📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ধন্যবাদ, প্রিয় শত্রু

📄 ধন্যবাদ, প্রিয় শত্রু


হযরত মুহাম্মদ (সা) ছিলেন সর্বগুণের আধার, রাহমাতুল্লিল 'আলামীন। এজন্যই তিনি বিশ্বনবী, খাতামুন নবীয়ীন। বিশ্বনবীর জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিভিন্ন ভাষায় বিস্তর আলোচনা হয়েছে; কিন্তু তাঁর জীবন ব্যপ্তিতে যেন এক অতল সমুদ্র, যাঁর শেষ নেই সীমা নেই। রসূল জীবনের রাজনৈতিক দিক সম্পর্কেও বিভিন্ন জন আলোচনা করেছেন। তবে ডঃ মুহাম্মদ হামীদুল্লাহর 'রসূলে আকরাম কী সিয়াসী যিন্দেগী' শীর্ষক পুস্তকটি এক্ষেত্রে একটি অতি মূল্যবান সংযোজন। সুপণ্ডিত ডঃ মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ্ পুস্তকটিতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে এমন অনেক চমকপ্রদ তথ্য পরিবেশন করেছেন, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ঠেকবে। তবে তাঁর পরিবেশিত সব তথ্যই প্রমাণ-সিদ্ধ, কোন-না-কোন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।

উপরিউক্ত কারণেই আমি 'বিশ্বনবীর রাজনৈতিক জীবন' শিরোনামে পুস্তকটির অনুবাদে হাত দিই। কিন্তু এক-তৃতীয়াংশ কাজ শেষ হতে না হতেই এমন এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি যে, সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না ভেবে পত্র মারফত ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে বিষয়টি জানিয়ে দিতে মনস্থ করি। এমতাবস্থায় সৌভাগ্যবশতই আমার এককালের কৃতি ছাত্র আবদুল কুদ্দুস আদিল আমার সাথে দেখা করতে আসে এবং আমার অভিভাবকত্বে সে নিজেই পুস্তকটির অনুবাদে হাত দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে। মাদ্রাসা বোর্ড ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত ডিগ্রীধারী আমার এই প্রিয় ছাত্রটির ঐকান্তিক আগ্রহ দেখে অসুস্থতা সত্ত্বেও আমি তাতে সায় দেই। সে কিছু অংশ অনুবাদ করে নিয়ে আসত আমি তা সম্পাদনা করে দিতাম। এভাবে কিছুদিন কাজ চলার পর আল্লাহর ফজলে আমি সুস্থ হয়ে উঠি।

আমার ছাত্রটিও তখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবে একটি মফস্বল শহরে চলে যায়। এবার আমি নিজেই পুরোদমে কাজ শুরু করি এবং ভালোয় ভালোয় তা শেষও করি। আমার ছাত্রটি মাঝখানে না পড়লে প্রিয় নবীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে এভাবে নাড়াচাড়া করার সুযোগ থেকে আমি নিশ্চয়ই বঞ্চিত হতাম। এজন্য তার কাছে ঋণী হয়ে রইলাম। অবশ্যই এই অনুশীলনীর মাধ্যমে তারও লেখক জীবনের সূচনা হয়েছিল এবং আল্লাহর ফজলে আজ সে একজন লেখক ও অনুবাদক হিসাবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। আমার এ ছাত্রটির জন্য আমি গর্ববোধ করি এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”

📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”


বিভিন্ন জাতিতে এবং বিভিন্ন ভাষায় নবী এবং রসূল সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত আছে। তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এই সৃষ্টি (নবী রসূল) সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে আগাগোড়া এই ধারণাই প্রচলিত যে, ইনি হচ্ছেন ইনসানে কামিল-পরিপূর্ণ মানুষ। আর এই পরিপূর্ণতা হচ্ছে শুধুমাত্র মানবীয় দিক সম্পর্কেই। মানুষের জীবনে দু'টি দিকই হচ্ছে প্রধান। একটি মা'আশ (ইহজীবন) এবং অন্যটি মা'আদ (পরজীবন)। অন্য কথায়, একটি হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের এবং অন্যান্য সৃষ্টির সম্বন্ধ সম্পর্কিত, আর অন্যটি হচ্ছে মানুষের সাথে তার সৃষ্টিকর্তা পরম পরাক্রমশালী প্রভুর সম্বন্ধ সম্পর্কিত। প্রথমটির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে শাসনক্ষমতার অধিকারী হওয়া আর দ্বিতীয়টির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে আকায়িদ-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব অর্থাৎ পয়গাম্বরী লাভ।

