📄 আমাদের দু-হাতের কামাই
বিপদ আসে মুমিন বান্দার জন্য পরীক্ষা হয়ে, যাতে সে সবর করতে পারে আর আল্লাহর ফায়সালার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পারে। তবে অনেক সময়েই মুমিন বান্দাদেরকে বিপদ দেওয়া হয় তাদের গুনাহ ও মন্দ কাজের প্রতিফল হিসেবে। এগুলো হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। আল্লাহ বান্দাদের মনে করিয়ে দেন যে, তাদের উচিত তাদের মন্দ কাজগুলো পরিত্যাগ করা আর আল্লাহর নিকট তাওবা করা।
আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
“তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”[১]
দুনিয়াবি বিপদের এ বাস্তবতা সঠিকরূপে বোঝা এবং তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক। কুরআন এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ পূর্ববর্তী অনেক জাতিকে নাফরমানির কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ সকল জাতির লোকেরা আল্লাহর সতর্কবার্তা শোনেনি। ফলস্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে প্রবল শাস্তি দিয়েছেন।
নূহ-এর সময়কার অবিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ মহাপ্রলয়ংকরী প্লাবনে ডুবিয়ে শাস্তি দিয়েছেন। হূদ-এর কওমকে প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা উৎখাত করেছেন। সালিহ-এর অহংকারী কওমকে প্রচণ্ড ভূকম্পনের দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। কৃত -এর কওমকে আল্লাহ তাআলা চূড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত করেন। তাদের সমগ্র এলাকা উলটিয়ে দেন, আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করে সমগ্র জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেন।
এগুলো-সহ কুরআনে বর্ণিত অতীতের জাতিগুলোর অন্যান্য কাহিনি আমাদেরকে সতর্ক করে দেয় আর জানিয়ে দেয় যে, আল্লাহর নাফরমানি করতে থাকলে, আল্লাহর সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।
আল্লাহ বলেন,
لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ *
“ রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহ্বানের মতো গণ্য কোরো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন, যারা তোমাদের মধ্যে চুপিসারে সরে পড়ে। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” [১]
শাস্তির রয়েছে রকমফের। শাস্তি আসতে পারে নানারূপে। সম্ভবত বর্তমান সময়ে মানবজাতির ওপর আপতিত সবচেয়ে সুস্পষ্ট শাস্তি হলো এইডস। আশির দশক থেকে এইডসের আবির্ভাব। এইডস হচ্ছে এইচ.আই.ভি. নামক ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট একটি ব্যাধি, যা মানুষের শরীরের রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। এতে করে একজন এইডস-রোগী খুব সহজেই যে-কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটাতে পারে।
এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যায়। এইডসের ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে-লাগামছাড়া যৌনসম্পর্ক, সমকামিতা এবং মাদকাসক্তির প্রসার। এই প্রত্যেকটি কাজই এমন, যা আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে।
অনেকে হয়তো বলবে, এইডস তো শুধুমাত্র গুনাহগার লোকদেরই হয় না। অনেক সময় চরিত্রবান মানুষও এইডস আক্রান্ত হয়। এ কথার জবাবে কুরআন জানাচ্ছে-যখন আল্লাহর গজব আপতিত হয়, তা শুধু গুনাহগারদেরই আক্রান্ত করে না, বরং সমগ্র সমাজ এতে আক্রান্ত হয়। আল্লাহ বলেন,
وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“আর তোমরা এমন ফিতনা থেকে বেঁচে থাকো, যার শাস্তি তোমাদের মধ্যে যারা জালিম শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর শাস্তি দানকারী।”[১]
শুধু এইডস নয়, মানবজাতিকে আজ অসংখ্য ব্যাধি ও বিপর্যয় গ্রাস করেছে। বর্তমানে আমরা প্রতিনিয়ত শুনতে পাই নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা। অপ্রত্যাশিত বন্যা-ঝড়-তুফান-ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে।
আজ মুসলিম উম্মাহ জালিমদের অত্যাচারে জর্জরিত। এগুলোও আমাদের জন্য শাস্তিদায়ক স্মরণিকা। আমরা আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে অভাব-অনটন আর বিপদ-আপদ দিয়ে আক্রান্ত করে রেখেছেন, আমাদের ওপর জালিমদের চাপিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ আমাদের সতর্ক করছেন। জেনে রাখুন, এগুলোর একমাত্র সমাধান হলো আল্লাহর অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকা, নিজেকে ইসলামের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখা, হারামে লিপ্ত না হওয়া। আল্লাহ বলেন,
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।”[২]
আমাদেরকে এসব সতর্কবার্তার ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত। আল্লাহর নিকট তাওবা-ইসতিগফার করা উচিত। এমন কাজ পরিহার করা উচিত, যা আমাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে। আমাদের উচিত কল্যাণের কাজে অগ্রসর হওয়া, যাতে আমরা আমাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিত। নতুবা আমরা আল্লাহর গজব থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারব না।
টিকাঃ
[১] সূরা শুরা, ৪২: ৩০
[১] সূরা নূর, ২৪: ৬৩
[১] সূরা আনফাল, ০৮:২৫
[২] সূরা রোম, ৩০:৪১
বিপদ আসে মুমিন বান্দার জন্য পরীক্ষা হয়ে, যাতে সে সবর করতে পারে আর আল্লাহর ফায়সালার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পারে। তবে অনেক সময়েই মুমিন বান্দাদেরকে বিপদ দেওয়া হয় তাদের গুনাহ ও মন্দ কাজের প্রতিফল হিসেবে। এগুলো হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। আল্লাহ বান্দাদের মনে করিয়ে দেন যে, তাদের উচিত তাদের মন্দ কাজগুলো পরিত্যাগ করা আর আল্লাহর নিকট তাওবা করা।
আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
“তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”[১]
দুনিয়াবি বিপদের এ বাস্তবতা সঠিকরূপে বোঝা এবং তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক। কুরআন এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ পূর্ববর্তী অনেক জাতিকে নাফরমানির কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ সকল জাতির লোকেরা আল্লাহর সতর্কবার্তা শোনেনি। ফলস্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে প্রবল শাস্তি দিয়েছেন।
নূহ-এর সময়কার অবিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ মহাপ্রলয়ংকরী প্লাবনে ডুবিয়ে শাস্তি দিয়েছেন। হূদ-এর কওমকে প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা উৎখাত করেছেন। সালিহ-এর অহংকারী কওমকে প্রচণ্ড ভূকম্পনের দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। কৃত -এর কওমকে আল্লাহ তাআলা চূড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত করেন। তাদের সমগ্র এলাকা উলটিয়ে দেন, আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করে সমগ্র জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেন।
