📄 আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছুই হয় না
আপনি হয়তো কোনো ব্যাপার নিয়ে বিচলিত, আপনার কন্ঠ বিষাদগ্রস্থ, আপনার মনে হয়তো শান্তি নেই। তবে জেনে রাখুন:
যা আপনার ভাগ্যে নির্ধারিত আছে, তা আপনার কাছেই আসবে। যদিও-বা আপনি আপনার বাসায় ঘুমিয়ে থাকেন।
আপনি ধৈর্য রাখুন আর দুআ করে যান।
ধৈর্য রাখুন।
আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছেন, তা নিয়ে অতি উল্লসিত হবেন না। আর আল্লাহ আপনাকে যা দেননি, তা নিয়ে দুঃখ করবেন না। কারণ এ সবই আল্লাহ লিখে রেখেছেন।
এখন আমরা ইসলামের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস 'তাকদীর' নিয়ে আলোচনা করব। কাদ্বা এবং কদর নিয়ে আলোচনা করব।
কাদ্বা (القضاء) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিচারক। কে সেই বিচারক? আল্লাহই হচ্ছেন সেই মহাবিচারক।
কদর (القدر) অর্থ হচ্ছে, যা আল্লাহ আপনার জন্য ফায়সালা করে রেখেছেন, যা আপনার সাথে ঘটবে—সেটিই হচ্ছে কদর।
আপনি যখন মায়ের গর্ভে অবস্থান করছিলেন, তখন ১২০তম দিনে একজন ফেরেশতা এসে গর্ভস্থিত ফিটাসে আপনার রুহ ফুঁকে দেন। এই সময়ে আপনার ব্যাপারে চারটি বিষয় নির্ধারিত হয়ে যায়:
• আপনি জীবনে সুখী নাকি দুঃখী হবেন,
• আপনি জান্নাতি নাকি জাহান্নামি হবেন,
• আপনি জীবনে কী কী করবেন, এবং
• আপনার রিযক কোথা থেকে আসবে।
আবার কিছু ব্যাপার বাৎসরিকভাবে নির্ধারিত হয় লাইলাতুল কাদরের রাতে, যা রমাদানের শেষ দশকের মধ্যে আছে। সেই সময় আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে যে চারটি বিষয় আগামী এক বছরের জন্যে নির্ধারণ করে দেন সেগুলো হচ্ছে:
• কারা জন্মগ্রহণ করবে,
• কারা মৃত্যুবরণ করবে,
• কোথায় কোথায় বিপদ আসবে, এবং
• কোথায় কোথায় রিযক বণ্টন করা হবে
যখন আল্লাহ কোনো ব্যাপারে ফায়সালা করে ফেলেছেন, তখন কেউ কি তা বদলাতে পারবে? আপনার পিতা-মাতা-ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন এমনকি সারা বিশ্বের মানুষ এক হয়ে চেষ্টা করলেও তা বদলাতে পারবে না।
সুতরাং শান্ত হোন। যখন তাকদীরের ব্যাপারটি হৃদয়ে বসাতে পারবেন, তখন অন্ধকারতম পরিস্থিতির মাঝেও আশার আলোকচ্ছটার সন্ধান পাবেন। দুর্গন্ধময় দিনেও সুগন্ধের ছোঁয়া পাবেন। আপনার পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠলেও অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করতে পারবেন।
আচ্ছা, এই জিনিসগুলো আল্লাহ কখন নির্ধারণ করলেন? মনে করুন, আপনি অমুককে বিয়ে করবেন এবং আগামী দিনে আপনার পাঁচটি সন্তান হবে। এই জিনিস আল্লাহ কখন নির্ধারণ করলেন?
