📄 লেখক পরিচিতি
একজন সুপণ্ডিত ও চিন্তাবিদ হিসাবে ডঃ হামীদুল্লাহর নাম মুসলিম বিশ্বে সুপরিচিত। বিশ্বের প্রধান প্রধান সাতটি ভাষায় ইসলাম সম্পর্কিত তাঁর তথ্যবহুল মৌলিক রচনাদি প্রকাশিত হয়েছে। 'রসূলে আকরম কী সিয়াসী যিন্দেগী' শীর্ষক পুস্তকে তিনি রসূল জীবনের, প্রধানত রাজনৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়সহ বিশ্বনবী (সা) কিভাবে বিভিন্ন অমুসলিম রাজশক্তি ও জনগোষ্ঠীর সাথে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন, কিভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান দিয়েছিলেন তারও একটি ধারাবাহিক ও পরিপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। শুধু বাংলায় কেন, অন্য যে-কোন ভাষায়ও এ ধরনের তথ্যসমৃদ্ধ পুস্তক বিরল।
📄 রসুলে করীম (সা)-এর জীবন অধ্যয়নের প্রয়োজন কেন
"হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান কর এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নাও। তুমি যাকে ইচ্ছা পরাক্রমশালী কর, আর যাকে ইচ্ছা হীন কর। কল্যাণ তোমার হাতেই। তুমি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। তুমিই রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে পরিণত কর। তুমিই মৃত হতে জীবন্তের আবার জীবন্ত হতে মৃতের আবির্ভাব ঘটাও। তুমি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবনোপকরণ দান কর।” (৩: ২৬-২৭)
"আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতারাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। হে বিশ্বাসিগণ, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাঁকে উত্তমরূপে অভিবাদন কর।” (৩৩: ৫৬)
বিভিন্ন জাতিতে এবং বিভিন্ন ভাষায় নবী এবং রসূল সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত আছে। তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এই সৃষ্টি (নবী রসূল) সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে আগাগোড়া এই ধারণাই প্রচলিত যে, ইনি হচ্ছেন ইনসানে কামিল-পরিপূর্ণ মানুষ। আর এই পরিপূর্ণতা হচ্ছে শুধুমাত্র মানবীয় দিক সম্পর্কেই। মানুষের জীবনে দু'টি দিকই হচ্ছে প্রধান। একটি মা'আশ (ইহজীবন) এবং অন্যটি মা'আদ (পরজীবন)। অন্য কথায়, একটি হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের এবং অন্যান্য সৃষ্টির সম্বন্ধ সম্পর্কিত, আর অন্যটি হচ্ছে মানুষের সাথে তার সৃষ্টিকর্তা পরম পরাক্রমশালী প্রভুর সম্বন্ধ সম্পর্কিত। প্রথমটির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে শাসনক্ষমতার অধিকারী হওয়া আর দ্বিতীয়টির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে আকায়িদ-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব অর্থাৎ পয়গাম্বরী লাভ।
রসূলে আরবী হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সা) একাধারে ছিলেন উপরিউক্ত দু'টি গুণেরই অধিকারী। তাঁর জীবনের এই দু'টি দিক সম্পর্কে আলোচনা একটি বিরাট ব্যাপার। এই পুস্তকে শুধুমাত্র তাঁর জীবনের একটি দিক অর্থাৎ রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
কিন্তু স্থিরমস্তিষ্ক জ্ঞানান্বেষী এবং ব্যক্তিগত চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে একটি স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তি মাত্রেরই মনে এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, আজ থেকে সাড়ে তেরশ' বছর পূর্বে যিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন, যাঁর মৃত্যুর পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবিত উন্নতি হয়েছে, সভ্য জাতিসমূহের পরিবেশ এবং জীবন সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন- সর্বোপরি যিনি ছিলেন আমাদের মত একজন মানুষই- এই যুগে কি তাঁর জীবন আলোচনার শিক্ষা অনুসরণের প্রয়োজন আছে?
নীতিগতভাবে একথা কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না যে, 'যেই নতুন আসবে সেই নতুন নির্মাণ করবে'- এই প্রবাদ বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মানব জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির উন্নয়ন রহস্য। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, 'সম্পূর্ণ হতে না হতে খুলে ফেলা'র। "সেই নারীর মত যে সুতা মজবুত হওয়ার পর তা খুলে ফেলে তার সুতা কাটা নষ্ট করে দেয়' (১৬ঃ ৯২)। অভ্যাস জারী রাখা হবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে পুরাতন নির্মাণের উপর নতুন নির্মাণ অব্যাহত রাখা হবে। এটা পরিষ্কার কথা যে, যিনি পুরাতন এবং নতুন উভয় ইমারতেরই মালিক, তিনি সেই ব্যক্তির চাইতে অপেক্ষাকৃত বেশি বিত্তশালী, যার অধিকারে রয়েছে শুধুমাত্র একটি পুরাতন অথবা নতুন ইমারত। এখন প্রশ্ন শুধুমাত্র মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব (আমার প্রাণ তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক)-এর জীবন অধ্যয়ন প্রয়োজন কেন? এবং এজন্য অন্য কারো জীবন বেছে নিতে আপত্তি কি? এটা নিশ্চয়ই এমন একটা প্রশ্ন যা একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ উত্তর প্রত্যাশা করে।
মুসলমানদের পক্ষ থেকে এর উত্তর এই হবে যে, তিনিই তো হচ্ছেন সেই গুণান্বিত ব্যক্তি যিনি এমন এক যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন সমগ্র বিশ্ব মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতার একেবারে শেষ স্তরে নেমে গিয়েছিল এবং তিনিই তখন নিখুঁত মানবতার সহজ সরল পথে মানব জাতিকে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। আজ, যখন আমরা বিভিন্ন অজুহাতে ঐ জাহিলিয়া যুগেরই নিকটতর হচ্ছি তখন শুধুমাত্র ঐ 'হিদায়েতের আলো'ই আমাদের সত্যিকার মুক্তির পথে নিয়ে যেতে পারে।
ব্যক্তিগত আকীদা-বিশ্বাসের কথা বাদ দিলে, একজন সত্যান্বেষী শিক্ষার্থী ও একজন নিরপেক্ষ অথচ অব্যর্থ লক্ষ্য ঐতিহাসিকের পক্ষ থেকে এর যে উত্তর হবে তার কিছু কথা শুধুমাত্র মুসলমানদের সাথে, কিছু কথা অন্যদের সাথে এবং কিছু কথা উভয়ের সাথেই সম্পর্কযুক্ত।
মুসলিমদের জন্য তাঁর জীবনচরিত যে গুরুত্ব বহন করে তার বিশদ ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই। উসূলে ফিকহের গ্রন্থাদিতে এটা একটা সর্বসম্মত কথা যে, রসূলে করীম (সা)-এর প্রত্যেকটি বাণীর ন্যায় তাঁর প্রত্যেকটি কর্মও আইনের মর্যাদা রাখে এবং সুন্নাতে নবভীর নিরিখে ওয়াজিব (অবশ্য করণীয়), মুসতাহাব (পছন্দনীয়), মুবাহ (করলেও চলে আবার না করলেও চলে), মাকরূহ (অপছন্দনীয়) প্রভৃতি নির্ণয় করা হয়। অবশ্য মুসলমানদের জীবনকে তখনই ইসলামী জীবন বলা হবে যখন তা কুরআন মজীদের আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হবে। তবে কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় সুন্নাতে নবভীর আইনগত (legal) মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এটাকে অবশ্য- পালনীয় বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। এর দ্বারা সুন্নাতে নবভী তথা সঠিক ও সর্বসম্মত নবীচরিত কুরআনের অংশ বিশেষের মত মর্যাদা সম্পন্ন না হলেও অন্তত তার ক্রোড়পত্র ও পরিশিষ্টের মর্যাদা সম্পন্ন হয়ে পড়ে।
