📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”

📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”


বিভিন্ন জাতিতে এবং বিভিন্ন ভাষায় নবী এবং রসূল সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত আছে। তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এই সৃষ্টি (নবী রসূল) সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে আগাগোড়া এই ধারণাই প্রচলিত যে, ইনি হচ্ছেন ইনসানে কামিল-পরিপূর্ণ মানুষ। আর এই পরিপূর্ণতা হচ্ছে শুধুমাত্র মানবীয় দিক সম্পর্কেই। মানুষের জীবনে দু'টি দিকই হচ্ছে প্রধান। একটি মা'আশ (ইহজীবন) এবং অন্যটি মা'আদ (পরজীবন)। অন্য কথায়, একটি হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের এবং অন্যান্য সৃষ্টির সম্বন্ধ সম্পর্কিত, আর অন্যটি হচ্ছে মানুষের সাথে তার সৃষ্টিকর্তা পরম পরাক্রমশালী প্রভুর সম্বন্ধ সম্পর্কিত। প্রথমটির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে শাসনক্ষমতার অধিকারী হওয়া আর দ্বিতীয়টির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে আকায়িদ-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব অর্থাৎ পয়গাম্বরী লাভ।

রসূলে আরবী হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সা) একাধারে ছিলেন উপরিউক্ত দু'টি গুণেরই অধিকারী। তাঁর জীবনের এই দু'টি দিক সম্পর্কে আলোচনা একটি বিরাট ব্যাপার। এই পুস্তকে শুধুমাত্র তাঁর জীবনের একটি দিক অর্থাৎ রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

কিন্তু স্থিরমস্তিষ্ক জ্ঞানান্বেষী এবং ব্যক্তিগত চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে একটি স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তি মাত্রেরই মনে এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, আজ থেকে সাড়ে তেরশ' বছর পূর্বে যিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন, যাঁর মৃত্যুর পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবিত উন্নতি হয়েছে, সভ্য জাতিসমূহের পরিবেশ এবং জীবন সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন- সর্বোপরি যিনি ছিলেন আমাদের মত একজন মানুষই- এই যুগে কি তাঁর জীবন আলোচনার শিক্ষা অনুসরণের প্রয়োজন আছে?

রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর জীবনে প্রথমবার যখন ঘোষণা করেন, "আমি সমগ্র বিশ্বের রহমতরূপে এসেছি এবং যে দীন ইসলাম (শান্তির ধর্ম) নিয়ে এসেছি তাঁর অনুসরণ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে ইহকাল পরকালের মঙ্গল লাভ সম্ভব নয়-তখন উদ্ধত স্বভাবের লোকেরা কূট তর্কে লিপ্ত হয় এবং বিরোধিতা করতে থাকে। কিন্তু শান্ত স্বভাবের লোকেরা অনুরূপ না করে বরং রসূলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করে: ইসলাম কাকে বলে এবং আপনার মতে আমাদের কি করা উচিত? এই জিজ্ঞাসার জওয়াব পাওয়ার পর তারা আবার ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হলে তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণও করে।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ধন্যবাদ, হে আবু বকর ও উমর!

📄 ধন্যবাদ, হে আবু বকর ও উমর!


প্রথম খলীফা নির্বাচনের সময় মুসলমানরা সর্বসম্মতিক্রমে একই সময়ে 'একই রাষ্ট্রে দুই রাষ্ট্রনায়ক' নির্বাচনের নীতি অনুসরণ করেছিল বলে বর্ণিত আছে।

যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন তখন একতা ও ঐক্যের ইসলামী শিক্ষা মুসলমানদের বাধ্য করলো, নবীকে কাফন-দাফনের পূর্বেই তাঁর উম্মতের জন্য একজন রাখাল (নেতা) নির্বাচন করতে, যাতে একটি মুহূর্তের জন্যও নৈরাজ্য সৃষ্টির কোন অবকাশ না থাকে। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সীরাত (নবী চরিত্র) লেখকেরা এক্ষেত্রে যা লিখেছেন তার মধ্যে এই বাক্যটিও আছে যে, যখন আনসার ও মুহাজিরদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সাকীফা-ই-বনী সাদা'য় সমবেত হন এবং আনসারী নেতা তাঁর দলের অগ্রাধিকার প্রাপ্তির পক্ষে মত প্রকাশ করেন তখন মুহাজিরদের পক্ষ থেকে হযরত আবু বকর (রা) দাঁড়িয়ে বলেন-

