📄 বিপদ কামনা করা অনুচিত
দুনিয়াবি বিপদ-আপদের নানা উপকারিতা, পুরস্কার এবং এর বিনিময়ে পরকালের শাস্তি মাফের মহা-সুযোগ দেখে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, দুনিয়াবি বিপদ ভোগ-করা এবং আল্লাহ যাতে বিপদে ফেলেন এমন প্রার্থনা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু মুসলিমদেরকে বিপদ চেয়ে দুআ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ :
প্রথমত, বিপদসংকুল অবস্থায় যে-কোনো ব্যক্তি অকৃতজ্ঞ হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাত অস্বীকার করতে পারে, হয়ে যেতে পারে অবিশ্বাসী। আর তা ছাড়া নিজের গুনাহের সম্পূর্ণ ভার এই দুনিয়াবি জীবনে বহন করা আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভবপর হবে না।
দ্বিতীয়ত, ইসলামের বিশেষত্বই হচ্ছে ইসলাম সহজ এবং ক্ষমার ধর্ম। নিজের বিপদ চেয়ে প্রার্থনা করা তাই ইসলামের এই বিশেষত্বের সাথেই সাংঘর্ষিক। আমাদেরকে তো এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছে যে, আমরা যেন নিজেদের কল্যাণ এবং গুনাহ মাফের জন্য দুআ করি। মহিমান্বিত আল্লাহ কুরআনে আমাদের এই দুআটি শিখিয়ে দিয়েছেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে “ আমাদেরকে অপরাধী কোরো না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের ওপর এমন দায়িত্ব অর্পণ কোরো না-যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর অর্পণ করেছ। হে আমাদের প্রভু! এবং আমাদের ওপর ওই বোঝা চাপিয়ে দিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন করো। আমাদেরকে ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের (একমাত্র আশ্রয়দাতা) বন্ধু। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কে সাহায্য করো."[১]
তাই মুসলিমদের উচিত আল্লাহর দয়া গ্রহণ করা এবং আল্লাহর কাছে নিজের কৃত গুনাহের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। বিপদ চাওয়া কখনোই উচিত নয়। আনাস বর্ণনা করেন যে, “রাসূলুল্লাহ একবার এক মুসলিমকে দেখতে গেলেন, সে এতই দুর্বল ছিল যে মুরগির বাচ্চার মতো (চিকন) হয়ে গিয়েছিল। রাসূল তখন তাকে প্রশ্ন করলেন, "তুমি কি আল্লাহর কাছে কোনো বিশেষ দুআ করেছ অথবা বিশেষ কিছু চেয়েছ (যার ফলে তুমি এমন হয়ে গেলে)?"
সে জবাব দিল, “হ্যাঁ, আমি দুআ করেছি যে, হে আল্লাহ! তুমি পরকালে আমার জন্য যেসব শাস্তি রেখেছ, তা আমাকে এই দুনিয়াতেই দিয়ে দাও।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, “সুবহানাল্লাহ! তুমি তো তা সহ্য করতে পারবে না। বরঞ্চ তোমার এ কথা বলা উচিত ছিল :
وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةٌ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও “কল্যাণ দান করো এবং আমাদিগকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।”[২]
তারপর তিনি আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির সুস্থতার জন্য দুআ করলেন আর আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দিলেন।”[৩]
টিকাঃ
[১] সূরা আল বাকারা, ০২: ২৮৬
[২] সূরা বাকারাহ, ০২: ২০১
[৩] মুসলিম, আস সহীহ
দুনিয়াবি বিপদ-আপদের নানা উপকারিতা, পুরস্কার এবং এর বিনিময়ে পরকালের শাস্তি মাফের মহা-সুযোগ দেখে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, দুনিয়াবি বিপদ ভোগ-করা এবং আল্লাহ যাতে বিপদে ফেলেন এমন প্রার্থনা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু মুসলিমদেরকে বিপদ চেয়ে দুআ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ :
প্রথমত, বিপদসংকুল অবস্থায় যে-কোনো ব্যক্তি অকৃতজ্ঞ হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাত অস্বীকার করতে পারে, হয়ে যেতে পারে অবিশ্বাসী। আর তা ছাড়া নিজের গুনাহের সম্পূর্ণ ভার এই দুনিয়াবি জীবনে বহন করা আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভবপর হবে না।
দ্বিতীয়ত, ইসলামের বিশেষত্বই হচ্ছে ইসলাম সহজ এবং ক্ষমার ধর্ম। নিজের বিপদ চেয়ে প্রার্থনা করা তাই ইসলামের এই বিশেষত্বের সাথেই সাংঘর্ষিক। আমাদেরকে তো এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছে যে, আমরা যেন নিজেদের কল্যাণ এবং গুনাহ মাফের জন্য দুআ করি। মহিমান্বিত আল্লাহ কুরআনে আমাদের এই দুআটি শিখিয়ে দিয়েছেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে “ আমাদেরকে অপরাধী কোরো না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের ওপর এমন দায়িত্ব অর্পণ কোরো না-যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর অর্পণ করেছ। হে আমাদের প্রভু! এবং আমাদের ওপর ওই বোঝা চাপিয়ে দিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন করো। আমাদেরকে ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের (একমাত্র আশ্রয়দাতা) বন্ধু। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কে সাহায্য করো."[১]
তাই মুসলিমদের উচিত আল্লাহর দয়া গ্রহণ করা এবং আল্লাহর কাছে নিজের কৃত গুনাহের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। বিপদ চাওয়া কখনোই উচিত নয়। আনাস বর্ণনা করেন যে, “রাসূলুল্লাহ একবার এক মুসলিমকে দেখতে গেলেন, সে এতই দুর্বল ছিল যে মুরগির বাচ্চার মতো (চিকন) হয়ে গিয়েছিল। রাসূল তখন তাকে প্রশ্ন করলেন, "তুমি কি আল্লাহর কাছে কোনো বিশেষ দুআ করেছ অথবা বিশেষ কিছু চেয়েছ (যার ফলে তুমি এমন হয়ে গেলে)?"
