📘 বিপদ যখন নিয়ামাত > 📄 শুধু আল্লাহর কাছেই চাওয়া

📄 শুধু আল্লাহর কাছেই চাওয়া


কতই-না দুর্ভাগা সেসব লোক, যারা বিপদের সময় সাহায্যের আশায় কবরে আর মাজারে গিয়ে ভীড় জমায়!

হতভাগারা নিজেদের বিপদ দূর করার আকুতি জানায় নবিদের নিকট আর মৃত মানুষদের নিকট! তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ *

“ তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে যে কিয়ামাত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তারা তো তাদের (ভক্তদের) ডাক সম্পর্কে পুরোপুরি বেখবর।”[১]

তাদের কাজের অসারতা প্রমাণ করতে এই হাদীসটিই যথেষ্ট :

عَنْ مُصْعَبِ بْنِ سَعْدٍ, عَنْ أَبِيهِ قَالَ : قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ : أَيُّ النَّاسِ أَشَدُّ بَلَاءٌ ؟ قَالَ : « الأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُونَ ثُمَّ الأَمْثَلُ فَالأَمْثَلُ مِنَ النَّاسِ « ، قَالَ : « يُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبِ دِينِهِ فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلابَةٌ زِيدَ فِي بَلَابِهِ, وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةُ خُفِّفَ عَنْهُ, فَلا يَزَالُ الْبَلاءُ بِالْعَبْدِ حَتَّى يَمْشِيَ عَلَى الْأَرْضِ وَمَا لَهُ خَطِيئَةٌ "

' নবিগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন, অতঃপর তাঁদের নিকটবর্তীরা, এরপর এদের নিকটবর্তীরা। মানুষকে তার ঈমান অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি তার ঈমান শক্তিশালী হয়, তা হলে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়। আর যদি তার ঈমান দুর্বল হয়, তা হলে তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে হালকা হয়। বিপদ বান্দার পিছু ছাড়ে না, পরিশেষে তার অবস্থা এমন হয় যে, সে পাপমুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা করে।[১]

এ হাদীসটি তাওহীদের প্রমাণও বহন করে। নবিগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন। তারপর তাঁদের নিকটতম স্তরের মুমিনগণ পরীক্ষিত হন। একজন সাধারণ মুসলিমের থেকে নবিগণ ও তাঁদের নিকটবর্তীগণ অনেক বেশি পরীক্ষিত হন ও কষ্ট পান। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাঁদেরকে উদ্ধার করতে পারে না। যখন কোনো সাধারণ মুসলিম এ বিষয়টি জানে, তখন সে বুঝতে পারে যে, যারা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া নিজেদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন না, তারা কীভাবে অপরের বিপদ হটাবেন?

কাজেই এটি তো প্রমাণিত যে, নবিগণ আর নেককারদের নিকট বিপদ থেকে মুক্তি পাবার জন্য দুআ করা বৃথা ও নিরর্থক। বরং আমাদের দুআ করা উচিত সেই মহান সত্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকটে, যিনি আমাদের বিপদ অপসারণ করতে সক্ষম।

নবি আইয়ূব -এর ঘটনা আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাঁকে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা, প্রিয় সন্তানাদির মৃত্যু দ্বারা আর সুস্বাস্থ্য ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন।

আইয়ূব -এর প্রচুর পরিমাণ গবাদিপশু ও শস্যাদি ছিল, ছিল সন্তানসন্ততি আর সুন্দর বাসগৃহ। এসব কিছুই তিনি হারালেন। অতঃপর তাঁকে শারীরিক অসুস্থতা দ্বারা পরীক্ষা করা হলো। মানুষজন তাঁকে পরিত্যাগ করল। তিনি শহরের একপ্রান্তে একাকী থাকতে বাধ্য হলেন। শুধুমাত্র তাঁর স্ত্রী রয়ে গিয়েছিলেন দেখভাল করার জন্য। এমন অবস্থায়ও আইয়ূব সবরের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এত কষ্টের পরও আল্লাহর ওপর তাঁর ভরসার কোনো কমতি হয়নি।

তারপর তিনি একাকী আল্লাহর কাছেই সুহায্যের জন্য দুআ চাইলেন। আল্লাহ বলেন,

وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ )

“ এবং স্মরণ করুন আইয়ূব-এর কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন: আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।".[১]

অতঃপর আল্লাহ সে আহ্বানে সাড়া দিলেন। আল্লাহ বলেন,

فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرِّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ )

“ অতঃপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম এবং তার পরিবারবর্গ ফিরিয়ে দিলাম, আর তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশত আর এটা আমার বান্দাদের জন্য উপদেশস্বরূপ।”[২]

কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, মৃতরা কখনোই জীবিতদের সাহায্য করতে পারবে না। অতএব, যারা পূর্ববর্তী নেককার মৃত লোকদেরকে নিজেদের বিপদ দূরীভূত করার জন্য ডাকবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধিকন্তু, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা শিরক। শিরক হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার পাপ, সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ। শিরক এজন্য হবে যে, দুআ একধরনের ইবাদাত আর ইবাদাত একমাত্র আল্লাহরই হক। [৩]

আল্লাহ বলেন,

وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ *

“ তোমাদের পালনকর্তা বলেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। যারা আমার ইবাদাতে অহংকার করে তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"[১]

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
الدعاء هو العبادة
“দুআ হচ্ছে ইবাদাত।”[২]

আল্লাহর বান্দারা যদি আল্লাহর হক আদায় করে আর শুধু আল্লাহরই ইবাদাত করে, তবে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। এটি আল্লাহর ওয়াদা।

মুআজ বিন জাবাল থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “হে মুআজ! তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক কী?” আমি (মুআজ) বললাম, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল ﷺ বললেন,
فإنَّ حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يُشركوا به شيئًا

(বান্দার ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে) শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা। তাঁর (আল্লাহর) সাথে কাউকে শরীক না করা।'

তারপর রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি জানো, আল্লাহর ওপর বান্দাদের হক কী?” আমি (মুআজ) বললাম, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল ﷺ জবাব দিলেন,
وحق العباد على الله أن لا يُعذِّب من لا يُشرك به شيئًا

' (আল্লাহর নিকট বান্দার হক হচ্ছে) তিনি তাঁদেরকে শাস্তি দেবেন না (যদি তারা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করে)।”[৩]

ইবনু আব্বাস -কে নাসীহা প্রদানকালে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন,
يَا غُلَامُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ وَلَوِ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ

'আল্লাহর আদেশ মেনে চলো, তা হলে আল্লাহ তোমাকে পথ দেখাবেন। তুমি আল্লাহকে মেনে চলো, তা হলে আল্লাহকে সাথে পাবে। যখন তুমি দুআ করবে, একমাত্র আল্লাহকেই ডাকবে। যখন তুমি সাহায্য চাইবে, শুধুমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে। জেনে রেখো, যদি সমগ্র (মানব ও জিন) জাতি তোমার উপকার করতে একত্র হয়ে যায়, তারপরেও তারা—আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন—তার বাইরে তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না। আর তারা যদি সকলে তোমার ক্ষতি করার জন্য জড়ো হয়, তবুও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে তারা কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর কাগজ শুকিয়ে গেছে।'[১]

আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “গুনাহের সাথে সম্পর্ক নেই কিংবা রক্ত-সম্পর্ক ছিন্নকরণের সাথে জড়িত নয় এমন দুআ যদি কোনো মুসলমান করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তিনটি জিনিসের একটি দান করবেন : আল্লাহ হয়তো শীঘ্রই তার দুআয় সাড়া দেবেন অথবা বিচার দিবসে প্রতিদান দেওয়ার জন্য তা জমা রাখবেন অথবা এই দুআর সমপরিমাণ ক্ষতি থেকে তাকে রক্ষা করবেন।”

সাহাবিগণ তখন প্রশ্ন করলেন, “আমরা যদি একাধিক দুআ করি, তখন কী হবে?” রাসূল জবাব দিলেন, “আল্লাহ আরও বেশি দুআ কবুলকারী।”[২]

আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর কোনো সাবধানতা অবলম্বনের দ্বারাই বদলে যায় না। আল্লাহ যা নির্ধারিত করে রেখেছেন আর যা রাখেননি, উভয় অবস্থাতেই দুআ কল্যাণকর। আল্লাহ তাকদীরে যে বিপদ লিখে রেখেছেন, দুআ কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তার মুখোমুখি হয়ে কুস্তি লড়তে থাকে।”[৩]

