📄 সুখানুভূতির শুরু এখানেই
জীবনকে আরামদায়ক ও সমৃদ্ধ করার উপকরণ ইতিহাসের কোনো যুগেই বর্তমান সময়ের মতো এতটা হাতের নাগালে ছিল না। মহাবিশ্বের জটিল সব রহস্য উন্মোচন কিংবা প্রতিকূল প্রকৃতিকে বশ করার এত উপায় এ যুগের মতো এত ব্যাপকভাবে মানুষ আগে আয়ত্ত করেনি।
অনলাইন শপিং থেকে শুরু করে চোখের লেজার অপারেশান, বিদ্যুতের সর্বময় ব্যবহার বা ঘর উষ্ণ রাখার যন্ত্র—জীবনকে আরামদায়ক করার সামগ্রীর এ তালিকা যেন শেষ হবার নয়। এত এত অসাধারণ অর্জনের পরেও সুখী জীবনের স্বপ্ন যেন আজ আরও অধরা হয়ে গেছে।
২০১৬ সালে দ্য গার্ডিয়ান ম্যাগাজিনের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে ২০১৫ সালে প্রায় ৬১ মিলিয়ন (৬ কোটিরও অধিক) হতাশাদূরীকরণের ওষুধ চিকিৎসকেরা হাসপাতালগুলোর বাইরে ব্যবহারের জন্য প্রদান করেছেন। অফিসিয়াল তথ্যানুযায়ী ইংল্যান্ডে গত এক দশকে হতাশাগ্রস্ত রোগীদের এই ওষুধ দেওয়ার পরিমাণ দ্বিগুণে উন্নীত হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের নাম শুনলেই মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য আর বিশাল বিস্তৃত পাহাড়ের সৌন্দর্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অথচ বেশ ক-বছর ধরেই দেশটিতে হতাশা আর আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউনিসেফের একটি পরিসংখ্যান দেখলে চমকে উঠতে হয়—উন্নত দেশগুলোর মধ্যে নিউজিল্যান্ডেই তরুণদের আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।
একবিংশ শতাব্দী আমাদের পুথির মতো আকাশে উড়তে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে মাছের মতো সাগরে সাঁতার কাটতে। কিন্তু শেখায়নি পরিতুষ্ট এক স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে পৃথিবীতে বিচরণ করতে। এখনও মানুষ তার সমস্যাগুলোর উৎস খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় প্রতিনিয়ত।
এবার চলুন দেখে আসা যাক একজন মুসলিমের জীবনচিত্র। জীবনধারণের ক্ষেত্রে তার রয়েছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি, যা তাকে সর্বদাই রাখে হাস্যোজ্জ্বল।
• একজন মুসলিমের হৃদয় অর্থ-সংকটে থাকা অবস্থায়ও প্রসন্ন থাকে কুরআনে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে:
وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ 1
“ আর পৃথিবীতে কোনো বিচরণশীল জীব নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ তাআলার ওপর নেই। তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং (মৃত্যুর পর) কোথায় তাকে সোপর্দ করা হবে। সবকিছুই এক সুস্পষ্ট কিতাবে (লিপিবদ্ধ) রয়েছে।”[১]
• যখন কেউ তাকে অপদস্থ করতে চায়, তখন সে এটা ভেবে প্রফুল্ল থাকে যে :
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ 2
“ সম্মান তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদের জন্যই, কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।”[২]
• যখন বিপদের সম্মুখীন হয় তখনও সে নিশ্চিন্ত থাকে, কারণ সে জানে কুরআনের সেই অমোঘ বাণী:
أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِن دُونِهِ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ 3
“ আল্লাহ কি তাঁর বান্দার পক্ষে যথেষ্ট নন?”[৩]
• যখন কেউই তাকে বুঝতে চায় না, তার সমস্যাগুলো শুনতে চায় না তখনও সে প্রশান্ত থাকে এ কারণে যে:
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ )
“ আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি।”[১]
• যখন কোনো দুর্দশা দরজায় কড়া নাড়ে, সে এটা ভেবে আনন্দ অনুভব করে যে :
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا .
"নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে."[২]
এটা হচ্ছে ইসলাম প্রদত্ত সেই আত্মিক প্রশান্তি, যা সম্পর্কে রাসূল বলেন,
' মুমিনের প্রত্যেকটি বিষয়ই কল্যাণকর। যখন প্রফুল্ল থাকে, তখন সে কৃতজ্ঞতা আদায় করে এবং এটা তার জন্য কল্যাণকর। আর যখন কষ্টে থাকে, তখন সে ধৈর্যধারণ করে এবং এটা তার জন্য কল্যাণকর।*।
তাই যখন কেউ আপনার কাছে সংক্ষেপে মুসলিমদের সুখময় জীবন সম্পর্কে জানতে চায়, তাকে বলুন: সুখের সময় সে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করে আর কষ্টের সময় সে ধৈর্যধারণ করে। অবশেষে তাকে পৌঁছে দেওয়া হয় জান্নাতের উদ্যানে।
এরকমই হচ্ছে একজন মুসলিমের সুখী সুন্দর জীবন, যা সম্বন্ধে আমরা সকলকে অবহিত করতে চাই। একজন বিশ্বাসী জীবনের সর্বক্ষেত্রেই জান্নাতি-সুখ অনুভব করে, কারণ সে আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে। তাকদীরে বিশ্বাস ব্যতীত কখনোই সুখ অর্জিত হবে না, কারণ এটাই যে সুখের ভিত্তি।
রাসূল কোন পরিস্থিতিতে কী বলতে হবে, সেটাও আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন।
• যখন একজন মুসলিম সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠে, তখন তাকে বলতে শেখানো হয়েছে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانًا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا، وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
' সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করেন এবং তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। [১]
• যখন সে রাতে ঘুমাতে যায় তখন বলে:
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنَا وَسَقَانَا، وَكَفَانَا، وَآوَانَا، فَكَمْ مِمَّنْ لَا كَافِيَ لَهُ وَلَا مُؤْوِيَ
'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের খাদ্য ও পানীয় দান করেছেন এবং আমাদের দায়িত্ব বহন করেছেন, আশ্রয় দিয়েছেন। অথচ অনেকে আছে যাদের জন্য কোনো দায়িত্ব বহনকারী নেই, আশ্রয়দাতাও নেই। [২]
