📄 ইসলামী দাওয়াতের কেন্দ্ররূপে আরব ও মক্কাকে নির্বাচনের কারণ
এখন প্রশ্ন হতে পারে, দুনিয়ার সর্বত্রই যখন সংস্কারের প্রয়োজন তখন কোন্ দেশ বা কোন্ অঞ্চলটিকে সংস্কার অভিযানের কেন্দ্ররূপে নির্বাচন করা হবে?
ভৌগোলিক কারণ
বিশ্বের প্রাচীন মানচিত্রের উপর চোখ বুলালে দেখা যাবে যে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এতদ্সংশ্লিষ্ট ভূভাগের মধ্যে আরব উপদ্বীপই ছিল সবদিক দিয়ে কেন্দ্রস্থল হবার যোগ্য। কেননা এটা এশিয়া মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও আফ্রিকা এবং ইউরোপের অত্যন্ত নিকটবর্তী। বিশেষ করে ঐ দুই মহাদেশের তৎকালীন সুসভ্য অঞ্চল গ্রীক, মিসর এবং রোম আরবের কেন্দ্রভূমি মক্কাকে ‘ভূমণ্ডলের নাভি’ আখ্যা দিয়ে পরোক্ষভাবে আরব ভূখণ্ডকেই বিশ্বের কেন্দ্রভূমি হিসাবে মেনে নিয়েছিল।
কোন কেন্দ্র থেকে তার প্রত্যেকটি প্রান্তিক অঞ্চল নিকটতর হয়ে থাকে। ফলে সেখান থেকে সর্বত্র পৌঁছনো যায় অতি সহজে। আবহাওয়া মানুষের স্বভাব এবং চরিত্রের উপর যে প্রভাব বিস্তার করে থাকে তা আজ সর্ববাদীসম্মত। প্রকৃতিগতভাবে শীত প্রধান দেশের অধিবাসীরা প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন, পাহাড় ও মরু অঞ্চলের অধিবাসীরা অধিক পরিশ্রমী এবং উর্বর অঞ্চলের অধিবাসীরা উন্নত সভ্যতা-সংস্কৃতির অধিকারী হয়ে থাকে। হিজায একটি অত্যন্ত সীমিত ভূভাগ, অথচ তার মধ্যে রয়েছে মক্কার মত তরুলতাহীন মরুঅঞ্চল, তায়েফের মত সবুজ শ্যামল প্রান্তর এবং মদীনার মত উর্বরা ভূখণ্ড। এছাড়াও আরো অনেক কারণে হিজায ছিল বিশ্বের মধ্যে তুলনাহীন। আর একটি বিস্ময়কর ব্যাপার এই ছিল যে, এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার সাথে স্বভাবগত সামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্মকালে আরব ঐ তিন মহাদেশের রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কনস্টান্টিনোপলের রোমানরা উত্তর আরব, ইরানীরা পূর্ব আরব এবং আবিসিনীয়রা দক্ষিণ-পশ্চিম আরব দখল করে রেখেছিল। আর আরব ছিল ঐ তিন শক্তি তথা তিন মহাদেশের সঙ্গমস্থল এবং তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রভূমি।
সাংস্কৃতিক কারণ
বিশ্ব ইতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, চরম অবনতি এবং বর্বরতার পরই একটি জাতি দ্রুতবেগে ধাবিত হয় উন্নতির দিকে এবং তাদের হাতেই গড়ে উঠে নতুন সভ্যতা-সংস্কৃতির ভিত্তিমূল। আর যখন কোন জাতি উন্নত ও ঐশ্বর্যশালী হয়ে উঠে তখন তাদের মধ্যে অনাচার দেখা দেয় এবং ক্রমে ক্রমে তাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, তারা নিজেরা আর নিজেদের শোধরাতে পারে না। ফলে বিশ্ব থেকে তাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লোপ পায়। প্রধানতঃ অসভ্য এবং যাযাবরেরা নিজেদের নিঃস্বতা সত্ত্বেও দুনিয়ার সভ্য জাতিগুলোকে পদানত করেছে। জার্মানরা রোমান সাম্রাজ্যকে এবং তুর্কমানরা যে চীনাদের পর্যুদস্ত করেছে তা কে না জানে। অতএব রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের সভ্য দুনিয়াকেও যে আরবের বেদুইনদের মাধ্যমে শায়েস্তা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল তাতে বিচিত্র কি?
কোন দেশে যখন পুরাপুরি সভ্য ও শহরে জীবন গড়ে উঠে তখন তাতে প্রাণ- সঞ্চারক নতুন চারা উদ্ভুত করার আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু মাঠ- প্রান্তর-বিচরণকারী যাযাবরদের আশেপাশে কোথাও যখন শহুরে জীবনের সূচনা হয় তখন সে এলাকা নিজের দিকে যাযাবরদের আকৃষ্ট করে তড়িৎগতিতে দিগন্ত প্রসারী সভ্যতা-সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। একথাটি আরবদের ক্ষেত্রে বিশেষ- ভাবে প্রযোজ্য।
বিশ্বের তিনটি অঞ্চলে জনসংখ্যার অতিবর্ধন লক্ষ্য করা গেছে। আর সে তিনটি অঞ্চল হলো, গোবি মরুঅঞ্চল, জার্মানী এবং আরব। হাজার হাজার বছর ধরে এই সমস্ত অঞ্চল থেকে দেশত্যাগী জনতরঙ্গ উত্থিত হয়ে আশেপাশের অঞ্চলসমূহে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কেননা এদের মধ্যে জনবসতি উন্নয়নের শক্তি ছিল প্রচুর, কিন্তু জনতার খাদ্য-উপাদানের অভাব ছিল প্রকট। আরব যেহেতু দুনিয়ার কেন্দ্রভূমি, তাই উপরিউক্ত কথাটি আরবদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
আরবে বিশেষ করে হিজাযে তখন পর্যন্ত কোন নবীর আগমন হয়নি। তাই সেখানকার অধিবাসীরাও নিজেদের মননশক্তিকে কোন কাজে নিঃশেষ করে বসেনি। তারা তখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ কর্মস্পৃহার অধিকারী ছিল। নেপোলিয়নের মতে, দেশব্যাপী হাজার হাজার বছর ধরে গৃহযুদ্ধ, অশান্তি এবং বিশৃঙ্খলা বিরাজমান থাকার কারণে কঠোর পরিশ্রম, আত্মোৎসর্গ, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, সারল্য এবং এ ধরনের অন্যান্য উন্নত গুণাবলী দ্বারা-যা একটি উন্নয়নশীল জাতির জন্য অতীব প্রয়োজনীয়-আরবরা পরিপূর্ণভাবে ভূষিত ছিল। অন্যান্য আরো অনেক কারণে-প্রতিশ্রুতি রক্ষা, আত্মসম্মানবোধ প্রভৃতি গুণও ছিল তাদের মধ্যে অত্যন্ত সুদৃঢ়। যাযাবর জীবন যাপন এবং মুক্ত প্রান্তরে বসবাস করার কারণে তাদের দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় ক্ষমতাও ছিল শহরেদের অনুপাতে অস্বাভাবিক ধরনের তীব্র। হাতে গোনা যায়-এমন পনেরো বিশ জন লোকের কথা বাদ দিলে তাদের মধ্যে লেখাপড়ার কোন প্রচলন ছিল না বললেই চলে। তাই তাদের স্মরণশক্তিও ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। মরু অঞ্চলে বসবাসের দরুন তাদের পানাহার ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে ধরনের। তাই বহু বছরেও তাদের মধ্যে কেউ রোগাক্রান্ত হত না।
কৃষিজীবীরা থাকে তাদের জন্মভূমি তথা কৃষিক্ষেতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা অভিযানপ্রিয়তা, যেকোন মুহূর্তে দূর-দূরান্তে গমনের স্পৃহা এবং এ ধরনের অন্যান্য উদ্যোগকেন্দ্রিক গুণের অধিকারী হয় না। শিল্প এবং কারিগরির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের জন্যও তাদের জন্মভূমি যথেষ্ট। তাই তারাও বিদেশ গমনের কথা চিন্তা করে না। শুধুমাত্র বাণিজ্যের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাই বিদেশ গমনে অনুপ্রাণিত হয়। প্রকৃতপক্ষে তাদের পরিবেশই তাদেরকে বিদেশ গমনে বাধ্য করে এবং তারা প্রকৃতিগতভাবে এর উপর অভ্যস্ত হয়ে উঠে। কুরআনের ভাষায়, মক্কাবাসীদের বসতি হচ্ছে একটি 'ক্ষেতহীন' উপত্যকা। এখানে শুধু কৃষি নয়, বরং শিল্প এবং কারিগরিরও কোন সুবিধা নেই। খাদ্য, পরিচ্ছদ সবকিছুই বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। অতএব এমন একটি অঞ্চলের অধিবাসীরা বিদেশ গমনের জন্য সদাপ্রস্তুত থাকবে তাতে বিচিত্র কি।
রাজ্যজয়, রাজ্য বিস্তার এবং শাসন ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে গতিশীলতার (mobility) গুরুত্ব অনস্বীকার্য। যে যুগে একমাত্র সমুদ্রযান ছাড়া কোন যান্ত্রিক পরিবহন ছিল না, যে যুগে বিদ্যুৎ এবং বাষ্পের উপর মানুষ তাদের কর্তৃত্ব খাটাতে পারত না তখন অশ্বই ছিল সবচাইতে দ্রুতগামী পরিবহন। আর উট ছিল একটি অতি উপকারী পণ্যবাহী জন্তু। কেননা শ্রমের ক্ষেত্রে ধৈর্য-সহিষ্ণুতা, পানাহারের ক্ষেত্রে সারল্য ও অত্যল্পতা, ভার বহনের ক্ষেত্রে অসাধারণ ক্ষমতা-সর্বোপরি তার দুধ মাংস প্রভৃতির খাদ্যোপযোগিতা উটকে মানুষের পরম উপকারী সাথীতে পরিণত করেছে। অশ্ব এবং উটের ক্ষেত্রে আরবদের বৈশিষ্ট্যের কথা কাউকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। হাজার হাজার সৈন্য সম্বলিত আরববাহিনী যেরূপ লম্বা পদক্ষেপে এবং তড়িৎ গতিতে মাঠ-প্রান্তর পাড়ি দিয়ে শত্রুসৈন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত তা ইতিহাস-পাঠক মাত্রেরই জানা আছে। আর উট ছিল তাদের ঐ ক্ষিপ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ এবং এই বিশেষ কারণেই যুদ্ধবিশারদরা প্রাচীন আরবদের উপর ছিল দারুণভাবে ইর্ষান্বিত।
চীন এবং ভারতবর্ষের বাণিজ্য-কাফেলা আরব পাড়ি দিয়ে তবে ইউরোপে যেত। আরব বাণিজ্যের উপর কুরায়শদের প্রাধ্যান্য-মিসর, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইয়ামেন, আম্মান, আবিসিনিয়া, ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশের সাথে তাদের চুক্তি সম্পাদন এবং শীত ও গ্রীষ্মকালের বাণিজ্য যাত্রার (রিহলাতাশ্ শিতায়ী ওয়াস্ সাইফ) কারণে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সাথে তাদের সংযোগ রক্ষার কথা সবারই জানা। তাছাড়া অন্যান্য জাতির মন-মেজাজ অনুধাবন, অন্যান্য দেশের রাস্তাঘাট ও অন্যান্য বিষয়ের উপর অবগতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্বের বহু কম লোকই তখন আরবদের সমকক্ষ ছিল।
প্রশাসনিক দক্ষতা
আরবের মক্কা, তায়েফ, অতঃপর মদীনায় কমবেশী যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ছিল, সৌভাগ্যবশতঃ তা ছিল সামাজিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্বকে অবলম্বন করে সেখানে বর্ণবৈষম্যের কোন অটুট বন্ধন গড়ে উঠেনি। ঐ সমস্ত অঞ্চলের সব লোকই ছিল স্বাধীন এবং সমমর্যাদার অধিকারী। শুধুমাত্র জ্ঞানবুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই কাউকে না কাউকে নেতা নির্বাচিত করা হতো। উপরিউক্ত পরিবেশে অভ্যস্ত হওয়ার দরুন যখন আরবরা বিশ্বকে শাসন করার সুযোগ পেল তখন তাদের কাছ থেকেই মানব সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার আশা করা যেত এবং এও আশা করা যেত যে, একমাত্র তারাই বর্ণ, ভাষা এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যকে দূর করতে পারবে। অপরদিকে ব্রাহ্মণ্য মতবাদ, ইরানী মতবাদ ও রোমান মতবাদের মধ্যে যেভাবে শ্রেণীবৈষম্য বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল তাতে ঐসব মতবাদের অনুসারীদের কাছ থেকে সামাজিক সাম্য আশা করা ছিল দুরাশারই শামিল।
ভাষাগত কারণ
আরবী ভাষাও (আরব থেকে নবী নির্বাচনের) একটি কারণ হয়ে থাকবে। কেননা এর মধ্যে ভাব প্রকাশ, সহজবোধ্যতা, শব্দ ঝংকার এবং এতদসংশ্লিষ্ট গুণাবলী, তখনকার পাহলভী, গ্রীক, সংস্কৃত, ল্যাটিন, চীনা এবং অন্যান্য উন্নত ভাষার চাইতে অপেক্ষাকৃত উন্নত ছিল।
ব্যক্তিগত কারণ
কয়েকটি উপকূলীয় অথবা সীমান্তবর্তী অঞ্চল ব্যতীত আরবে এ যাবত কোন বহিঃশক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং সে স্বীয় স্বাধীনতা বজায় রাখার সাথে সাথে চিরদিন বাইরে আশ্রয় গ্রহণকারীদেরও আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছিল। বস্তুতঃপক্ষে বিশ্বকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য পরাধীন মনোবৃত্তির অধিকারী কোন জাতির স্থলে এই জাতিকেই অন্যান্যের উপর শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করা হয় যারা গতানুগতিক স্বাধীনতার চাইতে অধিক স্বাধীনতা কামনা করে।
রসূলুল্লাহ (সা)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে মক্কার অবস্থা
رحلة الشتاء والصيف ভূমণ্ডলের মধ্যস্থলে এবং প্রাচীন বিশ্বের পাশাপাশি তিনটি মহাদেশের কেন্দ্রস্থলেই মক্কানগরীর অবস্থান। অতএব বিশ্বব্যাপী কোন আন্দোলন পরিচালনার পক্ষে এর চেয়ে উত্তম কোন স্থান হতে পারে না। আক্রমণকারীদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে গোপন করে রাখার উদ্দেশ্যেই যেন উষর মরু প্রান্তরে ছিল এর অবস্থান। শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক অভিযানের মাধ্যমে প্রচুর ধন-সম্পদ এসে জমা হতো এখানে। যে মরু প্রান্তরে মহানগরী মক্কা অবস্থিত, সামান্য ভূভাগ ব্যতীত তার চারিদিক অটুট দুর্গের মত দুর্গম ও দুর্জেয় উচ্চ পর্বত শ্রেণী দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রতিরক্ষার জন্যে এর চাইতে উত্তম ব্যবস্থা আর কি হতে পারে? উষর মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তী 'সুজলা সুফলা' তায়েফ নগরীর মিশ্রিত আবহাওয়া এখানকার অধিবাসীদের প্রকৃতিতে এমন সব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর সৃষ্টি করেছিল যার সমাহার অন্যত্র খুব কমই পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে রোমীয়, ইরানীয় ও হাবসী সম্রাটদের দুর্বার আক্রমণের মুখেও আরবরা তাদের ক্ষুদ্র নগর-রাষ্ট্রকে স্বাধীন ও সার্বভৌম হিসেবেই টিকিয়ে রেখেছিল; ফলে কখনো সেখানে বিদেশীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় নি।
মক্কার রাজনৈতিক অবস্থা
