📄 রসুলে করীম (সা)-এর জীবন অধ্যয়নের প্রয়োজন কেন
"হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান কর এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নাও। তুমি যাকে ইচ্ছা পরাক্রমশালী কর, আর যাকে ইচ্ছা হীন কর। কল্যাণ তোমার হাতেই। তুমি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। তুমিই রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে পরিণত কর। তুমিই মৃত হতে জীবন্তের আবার জীবন্ত হতে মৃতের আবির্ভাব ঘটাও। তুমি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবনোপকরণ দান কর।” (৩: ২৬-২৭)
"আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতারাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। হে বিশ্বাসিগণ, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাঁকে উত্তমরূপে অভিবাদন কর।” (৩৩: ৫৬)
বিভিন্ন জাতিতে এবং বিভিন্ন ভাষায় নবী এবং রসূল সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত আছে। তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এই সৃষ্টি (নবী রসূল) সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে আগাগোড়া এই ধারণাই প্রচলিত যে, ইনি হচ্ছেন ইনসানে কামিল-পরিপূর্ণ মানুষ। আর এই পরিপূর্ণতা হচ্ছে শুধুমাত্র মানবীয় দিক সম্পর্কেই। মানুষের জীবনে দু'টি দিকই হচ্ছে প্রধান। একটি মা'আশ (ইহজীবন) এবং অন্যটি মা'আদ (পরজীবন)। অন্য কথায়, একটি হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের এবং অন্যান্য সৃষ্টির সম্বন্ধ সম্পর্কিত, আর অন্যটি হচ্ছে মানুষের সাথে তার সৃষ্টিকর্তা পরম পরাক্রমশালী প্রভুর সম্বন্ধ সম্পর্কিত। প্রথমটির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে শাসনক্ষমতার অধিকারী হওয়া আর দ্বিতীয়টির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে আকায়িদ-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব অর্থাৎ পয়গাম্বরী লাভ।
রসূলে আরবী হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সা) একাধারে ছিলেন উপরিউক্ত দু'টি গুণেরই অধিকারী। তাঁর জীবনের এই দু'টি দিক সম্পর্কে আলোচনা একটি বিরাট ব্যাপার। এই পুস্তকে শুধুমাত্র তাঁর জীবনের একটি দিক অর্থাৎ রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
কিন্তু স্থিরমস্তিষ্ক জ্ঞানান্বেষী এবং ব্যক্তিগত চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে একটি স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তি মাত্রেরই মনে এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, আজ থেকে সাড়ে তেরশ' বছর পূর্বে যিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন, যাঁর মৃত্যুর পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবিত উন্নতি হয়েছে, সভ্য জাতিসমূহের পরিবেশ এবং জীবন সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন- সর্বোপরি যিনি ছিলেন আমাদের মত একজন মানুষই- এই যুগে কি তাঁর জীবন আলোচনার শিক্ষা অনুসরণের প্রয়োজন আছে?
নীতিগতভাবে একথা কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না যে, 'যেই নতুন আসবে সেই নতুন নির্মাণ করবে'- এই প্রবাদ বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মানব জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির উন্নয়ন রহস্য। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, 'সম্পূর্ণ হতে না হতে খুলে ফেলা'র। "সেই নারীর মত যে সুতা মজবুত হওয়ার পর তা খুলে ফেলে তার সুতা কাটা নষ্ট করে দেয়' (১৬ঃ ৯২)। অভ্যাস জারী রাখা হবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে পুরাতন নির্মাণের উপর নতুন নির্মাণ অব্যাহত রাখা হবে। এটা পরিষ্কার কথা যে, যিনি পুরাতন এবং নতুন উভয় ইমারতেরই মালিক, তিনি সেই ব্যক্তির চাইতে অপেক্ষাকৃত বেশি বিত্তশালী, যার অধিকারে রয়েছে শুধুমাত্র একটি পুরাতন অথবা নতুন ইমারত। এখন প্রশ্ন শুধুমাত্র মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব (আমার প্রাণ তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক)-এর জীবন অধ্যয়ন প্রয়োজন কেন? এবং এজন্য অন্য কারো জীবন বেছে নিতে আপত্তি কি? এটা নিশ্চয়ই এমন একটা প্রশ্ন যা একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ উত্তর প্রত্যাশা করে।
মুসলমানদের পক্ষ থেকে এর উত্তর এই হবে যে, তিনিই তো হচ্ছেন সেই গুণান্বিত ব্যক্তি যিনি এমন এক যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন সমগ্র বিশ্ব মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতার একেবারে শেষ স্তরে নেমে গিয়েছিল এবং তিনিই তখন নিখুঁত মানবতার সহজ সরল পথে মানব জাতিকে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। আজ, যখন আমরা বিভিন্ন অজুহাতে ঐ জাহিলিয়া যুগেরই নিকটতর হচ্ছি তখন শুধুমাত্র ঐ 'হিদায়েতের আলো'ই আমাদের সত্যিকার মুক্তির পথে নিয়ে যেতে পারে।
ব্যক্তিগত আকীদা-বিশ্বাসের কথা বাদ দিলে, একজন সত্যান্বেষী শিক্ষার্থী ও একজন নিরপেক্ষ অথচ অব্যর্থ লক্ষ্য ঐতিহাসিকের পক্ষ থেকে এর যে উত্তর হবে তার কিছু কথা শুধুমাত্র মুসলমানদের সাথে, কিছু কথা অন্যদের সাথে এবং কিছু কথা উভয়ের সাথেই সম্পর্কযুক্ত।
মুসলিমদের জন্য তাঁর জীবনচরিত যে গুরুত্ব বহন করে তার বিশদ ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই। উসূলে ফিকহের গ্রন্থাদিতে এটা একটা সর্বসম্মত কথা যে, রসূলে করীম (সা)-এর প্রত্যেকটি বাণীর ন্যায় তাঁর প্রত্যেকটি কর্মও আইনের মর্যাদা রাখে এবং সুন্নাতে নবভীর নিরিখে ওয়াজিব (অবশ্য করণীয়), মুসতাহাব (পছন্দনীয়), মুবাহ (করলেও চলে আবার না করলেও চলে), মাকরূহ (অপছন্দনীয়) প্রভৃতি নির্ণয় করা হয়। অবশ্য মুসলমানদের জীবনকে তখনই ইসলামী জীবন বলা হবে যখন তা কুরআন মজীদের আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হবে। তবে কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় সুন্নাতে নবভীর আইনগত (legal) মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এটাকে অবশ্য- পালনীয় বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। এর দ্বারা সুন্নাতে নবভী তথা সঠিক ও সর্বসম্মত নবীচরিত কুরআনের অংশ বিশেষের মত মর্যাদা সম্পন্ন না হলেও অন্তত তার ক্রোড়পত্র ও পরিশিষ্টের মর্যাদা সম্পন্ন হয়ে পড়ে।
এমনি ধরনের কয়েকটি আয়াতের প্রতি পাঠকবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে :
১. রসূলে করীম (সা) যার অনুমতি দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক। এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর। (৫৯ : ৭)
২. তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (৩৩ : ২১)
৩. হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর এবং তোমরা যখন তাঁর কথা শোন তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, এবং তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বলে 'শুনলাম'। বস্তুত তারা শোনে না। আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম জীব বধির ও মুক-যারা কিছুই বুঝে না। (৮ঃ ২২)
৪. তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রসূলের আনুগত্য কর এবং সর্তক হও, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রেখ, স্পষ্ট প্রচারই আমার রসূলের কর্তব্য। (৫ : ৯২)
৫. শপথ নক্ষত্রের যখন উহা হয় অস্তমিত, তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মদ (সা)। বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। কুরআন তো ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। (৫৩:১-৪)
এই সমস্ত আয়াত এবং আরো অনেক আয়াত দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, মহান পথ-প্রদর্শক, দু'জাহানের নেতা রসূলে করীম (সা)-এর কথা, তাঁর কর্ম এবং যেসব বিধি-বিধান তিনি তাঁর অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, সেসবের উপর আমল (কার্যে পরিণতকরণ) ঠিক তেমনি জরুরী যেমন জরুরী কুরআনের আদেশ নির্দেশ।
অমুসলিমদের জন্য রসূলে আরবীর জীবনচরিত অধ্যয়ন করা প্রয়োজন এজন্য যে, যখন কোন ব্যক্তি আমাদের বলে, ' তোমাদের জন্য মঙ্গলকর কিছু কথা আমি বলতে চাই'-তখন সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন এমন কে আছে, যে এই কথা শুনতে অস্বীকার করবে? রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর জীবনে প্রথমবার যখন ঘোষণা করেন, "আমি সমগ্র বিশ্বের রহমতরূপে এসেছি এবং যে দীন ইসলাম (শান্তির ধর্ম) নিয়ে এসেছি তাঁর অনুসরণ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে ইহকাল পরকালের মঙ্গল লাভ সম্ভব নয়-তখন উদ্ধত স্বভাবের লোকেরা কূট তর্কে লিপ্ত হয় এবং বিরোধিতা করতে থাকে। কিন্তু শান্ত স্বভাবের লোকেরা অনুরূপ না করে বরং রসূলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করে: ইসলাম কাকে বলে এবং আপনার মতে আমাদের কি করা উচিত? এই জিজ্ঞাসার জওয়াব পাওয়ার পর তারা আবার ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হলে তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণও করে। বিশ্বনবীর বাণীসমূহ, কার্যকলাপ এবং তাঁর উপস্থাপিত ধর্ম এখনো সুসংরক্ষিত অবস্থায় বিদ্যমান। এক্ষেত্রে প্রাচীন নিদর্শনাদির উপর ভিত্তি করে কিছু একটা খাড়া করার কিংবা সরল বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে কোন কল্পনাপ্রসূত কথা বলার প্রয়োজন নেই।
বিষয়টিকে কিঞ্চিৎ খোলাসা করে বলা যাক। অন্যান্য ধর্মের পবিত্র এবং ঐশ্বরিক গ্রন্থাদির মধ্যে গৌতম বুদ্ধের কোন গ্রন্থ পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র তাঁর বাণীসমূহ পাওয়া যায়-তাও আবার যথাসময়ে লিপিবদ্ধ নয়। হিন্দু ধর্মের বেদ পুরাণসহ কয়েকটি গ্রন্থ আছে বটে, কিন্তু সেগুলো হাজার হাজার বছর পর্যন্ত শুধু স্মৃতির উপর টিকে ছিল। শেষ পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয় বটে তবে শুধুমাত্র একই ব্যক্তির স্মৃতির উপর ভরসা করে। মূল তওরাত এখন পাওয়া যায় না। একাধিকবার তা বিশ্ব থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছে এবং পুনরায় লিপিবন্ধ করা হয়েছে শুধুমাত্র স্মৃতির উপর ভিত্তি করে। ফলে এখন যে সমস্ত কপি পাওয়া যায় সেগুলোর শব্দে এবং শ্লোকে পরস্পর পার্থক্য বিদ্যমান। এর মধ্যে অনেক জিনিসই এখন লাপাত্তা। অনেকগুলো অংশ পাঠ করার পর পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সেগুলো পরবর্তীকালের পরিবর্ধন ছাড়া কিছু নয়। যেমন হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে লিখিত গ্রন্থে তাঁর পরলোকগমনের বর্ণনা ইত্যাদি।
ইঞ্জীলের প্রকৃত অবস্থা এই যে, একে হযরত ঈসা (আ) কখনো লিপিবদ্ধ করান নাই (আর যদি করিয়েও থাকেন তবে মূল ইঞ্জীল এখন লাপাত্তা)। এখন ইঞ্জীল নামে যে সমস্ত জিনিস পাওয়া যায় তা হচ্ছে তাঁর শিষ্য এবং প্রশিষ্যদের এই মর্মের বর্ণনা যে, তাঁদের নবী এভাবে ভূমিষ্ঠ হন, সারা জীবন এভাবে অতিবাহিত করেন এবং অমুক সময়ে অমুক কথা বলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা তাঁদের চোখে দেখা অথবা কানে শোনা ঘটনাবলীর উপর লিখিত তাঁদের নবীর জীবন কাহিনী মাত্র—আল্লাহ্ প্রদত্ত কোন গ্রন্থ বা জীবন ব্যবস্থা নয়। আরো একটি কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, হযরত ঈসার অনুরূপ জীবন কাহিনীমূলক প্রচুর সংখ্যক ইঞ্জীল ছিল এবং অনিবার্যভাবে সেগুলোতে প্রচুর মতবিরোধও ছিল। একদা ঐ সমস্ত গ্রন্থকে একটির উপর একটি সাজিয়ে দোলানো হয়। তাতে যেগুলো স্তূপ থেকে নীচে পড়ে যায় সেগুলোকে এক জায়গায় এবং যেগুলো টিকে থাকে সেগুলোকে অন্য জায়গায় জড়ো করা হয়। এই পদ্ধতিতেই আজকালকার চারটি ইঞ্জীলকে নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করা হয়, আর বাকীগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়।
এবার কুরআন মজীদের কথায় আসা যাক। নবুয়্যতের একেবারে সূচনা থেকে যখন কোন আয়াত নাযিল হত, ঠিক তখনই রসূলুল্লাহ্ (সা) তা লিখিয়ে নিতেন। নতুন কোন আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে তিনি কাতিবদেরকে এ নির্দেশও দিতেন যে, 'ইতিমধ্যে কুরআনের যে অংশটুকু নাযিল হয়েছে তার অমুক সূরার অমুক আয়াতের পর এ আয়াতটি লিপিবদ্ধ কর।' তাছাড়া অনেক সাহাবী ঐ সমস্ত আয়াত মুখস্থ করে নিতেন এবং মুখস্থ করার সাথে সাথে তা রসূলুল্লাহকে আবার পড়িয়ে শোনাতেন। অনেকে নাযিলকৃত আয়াতের অনুলিপিও রাখতেন। রসূলূল্লাহ (সা) যখন পরলোকগমন করেন, তখন প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) কুরআনকে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার জন্য নবীযুগে সরকারীভাবে অনুমোদন প্রাপ্ত ওহী লেখকদের একটি কমিটি গঠন করেন এবং নির্দেশ দেন, মুখস্থ ছাড়াও অন্তত দু'টি লিখিত প্রমাণের উপর প্রত্যেকটি শব্দ এবং আয়াত যেন লিপিবদ্ধ করা হয়। রসূলূল্লাহর শেষ যুগে সম্পূর্ণ কুরআনের কমপক্ষে চার পাঁচজন হাফিয (মুখস্থকারী) ছিলেন এবং ওহী লেখক কমিটির সদস্যরাও ছিলেন এদের অন্তর্ভুক্ত। আর আংশিকভাবে কুরআন মুখস্থকারী তো ছিলেন হাজারে হাজারে। যাহোক প্রথম থেকেই অত্যন্ত যত্নের সাথে কন্ঠস্থ ও লিপিবদ্ধকরণ এবং আজ পর্যন্ত সেই একই নিয়ম জারি থাকার ফলে কুরআন মজীদ এমনভাবে সংরক্ষিত হয়ে আসছে যে, বিশুদ্ধতা ও নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে অন্য কোন ধর্ম প্রবর্তকের ঐশী গ্রন্থ এর ধারে কাছেও আসতে পারবে না।
