📄 তিনি সব জানেন
وَ لَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوْا عَلَى النَّارِ فَقَالُوْا يٰلَيْتَنَا نُرَدُّ وَ لَا نُكَذِّبَ بِاٰيٰتِ رَبِّنَا وَ نَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ *
“আর আপনি যদি দেখেন, যখন তাদেরকে দোযখের ওপর দাঁড় করানো হবে! তারা বলবে : কতই-না ভাল হত, যদি আমরা পুনঃপ্রেরিত হতাম; তা হলে আমরা স্বীয় পালনকর্তার নিদর্শনসমূহে মিথ্যারোপ করতাম না এবং আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম।”[১]
আপনি কি জানেন আল্লাহ তাদেরকে জবাবে কী বলবেন? আল্লাহ বলবেন,
بَلْ بَدَا لَهُمْ مَّا كَانُوْا يُخْفُوْنَ مِنْ قَبْلُ وَ لَوْ رُدُّوْا لَعَادُوْا لِمَا نُهُوْا عَنْهُ وَ اِنَّهُمْ لَكٰذِبُوْنَ *
“এবং তারা ইতঃপূর্বে যা গোপন করত, তা তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যদি তারা পুনঃপ্রেরিত হয়, তবুও তাই করবে, যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।”[২]
অর্থাৎ, আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে অবগত, তিনি সব জানেন। হাদীসে এসেছে,
رفع القلم و جف المداد
'কলম তো তুলে নেওয়া হয়েছে আর কালিও শুকিয়ে গেছে।”[১]
অন্যভাবে বললে, আপনার সাথে যা ঘটবে, সবই লিখে রাখা হয়েছে। তাইতো আল্লাহর সিদ্ধান্তে রুষ্ট হওয়া আপনার শোভা পায় না। আপনি বলতে পারেন না, 'আল্লাহ, তুমি আমাকে কেন এ জিনিস দিলে না?'
কারণ আপনি কী পাবেন, না পাবেন-তা আল্লাহই নির্ধারণ করে রেখেছেন, আপনি নন। আল্লাহই সেই মহান সত্তা, যিনি কবুল ও প্রদান করেন। আপনার যদি কিছু প্রয়োজন হয় তবে আল্লাহর কাছেই তা চাইবেন। এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ, কারণ সবকিছু আল্লাহর অধীনস্ত। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউই কিছু করতে পারে না। তাই আমরা আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করি।
যখন আপনি কোনো কিছু চাওয়ার পরেও পাবেন না, তখন জেনে রাখবেন এই জিনিস আপনার নয়। আর যে জিনিস আপনারই নয়, তা আপনি কীভাবে নেবেন? ওই জিনিস আপনার নয়, কারণ তা হয়তো আপনার জন্যে উত্তম ছিল না।
তাই কখনও হা-হুতাশ করবেন না। কারণ আল্লাহর আদেশেই এমনটি হয়েছে। আল্লাহ মহান কিতাবে যা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, তা কেউ বদলাতে পারে না। আর যখন কোনো জিনিস আপনার জন্যে নির্ধারণ করে রাখা হয়, তখন তা আপনার কাছেই আসবে। ওয়াল্লাহি! আপনি তা পাবেন। আল্লাহর কসম! আপনার জন্য নির্ধারিত জিনিস কেউ আপনার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আল্লাহর কসম! তা আপনার নিকটই ফিরে আসবে।
'ইশ', এমন যদি হতো', 'আমি তো চাইতাম ওইরকম'-এ ধরনের কথা কখনোই বলবেন না। এগুলো শয়তানের তরফ থেকে আসে।
তাই নিশ্চিন্ত থাকুন এ কথা জেনে যে, আল্লাহই সবার চেয়ে ভালো জানেন। আল্লাহই মানুষকে হিদায়াত দান করেন। আল্লাহ যাকে চান, তাকে দিনির্দেশনা দান করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার জন্যে কোনো হিদায়াত নেই।
আল্লাহ যা-কিছুর অনুমতি দিয়েছেন তা-ই হবে, এর ব্যতিক্রম হবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন-যিনি সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ রক্ষক, অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক। সুতরাং আমরা জানলাম, তাকদীরের মূল কথা হচ্ছে :
• আল্লাহ সব জানেন।
• আল্লাহ প্রত্যেক জিনিস লিখে রেখেছেন।
• আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।
• আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মহাবিশ্বে কোনো কিছুই সংঘটিত হতে পারে না।
আপনি যখন এ বিষয়গুলো অনুধাবন করবেন, তখন তা আপনার অন্তর বদলে দেবে। আপনাকে পরিতুষ্ট করবে। আপনি দুনিয়াতে বন্দি থাকবেন কিন্তু আপনার আত্মা জান্নাতে ঘুরে বেড়াবে। আপনার ওপর সম্ভাব্য সকল বিপদ আপতিত হলেও আপনার অন্তর ও পদযুগল অবিচল থাকবে। কারণ আপনি জানেন, সবই আল্লাহর বিধান।
পৃথিবীতে তো অনেক গাছপালা আছে। প্রতিবছরই প্রচুর পরিমাণে গাছ কাটা হয়। আপনি কি এর পরিমাণ জানেন? আল্লাহ কিন্তু জানেন। শুধু পাতার কথাই চিন্তা করে আমি হতবিহ্বল হয়ে যাই। চিন্তা করুন আল্লাহর জ্ঞানের পরিধি কত ব্যাপক! আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ *
“ তাঁরই নিকট অদৃশ্যের চাবি রয়েছে; তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। জলে-স্থলে যা-কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। (গাছ থেকে) যে পাতাটি পড়ে, তাও তাঁর জানা আছে। মৃত্তিকার অন্ধকারে শস্যকণা অথবা আর্দ্র বা শুষ্ক যে বস্তুটি আছে, তাও একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।”[১]
টিকাঃ
[১] সূরা আল আনআম, ০৬: ২৭
[২] সূরা আল আনআম, ০৬: ২৮
[১] আহমাদ, আল মুসনাদ, হাদীস : ২৬৬৯-২৭৬২; সহীহ।
[১] সূরা আল আনআম, ০৬: ৫৯
📄 দুয়ার শক্তি
দুআর শক্তি অতুলনীয়। ইসরাঈলি রেওয়ায়েতে দুআ নিয়ে মূসা -এর একটি সুন্দর ঘটনা আছে। যেহেতু ঘটনাটি আমাদের ধর্মের কোনো শিক্ষার সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ নয়, তাই আমি ঘটনাটি বর্ণনা করছি[১]।
মূসা ছিলেন কালিমুল্লাহ, তিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলতে পারতেন। একদা এক মহিলা মূসা -এর কাছে এসে অনুরোধ করল, যাতে তিনি আল্লাহর কাছে তার ব্যাপারে ফরিয়াদ করেন। ওই মহিলা নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, মূসা যাতে আল্লাহকে অনুরোধ করেন আর আল্লাহ তাকে সন্তান দান করেন। মহিলাটির বিবাহের পর অনেকদিন হয়ে গিয়েছিল, মনেপ্রাণে তিনি মা হতে চাচ্ছিলেন। মূসা আল্লাহর কাছে চাইলেন। আল্লাহ জবাব দিলেন, সেই মহিলা বন্ধ্যা, সে সন্তান জন্মদানে অক্ষম। মূসা মহিলাকে এ কথা জানালে সে চলে গেল।
আমি বা আপনি যদি আল্লাহর কাছ থেকে এ ব্যাপারে জানতে পারতাম, আমরা হয়তো থেমেই যেতাম। আমরা অনেকে তো কিছুদিন দুআ করেই হতাশ হয়ে যাই আর নালিশ জানাই। অনুযোগ করে ফেলি—আল্লাহ কখনোই আমাদের দুআ শুনেন না। কিন্তু ওই মহিলা ক্রমাগত আল্লাহর কাছে দুআ করে যাচ্ছিল। সে সকাতরে, বিনীত ও বিনম্রভাবে আল্লাহর কাছে চাইতে থাকল। কখনও দুআ করা বাদ দিলো না। এরপর একদিন তিনি দ্বিতীয়বার মূসা -এর কাছে গিয়ে বললেন, “আপনার প্রভুকে বলুন, হে মূসা!” আল্লাহ একই জবাব দিলেন।
এভাবে তিনি তিনবার মুসা -এর কাছে অনুরোধ জানিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলেন। এবারও একই উত্তর পেলেন—তিনি বন্ধ্যা, সন্তান জন্মদানে অক্ষম। তিনি চতুর্থবার মূসা-এর সাথে দেখা করলেন। কিন্তু এবার তার কোলে একটি ফুটফুটে শিশু ছিল। তার হাত ধরেছিল আরেকটি শিশু। তিনি বললেন, "দেখুন মূসা! আল্লাহ আমাকে দুটো সন্তান দান করেছেন।"
মূসা বিব্রত বোধ করলেন। আল্লাহকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি তিনবার আমাকে জানালেন যে, সে বন্ধ্যা, তার সন্তান হবে না। কিন্তু তারপর আপনি তাকে সন্তান দান করলেন!"