মক্কা ছিল স্বায়ত্তশাসিত নগর-রাষ্ট্র। এর আবাসিক এলাকার বিস্তৃতি কয়েক বর্গমাইলের অধিক ছিল না। তবে পার্শ্ববর্তী যেসব অঞ্চলে এর প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল এবং যে স্থানকে মক্কাবাসীরা 'হরম' হিসেবে অভিহিত করত তা প্রায় সোয়া শ' বর্গমাইলের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। এখানে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন গোত্রের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সৃষ্টিকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবের সময় এখানকার নেতৃত্ব কুরায়শ গোত্রের হাতেই ন্যস্ত ছিল। তবে এখানে কখনো কোন ব্যক্তি-শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহের পিতামহ কুসাই অনেকটা বাদশাহের মর্যাদা লাভ করেছিলেন, কিন্তু মৃত্যুকালে তিনি তাঁর সামাজিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতা স্বীয় পুত্রদের মধ্যে বন্টন করে দিলে পর পুনরায় তা কোন একক ব্যক্তির হাতে আর ফিরে আসেনি, ফলে বহু ব্যক্তির শাসনই এখানে চলতে থাকে। 'ইবনে আবদে রাব্বিহি'র মতানুসারে মক্কানগরীতে দশটি গোত্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই দশটি গোত্রের প্রধানগণ প্রত্যেকেই যেন ছিলেন এক একজন মন্ত্রী। তাঁদের মধ্যে বাদশাহ্ কেউই ছিলেন না। খানায়ে কা'বার সংসদীয় বিভাগের দায়িত্ব একজনের উপর ন্যস্ত ছিল, তো অপর জনের উপর ন্যস্ত ছিল এর উপাসনা বিভাগের দায়িত্ব। একজন জাতীয় পতাকাবাহী ও সেনাপতি হিসেবে কাজ করতেন, তো অন্যজন 'যেমান' বা ক্ষতিপূরণের অর্থ নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করতেন।
একজন পররাষ্ট্র দফতরের কাজ করতেন এবং প্রয়োজনবোধে নিজেই রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিদেশে চলে যেতেন। এভাবে কর আদায় ও ব্যয় নির্বাহের দায়িত্বও হয়ত এক একজনের উপর ন্যস্ত ছিল। এই ছিল তখনকার মক্কার শাসনব্যবস্থা। এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলার অবকাশ এখানে নেই। মোটামুটিভাবে বলতে গেলে, বুদ্ধিমান কুরায়শরা এমন একটি বিশেষ ও উন্নতমানের রাষ্ট্রীয় সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, যাতে সংযোজিত হয়েছিল প্রত্যেকটি মৌলিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়। ভাবীকালে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকারীদের মধ্যে এসব গুণ থাকার প্রয়োজনও ছিল।
মক্কাবাসীরা ক্রীতদাস ও ভৃত্যদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত সেনাবাহিনী, যা গোত্রীয় যুদ্ধ-বিগ্রহে অংশগ্রহণ করত এবং নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে বিদেশে গমনাগমন করত। বিচার ব্যবস্থার ব্যাপারে যতটুকু জানা যায় তা হলো, গোত্র-প্রধানরা সাধারণতঃ বিচারকের কাজ করতেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে খানায়ে কা'বায় লটারীর ব্যবস্থা করা হতো এবং কোন কোন সময় লটারীর মাধ্যমে সালিসও নিয়োগ করা হতো। এসব ছাড়াও ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সেখানে একটি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা গঠন করা হয়েছিল। 'হালফুল ফুযুল' নামক এই সংস্থার সদস্যরা পরস্পর অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল যে, নগরীর অভ্যন্তরে স্থানীয় অথবা বিদেশী কারো উপর কাউকে জুলুম করতে দেওয়া হবে না এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তারা অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাবে, যতক্ষণ না অত্যাচারী অত্যাচার থেকে বিরত হয়।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মক্কাবাসীরা আশেপাশের গোত্রসমূহের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। এ ব্যবস্থা সামরিক কারণে যেমন ছিল গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনৈতিক কারণেও তেমনি ছিল অর্থবহ। এটা বাণিজ্যিক কাফেলাসমূহকে নিরপদে গমনাগমনের পথ করে দিত। মক্কাবাসীদের ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তখন এত বেড়ে গিয়েছিল যে, দূর-দূরান্ত তথা মদীনা ও অন্যান্য অঞ্চলের গোত্রসমূহ তাদের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করত।
মক্কায় হাজার হাজার লোকের বসবাস থাকলেও কুরায়শ গোত্রসমূহের নেতৃত্বই ছিল এখানে প্রতিষ্ঠিত। ঐ গোত্রসমূহের মধ্যে দশটি গোত্রই ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। পরবর্তী আলোচনার সুবিধার্থে এখানে শুধু কুরায়শ নেতাদের নাম উল্লেখ করে একটি সংক্ষিপ্ত বংশ-তালিকা দেওয়া হলো।
কুরায়শদের হাতে মক্কার শাসনভার অর্পিত হওয়ার পর তাদের নেতাদের মধ্যে একমাত্র কুসাই-ই ছিলেন উন্নতমানের নেতৃত্বের অধিকারী। তাঁর মৃত্যুর পর প্রশাসন ক্ষমতা তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টিত হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও পরস্পর দ্বন্দ্ব-কলহের সৃষ্টি হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে আবদে মনাফ বংশের বনী হাশিম ও বনী উমাইয়া গোত্রদ্বয়ের মধ্যে প্রতিহিংসা বিরাজমান ছিল। আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর আবু তালিবের দৈন্যদশা ইত্যাদি বনী উমাইয়ার বাহুকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। আবু সুফিয়ানের মত জন্মগত নেতা ও উসমান গণীর মত বাণিজ্য-বিশেষজ্ঞ ছিলেন এই গোত্রেরই লোক। রসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে যদিও হাশিমী বংশোদ্ভূত ছিলেন কিন্তু একদিকে যেমন তিনি আবদুল মুত্তালিবের জ্যেষ্ঠ পুত্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন না, ঠিক তেমনি অন্য কোন প্রচলিত প্রথানুযায়ীও তিনি গোত্রের নেতৃত্ব লাভের অধিকারী ছিলেন না, বরং তিনি ইয়াতীম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং পিতৃব্য কর্তৃক লালিত-পালিত হয়েছিলেন।
এটা নবীকে ছোট করার জন্য নয়, বরং প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা যায় যে, রসূলুল্লাহ (সা) একটি অপেক্ষাকৃত ছোট পরিবারের কনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে নবী হিসেবে গ্রহণ করা বনী উমাইয়া কেন, বনী হাশিমের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হতো। অত্যাচারী পিতৃব্য আবু লাহাবই নয়, পরম হিতৈষী ও পৃষ্ঠপোষক পিতৃব্য আবু তালিবের নিকটও আজীবন নিজের চেয়ে কনিষ্ঠ ব্যক্তির মান-মর্যাদা স্বীকার করে নেওয়া আত্মসম্মানের পরিপন্থী ছিল।
কুরায়শদের অন্যান্য গোত্রেও বিরাট বিরাট ব্যক্তিত্বশালী লোক ছিলেন। মাখযুম গোত্রের আল-ওয়ালিদ বিন আল-মুগীরাহ ও তাঁর পুত্র খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র আবু জেহেল, জাহেলী যুগে এমন সব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যার উল্লেখ না করে উপায় নেই। তাবারীর বর্ণনানুসারে রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন নূবুওতের দাবি করলেন, তখন কুরায়শরা বলে উঠলোঃ 'কুরায়শ-কুসুম' ওয়ালিদই এ কাজের জন্য অধিকতর উপযুক্ত।
খালিদ যদিও অল্পবয়স্ক ছিলেন, কিন্তু তার সম্পর্কে হযরত উমরের মন্তব্য ছিল, "খালিদের মত সন্তান পুনরায় জন্ম দিতে রমণীগণ অক্ষম।” ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও উপস্থিত যেকোন কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী হওয়ার কারণে জাহেলী যুগে আবু জেহেলকে 'আবুল হাকাম' নামে অভিহিত করা হতো। দারুন নাদওয়া-যেখানে চল্লিশ বছরের কম বয়স্ক কোন লোক সদস্য হতে পারত না, সেখানে বিশেষ বিবেচনাধীনে ত্রিশ বছর বয়সেই আবু জেহেলকে সদস্য করা হয়েছিল। অহংকার তার মনের মধ্যে শিকড় গেড়ে বসেছিল। তবে তার জনসেবা ও দানশীলতার কথা ছিল সর্বজনবিদিত। এ সম্পর্কে 'মুনতাকিম' প্রভৃতি গ্রন্থে ইবনে হাবীব অনেক কাহিনী বর্ণনা করেছেন।
তখনকার আরবের সামাজিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও দ্বন্দ্ব-কলহের অবস্থা জানা না থাকলে ইসলাম-বিরোধী কুরায়শ নেতাদের ব্যক্তিগত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা সম্ভব নয়।
শিক্ষা ব্যবস্থা
মক্কায় লেখাপড়ার চর্চা মোটেই ছিল না। শুধুমাত্র দশ-বার জন লোকই লেখাপড়া জানতো। তবে কাব্য, ভাষাশৈলী ও বাগ্মিতার চর্চা ছিল সর্বত্র। আরবী ভাষা শেখার জন্য তারা তাদের শিশু সন্তানদের নিজ গৃহে শিক্ষা- দানের পরিবর্তে বেদুইন পরিবারে পাঠিয়ে দিত। পবিত্র কা'বাগৃহ ছিল মক্কারই জাতীয় উপাসনালয়। সরচিত কবিতা এখানে ঝুলিয়ে রাখা হত এবং তা 'মুআ'ল্লাকাতের' (ঝুলানো কবিতা) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে সবিশেষ মর্যাদা লাভ করত। 'ওকাজ'-এর বার্ষিক আন্তঃআরব সাহিত্য সম্মেলন ছিল কুরায়শ দেরই পৃষ্ঠপোষকতার ফলশ্রুতি। কা'বায় হজ্জ পালন, আরবের ভাষাসমূহের মধ্যে ঐক্য স্থাপনে এবং কুরায়শী অঞ্চলের ভাষাকে মান-নির্ধারক ভাষায় পরিণত করার ক্ষেত্রে নীরব অথচ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিল। এটা কুরায়শদের সাহিত্য চর্চারই ফলশ্রুতি যে, তাদের জন্য হযরত মূসা (আ)-এর শুভ্রহস্তের মু'জিযা কিংবা হযরত ঈসা (আ)-এর ফুঁক দিয়ে জীবনদানের মত অলৌকিক বস্তুর প্রয়োজন ছিল না, বরং এমন একটি উন্নত সাহিত্যিক অবদানের প্রয়োজন ছিল, যা শুনে তারা ভাবের নেশায় ঝিমাতে শুরু করে এবং নিজেদের নজীরবিহীন বিরোধিতা সত্ত্বেও এর তিলাওয়াত শোনার জন্য চুপে চুপে তিলাওয়াতকারীর পিছনে ছুটে।
সাহিত্য-সাধনার প্রতি আরবদের অনুরূপ আসক্তি থাকলেও লেখাপড়ার ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ছিল যেন তাদের বংশ-পরস্পরাগত বৈশিষ্ট্য। তবে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে, বিশেষ করে ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ, ঋণ গ্রহীতাদের নামধাম ও পরিমাণ-পরিমাপ স্মরণ রাখার কারণে বাধ্যতামূলকভাবে তারা তাদের স্মৃতিশক্তিকে এমনি অসাধারণভাবে উজ্জীবিত করে তুলেছিল, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে সত্যি বিরল। এসব কারণেই কুরআনের আয়াতসমূহ এবং সুদীর্ঘ হাদীসসমূহ তারা অবলীলাক্রমেই তাদের স্মৃতিতে হুবহু গেঁথে রাখতে সমর্থ ছিল।
অর্থনৈতিক অবস্থা
ঊষর মরু প্রান্তরের বাসিন্দাদের জীবিকা নির্বাহের জন্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না। শিল্প-কারখানার জন্যে যেসব কাঁচামালের প্রয়োজন ছিল তা তাদের মোটেই ছিল না। এ কারণে তারা তাদের যোগ্যতাকে অত্যন্ত একাগ্রচিত্তে ব্যবসা-বাণিজ্যেই কেন্দ্রীভূত করে নিয়েছিল। তখনকার সমাজব্যবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ঐ পেশা গ্রহণের ফলাফল ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদসংকুল।
আরব ছিল একটি বিরাট মরু অঞ্চল। তাই এ অঞ্চলের প্রতি বহির্বিশ্বের লোকেরা বলতে গেলে, ভ্রুক্ষেপই করত না বরং আরবরাই ছড়িয়ে পড়তো পৃথিবীর দিকদিগন্তে নিজেদের গরজে তথা জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। ভারতবর্ষের মত বিশাল উপমহাদেশের সমগ্র আভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত কুরায়শরাই। তারাই হয়ে উঠেছিল প্রধানত এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের হর্তাকর্তা।