আসমান-জমিন সৃষ্টি করার ৫০ হাজার বছর আগে আল্লাহ আমাদের তাকদীর নির্ধারণ করে রেখেছেন। প্রত্যেক ছোটো বড় জিনিসই নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই যা আপনার ভাগ্যে রয়েছে, সমগ্র পৃথিবী মিলে চেষ্টা করলেও তা আপনার কাছে আসবেই। তেমনিভাবে যদি কোনো জিনিস আপনার জন্য নির্ধারণ করা না থাকে, তবে সব জাতির মানুষ একত্র হয়ে চেষ্টা করলেও তা আপনার হবে না। যতটুকু আল্লাহ ফায়সালা করেছেন, ততটুকুই আপনি পাবেন। যা আপনার তাকদীরে নেই, তা আপনার হবে না।
আপনি কি জানেন, আপনার তাকদীরে কী আছে? আপনি কি জানেন, কোনটা আপনার জন্য উত্তম?
না, কিন্তু আল্লাহ জানেন। তাই আল্লাহই আপনার তাকদীর লিখে রেখেছেন। সুতরাং হতাশ হওয়ার কিছুই নেই।
আপনি এই মুহূর্তে এই লেখাটি পড়ছেন, এই বিষয়ে, এই সময়ে—এ ব্যাপারটি কিন্তু আসমান-জমিন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন।
তাকদীরের একটি স্তম্ভ হচ্ছে: আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া এই দুনিয়ায় কোনো কিছুই হয় না।
আচ্ছা, তবে কি দুনিয়ায় এমন কিছু ঘটা সম্ভব, যা আল্লাহ অপছন্দ করেন?
হ্যাঁ, সম্ভব। যদি তা আল্লাহ ঘটার অনুমতি দেন।
আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো কিছুই ঘটে না। তাই অপছন্দনীয় কিছু ঘটে গেলে বিচলিত হবেন না। রাতে অনিদ্রায় ভুগবেন না। মেজাজ খারাপ করবেন না। কারণ আপনি আল্লাহর ফায়সালার ওপর মেজাজ খারাপ করতে পারেন না। সবকিছুই আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঘটে।
আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো ঘটনা ঘটল কিংবা আপনি কোনো জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করলেন, কিন্তু তা আপনার হলো না—এমতাবস্থায় জেনে রাখবেন যে, ওই বস্তু আদতে আপনার ছিলই না। তখন বলবেন, 'মহান আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তা ছাড়া কোনো সাহায্য নেই, কোনো আশ্রয় নেই। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে আর আল্লাহর নিকটেই আমরা ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার দুর্ভাগ্যের বদৌলতে আমাকে উত্তম পুরস্কার দান করুন। এবং যা পাইনি তার বদলে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।'
খুশি থাকুন, রাগ করবেন না। মানুষেরা তো কিছুই নয়। একবার আমি কোর্টে বিচারককে দেখে বললাম, হে আল্লাহ! সে যা-কিছুই বলে, এর সবকিছুই তো আপনি নির্ধারণ করে রেখেছেন। সে তো কিছুই না।
আল্লাহ মহাবিচারক। তিনি সবকিছু লিখে রেখেছেন। তাঁর ফায়সালা কেউ বদলাতে পারে না। আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা। তিনি প্রত্যেক বস্তুর অনুপাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রত্যেক জিনিস তেমনই যেমনটি আল্লাহ চেয়েছেন।
তাকদীরের একটি স্তম্ভ হচ্ছে: আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে জগতের কোনো কিছুই ঘটে না।