সে জবাব দিল, “হ্যাঁ, আমি দুআ করেছি যে, হে আল্লাহ! তুমি পরকালে আমার জন্য যেসব শাস্তি রেখেছ, তা আমাকে এই দুনিয়াতেই দিয়ে দাও।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, “সুবহানাল্লাহ! তুমি তো তা সহ্য করতে পারবে না। বরঞ্চ তোমার এ কথা বলা উচিত ছিল :
وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةٌ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও “কল্যাণ দান করো এবং আমাদিগকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।”[২]
তারপর তিনি আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির সুস্থতার জন্য দুআ করলেন আর আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দিলেন।”[৩]
টিকাঃ
[১] সূরা আল বাকারা, ০২: ২৮৬
[২] সূরা বাকারাহ, ০২: ২০১
[৩] মুসলিম, আস সহীহ
📄 বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়
বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি, রহমত ও নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কিছু উপায় নিয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
• সবর : আরবি শব্দ 'সবর' এর মূল শব্দের অনুবাদ করলে তা বোঝায়, 'কোনো কিছুকে আটকে রাখা কিংবা কোনো কিছু হতে বিরত থাকা অথবা নিবৃত্ত থাকা।' ইসলামি পরিভাষায় 'সবর' এর অর্থ হচ্ছে, 'হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকা, অভিযোগ করা থেকে জিহ্বাকে নিবৃত্ত রাখা এবং দুঃখ-দুর্দশার সময় মুখে আঘাত করা কিংবা শরীরের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা থেকে নিজের হাতকে সংযত রাখা।[১]
সবরের বিশেষ গুণ যাদের আছে তারাই সৌভাগ্যবান। রাসূলুল্লাহ বলেন,
مَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنْ الصَّبْرِ
' সবরের চাইতে উত্তম ও প্রশস্ত আর কোনো জিনিস কাউকে দেওয়া হয়নি।[২]
মহিমান্বিত আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, যারা সবর করে তাদেরকে অজস্র সওয়াব দান করা হবে। তাদের প্রতিদান এত বেশি পরিমাণ হবে যে, তা না মাপা যাবে আর না গণনা করা যাবে। আল্লাহ বলেন,
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
“ নিশ্চয় সবরকারীদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে পরিপূর্ণরূপে এবং (তা হবে) অগণিত।”[১]
উত্তমরূপে সবর এনে দেবে প্রতিশ্রুত প্রতিদান, যার ওয়াদা আল্লাহ করেছেন। আর তা অর্জন করতে হলে বিপদের শুরু থেকে সবরের অনুশীলন করতে হবে। যখন সর্বপ্রথম বিপদের ব্যাপারটি আপনি আঁচ করতে পারবেন, ঠিক তখন থেকেই সবরের অনুশীলন করতে হবে। বস্তুত, অন্তর তো দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়, কিন্তু তবুও আল্লাহর বান্দারা হতাশায় মুষড়ে পড়ে না। তারা সবর করে। আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে।
যখন বিপদ আসে তখন মানুষ বিচলিত হয়। একটা সময় পর যখন কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়, তখন সে সবর করে। কিন্তু এটি প্রকৃত সবর নয়। প্রকৃত সবর তো করতে হবে তখন, ঠিক যে মুহূর্তে আপনার ওপর বিপর্যয় আসবে। রাসূলুল্লাহ বলেন,
الصبر عند الصدمة الأولى
' নিশ্চয় সবর তো (করতে হবে) প্রথম আঘাতেই।[২]
বাস্তবতা হচ্ছে প্রত্যেককেই সবর করতে হয়। ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক কিংবা অনিচ্ছায়, একসময় সবাইকেই সবর করতে হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি তো সে-ই, যে প্রথম থেকেই স্বেচ্ছায় সবর করে, সবরের মহান উপকারিতাগুলো বোঝে সবর করে। সে জানে তার সবরের বিনিময়ে সে পুরস্কৃত হবে। আর যদি পেরেশান হয়ে পড়ে তবে সে নিন্দিত হবে। সে জানে, যে সুযোগ তার হাতছাড়া হয়ে গেছে তা আর ফিরে আসবে না। সে জানে, সে আল্লাহর ফায়সালা বদলে ফেলতে পারবে না।
বোকা তো সেই ব্যক্তি যে অভিযোগ করে, যন্ত্রণা ভোগ করে। আর যখন তার কোনো উপায় থাকে না, তখন সে সবর করে। তার এই সবরে তো কোনো উপকারই নেই।
• ইহতিসাব: প্রত্যেক দুঃখ-দুর্দশার সময় আল্লাহর নিকট হতে সওয়াবের প্রত্যাশা করাকে ইহতিসাব বলে। যত বেশি কষ্ট-যাতনা হোক না কেন, আল্লাহর নিকট হতে এর বিনিময়ে ক্ষমা ও মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে ইহতিসাব।
রাসূলূল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার মুমিন বান্দার নিকট থেকে যখন তার অতি প্রিয়জনের জান কবজ করা হয়, আর সে আল্লাহর নিকট সওয়াবের আশায় ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহর নিকট তার একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত। "[১]
আসুন আমরা ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়ার কথা স্মরণ করি। আসিয়ার স্বামী ছিল দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জালিম বাদশাহ ফিরআউন। এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার কারণে আসিয়ার ওপর তার স্বামী ভয়াবহ অত্যাচার করত। এত মারাত্মক জখম আর যন্ত্রণা সহ্য করার পরেও আসিয়া স্বীয় বিশ্বাসে অটল থাকতেন, অসামান্য ধৈর্য আর ইহতিসাব প্রদর্শন করতেন সর্বদা।
তিনি আল্লাহর কাছেই দুআ করলেন। তিনি আল্লাহর কাছে কী চাইলেন? তিনি চাইলেন আল্লাহ যেন জান্নাতে তাকে একটি প্রাসাদ বানিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা এ অসামান্য ঘটনা কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجْنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجْنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ *
“ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্যে ফিরআউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলল: হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।”[২]
যখন তিনি এই দুআ করলেন, তখন আকাশের দ্বারগুলো উন্মোচিত হয়ে গেল। আর আসিয়া জান্নাতে তার ঘর দেখতে পেলেন। তা দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ফিরআউন আদেশ করল, একটি বড় পাথরখণ্ড এনে তা যেন আসিয়ার ওপর ফেলে আসিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সে পাথরখণ্ড আসিয়ার ওপর নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই আসিয়ার জান কবচ করে ফেলা হলো।