• যখন কোনো মুসলিম নতুন কাপড় পরিধান করে সে বলে:
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ كَسَوْتَنِيْهِ،
'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাকে এই পোশাক দ্বারা আচ্ছাদিত করেছেন। [৩]
• যখন কোনো মুসলিম শৌচাগার থেকে বের হয়, সে বলে:
'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমার থেকে কষ্টকে দূর করেছেন এবং আমাকে স্বস্তি দিয়েছেন। [৪]
• যখন কোনো মুসলিম তার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি অর্জন করে, তখন তাকে কী বলতে শেখানো হয়েছে? সে বলে:
• সকল প্রশংসা এবং শুকরিয়া আল্লাহর জন্য যার অনুগ্রহে সকল ভালো জিনিস অর্জিত হয়। [৫]
• আর যখন কোনো মুসলিম তার আরাধ্য বস্তু লাভে ব্যর্থ হয়, তখন তাকে বলতে শেখানো হয়েছে:
'সর্বাবস্থায় অবস্থায় আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা।[৬]
আর তাই মুসলিমরা যে-কোনো পরিস্থিতিতে কৃতজ্ঞতার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে উন্নীত হয়, খুঁজে পায় পরিতুষ্টির বিভিন্নরূপ। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এরূপ মানসিকতা না থাকলে কষ্টগুলো অসহ্য মনে হয়, দুর্দশাগুলো অসহনীয় রূপ ধারণ করে। জীবন যেন হয়ে উঠে সেই লবণাক্ত পানি গ্রহণকারী ব্যক্তির মতো, যার তৃষ্ণা কখনোই নিবারণ করা যায় না।
এ ধরনের মানুষগুলো দীর্ঘমেয়াদী শান্তির খুঁজে বেপরোয়াভাবে নিজেকে পাপের এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায়, এক বিছানা থেকে আরেক বিছানায়, এক পানীয় থেকে অন্য পানীয়তে, এক সম্পর্ক থেকে অন্য সম্পর্কতে, অনলাইনের একটা অশ্লীল ভিডিও থেকে অন্যটিতে আবর্তিত হয়।
কিন্তু আল্লাহর সাথে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান দূরত্ব তার অন্তরকে ধীরে ধীরে কঠিন থেকে কঠিনতর করে এবং জীবনকে করে তোলে তমসাচ্ছন্ন। সে তার অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে চায় যে-কোনো মূল্যে। কিন্তু তার অনুসৃত পন্থায় সেই শূন্যতা যে কখনোই পূরণ হবার নয়।
ইমাম ইবনু কায়্যিম বলেন, "প্রত্যেকটা মানুষের অন্তরেই কিছু অস্থিরতা বিদ্যমান যা শুধুমাত্র আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই নির্মূল করা সম্ভব। প্রত্যেকের অন্তরেই একাকীত্বের অনুভূতি বিদ্যমান যা শুধুমাত্র আল্লাহর নৈকট্যলাভেই দূর করা সম্ভব। প্রতিটা অন্তরে ভয় এবং উদ্বেগ বিদ্যমান যা শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে ছুটে যাওয়ার মাধ্যমেই কাটানো সম্ভব। আর অন্তরে কিছুটা দুঃখানুভূতি বিদ্যমান যা কেবলমাত্র আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকার মাধ্যমেই অপসারণ করা সম্ভব।" [১]
হারام পন্থায় অন্তরের শূন্যতা পূরণ কখনোই সম্ভব নয়, বরং সেটা কেবল শূন্যতাকে বিস্তৃতই করে। নিচের উদাহরণটা অনুধাবন করুন :
• দুজনের মধ্যে কে বেশি সুখী?
সে-ই কি, যে কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ব্যতিরেকেই বছরের যে-কোনো সময় নিজের পছন্দমতো ব্যয়বহুল খাবার দিয়ে উদরপূর্তি করে?
না কি সে বেশি সুখী, যে রমাদান, অথবা একটা সোমবার কিংবা বৃহস্পতিবার ধৈর্য ধারণ করে সূর্য ডোবা অবধি সিয়াম পালন করার পর একটি খেজুর মুখে পুরে, যা তাকে অবর্ণনীয় আনন্দে উদ্বেল করে তোলে, কারণ সে অনুভব করতে পারে, সে আখিরাতের জন্য কিছু বিনিয়োগ করে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে এক ধাপ এগিয়েছে।
• দুজনের মধ্যে কে বেশি সুখী?
যখন কেউ যে-কোনো মূল্যে অর্থ উপার্জন করতে যায়, তখন সে আল্লাহর আনুকূল্য হারিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত জীবন কাটায়। নিদ্রাহীন রজনীযাপন তার নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়। সে জানে তার হারাম আয় থেকে করা সদাকায় আল্লাহর কোনোই আগ্রহ নেই, সে কি বেশি সুখী?
নাকি সে, যে স্বল্প হলেও হালাল উপার্জনে আত্মনিয়োগ করে, যার অন্তর প্রশান্তি লাভ করে এটা ভেবে যে, সে নিজের এবং পরিবারের মানুষগুলোর মুখে জাহান্নামের আগুন নয় বরং হালাল আহার্য পুরে দিচ্ছে?
সে কেবলমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহের আশায় দান করে। কোনো এতিমের ভরণপোষণ করার মাধ্যমে সে এক অপার্থিব আনন্দ অনুভব করে। সে এতিম যখন তাকে বলে, “আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিক, আপনি আমার বাবার মতো।” এই সুখানুভূতি কোনো কবির কাব্যই ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম নয়।
• দুজনের মধ্যে কে বেশি সুখী?
যে ক্ষণস্থায়ী সুখের মোহে রাতের আঁধারে একটার-পর-একটা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, সে কি বেশি সুখী?
এর ফলে তো তার অন্তরে দীর্ঘমেয়াদী অনুশোচনাবোধের জন্ম নেয়, কারণ সে জানে এই সম্পর্ক আল্লাহর কাছে কতটা হীন!
সে সর্বদা উৎকণ্ঠিত থাকে এটা ভেবে যে, কেউ তাদের অন্তরঙ্গতার সময় দরজায় করাঘাত করছে কি না; তার বিবেকের দংশন তাকে আতংকিত করে তোলে; মেয়েটা কি তবে গর্ভবতী হয়ে যাবে, গর্ভপাতই কি করাতে হবে... পরিস্থিতির অবনতি ঘটার সাথে সাথে তার উদ্বেগ বাড়তেই থাকে। এ ধরণের মানুষগুলো কী করে সুখী হতে পারে!
নাকি সুখী সেই ধৈর্যশীল ব্যক্তিটি, যে তার জন্য নির্দিষ্ট করা জীবনসাথি আসার আগ পর্যন্ত আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে?
তারা তো একত্র হয় বিয়ের মাধ্যমে; দাওয়াত, উপহার, সামাজিক স্বীকৃতি, আলিঙ্গন, দুআ এবং অন্তরঙ্গতা উপভোগ করে, যা তাদেরকে এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে। গর্ভধারণের আনন্দ, আকীকার ভোজ ইত্যাকার অনুষঙ্গগুলো তাদের প্রশান্তি আর সুখ বর্ধিত করতে থাকে।
এই দুজনের মধ্যে তবে কে বেশি সুখী?