এগুলো-সহ কুরআনে বর্ণিত অতীতের জাতিগুলোর অন্যান্য কাহিনি আমাদেরকে সতর্ক করে দেয় আর জানিয়ে দেয় যে, আল্লাহর নাফরমানি করতে থাকলে, আল্লাহর সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।
আল্লাহ বলেন,
لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ *
“ রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহ্বানের মতো গণ্য কোরো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন, যারা তোমাদের মধ্যে চুপিসারে সরে পড়ে। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” [১]
শাস্তির রয়েছে রকমফের। শাস্তি আসতে পারে নানারূপে। সম্ভবত বর্তমান সময়ে মানবজাতির ওপর আপতিত সবচেয়ে সুস্পষ্ট শাস্তি হলো এইডস। আশির দশক থেকে এইডসের আবির্ভাব। এইডস হচ্ছে এইচ.আই.ভি. নামক ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট একটি ব্যাধি, যা মানুষের শরীরের রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। এতে করে একজন এইডস-রোগী খুব সহজেই যে-কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটাতে পারে।
এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যায়। এইডসের ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে-লাগামছাড়া যৌনসম্পর্ক, সমকামিতা এবং মাদকাসক্তির প্রসার। এই প্রত্যেকটি কাজই এমন, যা আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে।
অনেকে হয়তো বলবে, এইডস তো শুধুমাত্র গুনাহগার লোকদেরই হয় না। অনেক সময় চরিত্রবান মানুষও এইডস আক্রান্ত হয়। এ কথার জবাবে কুরআন জানাচ্ছে-যখন আল্লাহর গজব আপতিত হয়, তা শুধু গুনাহগারদেরই আক্রান্ত করে না, বরং সমগ্র সমাজ এতে আক্রান্ত হয়। আল্লাহ বলেন,
وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“আর তোমরা এমন ফিতনা থেকে বেঁচে থাকো, যার শাস্তি তোমাদের মধ্যে যারা জালিম শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর শাস্তি দানকারী।”[১]
শুধু এইডস নয়, মানবজাতিকে আজ অসংখ্য ব্যাধি ও বিপর্যয় গ্রাস করেছে। বর্তমানে আমরা প্রতিনিয়ত শুনতে পাই নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা। অপ্রত্যাশিত বন্যা-ঝড়-তুফান-ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে।
আজ মুসলিম উম্মাহ জালিমদের অত্যাচারে জর্জরিত। এগুলোও আমাদের জন্য শাস্তিদায়ক স্মরণিকা। আমরা আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে অভাব-অনটন আর বিপদ-আপদ দিয়ে আক্রান্ত করে রেখেছেন, আমাদের ওপর জালিমদের চাপিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ আমাদের সতর্ক করছেন। জেনে রাখুন, এগুলোর একমাত্র সমাধান হলো আল্লাহর অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকা, নিজেকে ইসলামের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখা, হারামে লিপ্ত না হওয়া। আল্লাহ বলেন,
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।”[২]
আমাদেরকে এসব সতর্কবার্তার ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত। আল্লাহর নিকট তাওবা-ইসতিগফার করা উচিত। এমন কাজ পরিহার করা উচিত, যা আমাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে। আমাদের উচিত কল্যাণের কাজে অগ্রসর হওয়া, যাতে আমরা আমাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিত। নতুবা আমরা আল্লাহর গজব থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারব না।
টিকাঃ
[১] সূরা শুরা, ৪২: ৩০
[১] সূরা নূর, ২৪: ৬৩
[১] সূরা আনফাল, ০৮:২৫
[২] সূরা রোম, ৩০:৪১
📄 বিপদ যখন নিয়ামাত
কোনো মুসলিম যখন বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহর নিকট নিজেকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে, তখন সেই বিপদ তার জন্যে নেকির এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের কারণ হয়। আর যদি সে অসন্তোষ প্রকাশ করে, অধৈর্য হয়ে যায়, তখন তা তার জন্য আল্লাহর গজব এবং শাস্তি নিয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ বলেন,
إن عظم الجزاء مع عظم البلاء، وإن الله - تعالى - إذا أحب قوما ابتلاهم، فمن رَضِيَ فله الرضا، ومن سخط فله السُّخْط
' বিপদ যত কঠিন হয়, পুরস্কারও তত বড় হয়। আল্লাহ কোনো জাতিকে ভালোবাসলে তাদেরকে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে তাতে সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান; আর যে তাতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে, আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে যান।[১]
তা হলে বিপদ কি নিয়ামাত নাকি শাস্তি? আমরা বলব, এটি নির্ভর করে আল্লাহর বান্দার আমলের ওপর। যদি সে বিপদকে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের একটি সুযোগ হিসেবে নেয় এবং সে সুযোগ কাজে লাগায়, তা হলে বিপদ তার জন্যে নিয়ামাত। নতুবা, বিপদ তার জন্যে শাস্তি। কষ্ট-যাতনা সত্ত্বেও বিপদ-আপদ মুমিনদের জন্য কিছু উপকার নিয়ে আসে। কষ্ট-যাতনাকে সহজভাবে বরণ করে নেওয়ার মাধ্যমে একজন মুসলমান ধৈর্য ও সহনশীলতার মহৎ গুণ অর্জন করতে পারে।
• কষ্ট মুমিনদেরকে ধৈর্যশীল হতে শেখায়। আল্লাহ তাঁর ধৈর্যশীল বান্দাদের অজস্র পুরস্কার দান করেন।
• দুঃখ-দুর্দশা গুনাহগার মুসলিমদেরকে জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়-মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, সে যে-কোনো সময় মারা যেতে পারে। আল্লাহর নাফরমানি করতে করতে মারা গেলে তাকে যে ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, সেই বোধোদয় ঘটে তার।
• যখন কেউ আল্লাহর রাস্তা থেকে বিচ্যুত হয়, সে কারও উপদেশকে তেমন পাত্তা দেয় না। কিন্তু বিপদের সময় তার আল্লাহকে মনে পড়ে, পরকালের ভয়াবহ শাস্তির কথা স্মরণ হয়। আল্লাহ বলেন,
تَنزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِن رَّبِّ الْعَالَمِينَ
বড় শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে “তারা প্রত্যাবর্তন করে।”[১]
তাই বিপদে পড়লে মানুষ নিজের গুনাহ ও তার ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণের অবকাশ পায়। ফলস্বরূপ, সে নিজের ভুলগুলো উপলব্ধি করতে পারে। তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে। এভাবে, দুনিয়াবি বিপদ-আপদ একজন গুনাহগার বান্দার জন্যে নিয়ামাত হিসেবে আসে। গুনাহের কারণে মুমিনদেরকে পরকালে যে অসহনীয় ও অসহ্য শাস্তির যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, দুনিয়াবি বিপদ-আপদের কারণে সেই গুনাহের বোঝা হালকা হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ বলেন,
মুসলিম নর-নারীর ওপর ক্রমাগত বিপদ আসতেই থাকে, যতক্ষণ না তারা সম্পূর্ণ গুনাহমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হয়।”[২]
রাসূলুল্লাহ আরও বলেন,
ما يُصيب المسلم من نصب، ولا وصب، ولا هيم، ولا حزن، ولا أذى، ولا غم، حتى الشوكة يشاكها إلا كفر الله بها من خطاياه
'মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে-সকল যাতনা, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এসবের দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।”[৩]