ইহতিসাবের কারণে আল্লাহ আসিয়াকে দুইটি নিয়ামাত দান করলেন। তাকে জান্নাতে প্রাসাদ বানিয়ে দিলেন এবং ফিরআউনের দুষ্ট পরিকল্পনা থেকেও হিফাজত করলেন। তাইতো তার পরে কিয়ামাত দিবস পর্যন্ত যারাই আসবেন, তাদের সবার জন্য তিনি দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবেন।।১।
• ইসতিরজা ইহতিসাব : বিপদের সম্মুখীন হয়েও আল্লাহর প্রভুত্বের ঘোষণা দেওয়া ও আল্লাহর নিকট নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়াকে ইস্তিরজা বলে। ইস্তিরজা হচ্ছে বিপদসংকুল অবস্থায় 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন' বলা; অর্থাৎ 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।' আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ *
“ এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়-ক্ষুধা-মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে: নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।”[২]
উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : ( ما من مسلم تصيبه مصيبة فيقول ما أمره الله « إنا لله وإنا إليه راجعون ، اللهم أجرني في مصيبتي وأخلف لي خيراً منها « إلا أخلف الله له خيراً منها
' রাসূলুল্লাহ বলেন, “যখনই কোনো মুসলিম বিপদ দ্বারা আক্রান্ত হয় আর এ কথা বলে যে: 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার বিপদের জন্য আমাকে পুরস্কৃত করো আর তা আমার জন্য উত্তম কোনো জিনিস দিয়ে বদলে দাও'- তা হলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে পুরস্কৃত করবেন এবং তার (বিপদের) পরিবর্তে তাকে উত্তম জিনিস দান করবেন।"
উম্মু সালামা বলেন, "আর তাই যখন আমার স্বামী আবূ সালামা মারা যান, তখন আল্লাহ আমাকে এই দুআ করার তৌফিক দিলেন। আর তার (আবূ সালামা-র) পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ-কে দিলেন (অর্থাৎ পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহ-এর সাথে উম্মু সালামা-র বিয়ে হয়)।[১]
• শাকওয়াহ : শাকওয়াহ অর্থ অভিযোগ করা, নালিশ জানানো। শাকওয়াহ দুই ধরনের-
ক) প্রথম ধরনের শাকওয়াহ হলো আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখ-কষ্ট পেশ করা। এটি সবরের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের শাকওয়াহ-র অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। ইয়াকূব বলেছিলেন,
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ
“আমি তো আমার দুঃখ-বেদনা আল্লাহর নিকটেই পেশ করি।”[২]
খ) আরেক ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে মানুষের নিকট নালিশ করা। এটি হতে পারে প্রত্যক্ষভাবে কথার দ্বারা অথবা পরোক্ষভাবে আচার-আচরণ বা কাজের দ্বারা, যেমন : বিবর্ণ পোশাক পরিধান করা, মাথা মুণ্ডানো, হতাশা প্রকাশ করা ইত্যাদি কাজের দ্বারা। এ-ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে সবরের সাথে সাংঘর্ষিক। এ-ধরনের শাকওয়াহ আল্লাহর ফায়সালার ওপর অসন্তুষ্টি ও অনাস্থা প্রকাশ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমানের দৃঢ়তার অভাব প্রমাণ করে।
তবে নিজের আপনজনকে নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানানো দোষের কিছু নয়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ-এর কাছে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর শরীরে আমার হাত বুলালাম এবং বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি তো কঠিন জ্বরে আক্রান্ত।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ, তোমাদের দু-ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু আক্রান্ত হই।” আমি বললাম, “এটা এ-জন্য যে, আপনার জন্য প্রতিদানও দ্বিগুণ।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ!” তারপর রাসূলুল্লাহ বললেন,
ما من مسلم يصيبه أذى؛ مرض فما سواء، إلا حط الله له سيئاته، كما تحط الشجرة ورقها
'যে-কোনো মুসলিমের ওপর কোনো যন্ত্রণা, রোগ-ব্যাধি বা এ ধরনের অন্য কিছু আপতিত হলে, তাতে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ঝরিয়ে দেন, যেভাবে গাছ তার পাতাগুলো ঝরিয়ে ফেলে।[১]
সুতরাং বিপদগ্রস্ত হলে সবর করা, আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও প্রতিদানের প্রত্যাশা রাখা (ইহতিসাব), আল্লাহর কাছেই বিপদে নিজেকে সঁপে দেওয়া (ইস্তিরজা) এবং আল্লাহর কাছেই নিজের দুঃখ-দুর্দশার নালিশ জানানো। এই চারটি কাজের দ্বারা আমরা বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দয়া অর্জন করতে পারি।
টিকাঃ
[১] 'সবর' শব্দের অনুবাদ এক শব্দে করা আসলে অসম্ভব। যদিও সাধারণভাবে এর অনুবাদ করা হয় 'ধৈর্য', কিন্তু সবর আসলে ধৈর্যের চেয়েও ব্যাপক অর্থ বহন করে। এর ভাবানুবাদ হয় আল্লাহর পথে অটল থাকা, দৃঢ় থাকা। পরীক্ষা যত বড়ই হোক না কেন, দৃঢ়তার সাথে প্রতিদানের আশায় আল্লাহর আদেশ পালন করে যাওয়া এবং সর্বাবস্থায় তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা-সবই সবরের অন্তর্ভুক্ত। সম্পাদক
[২] বুখারি, আস সহীহ : ১৪৬৯
[১] সূরা আয যুমার, ৩৯: ১০
[২] বুখারি, আস সহীহ: ১৮৭৬
[১] প্রাগুক্ত
[২] সূরা তাহরীন, ৬৬:১১
[১] তাবারি, আত তাফসীর: ২৩/৫০০
[২] সূরা বাকারা, ০২: ১৫৫-১৫৬
[১] মুসলিম, আস সহীহ: ৯১৮
[২] সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬
[১] বুখারি, আস সহীহ, হাদীস: ৫৭৫/১১৮
বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি, রহমত ও নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কিছু উপায় নিয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
• সবর : আরবি শব্দ 'সবর' এর মূল শব্দের অনুবাদ করলে তা বোঝায়, 'কোনো কিছুকে আটকে রাখা কিংবা কোনো কিছু হতে বিরত থাকা অথবা নিবৃত্ত থাকা।' ইসলামি পরিভাষায় 'সবর' এর অর্থ হচ্ছে, 'হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকা, অভিযোগ করা থেকে জিহ্বাকে নিবৃত্ত রাখা এবং দুঃখ-দুর্দশার সময় মুখে আঘাত করা কিংবা শরীরের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা থেকে নিজের হাতকে সংযত রাখা।[১]
সবরের বিশেষ গুণ যাদের আছে তারাই সৌভাগ্যবান। রাসূলুল্লাহ বলেন,
مَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنْ الصَّبْرِ
' সবরের চাইতে উত্তম ও প্রশস্ত আর কোনো জিনিস কাউকে দেওয়া হয়নি।[২]
মহিমান্বিত আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, যারা সবর করে তাদেরকে অজস্র সওয়াব দান করা হবে। তাদের প্রতিদান এত বেশি পরিমাণ হবে যে, তা না মাপা যাবে আর না গণনা করা যাবে। আল্লাহ বলেন,
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
“ নিশ্চয় সবরকারীদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে পরিপূর্ণরূপে এবং (তা হবে) অগণিত।”[১]
উত্তমরূপে সবর এনে দেবে প্রতিশ্রুত প্রতিদান, যার ওয়াদা আল্লাহ করেছেন। আর তা অর্জন করতে হলে বিপদের শুরু থেকে সবরের অনুশীলন করতে হবে। যখন সর্বপ্রথম বিপদের ব্যাপারটি আপনি আঁচ করতে পারবেন, ঠিক তখন থেকেই সবরের অনুশীলন করতে হবে। বস্তুত, অন্তর তো দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়, কিন্তু তবুও আল্লাহর বান্দারা হতাশায় মুষড়ে পড়ে না। তারা সবর করে। আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে।
যখন বিপদ আসে তখন মানুষ বিচলিত হয়। একটা সময় পর যখন কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়, তখন সে সবর করে। কিন্তু এটি প্রকৃত সবর নয়। প্রকৃত সবর তো করতে হবে তখন, ঠিক যে মুহূর্তে আপনার ওপর বিপর্যয় আসবে। রাসূলুল্লাহ বলেন,
الصبر عند الصدمة الأولى
' নিশ্চয় সবর তো (করতে হবে) প্রথম আঘাতেই।[২]
বাস্তবতা হচ্ছে প্রত্যেককেই সবর করতে হয়। ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক কিংবা অনিচ্ছায়, একসময় সবাইকেই সবর করতে হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি তো সে-ই, যে প্রথম থেকেই স্বেচ্ছায় সবর করে, সবরের মহান উপকারিতাগুলো বোঝে সবর করে। সে জানে তার সবরের বিনিময়ে সে পুরস্কৃত হবে। আর যদি পেরেশান হয়ে পড়ে তবে সে নিন্দিত হবে। সে জানে, যে সুযোগ তার হাতছাড়া হয়ে গেছে তা আর ফিরে আসবে না। সে জানে, সে আল্লাহর ফায়সালা বদলে ফেলতে পারবে না।
বোকা তো সেই ব্যক্তি যে অভিযোগ করে, যন্ত্রণা ভোগ করে। আর যখন তার কোনো উপায় থাকে না, তখন সে সবর করে। তার এই সবরে তো কোনো উপকারই নেই।
• ইহতিসাব: প্রত্যেক দুঃখ-দুর্দশার সময় আল্লাহর নিকট হতে সওয়াবের প্রত্যাশা করাকে ইহতিসাব বলে। যত বেশি কষ্ট-যাতনা হোক না কেন, আল্লাহর নিকট হতে এর বিনিময়ে ক্ষমা ও মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে ইহতিসাব।
রাসূলূল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার মুমিন বান্দার নিকট থেকে যখন তার অতি প্রিয়জনের জান কবজ করা হয়, আর সে আল্লাহর নিকট সওয়াবের আশায় ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহর নিকট তার একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত। "[১]
আসুন আমরা ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়ার কথা স্মরণ করি। আসিয়ার স্বামী ছিল দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জালিম বাদশাহ ফিরআউন। এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার কারণে আসিয়ার ওপর তার স্বামী ভয়াবহ অত্যাচার করত। এত মারাত্মক জখম আর যন্ত্রণা সহ্য করার পরেও আসিয়া স্বীয় বিশ্বাসে অটল থাকতেন, অসামান্য ধৈর্য আর ইহতিসাব প্রদর্শন করতেন সর্বদা।
তিনি আল্লাহর কাছেই দুআ করলেন। তিনি আল্লাহর কাছে কী চাইলেন? তিনি চাইলেন আল্লাহ যেন জান্নাতে তাকে একটি প্রাসাদ বানিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা এ অসামান্য ঘটনা কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجْنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجْنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ *
“ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্যে ফিরআউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলল: হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।”[২]
যখন তিনি এই দুআ করলেন, তখন আকাশের দ্বারগুলো উন্মোচিত হয়ে গেল। আর আসিয়া জান্নাতে তার ঘর দেখতে পেলেন। তা দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ফিরআউন আদেশ করল, একটি বড় পাথরখণ্ড এনে তা যেন আসিয়ার ওপর ফেলে আসিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সে পাথরখণ্ড আসিয়ার ওপর নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই আসিয়ার জান কবচ করে ফেলা হলো।
ইহতিসাবের কারণে আল্লাহ আসিয়াকে দুইটি নিয়ামাত দান করলেন। তাকে জান্নাতে প্রাসাদ বানিয়ে দিলেন এবং ফিরআউনের দুষ্ট পরিকল্পনা থেকেও হিফাজত করলেন। তাইতো তার পরে কিয়ামাত দিবস পর্যন্ত যারাই আসবেন, তাদের সবার জন্য তিনি দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবেন।।১।
• ইসতিরজা ইহতিসাব : বিপদের সম্মুখীন হয়েও আল্লাহর প্রভুত্বের ঘোষণা দেওয়া ও আল্লাহর নিকট নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়াকে ইস্তিরজা বলে। ইস্তিরজা হচ্ছে বিপদসংকুল অবস্থায় 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন' বলা; অর্থাৎ 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।' আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ *
“ এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়-ক্ষুধা-মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে: নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।”[২]
উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : ( ما من مسلم تصيبه مصيبة فيقول ما أمره الله « إنا لله وإنا إليه راجعون ، اللهم أجرني في مصيبتي وأخلف لي خيراً منها « إلا أخلف الله له خيراً منها
' রাসূলুল্লাহ বলেন, “যখনই কোনো মুসলিম বিপদ দ্বারা আক্রান্ত হয় আর এ কথা বলে যে: 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার বিপদের জন্য আমাকে পুরস্কৃত করো আর তা আমার জন্য উত্তম কোনো জিনিস দিয়ে বদলে দাও'- তা হলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে পুরস্কৃত করবেন এবং তার (বিপদের) পরিবর্তে তাকে উত্তম জিনিস দান করবেন।"
