📄 যৌবনকাল
ফুজ্জার যুদ্ধ
আরবরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনার খাতে ব্যয় করার জন্য তাদের আয়ের একটা অংশ-অথবা এক-দশমাংশ করদানের নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছিল। মেলা ও উৎসবাদিতে বিক্রয়ের জন্যে যারা পণ্য-সামগ্রী নিয়ে আসত, তার এক-দশমাংশ স্থানীয় নেতারা লাভ করতেন। মেলায় যাতে বিপুল লোক সমাগম ও প্রচুর পরিমাণ পণ্য-সামগ্রী আমদানী হয়, সে ব্যাপারে উৎসাহ প্রদানের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই তারা 'হারাম মাস' সমূহের নীতিমালাও নির্ধারণ করে নিয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোত্রেরও উৎসব অনুষ্ঠিত হত। পরিষ্কার বোঝা যায়, মেলাপূর্ব পনর দিন এবং মেলা-উত্তর পনর দিন-মোট একমাস সময়কে 'হারাম মাস' মনে করা হত এবং এ সময়ে প্রতিশোধ গ্রহণ, সাধারণ হত্যা ও লুটপাট সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল। লোকেরা তাদের পরম শত্রুদের পাশ দিয়েও তখন নিরাপদে আসা-যাওয়া করতে পারত। কয়েকটি গোত্র রজব মাসকে হারাম মাস মনে করত। 'রাবীয়ার' গোত্রসমূহ অন্য মাসকে হারাম মাস মনে করত। মাওলানা মানাযির আহসান গিলানী এ স্থলে 'রমযান' মাসের কথা লিখেছেন। খানায়ে কা'বার হজ্জ ও মিনা'র মেলা উপলক্ষে তিনমাস যথা-যিলকাদ, যিলহজ্ব ও মুহাররম মাসকে হারাম বা নিষিদ্ধ মাস হিসেবে মান্য করা হত। এগুলোর পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করাকে 'ফুজ্জার' অর্থাৎ কুৎসিত কাজ মনে করা হত। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়ত লাভের প্রাক্কালে এ জাতীয় চারটি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। তন্মধ্যে দুটিতে তিনি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব হাঙ্গামার কারণ ও অজুহাত আমাদের এখানকার আলোচ্য বিষয় নয়। এসব ছিল জাহিলিয়া যুগের সাধারণ হাঙ্গামা। কখনো ঋণ পরিশোধ করতে গড়িমসি করলে, কখনো নারীদের প্রতি অশুভ আচরণ বা কটাক্ষ করলে, কখনো আত্মগরিমা প্রকাশ করলে, আবার কখনো বা হত্যাকাণ্ডসমূহের পাথরদণ্ড করলে এসব যুদ্ধ সংঘটিত হত।
আরবে আবূ বারা মালাইবুল আসিন্নাহ্ নামক একজন প্রসিদ্ধ বর্শা নিক্ষেপকারী ছিল। কথিত আছে, হযরত মুহাম্মদ (সা) কোন এক 'ফুজ্জার'-এর সময়ে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে তার উপর বর্শা নিক্ষেপ করেছিলেন। চতুর্থ 'ফুজ্জার' সম্পর্কে ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন, হযরত মুহাম্মদ (সা) কেবলমাত্র সেসব তীরই কুড়িয়ে নিতেন, যেগুলো তাঁর পিতৃব্যদের লক্ষ্য করে শত্রুরা নিক্ষেপ করত। ইবনে সা'দ বর্ণনা করেছেন, ঐ সময় হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর বয়স ছিল বিশ বছর এবং তিনি এ ব্যাপারে কি বক্তব্য রেখেছিলেন, ইবনে সা'দ তারও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি আমার পিতৃব্যগণের সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম এবং কয়েকটি তীরও নিক্ষেপ করেছিলাম। তখন একেবারেই কিছু করবো না, এটা আমার মনঃপূত ছিল না।"
হিলফুল ফুযুল
ইবনে হাবীবের মতানুসারে, চতুর্থ যুজ্জার যুদ্ধে যুবায়র বিন আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন বনী হাশিমের নেতা। জানা যায়, অতি নগণ্য কারণেই এ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল এবং তাতে অনেক রক্তপাত ঘটেছিল। এ রক্তপাত কুরায়শদের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং তারা এ ধরনের রক্তারক্তি বন্ধ করার জন্য অবিলম্বে একটি নতুন সংস্থা গঠনের চেষ্টা চালায়। ফুজ্জার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কুরায়শ নেতারা বিশেষ করে যুবায়র বিন আবদুল মুত্তালিব ও তাইম গোত্রের আবদুল্লাহ বিন জাম্মান তখন নগরবাসীকে সেই 'হিলফুল ফুযুল' পুনর্গঠন করার আহবান জানান যা জরহমী শাসনামলে (কুসাই কর্তৃক শাসনভার গ্রহণ করার প্রাক্কালে) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ উদ্যোগটি নেয়া হয়েছিল ফুজ্জার যুদ্ধের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে।
ইবনে কু'তায়বা, জরহমী শাসনামলের এ সংস্থা সম্পর্কে যে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়েছেন, তাতে বোঝা যায়, কতিপয় লোক একত্রিত হয়ে অত্যাচারিতদের সাহায্যার্থে এ সংস্থাটি গঠন করেছিল। এর স্বেচ্ছাসেবীরা সম্মিলিতভাবে নিজেদের শহরের অত্যাচারীদের দমন ও অত্যাচারিতদের সাহায্য করত।
ফুজ্জার যুদ্ধের পর আবদুল্লাহ বিন জাদআনের বাড়িতে কুরায়শের লোকেরা এক ভোজসভায় মিলিত হয়। আবদুল্লাহ বিন জাদআন প্রবীণ ও প্রভাবশালী লোক ছিলেন এবং বিপুল ধন-সম্পদেরও অধিকারী ছিলেন। সম্ভবত তাঁর বাসস্থানটিও ছিল সবচেয়ে বড়! তবে এর উদ্যোক্তা কে ছিলেন, সে সম্পর্কে সুহায়লী ও আমাদের অন্যান্য ঐতিহাসিক একটি কাহিনীর কথা উল্লেখ করেছেন। ইয়ামনের জনৈক ব্যবসায়ী মক্কায় তার ধারে বিক্রীত পণ্যের মূল্য আদায়ের চেষ্টা চালায়। অনেক চেষ্টা সাধনার পরও যখন সে মূল্য আদায়ের ব্যাপারে কোনই সুরাহা করতে পারল না, তখন ক্ষোভে দুঃখে একটি ব্যঙ্গ কবিতা আবৃত্তি করে। এটা শুনে যুবায়র বিন আবদুল মুত্তালিবের আত্মসম্মানে দারুণ আঘাত লাগে। আর তখনই তিনি এ জাতীয় একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলার আন্দোলন শুরু করেন। যুবায়র এ সংস্থার প্রশংসায় অনেক কবিতাও রচনা করেন। সুহায়লীর গ্রন্থে কবিতাগুলোর উল্লেখ রয়েছে। এজন্য বলা হয়ে থাকে, সম্ভবত এর উদ্যোক্তা যুবায়রই ছিলেন; কিন্তু যেহেতু তখন তাঁর বয়স ছিল কম এবং তার সম্পদও ছিল সীমিত, তাই তিনি এ ব্যাপারে ইবনে জাদআনের পৃষ্ঠপোষকতা চেয়েছিলেন। ফলে ইবনে জাদআনের গৃহেই সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে যথারীতি ভোজেরও ব্যবস্থা করা হয়। এতে বনী আবদুল মুত্তালিব, বনী যুহরা, অন্য বর্ণনা মতে বনী হারিস বিন মহরসহ তামীম ও বনী হাশিম গোত্রের সম্মানিত লোকেরা উপস্থিত ছিলেন। এসব নেতা শপথ করে সিদ্ধান্ত নেন, নগর-সীমার অভ্যন্তরে কারো উপর অত্যাচার করতে দেওয়া হবে না এবং সকলের সম্মিলিত সাহায্যের মাধ্যমে অত্যাচারীর কাছ থেকে অত্যাচারিতের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
আরব তথা সারা বিশ্বে যখন জঙ্গী শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল, ঠিক তখনই মক্কার লোকেরা অত্যাচারিতের সাহায্যার্থে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সংঘবদ্ধ হয়েছিল; এটা মক্কাবাসীদের জন্যে ছিল বাস্তবিকই গৌরবের বিষয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ সংগঠনের কাজে তারা কখনো ঢিলেমীকে প্রশ্রয় দেয়নি। বরং এর কর্মসূচী বাস্তবায়নে তারা ছিল সদা তৎপর। জাহিলিয়া যুগেও এ সংগঠনের বরাত দিয়ে কোন কথা বললে আবূ জেহেলের মত নেতারাও শংকিত হয়ে উঠত। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর ও হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত স্বয়ং রসূলুল্লাহ (সা)-কেও এ ব্যাপারে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। কিন্তু কালের করাল গ্রাসে এ সংগঠনটিও একদিন বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন এবং সঠিকই উল্লেখ করেছেন যে, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সংগঠন হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্যে সময় সময় এর নতুন সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে যে তৎপরতা চালিয়ে যেতে হয়, তা' না থাকার কারণেই এক পুরুষ পর এ সংস্থাটির বিলুপ্তি ঘটে। উপরন্তু ইসলামের অভ্যুদয়ের কারণে এ সংস্থাটির প্রয়োজনও শেষ হয়ে যায়। 'হিলফুল ফুযুলে'র সদস্যরা যে শপথ গ্রহণ করেছিল তা ছিল নিম্নরূপ:
"আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমরা সকলেই অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এবং অত্যাচারিতের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকবো। "আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষান্ত হবো না, যতক্ষণ না অত্যাচারী অত্যাচারিতের অধিকার প্রদান করে। "যতদিন সমুদ্রে একটি লোম সিক্ত করার মত পানি অবশিষ্ট থাকবে, হেরা ও সবীর পর্বত স্ব স্ব স্থানে টিকে থাকবে এবং আমাদের জীবনে সাম্য বজায় থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের এই প্রতিজ্ঞা বলবৎ থাকবে।” (রাওদুল উনুফ)
শপথনামার শেষ অংশটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কিন্তু ঐতিহাসিকরা যেহেতু এর ব্যাখ্যা দান করেন নি, তাই আমরাও আর সেদিকে অগ্রসর হচ্ছি না। তাছাড়া সাহায্যকারীরা যেহেতু নিজ নিজ প্রাণ নিয়েই হাযির ছিল তাই তারা তাদের মাল সম্পদের কি কোন পরোয়া করতে পারে?