আল্লাহ জবাব দিলেন, “প্রত্যেকবার যখন আমি লিখে রাখি যে সে বন্ধ্যা, তখনই সে দুআ করছিল আর বলছিল: 'হে দয়াময়! হে দয়াময়! হে দয়াময়!' হে মূসা! আমার দয়া আমার ক্রোধকে অতিক্রম করেছে।”
তাই যখন আপনি আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইবেন, মনে রাখবেন—আল্লাহ আপনাকে তা দিতে সক্ষম। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তো কিছুই হয় না। তাই আপনার উচিত ধৈর্যের মাধ্যমে আপনার দুআকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা। আমরা কোনো কিছু ঘটলে রাগান্বিত হই না, হতাশও হই না। এর কারণ শুধু এটাই না যে, এসব তো তাকদীরে লিখে রাখা আছে। বরং এর কারণ হলো, এগুলো যে আল্লাহ-ই লিখে রেখেছেন! আল্লাহ বলেন,
مَّا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
“পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর কোনো বিপদ আসে না; কিন্তু তা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এজন্যে বলা হয়, যাতে তোমরা যা হারাও, তজ্জন্যে দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তজ্জন্যে বেশি উল্লসিত না হও। আল্লাহ কোনো উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”[১]
তাই বিপদ আসলে ধৈর্য ধরুন। বিপদের সময়ে কেউ অভিযোগ করে, কেউ পশ্চাদপসরণ করে, আবার কেউ ধৈর্য ধরে। যারা ধৈর্য ধারণ করে ও আল্লাহর প্রশংসা করে তারাই সর্বোত্তম। আল্লাহ জানেন আপনার জন্যে কোনটি ভালো। আল্লাহ সব সময় আপনার জন্যে ভালো জিনিসই নির্ধারণ করবেন। সব সময়! যা-ই ঘটুক না কেন, আপনি বলুন, “আল হামদু লিল্লাহ!” নবিরা বলতেন, “আল হামদু লিল্লাহ আলা কুল্লি হাল!” আপনি কি জানেন এর মানে কী?