মোটকথা, আমরা নিঃসংকোচে এমন এক ব্যক্তিত্বের জীবন কথা অধ্যয়ন করতে পারি যাতে খুঁটিনাটি ঘটনাবলীর বর্ণনাও বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং যাঁর শিক্ষার ভিত্তি অর্থাৎ তাঁর উপর অবতীর্ণ আসমানী গ্রন্থও হুবহু এবং অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। তাছাড়া সেটি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে অস্পৃশ্যতারও এমন কিছু নেই যে, এর অধ্যয়ন থেকে কোন ব্যক্তি, জাতি বা সম্প্রদায়কে বারণ করা হবে, বরং এর মধ্যে রয়েছে সার্বজনীন মঙ্গল এবং যে কেউ এটা পড়ে সে মঙ্গলের অধিকারী হতে পারে এবং নিজ থেকে এ সিদ্ধান্তও নিতে পারে যে, এই গ্রন্থকে বরণ করা যাবে কি না, আর যে বরণ করবে না তার জন্য (এই গ্রন্থেই) পরিষ্কার নির্দেশ রয়েছে 'লা ইকরাহা ফীদ্দিন'-ধর্ম (দীন) সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি নেই (২: ২৫৬)। সর্বোপরি এই কুরআন হচ্ছে এমন একটি গ্রন্থ যা ভাষাশৈলীর দিক দিয়ে হোমার ও ডিমসথেনিসকে, আইন শিক্ষার দিক দিয়ে জাস্টিনিয়ানকে, পার্থিব মঙ্গল লাভের ক্ষেত্রে কৌটিল্যকে, পারলৌকিক মঙ্গল লাভের ক্ষেত্রে গৌতম বুদ্ধকে এবং শিষ্টাচার শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কনফুসিয়াসকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ প্রদান করতে পারে। এই সেই গ্রন্থ যা মানুষের মধ্যে সত্যিকার সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং পূর্ববর্তী ধর্ম-গুলোকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সেগুলোর মধ্যে ইসলামের স্থান এমনভাবে নির্ধারণ করেছে যে, এটা হচ্ছে চিরাচরিত ন্যায় ও সত্য এবং আদি ও আসল ধর্মের খাঁটি ও নির্ভেজাল চেহারা।
সবার জন্য
ইসলামের মূলনীতি হলো, 'ইহকালে কল্যাণ, পরকালেও কল্যাণ (ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আঁখিরাতি হাসানাতাঁও) (২:২০১)। এবার দেখা যাক, ইহলৌকিক ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহর চরিত্র এবং জীবন পদ্ধতির মধ্যে আমাদের জন্য কি কি শিক্ষণীয় বিষয় আছে। বিশ্বে মহান ব্যক্তিত্বের সংখ্যা কখনো কম ছিল না, তবে তা শুধুমাত্র এক একটি বিশেষ ক্ষেত্রে। যেমন আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ান ও হিটলারের জীবন-চরিতে যে শিক্ষণীয় বিষয় আছে, তা শুধুমাত্র যুদ্ধ পরিচালনাকারী সেনাপতি ও দিগ্বিজয়ীদের জন্য। গৌতম বুদ্ধের জীবনে যে শিক্ষণীয় বিষয় আছে তা শুধু তাদের জন্য যারা সাধনা-উপাসনার প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী। হোমার শুধুমাত্র একজন কবি ছিলেন। প্লেটো এবং এরিস্টটল ছিলেন চিকিৎসক এবং দার্শনিক। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে এঁদের বিশেষ কোন দখল ছিল না। অথচ রসূলে আরবীর জীবনের প্রতি লক্ষ্য করুন, সর্বক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা, তাঁর কথা ও কাজের সামঞ্জস্য, তাঁর শিক্ষার সহজবোধ্যতা ও কার্যোপযোগিতা, সর্বোপরি তাঁর জীবনের চরম সাফল্য নিঃসন্দেহে অতুলনীয়তার দাবি রাখে। তাঁর জীবনের রাজনৈতিক দিকটির প্রতি লক্ষ্য করুন।
আরব উপদ্বীপের সেই নৈরাজ্য পরিবেশ, যেখানে স্বাধীনচেতা বেদুঈন সম্প্রদায়গুলো রাত দিন রক্তাক্ত সংঘর্ষে লিপ্ত থাকত, সেখানে তিনি মাত্র দশ বছরের মধ্যে একটি শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। একজন সেনাপতি হিসাবে তাঁর বিরাট কৃতিত্ব এই যে, তাঁর সকল যুদ্ধেই উভয় পক্ষের খুব কম লোকই নিহত হয়েছে। কিন্তু মাত্র দশ বছরের মধ্যে আনুমানিক বার লক্ষ বর্গমাইল এলাকার উপর তিনি তাঁর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। উপরন্তু আরবের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সম্পূর্ণ উপদ্বীপটিকে একই পতাকাতলে নিয়ে আসে। আর এটা রসূলুল্লাহরই শিক্ষার ফলশ্রুতি যে, আরবের মত অজ্ঞাত ও মূর্খ একটি জাতি বিজয় পতাকা নিয়ে বহির্জগতের দিকে দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে চলে এবং যাদের সম্পর্কে ক্যাম্ব্রিজের জনৈক খৃস্টান ঐতিহাসিকের মন্তব্য হলো, 'এদের চাইতে ভদ্র দুর্দান্ত কোন জাতি কখনো দিগ্বিজয়ে বহির্গত হয়নি।' তাছাড়া ব্যাপকতা ও গভীরতার দিক দিয়ে দেশজয়ের যে রেকর্ড তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন তা কোন জাতি এখনো ভাঙতে পারেনি। তারা দশ বছরের মধ্যেই ইরাক, ইরান, ফিলিস্তীন, সিরিয়া, মিসর, তিউনিসিয়া, তুরস্ক এবং আর্মিনিয়া পদানত করেন। এইসব অঞ্চল মোটামুটিভাবে এখনো ইসলামী এলাকার অন্তর্ভুক্ত এবং এদের সংখ্যাগুরু অধিবাসীর ভাষাও রূপান্তরিত হয়েছে আরবী ভাষায়।
এখন শাসন ব্যবস্থার কথায় আসা যাক। যে দেশে কখনো কোন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সে দেশে ভূমিষ্ঠ এবং প্রতিপালিত হওয়া সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ্ (সা) যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠা করেন তা বিশ্বের একটি বিরাট রাষ্ট্রের জন্যে শুধু উপযোগীই ছিল না, বরং যত দিন পর্যন্ত তা কার্যকরী ছিল ততদিন ঐ রাষ্ট্র বিশ্বের সবচাইতে সভ্য রাষ্ট্র হিসাবে পরিগণিত হত। গান্ধীর মত গোঁড়া হিন্দুও ইসলামী রাষ্ট্রের ঐ যুগকে মানবতার স্বর্ণযুগ বলে মনে করতেন এবং এটাকে নিজেদের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করার জন্য কংগ্রেসী হিন্দু রাষ্ট্রকে পরামর্শ দিতেন।
এবার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথায় আসা যাক। রসূলুল্লাহ্র প্রত্যেকটি অর্থনৈতিক নির্দেশের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ বন্টননীতি পরিলক্ষিত হয়। পরিত্যক্ত সম্পত্তি বন্টন, অসীয়ত নবায়ন, সুদের অবৈধতা, ফেলে রাখা সম্পদের উপর মাশুল (যাকাত) নির্ধারণ প্রভৃতি সম্পর্কে তিনি যে নীতি প্রণয়ন করেন, সেগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে উপরিউক্ত কথার যথার্থতা প্রমাণিত হবে। মোটকথা, তাঁর নির্দেশিত অর্থনীতি এমনি সুন্দর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, তাতে আজকালকার সমাজবাদী ও পুজিবাদী অর্থনীতির মধ্যে বিরাজমান কাদা ছোঁড়াছুড়ি ও সংঘর্ষের একটি সুন্দর সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
স্ত্রীলোক, শ্রমিক এবং ক্রীতদাসের মর্যাদা সম্পর্কিত রসূলুল্লাহর শিক্ষার মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য রয়েছে বিধায় উপকারিতা ও কার্যকারিতার দিক দিয়ে তা অতুলনীয়। সামাজিক এবং চারিত্রিক ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ (সা) শুধু অপরের শিক্ষকই ছিলেন না বরং অপরের জন্য নিজের শিক্ষা ও সদুপদেশের জীবন্ত নমুনা ছিলেন। একজন পিতা, একজন বন্ধু, একজন শাসক, একজন বণিক সর্বোপরি একজন মানুষ হিসাবে তাঁর কার্যকলাপ এতই খাঁটি এবং নিখুঁত ছিল যা তাঁর কট্টর শত্রুরাও স্বীকার না করে পারেনি। বিভিন্ন ইসলামী সংস্কার ছাড়াও পৌত্তলিকতা, মদপান, জুয়াখেলা প্রভৃতি নিষিদ্ধকরণ মুসলমানদের এমন কয়েকটি বিশেষত্ব যেগুলো বিশ্ববাসী ইচ্ছায় হোক অথবা অনিচ্ছায় হোক মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্বে অনেক শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং নবী এসেছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জীবনকালে যেরূপ সাফল্য অর্জন করেছেন তা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। দশম হিজরীতে তিনি যখন মক্কায় আগমন করেন তখন তাঁর সাথে দেড় লক্ষ মুসলমান ছিলেন যাঁরা এসেছিলেন দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চল থেকে। রসূলুল্লাহ (সা) যে ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন সে ধর্ম আপনা আপনি স্থান করে নিয়েছিল বিশ্ববাসীর অন্তরে। চীনে কখনো ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবু সেখানে কোটি কোটি মুসলমান রয়েছে। পাক-ভারত এবং অন্যান্য দেশেও নও-মুসলিমের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং ক্রমবৃদ্ধির এই ধারা ইসলামের আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে অতি সুন্দরভাবে। তিনিই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি অসাম্য ও অস্পৃশ্যতার অভিশাপে ভয়ানকভাবে জর্জরিত বিশ্বে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, বংশ, বর্ণ কিংবা ভাষা নয় বরং পুণ্যকর্ম এবং আল্লাহ-ভীরুতাই উৎকৃষ্টতার মাপকাঠি। 'তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহভীরু।' তিনি ইসলামী আদর্শকে বাস্তবায়িত করেন অত্যন্ত সার্থকভাবে, যার ফলে সমাজের হেয় এবং অধঃপতিত লোকেরা এটাকে নিজেদের মুক্তির একমাত্র পথ বলে মনে করে আসছে। ইসলামের চাইতে অধিক সাম্য অন্য কোন ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থায়ই পরিলক্ষিত হয় না। ইতিহাস একথার সাক্ষী যে, বর্ণ ও ভাষাকেন্দ্রিক ভেদ-বৈষম্যের মূলোৎপাটনে ইসলামের চাইতে অধিক সাফল্য অর্জন বিশ্বের অন্য কোন ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থার পক্ষে সম্ভব হয় নি।
মানব বসতির প্রত্যেকটি দল, সম্প্রদায় অথবা জাতির পৃথক ইতিহাস, পৃথক ঐতিহ্য এবং পৃথক বিশ্বাস (আকায়িদ) রয়েছে। আর মানুষকে তাদের মাননীয় ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকে বিরত রাখা যেমন সহজ নয়, তেমনি এতে লাভেরও কিছু নেই। বরং সহজ এবং লাভজনক পদ্ধতি এই যে, পুরানো আকীদা-বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং ধ্যান-ধারণার প্রতি কোনরূপ কটাক্ষ না করে (বরং নতুন পটভূমি দিয়ে সেগুলোকে নতুন খাতে প্রবাহিত করে) কিছু নতুন জিনিসের প্রতি অধিকতর শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের শিক্ষা দেওয়া। অন্যথায় একই উৎস হতে উৎসারিত আদম ও হাওয়ার সন্তানদের একই কেন্দ্রে জড়ো করা কখনও সম্ভব নয়।
একত্ববাদে বিশ্বাস এবং অন্য গুণাবলীর দরুন য়াহূদীরা তাদের সমসাময়িক অন্যান্য জাতির উপর গর্ব করত। কিন্তু অন্য সবাই তদেরকে একটি অভিশপ্ত জাতি বলেই মনে করত। কিন্তু ইসলাম প্রকাশ্যে স্বীকার করে যে, 'ফাদ্দালাকুম 'আলাল 'আলামীন'- অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে বিশ্বজগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। ঈসায়ীরাও তাদের পৈতৃক ধর্মের কোন কোন বৈশিষ্ট্যের দরুন গর্বিত থাকলেও অন্যরা তাদেরকে মোটেই পাত্তা দিত না। কিন্তু কুরআন ঈসায়ীদের সেই বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার করে নিয়ে ঘোষণা করে "নিশ্চয় মরিয়ম তনয় ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মরিয়মের কাছে পাঠিয়েছিলেন ও তাঁর রূহ (আদেশ)......(৪ঃ১৭১)
কিন্তু কুরআন এই উভয় জাতিকেই বলে দেয় যে, শুধু পূর্বপুরুষের বড়াই করলে চলবে না বরং আল্লাহ্ তা'আলা এক এক করে প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকেই তার কর্মের হিসাব নেবেন। তাছাড়া যে আল্লাহ্ মূসা ও ঈসা (আ)-কে বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, সেই আল্লাহই পূর্ববর্তী নবীদের শিক্ষা সম্বলিত গ্রন্থগুলো কালচক্রে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কারণে আপন অসীম করুণাগুণে আর একজন নবী পাঠিয়েছেন এবং তাঁর মাধ্যমে নতুনভাবে ঐ সমস্ত গ্রন্থের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দিয়ে মানব-জাতিকে ধন্য ও কৃতার্থ করেছেন। আর যতক্ষণ পর্যন্ত এই নবীর শিক্ষা সংরক্ষিত ও অপরিবর্তনীয় থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কোন নবী আসার প্রয়োজন নেই।
কুরআনের ঘোষণা "এমন কোন সম্প্রদায় নেই যার কাছে সতর্ককারী প্রেরিত হয়নি"-বিশ্বের সকল জাতি এবং সকল সম্প্রদায়ের অন্তর জয় করে নিয়েছে। হযরত আদম (আ) থেকে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত যে সমস্ত নবী রসূল এসেছেন, কুরআন তাঁদের দু'এক জনের নাম নিয়েছে এবং সাথে সাথে এ ঘোষণাও দিয়েছে, "অনেক রসূল প্রেরণ করেছি যাদের কথা পূর্বে তোমাকে বলেছি এবং অনেক রসূল যাদের কথা তোমাকে বলিনি।” অতঃপর পূর্ববর্তী কোন নবীর অনুসারীদের মনে কোনরূপ মনঃকষ্ট থাকার কথা নয়। রসূলুল্লাহ (সা) এভাবে নিজেকে 'সমস্ত বিশ্বের রহমত' রূপে প্রমাণিত করেছেন।
পূর্ববর্তী ধর্মগুলোতে গোলক-ধাঁধার সৃষ্টি হওয়ায় তা ধর্মযাজক ও ধর্মমন্দিরের পাণ্ডাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। ইসলামের নবী ঘোষণা করলেন, ধর্ম একটি সহজ ও সহজাত বস্তু। এর সাথে প্রতিটি মানুষ সরাসরি সম্পর্কিত। তিনি একটি মৌলিক ধর্ম তথা সকল ধর্মের সারকথাও মানুষের সামনে পেশ করলেন। আর তা হলো, মানুষ জন্ম থেকে, অন্ততঃপক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিজের জন্য নিজেই দায়ী। তাঁর ধর্ম হলো, "কেউ আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাস করলে এবং সৎকাজ করলে তার কোন ভয় নেই এবং সে দুঃখিতও হবে না"-(৫ঃ ৬৯), আর "আল্লাহ কারো উপর এমন কোন কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না যা তার সাধ্যাতীত...।” (২: ২৮৬)
ইসলামের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এ একই সাথে এবং একই সময়ে ইহকাল পরকালের মঙ্গল কামনা করে। আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং অন্তর পরিশুদ্ধির জন্য তওহীদের (একত্ববাদের) চাইতেও উৎকৃষ্টতর কোন পন্থা আছে এমন কথা কল্পনাও করা যায় না। যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহতে বিশ্বাসী হয়, মঙ্গলামঙ্গলের ব্যাপারে একমাত্র তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে ক্ষমতার অধিকারী মনে না করে এবং পরকাল ও বিচারদিনকে বিশ্বাস করে তাহলে এই বিশ্বে অপরাধ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব না হলেও সুকঠিন নিশ্চয়ই হবে। প্রতিটি লোকের বিশ্বাসের দৃঢ়তা তার কাজকর্মে ফুটে উঠে। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, আল্লাহর পথে জিহাদ প্রভৃতি নির্দেশ এমনি যে, এগুলো পালনের মধ্য দিয়ে মানুষ সম্মান এবং মর্যাদার ক্ষেত্রে ফেরেশতাদেরকেও ছাড়িয়ে যায়। যার মধ্যে অবাধ্য হওয়ার ক্ষমতাই নেই (যেমন ফেরেশতা) সে জড় পদার্থের মত কোন কাজ করলে সে কাজের জন্য শাস্তি বা পুরস্কার কোনটিই পাবে না। আর যার মধ্যে একই সময়ে পাপ-পুণ্যের ক্ষমতা রয়েছে এবং সে তার ক্ষমতাকে শুধু পুণ্য কাজে নিয়োজিত করে সে নিঃসন্দেহে সৃষ্টির সেরা।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবনে রয়েছে মানবজীবনে সাফল্য লাভের সত্যিকার পথ-নির্দেশ এবং এ কারণেই তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
📄 তথ্য সংগ্রহের উৎস
বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনকথা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে। তথ্যাদি কখনো বেশি হয়, আবার কখনো কম। কখনো কখনো কোন ভাষার শ্রুতিকাহিনী, প্রবাদবাক্য কিংবা অন্য কোন পরোক্ষ উৎস থেকে ঐ ভাষার জাতীয় বীরদের জীবনকথা উদ্ধার করা হয়।