রসূলে আরবী হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সা) একাধারে ছিলেন উপরিউক্ত দু'টি গুণেরই অধিকারী। তাঁর জীবনের এই দু'টি দিক সম্পর্কে আলোচনা একটি বিরাট ব্যাপার। এই পুস্তকে শুধুমাত্র তাঁর জীবনের একটি দিক অর্থাৎ রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

কিন্তু স্থিরমস্তিষ্ক জ্ঞানান্বেষী এবং ব্যক্তিগত চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে একটি স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তি মাত্রেরই মনে এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, আজ থেকে সাড়ে তেরশ' বছর পূর্বে যিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন, যাঁর মৃত্যুর পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবিত উন্নতি হয়েছে, সভ্য জাতিসমূহের পরিবেশ এবং জীবন সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন- সর্বোপরি যিনি ছিলেন আমাদের মত একজন মানুষই- এই যুগে কি তাঁর জীবন আলোচনার শিক্ষা অনুসরণের প্রয়োজন আছে?

রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর জীবনে প্রথমবার যখন ঘোষণা করেন, "আমি সমগ্র বিশ্বের রহমতরূপে এসেছি এবং যে দীন ইসলাম (শান্তির ধর্ম) নিয়ে এসেছি তাঁর অনুসরণ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে ইহকাল পরকালের মঙ্গল লাভ সম্ভব নয়-তখন উদ্ধত স্বভাবের লোকেরা কূট তর্কে লিপ্ত হয় এবং বিরোধিতা করতে থাকে। কিন্তু শান্ত স্বভাবের লোকেরা অনুরূপ না করে বরং রসূলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করে: ইসলাম কাকে বলে এবং আপনার মতে আমাদের কি করা উচিত? এই জিজ্ঞাসার জওয়াব পাওয়ার পর তারা আবার ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হলে তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণও করে।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ধন্যবাদ, হে আবু বকর ও উমর!

📄 ধন্যবাদ, হে আবু বকর ও উমর!


প্রথম খলীফা নির্বাচনের সময় মুসলমানরা সর্বসম্মতিক্রমে একই সময়ে 'একই রাষ্ট্রে দুই রাষ্ট্রনায়ক' নির্বাচনের নীতি অনুসরণ করেছিল বলে বর্ণিত আছে।

যখন রসূলুল্লাহ্ (সা) এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন তখন একতা ও ঐক্যের ইসলামী শিক্ষা মুসলমানদের বাধ্য করলো, নবীকে কাফন-দাফনের পূর্বেই তাঁর উম্মতের জন্য একজন রাখাল (নেতা) নির্বাচন করতে, যাতে একটি মুহূর্তের জন্যও নৈরাজ্য সৃষ্টির কোন অবকাশ না থাকে। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সীরাত (নবী চরিত্র) লেখকেরা এক্ষেত্রে যা লিখেছেন তার মধ্যে এই বাক্যটিও আছে যে, যখন আনসার ও মুহাজিরদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সাকীফা-ই-বনী সাদা'য় সমবেত হন এবং আনসারী নেতা তাঁর দলের অগ্রাধিকার প্রাপ্তির পক্ষে মত প্রকাশ করেন তখন মুহাজিরদের পক্ষ থেকে হযরত আবু বকর (রা) দাঁড়িয়ে বলেন-