পরকালের অসহ্য কঠিন শাস্তির তুলনায় দুনিয়াবি কষ্ট-যন্ত্রণাগুলো তো কিছুই না। দুনিয়াবি কষ্টগুলো তো মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু পরকালের শাস্তিগুলো তো চিরস্থায়ী। পরন্তু, আল্লাহ তো আমাদের অধিকাংশ অবাধ্যতাগুলো দুনিয়াতেই ক্ষমা করে দেন। আমরা দুনিয়াতে যেসব কষ্ট ভোগ করি, তা তো আমাদের গুনাহের ক্ষুদ্র একটি অংশেরই প্রতিফল। দয়াময় আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
“ তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন."[১]
আমাদের প্রত্যেকটি গুনাহের কারণে আমাদেরকে যদি শাস্তি দেওয়া হতো, তা হলে সমগ্র পৃথিবীই ধ্বংস হয়ে যেত। আল্লাহ বলেন,
وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوا مَا تَرَكَ عَلَى ظَهْرِهَا مِن دَابَّةٍ وَلَكِن يُؤَخِّرُهُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِعِبَادِهِ بَصِيرًا *
“ যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে ভুপৃষ্ঠে চলমান কাউকে ছেড়ে দিতেন না। কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন। অতঃপর যখন সে নির্দিষ্ট মেয়াদ এসে যাবে (তখন তিনি তাদের পাকড়াও করবেন), আল্লাহ তাআলা বান্দাদের যাবতীয় কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন।”[২]
সুতরাং এটি তো আল্লাহর অসীম দয়া যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের অধিকাংশ গুনাহ মাফ করে দেন এবং পরকালের ভয়াবহ শাস্তির বদলে দুনিয়াবি জীবনের খণ্ডকালীন বিপদ-আপদ দিয়ে আমাদের গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ বলেন,
' আল্লাহ যখন তাঁর বান্দার কল্যাণ চান, তখন দুনিয়াতেই তার শাস্তি দিয়ে দেন, আর যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তখন তার পাপগুলো রেখে দিয়ে কিয়ামাতের দিন তার প্রাপ্য পূর্ণ করে দেন."[৩]
• বিপদ মুমিনদেরকে আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণরূপে অনুগত ও বিনয়ী করে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো মুসলিম যখন রোগাক্রান্ত হয়, তখন সে নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করতে পারে। জীবনে আল্লাহর প্রয়োজন অনুভব করে। সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থতার জন্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, সুস্থতা লাভের পর তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যে আরও গভীরভাবে তখন সে আত্মনিয়োগ করে।
যদি সে সব সময় সুস্থ জীবন কাটাত, যদি সে জীবনে কখনোই কোনো অসুস্থতা অথবা কষ্ট ভোগ না করত, তবে সে হয়তো অহংকারী ও দাম্ভিক হয়ে যেত। একইভাবে, যদি সে সব সময় রোগ-শোক আর কষ্টে জীবন কাটাত, সে আল্লাহর ইবাদাত করার কিংবা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার সুযোগই পেত না।
একজন বিশ্বাসী বান্দা বিপদ-আপদের ফলে এগুলো ছাড়াও আরও অনেক উপকারিতা লাভ করে। তা ছাড়া, দুনিয়াবি বিপদ-আপদ একজন মুসলিমের আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের জন্যেও অত্যাবশ্যক। কারণ বিপদের যাতনা সহ্য করার মাধ্যমে সে গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধি লাভ করতে পারে, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করতে পারে এবং সর্বোপরি বিপদের ঝাপটা সহ্য করে সে দ্বীন কায়েম করতে সমর্থ হয়। আর এ-কারণেই নবিগণ এবং তাঁদের অনুসারীগণ যখন বিপদের সম্মুখীন হতেন, তখন খুশী হতেন। রাসূলুল্লাহ বলেন,
' সবচেয়ে বেশি বিপদ-মুসিবতের মুখোমুখী হয়েছেন নবিগণ। তারপর ন্যায়নিষ্ঠ বান্দাগণ। তাঁদের মধ্যে কাউকে তো এত বেশি দারিদ্র্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে যে, শরীর ঢাকতে এক-টুকরো আবা (কমদামি উলের বস্ত্র) ছাড়া কিছুই ছিল না। আর নিশ্চয়ই তাঁরা বিপদ দেখে তেমনই সন্তুষ্ট হতেন যেমন তোমরা স্বচ্ছলতা দেখে হও।''১
টিকাঃ
[১] আলবানি, আস সহীহাহ : ১৪৬
[১] সূরা আস সাজদাহ, ৩২: ২
[২] বুখারি, আস সহীহ
[৩] বুখারি, আস সহীহ: ২১৩৭
[১] সূরা আশ শুরা, ৪২: ৩০
[২] সূরা আল ফাতির, ৩৫: ৪৫
[৩] তিরমিযি, আস সুনান, হাদীস : ২৩৯৬
[১] আলবানি, আস সহীহাহ: ১৪৪
কোনো মুসলিম যখন বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহর নিকট নিজেকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে, তখন সেই বিপদ তার জন্যে নেকির এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের কারণ হয়। আর যদি সে অসন্তোষ প্রকাশ করে, অধৈর্য হয়ে যায়, তখন তা তার জন্য আল্লাহর গজব এবং শাস্তি নিয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ বলেন,
إن عظم الجزاء مع عظم البلاء، وإن الله - تعالى - إذا أحب قوما ابتلاهم، فمن رَضِيَ فله الرضا، ومن سخط فله السُّخْط
' বিপদ যত কঠিন হয়, পুরস্কারও তত বড় হয়। আল্লাহ কোনো জাতিকে ভালোবাসলে তাদেরকে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে তাতে সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান; আর যে তাতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে, আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে যান।[১]
তা হলে বিপদ কি নিয়ামাত নাকি শাস্তি? আমরা বলব, এটি নির্ভর করে আল্লাহর বান্দার আমলের ওপর। যদি সে বিপদকে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের একটি সুযোগ হিসেবে নেয় এবং সে সুযোগ কাজে লাগায়, তা হলে বিপদ তার জন্যে নিয়ামাত। নতুবা, বিপদ তার জন্যে শাস্তি। কষ্ট-যাতনা সত্ত্বেও বিপদ-আপদ মুমিনদের জন্য কিছু উপকার নিয়ে আসে। কষ্ট-যাতনাকে সহজভাবে বরণ করে নেওয়ার মাধ্যমে একজন মুসলমান ধৈর্য ও সহনশীলতার মহৎ গুণ অর্জন করতে পারে।
• কষ্ট মুমিনদেরকে ধৈর্যশীল হতে শেখায়। আল্লাহ তাঁর ধৈর্যশীল বান্দাদের অজস্র পুরস্কার দান করেন।
• দুঃখ-দুর্দশা গুনাহগার মুসলিমদেরকে জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়-মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, সে যে-কোনো সময় মারা যেতে পারে। আল্লাহর নাফরমানি করতে করতে মারা গেলে তাকে যে ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, সেই বোধোদয় ঘটে তার।
• যখন কেউ আল্লাহর রাস্তা থেকে বিচ্যুত হয়, সে কারও উপদেশকে তেমন পাত্তা দেয় না। কিন্তু বিপদের সময় তার আল্লাহকে মনে পড়ে, পরকালের ভয়াবহ শাস্তির কথা স্মরণ হয়। আল্লাহ বলেন,
تَنزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِن رَّبِّ الْعَالَمِينَ
বড় শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে “তারা প্রত্যাবর্তন করে।”[১]
তাই বিপদে পড়লে মানুষ নিজের গুনাহ ও তার ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণের অবকাশ পায়। ফলস্বরূপ, সে নিজের ভুলগুলো উপলব্ধি করতে পারে। তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে। এভাবে, দুনিয়াবি বিপদ-আপদ একজন গুনাহগার বান্দার জন্যে নিয়ামাত হিসেবে আসে। গুনাহের কারণে মুমিনদেরকে পরকালে যে অসহনীয় ও অসহ্য শাস্তির যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, দুনিয়াবি বিপদ-আপদের কারণে সেই গুনাহের বোঝা হালকা হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ বলেন,