এমনি ধরনের কয়েকটি আয়াতের প্রতি পাঠকবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে :
১. রসূলে করীম (সা) যার অনুমতি দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক। এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর। (৫৯ : ৭)
২. তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (৩৩ : ২১)
৩. হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর এবং তোমরা যখন তাঁর কথা শোন তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, এবং তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বলে 'শুনলাম'। বস্তুত তারা শোনে না। আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম জীব বধির ও মুক-যারা কিছুই বুঝে না। (৮ঃ ২২)
৪. তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রসূলের আনুগত্য কর এবং সর্তক হও, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রেখ, স্পষ্ট প্রচারই আমার রসূলের কর্তব্য। (৫ : ৯২)
৫. শপথ নক্ষত্রের যখন উহা হয় অস্তমিত, তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মদ (সা)। বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। কুরআন তো ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। (৫৩:১-৪)
এই সমস্ত আয়াত এবং আরো অনেক আয়াত দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, মহান পথ-প্রদর্শক, দু'জাহানের নেতা রসূলে করীম (সা)-এর কথা, তাঁর কর্ম এবং যেসব বিধি-বিধান তিনি তাঁর অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, সেসবের উপর আমল (কার্যে পরিণতকরণ) ঠিক তেমনি জরুরী যেমন জরুরী কুরআনের আদেশ নির্দেশ।
অমুসলিমদের জন্য রসূলে আরবীর জীবনচরিত অধ্যয়ন করা প্রয়োজন এজন্য যে, যখন কোন ব্যক্তি আমাদের বলে, ' তোমাদের জন্য মঙ্গলকর কিছু কথা আমি বলতে চাই'-তখন সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন এমন কে আছে, যে এই কথা শুনতে অস্বীকার করবে? রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর জীবনে প্রথমবার যখন ঘোষণা করেন, "আমি সমগ্র বিশ্বের রহমতরূপে এসেছি এবং যে দীন ইসলাম (শান্তির ধর্ম) নিয়ে এসেছি তাঁর অনুসরণ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে ইহকাল পরকালের মঙ্গল লাভ সম্ভব নয়-তখন উদ্ধত স্বভাবের লোকেরা কূট তর্কে লিপ্ত হয় এবং বিরোধিতা করতে থাকে। কিন্তু শান্ত স্বভাবের লোকেরা অনুরূপ না করে বরং রসূলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করে: ইসলাম কাকে বলে এবং আপনার মতে আমাদের কি করা উচিত? এই জিজ্ঞাসার জওয়াব পাওয়ার পর তারা আবার ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হলে তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণও করে। বিশ্বনবীর বাণীসমূহ, কার্যকলাপ এবং তাঁর উপস্থাপিত ধর্ম এখনো সুসংরক্ষিত অবস্থায় বিদ্যমান। এক্ষেত্রে প্রাচীন নিদর্শনাদির উপর ভিত্তি করে কিছু একটা খাড়া করার কিংবা সরল বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে কোন কল্পনাপ্রসূত কথা বলার প্রয়োজন নেই।
বিষয়টিকে কিঞ্চিৎ খোলাসা করে বলা যাক। অন্যান্য ধর্মের পবিত্র এবং ঐশ্বরিক গ্রন্থাদির মধ্যে গৌতম বুদ্ধের কোন গ্রন্থ পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র তাঁর বাণীসমূহ পাওয়া যায়-তাও আবার যথাসময়ে লিপিবদ্ধ নয়। হিন্দু ধর্মের বেদ পুরাণসহ কয়েকটি গ্রন্থ আছে বটে, কিন্তু সেগুলো হাজার হাজার বছর পর্যন্ত শুধু স্মৃতির উপর টিকে ছিল। শেষ পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয় বটে তবে শুধুমাত্র একই ব্যক্তির স্মৃতির উপর ভরসা করে। মূল তওরাত এখন পাওয়া যায় না। একাধিকবার তা বিশ্ব থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছে এবং পুনরায় লিপিবন্ধ করা হয়েছে শুধুমাত্র স্মৃতির উপর ভিত্তি করে। ফলে এখন যে সমস্ত কপি পাওয়া যায় সেগুলোর শব্দে এবং শ্লোকে পরস্পর পার্থক্য বিদ্যমান। এর মধ্যে অনেক জিনিসই এখন লাপাত্তা। অনেকগুলো অংশ পাঠ করার পর পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সেগুলো পরবর্তীকালের পরিবর্ধন ছাড়া কিছু নয়। যেমন হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে লিখিত গ্রন্থে তাঁর পরলোকগমনের বর্ণনা ইত্যাদি।
ইঞ্জীলের প্রকৃত অবস্থা এই যে, একে হযরত ঈসা (আ) কখনো লিপিবদ্ধ করান নাই (আর যদি করিয়েও থাকেন তবে মূল ইঞ্জীল এখন লাপাত্তা)। এখন ইঞ্জীল নামে যে সমস্ত জিনিস পাওয়া যায় তা হচ্ছে তাঁর শিষ্য এবং প্রশিষ্যদের এই মর্মের বর্ণনা যে, তাঁদের নবী এভাবে ভূমিষ্ঠ হন, সারা জীবন এভাবে অতিবাহিত করেন এবং অমুক সময়ে অমুক কথা বলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা তাঁদের চোখে দেখা অথবা কানে শোনা ঘটনাবলীর উপর লিখিত তাঁদের নবীর জীবন কাহিনী মাত্র—আল্লাহ্ প্রদত্ত কোন গ্রন্থ বা জীবন ব্যবস্থা নয়। আরো একটি কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, হযরত ঈসার অনুরূপ জীবন কাহিনীমূলক প্রচুর সংখ্যক ইঞ্জীল ছিল এবং অনিবার্যভাবে সেগুলোতে প্রচুর মতবিরোধও ছিল। একদা ঐ সমস্ত গ্রন্থকে একটির উপর একটি সাজিয়ে দোলানো হয়। তাতে যেগুলো স্তূপ থেকে নীচে পড়ে যায় সেগুলোকে এক জায়গায় এবং যেগুলো টিকে থাকে সেগুলোকে অন্য জায়গায় জড়ো করা হয়। এই পদ্ধতিতেই আজকালকার চারটি ইঞ্জীলকে নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করা হয়, আর বাকীগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়।
এবার কুরআন মজীদের কথায় আসা যাক। নবুয়্যতের একেবারে সূচনা থেকে যখন কোন আয়াত নাযিল হত, ঠিক তখনই রসূলুল্লাহ্ (সা) তা লিখিয়ে নিতেন। নতুন কোন আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে তিনি কাতিবদেরকে এ নির্দেশও দিতেন যে, 'ইতিমধ্যে কুরআনের যে অংশটুকু নাযিল হয়েছে তার অমুক সূরার অমুক আয়াতের পর এ আয়াতটি লিপিবদ্ধ কর।' তাছাড়া অনেক সাহাবী ঐ সমস্ত আয়াত মুখস্থ করে নিতেন এবং মুখস্থ করার সাথে সাথে তা রসূলুল্লাহকে আবার পড়িয়ে শোনাতেন। অনেকে নাযিলকৃত আয়াতের অনুলিপিও রাখতেন। রসূলূল্লাহ (সা) যখন পরলোকগমন করেন, তখন প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) কুরআনকে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার জন্য নবীযুগে সরকারীভাবে অনুমোদন প্রাপ্ত ওহী লেখকদের একটি কমিটি গঠন করেন এবং নির্দেশ দেন, মুখস্থ ছাড়াও অন্তত দু'টি লিখিত প্রমাণের উপর প্রত্যেকটি শব্দ এবং আয়াত যেন লিপিবদ্ধ করা হয়। রসূলূল্লাহর শেষ যুগে সম্পূর্ণ কুরআনের কমপক্ষে চার পাঁচজন হাফিয (মুখস্থকারী) ছিলেন এবং ওহী লেখক কমিটির সদস্যরাও ছিলেন এদের অন্তর্ভুক্ত। আর আংশিকভাবে কুরআন মুখস্থকারী তো ছিলেন হাজারে হাজারে। যাহোক প্রথম থেকেই অত্যন্ত যত্নের সাথে কন্ঠস্থ ও লিপিবদ্ধকরণ এবং আজ পর্যন্ত সেই একই নিয়ম জারি থাকার ফলে কুরআন মজীদ এমনভাবে সংরক্ষিত হয়ে আসছে যে, বিশুদ্ধতা ও নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে অন্য কোন ধর্ম প্রবর্তকের ঐশী গ্রন্থ এর ধারে কাছেও আসতে পারবে না।