“উমর (রা) থেকে বর্ণিত।..... তুমি তোমাদের যে সমস্ত কৃতিত্বপূর্ণ কাজের উল্লেখ করেছ, নিঃসন্দেহে তোমরা সেগুলোর অধিকারী, কিন্তু আরবের লোক কুরায়শ ছাড়া অন্য কাউকেই (নেতা) মানবে না। তারা (কুরায়শরা) বংশগত এবং পারিবারিক দিক দিয়ে আরবের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন। আর আমি এই দুইজন থেকে যেকোন একজনকে তোমাদের নেতা নির্বাচন করতে সম্মত আছি। তোমরা যার হাতে ইচ্ছা বায়'আত কর।" তখন তিনি আবু বকর (রা) আমার এবং আবু উবায়দা বিন জাররাহ (রা)-এর, যিনি আমার সাথেই বসেছিলেন-হাত ধরলেন। তিনি সেদিন যা বলেছিলেন, তার মধ্যে এই শেষ কথাটি ছাড়া অন্য কোন কথা আমার কাছে খারাপ লাগেনি। আল্লাহর শপথ, যদি কোন অপরাধ ছাড়াই আমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হত তাহলে সেটাও আমার কাছে অধিক পছন্দনীয় হত এটা হতে যে, আমাকে ঐ সমস্ত লোকের নেতা নির্বাচন করা হবে যাদের মধ্যে আবূ বকর (রা)-ও (জীবিত) আছেন। অতঃপর এক আনসারী দাঁড়িয়ে বললেন 'এ ব্যাপারে আপনি আমার প্রস্তাব মেনে নিন এবং আমার কথার মর্যাদা দিন। কুরায়শগণ, এক নেতা আমাদের মধ্য থেকে হবেন এবং এক নেতা তোমাদের মধ্য থেকে।' একথার উপর খুব হট্টগোল শুরু হলো এবং এমনভাবে চীৎকার-ধ্বনি উঠতে থাকলো যে, আমি মুসলিম জাতির অনৈক্যের ব্যাপারে আশংকিত হয়ে উঠলাম। তাই আমি বললাম, হে আবূ বকর (রা) আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি তাঁর হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং আমি তাঁর হাতেই বায়'আত করলাম। অতঃপর মুহাজিররা তাঁর হাতে বায়'আত করলো। অতঃপর আনসাররাও তাঁর হাতে বায়'আত করলো।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ভাই ইবনু জিবরিনের চিঠি

📄 ভাই ইবনু জিবরিনের চিঠি


বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনকথা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে । তথ্যাদি কখনো বেশি হয় , আবার কখনো কম । কখনো কখনো কোন ভাষার শ্রুতিকাহিনী , প্রবাদবাক্য কিংবা অন্য কোন পরোক্ষ উৎস থেকে ঐ ভাষার জাতীয় বীরদের জীবনকথা উদ্ধার করা হয় ।

কোন বাদশাহ , রাজনৈতিক ব্যক্তি , কারিগর , পেশাদার , দার্শনিক , কবি , সাহিত্যিক , সূফী , সংসারত্যাগী , ধার্মিক , ধর্মবিরোধী , বুদ্ধিমান , নির্বোধ তথা যেকোন মানুষের জীবনকথা জানতে হলে এক একটি বিশেষ পদ্ধতিতে সে সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করতে হয় । যেমন কোন স্থপতির জীবন-কথা জানতে হলে তার তৈরী ইমারতের শিল্পগত , অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দিক যাচাই করে দেখতে হবে , কোন নেতা ও সংস্কারকের জীবনকথা জানতে হলে দেখতে হবে জনসাধারণের মনের গভীরে তার নেতৃত্ব কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছে এবং কতটুকু স্থায়ী হয়েছে ।

আর যদি কোন ব্যক্তি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হন তাহলে জীবনীকারের কাজও বহুমুখী হয়ে পড়ে । জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন ব্যক্তির দৈহিক অবস্থা , বুদ্ধিগত ঊর্ধ্বমুখিতা , পারিবারিক জীবন , সামাজিকতা , বন্ধুদের সাথে ব্যবহার , শত্রুদের সাথে আচরণ , তার সম্পর্কে তার নিজের চিন্তা-ধারণা এবং অন্যদের মন্তব্য মতামত সে ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে যোগায় এক একটি চমৎকার উপাদান ।