ব্যবসা-বাণিজ্য
ঊষর মরুপ্রান্তরে মহানগরী মক্কা অবস্থিত। এ কারণে ক্ষেত-কৃষির সাথে সম্পর্ক ছিল না এখানকার অধিবাসীদের। অবশ্য শিল্প কারখানা গড়ে তোলা যেত, কিন্তু কাঁচামালের জন্যে নির্ভর করতে হত বিদেশের উপর। এসব কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যই এখানকার অধিবাসীদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম। বনী হাশিমের পরিবারে কোন প্রকারের কোন কারখানা ও কুটির শিল্প গড়ে উঠেছিল তেমন কথা কোন ঐতিহাসিকই বলেন নি। পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যশস্য, চামড়া, শুকনো ফল, হাতিয়ার, আতর ও প্রসাধনী দ্রব্যই ছিল মক্কাবাসীদের প্রধান বাণিজ্য সামগ্রী। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরিবারের লোকেরা সাধারণত প্রথমোক্ত দু'টি দ্রব্যের ব্যবসা করত।
মক্কাবাসীদের ব্যবসায়ে সাধারণত শতকরা একশ' ভাগই মুনাফা হত বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন। অবশ্য এজন্যে তাদেরকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে হত। এ খাতে যথেষ্ট ব্যয়ভারও বহন করতে হত। কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অবিরাম পথ চলার ফলে কিছু কিছু উটের প্রাণনাশ ঘটত। সফরের সময় নিজেদের ও জন্তুদের খরচ বাড়ীর খরচের চেয়ে অবশ্যই অধিক ছিল। নিরাপত্তার জন্যে পৃথকভাবে রক্ষীবাহিনীও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হত। দুর্ধর্ষ গোত্রসমূহের আবাসস্থল দিয়ে যাওয়ার সময় শত্রুর আক্রমণ ও আকস্মিক রাহাজানির আশংকা থাকত। এসব কারণে ব্যবসায়ের অধিকাংশ পুজিই যৌথ বিনিয়োগের ভিত্তিতে সংগৃহীত হত অর্থাৎ কিছু লোক একত্রিত হয়ে বাণিজ্যিক সফরে বের হত অথবা প্রত্যেকেই নিজেদের পণ্যদ্রব্য ছাড়াও বন্ধু-বান্ধবদের পণ্যদ্রব্য অর্ধেক মুনাফায় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বা অন্য কোন শর্তে সঙ্গে করে নিয়ে যেত। বাণিজ্যসম্ভার যতই অধিক পরিমাণে হত, ক্ষয়ক্ষতি ও খরচপত্রের পরিমাণও ততই কম হত এবং তা থেকে আয়ের অংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত।
নয়-দশ বছর বয়সে পিতামহের পরলোকগমনের বছরই পিতৃব্য আবূ তালিবের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা) যে ফিলিস্তিনে বাণিজ্য ভ্রমণে গিয়েছিলেন, ইতিহাসে সে কথার উল্লেখ আছে। অতঃপর পঁচিশ বছর বয়সের পূর্বে তিনি কোন বাণিজ্য ভ্রমণে গিয়েছিলেন কি না ঐতিহাসিকরা সে সম্পর্কে কোন উল্লেখ করেন নি। তবে, এর অর্থ এই নয় যে, এ দীর্ঘ সময়টা তিনি বেকার ছিলেন এবং পিতৃব্যের উপর বোঝাস্বরূপ জীবন যাপন করছিলেন। তখন তিনি সম্ভবত স্থানীয় কোন ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত ছিলেন অথবা নগরে পিতৃব্যের কোন দোকান ছিল এবং তিনি সেটার কাজে জড়িত ছিলেন। এছাড়া এটাও জানা যায় যে, অন্যান্য ব্যবসায়ী বিভিন্ন সময়ে নিজেদের পণ্যদ্রব্য নিয়ে যখন ব্যবসায়ে বের হত, তখন রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পণ্যদ্রব্য তাঁদের হাতে সোপর্দ করতেন। এ ধরনের জনৈক ব্যবসায়ী (কায়স বিন আল সায়ীব)-এর বক্তব্য হলো, "আমি জাহিলিয়া যুগে মুহাম্মদের চেয়ে উত্তম কোন ব্যবসায়ী-অংশীদার পাইনি। আমরা যদি তাঁর পণ্যদ্রব্য নিয়ে যেতাম, তাহলে ফিরে আসার পর তিনি আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং কুশলাদি জিজ্ঞেস করেই চলে যেতেন। পরে যখন হিসাবপত্র তাঁকে সমঝানো হত, তখন তিনি কখনো তা নিয়ে বাদানুবাদ করতেন না। পক্ষান্তরে অন্যান্য লোক সর্বপ্রথমই তাদের পণ্যদ্রব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করত। আর তারা নিজেরা যদি আমাদের পণ্য নিয়ে যেত তাহলে ফিরে আসার পর যতক্ষণ না কড়াগণ্ডায় এর হিসাব করত, ততক্ষণ বাড়ি যেত না। এ জন্যেই তিনি আমাদের মধ্যে 'আল-আমীন' হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।"
ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে তাবারী বর্ণনা করেছেন, "বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং জনৈক কুরায়শকে পারিশ্রমিক দিয়ে বাণিজ্য ব্যাপদেশে হুবাশা'র মেলায় পাঠিয়েছিলেন। হুবাশা ছিল মক্কার দক্ষিণে ছ' দিনের পথের দূরত্বে ইয়ামনমুখী বাণিজ্যিক রাস্তার পাশে তেহামার অন্তর্গত একটি প্রসিদ্ধ স্থান। রজব মাসের তিনদিন পর্যন্ত স্থায়ী এ মেলা ফিলিস্তিনের তুলনায় নিকটবর্তী ছিল এবং সেখানকার শুল্কও ছিল অতি অল্প।"
ইবনে 'সাইয়েদুন নাস'-এর বর্ণনামতে বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বাণিজ্য সম্ভারসহ দু'বার 'জরশ' নামক স্থানে পাঠান এবং বিনিময়ে প্রত্যেকবারই এক একটি উট দান করেন। এ জায়গাটার নাম যদি 'জুরশ' হয় তাহলে তা ছিল মক্কার দক্ষিণ দিকে তায়েফের কিছু সম্মুখে ইয়ামনমুখী বিশেষ প্রাচীর বেষ্টিত একটি নগর-রাষ্ট্র এবং এখানে বিরাট মেলার আয়োজন করা হত। আর যদি এর নাম জরশ হয় তাহলে এটা ছিল জর্দানের পূর্বদিকে একটি বড় গ্রীক শহর। এসব সফরের সাফল্য এবং রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মধুর স্বভাবই সম্ভবত বিবি খাদীজাকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেছিল, যার ফলে তিনি তাঁকে নিজের পণ্যদ্রব্য দিয়ে ফিলিস্তিনের দূরাঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন। বিবি খাদীজা বিধবা ছিলেন এবং এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় চল্লিশ বছর। তিনি বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারিণী ছিলেন; ব্যবসা-বাণিজ্যের সাফল্যের ক্ষেত্রে নগরীতে মহিলা কেন, কোন পুরুষই তাঁর সমকক্ষ ছিল না। তাঁকে 'মহিলা বণিক' উপাধি দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি 'তাহেরা' (শুদ্ধাচারিণী বা সতী-সাব্বী) নামেও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায়, আবূ তালিব রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলেছিলেন, "দেখ বাবা, কয়েক বছরের দুর্ভিক্ষে আমাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। আমাদের ব্যবসার জন্যে না আছে নগদ পুঁজি, আর না আছে বাণিজ্য-সম্ভার। তুমি বিবি খাদীজার কাছে গিয়ে বলে দেখ, তিনি হয়তো তোমার দায়িত্বে কিছু বাণিজ্যসম্ভার দিয়ে দিতে পারেন।" খুব সম্ভব 'হুবাশা'র প্রথম বাণিজ্য মেলা উপলক্ষে এটা বলা হয়েছিল, যদিও বর্ণনাকারী, ফিলিস্তিন ভ্রমণ উপ- লক্ষে একথা বলা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন।
যা হোক, একটি কুরায়শ বণিকদল যখন সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করে, তখন বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর তত্ত্বাবধানে বিপুল পণ্যসামগ্রী সিরিয়ায় পাঠান। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত দাস মায়সারাকে (সেবার জন্য) ও খুযায়মা নামক জনৈক আত্মীয়কে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে পাঠান। ব্যবসা শেখার জন্যে বা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ব্যবসা শেখানোর জন্যে অথবা বাণিজ্য-সম্ভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্যেই সম্ভবত খুযায়মাকে তিনি পাঠিয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) এ সময় সিরিয়ার বসরা নগর পর্যন্ত সফর করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই রাস্তায় যেহেতু সাগর পড়ে, তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) সম্ভবত তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এ সময় নেস্তরীয় ধর্মযাজকের সাথেও তাঁর সাক্ষাত হয়েছিল বলে জানা যায়। বণিক দলের সাথে ধর্মযাজকদের সাক্ষাতের কারণ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। জানা যায়, একদা বিবি খাদীজা সখীদের নিয়ে ঘরের উপরতলায় বসে আছেন। এমন সময় দেখতে পান, অনেক দূর থেকে একটি বাণিজ্য-কাফেলা অতি দ্রুতবেগে নগর অভিমুখে আসছে। কাছে এলে দেখা গেল, এটা রসূলুল্লাহ (সা)-এরই কাফেলা। এ থেকে বোঝা যায়, তখনকার যুগে মক্কানগরীতে বহুতলাবিশিষ্ট ঘরবাড়ী ছিল; অবশ্য শুষ্ক আবহাওয়ার দরুন এসবের প্রয়োজনও ছিল।
ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সততা, ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফলে বিবি খাদীজা ঐ বাণিজ্য-অভিযানে দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করেন। তাই রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তিনি পুরস্কারস্বরূপ সম্পাদিত চুক্তির দ্বিগুণ পারি- শ্রমিক দান করেন। চুক্তিতে দু'টি উট দানের উল্লেখ ছিল। তবে সেগুলো বোঝাই- কৃত পণ্য সামগ্রীসহ, না পণ্যসামগ্রী ছাড়াই দেওয়া হবে ইতিহাস সে সম্পর্কে নীরব।
ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বিবি খাদীজার আহবানে রসূলুল্লাহ্ (সা) মাঝে মধ্যে তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন। প্রাচুর্যের অধিকারিণী, এই রমণী তাঁর বালাখানায় সখীগণ পরিবেষ্টিত অবস্থায় থাকলেও রসূলুল্লাহ্ (সা) আসামাত্র তৎক্ষণাৎ তাঁকে সাক্ষাতদান করতেন। এসব অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাতে অন্যান্য সাধারণ বিষয়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়েও তাঁদের মধ্যে 'পারস্পরিক আলাপ- আলোচনা হত বলে অনুমান করা যায়।
আবূ দাউদ প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, নবুওত লাভের প্রাক্কালে ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে আবদুল্লাহ বিন হামাসা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে একদা বলেছিলেন, "আপনি একটু অপেক্ষা করুন, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ফিরে আসছি।" অতঃপর তিনি প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান। কিন্তু তিনদিন পর ঘটনাক্রমে সে পথ দিয়ে যাওয়ার সময় রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সেখানে দেখতে পেয়ে আপন প্রতিশ্রুতির কথা তাঁর মনে পড়ে। রসূলুল্লাহ (সা) ঠিক ঠিকই ঐ জায়গায় বসে তিন দিন যাবত তাঁর অপেক্ষা করছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) মানুষের কথার কি যে মূল্য দিতেন, উপরিউক্ত ঘটনা থেকে তা সহজেই বুঝা যায়। উক্ত ঘটনা থেকে তাঁর চরিত্র মাধুর্যের আর যে বিশেষ একটি দিক ফুটে উঠেছিল, তা হলো এই যে, এতসব সত্ত্বেও তিনি আবদুল্লাহ বিন হামাসাকে হাসিমুখে বরণ করে নেন এবং তাঁকে ভালমন্দ কিছুই বলেন নি।
মসনদে ইমাম আহমদ বিন হাম্বলে একটি ঘটনার উল্লেখ আছেঃ পূর্ব আরব অর্থাৎ বাহরাইনের (বর্তমানে একে আল-হাসা বলা হয়) আবদুল কা'য়েস গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শেষ জীবনে তাঁর সাথে মদীনায় এসে সাক্ষাত করে। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁদের কাছে তাদেরই দেশের বিভিন্ন বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে যখন সেগুলোর বর্তমান অবস্থা জানতে চান তখন তারা অবাক বিস্ময়ে ভাবতে থাকে, তিনি কিভাবে তাদের অঞ্চলের ঐসব বিষয়ের এত খুঁটিনাটি জানতে পারলেন। কথিত আছে, রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বলেছিলেন, "আমি ব্যাপকভাবে তোমাদের দেশ সফর করেছি।" এতে অনুমান করা যায়, বাণিজ্যিক কারণেই তিনি 'মশকর' ও 'ওবা'র পার্শ্ববর্তী প্রসিদ্ধ মেলাসমূহে গমন করেছিলেন এবং সম্ভবত বিবি খাদীজার ব্যবসায়ের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবেই তিনি তা করেছিলেন। ঠিক কোন্ সময়ে তিনি ঐসব মেলায় গিয়েছিলেন, তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। সম্ভবত বিবাহের পরই স্বীয় স্ত্রীর বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে তিনি তথায় গিয়েছিলেন।
নবুওত লাভের প্রাথমিক বছরগুলোতে (মদীনায় হিজরতের প্রাক্কালে)। রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাঁর সাথীদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের নির্দেশ দেন, তখন তিনি তাঁর পিতৃব্যপুত্র জা'ফর তাইয়ার-এর সাথে নাজ্জাশীর নামে (আবিসিনিয়ার শাসনকর্তাকে নাজ্জাশী বলা হত) একটি পরিচয়পত্র দেন। পরিচয়পত্রটি ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত আছে। ঐ পত্রের ভাষার স্টাইল ইঙ্গিত প্রদান করে, যেন তিনি একজন পরিচিত ব্যক্তির নামেই তা পাঠিয়েছিলেন। তাছাড়া হিজরতকারীদের বিদায় দানকালে রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, "এটা এমন এক বাদশাহ্ দেশ, যেখানে কারো উপর অত্যাচার করা হয় না। উপরন্তু হাদীসে রসূলে একাধিক হাবশী শব্দের ব্যবহার এ কথারই ইঙ্গিতবহ যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) আবিসিনিয়া সফর করেছিলেন এবং নাজ্জাশীর সাথে তাঁর সাক্ষাতও হয়েছিল। (প্রাক-ইসলামী যুগে আ'মর ইবনে আস প্রমুখেরও আবিসিনিয়া সফরের সুযোগ হয়েছিল।)। মুসলিম মুহাজিরগণ যে পথে আবিসিনিয়া গিয়েছিলেন অর্থাৎ জিদ্দায় গিয়ে জাহাজে আরোহণ করে লোহিত সাগর পাড়ি দেয়া—সেটাই ছিল আবিসিনিয়া গমনের সহজ পথ। দ্বিতীয় আরেকটি পথ ছিল 'ইলা' (আকাবা) ও সিনাই উপদ্বীপ অথবা 'গাযা' হয়ে (এখানে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহ সমাহিত আছেন)। মিসর গমন করা এবং সেখান থেকে নীলনদের কূল বেয়ে আবিসিনিয়ায় উপনীত হওয়া। সমুদ্রের গতি শান্ত হওয়ার কারণে আবিসিনিয়া হতে মিসর গমনও সম্ভব ছিল। যদি এ গবেষণাভিত্তিক যুক্তিকে অহেতুক বলে মনে না করা হয়, তাহলে এর মধ্যে এ কথারও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) সমুদ্র সফরও করেছিলেন। যেহেতু কুরআন মজীদের সর্বপ্রথম মুখাতব (সম্বোধিত ব্যক্তি) ছিলেন রসূলুল্লাহ (সা), সেহেতু কুরআন মজীদে “বাগানের তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়” (যেমন সিরিয়ায়)। এরূপ কথা এবং সমুদ্র ভ্রমণের উপকারিতা ও সেই সাথে এর বিপদসংকুল অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ বিনা কারণে দেওয়া হয়েছে, তেমন কথা সহজে মেনে নেওয়া যায় না। (একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা নিবেদন করছি; বাগানের মধ্য দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয় এমন কথা আমাদের তথা বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের অধিবাসীদের কাছে অবোধগম্য নয়, কিন্তু বাগানের "নীচ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়”—এমন কথা সিরিয়ায় গিয়ে বাস্তব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার পূর্ব পর্যন্ত আমার কাছে মোটেই বোধগম্য ছিল না।)
সামুদ্রিক ভ্রমণ ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করার মধ্যে জীবন চরিত লেখকদের জন্য অশিষ্টতার কিছু নেই। প্রাক-ইসলাম যুগের এসব ঘটনা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ যদি হাদীস যাচাই-বাছাই-এর যুগ শুরু হওয়ার পূর্বেই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে পরবর্তীকালে মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসের সন্ধান করার মধ্যে কি অন্যায়ের কিছু থাকতে পারে? سیروا فی الارض "পৃথিবীতে ভ্রমণ কর" এ আয়াতটি কুরআনের দশ-পনের জায়গায় রয়েছে। যিনি (যে রসূল) আমাদের জন্যে "সুন্দরতম আদর্শ” তিনি স্বয়ং এ নির্দেশ (পূর্বে) পালন করে থাকলে তাতে কি দোষের কিছু আছে?