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহ আমর ইবনে আবদে মনাফ (যিনি জনসেবার কারণে 'হাশিম' উপাধি লাভ করেছিলেন) এমন সুদক্ষ ও বিচক্ষণ ব্যবসায়ী ছিলেন যে, রোমের কায়সার, ইরানের কিস্সা, আবিসিনিয়ার নাজ্জাশী ও ইয়ামনের আকইয়ালের নিকট থেকে, তাদের দেশে পণ্যসামগ্রী নিয়ে গমনাগমনের 'অবাধ অনুমতি' ( ইলাফ ) লাভ করেন। মক্কা হতে ইরাক ও ওমান (যেখান থেকে সমুদ্রপথে বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও হিন্দুস্তানের সাথে যোগাযোগ করা যেত), ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, মিসর, আবিসিনিয়া (হাবশা), ইয়ামন তথা হাজার হাজার মাইল দূরবর্তী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রান্তে প্রান্তে رحلة الشتاء والصيف তথা শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যাভিযান পরিচালিত হত। এই বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধেও অনুরূপ বাণিজ্যের কল্পনা অনেকটা লোমহর্ষক ব্যাপার বলেই মনে হয়। কিন্তু কুরায়শ বণিকরা সেই প্রাচীন যুগেও এ ধরনের বাণিজ্যাভিযান সাফল্যজনকভাবে পরিচালনা করত। রাস্তার দূরত্ব অতিক্রম, ক্ষুধাতৃষ্ণা ও উপবাসের সাথে লড়াই ছাড়াও তাদেরকে পথে অভাবগ্রস্ত অথচ দুর্ধর্ষ গোত্রসমূহের সাথে বরাবরই মুকাবিলায় নামতে হত। এসব কারণে তারা বিভিন্ন দেশ ও গোত্রের সাথে শক্তিশালী 'মৈত্রী চুক্তি' সম্পাদন ও নিজেদের লোক নিয়ে রক্ষীবাহিনী গঠনের ব্যবস্থা করেছিল। আরবের যেকোন বণিককে পণ্যসামগ্রী নিয়ে হিজায, নজদ ইত্যাদি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকরী মিসরীয় গোত্রসমূহকে অতিক্রম করার সময় কুরায়শী রক্ষীবাহিনীর ছত্রছায়া গ্রহণ করতে হত। 'ত্বাই' ও 'কলব' গোত্রদ্বয়ের সাথে কুরায়শদের মৈত্রীচুক্তি ছিল। উত্তর আরবের খায়বর ও দুমাতুল জন্দরের বিশেষ বিশেষ স্থানে ওরা বসবাস করত এবং তাদের অঞ্চল দিয়েই ইরাক, সিরিয়া ও মিসরের পথ অতিক্রম করতে হত। বনী আমর ইবনে মারশদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কারণে রাবীয়া অঞ্চলটিও ছিল কুরায়শদের জন্য নিরাপদ। ফলে বাহরাইন, ওমান তথা সমগ্র পূর্ব আরবের উল্লেখযোগ্য স্থানসমূহে গমনাগমনের সুযোগ তারা লাভ করেছিল। যে কেউ বাণিজ্য ব্যাপদেশে বাহরাইনের মুশকর মেলায় যেতে চাইলে তাকে কুরায়শের রক্ষীবাহিনীকে অবশ্যই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হত। মুহরা ও হাদ্রামাউত-এ দুটি এলাকা দক্ষিণ আরবে অবস্থিত। মুহরা বাজারে যেতে হলে বনী মুখাবির গোত্রের রক্ষীবাহিনী সংগ্রহ করতে হত। হাদ্রামাউতের রাবিয়া হাটে যেতে হলে কুরায়শরা সংগ্রহ করত আকলুল মুরামের রক্ষীবাহিনী এবং অন্যরা সংগ্রহ করত কানদাহের আলে মাসরূকের রক্ষীবাহিনী। কিন্তু কুরায়শদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে আকলুল মুরাম, অন্যান্য গোত্রের উপর অপেক্ষাকৃত অধিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। মোদ্দাকথা, আরবের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্যভাগ তথা সব অঞ্চলই ছিল কুরায়শদের অবাধ বাণিজ্য শিকলে আবদ্ধ। কুরআন করীমে তাদের মেলা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সাফল্যকে বর্ণনা করা হয়েছে উপবাসের স্থলে আহার এবং সন্ত্রাসের স্থলে নিরাপত্তা-এ কয়টি চমৎকার শব্দ দ্বারা (اطعمهم من جوع وامنهم من خوف)
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ কোন না কোনভাবে কুরায়শদেরকে সমগ্র আরবের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দান করেছিলেন। হজ্জের জন্য কা'বায় এবং আরাফাতের ময়দানে আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার লোক এসে ভিড় করত। এটাও ছিল বহির্দেশের সাথে আরবদের যোগাযোগ সৃষ্টির একটি সুবর্ণ সুযোগ। উল্লেখিত কারণেই অন্যান্য দেশে গমনাগমনে তাদের দুশ্চিন্তার কোনই কারণ ছিল না।
ধর্মীয় অবস্থা
মক্কাবাসীরা ছিল প্রতিমা পূজারী, কিন্তু প্রতিমাকে তারা আসল আল্লাহ্ নয় বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম বলেই মনে করত। আসলে তারা আল্লাহকে আসমান যমীনের সৃষ্টিকর্তা এবং একক ও অদ্বিতীয়ই মনে করত। প্রতিমাদের প্রতি তাদের মনোভাব যে অত্যন্ত সহনশীল ছিল তা অবশ্য পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। এজন্য কা'বাগৃহে তাদের স্থানীয় মূর্তি 'হাবলই' কেবলমাত্র স্থান পায়নি, বরং সাফা- মারওয়াসহ কা'বার অভ্যন্তরে ও অঙ্গন-প্রাঙ্গণে সমগ্র গোত্রের ৩৬০টি মূর্তি অধিষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়া কা'বাগৃহের অভ্যন্তরে এসব প্রতিমা ও প্রতিকৃতি ছাড়া শুধুমাত্র হযরত ইবরাহীম (আ)-ই নয় বরং হযরত মারইয়াম (আ) ও হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতিকৃতিও স্থান পেয়েছিল। এতে বোঝা যায়, য়াহুদী ধর্মের প্রতিও আরবদের সম্পর্ক ছিল সহানুভূতিশীল। তাদের একই পরিবারে কেউ ছিল প্রতিমাপূজারী, কেউ ছিল খৃস্টান, কেউ ছিল নাস্তিক, আবার কেউ ধর্ম-নিরপেক্ষ। এসবের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে 'মুআরিফে ইবনে কুতায়বা' ও আরযাকীর 'তারিখে মক্কা' ইত্যাদি গ্রন্থে।
মূর্তিপূজার সাথে সাথে বার্ষিক হজ্জের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিও তারা পালন করত। কা'বাগৃহের তাওয়াফ-ও-আরাফার ময়দানে উপস্থিত হওয়া ছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে তারা যোগ দিত। ধর্মনীতির সাথে যে অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এ তথ্য সকল দেশে ও সকল যুগেই মানুষের বোধগম্য ছিল। হজ্জের মওসুমে অনুষ্ঠিত আন্তঃ আরব মহাবাণিজ্যিক মেলায়ও এর পরিষ্কার প্রমাণ মেলে। কেবলমাত্র হজ্জের মাসই (যিলহজ্জ) নয় বরং হজ্জপূর্বে একমাস এবং হজ্জ-উত্তর একমাস- এই মোট তিনমাস এ মেলা জারী থাকত। এ মাসত্রয়কে 'হারাম মাস' বলা হত এবং এ সময়ে হত্যা ও রক্তপাত সর্বতোভাবে ছিল হারাম বা নিষিদ্ধ। এমন কি হত্যার প্রতিশোধ পর্যন্ত নেওয়া হত না এই সময়কালে। যিলহজ্জের মহামেলায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর মক্কায় আগমন ও মেলাশেষে পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে স্ব স্ব দেশে প্রত্যাগমনের পক্ষে তিন মাসের অধিক সময়ের প্রয়োজনও ছিল না। এ দীর্ঘ নিরাপদ সময়ে যেসব মেলা ও উৎসব উদযাপিত হত, তার সবগুলোরই কেন্দ্রস্থল ছিল মহানগরী মক্কা। সুতরাং মহানগরী মক্কার গুরুত্ব কোন মতেই খাটো করে দেখা চলে না।
চরিত্র ও আচার-আচরণ
ইসলামের আবির্ভাবের ঠিক পূর্ব-মুহূর্তে তখনকার সভ্য জাতিসমূহের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে যেসব বাঞ্ছিত সদ্গুণ বিদ্যমান ছিল, তার সব কয়টিই বিদ্যমান ছিল আরববাসীদের মধ্যে। তারা ছিল একাধারে দানশীল, বীর, অভিযান-প্রিয়, কষ্টসহিষ্ণু এবং দূরদূরান্ত সফরে অভ্যস্ত। সততা ও বিশ্বস্ততা-রূপ গুণাবলীকে তারা অত্যন্ত আপন করে নিয়েছিল। অঙ্গীকার পালনেও ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। মোটকথা তাদের মধ্যে সব গুণই ছিল কিন্তু সবকিছুই যেন এক অজানা পর্দার অন্তরালে। তাদের শক্তি-সামর্থ্য ছিল কিন্তু তা সঠিকভাবে প্রয়োগ না করায় তার তেমন কোন মূল্যই ছিল না। জীবন হরণ ও জীবনদানে তারা কুণ্ঠাবোধ করত না, তবে আদর্শহীনতার ফলে এই মহান গুণাবলী তাদেরকে মহীয়ান করে তোলার চাইতে বরং পশুর কাতারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল। তারা চিন্তাশক্তির অধিকারী ছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে স্থিরতার অভাব ছিল প্রকট। তাদের সামনে এমন কোন জীবনাদর্শ ছিল না, যার মাধ্যমে তারা বিশ্বমানবতার সেবায় সত্যিকার কোন অবদান রাখতে পারে। তাদের বীরত্ব ছিল, কিন্তু তা ছিল গৃহযুদ্ধের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত; ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ ছিল, কিন্তু তা ছিল কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবরস্থ করার ক্ষেত্রে, বদান্যতা ছিল কিন্তু তা ছিল নীতি বহির্ভূত তথা শুধুমাত্র বিত্তবানদের মধ্যে পারস্পরিক আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণের ক্ষেত্রে; তাদের সাহিত্য প্রতিভা ছিল, কিন্তু তা কেন্দ্ৰীভূত ছিল শুধুমাত্র সৌখিন কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে। মোদ্দাকথা, কোন মহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে নয় বরং সাধারণ ও নগণ্য উদ্দেশ্য লাভের জন্যই তারা সর্বদা ব্যস্ত থাকত। তারা যেন খরগোস শিকারের জন্য বাঘের অস্ত্র ব্যবহার করছিল। তারা যেন পশু হিসেবে জন্মলাভ করত এবং আহার-বিহার শেষে পশুর দুনিয়া থেকে বিদায় নিত। তাদের জন্ম বা মৃত্যুতে বিশ্বমানবতার যেন কিছুই যেত আসত না।
কিন্তু আরবদের যোগ্যতার উৎকর্ষ সাধন করে তাদেরকে সুসংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করে তুলে দুনিয়ার বুক থেকে যাবতীয় অন্যায় অবিচার নিশ্চিহ্ন করার এবং একমাত্র আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করার প্রতি। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সবকিছুর প্রভুত্ব খতম করে সারা দুনিয়ায় শান্তি ও স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করাই ছিল ইসলামের উদ্দেশ্য। এ মহৎ উদ্দেশ্য সাধন ও এ গুরুত্বপূর্ণ আঞ্জাম দেওয়ার জন্যে তখনকার দিনে সারা বিশ্বে কুরায়শদের চেয়ে অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য কোন জাতিই ছিল না।
হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে শেষ নবী হিসেবে নির্বাচনের কারণ
মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ যখন যাকে দিয়ে ইচ্ছা, যেকোন কাজ করিয়ে থাকেন। তাঁর ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা নেই—নেই তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো টু শব্দ করারও সাধ্য। অধিকার। তাঁরই নির্দেশিত হচ্ছে বিশ্বজগৎ। এ জগৎ অত্যন্ত বাস্তব, এতে কিছুই অবান্তর বা অহেতুক নেই।
মক্কা ও মক্কাবাসীদের সম্পর্কে উপরে যেসব আলোচনা করা হল তাতে পরিষ্কার বোঝা যায়, বিশ্বব্যাপী কোন আন্দোলন পরিচালনার জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান ছিল আরব এবং আরবের মধ্যে হিজায, আর হিজাযের মধ্যে মহানগরী মক্কা।
মক্কায় কুরায়শদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল সর্বজনস্বীকৃত। তবে বিশেষজ্ঞদের গবেষণালব্ধ অভিমত হলো, নেতৃত্বের ধারা কোন বিশেষ বংশের মধ্যে দীর্ঘদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকলে মাটির উর্বরাশক্তির মত সে নেতৃত্বের যোগ্যতা ও প্রখরতাও ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব নিঃসন্দেহে একজন নেতা ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায়ই রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিতা আবদুল্লাহ পরলোকগমন করেন।
সুতরাং আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর কোলে যে সন্তান জন্ম নেয়, বাস্তবতার নিরিখে সে সন্তানের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লাভের কোনই সম্ভাবনা ছিল না। উপরন্তু আবদুল মুত্তালিবের ইন্তেকালের পর সম্পদ ও বৈষয়িক জ্ঞান ইত্যাদির অভাবে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব কুরায়শদের অন্যান্য শাখায়—বিশেষ করে বনী উমাইয়াদের হাতে চলে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় বনী হাশিম ও বনী মুত্তালিবের নেতৃত্বও আবদুল মুত্তালিবের কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহ লাভ করতে পারেন নি, যার ফলে তাঁর একমাত্র ইয়াতীম সন্তানের পক্ষেও পিতার পক্ষ থেকে উত্তরাধিকারীসূত্রে কোনরূপ নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব লাভের আশা আকাশ-কুসুম কল্পনা ছাড়া কিছু ছিল না। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্মের কয়েক বছর পর আবদুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করলে আবু তালিব বংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সামাজিক নেতৃত্বের যোগ্যতা যতটুকু ছিল, বাণিজ্যিক নেতৃত্বের যোগ্যতা ততটুকু ছিল না। নেতৃত্বকে সম্বল করে বৈষয়িক সম্পদকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয় তা তিনি জানতেন না। আবূ তালিবের সন্তানরাও নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন ছিল না; তাই তারা তাদের পিতার মৃত্যুর পর তাদের নিষ্ঠুর চাচা আবু লাহাবের কাছ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিতে পারেনি।
রসূলুল্লাহ্ (সা) হিজরত করতে বাধ্য হলে দারিদ্র্যের কারণে আকিল বিন আবু তালিব রসূলুল্লাহ্ (সা) তথা বিবি খাদীজার বাড়ীঘর পর্যন্ত বিক্রি করে ফেলুতে কুণ্ঠাবোধ করেন নি। যা হোক, নেতৃত্বের খুন তাদের ধমনীতে প্রবাহিত থাকলেও নেতৃত্ব লাভের সম্ভাবনা তাঁদের যেন অবশিষ্ট ছিল না। এমতাবস্থায় পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে যে ব্যক্তি নেতৃত্ব গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে সে কিছুটা অতুলনীয় গুণাবলীর অধিকারী হয়ে থাকে। অহংকার, শঠতা, আরামপ্রিয়তা, অদূরদর্শিতা ইত্যাদি যেসব নেতৃত্ব-প্রতিকূল দোষত্রুটি আছে তা থেকে সে থাকে মুক্ত। পিতামাতার আদর-যত্ন, সহচরদের তোষামোদ, ব্যক্তিগত ভোগবিলাস ইত্যাদি কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারে না। এ পরিস্থিতিতে একটি কনিষ্ঠ পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানও সারা বংশের আশার আলোতে পরিণত হতে পারে।
উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ অন্যান্য ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকাটা অস্বাভাবিক ছিল না, কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারটা ছিল আরো স্বতন্ত্র আরো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ইয়াতীম হিসেবে জন্মগ্রহণ করার কারণে স্বাভাবিক অহংকার ও স্নেহমমতা থেকেও তিনি বঞ্চিত ছিলেন। গোত্রীয় প্রথার কারণে তাঁকে মায়ের তত্ত্বাবধান ও মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে হয় এবং কয়েক বছর পর্যন্ত অপরিচিতা ধাত্রী হালিমার কোলে ভিন্ন পরিবেশে সম্পূর্ণভাবে একজন বেদুঈনের জীবন যাপন করতে হয়। বিবি হালিমার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল না থাকায় তাঁর পরিবারের সবার পক্ষে মিতব্যয়ী ও স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। যেকোন শিক্ষাগ্রহণের অনুকূল ও উপযুক্ত সময় বাল্যকাল। আর বেদুঈন যাযাবর জীবন পরিবেশের চেয়ে অধিক অনুকূল পরিবেশ আর কি থাকতে পারে যা মানুষকে 'সার' বিশ্বই আমার জন্মভূমি'-এ উদার শিক্ষা দিতে পারে? কোথাও নির্দিষ্ট কোন গৃহ নেই, এমনকি নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ড নেই যেখানে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় পানি ও আশ্রয়স্থল পাওয়া গেল সেখানেই তাঁবু খাটানো হল-আবার যখন প্রতিকূল আবহাওয়া দেখা দিল অর্থাৎ অঞ্চলটি অনুর্বর হয়ে উঠল তখন সেখান থেকে তাঁবু উঠিয়ে আল্লাহর বিশাল পৃথিবীর অন্য যেকোন অনুকূল স্থানের দিকে যাত্রা শুরু হলো-এই ছিল মরুবাসী বেদুঈনের জীবন-ধর্ম।
কয়েক বছর এ ধরনের উন্মুক্ত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠার পর রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন, তার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের মাতা ও পিতামহের স্নেহমমতা থেকেও চিরবঞ্চিত হন। সুতরাং বাধ্য হয়েই তিনি অধিক সন্তানের অধিকারী পিতৃব্য আবূ তালিবের গৃহে আশ্রয় নেন। অতএব এ ধরনের একজন ব্যক্তিত্বের মধ্যে নেতৃত্বের অহমিকা দেখা দেওয়া কল্পনারও অতীত ছিল।
মাতামহের দিক দিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সম্পর্ক ছিল মদীনাবাসীদের সাথে এবং মামাদের দিক দিয়ে ছিল তায়েফবাসীদের সাথে। মক্কা, মদীনা, তায়েফ-এ তিনটি নগর প্রাকৃতিক ও মানবিক উভয় দিক দিয়েই ছিল ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এ তিনটি নগরের সাথে সমপরিমাণ সম্পর্ক রাখার কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিজের সীমিত জন্মভূমির পরিবর্তে অসীম বিশ্ব আবাসভূমির প্রতি স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হতে দেখা গিয়েছিল। বস্তুতঃ একজন বিশ্ব পথ-প্রদর্শকের জন্য এর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
স্বগৃহে প্রত্যাবর্তনের পর রসূলুল্লাহ (সা)-কে বাল্যকালেই পশু চরানোর কাজ করতে হত। নির্বাক ও নিরীহ মেষ-ছাগল রাখালীর মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছিল তাঁর মধ্যে সদাতৎপরতা, দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা, নম্রতা ও কষ্টসহিষ্ণুতার মহৎ গুণাবলী। 'জাতির সেবকই জাতির নেতা'-এ শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি উপরিউক্ত কাজের মাধ্যমেই। এখানেই তিনি লাভ করেছিলেন হিদায়াতের ও নেতৃত্বের সত্যিকার গুণাবলী।
পশু চরানোর কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তাঁকে আত্মনিয়োগ করতে হয় ব্যবসা-বাণিজ্যে। ক্রেতাদের মনোবৃত্তির পরিচয়, সুস্থ মানসিকতার পরিমাপ, সততা, কষ্টসহিষ্ণুতা ইত্যাদি ব্যবসায়ের অপরিহার্য গুণাবলী তিনি এভাবেই লাভ করছিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে রসূলুল্লাহ্ (সা) ছিলেন একজন উত্তম ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করার পর শীঘ্রই তাঁকে ফিলিস্তিন, ইয়ামেন ও ওমানের মত উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের আনাচে-কানাচে সফর করতে হয় এবং রোমীয়, ইরাকী ও হামিরীয় অঞ্চলসমূহে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ তথ্যটি কতটুকু সত্য জানি না, তবে কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে রসূলুল্লাহ (সা) আবিসিনিয়া গমন করেছিলেন এবং সমুদ্র সফরও করেছিলেন। অতএব এ ধরনের দেশ-বিদেশে ভ্রমণকারী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের উপর চল্লিশ বছরের পরিপক্ব বয়সে নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পিত হলে তিনি তা অন্য যেকোন ব্যক্তির চাইতে যে উত্তমতাবে সম্পাদন করতে পারবেন তা বলাই বাহুল্য।
প্রশিক্ষণ মানুষকে সত্যিকার মানুষে পরিণত করে-বিকশিত করে তার মানবীয় প্রতিভাসমূহকে। এখন লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এসব ছাড়া রসূলুল্লাহ (সা)-এর মধ্যে আর কি কি প্রাকৃতিক প্রতিভার সমাবেশ ঘটেছিল?
দুর্বলকে সাহায্য করা, সত্য প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামিতা, সত্য গোপনে পশ্চাৎগামিতা, সারল্য, সদাচার, একনিষ্ঠতা, বদান্যতা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা ইত্যাদি গুণ অর্থাৎ 'অনুপম চরিত্রের' প্রতিটি গুণই প্রকৃতি তাঁকে দান করেছিল অকৃপণ হস্তে। শৈশবকাল থেকেই এসব গুণ তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। উপরে যেসব বিপদাপদ ও প্রতিকূল অবস্থার কথা আলোচনা করা হয়েছে, তা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে এমনভাবে সহনশীল করে তুলেছিল, যার দরুন নবুয়ত লাভের পূর্বেই জনগণ তাঁকে 'আল-আমীন' উপাধিতে ভূষিত করে পরোক্ষভাবে তাঁর নেতৃত্বকেই স্বীকার করে নিয়েছিল। আবু তালিবের নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে:
স্ফটিক বর্ণ সে, তার মুখমণ্ডলের দোহাই দিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করা হয়। সে নিঃস্ব অনাথের শরণ, সে দুঃখিনী বিধবার রক্ষক।
এ কবিতাটি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মানবিক গুণাবলী ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সাক্ষ্য বহন করে। এসব গুণের কোন কোনটি অন্যদের মধ্যেও থাকতে পারে, কিন্তু একই সাথে সব কয়টি অন্য কারো মধ্যেই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বনবী ও শেষ নবীর দায়িত্ব পালনের জন্য যিনি আদিষ্ট হবেন তাঁর মধ্যে এসব গুণের বিদ্যমানতা ছিল অনস্বীকার্য।
রসূলুল্লাহ (সা)-এর আবির্ভাব
পৃথিবীতে কাজের মাধ্যমেই মানুষ উত্তম অথবা অধমে পরিণত হয়। বিশ্ব বিজয়ী আলেকজাণ্ডার ও দার্শনিক প্লেটোর সন্তান-সন্ততির খবর কেউই রাখে না, মহান সিজার ও এরিস্টটলের পিতামাতা কে ছিলেন এ নিয়েও কারো মাথাব্যথা নেই। মানুষ কেবলমাত্র জানতে চায় এঁরা কি করে গিয়েছেন এবং এঁদের কার্যধারা কি ছিল। সুতরাং এটা সন্দেহাতীত সত্য যে, একমাত্র কাজই মানুষকে অপ্রত্যাশিত সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে।
ভবিষ্যতে কে কোন্ মর্যাদার অধিকারী হবেন-এ নিয়ে সমসাময়িক লোকেরা সাধারণত চিন্তা-ভাবনা করে না। এজন্যে অনেক মূল্যবান তথ্য চিরদিনের জন্য সকলের কাছে অজানাই থেকে যায়। হযরত মুহাম্মদ (সা) যে 'রাহমাতুল্লিল 'আলামীন' (বিশ্বের করুণা) হবেন, এটা মূর্খ আরব সমাজের কেউ জানত না। তাঁর নবী জীবনের সূচনা হয়েছিল পূর্ণ চল্লিশ বছর বয়সে। সুতরাং যারা তাঁকে বাল্যাবস্থায় দেখেছিলেন এবং তাঁর সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশিই এ সময়ে পরলোকগমন করে। এছাড়া যারা ছিল সমবয়সী, তারা বাল্যকাল সম্পর্কে কতটুকুই বা স্মৃতিচারণ করতে পারে। অধিকন্তু আমরা এমন এক দেশের ঘটনাবলী লিখতে যাচ্ছি, লেখাপড়ার প্রতি যে দেশের অধিবাসীদের মোটেই অনুরাগ ছিল না। অতএব পারিবারিক ডায়েরী ও বন্ধু-বান্ধবদের রোজনামচার উপর কতটুকু ভরসা করা যায়, তা সহজেই অনুমেয়।
যা হোক, হিজরী-পূর্ব ৫৩ সালের (৫৭০ খ্রীস্টাব্দে, মতান্তরে ৫৭১ খ্রীস্টাব্দে) ঘটনা। বিশ্বনবীর শুভাগমন উপলক্ষে বিশ্বজগৎ আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠে। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়ই তাঁর পিতা এ নশ্বর জগৎ ত্যাগ করে পরলোকে পাড়ি জমান এবং মাতা বিধবা হয়ে শ্বশুরালয়েই অবস্থান করেন। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর সঠিক জন্ম-তারিখ নিয়ে বিরাট মতপার্থক্য রয়েছে, তবে আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য এর কোন গুরুত্ব নেই। সুন্নী মুসলমানরা বারই রবিউল আউয়াল তারিখে 'ঈদে মিলাদুন্নবী' উদযাপন করে থাকেন।
রসূলুল্লাহ্র জন্মকালে সারা বিশ্বের অবস্থা ছিল বিপদসংকুল। মানবতার আর্তনাদ তখন সর্বত্র। আল্লাহ্ তা'আলার করুণা হলো। তিনি একজন 'রাহমাতুল্লিল 'আলামীন' পাঠালেন—যিনি এসে মানুষকে পশুত্ব ও শয়তানের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিলেন এবং কিভাবে প্রকৃত মানুষ ও আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হওয়া যায়; তা হাতে কলমে দেখিয়ে দিলেন।
মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারের। যা আজো বড় বড় পরিবারে প্রচলিত আছে। প্রথা ছিল, তারা তাদের শিশু সন্তানকে বেদুঈন ধাত্রীর নিকট সমর্পণ করত এবং কয়েক বছর জঙ্গলের মুক্ত প্রান্তরে ও স্বাধীন পরিবেশে প্রতিপালিত হওয়ার পর স্বগৃহে নিয়ে আসত। শিশুদেরকে দেখানোর বাহানা করে অতিরিক্ত পুরস্কার লাভের আশায় ধাত্রীরা তাদের পালিত শিশুকে কয়েকমাস পর পর দু'চার দিনের জন্য তাদের আসল মায়ের কাছে নিয়ে আসত।
ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রসূলে করীম (সা)- কেও ধাত্রী মায়ের নিকট সোপর্দ করা হয়েছিল এবং সেখানে তিনি একজন দুধ- ভাইয়ের সাহচর্য লাভ করারও সুযোগ পেয়েছিলেন। ভাগ্যবতী হালিমা ছিলেন একজন ধৈর্যশীলা বেদুঈন রমণী। দরিদ্র ও আশ্রয়হীনা হলেও লোভ-লালসা বিবর্জিত, অল্পে সন্তুষ্ট সর্বংসহা ও স্নেহময়ী রমণী ছিলেন তিনি। শিশু মুহাম্মদ (সা)-এর পিতা জীবিত নেই, জীবিত থাকলে প্রতিপালনের বিনিময়ের অবশ্যই উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাওয়া যেত; পিতামহ যদিও বিত্তশালী ব্যক্তি, কিন্তু যেহেতু তিনি বহু পুত্র ও পুত্রাদির প্রতিপালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত, সুতরাং প্রয়োজনীয় খরচ ছাড়া অধিক পুরস্কার লাভের আশাও এখানে নেই। এতদসত্ত্বেও বিবি হালিমা নবজাত শিশুটিকে লালন-পালনের জন্য গ্রহণ করেছিলেন।
ঐতিহাসিকরা এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা না করলেও আমাদের ধারণা হালিমার পরিবারটি অত্যন্ত দীনহীনভাবেই জীবন যাপন করছিলো। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে তারা তাঁবু স্থানান্তরিত করত। বালকেরা সারাদিন উট ছাগল চরাত এবং তাঁবুর আশেপাশেই সম্মিলিতভাবে খেলাধুলা করত। মহিলারা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করত ও পশমী বস্ত্র বুনত। শুধু খেজুর ও দুধের উপরেই তারা সন্তুষ্ট থাকত, কখনো বা গোস্ত ও তরিতরকারী তাদের ভাগ্যে জুটত। এই ছিল তাদের নিত্যনৈমিত্তিক সহজ সরল জীবন-পদ্ধতি।
জীবনীগ্রন্থসমূহে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাল্যজীবনের মাত্র দু'একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। শিশু মুহাম্মদ (সা) দুধ-মার একটি মাত্র স্তন পান করতেন; দুধমা অন্য স্তনটি দান করলে তিনি তাতে মুখ না লাগিয়ে দুধ ভাইয়ের জন্যই তা রেখে দিতেন। মরু জীবন যাপন কালে কষ্ট সহিষ্ণুতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও বালক মুহাম্মদ (সা) অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন না। যখনই তিনি নগরীতে ফিরে আসতেন তখনই অসুস্থ হয়ে পড়তেন এবং সুস্থ হয়ে পুনরায় মরুভূমিতে চলে যেতে তাঁর দীর্ঘদিন কেটে যেত। এসব কারণে ধাত্রী মায়ের সাথে তাঁর জীবন যাপনের মেয়াদ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘায়িত হয়েছিল।
হযরত মুহাম্মদ (সা) স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করলে শীঘ্রই বিবি আমেনা উম্মে আইমান নাম্নী একজন পরিচারিকা সহ পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে মদীনায় তাঁর পিত্রালয়ে বেড়াতে যান। মদীনার বনী নাজ্জারের আবাসভূমিই ছিল রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাতুলালয়। স্বামীর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যেই বিবি আমেনা এ দীর্ঘপথ সফর করেন এবং সেখানে তিনি কিছুদিন অবস্থান করেন। মক্কা একটি ঊষর মরুপ্রান্তর, যেখানে পানির নাম-গন্ধ নেই, পক্ষান্তরে মদীনা একটি উর্বর ভূখণ্ড যেখানে স্থানে স্থানে বড় বড় জলাশয় বিদ্যমান। রসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় অবস্থানকালেই সাঁতার কাটা শিখেন। সম্ভবতঃ ঐ সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল।