কোন বাদশাহ, রাজনৈতিক ব্যক্তি, কারিগর, পেশাদার, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, সূফী, সংসারত্যাগী, ধার্মিক, ধর্মবিরোধী, বুদ্ধিমান, নির্বোধ তথা যেকোন মানুষের জীবনকথা জানতে হলে এক একটি বিশেষ পদ্ধতিতে সে সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করতে হয়। যেমন কোন স্থপতির জীবন-কথা জানতে হলে তার তৈরী ইমারতের শিল্পগত, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দিক যাচাই করে দেখতে হবে, কোন নেতা ও সংস্কারকের জীবনকথা জানতে হলে দেখতে হবে জনসাধারণের মনের গভীরে তার নেতৃত্ব কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছে এবং কতটুকু স্থায়ী হয়েছে।
আর যদি কোন ব্যক্তি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হন তাহলে জীবনীকারের কাজও বহুমুখী হয়ে পড়ে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন ব্যক্তির দৈহিক অবস্থা, বুদ্ধিগত ঊর্ধ্বমুখিতা, পারিবারিক জীবন, সামাজিকতা, বন্ধুদের সাথে ব্যবহার, শত্রুদের সাথে আচরণ, তার সম্পর্কে তার নিজের চিন্তা-ধারণা এবং অন্যদের মন্তব্য মতামত সে ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে যোগায় এক একটি চমৎকার উপাদান।
কোন নবীর মহান জীবনের কার্যাবলী যেমন মানুষের সৌভাগ্যের উৎস, তেমনি সেগুলোকে হুবহু উদ্ধার করাও অত্যন্ত কঠিন। কেননা তাঁর জীবনীতে যেমন পার্থিব ও অন্যান্য ব্যাপার রয়েছে, তেমনি রয়েছে ওহী সম্পর্কিত বিষয়াদি এবং অনেক আলৌকিক ঘটনাও।
দুনিয়াতে শুধু নবী-রসূলই নন বরং এমন একজন মানুষও পাওয়া যাবে না, যার জীবনের ঘটনাবলী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনের ঘটনাবলীর মত এত বিস্তৃত ও বিভিন্নমুখী। রসূল জীবনের তথ্যাদি সংগ্রহের যে সমস্ত উপাদান ও উৎস রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে মোটামুটিভাবে এই ধারণা করা যেতে পারে যে, নবুওত জীবনের ২৩ বছরে তাঁর মুখ দিয়ে যে সমস্ত কথাবার্তা ও আদেশ-নিষেধ নিঃসৃত হয়েছে, তার যে সংক্ষিপ্ত ও সীমিত অংশটি সংরক্ষিত রয়েছে এবং আমাদের কাছে পৌঁছেছে-তাও শুধু হাজার হাজার নয় বরং লক্ষ লক্ষ হাদীসের আকারে বিদ্যমান। যদি তাঁর কার্যাবলী এবং ব্যক্তিগত আচার-আচরণকেও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে অনেকগুলো খণ্ডে শুধুমাত্র সুন্নাত তথা হাদীসের স্থানই সংকুলান হতে পারে।
কোন ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর সাথে সাক্ষাতকারীরাও অনেক তথ্যাদি সরবরাহ করতে পারে। আর হিজরী ১০ সনে, রসূলুল্লাহর বিদায় হজ্জে আরাফার মাঠে তাঁর যে সকল অনুসারী অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের সংখ্যাই ছিল এক লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ এবং যারা অংশগ্রহণ করতে পারেন নি তাদের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই ছিল এর চাইতে কয়েক গুণ বেশি। হাদীসবিশারদদের মতে, সাহাবীদের মধ্যে যারা রসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে কোন না কোন হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের সংখ্যাই এক লক্ষের চাইতে বেশি। বিশ্বের অন্য যেকোন ব্যক্তির জীবনের অবস্থাদির চাক্ষুস সাক্ষী এত বিরাট সংখ্যক লোক হওয়া তা দূরের কথা, এর সহস্র ভাগের এক ভাগও হবে না। রসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাতকারীদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর গুরুজন, আত্মীয়-স্বজন, পরিবারবর্গ, চাকর-ভৃত্য, বন্ধু-বান্ধব এবং হঠাৎ আগমনকারীরা।
রসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর ৬৩ বছরের ঘটনাবহুল জীবনে কত চিঠি-পত্রই না লিখতে হয়েছে। তাঁর নবুওতকালের সাথে সম্পর্কিত আড়াই তিন'শ চিঠি, ইতিহাস এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছে। শুধুমাত্র এই চিঠিগুলোর কথাই ধরুন। তিনি কখন এগুলো লিখেছিলেন, কেন লিখেছিলেন, তার ফল কি হয়েছিল, ইত্যাকার বিবরণী লিপিবদ্ধ করতে গেলেই কয়েক খণ্ড বিরাট পুস্তক হয়ে যাবে।
রসূল-জীবনের তথ্যাবলীর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে তাঁর সমসাময়িক কবিদের কথামালা বা কাব্যগাঁথা। তাদের কথামালার বিষয়বস্তু, ইংগিত-ইশারা, তাঁদের নিরীক্ষা, স্থিরসিদ্ধান্ত, প্রকাশভঙ্গি এবং আরো অনেক বিষয় এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার।
বহির্দেশে রসূলুল্লাহর অবস্থাদির যে বিবরণ পৌঁছেছে সেগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায় সমসাময়িক বহির্দেশীয় ব্যক্তিদের লেখা ভ্রমণকাহিনী সমূহে। অতএব রসূল-জীবনের তথ্যাদি সংগ্রহে ঐ সমস্ত কাহিনীরও কমবেশি ভূমিকা রয়েছে।
অতঃপর রয়েছে রসূল প্রদত্ত শিক্ষা। তাঁর শিক্ষাকে জানতে হলে তিনি কি মিশন নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সেটাকে ফলপ্রসূ করার জন্য কি কি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তার কি প্রভাব পড়েছিল, কিভাবে তাতে তিনি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এনেছিলেন ইত্যাকার বিষয় জানতে হবে। যেহেতু কোন একটি নির্দিষ্ট যুগ সম্পর্কে জানতে হলে তার পটভূমি অবশ্যই জানা চাই, তাই রসূল-যুগ সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা করতে হলে তাঁর নবুওত যুগ এবং সেই সাথে নবুওত পূর্ববর্তী যুগ সম্পর্কেও একটি মোটামুটি ধারণা থাকতে হবে। আর সত্যি কথা বলতে গেলে, রসূলের মত পূত-পবিত্র ও সর্বগুণের অধিকারী একজন মহাপুরুষের জীবন সম্পর্কে অবহিত হতে হলে সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মানবেতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।
কোন ব্যক্তির কৃতিত্বপূর্ণ কার্যাবলীর গুরুত্ব নিরূপণ করতে হলে কাজের সংখ্যা বা পরিমাণ নয় বরং ধরন এবং অবস্থার প্রতিই লক্ষ্য করতে হয়। ১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধে এক কোটি এবং ১৯৩৯ সালের বিশ্বযুদ্ধে চার কোটি লোক মারা গেছে বলে পরিস্খল্যানে প্রকাশ। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে এই দুই মহাযুদ্ধের ততটুকু গুরুত্ব নেই যতটুকু গুরুত্ব রয়েছে বদর যুদ্ধের। অথচ বদর যুদ্ধে দুইপক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা একশ'ও ছিল না। অনুরূপভাবে বহু কোটি টাকার মালিক রকফেলারের এক কোটি টাকা দান করা কিংবা মৃত্যুর সময় উইল করা—ঐ ব্যক্তির মাত্র কয়েক শ' টাকা চাঁদাদানের সমপরিমাণ গুরুত্ব রাখে না যে ব্যক্তিকে, 'এই চাঁদার পর তুমি ঘরে কি রেখে এসেছ?'—এই মর্মে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, 'শুধুমাত্র আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রসূলের মুহব্বত-ভালবাসা ছাড়া কিছুই ঘরে রেখে আসিনি।' উপরন্তু অনেকগুলো ঘটনার তাৎপর্য ততক্ষণ পর্যন্ত বোঝাই যায় না যতক্ষণ না সেগুলোর মূল্যমান নির্ণীত হয়, যতক্ষণ না অবগত হওয়া যায় ঐ অঞ্চলের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা, ঐ অঞ্চলের অধিবাসী ও ঘটনা অংশগ্রহণকারীদের মানসিক অবস্থা, ঐ অঞ্চলের আভ্যন্তরীণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং আরো অনেক বিষয়, যেখানে ঐ সমস্ত ঘটনা ঘটেছে। কোন ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে হলে তার সম্পর্কে তুলনামূলক আলোচনাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এক্ষেত্রে লেখকদের ধর্মীয় বিশ্বাস, উপযুক্ততা, উপাদানের সহজলভ্যতা, পরিস্থিতির আনুকূল্য প্রভৃতিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এই ঘটনা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন যুক্তি ও ফলাফল উদ্ঘাটন করে থাকেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রত্যেকটি সংস্কৃতিবান ভাষায়ই রসূলের জীবনী পাওয়া যায়। কোন কোন ভাষায় তো এই একই বিষয়ের উপর হাজার হাজার গ্রন্থ রয়েছে। পুনরাবৃত্তির কথা বাদ দিলেও প্রত্যেকটি গ্রন্থই কোন না কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য গুরুত্বের দাবি করতে পারে। শুধুমাত্র রসূলুল্লাহর যুদ্ধসমূহের কথাই ধরুন। কেউ এগুলোকে বর্ণনা করেন কাহিনী হিসেবে, কেউ বর্ণনা করেন যুদ্ধ ইতিহাসের বিষয় হিসেবে, কেউ এগুলোকে অধ্যয়ন করেন আন্তর্জাতিক সমর-নীতির উপমা হিসেবে, কেউ এগুলো থেকে উদ্ঘাটন করেন আরব সৈন্যদের মন-মানসিকতা, ধৈর্যশক্তি, বীরত্ব ও অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা অবলম্বনের দক্ষতা, আবার কেউ এগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান করেন অন্য কোন উপাদান।
যে স্থানে কোন ব্যক্তি তার জীবন অতিবাহিত করেন সেখানে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কাহিনী ও প্রবাদ প্রচলিত থাকে এবং এগুলোর মধ্যে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটতে থাকে।
এত প্রচুর উপাদানের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনী লেখক কি করবেন? তাঁকে নিশ্চয়ই এর কোন না কোন দিকের উপর ভরসা করতে হবে। যদি তিনি এতে প্রথম পদক্ষেপেই সফলকাম হন অর্থাৎ গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে সক্ষম হন তাহলে তো ভাল কথা; অন্যথায় তাঁকে নিজ চিন্তাশক্তি ও সাহস অনুযায়ী অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতে হবে।
📄 রসুল (সা)-এর আবির্ভাবকালে বিশ্বের অবস্থা
প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক অঞ্চলে মানব সমাজে দু'টি দলের অস্তিত্ব থাকে। এক দল শুধু পাপাচারে লিপ্ত থাকে না বরং এটাকে একটি সূক্ষ্ম পেশায় পরিণত করে এবং অন্যদল মানব সমাজের এই অবস্থার উপর দারুণভাবে চিন্তিত ও বিচলিত হয়ে পড়ে। আর যেখানে পাপাচার ও চারিত্রিক অধঃপতন যত ব্যাপক হয় সেখানে তত বড় সংস্কারকের প্রয়োজন দেখা দেয়। পূর্ববর্তী নবীদের যুগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোন কোন সম্প্রদায় বা কোন কোন জনবসতির অবস্থা এমনি হয়ে দাঁড়ায় যে, সেখানে দুষ্কর্মকে সাধারণভাবে সুকর্ম বলে মনে করা হয়। তখন অবশ্য বিশ্বের বাকি অঞ্চলের অবস্থা মোটামুটিভাবে সহনীয় থাকে। এমনি পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ তা'আলা ঐ বিশেষ সম্প্রদায় বা বিশেষ অঞ্চলের জন্য নবী-রসূল পাঠিয়ে থাকেন।
রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে বিশ্বের কোন্ কোন্ দেশে সংস্কারকের প্রয়োজন ছিল তা এখন ভেবে দেখতে হবে। একই পিতামাতা অর্থাৎ আদম হাওয়ার বংশধর হওয়া সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান মানবজাতি, জীবিকার প্রয়োজনে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই নিজেদের আত্মীয়-স্বজনকে ছেড়ে দূর-দূরাঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করতে থাকে। অতঃপর নিজেদের আদি বাসভূমির সাথে যোগাযোগ রাখার কোন প্রয়োজন তাদের ছিল না, কিংবা এ ধরনের কোন সুযোগও তারা পেত না। কেননা তখন পরিবহন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অনুন্নত। তাছাড়া প্রত্যেকটি অঞ্চলই খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রে ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। তখন আজকালকার মত এমন অবস্থা ছিল না যে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একে অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষী, কোন অঞ্চলে খাদ্য আছে তো বস্ত্র নেই, কোথাও রুটি আছে তো ডাল নেই, কোথাও লোহা আছে তো কাঠ নেই, কোথাও কয়লা আছে তো পেট্রোল নেই, কোথাও কাগজ আছে তো কালি নেই। আর একমাত্র এ কারণেই প্রাচীন যুগে আন্তর্জাতিক ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। তখনকার নবী ও সংস্কারকগণও আবির্ভূত হতেন একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা বিশেষ অঞ্চলের জন্য। বার্বার সম্প্রদায়ের নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু বার্বারদের মধ্যে, বনি ইসরাইলী নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু বনি ইসরাইলের মধ্যে এবং আর্য সমাজের নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু আর্য সমাজের মধ্যেই সীমবদ্ধ ছিল। মানব সমাজে আন্তর্জাতিক মুখাপেক্ষিতা ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পায় এবং রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে তার ব্যাপকতা এতদূর পর্যন্ত পৌঁছে যে, তখন অভিযান-বিলাসী আরব বণিকরা একদিকে আবিসিনিয়া, মিসর, সিরিয়া এবং অন্যদিকে চীন, ইরান ও ভারতবর্ষে তাদের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যথারীতি যাতায়াত করত। তখন বড় বড় জাহাজ নির্মাণের কৌশলও মানুষের আয়ত্তে এসে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় এমন নবী আসারও প্রয়োজন ছিল যিনি কোন স্থান বা কালের বেড়াজালে আবদ্ধ নন, যাঁর শিক্ষা হবে ব্যাপকধর্মী ও সার্বজনীন এবং এই শিক্ষার মাধ্যমে তিনি শীতাঞ্চল, উষ্ণাঞ্চল, শহরাঞ্চল, গ্রামাঞ্চল তথা বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষকে, চাই তারা স্থায়ী বাশিন্দা হোক অথবা যাযাবর-একই মৌলিক ধর্মের ঝাণ্ডাতলে একত্রিত করতে সক্ষম। তার শিক্ষার মধ্যে মুসতাহাব-নফলের ব্যাপার থাকবে সত্যি। অর্থাৎ এমন কিছু কিছু কাজের উল্লেখ থাকবে যেগুলো করা খুবই ভাল, কিন্তু না করলে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু যে যৎসামান্য অবশ্যকরণীয় কাজের উল্লেখ থাকবে সেগুলোর বাস্তবায়ন তথা কার্যকরীকরণ একটি মৌলিক ও সার্বজনীন ধর্মের কাজ দেবে। অর্থাৎ এই দায়িত্বগুলো এমনি প্রকৃতির হবে যে, তা সকলেই নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে সমভাবে পালন করতে পারবে।