এই অনুভূতিগুলো কিছু গভীর উপলব্ধির জন্ম দেয়। আমরা অনুধাবন করতে পারি যে, মনের এই প্রশান্তি কেবলমাত্র আল্লাহর নৈকট্য আর তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আর এটা সহজেই অনুমেয় যেহেতু আল্লাহ বলেন,
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةٌ طَيِّبَةٌ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ *
“ যে মুমিন অবস্থায় সৎকাজ করবে-হোক সে পুরুষ কিংবা নারী-আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব। এবং তারা যা করত, তার তুলনায় অবশ্যই আমি উত্তম প্রতিদান দেবো।”[১]
এবং আল্লাহ আরও বলেন,
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى
“ যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ঠ হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামাতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।”[২]
আমরা প্রায় সবগুলো মূলধারার তত্ত্ব পড়ে ফেলতে পারি, তাক থেকে প্রত্যেকটা ওষুধ সেবন করতে পারি এবং প্রত্যেকটা দরজায় সুখের খোঁজে ধরনা দিতে পারি, কিন্তু সেই সুখের চাবিকাঠি স্রষ্টার শিখিয়ে দেওয়া জায়গাটি ছাড়া কোথাও খোঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, আল্লাহই বলেন,
وَأَنَّهُ هُوَ أَضْحَكَ وَأَبْكَى *
“ এবং তিনিই হাসান ও কাঁদান।”[৩]
আমরা সুখী, কারণ আমরা আল্লাহকে জানি, তাঁকে আমাদের রব হিসেবে পেয়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা সুখী, কারণ আমাদের মানুষের তৈরি করা জীবনবিধানের ওপর নির্ভরশীল করা হয়নি, বরং কুরআনই আমাদের জীবনবিধান। আমরা সুখী, কারণ শেষ বিচারের দিন সর্বপ্রথম আমাদেরই হিসাব নেওয়া হবে এবং আমাদেরকেই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।
টিকাঃ
[১] সূরা হুদ, ১১:৬
[২] সূরা মুনাফিকুন, ৬৩: ৮
[৩] সূরা যুমার, ৩৯ : ৩৬
[১] সূরা ইউসুফ, ১২: ৮৬
[২] সূরা আশ শারহ, ৯৪ : ৫
[৩] মুসলিম, আস সহীহ: ২৯৯৯
[১] মুসলিম, আস সহীহ: ২০৮৪
[২] মুসলিম, আস সহীহ: ২০৮৩
[৩] আবূ দাউদ, আস সুনান: ৪০২০
[৪] ইবনু আবী শায়বা, আল মুসান্নাফ
[৫] নাবাবি, আল আযকার
[৬] নাবাবি, আল আযকার
[১] ইবনু কায়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন, ৩/১৫৬
[১] সূরা নাহল, ১৬:৯৭
[২] সূরা ত্ব-হা, ২০: ১২৩-১২৪
[৩] সূরা আন নাজম, ৫৩: ৪৩
📄 বিষণ্নতার ১৫টি প্রতিষেধক
প্রত্যেক মানুষের জীবনেই বলার মতো কিছু-না-কিছু বিষাদমাখা গল্প থাকে। সে চোর হোক অথবা চুরির শিকার হোক, বিশ্বাসঘাতক হোক কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার, বিবাহিত অথবা অবিবাহিত, ধনী অথবা গরীব, স্বাস্থ্যবান অথবা দুর্বল। পৃথিবীর কোনো একজন মানুষের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে না।
এই বিষণ্ণতাবোধের মোকাবিলা যথাযথভাবে না করা হল, তা ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে। কারণ বিষণ্ণতা অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, শরীরকে দুর্বল করে দেয়, মানুষকে সংকল্পচ্যুত করে ছাড়ে। পরন্তু অনেক মানুষকেই এটা বিরামহীন ক্রন্দন আর সীমাহীন উদ্বেগের কুচক্রে আটকে দেয়। ইমাম ইবনু কায়্যিম বলেন,
' বিষণ্ণতাকে কুরআনে শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা প্রকাশেই উল্লেখ করা হয়েছে; যেমন : 'হতাশ হোয়ো না', অথবা নাকচ করা অর্থে; যেমন: 'তাদের কোনো দুঃখ থাকবে না'। এরকমটা করার নিগূঢ় রহস্য হলো, বিষণ্ণতা মানুষের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং কোনো প্রকার আত্মিক কল্যাণও সাধন করে না। মানুষকে বিষণ্ণ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যলাভের অগ্রযাত্রাকে বিঘ্ন ঘটানো এবং তাদের কল্যাণের কাজে বাধা দেওয়ার থেকে কোনো কিছুই শয়তানের নিকট অধিকতর প্রিয় নয়।”[১]
আমি এখানে বিষণ্ণতা থেকে পরিত্রাণের জন্য ১৫টি পরামর্শ রাখব। আল্লাহ যেন এই প্রচেষ্টাকে বিপদগ্রস্ত কিংবা ভগ্নহৃদয় ব্যক্তিদের জন্য স্বস্তির কারণ আর মুসিবত মোকাবিলার উপায় বানিয়ে দেন এবং বিষণ্ণতার মোকাবিলায় করা আমাদের সবার নিজ নিজ লড়াইকে জয়লাভের মাধ্যম বানিয়ে দেন।
প্রথম প্রতিষেধক : কখনোই ভুলে যাবেন না যে, আপনার এই বিপদ স্বয়ং আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়েছে। আর সত্যিকার অর্থে উবুদিয়্যাহ (আল্লাহর একজন দাস হওয়া) বলতে তিনি আপনার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, সেটা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়াকেই বোঝায়। আল্লাহ বলেন,
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“ আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে কোনো বিপদ আসে না এবং যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।" [১]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আলকামা বলেন, “এই আয়াতটা এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যে নাকি কোনো বিপদে পতিত হয়, কিন্তু অনুধাবন করে যে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, এরপর সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহর সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পণ করে।"[২]
দ্বিতীয় প্রতিষেধক: মনে রাখবেন, এই কঠিন পরিস্থিতি আপনার জন্য পছন্দ করেছেন সেই পরম করুণাময় সত্তা, যিনি আপনার মায়ের থেকেও বেশি আপনার প্রতি যত্নশীল। তিনি সেই মহাজ্ঞানী সত্তা, যিনি আপনাকে কল্পনাতীত উপায়ে সাহায্য করতে চান। নবিগণ এটা অনুধাবন করতে পারতেন, তাই আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে:
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“ এবং স্মরণ করুন আইয়ুবের কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন: আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।"[৩]
চিন্তা করুন নবি ইয়াকূব -এর কথা, যিনি তার ছেলে হারিয়ে বলেছিলেন,
فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“ অতএব আল্লাহ উত্তম হিফাযতকারী এবং তিনিই সর্বাধিক দয়ালু।”[১]
তাঁর ব্যাপারে স্মরণ করুন যিনি আপনাকে পরীক্ষা করছেন। তিনিই আমাদের রব, পরম করুণাময় ও মহাজ্ঞানী সত্তা, যিনি আপনাকে বিধ্বস্ত বা ধ্বংস করতে চান না। বরং তিনি আপনার নিজের থেকেও বেশি আপনার কল্যাণ কামনা করেন।
তৃতীয় প্রতিষেধক : অনুধাবন করুন যে, এই জটিল পরিস্থিতি আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করে প্রতিষেধক ওষুধরূপে পাঠিয়েছেন। ওষুধের প্রকৃতিই হচ্ছে তেতো; তাই এটাকে গ্রহণ করুন এবং আল্লাহর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ কিংবা অধৈর্য হওয়া থেকে বিরত থাকুন, অন্যথায় এই ওষুধ তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে।
ইমাম ইবনু কায়্যিম বলেন, ' যখনই আল্লাহ কারও কল্যান চান, তিনি প্রতিষেধকস্বরূপ তাকে দুঃখ-দুর্দশায় পতিত করেন, যা তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে আরোগ্য দান করতে থাকে— যতক্ষণ না সে পরিপূর্ণভাবে পরিশোধিত এবং পরিমার্জিত হয়ে যায়। আর এভাবে তিনি তাকে দুনিয়ায় উঁচু মর্যাদায় আসীন করেন; সে আল্লাহর উপাসনা করে এবং আখিরাতে উত্তম প্রতিদানে তাকে ভূষিত করা হয়; সর্বোপরি, আল্লাহর দর্শন এবং নৈকট্য লাভে সে ধন্য হয়।”[২]
প্রায়শই কোনো উদ্ধত, অহংকারী পাপী চলার পথে এমন বিপদের সম্মুখীন হয়, যা তাকে গ্রাস করে নেয় এবং তার গতি থামিয়ে দেয়। এরপর সে বিনম্র হয়ে যায় এবং সালাত আদায়কারী, কুরআন অধ্যয়নকারী, দুআ প্রার্থনাকারী এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে অহংকার ত্যাগ করে।
এভাবে প্রতিষেধকরূপী দুর্দশা আপনাকে এমন রোগের আরোগ্য দেয়, যা আপনি দেখতে পান না অথচ সেটা নিরাময়ের সত্যিই প্রয়োজন ছিল।
চতুর্থ প্রতিষেধক: মনে রাখবেন, আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হন। রাসূল -কে জিজ্ঞেস করা হলো: কাদেরকে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা করা হয়?