মোটকথা, আমরা নিঃসংকোচে এমন এক ব্যক্তিত্বের জীবন কথা অধ্যয়ন করতে পারি যাতে খুঁটিনাটি ঘটনাবলীর বর্ণনাও বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং যাঁর শিক্ষার ভিত্তি অর্থাৎ তাঁর উপর অবতীর্ণ আসমানী গ্রন্থও হুবহু এবং অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। তাছাড়া সেটি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে অস্পৃশ্যতারও এমন কিছু নেই যে, এর অধ্যয়ন থেকে কোন ব্যক্তি, জাতি বা সম্প্রদায়কে বারণ করা হবে, বরং এর মধ্যে রয়েছে সার্বজনীন মঙ্গল এবং যে কেউ এটা পড়ে সে মঙ্গলের অধিকারী হতে পারে এবং নিজ থেকে এ সিদ্ধান্তও নিতে পারে যে, এই গ্রন্থকে বরণ করা যাবে কি না, আর যে বরণ করবে না তার জন্য (এই গ্রন্থেই) পরিষ্কার নির্দেশ রয়েছে 'লা ইকরাহা ফীদ্দিন'-ধর্ম (দীন) সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি নেই (২: ২৫৬)। সর্বোপরি এই কুরআন হচ্ছে এমন একটি গ্রন্থ যা ভাষাশৈলীর দিক দিয়ে হোমার ও ডিমসথেনিসকে, আইন শিক্ষার দিক দিয়ে জাস্টিনিয়ানকে, পার্থিব মঙ্গল লাভের ক্ষেত্রে কৌটিল্যকে, পারলৌকিক মঙ্গল লাভের ক্ষেত্রে গৌতম বুদ্ধকে এবং শিষ্টাচার শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কনফুসিয়াসকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ প্রদান করতে পারে। এই সেই গ্রন্থ যা মানুষের মধ্যে সত্যিকার সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং পূর্ববর্তী ধর্ম-গুলোকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সেগুলোর মধ্যে ইসলামের স্থান এমনভাবে নির্ধারণ করেছে যে, এটা হচ্ছে চিরাচরিত ন্যায় ও সত্য এবং আদি ও আসল ধর্মের খাঁটি ও নির্ভেজাল চেহারা।
সবার জন্য
ইসলামের মূলনীতি হলো, 'ইহকালে কল্যাণ, পরকালেও কল্যাণ (ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আঁখিরাতি হাসানাতাঁও) (২:২০১)। এবার দেখা যাক, ইহলৌকিক ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহর চরিত্র এবং জীবন পদ্ধতির মধ্যে আমাদের জন্য কি কি শিক্ষণীয় বিষয় আছে। বিশ্বে মহান ব্যক্তিত্বের সংখ্যা কখনো কম ছিল না, তবে তা শুধুমাত্র এক একটি বিশেষ ক্ষেত্রে। যেমন আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ান ও হিটলারের জীবন-চরিতে যে শিক্ষণীয় বিষয় আছে, তা শুধুমাত্র যুদ্ধ পরিচালনাকারী সেনাপতি ও দিগ্বিজয়ীদের জন্য। গৌতম বুদ্ধের জীবনে যে শিক্ষণীয় বিষয় আছে তা শুধু তাদের জন্য যারা সাধনা-উপাসনার প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী। হোমার শুধুমাত্র একজন কবি ছিলেন। প্লেটো এবং এরিস্টটল ছিলেন চিকিৎসক এবং দার্শনিক। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে এঁদের বিশেষ কোন দখল ছিল না। অথচ রসূলে আরবীর জীবনের প্রতি লক্ষ্য করুন, সর্বক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা, তাঁর কথা ও কাজের সামঞ্জস্য, তাঁর শিক্ষার সহজবোধ্যতা ও কার্যোপযোগিতা, সর্বোপরি তাঁর জীবনের চরম সাফল্য নিঃসন্দেহে অতুলনীয়তার দাবি রাখে। তাঁর জীবনের রাজনৈতিক দিকটির প্রতি লক্ষ্য করুন।
আরব উপদ্বীপের সেই নৈরাজ্য পরিবেশ, যেখানে স্বাধীনচেতা বেদুঈন সম্প্রদায়গুলো রাত দিন রক্তাক্ত সংঘর্ষে লিপ্ত থাকত, সেখানে তিনি মাত্র দশ বছরের মধ্যে একটি শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। একজন সেনাপতি হিসাবে তাঁর বিরাট কৃতিত্ব এই যে, তাঁর সকল যুদ্ধেই উভয় পক্ষের খুব কম লোকই নিহত হয়েছে। কিন্তু মাত্র দশ বছরের মধ্যে আনুমানিক বার লক্ষ বর্গমাইল এলাকার উপর তিনি তাঁর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। উপরন্তু আরবের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সম্পূর্ণ উপদ্বীপটিকে একই পতাকাতলে নিয়ে আসে। আর এটা রসূলুল্লাহরই শিক্ষার ফলশ্রুতি যে, আরবের মত অজ্ঞাত ও মূর্খ একটি জাতি বিজয় পতাকা নিয়ে বহির্জগতের দিকে দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে চলে এবং যাদের সম্পর্কে ক্যাম্ব্রিজের জনৈক খৃস্টান ঐতিহাসিকের মন্তব্য হলো, 'এদের চাইতে ভদ্র দুর্দান্ত কোন জাতি কখনো দিগ্বিজয়ে বহির্গত হয়নি।' তাছাড়া ব্যাপকতা ও গভীরতার দিক দিয়ে দেশজয়ের যে রেকর্ড তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন তা কোন জাতি এখনো ভাঙতে পারেনি। তারা দশ বছরের মধ্যেই ইরাক, ইরান, ফিলিস্তীন, সিরিয়া, মিসর, তিউনিসিয়া, তুরস্ক এবং আর্মিনিয়া পদানত করেন। এইসব অঞ্চল মোটামুটিভাবে এখনো ইসলামী এলাকার অন্তর্ভুক্ত এবং এদের সংখ্যাগুরু অধিবাসীর ভাষাও রূপান্তরিত হয়েছে আরবী ভাষায়।
এখন শাসন ব্যবস্থার কথায় আসা যাক। যে দেশে কখনো কোন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সে দেশে ভূমিষ্ঠ এবং প্রতিপালিত হওয়া সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ্ (সা) যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠা করেন তা বিশ্বের একটি বিরাট রাষ্ট্রের জন্যে শুধু উপযোগীই ছিল না, বরং যত দিন পর্যন্ত তা কার্যকরী ছিল ততদিন ঐ রাষ্ট্র বিশ্বের সবচাইতে সভ্য রাষ্ট্র হিসাবে পরিগণিত হত। গান্ধীর মত গোঁড়া হিন্দুও ইসলামী রাষ্ট্রের ঐ যুগকে মানবতার স্বর্ণযুগ বলে মনে করতেন এবং এটাকে নিজেদের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করার জন্য কংগ্রেসী হিন্দু রাষ্ট্রকে পরামর্শ দিতেন।
এবার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথায় আসা যাক। রসূলুল্লাহ্র প্রত্যেকটি অর্থনৈতিক নির্দেশের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ বন্টননীতি পরিলক্ষিত হয়। পরিত্যক্ত সম্পত্তি বন্টন, অসীয়ত নবায়ন, সুদের অবৈধতা, ফেলে রাখা সম্পদের উপর মাশুল (যাকাত) নির্ধারণ প্রভৃতি সম্পর্কে তিনি যে নীতি প্রণয়ন করেন, সেগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে উপরিউক্ত কথার যথার্থতা প্রমাণিত হবে। মোটকথা, তাঁর নির্দেশিত অর্থনীতি এমনি সুন্দর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, তাতে আজকালকার সমাজবাদী ও পুজিবাদী অর্থনীতির মধ্যে বিরাজমান কাদা ছোঁড়াছুড়ি ও সংঘর্ষের একটি সুন্দর সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
