📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 শুরুর কথা

📄 শুরুর কথা


একজন সুপণ্ডিত ও চিন্তাবিদ হিসাবে ডঃ হামীদুল্লাহর নাম মুসলিম বিশ্বে সুপরিচিত। বিশ্বের প্রধান প্রধান সাতটি ভাষায় ইসলাম সম্পর্কিত তাঁর তথ্যবহুল মৌলিক রচনাদি প্রকাশিত হয়েছে। 'রসূলে আকরম কী সিয়াসী যিন্দেগী' শীর্ষক পুস্তকে তিনি রসূল জীবনের, প্রধানত রাজনৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়সহ বিশ্বনবী (সা) কিভাবে বিভিন্ন অমুসলিম রাজশক্তি ও জনগোষ্ঠীর সাথে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন, কিভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান দিয়েছিলেন তারও একটি ধারাবাহিক ও পরিপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে।

কৌটিল্যনীতি, ধোঁকাবাজির পথ (যাকে আধুনিক রাজনীতির অপরিহার্য অঙ্গ বলে মনে করা হয়) অবলম্বন না করেও যে সার্থকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় এবং রাষ্ট্র বিস্তারের একমাত্র উদ্দেশ্যই যে জনকল্যাণ তার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল হযরত মুহাম্মদ (সা) প্রায় ১৪শ' বছর আগে। আর তারই একটি ধারাবাহিক সুন্দর চিত্র অঙ্কিত হয়েছে ডঃ হামীদুল্লাহ্ 'রসূলে আকরম কী সিয়াসী যিন্দেগী'তে। শুধু বাংলায় কেন, অন্য যে-কোন ভাষায়ও এ ধরনের তথ্যসমৃদ্ধ পুস্তক বিরল। বইটির প্রথম প্রকাশের পর অল্পদিনেই এর সমস্ত কপি নিঃশেষ হয়ে যায়। দেরিতে হলেও বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করতে পেরে আমরা গর্বিত।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


সব প্রশংসা আল্লাহর; দরূদ ও সালাম সর্বশেষ নবী এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথীদের উপর।

সর্বগুণের আধার হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনের উপর কিছু একটা লেখার সাধ ছিল, ঐকান্তিক বাসনা ছিল, কিন্তু সাহস ছিল না। আর পূর্ববর্তীদের ডিঙ্গিয়ে নতুন কোন্ কথাটি আমার বলারই বা আছে? 'সীরাতুন নবী' (প্রণেতা: শিবলী নুমানী ও সুলায়মান নদভী)-এর মত পাণ্ডিত্যপূর্ণ তথ্যবহুল বিরাট গ্রন্থ আমাদেরই মাতৃভাষায় লেখা হয়ে গেছে, নবীজীবনের উপর মধ্য ও ক্ষুদ্রাকারের আরো অনেক গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে। মোটকথা, আমাদের কিঞ্চিৎ পূর্ববর্তীরাও, তাঁদের পরবর্তীদের জন্য নবীজীবনের উপর লেখার মত কোন বিষয়, বড় একটা ছেড়ে যান নি।

তবে আমি এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম যে, দিনের পর দিন আমাকে নবীজীবনী অধ্যয়ন করতে হত এবং সাময়িক প্রয়োজনে এর উপর কিছু লিখতেও হত; কিন্তু তখন কল্পনাও করতে পারিনি যে, এই পরস্পর বিচ্ছিন্ন লেখাগুলো আপনা-আপনি একটি বিরাট গ্রন্থের এক একটি অধ্যায়ে রূপ নিচ্ছে। যাহোক, সন তারিখের ধারাবাহিকতা সহ নবী-জীবনী লেখার পরিবর্তে, নবী-জীবনের সাথে কোন-না-কোনভাবে সম্পর্কিত বিভিন্ন দেশ ও জাতির উপর ভিত্তি করে আমি কিছু প্রবন্ধ রচনা করি, যা গত বিশ বছর ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে আসছে। বই পুস্তকের অনুপাতে এই সমস্ত জিনিস শীঘ্রই মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। তাই ঐ ধরনের কিছু প্রবন্ধ একত্রিত করে সেগুলোকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা যুক্তিযুক্ত মনে করি। এতে আর কেউ উপকৃত না হলেও সময় সময় কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের বিবরণ কিংবা রেফারেন্স খুঁজে পেতে অন্তত আমার কিছুটা সুবিধা হবে। অবশ্য আলোচ্য বিষয়ের পরিপূর্ণতার দিকে লক্ষ্য রেখে দু'একটি অপ্রকাশিত নতুন অধ্যায়ও এতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