দীর্ঘ একমাস অবস্থানের পর যখন তিনি মায়ের সাথে মক্কার দিকে রওয়ানা হন, তখন পথিমধ্যে 'নাবিগা'র সাথে তাঁর সাক্ষাত হয় এবং তিনি তাঁর তাঁবুতে অবস্থান করেন। নাবিগা আনসার গোত্রের কোন শাখার আত্মীয় ছিলেন, না কোন খ্যাতিমান কবি ছিলেন, সে সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। ইবনে হাবীবের বর্ণনা থেকে জানা যায়, নাবিগা জাহিলিয়া যুগেও মদপান থেকে বিরত থাকতেন। পুণ্যবান নাবিগার এ সদ্গুণের প্রভাব নিশ্চয়ই তাঁর মেহমান মুহাম্মদ (সা)-এর উপর পড়েছিল। তবে ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, মদীনাতেই রসূলুল্লাহ (সা) নাবিগার গৃহে অবস্থান করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, এ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স ছিল প্রায় ৬ বছর। ঐ সময়কার পারিবারিক ক্ষুদ্র পরিসরের কিছু কিছু ঘটনা পরিণত বয়সেও তাঁর স্মৃতিতে জাগরুক ছিল। তিনি বলতেন, তাঁর স্নেহময়ী জননী অধিকাংশ সময়ই শুক্সা গোস্ত খেতেন। কেননা তাজা গোস্ত সবসময় তাঁর ভাগ্যে জুটত না। কুরবানী, হাদিয়া ও অন্যান্য উপলক্ষে প্রাপ্ত গোস্ত তিনি সযত্নে রেখে দিতেন এবং অভাব-অনটনের সময় তা সিদ্ধ করে খেতেন। মিতব্যয়িতা, সহিষ্ণুতা ও অল্পে তুষ্টি ছিল 'তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
মদীনা হতে প্রত্যাবর্তনকালে 'আবওয়া' নামক স্থানে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্নেহময়ী জননী অকস্মাৎ পরলোকগমন করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। একমাত্র ইয়াতীম সন্তানের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই জননীর স্নেহমমতা ছিল অপরিসীম, পক্ষান্তরে জননীর প্রতি ছিল রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সীমাহীন শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। এই অপরিণত বয়সে মাতৃবিয়োগ ছিল তাঁর পক্ষে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। তাই দেখা যায়, পরিণত বয়সে যখনই তিনি আবওয়ার কাছ দিয়ে যাতায়াত করতেন তখনই তাঁর স্নেহময়ী জননীর কবর যিয়ারত করে আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করতেন।
পথের যাবতীয় প্রতিকূল অবস্থার মুকাবিলা করে তিনি যখন মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন তখন এক শ' আট বছর বয়সের বৃদ্ধ পিতামহের গৃহে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া তাঁর গত্যন্তর ছিল না। সবচেয়ে প্রিয় পুত্রের অনাথ ইয়াতীম এবং একমাত্র 'স্মারক' এই পুত্র সন্তানের প্রতি এমনিতেই পিতামহের স্নেমমতা ছিল অপরিসীম; উপরন্তু পৌত্রের সদগুণ, সদাচার ও বুদ্ধিমত্তা তাঁকে তার প্রতি আরো অধিক আকৃষ্ট করে তুলেছিল। শুধুমাত্র পরিবারের অকৃত্রিম পরিবেশই নয় বরং বাইরের গুরুগম্ভীর অনুষ্ঠানাদিতেও তিনি প্রায়ই পিতামহের পাশে থাকতেন। অন্যান্য গোত্র-প্রধানদের বৈঠকসমূহে প্রধান বিচারপতি বা পঞ্চায়েত-প্রধান হিসেবে যখনই পিতামহ যোগদান করতেন এবং তাঁর নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করতেন, তখন স্নেহভাজন পৌত্রও পিতামহের পাশে বসার দাবি করতেন। লোকেরা তাঁকে বৈঠকের কোন এক প্রান্তে বসতে বললে পিতামহ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই পৌত্রকে নিজের পাশেই বসিয়ে দিতেন এবং বলতেন, 'এই ছেলের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ও অন্যান্য অসাধারণ গুণ রয়েছে; সে নিজেকে আত্মমর্যাদাশীল মনে করে। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে সে নিশ্চয়ই একজন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হবে।' বালক মুহাম্মদ (সা)-এর এই আচরণ বৈঠকে যোগদানকারী কারো চোখে অবশ্য আপত্তিকর ঠেকত না।
শিশু পৌত্রকে তিনি যে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাও করতেন, তার প্রমাণ হলো- একবার অনাবৃষ্টির সময়ে তিনি এই পৌত্রেরই সদ্গুণাবলীর দোহাই দিয়ে আল্লাহর নিকট অত্যন্ত কাকুতি-মিনতির সাথে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, পৌত্রকে সাথে না বসিয়ে তিনি কখনো একাকী পানাহার করতেন না। (তাবাকাত-৭৪)
পিতামহের স্নেহক্রোড়ে কোনমতে দু'টি বছর অতিবাহিত হতে না হতেই তিনি তাঁকেও চিরতরে হারান। আট বছর বয়সের মন-মানসিকতায় কঠোর আঘাত হেনে তাঁর জীবনকে একেবারে গোড়া থেকেই মজবুত করে তোলাই ছিল যেন স্রষ্টার উদ্দেশ্য। ইবনে হিশাম প্রমুখ বর্ণনা করেছেন, পিতামহ আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর বালক মুহাম্মদ (সা) কেঁদে কেঁদে তার মৃতদেহের পিছনে পিছনে ছুটে যাচ্ছিলেন। অবশ্য মৃত্যুশয্যায় শায়িত আবদুল মুত্তালিব তাঁর উদার হৃদয় পুত্র আবূ তালিবকে ডেকে এনে তাঁর উপর তাঁর পরলোকগত সহোদর ভ্রাতার একমাত্র 'স্মারক' এই পুত্রের প্রতিপালন ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করে গিয়েছিলেন। বালক মুহাম্মদ (সা)-এর নবনিযুক্ত পৃষ্ঠপোষক আবু তালিব বহু সন্তানের জনক হওয়ার কারণে উদার-হৃদয় হওয়া সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে কিছুটা পাষাণের মত হয়ে গিয়েছিলেন। তবে প্রিয় ভ্রাতার একমাত্র 'স্মারক' পুত্রকে অত্যন্ত স্নেহভরে স্বগৃহে নিয়ে যান-যা ছিল সকলের জন্য যেন কল্পনাতীত ব্যাপার। একজন অযাচিত মেহমানকে যতটুকু কষ্ট স্বীকার করতে হয়, বালক মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর পিতৃব্য গৃহে কিন্তু ততটুকু কষ্ট স্বীকার করার কোন প্রয়োজনই দেখা দেয়নি।
খেটে খাওয়া থেকে রসূলুল্লাহ্ (সা) কখনো পিছপা ছিলেন না। পিতৃব্যের অভাব-অনটন প্রত্যক্ষ করে অলসের মত বসে থাকাকে তিনি মানহানিকর মনে করতেন। কোনরূপ শ্রমের কাজকেই তিনি হেয় মনে করতেন না। তাই মাঝে মধ্যে প্রতিবেশীর ছাগল চরিয়ে নির্দিষ্ট ও স্বল্প পরিমাণ পারিশ্রমিক তিনি লাভ করতেন। পশুপালের রক্ষণাবেক্ষণের মধ্য দিয়েই তিনি লাভ করেছিলেন তাঁর নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ। একবার তিনি বলেছিলেন, "আরাকের সে কুলগুলো তোমরা খাও যেগুলো কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে; কারণ আমরা যখন পশু চরাতে আসতাম তখন ওগুলোই খেতাম।" (ইবনে সা'দ)
মক্কা ছিল একটি বাণিজ্যিক নগরী। এখানে অনেক বিত্তশালী লোক বাস করতেন। তাদের পারিবারিক উৎসবাদি মাঝে মাঝে শহরের মধ্যে আলোড়নের সৃষ্টি করত। এ জাতীয় একটি উৎসবে একদিন গান-বাজনার আয়োজন করা হয়। বালক মুহাম্মদ (সা)-এর অন্তরে তা উপভোগ করার আগ্রহ জন্মে। তিনি তাঁর সহযোগী রাখাল বালককে একদিনের জন্য দু'দল ছাগল একসাথে চরানোর দায়িত্ব দিয়ে গান শোনার জন্য নগরীর দিকে আসেন। সময়টা ছিল সম্ভবত গ্রীষ্মকাল। নগরীতে উপস্থিত হয়ে তিনি জানতে পারলেন, গান শুরু হতে বেশ বিলম্ব হবে, তাই তিনি আসরের বাইরে বৃক্ষছায়ায় বসে প্রতীক্ষা করতে থাকেন। ইত্যবসরে তাঁর চোখের পাতায় নিদ্রা নেমে আসে। যখন তিনি জেগে উঠেন তখন দেখতে পান উৎসব অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। অদৃশ্য শক্তি প্রদত্ত এই শান্তি তাঁর হৃদয়ানুভূতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, আর কখনো কর্তব্য কাজে অবহেলা করবেন না এবং এ জাতীয় নিষ্ফল আমোদ-প্রমোদের প্রতিও ঝুঁকবেন না।
📄 বাল্যকাল
স্বামী আবদুল্লাহর মৃত্যুতে বিবি আমিনা যে হৃদয়বিদারক শোকগাঁথা গেয়েছিলেন, নবডী ও ইবনে সা'দ প্রমুখ লেখক তার কয়েকটি পংক্তির উল্লেখ করেছেন, যা থেকে অনুমান করে নিতে কষ্ট হয় না যে, নবী করীম (সা)-এর পরিবারের শুধু পুরুষরাই নন বরং মহিলারাও অত্যন্ত উন্নত মন-মানসিকতার অধিকারী ছিলেন। মৃত্যুকালে বিবি আমিনা তাঁর একমাত্র পুত্রকে দেখে একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁর পংক্তিগুলির ভাষা বেশ পরবর্তী সময়ের বলে অনেকের ধারণা। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, বিবি আমিনা অতি কষ্টে জীবন যাপন করতেন। তিনি যে শুকনো মাংসের কাবাব খেতেন, তা খোদ নবী করীম (সা)-এর বর্ণনা থেকেই জানা যায়।
শিশু মুহাম্মদ (সা)-এর জন্যে বিবি হালিমা যেসব ঘুমপাড়ানি ছড়া আবৃত্তি করতেন সেগুলো অত্যন্ত শ্রুতিমধুর বলে জানা যায়। এছাড়া রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দুধ-বোন শায়মা যে ঘুমপাড়ানি ছড়া আবৃত্তি করতেন, 'সীরাতে হালবিয়া'য় সে ছড়ার উল্লেখ আছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে বিচার করলে সে ছড়া সাধারণ শিশুদের বেলায় যে আবৃত্তি করা হত তেমনটি মনে হয়না, বরং পরিষ্কার মনে হয় যে, তা কেবল হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জন্যই রচিত হয়েছিল এবং তাঁকে উদ্দেশ্য করেই গীত হত। অজ্ঞ, অল্প বয়স্কা একটি বেদুঈন বালিকা কর্তৃক এ ধরনের উন্নতমানের ঘুমপাড়ানি ছড়া রচনা সত্যি একটি বিস্ময়কর ঘটনা।
বিবি হালিমার বেদুঈন জীবনের অভ্যাস ছিল আশেপাশের মেলাগুলোতে অংশগ্রহণ করা। বাল্যকালে একদা রসূলুল্লাহ (সা) বিবি হালিমার সাথে ওকাজের মেলায় যান। ওকাজের মেলায় জিনিসপত্র বেচাকেনা ছাড়াও কবিতার আসর ও কুস্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। ভবিষ্যতবক্তা জ্যোতির্বিদদের অনেক চেম্বারও সেখানে শোভা পেত। বিবি হালিমা তেমন একজন শিশু-বিশেষজ্ঞ জ্যোতির্বিদের কাছে গিয়ে বসেছিলেন। বলা বাহুল্য, জ্যোতিষী ঐ সময় তাঁর সামনে অনেক আজেবাজে বক্তব্য রেখেছিল।
সাত বছর বয়সে একবার বালক মুহাম্মদ (সা)-এর চক্ষুরোগ দেখা দেয়। মক্কার চিকিৎসায় রোগের উপশম না হওয়ায় কারো না কারো পরামর্শে পিতামহ আবদুল মুত্তালিব তাঁকে ওকাজের মেলায় নিয়ে যান। ওকাজের নিকটেই ছিল একটি য়াহূদী মঠ। ইবনে জওযীর মতে, সেখানকার পাদ্রীই তাঁর চক্ষু চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন।
'আখবারুল হকামা' গ্রন্থে কিফতী উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর চিকিৎসার জন্য একবার সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের মাধ্যমে হারিস বিন কালদাহ নামক জনৈক চিকিৎসককে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তবে এটা কোন্ সময়কার ঘটনা, তা পরিষ্কার জানা যায়নি।
বাল্যকালে হযরত মুহাম্মদ (সা) এত স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন যে, পিতামহ আবদুল মুত্তালিব ও অন্যান্য মুরুব্বী গৃহে কোন কিছু হারিয়ে গেলে তা অনুসন্ধান করে বের করার জন্য তাঁকেই বলতেন এবং তিনি তাতে সফলকামও হতেন। একবার আবদুল মুত্তালিবের কয়েকটি উট হারিয়ে যায়। ভৃত্যরা অনুসন্ধান করে ব্যর্থ হলে পিতামহ তাঁর পৌত্রকে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তাঁর ফিরে আসতে দেরি দেখে বৃদ্ধ আবদুল মুত্তালিব ঘাবড়ে যান এবং নিজেকে এই বলে ধিক্কার দিতে থাকেন যে, সাত-আট বছরের একটি বালককে কি কঠিন কাজেই না তিনি পাঠিয়েছেন; নাজানি পাহাড়ী অঞ্চলে হয়ত সে কোন প্রকার বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। অতঃপর তিনি পবিত্র কা'বা পরিক্রম (তওয়াফ) করেন এবং কেঁদে কেঁদে পৌত্রের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। কিছুক্ষণ পরই হযরত মুহাম্মদ (সা) ফিরে এসে উট প্রাপ্তির সংবাদ জানালে বৃদ্ধ পিতামহ পৌত্রকে আনন্দের আতিশয্যে জড়িয়ে ধরেন। সাথে সাথে প্রতিজ্ঞাও করেন, তিনি আর কখনো তাঁকে এরূপ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠাবেন না।
'কিতাবুল মুহাব্বর' গ্রন্থে ইবনে হাবীব উল্লেখ করেছেন, মক্কার যে সমস্ত লোক মদ্যপান থেকে বিরত থাকতেন, আবদুল মুত্তালিব ছিলেন তাঁদের অন্যতম। কচি বয়সে অনুকরণের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের সময় নবীনরা এ জাতীয় পরিবারে লালিত-পালিত হলে অতি সহজেই অনেক পাপাচার থেকে ভবিষ্যত জীবনে বেঁচে থাকতে পারেন। চাচা, ফুফু প্রমুখের বেহিসেবী ও দুরন্তপনা আচার-আচরণ প্রত্যক্ষ করে ছোট শিশুদের যে বিরূপ প্রশিক্ষণ হয়ে থাকে সৌভাগ্যবশত বালক মুহাম্মদ (সা) ছিলেন সেগুলো থেকে মুক্ত।