কোন নবীর মহান জীবনের কার্যাবলী যেমন মানুষের সৌভাগ্যের উৎস , তেমনি সেগুলোকে হুবহু উদ্ধার করাও অত্যন্ত কঠিন । কেননা তাঁর জীবনীতে যেমন পার্থিব ও অন্যান্য ব্যাপার রয়েছে , তেমনি রয়েছে ওহী সম্পর্কিত বিষয়াদি এবং অনেক আলৌকিক ঘটনাও । দুনিয়ায় শুধু নবী-রসূলই নন বরং এমন একজন মানুষও পাওয়া যাবে না , যার জীবনের ঘটনাবলী হযরত মুহাম্মদ ( সা ) -এর জীবনের ঘটনাবলীর মত এত বিস্তৃত ও বিভিন্নমুখী । রসূল জীবনের তথ্যাদি সংগ্রহের যে সমস্ত উপাদান ও উৎস রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে মোটামুটিভাবে এই ধারণা করা যেতে পারে যে , নবুওত জীবনের ২৩ বছরে তাঁর মুখ দিয়ে যে সমস্ত কথাবার্তা ও আদেশ-নিষেধ নিঃসৃত হয়েছে , তার যে সংক্ষিপ্ত ও সীমিত অংশটি সংরক্ষিত রয়েছে এবং আমাদের কাছে পৌঁছেছে-তাও শুধু হাজার হাজার নয় বরং লক্ষ লক্ষ হাদীসের আকারে বিদ্যমান । যদি তাঁর কার্যাবলী এবং ব্যক্তিগত আচার-আচরণকেও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে অনেকগুলো খণ্ডে শুধুমাত্র সুন্নাত তথা হাদীসের স্থানই সংকুলান হতে পারে ।

কোন ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর সাথে সাক্ষাতকারীরাও অনেক তথ্যাদি সরবরাহ করতে পারে । আর হিজরী ১০ সনে , রসূলুল্লাহর বিদায় হজ্জে আরাফার মাঠে তাঁর যে সকল অনুসারী অংশগ্রহণ করেছিলেন , তাদের সংখ্যাই ছিল এক লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ এবং যারা অংশগ্রহণ করতে পারেন নি তাদের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই ছিল এর চাইতে কয়েক গুণ বেশি । হাদীসবিশারদদের মতে , সাহাবীদের মধ্যে যারা রসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে কোন না কোন হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের সংখ্যাই এক লক্ষের চাইতে বেশি । বিশ্বের অন্য যেকোন ব্যক্তির জীবনের অবস্থাদির চাক্ষুস সাক্ষী এত বিরাট সংখ্যক লোক হওয়া তা দূরের কথা , এর সহস্র ভাগের এক ভাগও হবে না । রসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাতকারীদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর গুরুজন , আত্মীয়-স্বজন , পরিবারবর্গ , চাকর-ভৃত্য , বন্ধু-বান্ধব এবং হঠাৎ আগমনকারীরা ।

রসূলুল্লাহ ( সা ) -কে তাঁর ৬৩ বছরের ঘটনাবহুল জীবনে কত চিঠি-পত্রই না লিখতে হয়েছে । তাঁর নবুওতকালের সাথে সম্পর্কিত আড়াই তিন'শ চিঠি , ইতিহাস এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছে । শুধুমাত্র এই চিঠিগুলোর কথাই ধরুন । তিনি কখন এগুলো লিখেছিলেন , কেন লিখেছিলেন , তার ফল কি হয়েছিল , ইত্যাকার বিবরণী লিপিবদ্ধ করতে গেলেই কয়েক খণ্ড বিরাট পুস্তক হয়ে যাবে ।

রসূল-জীবনের তথ্যাবলীর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে তাঁর সমসাময়িক কবিদের কথামালা বা কাব্যগাঁথা । তাদের কথামালার বিষয়বস্তু , ইংগিত-ইশারা , তাঁদের নিরীক্ষা , স্থিরসিদ্ধান্ত , প্রকাশভঙ্গি এবং আরো অনেক বিষয় এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার । বহির্দেশে রসূলুল্লাহর অবস্থাদির যে বিবরণ পৌঁছেছে সেগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায় সমসাময়িক বহির্দেশীয় ব্যক্তিদের লেখা ভ্রমণকাহিনী সমূহে । অতএব রসূল-জীবনের তথ্যাদি সংগ্রহে ঐ সমস্ত কাহিনীরও কমবেশি ভূমিকা রয়েছে ।

অতঃপর রয়েছে রসূল প্রদত্ত শিক্ষা । তাঁর শিক্ষাকে জানতে হলে তিনি কি মিশন নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সেটাকে ফলপ্রসূ করার জন্য কি কি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন , তার কি প্রভাব পড়েছিল , কিভাবে তাতে তিনি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এনেছিলেন ইত্যাকার বিষয় জানতে হবে । যেহেতু কোন একটি নির্দিষ্ট যুগ সম্পর্কে জানতে হলে তার পটভূমি অবশ্যই জানা চাই , তাই রসূল-যুগ সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা করতে হলে তাঁর নবুওত যুগ এবং সেই সাথে নবুওত পূর্ববর্তী যুগ সম্পর্কেও একটি মোটামুটি ধারণা থাকতে হবে । আর সত্যি কথা বলতে গেলে , রসূলের মত পূত-পবিত্র ও সর্বগুণের অধিকারী একজন মহাপুরুষের জীবন সম্পর্কে অবহিত হতে হলে সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মানবেতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে ।