একদা যাইনুল আবেদীন -কে জিজ্ঞেস করা হলো, "কেউ খারাপ আমল করলে আল্লাহ তার অনুমতি দেন কীভাবে? তবে কি আল্লাহ তাতে সন্তুষ্ট হোন?” যাইনুল আবেদীন জবাব দিলেন, "আপনি আল্লাহর ওপর এটি কীভাবে আরোপ করবেন! নিঃসন্দেহে আল্লাহ খারাপ কাজ করারও অনুমতি দেন। কিন্তু তিনি তো আমাদেরকে কখনও খারাপ কাজ করার আদেশ দেননি। তিনি আমাদেরকে জাহান্নামের আগুনের ব্যাপারে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলে দিয়েছেন, কিছু কাজ আছে যা করলে তোমাকে জাহান্নামে যেতে হবে। তাই সেগুলো থেকে বেঁচে থাকো। তিনি চান না তাঁর বান্দা জাহান্নামে যাক। তিনি এটি অপছন্দ করেন, ঘৃণা করেন। এর থেকেও খারাপ ব্যাপার হলো, মানুষ আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে। আল্লাহ তো সেই কাজও সংঘটিত হওয়ার অনুমতি দেন। কারও ওপর জোর জবরদস্তি করা হয় না। কিন্তু আমরা আল্লাহর ওপর প্রভাবশালী হতে পারব না। কোনো জিনিস আল্লাহ অনুমতি দিলেই শুধু তা সংঘটিত হতে পারবে। যদি আল্লাহ কোনো জিনিসের অনুমতি না দেন, তবে তা সংঘটিত হবে না।”
একদা আলি ইবনু আবী তালিব মাসজিদে গেলেন। তাঁর সাথে একটি ঘোড়া ছিল। তিনি মাসজিদের ভেতরে প্রবেশের পূর্বে এক লোককে ঘোড়াটি দিলেন এবং বললেন, ঘোড়াটি যেন সে দেখে রাখে। লোকটি ঘোড়ার লাগাম চুরি করে নিয়ে গেল।
মাসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় আলি ভাবলেন, লোকটিকে ঘোড়া দেখে রাখার জন্যে চার দিনার মজুরি দিবেন। তিনি বাইরে বের হয়ে দেখলেন ঘোড়ার লাগাম হারিয়ে গেছে। তিনি তাঁর সেবককে বললেন, "এই চার দিনার দিয়ে আমার জন্যে বাজার থেকে একটি লাগাম নিয়ে এসো।”
সেবক বাজারে গিয়ে দেখল যে এক ব্যক্তি লাগাম বিক্রি করছে। এ ছিল সেই ব্যক্তি যে লাগামটি চুরি করেছিল। সেবকটি ওই ব্যক্তির কাছে থেকেই দামাদামি করে চার দিনারে লাগাম কিনে নিয়ে এল।
একবার ভাবুন তো, লোকটি একটু অপেক্ষা করলেই বৈধভাবে চার দিনারই পেত। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করল। হারাম পন্থায় চুরির মাধ্যমে একই টাকা হাতিয়ে নিল। বোঝার ব্যাপার হচ্ছে, যা আপনার ভাগ্যে আছে তা আপনারই হবে। এই চার দিনার লোকটির তাকদীরে ছিল। কিন্তু সে চুরির মাধ্যমে তা নিল। তাই আমি আপনাদের ধৈর্যধারণ করার উপদেশ দেবো। যা আপনার ভাগ্যে আছে, তা আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও আপনার কাছে আসবে। সবর করুন, আর বেশি বেশি দুআ করুন।
📄 তিনি সব জানেন
وَ لَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوْا عَلَى النَّارِ فَقَالُوْا يٰلَيْتَنَا نُرَدُّ وَ لَا نُكَذِّبَ بِاٰيٰتِ رَبِّنَا وَ نَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ *
“আর আপনি যদি দেখেন, যখন তাদেরকে দোযখের ওপর দাঁড় করানো হবে! তারা বলবে : কতই-না ভাল হত, যদি আমরা পুনঃপ্রেরিত হতাম; তা হলে আমরা স্বীয় পালনকর্তার নিদর্শনসমূহে মিথ্যারোপ করতাম না এবং আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম।”[১]
আপনি কি জানেন আল্লাহ তাদেরকে জবাবে কী বলবেন? আল্লাহ বলবেন,
بَلْ بَدَا لَهُمْ مَّا كَانُوْا يُخْفُوْنَ مِنْ قَبْلُ وَ لَوْ رُدُّوْا لَعَادُوْا لِمَا نُهُوْا عَنْهُ وَ اِنَّهُمْ لَكٰذِبُوْنَ *
“এবং তারা ইতঃপূর্বে যা গোপন করত, তা তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যদি তারা পুনঃপ্রেরিত হয়, তবুও তাই করবে, যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।”[২]
অর্থাৎ, আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে অবগত, তিনি সব জানেন। হাদীসে এসেছে,
رفع القلم و جف المداد
'কলম তো তুলে নেওয়া হয়েছে আর কালিও শুকিয়ে গেছে।”[১]
অন্যভাবে বললে, আপনার সাথে যা ঘটবে, সবই লিখে রাখা হয়েছে। তাইতো আল্লাহর সিদ্ধান্তে রুষ্ট হওয়া আপনার শোভা পায় না। আপনি বলতে পারেন না, 'আল্লাহ, তুমি আমাকে কেন এ জিনিস দিলে না?'