যে সমস্ত পত্র-পত্রিকায় এই প্রবন্ধগুলো প্রথমবার প্রকাশিত হয়েছিল তাদের কাছ থেকে এগুলো পুনঃপ্রকাশের অনুমতি গ্রহণ করা অবশ্যই একটি নৈতিক দায়িত্ব ছিল, কিন্তু অবস্থা বিপাকে সে দায়িত্ব পালনের সুযোগ আমার হয়ে উঠে নি। যা হোক, আমি এই যৎসামান্য পুঁজি নিয়ে পাঠকবৃন্দের সামনে হাযির হলাম। এটা যদি কারো কোন উপকারে আসে তাহলে নিজেকে ভাগ্যবানই মনে করবো। হ্যাঁ, যদি জীবন পাই এবং উপাদানও সংগৃহীত হয়, তাহলে নবী-জীবনী রচনার উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করবো। কেননা আমার কাছে এর চাইতে মহৎ কাজ আর নেই।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 ধন্যবাদ, প্রিয় শত্রু

📄 ধন্যবাদ, প্রিয় শত্রু


হযরত মুহাম্মদ (সা) ছিলেন সর্বগুণের আধার, রাহমাতুল্লিল 'আলামীন। এজন্যই তিনি বিশ্বনবী, খাতামুন নবীয়ীন। বিশ্বনবীর জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিভিন্ন ভাষায় বিস্তর আলোচনা হয়েছে; কিন্তু তাঁর জীবন ব্যপ্তিতে যেন এক অতল সমুদ্র, যাঁর শেষ নেই সীমা নেই। রসূল জীবনের রাজনৈতিক দিক সম্পর্কেও বিভিন্ন জন আলোচনা করেছেন। তবে ডঃ মুহাম্মদ হামীদুল্লাহর 'রসূলে আকরাম কী সিয়াসী যিন্দেগী' শীর্ষক পুস্তকটি এক্ষেত্রে একটি অতি মূল্যবান সংযোজন। সুপণ্ডিত ডঃ মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ্ পুস্তকটিতে রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে এমন অনেক চমকপ্রদ তথ্য পরিবেশন করেছেন, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ঠেকবে। তবে তাঁর পরিবেশিত সব তথ্যই প্রমাণ-সিদ্ধ, কোন-না-কোন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।

উপরিউক্ত কারণেই আমি 'বিশ্বনবীর রাজনৈতিক জীবন' শিরোনামে পুস্তকটির অনুবাদে হাত দিই। কিন্তু এক-তৃতীয়াংশ কাজ শেষ হতে না হতেই এমন এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি যে, সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না ভেবে পত্র মারফত ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে বিষয়টি জানিয়ে দিতে মনস্থ করি। এমতাবস্থায় সৌভাগ্যবশতই আমার এককালের কৃতি ছাত্র আবদুল কুদ্দুস আদিল আমার সাথে দেখা করতে আসে এবং আমার অভিভাবকত্বে সে নিজেই পুস্তকটির অনুবাদে হাত দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে। মাদ্রাসা বোর্ড ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত ডিগ্রীধারী আমার এই প্রিয় ছাত্রটির ঐকান্তিক আগ্রহ দেখে অসুস্থতা সত্ত্বেও আমি তাতে সায় দেই। সে কিছু অংশ অনুবাদ করে নিয়ে আসত আমি তা সম্পাদনা করে দিতাম। এভাবে কিছুদিন কাজ চলার পর আল্লাহর ফজলে আমি সুস্থ হয়ে উঠি।