গ্রীস কোন এক যুগে বিজ্ঞান-দর্শনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল এবং সে দর্শনের বন্যাস্রোত প্লাবিত করে ফেলেছিল সমগ্র বিশ্বকে। অতএব এমন একটি উচ্চমানের বিজ্ঞান-দর্শনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, যা মানুষকে গ্রীক দর্শনের গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে রেহাই দিতে পারে। রোম আইনশাস্ত্র এতটুকু অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল যে, রসূলুল্লাহ্র জন্মের মাত্র পাঁচ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণকারী সম্রাট হাবসীনীন রোমীয় আইনকে শৃঙ্খলার সাথে লিপিবদ্ধ করে বিশ্বকে এই মর্মে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেছিলেন যে, ক্ষমতায় কুলালে এর চাইতে উৎকৃষ্ট কোন আইন উপস্থাপিত কর। এভাবে হিন্দুরা, মিসরীয়রা এবং ইরানীরা এমন কিছু কিছু কৃতিত্বপূর্ণ কাজ করেছিল যার দরুন তারা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের মনোজগতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। এমতাবস্থায় প্রয়োজন ছিল মানুষের মনোজগতকে সংস্কারমুক্ত করে তাতে স্বাধীন চিন্তার প্রবাহ সৃষ্টি করা, যাতে তারা নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধি এবং শ্রবণ ও দর্শনশক্তিকে অবাধে কাজে লাগাতে পারে। কেননা আল্লাহ্ তা'আলার উপরিউক্ত অবদানসমূহকে অকেজো করে রাখা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে সেগুলোর সদ্ব্যবহার না করা অতি অনুগত ফেরেশতা কিংবা অতি অবাধ্য শয়তানের পক্ষে মানানসই হলেও সুগঠিত দেহের অধিকারী তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে কখনো মানানসই হতে পারে না। রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে বিশ্বের বড় বড় দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল আমাদের উপরিউক্ত মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সে সম্বন্ধে মোটামুটি জ্ঞান আহরণ করা একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়ে।
চীন
বিশ্বের একেবারে পূর্ব দিগন্তে চীন তার বিখ্যাত সংস্কারক কনফুসিয়াসের (খ্রীস্টপূর্ব ৫৫১ থেকে ৫৪৯) মাধ্যমে দর্শনের এক অপরূপ বন্যা বইয়ে দিয়েছিল সত্যি কিন্তু রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে সেখানকার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছিল; কনফুসীয়াসী ব্যবস্থা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং ভারতের বৌদ্ধ মতাদর্শ সেখানে ঢুকে পড়ে একটি ব্যাপকতর নবযুগের সূচনা করার উদ্যোগ নিচ্ছিলো। সেখানে হুন শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এবং তার স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ওয়াই (WAI) এবং শু (SHU)-দের তিনটি রাজ্য এবং সেখানে এমনভাবে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানবতার সেবা করার কোন সুযোগই আর অবশিষ্ট ছিল না। তখনকার চীন শুধু গৃহযুদ্ধেই নয়, বরং তাতারী এবং তিব্বতীদের উপর্যুপরি আক্রমণে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পর 'সুই' (৫৮৯ থেকে ৬১৮ খ্রীস্টাব্দ) ত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেশের মধ্যে বেশ কিছুটা ঐক্যের সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেও রসূলুল্লাহ্র হিজরতের দু'বছর পূর্বে আবার সেখানে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়। অতঃপর 'টায়াংগ' রাজ পরিবার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অবস্থা কিছুটা আয়ত্তে আসে এবং দেশের মধ্যে মোটামুটি শান্তি-শৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তবে ক্ষমতার বড়াই এবং রাজ্য বিস্তারের অন্ধ মোহ তাদেরকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা থেকে বিরত রাখে (বিস্তারিত 'বিবরণের জন্য এনসাইক্লোপেডিয়া বৃটানিকা ইত্যাদি দ্রষ্টব্য)।
ভারতবর্ষ
খ্রীস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে আর্যরা ভারতবর্ষে আগমন করে। বর্ণপ্রথা, পৌত্তলিকতা, বৈরাগ্যবাদ এবং আরো অনেক কারণে তারা সামাজিকভাবে মানব সেবার সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। কনফুসিয়াসের সমসাময়িক গৌতম বুদ্ধ ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে জোর প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিকার ছিল ঠিকই, কিন্তু বৌদ্ধমতের মধ্যেও বাড়াবাড়ি এবং তা ছিল শুধুমাত্র সাময়িক প্রয়োজন পূরণের জন্য। ঐ মতবাদ দ্রুত প্রসার লাভ করলেও তাতে সর্বকাল-উপযোগী মৌলিক উপাদান ছিল না। ফলে বৌদ্ধমত ও ব্রাহ্মণ্যবাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন আকর্ষণ-প্রতিআকর্ষণ তথা জয় পরাজয়ের খেলা চলতে থাকে এবং পরিণামে বৌদ্ধ মতকে ভারতবর্ষ থেকে অত্যন্ত নির্মমভাবে নির্বাসিত করা হয়।
রসূলুল্লাহর আবির্ভাবের পূর্বে মধ্য এশিয়া ছিল হুনদের শাসনাধীন। কিন্তু রসূলুল্লাহর নবুওত লাভের পাঁচ বছর পূর্বে অর্থাৎ ৫৬৫ খ্রীস্টাব্দে তাদের পরাজয় ঘটে। ফলে ভারতবর্ষ থেকেও তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়। অতঃপর থানেশ্বরের রাজার কনিষ্ঠ পুত্র হর্ষ (৬০৬ থেকে ৬৪৮ খ্রীস্টাব্দ) দক্ষিণ ভারতের অধিকারী হন এবং ক্রমে ক্রমে তিনি বাংলা, নেপাল, মালব, গুজরাট প্রভৃতি দখল করেন। কিন্তু হিজরতের কিছু পূর্বে অর্থাৎ ৬১০ খ্রীস্টাব্দে তিনি দক্ষিণ ভারত আক্রমণ করলে চালুক্য বংশের পুলকেশীর (দ্বিতীয়) হাতে নর্মদা নদীর তীরে পরাজিত হন। তাঁর কোন বংশধর ছিল না এবং তিনি তাঁর প্রজাদের অত্যন্ত আরামপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ফলে তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর সাম্রাজ্যেরও অবসান ঘটে। অতঃপর যুগ যুগ ধরে ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। চালুক্য বংশের হর্ষকে পরাজিত করলেও অন্যদের হাতে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের সাম্রাজ্যেরও চিরবিলুপ্তি ঘটে।
তুরস্ক
তুরস্ক একটি ঘনবসতি ভূখণ্ড। কিন্তু খ্রীস্টীয় সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সেখানকার কোন অবস্থাই জানা যায় না। রসূলুল্লাহর সমসাময়িককালে হুনরা তিব্বতের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং তুর্কীরা বিজয়ী বেশে প্রতীচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। কিন্তু এই তুর্কীরা কোন সভ্যতা সংস্কৃতির অধিকারী ছিল না এবং সামগ্রিকভাবে মানবসেবা করার মত কোন গুণও তাদের মধ্যে ছিল না (এনসাইক্লোপেডিয়া বৃটানিকা দ্রষ্টব্য)।
রোম ও ইরান
গ্রীক শাসনের অবসান ঘটেছিল অনেক আগেই। তার পরিবর্তে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রোমকদের শাসন। কিন্তু যখন তা পশ্চিম ও পূর্ব—এই দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লো তখন আমরা দেখতে পাই যে, রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে জার্মান প্রভৃতি বর্বর জাতি পশ্চিমা রোমকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং ছিনিয়ে নিয়েছে রোমের সিংহাসন। এই নিরক্ষর বর্বরতা মানুষের সাথে যে আচরণ করত তার একটি নমুনা হচ্ছে এই যে, তারা প্রেমের ধর্ম 'ঈসাইয়ত' গ্রহণ করার পরও এমন নির্দয় ও নীতিভ্রষ্ট রয়ে গিয়েছিল, যেমনটি একজন অ-ঈসায়ীর কাছ থেকেও কল্পনা করা যায় না।
অপরদিকে পূর্বরোম, কনস্টান্টিনোপলে রাজধানী স্থাপন করে যুগের পর যুগ ধরে প্রতিবেশী ইরানীদের সাথে যুঝতে থাকে। রসূলুল্লাহর নবুওতের প্রারম্ভিককালে ইরানীরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাত থেকে মিসর, সিরিয়া প্রভৃতি ছিনিয়ে নেয়। তখন কুরআন ঘোষণা করেছিল, “রোমানরা পরাজিত হয়েছে আরব দেশের অতি নিকটবর্তী স্থানে, কিন্তু তারা তাদের এই পরাজয়ের পর শীঘ্রই জয়ী হবে—৩ বছর থেকে ৯ বছরের মধ্যে। পূর্বে ও পরে সর্বদাই আল্লাহ্র আদেশ বলবৎ থাকবে এবং সেদিন মুমিনগণ আল্লাহর এই সাহায্যের কারণে আনন্দিত হবে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন, তিনি মহাক্ষমতাবান, পরম দয়াময়” (৩০: ১-৫)। হিজরী ৬ সনে অর্থাৎ হুদায়বিয়া সন্ধির সময়ে মুসলের রণক্ষেত্রে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের হাতে ইরানীরা এমন শোচনীয় পরাজয় বরণ করে যে, অতঃপর তারা আর কোনদিনই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। এটা ছিল কনস্টান্টিনোপলের রোমকদের (বাইজেন্টাইনীদের) জন্য একটি বিরাট বিজয়। কিন্তু এ বিজয় থেকেও তারা উপকৃত হতে পারল না। কেননা যুগের পর যুগ ধরে বহিরাক্রমণ একদিকে যেমন তাদের দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি ধর্মীয় ফিতনা-ফাসাদও সেখানে দারুণভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।
হযরত ঈসা (আ)-এর মধ্যে শুধু খোদায়ী স্বভাব আছে, না খোদায়ী ও মানবিক উভয় স্বভাবের সংমিশ্রণ আছে—ইত্যাকার দর্শন বাইজেন্টাইনীদের মধ্যে দলাদলি ও রেষারেষির সৃষ্টি করছিল এবং প্রত্যেকটি দলই অত্যন্ত অদূরদর্শী ও সংকীর্ণমনা হয়ে উঠেছিল। তারা একে অন্যের উপর এত অত্যাচার করতে থাকে যে, যখন শাসকদলের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয় তখন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঈসায়ী ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মনেপ্রাণে ঐ অপরিচিত ভিন্নধর্মী মুসলমানদের স্বাগতম জানায় এবং বিভিন্নভাবে সাহায্যও করতে থাকে। এমন কি মুসলমানদের অধীনে থাকাকে তারা তাদের সহধর্মী ঈসাইদের অধীনে থাকার চাইতে অধিক শ্রেয় মনে করত।
(রোমের উত্থান ও পতনঃ গীবন) ইরানের অবস্থাও ছিল তাই। 'সম্পত্তি এবং স্ত্রীলোকের মধ্যে সকলের সমান অধিকার'-মুযদাক প্রবর্তিত ইত্যাকার সমাজতন্ত্র শুধুমাত্র দেশের মধ্যে গৃহযুদ্ধেরই আগুন জ্বালিয়ে রাখেনি বরং সেই সাথে দেশবাসীর চরিত্রকেও ধ্বংস করে দিয়েছিল। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়িয়েছিল যে, মুযদাক প্রকাশ্য দরবারেই সম্রাটকে সম্বোধন করে বলেছিলেন 'এই রাণী থেকে শুধু তুমি কেন, সকলেই উপকৃত হতে পারে।' একথা বলতে তার বিবেকে বাঁধে নি বা তিনি লজ্জাবোধও করেন নি। অতঃপর নওশেরওয়ান যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তিনি তাঁর পিতার বিপরীত কর্মপন্থা গ্রহণ করেন। তখন অগ্নিউপাসকরা মুযদাকতন্ত্রীদের উপর যে অত্যাচার চালায় তা ছিল অত্যন্ত নির্মম এবং পৈশাচিক।
আবিসিনিয়া
আবিসিনিয়াও একটি বিরাট অঞ্চল। আবিসিনীয়রা ইরানীদের কাছ থেকে ইয়ামেন দেশ ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু যখন এই 'হাতীর আরোহীরা' (কুরআনের সূরা ফীল দ্রষ্টব্য) উত্তর আরবের দিকে (নবীর আবির্ভাব বছর) অগ্রসর হয় তখন 'পশুর চর্বিত ঘাস'-এর ন্যায় পর্যুদস্ত হয়ে ভূপৃষ্ঠে লুটিয়ে পড়ে। রসূলুল্লাহর নবুয়তকালে আরব থেকেই তাদের সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে নি, বরং গৃহযুদ্ধ এবং অন্যান্য কারণে খোদ আবিসিনিয়ায়ও তা বিকল হয়ে পড়ে। আবিসিনিয়ার ঐ গৃহযুদ্ধের কারণে সেখানে হিজরতকারী মুসলমানরা সবসময়ই বিচলিত থাকতেন।
মোটকথা, তখন বিশ্বের সর্বত্রই ছিল ধ্বংস, ফিত্না এবং অশান্তি। মহানুভবতা ও মানবতার অভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট। তখন সমগ্র বিশ্বকে একথা খুব ভালভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল যে, তারা একই আদম-হাওয়ার বংশধর। প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল তাদেরকে দেশ, জাতি, বংশ এবং এ ধরনের অন্যান্য সীমিত ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এমন একটি মৌলিক মযহাব বা জীবন ব্যবস্থা পেশ করার যা আঞ্চলিক ও ভাষাগত বৈষম্যের উর্ধ্বে এবং বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত। প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল এমন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের যা প্রতিটি মানুষকে তার ব্যক্তিগত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ করে তুলবে এবং তাকে সর্বপ্রকার সহায়তা প্রদান করবে তার জীবনের মূল লক্ষ্য অর্জনে।
📄 ইসলামী দাওয়াতের কেন্দ্ররূপে আরব ও মক্কাকে নির্বাচনের কারণ
এখন প্রশ্ন হতে পারে, দুনিয়ার সর্বত্রই যখন সংস্কারের প্রয়োজন তখন কোন্ দেশ বা কোন্ অঞ্চলটিকে সংস্কার অভিযানের কেন্দ্ররূপে নির্বাচন করা হবে?
ভৌগোলিক কারণ
বিশ্বের প্রাচীন মানচিত্রের উপর চোখ বুলালে দেখা যাবে যে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এতদ্সংশ্লিষ্ট ভূভাগের মধ্যে আরব উপদ্বীপই ছিল সবদিক দিয়ে কেন্দ্রস্থল হবার যোগ্য। কেননা এটা এশিয়া মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও আফ্রিকা এবং ইউরোপের অত্যন্ত নিকটবর্তী। বিশেষ করে ঐ দুই মহাদেশের তৎকালীন সুসভ্য অঞ্চল গ্রীক, মিসর এবং রোম আরবের কেন্দ্রভূমি মক্কাকে ‘ভূমণ্ডলের নাভি’ আখ্যা দিয়ে পরোক্ষভাবে আরব ভূখণ্ডকেই বিশ্বের কেন্দ্রভূমি হিসাবে মেনে নিয়েছিল।
কোন কেন্দ্র থেকে তার প্রত্যেকটি প্রান্তিক অঞ্চল নিকটতর হয়ে থাকে। ফলে সেখান থেকে সর্বত্র পৌঁছনো যায় অতি সহজে। আবহাওয়া মানুষের স্বভাব এবং চরিত্রের উপর যে প্রভাব বিস্তার করে থাকে তা আজ সর্ববাদীসম্মত। প্রকৃতিগতভাবে শীত প্রধান দেশের অধিবাসীরা প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন, পাহাড় ও মরু অঞ্চলের অধিবাসীরা অধিক পরিশ্রমী এবং উর্বর অঞ্চলের অধিবাসীরা উন্নত সভ্যতা-সংস্কৃতির অধিকারী হয়ে থাকে। হিজায একটি অত্যন্ত সীমিত ভূভাগ, অথচ তার মধ্যে রয়েছে মক্কার মত তরুলতাহীন মরুঅঞ্চল, তায়েফের মত সবুজ শ্যামল প্রান্তর এবং মদীনার মত উর্বরা ভূখণ্ড। এছাড়াও আরো অনেক কারণে হিজায ছিল বিশ্বের মধ্যে তুলনাহীন। আর একটি বিস্ময়কর ব্যাপার এই ছিল যে, এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার সাথে স্বভাবগত সামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্মকালে আরব ঐ তিন মহাদেশের রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কনস্টান্টিনোপলের রোমানরা উত্তর আরব, ইরানীরা পূর্ব আরব এবং আবিসিনীয়রা দক্ষিণ-পশ্চিম আরব দখল করে রেখেছিল। আর আরব ছিল ঐ তিন শক্তি তথা তিন মহাদেশের সঙ্গমস্থল এবং তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রভূমি।
সাংস্কৃতিক কারণ
বিশ্ব ইতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, চরম অবনতি এবং বর্বরতার পরই একটি জাতি দ্রুতবেগে ধাবিত হয় উন্নতির দিকে এবং তাদের হাতেই গড়ে উঠে নতুন সভ্যতা-সংস্কৃতির ভিত্তিমূল। আর যখন কোন জাতি উন্নত ও ঐশ্বর্যশালী হয়ে উঠে তখন তাদের মধ্যে অনাচার দেখা দেয় এবং ক্রমে ক্রমে তাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, তারা নিজেরা আর নিজেদের শোধরাতে পারে না। ফলে বিশ্ব থেকে তাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লোপ পায়। প্রধানতঃ অসভ্য এবং যাযাবরেরা নিজেদের নিঃস্বতা সত্ত্বেও দুনিয়ার সভ্য জাতিগুলোকে পদানত করেছে। জার্মানরা রোমান সাম্রাজ্যকে এবং তুর্কমানরা যে চীনাদের পর্যুদস্ত করেছে তা কে না জানে। অতএব রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগের সভ্য দুনিয়াকেও যে আরবের বেদুইনদের মাধ্যমে শায়েস্তা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল তাতে বিচিত্র কি?