বলা হয়ে থাকে, পিতামহ আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর সময় হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর বয়স ছিল আট বছর। অতঃপর আবূ তালিব তাঁকে তাঁর তত্ত্বাবধানে নিয়ে যান। অনুমান করা হয়, নয় বছর বয়সেই আবূ তালিবের সাথে তাঁর প্রথম বিদেশ যাত্রা শুরু হয়। বালক মুহাম্মদ (সা)-এর ঐকান্তিক আগ্রহ ও কাকুতি-মিনতির কারণেই আবূ তালিব তাঁকে শিশু বয়সেই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাছাড়া সফরকালীন সময়ে এই বালক অনেক ছোট খাটো কাজে তাঁকে সাহায্য করতে পারবে মনে করে খুব সম্ভব আবূ তালিব তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে আপত্তি করেন নি।
কথিত আছে, এ সফরে 'বাহীরা' নামক জনৈক পাদ্রীর সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা)- এর সাক্ষাত হয়। আবু তালিব মক্কা থেকে রওয়ানা হয়ে 'বসরায়'। বায়তুল মুকাদ্দাস ও দামেশকের মধ্যবর্তী স্থানে বসরা নগরী অবস্থিত। তখনকার দিনে এটা একটি বড় ব্যবসাকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক বন্দর ছিল) উপস্থিত হন। যেহেতু ঐ অঞ্চলটি বাইজেনটাইনী রোমানন্দের অধীনে ছিল, সেহেতু সেখানকার চতুর খ্রীস্টান পাদ্রীরা সম্ভবত নিজেদের ধর্মমত প্রচারের জন্যই সে অঞ্চলটিকে বেছে নিয়েছিল। তারা নবাগত অখ্রীস্টানদের সাথে সহজেই মিশে গিয়ে তাদের মধ্যে খ্রীস্ট ধর্ম প্রচার করত। তবে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনেও পাদ্রীরা খ্রীস্ট ধর্ম প্রচার করেছিল, তেমন কথা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত, ন'বছরের একজন বালককে ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা দেওয়ার কি কারণই বা থাকতে পারে? দ্বিতীয়ত, এ সময় খ্রীস্টানদের মধ্যে বিরাট মতানৈক্য ও মতবিরোধ বিরাজ করছিল। ধর্মযাজকদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহের কারণে বিদেশীদের কাছে ধর্মমত প্রচার করার মত সময়ই তাদের হাতে ছিল না। পাদ্রী 'বাহীরা' আবূ তালিব ও তাঁর সহযাত্রী বণিক দলকে ভোজসভায় আপ্যায়িত করেছিলেন এবং ভোজশেষে তাঁদের সাথে ঘন্টা দেড়েক সময় অতিবাহিত করেছিলেন। এ অবকাশে খ্রীস্ট ধর্ম প্রচার করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না, বরং এ সময়টুকু তিনি শুধুমাত্র দলনেতা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে প্রয়োজনীয় আলাপ- আলোচনার মধ্যেই অতিবাহিত করেছিলেন। তবে সর্বকনিষ্ঠ অতিথিকে আদর করে, তাঁর বোধগম্য হয়, এমন দু'চারটি কথাবার্তা তাঁর সাথে বলা বাহীরার পক্ষে অসম্ভব কিছু ছিল না। আরবী লেখকদের বর্ণনা কতটুকু সত্য জানি না, তবে তাঁরা লিখেছেন, ধর্মযাজক বাহীরা বিভিন্ন লক্ষণ দেখে মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, তিনি ভবিষ্যতে নবী হবেন। কিন্তু কাসানাভা প্রমুখ খ্রীস্টান লেখক মনে করেন যে, এ সময় সমগ্র খ্রীস্টান জগতে একটা সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে, অবিলম্বে একজন মসীহা বা শেষ নবী আসবেন এবং সেজন্যে তাঁরা সকলে অপেক্ষাও করছিলেন। সম্ভবত বাহীরাও তাঁর আরব মেহমানদের কাছে এ কথার উল্লেখ করেছিলেন। যা হোক, খ্রীস্টানদের বিশ্বাস এই ছিল না যে, শেষ নবীর আগমন হিজাযেই হবে। এমতাবস্থায় বাহীরার সাথে আলাপ-আলোচনা কারণেই হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবী হবার আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল, তেমন কথা ভাবা কোনমতেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।
সিরিয়া হতে প্রত্যাবর্তনের পর দশ-এগার বছর পর্যন্ত রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবন কিভাবে কেটেছিল, আমাদের ঐতিহাসিকরা এ ব্যাপারে নীরব। তবে তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করে ভদ্রজীবন যাপন করেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক পিতৃব্যের ব্যবসায়ে সহযোগিতা করেছিলেন এবং সমাজ জীবনের উন্নয়ন ও দীন-দুঃখীদের দুর্দশা লাঘবের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন বলে অনুমান করা যায়। ইবনে সা'দ উল্লেখ করেছেন, আবু তালিবের গৃহে ছোটদের সামনে যখন নাস্তা পরিবেশন করা হত, তখন তারা সবাই লুটেপুটে তা খেয়ে ফেলত। আবূ তালিব যখন দেখতেন, ইয়াতীম ভ্রাতুষ্পুত্র লুটপাটে অংশ নিচ্ছেন না, তখন তিনি তাঁর জন্যে পৃথক নাস্তার ব্যবস্থা করেন। বাল্যকালে এরূপ সহনশীল মনোভাব গ্রহণের মাধ্যমেই প্রতিভাত হচ্ছিল তাঁর ভবিষ্যত ব্যক্তিত্বের রূপরেখা। বস্তুত তখন থেকেই তিনি এ প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন। 'সীরাতে হালবীয়ায়' এ সম্পর্কিত একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।
একদা আবু তালিব মক্কাবাসীদের একটি প্রতিমা পূজার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্যে ভ্রাতুষ্পুত্রকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে সঙ্গে নিয়ে যান। এ সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ায় আবূ তালিব আর কখনো তাঁকে এরূপ কাজে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করতেন না। 'কিতাবুল আসনাম' গ্রন্থে কলবী যে ঘটনার উল্লেখ করেছেন, তা সম্ভবত এ সময়কার ঘটনারই অংশবিশেষ। তিনি উল্লেখ করেছেন, হযরত মুহাম্মদ (সা) জাহিলী যুগে একটি বাদামী রং-এর ভেড়া কুরবানী করেছিলেন। রসূলে করীমের যৌবনকালের যে কয়টি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় তাতেও অনুমিত হচ্ছিল যে, তিনি ভবিষ্যতে মানব সমাজে উচ্চাসন লাভ করবেন।
মন্তব্য
উপরিবুক্ত 'সীরাতে হালবিয়ায়' জাহিলিয়া যুগের যে ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় রসূলে করীমের পরিচারিকা বিবি উম্মে আয়মনের বর্ণনায়। ঘটনাটি যদিও ওয়াকিদীর বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তথাপি এটা যুক্তিসঙ্গত। এছাড়া ওয়াকিদীর সব কথাই যে মিথ্যা হবে, তেমন কথা কী করে বলা যায়? ঘটনাটি হল, 'বুয়ানা' নামক এক মূর্তির বার্ষিক পূজার উৎসব ছিল। লোকেরা এ পূজাশেষে চুল কেটে ফেলত। হযরত মুহাম্মদ (সা) প্রতি বছরই এ উৎসবে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। একবার আবূ তালিবসহ তাঁর ফুফুরা বিরক্ত হয়ে বললেন, গোষ্ঠীর উৎসবে অংশগ্রহণ না করা এবং জনসমাবেশের জৌলুস বৃদ্ধি না করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। শেষ পর্যন্ত তাঁর ফুফুরা এমনভাবে বেঁকে বসলেন যে, অগত্যা বাধ্য হয়ে তিনি তাঁদের সাথে ঐ উৎসবে যেতে সম্মত হয়ে যান। এ সময় অলৌকিক এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এসব হলো রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাল্যকালের এবং জাহিলিয়া যুগের ঘটনা।
মা কুন্তা তাদরী মাল কিতা-বু ওয়ালাল ঈমা-নু (তুমি জানতে না যে, কিতাব কাকে বলে কিংবা ঈমান কাকে বলে)-আয়াতের মর্মানুযায়ী বলা যায় যে, নবুয়ত লাভের পূর্বে কদাচিৎ এ জাতীয় ঘটনা ঘটে যাওয়াটা অসম্ভব কিছু ছিল না।
📄 যৌবনকাল
ফুজ্জার যুদ্ধ
আরবরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনার খাতে ব্যয় করার জন্য তাদের আয়ের একটা অংশ-অথবা এক-দশমাংশ করদানের নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছিল। মেলা ও উৎসবাদিতে বিক্রয়ের জন্যে যারা পণ্য-সামগ্রী নিয়ে আসত, তার এক-দশমাংশ স্থানীয় নেতারা লাভ করতেন। মেলায় যাতে বিপুল লোক সমাগম ও প্রচুর পরিমাণ পণ্য-সামগ্রী আমদানী হয়, সে ব্যাপারে উৎসাহ প্রদানের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই তারা 'হারাম মাস' সমূহের নীতিমালাও নির্ধারণ করে নিয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোত্রেরও উৎসব অনুষ্ঠিত হত। পরিষ্কার বোঝা যায়, মেলাপূর্ব পনর দিন এবং মেলা-উত্তর পনর দিন-মোট একমাস সময়কে 'হারাম মাস' মনে করা হত এবং এ সময়ে প্রতিশোধ গ্রহণ, সাধারণ হত্যা ও লুটপাট সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল। লোকেরা তাদের পরম শত্রুদের পাশ দিয়েও তখন নিরাপদে আসা-যাওয়া করতে পারত। কয়েকটি গোত্র রজব মাসকে হারাম মাস মনে করত। 'রাবীয়ার' গোত্রসমূহ অন্য মাসকে হারাম মাস মনে করত। মাওলানা মানাযির আহসান গিলানী এ স্থলে 'রমযান' মাসের কথা লিখেছেন। খানায়ে কা'বার হজ্জ ও মিনা'র মেলা উপলক্ষে তিনমাস যথা-যিলকাদ, যিলহজ্ব ও মুহাররম মাসকে হারাম বা নিষিদ্ধ মাস হিসেবে মান্য করা হত। এগুলোর পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করাকে 'ফুজ্জার' অর্থাৎ কুৎসিত কাজ মনে করা হত। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়ত লাভের প্রাক্কালে এ জাতীয় চারটি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। তন্মধ্যে দুটিতে তিনি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব হাঙ্গামার কারণ ও অজুহাত আমাদের এখানকার আলোচ্য বিষয় নয়। এসব ছিল জাহিলিয়া যুগের সাধারণ হাঙ্গামা। কখনো ঋণ পরিশোধ করতে গড়িমসি করলে, কখনো নারীদের প্রতি অশুভ আচরণ বা কটাক্ষ করলে, কখনো আত্মগরিমা প্রকাশ করলে, আবার কখনো বা হত্যাকাণ্ডসমূহের পাথরদণ্ড করলে এসব যুদ্ধ সংঘটিত হত।
আরবে আবূ বারা মালাইবুল আসিন্নাহ্ নামক একজন প্রসিদ্ধ বর্শা নিক্ষেপকারী ছিল। কথিত আছে, হযরত মুহাম্মদ (সা) কোন এক 'ফুজ্জার'-এর সময়ে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে তার উপর বর্শা নিক্ষেপ করেছিলেন। চতুর্থ 'ফুজ্জার' সম্পর্কে ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন, হযরত মুহাম্মদ (সা) কেবলমাত্র সেসব তীরই কুড়িয়ে নিতেন, যেগুলো তাঁর পিতৃব্যদের লক্ষ্য করে শত্রুরা নিক্ষেপ করত। ইবনে সা'দ বর্ণনা করেছেন, ঐ সময় হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর বয়স ছিল বিশ বছর এবং তিনি এ ব্যাপারে কি বক্তব্য রেখেছিলেন, ইবনে সা'দ তারও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি আমার পিতৃব্যগণের সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম এবং কয়েকটি তীরও নিক্ষেপ করেছিলাম। তখন একেবারেই কিছু করবো না, এটা আমার মনঃপূত ছিল না।"
হিলফুল ফুযুল
ইবনে হাবীবের মতানুসারে, চতুর্থ যুজ্জার যুদ্ধে যুবায়র বিন আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন বনী হাশিমের নেতা। জানা যায়, অতি নগণ্য কারণেই এ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল এবং তাতে অনেক রক্তপাত ঘটেছিল। এ রক্তপাত কুরায়শদের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং তারা এ ধরনের রক্তারক্তি বন্ধ করার জন্য অবিলম্বে একটি নতুন সংস্থা গঠনের চেষ্টা চালায়। ফুজ্জার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কুরায়শ নেতারা বিশেষ করে যুবায়র বিন আবদুল মুত্তালিব ও তাইম গোত্রের আবদুল্লাহ বিন জাম্মান তখন নগরবাসীকে সেই 'হিলফুল ফুযুল' পুনর্গঠন করার আহবান জানান যা জরহমী শাসনামলে (কুসাই কর্তৃক শাসনভার গ্রহণ করার প্রাক্কালে) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ উদ্যোগটি নেয়া হয়েছিল ফুজ্জার যুদ্ধের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে।
ইবনে কু'তায়বা, জরহমী শাসনামলের এ সংস্থা সম্পর্কে যে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়েছেন, তাতে বোঝা যায়, কতিপয় লোক একত্রিত হয়ে অত্যাচারিতদের সাহায্যার্থে এ সংস্থাটি গঠন করেছিল। এর স্বেচ্ছাসেবীরা সম্মিলিতভাবে নিজেদের শহরের অত্যাচারীদের দমন ও অত্যাচারিতদের সাহায্য করত।
ফুজ্জার যুদ্ধের পর আবদুল্লাহ বিন জাদআনের বাড়িতে কুরায়শের লোকেরা এক ভোজসভায় মিলিত হয়। আবদুল্লাহ বিন জাদআন প্রবীণ ও প্রভাবশালী লোক ছিলেন এবং বিপুল ধন-সম্পদেরও অধিকারী ছিলেন। সম্ভবত তাঁর বাসস্থানটিও ছিল সবচেয়ে বড়! তবে এর উদ্যোক্তা কে ছিলেন, সে সম্পর্কে সুহায়লী ও আমাদের অন্যান্য ঐতিহাসিক একটি কাহিনীর কথা উল্লেখ করেছেন। ইয়ামনের জনৈক ব্যবসায়ী মক্কায় তার ধারে বিক্রীত পণ্যের মূল্য আদায়ের চেষ্টা চালায়। অনেক চেষ্টা সাধনার পরও যখন সে মূল্য আদায়ের ব্যাপারে কোনই সুরাহা করতে পারল না, তখন ক্ষোভে দুঃখে একটি ব্যঙ্গ কবিতা আবৃত্তি করে। এটা শুনে যুবায়র বিন আবদুল মুত্তালিবের আত্মসম্মানে দারুণ আঘাত লাগে। আর তখনই তিনি এ জাতীয় একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলার আন্দোলন শুরু করেন। যুবায়র এ সংস্থার প্রশংসায় অনেক কবিতাও রচনা করেন। সুহায়লীর গ্রন্থে কবিতাগুলোর উল্লেখ রয়েছে। এজন্য বলা হয়ে থাকে, সম্ভবত এর উদ্যোক্তা যুবায়রই ছিলেন; কিন্তু যেহেতু তখন তাঁর বয়স ছিল কম এবং তার সম্পদও ছিল সীমিত, তাই তিনি এ ব্যাপারে ইবনে জাদআনের পৃষ্ঠপোষকতা চেয়েছিলেন। ফলে ইবনে জাদআনের গৃহেই সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে যথারীতি ভোজেরও ব্যবস্থা করা হয়। এতে বনী আবদুল মুত্তালিব, বনী যুহরা, অন্য বর্ণনা মতে বনী হারিস বিন মহরসহ তামীম ও বনী হাশিম গোত্রের সম্মানিত লোকেরা উপস্থিত ছিলেন। এসব নেতা শপথ করে সিদ্ধান্ত নেন, নগর-সীমার অভ্যন্তরে কারো উপর অত্যাচার করতে দেওয়া হবে না এবং সকলের সম্মিলিত সাহায্যের মাধ্যমে অত্যাচারীর কাছ থেকে অত্যাচারিতের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