মুসলিম নর-নারীর ওপর ক্রমাগত বিপদ আসতেই থাকে, যতক্ষণ না তারা সম্পূর্ণ গুনাহমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হয়।”[২]
রাসূলুল্লাহ আরও বলেন,
ما يُصيب المسلم من نصب، ولا وصب، ولا هيم، ولا حزن، ولا أذى، ولا غم، حتى الشوكة يشاكها إلا كفر الله بها من خطاياه
'মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে-সকল যাতনা, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এসবের দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।”[৩]
পরকালের অসহ্য কঠিন শাস্তির তুলনায় দুনিয়াবি কষ্ট-যন্ত্রণাগুলো তো কিছুই না। দুনিয়াবি কষ্টগুলো তো মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু পরকালের শাস্তিগুলো তো চিরস্থায়ী। পরন্তু, আল্লাহ তো আমাদের অধিকাংশ অবাধ্যতাগুলো দুনিয়াতেই ক্ষমা করে দেন। আমরা দুনিয়াতে যেসব কষ্ট ভোগ করি, তা তো আমাদের গুনাহের ক্ষুদ্র একটি অংশেরই প্রতিফল। দয়াময় আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
“ তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন."[১]
আমাদের প্রত্যেকটি গুনাহের কারণে আমাদেরকে যদি শাস্তি দেওয়া হতো, তা হলে সমগ্র পৃথিবীই ধ্বংস হয়ে যেত। আল্লাহ বলেন,
وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوا مَا تَرَكَ عَلَى ظَهْرِهَا مِن دَابَّةٍ وَلَكِن يُؤَخِّرُهُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِعِبَادِهِ بَصِيرًا *
“ যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে ভুপৃষ্ঠে চলমান কাউকে ছেড়ে দিতেন না। কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন। অতঃপর যখন সে নির্দিষ্ট মেয়াদ এসে যাবে (তখন তিনি তাদের পাকড়াও করবেন), আল্লাহ তাআলা বান্দাদের যাবতীয় কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন।”[২]
সুতরাং এটি তো আল্লাহর অসীম দয়া যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের অধিকাংশ গুনাহ মাফ করে দেন এবং পরকালের ভয়াবহ শাস্তির বদলে দুনিয়াবি জীবনের খণ্ডকালীন বিপদ-আপদ দিয়ে আমাদের গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ বলেন,
' আল্লাহ যখন তাঁর বান্দার কল্যাণ চান, তখন দুনিয়াতেই তার শাস্তি দিয়ে দেন, আর যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তখন তার পাপগুলো রেখে দিয়ে কিয়ামাতের দিন তার প্রাপ্য পূর্ণ করে দেন."[৩]
• বিপদ মুমিনদেরকে আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণরূপে অনুগত ও বিনয়ী করে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো মুসলিম যখন রোগাক্রান্ত হয়, তখন সে নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করতে পারে। জীবনে আল্লাহর প্রয়োজন অনুভব করে। সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থতার জন্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, সুস্থতা লাভের পর তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যে আরও গভীরভাবে তখন সে আত্মনিয়োগ করে।
যদি সে সব সময় সুস্থ জীবন কাটাত, যদি সে জীবনে কখনোই কোনো অসুস্থতা অথবা কষ্ট ভোগ না করত, তবে সে হয়তো অহংকারী ও দাম্ভিক হয়ে যেত। একইভাবে, যদি সে সব সময় রোগ-শোক আর কষ্টে জীবন কাটাত, সে আল্লাহর ইবাদাত করার কিংবা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার সুযোগই পেত না।
একজন বিশ্বাসী বান্দা বিপদ-আপদের ফলে এগুলো ছাড়াও আরও অনেক উপকারিতা লাভ করে। তা ছাড়া, দুনিয়াবি বিপদ-আপদ একজন মুসলিমের আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের জন্যেও অত্যাবশ্যক। কারণ বিপদের যাতনা সহ্য করার মাধ্যমে সে গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধি লাভ করতে পারে, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করতে পারে এবং সর্বোপরি বিপদের ঝাপটা সহ্য করে সে দ্বীন কায়েম করতে সমর্থ হয়। আর এ-কারণেই নবিগণ এবং তাঁদের অনুসারীগণ যখন বিপদের সম্মুখীন হতেন, তখন খুশী হতেন। রাসূলুল্লাহ বলেন,
' সবচেয়ে বেশি বিপদ-মুসিবতের মুখোমুখী হয়েছেন নবিগণ। তারপর ন্যায়নিষ্ঠ বান্দাগণ। তাঁদের মধ্যে কাউকে তো এত বেশি দারিদ্র্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে যে, শরীর ঢাকতে এক-টুকরো আবা (কমদামি উলের বস্ত্র) ছাড়া কিছুই ছিল না। আর নিশ্চয়ই তাঁরা বিপদ দেখে তেমনই সন্তুষ্ট হতেন যেমন তোমরা স্বচ্ছলতা দেখে হও।''১
টিকাঃ
[১] আলবানি, আস সহীহাহ : ১৪৬
[১] সূরা আস সাজদাহ, ৩২: ২
[২] বুখারি, আস সহীহ
[৩] বুখারি, আস সহীহ: ২১৩৭
[১] সূরা আশ শুরা, ৪২: ৩০
[২] সূরা আল ফাতির, ৩৫: ৪৫
[৩] তিরমিযি, আস সুনান, হাদীস : ২৩৯৬
[১] আলবানি, আস সহীহাহ: ১৪৪
📄 বিপদ কামনা করা অনুচিত
দুনিয়াবি বিপদ-আপদের নানা উপকারিতা, পুরস্কার এবং এর বিনিময়ে পরকালের শাস্তি মাফের মহা-সুযোগ দেখে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, দুনিয়াবি বিপদ ভোগ-করা এবং আল্লাহ যাতে বিপদে ফেলেন এমন প্রার্থনা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু মুসলিমদেরকে বিপদ চেয়ে দুআ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ :
প্রথমত, বিপদসংকুল অবস্থায় যে-কোনো ব্যক্তি অকৃতজ্ঞ হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাত অস্বীকার করতে পারে, হয়ে যেতে পারে অবিশ্বাসী। আর তা ছাড়া নিজের গুনাহের সম্পূর্ণ ভার এই দুনিয়াবি জীবনে বহন করা আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভবপর হবে না।
দ্বিতীয়ত, ইসলামের বিশেষত্বই হচ্ছে ইসলাম সহজ এবং ক্ষমার ধর্ম। নিজের বিপদ চেয়ে প্রার্থনা করা তাই ইসলামের এই বিশেষত্বের সাথেই সাংঘর্ষিক। আমাদেরকে তো এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছে যে, আমরা যেন নিজেদের কল্যাণ এবং গুনাহ মাফের জন্য দুআ করি। মহিমান্বিত আল্লাহ কুরআনে আমাদের এই দুআটি শিখিয়ে দিয়েছেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে “ আমাদেরকে অপরাধী কোরো না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের ওপর এমন দায়িত্ব অর্পণ কোরো না-যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর অর্পণ করেছ। হে আমাদের প্রভু! এবং আমাদের ওপর ওই বোঝা চাপিয়ে দিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন করো। আমাদেরকে ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের (একমাত্র আশ্রয়দাতা) বন্ধু। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কে সাহায্য করো."[১]
তাই মুসলিমদের উচিত আল্লাহর দয়া গ্রহণ করা এবং আল্লাহর কাছে নিজের কৃত গুনাহের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। বিপদ চাওয়া কখনোই উচিত নয়। আনাস বর্ণনা করেন যে, “রাসূলুল্লাহ একবার এক মুসলিমকে দেখতে গেলেন, সে এতই দুর্বল ছিল যে মুরগির বাচ্চার মতো (চিকন) হয়ে গিয়েছিল। রাসূল তখন তাকে প্রশ্ন করলেন, "তুমি কি আল্লাহর কাছে কোনো বিশেষ দুআ করেছ অথবা বিশেষ কিছু চেয়েছ (যার ফলে তুমি এমন হয়ে গেলে)?"