কোন ব্যক্তির কৃতিত্বপূর্ণ কার্যাবলীর গুরুত্ব নিরূপণ করতে হলে কাজের সংখ্যা বা পরিমাণ নয় বরং ধরন এবং অবস্থার প্রতিই লক্ষ্য করতে হয় । ১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধে এক কোটি এবং ১৯৩৯ সালের বিশ্বযুদ্ধে চার কোটি লোক মারা গেছে বলে পরিসংখ্যানে প্রকাশ । কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে এই দুই মহাযুদ্ধের ততটুকু গুরুত্ব নেই যতটুকু গুরুত্ব রয়েছে বদর যুদ্ধের । অথচ বদর যুদ্ধে দুইপক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা একশ'ও ছিল না । অনুরূপভাবে বহু কোটি টাকার মালিক রকফেলারের এক কোটি টাকা দান করা কিংবা মৃত্যুর সময় উইল করা—ঐ ব্যক্তির মাত্র কয়েক শ' টাকা চাঁদাদানের সমপরিমাণ গুরুত্ব রাখে না যে ব্যক্তিকে , 'এই চাঁদার পর তুমি ঘরে কি রেখে এসেছ ?'—এই মর্মে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন , 'শুধুমাত্র আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রসূলের মুহব্বত-ভালবাসা ছাড়া কিছুই ঘরে রেখে আসিনি ।' উপরন্তু অনেকগুলো ঘটনার তাৎপর্য ততক্ষণ পর্যন্ত বোঝাই যায় না যতক্ষণ না সেগুলোর মূল্যমান নির্ণীত হয় , যতক্ষণ না অবগত হওয়া যায় ঐ অঞ্চলের ভৌগোলিক , অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা , ঐ অঞ্চলের অধিবাসী ও ঘটনা অংশগ্রহণকারীদের মানসিক অবস্থা , ঐ অঞ্চলের আভ্যন্তরীণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং আরো অনেক বিষয় , যেখানে ঐ সমস্ত ঘটনা ঘটেছে । কোন ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে হলে তার সম্পর্কে তুলমূলক আলোচনাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ । এক্ষেত্রে লেখকদের ধর্মীয় বিশ্বাস , উপযুক্ততা , উপাদানের সহজলভ্যতা , পরিস্থিতির আনুকূল্য প্রভৃতিও বিশেষভাবে লক্ষণীয় ।

এই ঘটনা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন যুক্তি ও ফলাফল উদ্‌ঘাটন করে থাকেন । বর্তমানে বিশ্বের প্রত্যেকটি সংস্কৃতিবান ভাষায়ই রসূলের জীবনী পাওয়া যায় । কোন কোন ভাষায় তো এই একই বিষয়ের উপর হাজার হাজার গ্রন্থ রয়েছে । পুনরাবৃত্তির কথা বাদ দিলেও প্রত্যেকটি গ্রন্থই কোন না কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য গুরুত্বের দাবি করতে পারে । শুধুমাত্র রসূলুল্লাহর যুদ্ধসমূহের কথাই ধরুন । কেউ এগুলোকে বর্ণনা করেন কাহিনী হিসেবে , কেউ বর্ণনা করেন যুদ্ধ ইতিহাসের বিষয় হিসেবে , কেউ এগুলোকে অধ্যয়ন করেন আন্তর্জাতিক সমর-নীতির উপমা হিসেবে , কেউ এগুলো থেকে উদ্‌ঘাটন করেন আরব সৈন্যদের মন-মানসিকতা , ধৈর্যশক্তি , বীরত্ব ও অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা অবলম্বনের দক্ষতা , আবার কেউ এগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান করেন অন্য কোন উপাদান ।

যে স্থানে কোন ব্যক্তি তার জীবন অতিবাহিত করেন সেখানে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কাহিনী ও প্রবাদ প্রচলিত থাকে এবং এগুলোর মধ্যে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটতে থাকে । এত প্রচুর উপাদানের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনী লেখক কি করবেন ? তাঁকে নিশ্চয়ই এর কোন না কোন দিকের উপর ভরসা করতে হবে । যদি তিনি এতে প্রথম পদক্ষেপেই সফলকাম হন অর্থাৎ গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে সক্ষম হন তাহলে তো ভাল কথা ; অন্যথায় তাঁকে নিজ চিন্তাশক্তি ও সাহস অনুযায়ী অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতে হবে ।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ঈমান সবার আগে

