📄 নিয়তির বিধান
দুনিয়াতে এমন কিছুই ঘটে না যা লাওহে মাহফুজ বা সংরক্ষিত কিতাবে লিখিত নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেই গ্রন্থে তাঁর সৃষ্টির জীবিকা, জীবনোপকরণ, জীবন-মৃত্যু, আমল ইত্যাদি সবকিছুই সংরক্ষণ করে রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةً
"আসমান-যমীন সৃষ্টির ৫০ হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতের পরিমাপ লিখে রেখেছেন।”[১]
অনুরূপভাবে বান্দার ওপর ঘটে যাওয়া প্রত্যেক বিপদ-আপদ বস্তুত নিয়তিরই বিধান, যা আল্লাহ তাআলা পূর্বনির্ধারিত করে রেখছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
“পৃথিবীতে অথবা (ব্যক্তিগতভাবে) তোমাদের ওপর যখনই কোনো বিপর্যয় আসে; তাকে অস্তিত্ব দান করার (বহু) আগেই তা (-র বিবরণ) একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ থাকে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে অত্যন্ত সহজ। এটা এজন্যে বলা হয়, যাতে তোমরা যা হারাও তজ্জন্যে দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তজ্জন্যে বেশি উল্লসিত না হও। আল্লাহ কোনো উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না."[১]
সূরা হাদীদের পরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ সবকিছু পূর্বনির্ধারিত করে রাখার পেছনের হিকমাহ বর্ণনা করেছেন। যখন বিপর্যয় আসবে তখন আল্লাহর বান্দারা যেন হতাশ না হয়ে যায়। আবার আল্লাহ যখন তাদেরকে ভালো কোনো নিয়ামাত দান করেন, তারা যেন এর ফলে অহংকারী বা উদ্ধত না হয়ে যায়। কারণ, প্রত্যেক বিপর্যয়—যা তার সাথে ঘটে—এর সবকিছুই তো পূর্বনির্ধারিত। অন্যদিকে বান্দার অর্জন ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও আল্লাহরই অনুকম্পা। তাই, বান্দার যা পাওয়ার ছিল তা কখনও তাকে ছেড়ে যাবে না। আর যে জিনিস তাকে ছেড়ে যাবে, তা আসলে কখনও তার পাওয়ারই ছিল না। এই বিশ্বাস ইমানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একদা রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করা হলো, "ঈমান কী?” তিনি জবাব দিলেন,
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَا بِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ ৬
আল্লাহর, তাঁর ফেরেশতাকূলের, তাঁর (আসমানি) কিতাবসমূহের, তাঁর রাসূলগণের, কিয়ামাত দিবসের এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস আনাই হচ্ছে ঈমান। "[২]
তাই আল্লাহর বান্দাদের অতি জল্পনা-কল্পনা বা অতিরিক্ত অনুমান করা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। "আহা, আমি যদি এই কাজটি এভাবে না করে ওইভাবে করতাম, তা হলে হয়তো এমনটা হতো না" অথবা "ইশ, আমি যদি এই কাজটি করতাম, তা হলে আজ আমার এমন বিপদ হতো না"- ইত্যাদি কথা বলা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ বলেন,
'... আর যদি তোমাদের ওপর কোনো (বিপর্যয়) আসে, তা হলে এমন কথা বলবে না যে, 'ইশ, যদি আমি এমনটি না করতাম, তা হলে আমার আজ এমন পরিণাম ভুগতে হতো না'; বরং বলবে, 'আল্লাহ (তাকদীরে) যা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, তা-ই হয়েছে।' 'যদি' কথাটা শয়তানের দরজা খুলে দেয়। "[৩]
মহিমান্বিত আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি দান করবেন এবং হিদায়াতের পথে পরিচালিত করবেন, যদি তারা আন্দাজ-অনুমান থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ বলেন,
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ۞
“ আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে কোনো বিপদ আসে না, আর যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।”[১]
ইবনু আব্বাস বলেন, “আল্লাহ তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন'-এর অর্থ হচ্ছে : আল্লাহ তার অন্তরকে নিশ্চয়তার দিকে পরিচালিত করবেন। তাই সে নিঃসংশয়চিত্তে বুঝতে পারবে যে, সে যা পেয়েছে তা কখনোই তাকে ছেড়ে যেত না। আর যে জিনিস সে পায়নি, তা কখনও তার হওয়ারই ছিল না।”[২]