সে জবাব দিল, “হ্যাঁ, আমি দুআ করেছি যে, হে আল্লাহ! তুমি পরকালে আমার জন্য যেসব শাস্তি রেখেছ, তা আমাকে এই দুনিয়াতেই দিয়ে দাও।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, “সুবহানাল্লাহ! তুমি তো তা সহ্য করতে পারবে না। বরঞ্চ তোমার এ কথা বলা উচিত ছিল :
وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةٌ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও “কল্যাণ দান করো এবং আমাদিগকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।”[২]
তারপর তিনি আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির সুস্থতার জন্য দুআ করলেন আর আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দিলেন।”[৩]
টিকাঃ
[১] সূরা আল বাকারা, ০২: ২৮৬
[২] সূরা বাকারাহ, ০২: ২০১
[৩] মুসলিম, আস সহীহ
দুনিয়াবি বিপদ-আপদের নানা উপকারিতা, পুরস্কার এবং এর বিনিময়ে পরকালের শাস্তি মাফের মহা-সুযোগ দেখে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, দুনিয়াবি বিপদ ভোগ-করা এবং আল্লাহ যাতে বিপদে ফেলেন এমন প্রার্থনা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু মুসলিমদেরকে বিপদ চেয়ে দুআ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ :
প্রথমত, বিপদসংকুল অবস্থায় যে-কোনো ব্যক্তি অকৃতজ্ঞ হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাত অস্বীকার করতে পারে, হয়ে যেতে পারে অবিশ্বাসী। আর তা ছাড়া নিজের গুনাহের সম্পূর্ণ ভার এই দুনিয়াবি জীবনে বহন করা আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভবপর হবে না।
দ্বিতীয়ত, ইসলামের বিশেষত্বই হচ্ছে ইসলাম সহজ এবং ক্ষমার ধর্ম। নিজের বিপদ চেয়ে প্রার্থনা করা তাই ইসলামের এই বিশেষত্বের সাথেই সাংঘর্ষিক। আমাদেরকে তো এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছে যে, আমরা যেন নিজেদের কল্যাণ এবং গুনাহ মাফের জন্য দুআ করি। মহিমান্বিত আল্লাহ কুরআনে আমাদের এই দুআটি শিখিয়ে দিয়েছেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে “ আমাদেরকে অপরাধী কোরো না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের ওপর এমন দায়িত্ব অর্পণ কোরো না-যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর অর্পণ করেছ। হে আমাদের প্রভু! এবং আমাদের ওপর ওই বোঝা চাপিয়ে দিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন করো। আমাদেরকে ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের (একমাত্র আশ্রয়দাতা) বন্ধু। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কে সাহায্য করো."[১]
তাই মুসলিমদের উচিত আল্লাহর দয়া গ্রহণ করা এবং আল্লাহর কাছে নিজের কৃত গুনাহের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। বিপদ চাওয়া কখনোই উচিত নয়। আনাস বর্ণনা করেন যে, “রাসূলুল্লাহ একবার এক মুসলিমকে দেখতে গেলেন, সে এতই দুর্বল ছিল যে মুরগির বাচ্চার মতো (চিকন) হয়ে গিয়েছিল। রাসূল তখন তাকে প্রশ্ন করলেন, "তুমি কি আল্লাহর কাছে কোনো বিশেষ দুআ করেছ অথবা বিশেষ কিছু চেয়েছ (যার ফলে তুমি এমন হয়ে গেলে)?"
সে জবাব দিল, “হ্যাঁ, আমি দুআ করেছি যে, হে আল্লাহ! তুমি পরকালে আমার জন্য যেসব শাস্তি রেখেছ, তা আমাকে এই দুনিয়াতেই দিয়ে দাও।” রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, “সুবহানাল্লাহ! তুমি তো তা সহ্য করতে পারবে না। বরঞ্চ তোমার এ কথা বলা উচিত ছিল :
وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةٌ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও “কল্যাণ দান করো এবং আমাদিগকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।”[২]
তারপর তিনি আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির সুস্থতার জন্য দুআ করলেন আর আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দিলেন।”[৩]
টিকাঃ
[১] সূরা আল বাকারা, ০২: ২৮৬
[২] সূরা বাকারাহ, ০২: ২০১
[৩] মুসলিম, আস সহীহ
📄 বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়
বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি, রহমত ও নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কিছু উপায় নিয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
• সবর : আরবি শব্দ 'সবর' এর মূল শব্দের অনুবাদ করলে তা বোঝায়, 'কোনো কিছুকে আটকে রাখা কিংবা কোনো কিছু হতে বিরত থাকা অথবা নিবৃত্ত থাকা।' ইসলামি পরিভাষায় 'সবর' এর অর্থ হচ্ছে, 'হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকা, অভিযোগ করা থেকে জিহ্বাকে নিবৃত্ত রাখা এবং দুঃখ-দুর্দশার সময় মুখে আঘাত করা কিংবা শরীরের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা থেকে নিজের হাতকে সংযত রাখা।[১]
সবরের বিশেষ গুণ যাদের আছে তারাই সৌভাগ্যবান। রাসূলুল্লাহ বলেন,
مَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنْ الصَّبْرِ
' সবরের চাইতে উত্তম ও প্রশস্ত আর কোনো জিনিস কাউকে দেওয়া হয়নি।[২]
মহিমান্বিত আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, যারা সবর করে তাদেরকে অজস্র সওয়াব দান করা হবে। তাদের প্রতিদান এত বেশি পরিমাণ হবে যে, তা না মাপা যাবে আর না গণনা করা যাবে। আল্লাহ বলেন,
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
“ নিশ্চয় সবরকারীদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে পরিপূর্ণরূপে এবং (তা হবে) অগণিত।”[১]
উত্তমরূপে সবর এনে দেবে প্রতিশ্রুত প্রতিদান, যার ওয়াদা আল্লাহ করেছেন। আর তা অর্জন করতে হলে বিপদের শুরু থেকে সবরের অনুশীলন করতে হবে। যখন সর্বপ্রথম বিপদের ব্যাপারটি আপনি আঁচ করতে পারবেন, ঠিক তখন থেকেই সবরের অনুশীলন করতে হবে। বস্তুত, অন্তর তো দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়, কিন্তু তবুও আল্লাহর বান্দারা হতাশায় মুষড়ে পড়ে না। তারা সবর করে। আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে।
যখন বিপদ আসে তখন মানুষ বিচলিত হয়। একটা সময় পর যখন কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়, তখন সে সবর করে। কিন্তু এটি প্রকৃত সবর নয়। প্রকৃত সবর তো করতে হবে তখন, ঠিক যে মুহূর্তে আপনার ওপর বিপর্যয় আসবে। রাসূলুল্লাহ বলেন,
الصبر عند الصدمة الأولى
' নিশ্চয় সবর তো (করতে হবে) প্রথম আঘাতেই।[২]