কোন দেশে যখন পুরাপুরি সভ্য ও শহরে জীবন গড়ে উঠে তখন তাতে প্রাণ- সঞ্চারক নতুন চারা উদ্ভুত করার আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু মাঠ- প্রান্তর-বিচরণকারী যাযাবরদের আশেপাশে কোথাও যখন শহুরে জীবনের সূচনা হয় তখন সে এলাকা নিজের দিকে যাযাবরদের আকৃষ্ট করে তড়িৎগতিতে দিগন্ত প্রসারী সভ্যতা-সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। একথাটি আরবদের ক্ষেত্রে বিশেষ- ভাবে প্রযোজ্য।
বিশ্বের তিনটি অঞ্চলে জনসংখ্যার অতিবর্ধন লক্ষ্য করা গেছে। আর সে তিনটি অঞ্চল হলো, গোবি মরুঅঞ্চল, জার্মানী এবং আরব। হাজার হাজার বছর ধরে এই সমস্ত অঞ্চল থেকে দেশত্যাগী জনতরঙ্গ উত্থিত হয়ে আশেপাশের অঞ্চলসমূহে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কেননা এদের মধ্যে জনবসতি উন্নয়নের শক্তি ছিল প্রচুর, কিন্তু জনতার খাদ্য-উপাদানের অভাব ছিল প্রকট। আরব যেহেতু দুনিয়ার কেন্দ্রভূমি, তাই উপরিউক্ত কথাটি আরবদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
আরবে বিশেষ করে হিজাযে তখন পর্যন্ত কোন নবীর আগমন হয়নি। তাই সেখানকার অধিবাসীরাও নিজেদের মননশক্তিকে কোন কাজে নিঃশেষ করে বসেনি। তারা তখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ কর্মস্পৃহার অধিকারী ছিল। নেপোলিয়নের মতে, দেশব্যাপী হাজার হাজার বছর ধরে গৃহযুদ্ধ, অশান্তি এবং বিশৃঙ্খলা বিরাজমান থাকার কারণে কঠোর পরিশ্রম, আত্মোৎসর্গ, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, সারল্য এবং এ ধরনের অন্যান্য উন্নত গুণাবলী দ্বারা-যা একটি উন্নয়নশীল জাতির জন্য অতীব প্রয়োজনীয়-আরবরা পরিপূর্ণভাবে ভূষিত ছিল। অন্যান্য আরো অনেক কারণে-প্রতিশ্রুতি রক্ষা, আত্মসম্মানবোধ প্রভৃতি গুণও ছিল তাদের মধ্যে অত্যন্ত সুদৃঢ়। যাযাবর জীবন যাপন এবং মুক্ত প্রান্তরে বসবাস করার কারণে তাদের দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় ক্ষমতাও ছিল শহরেদের অনুপাতে অস্বাভাবিক ধরনের তীব্র। হাতে গোনা যায়-এমন পনেরো বিশ জন লোকের কথা বাদ দিলে তাদের মধ্যে লেখাপড়ার কোন প্রচলন ছিল না বললেই চলে। তাই তাদের স্মরণশক্তিও ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। মরু অঞ্চলে বসবাসের দরুন তাদের পানাহার ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে ধরনের। তাই বহু বছরেও তাদের মধ্যে কেউ রোগাক্রান্ত হত না।
কৃষিজীবীরা থাকে তাদের জন্মভূমি তথা কৃষিক্ষেতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা অভিযানপ্রিয়তা, যেকোন মুহূর্তে দূর-দূরান্তে গমনের স্পৃহা এবং এ ধরনের অন্যান্য উদ্যোগকেন্দ্রিক গুণের অধিকারী হয় না। শিল্প এবং কারিগরির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের জন্যও তাদের জন্মভূমি যথেষ্ট। তাই তারাও বিদেশ গমনের কথা চিন্তা করে না। শুধুমাত্র বাণিজ্যের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাই বিদেশ গমনে অনুপ্রাণিত হয়। প্রকৃতপক্ষে তাদের পরিবেশই তাদেরকে বিদেশ গমনে বাধ্য করে এবং তারা প্রকৃতিগতভাবে এর উপর অভ্যস্ত হয়ে উঠে। কুরআনের ভাষায়, মক্কাবাসীদের বসতি হচ্ছে একটি 'ক্ষেতহীন' উপত্যকা। এখানে শুধু কৃষি নয়, বরং শিল্প এবং কারিগরিরও কোন সুবিধা নেই। খাদ্য, পরিচ্ছদ সবকিছুই বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। অতএব এমন একটি অঞ্চলের অধিবাসীরা বিদেশ গমনের জন্য সদাপ্রস্তুত থাকবে তাতে বিচিত্র কি।
রাজ্যজয়, রাজ্য বিস্তার এবং শাসন ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে গতিশীলতার (mobility) গুরুত্ব অনস্বীকার্য। যে যুগে একমাত্র সমুদ্রযান ছাড়া কোন যান্ত্রিক পরিবহন ছিল না, যে যুগে বিদ্যুৎ এবং বাষ্পের উপর মানুষ তাদের কর্তৃত্ব খাটাতে পারত না তখন অশ্বই ছিল সবচাইতে দ্রুতগামী পরিবহন। আর উট ছিল একটি অতি উপকারী পণ্যবাহী জন্তু। কেননা শ্রমের ক্ষেত্রে ধৈর্য-সহিষ্ণুতা, পানাহারের ক্ষেত্রে সারল্য ও অত্যল্পতা, ভার বহনের ক্ষেত্রে অসাধারণ ক্ষমতা-সর্বোপরি তার দুধ মাংস প্রভৃতির খাদ্যোপযোগিতা উটকে মানুষের পরম উপকারী সাথীতে পরিণত করেছে। অশ্ব এবং উটের ক্ষেত্রে আরবদের বৈশিষ্ট্যের কথা কাউকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। হাজার হাজার সৈন্য সম্বলিত আরববাহিনী যেরূপ লম্বা পদক্ষেপে এবং তড়িৎ গতিতে মাঠ-প্রান্তর পাড়ি দিয়ে শত্রুসৈন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত তা ইতিহাস-পাঠক মাত্রেরই জানা আছে। আর উট ছিল তাদের ঐ ক্ষিপ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ এবং এই বিশেষ কারণেই যুদ্ধবিশারদরা প্রাচীন আরবদের উপর ছিল দারুণভাবে ইর্ষান্বিত।
চীন এবং ভারতবর্ষের বাণিজ্য-কাফেলা আরব পাড়ি দিয়ে তবে ইউরোপে যেত। আরব বাণিজ্যের উপর কুরায়শদের প্রাধ্যান্য-মিসর, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইয়ামেন, আম্মান, আবিসিনিয়া, ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশের সাথে তাদের চুক্তি সম্পাদন এবং শীত ও গ্রীষ্মকালের বাণিজ্য যাত্রার (রিহলাতাশ্ শিতায়ী ওয়াস্ সাইফ) কারণে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সাথে তাদের সংযোগ রক্ষার কথা সবারই জানা। তাছাড়া অন্যান্য জাতির মন-মেজাজ অনুধাবন, অন্যান্য দেশের রাস্তাঘাট ও অন্যান্য বিষয়ের উপর অবগতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্বের বহু কম লোকই তখন আরবদের সমকক্ষ ছিল।
প্রশাসনিক দক্ষতা
আরবের মক্কা, তায়েফ, অতঃপর মদীনায় কমবেশী যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ছিল, সৌভাগ্যবশতঃ তা ছিল সামাজিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্বকে অবলম্বন করে সেখানে বর্ণবৈষম্যের কোন অটুট বন্ধন গড়ে উঠেনি। ঐ সমস্ত অঞ্চলের সব লোকই ছিল স্বাধীন এবং সমমর্যাদার অধিকারী। শুধুমাত্র জ্ঞানবুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই কাউকে না কাউকে নেতা নির্বাচিত করা হতো। উপরিউক্ত পরিবেশে অভ্যস্ত হওয়ার দরুন যখন আরবরা বিশ্বকে শাসন করার সুযোগ পেল তখন তাদের কাছ থেকেই মানব সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার আশা করা যেত এবং এও আশা করা যেত যে, একমাত্র তারাই বর্ণ, ভাষা এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যকে দূর করতে পারবে। অপরদিকে ব্রাহ্মণ্য মতবাদ, ইরানী মতবাদ ও রোমান মতবাদের মধ্যে যেভাবে শ্রেণীবৈষম্য বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল তাতে ঐসব মতবাদের অনুসারীদের কাছ থেকে সামাজিক সাম্য আশা করা ছিল দুরাশারই শামিল।
ভাষাগত কারণ
আরবী ভাষাও (আরব থেকে নবী নির্বাচনের) একটি কারণ হয়ে থাকবে। কেননা এর মধ্যে ভাব প্রকাশ, সহজবোধ্যতা, শব্দ ঝংকার এবং এতদসংশ্লিষ্ট গুণাবলী, তখনকার পাহলভী, গ্রীক, সংস্কৃত, ল্যাটিন, চীনা এবং অন্যান্য উন্নত ভাষার চাইতে অপেক্ষাকৃত উন্নত ছিল।
ব্যক্তিগত কারণ
কয়েকটি উপকূলীয় অথবা সীমান্তবর্তী অঞ্চল ব্যতীত আরবে এ যাবত কোন বহিঃশক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং সে স্বীয় স্বাধীনতা বজায় রাখার সাথে সাথে চিরদিন বাইরে আশ্রয় গ্রহণকারীদেরও আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছিল। বস্তুতঃপক্ষে বিশ্বকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য পরাধীন মনোবৃত্তির অধিকারী কোন জাতির স্থলে এই জাতিকেই অন্যান্যের উপর শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করা হয় যারা গতানুগতিক স্বাধীনতার চাইতে অধিক স্বাধীনতা কামনা করে।
রসূলুল্লাহ (সা)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে মক্কার অবস্থা
رحلة الشتاء والصيف ভূমণ্ডলের মধ্যস্থলে এবং প্রাচীন বিশ্বের পাশাপাশি তিনটি মহাদেশের কেন্দ্রস্থলেই মক্কানগরীর অবস্থান। অতএব বিশ্বব্যাপী কোন আন্দোলন পরিচালনার পক্ষে এর চেয়ে উত্তম কোন স্থান হতে পারে না। আক্রমণকারীদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে গোপন করে রাখার উদ্দেশ্যেই যেন উষর মরু প্রান্তরে ছিল এর অবস্থান। শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক অভিযানের মাধ্যমে প্রচুর ধন-সম্পদ এসে জমা হতো এখানে। যে মরু প্রান্তরে মহানগরী মক্কা অবস্থিত, সামান্য ভূভাগ ব্যতীত তার চারিদিক অটুট দুর্গের মত দুর্গম ও দুর্জেয় উচ্চ পর্বত শ্রেণী দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রতিরক্ষার জন্যে এর চাইতে উত্তম ব্যবস্থা আর কি হতে পারে? উষর মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তী 'সুজলা সুফলা' তায়েফ নগরীর মিশ্রিত আবহাওয়া এখানকার অধিবাসীদের প্রকৃতিতে এমন সব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর সৃষ্টি করেছিল যার সমাহার অন্যত্র খুব কমই পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে রোমীয়, ইরানীয় ও হাবসী সম্রাটদের দুর্বার আক্রমণের মুখেও আরবরা তাদের ক্ষুদ্র নগর-রাষ্ট্রকে স্বাধীন ও সার্বভৌম হিসেবেই টিকিয়ে রেখেছিল; ফলে কখনো সেখানে বিদেশীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় নি।
মক্কার রাজনৈতিক অবস্থা
মক্কা ছিল স্বায়ত্তশাসিত নগর-রাষ্ট্র। এর আবাসিক এলাকার বিস্তৃতি কয়েক বর্গমাইলের অধিক ছিল না। তবে পার্শ্ববর্তী যেসব অঞ্চলে এর প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল এবং যে স্থানকে মক্কাবাসীরা 'হরম' হিসেবে অভিহিত করত তা প্রায় সোয়া শ' বর্গমাইলের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। এখানে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন গোত্রের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সৃষ্টিকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবের সময় এখানকার নেতৃত্ব কুরায়শ গোত্রের হাতেই ন্যস্ত ছিল। তবে এখানে কখনো কোন ব্যক্তি-শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহের পিতামহ কুসাই অনেকটা বাদশাহের মর্যাদা লাভ করেছিলেন, কিন্তু মৃত্যুকালে তিনি তাঁর সামাজিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতা স্বীয় পুত্রদের মধ্যে বন্টন করে দিলে পর পুনরায় তা কোন একক ব্যক্তির হাতে আর ফিরে আসেনি, ফলে বহু ব্যক্তির শাসনই এখানে চলতে থাকে। 'ইবনে আবদে রাব্বিহি'র মতানুসারে মক্কানগরীতে দশটি গোত্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই দশটি গোত্রের প্রধানগণ প্রত্যেকেই যেন ছিলেন এক একজন মন্ত্রী। তাঁদের মধ্যে বাদশাহ্ কেউই ছিলেন না। খানায়ে কা'বার সংসদীয় বিভাগের দায়িত্ব একজনের উপর ন্যস্ত ছিল, তো অপর জনের উপর ন্যস্ত ছিল এর উপাসনা বিভাগের দায়িত্ব। একজন জাতীয় পতাকাবাহী ও সেনাপতি হিসেবে কাজ করতেন, তো অন্যজন 'যেমান' বা ক্ষতিপূরণের অর্থ নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করতেন।
একজন পররাষ্ট্র দফতরের কাজ করতেন এবং প্রয়োজনবোধে নিজেই রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিদেশে চলে যেতেন। এভাবে কর আদায় ও ব্যয় নির্বাহের দায়িত্বও হয়ত এক একজনের উপর ন্যস্ত ছিল। এই ছিল তখনকার মক্কার শাসনব্যবস্থা। এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলার অবকাশ এখানে নেই। মোটামুটিভাবে বলতে গেলে, বুদ্ধিমান কুরায়শরা এমন একটি বিশেষ ও উন্নতমানের রাষ্ট্রীয় সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, যাতে সংযোজিত হয়েছিল প্রত্যেকটি মৌলিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়। ভাবীকালে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকারীদের মধ্যে এসব গুণ থাকার প্রয়োজনও ছিল।
মক্কাবাসীরা ক্রীতদাস ও ভৃত্যদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত সেনাবাহিনী, যা গোত্রীয় যুদ্ধ-বিগ্রহে অংশগ্রহণ করত এবং নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে বিদেশে গমনাগমন করত। বিচার ব্যবস্থার ব্যাপারে যতটুকু জানা যায় তা হলো, গোত্র-প্রধানরা সাধারণতঃ বিচারকের কাজ করতেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে খানায়ে কা'বায় লটারীর ব্যবস্থা করা হতো এবং কোন কোন সময় লটারীর মাধ্যমে সালিসও নিয়োগ করা হতো। এসব ছাড়াও ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সেখানে একটি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা গঠন করা হয়েছিল। 'হালফুল ফুযুল' নামক এই সংস্থার সদস্যরা পরস্পর অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল যে, নগরীর অভ্যন্তরে স্থানীয় অথবা বিদেশী কারো উপর কাউকে জুলুম করতে দেওয়া হবে না এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তারা অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাবে, যতক্ষণ না অত্যাচারী অত্যাচার থেকে বিরত হয়।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মক্কাবাসীরা আশেপাশের গোত্রসমূহের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। এ ব্যবস্থা সামরিক কারণে যেমন ছিল গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনৈতিক কারণেও তেমনি ছিল অর্থবহ। এটা বাণিজ্যিক কাফেলাসমূহকে নিরপদে গমনাগমনের পথ করে দিত। মক্কাবাসীদের ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তখন এত বেড়ে গিয়েছিল যে, দূর-দূরান্ত তথা মদীনা ও অন্যান্য অঞ্চলের গোত্রসমূহ তাদের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করত।