ইমাম ইবনু কাসীর তাঁর তাফসীরে লিখেন, "... যদি কোনো বিপদে যাতনা ভোগ করার পর আল্লাহর কোনো বান্দা বিশ্বাস রাখে যে, এটি আল্লাহর ফায়সালা ও নির্দেশমতোই ঘটেছে, আর সে যদি আল্লাহর থেকে প্রতিদানের আশায় ধৈর্যধারণ করে সেই কষ্ট সহ্য করে, তা হলে আল্লাহ তাঁর বান্দার অন্তরকে সৎপথে পরিচালিত করার মাধ্যমে এবং ঈমানকে সুদৃঢ় করার মাধ্যমে তার কষ্টের ক্ষতিপূরণ দেবেন। সে যা-কিছু হারিয়েছে তার পরিবর্তে আল্লাহ তাকে সে জিনিসের সমপরিমাণ অথবা এর চেয়েও ভালো কিছু তাকে দান করবেন।"
টিকাঃ
[১] নিশাপুরি, আল মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন: ২/২৬০
[১] সূরা হাদীদ, ৫৭:২২, ২৩
[২] বুখারি, আস সহীহ হাদীস: ৪৮
[৩] মুসলিম, আস সহীহ: ৬৪৪১
[১] সূরা তাগাবুন, ৬৪: ১১
[২] তাবারি, আত তাফসীর: ২৩/৪২
📄 ভরসা রাখুন আল্লাহর ওপর
একজন মুসলিমের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার জন্যে যা-কিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার সবকিছুই বান্দার কল্যাণের জন্য; চাই তা ভালো হোক কিংবা মন্দ, স্বস্তিদায়ক কিংবা যাতনাময়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
‘শপথ সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! আল্লাহ মুমিনদের জন্য এমন কোনো বিষয় নির্ধারণ করেন না, যাতে তার উপকার নেই। আর এই বিশেষত্ব মুমিনগণ ছাড়া আর কারও জন্যেই নয়।"[১]
প্রতিটি দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদ-আপদের পেছনে আল্লাহর হিকমাহ সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করা আমাদের মানবিক বুদ্ধিমত্তার পক্ষে অসম্ভব। কারণ মানুষের জ্ঞান তো শুধু দৃশ্যমান বিষয়গুলোতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান—শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে আর তা বান্দাকে কীভাবেই-বা উপকৃত করবে—এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞা তো শুধুমাত্র আল্লাহই রাখেন।
অনেক সময় কোনো বিপদ আপাতদৃষ্টিতে ভয়াবহ মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়তো কল্যাণকর বলে প্রমাণিত হবে। আল্লাহ বলেন,
عَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“ তোমাদের কাছে হয়তো কোনো বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তো-বা কোনো একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে তা অকল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহই জানেন, তোমরা জানো না।”১
তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর নিকট হতে উত্তম প্রতিদানের প্রত্যাশা করা। এবং সেই সাথে আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও ফায়সালার ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখা।
আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, যদি মুমিনগণ তাদের রবের প্রতি ভরসা করতে পারে তা হলে আল্লাহই তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যাবেন। আল্লাহ বলেন,
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
“ যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন।"[খ]
কুরআন আমাদেরকে নবি ইয়াকূব-এর আল্লাহর প্রতি ভরসার অনুপম দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে। ইয়াকূব-এর সন্তানেরা অত্যন্ত সুদর্শন ছিল। তাই মিশরে পাঠানোর সময় তাদেরকে তিনি আলাদা আলাদা প্রবেশপথে ঢোকার আদেশ দেন। কারণ তিনি তাদের জন্যে বদনজরের ভয় করছিলেন।
وَقَالَ يَا بَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِن بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُّتَفَرِّقَةٍ وَمَا أُغْنِي عَنكُم مِنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ )
““ ইয়াকূব বললেন : হে আমার বৎসগণ! সবাই একই প্রবেশদ্বার দিয়ে যেয়ো না, বরং পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ কোরো। আল্লাহর কোনো বিধান থেকে আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারি না। নির্দেশ আল্লাহরই চলে। তাঁরই ওপর আমি ভরসা করি এবং ভরসাকারীদের তাঁরই ওপর ভরসা করা উচিত।"[৩]