কারণ আপনি কী পাবেন, না পাবেন-তা আল্লাহই নির্ধারণ করে রেখেছেন, আপনি নন। আল্লাহই সেই মহান সত্তা, যিনি কবুল ও প্রদান করেন। আপনার যদি কিছু প্রয়োজন হয় তবে আল্লাহর কাছেই তা চাইবেন। এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ, কারণ সবকিছু আল্লাহর অধীনস্ত। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউই কিছু করতে পারে না। তাই আমরা আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করি।
যখন আপনি কোনো কিছু চাওয়ার পরেও পাবেন না, তখন জেনে রাখবেন এই জিনিস আপনার নয়। আর যে জিনিস আপনারই নয়, তা আপনি কীভাবে নেবেন? ওই জিনিস আপনার নয়, কারণ তা হয়তো আপনার জন্যে উত্তম ছিল না।
তাই কখনও হা-হুতাশ করবেন না। কারণ আল্লাহর আদেশেই এমনটি হয়েছে। আল্লাহ মহান কিতাবে যা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, তা কেউ বদলাতে পারে না। আর যখন কোনো জিনিস আপনার জন্যে নির্ধারণ করে রাখা হয়, তখন তা আপনার কাছেই আসবে। ওয়াল্লাহি! আপনি তা পাবেন। আল্লাহর কসম! আপনার জন্য নির্ধারিত জিনিস কেউ আপনার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আল্লাহর কসম! তা আপনার নিকটই ফিরে আসবে।
'ইশ', এমন যদি হতো', 'আমি তো চাইতাম ওইরকম'-এ ধরনের কথা কখনোই বলবেন না। এগুলো শয়তানের তরফ থেকে আসে।
তাই নিশ্চিন্ত থাকুন এ কথা জেনে যে, আল্লাহই সবার চেয়ে ভালো জানেন। আল্লাহই মানুষকে হিদায়াত দান করেন। আল্লাহ যাকে চান, তাকে দিনির্দেশনা দান করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার জন্যে কোনো হিদায়াত নেই।
আল্লাহ যা-কিছুর অনুমতি দিয়েছেন তা-ই হবে, এর ব্যতিক্রম হবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন-যিনি সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ রক্ষক, অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক। সুতরাং আমরা জানলাম, তাকদীরের মূল কথা হচ্ছে :
• আল্লাহ সব জানেন।
• আল্লাহ প্রত্যেক জিনিস লিখে রেখেছেন।
• আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।
• আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মহাবিশ্বে কোনো কিছুই সংঘটিত হতে পারে না।
আপনি যখন এ বিষয়গুলো অনুধাবন করবেন, তখন তা আপনার অন্তর বদলে দেবে। আপনাকে পরিতুষ্ট করবে। আপনি দুনিয়াতে বন্দি থাকবেন কিন্তু আপনার আত্মা জান্নাতে ঘুরে বেড়াবে। আপনার ওপর সম্ভাব্য সকল বিপদ আপতিত হলেও আপনার অন্তর ও পদযুগল অবিচল থাকবে। কারণ আপনি জানেন, সবই আল্লাহর বিধান।
পৃথিবীতে তো অনেক গাছপালা আছে। প্রতিবছরই প্রচুর পরিমাণে গাছ কাটা হয়। আপনি কি এর পরিমাণ জানেন? আল্লাহ কিন্তু জানেন। শুধু পাতার কথাই চিন্তা করে আমি হতবিহ্বল হয়ে যাই। চিন্তা করুন আল্লাহর জ্ঞানের পরিধি কত ব্যাপক! আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ *
“ তাঁরই নিকট অদৃশ্যের চাবি রয়েছে; তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। জলে-স্থলে যা-কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। (গাছ থেকে) যে পাতাটি পড়ে, তাও তাঁর জানা আছে। মৃত্তিকার অন্ধকারে শস্যকণা অথবা আর্দ্র বা শুষ্ক যে বস্তুটি আছে, তাও একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।”[১]
টিকাঃ
[১] সূরা আল আনআম, ০৬: ২৭
[২] সূরা আল আনআম, ০৬: ২৮
[১] আহমাদ, আল মুসনাদ, হাদীস : ২৬৬৯-২৭৬২; সহীহ।
[১] সূরা আল আনআম, ০৬: ৫৯
📄 দুয়ার শক্তি
দুআর শক্তি অতুলনীয়। ইসরাঈলি রেওয়ায়েতে দুআ নিয়ে মূসা -এর একটি সুন্দর ঘটনা আছে। যেহেতু ঘটনাটি আমাদের ধর্মের কোনো শিক্ষার সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ নয়, তাই আমি ঘটনাটি বর্ণনা করছি[১]।
মূসা ছিলেন কালিমুল্লাহ, তিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলতে পারতেন। একদা এক মহিলা মূসা -এর কাছে এসে অনুরোধ করল, যাতে তিনি আল্লাহর কাছে তার ব্যাপারে ফরিয়াদ করেন। ওই মহিলা নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, মূসা যাতে আল্লাহকে অনুরোধ করেন আর আল্লাহ তাকে সন্তান দান করেন। মহিলাটির বিবাহের পর অনেকদিন হয়ে গিয়েছিল, মনেপ্রাণে তিনি মা হতে চাচ্ছিলেন। মূসা আল্লাহর কাছে চাইলেন। আল্লাহ জবাব দিলেন, সেই মহিলা বন্ধ্যা, সে সন্তান জন্মদানে অক্ষম। মূসা মহিলাকে এ কথা জানালে সে চলে গেল।
আমি বা আপনি যদি আল্লাহর কাছ থেকে এ ব্যাপারে জানতে পারতাম, আমরা হয়তো থেমেই যেতাম। আমরা অনেকে তো কিছুদিন দুআ করেই হতাশ হয়ে যাই আর নালিশ জানাই। অনুযোগ করে ফেলি—আল্লাহ কখনোই আমাদের দুআ শুনেন না। কিন্তু ওই মহিলা ক্রমাগত আল্লাহর কাছে দুআ করে যাচ্ছিল। সে সকাতরে, বিনীত ও বিনম্রভাবে আল্লাহর কাছে চাইতে থাকল। কখনও দুআ করা বাদ দিলো না। এরপর একদিন তিনি দ্বিতীয়বার মূসা -এর কাছে গিয়ে বললেন, “আপনার প্রভুকে বলুন, হে মূসা!” আল্লাহ একই জবাব দিলেন।
এভাবে তিনি তিনবার মুসা -এর কাছে অনুরোধ জানিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলেন। এবারও একই উত্তর পেলেন—তিনি বন্ধ্যা, সন্তান জন্মদানে অক্ষম। তিনি চতুর্থবার মূসা-এর সাথে দেখা করলেন। কিন্তু এবার তার কোলে একটি ফুটফুটে শিশু ছিল। তার হাত ধরেছিল আরেকটি শিশু। তিনি বললেন, "দেখুন মূসা! আল্লাহ আমাকে দুটো সন্তান দান করেছেন।"
মূসা বিব্রত বোধ করলেন। আল্লাহকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি তিনবার আমাকে জানালেন যে, সে বন্ধ্যা, তার সন্তান হবে না। কিন্তু তারপর আপনি তাকে সন্তান দান করলেন!"