📄 ঈমান সবার আগে


প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক অঞ্চলে মানব সমাজে দু'টি দলের অস্তিত্ব থাকে । এক দল শুধু পাপাচারে লিপ্ত থাকে না বরং এটাকে একটি সূক্ষ্ম পেশায় পরিণত করে এবং অন্যদল মানব সমাজের এই অবস্থার উপর দারুণভাবে চিন্তিত ও বিচলিত হয়ে পড়ে । আর যেখানে পাপাচার ও চারিত্রিক অধঃপতন যত ব্যাপক হয় সেখানে তত বড় সংস্কারকের প্রয়োজন দেখা দেয় । পূর্ববর্তী নবীদের যুগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় , কোন কোন সম্প্রদায় বা কোন কোন জনবসতির অবস্থা এমনি হয়ে দাঁড়ায় যে , সেখানে দুষ্কর্মকে সাধারণভাবে সুকর্ম বলে মনে করা হয় । তখন অবশ্য বিশ্বের বাকি অঞ্চলের অবস্থা মোটামুটিভাবে সহনীয় থাকে । এমনি পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ তা'আলা ঐ বিশেষ সম্প্রদায় বা বিশেষ অঞ্চলের জন্য নবী-রসূল পাঠিয়ে থাকেন ।

রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে বিশ্বের কোন্ কোন্ দেশে সংস্কারকের প্রয়োজন ছিল তা এখন ভেবে দেখতে হবে । একই পিতামাতা অর্থাৎ আদম হাওয়ার বংশধর হওয়া সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান মানবজাতি , জীবিকার প্রয়োজনে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই নিজেদের আত্মীয়-স্বজনকে ছেড়ে দূর-দূরাঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করতে থাকে । অতঃপর নিজেদের আদি বাসভূমির সাথে যোগাযোগ রাখার কোন প্রয়োজন তাদের ছিল না , কিংবা এ ধরনের কোন সুযোগও তারা পেত না । কেননা তখন পরিবহন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অনুন্নত । তাছাড়া প্রত্যেকটি অঞ্চলই খাদ্য , বস্ত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রে ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ । তখন আজকালকার মত এমন অবস্থা ছিল না যে , প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একে অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষী , কোন অঞ্চলে খাদ্য আছে তো বস্ত্র নেই , কোথাও রুটি আছে তো ডাল নেই , কোথাও লোহা আছে তো কাঠ নেই , কোথাও কয়লা আছে তো পেট্রোল নেই , কোথাও কাগজ আছে তো কালি নেই । আর একমাত্র এ কারণেই প্রাচীন যুগে আন্তর্জাতিক ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে । তখনকার নবী ও সংস্কারকগণও আবির্ভূত হতেন একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা বিশেষ অঞ্চলের জন্য । বার্বার সম্প্রদায়ের নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু বার্বারদের মধ্যে , বনি ইসরাইলী নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু বনি ইসরাইলের মধ্যে এবং আর্য সমাজের নবীর কার্যক্ষেত্র শুধু আর্য সমাজের মধ্যেই সীমবদ্ধ ছিল । মানব সমাজে আন্তর্জাতিক মুখাপেক্ষিতা ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পায় এবং রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে তার ব্যাপকতা এতদূর পর্যন্ত পৌঁছে যে , তখন অভিযান-বিলাসী আরব বণিকরা একদিকে আবিসিনিয়া , মিসর , সিরিয়া এবং অন্যদিকে চীন , ইরান ও ভারতবর্ষে তাদের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যথারীতি যাতায়াত করত । তখন বড় বড় জাহাজ নির্মাণের কৌশলও মানুষের আয়ত্তে এসে গিয়েছিল । এমতাবস্থায় এমন নবী আসারও প্রয়োজন ছিল যিনি কোন স্থান বা কালের বেড়াজালে আবদ্ধ নন , যাঁর শিক্ষা হবে ব্যাপকধর্মী ও সার্বজনীন এবং এই শিক্ষার মাধ্যমে তিনি শীতাঞ্চল , উষ্ণাঞ্চল , শহরাঞ্চল , গ্রামাঞ্চল তথা বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষকে , চাই তারা স্থায়ী বাশিন্দা হোক অথবা যাযাবর-একই মৌলিক ধর্মের ঝাণ্ডাতলে একত্রিত করতে সক্ষম । তার শিক্ষার মধ্যে মুসতাহাব-নফলের ব্যাপার থাকবে সত্যি । অর্থাৎ এমন কিছু কিছু কাজের উল্লেখ থাকবে যেগুলো করা খুবই ভাল , কিন্তু না করলে কোন ক্ষতি নেই । কিন্তু যে যৎসামান্য অবশ্যকরণীয় কাজের উল্লেখ থাকবে সেগুলোর বাস্তবায়ন তথা কার্যকরীকরণ একটি মৌলিক ও সার্বজনীন ধর্মের কাজ দেবে । অর্থাৎ এই দায়িত্বগুলো এমনি প্রকৃতির হবে যে , তা সকলেই নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে সমভাবে পালন করতে পারবে ।