তিনি বললেন,
الْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُوْنَ ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ مِنَ النَّاسِ يُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسْبِ دِيْنِهِ فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلَابَةٌ زِيْدَ فِي بَلَاءِهِ وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةٌ خُفِّفَتْ عَنْهُ وَلَا يَزَالُ الْبَلَاءُ فِي الْعَبْدِ حَتَّى يَمْشِيَ فِي الْأَرْضِ لَيْسَ عَلَيْهِ خَطِيئَةٌ
' নবিগণ, তারপর ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ, তারপর তাদের অনুরূপ লোকজন, অতঃপর তাদের অনুরূপ লোকজন। মানুষকে তার দ্বীন অনুপাতে পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়-তার দ্বীন পালনে দৃঢ়তা থাকলে তার বিপদ-মুসিবত বাড়িয়ে দেওয়া হয়, আর দ্বীন পালনে নমনীয়তা থাকলে তার বিপদ-মুসিবত হালকা করে দেওয়া হয়। বান্দা যতদিন দুনিয়ায় বিচরণ করে, ততদিন তার পরীক্ষা চলতে থাকে, যতক্ষণ না সে পাপমুক্ত হচ্ছে।[১]
আর এ কারণেই আমাদের পূর্বসূরিরা বলতেন, যাকে কোনো বিপদে পতিত করা হয়েছে, তাকে নবিগণের পথেই অধিষ্ঠিত করা হয়েছে।
পঞ্চম প্রতিষেধক : আল্লাহ যে আপনার ভালো চান, আপনার কঠিন পারিপার্শ্বিকতাই এর একটা প্রমাণ। রাসূল বলেন,
' আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন দুনিয়ায় তার দুঃখ-কষ্ট বাড়িয়ে দেন। কিন্তু যখন তিনি কারও জন্য অন্যথা চান, তখন তিনি তার দুর্ভোগ উঠিয়ে নেন, যাতে বিচার দিবসে দুর্ভোগের বোঝা পুরোপুরি তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন। [২]
ফুযাইল ইবনু ইয়ায বলেন,
' মানুষ যেমন কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে তার পরিবারের তত্ত্বাবধান করে, ঠিক একইভাবে আল্লাহ তাঁর বিশ্বাসী বান্দাকে পরীক্ষার মাধ্যমে তত্ত্বাবধান করেন।”।৩।
তিনি আরও বলেন,
' ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ সত্যিকার ঈমান অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ সে দুঃখ-কষ্টের পরীক্ষাকে আশীর্বাদস্বরূপ এবং স্বাচ্ছন্দ্যকে দুর্ভাগ্য হিসেবে না দেখবে।"[৪]
ষষ্ঠ প্রতিষেধক : অনুধাবন করা যে, আল্লাহ হয়তো জান্নাতে আপনার জন্য একটা মর্যাদাপূর্ণ স্থান নির্ধারণ করে রেখেছেন। কিন্তু আপনার নেক আমল সেই স্থানে অধিষ্ঠান করানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আর তাই তিনি আপনাকে কষ্টে পতিত করার মাধ্যমে আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি করে সেই মাকাম অর্জনে সাহায্য করেন। রাসূল বলেন,
'জান্নাতে একটা নির্দিষ্ট মর্যাদা অর্জনের যথেষ্ট ভালো আমল না থাকা স্বত্ত্বেও আল্লাহ যখন কোনো বান্দার জন্য তা নির্ধারিত করে দেন, তখন তিনি তাকে শরীর, সম্পদ এবং সন্তানসন্ততি দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন। তদুপরি তাকে ধৈর্য ধারণে উৎসাহ দেন এবং এভাবে জান্নাতের সেই নির্ধারিত মর্যাদায় তাকে পৌঁছে দেন, যা তিনি তার জন্য পূর্বেই নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।[১]
আপনি যখন অনুধাবন করতে পারবেন যে, এই উদ্বিগ্নতা কিংবা কঠিন পরিস্থিতি আখিরাতে আপনার উঁচু মর্যাদা অর্জনের সোপানস্বরূপ, তখন এগুলোর মোকাবিলা করা আপনার জন্য অনেকাংশেই সহজ হয়ে যাবে।
সপ্তম প্রতিষেধক: মনে রাখবেন, দুনিয়া এবং আখিরাতে আপনার সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে আপনার কৃত পাপসমূহ। আর এহেন কঠিন পরিস্থিতি সেই পাপসমূহকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে দেয়। রাসূল বলেন,
'কোনো মুমিন কখনোই এমন কোন দুর্দশা, উদ্বিগ্নতা, দুঃখবোধ কিংবা দুশ্চিন্তা দ্বারা আক্রান্ত হয় না, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ না করেন। [২]
রাসূল বলেন,
'যখন কোনো ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হয়, আল্লাহ তার নিকট দুজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন এবং তাদের বলে দেন, 'লোকটি তাকে দেখতে আসা লোকদের কী বলে শোনো।' যদি সে তাদের নিকট আল্লাহর প্রশংসা ব্যক্ত করে এবং তাঁর ব্যাপারে ভালো কথা বলে, ফেরেশতারা তাঁকে সে কথা জানিয়ে দেন যদিও তিনি এ ব্যাপারে তাদের থেকে বেশি অবগত। তখন আল্লাহ বলেন, 'সুতরাং আমার বান্দার নিকট আমার পক্ষ থেকে একটি ওয়াদা এই যে, সে যদি মারা যায় আমি তাকে জান্নাতে দাখিল করব। আর যদি আমি তাকে সুস্থ করে দিই তবে তার গোশতকে উত্তম গোশত দ্বারা, রক্তকে উত্তম রক্ত দ্বারা প্রতিস্থাপন করে দেবো এবং তার গুনাহসমূহ মুছে দেবো।[১]
এমনকি আমাদের পূর্বসূরিরা একে অপরকে অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভের পর অভিনন্দন জানাতেন। মুসলিম বিন ইয়াসার বলেন, "তাঁরা একজন আরেকজনকে রোগমুক্তির পর বলতেন—পরিশুদ্ধি অর্জনের জন্য অভিনন্দন!”