আল্লাহ জবাব দিলেন, “প্রত্যেকবার যখন আমি লিখে রাখি যে সে বন্ধ্যা, তখনই সে দুআ করছিল আর বলছিল: 'হে দয়াময়! হে দয়াময়! হে দয়াময়!' হে মূসা! আমার দয়া আমার ক্রোধকে অতিক্রম করেছে।”
তাই যখন আপনি আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইবেন, মনে রাখবেন—আল্লাহ আপনাকে তা দিতে সক্ষম। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তো কিছুই হয় না। তাই আপনার উচিত ধৈর্যের মাধ্যমে আপনার দুআকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা। আমরা কোনো কিছু ঘটলে রাগান্বিত হই না, হতাশও হই না। এর কারণ শুধু এটাই না যে, এসব তো তাকদীরে লিখে রাখা আছে। বরং এর কারণ হলো, এগুলো যে আল্লাহ-ই লিখে রেখেছেন! আল্লাহ বলেন,
مَّا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
“পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর কোনো বিপদ আসে না; কিন্তু তা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এজন্যে বলা হয়, যাতে তোমরা যা হারাও, তজ্জন্যে দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তজ্জন্যে বেশি উল্লসিত না হও। আল্লাহ কোনো উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”[১]
তাই বিপদ আসলে ধৈর্য ধরুন। বিপদের সময়ে কেউ অভিযোগ করে, কেউ পশ্চাদপসরণ করে, আবার কেউ ধৈর্য ধরে। যারা ধৈর্য ধারণ করে ও আল্লাহর প্রশংসা করে তারাই সর্বোত্তম। আল্লাহ জানেন আপনার জন্যে কোনটি ভালো। আল্লাহ সব সময় আপনার জন্যে ভালো জিনিসই নির্ধারণ করবেন। সব সময়! যা-ই ঘটুক না কেন, আপনি বলুন, “আল হামদু লিল্লাহ!” নবিরা বলতেন, “আল হামদু লিল্লাহ আলা কুল্লি হাল!” আপনি কি জানেন এর মানে কী?
এই দুআর মানে হচ্ছে, সব সময়, সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করা। কারণ আল্লাহ-ই তো তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অন্তর থেকে সবকিছু বের করে দেন। শুধুমাত্র আল্লাহর প্রশংসা করুন। আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট থাকুন। কখনও দুআ করা ছেড়ে দেবেন না।
কাদা আর কাদরের ব্যাপারগুলো তো আমরা জানি। আমরা জানি যে, যা-কিছু আগামীতে ঘটবে, সব লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ হচ্ছেন বিচারক, ফায়সালাদাতা। তিনি অনেক অনেক বছর আগে, পঞ্চাশ হাজার বছরেরও আগে সবকিছুর ফায়সালা করে রেখেছেন। আমরা কি আল্লাহর ফায়সালা অস্বীকার করতে পারি? না।
তাই যা আপনার হবার নয়, তা আপনার হবে না। আর যা আপনার, তা আপনি পাবেনই।
আপনি নিজের বাসায় যান। আপনি দেখবেন বিভিন্ন স্থান থেকে আপনার খাদ্য আসে। আমরা তো এখানে (আমেরিকায়) বিভিন্ন দেশ থেকে খাদ্য পাই। আঙুর, ডুমুর-সহ প্রত্যেকটি ফলমূল আলাদা আলাদা দেশ থেকে আসছে। সুবহানাল্লাহ! আফগানিস্তান, পাকিস্তান, আফ্রিকা, কোরিয়া-সহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে খাদ্য প্রস্তুত হয়ে আসে, যাতে তা আমরা খেতে পারি।