এর মাধ্যমে তিনি হয়তো বোঝাতে চেয়েছিলেন, যদিও আমার সাবধানতা আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও নির্ধারিত ফায়সালাকে আটকাতে পারবে না, তবুও আমি আল্লাহর প্রতি এই বিশ্বাস রাখি যে, আল্লাহ যে ফায়সালা করবেন সেটাই সর্বোত্তম।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, মুমিনদের সর্বদা আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। বান্দার জীবনে যখন আনন্দ আর স্বচ্ছলতা আসবে, তখন তার আল্লাহর শোকর করা উচিত এবং সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। আর যখন জীবনে বিপদের ঘনঘটা নেমে আসবে, তখন বান্দার উচিত সবর করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنْ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
'মুমিনের বিষয়াদি কত আশ্চর্যের! তার সবকিছুই কল্যাণকর। আর এটা তো কেবল মুমিনের ক্ষেত্রেই হতে পারে। স্বচ্ছলতায় সে শুকরিয়া আদায় করে, তখন তা তার জন্যে কল্যাণকর হয়। আর যদি তার ওপর কোনো বিপদ নেমে আসে তা হলে সে সবর করে, ফলে তাও তার জন্যে কল্যাণকর হয়ে যায়।১]
বিপদের সময় ধৈর্যহীন হয়ে পড়া, অস্থিরতা দেখানো, অতি উত্তেজিত হয়ে পড়া অথবা কোনো কথা বলা বা কাজ করা যাতে আল্লাহর ফায়সালার ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ পায়—এমন কোনো কাজই আমাদের জন্য বৈধ নয়।
তাই বিলাপ করে কাঁদা, কাপড় ছিঁড়ে শোক পালন করা অথবা নিজের শরীরে আঘাত করা ইত্যাদি কাজ ইসলামে কঠিনভাবে নিষেধ। কিয়ামাতের দিন সবাইকে ওইসব নিষিদ্ধ কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, যা সে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও করেছিল।
ইমাম বুখারি তাঁর সহীহ গ্রন্থে আবূ মূসা আল আশআরি -এর সূত্রে লিপিবদ্ধ করেন যে, যারা বিপদের সময় বিলাপ করে কিংবা মাথা মুণ্ডন করে (শোক প্রকাশের প্রতীক হিসেবে) কিংবা কাপড় ছিঁড়ে ফেলে, তাদের প্রত্যেকের থেকে রাসূলূল্লাহ ﷺ নিজেকে দায়িত্বমুক্ত ঘোষণা করেছেন। সুতরাং এ ধরনের প্রত্যেকটি কাজই আলেমগণের ঐকমত্য (ইজমা) অনুসারে হারাম।
যেসব জিনিস বান্দার ক্ষমতার বাইরে, সেসব কাজের জন্যে কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাকে শাস্তি দেন না। উদাহরণস্বরূপ, কষ্টের সময় যখন অন্তর আবেগপ্রবণ হয়ে যায় তখন চক্ষুযুগল অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। অনবরত নির্গত হয় অশ্রুধারা। এ কান্নার ব্যাপারে বান্দার হয়তো কোনো নিয়ন্ত্রণই থাকে না। সে হয়তো মূল্যবান কোনো বস্তু হারানোর কষ্টে বা প্রিয়জন হারানোর বেদনায় নিদারুণ বিরহের যন্ত্রণা ভোগ করছে। আল্লাহ সেই অশ্রু আর অন্তরের কষ্টদায়ক অনুভূতির জন্যে বান্দাকে শাস্তি দেবেন না।
তবে এমন কষ্টের সময় আল্লাহর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মনে কোনো খারাপ চিন্তার উদয় হওয়ার আগেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আবেগের আতিশয্যে এমন কোনো কথা বলা থেকে নিজ জবানের হেফাজত করতে হবে, যে কথা দ্বারা আল্লাহর ফায়সালার ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর প্রিয় সাহাবি সা'দ ইবনু উবাদাহ -কে দেখতে গেলেন। সা'দ তখন অসুস্থ ছিলেন। রাসূল ﷺ-এর সাথে কয়েকজন সাহাবিও ছিলেন। প্রিয় সাহাবি সা'দকে অসুস্থ দেখে আল্লাহর রাসূল ﷺ কেঁদে ফেললেন। রাসূল ﷺ-কে কাঁদতে দেখে সাহাবিগণও কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
أَلَا تَسْمَعُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يُعَذِّبُ بِدَمْعِ الْعَيْنِ وَلَا بِحُزْنِ الْقَلْبِ وَلَكِنْ يُعَذِّبُ بِهَذَا - وَأَشَارَ إِلَى لِسَانِهِ - أَوْ يَرْحَمُ
‘শুনে রাখো, চোখের পানি কিংবা অন্তরের দুঃখের জন্য আল্লাহ কখনও শাস্তি দেন না, বরং শাস্তি তো দেন তিনি এটির কারণে (এ কথা বলে রাসূল ﷺ নিজের জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন)। নতুবা তিনি দয়া প্রদর্শন করেন। [১]
যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পুত্র ইবরাহীম মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখন রাসূল ﷺ নিজ পুত্রের পাশে গেলেন। রাসূল ﷺ-এর চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়ল। তা দেখে আবদুর রহমান ইবনু আউফ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এমনকি আপনিও (সন্তানের মৃত্যুতে কাঁদলেন)!”