উম্মু সালামা বলেন, "আর তাই যখন আমার স্বামী আবূ সালামা মারা যান, তখন আল্লাহ আমাকে এই দুআ করার তৌফিক দিলেন। আর তার (আবূ সালামা-র) পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ-কে দিলেন (অর্থাৎ পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহ-এর সাথে উম্মু সালামা-র বিয়ে হয়)।[১]
• শাকওয়াহ : শাকওয়াহ অর্থ অভিযোগ করা, নালিশ জানানো। শাকওয়াহ দুই ধরনের-
ক) প্রথম ধরনের শাকওয়াহ হলো আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখ-কষ্ট পেশ করা। এটি সবরের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের শাকওয়াহ-র অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। ইয়াকূব বলেছিলেন,
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ
“আমি তো আমার দুঃখ-বেদনা আল্লাহর নিকটেই পেশ করি।”[২]
খ) আরেক ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে মানুষের নিকট নালিশ করা। এটি হতে পারে প্রত্যক্ষভাবে কথার দ্বারা অথবা পরোক্ষভাবে আচার-আচরণ বা কাজের দ্বারা, যেমন : বিবর্ণ পোশাক পরিধান করা, মাথা মুণ্ডানো, হতাশা প্রকাশ করা ইত্যাদি কাজের দ্বারা। এ-ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে সবরের সাথে সাংঘর্ষিক। এ-ধরনের শাকওয়াহ আল্লাহর ফায়সালার ওপর অসন্তুষ্টি ও অনাস্থা প্রকাশ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমানের দৃঢ়তার অভাব প্রমাণ করে।
তবে নিজের আপনজনকে নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানানো দোষের কিছু নয়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ-এর কাছে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর শরীরে আমার হাত বুলালাম এবং বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি তো কঠিন জ্বরে আক্রান্ত।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ, তোমাদের দু-ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু আক্রান্ত হই।” আমি বললাম, “এটা এ-জন্য যে, আপনার জন্য প্রতিদানও দ্বিগুণ।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ!” তারপর রাসূলুল্লাহ বললেন,
ما من مسلم يصيبه أذى؛ مرض فما سواء، إلا حط الله له سيئاته، كما تحط الشجرة ورقها
'যে-কোনো মুসলিমের ওপর কোনো যন্ত্রণা, রোগ-ব্যাধি বা এ ধরনের অন্য কিছু আপতিত হলে, তাতে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ঝরিয়ে দেন, যেভাবে গাছ তার পাতাগুলো ঝরিয়ে ফেলে।[১]
সুতরাং বিপদগ্রস্ত হলে সবর করা, আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও প্রতিদানের প্রত্যাশা রাখা (ইহতিসাব), আল্লাহর কাছেই বিপদে নিজেকে সঁপে দেওয়া (ইস্তিরজা) এবং আল্লাহর কাছেই নিজের দুঃখ-দুর্দশার নালিশ জানানো। এই চারটি কাজের দ্বারা আমরা বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দয়া অর্জন করতে পারি।
টিকাঃ
[১] 'সবর' শব্দের অনুবাদ এক শব্দে করা আসলে অসম্ভব। যদিও সাধারণভাবে এর অনুবাদ করা হয় 'ধৈর্য', কিন্তু সবর আসলে ধৈর্যের চেয়েও ব্যাপক অর্থ বহন করে। এর ভাবানুবাদ হয় আল্লাহর পথে অটল থাকা, দৃঢ় থাকা। পরীক্ষা যত বড়ই হোক না কেন, দৃঢ়তার সাথে প্রতিদানের আশায় আল্লাহর আদেশ পালন করে যাওয়া এবং সর্বাবস্থায় তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা-সবই সবরের অন্তর্ভুক্ত। সম্পাদক
[২] বুখারি, আস সহীহ : ১৪৬৯
[১] সূরা আয যুমার, ৩৯: ১০
[২] বুখারি, আস সহীহ: ১৮৭৬
[১] প্রাগুক্ত
[২] সূরা তাহরীন, ৬৬:১১
[১] তাবারি, আত তাফসীর: ২৩/৫০০
[২] সূরা বাকারা, ০২: ১৫৫-১৫৬
[১] মুসলিম, আস সহীহ: ৯১৮
[২] সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬
[১] বুখারি, আস সহীহ, হাদীস: ৫৭৫/১১৮
📄 শুধু আল্লাহর কাছেই চাওয়া
কতই-না দুর্ভাগা সেসব লোক, যারা বিপদের সময় সাহায্যের আশায় কবরে আর মাজারে গিয়ে ভীড় জমায়!
হতভাগারা নিজেদের বিপদ দূর করার আকুতি জানায় নবিদের নিকট আর মৃত মানুষদের নিকট! তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ *
“ তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে যে কিয়ামাত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তারা তো তাদের (ভক্তদের) ডাক সম্পর্কে পুরোপুরি বেখবর।”[১]
তাদের কাজের অসারতা প্রমাণ করতে এই হাদীসটিই যথেষ্ট :
عَنْ مُصْعَبِ بْنِ سَعْدٍ, عَنْ أَبِيهِ قَالَ : قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ : أَيُّ النَّاسِ أَشَدُّ بَلَاءٌ ؟ قَالَ : « الأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُونَ ثُمَّ الأَمْثَلُ فَالأَمْثَلُ مِنَ النَّاسِ « ، قَالَ : « يُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبِ دِينِهِ فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلابَةٌ زِيدَ فِي بَلَابِهِ, وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةُ خُفِّفَ عَنْهُ, فَلا يَزَالُ الْبَلاءُ بِالْعَبْدِ حَتَّى يَمْشِيَ عَلَى الْأَرْضِ وَمَا لَهُ خَطِيئَةٌ "
' নবিগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন, অতঃপর তাঁদের নিকটবর্তীরা, এরপর এদের নিকটবর্তীরা। মানুষকে তার ঈমান অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি তার ঈমান শক্তিশালী হয়, তা হলে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়। আর যদি তার ঈমান দুর্বল হয়, তা হলে তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে হালকা হয়। বিপদ বান্দার পিছু ছাড়ে না, পরিশেষে তার অবস্থা এমন হয় যে, সে পাপমুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা করে।[১]
এ হাদীসটি তাওহীদের প্রমাণও বহন করে। নবিগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন। তারপর তাঁদের নিকটতম স্তরের মুমিনগণ পরীক্ষিত হন। একজন সাধারণ মুসলিমের থেকে নবিগণ ও তাঁদের নিকটবর্তীগণ অনেক বেশি পরীক্ষিত হন ও কষ্ট পান। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাঁদেরকে উদ্ধার করতে পারে না। যখন কোনো সাধারণ মুসলিম এ বিষয়টি জানে, তখন সে বুঝতে পারে যে, যারা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া নিজেদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন না, তারা কীভাবে অপরের বিপদ হটাবেন?