বাস্তবতা হচ্ছে প্রত্যেককেই সবর করতে হয়। ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক কিংবা অনিচ্ছায়, একসময় সবাইকেই সবর করতে হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি তো সে-ই, যে প্রথম থেকেই স্বেচ্ছায় সবর করে, সবরের মহান উপকারিতাগুলো বোঝে সবর করে। সে জানে তার সবরের বিনিময়ে সে পুরস্কৃত হবে। আর যদি পেরেশান হয়ে পড়ে তবে সে নিন্দিত হবে। সে জানে, যে সুযোগ তার হাতছাড়া হয়ে গেছে তা আর ফিরে আসবে না। সে জানে, সে আল্লাহর ফায়সালা বদলে ফেলতে পারবে না।
বোকা তো সেই ব্যক্তি যে অভিযোগ করে, যন্ত্রণা ভোগ করে। আর যখন তার কোনো উপায় থাকে না, তখন সে সবর করে। তার এই সবরে তো কোনো উপকারই নেই।
• ইহতিসাব: প্রত্যেক দুঃখ-দুর্দশার সময় আল্লাহর নিকট হতে সওয়াবের প্রত্যাশা করাকে ইহতিসাব বলে। যত বেশি কষ্ট-যাতনা হোক না কেন, আল্লাহর নিকট হতে এর বিনিময়ে ক্ষমা ও মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে ইহতিসাব।
রাসূলূল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার মুমিন বান্দার নিকট থেকে যখন তার অতি প্রিয়জনের জান কবজ করা হয়, আর সে আল্লাহর নিকট সওয়াবের আশায় ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহর নিকট তার একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত। "[১]
আসুন আমরা ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়ার কথা স্মরণ করি। আসিয়ার স্বামী ছিল দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জালিম বাদশাহ ফিরআউন। এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার কারণে আসিয়ার ওপর তার স্বামী ভয়াবহ অত্যাচার করত। এত মারাত্মক জখম আর যন্ত্রণা সহ্য করার পরেও আসিয়া স্বীয় বিশ্বাসে অটল থাকতেন, অসামান্য ধৈর্য আর ইহতিসাব প্রদর্শন করতেন সর্বদা।
তিনি আল্লাহর কাছেই দুআ করলেন। তিনি আল্লাহর কাছে কী চাইলেন? তিনি চাইলেন আল্লাহ যেন জান্নাতে তাকে একটি প্রাসাদ বানিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা এ অসামান্য ঘটনা কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجْنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجْنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ *
“ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্যে ফিরআউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলল: হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।”[২]
যখন তিনি এই দুআ করলেন, তখন আকাশের দ্বারগুলো উন্মোচিত হয়ে গেল। আর আসিয়া জান্নাতে তার ঘর দেখতে পেলেন। তা দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ফিরআউন আদেশ করল, একটি বড় পাথরখণ্ড এনে তা যেন আসিয়ার ওপর ফেলে আসিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সে পাথরখণ্ড আসিয়ার ওপর নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই আসিয়ার জান কবচ করে ফেলা হলো।
ইহতিসাবের কারণে আল্লাহ আসিয়াকে দুইটি নিয়ামাত দান করলেন। তাকে জান্নাতে প্রাসাদ বানিয়ে দিলেন এবং ফিরআউনের দুষ্ট পরিকল্পনা থেকেও হিফাজত করলেন। তাইতো তার পরে কিয়ামাত দিবস পর্যন্ত যারাই আসবেন, তাদের সবার জন্য তিনি দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবেন।।১।
• ইসতিরজা ইহতিসাব : বিপদের সম্মুখীন হয়েও আল্লাহর প্রভুত্বের ঘোষণা দেওয়া ও আল্লাহর নিকট নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়াকে ইস্তিরজা বলে। ইস্তিরজা হচ্ছে বিপদসংকুল অবস্থায় 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন' বলা; অর্থাৎ 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।' আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ *
“ এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়-ক্ষুধা-মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে: নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।”[২]
উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : ( ما من مسلم تصيبه مصيبة فيقول ما أمره الله « إنا لله وإنا إليه راجعون ، اللهم أجرني في مصيبتي وأخلف لي خيراً منها « إلا أخلف الله له خيراً منها
' রাসূলুল্লাহ বলেন, “যখনই কোনো মুসলিম বিপদ দ্বারা আক্রান্ত হয় আর এ কথা বলে যে: 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার বিপদের জন্য আমাকে পুরস্কৃত করো আর তা আমার জন্য উত্তম কোনো জিনিস দিয়ে বদলে দাও'- তা হলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে পুরস্কৃত করবেন এবং তার (বিপদের) পরিবর্তে তাকে উত্তম জিনিস দান করবেন।"
উম্মু সালামা বলেন, "আর তাই যখন আমার স্বামী আবূ সালামা মারা যান, তখন আল্লাহ আমাকে এই দুআ করার তৌফিক দিলেন। আর তার (আবূ সালামা-র) পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ-কে দিলেন (অর্থাৎ পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহ-এর সাথে উম্মু সালামা-র বিয়ে হয়)।[১]
• শাকওয়াহ : শাকওয়াহ অর্থ অভিযোগ করা, নালিশ জানানো। শাকওয়াহ দুই ধরনের-
ক) প্রথম ধরনের শাকওয়াহ হলো আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখ-কষ্ট পেশ করা। এটি সবরের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের শাকওয়াহ-র অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। ইয়াকূব বলেছিলেন,
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ
“আমি তো আমার দুঃখ-বেদনা আল্লাহর নিকটেই পেশ করি।”[২]
খ) আরেক ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে মানুষের নিকট নালিশ করা। এটি হতে পারে প্রত্যক্ষভাবে কথার দ্বারা অথবা পরোক্ষভাবে আচার-আচরণ বা কাজের দ্বারা, যেমন : বিবর্ণ পোশাক পরিধান করা, মাথা মুণ্ডানো, হতাশা প্রকাশ করা ইত্যাদি কাজের দ্বারা। এ-ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে সবরের সাথে সাংঘর্ষিক। এ-ধরনের শাকওয়াহ আল্লাহর ফায়সালার ওপর অসন্তুষ্টি ও অনাস্থা প্রকাশ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমানের দৃঢ়তার অভাব প্রমাণ করে।