“উমর (রা) থেকে বর্ণিত।..... তুমি তোমাদের যে সমস্ত কৃতিত্বপূর্ণ কাজের উল্লেখ করেছ, নিঃসন্দেহে তোমরা সেগুলোর অধিকারী, কিন্তু আরবের লোক কুরায়শ ছাড়া অন্য কাউকেই (নেতা) মানবে না। তারা (কুরায়শরা) বংশগত এবং পারিবারিক দিক দিয়ে আরবের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন। আর আমি এই দুইজন থেকে যেকোন একজনকে তোমাদের নেতা নির্বাচন করতে সম্মত আছি। তোমরা যার হাতে ইচ্ছা বায়'আত কর।" তখন তিনি আবু বকর (রা) আমার এবং আবু উবায়দা বিন জাররাহ (রা)-এর, যিনি আমার সাথেই বসেছিলেন-হাত ধরলেন। তিনি সেদিন যা বলেছিলেন, তার মধ্যে এই শেষ কথাটি ছাড়া অন্য কোন কথা আমার কাছে খারাপ লাগেনি। আল্লাহর শপথ, যদি কোন অপরাধ ছাড়াই আমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হত তাহলে সেটাও আমার কাছে অধিক পছন্দনীয় হত এটা হতে যে, আমাকে ঐ সমস্ত লোকের নেতা নির্বাচন করা হবে যাদের মধ্যে আবূ বকর (রা)-ও (জীবিত) আছেন। অতঃপর এক আনসারী দাঁড়িয়ে বললেন 'এ ব্যাপারে আপনি আমার প্রস্তাব মেনে নিন এবং আমার কথার মর্যাদা দিন। কুরায়শগণ, এক নেতা আমাদের মধ্য থেকে হবেন এবং এক নেতা তোমাদের মধ্য থেকে।' একথার উপর খুব হট্টগোল শুরু হলো এবং এমনভাবে চীৎকার-ধ্বনি উঠতে থাকলো যে, আমি মুসলিম জাতির অনৈক্যের ব্যাপারে আশংকিত হয়ে উঠলাম। তাই আমি বললাম, হে আবূ বকর (রা) আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি তাঁর হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং আমি তাঁর হাতেই বায়'আত করলাম। অতঃপর মুহাজিররা তাঁর হাতে বায়'আত করলো। অতঃপর আনসাররাও তাঁর হাতে বায়'আত করলো।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ভাই ইবনু জিবরিনের চিঠি

📄 ভাই ইবনু জিবরিনের চিঠি


বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনকথা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে । তথ্যাদি কখনো বেশি হয় , আবার কখনো কম । কখনো কখনো কোন ভাষার শ্রুতিকাহিনী , প্রবাদবাক্য কিংবা অন্য কোন পরোক্ষ উৎস থেকে ঐ ভাষার জাতীয় বীরদের জীবনকথা উদ্ধার করা হয় ।

কোন বাদশাহ , রাজনৈতিক ব্যক্তি , কারিগর , পেশাদার , দার্শনিক , কবি , সাহিত্যিক , সূফী , সংসারত্যাগী , ধার্মিক , ধর্মবিরোধী , বুদ্ধিমান , নির্বোধ তথা যেকোন মানুষের জীবনকথা জানতে হলে এক একটি বিশেষ পদ্ধতিতে সে সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করতে হয় । যেমন কোন স্থপতির জীবন-কথা জানতে হলে তার তৈরী ইমারতের শিল্পগত , অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দিক যাচাই করে দেখতে হবে , কোন নেতা ও সংস্কারকের জীবনকথা জানতে হলে দেখতে হবে জনসাধারণের মনের গভীরে তার নেতৃত্ব কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছে এবং কতটুকু স্থায়ী হয়েছে ।

আর যদি কোন ব্যক্তি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হন তাহলে জীবনীকারের কাজও বহুমুখী হয়ে পড়ে । জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন ব্যক্তির দৈহিক অবস্থা , বুদ্ধিগত ঊর্ধ্বমুখিতা , পারিবারিক জীবন , সামাজিকতা , বন্ধুদের সাথে ব্যবহার , শত্রুদের সাথে আচরণ , তার সম্পর্কে তার নিজের চিন্তা-ধারণা এবং অন্যদের মন্তব্য মতামত সে ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে যোগায় এক একটি চমৎকার উপাদান ।

কোন নবীর মহান জীবনের কার্যাবলী যেমন মানুষের সৌভাগ্যের উৎস , তেমনি সেগুলোকে হুবহু উদ্ধার করাও অত্যন্ত কঠিন । কেননা তাঁর জীবনীতে যেমন পার্থিব ও অন্যান্য ব্যাপার রয়েছে , তেমনি রয়েছে ওহী সম্পর্কিত বিষয়াদি এবং অনেক আলৌকিক ঘটনাও । দুনিয়ায় শুধু নবী-রসূলই নন বরং এমন একজন মানুষও পাওয়া যাবে না , যার জীবনের ঘটনাবলী হযরত মুহাম্মদ ( সা ) -এর জীবনের ঘটনাবলীর মত এত বিস্তৃত ও বিভিন্নমুখী । রসূল জীবনের তথ্যাদি সংগ্রহের যে সমস্ত উপাদান ও উৎস রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে মোটামুটিভাবে এই ধারণা করা যেতে পারে যে , নবুওত জীবনের ২৩ বছরে তাঁর মুখ দিয়ে যে সমস্ত কথাবার্তা ও আদেশ-নিষেধ নিঃসৃত হয়েছে , তার যে সংক্ষিপ্ত ও সীমিত অংশটি সংরক্ষিত রয়েছে এবং আমাদের কাছে পৌঁছেছে-তাও শুধু হাজার হাজার নয় বরং লক্ষ লক্ষ হাদীসের আকারে বিদ্যমান । যদি তাঁর কার্যাবলী এবং ব্যক্তিগত আচার-আচরণকেও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে অনেকগুলো খণ্ডে শুধুমাত্র সুন্নাত তথা হাদীসের স্থানই সংকুলান হতে পারে ।