স্ত্রীলোক, শ্রমিক এবং ক্রীতদাসের মর্যাদা সম্পর্কিত রসূলুল্লাহর শিক্ষার মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য রয়েছে বিধায় উপকারিতা ও কার্যকারিতার দিক দিয়ে তা অতুলনীয়। সামাজিক এবং চারিত্রিক ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ (সা) শুধু অপরের শিক্ষকই ছিলেন না বরং অপরের জন্য নিজের শিক্ষা ও সদুপদেশের জীবন্ত নমুনা ছিলেন। একজন পিতা, একজন বন্ধু, একজন শাসক, একজন বণিক সর্বোপরি একজন মানুষ হিসাবে তাঁর কার্যকলাপ এতই খাঁটি এবং নিখুঁত ছিল যা তাঁর কট্টর শত্রুরাও স্বীকার না করে পারেনি। বিভিন্ন ইসলামী সংস্কার ছাড়াও পৌত্তলিকতা, মদপান, জুয়াখেলা প্রভৃতি নিষিদ্ধকরণ মুসলমানদের এমন কয়েকটি বিশেষত্ব যেগুলো বিশ্ববাসী ইচ্ছায় হোক অথবা অনিচ্ছায় হোক মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্বে অনেক শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং নবী এসেছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, রসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জীবনকালে যেরূপ সাফল্য অর্জন করেছেন তা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। দশম হিজরীতে তিনি যখন মক্কায় আগমন করেন তখন তাঁর সাথে দেড় লক্ষ মুসলমান ছিলেন যাঁরা এসেছিলেন দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চল থেকে। রসূলুল্লাহ (সা) যে ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন সে ধর্ম আপনা আপনি স্থান করে নিয়েছিল বিশ্ববাসীর অন্তরে। চীনে কখনো ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবু সেখানে কোটি কোটি মুসলমান রয়েছে। পাক-ভারত এবং অন্যান্য দেশেও নও-মুসলিমের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং ক্রমবৃদ্ধির এই ধারা ইসলামের আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে অতি সুন্দরভাবে। তিনিই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি অসাম্য ও অস্পৃশ্যতার অভিশাপে ভয়ানকভাবে জর্জরিত বিশ্বে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, বংশ, বর্ণ কিংবা ভাষা নয় বরং পুণ্যকর্ম এবং আল্লাহ-ভীরুতাই উৎকৃষ্টতার মাপকাঠি। 'তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহভীরু।' তিনি ইসলামী আদর্শকে বাস্তবায়িত করেন অত্যন্ত সার্থকভাবে, যার ফলে সমাজের হেয় এবং অধঃপতিত লোকেরা এটাকে নিজেদের মুক্তির একমাত্র পথ বলে মনে করে আসছে। ইসলামের চাইতে অধিক সাম্য অন্য কোন ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থায়ই পরিলক্ষিত হয় না। ইতিহাস একথার সাক্ষী যে, বর্ণ ও ভাষাকেন্দ্রিক ভেদ-বৈষম্যের মূলোৎপাটনে ইসলামের চাইতে অধিক সাফল্য অর্জন বিশ্বের অন্য কোন ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থার পক্ষে সম্ভব হয় নি।
মানব বসতির প্রত্যেকটি দল, সম্প্রদায় অথবা জাতির পৃথক ইতিহাস, পৃথক ঐতিহ্য এবং পৃথক বিশ্বাস (আকায়িদ) রয়েছে। আর মানুষকে তাদের মাননীয় ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকে বিরত রাখা যেমন সহজ নয়, তেমনি এতে লাভেরও কিছু নেই। বরং সহজ এবং লাভজনক পদ্ধতি এই যে, পুরানো আকীদা-বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং ধ্যান-ধারণার প্রতি কোনরূপ কটাক্ষ না করে (বরং নতুন পটভূমি দিয়ে সেগুলোকে নতুন খাতে প্রবাহিত করে) কিছু নতুন জিনিসের প্রতি অধিকতর শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের শিক্ষা দেওয়া। অন্যথায় একই উৎস হতে উৎসারিত আদম ও হাওয়ার সন্তানদের একই কেন্দ্রে জড়ো করা কখনও সম্ভব নয়।
একত্ববাদে বিশ্বাস এবং অন্য গুণাবলীর দরুন য়াহূদীরা তাদের সমসাময়িক অন্যান্য জাতির উপর গর্ব করত। কিন্তু অন্য সবাই তদেরকে একটি অভিশপ্ত জাতি বলেই মনে করত। কিন্তু ইসলাম প্রকাশ্যে স্বীকার করে যে, 'ফাদ্দালাকুম 'আলাল 'আলামীন'- অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে বিশ্বজগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। ঈসায়ীরাও তাদের পৈতৃক ধর্মের কোন কোন বৈশিষ্ট্যের দরুন গর্বিত থাকলেও অন্যরা তাদেরকে মোটেই পাত্তা দিত না। কিন্তু কুরআন ঈসায়ীদের সেই বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার করে নিয়ে ঘোষণা করে "নিশ্চয় মরিয়ম তনয় ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মরিয়মের কাছে পাঠিয়েছিলেন ও তাঁর রূহ (আদেশ)......(৪ঃ১৭১)
কিন্তু কুরআন এই উভয় জাতিকেই বলে দেয় যে, শুধু পূর্বপুরুষের বড়াই করলে চলবে না বরং আল্লাহ্ তা'আলা এক এক করে প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকেই তার কর্মের হিসাব নেবেন। তাছাড়া যে আল্লাহ্ মূসা ও ঈসা (আ)-কে বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, সেই আল্লাহই পূর্ববর্তী নবীদের শিক্ষা সম্বলিত গ্রন্থগুলো কালচক্রে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কারণে আপন অসীম করুণাগুণে আর একজন নবী পাঠিয়েছেন এবং তাঁর মাধ্যমে নতুনভাবে ঐ সমস্ত গ্রন্থের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দিয়ে মানব-জাতিকে ধন্য ও কৃতার্থ করেছেন। আর যতক্ষণ পর্যন্ত এই নবীর শিক্ষা সংরক্ষিত ও অপরিবর্তনীয় থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কোন নবী আসার প্রয়োজন নেই।
কুরআনের ঘোষণা "এমন কোন সম্প্রদায় নেই যার কাছে সতর্ককারী প্রেরিত হয়নি"-বিশ্বের সকল জাতি এবং সকল সম্প্রদায়ের অন্তর জয় করে নিয়েছে। হযরত আদম (আ) থেকে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত যে সমস্ত নবী রসূল এসেছেন, কুরআন তাঁদের দু'এক জনের নাম নিয়েছে এবং সাথে সাথে এ ঘোষণাও দিয়েছে, "অনেক রসূল প্রেরণ করেছি যাদের কথা পূর্বে তোমাকে বলেছি এবং অনেক রসূল যাদের কথা তোমাকে বলিনি।” অতঃপর পূর্ববর্তী কোন নবীর অনুসারীদের মনে কোনরূপ মনঃকষ্ট থাকার কথা নয়। রসূলুল্লাহ (সা) এভাবে নিজেকে 'সমস্ত বিশ্বের রহমত' রূপে প্রমাণিত করেছেন।
পূর্ববর্তী ধর্মগুলোতে গোলক-ধাঁধার সৃষ্টি হওয়ায় তা ধর্মযাজক ও ধর্মমন্দিরের পাণ্ডাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। ইসলামের নবী ঘোষণা করলেন, ধর্ম একটি সহজ ও সহজাত বস্তু। এর সাথে প্রতিটি মানুষ সরাসরি সম্পর্কিত। তিনি একটি মৌলিক ধর্ম তথা সকল ধর্মের সারকথাও মানুষের সামনে পেশ করলেন। আর তা হলো, মানুষ জন্ম থেকে, অন্ততঃপক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিজের জন্য নিজেই দায়ী। তাঁর ধর্ম হলো, "কেউ আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাস করলে এবং সৎকাজ করলে তার কোন ভয় নেই এবং সে দুঃখিতও হবে না"-(৫ঃ ৬৯), আর "আল্লাহ কারো উপর এমন কোন কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না যা তার সাধ্যাতীত...।” (২: ২৮৬)