তবে নিজের আপনজনকে নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানানো দোষের কিছু নয়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ-এর কাছে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর শরীরে আমার হাত বুলালাম এবং বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি তো কঠিন জ্বরে আক্রান্ত।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ, তোমাদের দু-ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু আক্রান্ত হই।” আমি বললাম, “এটা এ-জন্য যে, আপনার জন্য প্রতিদানও দ্বিগুণ।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ!” তারপর রাসূলুল্লাহ বললেন,
ما من مسلم يصيبه أذى؛ مرض فما سواء، إلا حط الله له سيئاته، كما تحط الشجرة ورقها
'যে-কোনো মুসলিমের ওপর কোনো যন্ত্রণা, রোগ-ব্যাধি বা এ ধরনের অন্য কিছু আপতিত হলে, তাতে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ঝরিয়ে দেন, যেভাবে গাছ তার পাতাগুলো ঝরিয়ে ফেলে।[১]
সুতরাং বিপদগ্রস্ত হলে সবর করা, আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও প্রতিদানের প্রত্যাশা রাখা (ইহতিসাব), আল্লাহর কাছেই বিপদে নিজেকে সঁপে দেওয়া (ইস্তিরজা) এবং আল্লাহর কাছেই নিজের দুঃখ-দুর্দশার নালিশ জানানো। এই চারটি কাজের দ্বারা আমরা বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দয়া অর্জন করতে পারি।
টিকাঃ
[১] 'সবর' শব্দের অনুবাদ এক শব্দে করা আসলে অসম্ভব। যদিও সাধারণভাবে এর অনুবাদ করা হয় 'ধৈর্য', কিন্তু সবর আসলে ধৈর্যের চেয়েও ব্যাপক অর্থ বহন করে। এর ভাবানুবাদ হয় আল্লাহর পথে অটল থাকা, দৃঢ় থাকা। পরীক্ষা যত বড়ই হোক না কেন, দৃঢ়তার সাথে প্রতিদানের আশায় আল্লাহর আদেশ পালন করে যাওয়া এবং সর্বাবস্থায় তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা-সবই সবরের অন্তর্ভুক্ত। সম্পাদক
[২] বুখারি, আস সহীহ : ১৪৬৯
[১] সূরা আয যুমার, ৩৯: ১০
[২] বুখারি, আস সহীহ: ১৮৭৬
[১] প্রাগুক্ত
[২] সূরা তাহরীন, ৬৬:১১
[১] তাবারি, আত তাফসীর: ২৩/৫০০
[২] সূরা বাকারা, ০২: ১৫৫-১৫৬
[১] মুসলিম, আস সহীহ: ৯১৮
[২] সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬
[১] বুখারি, আস সহীহ, হাদীস: ৫৭৫/১১৮
বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি, রহমত ও নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কিছু উপায় নিয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
• সবর : আরবি শব্দ 'সবর' এর মূল শব্দের অনুবাদ করলে তা বোঝায়, 'কোনো কিছুকে আটকে রাখা কিংবা কোনো কিছু হতে বিরত থাকা অথবা নিবৃত্ত থাকা।' ইসলামি পরিভাষায় 'সবর' এর অর্থ হচ্ছে, 'হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকা, অভিযোগ করা থেকে জিহ্বাকে নিবৃত্ত রাখা এবং দুঃখ-দুর্দশার সময় মুখে আঘাত করা কিংবা শরীরের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা থেকে নিজের হাতকে সংযত রাখা।[১]
সবরের বিশেষ গুণ যাদের আছে তারাই সৌভাগ্যবান। রাসূলুল্লাহ বলেন,
مَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنْ الصَّبْرِ
' সবরের চাইতে উত্তম ও প্রশস্ত আর কোনো জিনিস কাউকে দেওয়া হয়নি।[২]
মহিমান্বিত আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, যারা সবর করে তাদেরকে অজস্র সওয়াব দান করা হবে। তাদের প্রতিদান এত বেশি পরিমাণ হবে যে, তা না মাপা যাবে আর না গণনা করা যাবে। আল্লাহ বলেন,
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
“ নিশ্চয় সবরকারীদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে পরিপূর্ণরূপে এবং (তা হবে) অগণিত।”[১]
উত্তমরূপে সবর এনে দেবে প্রতিশ্রুত প্রতিদান, যার ওয়াদা আল্লাহ করেছেন। আর তা অর্জন করতে হলে বিপদের শুরু থেকে সবরের অনুশীলন করতে হবে। যখন সর্বপ্রথম বিপদের ব্যাপারটি আপনি আঁচ করতে পারবেন, ঠিক তখন থেকেই সবরের অনুশীলন করতে হবে। বস্তুত, অন্তর তো দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়, কিন্তু তবুও আল্লাহর বান্দারা হতাশায় মুষড়ে পড়ে না। তারা সবর করে। আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে।
যখন বিপদ আসে তখন মানুষ বিচলিত হয়। একটা সময় পর যখন কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়, তখন সে সবর করে। কিন্তু এটি প্রকৃত সবর নয়। প্রকৃত সবর তো করতে হবে তখন, ঠিক যে মুহূর্তে আপনার ওপর বিপর্যয় আসবে। রাসূলুল্লাহ বলেন,
الصبر عند الصدمة الأولى
' নিশ্চয় সবর তো (করতে হবে) প্রথম আঘাতেই।[২]
বাস্তবতা হচ্ছে প্রত্যেককেই সবর করতে হয়। ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক কিংবা অনিচ্ছায়, একসময় সবাইকেই সবর করতে হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি তো সে-ই, যে প্রথম থেকেই স্বেচ্ছায় সবর করে, সবরের মহান উপকারিতাগুলো বোঝে সবর করে। সে জানে তার সবরের বিনিময়ে সে পুরস্কৃত হবে। আর যদি পেরেশান হয়ে পড়ে তবে সে নিন্দিত হবে। সে জানে, যে সুযোগ তার হাতছাড়া হয়ে গেছে তা আর ফিরে আসবে না। সে জানে, সে আল্লাহর ফায়সালা বদলে ফেলতে পারবে না।
বোকা তো সেই ব্যক্তি যে অভিযোগ করে, যন্ত্রণা ভোগ করে। আর যখন তার কোনো উপায় থাকে না, তখন সে সবর করে। তার এই সবরে তো কোনো উপকারই নেই।
• ইহতিসাব: প্রত্যেক দুঃখ-দুর্দশার সময় আল্লাহর নিকট হতে সওয়াবের প্রত্যাশা করাকে ইহতিসাব বলে। যত বেশি কষ্ট-যাতনা হোক না কেন, আল্লাহর নিকট হতে এর বিনিময়ে ক্ষমা ও মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে ইহতিসাব।
রাসূলূল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার মুমিন বান্দার নিকট থেকে যখন তার অতি প্রিয়জনের জান কবজ করা হয়, আর সে আল্লাহর নিকট সওয়াবের আশায় ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহর নিকট তার একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত। "[১]
আসুন আমরা ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়ার কথা স্মরণ করি। আসিয়ার স্বামী ছিল দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জালিম বাদশাহ ফিরআউন। এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার কারণে আসিয়ার ওপর তার স্বামী ভয়াবহ অত্যাচার করত। এত মারাত্মক জখম আর যন্ত্রণা সহ্য করার পরেও আসিয়া স্বীয় বিশ্বাসে অটল থাকতেন, অসামান্য ধৈর্য আর ইহতিসাব প্রদর্শন করতেন সর্বদা।