এই দুআর মানে হচ্ছে, সব সময়, সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করা। কারণ আল্লাহ-ই তো তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অন্তর থেকে সবকিছু বের করে দেন। শুধুমাত্র আল্লাহর প্রশংসা করুন। আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট থাকুন। কখনও দুআ করা ছেড়ে দেবেন না।
কাদা আর কাদরের ব্যাপারগুলো তো আমরা জানি। আমরা জানি যে, যা-কিছু আগামীতে ঘটবে, সব লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ হচ্ছেন বিচারক, ফায়সালাদাতা। তিনি অনেক অনেক বছর আগে, পঞ্চাশ হাজার বছরেরও আগে সবকিছুর ফায়সালা করে রেখেছেন। আমরা কি আল্লাহর ফায়সালা অস্বীকার করতে পারি? না।
তাই যা আপনার হবার নয়, তা আপনার হবে না। আর যা আপনার, তা আপনি পাবেনই।
আপনি নিজের বাসায় যান। আপনি দেখবেন বিভিন্ন স্থান থেকে আপনার খাদ্য আসে। আমরা তো এখানে (আমেরিকায়) বিভিন্ন দেশ থেকে খাদ্য পাই। আঙুর, ডুমুর-সহ প্রত্যেকটি ফলমূল আলাদা আলাদা দেশ থেকে আসছে। সুবহানাল্লাহ! আফগানিস্তান, পাকিস্তান, আফ্রিকা, কোরিয়া-সহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে খাদ্য প্রস্তুত হয়ে আসে, যাতে তা আমরা খেতে পারি।
আপনার বাবা আজ বাসায় খাবার নিয়ে আসবেন। আপনি জানেন না, রুটি কোথা থেকে আসবে। তবুও যা আপনার জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে, তা আপনি পাবেনই, যদি তা ভিন্ন দেশ থেকে আসে তবু। আপনার জন্য নির্ধারিত অংশ আপনি পাবেন। কেউ তা আটকাতে পারবে না। কারণ তা তাকদীরে লেখা আছে। আমাদের জন্য আল্লাহ যা নির্ধারিত করে রেখেছেন, তা আমরা পাব। আমরা যা পানি পান করি, খাদ্য গ্রহণ করি কিংবা যেখানে যাই-তা সবকিছু আল্লাহ লিখে রেখেছেন। এভাবে আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন বলেই তা এরকম হয়।
বেশি বেশি দুআ করুন। ইমাম আহমাদ আর রুটিওয়ালার গল্প থেকে আমরা দুআর শক্তি বুঝতে পারি।
একদা ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল এ শামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন। রাত্রিযাপনের জন্যে তিনি একটি মাসজিদে প্রবেশ করলেন। মাসজিদের পাহারাদার বলল, অনেক রাত হয়ে গেছে, এখন মাসজিদ ছাড়তে হবে। মাসজিদ বন্ধ করার সময় হয়ে গিয়েছিল। ইমাম আহমাদ পাহারাদারকে জানালেন যে, তাঁর আর রাত কাটানোর জায়গা নেই, তবুও পাহারাদার তাঁকে উঠে যাবার জন্য জোর করছিল।
চিন্তা করুন। ইমাম আহমাদ ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম! তিনি যদি চাইতেন, তো নিজের পরিচয় দিতে পারতেন। তিনি যা চাইতেন, তা-ই পেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না, রাহিমাহুল্লাহ। তিনি তার জিনিসিপত্র নিয়ে বেরিয়ে এসে মাসজিদের সিঁড়িতে শুয়ে পড়লেন। পাহারাদার বাইরে বেরিয়ে ইমাম আহমাদ-কে সিঁড়ি থেকে উঠে যেতে বলল। অতঃপর পাহারাদার ইমাম আহমাদ-এর পা ধরে টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে রাস্তার মাঝখানে ফেলে রেখে চলে গেল।
রাস্তার পাশেই এক ধার্মিক রুটিওয়ালার দোকান ছিল। সে ইমাম আহমাদ-কে দেখে নিজের সাথে রাতে থেকে যেতে বলল। সে রাতভর রুটি বানায় তাই ইমাম আহমাদ তার স্থানে ঘুমোতে পারবেন।
রাতে ইমাম আহমাদ একটি অভাবনীয় দৃশ্য দেখলেন। রুটিওয়ালা রাতভর কাজ করছিল। সে ময়দা গোলে রুটির খামির বানাচ্ছিল আবার কখনও-বা রুটি সেঁকছিল। কিন্তু এসব কাজের মধ্যেও সে রাতভর আল্লাহর যিকর করে যাচ্ছিল, তাসবিহ জপছিল। ইমাম আহমাদ তা দেখে বিস্মিত হলেন।
এই লোকটি রাতভর আল্লাহর যিকর করছিল। অথচ, আজকাল মানুষ কত তাড়াতাড়ি যিকর করে ক্লান্ত হয়ে যায়। ইমাম আহমাদ রুটিওয়ালার কাছে জানতে চাইলেন যে, কদিন ধরে সে এই আমল করে যাচ্ছে। রুটিওয়ালা জবাব দিলো যে, সে জীবনভর এই আমল করে আসছে।
ইমাম আহমাদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই আমলের কোনো ফল সে পেয়েছে কি না। লোকটি তখন যে জবাব দিলো, তা শুনে ইমাম আহমাদ হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। রুটিওয়ালা জবাব দিলো, "আমি আল্লাহর কাছে কোনো দুআ করেছি আর আল্লাহ তা কবুল করেননি, এমন কখনও হয়নি, শুধুমাত্র একটি দুআ বাদে।” ইমাম আহমাদ তখন জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কোন দুআটি কবুল হয়নি?"