কোন ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর সাথে সাক্ষাতকারীরাও অনেক তথ্যাদি সরবরাহ করতে পারে । আর হিজরী ১০ সনে , রসূলুল্লাহর বিদায় হজ্জে আরাফার মাঠে তাঁর যে সকল অনুসারী অংশগ্রহণ করেছিলেন , তাদের সংখ্যাই ছিল এক লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ এবং যারা অংশগ্রহণ করতে পারেন নি তাদের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই ছিল এর চাইতে কয়েক গুণ বেশি । হাদীসবিশারদদের মতে , সাহাবীদের মধ্যে যারা রসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে কোন না কোন হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের সংখ্যাই এক লক্ষের চাইতে বেশি । বিশ্বের অন্য যেকোন ব্যক্তির জীবনের অবস্থাদির চাক্ষুস সাক্ষী এত বিরাট সংখ্যক লোক হওয়া তা দূরের কথা , এর সহস্র ভাগের এক ভাগও হবে না । রসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাতকারীদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর গুরুজন , আত্মীয়-স্বজন , পরিবারবর্গ , চাকর-ভৃত্য , বন্ধু-বান্ধব এবং হঠাৎ আগমনকারীরা ।

রসূলুল্লাহ ( সা ) -কে তাঁর ৬৩ বছরের ঘটনাবহুল জীবনে কত চিঠি-পত্রই না লিখতে হয়েছে । তাঁর নবুওতকালের সাথে সম্পর্কিত আড়াই তিন'শ চিঠি , ইতিহাস এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছে । শুধুমাত্র এই চিঠিগুলোর কথাই ধরুন । তিনি কখন এগুলো লিখেছিলেন , কেন লিখেছিলেন , তার ফল কি হয়েছিল , ইত্যাকার বিবরণী লিপিবদ্ধ করতে গেলেই কয়েক খণ্ড বিরাট পুস্তক হয়ে যাবে ।

রসূল-জীবনের তথ্যাবলীর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে তাঁর সমসাময়িক কবিদের কথামালা বা কাব্যগাঁথা । তাদের কথামালার বিষয়বস্তু , ইংগিত-ইশারা , তাঁদের নিরীক্ষা , স্থিরসিদ্ধান্ত , প্রকাশভঙ্গি এবং আরো অনেক বিষয় এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার । বহির্দেশে রসূলুল্লাহর অবস্থাদির যে বিবরণ পৌঁছেছে সেগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায় সমসাময়িক বহির্দেশীয় ব্যক্তিদের লেখা ভ্রমণকাহিনী সমূহে । অতএব রসূল-জীবনের তথ্যাদি সংগ্রহে ঐ সমস্ত কাহিনীরও কমবেশি ভূমিকা রয়েছে ।

অতঃপর রয়েছে রসূল প্রদত্ত শিক্ষা । তাঁর শিক্ষাকে জানতে হলে তিনি কি মিশন নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সেটাকে ফলপ্রসূ করার জন্য কি কি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন , তার কি প্রভাব পড়েছিল , কিভাবে তাতে তিনি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এনেছিলেন ইত্যাকার বিষয় জানতে হবে । যেহেতু কোন একটি নির্দিষ্ট যুগ সম্পর্কে জানতে হলে তার পটভূমি অবশ্যই জানা চাই , তাই রসূল-যুগ সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা করতে হলে তাঁর নবুওত যুগ এবং সেই সাথে নবুওত পূর্ববর্তী যুগ সম্পর্কেও একটি মোটামুটি ধারণা থাকতে হবে । আর সত্যি কথা বলতে গেলে , রসূলের মত পূত-পবিত্র ও সর্বগুণের অধিকারী একজন মহাপুরুষের জীবন সম্পর্কে অবহিত হতে হলে সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মানবেতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে ।