মক্কায় হাজার হাজার লোকের বসবাস থাকলেও কুরায়শ গোত্রসমূহের নেতৃত্বই ছিল এখানে প্রতিষ্ঠিত। ঐ গোত্রসমূহের মধ্যে দশটি গোত্রই ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। পরবর্তী আলোচনার সুবিধার্থে এখানে শুধু কুরায়শ নেতাদের নাম উল্লেখ করে একটি সংক্ষিপ্ত বংশ-তালিকা দেওয়া হলো।
কুরায়শদের হাতে মক্কার শাসনভার অর্পিত হওয়ার পর তাদের নেতাদের মধ্যে একমাত্র কুসাই-ই ছিলেন উন্নতমানের নেতৃত্বের অধিকারী। তাঁর মৃত্যুর পর প্রশাসন ক্ষমতা তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টিত হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও পরস্পর দ্বন্দ্ব-কলহের সৃষ্টি হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে আবদে মনাফ বংশের বনী হাশিম ও বনী উমাইয়া গোত্রদ্বয়ের মধ্যে প্রতিহিংসা বিরাজমান ছিল। আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর আবু তালিবের দৈন্যদশা ইত্যাদি বনী উমাইয়ার বাহুকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। আবু সুফিয়ানের মত জন্মগত নেতা ও উসমান গণীর মত বাণিজ্য-বিশেষজ্ঞ ছিলেন এই গোত্রেরই লোক। রসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে যদিও হাশিমী বংশোদ্ভূত ছিলেন কিন্তু একদিকে যেমন তিনি আবদুল মুত্তালিবের জ্যেষ্ঠ পুত্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন না, ঠিক তেমনি অন্য কোন প্রচলিত প্রথানুযায়ীও তিনি গোত্রের নেতৃত্ব লাভের অধিকারী ছিলেন না, বরং তিনি ইয়াতীম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং পিতৃব্য কর্তৃক লালিত-পালিত হয়েছিলেন।
এটা নবীকে ছোট করার জন্য নয়, বরং প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা যায় যে, রসূলুল্লাহ (সা) একটি অপেক্ষাকৃত ছোট পরিবারের কনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে নবী হিসেবে গ্রহণ করা বনী উমাইয়া কেন, বনী হাশিমের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হতো। অত্যাচারী পিতৃব্য আবু লাহাবই নয়, পরম হিতৈষী ও পৃষ্ঠপোষক পিতৃব্য আবু তালিবের নিকটও আজীবন নিজের চেয়ে কনিষ্ঠ ব্যক্তির মান-মর্যাদা স্বীকার করে নেওয়া আত্মসম্মানের পরিপন্থী ছিল।
কুরায়শদের অন্যান্য গোত্রেও বিরাট বিরাট ব্যক্তিত্বশালী লোক ছিলেন। মাখযুম গোত্রের আল-ওয়ালিদ বিন আল-মুগীরাহ ও তাঁর পুত্র খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র আবু জেহেল, জাহেলী যুগে এমন সব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যার উল্লেখ না করে উপায় নেই। তাবারীর বর্ণনানুসারে রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন নূবুওতের দাবি করলেন, তখন কুরায়শরা বলে উঠলোঃ 'কুরায়শ-কুসুম' ওয়ালিদই এ কাজের জন্য অধিকতর উপযুক্ত।
খালিদ যদিও অল্পবয়স্ক ছিলেন, কিন্তু তার সম্পর্কে হযরত উমরের মন্তব্য ছিল, "খালিদের মত সন্তান পুনরায় জন্ম দিতে রমণীগণ অক্ষম।” ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও উপস্থিত যেকোন কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী হওয়ার কারণে জাহেলী যুগে আবু জেহেলকে 'আবুল হাকাম' নামে অভিহিত করা হতো। দারুন নাদওয়া-যেখানে চল্লিশ বছরের কম বয়স্ক কোন লোক সদস্য হতে পারত না, সেখানে বিশেষ বিবেচনাধীনে ত্রিশ বছর বয়সেই আবু জেহেলকে সদস্য করা হয়েছিল। অহংকার তার মনের মধ্যে শিকড় গেড়ে বসেছিল। তবে তার জনসেবা ও দানশীলতার কথা ছিল সর্বজনবিদিত। এ সম্পর্কে 'মুনতাকিম' প্রভৃতি গ্রন্থে ইবনে হাবীব অনেক কাহিনী বর্ণনা করেছেন।
তখনকার আরবের সামাজিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও দ্বন্দ্ব-কলহের অবস্থা জানা না থাকলে ইসলাম-বিরোধী কুরায়শ নেতাদের ব্যক্তিগত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা সম্ভব নয়।
শিক্ষা ব্যবস্থা
মক্কায় লেখাপড়ার চর্চা মোটেই ছিল না। শুধুমাত্র দশ-বার জন লোকই লেখাপড়া জানতো। তবে কাব্য, ভাষাশৈলী ও বাগ্মিতার চর্চা ছিল সর্বত্র। আরবী ভাষা শেখার জন্য তারা তাদের শিশু সন্তানদের নিজ গৃহে শিক্ষা- দানের পরিবর্তে বেদুইন পরিবারে পাঠিয়ে দিত। পবিত্র কা'বাগৃহ ছিল মক্কারই জাতীয় উপাসনালয়। সরচিত কবিতা এখানে ঝুলিয়ে রাখা হত এবং তা 'মুআ'ল্লাকাতের' (ঝুলানো কবিতা) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে সবিশেষ মর্যাদা লাভ করত। 'ওকাজ'-এর বার্ষিক আন্তঃআরব সাহিত্য সম্মেলন ছিল কুরায়শ দেরই পৃষ্ঠপোষকতার ফলশ্রুতি। কা'বায় হজ্জ পালন, আরবের ভাষাসমূহের মধ্যে ঐক্য স্থাপনে এবং কুরায়শী অঞ্চলের ভাষাকে মান-নির্ধারক ভাষায় পরিণত করার ক্ষেত্রে নীরব অথচ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিল। এটা কুরায়শদের সাহিত্য চর্চারই ফলশ্রুতি যে, তাদের জন্য হযরত মূসা (আ)-এর শুভ্রহস্তের মু'জিযা কিংবা হযরত ঈসা (আ)-এর ফুঁক দিয়ে জীবনদানের মত অলৌকিক বস্তুর প্রয়োজন ছিল না, বরং এমন একটি উন্নত সাহিত্যিক অবদানের প্রয়োজন ছিল, যা শুনে তারা ভাবের নেশায় ঝিমাতে শুরু করে এবং নিজেদের নজীরবিহীন বিরোধিতা সত্ত্বেও এর তিলাওয়াত শোনার জন্য চুপে চুপে তিলাওয়াতকারীর পিছনে ছুটে।
সাহিত্য-সাধনার প্রতি আরবদের অনুরূপ আসক্তি থাকলেও লেখাপড়ার ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ছিল যেন তাদের বংশ-পরস্পরাগত বৈশিষ্ট্য। তবে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে, বিশেষ করে ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ, ঋণ গ্রহীতাদের নামধাম ও পরিমাণ-পরিমাপ স্মরণ রাখার কারণে বাধ্যতামূলকভাবে তারা তাদের স্মৃতিশক্তিকে এমনি অসাধারণভাবে উজ্জীবিত করে তুলেছিল, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে সত্যি বিরল। এসব কারণেই কুরআনের আয়াতসমূহ এবং সুদীর্ঘ হাদীসসমূহ তারা অবলীলাক্রমেই তাদের স্মৃতিতে হুবহু গেঁথে রাখতে সমর্থ ছিল।
অর্থনৈতিক অবস্থা
ঊষর মরু প্রান্তরের বাসিন্দাদের জীবিকা নির্বাহের জন্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না। শিল্প-কারখানার জন্যে যেসব কাঁচামালের প্রয়োজন ছিল তা তাদের মোটেই ছিল না। এ কারণে তারা তাদের যোগ্যতাকে অত্যন্ত একাগ্রচিত্তে ব্যবসা-বাণিজ্যেই কেন্দ্রীভূত করে নিয়েছিল। তখনকার সমাজব্যবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ঐ পেশা গ্রহণের ফলাফল ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদসংকুল।
আরব ছিল একটি বিরাট মরু অঞ্চল। তাই এ অঞ্চলের প্রতি বহির্বিশ্বের লোকেরা বলতে গেলে, ভ্রুক্ষেপই করত না বরং আরবরাই ছড়িয়ে পড়তো পৃথিবীর দিকদিগন্তে নিজেদের গরজে তথা জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। ভারতবর্ষের মত বিশাল উপমহাদেশের সমগ্র আভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত কুরায়শরাই। তারাই হয়ে উঠেছিল প্রধানত এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের হর্তাকর্তা।
রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রপিতামহ আমর ইবনে আবদে মনাফ (যিনি জনসেবার কারণে 'হাশিম' উপাধি লাভ করেছিলেন) এমন সুদক্ষ ও বিচক্ষণ ব্যবসায়ী ছিলেন যে, রোমের কায়সার, ইরানের কিস্সা, আবিসিনিয়ার নাজ্জাশী ও ইয়ামনের আকইয়ালের নিকট থেকে, তাদের দেশে পণ্যসামগ্রী নিয়ে গমনাগমনের 'অবাধ অনুমতি' ( ইলাফ ) লাভ করেন। মক্কা হতে ইরাক ও ওমান (যেখান থেকে সমুদ্রপথে বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও হিন্দুস্তানের সাথে যোগাযোগ করা যেত), ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, মিসর, আবিসিনিয়া (হাবশা), ইয়ামন তথা হাজার হাজার মাইল দূরবর্তী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রান্তে প্রান্তে رحلة الشتاء والصيف তথা শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যাভিযান পরিচালিত হত। এই বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধেও অনুরূপ বাণিজ্যের কল্পনা অনেকটা লোমহর্ষক ব্যাপার বলেই মনে হয়। কিন্তু কুরায়শ বণিকরা সেই প্রাচীন যুগেও এ ধরনের বাণিজ্যাভিযান সাফল্যজনকভাবে পরিচালনা করত। রাস্তার দূরত্ব অতিক্রম, ক্ষুধাতৃষ্ণা ও উপবাসের সাথে লড়াই ছাড়াও তাদেরকে পথে অভাবগ্রস্ত অথচ দুর্ধর্ষ গোত্রসমূহের সাথে বরাবরই মুকাবিলায় নামতে হত। এসব কারণে তারা বিভিন্ন দেশ ও গোত্রের সাথে শক্তিশালী 'মৈত্রী চুক্তি' সম্পাদন ও নিজেদের লোক নিয়ে রক্ষীবাহিনী গঠনের ব্যবস্থা করেছিল। আরবের যেকোন বণিককে পণ্যসামগ্রী নিয়ে হিজায, নজদ ইত্যাদি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকরী মিসরীয় গোত্রসমূহকে অতিক্রম করার সময় কুরায়শী রক্ষীবাহিনীর ছত্রছায়া গ্রহণ করতে হত। 'ত্বাই' ও 'কলব' গোত্রদ্বয়ের সাথে কুরায়শদের মৈত্রীচুক্তি ছিল। উত্তর আরবের খায়বর ও দুমাতুল জন্দরের বিশেষ বিশেষ স্থানে ওরা বসবাস করত এবং তাদের অঞ্চল দিয়েই ইরাক, সিরিয়া ও মিসরের পথ অতিক্রম করতে হত। বনী আমর ইবনে মারশদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কারণে রাবীয়া অঞ্চলটিও ছিল কুরায়শদের জন্য নিরাপদ। ফলে বাহরাইন, ওমান তথা সমগ্র পূর্ব আরবের উল্লেখযোগ্য স্থানসমূহে গমনাগমনের সুযোগ তারা লাভ করেছিল। যে কেউ বাণিজ্য ব্যাপদেশে বাহরাইনের মুশকর মেলায় যেতে চাইলে তাকে কুরায়শের রক্ষীবাহিনীকে অবশ্যই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হত। মুহরা ও হাদ্রামাউত-এ দুটি এলাকা দক্ষিণ আরবে অবস্থিত। মুহরা বাজারে যেতে হলে বনী মুখাবির গোত্রের রক্ষীবাহিনী সংগ্রহ করতে হত। হাদ্রামাউতের রাবিয়া হাটে যেতে হলে কুরায়শরা সংগ্রহ করত আকলুল মুরামের রক্ষীবাহিনী এবং অন্যরা সংগ্রহ করত কানদাহের আলে মাসরূকের রক্ষীবাহিনী। কিন্তু কুরায়শদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে আকলুল মুরাম, অন্যান্য গোত্রের উপর অপেক্ষাকৃত অধিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। মোদ্দাকথা, আরবের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্যভাগ তথা সব অঞ্চলই ছিল কুরায়শদের অবাধ বাণিজ্য শিকলে আবদ্ধ। কুরআন করীমে তাদের মেলা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সাফল্যকে বর্ণনা করা হয়েছে উপবাসের স্থলে আহার এবং সন্ত্রাসের স্থলে নিরাপত্তা-এ কয়টি চমৎকার শব্দ দ্বারা (اطعمهم من جوع وامنهم من خوف)
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ কোন না কোনভাবে কুরায়শদেরকে সমগ্র আরবের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দান করেছিলেন। হজ্জের জন্য কা'বায় এবং আরাফাতের ময়দানে আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার লোক এসে ভিড় করত। এটাও ছিল বহির্দেশের সাথে আরবদের যোগাযোগ সৃষ্টির একটি সুবর্ণ সুযোগ। উল্লেখিত কারণেই অন্যান্য দেশে গমনাগমনে তাদের দুশ্চিন্তার কোনই কারণ ছিল না।
ধর্মীয় অবস্থা
মক্কাবাসীরা ছিল প্রতিমা পূজারী, কিন্তু প্রতিমাকে তারা আসল আল্লাহ্ নয় বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম বলেই মনে করত। আসলে তারা আল্লাহকে আসমান যমীনের সৃষ্টিকর্তা এবং একক ও অদ্বিতীয়ই মনে করত। প্রতিমাদের প্রতি তাদের মনোভাব যে অত্যন্ত সহনশীল ছিল তা অবশ্য পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। এজন্য কা'বাগৃহে তাদের স্থানীয় মূর্তি 'হাবলই' কেবলমাত্র স্থান পায়নি, বরং সাফা- মারওয়াসহ কা'বার অভ্যন্তরে ও অঙ্গন-প্রাঙ্গণে সমগ্র গোত্রের ৩৬০টি মূর্তি অধিষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়া কা'বাগৃহের অভ্যন্তরে এসব প্রতিমা ও প্রতিকৃতি ছাড়া শুধুমাত্র হযরত ইবরাহীম (আ)-ই নয় বরং হযরত মারইয়াম (আ) ও হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতিকৃতিও স্থান পেয়েছিল। এতে বোঝা যায়, য়াহুদী ধর্মের প্রতিও আরবদের সম্পর্ক ছিল সহানুভূতিশীল। তাদের একই পরিবারে কেউ ছিল প্রতিমাপূজারী, কেউ ছিল খৃস্টান, কেউ ছিল নাস্তিক, আবার কেউ ধর্ম-নিরপেক্ষ। এসবের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে 'মুআরিফে ইবনে কুতায়বা' ও আরযাকীর 'তারিখে মক্কা' ইত্যাদি গ্রন্থে।