রাসূল ﷺ তখন জবাব দিলেন, “ও ইবনু আউফ! এটি তো দয়া।” তারপর তিনি আরও কাঁদলেন এবং বললেন,
(إن العين تدمع، والقلب يحزن، ولا نقول إلا ما يرضى ربنا، وإنا بفراقك يا إبراهيم لمحزونون)
'আখি অশ্রুসিক্ত হয় এবং অন্তর ভারাক্রান্ত হয়। তবু আমরা এমন কিছুই বলি না, যাতে আমাদের রব অসন্তুষ্ট হন। হে ইবরাহীম! তোমার বিদায়ে আমরা দুঃখভারাক্রান্ত।'[১]
টিকাঃ
[১] মুসলিম, আস সহীহ
[১] সূরা বাকারাহ, ০২: ২১৬
[২] সূরা তালাক, ৬৫: ৩
[৩] সূরা ইউসুফ, ১২: ৬৭
১] মুসলিম, আস সহীহ : ২৯৯৯
[১] মুসলিম, আস সহীহ : ২০২২
[১] বুখারি, আস সহীহ, ১৩০৩
📄 বিপদ : কখন পরীক্ষা আর কখন শাস্তি?
যখন কেউ আল্লাহর আনুগত্যের কাজ করতে গিয়ে বিপদের সম্মুখীন কিংবা ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়, তখন সেই বিপদ হচ্ছে পরীক্ষা। উদাহরণস্বরূপ, কোনো মুজাহিদ যখন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে আহত হন, কোনো মুহাজির যখন হিজরত করতে গিয়ে সম্পত্তি হারান, সুন্নতের অনুসরণ করতে গিয়ে বা ইসলামের বিধান মানতে গিয়ে যখন কারও চাকরি চলে যায়—তখন এ ধরনের বিপদ হচ্ছে পরীক্ষা। যারা এ ধরনের বিপদে সবর করবে, তারা উত্তম বিনিময় পাবে। আর যারা অসন্তোষ প্রকাশ করবে, তারা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হবে।
গুনাহের কাজ করতে করতে যখন কেউ দুর্দশার শিকার হয়, তখন এটি আযাব। উদাহরণস্বরূপ, মদ বা অন্যকোনো নেশাদ্রব্য গ্রহণের কারণে কেউ যখন অসুস্থ হয়ে যায়, তখন তা আল্লাহর তরফ থেকে শাস্তি। এমতাবস্থায় সাথে সাথে গুনাহ ত্যাগ করতে হবে। তাওবা ও ইসতিগফার করে আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আর না হলে জেনে রাখা উচিত, কিয়ামতের শাস্তি এর চেয়ে আরও অনেক ভয়াবহ, যন্ত্রণাদায়ক আর অসহ্য হবে।
অনেক সময় বিপদ-আপদের সাথে নেকির কাজ বা গুনাহের কাজের সরাসরি কোনো সম্পর্ক থাকে না। যেমন কেউ রোগাক্রান্ত হলো, সন্তান হারাল কিংবা ব্যবসায় ক্ষতির শিকার হলো। এমতাবস্থায় একজন মুসলিমের উচিত নিজের আমলের পর্যালোচনা করা। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমলের ফলস্বরূপ বিপদ দেওয়া হয়। অথবা, অনেক সময় আল্লাহ বান্দার ধৈর্য পরীক্ষা করার জন্যে বিপদ দেন।
রাসূলুল্লাহ বলেন,
يُؤْتَى بِأَنْعَمِ أَهْلِ الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُصْبَغُ فِي النَّارِ صَبْغَةً ثُمَّ يُقَالُ يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ خَيْرًا فَظُ هَلْ مَرَّ بِكَ نَعِيمٌ قَطُّ فَيَقُولُ لَا وَاللَّهِ يَا رَبِّ . وَيُؤْتَى بِأَشَةِ النَّاسِ بُوسًا فِي الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَيُصْبَغُ صَبْغَةٌ فِي الْجَنَّةِ فَيُقَالُ لَهُ يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ بُؤْسًا قَطُّ هَلْ مَرَّ بِكَ شِدَّةٌ قَطُّ فَيَقُولُ لَا وَاللَّهِ يَا رَبِّ مَا مَرَّ بِي بُؤْسٌ قَط وَلَا رَأَيْتُ شِدَّةً قَطُّ
' কিয়ামাতের ময়দানে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ধনাঢ্য ও সুখী ছিল এমন এক জাহান্নামী ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে অল্প সময় ঢুকিয়ে এনে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদম-সন্তান! তুমি কি কখনও দুনিয়াতে সুখ- শান্তিতে ছিলে? তুমি কি কখনও দুনিয়ার নিয়ামাত পেয়েছিলে? সে বলবে, না, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! আমি কখনও দুনিয়াতে শান্তি পাইনি। ঠিক তদ্রুপ দুনিয়ায় যে ব্যক্তি সর্বাধিক কষ্ট ও অশান্তিতে ছিল এমন এক জান্নাতি ব্যক্তিকে আনা হবে তারপর তাকে অল্প সময়ের জন্য জান্নাতে ঢুকিয়ে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, হে আদম-সন্তান! তুমি কি কখনও অভাব অনটনে ছিলে? সে আল্লাহর কসম করে বলবে, না, আমি কখনও কোনো অভাব-অনটনে বা কষ্টে ছিলাম না।[১]
সর্বদা স্মরণে রাখবেন:
• দুঃখ-কষ্ট আর সুখ-শান্তি সবই পরীক্ষা।
• আল্লাহ আপনার জন্যে ভালো-মন্দ যা-কিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন, তাতেই আপনার মঙ্গল আছে।
• আপনার সাথে যা ঘটেছে, তা কখনোই আপনাকে ছেড়ে যেত না। আর যা আপনার সাথে ঘটেনি, তা কখনও আপনার সাথে ঘটারই ছিল না।
• সবর মুমিনের একটি অত্যাবশ্যকীয় গুণ।
• যারা আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে ও সবর করে, তারা উত্তম প্রতিদান পায়।
• অধৈর্য হওয়া, বিলাপ করা, হা-হুঁতাশ করার মাধ্যমে কখনোই আল্লাহর নির্ধারিত ফায়সালা বদলে যায় না।
• মানুষের কাছে নিজের বিপদের ব্যাপারে নালিশ জানানো সবরের বিপরীত কাজ।
• একমাত্র আল্লাহই পারেন আপনাকে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এবং আপনার কষ্ট দূর করতে।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, আস সহীহ: ৬৯৮১
যখন কেউ আল্লাহর আনুগত্যের কাজ করতে গিয়ে বিপদের সম্মুখীন কিংবা ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়, তখন সেই বিপদ হচ্ছে পরীক্ষা। উদাহরণস্বরূপ, কোনো মুজাহিদ যখন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে আহত হন, কোনো মুহাজির যখন হিজরত করতে গিয়ে সম্পত্তি হারান, সুন্নতের অনুসরণ করতে গিয়ে বা ইসলামের বিধান মানতে গিয়ে যখন কারও চাকরি চলে যায়—তখন এ ধরনের বিপদ হচ্ছে পরীক্ষা। যারা এ ধরনের বিপদে সবর করবে, তারা উত্তম বিনিময় পাবে। আর যারা অসন্তোষ প্রকাশ করবে, তারা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হবে।
গুনাহের কাজ করতে করতে যখন কেউ দুর্দশার শিকার হয়, তখন এটি আযাব। উদাহরণস্বরূপ, মদ বা অন্যকোনো নেশাদ্রব্য গ্রহণের কারণে কেউ যখন অসুস্থ হয়ে যায়, তখন তা আল্লাহর তরফ থেকে শাস্তি। এমতাবস্থায় সাথে সাথে গুনাহ ত্যাগ করতে হবে। তাওবা ও ইসতিগফার করে আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আর না হলে জেনে রাখা উচিত, কিয়ামতের শাস্তি এর চেয়ে আরও অনেক ভয়াবহ, যন্ত্রণাদায়ক আর অসহ্য হবে।
অনেক সময় বিপদ-আপদের সাথে নেকির কাজ বা গুনাহের কাজের সরাসরি কোনো সম্পর্ক থাকে না। যেমন কেউ রোগাক্রান্ত হলো, সন্তান হারাল কিংবা ব্যবসায় ক্ষতির শিকার হলো। এমতাবস্থায় একজন মুসলিমের উচিত নিজের আমলের পর্যালোচনা করা। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমলের ফলস্বরূপ বিপদ দেওয়া হয়। অথবা, অনেক সময় আল্লাহ বান্দার ধৈর্য পরীক্ষা করার জন্যে বিপদ দেন।
রাসূলুল্লাহ বলেন,
يُؤْتَى بِأَنْعَمِ أَهْلِ الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُصْبَغُ فِي النَّارِ صَبْغَةً ثُمَّ يُقَالُ يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ خَيْرًا فَظُ هَلْ مَرَّ بِكَ نَعِيمٌ قَطُّ فَيَقُولُ لَا وَاللَّهِ يَا رَبِّ . وَيُؤْتَى بِأَشَةِ النَّاسِ بُوسًا فِي الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَيُصْبَغُ صَبْغَةٌ فِي الْجَنَّةِ فَيُقَالُ لَهُ يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ بُؤْسًا قَطُّ هَلْ مَرَّ بِكَ شِدَّةٌ قَطُّ فَيَقُولُ لَا وَاللَّهِ يَا رَبِّ مَا مَرَّ بِي بُؤْسٌ قَط وَلَا رَأَيْتُ شِدَّةً قَطُّ
' কিয়ামাতের ময়দানে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ধনাঢ্য ও সুখী ছিল এমন এক জাহান্নামী ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে অল্প সময় ঢুকিয়ে এনে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদম-সন্তান! তুমি কি কখনও দুনিয়াতে সুখ- শান্তিতে ছিলে? তুমি কি কখনও দুনিয়ার নিয়ামাত পেয়েছিলে? সে বলবে, না, আল্লাহর কসম! হে আমার রব! আমি কখনও দুনিয়াতে শান্তি পাইনি। ঠিক তদ্রুপ দুনিয়ায় যে ব্যক্তি সর্বাধিক কষ্ট ও অশান্তিতে ছিল এমন এক জান্নাতি ব্যক্তিকে আনা হবে তারপর তাকে অল্প সময়ের জন্য জান্নাতে ঢুকিয়ে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, হে আদম-সন্তান! তুমি কি কখনও অভাব অনটনে ছিলে? সে আল্লাহর কসম করে বলবে, না, আমি কখনও কোনো অভাব-অনটনে বা কষ্টে ছিলাম না।[১]