এই কাঠিন্যগুলো শুধু আমাদের পাপের বোঝাই হালকা করে না বরং আমাদের পুণ্যের পাল্লাও ভারি করে। এ ব্যাপারে রাসূল -এর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,
• যখন আরাম-আয়েশে জীবনযাপন করা মানুষগুলো দুনিয়ার জীবনে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় কাটিয়ে দেওয়া মানুষগুলোকে আল্লাহপ্রদত্ত পুরস্কার দেখতে পাবে, তখন তারা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে—যদি তাদের চামড়াকে কাঁচি দ্বারা চাঁছা হত।[২]
আর এ কারণেই আমাদের কতিপয় সালাফরা বলতেন, “যদি দুর্ভোগ না থাকত, তবে আমরা আল্লাহর কাছে রিক্তহস্তে মিলিত হতাম।”[৩]
ইমাম ইবনু কায়্যিম -এর বর্ণনানুযায়ী, একজন আবেদ মহিলা একটি দুর্ঘটনায় তার একটি আঙুল হারায়। অথচ তখনও সে মুচকি হাসছিল। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, “তুমি তোমার আঙুল হারানো সত্ত্বেও হাসছ?”
সে জবাবে বলল, “এই ব্যথার বিনিময়ে প্রাপ্ত পুরস্কারের মিষ্টতা আমাকে ব্যথার তিক্ততা ভুলিয়ে দিয়েছে।”[৪]
ইমাম ইবনু কুদামা বলেন, "যদি কোনো বাদশাহ কোনো গরিব লোককে বলে, 'প্রতিবার এই ছোটো ডাল দিয়ে আঘাত করার বিনিময়ে আমি তোমাকে ১০০০ দিনার দেবো', তো সেই গরিব মানুষটা বারংবার আঘাত পেতে চাইবে। এটা এ কারণে না যে, সে ব্যথা পাবে না। বরং এ কারণে যে, সে তার কাঙ্ক্ষিত বিনিময় পাবে যদি আঘাতগুলো কষ্টদায়ক হয় তবু।”[৫]
অষ্টম প্রতিষেধক : মনে রাখবেন, যা আপনার ওপর আপতিত হয়েছে, তা হয়তো আপনার কৃত গুনাহের জন্যই। আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
“ তোমাদের ওপর যেসব বিপদআপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল।”[১]
তাই আফসোস করে সময় ব্যয় না করে, সেই প্রচেষ্টাটুকু তাওবাতে প্রয়োগ করুন। কারণ এটা দুঃখদুর্দশা লাঘবের একটি অন্যতম উপায়।
আলি বলেন, “প্রত্যেকটা বিপদের কারণ হচ্ছে গুনাহ এবং তাওবা ব্যতীত সেই বিপদ কোনোভাবেই কাটবে না।”
নবম প্রতিষেধক : অনুধাবন করুন, আপনার ওপর যে বিপদটা এসেছে তা কোনোভাবেই এড়ানোর ছিল না। এটা এমন একটা ব্যাপার, যা পৃথিবী এবং মহাকাশ সৃষ্টির হাজার হাজার বছর পূর্বে লেখা হয়ে গিয়েছিল, তাই আপনার অন্তরকে স্বস্তি পেতে দিন। আল্লাহ বলেন,
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرُ *
“ পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর এমন কোনো বিপদ আসে না; যা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”[২]
এমনকি আল্লাহ প্রথমেই কলম সৃষ্টি করে সেটাকে লিখার নির্দেশ দেন। কলমটি যখন জানতে চাইল তাকে কী লিখতে হবে, বলা হলো, "কিয়ামাত পর্যন্ত সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর লিখে রাখো।”[৩]
সুতরাং আমরা আতঙ্কিত হই বা স্বাভাবিক থাকি না কেন, আল্লাহর নির্ধারণ-করা বিষয় ঘটবেই। তাই অযথা দুশ্চিন্তা করে নিজের দুর্ভোগ বাড়াবেন না। আলি এ সম্পর্কে বলেন,
' যদি তুমি ধৈর্যধারণ করো, আল্লাহর ফায়সালা অবশ্যই প্রকাশিত হবে এবং তুমি পুরস্কৃত হবে। অন্যথায় যদি তুমি অধৈর্য হও, তবুও আল্লাহর ফায়সালা ঘটবেই। কিন্তু তখন তুমি গুনাহগার হয়ে যাবে।[১]
দশম প্রতিষেধক : মানুষকে যে-কোনো উপায়ে সাহায্য করার মাধ্যমে আপনার দুশ্চিন্তার মোকাবিলা করুন। যদি জীবনকে অসহ্য মনে হয়, একজন ক্ষুধার্ত লোককে খুঁজে বের করুন এবং তাকে খাওয়ান। কাউকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ধার দিন, বিষণ্ণ মানুষগুলোকে সান্ত্বনা দিন। এমনকি একটি জনাকীর্ণ-কক্ষে আপনার পাশে কোনো ভাইকে বসার জায়গা করে দেওয়ার মতো তুচ্ছ কাজও আপনার অন্তরকে প্রফুল্ল করতে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوا فِي الْمَجَالِسِ فَافْسَحُوا يَفْسَحِ اللَّهُ لَكُمْ وَإِذَا قِيلَ انْشُرُوا فَانْشُرُوا يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ۞
“হে মুমিনগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়: মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিয়ো। তা হলে আল্লাহ তোমাদের জন্য (জান্নাতে) স্থান প্রশস্ত করে দেবেন।”[২]
মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রশস্ত করে দিন; বিনিময়ে আল্লাহ আপনার অন্তর, সম্পদ, স্বাস্থ্য এবং কবরকে প্রশস্ততা দান করবেন।
একাদশ প্রতিষেধক : সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন ইলম এবং যিকরের মজলিসসমূহে অংশগ্রহণ করার। আমরা সাধারণত দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় জনসমাগম এবং কল্যাণময় জায়গাগুলো থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে ফেলি, যা আমাদের ক্ষতকে শুধু গভীর করে। যে প্রশান্তি হারানোর অভিযোগ আপনি করেন, সেটা তো কেবল মাসজিদেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। রাসূল বলেন,
ما اجتمع قوم في بيت من بيوت الله تعالى يتلون كتاب الله ويتدارسونه بينهم إلا نزلت عليهم السكينة وغشيتهم الرحمة وحفتهم الملائكة وذكرهم الله فيمن عنده
' যখনই কোনো মানুষ আল্লাহর ঘরসমূহের মধ্যে কোনো একটি ঘরে কুরআনের জ্ঞান অর্জনে একত্র হয়, তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল হবে, রহমত তাদের ঘিরে রাখবে, ফেরেশতারা তাদের আবৃত করে রাখবেন এবং আল্লাহ তাদেরকে স্মরণ করবেন।"[১]