📄 বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স যখন পঁচিশ বছর দু'মাস দশ দিন, তখন তিনি খাদীজা বিনতে খুডায়ল্দ বিন আবদুল উযা বিন কুসাই-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবি খাদীজা শুধু সুন্দরীই ছিলেন না, প্রচুর ধন-রত্নেরও অধিকারী ছিলেন। কুরায়শের অনেক নেতৃস্থানীয় লোকই তাঁর পাণি-প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু তিনি কাউকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে সম্মত হননি। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা ও অন্যান্য সদ্গুণের খ্যাতি ছিল সমগ্র মক্কা নগরীতে। তাঁর পবিত্রতার কথাও সর্বত্র আলোচিত হত। বিবি খাদীজাও এসব বিষয় সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ফুফু হযরত সুফিয়া বিবি খাদীজার ভাই আওয়াম বিন খুভায়লদ-এর স্ত্রী ছিলেন। বিবি খাদীজা আলাপ প্রসঙ্গে হযরত সুফিয়ার কাছ থেকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যক্তিগত জীবনেরও খুঁটিনাটি জানার সুযোগ পান। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সতী-সাধ্বী রমণী হিসাবে স্বাভাবিকভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি তাঁর অনুরাগের সৃষ্টি হয়। তাছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার উদ্দেশ্যেই প্রধানত তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিজের পণ্য-সামগ্রী দিয়ে সিরিয়া পাঠান এবং স্বীয় দাস মায়সারাকেও তাঁর সঙ্গী করে দেন। ঐ অভিযানে বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সততা ও উন্নত গুণাবলীর অনেক প্রত্যক্ষ প্রমাণ পান। ফলে তিনি স্বয়ং নাফিসা বিনতে উমাইয়া অর্থাৎ ইউলা বিন উমাইয়ার ভগ্নির মাধ্যমে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তাঁর বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। ইবনে ইসহাকের মতে তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে ডেকে এনে সাক্ষাতেই সব কথা পাকাপাকি করেছিলেন। বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কেন ভালবেসেছিলেন তা তাঁর তখনকার একটি বক্তব্য থেকেই পরিস্ফুট হয়ে উঠে। তিনি বলেছিলেন, "আপনার সচ্চরিত্র ও সত্যবাদিতার কারণেই আমি আপনার অনুরাগী হয়ে উঠেছি।”
রসূলুল্লাহ (সা)-এর ঐ সংবাদটি পিতৃব্য আবূ তালিবের কাছে পৌঁছালে তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাতে সায় দেন। অতঃপর তিনি বনী হাশিম ও 'মুদা'র গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকদের নিয়ে বিবি খাদীজার বাড়িতে যান এবং সেখানেই বিবাহের যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। আব্দ অনুষ্ঠানে আবূ তালিব যে সারগর্ত ভাষণ দেন, তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অভিভাবকরা ঐ সময়ে তাঁর সম্পর্কে কি উন্নত ধারণা পোষণ করতেন এবং তাঁর স্বভাব-চরিত্র তাঁদের উপর কী অসাধারণ প্রভাবই না বিস্তার করেছিল! আবূ তালিবের ভাষণ ছিল নিম্নরূপঃ
সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর-যিনি আমাদের ইবরাহীমের বংশে ও ইসমাঈলের গোত্রে সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের মা'দ ও মুদারে'র পবিত্র উৎস থেকে উৎসারিত করেছেন, যিনি আমাদের তাঁর গৃহের রক্ষক ও হরমের ইমাম মনোনীত করেছেন, যিনি আমাদের এমন গৃহ দান করেছেন যার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে অসংখ্য লোকের আগমন ঘটে এবং এমন 'হরম' দান করেছেন যেখানে কেউ উপস্থিত হলে পুরোপুরি নিরাপত্তা লাভ করে, যিনি আমাদের জনগণের নেতা মনোনীত করেছেন। অতঃপর বলছি, আমার ভ্রাতুপুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সম্পর্কে, জ্ঞানগরিমা ও মহত্ত্বে যার সাথে অন্য কারো তুলনাই হয় না- যদিও তাঁর ধন-সম্পদ অতি অল্প। তবে জেনে রাখবেন ধনসম্পদ নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। মুহাম্মদের (সা) সাথে আমার কি সম্পর্ক রয়েছে আপনারা সকলেই তা জানেন। তিনি বিবি খাদীজা বিনতে খুভায়লকে বিবাহ করার জন্যে প্রস্তাব দিয়েছেন, অতএব, আমি আমার সম্পদ হ'তে বিশটি উট এ বিবাহের মুহর হিসেবে দান করলাম। তাঁর ভবিষ্যত, আল্লাহর শপথ, অত্যন্ত উজ্জ্বল ও গৌরবময়।
যখন আবূ তালিবের ভাষণ শেষ হলো তখন বিবি খাদীজার পিতৃব্য পুত্র ওরাকাহ বিন নওফেল ভাষণ দিতে উঠেন। তাঁর ভাষণের বিষয়বস্তু ছিল:
সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের সেসব গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যার কথা আবূ তালিব উল্লেখ করেছেন। আমরা সারা আরবের নেতা ও ইমাম, আর আপনারা সর্ব প্রকার সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। কোন দল বা গোষ্ঠীই আপনাদের মর্যাদা অস্বীকার করতে পারবে না এবং আপনাদের আভিজাত্য ও মর্যাদাকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আমরা অত্যন্ত আনন্দ উদ্দীপনা নিয়ে আপনাদের সাথে আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হতে যাচ্ছি। অতএব, হে কুরায়শের লোকেরা! আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমি চার শ' মিসকালের বিনিময়ে খাদীজা বিনতে খুভায়দকে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লার হাতে তাঁর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে তুলে দিচ্ছি।
ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আবু তালিব বললেন, "হে ওরাকাহ, উমর বিন আসাদ যখন এই মাহফিলে উপস্থিত আছেন, তখন তিনিও এ ব্যাপারে আপনার সাথে অংশ নিন—এটা আমি কামনা করি।” তখন আমর বিন আসাদ দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি খাদীজা বিনতে খুয়ায়লদকে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর স্ত্রীত্বে সমর্পণ করলাম।” এভাবে উভয় পক্ষের ইজাব (প্রস্তাব দান) ও কবুল (প্রস্তাব গ্রহণ)-এর মধ্য দিয়ে বিবাহকাজ সম্পন্ন হয়।
বিবাহের সময় বিবি খাদীজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তিনি বিধবা ছিলেন এবং ইতিপূর্বে তাঁর আরো দু'টি বিয়ে হয়েছিল। প্রথম বিয়ে হয়েছিল আবিহালা বিন যারারাহ তামীমীর সাথে। ঐ ঘরে তাঁর গর্ভে হিন্দ বিন আবিহালা ও যয়নব বিনতে আবিহালা নামক দুটি সন্তান জন্ম নেয়। দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল আতীক বিন আয়িয মাখযুমীর সাথে। ঐ ঘরেও তাঁর গর্ভে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। পুত্র সন্তানের নাম আবদুল্লাহ বিন আতীক ছিল বলে জানা যায়।
📄 সামাজিক ও নাগরিক জীবন
বিবাহ-উত্তর জীবন
বিবি খাদীজার মৃত স্বামীদ্বয়ের সন্তানরা আরবের প্রচলিত প্রথানুযায়ী সম্ভবত তাঁর শ্বশুরালয়েই রয়ে গিয়েছিল। কেননা, তাঁর এ বিয়ের সময় তাঁর সন্তানরা বেশ বড়সড় হয়ে গিয়েছিল। যা হোক, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পারিবারিক জীবনে কিন্তু এসব সন্তানের বিশেষ কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে অনুমান করা হয় যে, এদের সাথে তাঁর ব্যবহার নিশ্চয়ই সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল।
দুধমায়ের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সম্পর্ক ছিল সবসময়ই মধুর। সুহাইলী তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, "রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিবাহের পর বৃদ্ধা হালিমা তাঁকে দেখতে এলে নববধূ বিবি খাদীজা তাঁর সাথে অত্যন্ত শিষ্টাচারপূর্ণ ব্যবহার করেন এবং তাঁকে উপঢৌকনস্বরূপ কয়েকটি উট প্রদান করেন। বিবি হালিমা অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করেন এবং নবদম্পতির মঙ্গল কামনা করে তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নেন।” ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বিবি হালিমা তাঁর দুর্ভিক্ষজনিত অভাবের কথা ব্যক্ত করলে বিবি খাদীজা তাঁকে চল্লিশটি ছাগল এবং একটি উট দান করেন।