ইসলামের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এ একই সাথে এবং একই সময়ে ইহকাল পরকালের মঙ্গল কামনা করে। আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং অন্তর পরিশুদ্ধির জন্য তওহীদের (একত্ববাদের) চাইতেও উৎকৃষ্টতর কোন পন্থা আছে এমন কথা কল্পনাও করা যায় না। যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহতে বিশ্বাসী হয়, মঙ্গলামঙ্গলের ব্যাপারে একমাত্র তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে ক্ষমতার অধিকারী মনে না করে এবং পরকাল ও বিচারদিনকে বিশ্বাস করে তাহলে এই বিশ্বে অপরাধ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব না হলেও সুকঠিন নিশ্চয়ই হবে। প্রতিটি লোকের বিশ্বাসের দৃঢ়তা তার কাজকর্মে ফুটে উঠে। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, আল্লাহর পথে জিহাদ প্রভৃতি নির্দেশ এমনি যে, এগুলো পালনের মধ্য দিয়ে মানুষ সম্মান এবং মর্যাদার ক্ষেত্রে ফেরেশতাদেরকেও ছাড়িয়ে যায়। যার মধ্যে অবাধ্য হওয়ার ক্ষমতাই নেই (যেমন ফেরেশতা) সে জড় পদার্থের মত কোন কাজ করলে সে কাজের জন্য শাস্তি বা পুরস্কার কোনটিই পাবে না। আর যার মধ্যে একই সময়ে পাপ-পুণ্যের ক্ষমতা রয়েছে এবং সে তার ক্ষমতাকে শুধু পুণ্য কাজে নিয়োজিত করে সে নিঃসন্দেহে সৃষ্টির সেরা।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবনে রয়েছে মানবজীবনে সাফল্য লাভের সত্যিকার পথ-নির্দেশ এবং এ কারণেই তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
📄 তথ্য সংগ্রহের উৎস
বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনকথা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে। তথ্যাদি কখনো বেশি হয়, আবার কখনো কম। কখনো কখনো কোন ভাষার শ্রুতিকাহিনী, প্রবাদবাক্য কিংবা অন্য কোন পরোক্ষ উৎস থেকে ঐ ভাষার জাতীয় বীরদের জীবনকথা উদ্ধার করা হয়।
কোন বাদশাহ, রাজনৈতিক ব্যক্তি, কারিগর, পেশাদার, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, সূফী, সংসারত্যাগী, ধার্মিক, ধর্মবিরোধী, বুদ্ধিমান, নির্বোধ তথা যেকোন মানুষের জীবনকথা জানতে হলে এক একটি বিশেষ পদ্ধতিতে সে সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করতে হয়। যেমন কোন স্থপতির জীবন-কথা জানতে হলে তার তৈরী ইমারতের শিল্পগত, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দিক যাচাই করে দেখতে হবে, কোন নেতা ও সংস্কারকের জীবনকথা জানতে হলে দেখতে হবে জনসাধারণের মনের গভীরে তার নেতৃত্ব কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছে এবং কতটুকু স্থায়ী হয়েছে।
আর যদি কোন ব্যক্তি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হন তাহলে জীবনীকারের কাজও বহুমুখী হয়ে পড়ে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন ব্যক্তির দৈহিক অবস্থা, বুদ্ধিগত ঊর্ধ্বমুখিতা, পারিবারিক জীবন, সামাজিকতা, বন্ধুদের সাথে ব্যবহার, শত্রুদের সাথে আচরণ, তার সম্পর্কে তার নিজের চিন্তা-ধারণা এবং অন্যদের মন্তব্য মতামত সে ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে যোগায় এক একটি চমৎকার উপাদান।
কোন নবীর মহান জীবনের কার্যাবলী যেমন মানুষের সৌভাগ্যের উৎস, তেমনি সেগুলোকে হুবহু উদ্ধার করাও অত্যন্ত কঠিন। কেননা তাঁর জীবনীতে যেমন পার্থিব ও অন্যান্য ব্যাপার রয়েছে, তেমনি রয়েছে ওহী সম্পর্কিত বিষয়াদি এবং অনেক আলৌকিক ঘটনাও।
দুনিয়াতে শুধু নবী-রসূলই নন বরং এমন একজন মানুষও পাওয়া যাবে না, যার জীবনের ঘটনাবলী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনের ঘটনাবলীর মত এত বিস্তৃত ও বিভিন্নমুখী। রসূল জীবনের তথ্যাদি সংগ্রহের যে সমস্ত উপাদান ও উৎস রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে মোটামুটিভাবে এই ধারণা করা যেতে পারে যে, নবুওত জীবনের ২৩ বছরে তাঁর মুখ দিয়ে যে সমস্ত কথাবার্তা ও আদেশ-নিষেধ নিঃসৃত হয়েছে, তার যে সংক্ষিপ্ত ও সীমিত অংশটি সংরক্ষিত রয়েছে এবং আমাদের কাছে পৌঁছেছে-তাও শুধু হাজার হাজার নয় বরং লক্ষ লক্ষ হাদীসের আকারে বিদ্যমান। যদি তাঁর কার্যাবলী এবং ব্যক্তিগত আচার-আচরণকেও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে অনেকগুলো খণ্ডে শুধুমাত্র সুন্নাত তথা হাদীসের স্থানই সংকুলান হতে পারে।
কোন ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর সাথে সাক্ষাতকারীরাও অনেক তথ্যাদি সরবরাহ করতে পারে। আর হিজরী ১০ সনে, রসূলুল্লাহর বিদায় হজ্জে আরাফার মাঠে তাঁর যে সকল অনুসারী অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের সংখ্যাই ছিল এক লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ এবং যারা অংশগ্রহণ করতে পারেন নি তাদের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই ছিল এর চাইতে কয়েক গুণ বেশি। হাদীসবিশারদদের মতে, সাহাবীদের মধ্যে যারা রসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে কোন না কোন হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের সংখ্যাই এক লক্ষের চাইতে বেশি। বিশ্বের অন্য যেকোন ব্যক্তির জীবনের অবস্থাদির চাক্ষুস সাক্ষী এত বিরাট সংখ্যক লোক হওয়া তা দূরের কথা, এর সহস্র ভাগের এক ভাগও হবে না। রসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাতকারীদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর গুরুজন, আত্মীয়-স্বজন, পরিবারবর্গ, চাকর-ভৃত্য, বন্ধু-বান্ধব এবং হঠাৎ আগমনকারীরা।
রসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর ৬৩ বছরের ঘটনাবহুল জীবনে কত চিঠি-পত্রই না লিখতে হয়েছে। তাঁর নবুওতকালের সাথে সম্পর্কিত আড়াই তিন'শ চিঠি, ইতিহাস এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছে। শুধুমাত্র এই চিঠিগুলোর কথাই ধরুন। তিনি কখন এগুলো লিখেছিলেন, কেন লিখেছিলেন, তার ফল কি হয়েছিল, ইত্যাকার বিবরণী লিপিবদ্ধ করতে গেলেই কয়েক খণ্ড বিরাট পুস্তক হয়ে যাবে।
রসূল-জীবনের তথ্যাবলীর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে তাঁর সমসাময়িক কবিদের কথামালা বা কাব্যগাঁথা। তাদের কথামালার বিষয়বস্তু, ইংগিত-ইশারা, তাঁদের নিরীক্ষা, স্থিরসিদ্ধান্ত, প্রকাশভঙ্গি এবং আরো অনেক বিষয় এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার।
বহির্দেশে রসূলুল্লাহর অবস্থাদির যে বিবরণ পৌঁছেছে সেগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায় সমসাময়িক বহির্দেশীয় ব্যক্তিদের লেখা ভ্রমণকাহিনী সমূহে। অতএব রসূল-জীবনের তথ্যাদি সংগ্রহে ঐ সমস্ত কাহিনীরও কমবেশি ভূমিকা রয়েছে।