যখনই আপনি অনুভব করবেন দুশ্চিন্তা আপনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে তখনই আপনার কোনো বন্ধুকে আপনার সাথে কুরআন তিলাওয়াত এবং তাফসীর অধ্যয়নের জন্য মাসজিদে আমন্ত্রণ করুন। এর ফলে খুব সহজেই আপনি আপনার অন্তরের পরিবর্তন অনুভব করতে সক্ষম হবেন।
দ্বাদশ প্রতিষেধক : আল্লাহর স্মরণকে এমন একটি দুর্গে রূপান্তর করুন যেখানে আপনি আশ্রয় নিতে পারবেন। প্রত্যেক বিশ্বাসীই উদ্বেগ দূরীকরণে এর সর্বোচ্চ গুরুত্ব স্বীকার করে নেবে। আল্লাহ তাঁর রাসূল -কে বলেন,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ تَنزِيلًا فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلَا تُطِعْ مِنْهُمْ أَيْمًا أَوْ كَفُورًا وَاذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا وَمِنَ اللَّيْلِ فَاسْجُدْ لَهُ وَسَبِّحْهُ لَيْلًا طويلا
“ আমি আপনার প্রতি পর্যায়ক্রমে কুরআন নাযিল করেছি। অতএব, আপনি আপনার পালনকর্তার আদেশের জন্যে ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করুন এবং ওদের মধ্যকার কোনো পাপিষ্ঠ কাফিরের আনুগত্য করবেন না। এবং সকাল-সন্ধ্যায় আপন পালনকর্তার নাম স্মরণ করুন। রাত্রির কিছু অংশে তাঁর উদ্দেশ্যে সাজদা করুন এবং রাত্রির দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করুন।”[২]
এই আয়াতগুলো সম্পর্কে ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা বলেন,
' আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সকাল-সন্ধ্যায় যিকর করতে আদেশ করেছেন, কেননা আল্লাহর স্মরণই ধৈর্যশীল হতে সবচেয়ে উত্তম সহায়ক। তাকে রাতে সালাতের মাধ্যমে ধৈর্যাবলম্বনের আদেশ করা হয়েছে। কেননা রাতের সালাতগুলো তাঁর দিবসের দায়িত্বপালনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এবং এটা তাঁর শক্তির উৎস হিসেবেও কাজ করে।”[৩]
কল্পনা করুন মিশরের ফিরআউনের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছনোর মতো বিশাল দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার কথাটা। সে ওই ব্যক্তি, যে কিনা প্রভুত্ব দাবি করে বসেছিল। সুতরাং চিন্তা করুন মূসা এবং হারুন -কে কীভাবে সেই দুশ্চিন্তা করার উপদেশ দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহ বলেন,
اِذْهَبْ اَنْتَ وَاَخُوْكَ بِاٰيٰتِيْ وَلَا تَنِيَا فِيْ ذِكْرِيْ
“তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনাবলী-সহ যাও এবং আমার স্মরণে শৈথিল্য কোরো না।”[১]
আল্লাহর যিকরই একমাত্র অস্ত্র, যা তাদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে পাপী শাসককে মোকাবিলা করার জন্য দেওয়া হয়েছিল। শাইখ আস সা'দি এ ব্যাপারে বলেন, “আল্লাহর স্মরণ প্রতিটা ব্যাপারে সহায়তা দান করে। এটা মানুষকে স্বস্তি দান করে এবং তাদের বোঝাকে হালকা করে।”[২]
ত্রয়োদশ প্রতিষেধক : আল্লাহ হয়তো আপনাকে বিপদ দিয়েছেন তার চেয়েও বড় কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য। আপনার ব্যাপারে যা পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটা অনুমান করাও আপনার পক্ষে অসম্ভব।
আলেমরা এক রাজা আর তার মন্ত্রীর কথা প্রায়শই বর্ণনা করে থাকেন। মন্ত্রী ছিলেন একজন সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, যিনি বিপদ এলেই এই কথাটির পুনরাবৃত্তি করতেন : "الْخِيْرَةُ فِيْمَا اخْتَارَهُ اللهُ" “আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।”
একদিন একসাথে খাওয়ার সময় রাজা তার হাত খুব বাজেভাবে কেটে ফেললেন। সব সময়কার মতোই মন্ত্রী বলে উঠলেন, “আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।”
রাজা মশায় মন্ত্রীর কথায় খুব অপমানিত বোধ করলেন। তিনি ভাবলেন, মন্ত্রী তার এমন দুর্দশায় মজা নিচ্ছে! তাই তিনি রাগে-ক্ষোভে মন্ত্রীকে বন্দি করলেন। মন্ত্রী তার বন্দিত্বের ব্যাপারেও—'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন'—বলে প্রতিক্রিয়া দেখালেন।
রাজা তার বিনোদনের বেশিরভাগ সময়ই মন্ত্রীর সাথে শিকারে কাটাতেন। কিন্তু মন্ত্রী জেলে বন্দি হবার পর তিনি একাই শিকারে গেলেন। তিনি শিকারের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে কখন যে নিজের সীমানা পেরিয়ে মূর্তিপূজারিদের সীমানায় গিয়ে পৌঁছলেন, সেটা টেরও পেলেন না। তারা তাকে ধরে ফেলল, এরপর বন্দি করল। তার পর তাদের সবচেয়ে বড় দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেবার জন্য নিয়ে গেল। তাকে মাটিতে শুইয়ে যেই ছুরি দিয়ে গলাটা কাটতে গেল, তখনই রাজার হাতের জখম তাদের দৃষ্টিগোচর হলো। আর এই খুঁতের কারণে তারা তাকে বলি দেওয়ার অযোগ্য মনে করে ছেড়ে দিলো।
রাজা তার প্রাসাদে ফিরলেন। তিনি অনুধাবন করতে পারলেন—'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।' তাই রাজা তৎক্ষণাৎ মন্ত্রীকে মুক্ত করে দিলেন এবং সম্পূর্ণ ঘটনা তাকে খুলে বললেন। তিনি মন্ত্রীকে বললেন, “জখমের মাধ্যমে আমার কী কল্যাণ হয়েছিল, এখন আমি তা বুঝতে পারছি। কিন্তু তোমাকে বন্দি করার সময়ও তুমি বলেছিলে 'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন', এই বন্দিত্বের মধ্যে কী কল্যাণ ছিল তোমার জন্য?"