আরব তথা সারা বিশ্বে যখন জঙ্গী শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল, ঠিক তখনই মক্কার লোকেরা অত্যাচারিতের সাহায্যার্থে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সংঘবদ্ধ হয়েছিল; এটা মক্কাবাসীদের জন্যে ছিল বাস্তবিকই গৌরবের বিষয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ সংগঠনের কাজে তারা কখনো ঢিলেমীকে প্রশ্রয় দেয়নি। বরং এর কর্মসূচী বাস্তবায়নে তারা ছিল সদা তৎপর। জাহিলিয়া যুগেও এ সংগঠনের বরাত দিয়ে কোন কথা বললে আবূ জেহেলের মত নেতারাও শংকিত হয়ে উঠত। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর ও হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত স্বয়ং রসূলুল্লাহ (সা)-কেও এ ব্যাপারে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। কিন্তু কালের করাল গ্রাসে এ সংগঠনটিও একদিন বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন এবং সঠিকই উল্লেখ করেছেন যে, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সংগঠন হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্যে সময় সময় এর নতুন সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে যে তৎপরতা চালিয়ে যেতে হয়, তা' না থাকার কারণেই এক পুরুষ পর এ সংস্থাটির বিলুপ্তি ঘটে। উপরন্তু ইসলামের অভ্যুদয়ের কারণে এ সংস্থাটির প্রয়োজনও শেষ হয়ে যায়। 'হিলফুল ফুযুলে'র সদস্যরা যে শপথ গ্রহণ করেছিল তা ছিল নিম্নরূপ:
"আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমরা সকলেই অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এবং অত্যাচারিতের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকবো। "আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষান্ত হবো না, যতক্ষণ না অত্যাচারী অত্যাচারিতের অধিকার প্রদান করে। "যতদিন সমুদ্রে একটি লোম সিক্ত করার মত পানি অবশিষ্ট থাকবে, হেরা ও সবীর পর্বত স্ব স্ব স্থানে টিকে থাকবে এবং আমাদের জীবনে সাম্য বজায় থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের এই প্রতিজ্ঞা বলবৎ থাকবে।” (রাওদুল উনুফ)
শপথনামার শেষ অংশটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কিন্তু ঐতিহাসিকরা যেহেতু এর ব্যাখ্যা দান করেন নি, তাই আমরাও আর সেদিকে অগ্রসর হচ্ছি না। তাছাড়া সাহায্যকারীরা যেহেতু নিজ নিজ প্রাণ নিয়েই হাযির ছিল তাই তারা তাদের মাল সম্পদের কি কোন পরোয়া করতে পারে?
ব্যবসা-বাণিজ্য
ঊষর মরুপ্রান্তরে মহানগরী মক্কা অবস্থিত। এ কারণে ক্ষেত-কৃষির সাথে সম্পর্ক ছিল না এখানকার অধিবাসীদের। অবশ্য শিল্প কারখানা গড়ে তোলা যেত, কিন্তু কাঁচামালের জন্যে নির্ভর করতে হত বিদেশের উপর। এসব কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যই এখানকার অধিবাসীদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম। বনী হাশিমের পরিবারে কোন প্রকারের কোন কারখানা ও কুটির শিল্প গড়ে উঠেছিল তেমন কথা কোন ঐতিহাসিকই বলেন নি। পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যশস্য, চামড়া, শুকনো ফল, হাতিয়ার, আতর ও প্রসাধনী দ্রব্যই ছিল মক্কাবাসীদের প্রধান বাণিজ্য সামগ্রী। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরিবারের লোকেরা সাধারণত প্রথমোক্ত দু'টি দ্রব্যের ব্যবসা করত।
মক্কাবাসীদের ব্যবসায়ে সাধারণত শতকরা একশ' ভাগই মুনাফা হত বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন। অবশ্য এজন্যে তাদেরকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে হত। এ খাতে যথেষ্ট ব্যয়ভারও বহন করতে হত। কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অবিরাম পথ চলার ফলে কিছু কিছু উটের প্রাণনাশ ঘটত। সফরের সময় নিজেদের ও জন্তুদের খরচ বাড়ীর খরচের চেয়ে অবশ্যই অধিক ছিল। নিরাপত্তার জন্যে পৃথকভাবে রক্ষীবাহিনীও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হত। দুর্ধর্ষ গোত্রসমূহের আবাসস্থল দিয়ে যাওয়ার সময় শত্রুর আক্রমণ ও আকস্মিক রাহাজানির আশংকা থাকত। এসব কারণে ব্যবসায়ের অধিকাংশ পুজিই যৌথ বিনিয়োগের ভিত্তিতে সংগৃহীত হত অর্থাৎ কিছু লোক একত্রিত হয়ে বাণিজ্যিক সফরে বের হত অথবা প্রত্যেকেই নিজেদের পণ্যদ্রব্য ছাড়াও বন্ধু-বান্ধবদের পণ্যদ্রব্য অর্ধেক মুনাফায় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বা অন্য কোন শর্তে সঙ্গে করে নিয়ে যেত। বাণিজ্যসম্ভার যতই অধিক পরিমাণে হত, ক্ষয়ক্ষতি ও খরচপত্রের পরিমাণও ততই কম হত এবং তা থেকে আয়ের অংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত।
নয়-দশ বছর বয়সে পিতামহের পরলোকগমনের বছরই পিতৃব্য আবূ তালিবের সাথে রসূলুল্লাহ্ (সা) যে ফিলিস্তিনে বাণিজ্য ভ্রমণে গিয়েছিলেন, ইতিহাসে সে কথার উল্লেখ আছে। অতঃপর পঁচিশ বছর বয়সের পূর্বে তিনি কোন বাণিজ্য ভ্রমণে গিয়েছিলেন কি না ঐতিহাসিকরা সে সম্পর্কে কোন উল্লেখ করেন নি। তবে, এর অর্থ এই নয় যে, এ দীর্ঘ সময়টা তিনি বেকার ছিলেন এবং পিতৃব্যের উপর বোঝাস্বরূপ জীবন যাপন করছিলেন। তখন তিনি সম্ভবত স্থানীয় কোন ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত ছিলেন অথবা নগরে পিতৃব্যের কোন দোকান ছিল এবং তিনি সেটার কাজে জড়িত ছিলেন। এছাড়া এটাও জানা যায় যে, অন্যান্য ব্যবসায়ী বিভিন্ন সময়ে নিজেদের পণ্যদ্রব্য নিয়ে যখন ব্যবসায়ে বের হত, তখন রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পণ্যদ্রব্য তাঁদের হাতে সোপর্দ করতেন। এ ধরনের জনৈক ব্যবসায়ী (কায়স বিন আল সায়ীব)-এর বক্তব্য হলো, "আমি জাহিলিয়া যুগে মুহাম্মদের চেয়ে উত্তম কোন ব্যবসায়ী-অংশীদার পাইনি। আমরা যদি তাঁর পণ্যদ্রব্য নিয়ে যেতাম, তাহলে ফিরে আসার পর তিনি আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং কুশলাদি জিজ্ঞেস করেই চলে যেতেন। পরে যখন হিসাবপত্র তাঁকে সমঝানো হত, তখন তিনি কখনো তা নিয়ে বাদানুবাদ করতেন না। পক্ষান্তরে অন্যান্য লোক সর্বপ্রথমই তাদের পণ্যদ্রব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করত। আর তারা নিজেরা যদি আমাদের পণ্য নিয়ে যেত তাহলে ফিরে আসার পর যতক্ষণ না কড়াগণ্ডায় এর হিসাব করত, ততক্ষণ বাড়ি যেত না। এ জন্যেই তিনি আমাদের মধ্যে 'আল-আমীন' হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।"
ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে তাবারী বর্ণনা করেছেন, "বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা) এবং জনৈক কুরায়শকে পারিশ্রমিক দিয়ে বাণিজ্য ব্যাপদেশে হুবাশা'র মেলায় পাঠিয়েছিলেন। হুবাশা ছিল মক্কার দক্ষিণে ছ' দিনের পথের দূরত্বে ইয়ামনমুখী বাণিজ্যিক রাস্তার পাশে তেহামার অন্তর্গত একটি প্রসিদ্ধ স্থান। রজব মাসের তিনদিন পর্যন্ত স্থায়ী এ মেলা ফিলিস্তিনের তুলনায় নিকটবর্তী ছিল এবং সেখানকার শুল্কও ছিল অতি অল্প।"
ইবনে 'সাইয়েদুন নাস'-এর বর্ণনামতে বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বাণিজ্য সম্ভারসহ দু'বার 'জরশ' নামক স্থানে পাঠান এবং বিনিময়ে প্রত্যেকবারই এক একটি উট দান করেন। এ জায়গাটার নাম যদি 'জুরশ' হয় তাহলে তা ছিল মক্কার দক্ষিণ দিকে তায়েফের কিছু সম্মুখে ইয়ামনমুখী বিশেষ প্রাচীর বেষ্টিত একটি নগর-রাষ্ট্র এবং এখানে বিরাট মেলার আয়োজন করা হত। আর যদি এর নাম জরশ হয় তাহলে এটা ছিল জর্দানের পূর্বদিকে একটি বড় গ্রীক শহর। এসব সফরের সাফল্য এবং রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মধুর স্বভাবই সম্ভবত বিবি খাদীজাকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেছিল, যার ফলে তিনি তাঁকে নিজের পণ্যদ্রব্য দিয়ে ফিলিস্তিনের দূরাঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন। বিবি খাদীজা বিধবা ছিলেন এবং এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় চল্লিশ বছর। তিনি বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারিণী ছিলেন; ব্যবসা-বাণিজ্যের সাফল্যের ক্ষেত্রে নগরীতে মহিলা কেন, কোন পুরুষই তাঁর সমকক্ষ ছিল না। তাঁকে 'মহিলা বণিক' উপাধি দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি 'তাহেরা' (শুদ্ধাচারিণী বা সতী-সাব্বী) নামেও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায়, আবূ তালিব রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলেছিলেন, "দেখ বাবা, কয়েক বছরের দুর্ভিক্ষে আমাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। আমাদের ব্যবসার জন্যে না আছে নগদ পুঁজি, আর না আছে বাণিজ্য-সম্ভার। তুমি বিবি খাদীজার কাছে গিয়ে বলে দেখ, তিনি হয়তো তোমার দায়িত্বে কিছু বাণিজ্যসম্ভার দিয়ে দিতে পারেন।" খুব সম্ভব 'হুবাশা'র প্রথম বাণিজ্য মেলা উপলক্ষে এটা বলা হয়েছিল, যদিও বর্ণনাকারী, ফিলিস্তিন ভ্রমণ উপ- লক্ষে একথা বলা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন।
যা হোক, একটি কুরায়শ বণিকদল যখন সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করে, তখন বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর তত্ত্বাবধানে বিপুল পণ্যসামগ্রী সিরিয়ায় পাঠান। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত দাস মায়সারাকে (সেবার জন্য) ও খুযায়মা নামক জনৈক আত্মীয়কে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে পাঠান। ব্যবসা শেখার জন্যে বা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ব্যবসা শেখানোর জন্যে অথবা বাণিজ্য-সম্ভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্যেই সম্ভবত খুযায়মাকে তিনি পাঠিয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) এ সময় সিরিয়ার বসরা নগর পর্যন্ত সফর করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই রাস্তায় যেহেতু সাগর পড়ে, তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) সম্ভবত তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এ সময় নেস্তরীয় ধর্মযাজকের সাথেও তাঁর সাক্ষাত হয়েছিল বলে জানা যায়। বণিক দলের সাথে ধর্মযাজকদের সাক্ষাতের কারণ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। জানা যায়, একদা বিবি খাদীজা সখীদের নিয়ে ঘরের উপরতলায় বসে আছেন। এমন সময় দেখতে পান, অনেক দূর থেকে একটি বাণিজ্য-কাফেলা অতি দ্রুতবেগে নগর অভিমুখে আসছে। কাছে এলে দেখা গেল, এটা রসূলুল্লাহ (সা)-এরই কাফেলা। এ থেকে বোঝা যায়, তখনকার যুগে মক্কানগরীতে বহুতলাবিশিষ্ট ঘরবাড়ী ছিল; অবশ্য শুষ্ক আবহাওয়ার দরুন এসবের প্রয়োজনও ছিল।
ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সততা, ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফলে বিবি খাদীজা ঐ বাণিজ্য-অভিযানে দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করেন। তাই রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তিনি পুরস্কারস্বরূপ সম্পাদিত চুক্তির দ্বিগুণ পারি- শ্রমিক দান করেন। চুক্তিতে দু'টি উট দানের উল্লেখ ছিল। তবে সেগুলো বোঝাই- কৃত পণ্য সামগ্রীসহ, না পণ্যসামগ্রী ছাড়াই দেওয়া হবে ইতিহাস সে সম্পর্কে নীরব।
ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বিবি খাদীজার আহবানে রসূলুল্লাহ্ (সা) মাঝে মধ্যে তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন। প্রাচুর্যের অধিকারিণী, এই রমণী তাঁর বালাখানায় সখীগণ পরিবেষ্টিত অবস্থায় থাকলেও রসূলুল্লাহ্ (সা) আসামাত্র তৎক্ষণাৎ তাঁকে সাক্ষাতদান করতেন। এসব অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাতে অন্যান্য সাধারণ বিষয়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়েও তাঁদের মধ্যে 'পারস্পরিক আলাপ- আলোচনা হত বলে অনুমান করা যায়।