রুটিওয়ালা জবাব দিলো যে, সে আল্লাহর কাছে দুআ করত যেন ইমাম আহমাদের সাথে তার দেখা হয়। কিন্তু সেই দুআটি এখনও কবুল হয়নি।
এ কথা শুনে ইমাম আহমাদ কেঁদে ফেললেন। তিনি রুটিওয়ালাকে বললেন, “সুবহানাল্লাহ! তিনিই তো হচ্ছেন আল্লাহ... তিনি আমাকে টেনে-হিঁচড়ে তোমার দোকানে এনে ফেলেছেন, যেন আল্লাহ আমাকে দিয়ে তোমার দুআ কবুল করাতে পারেন।"
দেখতেই পারছেন আল্লাহর যিকর-করার ফযীলত!
দুআ ওপরের দিকে উঠতে থাকে, বিপদ নিচের দিকে নামতে থাকে এবং মাঝপথে তারা একে অন্যের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এ লড়াইয়ে বিজয় নির্ভর করে কে বেশি শক্তিশালী তার ওপর। ইখলাস ও কবুলিয়াতের আশা নিয়ে করা দুআ বিপদের ওপর প্রবল হয়, বিজয় লাভ করে এবং তখন বিপদ আর সংঘটিত হতে পারে না।
পক্ষান্তরে অমনোযোগের সাথে, হতাশা নিয়ে করা দুআ থেকে বিপদ শক্তিশালী হয়। তখন বিপদ দুআকে পরাজিত করে নিচে নেমে আসে।
কখনও কখনও তারা সমানে সমান হয় আর কিয়ামাত পর্যন্ত একে অন্যের সাথে লড়তে থাকে। সুতরাং,
• দুআ শক্তিশালী হলে তা বিপদকে পরাজিত করবে এবং আটকে দেবে。
• বিপদ দুআ থেকে শক্তিশালী হলে তা দুআর ওপর বিজয়ী হবে এবং নিচে নেমে আসবে。
• যদি তারা সমানে সমান হয়, তবে তারা কিয়ামাতের আগ পর্যন্ত পরস্পর লড়াই করতে থাকবে।
তাই আমাদের সব সময় দুআ করা উচিত, যাতে দুআ শক্তিশালী হয়ে যায়। আল্লাহ আপনার দুআ কবুল করবেনই এমন দৃঢ় সংকল্পের সাথে দুআ করুন এবং ফলাফলের ব্যাপারে উত্তম প্রত্যাশা রাখুন। আল্লাহ তাঁর নিজের ব্যাপারে বলেন, যে এই ধারণা রাখে যে আমি ক্ষমাশীল, তাকে আমি অবশ্যই ক্ষমা করে দেবো। আমার বান্দা আমার ব্যাপারে যেমন ধারণা রাখে, আমি তেমনই। অন্যভাবে বললে, আল্লাহর কাছে আপনি যা চান তা তাঁর কাছে থেকেই চেয়ে নিন দুআর মাধ্যমে।
উমার বলেন, “আল্লাহ আমার দুআর কী জবাব দেবেন সে ব্যাপারে আমি চিন্তিত নই। আমি তো চিন্তিত থাকি কীভাবে আমি আমার দুআকে সাজাতে এবং আল্লাহর কাছে চাইতে পারি। কারণ আমি যখন দুআ করব, আল্লাহ তো উত্তর দেবেনই।” উমার নিঃসংশয় ছিলেন যে তাঁর দুআ কবুল হবেই, রাদিয়াল্লাহু আনহু।
টিকাঃ
[১] এভাবে শিক্ষা লাভ করার জন্যে ইসরাইলিয়াত থেকে ঘটনা নেওয়া যায়, যদি তা ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে অসামাঞ্জাস্যপূর্ণ না হয়ে থাকে। - অনুবাদক
[১] সূরা হাদীদ, ৫৭: ২২,২৩