অতঃপর রয়েছে রসূল প্রদত্ত শিক্ষা। তাঁর শিক্ষাকে জানতে হলে তিনি কি মিশন নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সেটাকে ফলপ্রসূ করার জন্য কি কি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তার কি প্রভাব পড়েছিল, কিভাবে তাতে তিনি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এনেছিলেন ইত্যাকার বিষয় জানতে হবে। যেহেতু কোন একটি নির্দিষ্ট যুগ সম্পর্কে জানতে হলে তার পটভূমি অবশ্যই জানা চাই, তাই রসূল-যুগ সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা করতে হলে তাঁর নবুওত যুগ এবং সেই সাথে নবুওত পূর্ববর্তী যুগ সম্পর্কেও একটি মোটামুটি ধারণা থাকতে হবে। আর সত্যি কথা বলতে গেলে, রসূলের মত পূত-পবিত্র ও সর্বগুণের অধিকারী একজন মহাপুরুষের জীবন সম্পর্কে অবহিত হতে হলে সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মানবেতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।
কোন ব্যক্তির কৃতিত্বপূর্ণ কার্যাবলীর গুরুত্ব নিরূপণ করতে হলে কাজের সংখ্যা বা পরিমাণ নয় বরং ধরন এবং অবস্থার প্রতিই লক্ষ্য করতে হয়। ১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধে এক কোটি এবং ১৯৩৯ সালের বিশ্বযুদ্ধে চার কোটি লোক মারা গেছে বলে পরিস্খল্যানে প্রকাশ। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে এই দুই মহাযুদ্ধের ততটুকু গুরুত্ব নেই যতটুকু গুরুত্ব রয়েছে বদর যুদ্ধের। অথচ বদর যুদ্ধে দুইপক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা একশ'ও ছিল না। অনুরূপভাবে বহু কোটি টাকার মালিক রকফেলারের এক কোটি টাকা দান করা কিংবা মৃত্যুর সময় উইল করা—ঐ ব্যক্তির মাত্র কয়েক শ' টাকা চাঁদাদানের সমপরিমাণ গুরুত্ব রাখে না যে ব্যক্তিকে, 'এই চাঁদার পর তুমি ঘরে কি রেখে এসেছ?'—এই মর্মে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, 'শুধুমাত্র আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রসূলের মুহব্বত-ভালবাসা ছাড়া কিছুই ঘরে রেখে আসিনি।' উপরন্তু অনেকগুলো ঘটনার তাৎপর্য ততক্ষণ পর্যন্ত বোঝাই যায় না যতক্ষণ না সেগুলোর মূল্যমান নির্ণীত হয়, যতক্ষণ না অবগত হওয়া যায় ঐ অঞ্চলের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা, ঐ অঞ্চলের অধিবাসী ও ঘটনা অংশগ্রহণকারীদের মানসিক অবস্থা, ঐ অঞ্চলের আভ্যন্তরীণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং আরো অনেক বিষয়, যেখানে ঐ সমস্ত ঘটনা ঘটেছে। কোন ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে হলে তার সম্পর্কে তুলনামূলক আলোচনাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এক্ষেত্রে লেখকদের ধর্মীয় বিশ্বাস, উপযুক্ততা, উপাদানের সহজলভ্যতা, পরিস্থিতির আনুকূল্য প্রভৃতিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এই ঘটনা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন যুক্তি ও ফলাফল উদ্ঘাটন করে থাকেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রত্যেকটি সংস্কৃতিবান ভাষায়ই রসূলের জীবনী পাওয়া যায়। কোন কোন ভাষায় তো এই একই বিষয়ের উপর হাজার হাজার গ্রন্থ রয়েছে। পুনরাবৃত্তির কথা বাদ দিলেও প্রত্যেকটি গ্রন্থই কোন না কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য গুরুত্বের দাবি করতে পারে। শুধুমাত্র রসূলুল্লাহর যুদ্ধসমূহের কথাই ধরুন। কেউ এগুলোকে বর্ণনা করেন কাহিনী হিসেবে, কেউ বর্ণনা করেন যুদ্ধ ইতিহাসের বিষয় হিসেবে, কেউ এগুলোকে অধ্যয়ন করেন আন্তর্জাতিক সমর-নীতির উপমা হিসেবে, কেউ এগুলো থেকে উদ্ঘাটন করেন আরব সৈন্যদের মন-মানসিকতা, ধৈর্যশক্তি, বীরত্ব ও অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা অবলম্বনের দক্ষতা, আবার কেউ এগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান করেন অন্য কোন উপাদান।
যে স্থানে কোন ব্যক্তি তার জীবন অতিবাহিত করেন সেখানে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কাহিনী ও প্রবাদ প্রচলিত থাকে এবং এগুলোর মধ্যে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটতে থাকে।
এত প্রচুর উপাদানের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনী লেখক কি করবেন? তাঁকে নিশ্চয়ই এর কোন না কোন দিকের উপর ভরসা করতে হবে। যদি তিনি এতে প্রথম পদক্ষেপেই সফলকাম হন অর্থাৎ গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে সক্ষম হন তাহলে তো ভাল কথা; অন্যথায় তাঁকে নিজ চিন্তাশক্তি ও সাহস অনুযায়ী অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতে হবে।
📄 রসুল (সা)-এর আবির্ভাবকালে বিশ্বের অবস্থা
প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক অঞ্চলে মানব সমাজে দু'টি দলের অস্তিত্ব থাকে। এক দল শুধু পাপাচারে লিপ্ত থাকে না বরং এটাকে একটি সূক্ষ্ম পেশায় পরিণত করে এবং অন্যদল মানব সমাজের এই অবস্থার উপর দারুণভাবে চিন্তিত ও বিচলিত হয়ে পড়ে। আর যেখানে পাপাচার ও চারিত্রিক অধঃপতন যত ব্যাপক হয় সেখানে তত বড় সংস্কারকের প্রয়োজন দেখা দেয়। পূর্ববর্তী নবীদের যুগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোন কোন সম্প্রদায় বা কোন কোন জনবসতির অবস্থা এমনি হয়ে দাঁড়ায় যে, সেখানে দুষ্কর্মকে সাধারণভাবে সুকর্ম বলে মনে করা হয়। তখন অবশ্য বিশ্বের বাকি অঞ্চলের অবস্থা মোটামুটিভাবে সহনীয় থাকে। এমনি পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ তা'আলা ঐ বিশেষ সম্প্রদায় বা বিশেষ অঞ্চলের জন্য নবী-রসূল পাঠিয়ে থাকেন।
রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে বিশ্বের কোন্ কোন্ দেশে সংস্কারকের প্রয়োজন ছিল তা এখন ভেবে দেখতে হবে। একই পিতামাতা অর্থাৎ আদম হাওয়ার বংশধর হওয়া সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান মানবজাতি, জীবিকার প্রয়োজনে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই নিজেদের আত্মীয়-স্বজনকে ছেড়ে দূর-দূরাঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করতে থাকে। অতঃপর নিজেদের আদি বাসভূমির সাথে যোগাযোগ রাখার কোন প্রয়োজন তাদের ছিল না, কিংবা এ ধরনের কোন সুযোগও তারা পেত না। কেননা তখন পরিবহন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অনুন্নত। তাছাড়া প্রত্যেকটি অঞ্চলই খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রে ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। তখন আজকালকার মত এমন অবস্থা ছিল না যে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একে অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষী, কোন অঞ্চলে খাদ্য আছে তো বস্ত্র নেই, কোথাও রুটি আছে তো ডাল নেই, কোথাও লোহা আছে তো কাঠ নেই, কোথাও কয়লা আছে তো পেট্রোল নেই, কোথাও কাগজ আছে তো কালি নেই। আর একমাত্র এ কারণেই প্রাচীন যুগে আন্তর্জাতিক ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। তখনকার নবী ও সংস্কারকগণও আবির্ভূত হতেন একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা বিশেষ অঞ্চলের জন্য। বার্বার সম্প্রদায়ের নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু বার্বারদের মধ্যে, বনি ইসরাইলী নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু বনি ইসরাইলের মধ্যে এবং