তিনি আল্লাহর কাছেই দুআ করলেন। তিনি আল্লাহর কাছে কী চাইলেন? তিনি চাইলেন আল্লাহ যেন জান্নাতে তাকে একটি প্রাসাদ বানিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা এ অসামান্য ঘটনা কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجْنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجْنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ *
“ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্যে ফিরআউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলল: হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।”[২]
যখন তিনি এই দুআ করলেন, তখন আকাশের দ্বারগুলো উন্মোচিত হয়ে গেল। আর আসিয়া জান্নাতে তার ঘর দেখতে পেলেন। তা দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ফিরআউন আদেশ করল, একটি বড় পাথরখণ্ড এনে তা যেন আসিয়ার ওপর ফেলে আসিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সে পাথরখণ্ড আসিয়ার ওপর নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই আসিয়ার জান কবচ করে ফেলা হলো।
ইহতিসাবের কারণে আল্লাহ আসিয়াকে দুইটি নিয়ামাত দান করলেন। তাকে জান্নাতে প্রাসাদ বানিয়ে দিলেন এবং ফিরআউনের দুষ্ট পরিকল্পনা থেকেও হিফাজত করলেন। তাইতো তার পরে কিয়ামাত দিবস পর্যন্ত যারাই আসবেন, তাদের সবার জন্য তিনি দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবেন।।১।
• ইসতিরজা ইহতিসাব : বিপদের সম্মুখীন হয়েও আল্লাহর প্রভুত্বের ঘোষণা দেওয়া ও আল্লাহর নিকট নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়াকে ইস্তিরজা বলে। ইস্তিরজা হচ্ছে বিপদসংকুল অবস্থায় 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন' বলা; অর্থাৎ 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।' আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ *
“ এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়-ক্ষুধা-মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে: নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।”[২]
উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : ( ما من مسلم تصيبه مصيبة فيقول ما أمره الله « إنا لله وإنا إليه راجعون ، اللهم أجرني في مصيبتي وأخلف لي خيراً منها « إلا أخلف الله له خيراً منها
' রাসূলুল্লাহ বলেন, “যখনই কোনো মুসলিম বিপদ দ্বারা আক্রান্ত হয় আর এ কথা বলে যে: 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার বিপদের জন্য আমাকে পুরস্কৃত করো আর তা আমার জন্য উত্তম কোনো জিনিস দিয়ে বদলে দাও'- তা হলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে পুরস্কৃত করবেন এবং তার (বিপদের) পরিবর্তে তাকে উত্তম জিনিস দান করবেন।"
উম্মু সালামা বলেন, "আর তাই যখন আমার স্বামী আবূ সালামা মারা যান, তখন আল্লাহ আমাকে এই দুআ করার তৌফিক দিলেন। আর তার (আবূ সালামা-র) পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ-কে দিলেন (অর্থাৎ পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহ-এর সাথে উম্মু সালামা-র বিয়ে হয়)।[১]
• শাকওয়াহ : শাকওয়াহ অর্থ অভিযোগ করা, নালিশ জানানো। শাকওয়াহ দুই ধরনের-
ক) প্রথম ধরনের শাকওয়াহ হলো আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখ-কষ্ট পেশ করা। এটি সবরের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের শাকওয়াহ-র অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। ইয়াকূব বলেছিলেন,
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ
“আমি তো আমার দুঃখ-বেদনা আল্লাহর নিকটেই পেশ করি।”[২]
খ) আরেক ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে মানুষের নিকট নালিশ করা। এটি হতে পারে প্রত্যক্ষভাবে কথার দ্বারা অথবা পরোক্ষভাবে আচার-আচরণ বা কাজের দ্বারা, যেমন : বিবর্ণ পোশাক পরিধান করা, মাথা মুণ্ডানো, হতাশা প্রকাশ করা ইত্যাদি কাজের দ্বারা। এ-ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে সবরের সাথে সাংঘর্ষিক। এ-ধরনের শাকওয়াহ আল্লাহর ফায়সালার ওপর অসন্তুষ্টি ও অনাস্থা প্রকাশ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমানের দৃঢ়তার অভাব প্রমাণ করে।
তবে নিজের আপনজনকে নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানানো দোষের কিছু নয়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ-এর কাছে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর শরীরে আমার হাত বুলালাম এবং বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি তো কঠিন জ্বরে আক্রান্ত।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ, তোমাদের দু-ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু আক্রান্ত হই।” আমি বললাম, “এটা এ-জন্য যে, আপনার জন্য প্রতিদানও দ্বিগুণ।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ!” তারপর রাসূলুল্লাহ বললেন,
ما من مسلم يصيبه أذى؛ مرض فما سواء، إلا حط الله له سيئاته، كما تحط الشجرة ورقها
'যে-কোনো মুসলিমের ওপর কোনো যন্ত্রণা, রোগ-ব্যাধি বা এ ধরনের অন্য কিছু আপতিত হলে, তাতে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ঝরিয়ে দেন, যেভাবে গাছ তার পাতাগুলো ঝরিয়ে ফেলে।[১]
সুতরাং বিপদগ্রস্ত হলে সবর করা, আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও প্রতিদানের প্রত্যাশা রাখা (ইহতিসাব), আল্লাহর কাছেই বিপদে নিজেকে সঁপে দেওয়া (ইস্তিরজা) এবং আল্লাহর কাছেই নিজের দুঃখ-দুর্দশার নালিশ জানানো। এই চারটি কাজের দ্বারা আমরা বিপদের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দয়া অর্জন করতে পারি।
টিকাঃ
[১] 'সবর' শব্দের অনুবাদ এক শব্দে করা আসলে অসম্ভব। যদিও সাধারণভাবে এর অনুবাদ করা হয় 'ধৈর্য', কিন্তু সবর আসলে ধৈর্যের চেয়েও ব্যাপক অর্থ বহন করে। এর ভাবানুবাদ হয় আল্লাহর পথে অটল থাকা, দৃঢ় থাকা। পরীক্ষা যত বড়ই হোক না কেন, দৃঢ়তার সাথে প্রতিদানের আশায় আল্লাহর আদেশ পালন করে যাওয়া এবং সর্বাবস্থায় তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা-সবই সবরের অন্তর্ভুক্ত। সম্পাদক
[২] বুখারি, আস সহীহ : ১৪৬৯
[১] সূরা আয যুমার, ৩৯: ১০
[২] বুখারি, আস সহীহ: ১৮৭৬
[১] প্রাগুক্ত
[২] সূরা তাহরীন, ৬৬:১১
[১] তাবারি, আত তাফসীর: ২৩/৫০০
[২] সূরা বাকারা, ০২: ১৫৫-১৫৬
[১] মুসলিম, আস সহীহ: ৯১৮
[২] সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬
[১] বুখারি, আস সহীহ, হাদীস: ৫৭৫/১১৮