বিবি খাদীজার সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বৈবাহিক জীবন যে কত মধুর ও সুখময় ছিল তা দশ বছরের মধ্যে ছয়-সাতটি সন্তান লাভের মাধ্যমেই নয় বরং বিবি খাদীজার ইন্তেকালের পর রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে যেরূপ আবেগ-উচ্ছ্বাসের সাথে স্মরণ করতেন, তা থেকেও অতি সহজে অনুমান করা যায়। রসূলুল্লাহ্ (সা) বিবি খাদীজাকে এত বেশি স্মরণ করতেন-যা তাঁর সবচেয়ে প্রিয়তমা পত্নী হযরত আয়েশার কাছেও ছিল দস্তুরমত ঈর্যার ব্যাপার। রসূলুল্লাহ্ (সা) যতক্ষণ ঘরে থাকতেন, ততক্ষণ স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির সাথে কিরূপ মধুর ব্যবহার করতেন, তাদেরকে কত বেশি আদর করতেন এবং তাদের মন রক্ষা করার প্রতি কিরূপ যত্নবান থাকতেন, হাদীস গ্রন্থাদিতে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি তাঁদেরকে সব সময়ই ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বদান্যতার প্রশিক্ষণ দিতেন ও তাঁদের বোধগম্য হয় এমন কথাবার্তা বলতেন। সত্যিকথা বলতে গেলে, সকলের সাথে সবসময় সদ্ভাব বজায় রেখে চলাই ছিল তাঁর আচরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
বিবাহ-উত্তর ও নবুওতপূর্ব পনর বছরের জীবন তিনি কিভাবে কাটিয়েছিলেন তার সত্যিকার রূপরেখা একমাত্র কোন অভিজ্ঞ প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে। নবুওতের প্রাথমিক যুগে আল্লাহ্ কর্তৃক তাঁকে প্রদত্ত 'উম্মী' (নিরক্ষর) উপাধির কারণে তিনি বিচলিত হয়ে পড়লে বিবি খাদীজা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, "আপনি নিঃসন্দেহ থাকুন, আল্লাহ্ আপনাকে বিপর্যস্ত করবেন না এবং আপনার জন্য কল্যাণকর নয় এমন কিছুও করবেন না। কেননা, আপনি নিকটাত্মীয়দের হক আদায় করেন, অতিথিদের সেবাযত্ব করেন, পরিবারের ভরণ-পোষণ করেন, পরিশ্রম করে রোজগার করেন, ন্যায় ও সত্যের কাজে সকলকে সাহায্য করেন, অনাথদের আশ্রয় দেন, সবসময় সত্য কথা বলেন, কখনো বিশ্বাসঘাত করেন না, অক্ষমদের সাহায্য করেন, গরীব নিঃস্বদের সাথে সদ্ব্যবহার করেন এবং সকলের সাথেই সদ্ভাব রাখেন।"
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আর যেসব গুণের সন্ধান পাওয়া যায়, তা হলো, তিনি নিজে শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন, বসে বসে ধনবতী স্ত্রীর সম্পত্তি ভোগ করাকে তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি খাদ্যশস্যের ব্যবসা করতেন। খুব সম্ভব তিনি ব্যবসায়ে অন্য কোন লোকের সাথে অংশীদার ছিলেন।
তাবারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, ঐ সময়ে মক্কায় একবার ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন আবু তালিবের বিরাট পরিবারটি অত্যন্ত দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়। একদিন রসূলুল্লাহ্ (সা) পিতৃব্য আব্বাসের কাছে গিয়ে আবূ তালিবকে এই দুঃসময়ে সাহায্য করার আবেদন জানান। শেষ পর্যন্ত তিনি এবং আব্বাস আবু তালিবের পুত্র যথাক্রমে আলী এবং জাফরকে ভরণ-পোষণের জন্য নিজ নিজ পরিবারে নিয়ে আসেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রতিটি সৎকর্মেই ছিলেন অগ্রণী এবং এক্ষেত্রে অন্যান্যকেও তিনি অনুপ্রেরণা দান করতেন।
উল্লেখিত আচার-আচরণের কারণেই সমগ্র মক্কা নগরীতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। আযরাকী প্রমুখ ইতিহাসবিদের মতে, যদিও চল্লিশের কম বয়স্ক লোকের পক্ষে মক্কা নগরীর (ব্যবস্থাপনার) সদস্যপদ লাভ করার সুযোগ ছিল না, কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দূরদর্শিতা, ন্যায়বিচারসুলভ ও পক্ষপাতহীন আচরণের কারণে যেকোন সমস্যা সমাধানে তার বয়োজ্যেষ্ঠরাও যে তাঁর উপর নির্ভরশীল ছিলেন তার বাস্তব দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করা যায় নগরের একাধিক সমস্যা সমাধানে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স যখন আনুমানিক পঁয়ত্রিশ বছর তখন একটি অগ্নিকাণ্ডের কারণে এবং পরবর্তী সময়ে ধ্বংসাত্মক বন্যার ফলে পবিত্র কা'বাগৃহের প্রাচীর ধ্বসে পড়ে। মক্কা ছিল চতুর্দিক দিয়ে পর্বতশ্রেণী পরিবেষ্টিত এবং এর সবচেয়ে নীচু জায়গায় ছিল পবিত্র কা'বাগৃহের অবস্থান। ফলে, নগরে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই সমস্ত পানি এখানে এসে জমা হতো। পূর্ব অভিজ্ঞতা সামনে রেখে 'আ'মির আল জাদির' নামক মক্কার জনৈক দলপতি কা'বার মূল প্রাচীরকে বন্যার স্রোত থেকে রক্ষা করার জন্যে এর চতুর্দিকে পৃথক আর একটি প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু উল্লেখিত বছরে এত অধিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়েছিল যে, বাইরের প্রাচীর মূল প্রাচীরকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ফলে বাধ্য হয়েই এটা পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন পর্যন্ত কা'বাগৃহের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয়ই ছিল ন'হাত করে এবং উচ্চতা ছিল মানুষের দেহের উচ্চতার চাইতে সামান্য কিছু বেশি। এছাড়া এর উপরিভাগে ছাদের কোন ব্যবস্থা ছিল না। সে বছর মক্কা নগরীর উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী সাগরের উপর দিয়েও ঝড় বয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। বাস্তবে হয়েও ছিল তা-ই এবং ঐ সর্বনাশা ঝড়ের কবলে পড়ে জিদ্দার অদূরে একটি রোমীয় জাহাজ ডাঙ্গায় আটকা পড়ে এবং তা লুণ্ঠিত হয়। আযরাকীর মতানুসারে, ঐ সংবাদ যখন মক্কাবাসীদের কাছে পৌঁছে তখন তারা সম্পদের লোভ-লালসা পরিহার করে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসে। ঐ জাহাজের আরোহীদের মধ্যে যারা প্রাণে বেঁচেছিল তারা তাদের সেবাযত্ব করে এবং যে সমস্ত পণ্যদ্রব্য রক্ষা পেয়েছিল, সেগুলো তারা শুধু উচিত মূল্যে কিনেই নেয়নি বরং সেগুলোর শুল্কও রহিত করে দেয়। তারা জাহাজের তক্তাগুলোও কিনে নেয়। মক্কায় বাকুম নাম্নী জনৈকা মিসরী মহিলার সন্ধান পাওয়া যায়। এক বর্ণনানুসারে ঐ বৃদ্ধাটিও ঝড়ে আক্রান্ত হয়েছিল এবং মক্কাবাসীদের উদার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে চিরদিনের জন্য সেখানেই রয়ে গিয়েছিল। কোন কোন বর্ণনা মতে, মর্মর পাথর, লোহা, কাঠ ইত্যাদি গৃহনির্মাণ সামগ্রীই ছিল ঐ জাহাজের পণ্যদ্রব্য। একটি গীর্জা নির্মাণের জন্য ঐসব সামগ্রী মিসর হতে আবিসিনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। অতএব কা'বাগৃহ নির্মাণে ব্যবহারযোগ্য ঐসব প্রয়োজনীয় অথচ অত্যুৎকৃষ্ট সামগ্রী কোনরূপ চেষ্টা-চরিত্র ছাড়াই মক্কাবাসীরা পেয়ে যায়। তখন মক্কাবাসীদের চোখের সামনে আর একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে; আর তা হচ্ছে এই যে, ভালভাবে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পূজার নযর-নিয়াজ তথা নৈবেদ্যাদি কা'বার দরজার নিকটস্থ যে অন্ধকূপে নিক্ষেপ করা হতো, সেখানে কোথা থেকে একটি বিরাট সর্প এসে বাসা বাঁধে। ফলে জনমনে দারুণ ত্রাসের সৃষ্টি হয়। যখন কা'বাগৃহ পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছিল তখন হঠাৎ একদিন সাপটি অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে এসে প্রাচীরের উপর ঘোরাফেরা করতে থাকে এবং ঠিক তখনি একটি বাজপাখী কোথা থেকে বিদ্যুৎ বেগে উড়ে এসে সাপটি ছোঁ মেরে ধরে নিয়ে যায়। এ বিস্ময়কর অথচ অলৌকিক ঘটনা থেকে মক্কাবাসীরা এই অনুপ্রেরণা লাভ করে যে, তারা তাদের এই প্রাচীন ও পবিত্র উপাসনালয় নির্মাণে অবৈধ উপায়ে অর্জিত কোন টাকা-পয়সা খরচ করবে না। জুলুম অথবা বল প্রয়োগের মাধ্যমে কিংবা সুদী ব্যবসা করে যেসব অর্থ উপার্জিত হয়েছে সেগুলোও এই পুণ্য কাজে ব্যয় করা হবে না। কা'বাগৃহ ছিল চার প্রাচীর বিশিষ্ট এবং এর নির্মাণ কাজ মক্কাবাসীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল।