কোন ব্যক্তির কৃতিত্বপূর্ণ কার্যাবলীর গুরুত্ব নিরূপণ করতে হলে কাজের সংখ্যা বা পরিমাণ নয় বরং ধরন এবং অবস্থার প্রতিই লক্ষ্য করতে হয় । ১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধে এক কোটি এবং ১৯৩৯ সালের বিশ্বযুদ্ধে চার কোটি লোক মারা গেছে বলে পরিসংখ্যানে প্রকাশ । কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে এই দুই মহাযুদ্ধের ততটুকু গুরুত্ব নেই যতটুকু গুরুত্ব রয়েছে বদর যুদ্ধের । অথচ বদর যুদ্ধে দুইপক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা একশ'ও ছিল না । অনুরূপভাবে বহু কোটি টাকার মালিক রকফেলারের এক কোটি টাকা দান করা কিংবা মৃত্যুর সময় উইল করা—ঐ ব্যক্তির মাত্র কয়েক শ' টাকা চাঁদাদানের সমপরিমাণ গুরুত্ব রাখে না যে ব্যক্তিকে , 'এই চাঁদার পর তুমি ঘরে কি রেখে এসেছ ?'—এই মর্মে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন , 'শুধুমাত্র আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রসূলের মুহব্বত-ভালবাসা ছাড়া কিছুই ঘরে রেখে আসিনি ।' উপরন্তু অনেকগুলো ঘটনার তাৎপর্য ততক্ষণ পর্যন্ত বোঝাই যায় না যতক্ষণ না সেগুলোর মূল্যমান নির্ণীত হয় , যতক্ষণ না অবগত হওয়া যায় ঐ অঞ্চলের ভৌগোলিক , অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা , ঐ অঞ্চলের অধিবাসী ও ঘটনা অংশগ্রহণকারীদের মানসিক অবস্থা , ঐ অঞ্চলের আভ্যন্তরীণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং আরো অনেক বিষয় , যেখানে ঐ সমস্ত ঘটনা ঘটেছে । কোন ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে হলে তার সম্পর্কে তুলমূলক আলোচনাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ । এক্ষেত্রে লেখকদের ধর্মীয় বিশ্বাস , উপযুক্ততা , উপাদানের সহজলভ্যতা , পরিস্থিতির আনুকূল্য প্রভৃতিও বিশেষভাবে লক্ষণীয় ।

এই ঘটনা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন যুক্তি ও ফলাফল উদ্‌ঘাটন করে থাকেন । বর্তমানে বিশ্বের প্রত্যেকটি সংস্কৃতিবান ভাষায়ই রসূলের জীবনী পাওয়া যায় । কোন কোন ভাষায় তো এই একই বিষয়ের উপর হাজার হাজার গ্রন্থ রয়েছে । পুনরাবৃত্তির কথা বাদ দিলেও প্রত্যেকটি গ্রন্থই কোন না কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য গুরুত্বের দাবি করতে পারে । শুধুমাত্র রসূলুল্লাহর যুদ্ধসমূহের কথাই ধরুন । কেউ এগুলোকে বর্ণনা করেন কাহিনী হিসেবে , কেউ বর্ণনা করেন যুদ্ধ ইতিহাসের বিষয় হিসেবে , কেউ এগুলোকে অধ্যয়ন করেন আন্তর্জাতিক সমর-নীতির উপমা হিসেবে , কেউ এগুলো থেকে উদ্‌ঘাটন করেন আরব সৈন্যদের মন-মানসিকতা , ধৈর্যশক্তি , বীরত্ব ও অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা অবলম্বনের দক্ষতা , আবার কেউ এগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান করেন অন্য কোন উপাদান ।

যে স্থানে কোন ব্যক্তি তার জীবন অতিবাহিত করেন সেখানে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কাহিনী ও প্রবাদ প্রচলিত থাকে এবং এগুলোর মধ্যে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটতে থাকে । এত প্রচুর উপাদানের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনী লেখক কি করবেন ? তাঁকে নিশ্চয়ই এর কোন না কোন দিকের উপর ভরসা করতে হবে । যদি তিনি এতে প্রথম পদক্ষেপেই সফলকাম হন অর্থাৎ গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে সক্ষম হন তাহলে তো ভাল কথা ; অন্যথায় তাঁকে নিজ চিন্তাশক্তি ও সাহস অনুযায়ী অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতে হবে ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px