আবূ দাউদ প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, নবুওত লাভের প্রাক্কালে ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে আবদুল্লাহ বিন হামাসা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে একদা বলেছিলেন, "আপনি একটু অপেক্ষা করুন, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ফিরে আসছি।" অতঃপর তিনি প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান। কিন্তু তিনদিন পর ঘটনাক্রমে সে পথ দিয়ে যাওয়ার সময় রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সেখানে দেখতে পেয়ে আপন প্রতিশ্রুতির কথা তাঁর মনে পড়ে। রসূলুল্লাহ (সা) ঠিক ঠিকই ঐ জায়গায় বসে তিন দিন যাবত তাঁর অপেক্ষা করছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) মানুষের কথার কি যে মূল্য দিতেন, উপরিউক্ত ঘটনা থেকে তা সহজেই বুঝা যায়। উক্ত ঘটনা থেকে তাঁর চরিত্র মাধুর্যের আর যে বিশেষ একটি দিক ফুটে উঠেছিল, তা হলো এই যে, এতসব সত্ত্বেও তিনি আবদুল্লাহ বিন হামাসাকে হাসিমুখে বরণ করে নেন এবং তাঁকে ভালমন্দ কিছুই বলেন নি।
মসনদে ইমাম আহমদ বিন হাম্বলে একটি ঘটনার উল্লেখ আছেঃ পূর্ব আরব অর্থাৎ বাহরাইনের (বর্তমানে একে আল-হাসা বলা হয়) আবদুল কা'য়েস গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শেষ জীবনে তাঁর সাথে মদীনায় এসে সাক্ষাত করে। রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁদের কাছে তাদেরই দেশের বিভিন্ন বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে যখন সেগুলোর বর্তমান অবস্থা জানতে চান তখন তারা অবাক বিস্ময়ে ভাবতে থাকে, তিনি কিভাবে তাদের অঞ্চলের ঐসব বিষয়ের এত খুঁটিনাটি জানতে পারলেন। কথিত আছে, রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বলেছিলেন, "আমি ব্যাপকভাবে তোমাদের দেশ সফর করেছি।" এতে অনুমান করা যায়, বাণিজ্যিক কারণেই তিনি 'মশকর' ও 'ওবা'র পার্শ্ববর্তী প্রসিদ্ধ মেলাসমূহে গমন করেছিলেন এবং সম্ভবত বিবি খাদীজার ব্যবসায়ের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবেই তিনি তা করেছিলেন। ঠিক কোন্ সময়ে তিনি ঐসব মেলায় গিয়েছিলেন, তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। সম্ভবত বিবাহের পরই স্বীয় স্ত্রীর বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে তিনি তথায় গিয়েছিলেন।
নবুওত লাভের প্রাথমিক বছরগুলোতে (মদীনায় হিজরতের প্রাক্কালে)। রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাঁর সাথীদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের নির্দেশ দেন, তখন তিনি তাঁর পিতৃব্যপুত্র জা'ফর তাইয়ার-এর সাথে নাজ্জাশীর নামে (আবিসিনিয়ার শাসনকর্তাকে নাজ্জাশী বলা হত) একটি পরিচয়পত্র দেন। পরিচয়পত্রটি ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত আছে। ঐ পত্রের ভাষার স্টাইল ইঙ্গিত প্রদান করে, যেন তিনি একজন পরিচিত ব্যক্তির নামেই তা পাঠিয়েছিলেন। তাছাড়া হিজরতকারীদের বিদায় দানকালে রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, "এটা এমন এক বাদশাহ্ দেশ, যেখানে কারো উপর অত্যাচার করা হয় না। উপরন্তু হাদীসে রসূলে একাধিক হাবশী শব্দের ব্যবহার এ কথারই ইঙ্গিতবহ যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) আবিসিনিয়া সফর করেছিলেন এবং নাজ্জাশীর সাথে তাঁর সাক্ষাতও হয়েছিল। (প্রাক-ইসলামী যুগে আ'মর ইবনে আস প্রমুখেরও আবিসিনিয়া সফরের সুযোগ হয়েছিল।)। মুসলিম মুহাজিরগণ যে পথে আবিসিনিয়া গিয়েছিলেন অর্থাৎ জিদ্দায় গিয়ে জাহাজে আরোহণ করে লোহিত সাগর পাড়ি দেয়া—সেটাই ছিল আবিসিনিয়া গমনের সহজ পথ। দ্বিতীয় আরেকটি পথ ছিল 'ইলা' (আকাবা) ও সিনাই উপদ্বীপ অথবা 'গাযা' হয়ে (এখানে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহ সমাহিত আছেন)। মিসর গমন করা এবং সেখান থেকে নীলনদের কূল বেয়ে আবিসিনিয়ায় উপনীত হওয়া। সমুদ্রের গতি শান্ত হওয়ার কারণে আবিসিনিয়া হতে মিসর গমনও সম্ভব ছিল। যদি এ গবেষণাভিত্তিক যুক্তিকে অহেতুক বলে মনে না করা হয়, তাহলে এর মধ্যে এ কথারও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) সমুদ্র সফরও করেছিলেন। যেহেতু কুরআন মজীদের সর্বপ্রথম মুখাতব (সম্বোধিত ব্যক্তি) ছিলেন রসূলুল্লাহ (সা), সেহেতু কুরআন মজীদে “বাগানের তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়” (যেমন সিরিয়ায়)। এরূপ কথা এবং সমুদ্র ভ্রমণের উপকারিতা ও সেই সাথে এর বিপদসংকুল অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ বিনা কারণে দেওয়া হয়েছে, তেমন কথা সহজে মেনে নেওয়া যায় না। (একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা নিবেদন করছি; বাগানের মধ্য দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয় এমন কথা আমাদের তথা বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের অধিবাসীদের কাছে অবোধগম্য নয়, কিন্তু বাগানের "নীচ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়”—এমন কথা সিরিয়ায় গিয়ে বাস্তব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার পূর্ব পর্যন্ত আমার কাছে মোটেই বোধগম্য ছিল না।)
সামুদ্রিক ভ্রমণ ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করার মধ্যে জীবন চরিত লেখকদের জন্য অশিষ্টতার কিছু নেই। প্রাক-ইসলাম যুগের এসব ঘটনা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ যদি হাদীস যাচাই-বাছাই-এর যুগ শুরু হওয়ার পূর্বেই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে পরবর্তীকালে মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসের সন্ধান করার মধ্যে কি অন্যায়ের কিছু থাকতে পারে? سیروا فی الارض "পৃথিবীতে ভ্রমণ কর" এ আয়াতটি কুরআনের দশ-পনের জায়গায় রয়েছে। যিনি (যে রসূল) আমাদের জন্যে "সুন্দরতম আদর্শ” তিনি স্বয়ং এ নির্দেশ (পূর্বে) পালন করে থাকলে তাতে কি দোষের কিছু আছে?
📄 বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স যখন পঁচিশ বছর দু'মাস দশ দিন, তখন তিনি খাদীজা বিনতে খুডায়ল্দ বিন আবদুল উযা বিন কুসাই-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবি খাদীজা শুধু সুন্দরীই ছিলেন না, প্রচুর ধন-রত্নেরও অধিকারী ছিলেন। কুরায়শের অনেক নেতৃস্থানীয় লোকই তাঁর পাণি-প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু তিনি কাউকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে সম্মত হননি। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা ও অন্যান্য সদ্গুণের খ্যাতি ছিল সমগ্র মক্কা নগরীতে। তাঁর পবিত্রতার কথাও সর্বত্র আলোচিত হত। বিবি খাদীজাও এসব বিষয় সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ফুফু হযরত সুফিয়া বিবি খাদীজার ভাই আওয়াম বিন খুভায়লদ-এর স্ত্রী ছিলেন। বিবি খাদীজা আলাপ প্রসঙ্গে হযরত সুফিয়ার কাছ থেকে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যক্তিগত জীবনেরও খুঁটিনাটি জানার সুযোগ পান। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সতী-সাধ্বী রমণী হিসাবে স্বাভাবিকভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি তাঁর অনুরাগের সৃষ্টি হয়। তাছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার উদ্দেশ্যেই প্রধানত তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিজের পণ্য-সামগ্রী দিয়ে সিরিয়া পাঠান এবং স্বীয় দাস মায়সারাকেও তাঁর সঙ্গী করে দেন। ঐ অভিযানে বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সততা ও উন্নত গুণাবলীর অনেক প্রত্যক্ষ প্রমাণ পান। ফলে তিনি স্বয়ং নাফিসা বিনতে উমাইয়া অর্থাৎ ইউলা বিন উমাইয়ার ভগ্নির মাধ্যমে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তাঁর বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। ইবনে ইসহাকের মতে তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-কে ডেকে এনে সাক্ষাতেই সব কথা পাকাপাকি করেছিলেন। বিবি খাদীজা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কেন ভালবেসেছিলেন তা তাঁর তখনকার একটি বক্তব্য থেকেই পরিস্ফুট হয়ে উঠে। তিনি বলেছিলেন, "আপনার সচ্চরিত্র ও সত্যবাদিতার কারণেই আমি আপনার অনুরাগী হয়ে উঠেছি।”
রসূলুল্লাহ (সা)-এর ঐ সংবাদটি পিতৃব্য আবূ তালিবের কাছে পৌঁছালে তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাতে সায় দেন। অতঃপর তিনি বনী হাশিম ও 'মুদা'র গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকদের নিয়ে বিবি খাদীজার বাড়িতে যান এবং সেখানেই বিবাহের যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। আব্দ অনুষ্ঠানে আবূ তালিব যে সারগর্ত ভাষণ দেন, তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অভিভাবকরা ঐ সময়ে তাঁর সম্পর্কে কি উন্নত ধারণা পোষণ করতেন এবং তাঁর স্বভাব-চরিত্র তাঁদের উপর কী অসাধারণ প্রভাবই না বিস্তার করেছিল! আবূ তালিবের ভাষণ ছিল নিম্নরূপঃ
সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর-যিনি আমাদের ইবরাহীমের বংশে ও ইসমাঈলের গোত্রে সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের মা'দ ও মুদারে'র পবিত্র উৎস থেকে উৎসারিত করেছেন, যিনি আমাদের তাঁর গৃহের রক্ষক ও হরমের ইমাম মনোনীত করেছেন, যিনি আমাদের এমন গৃহ দান করেছেন যার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে অসংখ্য লোকের আগমন ঘটে এবং এমন 'হরম' দান করেছেন যেখানে কেউ উপস্থিত হলে পুরোপুরি নিরাপত্তা লাভ করে, যিনি আমাদের জনগণের নেতা মনোনীত করেছেন। অতঃপর বলছি, আমার ভ্রাতুপুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সম্পর্কে, জ্ঞানগরিমা ও মহত্ত্বে যার সাথে অন্য কারো তুলনাই হয় না- যদিও তাঁর ধন-সম্পদ অতি অল্প। তবে জেনে রাখবেন ধনসম্পদ নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। মুহাম্মদের (সা) সাথে আমার কি সম্পর্ক রয়েছে আপনারা সকলেই তা জানেন। তিনি বিবি খাদীজা বিনতে খুভায়লকে বিবাহ করার জন্যে প্রস্তাব দিয়েছেন, অতএব, আমি আমার সম্পদ হ'তে বিশটি উট এ বিবাহের মুহর হিসেবে দান করলাম। তাঁর ভবিষ্যত, আল্লাহর শপথ, অত্যন্ত উজ্জ্বল ও গৌরবময়।
যখন আবূ তালিবের ভাষণ শেষ হলো তখন বিবি খাদীজার পিতৃব্য পুত্র ওরাকাহ বিন নওফেল ভাষণ দিতে উঠেন। তাঁর ভাষণের বিষয়বস্তু ছিল:
সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের সেসব গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যার কথা আবূ তালিব উল্লেখ করেছেন। আমরা সারা আরবের নেতা ও ইমাম, আর আপনারা সর্ব প্রকার সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। কোন দল বা গোষ্ঠীই আপনাদের মর্যাদা অস্বীকার করতে পারবে না এবং আপনাদের আভিজাত্য ও মর্যাদাকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আমরা অত্যন্ত আনন্দ উদ্দীপনা নিয়ে আপনাদের সাথে আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হতে যাচ্ছি। অতএব, হে কুরায়শের লোকেরা! আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমি চার শ' মিসকালের বিনিময়ে খাদীজা বিনতে খুভায়দকে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লার হাতে তাঁর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে তুলে দিচ্ছি।
ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আবু তালিব বললেন, "হে ওরাকাহ, উমর বিন আসাদ যখন এই মাহফিলে উপস্থিত আছেন, তখন তিনিও এ ব্যাপারে আপনার সাথে অংশ নিন—এটা আমি কামনা করি।” তখন আমর বিন আসাদ দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি খাদীজা বিনতে খুয়ায়লদকে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর স্ত্রীত্বে সমর্পণ করলাম।” এভাবে উভয় পক্ষের ইজাব (প্রস্তাব দান) ও কবুল (প্রস্তাব গ্রহণ)-এর মধ্য দিয়ে বিবাহকাজ সম্পন্ন হয়।
বিবাহের সময় বিবি খাদীজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তিনি বিধবা ছিলেন এবং ইতিপূর্বে তাঁর আরো দু'টি বিয়ে হয়েছিল। প্রথম বিয়ে হয়েছিল আবিহালা বিন যারারাহ তামীমীর সাথে। ঐ ঘরে তাঁর গর্ভে হিন্দ বিন আবিহালা ও যয়নব বিনতে আবিহালা নামক দুটি সন্তান জন্ম নেয়। দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল আতীক বিন আয়িয মাখযুমীর সাথে। ঐ ঘরেও তাঁর গর্ভে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। পুত্র সন্তানের নাম আবদুল্লাহ বিন আতীক ছিল বলে জানা যায়।