দরজা সংলগ্ন প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব আব্দে মনাফ এবং বনী যুহরার উপর পড়েছিল। হজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী প্রাচীরের নির্মাণ কাজ বনী মখযুম, তায়ীম ইত্যাদি গোত্র গ্রহণ করেছিল। পেছনের প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব ছিল বনী সাহাম ও বনী জামাহ-এর উপর। হজর বা হাতীম সংলগ্ন প্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব ছিল বনী আবদেদার, বনী আসাদ ও বনী আদীর উপর। পুরাতন প্রাচীরটিকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে অপসারণ করা হয়। গৃহের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আগের চাইতে দ্বিগুণ করা হয়। একটি সিঁড়িও নির্মাণ করা হয় এবং উপরিভাগে ছাদ দেয়া হয়। কা'বার 'হাতীম' নামক অংশটি ছাদবিহীন অবস্থায় অর্ধেক প্রাচীর দ্বারা বৃত্তাকারে নির্মাণ করা হয়। কিছু ফাঁক রেখে এর দু'দিকের প্রাচীরকে কা'বাপ্রাচীর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, যাতে যেকোন লোক যেকোন সময় এতে প্রবেশ করতে পারে। এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ছিল কা'বাগৃহে প্রবেশ করারই শামিল। সাধারণ চুক্তি সম্পাদন, শপথ গ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে জনসাধারণ হাতীমকেই ব্যবহার করত। তারা মূলগৃহে সপ্তাহে শুধু সোমবার ও বৃহস্পতিবার-এ দুদিন প্রবেশ করত। অবশ্য বিশেষ বিশেষ উৎসব উপলক্ষে অন্য যেকোন দিনও প্রবেশ করা চলত। প্রাচীরের নির্মাণ কাজ শুরু হলে নগরের সকলেই পাথর বহন এবং তা স্থাপনের কাজে অংশ নিতে থাকে। প্রাচীর নির্মাণের কাজ উচ্চতায় দেড় গজ পর্যন্ত পৌঁছলে 'হজরে আসওয়াদ'কে এমন একটি জায়গায় স্থাপনের প্রয়োজন অনুমিত হয় যেখান থেকে তা তওয়াফকারীদের নজরে পড়ে এবং তারা সেটাকে সহজে চুম্বনও করতে পারে। হজরে আসওয়াদ ছিল একটি পবিত্র পাথর; একে যথাস্থানে স্থাপন করা ছিল একটি অতি সম্মানের কাজ। সুতরাং প্রত্যেক গোত্রের লোকই সে কাজটি সমাধা করতে চায়। শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্বকলহের সৃষ্টি হয় এবং তা যুদ্ধের আকার ধারণ করে। হাতীম অংশের নির্মাণকারীরা 'রক্তপূর্ণ পাত্রে হাত ডুবিয়ে' শপথ নিল যে, তারা কিছুতেই এ সম্মানজনক কাজ সমাধা না করে ছাড়বে না। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে পাঁচদিন পর্যন্ত কা'বার নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকে। অবশেষে এ সংকট নিরসনের জন্যে কা'বা প্রাঙ্গণেই পরস্পর সলা-পরামর্শ চলতে থাকে! বৃদ্ধ উমাইয়া বিন আল-মুগীরা সকলকে সম্বোধন করে বললেন, "তোমরা এই ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। আগামী দিন যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম এ পথে কা'বাগৃহে আসবে সে এ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত দেবে তাই তোমরা মেনে নেবে।” (অতি প্রত্যূষে) হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে সর্বাগ্রে সেখানে আসতে দেখে দূর হতে সকলেই সমস্বরে বলে উঠল, "এই তো আমাদের আল- আমীন আসছে, এই তো আমাদের মুহাম্মদ (সা) আসছে, আমরা সকলে তাঁর উপরই মীমাংসার ভার অর্পণ করলাম।” রসূলুল্লাহ (সা) যখন কাছে এলেন তখন আসল ঘটনার কথা তাঁকে বলা হলো। তখন তিনি ইচ্ছা করলে এ সম্মানজনক কাজটি নিজের জন্য অথবা নিজের গোত্রের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে তৎক্ষণাৎ একখানি চাদর চেয়ে নিয়ে তাতে হজরে আসওয়াদ রাখেন এবং প্রত্যেক গোত্রের মনোনীত ব্যক্তিদেরকে সেই চাদরের এক এক কোণা ধরে পাথরটিকে সম্মিলিতভাবে উঠানোর আহবান জানান। এভাবে সকলে নির্দিষ্ট স্থানের নিকটবর্তী হলে তিনি হজরে আসওয়াদকে নিজ হাতে চাদর থেকে উঠিয়ে নিয়ে প্রাচীরগাত্রে স্থাপন করেন। এভাবে রসূলুল্লাহ (সা) সেদিন একটি অবশ্যম্ভাবী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধকে অতি সহজে প্রতিরোধ করেছিলেন। যারা ঐ ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি করেছিল আজ বিশ্বে তাদের নামগন্ধও নেই, যারা চাদর উঠিয়েছিল তাদের নামও আর কেউ জানতে চায় না, কিন্তু কিভাবে ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করতে হয়, একজন শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী হিসাবে সেদিন মুহাম্মদ আল-আমীন তাঁর যে 'উত্তম আদর্শ' স্থাপন করলেন তাতে তিনি বিশ্বে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ঐ সময়কার (কা'বা পুননির্মাণ চলাকালীন) শেষ ঘটনাটির কথাও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। মক্কাবাসীদের তখনকার পোশাক ছিল সাধারণত একটি লুঙ্গি ও একটি চাদর। বিত্তহীনদের আবার চাদর গায়ে দেওয়ার সঙ্গতি ছিল না। কা'বা নির্মাণের সময় ভারী ভারী পাথর কাঁধে করে বয়ে আনতে হত। সুতরাং কাঁধের চামড়া যাতে কেটে না যায় সে জন্যে বিত্তহীন লোকেরা নিজেদের লুঙ্গিকেই কাঁধের উপর ভাঁজ করে গদির মত বানিয়ে নিত। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর কাঁধের চামড়া কেটে যাচ্ছে দেখে পিতৃব্য আব্বাস উপরিউক্তভাবে গদি বানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন কিন্তু যখনই তিনি তা করতে যান, তখনই মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। অতএব ঐ লজ্জাজনক কাজটি করা তাঁর পক্ষে সেদিন সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতেও তিনি কোনদিন এ কাজ করার ইচ্ছা করেন নি।
যখন কা'বার নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলো এবং তা আল্লাহর ঘর হিসেবে স্বীকৃতিও পেল তখন পৌত্তলিক মক্কাবাসীরা অনতিবিলম্বে তাতে কারুকার্য শুরু করে দিল। তারা কা'বাপ্রাচীরের ভিতরের দিকে নানা ধরনের ছবি আঁকলো। তন্মধ্যে ফেরেশতার ছবিসহ কয়েকজন নবী-রসূলেরও ছবি ছিল। তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা (লটারী) করছেন, হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর সেরূপ ছবিও তাতে অংকিত হলো। বিবি মরিয়ম ও হযরত ঈসা (আ)-এর ছবিও তাতে স্থান পেল। কা'বার অঙ্গনে-প্রাঙ্গণে প্রত্যেক গোত্রের মোট ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হলো। এভাবে সুচতুর কুরায়শরা কা'বাকে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীর জন্যে "সার্বজনীন দেবালয়ে” পরিণত করল। ফলে আরবের প্রত্যেক ধর্মের ও প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা অত্যন্ত খুশীমনে কা'বা দর্শন ও তা প্রদক্ষিণ করতে শুরু করল। বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে কুরায়শদের জন্য এটা অত্যন্ত কল্যাণকর প্রমাণিত হলো।
এক ও অদ্বিতীয় (লা-শরীক) আল্লাহর ঘরটি এভাবে 'দেবালয়ে' পরিণত হচ্ছে দেখে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মন-মানসিকতা তথা চিন্তারাজ্যে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। তিনি তখন থেকে শুধু এ ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাই করেন নি বরং অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে প্রতীক্ষাও করতে থাকেন- 'কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়' তা দেখার জন্য।
📄 নবুওতের সূর্যোদয়