কাজেই এটি তো প্রমাণিত যে, নবিগণ আর নেককারদের নিকট বিপদ থেকে মুক্তি পাবার জন্য দুআ করা বৃথা ও নিরর্থক। বরং আমাদের দুআ করা উচিত সেই মহান সত্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকটে, যিনি আমাদের বিপদ অপসারণ করতে সক্ষম।
নবি আইয়ূব -এর ঘটনা আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাঁকে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা, প্রিয় সন্তানাদির মৃত্যু দ্বারা আর সুস্বাস্থ্য ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন।
আইয়ূব -এর প্রচুর পরিমাণ গবাদিপশু ও শস্যাদি ছিল, ছিল সন্তানসন্ততি আর সুন্দর বাসগৃহ। এসব কিছুই তিনি হারালেন। অতঃপর তাঁকে শারীরিক অসুস্থতা দ্বারা পরীক্ষা করা হলো। মানুষজন তাঁকে পরিত্যাগ করল। তিনি শহরের একপ্রান্তে একাকী থাকতে বাধ্য হলেন। শুধুমাত্র তাঁর স্ত্রী রয়ে গিয়েছিলেন দেখভাল করার জন্য। এমন অবস্থায়ও আইয়ূব সবরের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এত কষ্টের পরও আল্লাহর ওপর তাঁর ভরসার কোনো কমতি হয়নি।
তারপর তিনি একাকী আল্লাহর কাছেই সুহায্যের জন্য দুআ চাইলেন। আল্লাহ বলেন,
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ )
“ এবং স্মরণ করুন আইয়ূব-এর কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন: আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।".[১]
অতঃপর আল্লাহ সে আহ্বানে সাড়া দিলেন। আল্লাহ বলেন,
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرِّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ )
“ অতঃপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম এবং তার পরিবারবর্গ ফিরিয়ে দিলাম, আর তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশত আর এটা আমার বান্দাদের জন্য উপদেশস্বরূপ।”[২]
কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, মৃতরা কখনোই জীবিতদের সাহায্য করতে পারবে না। অতএব, যারা পূর্ববর্তী নেককার মৃত লোকদেরকে নিজেদের বিপদ দূরীভূত করার জন্য ডাকবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধিকন্তু, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা শিরক। শিরক হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার পাপ, সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ। শিরক এজন্য হবে যে, দুআ একধরনের ইবাদাত আর ইবাদাত একমাত্র আল্লাহরই হক। [৩]
আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ *
“ তোমাদের পালনকর্তা বলেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। যারা আমার ইবাদাতে অহংকার করে তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"[১]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
الدعاء هو العبادة
“দুআ হচ্ছে ইবাদাত।”[২]
আল্লাহর বান্দারা যদি আল্লাহর হক আদায় করে আর শুধু আল্লাহরই ইবাদাত করে, তবে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। এটি আল্লাহর ওয়াদা।
মুআজ বিন জাবাল থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “হে মুআজ! তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক কী?” আমি (মুআজ) বললাম, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল ﷺ বললেন,
فإنَّ حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يُشركوا به شيئًا
(বান্দার ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে) শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা। তাঁর (আল্লাহর) সাথে কাউকে শরীক না করা।'
তারপর রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি জানো, আল্লাহর ওপর বান্দাদের হক কী?” আমি (মুআজ) বললাম, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল ﷺ জবাব দিলেন,
وحق العباد على الله أن لا يُعذِّب من لا يُشرك به شيئًا
' (আল্লাহর নিকট বান্দার হক হচ্ছে) তিনি তাঁদেরকে শাস্তি দেবেন না (যদি তারা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করে)।”[৩]
ইবনু আব্বাস -কে নাসীহা প্রদানকালে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন,
يَا غُلَامُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ وَلَوِ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ
'আল্লাহর আদেশ মেনে চলো, তা হলে আল্লাহ তোমাকে পথ দেখাবেন। তুমি আল্লাহকে মেনে চলো, তা হলে আল্লাহকে সাথে পাবে। যখন তুমি দুআ করবে, একমাত্র আল্লাহকেই ডাকবে। যখন তুমি সাহায্য চাইবে, শুধুমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে। জেনে রেখো, যদি সমগ্র (মানব ও জিন) জাতি তোমার উপকার করতে একত্র হয়ে যায়, তারপরেও তারা—আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন—তার বাইরে তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না। আর তারা যদি সকলে তোমার ক্ষতি করার জন্য জড়ো হয়, তবুও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে তারা কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর কাগজ শুকিয়ে গেছে।'[১]
আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “গুনাহের সাথে সম্পর্ক নেই কিংবা রক্ত-সম্পর্ক ছিন্নকরণের সাথে জড়িত নয় এমন দুআ যদি কোনো মুসলমান করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তিনটি জিনিসের একটি দান করবেন : আল্লাহ হয়তো শীঘ্রই তার দুআয় সাড়া দেবেন অথবা বিচার দিবসে প্রতিদান দেওয়ার জন্য তা জমা রাখবেন অথবা এই দুআর সমপরিমাণ ক্ষতি থেকে তাকে রক্ষা করবেন।”
সাহাবিগণ তখন প্রশ্ন করলেন, “আমরা যদি একাধিক দুআ করি, তখন কী হবে?” রাসূল জবাব দিলেন, “আল্লাহ আরও বেশি দুআ কবুলকারী।”[২]
আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর কোনো সাবধানতা অবলম্বনের দ্বারাই বদলে যায় না। আল্লাহ যা নির্ধারিত করে রেখেছেন আর যা রাখেননি, উভয় অবস্থাতেই দুআ কল্যাণকর। আল্লাহ তাকদীরে যে বিপদ লিখে রেখেছেন, দুআ কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তার মুখোমুখি হয়ে কুস্তি লড়তে থাকে।”[৩]
আল্লাহ বলেন,
وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“আর আল্লাহ যদি তোমার ওপর কোন কষ্ট আরোপ করেন, তা হলে তিনি ছাড়া কেউ নেই তা খণ্ডাবার মতো। পক্ষান্তরে যদি তিনি কোনো কল্যাণ দান করেন, তবে তাঁর মেহেরবানিকে রহিত করার মতোও কেউ নেই। তিনি যার প্রতি অনুগ্রহ দান করতে চান স্বীয় বান্দাদের মধ্যে তাকেই দান করেন; বস্তুত তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু।”১।
টিকাঃ
[১] সূরা আহকাফ, ৪৬:৫
[১] তিরমিযি, আস সুনান, হাদীস: ১৪৩
[১] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩
[২] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৪
[৩] 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা' বলতে বোঝানো হয়েছে যেসব ব্যাপার কেবল আল্লাহর কাছেই চাওয়া যায় সেগুলোর জন্য মানুষের দ্বারস্থ হওয়া। যেমন সম্পদ বৃদ্ধি, সন্তানলাভ ইত্যাদি। এগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে কামনা করা শিরক। কিন্তু সাধারণ সমস্যায় মানুষের সাহায্য চাইতে দোষ নেই, যেমন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য যাওয়া। তবে এসবক্ষেত্রেও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহই পারেন সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে, তাঁর হুকুম না হলে কোনো সাহায্যকারীর সাহায্য কাজে আসবে না। এবং তাঁর কাছেই ক্রমাগত সাহায্য চাইতে থাকতে হবে। - সম্পাদক
[১] সূরা মু'মিন, ২৩:৬০
[২] আবূ দাউদ, আস সুনান: ১৪৭৪
[৩] ইজমা অনুসারে
[১] তিরমিযি, আস সুনান: ২৫১৮
[২] আহমাদ, আল মুসনাদ
[৩] আলবানি, সহীহ আল জামি: ৭৭৩৯
[১] সূরা ইউনূস, ১০: ১০৭
কতই-না দুর্ভাগা সেসব লোক, যারা বিপদের সময় সাহায্যের আশায় কবরে আর মাজারে গিয়ে ভীড় জমায়!
হতভাগারা নিজেদের বিপদ দূর করার আকুতি জানায় নবিদের নিকট আর মৃত মানুষদের নিকট! তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ *
“ তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে যে কিয়ামাত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তারা তো তাদের (ভক্তদের) ডাক সম্পর্কে পুরোপুরি বেখবর।”[১]
তাদের কাজের অসারতা প্রমাণ করতে এই হাদীসটিই যথেষ্ট :
عَنْ مُصْعَبِ بْنِ سَعْدٍ, عَنْ أَبِيهِ قَالَ : قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ : أَيُّ النَّاسِ أَشَدُّ بَلَاءٌ ؟ قَالَ : « الأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُونَ ثُمَّ الأَمْثَلُ فَالأَمْثَلُ مِنَ النَّاسِ « ، قَالَ : « يُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبِ دِينِهِ فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلابَةٌ زِيدَ فِي بَلَابِهِ, وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةُ خُفِّفَ عَنْهُ, فَلا يَزَالُ الْبَلاءُ بِالْعَبْدِ حَتَّى يَمْشِيَ عَلَى الْأَرْضِ وَمَا لَهُ خَطِيئَةٌ "
' নবিগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন, অতঃপর তাঁদের নিকটবর্তীরা, এরপর এদের নিকটবর্তীরা। মানুষকে তার ঈমান অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি তার ঈমান শক্তিশালী হয়, তা হলে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়। আর যদি তার ঈমান দুর্বল হয়, তা হলে তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে হালকা হয়। বিপদ বান্দার পিছু ছাড়ে না, পরিশেষে তার অবস্থা এমন হয় যে, সে পাপমুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা করে।[১]
এ হাদীসটি তাওহীদের প্রমাণও বহন করে। নবিগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন। তারপর তাঁদের নিকটতম স্তরের মুমিনগণ পরীক্ষিত হন। একজন সাধারণ মুসলিমের থেকে নবিগণ ও তাঁদের নিকটবর্তীগণ অনেক বেশি পরীক্ষিত হন ও কষ্ট পান। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাঁদেরকে উদ্ধার করতে পারে না। যখন কোনো সাধারণ মুসলিম এ বিষয়টি জানে, তখন সে বুঝতে পারে যে, যারা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া নিজেদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন না, তারা কীভাবে অপরের বিপদ হটাবেন?