আর্য সমাজের নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু আর্য সমাজের মধ্যেই সীমবদ্ধ ছিল। মানব সমাজে আন্তর্জাতিক মুখাপেক্ষিতা ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পায় এবং রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে তার ব্যাপকতা এতদূর পর্যন্ত পৌঁছে যে, তখন অভিযান-বিলাসী আরব বণিকরা একদিকে আবিসিনিয়া, মিসর, সিরিয়া এবং অন্যদিকে চীন, ইরান ও ভারতবর্ষে তাদের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যথারীতি যাতায়াত করত। তখন বড় বড় জাহাজ নির্মাণের কৌশলও মানুষের আয়ত্তে এসে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় এমন নবী আসারও প্রয়োজন ছিল যিনি কোন স্থান বা কালের বেড়াজালে আবদ্ধ নন, যাঁর শিক্ষা হবে ব্যাপকধর্মী ও সার্বজনীন এবং এই শিক্ষার মাধ্যমে তিনি শীতাঞ্চল, উষ্ণাঞ্চল, শহরাঞ্চল, গ্রামাঞ্চল তথা বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষকে, চাই তারা স্থায়ী বাশিন্দা হোক অথবা যাযাবর-একই মৌলিক ধর্মের ঝাণ্ডাতলে একত্রিত করতে সক্ষম। তার শিক্ষার মধ্যে মুসতাহাব-নফলের ব্যাপার থাকবে সত্যি। অর্থাৎ এমন কিছু কিছু কাজের উল্লেখ থাকবে যেগুলো করা খুবই ভাল, কিন্তু না করলে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু যে যৎসামান্য অবশ্যকরণীয় কাজের উল্লেখ থাকবে সেগুলোর বাস্তবায়ন তথা কার্যকরীকরণ একটি মৌলিক ও সার্বজনীন ধর্মের কাজ দেবে। অর্থাৎ এই দায়িত্বগুলো এমনি প্রকৃতির হবে যে, তা সকলেই নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে সমভাবে পালন করতে পারবে।
গ্রীস কোন এক যুগে বিজ্ঞান-দর্শনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল এবং সে দর্শনের বন্যাস্রোত প্লাবিত করে ফেলেছিল সমগ্র বিশ্বকে। অতএব এমন একটি উচ্চমানের বিজ্ঞান-দর্শনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, যা মানুষকে গ্রীক দর্শনের গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে রেহাই দিতে পারে। রোম আইনশাস্ত্র এতটুকু অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল যে, রসূলুল্লাহ্র জন্মের মাত্র পাঁচ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণকারী সম্রাট হাবসীনীন রোমীয় আইনকে শৃঙ্খলার সাথে লিপিবদ্ধ করে বিশ্বকে এই মর্মে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেছিলেন যে, ক্ষমতায় কুলালে এর চাইতে উৎকৃষ্ট কোন আইন উপস্থাপিত কর। এভাবে হিন্দুরা, মিসরীয়রা এবং ইরানীরা এমন কিছু কিছু কৃতিত্বপূর্ণ কাজ করেছিল যার দরুন তারা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের মনোজগতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। এমতাবস্থায় প্রয়োজন ছিল মানুষের মনোজগতকে সংস্কারমুক্ত করে তাতে স্বাধীন চিন্তার প্রবাহ সৃষ্টি করা, যাতে তারা নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধি এবং শ্রবণ ও দর্শনশক্তিকে অবাধে কাজে লাগাতে পারে। কেননা আল্লাহ্ তা'আলার উপরিউক্ত অবদানসমূহকে অকেজো করে রাখা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে সেগুলোর সদ্ব্যবহার না করা অতি অনুগত ফেরেশতা কিংবা অতি অবাধ্য শয়তানের পক্ষে মানানসই হলেও সুগঠিত দেহের অধিকারী তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে কখনো মানানসই হতে পারে না। রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে বিশ্বের বড় বড় দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল আমাদের উপরিউক্ত মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সে সম্বন্ধে মোটামুটি জ্ঞান আহরণ করা একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়ে।
চীন
বিশ্বের একেবারে পূর্ব দিগন্তে চীন তার বিখ্যাত সংস্কারক কনফুসিয়াসের (খ্রীস্টপূর্ব ৫৫১ থেকে ৫৪৯) মাধ্যমে দর্শনের এক অপরূপ বন্যা বইয়ে দিয়েছিল সত্যি কিন্তু রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে সেখানকার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছিল; কনফুসীয়াসী ব্যবস্থা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং ভারতের বৌদ্ধ মতাদর্শ সেখানে ঢুকে পড়ে একটি ব্যাপকতর নবযুগের সূচনা করার উদ্যোগ নিচ্ছিলো। সেখানে হুন শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এবং তার স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ওয়াই (WAI) এবং শু (SHU)-দের তিনটি রাজ্য এবং সেখানে এমনভাবে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানবতার সেবা করার কোন সুযোগই আর অবশিষ্ট ছিল না। তখনকার চীন শুধু গৃহযুদ্ধেই নয়, বরং তাতারী এবং তিব্বতীদের উপর্যুপরি আক্রমণে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পর 'সুই' (৫৮৯ থেকে ৬১৮ খ্রীস্টাব্দ) ত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেশের মধ্যে বেশ কিছুটা ঐক্যের সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেও রসূলুল্লাহ্র হিজরতের দু'বছর পূর্বে আবার সেখানে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়। অতঃপর 'টায়াংগ' রাজ পরিবার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অবস্থা কিছুটা আয়ত্তে আসে এবং দেশের মধ্যে মোটামুটি শান্তি-শৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তবে ক্ষমতার বড়াই এবং রাজ্য বিস্তারের অন্ধ মোহ তাদেরকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা থেকে বিরত রাখে (বিস্তারিত 'বিবরণের জন্য এনসাইক্লোপেডিয়া বৃটানিকা ইত্যাদি দ্রষ্টব্য)।
ভারতবর্ষ
খ্রীস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে আর্যরা ভারতবর্ষে আগমন করে। বর্ণপ্রথা, পৌত্তলিকতা, বৈরাগ্যবাদ এবং আরো অনেক কারণে তারা সামাজিকভাবে মানব সেবার সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। কনফুসিয়াসের সমসাময়িক গৌতম বুদ্ধ ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে জোর প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিকার ছিল ঠিকই, কিন্তু বৌদ্ধমতের মধ্যেও বাড়াবাড়ি এবং তা ছিল শুধুমাত্র সাময়িক প্রয়োজন পূরণের জন্য। ঐ মতবাদ দ্রুত প্রসার লাভ করলেও তাতে সর্বকাল-উপযোগী মৌলিক উপাদান ছিল না। ফলে বৌদ্ধমত ও ব্রাহ্মণ্যবাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন আকর্ষণ-প্রতিআকর্ষণ তথা জয় পরাজয়ের খেলা চলতে থাকে এবং পরিণামে বৌদ্ধ মতকে ভারতবর্ষ থেকে অত্যন্ত নির্মমভাবে নির্বাসিত করা হয়।