আল্লাহ বলেন,

وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

“আর আল্লাহ যদি তোমার ওপর কোন কষ্ট আরোপ করেন, তা হলে তিনি ছাড়া কেউ নেই তা খণ্ডাবার মতো। পক্ষান্তরে যদি তিনি কোনো কল্যাণ দান করেন, তবে তাঁর মেহেরবানিকে রহিত করার মতোও কেউ নেই। তিনি যার প্রতি অনুগ্রহ দান করতে চান স্বীয় বান্দাদের মধ্যে তাকেই দান করেন; বস্তুত তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু।”১।

টিকাঃ
[১] সূরা আহকাফ, ৪৬:৫
[১] তিরমিযি, আস সুনান, হাদীস: ১৪৩
[১] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩
[২] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৪
[৩] 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা' বলতে বোঝানো হয়েছে যেসব ব্যাপার কেবল আল্লাহর কাছেই চাওয়া যায় সেগুলোর জন্য মানুষের দ্বারস্থ হওয়া। যেমন সম্পদ বৃদ্ধি, সন্তানলাভ ইত্যাদি। এগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে কামনা করা শিরক। কিন্তু সাধারণ সমস্যায় মানুষের সাহায্য চাইতে দোষ নেই, যেমন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য যাওয়া। তবে এসবক্ষেত্রেও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহই পারেন সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে, তাঁর হুকুম না হলে কোনো সাহায্যকারীর সাহায্য কাজে আসবে না। এবং তাঁর কাছেই ক্রমাগত সাহায্য চাইতে থাকতে হবে। - সম্পাদক
[১] সূরা মু'মিন, ২৩:৬০
[২] আবূ দাউদ, আস সুনান: ১৪৭৪
[৩] ইজমা অনুসারে
[১] তিরমিযি, আস সুনান: ২৫১৮
[২] আহমাদ, আল মুসনাদ
[৩] আলবানি, সহীহ আল জামি: ৭৭৩৯
[১] সূরা ইউনূস, ১০: ১০৭

কতই-না দুর্ভাগা সেসব লোক, যারা বিপদের সময় সাহায্যের আশায় কবরে আর মাজারে গিয়ে ভীড় জমায়!

হতভাগারা নিজেদের বিপদ দূর করার আকুতি জানায় নবিদের নিকট আর মৃত মানুষদের নিকট! তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ *

“ তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে যে কিয়ামাত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তারা তো তাদের (ভক্তদের) ডাক সম্পর্কে পুরোপুরি বেখবর।”[১]

তাদের কাজের অসারতা প্রমাণ করতে এই হাদীসটিই যথেষ্ট :

عَنْ مُصْعَبِ بْنِ سَعْدٍ, عَنْ أَبِيهِ قَالَ : قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ : أَيُّ النَّاسِ أَشَدُّ بَلَاءٌ ؟ قَالَ : « الأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُونَ ثُمَّ الأَمْثَلُ فَالأَمْثَلُ مِنَ النَّاسِ « ، قَالَ : « يُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبِ دِينِهِ فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلابَةٌ زِيدَ فِي بَلَابِهِ, وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةُ خُفِّفَ عَنْهُ, فَلا يَزَالُ الْبَلاءُ بِالْعَبْدِ حَتَّى يَمْشِيَ عَلَى الْأَرْضِ وَمَا لَهُ خَطِيئَةٌ "

' নবিগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন, অতঃপর তাঁদের নিকটবর্তীরা, এরপর এদের নিকটবর্তীরা। মানুষকে তার ঈমান অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি তার ঈমান শক্তিশালী হয়, তা হলে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়। আর যদি তার ঈমান দুর্বল হয়, তা হলে তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে হালকা হয়। বিপদ বান্দার পিছু ছাড়ে না, পরিশেষে তার অবস্থা এমন হয় যে, সে পাপমুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা করে।[১]

এ হাদীসটি তাওহীদের প্রমাণও বহন করে। নবিগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন। তারপর তাঁদের নিকটতম স্তরের মুমিনগণ পরীক্ষিত হন। একজন সাধারণ মুসলিমের থেকে নবিগণ ও তাঁদের নিকটবর্তীগণ অনেক বেশি পরীক্ষিত হন ও কষ্ট পান। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাঁদেরকে উদ্ধার করতে পারে না। যখন কোনো সাধারণ মুসলিম এ বিষয়টি জানে, তখন সে বুঝতে পারে যে, যারা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া নিজেদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন না, তারা কীভাবে অপরের বিপদ হটাবেন?

