তা'আলা অসন্তুষ্ট হয়ে পড়লেন তাঁর উপর?
বস্তুত এ সময়টা ছিল তাঁর প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। শেষ পর্যন্ত এর পরিসমাপ্তি ঘটল এবং মুহাম্মদ (সা)-কে সম্বোধন করে পাক রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ঘোষণা করা হলো:
উজ্জ্বল দিনের শপথ এবং অন্ধকার রাতের শপথ। তোমার প্রভু তোমাকে পরিত্যাগ করেন নি কিংবা তোমার উপর অসন্তুষ্ট হননি। নিশ্চয়ই তোমার ভবিষ্যৎ তোমার অতীত অপেক্ষা উজ্জ্বল এবং শীঘ্রই তোমার প্রভু তোমাকে এমন কিছু দান করবেন যাতে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে। তিনি কি তোমাকে য়াতিম বালকরূপে পান নি এবং আশ্রয়দান করেন নি? এবং তিনি কি তোমাকে পথ-অনভিজ্ঞ পান নি এবং সুপথ দেখান নি? তিনি কি তোমাকে অভাবগ্রস্ত দেখেন নি এবং অভাবমুক্ত করেন নি? অতএব যে অনাথ, তাকে তুমি উৎপীড়ন করবে না, যে ভিক্ষুক, তাকে তুমি তিরস্কার করবে না। আর তোমার প্রভুর অনুগ্রহের কথা প্রচার কর।
"এবং তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের কথা প্রচার কর"-এ আয়াতের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ্ (সা) তাবলীগে রিসালত-এর নির্দেশ লাভ করেছিলেন। এই প্রাথমিক অবস্থায় যেসব আয়াত ও সূরা অবতীর্ণ হয়েছিল, তন্মধ্যে সূরা 'ইকরা' এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সৃষ্টি ক্ষমতার অপূর্ব বর্ণনা এবং যাবতীয় জড়বাদ ও নাস্তিক্যবাদের অসারতা প্রমাণ করেছে। সূরা 'মুদ্দাস্সিরে" মানবজাতিকে যাবতীয় অসৎ কর্মের অশুভ পরিণতি থেকে দূরে থাকা, একমাত্র মহান আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করা, নামাযের পূর্বে দেহ ও পোশাক পবিত্র করা, আল্লাহ্ যেসব কাজে অসন্তুষ্ট সেগুলি থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের সেবা ও উপকার করার পর সেজন্য খোঁটা না দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করা হয়েছে। সূরা 'হজরে' রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, ' তোমাকে যে নির্দেশই দেওয়া হোক না কেন, তুমি তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করো। এজন্য মুশরিকদের ভয় করবে না। সূরা 'শু'আরা'য় একদিকে রসূলুল্লাহ-কে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে তাঁর নিকটাত্মীয়দেরকে আল্লাহর ভয় দেখাতে এবং অন্যদিকে অভিযোগকারীদের জওয়াব দিতে গিয়ে পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ওহী দেবতাদের কন্ঠ নিঃসৃত বাণী বা মনগড়া কবিতা কিংবা শয়তানী কথাবার্তা নয়। 'আমপারার' বিভিন্ন সূরায় আল্লাহ্ তা'আলার একত্ব স্বীকার করে নেওয়া এবং সৎকর্মশীল হওয়ার জন্যে মানব জাতিকে বারবার তাকিদ দেওয়া হয়েছে এবং নানাবিধ দলীল এবং উপমা দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে যে, মানুষের ক্ষমতার বাইরে এই যে আসমান-যমীন, চাঁদ, সূর্য, বাতাস, সমুদ্র, মেঘবৃষ্টি, ঋতু, এমন কি মানব জাতি-এ সবকিছুরই স্রষ্টা হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা। তিনি অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ব দান করেন, তিনি জীবিতকে মৃত্যুর মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেন। এমন ক্ষমতাবান যে সত্তা, তিনি কি মৃত্যুর পর মানুষকে জীবন দান করে তার ইহলোকের যাবতীয় কাজের পুরস্কার অথবা শাস্তি প্রদান করতে পারবেন না? অতঃপর সৎকাজ ও অসৎকাজের পরিণামস্বরূপ যথাক্রমে বেহেশত ও দোযখ প্রদানের কথা উল্লেখ করে কিয়ামত ও শেষ বিচার দিনের বিস্তারিত অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে।
ইসলাম ও জাহিলিয়াতের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, জাহিল লোকেরা পার্থিব আরাম-আয়েশকেই ভালমন্দের মাপকাঠি বলে মনে করে এবং পার্থিব কামনা-বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য মন্দ কাজকেই ভাল কাজের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে এটা শয়তানী আচরণ ছাড়া কিছু নয়। আমরা এখন ঐ যুগ সম্পর্কে আলোচনা করবো।