মূর্তিপূজার সাথে সাথে বার্ষিক হজ্জের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিও তারা পালন করত। কা'বাগৃহের তাওয়াফ-ও-আরাফার ময়দানে উপস্থিত হওয়া ছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে তারা যোগ দিত। ধর্মনীতির সাথে যে অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এ তথ্য সকল দেশে ও সকল যুগেই মানুষের বোধগম্য ছিল। হজ্জের মওসুমে অনুষ্ঠিত আন্তঃ আরব মহাবাণিজ্যিক মেলায়ও এর পরিষ্কার প্রমাণ মেলে। কেবলমাত্র হজ্জের মাসই (যিলহজ্জ) নয় বরং হজ্জপূর্বে একমাস এবং হজ্জ-উত্তর একমাস- এই মোট তিনমাস এ মেলা জারী থাকত। এ মাসত্রয়কে 'হারাম মাস' বলা হত এবং এ সময়ে হত্যা ও রক্তপাত সর্বতোভাবে ছিল হারাম বা নিষিদ্ধ। এমন কি হত্যার প্রতিশোধ পর্যন্ত নেওয়া হত না এই সময়কালে। যিলহজ্জের মহামেলায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর মক্কায় আগমন ও মেলাশেষে পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে স্ব স্ব দেশে প্রত্যাগমনের পক্ষে তিন মাসের অধিক সময়ের প্রয়োজনও ছিল না। এ দীর্ঘ নিরাপদ সময়ে যেসব মেলা ও উৎসব উদযাপিত হত, তার সবগুলোরই কেন্দ্রস্থল ছিল মহানগরী মক্কা। সুতরাং মহানগরী মক্কার গুরুত্ব কোন মতেই খাটো করে দেখা চলে না।
চরিত্র ও আচার-আচরণ
ইসলামের আবির্ভাবের ঠিক পূর্ব-মুহূর্তে তখনকার সভ্য জাতিসমূহের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে যেসব বাঞ্ছিত সদ্গুণ বিদ্যমান ছিল, তার সব কয়টিই বিদ্যমান ছিল আরববাসীদের মধ্যে। তারা ছিল একাধারে দানশীল, বীর, অভিযান-প্রিয়, কষ্টসহিষ্ণু এবং দূরদূরান্ত সফরে অভ্যস্ত। সততা ও বিশ্বস্ততা-রূপ গুণাবলীকে তারা অত্যন্ত আপন করে নিয়েছিল। অঙ্গীকার পালনেও ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। মোটকথা তাদের মধ্যে সব গুণই ছিল কিন্তু সবকিছুই যেন এক অজানা পর্দার অন্তরালে। তাদের শক্তি-সামর্থ্য ছিল কিন্তু তা সঠিকভাবে প্রয়োগ না করায় তার তেমন কোন মূল্যই ছিল না। জীবন হরণ ও জীবনদানে তারা কুণ্ঠাবোধ করত না, তবে আদর্শহীনতার ফলে এই মহান গুণাবলী তাদেরকে মহীয়ান করে তোলার চাইতে বরং পশুর কাতারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল। তারা চিন্তাশক্তির অধিকারী ছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে স্থিরতার অভাব ছিল প্রকট। তাদের সামনে এমন কোন জীবনাদর্শ ছিল না, যার মাধ্যমে তারা বিশ্বমানবতার সেবায় সত্যিকার কোন অবদান রাখতে পারে। তাদের বীরত্ব ছিল, কিন্তু তা ছিল গৃহযুদ্ধের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত; ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ ছিল, কিন্তু তা ছিল কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবরস্থ করার ক্ষেত্রে, বদান্যতা ছিল কিন্তু তা ছিল নীতি বহির্ভূত তথা শুধুমাত্র বিত্তবানদের মধ্যে পারস্পরিক আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণের ক্ষেত্রে; তাদের সাহিত্য প্রতিভা ছিল, কিন্তু তা কেন্দ্ৰীভূত ছিল শুধুমাত্র সৌখিন কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে। মোদ্দাকথা, কোন মহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে নয় বরং সাধারণ ও নগণ্য উদ্দেশ্য লাভের জন্যই তারা সর্বদা ব্যস্ত থাকত। তারা যেন খরগোস শিকারের জন্য বাঘের অস্ত্র ব্যবহার করছিল। তারা যেন পশু হিসেবে জন্মলাভ করত এবং আহার-বিহার শেষে পশুর দুনিয়া থেকে বিদায় নিত। তাদের জন্ম বা মৃত্যুতে বিশ্বমানবতার যেন কিছুই যেত আসত না।
কিন্তু আরবদের যোগ্যতার উৎকর্ষ সাধন করে তাদেরকে সুসংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করে তুলে দুনিয়ার বুক থেকে যাবতীয় অন্যায় অবিচার নিশ্চিহ্ন করার এবং একমাত্র আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করার প্রতি। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সবকিছুর প্রভুত্ব খতম করে সারা দুনিয়ায় শান্তি ও স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করাই ছিল ইসলামের উদ্দেশ্য। এ মহৎ উদ্দেশ্য সাধন ও এ গুরুত্বপূর্ণ আঞ্জাম দেওয়ার জন্যে তখনকার দিনে সারা বিশ্বে কুরায়শদের চেয়ে অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য কোন জাতিই ছিল না।
হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে শেষ নবী হিসেবে নির্বাচনের কারণ
মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ যখন যাকে দিয়ে ইচ্ছা, যেকোন কাজ করিয়ে থাকেন। তাঁর ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা নেই—নেই তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো টু শব্দ করারও সাধ্য। অধিকার। তাঁরই নির্দেশিত হচ্ছে বিশ্বজগৎ। এ জগৎ অত্যন্ত বাস্তব, এতে কিছুই অবান্তর বা অহেতুক নেই।
মক্কা ও মক্কাবাসীদের সম্পর্কে উপরে যেসব আলোচনা করা হল তাতে পরিষ্কার বোঝা যায়, বিশ্বব্যাপী কোন আন্দোলন পরিচালনার জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান ছিল আরব এবং আরবের মধ্যে হিজায, আর হিজাযের মধ্যে মহানগরী মক্কা।
মক্কায় কুরায়শদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল সর্বজনস্বীকৃত। তবে বিশেষজ্ঞদের গবেষণালব্ধ অভিমত হলো, নেতৃত্বের ধারা কোন বিশেষ বংশের মধ্যে দীর্ঘদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকলে মাটির উর্বরাশক্তির মত সে নেতৃত্বের যোগ্যতা ও প্রখরতাও ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব নিঃসন্দেহে একজন নেতা ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায়ই রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিতা আবদুল্লাহ পরলোকগমন করেন।
সুতরাং আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর কোলে যে সন্তান জন্ম নেয়, বাস্তবতার নিরিখে সে সন্তানের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লাভের কোনই সম্ভাবনা ছিল না। উপরন্তু আবদুল মুত্তালিবের ইন্তেকালের পর সম্পদ ও বৈষয়িক জ্ঞান ইত্যাদির অভাবে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব কুরায়শদের অন্যান্য শাখায়—বিশেষ করে বনী উমাইয়াদের হাতে চলে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় বনী হাশিম ও বনী মুত্তালিবের নেতৃত্বও আবদুল মুত্তালিবের কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহ লাভ করতে পারেন নি, যার ফলে তাঁর একমাত্র ইয়াতীম সন্তানের পক্ষেও পিতার পক্ষ থেকে উত্তরাধিকারীসূত্রে কোনরূপ নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব লাভের আশা আকাশ-কুসুম কল্পনা ছাড়া কিছু ছিল না। রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্মের কয়েক বছর পর আবদুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করলে আবু তালিব বংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সামাজিক নেতৃত্বের যোগ্যতা যতটুকু ছিল, বাণিজ্যিক নেতৃত্বের যোগ্যতা ততটুকু ছিল না। নেতৃত্বকে সম্বল করে বৈষয়িক সম্পদকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয় তা তিনি জানতেন না। আবূ তালিবের সন্তানরাও নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন ছিল না; তাই তারা তাদের পিতার মৃত্যুর পর তাদের নিষ্ঠুর চাচা আবু লাহাবের কাছ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিতে পারেনি।
রসূলুল্লাহ্ (সা) হিজরত করতে বাধ্য হলে দারিদ্র্যের কারণে আকিল বিন আবু তালিব রসূলুল্লাহ্ (সা) তথা বিবি খাদীজার বাড়ীঘর পর্যন্ত বিক্রি করে ফেলুতে কুণ্ঠাবোধ করেন নি। যা হোক, নেতৃত্বের খুন তাদের ধমনীতে প্রবাহিত থাকলেও নেতৃত্ব লাভের সম্ভাবনা তাঁদের যেন অবশিষ্ট ছিল না। এমতাবস্থায় পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে যে ব্যক্তি নেতৃত্ব গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে সে কিছুটা অতুলনীয় গুণাবলীর অধিকারী হয়ে থাকে। অহংকার, শঠতা, আরামপ্রিয়তা, অদূরদর্শিতা ইত্যাদি যেসব নেতৃত্ব-প্রতিকূল দোষত্রুটি আছে তা থেকে সে থাকে মুক্ত। পিতামাতার আদর-যত্ন, সহচরদের তোষামোদ, ব্যক্তিগত ভোগবিলাস ইত্যাদি কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারে না। এ পরিস্থিতিতে একটি কনিষ্ঠ পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানও সারা বংশের আশার আলোতে পরিণত হতে পারে।
উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ অন্যান্য ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকাটা অস্বাভাবিক ছিল না, কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারটা ছিল আরো স্বতন্ত্র আরো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ইয়াতীম হিসেবে জন্মগ্রহণ করার কারণে স্বাভাবিক অহংকার ও স্নেহমমতা থেকেও তিনি বঞ্চিত ছিলেন। গোত্রীয় প্রথার কারণে তাঁকে মায়ের তত্ত্বাবধান ও মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে হয় এবং কয়েক বছর পর্যন্ত অপরিচিতা ধাত্রী হালিমার কোলে ভিন্ন পরিবেশে সম্পূর্ণভাবে একজন বেদুঈনের জীবন যাপন করতে হয়। বিবি হালিমার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল না থাকায় তাঁর পরিবারের সবার পক্ষে মিতব্যয়ী ও স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। যেকোন শিক্ষাগ্রহণের অনুকূল ও উপযুক্ত সময় বাল্যকাল। আর বেদুঈন যাযাবর জীবন পরিবেশের চেয়ে অধিক অনুকূল পরিবেশ আর কি থাকতে পারে যা মানুষকে 'সার' বিশ্বই আমার জন্মভূমি'-এ উদার শিক্ষা দিতে পারে? কোথাও নির্দিষ্ট কোন গৃহ নেই, এমনকি নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ড নেই যেখানে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় পানি ও আশ্রয়স্থল পাওয়া গেল সেখানেই তাঁবু খাটানো হল-আবার যখন প্রতিকূল আবহাওয়া দেখা দিল অর্থাৎ অঞ্চলটি অনুর্বর হয়ে উঠল তখন সেখান থেকে তাঁবু উঠিয়ে আল্লাহর বিশাল পৃথিবীর অন্য যেকোন অনুকূল স্থানের দিকে যাত্রা শুরু হলো-এই ছিল মরুবাসী বেদুঈনের জীবন-ধর্ম।
কয়েক বছর এ ধরনের উন্মুক্ত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠার পর রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন, তার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের মাতা ও পিতামহের স্নেহমমতা থেকেও চিরবঞ্চিত হন। সুতরাং বাধ্য হয়েই তিনি অধিক সন্তানের অধিকারী পিতৃব্য আবূ তালিবের গৃহে আশ্রয় নেন। অতএব এ ধরনের একজন ব্যক্তিত্বের মধ্যে নেতৃত্বের অহমিকা দেখা দেওয়া কল্পনারও অতীত ছিল।
মাতামহের দিক দিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সম্পর্ক ছিল মদীনাবাসীদের সাথে এবং মামাদের দিক দিয়ে ছিল তায়েফবাসীদের সাথে। মক্কা, মদীনা, তায়েফ-এ তিনটি নগর প্রাকৃতিক ও মানবিক উভয় দিক দিয়েই ছিল ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এ তিনটি নগরের সাথে সমপরিমাণ সম্পর্ক রাখার কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিজের সীমিত জন্মভূমির পরিবর্তে অসীম বিশ্ব আবাসভূমির প্রতি স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হতে দেখা গিয়েছিল। বস্তুতঃ একজন বিশ্ব পথ-প্রদর্শকের জন্য এর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
স্বগৃহে প্রত্যাবর্তনের পর রসূলুল্লাহ (সা)-কে বাল্যকালেই পশু চরানোর কাজ করতে হত। নির্বাক ও নিরীহ মেষ-ছাগল রাখালীর মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছিল তাঁর মধ্যে সদাতৎপরতা, দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা, নম্রতা ও কষ্টসহিষ্ণুতার মহৎ গুণাবলী। 'জাতির সেবকই জাতির নেতা'-এ শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি উপরিউক্ত কাজের মাধ্যমেই। এখানেই তিনি লাভ করেছিলেন হিদায়াতের ও নেতৃত্বের সত্যিকার গুণাবলী।
পশু চরানোর কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তাঁকে আত্মনিয়োগ করতে হয় ব্যবসা-বাণিজ্যে। ক্রেতাদের মনোবৃত্তির পরিচয়, সুস্থ মানসিকতার পরিমাপ, সততা, কষ্টসহিষ্ণুতা ইত্যাদি ব্যবসায়ের অপরিহার্য গুণাবলী তিনি এভাবেই লাভ করছিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে রসূলুল্লাহ্ (সা) ছিলেন একজন উত্তম ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করার পর শীঘ্রই তাঁকে ফিলিস্তিন, ইয়ামেন ও ওমানের মত উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের আনাচে-কানাচে সফর করতে হয় এবং রোমীয়, ইরাকী ও হামিরীয় অঞ্চলসমূহে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ তথ্যটি কতটুকু সত্য জানি না, তবে কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে রসূলুল্লাহ (সা) আবিসিনিয়া গমন করেছিলেন এবং সমুদ্র সফরও করেছিলেন। অতএব এ ধরনের দেশ-বিদেশে ভ্রমণকারী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের উপর চল্লিশ বছরের পরিপক্ব বয়সে নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পিত হলে তিনি তা অন্য যেকোন ব্যক্তির চাইতে যে উত্তমতাবে সম্পাদন করতে পারবেন তা বলাই বাহুল্য।
প্রশিক্ষণ মানুষকে সত্যিকার মানুষে পরিণত করে-বিকশিত করে তার মানবীয় প্রতিভাসমূহকে। এখন লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এসব ছাড়া রসূলুল্লাহ (সা)-এর মধ্যে আর কি কি প্রাকৃতিক প্রতিভার সমাবেশ ঘটেছিল?