আপনার বাবা আজ বাসায় খাবার নিয়ে আসবেন। আপনি জানেন না, রুটি কোথা থেকে আসবে। তবুও যা আপনার জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে, তা আপনি পাবেনই, যদি তা ভিন্ন দেশ থেকে আসে তবু। আপনার জন্য নির্ধারিত অংশ আপনি পাবেন। কেউ তা আটকাতে পারবে না। কারণ তা তাকদীরে লেখা আছে। আমাদের জন্য আল্লাহ যা নির্ধারিত করে রেখেছেন, তা আমরা পাব। আমরা যা পানি পান করি, খাদ্য গ্রহণ করি কিংবা যেখানে যাই-তা সবকিছু আল্লাহ লিখে রেখেছেন। এভাবে আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন বলেই তা এরকম হয়।
বেশি বেশি দুআ করুন। ইমাম আহমাদ আর রুটিওয়ালার গল্প থেকে আমরা দুআর শক্তি বুঝতে পারি।
একদা ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল এ শামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন। রাত্রিযাপনের জন্যে তিনি একটি মাসজিদে প্রবেশ করলেন। মাসজিদের পাহারাদার বলল, অনেক রাত হয়ে গেছে, এখন মাসজিদ ছাড়তে হবে। মাসজিদ বন্ধ করার সময় হয়ে গিয়েছিল। ইমাম আহমাদ পাহারাদারকে জানালেন যে, তাঁর আর রাত কাটানোর জায়গা নেই, তবুও পাহারাদার তাঁকে উঠে যাবার জন্য জোর করছিল।
চিন্তা করুন। ইমাম আহমাদ ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম! তিনি যদি চাইতেন, তো নিজের পরিচয় দিতে পারতেন। তিনি যা চাইতেন, তা-ই পেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না, রাহিমাহুল্লাহ। তিনি তার জিনিসিপত্র নিয়ে বেরিয়ে এসে মাসজিদের সিঁড়িতে শুয়ে পড়লেন। পাহারাদার বাইরে বেরিয়ে ইমাম আহমাদ-কে সিঁড়ি থেকে উঠে যেতে বলল। অতঃপর পাহারাদার ইমাম আহমাদ-এর পা ধরে টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে রাস্তার মাঝখানে ফেলে রেখে চলে গেল।
রাস্তার পাশেই এক ধার্মিক রুটিওয়ালার দোকান ছিল। সে ইমাম আহমাদ-কে দেখে নিজের সাথে রাতে থেকে যেতে বলল। সে রাতভর রুটি বানায় তাই ইমাম আহমাদ তার স্থানে ঘুমোতে পারবেন।
রাতে ইমাম আহমাদ একটি অভাবনীয় দৃশ্য দেখলেন। রুটিওয়ালা রাতভর কাজ করছিল। সে ময়দা গোলে রুটির খামির বানাচ্ছিল আবার কখনও-বা রুটি সেঁকছিল। কিন্তু এসব কাজের মধ্যেও সে রাতভর আল্লাহর যিকর করে যাচ্ছিল, তাসবিহ জপছিল। ইমাম আহমাদ তা দেখে বিস্মিত হলেন।
এই লোকটি রাতভর আল্লাহর যিকর করছিল। অথচ, আজকাল মানুষ কত তাড়াতাড়ি যিকর করে ক্লান্ত হয়ে যায়। ইমাম আহমাদ রুটিওয়ালার কাছে জানতে চাইলেন যে, কদিন ধরে সে এই আমল করে যাচ্ছে। রুটিওয়ালা জবাব দিলো যে, সে জীবনভর এই আমল করে আসছে।
ইমাম আহমাদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই আমলের কোনো ফল সে পেয়েছে কি না। লোকটি তখন যে জবাব দিলো, তা শুনে ইমাম আহমাদ হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। রুটিওয়ালা জবাব দিলো, "আমি আল্লাহর কাছে কোনো দুআ করেছি আর আল্লাহ তা কবুল করেননি, এমন কখনও হয়নি, শুধুমাত্র একটি দুআ বাদে।” ইমাম আহমাদ তখন জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কোন দুআটি কবুল হয়নি?"