রসূলুল্লাহর আবির্ভাবের পূর্বে মধ্য এশিয়া ছিল হুনদের শাসনাধীন। কিন্তু রসূলুল্লাহর নবুওত লাভের পাঁচ বছর পূর্বে অর্থাৎ ৫৬৫ খ্রীস্টাব্দে তাদের পরাজয় ঘটে। ফলে ভারতবর্ষ থেকেও তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়। অতঃপর থানেশ্বরের রাজার কনিষ্ঠ পুত্র হর্ষ (৬০৬ থেকে ৬৪৮ খ্রীস্টাব্দ) দক্ষিণ ভারতের অধিকারী হন এবং ক্রমে ক্রমে তিনি বাংলা, নেপাল, মালব, গুজরাট প্রভৃতি দখল করেন। কিন্তু হিজরতের কিছু পূর্বে অর্থাৎ ৬১০ খ্রীস্টাব্দে তিনি দক্ষিণ ভারত আক্রমণ করলে চালুক্য বংশের পুলকেশীর (দ্বিতীয়) হাতে নর্মদা নদীর তীরে পরাজিত হন। তাঁর কোন বংশধর ছিল না এবং তিনি তাঁর প্রজাদের অত্যন্ত আরামপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ফলে তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর সাম্রাজ্যেরও অবসান ঘটে। অতঃপর যুগ যুগ ধরে ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। চালুক্য বংশের হর্ষকে পরাজিত করলেও অন্যদের হাতে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের সাম্রাজ্যেরও চিরবিলুপ্তি ঘটে।
তুরস্ক
তুরস্ক একটি ঘনবসতি ভূখণ্ড। কিন্তু খ্রীস্টীয় সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সেখানকার কোন অবস্থাই জানা যায় না। রসূলুল্লাহর সমসাময়িককালে হুনরা তিব্বতের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং তুর্কীরা বিজয়ী বেশে প্রতীচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। কিন্তু এই তুর্কীরা কোন সভ্যতা সংস্কৃতির অধিকারী ছিল না এবং সামগ্রিকভাবে মানবসেবা করার মত কোন গুণও তাদের মধ্যে ছিল না (এনসাইক্লোপেডিয়া বৃটানিকা দ্রষ্টব্য)।
রোম ও ইরান
গ্রীক শাসনের অবসান ঘটেছিল অনেক আগেই। তার পরিবর্তে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রোমকদের শাসন। কিন্তু যখন তা পশ্চিম ও পূর্ব—এই দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লো তখন আমরা দেখতে পাই যে, রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে জার্মান প্রভৃতি বর্বর জাতি পশ্চিমা রোমকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং ছিনিয়ে নিয়েছে রোমের সিংহাসন। এই নিরক্ষর বর্বরতা মানুষের সাথে যে আচরণ করত তার একটি নমুনা হচ্ছে এই যে, তারা প্রেমের ধর্ম 'ঈসাইয়ত' গ্রহণ করার পরও এমন নির্দয় ও নীতিভ্রষ্ট রয়ে গিয়েছিল, যেমনটি একজন অ-ঈসায়ীর কাছ থেকেও কল্পনা করা যায় না।
অপরদিকে পূর্বরোম, কনস্টান্টিনোপলে রাজধানী স্থাপন করে যুগের পর যুগ ধরে প্রতিবেশী ইরানীদের সাথে যুঝতে থাকে। রসূলুল্লাহর নবুওতের প্রারম্ভিককালে ইরানীরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাত থেকে মিসর, সিরিয়া প্রভৃতি ছিনিয়ে নেয়। তখন কুরআন ঘোষণা করেছিল, “রোমানরা পরাজিত হয়েছে আরব দেশের অতি নিকটবর্তী স্থানে, কিন্তু তারা তাদের এই পরাজয়ের পর শীঘ্রই জয়ী হবে—৩ বছর থেকে ৯ বছরের মধ্যে। পূর্বে ও পরে সর্বদাই আল্লাহ্র আদেশ বলবৎ থাকবে এবং সেদিন মুমিনগণ আল্লাহর এই সাহায্যের কারণে আনন্দিত হবে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন, তিনি মহাক্ষমতাবান, পরম দয়াময়” (৩০: ১-৫)। হিজরী ৬ সনে অর্থাৎ হুদায়বিয়া সন্ধির সময়ে মুসলের রণক্ষেত্রে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের হাতে ইরানীরা এমন শোচনীয় পরাজয় বরণ করে যে, অতঃপর তারা আর কোনদিনই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। এটা ছিল কনস্টান্টিনোপলের রোমকদের (বাইজেন্টাইনীদের) জন্য একটি বিরাট বিজয়। কিন্তু এ বিজয় থেকেও তারা উপকৃত হতে পারল না। কেননা যুগের পর যুগ ধরে বহিরাক্রমণ একদিকে যেমন তাদের দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি ধর্মীয় ফিতনা-ফাসাদও সেখানে দারুণভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।
হযরত ঈসা (আ)-এর মধ্যে শুধু খোদায়ী স্বভাব আছে, না খোদায়ী ও মানবিক উভয় স্বভাবের সংমিশ্রণ আছে—ইত্যাকার দর্শন বাইজেন্টাইনীদের মধ্যে দলাদলি ও রেষারেষির সৃষ্টি করছিল এবং প্রত্যেকটি দলই অত্যন্ত অদূরদর্শী ও সংকীর্ণমনা হয়ে উঠেছিল। তারা একে অন্যের উপর এত অত্যাচার করতে থাকে যে, যখন শাসকদলের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয় তখন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঈসায়ী ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মনেপ্রাণে ঐ অপরিচিত ভিন্নধর্মী মুসলমানদের স্বাগতম জানায় এবং বিভিন্নভাবে সাহায্যও করতে থাকে। এমন কি মুসলমানদের অধীনে থাকাকে তারা তাদের সহধর্মী ঈসাইদের অধীনে থাকার চাইতে অধিক শ্রেয় মনে করত।
(রোমের উত্থান ও পতনঃ গীবন) ইরানের অবস্থাও ছিল তাই। 'সম্পত্তি এবং স্ত্রীলোকের মধ্যে সকলের সমান অধিকার'-মুযদাক প্রবর্তিত ইত্যাকার সমাজতন্ত্র শুধুমাত্র দেশের মধ্যে গৃহযুদ্ধেরই আগুন জ্বালিয়ে রাখেনি বরং সেই সাথে দেশবাসীর চরিত্রকেও ধ্বংস করে দিয়েছিল। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়িয়েছিল যে, মুযদাক প্রকাশ্য দরবারেই সম্রাটকে সম্বোধন করে বলেছিলেন 'এই রাণী থেকে শুধু তুমি কেন, সকলেই উপকৃত হতে পারে।' একথা বলতে তার বিবেকে বাঁধে নি বা তিনি লজ্জাবোধও করেন নি। অতঃপর নওশেরওয়ান যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তিনি তাঁর পিতার বিপরীত কর্মপন্থা গ্রহণ করেন। তখন অগ্নিউপাসকরা মুযদাকতন্ত্রীদের উপর যে অত্যাচার চালায় তা ছিল অত্যন্ত নির্মম এবং পৈশাচিক।
আবিসিনিয়া
আবিসিনিয়াও একটি বিরাট অঞ্চল। আবিসিনীয়রা ইরানীদের কাছ থেকে ইয়ামেন দেশ ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু যখন এই 'হাতীর আরোহীরা' (কুরআনের সূরা ফীল দ্রষ্টব্য) উত্তর আরবের দিকে (নবীর আবির্ভাব বছর) অগ্রসর হয় তখন 'পশুর চর্বিত ঘাস'-এর ন্যায় পর্যুদস্ত হয়ে ভূপৃষ্ঠে লুটিয়ে পড়ে। রসূলুল্লাহর নবুয়তকালে আরব থেকেই তাদের সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে নি, বরং গৃহযুদ্ধ এবং অন্যান্য কারণে খোদ আবিসিনিয়ায়ও তা বিকল হয়ে পড়ে। আবিসিনিয়ার ঐ গৃহযুদ্ধের কারণে সেখানে হিজরতকারী মুসলমানরা সবসময়ই বিচলিত থাকতেন।
মোটকথা, তখন বিশ্বের সর্বত্রই ছিল ধ্বংস, ফিত্না এবং অশান্তি। মহানুভবতা ও মানবতার অভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট। তখন সমগ্র বিশ্বকে একথা খুব ভালভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল যে, তারা একই আদম-হাওয়ার বংশধর। প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল তাদেরকে দেশ, জাতি, বংশ এবং এ ধরনের অন্যান্য সীমিত ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এমন একটি মৌলিক মযহাব বা জীবন ব্যবস্থা পেশ করার যা আঞ্চলিক ও ভাষাগত বৈষম্যের উর্ধ্বে এবং বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত। প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল এমন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের যা প্রতিটি মানুষকে তার ব্যক্তিগত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ করে তুলবে এবং তাকে সর্বপ্রকার সহায়তা প্রদান করবে তার জীবনের মূল লক্ষ্য অর্জনে।