আমার ছাত্রটিও তখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবে একটি মফস্বল শহরে চলে যায়। এবার আমি নিজেই পুরোদমে কাজ শুরু করি এবং ভালোয় ভালোয় তা শেষও করি। আমার ছাত্রটি মাঝখানে না পড়লে প্রিয় নবীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে এভাবে নাড়াচাড়া করার সুযোগ থেকে আমি নিশ্চয়ই বঞ্চিত হতাম। এজন্য তার কাছে ঋণী হয়ে রইলাম। অবশ্যই এই অনুশীলনীর মাধ্যমে তারও লেখক জীবনের সূচনা হয়েছিল এবং আল্লাহর ফজলে আজ সে একজন লেখক ও অনুবাদক হিসাবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। আমার এ ছাত্রটির জন্য আমি গর্ববোধ করি এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।

📘 বিশ্বনবী সাঃ এর রাজনৈতিক জীবন 📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”

📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”


বিভিন্ন জাতিতে এবং বিভিন্ন ভাষায় নবী এবং রসূল সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত আছে। তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এই সৃষ্টি (নবী রসূল) সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে আগাগোড়া এই ধারণাই প্রচলিত যে, ইনি হচ্ছেন ইনসানে কামিল-পরিপূর্ণ মানুষ। আর এই পরিপূর্ণতা হচ্ছে শুধুমাত্র মানবীয় দিক সম্পর্কেই। মানুষের জীবনে দু'টি দিকই হচ্ছে প্রধান। একটি মা'আশ (ইহজীবন) এবং অন্যটি মা'আদ (পরজীবন)। অন্য কথায়, একটি হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের এবং অন্যান্য সৃষ্টির সম্বন্ধ সম্পর্কিত, আর অন্যটি হচ্ছে মানুষের সাথে তার সৃষ্টিকর্তা পরম পরাক্রমশালী প্রভুর সম্বন্ধ সম্পর্কিত। প্রথমটির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে শাসনক্ষমতার অধিকারী হওয়া আর দ্বিতীয়টির সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে আকায়িদ-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব অর্থাৎ পয়গাম্বরী লাভ।

রসূলে আরবী হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সা) একাধারে ছিলেন উপরিউক্ত দু'টি গুণেরই অধিকারী। তাঁর জীবনের এই দু'টি দিক সম্পর্কে আলোচনা একটি বিরাট ব্যাপার। এই পুস্তকে শুধুমাত্র তাঁর জীবনের একটি দিক অর্থাৎ রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

কিন্তু স্থিরমস্তিষ্ক জ্ঞানান্বেষী এবং ব্যক্তিগত চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে একটি স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তি মাত্রেরই মনে এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, আজ থেকে সাড়ে তেরশ' বছর পূর্বে যিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন, যাঁর মৃত্যুর পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবিত উন্নতি হয়েছে, সভ্য জাতিসমূহের পরিবেশ এবং জীবন সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন- সর্বোপরি যিনি ছিলেন আমাদের মত একজন মানুষই- এই যুগে কি তাঁর জীবন আলোচনার শিক্ষা অনুসরণের প্রয়োজন আছে?

রসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর জীবনে প্রথমবার যখন ঘোষণা করেন, "আমি সমগ্র বিশ্বের রহমতরূপে এসেছি এবং যে দীন ইসলাম (শান্তির ধর্ম) নিয়ে এসেছি তাঁর অনুসরণ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে ইহকাল পরকালের মঙ্গল লাভ সম্ভব নয়-তখন উদ্ধত স্বভাবের লোকেরা কূট তর্কে লিপ্ত হয় এবং বিরোধিতা করতে থাকে। কিন্তু শান্ত স্বভাবের লোকেরা অনুরূপ না করে বরং রসূলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করে: ইসলাম কাকে বলে এবং আপনার মতে আমাদের কি করা উচিত? এই জিজ্ঞাসার জওয়াব পাওয়ার পর তারা আবার ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হলে তা বিনা দ্বিধায় গ্রহণও করে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px