জবাবে মন্ত্রী জানতে চাইলেন, "শিকারের সময় সচরাচর কে আপনার সাথে থাকত?” রাজা বললেন, “তুমি।” মন্ত্রী তখন বললেন, “আমাকে যদি বন্দি না করতেন তবে আজকেও আপনার সুখে আমি থাকতাম, আর তখন আপনার বদলে আমাকেই বলি দেওয়া হতো।”
যখনই আপনি কোনো দুর্বিপাকে পতিত হন, 'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন'-বাক্যটিকে আপনার স্লোগানে পরিণত করুন। যেহেতু আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন:
وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“ পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোনো একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তো-বা কোনো একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে তা অকল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহই জানেন, তোমরা জানো না।”[১]
চতুর্দশ প্রতিষেধক : সমস্যা ততটুকুই বড় হয়, যতটুকু আপনি সেটাকে বড় করেন। আরবিতে একটা প্রবাদ আছে: هونها وتهون "তালকে তিল করা।”
অন্যভাবে বলতে গেলে এর মানে হলো, আপনার সমস্যাকে যতটা সম্ভব সঙ্কুচিত করুন। আর এটা নিম্নলিখিত উপায়ে করা সম্ভব :
• এর থেকেও খারাপ অবস্থার কথা চিন্তা করে আপনার সমস্যাকে ছোটো মনে করুন। দীর্ঘসময় ধরে দুর্বিপাকে থেকেও মুষড়ে না পড়া এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "আপনি কীভাবে এত স্থিরতা এবং ধৈর্যাবলম্বন করতে পারেন?" তিনি বললেন, "আমি কোনো কষ্টের সম্মুখীন হওয়ার সাথে সাথেই জাহান্নামের তীব্র শাস্তির কথা স্মরণ করি। আর তখন সেই কষ্টটাকে আমার কাছে মাছির মতোই তুচ্ছ মনে হয়।”
• আপনার সমস্যাটা যে সত্যিই ততটা মারাত্মক নয়, এর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজের কষ্টটাকে কমিয়ে আনুন। যদি আপনি একটি চোখ হারিয়ে থাকেন, তবে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করুন এই কারণে যে, আপনি উভয় চোখই হারাননি। যদি আপনার একটা হাত ভেঙে যায়, তৎক্ষণাৎ আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন যে, অন্তত আপনার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়নি।
বিখ্যাত আবিদ মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসি একবার ত্বকের ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার বন্ধু এটা দেখে ভীত হয়ে পড়লেন। তখন মুহাম্মাদ তাকে বললেন, "আল হামদু লিল্লাহ! ক্ষতটা আমার জিহ্বায় কিংবা চোখের কিনারায় হয়নি।”
এক গরিব-অসুস্থ-অন্ধ এবং প্রতিবন্ধী লোককে প্রায় সব সময় বলতে শোনা যেত-“প্রশংসা শুধুই আল্লাহর, যিনি আমাকে তাঁর অনেক বান্দার থেকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।”
এটা শুনে একজন লোক তাকে বললেন, “আপনার ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক! আল্লাহ আপনাকে কোন দিক দিয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছেন?” অন্ধ লোকটি জবাব দিলেন, "তিনি আমাকে একটা জিহ্বা দিয়েছেন, যা দিয়ে তাঁর যিকর করতে পারি, তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপনকারী হৃদয় দিয়েছেন এবং বিপদে সহিষ্ণুতা অবলম্বনকারী একটা দেহ দান করেছেন।"
• আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন এবং নিজের সমস্যাকে ছোটো ভাবুন, কেননা এই দুর্ভাগ্য আপনার দ্বীনদারিতাকে আক্রান্ত করেনি।
উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, "আমার ওপর আপতিত প্রত্যেকটা বিপদের মধ্যে আমি ৪টা কল্যাণ অবলোকন করি:
১) বিপদটা আমার দ্বীনের ক্ষেত্রে ছিল না।
২) আমাকে এই কঠিন পরিস্থিতিতে সংযম অবলম্বন করা থেকে বিরত রাখা হয়নি।
৩) এর চেয়েও বড় বিপদ হতে পারত।
৪) আর আমি এটার জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করি।”[১]
• আপনার প্রতি আল্লাহ-প্রদত্ত নিয়ামাতের কথা স্মরণ করে বর্তমান সমস্যাটাকে তুচ্ছ মনে করুন। এই বিষয়টা কতই-না দুঃখজনক যে, আমাদের প্রতি বর্ষিত অজস্র নিয়ামাতের ব্যাপারটাতে আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। আমরা শুধু দেখতে পাই সেই একটামাত্র নিয়ামাত, যা থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এটা কি ঠিক?
যখন উরওয়া বিন যুবাইর-এর পা কর্তন করা হয়, তখন ইবনু তালহা তাকে বললেন, “আল্লাহ তো আপনার জন্য শরীরের বেশিরভাগ অঙ্গই অক্ষত রেখেছেন; অন্তর, জিহ্বা, দুটো চোখ, দুটো হাত এবং একটা পা।”
উরওয়া বললেন, “আপনার থেকে উত্তমভাবে কেউই আমার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেনি।”
কেউ কেউ আর্থিক দুরবস্থার ব্যাপারে অভিযোগ করে থাকেন। তাদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনি কি আপনার দৃষ্টিশক্তিকে ১ কোটি টাকার বিনিময়ে দিতে রাজি?”
তখন জবাব আসে, “না।”
“তা হলে আপনার শ্রবণশক্তিকে?” একই জবাব আসে।
“আপনার বাক্শক্তি? আপনার অন্তর?”
প্রতিবারই উত্তর আসে, “না।”
তখন তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত, “সত্যি বলতে, আপনি তো একজন কোটিপতি। এরপরেও আপনি কীভাবে দারিদ্র্যের অভিযোগ করতে পারেন?”
• আপনার সমস্যাটাকে তুচ্ছ ভাবুন এটা স্মরণ করে যে, বৈশাখের ঘন-কালো মেঘের মতোই এটা একসময় কেটে যাবে। যাদেরকে পূর্বে অসুস্থতা কিংবা প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছিল, তাদের কথা চিন্তা করুন। তখন তাদের অবস্থা কীরকম ছিল? কেউ কেউ তো নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন আদৌ হবে কি না, এ ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঠিকই হয়েছিল। তাদের জীবনযাত্রা এগিয়ে গেল। এমনকি একসময়ের হৃদয়বিদারক দুঃখগাঁথা তাদের জন্য সুদূর অতীতে পরিণত হলো।
এখন আপনি যাদেরকে আপনার পাশে হাসতে দেখেন, জীবনকে উপভোগ করতে দেখেন, তারা কি জীবনের কোনো এক মুহূর্তেও বিষাদের ভারে অশ্রুপাত করেনি?