গ্রীস কোন এক যুগে বিজ্ঞান-দর্শনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল এবং সে দর্শনের বন্যাস্রোত প্লাবিত করে ফেলেছিল সমগ্র বিশ্বকে । অতএব এমন একটি উচ্চমানের বিজ্ঞান-দর্শনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল , যা মানুষকে গ্রীক দর্শনের গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে রেহাই দিতে পারে । রোম আইনশাস্ত্র এতটুকু অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল যে , রসূলুল্লাহ্র জন্মের মাত্র পাঁচ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণকারী সম্রাট হাবসীনীন রোমীয় আইনকে শৃঙ্খলার সাথে লিপিবদ্ধ করে বিশ্বকে এই মর্মে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেছিলেন যে , ক্ষমতায় কুলালে এর চাইতে উৎকৃষ্ট কোন আইন উপস্থাপিত কর । এভাবে হিন্দুরা , মিসরীয়রা এবং ইরানীরা এমন কিছু কিছু কৃতিত্বপূর্ণ কাজ করেছিল যার দরুন তারা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের মনোজগতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল । এমতাবস্থায় প্রয়োজন ছিল মানুষের মনোজগতকে সংস্কারমুক্ত করে তাতে স্বাধীন চিন্তার প্রবাহ সৃষ্টি করা , যাতে তারা নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধি এবং শ্রবণ ও দর্শনশক্তিকে অবাধে কাজে লাগাতে পারে । কেননা আল্লাহ্ তা'আলার উপরিউক্ত অবদানসমূহকে অকেজো করে রাখা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে সেগুলোর সদ্ব্যবহার না করা অতি অনুগত ফেরেশতা কিংবা অতি অবাধ্য শয়তানের পক্ষে মানানসই হলেও সুগঠিত দেহের অধিকারী তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে কখনো মানানসই হতে পারে না । রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে বিশ্বের বড় বড় দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল আমাদের উপরিউক্ত মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সে সম্বন্ধে মোটামুটি জ্ঞান আহরণ করা একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়ে ।

চীন
বিশ্বের একেবারে পূর্ব দিগন্তে চীন তার বিখ্যাত সংস্কারক কনফুসিয়াসের ( খ্রীস্টপূর্ব ৫৫১ থেকে ৫৪৯ ) মাধ্যমে দর্শনের এক অপরূপ বন্যা বইয়ে দিয়েছিল সত্যি কিন্তু রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে সেখানকার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছিল ; কনফুসীয়াসী ব্যবস্থা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং ভারতের বৌদ্ধ মতাদর্শ সেখানে ঢুকে পড়ে একটি ব্যাপকতর নবযুগের সূচনা করার উদ্যোগ নিচ্ছিলো । সেখানে হুন শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এবং তার স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ওয়াই ( WAI ) এবং শু ( SHU ) -দের তিনটি রাজ্য এবং সেখানে এমনভাবে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল যে , রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানবতার সেবা করার কোন সুযোগই আর অবশিষ্ট ছিল না । তখনকার চীন শুধু গৃহযুদ্ধেই নয় , বরং তাতারী এবং তিব্বতীদের উপর্যুপরি আক্রমণে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছিল । দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পর ' সুই ' ( ৫৮৯ থেকে ৬১৮ খ্রীস্টাব্দ ) ত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেশের মধ্যে বেশ কিছুটা ঐক্যের সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেও রসূলুল্লাহ্র হিজরতের দু'বছর পূর্বে আবার সেখানে অনৈক্যের সৃষ্টি হয় । অতঃপর ' টায়াংগ ' রাজ পরিবার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অবস্থা কিছুটা আয়ত্তে আসে এবং দেশের মধ্যে মোটামুটি শান্তি-শৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় । তবে ক্ষমতার বড়াই এবং রাজ্য বিস্তারের অন্ধ মোহ তাদেরকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা থেকে বিরত রাখে ( বিস্তারিত বিবরণের জন্য এনসাইক্লোপেডিয়া বৃটানিকা ইত্যাদি দ্রষ্টব্য ) ।