দুর্বলকে সাহায্য করা, সত্য প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামিতা, সত্য গোপনে পশ্চাৎগামিতা, সারল্য, সদাচার, একনিষ্ঠতা, বদান্যতা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা ইত্যাদি গুণ অর্থাৎ 'অনুপম চরিত্রের' প্রতিটি গুণই প্রকৃতি তাঁকে দান করেছিল অকৃপণ হস্তে। শৈশবকাল থেকেই এসব গুণ তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। উপরে যেসব বিপদাপদ ও প্রতিকূল অবস্থার কথা আলোচনা করা হয়েছে, তা রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে এমনভাবে সহনশীল করে তুলেছিল, যার দরুন নবুয়ত লাভের পূর্বেই জনগণ তাঁকে 'আল-আমীন' উপাধিতে ভূষিত করে পরোক্ষভাবে তাঁর নেতৃত্বকেই স্বীকার করে নিয়েছিল। আবু তালিবের নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে:
স্ফটিক বর্ণ সে, তার মুখমণ্ডলের দোহাই দিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করা হয়। সে নিঃস্ব অনাথের শরণ, সে দুঃখিনী বিধবার রক্ষক।
এ কবিতাটি রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মানবিক গুণাবলী ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সাক্ষ্য বহন করে। এসব গুণের কোন কোনটি অন্যদের মধ্যেও থাকতে পারে, কিন্তু একই সাথে সব কয়টি অন্য কারো মধ্যেই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বনবী ও শেষ নবীর দায়িত্ব পালনের জন্য যিনি আদিষ্ট হবেন তাঁর মধ্যে এসব গুণের বিদ্যমানতা ছিল অনস্বীকার্য।
রসূলুল্লাহ (সা)-এর আবির্ভাব
পৃথিবীতে কাজের মাধ্যমেই মানুষ উত্তম অথবা অধমে পরিণত হয়। বিশ্ব বিজয়ী আলেকজাণ্ডার ও দার্শনিক প্লেটোর সন্তান-সন্ততির খবর কেউই রাখে না, মহান সিজার ও এরিস্টটলের পিতামাতা কে ছিলেন এ নিয়েও কারো মাথাব্যথা নেই। মানুষ কেবলমাত্র জানতে চায় এঁরা কি করে গিয়েছেন এবং এঁদের কার্যধারা কি ছিল। সুতরাং এটা সন্দেহাতীত সত্য যে, একমাত্র কাজই মানুষকে অপ্রত্যাশিত সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে।
ভবিষ্যতে কে কোন্ মর্যাদার অধিকারী হবেন-এ নিয়ে সমসাময়িক লোকেরা সাধারণত চিন্তা-ভাবনা করে না। এজন্যে অনেক মূল্যবান তথ্য চিরদিনের জন্য সকলের কাছে অজানাই থেকে যায়। হযরত মুহাম্মদ (সা) যে 'রাহমাতুল্লিল 'আলামীন' (বিশ্বের করুণা) হবেন, এটা মূর্খ আরব সমাজের কেউ জানত না। তাঁর নবী জীবনের সূচনা হয়েছিল পূর্ণ চল্লিশ বছর বয়সে। সুতরাং যারা তাঁকে বাল্যাবস্থায় দেখেছিলেন এবং তাঁর সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশিই এ সময়ে পরলোকগমন করে। এছাড়া যারা ছিল সমবয়সী, তারা বাল্যকাল সম্পর্কে কতটুকুই বা স্মৃতিচারণ করতে পারে। অধিকন্তু আমরা এমন এক দেশের ঘটনাবলী লিখতে যাচ্ছি, লেখাপড়ার প্রতি যে দেশের অধিবাসীদের মোটেই অনুরাগ ছিল না। অতএব পারিবারিক ডায়েরী ও বন্ধু-বান্ধবদের রোজনামচার উপর কতটুকু ভরসা করা যায়, তা সহজেই অনুমেয়।
যা হোক, হিজরী-পূর্ব ৫৩ সালের (৫৭০ খ্রীস্টাব্দে, মতান্তরে ৫৭১ খ্রীস্টাব্দে) ঘটনা। বিশ্বনবীর শুভাগমন উপলক্ষে বিশ্বজগৎ আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠে। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়ই তাঁর পিতা এ নশ্বর জগৎ ত্যাগ করে পরলোকে পাড়ি জমান এবং মাতা বিধবা হয়ে শ্বশুরালয়েই অবস্থান করেন। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর সঠিক জন্ম-তারিখ নিয়ে বিরাট মতপার্থক্য রয়েছে, তবে আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য এর কোন গুরুত্ব নেই। সুন্নী মুসলমানরা বারই রবিউল আউয়াল তারিখে 'ঈদে মিলাদুন্নবী' উদযাপন করে থাকেন।
রসূলুল্লাহ্র জন্মকালে সারা বিশ্বের অবস্থা ছিল বিপদসংকুল। মানবতার আর্তনাদ তখন সর্বত্র। আল্লাহ্ তা'আলার করুণা হলো। তিনি একজন 'রাহমাতুল্লিল 'আলামীন' পাঠালেন—যিনি এসে মানুষকে পশুত্ব ও শয়তানের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিলেন এবং কিভাবে প্রকৃত মানুষ ও আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হওয়া যায়; তা হাতে কলমে দেখিয়ে দিলেন।
মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারের। যা আজো বড় বড় পরিবারে প্রচলিত আছে। প্রথা ছিল, তারা তাদের শিশু সন্তানকে বেদুঈন ধাত্রীর নিকট সমর্পণ করত এবং কয়েক বছর জঙ্গলের মুক্ত প্রান্তরে ও স্বাধীন পরিবেশে প্রতিপালিত হওয়ার পর স্বগৃহে নিয়ে আসত। শিশুদেরকে দেখানোর বাহানা করে অতিরিক্ত পুরস্কার লাভের আশায় ধাত্রীরা তাদের পালিত শিশুকে কয়েকমাস পর পর দু'চার দিনের জন্য তাদের আসল মায়ের কাছে নিয়ে আসত।
ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রসূলে করীম (সা)- কেও ধাত্রী মায়ের নিকট সোপর্দ করা হয়েছিল এবং সেখানে তিনি একজন দুধ- ভাইয়ের সাহচর্য লাভ করারও সুযোগ পেয়েছিলেন। ভাগ্যবতী হালিমা ছিলেন একজন ধৈর্যশীলা বেদুঈন রমণী। দরিদ্র ও আশ্রয়হীনা হলেও লোভ-লালসা বিবর্জিত, অল্পে সন্তুষ্ট সর্বংসহা ও স্নেহময়ী রমণী ছিলেন তিনি। শিশু মুহাম্মদ (সা)-এর পিতা জীবিত নেই, জীবিত থাকলে প্রতিপালনের বিনিময়ের অবশ্যই উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাওয়া যেত; পিতামহ যদিও বিত্তশালী ব্যক্তি, কিন্তু যেহেতু তিনি বহু পুত্র ও পুত্রাদির প্রতিপালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত, সুতরাং প্রয়োজনীয় খরচ ছাড়া অধিক পুরস্কার লাভের আশাও এখানে নেই। এতদসত্ত্বেও বিবি হালিমা নবজাত শিশুটিকে লালন-পালনের জন্য গ্রহণ করেছিলেন।
ঐতিহাসিকরা এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা না করলেও আমাদের ধারণা হালিমার পরিবারটি অত্যন্ত দীনহীনভাবেই জীবন যাপন করছিলো। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে তারা তাঁবু স্থানান্তরিত করত। বালকেরা সারাদিন উট ছাগল চরাত এবং তাঁবুর আশেপাশেই সম্মিলিতভাবে খেলাধুলা করত। মহিলারা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করত ও পশমী বস্ত্র বুনত। শুধু খেজুর ও দুধের উপরেই তারা সন্তুষ্ট থাকত, কখনো বা গোস্ত ও তরিতরকারী তাদের ভাগ্যে জুটত। এই ছিল তাদের নিত্যনৈমিত্তিক সহজ সরল জীবন-পদ্ধতি।
জীবনীগ্রন্থসমূহে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাল্যজীবনের মাত্র দু'একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। শিশু মুহাম্মদ (সা) দুধ-মার একটি মাত্র স্তন পান করতেন; দুধমা অন্য স্তনটি দান করলে তিনি তাতে মুখ না লাগিয়ে দুধ ভাইয়ের জন্যই তা রেখে দিতেন। মরু জীবন যাপন কালে কষ্ট সহিষ্ণুতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও বালক মুহাম্মদ (সা) অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন না। যখনই তিনি নগরীতে ফিরে আসতেন তখনই অসুস্থ হয়ে পড়তেন এবং সুস্থ হয়ে পুনরায় মরুভূমিতে চলে যেতে তাঁর দীর্ঘদিন কেটে যেত। এসব কারণে ধাত্রী মায়ের সাথে তাঁর জীবন যাপনের মেয়াদ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘায়িত হয়েছিল।
হযরত মুহাম্মদ (সা) স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করলে শীঘ্রই বিবি আমেনা উম্মে আইমান নাম্নী একজন পরিচারিকা সহ পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে মদীনায় তাঁর পিত্রালয়ে বেড়াতে যান। মদীনার বনী নাজ্জারের আবাসভূমিই ছিল রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাতুলালয়। স্বামীর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যেই বিবি আমেনা এ দীর্ঘপথ সফর করেন এবং সেখানে তিনি কিছুদিন অবস্থান করেন। মক্কা একটি ঊষর মরুপ্রান্তর, যেখানে পানির নাম-গন্ধ নেই, পক্ষান্তরে মদীনা একটি উর্বর ভূখণ্ড যেখানে স্থানে স্থানে বড় বড় জলাশয় বিদ্যমান। রসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় অবস্থানকালেই সাঁতার কাটা শিখেন। সম্ভবতঃ ঐ সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল।
দীর্ঘ একমাস অবস্থানের পর যখন তিনি মায়ের সাথে মক্কার দিকে রওয়ানা হন, তখন পথিমধ্যে 'নাবিগা'র সাথে তাঁর সাক্ষাত হয় এবং তিনি তাঁর তাঁবুতে অবস্থান করেন। নাবিগা আনসার গোত্রের কোন শাখার আত্মীয় ছিলেন, না কোন খ্যাতিমান কবি ছিলেন, সে সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। ইবনে হাবীবের বর্ণনা থেকে জানা যায়, নাবিগা জাহিলিয়া যুগেও মদপান থেকে বিরত থাকতেন। পুণ্যবান নাবিগার এ সদ্গুণের প্রভাব নিশ্চয়ই তাঁর মেহমান মুহাম্মদ (সা)-এর উপর পড়েছিল। তবে ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, মদীনাতেই রসূলুল্লাহ (সা) নাবিগার গৃহে অবস্থান করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, এ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স ছিল প্রায় ৬ বছর। ঐ সময়কার পারিবারিক ক্ষুদ্র পরিসরের কিছু কিছু ঘটনা পরিণত বয়সেও তাঁর স্মৃতিতে জাগরুক ছিল। তিনি বলতেন, তাঁর স্নেহময়ী জননী অধিকাংশ সময়ই শুক্সা গোস্ত খেতেন। কেননা তাজা গোস্ত সবসময় তাঁর ভাগ্যে জুটত না। কুরবানী, হাদিয়া ও অন্যান্য উপলক্ষে প্রাপ্ত গোস্ত তিনি সযত্নে রেখে দিতেন এবং অভাব-অনটনের সময় তা সিদ্ধ করে খেতেন। মিতব্যয়িতা, সহিষ্ণুতা ও অল্পে তুষ্টি ছিল 'তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
মদীনা হতে প্রত্যাবর্তনকালে 'আবওয়া' নামক স্থানে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্নেহময়ী জননী অকস্মাৎ পরলোকগমন করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। একমাত্র ইয়াতীম সন্তানের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই জননীর স্নেহমমতা ছিল অপরিসীম, পক্ষান্তরে জননীর প্রতি ছিল রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সীমাহীন শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। এই অপরিণত বয়সে মাতৃবিয়োগ ছিল তাঁর পক্ষে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। তাই দেখা যায়, পরিণত বয়সে যখনই তিনি আবওয়ার কাছ দিয়ে যাতায়াত করতেন তখনই তাঁর স্নেহময়ী জননীর কবর যিয়ারত করে আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করতেন।
পথের যাবতীয় প্রতিকূল অবস্থার মুকাবিলা করে তিনি যখন মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন তখন এক শ' আট বছর বয়সের বৃদ্ধ পিতামহের গৃহে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া তাঁর গত্যন্তর ছিল না। সবচেয়ে প্রিয় পুত্রের অনাথ ইয়াতীম এবং একমাত্র 'স্মারক' এই পুত্র সন্তানের প্রতি এমনিতেই পিতামহের স্নেমমতা ছিল অপরিসীম; উপরন্তু পৌত্রের সদগুণ, সদাচার ও বুদ্ধিমত্তা তাঁকে তার প্রতি আরো অধিক আকৃষ্ট করে তুলেছিল। শুধুমাত্র পরিবারের অকৃত্রিম পরিবেশই নয় বরং বাইরের গুরুগম্ভীর অনুষ্ঠানাদিতেও তিনি প্রায়ই পিতামহের পাশে থাকতেন। অন্যান্য গোত্র-প্রধানদের বৈঠকসমূহে প্রধান বিচারপতি বা পঞ্চায়েত-প্রধান হিসেবে যখনই পিতামহ যোগদান করতেন এবং তাঁর নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করতেন, তখন স্নেহভাজন পৌত্রও পিতামহের পাশে বসার দাবি করতেন। লোকেরা তাঁকে বৈঠকের কোন এক প্রান্তে বসতে বললে পিতামহ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই পৌত্রকে নিজের পাশেই বসিয়ে দিতেন এবং বলতেন, 'এই ছেলের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ও অন্যান্য অসাধারণ গুণ রয়েছে; সে নিজেকে আত্মমর্যাদাশীল মনে করে। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে সে নিশ্চয়ই একজন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হবে।' বালক মুহাম্মদ (সা)-এর এই আচরণ বৈঠকে যোগদানকারী কারো চোখে অবশ্য আপত্তিকর ঠেকত না।
শিশু পৌত্রকে তিনি যে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাও করতেন, তার প্রমাণ হলো- একবার অনাবৃষ্টির সময়ে তিনি এই পৌত্রেরই সদ্গুণাবলীর দোহাই দিয়ে আল্লাহর নিকট অত্যন্ত কাকুতি-মিনতির সাথে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। ইবনে সা'দের বর্ণনা থেকে জানা যায়, পৌত্রকে সাথে না বসিয়ে তিনি কখনো একাকী পানাহার করতেন না। (তাবাকাত-৭৪)
পিতামহের স্নেহক্রোড়ে কোনমতে দু'টি বছর অতিবাহিত হতে না হতেই তিনি তাঁকেও চিরতরে হারান। আট বছর বয়সের মন-মানসিকতায় কঠোর আঘাত হেনে তাঁর জীবনকে একেবারে গোড়া থেকেই মজবুত করে তোলাই ছিল যেন স্রষ্টার উদ্দেশ্য। ইবনে হিশাম প্রমুখ বর্ণনা করেছেন, পিতামহ আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর বালক মুহাম্মদ (সা) কেঁদে কেঁদে তার মৃতদেহের পিছনে পিছনে ছুটে যাচ্ছিলেন। অবশ্য মৃত্যুশয্যায় শায়িত আবদুল মুত্তালিব তাঁর উদার হৃদয় পুত্র আবূ তালিবকে ডেকে এনে তাঁর উপর তাঁর পরলোকগত সহোদর ভ্রাতার একমাত্র 'স্মারক' এই পুত্রের প্রতিপালন ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করে গিয়েছিলেন। বালক মুহাম্মদ (সা)-এর নবনিযুক্ত পৃষ্ঠপোষক আবু তালিব বহু সন্তানের জনক হওয়ার কারণে উদার-হৃদয় হওয়া সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে কিছুটা পাষাণের মত হয়ে গিয়েছিলেন। তবে প্রিয় ভ্রাতার একমাত্র 'স্মারক' পুত্রকে অত্যন্ত স্নেহভরে স্বগৃহে নিয়ে যান-যা ছিল সকলের জন্য যেন কল্পনাতীত ব্যাপার। একজন অযাচিত মেহমানকে যতটুকু কষ্ট স্বীকার করতে হয়, বালক মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর পিতৃব্য গৃহে কিন্তু ততটুকু কষ্ট স্বীকার করার কোন প্রয়োজনই দেখা দেয়নি।
খেটে খাওয়া থেকে রসূলুল্লাহ্ (সা) কখনো পিছপা ছিলেন না। পিতৃব্যের অভাব-অনটন প্রত্যক্ষ করে অলসের মত বসে থাকাকে তিনি মানহানিকর মনে করতেন। কোনরূপ শ্রমের কাজকেই তিনি হেয় মনে করতেন না। তাই মাঝে মধ্যে প্রতিবেশীর ছাগল চরিয়ে নির্দিষ্ট ও স্বল্প পরিমাণ পারিশ্রমিক তিনি লাভ করতেন। পশুপালের রক্ষণাবেক্ষণের মধ্য দিয়েই তিনি লাভ করেছিলেন তাঁর নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ। একবার তিনি বলেছিলেন, "আরাকের সে কুলগুলো তোমরা খাও যেগুলো কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে; কারণ আমরা যখন পশু চরাতে আসতাম তখন ওগুলোই খেতাম।" (ইবনে সা'দ)
মক্কা ছিল একটি বাণিজ্যিক নগরী। এখানে অনেক বিত্তশালী লোক বাস করতেন। তাদের পারিবারিক উৎসবাদি মাঝে মাঝে শহরের মধ্যে আলোড়নের সৃষ্টি করত। এ জাতীয় একটি উৎসবে একদিন গান-বাজনার আয়োজন করা হয়। বালক মুহাম্মদ (সা)-এর অন্তরে তা উপভোগ করার আগ্রহ জন্মে। তিনি তাঁর সহযোগী রাখাল বালককে একদিনের জন্য দু'দল ছাগল একসাথে চরানোর দায়িত্ব দিয়ে গান শোনার জন্য নগরীর দিকে আসেন। সময়টা ছিল সম্ভবত গ্রীষ্মকাল। নগরীতে উপস্থিত হয়ে তিনি জানতে পারলেন, গান শুরু হতে বেশ বিলম্ব হবে, তাই তিনি আসরের বাইরে বৃক্ষছায়ায় বসে প্রতীক্ষা করতে থাকেন। ইত্যবসরে তাঁর চোখের পাতায় নিদ্রা নেমে আসে। যখন তিনি জেগে উঠেন তখন দেখতে পান উৎসব অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। অদৃশ্য শক্তি প্রদত্ত এই শান্তি তাঁর হৃদয়ানুভূতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, আর কখনো কর্তব্য কাজে অবহেলা করবেন না এবং এ জাতীয় নিষ্ফল আমোদ-প্রমোদের প্রতিও ঝুঁকবেন না।