সর্বদা স্মরণে রাখবেন:
• দুঃখ-কষ্ট আর সুখ-শান্তি সবই পরীক্ষা।
• আল্লাহ আপনার জন্যে ভালো-মন্দ যা-কিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন, তাতেই আপনার মঙ্গল আছে।
• আপনার সাথে যা ঘটেছে, তা কখনোই আপনাকে ছেড়ে যেত না। আর যা আপনার সাথে ঘটেনি, তা কখনও আপনার সাথে ঘটারই ছিল না।
• সবর মুমিনের একটি অত্যাবশ্যকীয় গুণ।
• যারা আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে ও সবর করে, তারা উত্তম প্রতিদান পায়।
• অধৈর্য হওয়া, বিলাপ করা, হা-হুঁতাশ করার মাধ্যমে কখনোই আল্লাহর নির্ধারিত ফায়সালা বদলে যায় না।
• মানুষের কাছে নিজের বিপদের ব্যাপারে নালিশ জানানো সবরের বিপরীত কাজ।
• একমাত্র আল্লাহই পারেন আপনাকে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এবং আপনার কষ্ট দূর করতে।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, আস সহীহ: ৬৯৮১
📄 আমাদের দু-হাতের কামাই
বিপদ আসে মুমিন বান্দার জন্য পরীক্ষা হয়ে, যাতে সে সবর করতে পারে আর আল্লাহর ফায়সালার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পারে। তবে অনেক সময়েই মুমিন বান্দাদেরকে বিপদ দেওয়া হয় তাদের গুনাহ ও মন্দ কাজের প্রতিফল হিসেবে। এগুলো হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। আল্লাহ বান্দাদের মনে করিয়ে দেন যে, তাদের উচিত তাদের মন্দ কাজগুলো পরিত্যাগ করা আর আল্লাহর নিকট তাওবা করা।
আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
“তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”[১]
দুনিয়াবি বিপদের এ বাস্তবতা সঠিকরূপে বোঝা এবং তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক। কুরআন এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ পূর্ববর্তী অনেক জাতিকে নাফরমানির কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ সকল জাতির লোকেরা আল্লাহর সতর্কবার্তা শোনেনি। ফলস্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে প্রবল শাস্তি দিয়েছেন।
নূহ-এর সময়কার অবিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ মহাপ্রলয়ংকরী প্লাবনে ডুবিয়ে শাস্তি দিয়েছেন। হূদ-এর কওমকে প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা উৎখাত করেছেন। সালিহ-এর অহংকারী কওমকে প্রচণ্ড ভূকম্পনের দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। কৃত -এর কওমকে আল্লাহ তাআলা চূড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত করেন। তাদের সমগ্র এলাকা উলটিয়ে দেন, আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করে সমগ্র জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেন।
এগুলো-সহ কুরআনে বর্ণিত অতীতের জাতিগুলোর অন্যান্য কাহিনি আমাদেরকে সতর্ক করে দেয় আর জানিয়ে দেয় যে, আল্লাহর নাফরমানি করতে থাকলে, আল্লাহর সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।
আল্লাহ বলেন,
لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ *
“ রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহ্বানের মতো গণ্য কোরো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন, যারা তোমাদের মধ্যে চুপিসারে সরে পড়ে। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” [১]
শাস্তির রয়েছে রকমফের। শাস্তি আসতে পারে নানারূপে। সম্ভবত বর্তমান সময়ে মানবজাতির ওপর আপতিত সবচেয়ে সুস্পষ্ট শাস্তি হলো এইডস। আশির দশক থেকে এইডসের আবির্ভাব। এইডস হচ্ছে এইচ.আই.ভি. নামক ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট একটি ব্যাধি, যা মানুষের শরীরের রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। এতে করে একজন এইডস-রোগী খুব সহজেই যে-কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটাতে পারে।
এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যায়। এইডসের ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে-লাগামছাড়া যৌনসম্পর্ক, সমকামিতা এবং মাদকাসক্তির প্রসার। এই প্রত্যেকটি কাজই এমন, যা আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে।
অনেকে হয়তো বলবে, এইডস তো শুধুমাত্র গুনাহগার লোকদেরই হয় না। অনেক সময় চরিত্রবান মানুষও এইডস আক্রান্ত হয়। এ কথার জবাবে কুরআন জানাচ্ছে-যখন আল্লাহর গজব আপতিত হয়, তা শুধু গুনাহগারদেরই আক্রান্ত করে না, বরং সমগ্র সমাজ এতে আক্রান্ত হয়। আল্লাহ বলেন,
وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“আর তোমরা এমন ফিতনা থেকে বেঁচে থাকো, যার শাস্তি তোমাদের মধ্যে যারা জালিম শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর শাস্তি দানকারী।”[১]
শুধু এইডস নয়, মানবজাতিকে আজ অসংখ্য ব্যাধি ও বিপর্যয় গ্রাস করেছে। বর্তমানে আমরা প্রতিনিয়ত শুনতে পাই নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা। অপ্রত্যাশিত বন্যা-ঝড়-তুফান-ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে।
আজ মুসলিম উম্মাহ জালিমদের অত্যাচারে জর্জরিত। এগুলোও আমাদের জন্য শাস্তিদায়ক স্মরণিকা। আমরা আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে অভাব-অনটন আর বিপদ-আপদ দিয়ে আক্রান্ত করে রেখেছেন, আমাদের ওপর জালিমদের চাপিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ আমাদের সতর্ক করছেন। জেনে রাখুন, এগুলোর একমাত্র সমাধান হলো আল্লাহর অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকা, নিজেকে ইসলামের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখা, হারামে লিপ্ত না হওয়া। আল্লাহ বলেন,
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।”[২]
আমাদেরকে এসব সতর্কবার্তার ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত। আল্লাহর নিকট তাওবা-ইসতিগফার করা উচিত। এমন কাজ পরিহার করা উচিত, যা আমাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে। আমাদের উচিত কল্যাণের কাজে অগ্রসর হওয়া, যাতে আমরা আমাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিত। নতুবা আমরা আল্লাহর গজব থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারব না।
টিকাঃ
[১] সূরা শুরা, ৪২: ৩০
[১] সূরা নূর, ২৪: ৬৩
[১] সূরা আনফাল, ০৮:২৫
[২] সূরা রোম, ৩০:৪১
বিপদ আসে মুমিন বান্দার জন্য পরীক্ষা হয়ে, যাতে সে সবর করতে পারে আর আল্লাহর ফায়সালার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পারে। তবে অনেক সময়েই মুমিন বান্দাদেরকে বিপদ দেওয়া হয় তাদের গুনাহ ও মন্দ কাজের প্রতিফল হিসেবে। এগুলো হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। আল্লাহ বান্দাদের মনে করিয়ে দেন যে, তাদের উচিত তাদের মন্দ কাজগুলো পরিত্যাগ করা আর আল্লাহর নিকট তাওবা করা।
আল্লাহ বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
“তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”[১]
দুনিয়াবি বিপদের এ বাস্তবতা সঠিকরূপে বোঝা এবং তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক। কুরআন এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ পূর্ববর্তী অনেক জাতিকে নাফরমানির কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ সকল জাতির লোকেরা আল্লাহর সতর্কবার্তা শোনেনি। ফলস্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে প্রবল শাস্তি দিয়েছেন।