ভারতবর্ষ
খ্রীস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে আর্যরা ভারতবর্ষে আগমন করে । বর্ণপ্রথা , পৌত্তলিকতা , বৈরাগ্যবাদ এবং আরো অনেক কারণে তারা সামাজিকভাবে মানব সেবার সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়েছিল । কনফুসিয়াসের সমসাময়িক গৌতম বুদ্ধ ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে জোর প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন । প্রতিকার ছিল ঠিকই , কিন্তু বৌদ্ধমতের মধ্যেও বাড়াবাড়ি এবং তা ছিল শুধুমাত্র সাময়িক প্রয়োজন পূরণের জন্য । ঐ মতবাদ দ্রুত প্রসার লাভ করলেও তাতে সর্বকাল-উপযোগী মৌলিক উপাদান ছিল না । ফলে বৌদ্ধমত ও ব্রাহ্মণ্যবাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন আকর্ষণ-প্রতিআকর্ষণ তথা জয় পরাজয়ের খেলা চলতে থাকে এবং পরিণামে বৌদ্ধ মতকে ভারতবর্ষ থেকে অত্যন্ত নির্মমভাবে নির্বাসিত করা হয় । রসূলুল্লাহর আবির্ভাবের পূর্বে মধ্য এশিয়া ছিল হুনদের শাসনাধীন । কিন্তু রসূলুল্লাহর নবুওত লাভের পাঁচ বছর পূর্বে অর্থাৎ ৫৬৫ খ্রীস্টাব্দে তাদের পরাজয় ঘটে । ফলে ভারতবর্ষ থেকেও তারা ক্ষমতাচ্যুত হয় । অতঃপর থানেশ্বরের রাজার কনিষ্ঠ পুত্র হর্ষ ( ৬০৬ থেকে ৬৪৮ খ্রীস্টাব্দ ) দক্ষিণ ভারতের অধিকারী হন এবং ক্রমে ক্রমে তিনি বাংলা , নেপাল , মালব , গুজরাট প্রভৃতি দখল করেন । কিন্তু হিজরতের কিছু পূর্বে অর্থাৎ ৬১০ খ্রীস্টাব্দে তিনি দক্ষিণ ভারত আক্রমণ করলে চালুক্য বংশের পুলকেশীর ( দ্বিতীয় ) হাতে নর্মদা নদীর তীরে পরাজিত হন । তাঁর কোন বংশধর ছিল না এবং তিনি তাঁর প্রজাদের অত্যন্ত আরামপ্রিয় করে তুলেছিলেন । ফলে তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর সাম্রাজ্যেরও অবসান ঘটে । অতঃপর যুগ যুগ ধরে ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে । চালুক্য বংশের হর্ষকে পরাজিত করলেও অন্যদের হাতে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের সাম্রাজ্যেরও চিরবিলুপ্তি ঘটে ।

তুরস্ক
তুরস্ক একটি ঘনবসতি ভূখণ্ড । কিন্তু খ্রীস্টীয় সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সেখানকার কোন অবস্থাই জানা যায় না । রসূলুল্লাহর সমসাময়িককালে হুনরা তিব্বতের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং তুর্কীরা বিজয়ী বেশে প্রতীচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো । কিন্তু এই তুর্কীরা কোন সভ্যতা সংস্কৃতির অধিকারী ছিল না এবং সামগ্রিকভাবে মানবসেবা করার মত কোন গুণও তাদের মধ্যে ছিল না ( এনসাইক্লোপেডিয়া বৃটানিকা দ্রষ্টব্য ) ।