যে বিশ্বাস ও মর্যাদার সাথে বায়তুল্লাহর (কা'বাগৃহের) নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, যেভাবে অবৈধ অর্থের চাঁদা পরিহার করে কেবলমাত্র হালাল ও বৈধ মাল দিয়ে তা নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবে নগরের চিন্তাশীল লোক ও যুবক সমাজের মনে এক অভাবনীয় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। কা'বার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অবস্থা এরূপ দাঁড়িয়েছিল যে, এখানে এসে মিথ্যা শপথ নিতে যেকোন লোক বিব্রত বোধ করত এবং কোন ব্যাপারে অত্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহমুক্ত হলে পর 'হাতীমে কা'বায়' এসে সে ব্যাপারে শপথ নিত। ক্রমে ক্রমে জনমনে এরূপ ধারণারও সৃষ্টি হয়েছিল যে, এখানে কোন ব্যক্তি মিথ্যা শপথ নিলে বিশ্বে তার নাম-নিশানা থাকবে না এবং সবংশে সে নিপাত যাবে।
কিছুদিন যেতে না যেতেই যখন লা-শরীক (অদ্বিতীয়) আল্লাহর ঘর দেবালয়ে পরিণত হলো এবং এর অভ্যন্তরে ও বহিরাঙ্গনে তিন শ' ষাটটি প্রতিমা স্থাপন করা হলো, তখন স্বাধীন চিন্তাশীলদের মনে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। যেসব প্রতিমা মানুষেরই তৈরী, এমন কি নির্মাণগত অক্ষমতার কারণে যেগুলোর আকার-আকৃতিও বেমানান ও অশোভন, যারা কথা বলতে পারে না, নড়াচড়া করতে পারে না, কেউ ক্ষতি সাধন করলে যারা তাকে বাধাদানের সামান্যতম ক্ষমতাও রাখে না, তারা অন্যের কী উপকার বা অপকার করতে পারে এবং ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে এদের স্থানই বা কি হতে পারে? তা ছাড়া একটি কাহিনী তো সবারই জানা ছিল যে, খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী কোন এক অঞ্চলের লোকেরা মাটি ও পাথরের পরিবর্তে আটা দিয়ে একটি বৃহদাকার মূর্তি তৈরি করে তাকেই তাদের উপাস্য দেবতা হিসেবে মানতে থাকে। কিন্তু পরবর্তী কোন এক বছর যখন তথায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখন তারা তাদের ঐ উপাস্য দেবতাকে কেটে টুকরা টুকরা করে নিজেদের মধ্যে বন্টন করে খেয়ে ফেলে। উপরন্তু এও শোনা যেত, যেসব প্রতিমা কাঠ দিয়ে তৈরী করা হত, শীতের মওসুমে রাতের অন্ধকারে পথিকেরা সেসব প্রতিমা থেকে তাদের চলার ইন্ধন সংগ্রহ করে নিত। এ জাতীয় উপাস্য কি কোনরূপ গুরুত্বের অধিকারী হতে পারে? প্রতিমা সম্পর্কিত এর চাইতেও ঘৃণ্য একটি ঘটনার কথা জানা যায়। আর তা হলো, আসাফ নামক জনৈক ব্যক্তি নায়েলা নাম্নী জনৈকা মহিলার সাথে ব্যভিচার করার কারণে একবার খানায়ে কা'বার অভ্যন্তরে এসে আশ্রয় নেয়। জনসাধারণ তাদের ঐ ঘৃণ্য অনাচারের কথা প্রচারের উদ্দেশ্য তাদের দু'টি মূর্তি মক্কার বিশেষ বিশেষ স্থানে স্থাপন করে। কয়েক বছর পর কিছু অজ্ঞ লোক অভিশপ্ত এ দুটি মূর্তিরই পূজা শুরু করে দেয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সংখ্যক উন্নত মন্যেবৃত্তির অধিকারী লোকের পক্ষে কা'বাগৃহকে দেবালয়ে পরিণত করার ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়ার মধ্যে অস্বাভাবিকতার কিছু ছিল না।
মক্কার অধিবাসীরা ছিল সাধারণত পৌত্তলিক। তবে কিছু লোক বিদেশীদের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পৌত্তলিকতাকে ঘৃণা করত। মক্কা নগরেই কিছু লোক খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ছিল। আর কিছু লোক ছিল নাস্তিক। 'খাও দাও স্ফূর্তি কর'- এই ছিল শেষোক্তদের জীবনাদর্শ। পক্ষান্তরে কিছু লোক একত্ববাদেও বিশ্বাসী ছিল। তারা মাবুদ ও ইবাদতকারীদের মধ্যে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা যায় সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করত, তবে এর সঠিক দিকদর্শন তাদের জানা ছিল না। তারা তাদের হৃদয়ের আবেগ কবিতার ছন্দে এবং অন্যান্যভাবে প্রকাশ করত। যেমন একজন বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছেন "হে আল্লাহ! কিভাবে আমি তোমার ইবাদত করবো? দাঁড়িয়ে মাথা নত করে, সিজদা করে, পা উপরের দিকে উঠিয়ে, না উর্ধ্ববাহ হয়ে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমিই বলে দাও। তুমি যেভাবে বলবে আমি সেভাবেই করব।"
মোটকথা, ধার্মিক মাত্রেই নিজ নিজ সাধ্যমত ইবাদতের একটা সঠিক পন্থা উদ্ভাবনের চিন্তায় ছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোত্রের লোকেরাও প্রতিমাপূজা করত; তবে বিবি খাদীজার জনৈক নিকটাত্মীয় ওরাকাহ বিন নওফেল খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন। নগরবাসীদের মধ্যে বিরাজিত অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণাও রসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ও সৃষ্টিকর্তার রহস্য সম্পর্কে চিন্তিত করে তুলত। সম্ভবত এভাবে অনেকদিন পর্যন্ত তিনি চিন্তা করতে থাকেন। তিনি এসব বিষয় নিয়ে কখনো স্ত্রীর সাথে, আবার কখনো বন্ধু-বান্ধব, গোত্র-প্রধান ও নগরের সম্মানিত ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। কারো কাছ থেকে সদুত্তর না পেয়ে নিরাশ চিত্তে কখনো কোন বৃক্ষতলে, কখনো প্রকাণ্ড পাথরের ছায়ায় বসে তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা চিন্তার মধ্যে কাটিয়ে দিতেন। তাবারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, পরিবার-পরিজন ছেড়ে কিছুদিনের জন্যে কোন পর্বত গুহায় একাকী বসে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে উপকারিতা রয়েছে তা মক্কাবাসীদের অজ্ঞাত ছিল না। তারা এ জিনিসটির সন্ধান কোথা থেকে পেয়েছিল তা অবশ্য জানা যায়নি। সম্ভবত তারা তা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কাছ থেকেই শিখেছিল।
ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) সারা রমযান মাস মক্কার বাইরে, তাঁর বাসস্থান থেকে প্রায় আড়াই/তিন ফার্লং দূরে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। তখন তিনি খাদ্যদ্রব্য সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। যখন তা ফুরিয়ে যেত তখন কিছুক্ষণের জন্য বাড়ীতে ফিরে এসে আবার তা নিয়ে যেতেন অথবা বিবি খাদীজা ভৃত্যের মাধ্যমে তা তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। গুহায় বসে তিনি কি করতেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না; সম্ভবত তিনি তখন রোযা রাখতেন এবং অন্য কোন কঠোর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। ঘটনাক্রমে কোন মুসাফির বা ভিখারী সেখানে উপস্থিত হলে নিজের সামান্য আহার্য থেকেই তিনি তাকে কিছু খেতে দিতেন। মাস শেষে তিনি সেখান থেকে গৃহাভিমুখে রওয়ানা হতেন এবং কা'বাগৃহ প্রদক্ষিণ করে তবে নিজের পরিবার-পরিজনের সাথে মিলিত হতেন।
হেরা পর্বত। বর্তমান এটাকে জবলুনুর বলা হয় এবং বাইবেলে এটা 'ফারান' নামে পরিচিত। মক্কার উত্তর-পূর্ব দিকে, মীনা ও আরাফাগামী রাস্তার বামদিকে কয়েক ফার্লং দূরে অবস্থিত। বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট বন্যায় তখন শহরের বিরাট ক্ষতি হত। তুর্কী শাসনামলে মক্কা শহর রক্ষার উদ্দেশ্যে একটি দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করে বন্যার গতি পরিবর্তন করে দেয়া হয়। এই বাঁধের কিছুটা সম্মুখভাগে অগ্রসর হলেই শুভ্রসাদা একটি নূরানী পাহাড় নযরে পড়ে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে উপরে উঠলেই তুর্কী সুলতানদের জন্যে অন্তর থেকে আপনা আপনি দুআ বেরিয়ে আসে। তারা সেখানে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরী করেছিলেন। বৃষ্টির পানি ঐ হ্রদে জমা হত এবং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত তা জনসাধারণের তৃষ্ণা নিবারণের কাজ দিত। আরো কিছু উপরে উঠলে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়ার কাছে কয়েকটি বড় বড় পাথর উপরে, নীচে ও আশেপাশে এমনভাবে স্থাপিত হয়েছে যে, এতে একটি গুহার সৃষ্টি হয়েছে। তাতে উঠানামার জন্যে সিঁড়ির মত পথও তৈরী হয়ে গেছে। গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেই আল্লাহর অসীম মহিমা প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রায় চার গজ লম্বা, পৌনে দুই গজ প্রশস্ত ও একজন পূর্ণদৈর্ঘ্য মানুষ দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারে এরূপ উচ্চতাসম্পন্ন এই গুহাটিতে পা লম্বা করে অনায়াসেই শোয়া যেত। এছাড়া রৌদ্র-বৃষ্টি থেকেও তা ছিল সুরক্ষিত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, লম্বাকৃতির এই গুহাটি ছিল সম্পূর্ণরূপে কা'বামুখী। এভাবে হেরা গুহায় ধ্যান-মগ্ন অবস্থায় রসূলুল্লাহ্ (সা) কত বছর কাটিয়েছিলেন, অনেক অনুসন্ধানের পরও তা জানা যায়নি। তবে সে মেয়াদ পাঁচ বছরের কম ছিল বলে অনুমিত হয়।