কাজেই এটি তো প্রমাণিত যে, নবিগণ আর নেককারদের নিকট বিপদ থেকে মুক্তি পাবার জন্য দুআ করা বৃথা ও নিরর্থক। বরং আমাদের দুআ করা উচিত সেই মহান সত্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকটে, যিনি আমাদের বিপদ অপসারণ করতে সক্ষম।

নবি আইয়ূব -এর ঘটনা আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাঁকে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা, প্রিয় সন্তানাদির মৃত্যু দ্বারা আর সুস্বাস্থ্য ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন।

আইয়ূব -এর প্রচুর পরিমাণ গবাদিপশু ও শস্যাদি ছিল, ছিল সন্তানসন্ততি আর সুন্দর বাসগৃহ। এসব কিছুই তিনি হারালেন। অতঃপর তাঁকে শারীরিক অসুস্থতা দ্বারা পরীক্ষা করা হলো। মানুষজন তাঁকে পরিত্যাগ করল। তিনি শহরের একপ্রান্তে একাকী থাকতে বাধ্য হলেন। শুধুমাত্র তাঁর স্ত্রী রয়ে গিয়েছিলেন দেখভাল করার জন্য। এমন অবস্থায়ও আইয়ূব সবরের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এত কষ্টের পরও আল্লাহর ওপর তাঁর ভরসার কোনো কমতি হয়নি।

তারপর তিনি একাকী আল্লাহর কাছেই সুহায্যের জন্য দুআ চাইলেন। আল্লাহ বলেন,

وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ )

“ এবং স্মরণ করুন আইয়ূব-এর কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন: আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।".[১]

অতঃপর আল্লাহ সে আহ্বানে সাড়া দিলেন। আল্লাহ বলেন,

فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرِّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ )

“ অতঃপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম এবং তার পরিবারবর্গ ফিরিয়ে দিলাম, আর তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশত আর এটা আমার বান্দাদের জন্য উপদেশস্বরূপ।”[২]

কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, মৃতরা কখনোই জীবিতদের সাহায্য করতে পারবে না। অতএব, যারা পূর্ববর্তী নেককার মৃত লোকদেরকে নিজেদের বিপদ দূরীভূত করার জন্য ডাকবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধিকন্তু, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা শিরক। শিরক হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার পাপ, সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ। শিরক এজন্য হবে যে, দুআ একধরনের ইবাদাত আর ইবাদাত একমাত্র আল্লাহরই হক। [৩]

আল্লাহ বলেন,

وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ *

“ তোমাদের পালনকর্তা বলেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। যারা আমার ইবাদাতে অহংকার করে তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"[১]

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
الدعاء هو العبادة
“দুআ হচ্ছে ইবাদাত।”[২]

আল্লাহর বান্দারা যদি আল্লাহর হক আদায় করে আর শুধু আল্লাহরই ইবাদাত করে, তবে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। এটি আল্লাহর ওয়াদা।

মুআজ বিন জাবাল থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “হে মুআজ! তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক কী?” আমি (মুআজ) বললাম, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল ﷺ বললেন,
فإنَّ حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يُشركوا به شيئًا

(বান্দার ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে) শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা। তাঁর (আল্লাহর) সাথে কাউকে শরীক না করা।'

তারপর রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি জানো, আল্লাহর ওপর বান্দাদের হক কী?” আমি (মুআজ) বললাম, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল ﷺ জবাব দিলেন,
وحق العباد على الله أن لا يُعذِّب من لا يُشرك به شيئًا

' (আল্লাহর নিকট বান্দার হক হচ্ছে) তিনি তাঁদেরকে শাস্তি দেবেন না (যদি তারা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করে)।”[৩]