কাজেই এটি তো প্রমাণিত যে, নবিগণ আর নেককারদের নিকট বিপদ থেকে মুক্তি পাবার জন্য দুআ করা বৃথা ও নিরর্থক। বরং আমাদের দুআ করা উচিত সেই মহান সত্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকটে, যিনি আমাদের বিপদ অপসারণ করতে সক্ষম।
নবি আইয়ূব -এর ঘটনা আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাঁকে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা, প্রিয় সন্তানাদির মৃত্যু দ্বারা আর সুস্বাস্থ্য ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন।
আইয়ূব -এর প্রচুর পরিমাণ গবাদিপশু ও শস্যাদি ছিল, ছিল সন্তানসন্ততি আর সুন্দর বাসগৃহ। এসব কিছুই তিনি হারালেন। অতঃপর তাঁকে শারীরিক অসুস্থতা দ্বারা পরীক্ষা করা হলো। মানুষজন তাঁকে পরিত্যাগ করল। তিনি শহরের একপ্রান্তে একাকী থাকতে বাধ্য হলেন। শুধুমাত্র তাঁর স্ত্রী রয়ে গিয়েছিলেন দেখভাল করার জন্য। এমন অবস্থায়ও আইয়ূব সবরের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এত কষ্টের পরও আল্লাহর ওপর তাঁর ভরসার কোনো কমতি হয়নি।
তারপর তিনি একাকী আল্লাহর কাছেই সুহায্যের জন্য দুআ চাইলেন। আল্লাহ বলেন,
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ )
“ এবং স্মরণ করুন আইয়ূব-এর কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন: আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।".[১]
অতঃপর আল্লাহ সে আহ্বানে সাড়া দিলেন। আল্লাহ বলেন,
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرِّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ )
“ অতঃপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম এবং তার পরিবারবর্গ ফিরিয়ে দিলাম, আর তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশত আর এটা আমার বান্দাদের জন্য উপদেশস্বরূপ।”[২]
কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, মৃতরা কখনোই জীবিতদের সাহায্য করতে পারবে না। অতএব, যারা পূর্ববর্তী নেককার মৃত লোকদেরকে নিজেদের বিপদ দূরীভূত করার জন্য ডাকবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধিকন্তু, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা শিরক। শিরক হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার পাপ, সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ। শিরক এজন্য হবে যে, দুআ একধরনের ইবাদাত আর ইবাদাত একমাত্র আল্লাহরই হক। [৩]
আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ *
“ তোমাদের পালনকর্তা বলেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। যারা আমার ইবাদাতে অহংকার করে তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"[১]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
الدعاء هو العبادة
“দুআ হচ্ছে ইবাদাত।”[২]
আল্লাহর বান্দারা যদি আল্লাহর হক আদায় করে আর শুধু আল্লাহরই ইবাদাত করে, তবে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। এটি আল্লাহর ওয়াদা।
মুআজ বিন জাবাল থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “হে মুআজ! তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক কী?” আমি (মুআজ) বললাম, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল ﷺ বললেন,
فإنَّ حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يُشركوا به شيئًا
(বান্দার ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে) শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা। তাঁর (আল্লাহর) সাথে কাউকে শরীক না করা।'
তারপর রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি জানো, আল্লাহর ওপর বান্দাদের হক কী?” আমি (মুআজ) বললাম, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল ﷺ জবাব দিলেন,
وحق العباد على الله أن لا يُعذِّب من لا يُشرك به شيئًا
' (আল্লাহর নিকট বান্দার হক হচ্ছে) তিনি তাঁদেরকে শাস্তি দেবেন না (যদি তারা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করে)।”[৩]
ইবনু আব্বাস -কে নাসীহা প্রদানকালে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন,
يَا غُلَامُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ وَلَوِ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ
'আল্লাহর আদেশ মেনে চলো, তা হলে আল্লাহ তোমাকে পথ দেখাবেন। তুমি আল্লাহকে মেনে চলো, তা হলে আল্লাহকে সাথে পাবে। যখন তুমি দুআ করবে, একমাত্র আল্লাহকেই ডাকবে। যখন তুমি সাহায্য চাইবে, শুধুমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে। জেনে রেখো, যদি সমগ্র (মানব ও জিন) জাতি তোমার উপকার করতে একত্র হয়ে যায়, তারপরেও তারা—আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন—তার বাইরে তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না। আর তারা যদি সকলে তোমার ক্ষতি করার জন্য জড়ো হয়, তবুও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে তারা কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর কাগজ শুকিয়ে গেছে।'[১]
আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “গুনাহের সাথে সম্পর্ক নেই কিংবা রক্ত-সম্পর্ক ছিন্নকরণের সাথে জড়িত নয় এমন দুআ যদি কোনো মুসলমান করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তিনটি জিনিসের একটি দান করবেন : আল্লাহ হয়তো শীঘ্রই তার দুআয় সাড়া দেবেন অথবা বিচার দিবসে প্রতিদান দেওয়ার জন্য তা জমা রাখবেন অথবা এই দুআর সমপরিমাণ ক্ষতি থেকে তাকে রক্ষা করবেন।”
সাহাবিগণ তখন প্রশ্ন করলেন, “আমরা যদি একাধিক দুআ করি, তখন কী হবে?” রাসূল জবাব দিলেন, “আল্লাহ আরও বেশি দুআ কবুলকারী।”[২]
আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর কোনো সাবধানতা অবলম্বনের দ্বারাই বদলে যায় না। আল্লাহ যা নির্ধারিত করে রেখেছেন আর যা রাখেননি, উভয় অবস্থাতেই দুআ কল্যাণকর। আল্লাহ তাকদীরে যে বিপদ লিখে রেখেছেন, দুআ কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তার মুখোমুখি হয়ে কুস্তি লড়তে থাকে।”[৩]
আল্লাহ বলেন,
وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“আর আল্লাহ যদি তোমার ওপর কোন কষ্ট আরোপ করেন, তা হলে তিনি ছাড়া কেউ নেই তা খণ্ডাবার মতো। পক্ষান্তরে যদি তিনি কোনো কল্যাণ দান করেন, তবে তাঁর মেহেরবানিকে রহিত করার মতোও কেউ নেই। তিনি যার প্রতি অনুগ্রহ দান করতে চান স্বীয় বান্দাদের মধ্যে তাকেই দান করেন; বস্তুত তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু।”১।
টিকাঃ
[১] সূরা আহকাফ, ৪৬:৫
[১] তিরমিযি, আস সুনান, হাদীস: ১৪৩
[১] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩
[২] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৪
[৩] 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা' বলতে বোঝানো হয়েছে যেসব ব্যাপার কেবল আল্লাহর কাছেই চাওয়া যায় সেগুলোর জন্য মানুষের দ্বারস্থ হওয়া। যেমন সম্পদ বৃদ্ধি, সন্তানলাভ ইত্যাদি। এগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে কামনা করা শিরক। কিন্তু সাধারণ সমস্যায় মানুষের সাহায্য চাইতে দোষ নেই, যেমন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য যাওয়া। তবে এসবক্ষেত্রেও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহই পারেন সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে, তাঁর হুকুম না হলে কোনো সাহায্যকারীর সাহায্য কাজে আসবে না। এবং তাঁর কাছেই ক্রমাগত সাহায্য চাইতে থাকতে হবে। - সম্পাদক
[১] সূরা মু'মিন, ২৩:৬০
[২] আবূ দাউদ, আস সুনান: ১৪৭৪
[৩] ইজমা অনুসারে
[১] তিরমিযি, আস সুনান: ২৫১৮
[২] আহমাদ, আল মুসনাদ
[৩] আলবানি, সহীহ আল জামি: ৭৭৩৯
[১] সূরা ইউনূস, ১০: ১০৭