হ্যাঁ, তারা করেছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সবকিছুই বদলে গেছে।
শাইখ আলি আল-তানতাবি বলেন, “অসুস্থতা যাদের হতাশায় নিপতিত করছে; অথবা দারিদ্র যাদের দুঃখ ভারাক্রান্ত করে তুলছে; কিংবা পীড়াদায়ক কারাবাস যাদেরকে পরিবার এবং সন্তানসন্ততি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে; অথবা কোনো জালিম শাসকের জন্য যারা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার; এমন একদিন আসবে যেদিন এই সমস্তকিছুই শুধু তাদের স্মৃতির পাতায় আর বন্ধুদের সাথে পুরনো গল্পের আড্ডাতেই শোভা পাবে।"
• নিজের বিপদটা যে কত তুচ্ছ, সেটা অনুধাবনের জন্য শুধু আপনার চারপাশের মানুষগুলোর যাপিত জীবনের দিকে তাকান। খুব দ্রুত আপনি অনুধাবন করবেন যে, প্রত্যেকটা মানুষই কোনো-না-কোনোভাবে সমস্যায় জর্জরিত।
পঞ্চদশ প্রতিষেধক: দুনিয়ার প্রতি এমন কোনো আশা পোষণ করবেন না, যার জন্য এটাকে সৃষ্টিই করা হয়নি। পরীক্ষা জিনিসটা যে খুব সহজ কোনো অভিজ্ঞতা নয়, এটা সবারই জানা। আর এই দুনিয়াটা পরীক্ষা ছাড়া আর কীই-বা হতে পারে? তাই যে কয়টা দিন পৃথিবীতে শ্লান্তিতে থাকছেন সেগুলোকে সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম মনে করুন। কারণ আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ
“ নিশ্চয় আমি মানুষকে কষ্টের মধ্যে সৃষ্টি করেছি."[১]
গর্ভধারণকালীন কষ্ট, খাটুনির সময়কার কষ্ট, জ্ঞানার্জনের পেছনে দেওয়া পরিশ্রম, চাকুরি, বিয়ে এবং সন্তান লালনপালনের কষ্ট, দুর্বল স্বাস্থ্য, বার্ধক্য এবং মৃত্যুকালীন তীব্র যন্ত্রণা-এসব তো প্রায় প্রতিটা মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে-কেউই যদি কোনোরকম সমস্যা বিহীন জীবন আশা করে, অথবা ধারণা করে একমাত্র সে-ই দুর্দশাগ্রস্ত, অথবা কল্পনা করে সে-ই সবচেয়ে বেশি কষ্টের মধ্যে আছে, সে আসলে ভুল ভাবছে। কেননা প্রত্যেককেই পরীক্ষা করা হচ্ছে। যেমনটা ইবনে উআইনা বলেছেন, ' এই দুনিয়াটা বিষাদময়। তাই যে অনাকাঙ্ক্ষিত দিনগুলো আপনি স্বস্তির মধ্যে কাটান, সেগুলোকে বোনাস হিসেবে নিন।"[১]
আবদুর রহমান আন নাসির ছিলেন আন্দালুসিয়ার একজন বিখ্যাত গভর্নর। তিনি স্বস্তিতে অতিক্রান্ত দিনগুলো নোট করে রাখতেন। তিনি চরম কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতেন এবং যারা তার রাজ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চেয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে নিদারুণ সংগ্রাম করেছিলেন। যখন তিনি মারা গেলেন, তখন শত্রুরা তার নোট করা স্বস্তির দিনগুলোর হিসাব দেখতে পেল। তারা মাত্র ১৪ দিনের হিসাব পেল, যদিও তিনি ৫০ বছর সময়কাল আন্দালুসিয়াকে শাসন করেছিলেন।[২]
তাই দুনিয়াকে একটা অস্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য নিজেকে প্রশিক্ষিত করে তুলুন।
ইমাম আহমাদ -কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "আমরা কবে শান্তি পাব?” তিনি উত্তর দিলেন, "জান্নাতে প্রথম পদক্ষেপটি রাখার সাথে সাথেই।”
সব সময় এই উত্তরটি সামনে রাখুন। দেখবেন, কষ্ট কমে যাবে। আমি আল্লাহর কাছে দুআ করছি, তিনি যেন আমাদের জান্নাতে সেই পদক্ষেপ রাখার তৌফিক দান করেন। কিন্তু জান্নাতে পদার্পণের আগপর্যন্ত আপনার প্রতি ছুড়ে দেওয়া জীবনের প্রত্যেকটা সম্ভাব্য পরিস্থিতির সাথে আপনাকে মানিয়ে নিতে হবে। এটাই হচ্ছে দুনিয়া, আর আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী।
আল্লাহ যেন এই ১৫টা প্রতিষেধককে তাঁর কাছে পৌঁছনোর এই ক্ষণস্থায়ী যাত্রায় আমাদের জন্য স্বস্তির মাধ্যম বানিয়ে দেন।
সত্যিই এটা আমাদের দুর্বল সত্তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাঁকে ছাড়া আর কোনো কিছুর সাথেই আমাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সুখ জুড়ে দেননি। স্ত্রী-স্বামী- চাকরি-সন্তানসন্ততি-দেশ-সম্পদ অথবা অন্য যে-কোনো কিছুই হারিয়ে ফেললে পুনরায় প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু আল্লাহ যদি কারও জীবন থেকে হারিয়ে যান, তবে কীসের মাধ্যমে তাঁকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব?
সত্যিকারের দুঃখ তাই অপূরণীয় সেই সত্তাকে হারানো ছাড়া ওপরের আর কোনোটা হারানোতেই নয়।
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ )
“ যে মুমিন অবস্থায় সৎকাজ করবে—হোক সে পুরুষ কিংবা নারী—আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব। এবং তারা যা করত, তার তুলনায় অবশ্যই আমি উত্তম প্রতিদান দেবো।"[১]
টিকাঃ
[১] ইবনু কায়্যিম, মাদারিজুস সালিকিন
[১] সূরা তাগাবুন, ৬৪: ১১
[২] তাবারি, আত তাফসীর
[৩] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩
[১] সূরা ইউসুফ, ১২: ৬৪
[২] ইবনু কায়্যিম, আত-তিব্ব আন-নববি
[১] আহমাদ, কিতাব আয যুহদ, (রাসূলের চোখে দুনিয়া): ২৩৯
[২] তিরমিযি, আস সুনান
[৩] গাজালি, ইহয়াউ উলুম আদ্দীন
[৪] আবূ নুআইম, হায়াতুল আউলিয়া
[১] আবূ দাউদ, আস সুনান
[২] বুখারি, আস সহীহ; মুসলিম, আস সহীহ
[১] আল-মুনযিরি, তারগীব
[২] তিরমিযি, আস সুনান
[৩] ইবনু জাওযি, সিফাতুস সাফওয়া
[৪] ইবনু কায়্যিম, মাদারিজুস সালিকিন
[৫] ইবনু কুদামা, মিনহাজুল কাসিদীন
[১] সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৩০
[২] সূরা হাদীদ, ৫৭:২২
[৩] তিরমিযি, আস সুনান
[১] আল-মাওয়ারিদি, আদাব আদ-দুনিয়া ওয়াদ্দীন
[২] সূরা মুজাদালাহ, ৫৮: ১১
[১] আবূ দাউদ, আস সুনান: ১৪৫৫
[২] সূরা ইনসান, ৭৬: ২৩-২৬
[৩] জামি' আর রাসাইল
[১] সূরা ত্ব-হা, ২০:৪২
[২] তাফসীর আস সা'দি
[১] সূরা বাকারা, ০২: ২১৬
[১] মানাবি, ফাইদুল কাদীর
[১] সূরা বালাদ, ৯০:৪
[১] ইবনে আবদিল বার, বাহজাতুল মাজালি
[২] আয-যাহাবি, সিয়ারা আ'লামিন নুবালা
[১] সূরা নাহল, ১৬:৯৭