ইবনু আব্বাস -কে নাসীহা প্রদানকালে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন,
يَا غُلَامُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ وَلَوِ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ

'আল্লাহর আদেশ মেনে চলো, তা হলে আল্লাহ তোমাকে পথ দেখাবেন। তুমি আল্লাহকে মেনে চলো, তা হলে আল্লাহকে সাথে পাবে। যখন তুমি দুআ করবে, একমাত্র আল্লাহকেই ডাকবে। যখন তুমি সাহায্য চাইবে, শুধুমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে। জেনে রেখো, যদি সমগ্র (মানব ও জিন) জাতি তোমার উপকার করতে একত্র হয়ে যায়, তারপরেও তারা—আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন—তার বাইরে তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না। আর তারা যদি সকলে তোমার ক্ষতি করার জন্য জড়ো হয়, তবুও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে তারা কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর কাগজ শুকিয়ে গেছে।'[১]

আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “গুনাহের সাথে সম্পর্ক নেই কিংবা রক্ত-সম্পর্ক ছিন্নকরণের সাথে জড়িত নয় এমন দুআ যদি কোনো মুসলমান করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তিনটি জিনিসের একটি দান করবেন : আল্লাহ হয়তো শীঘ্রই তার দুআয় সাড়া দেবেন অথবা বিচার দিবসে প্রতিদান দেওয়ার জন্য তা জমা রাখবেন অথবা এই দুআর সমপরিমাণ ক্ষতি থেকে তাকে রক্ষা করবেন।”

সাহাবিগণ তখন প্রশ্ন করলেন, “আমরা যদি একাধিক দুআ করি, তখন কী হবে?” রাসূল জবাব দিলেন, “আল্লাহ আরও বেশি দুআ কবুলকারী।”[২]

আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর কোনো সাবধানতা অবলম্বনের দ্বারাই বদলে যায় না। আল্লাহ যা নির্ধারিত করে রেখেছেন আর যা রাখেননি, উভয় অবস্থাতেই দুআ কল্যাণকর। আল্লাহ তাকদীরে যে বিপদ লিখে রেখেছেন, দুআ কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তার মুখোমুখি হয়ে কুস্তি লড়তে থাকে।”[৩]

আল্লাহ বলেন,

وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

“আর আল্লাহ যদি তোমার ওপর কোন কষ্ট আরোপ করেন, তা হলে তিনি ছাড়া কেউ নেই তা খণ্ডাবার মতো। পক্ষান্তরে যদি তিনি কোনো কল্যাণ দান করেন, তবে তাঁর মেহেরবানিকে রহিত করার মতোও কেউ নেই। তিনি যার প্রতি অনুগ্রহ দান করতে চান স্বীয় বান্দাদের মধ্যে তাকেই দান করেন; বস্তুত তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু।”১।

টিকাঃ
[১] সূরা আহকাফ, ৪৬:৫
[১] তিরমিযি, আস সুনান, হাদীস: ১৪৩
[১] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩
[২] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৪
[৩] 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা' বলতে বোঝানো হয়েছে যেসব ব্যাপার কেবল আল্লাহর কাছেই চাওয়া যায় সেগুলোর জন্য মানুষের দ্বারস্থ হওয়া। যেমন সম্পদ বৃদ্ধি, সন্তানলাভ ইত্যাদি। এগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে কামনা করা শিরক। কিন্তু সাধারণ সমস্যায় মানুষের সাহায্য চাইতে দোষ নেই, যেমন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য যাওয়া। তবে এসবক্ষেত্রেও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহই পারেন সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে, তাঁর হুকুম না হলে কোনো সাহায্যকারীর সাহায্য কাজে আসবে না। এবং তাঁর কাছেই ক্রমাগত সাহায্য চাইতে থাকতে হবে। - সম্পাদক
[১] সূরা মু'মিন, ২৩:৬০
[২] আবূ দাউদ, আস সুনান: ১৪৭৪
[৩] ইজমা অনুসারে
[১] তিরমিযি, আস সুনান: ২৫১৮
[২] আহমাদ, আল মুসনাদ
[৩] আলবানি, সহীহ আল জামি: ৭৭৩৯
[১] সূরা ইউনূস, ১০: ১০৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00