নূহ-এর সময়কার অবিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ মহাপ্রলয়ংকরী প্লাবনে ডুবিয়ে শাস্তি দিয়েছেন। হূদ-এর কওমকে প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা উৎখাত করেছেন। সালিহ-এর অহংকারী কওমকে প্রচণ্ড ভূকম্পনের দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। কৃত -এর কওমকে আল্লাহ তাআলা চূড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত করেন। তাদের সমগ্র এলাকা উলটিয়ে দেন, আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করে সমগ্র জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেন।
এগুলো-সহ কুরআনে বর্ণিত অতীতের জাতিগুলোর অন্যান্য কাহিনি আমাদেরকে সতর্ক করে দেয় আর জানিয়ে দেয় যে, আল্লাহর নাফরমানি করতে থাকলে, আল্লাহর সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।
আল্লাহ বলেন,
لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ *
“ রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহ্বানের মতো গণ্য কোরো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন, যারা তোমাদের মধ্যে চুপিসারে সরে পড়ে। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” [১]
শাস্তির রয়েছে রকমফের। শাস্তি আসতে পারে নানারূপে। সম্ভবত বর্তমান সময়ে মানবজাতির ওপর আপতিত সবচেয়ে সুস্পষ্ট শাস্তি হলো এইডস। আশির দশক থেকে এইডসের আবির্ভাব। এইডস হচ্ছে এইচ.আই.ভি. নামক ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট একটি ব্যাধি, যা মানুষের শরীরের রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। এতে করে একজন এইডস-রোগী খুব সহজেই যে-কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটাতে পারে।
এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যায়। এইডসের ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে-লাগামছাড়া যৌনসম্পর্ক, সমকামিতা এবং মাদকাসক্তির প্রসার। এই প্রত্যেকটি কাজই এমন, যা আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে।
অনেকে হয়তো বলবে, এইডস তো শুধুমাত্র গুনাহগার লোকদেরই হয় না। অনেক সময় চরিত্রবান মানুষও এইডস আক্রান্ত হয়। এ কথার জবাবে কুরআন জানাচ্ছে-যখন আল্লাহর গজব আপতিত হয়, তা শুধু গুনাহগারদেরই আক্রান্ত করে না, বরং সমগ্র সমাজ এতে আক্রান্ত হয়। আল্লাহ বলেন,
وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“আর তোমরা এমন ফিতনা থেকে বেঁচে থাকো, যার শাস্তি তোমাদের মধ্যে যারা জালিম শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর শাস্তি দানকারী।”[১]
শুধু এইডস নয়, মানবজাতিকে আজ অসংখ্য ব্যাধি ও বিপর্যয় গ্রাস করেছে। বর্তমানে আমরা প্রতিনিয়ত শুনতে পাই নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা। অপ্রত্যাশিত বন্যা-ঝড়-তুফান-ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে।
আজ মুসলিম উম্মাহ জালিমদের অত্যাচারে জর্জরিত। এগুলোও আমাদের জন্য শাস্তিদায়ক স্মরণিকা। আমরা আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে অভাব-অনটন আর বিপদ-আপদ দিয়ে আক্রান্ত করে রেখেছেন, আমাদের ওপর জালিমদের চাপিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ আমাদের সতর্ক করছেন। জেনে রাখুন, এগুলোর একমাত্র সমাধান হলো আল্লাহর অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকা, নিজেকে ইসলামের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখা, হারামে লিপ্ত না হওয়া। আল্লাহ বলেন,
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।”[২]
আমাদেরকে এসব সতর্কবার্তার ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত। আল্লাহর নিকট তাওবা-ইসতিগফার করা উচিত। এমন কাজ পরিহার করা উচিত, যা আমাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে। আমাদের উচিত কল্যাণের কাজে অগ্রসর হওয়া, যাতে আমরা আমাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিত। নতুবা আমরা আল্লাহর গজব থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারব না।
টিকাঃ
[১] সূরা শুরা, ৪২: ৩০
[১] সূরা নূর, ২৪: ৬৩
[১] সূরা আনফাল, ০৮:২৫
[২] সূরা রোম, ৩০:৪১