রুটিওয়ালা জবাব দিলো যে, সে আল্লাহর কাছে দুআ করত যেন ইমাম আহমাদের সাথে তার দেখা হয়। কিন্তু সেই দুআটি এখনও কবুল হয়নি।
এ কথা শুনে ইমাম আহমাদ কেঁদে ফেললেন। তিনি রুটিওয়ালাকে বললেন, “সুবহানাল্লাহ! তিনিই তো হচ্ছেন আল্লাহ... তিনি আমাকে টেনে-হিঁচড়ে তোমার দোকানে এনে ফেলেছেন, যেন আল্লাহ আমাকে দিয়ে তোমার দুআ কবুল করাতে পারেন।"
দেখতেই পারছেন আল্লাহর যিকর-করার ফযীলত!
দুআ ওপরের দিকে উঠতে থাকে, বিপদ নিচের দিকে নামতে থাকে এবং মাঝপথে তারা একে অন্যের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এ লড়াইয়ে বিজয় নির্ভর করে কে বেশি শক্তিশালী তার ওপর। ইখলাস ও কবুলিয়াতের আশা নিয়ে করা দুআ বিপদের ওপর প্রবল হয়, বিজয় লাভ করে এবং তখন বিপদ আর সংঘটিত হতে পারে না।
পক্ষান্তরে অমনোযোগের সাথে, হতাশা নিয়ে করা দুআ থেকে বিপদ শক্তিশালী হয়। তখন বিপদ দুআকে পরাজিত করে নিচে নেমে আসে।
কখনও কখনও তারা সমানে সমান হয় আর কিয়ামাত পর্যন্ত একে অন্যের সাথে লড়তে থাকে। সুতরাং,
• দুআ শক্তিশালী হলে তা বিপদকে পরাজিত করবে এবং আটকে দেবে。
• বিপদ দুআ থেকে শক্তিশালী হলে তা দুআর ওপর বিজয়ী হবে এবং নিচে নেমে আসবে。
• যদি তারা সমানে সমান হয়, তবে তারা কিয়ামাতের আগ পর্যন্ত পরস্পর লড়াই করতে থাকবে।
তাই আমাদের সব সময় দুআ করা উচিত, যাতে দুআ শক্তিশালী হয়ে যায়। আল্লাহ আপনার দুআ কবুল করবেনই এমন দৃঢ় সংকল্পের সাথে দুআ করুন এবং ফলাফলের ব্যাপারে উত্তম প্রত্যাশা রাখুন। আল্লাহ তাঁর নিজের ব্যাপারে বলেন, যে এই ধারণা রাখে যে আমি ক্ষমাশীল, তাকে আমি অবশ্যই ক্ষমা করে দেবো। আমার বান্দা আমার ব্যাপারে যেমন ধারণা রাখে, আমি তেমনই। অন্যভাবে বললে, আল্লাহর কাছে আপনি যা চান তা তাঁর কাছে থেকেই চেয়ে নিন দুআর মাধ্যমে।
উমার বলেন, “আল্লাহ আমার দুআর কী জবাব দেবেন সে ব্যাপারে আমি চিন্তিত নই। আমি তো চিন্তিত থাকি কীভাবে আমি আমার দুআকে সাজাতে এবং আল্লাহর কাছে চাইতে পারি। কারণ আমি যখন দুআ করব, আল্লাহ তো উত্তর দেবেনই।” উমার নিঃসংশয় ছিলেন যে তাঁর দুআ কবুল হবেই, রাদিয়াল্লাহু আনহু।
টিকাঃ
[১] এভাবে শিক্ষা লাভ করার জন্যে ইসরাইলিয়াত থেকে ঘটনা নেওয়া যায়, যদি তা ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে অসামাঞ্জাস্যপূর্ণ না হয়ে থাকে। - অনুবাদক
[১] সূরা হাদীদ, ৫৭: ২২,২৩