পার্থিব সাধনা ও তার ফলাফল সম্পর্কে মানুষ আলাপ-আলোচনা করে এবং ভাষাশৈলীর মাধ্যমে তা বিভিন্নভাবে প্রকাশও করতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনার ফলাফল তো বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করা সম্ভব নয়। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ঐ ধ্যানমগ্ন হওয়াটা কেমন লাগত তা পুরোপুরিভাবে ব্যক্ত করা সহজ নয়; তবে প্রামাণ্য বর্ণনাসমূহ ও জীবন-চরিত লেখকরা এ সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন তার সারকথা হলো, যেহেতু রসূলুল্লাহ্ (সা) প্রতি বছর ঐ একই কাজ করতেন, তাই নিশ্চিত করে বলা যায়, তাতে তিনি তাঁর বিদগ্ধ হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ করতেন এবং ঐ কাজ তাঁর খুবই মনঃপূত ছিল। আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রাথমিক সোপানে তিনি সত্য স্বপ্ন দেখতেন এবং সেগুলোর ফলাফল দিবালোকের ন্যায় সত্যে পরিণত হত। ক্রমে ক্রমে তিনি অনুভব করতে থাকেন, কোন পাথর অথবা বৃক্ষ যেন তাঁকেই লক্ষ্য করে আওয়াজ দিচ্ছে এবং ক্রমশ সে আওয়াজ যেন তাঁর কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রথম প্রথম এসব ব্যাপার লক্ষ্য করে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন। কোন মানুষ আওয়াজ দিচ্ছে মনে করে তিনি গুহা থেকে বেরিয়ে আসতেন, কিন্তু আশেপাশে কোথাও কাউকে খুঁজে পেতেন না। এভাবে ক্রমাগত ঐ আওয়াজ শুনতে শুনতে অদৃশ্য আওয়াজদাতার প্রতি তাঁর অনুরাগ বেড়ে যেতে থাকে। এমন কি, একবার আওয়াজ শোনার পর পুনরায় তা শোনার জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন।
এভাবে দিন যতই অতিক্রান্ত হতে থাকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মন পার্থিব বিষয়বস্তুর প্রতি ততই অনীহ হয়ে উঠতে থাকে এবং তিনি এক অদৃশ্য শক্তির সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে উঠেন। মাবুদ ও আবিদ, সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যে এবং একজন মানুষকে পূর্ণ মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য যে স্তরের পূত-পবিত্র হৃদয়ের প্রয়োজন, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পূর্ব থেকেই তিনি তা লাভ করেছিলেন। তার ফলে তাঁর পবিত্র সত্তা সর্বদা সবাইকে যাবতীয় অন্যায় অসত্য প্রতিরোধে এবং ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করত। আর এ ধরনের পূত-পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই একজন সত্যিকার পথপ্রদর্শক ও সংস্কারক না হয়ে পারেন না।
এভাবে তাঁর আত্মশুদ্ধি ও আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জনের কাজ কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে থাকে এবং তখন তিনি পরিবার-পরিজন থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কা'বাগৃহ নির্মাণের পূর্বে তাঁর যে সন্তান জন্ম নিয়েছিল সেই ছিল শেষ সন্তান। অতঃপর খাদীজা (রা)-এর কোলে আর কোন সন্তান আসেনি।
রসূলুল্লাহ (সা) বয়সে পরিপক্বতা লাভ করছেন, তাঁর চল্লিশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে, সুতরাং অদৃশ্য শক্তির পক্ষ থেকে তাঁকে 'ওহী' ও 'ইলহাম' বহনের উপযোগী করে তৈরী করা হচ্ছে। 'রসূলে উম্মী' (নিরক্ষর নবী) (সা)-কে মহান স্রষ্টা "রাহমাতুল্লিল আলামীনে" (জগৎসমূহের করুণায়) রূপান্তরিত করছেন।
পুনরায় রমযান মাস এল। পূর্বের মত ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তাঁর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। এমতাবস্থায় একদিন জিবরাইল (আ) 'ওহী' তথা আল্লাহর বাণী নিয়ে তাঁর সমক্ষে হাযির হলেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবীর মর্যাদা দান করলেন। আল্লাহুম্মা সাল্লি'আলা মুহাম্মদ (হে আল্লাহ্! মুহাম্মদের উপর করুণা বর্ষণ কর)।
যখন সর্বপ্রথম 'ওহী' অবতীর্ণ হলো, তখন কেউই তাঁর সামনে ছিল না। অতঃপর তেইশ বছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে এবং অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। প্রত্যক্ষদর্শীরা এ সম্পর্কে যেসব বর্ণনা দিয়েছেন, সেগুলোর আলোকে, আমাদের বর্তমান পারিপার্শ্বিকতায় আমরা সে সম্পর্কে যে ধারণা করতে পারি, তা হলো, অবতরণের পদ্ধতিটা ছিল ঠিক যেন টেলিফোন যন্ত্রের মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণের মত। ওহীকে একটি টেলিফোন-বার্তা মনে করা যেতে পারে, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীর কাছে পাঠাতেন। মুহাদ্দিস এবং ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে ওহী আসার সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) ঘন্টার মত আওয়াজ শুনতে পেতেন। তাঁর অন্তরঙ্গ ব্যক্তিদের। যেমন আবূ বকর ও উমর (রা)। কানে ঐ সময় মাছির ভন ভন শব্দের মত আওয়াজ আসত, যদিও তাঁরা কোন কিছুই দেখতে পেতেন না। ওহী অবতরণের ঐ পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও গুরুগম্ভীর। প্রত্যক্ষদর্শী কোন কোন সাহাবীর বর্ণনা অনুযায়ী ভীষণ শীতের সময়ও ওহী অবতীর্ণ হলে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে উঠত। উষ্টারোহী অবস্থায় ওহী অবতীর্ণ হলে তাঁকে বহনকারী উট অনেক সময় ভারাক্রান্ত হয়ে বসে পড়ত। কোন কোন সময় উট না বসলেও মনে হত, যেন তার হাড্ডি ভেঙ্গে যাচ্ছে। একদা জনৈক সাহাবীর উরুর সাথে হাঁটু লাগিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) বসে আছেন, এমন সময় ওহী অবতীর্ণ হয়, তখন ঐ সাহাবী মূর্ছিত হয়ে পড়েন এবং অনুভব করেন, যেন তাঁর উরুদেশের হাড্ডি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
ফেরেশতা বা 'মালাক' শব্দের অর্থ 'প্রেরিত' বা 'সংবাদবাহক'। প্রকৃতপক্ষে মালাক হচ্ছে এমন এক সৃষ্টি, যা মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের কাজ করে এবং সংবাদ বহন করে। রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, সংবাদ বাহক ফেরেশতা (জিবরাঈল) কখনো মানুষের মত, কখনো ডানাবিশিষ্ট উড্ডয়নশীল এক অভিনব প্রাণীর মত, কখনো বা অন্য কোন আকৃতিতে আমার সামনে হাযির হতেন।
যেহেতু নবুওতের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, তাই এ সম্পর্কিত বিষয়াদিও সবার কাছে সহজবোধ্য হবার কথা নয়। তাছাড়া ওহী অনুসরণকারীদের কাছে এসব বিষয় খুব একটা গুরুত্বপূর্ণও নয়। ওহী কিভাবে অবতীর্ণ হলো, তার চাইতে ওহীর মাধ্যমে কি নির্দেশ এলো এবং কিভাবে তা সংরক্ষিত হলো, তা-ই হচ্ছে আমাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মোটকথা, ওহীর আগমন ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল রসূল-জীবনের পরবর্তী যুগ।