রোম ও ইরান
গ্রীক শাসনের অবসান ঘটেছিল অনেক আগেই । তার পরিবর্তে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রোমকদের শাসন । কিন্তু যখন তা পশ্চিম ও পূর্ব—এই দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লো তখন আমরা দেখতে পাই যে , রসূলুল্লাহর আবির্ভাবকালে জার্মান প্রভৃতি বর্বর জাতি পশ্চিমা রোমকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং ছিনিয়ে নিয়েছে রোমের সিংহাসন । এই নিরক্ষর বর্বরতা মানুষের সাথে যে আচরণ করত তার একটি নমুনা হচ্ছে এই যে , তারা প্রেমের ধর্ম ' ঈসাইয়ত ' গ্রহণ করার পরও এমন নির্দয় ও নীতিভ্রষ্ট রয়ে গিয়েছিল , যেমনটি একজন অ-ঈসায়ীর কাছ থেকেও কল্পনা করা যায় না । অপরদিকে পূর্বরোম , কনস্টান্টিনোপলে রাজধানী স্থাপন করে যুগের পর যুগ ধরে প্রতিবেশী ইরানীদের সাথে যুঝতে থাকে । রসূলুল্লাহর নবুওতের প্রারম্ভিককালে ইরানীরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাত থেকে মিসর , সিরিয়া প্রভৃতি ছিনিয়ে নেয় । তখন কুরআন ঘোষণা করেছিল , “ রোমানরা পরাজিত হয়েছে আরব দেশের অতি নিকটবর্তী স্থানে , কিন্তু তারা তাদের এই পরাজ্যের পর শীঘ্রই জয়ী হবে—৩ বছর থেকে ৯ বছরের মধ্যে । পূর্বে ও পরে সর্বদাই আল্লাহ্র আদেশ বলবৎ থাকবে এবং সেদিন মুমিনগণ আল্লাহর এই সাহায্যের কারণে আনন্দিত হবে । তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন , তিনি মহাক্ষমতাবান , পরম দয়াময় ” ( ৩০ : ১-৫ ) । হিজরী ৬ সনে অর্থাৎ হুদায়বিয়া সন্ধির সময়ে মুসলের রণক্ষেত্রে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের হাতে ইরানীরা এমন শোচনীয় পরাজয় বরণ করে যে , অতঃপর তারা আর কোনদিনই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি । এটা ছিল কনস্টান্টিনোপলের রোমকদের ( বাইজেন্টাইনীদের ) জন্য একটি বিরাট বিজয় । কিন্তু এ বিজয় থেকেও তারা উপকৃত হতে পারল না । কেননা যুগের পর যুগ ধরে বহিরাক্রমণ একদিকে যেমন তাদের দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছিল , অন্যদিকে তেমনি ধর্মীয় ফিতনা-ফাসাদও সেখানে দারুণভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল । হযরত ঈসা ( আ ) -এর মধ্যে শুধু খোদায়ী স্বভাব আছে , না খোদায়ী ও মানবিক উভয় স্বভাবের সংমিশ্রণ আছে—ইত্যাকার দর্শন বাইজেন্টাইনীদের মধ্যে দলাদলি ও রেষারেষির সৃষ্টি করছিল এবং প্রত্যেকটি দলই অত্যন্ত অদূরদর্শী ও সংকীর্ণমনা হয়ে উঠেছিল । তারা একে অন্যের উপর এত অত্যাচার করতে থাকে যে , যখন শাসকদলের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয় তখন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঈসায়ী ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মনেপ্রাণে ঐ অপরিচিত ভিন্নধর্মী মুসলমানদের স্বাগতম জানায় এবং বিভিন্নভাবে সাহায্যও করতে থাকে । এমন কি মুসলমানদের অধীনে থাকাকে তারা তাদের সহধর্মী ঈসাইদের অধীনে থাকার চাইতে অধিক শ্রেয় মনে করত ।
( রোমের উত্থান ও পতনঃ গীবন ) ইরানের অবস্থাও ছিল তাই । ' সম্পত্তি এবং স্ত্রীলোকের মধ্যে সকলের সমান অধিকার '—মুযদাক প্রবর্তিত ইত্যাকার সমাজতন্ত্র শুধুমাত্র দেশের মধ্যে গৃহযুদ্ধেরই আগুন জ্বালিয়ে রাখেনি বরং সেই সাথে দেশবাসীর চরিত্রকেও ধ্বংস করে দিয়েছিল । পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়িয়েছিল যে , মুযদাক প্রকাশ্য দরবারেই সম্রাটকে সম্বোধন করে বলেছিলেন ' এই রাণী থেকে শুধু তুমি কেন , সকলেই উপকৃত হতে পারে । ' একথা বলতে তার বিবেকে বাঁধে নি বা তিনি লজ্জাবোধও করেন নি । অতঃপর নওশেরওয়ান যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তিনি তাঁর পিতার বিপরীত কর্মপন্থা গ্রহণ করেন । তখন অগ্নিউপাসকরা মুযদাকতন্ত্রীদের উপর যে অত্যাচার চালায় তা ছিল অত্যন্ত নির্মম এবং পৈশাচিক ।

আবিসিনিয়া
আবিসিনিয়াও একটি বিরাট অঞ্চল । আবিসিনীয়রা ইরানীদের কাছ থেকে ইয়ামেন দেশ ছিনিয়ে নেয় । কিন্তু যখন এই ' হাতীর আরোহীরা ' ( কুরআনের সূরা ফীল দ্রষ্টব্য ) উত্তর আরবের দিকে ( নবীর আবির্ভাব বছর ) অগ্রসর হয় তখন ' পশুর চর্বিত ঘাস ' - এর ন্যায় পর্যুদস্ত হয়ে ভূপৃষ্ঠে লুটিয়ে পড়ে । রসূলুল্লাহর নবুয়তকালে আরব থেকেই তাদের সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে নি , বরং গৃহযুদ্ধ এবং অন্যান্য কারণে খোদ আবিসিনিয়ায়ও তা বিকল হয়ে পড়ে । আবিসিনিয়ার ঐ গৃহযুদ্ধের কারণে সেখানে হিজরতকারী মুসলমানরা সবসময়ই বিচলিত থাকতেন ।

মোটকথা , তখন বিশ্বের সর্বত্রই ছিল ধ্বংস , ফিত্না এবং অশান্তি । মহানুভবতা ও মানবতার অভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট । তখন সমগ্র বিশ্বকে একথা খুব ভালভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল যে , তারা একই আদম-হাওয়ার বংশধর । প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল তাদেরকে দেশ , জাতি , বংশ এবং এ ধরনের অন্যান্য সীমিত ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এমন একটি মৌলিক মযহাব বা জীবন ব্যবস্থা পেশ করার যা আঞ্চলিক ও ভাষাগত বৈষম্যের উর্ধ্বে এবং বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত । প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল এমন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের যা প্রতিটি মানুষকে তার ব্যক্তিগত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ করে তুলবে এবং তাকে সর্বপ্রকার সহায়তা প্রদান করবে তার জীবনের মূল লক্ষ্য অর্জনে ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px